Home শুকনো পাতার নূপুর পায়ে শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ১১

শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ১১

শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ১১
আয়েশা শেখ

রাত তখন নিঝুম, ঘড়ির কাঁটায় ঠিক তিনটে। চারপাশ একদম থমথমে, নিস্তব্ধ। চঞ্চল শেহরিয়ার এসে বসেছে বিছানার পাশে, যেখানে বেঘোরে ঘুমাচ্ছে তার নিজের ছেলে। দরজাটা হয়তো আজ আর লক করা হয়নি, অসাবধানতাবশত খোলা রেখেই গভীর ঘুমে তলিয়ে গেছে সে।
বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে আছে বারিশ। কোমর অবধি টানা পাতলা চাদরটা একপাশে কিছুটা সরে গেছে। চাদরটা ভালোভাবে টেনে দিলেন তিনি। তারপর হাতটা আলতো করে উঠে এলো মাথার কাছে, ছেলের লম্বা, ঘন কালো চুলে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন। নিজের চোখের সামনে শুয়ে থাকা এই বর্তমান পুরুষটাকে সেই সাত বছর আগের চঞ্চল তরুণটার সাথে কোনোভাবেই মেলানো যায় না। এটা সেই তরঙ্গ নয়, যে আজ থেকে সাত বছর আগে এই বাড়ি, এই শহর ছেড়ে চলে গিয়েছিল! যদিও সে নিজে থেকে যায়নি। তারাই তাকে একরকম জোর করে, বাধ্য করে তাড়িয়ে দিয়েছিল। সেই সিদ্ধান্তের কথা মনে হতেই তার ভেতরটা হু হু করে ওঠে।

দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাতটা সরিয়ে নিল, কিন্তু চোখ সরাতে পারল না। সাতটা বছর একটা মানুষের ভেতরের চপলতা, হাসি আর প্রাণোচ্ছলতা কীভাবে এভাবে শুষে নিতে পারে? এখন তার অবয়বে, তার আচরণে যে রাশভারী গম্ভীর রূপ, তা যেন এক অচেনা মানুষকে প্রকাশ করে।
বিছানার ওপর ঘুমে আচ্ছন্ন শরীরটা সামান্য নড়ে উঠতেই চঞ্চল দ্রুত নিজেকে সামলে নিল। সে চায় না তার উপস্থিতির টের পেয়ে এই কঠিন মানুষটার ঘুম ভেঙে যাক। কারণ জেগে থাকা অবস্থায় এই ছেলে কখনো তাকে এত কাছে আসতে দেবে না, আর না দেবে নিজের ভেতরের সেই ক্ষতগুলো প্রকাশ করতে। দু’মাস হলো ছেলেটা এই দেশে ফিরেছে, অথচ এই দীর্ঘ সময়ে বাসার কারও সাথেই সে মন খুলে একটা কথাও বলেনি। চঞ্চল শেহরিয়ারের মাথায় কিছুতেই খেলে না—এই ছেলে দেশে এসেই হুট করে কী মনে করে দীঘিকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিলো! রাত পোহালেই তো গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান, পুরো বাড়ি উৎসবের আলোয় সেজে উঠছে। অথচ এই বিয়ে নিয়ে চঞ্চলের মনের ভেতর এক ফোঁটা আনন্দ নেই, বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। থাকবেই বা কী করে? দীঘি মেয়েটাকে তো সে নিজের চোখে মদ্যপান করতে দেখেছে! আধুনিকতার নামে এমন উচ্ছৃঙ্খলতা চঞ্চল কিছুতেই মেনে নিতে পারে না। যে মেয়ে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারে না, তাকে কীভাবে এই বাড়ির পুত্রবধূ হিসেবে মেনে নেবেন তিনি?
​আগের সেই পুরনো দিনগুলো হলে হয়তো এতক্ষণে ছেলেকে দু-চারটে কড়া ধমক দিয়ে স্পষ্ট জানিয়ে দিতেন, এই বিয়ে হবে না। কিন্তু বিছানায় শুয়ে থাকা এই মানুষটা আর আগের সেই ছেলে নেই! এর ওপর হুকুম খাটানো তো দূর, কোনো বিষয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকারও তারা হারিয়েছে। ছেলের ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে তিনি আরেক দফা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে নিঃশব্দে, ভারী পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।

পরদিন সন্ধ্যা নামতেই পুরো আলোয় আলোকময় হয়ে উঠেছে দুই বাড়ির একদম কাছাকাছি বিস্তীর্ণ ফাঁকা জায়গাটি। দুই পরিবারের সুবিধার কথা চিন্তা করে এই বিশাল প্রাঙ্গণ জুড়ে আয়োজন করা হয়েছে যৌথ গায়ে হলুদের। জমকালো আলোকসজ্জা, গাঁদা ফুলের সুবাস আর উৎসবের চঞ্চল সুর মিলেমিশে এক রাজকীয় পরিবেশ তৈরি হয়েছে চারিপাশে।
​​হলুদ রঙের ঐতিহ্যবাহী পোশাকে সেজে দীঘি আর বারিশ পাশাপাশি বসে আছে স্টেজে। তবে বারিশের মুখাবয়ব বরাবরের মতোই অতিরিক্ত গম্ভীর। বরযাত্রী আর মেহমানদের হাসাহাসি আর হইচইয়ের মাঝেই দুজনে খুব নিচু স্বরে, চাপা গলায় একে অপরের সাথে কিছু একটা বলতে ব্যস্ত তারা। দীঘির গালে হলুদ লেগে আছে। বারিশের গালে কেউ হলুদ লাগানোর সাহস পায়নি। স্টেজের কোলাহলের মাঝেই তারা দুজন যখন নিচু স্বরে চাপা কোনো আলোচনায় মগ্ন, ঠিক তখনই অনাহূত এক ঝড়ের মতো সেখানে ছুটে এলো ঝিলমিল। এতক্ষণে যে সে কোত্থেকে আসলো কে জানে! পরনে তার গায়ে হলুদের জমকালো লেহেঙ্গা। দূর থেকে দৌড়ে এসে সে নতুন বর-কনের ঠিক সামনে এসে দাঁড়াল। আর ওমনি দীঘি আর বারিশের মধ্যকার ফিসফিসানি মুহূর্তেই থেমে গেল।
দীঘি ভ্রু কুঁচকে বলল,

_“এত দেরি হলো কেন তোর?”
ঝিলমিল হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
_“সাজতে দেরি হয়ে গেল ফুপি। সবাই তোমাদের হলুদ দিয়ে দিয়েছে?” কথা বলতে বলতেই সে দুজনের মুখের দিকে তাকাল।
দীঘি মাথা নাড়ল। কিন্তু ঝিলমিল দেখল, বারিশ চাচ্চুর মুখে তো বিন্দুমাত্র হলুদ নেই! সে ঠোঁট উল্টে বলল,
_“আপনাকে মনে হয় কেউ হলুদ দেয়নি। কোনো ব্যাপার না, আমি দিয়ে দিচ্ছি।”
বলেই সে দু-হাতে দলা দলা হলুদ নিয়ে এক ঝটকায় দীঘি আর বারিশের গালে মাখিয়ে দিতে লাগল। শুধু হলুদ মাখানোই না, স্টেজে তখন উচ্চস্বরে গান বাজছে আর ঝিলমিল সেটার সাথে মিলিয়ে নিজেও গাইতে লাগল,
—“হলুদ হলো গাল আর কন্যে হলো লাল,
বিয়ের আঙুর ফল বলো টক হবে না ঝাল?”
এদিকে হলুদটা গালে লাগতেই বারিশের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।
তার চোখের মণি দুটো কুঁচকে উঠল রাগে। এই বাড়িতে তার গায়ে এভাবে হাত দেওয়ার সাহস কারও নেই, আর এই পিচ্চি মেয়েটার এত সাহস! কিন্তু ঝিলমিল এসবের কোনো ধার ধারল না। ​সে এবার গানের তাল পরিবর্তনের সাথে সাথে স্টেজ কাঁপিয়ে নাচতে শুরু করল। নতুন এক হিন্দি গানের বিটের সাথে তাল মিলিয়ে সে কোমর দুলিয়ে নাচতে শুরু করে দেয়,

—“Kar diya hai tune mujhko yun bekaraar mahii
Keh diya duniya se main teri main teri ho gayi re
Teri naal mein Aavaangi, sasural mein Javaangi…”
পুরো প্রাঙ্গণ জুড়ে দুই পরিবারের সকলে বসে আছে। ঝিলমিলের এই নাচ দেখে তার নিজের পরিবারের সবাই হাততালি দিলেও, দর্শকসারির সামনের দিকে বসা ঝর্ণা শেহরিয়ারের কপালে বিরক্তির গভীর ভাঁজ পড়ল। তিনি অত্যন্ত কড়া চোখে ঝিলমিলের এই অতিরিক্ত নাচানাচি দেখছিলেন। ​ঝিলমিলের বান্ধবী ইরান একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিল। নাচের মাঝেই সে একটু অবাক হয়ে ঝিলমিলের হাত ধরে টেনে একপাশে নিয়ে গেল। ফিসফিস করে বলল,
_ “তুই এটা কোন গানে নাচছিস রে? শ্বশুরবাড়ি কি তুই যাবি নাকি?”
ঝিলমিল বলল,
_“কেন, কী হয়েছে?”
_“আরে, এটা তোর ফুপির বিয়ে, তোর না!”
ঝিলমিল ফিসফিস করে বলল,
_“কিন্তু ফুপি তো পালাবে।”
ইরানের চোখ কপালে,
_“মানে?”

ঝিলমিল ইরানকে আরেকটু দূরে নিয়ে গেল এবং নিজের মাথায় ছকা সব পরিকল্পনা খুলে বলল। ইরান প্রথমে রাজি না হলেও, জারিফকে চরম একটা শিক্ষা দেওয়ার জন্য শেষমেশ ঝিলমিলকে সাপোর্ট করে দিল। নিজের বান্ধবীর বিয়ে, তাই সে-ও আর বসে রইল না; বান্ধবীর সাথে সে-ও এখন নাচতে শুরু করে দিল। মঞ্চে এখন সবাই নিজেদের মতো নাচছে। মেহরাজ তার বন্ধুদের নিয়ে এক কোণায় লাফাতে ব্যস্ত। বড়রা-ছোটরা সবাই যখন এই হইহুল্লড়ে মেতে আছে। কিন্তু এত হই হুল্লুরের মাঝেও একপাশে একা দাঁড়িয়ে আছে তাহসিন। সে একটু পরপর বেশ উদাসীনভাবে ফোনে কিছু একটা দেখছিল, যেন এই অনুষ্ঠানটা কোনোমতে শেষ হলেই সে বাঁচে।
ঝিলমিলের হঠাৎ নজর গেল সেদিকে। সে দৌড়ে গিয়ে টেনে বের করল তাহসিনকে।
_“একা একা দাঁড়িয়ে কিসের শোক পালন করছো আঙ্কেল? আমার সঙ্গে নাচবে চলো।”
তাহসিন হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করে বলল,
_“ছাড়ো ঝিলমিল, আমি ওদিকে যাব না।”
_“ না, নাচতে হবে আমার সঙ্গে।” বলতে বলতে তাকে টেনে নিয়ে এলো সবার মাঝখানে। তাহসিনের একটা হাত উপরে তুলে ধরল এবং সেই হাতের নিচে নিজের আঙুল গলিয়ে সুন্দর করে পাক খেয়ে ঘুরতে লাগল।

দীঘি আর বারিশ এসব উপেক্ষা করে আবারও কিছু একটা নিয়ে কথা বলছিল। কিন্তু দীঘির চোখ হঠাৎ সামনে পড়তেই সে স্তব্ধ হয়ে গেল। সে দেখল, তাহসিন ঝিলমিলকে ঘোরাচ্ছে। হাসছে তাহসিন! কত খুশি সে! বিয়ের চিন্তায় দীঘি মা’রা যাচ্ছে, অথচ এই ছেলে এত খুশি! না, দীঘির এটা ভেবে কষ্ট হচ্ছে না যে তাহসিন ঝিলমিলকে ঘোরাচ্ছে—কারণ ঝিলমিল অনেক ছোট, আর তাহসিনও ওকে কখনো অন্য নজরে দেখে না। ওর কষ্ট হচ্ছে এই কারণে যে— দীঘির বিয়ে হয়ে যাচ্ছে, এটা দেখেও তাহসিনের বুকে একটুও কষ্ট লাগছে না! সে কতটা নির্বিকার!
দীঘিকে ওভাবে পাথরের মতো সামনে তাকিয়ে থাকতে দেখে বারিশও নিজের অনীহা সত্ত্বেও সেদিকে তাকায়। আর তাকাতেই সেকেন্ডের মধ্যে বারিশের পুরো পুরোপুরি বদলে গেল মুখের অবয়ব। শান্ত চোখ দুটো পলকেই জ্বলে উঠল ধক করে। ​তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি প্রথমে গিয়ে আটকাল ঝিলমিলের সেই ফুটফুটে, পুতুলের মতো নিষ্পাপ মুখের ওপর। যে এখনও তাহসিনের হাত ধরে পাক খাচ্ছে। পরক্ষণেই বারিশের চোখ চলে গেল ঝিলমিলের ফর্সা, উন্মুক্ত পেটের দিকে। নাচের ঝোঁকে লেহেঙ্গার ওড়নাটা কখন যে সরে গেছে, তা ঝিলমিল নিজেও টের পায়নি। তার ফর্সা কামুক কটিদেশটি এখন সবার সামনে অনাবৃত।
বুকের ভেতর যেন লাভা ফুটতে শুরু করল বারিশের। চোখ দুটোও লালচে রঙ ধারণ করেছে। রাগের কারণ বারিশের নিজেরও অজানা। মন চাইল তার এখনই গিয়ে স্টেজের সবকিছু ভেঙেচুরে এখান থেকে চলে যেতে। সে আর এক সেকেন্ডও না বসে ঝট করে উঠে দাঁড়াল। দ্রুত পায়ে এগিয়ে গিয়ে, লাফাতে থাকা মেহরাজের ঘাড় ধরে এক টানে সবার মাঝখান থেকে বের করে আনল সে।
মেহরাজ আচমকা ঘাড়ের ওপর চাপ খেয়ে কঁকিয়ে উঠে বলল,

_“কী হলো, আমাকে এভাবে টেনে আনলি কেন?”
বারিশ দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
_“এসব গান-বাজনা এক্ষুনি বন্ধ কর।”
_“কেন?”
_“আমার ভালো লাগছে না।”
মেহরাজ বিরক্ত হয়ে বলল,
_“না লাগলে নাই! আজ একটু সবাই মজা করবেই, তুই দয়া করে সহ্য করে নে।”
_“আমি কিন্তু গিয়ে স্পিকার ভেঙে ফেলব।” বারিশের রসিকতা করছে না।
মেহরাজও খেপে গিয়ে বলল,
_“ভেঙে ফেললে আমার কী? ডেকরেশন ম্যানেজারকে তোকেই জরিমানা দিতে হবে। দিতে পারলে ভেঙে ফেল!”

_“ওকে।” বারিশ সত্যি সত্যি স্পিকারের দিকে পা বাড়াল। মেহরাজ দেখল সর্বনাশ! এই পাগল তো আসলেই ভেঙে ফেলবে। সে তৎক্ষণাৎ দৌড়ে গিয়ে বারিশের পাঞ্জাবির ওড়নাটা পেছন থেকে টেনে ধরল,
_“দাঁড়া, দাঁড়া ভাই! আমি বন্ধ করাচ্ছি। তাও তুই অন্তত এত মানুষের মধ্যে ঝামেলা করিস না!”
নাচানাচির ধুমধাম পর্ব শেষ হতেই এবার বিশাল মাঠ জুড়ে শুরু হলো খাওয়া দাওয়ার আয়োজন। চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে খাসির বিরিয়ানির সুবাস। মূল খাবারের পাশাপাশি এক কোণায় আলো ঝলমলে ফুচকা আর চটপটির একটা লাইভ স্টলও বসানো হয়েছে, যেখানে তরুণ-তরুণীদের উপচে পড়া ভিড়। সেখানে কিছু দীঘির বন্ধু-বান্ধব, কিছু মেহরাজের। সাথে আরও অন্যান্য আত্মীয় স্বজন।
​নাচতে নাচতে ঝিলমিল ততক্ষণে একদম ক্লান্ত, তার শরীর আর চলছে না। নূরজাহান চৌধুরী নিজের হাতে প্লেট থেকে বিরিয়ানি তুলে তুলে ঝিলমিলের মুখে গুঁজে দিচ্ছেন। খাওয়া শেষ করে সে একটু জিরিয়ে নেওয়ার জন্য স্টেজের ওপরে দীঘির পাশে গিয়ে বসল। দীঘির সামনেও খাবারের রাজকীয় প্লেট সাজানো, কিন্তু সে এক লোকমাও মুখে তোলেনি। ভীষণ অন্যমনস্ক হয়ে চামচ দিয়ে প্লেটের বিরিয়ানিগুলো এপাশ-ওপাশ করছে আর আঙুল ঘুরিয়ে চালের দানাগুলো গুনছে।
​ঝিলমিল চারপাশটা একবার দেখে নিয়ে দীঘির দিকে একটু ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল,
_“কালকে কখন পালাবে ফুপি?”

সরাসরি এমন কথা শুনে চমকে উঠল দীঘি। হাতের চামচটা প্লেটের ওপর ঠক করে পড়ে গেল। এই মেয়েটা এসব গোপন কথা কোত্থেকে জানল! সে চরম বিস্ময় আর ভীতি জড়ানো চোখে ঝিলমিলের দিকে তাকিয়ে রইল, তার গলার ভেতরটা শুকিয়ে কাঠ। ​ঝিলমিল ফুপির অবস্থা বুঝতে পেরে ঠোঁট টিপে হেসে বলল,
_“আরে ধুর, ভয় পেও না তো! আমি কাউকে কিচ্ছু বলব না।”
​দীঘি নিজের ভেতরের কাঁপনটা লুকিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে কড়া গলায় বলল,
_“তুই এসব কী আবোলতাবোল বলছিস ঝিল? আমি পালাব কেন? তোর মাথা ঠিক আছে?”
_​“একদম ঢং করো না তো ফুপি! আমি খুব ভালো করেই জানি তুমি তাহসিন আঙ্কেলকে ভালোবাসো। সেদিন আমি তোমাদের সব কথা আড়ালে দাঁড়িয়ে শুনে নিয়েছিলাম।”
​কথাটা শুনতেই দীঘি আর রাগ সামলাতে পারল না। সে নিজের বাঁ হাতটা বাড়িয়ে ঝিলমিলের কানটা খপ করে চেপে ধরে একটু মুচড়ে দিয়ে বলল,
_ “এত বড় সাহস! আমার রুমের দরজায় আড়ি পাততিস তুই?”
​_“আরে ছাড়ো, ছাড়ো! লাগছে তো!” ঝিলমিল কান ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে ফিসফিসিয়ে বলল,
_“একটা প্রয়োজনে তোমার রুমে গিয়েছিলাম, তখন কানের মধ্যে তোমাদের কথাগুলো চলে এসেছে। আমি কি ইচ্ছে করে শুনেছি নাকি? এখন ওসব বাদ দাও, বলো কখন পালাবে? আমি নিজে তোমাকে এই বাড়ি থেকে পালাতে সাহায্য করব।”

_​“চুপ কর! একদম আস্তে কথা বল!” দীঘি তড়িঘড়ি করে ঝিলমিলের মুখটা চেপে ধরতে চাইল। তারপর চারপাশের কোলাহলের দিকে তাকিয়ে অসহায় কণ্ঠে বলল,
_ “কিন্তু পালিয়ে আমি কী করব ঝিল? যার জন্য আমি এই সবকিছু ছেড়ে চলে যাব, সেই মানুষটাই তো আমার সঙ্গে যাবে না। সে তো আমাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য একটা পা-ও বাড়াবে না।”
​ঝিলমিল ফুপির এই অসহায় মুখটা দেখে নিজের মুখটাও কেমন কাঁদো কাঁদো বানিয়ে ফেলল। সে দীঘির হাতটা জড়িয়ে ধরে নরম গলায় বলল,
_“তাহসিন আঙ্কেল না গেলে তুমি একাই পালাও ফুপি। পরে না হয় ওনাকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে রাজি করানো যাবে। কিন্তু তুমি যদি এখন এই বাড়িতে থেকে যাও, তাহলে তো কাল সত্যি সত্যি বিয়েটাই হয়ে যাবে! আমি কোনোভাবেই চাই না তুমি এভাবে ভেতরে ভেতরে কষ্ট পেতে পেতে কাউকে জোর করে বিয়ে করো।”
দীঘি আর ঝিলমিলের আলোচনার মাঝখানে এসে হাজির হলেন ঝর্ণা বেগম। গম্ভীর পায়ে হেঁটে এসে তিনি দীঘির অন্য পাশে ফাঁকা জায়গাটায় বসলেন। তাঁর তীক্ষ্ণ চোখ দুটো দীঘির না-ছোঁয়া বিরিয়ানির প্লেটের দিকে রেখে কিছুটা পরখ করার সুরে বললেন,

_“কী হলো বউমা? কখন থেকে দেখছি প্লেট সামনে নিয়ে বসে আছ, কিছুই খাচ্ছ না! কীসের এত টেনশন করছ?”
_“ফুপির গ্যাস্ট্রিক হয়েছে দাদী, সেই জন্য খেতে পারছে না। তুমি একটা গ্যাস্ট্রিকের ট্যাবলেট এনে দাও।” দীঘির আগেই ঝিলমিল ফটাফট বলে ফেলল।
ঝর্ণা বেগম চোখ গরম করলেন,
_“এই মেয়ে! তোমাকে কিছু জিজ্ঞেস করেছি আমি? বড়দের কথার মাঝখানে এত কথা কেন বলো?”
ঝিলমিল ঠোঁট উল্টে, কাঁধ নাচিয়ে বলল,
_ “আমি তো ফুপির ভালোর জন্যই বললাম! আজব!”
ঝিলমিলের কথায় আর পাত্তা দিলেন না ঝর্ণা। তিনি প্লেট থেকে এক চামচ বিরিয়ানি তুলে দীঘির মুখের সামনে ধরে বেশ জোর করার ভঙ্গিতে বললেন,
_“তুমিও কিছু খাচ্ছ না, ওদিকে তরঙ্গও না খেয়ে, না বলে বাড়ি চলে গেল। তোমাদের মধ্যে কিছু হয়েছে নাকি?”
_“না আন্টি, তেমন কিছু হয়নি। আমার আসলেই তেমন খিদে নেই।”
ঝর্ণা বেগম চামচটা আরও একটু এগিয়ে দিয়ে বললেন,
_“আমি কোনো বাহানা শুনব না, বিয়ের কনে এভাবে না খেয়ে থাকলে চলে? নাও, একটু মুখে তোলো।”

বিয়ের দিন দীঘি সত্যি সত্যিই বাড়ি থেকে পালাল। আর এই পুরো নিখুঁত অপারেশনের পেছনে নেপথ্যের মাস্টারমাইন্ড হিসেবে সবটুকু সাহায্য করেছে স্বয়ং ঝিলমিল। অথচ মুখে এক রাশ আতঙ্ক আর ভয়ের নাটক ফুটিয়ে সে হন্তদন্ত হয়ে দৌড়ে গেল দাদীমার ঘরে। ঘরে ঢুকেই সে চিৎকার করে উঠল,
_ “দাদীমা! সর্বনাশ হয়ে গেছে! ফুপি ঘরে নেই!”
​আকাশ ভেঙে পড়ল দাদীমার মাথায়। তিনি বসা থেকে বিদ্যুৎগতিতে
উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,
_“কী বলছিস তুই এসব? নেই মানে! কোথায় যাবে ও?”
_​“আমি সত্যি বলছি দাদীমা… বিছানায় ও নেই। শুধু এই দেখো, টেবিলের ওপর এটা লিখে ও চলে গেছে।” ঝিলমিল অত্যন্ত সততার অভিনয় করে দীঘির লিখে যাওয়া সেই গোপন চিরকুটটা দাদীমার হাতে বাড়িয়ে দিল। কাগজের টুকরোটাতে দীঘি স্পষ্ট অক্ষরে জানিয়ে গেছে—নিজের অনিচ্ছায় এই বিয়েটা সে কোনোভাবেই করতে পারবে না, তাই সে চলে যাচ্ছে।
​চিরকুট দেখেই নূরজাহান চৌধুরীর পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেল। রাগে তাঁর শরীর কাঁপতে লাগল। তিনি সোজা চলে গেলেন তাহসিনের সামনে। অত্যন্ত কঠোর আর হুকুমের সুরে বললেন, _“তাহসিন! দীঘি বাড়ি থেকে পালিয়েছে। যত তাড়াতাড়ি পারো, যেখান থেকে পারো ওকে খুঁজে আমার সামনে এনে দাঁড় করাও!”
ফ্যাকাশে হয়ে গেল তাহসিনের মুখ। তার বুকের ভেতরটা যেন ওলটপালট হয়ে গেল। সে স্তব্ধ, বাকরুদ্ধ হয়ে নূরজাহান চৌধুরীর মুখের দিকে চেয়ে রইল। ​তাহসিনকে ওভাবে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে নূরজাহান চৌধুরী গলা চড়িয়ে বললেন,

_“তোমাকে কিছু বলেছি আমি তাহসিন! কানে যায়নি?”
​ঝাঁকুনি খেয়ে বাস্তবতায় ফিরল তাহসিন। সে আমতা আমতা করে কোনোমতে বলল,
_“জি, জি ম্যাডাম… আমি… আমি এখনই যাচ্ছি।”
​বলেই তাহসিন দ্রুত পায়ে গাড়িতে গিয়ে বসল। গাড়ির স্টিয়ারিংটা শক্ত করে ধরে সে হাহাকার ভরা চোখে সামনের দিকে তাকাল। সে কোথায় খুঁজবে দীঘিকে? কোথায় যাবে সে? এই মেয়েটা আস্ত একটা পা’গ’ল! নিজেকে তো ধ্বংস করছেই, সাথে তাহসিনকেও পা’গল বানিয়ে ছাড়বে! এই মেয়ে নিজের এত সুন্দর ভবিষ্যৎ, এত আভিজাত্য এক নিমেষে ধূলিসাৎ করে দিয়ে তার মতো একটা সাধারণ ছেলের ভালোবাসার টানে সবকিছু ছেড়ে বেরিয়ে গেল!
তাহসিন আর গাড়ি স্টার্ট দিয়ে দীঘিকে খুঁজতে গেল না। অসহায়ত্ব নিয়ে রাস্তার এক পাশে গাড়িটা পার্ক করে, স্টিয়ারিংয়ের ওপর মাথা রেখে চুপচাপ বসে রইল।

আলতাফ চৌধুরী আর মেহরাজকে নিজের ঘরে ডেকে পাঠালেন নূরজাহান বেগম। রাগে তাঁর সারা শরীর রি রি করছে, কপাল বেয়ে ঘাম ঝরছে। দুজনকে সামনে দাঁড় করিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে তিনি বললেন,
_“তোদের ওই নষ্ট বোন বাড়ি থেকে পালিয়েছে! আমার সম্মান ধুলোয় মিশিয়ে না দিয়ে ও শান্ত হলো না! যেভাবে পারিস ওকে খুঁজে বের করে আমার সামনে নিয়ে আয়!”
মায়ের মুখের এমন কড়া হুকুম শুনেও আলতাফ চৌধুরীর মুখে বিন্দুমাত্র চিন্তার রেখা ফুটল না। উল্টো তাঁর ঠোঁটের কোণে চওড়া এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। তিনি বেশ ফুরফুরে গলায় বললেন,
_“খুব ভালো হয়েছে! অত জোর করে বিয়ে দিতে যাচ্ছিলে কেন? আমি তো মনে করি আমার বোন এতদিনে একটা কাজের মতো কাজ করেছে!”
নূরজাহান বেগম রাগে ফেটে পড়ে চিৎকার করে উঠলেন,
_ “চুপ করো আলতাফ! তোমার ওই আলগা ইয়ার্কি বন্ধ করো! মেহরাজ, তুমি দাঁড়িয়ে আছ কেন? যাও দ্রুত!”

_“কিন্তু মা, আমি কোথায় খুঁজব ওকে? তোমার কি মনে হয় আশেপাশে কোথাও বসে আছে ও ? ও তো সব প্ল্যান করেই গেছে। আর তাছাড়া… আমি এবার বারিশকে কী জবাব দেব!”
আলতাফ চৌধুরী বাদে ঘরের বাকি সবার মধ্যেই এখন চিন্তার মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। একটু পরেই বরপক্ষ চলে আসবে, নিচে এখনই আত্মীয়দের আনাগোনা শুরু হয়ে গেছে। মানসিক চাপে নূরজাহান বেগম সোফার ওপর ধপ করে বসে পড়লেন। এক কোণায় দাঁড়িয়ে সব দেখছিল ঝিলমিল। সে চুপিসারে বান্ধবী ইরানের দিকে তাকিয়ে চোখের একটা বিশেষ ইশারা করল। তারপর বেশ চিন্তিত সাজার ভান করে বলল,
_“দাদীমার অবস্থা তো খুব খারাপ। আমি ওনার জন্য একটু শরবত বানিয়ে নিয়ে আসছি।” এই বলে সে চট করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
ঘরে বাকিরা চলে যাওয়ার পর ইরান একটা হাতপাখা হাতে নিয়ে নূরজাহান বেগমের পাশে গিয়ে বসল এবং তাঁকে আলতো করে বাতাস দিতে লাগল। কিছুক্ষণ বাতাস করার পর সে বেশ দরদি গলায় বলল,
_“দাদীমা, তুমি এত চিন্তা করছ কেন বলো তো? একটা না একটা উপায় তো বের হবেই।”
_“কী উপায় বের হবে? দীঘি যদি ফিরে না আসে, তবে আমি ওই পরিবারকে কীভাবে মুখ দেখাব? আল্লাহ এই মুখ দেখানোর আগে আমাকে এই মুহূর্তেই দুনিয়া থেকে উঠিয়ে নিক!”
ইরান যেন ঠিক এই সুযোগটার অপেক্ষাই করছিল। সে দাদীমার আরেকটু কাছে ঘেঁষে ফিসফিস করে বলল,
_“কেন দাদীমা? আমাদের ঝিলমিল আছে তো!”
ব্যস! এরপর সেদিন যা হওয়ার ছিল, তা-ই হলো!

**বর্তমান—**
_“সকাল হয়ে গেছে, ওঠো!”
ঝিলমিলের দিক থেকে কোনো সাড়াশব্দ নেই। বিরক্ত হয়ে বারিশ এক ঝটকায় মেয়েটার দুই কাঁধ শক্ত করে ধরে একেবারে বিছানার ওপর বসিয়ে দিল।
আচমকা এই ধাক্কায় ভীষণভাবে ভরকে গেল ঝিলমিল। সে ধড়ফড় করে উঠল। বুকটা ধক করে ওঠায় ধীরে ধীরে চোখ মেলল সে। গত রাতে বিছানায় শুয়ে শুয়ে অতীতের ওই তোলপাড় করা দিনগুলোর কথা ভাবতে ভাবতেই কখন যে চোখ লেগে গিয়েছিল, সে নিজেও জানে না। চোখের সামনে এখন দাঁড়িয়ে আছে বারিশ। বারিশ হাতের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত গম্ভীর গলায় বলল,
_“সাতটা বেজে গেছে! রুটিনের দুটো নিয়ম অলরেডি অমান্য করেছ তুমি! আজকের মতো মাফ করে দিলাম। এখন ভদ্র মেয়ের মতো ফ্রেশ হয়ে গিয়ে আমার জন্য ব্রেকফাস্ট রেডি করবে, যাও।”
ঝিলমিল তখনো ঘুমের ঘোরে চোখ ডলছিল। সে কিছুটা মিনমিন করে বলল,

শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ১০

_“আরেকটু ঘুমাই, প্লিজ?”
_“নো ওয়ে! কলেজে যেতে হবে আজ থেকে, ভুলে গেলে? ব্রেকফাস্ট বানিয়ে রেডি হও দ্রুত।”
_“ভুলিনি! কিচ্ছু ভুলিনি আমি! যাচ্ছি!” রাগত গলায় বলল সে।
বলেই সে রাগে পা ঠুকতে ঠুকতে ওয়াশরুমে গিয়ে ঢুকল। কোনোমতে ফ্রেশ হয়ে, রুমে আর এক মুহূর্তও সময় নষ্ট না করে সে গটগট করে সোজা রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেল।

শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ১২

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here