লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ৫৫
নুসাইবা আরা নুরি
সোফায় গোল হয়ে বসে আছে সকলে।সবার মুখেই চিন্তার ছাপ স্পষ্ট।দুপুরে খাওয়ার পর সোফায় বসে সবার আড্ডা দেওয়ার মাঝে হটাৎ যখন তোহা কথাটা বললো।তারপর থেকে নিশ্চুপ সকলে।তোহার আইডিতে পাঠানো ওই ম্যাসেজ গুলো পড়েছে সকলে।মাথায় কাজ করছে না কারোর।কি বলবে।
মেহেরাজের কথায় ইভান নিজের ল্যাপটপ নিয়ে অনেক কষ্টে আইডিটা হ্যাক করে।নতুন আইডি হলেও বেশ সিকিউরিটি সস্টেম আ্যড করা আইডিতে।।তবে বিশেষ কোনো লাভ হয়নি।আইডি টাতে একমাত্র তোহাকে ম্যাসেজ করা হয়েছে।আর কিছুই নেই।আইডি টা খোলা আজকেই ইতালিয়ান সার্ভার সিস্টেম দিয়ে।আইডিতে কোনো নাম্বার এড করা নেই।একটা জি-মেইল দিয়ে আইডি ওপেন করা।
ইভান জিমেইল ট্রাক করেছিলো তবে হতাশ হয়েছে।জিমেইল এর মালিক বর্তমান ইতালিতে।তাহলে অনুভব চ্যাটার্জী কি এখন ইতালিতে।কারোর মনের কোনো প্রশ্নের উত্তর মেলেনা।তবে এটা বুজতে পারে অনুভব চ্যাটার্জী কোনো কাচা খেলোয়াড় না।খুব ধুর্ত একজন মানুষ।
ডাইনিং রুমে চলছে পিনপতন নিরবতা।সবার নজর তোহার ফোনের জ্বলে থাকা স্ক্রীনে যেখানে অনুভবের ম্যাসেজ টা আছে।শ্রেয়সীর জ্বর কিছুটা কমলেও মেহেরাজ বিছানা থেকে উঠতে নিষেধ করেছে।তাই খেয়ে আবার ঘুমিয়ে গেছে মেয়েটা।তারপর মেহেরাজ বাইরে থেকে দরজা লক করে সোফায় এসে বসেছে।সাত ঘন্টার ভিতরে ইতিমধ্যে চার ঘন্টা পার হয়ে গেচহে।হাতে বেশি সময় নেই।
যা সিদ্ধান্ত নেওয়ার খুব দ্রুত সময়ের ভিতরেই করতে হবে।সবার মাঝের নিরবতা ভেঙে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তুহিন বলে উঠে,
-আমার মনে হয়।একবার বিশ্বাস করে দেখা উচিত। কারন আমার মনে হচ্ছে সে আসল অনুভব চ্যাটার্জী কারন সব ইনফরমেশন তার জানা।আর একবার আমাদের জীবন ও বাচিয়েছে আগুন দূত হয়ে এসে।হয়তো আমরা এখানে আছি সেটাও জানে সে।তাই একবার রিস্ক নিয়ে দেখলে ভালো হতো যদি মিশন টা শেষ করতে পারি তাহলে কত নিরাপরাধ মানুষের জীবন বেচে যাবে।ম্যাসেজে তো লেখাই আছে।
তুহিনের বলা কথা সকলেই মনযোগ দিয়ে মনযোগ দিয়ে শুনলো।তারপর আবার সবার মাঝে নিরবতা ছেয়ে গেলো।সবার মন দোটানায় পড়েছে।একবার মনে হচ্ছে ম্যাসেজের কথায় বিশ্বাস করবে আর একবার মনে হচ্ছে না বিশ্বাস করায় ভালো যদি বিপদ হয়।তুহিন থামার কিছুক্ষন পর নিরবতা ভেঙে মিলি বলে উঠে,
-যদি এটা অন্য কারোর চাল হয়ে থাকে।তাহলে আমরা সকলেই বিপদে পড়বো।তখন কি হবে??
মিলির কথায় সবাই তাকায় মিলির পানে। তুহিন কিছু বলার জন্য উদ্দত হতেই মেহেরাজ বেশ গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠে,
-আমার মনে হয়না এটা অন্য কারোর চাল। কারন লোকটার ম্যাসেজের কথাগুলো দেখেছিস তো কিভাবে কনফিডেন্স এর সাথে বলেছে।আবার এটাও বলেছে আমাদের ইচ্ছা।আমরা তার দেওয়া সাহায্য গ্রহন করবো কিনা।এবার তোরা ভাব কি করবি??
মেহেরাজের কথায় তোহা আর ইভান ও একমত হয়।মেহেরাজ থামার পর ইভান বলে ল্যাপটপ টা অফ করে বলে উঠে,
-ভাইয়ার কথায় আমিও একমত।লোকটার ম্যাসেজ এ প্রতিটা কথায় অন্য রকম কনফিডেন্স আছে।আর আইডি এমন ভাবে খোলা যে সাধারন কেও এভাবে সিকিউরিটি সস্টেম এক্টিভ করতে পারবে না।তার উপর আইডির লোকেশন।জিমেইল সব কিছুই ইতালিয়ান সার্ভারে কানেক্টেড।যত দূর ধারনা করা যায় এটা অনুভব চ্যাটার্জী ই।সন্দেহ নেই।
ইভানের কথা শুনে সকলে আরো চিন্তায় পড়ে যায়।ম্যাসেজ টা পড়ার পর অনুভব কে প্রথমে তাদের শত্রু মনে হলেও ম্যাসেজে এমন কিছু পয়েন্ট উল্লেখ আছে যা কারোর জানার কথা না।তবে অনুভব চ্যাটার্জী কে তো চিনেই সকলে ভালোর ভালো আর খারাপের জোম।হয়তো সত্যিই তাদের এই মিশনটাতে সাহায্য করতে চাইছে অনুভব চ্যাটার্জী।।সত্যিই হয়তো সেই একশত বারো জন মানুষের জীবন বাচাতে চাইছে তাদের হাত দিয়ে।
তবে কেন।তাদের হাত দিয়েই কেন বাচাবে।সে চাইলেই তো সব করতে পারে তাহলে??সবার মনে ভিন্ন ভিন্ন প্রশ্নের জন্ম হতে শুরু করে।সবার ভাবনার মাঝেই তোহা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে উঠে,
-জানিনা কপালে কি আছে।তবে আমার মনে হয় একটা বার এই অজানা অন্ধকারে পা রাখা ভালো তাকে বিশ্বাস করে।আর আগের বার সে আমাদের নিঃস্বার্থ ভাবে বাচিয়েছিলো। এবার আবার সে নিজ থেকেই সাহায্য করতে চাইছে।হতে পারে সাফল্য নিজ থেকেই আমাদের কাছে ধরা দিতে চাচ্ছে।
তোহার কথায় মনে মনে হাসলো মেহেরাজ।মেয়েটা বেশ বুদ্ধিমতী।নেগেটিভ চিন্তা মাথায় আনার আগে সব রকমের পসিটিভ চিন্তা করে সুত্র খোজার চেষ্টা চালায়।এটা মেহেরাজের বেশ ভালো লাগে।এই যে এখন সবাই অনুভবের ম্যাসেজ নিয়ে নেগেটিভ চিন্তা করলেও একমাত্র তোহা পজিটিভ চিন্তা করে যাচ্ছে।
তোহার কথায় প্রথমে সকলে আবারো একটু দ্বিমত করলেও পরক্ষনে রাজি হয়ে যায়।তোহা স্বস্তির একটা শ্বাস নিয়ে।মোবাইল হাতে নিয়ে সাবধানের সহিত সাহায্য চেয়ে ভয়েজ পাঠাই অনুভবের আইডিতে।সাথে সাথে ম্যাসেজ সিন হয়ে যায়।সবাই বেশ অবাক হয়।এতো দ্রুত ম্যাসেজ সিন হতে দেখে।সাথে সাথেই ম্যাসেজ টাইপিং হয়ে ক্ষনিকের মাঝেই আবারো একটা ম্যাসেজ ভেসে উঠে স্ক্রীনে,
-আমি জানতাম আপনি আমার সাহায্য না নিয়ে পারবেন না।কারন আপ্নারা যে দাবার সৈন্য।আমি সেই দাবার রাজা।
আমাকে আর ম্যাসেজ দিতে পারবেন না আপনি।আর আমার একটা শ্যাডো টিম আপনাদের আশে পাশেই আছে সেফটি দেওয়ার জন্য।আজকের পর থেকে লাস্ট সাত দিন আমি যখন যা বলবো তাই করবেন।তাহলে শিকার খাচায় আটকে ফেলতে পারবেন।
অনুভবের পাঠানো ম্যাসেজ টা পড়ে তোহার পাশাপাশি সকলেরই ভ্রু কুচকে গেলো।তার মানে তাদের ধারনাই ঠিক।লোক্টা তাদের উপরেও নজর রেখেছে।কিন্তু কেনো।আর এই সাত দিনে কি হবে।আএ লোকটা যা বলবে তাই শুনতে হবে।মানে কি।তোহার ভাবনার মাঝে আরো একটা ম্যাসেজ ভেষে উঠলো স্ক্রীনে।সবাই এক সাথে হামলে পড়লো দেখতে।ম্যাসেজে স্পষ্ট করে লেখা,
-স্ক্রীনে চোখ রাখবেন।দরকার হয় কেও নাইট শিফট।কেও ডে শিফট করবেন।আমার দেওয়া একটা ম্যাসেজ ইগনোর করা মানে নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারা।শত্রুদের আরো দূরে পালিয়ে যেতে সাহায্য করা।নিজের মন শক্ত করুন।আবেগ, ইমোশন কে হত্যা করুন।ধন্যবাদ।
ম্যাসেজ টা পড়ার পরপরই ভ্রু জোড়া কুচকে গেলো তোহার।ভ্রু কুঞ্চিত রেখেই বলে উঠলো,
-আমার আবেগ, ইমোশনকে হত্যা করতে বললো কেন।আর মনই বা শক্ত করতে বলল কেন।
নিজের কথায় নিজেরই হটাৎ বুকের ভিতর কেমন চিনচিনে ব্যাথা শুরু হয়ে গেলো হটাৎ।মুহুর্তেই মনে পড়ে গেলো সিয়ামের কথা।সিয়াম ও তো পাপ কাকের সাথে জড়িত।তাহলে।অনুভব চ্যাটার্জী কি সিয়াম কে মিন করেই তার মন শক্ত করতে বলল।না না এ কি ভাবছে তোহা।অনুভব কেন বা সিয়াম কে মিন করবে।আর মিন করলেও তোহার কি।তোহার ডিউটি তোহাকে পালন করতেই হবে।আবারো বুকের ভিতর অদ্ভুত শুন্যতা ঘিরে ধরলো তোহাকে।
-এই তোহা।কি ভাবছিস এতো??
মিলির ধাক্কায় তোহার ধ্যান ভেঙে যায়।সাথে সাথে বলে উঠে,
-ক কি হয়েছে??
-কি ভাবছিলি??
-ক কোথায়??
মিলি আরও কিছু বলতে যাবে তার আগে মেহেরাজ মিলিকে থামিয়ে দিলো।তারপর তোহার দিকে তাকিয়ে বলল,
-তোরে তুহিন কি বলল বল তো।যদি কিছু নাই ভেবে থাকিস??
মেহেরাজের কথায় মাথা নিচু হয়ে যায় তোহার।সে তো আসলেই শুনতে পায়নি বলবে কি।মেহেরাজ চোখ বুজে একটা শ্বাস নিয়ে বলে,
-নিশ্চয় অনুভব চ্যাটার্জী তোর মাঝে এমন কিছু দেখেছে।যা এখানে উপস্থিত অন্য কারোর মাঝে দেখেনি।আর এর আগের মিশনের মার্ডা*র গুলোর কথা হতে পারে অনুভব চ্যাটার্জী জানে।তাই তোকে মন শক্ত করে পুরোপুরি প্রিপারেশন নিতে বলেছে।শুধু তুই না সবাই শক্ত হ।নিজের টিম তৈরি কর।
মেহেরাজ থামতেই তুহিন বলে উঠে,
-আমিও এটাই বলছি।বাট নিজেদের টিম মানে তুই থাকবি না??
তুহিনের কথায় সকলে তাকায় মেহেরাজের দিকে।মেহেরাজ বিরক্তিমুখে এক পলক তাকালো সবার মুখের দিকে তারপর বলল,
-আমিতো শুরু থেকে কিছুই জানতাম না।মাঝখানে বাড়িতে ফিরলাম তোরা সব বললি।আর সেদিনের মিশনেও তো আমি ছিলাম না।তাই এটাই ও থাকতে চাই না।
মেহেরাজের কথায় মিলি ভ্রু কুচকে বলে,
-ভয় পাচ্ছিস নাকি রাগ করছিস মেহু??
-মেহেরাজ ভয় পাই না রে লিলিপুট।আর রাগের তো প্রশ্নই নেই।বন্ধুদের উপর কেও রাগ করে নাকি।আর সব শেষ কথা আমি যেতে চাইনা কারন এটা সম্পুর্ন পুলিশ আর্মিদের গোয়েন্দা সংস্থার মিশন।আর আমার একটা ভুলে কারোর জীবন ও চলে যেতে পারে।আর আমাকে কখন কল দিবে ঠিক নেই।দেখা যাবে মিশন অর্ধেক হয়েছে তখন আমার ডাক পড়েছে।তখন তোদের সমস্যা বাড়বে।
মেহেরাজ থামতেই তোহা বলে উঠে,
লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ৫৪
-আর যদি…
তোহা বাকি কথা টুকু শেষ করার আগেই মেহেরাজের ফোন ভাইব্রেশন হয়।টি টেবিলের উপরে থাকায় সবার নজর একত্রে ফোনের উপরে পড়ে।মুহুর্তেই সবার মুখের ভাবমূর্তি বদলে যায়।মেহেরাজ মোবাইল টা হাতে তুলে নিয়ে সবাইকে ইশারা করে চুপ থাকতে বলে।ফোন রিসিভ করে কানে ধরে।
ওপাশ থেকে কিছু একটা বলার পর মেহেরাজ শান্ত গলায় বলে,
-ইয়েস ক্যাপ্টেন মেহেরাজ মির্জা।
