Home শুকনো পাতার নূপুর পায়ে শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ১৫

শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ১৫

শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ১৫
আয়েশা শেখ

কলিংবেল বাজতেই দরজা খুলে দিল ইরান। চোখে তার রাজ্যের ঘুম, চুলগুলো উসকোখুসকো। কিন্তু দরজার ওপাশে দাঁড়ানো মানুষটাকে দেখামাত্রই চোখের সমস্ত ঘুম পাখির মতো ডানা মেলে উড়ে গেল! চোখ দুটো বড় বড় হয়ে উঠল বিস্ময়ে। হতবাক হয়ে বলল,
—‘ভাইয়া, আপনি?!’
অপর পাশ থেকে মেহরাজও বলে উঠল সমপরিমাণ বিস্মিত স্বরে,
—‘তুমি?’
মেহরাজের কাঁধে তখন শরীরের পুরো ভার ছেড়ে দিয়ে ঝুলে আছেন ইরানের মাতাল বাবা সুলতান আহমেদ খোকন! অনবরত বিড়বিড় করে নিজের পুরোনো দিনের কোনো হিসাব মেলানোর চেষ্টা করছেন। ইরান তড়িঘড়ি এগিয়ে এসে নিজের বাবাকে একপাশ থেকে চেপে ধরল।
বাবার এক হাত মেহরাজের কাঁধ থেকে সরিয়ে নিজের কাঁধে তুলে নিল। দুইজন মিলে টেনেটুনে সুলতান সাহেবকে ড্রয়িংরুমের সোফাটার ওপর ফেলতেই লোকটা কাচের গ্লাসের মতো ধপাস করে কাত হয়ে পড়ল। মুখে এখনও আধো-আধো বুলি

—‘আমি খোকন… আমার সাথে চালাকি না…!’
​সোফায় বাবার পা দুটো তুলে দিতে দিতে ইরান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মেহরাজের দিকে তাকিয়ে বলল,
—আপনি তাকে কোথায় পেলেন ভাইয়া?
— আমি পাইনি, সে আমার উপর এসে পড়েছে। বাপকে মাতলামি করতে পাঠিয়ে নিজে আরাম করে ঘুমাচ্ছো?
— মাতাল বলবেন না আমার বাবাকে।
— রাস্তাঘাটে মাতলামি করে বেড়াচ্ছে, আর মাতাল বললেই দোষ?
ইরান আর কোনো উত্তর দিল না। মেহরাজ ঘরের এদিক-ওদিক একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে হঠাৎ প্রশ্ন করল,
—‘তোমার মা কোথায়?’
​প্রশ্নটা শুনতেই যেন খানিকটা চুপসে গেল ইরান। এবারও মুখ খুলল না সে। মেহরাজ তখনও উত্তরের অপেক্ষায় স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ইরানের মুখের দিকে।

—‘নেই।’ ​অবশেষে ইরান নিচু গলায় বলল,
—কোথায় গিয়েছে?
— যেখানে গেলে আর ফেরে না, সেখানে।
একটু থমকাল মেহরাজ। গলা খাকারি দিয়ে বলল,
— ওহ, আই’ম সরি! বুঝতে পারিনি আমি।
এতক্ষণে মেহরাজের মাথায় পুরো বিষয়টা ঢুকল। রাস্তায় আসার সময় মাতাল লোকটা কেন বারবার ‘বউয়ের কাছে চলে যাব’ বলে বিড়বিড় করছিল, তার আসল কারণ এতক্ষণে পরিষ্কার হলো।
​হঠাৎ ইরানের নজর গিয়ে আটকাল মেহরাজের হাতের ক্ষতের ওপর। সে সোজা এগিয়ে এসে মেহরাজের হাত স্পর্শ করে উদ্বিগ্ন গলায় বলল,
—‘আপনার তো অনেকখানি কেটে গিয়েছে! জ্বলছে নিশ্চয়ই? বসুন, আমি ওষুধ লাগিয়ে দিচ্ছি।’
​কথাটা বলেই সে ফাস্ট এইড বক্সটা আনতে যেতে নিলে মেহরাজ তাকে ডেকে মানা করে,
—‘কোনো দরকার নেই। আমি ঠিক আছি, এখন বাসায় যেতে হবে।’
​কিন্তু ইরান কোনো কথা না শুনে সোজা গিয়ে দরজায় লক লাগিয়ে দিল।
—‘না! আগে ওষুধ লাগিয়ে দেব, তারপর যাবেন।’
​অগত্যা বাধা না দিয়ে মেহরাজ চুপচাপ বসে রইল। ইরান দ্রুত ফার্স্ট এইড বক্সটা নিয়ে এসে মেহরাজের হাতের ক্ষ’ত অংশে যত্ন করে ওষুধ লাগাতে লাগল। ছেলেটা একবার নিবিষ্টমনে কাজ করতে থাকা ইরানের দিকে, আর একবার সোফায় উপুড় হয়ে শুয়ে থাকা লোকটার দিকে তাকাল। ​গম্ভীর স্বরে জিজ্ঞেস করল,

—‘এখানে তোমরা দুজনেই থাকো?’
​—‘জি ভাইয়া।’
​—‘তোমাকে না বলেছি, আমাকে ভাইয়া নয়, চাচ্চু ডাকবে?’
​ইরান মুখ তুলে চাইল,
—‘কেন?’
​—‘ঝিলমিল আর তুমি আমার চোখে সমান, তাই।’
​ইরানের হাত থামল না, কিন্তু চোখ দুটো চকচক করে উঠল। মুখ তুলে ঠাণ্ডা গলায় বলল,
—‘তাহলে আপনাদের পারিবারিক সম্পত্তির ভাগও আমাকে দিয়েন।’
—‘কেন?’ ​মেহরাজের কণ্ঠে বিস্ময়।
​—‘আপনিই তো বললেন ঝিলমিল আর আমি আপনার কাছে সমান! তাহলে সব সমানে সমান দেবেন।’
​মেহরাজ হাতটা কিছুটা সরিয়ে নিয়ে সোজা হয়ে বসল,
—‘দেখো, আমি মজা করছি না। আমার গার্লফ্রেন্ড আছে, তাই এসব করে কোনো লাভ নেই।’
​বাক্যটা শেষ হতে না হতেই ইরান মেহরাজের হাতটা ছেড়ে দিল। মুহূর্তেই বন্ধ হয়ে গেল ওষুধ লাগানো। ছেলেটা কিছু বোঝার আগেই ইরান সোজা দাঁড়িয়ে পড়ে বলল,

—‘উঠুন। চলে যান।’
​মেহরাজ অবাক হয়ে বলল,
—‘মানে?’
​—‘বলছি চলে যান! গেট আউট! গেট আউট!’
বলতে বলতে এক ঝটকায় দরজা খুলে দিল ইরান। ​মেহরাজ নিজেকে একটু সামলে নিয়ে বলল,
—‘তুমি কিন্তু আমায় অপমান করে তাড়িয়ে দিচ্ছো!’
​ইরান দরজার হাতল শক্ত করে ধরে মেহরাজের চোখের দিকে তাকিয়ে কাটাকাটা গলায় বলল,
—‘অন্যের জিনিসের যত্ন করে লাভ নেই। বের হোন!’

​—‘আমি একটু আগে পায়ে ব্যথা পেয়েছি, হাঁটতে পারছি না। আপনি কষ্ট করে খাবার গরম করে খেয়ে নিন।’
​কাঁদতে কাঁদতেই বলল ঝিলমিল। কিন্তু নিস্তার মিলল না। কথাটা শেষ করে মুখটা অন্যদিকে ফিরিয়ে নেওয়ার আগেই বারিশ নিজের দুই সুগঠিত পেশিবহুল বাহুতে ঝিলমিলকে পাঁজাকোলে তুলে নিল।
​হুট করে শূন্যে ভেসে উঠে আতঙ্কে চিৎকার করে উঠতে চেয়েছিল বেচারি ঝিলমিল। দু’হাতে আঁকড়ে ধরে বারিশের শার্টের কলার। কিন্তু কিছু একটা বলার আগেই স্বামীর কটমট চোখের র’ক্তচক্ষু দেখে শব্দটা গলার কাছেই আটকে গেল।
​বারিশ তাকে কোলে নিয়েই ধীরে ধীরে কিচেনের দিকে হেঁটে যায়। তারপর ঝিলমিলকে সাবধানে নামিয়ে দিয়ে ঠাণ্ডা গলায় বলে,
—‘এবার গরম করে দাও।’
​কান্না চেপে দাঁতে দাঁত গুঁজে খাবার গরম করল ঝিলমিল। প্লেটে বেড়েও দিল। কিচেনের একপাশে রাখা ছোট ডাইনিং টেবিলটায় বসে নীরব দর্শকের মতো মেয়েটার প্রতিটি নড়াচড়া পর্যবেক্ষণ করছিল বারিশ।
প্লেটটি টেবিলের ওপর নামিয়ে রেখে ঝিলমিল যেমন নিঃশব্দে এসেছিল, তেমনই নীরবে প্রস্থান করতে চাইল। গটগট করে পা বাড়ানোর আগেই যেন মাথার ওপর দ্বিতীয় বোমাটা ফাটাল বারিশ,

​—‘খাইয়ে দেবে আমাকে একটু?’
​পা দুটি যেন তৎক্ষণাৎ মেঝের সাথে শক্ত করে জমে গেল ঝিলমিলের। সে ধীরপায়ে পেছনে ফিরল। কান্নায় ভিজে থাকা চোখ দুটোতে এতক্ষণ যে ভয় ছিল, সেখানে এখন জমাট বাঁধছে বিরক্তি আর এক অদ্ভুত বিস্ময়।
​—‘আপনি কি ছোট বাচ্চা?’ বিষিয়ে ওঠা গলায় বলল ঝিলমিল।
—‘নাকি হাত দুটোও কাজ করছে না আপনার?’
বারিশ জবাব দেওয়ার প্রয়োজন মনে করল না। চুপচাপ ঝিলমিলকে দেখছিল। ঝিলমিল এক পা এগিয়ে গিয়ে প্লেটটা দু’হাতে তুলে নিল। রাগে শরীর কাঁপছে তার। প্লেটটা উঁচিয়ে বলল,
—‘এখন এটা আমি হাত থেকে মেঝেতে ফেলে দেব! সব খাবার নষ্ট হয়ে যাবে। তারপর দেখব আপনি কীভাবে খান!’
​বারিশের মুখের ভঙ্গিমায় বিন্দুমাত্র পরিবর্তন এলো না। সে চেয়ার হেলান দিয়ে ঠাণ্ডা গলায় বলল,
—‘আমাকে দাও, আমি ফেলে দিচ্ছি। তোমাকে কষ্ট করতে হবে না। থালাটা ভাঙার পর পুরো রান্নাঘর পরিষ্কার করে আবার নতুন করে আমার জন্য রান্না করবে। চয়েস ইজ ইয়োরস।’

ঝিলমিল চমকে উঠে চট করে প্লেট সমেত অন্যদিকে ঘুরে দাঁড়াল।
—‘না, না! ফেলবেন না!’
​এই লোকটাকে ঝিলমিল হারে হারে চিনে নিয়েছে! মুখে যখন বলেছে, কাজটা সে করিয়েই ছাড়বে। লোকটার এই অসুস্থ একগুঁয়েমির কাছে হার মেনে সে আবারও বারিশের দিকে ঘুরে দাঁড়াল। ক্ষোভে রগ ফুলে ওঠা গলায় বলল,
—‘এভাবে খেলে খান, আমি আপনাকে খাইয়ে দিতে পারব না। আপনি জানেন, বাসায় আমাকে আম্মু নয়তো দাদীমা খাইয়ে দিত? মাঝে মাঝে আব্বুও। সেখানে আমি আপনাকে রেঁধে দিচ্ছি! এর চেয়ে বেশি আর কিছু করতে পারব না আমি।’
​কথাগুলো শুনে বারিশ নিঃশব্দে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। ঝিলমিলের বিষণ্ণ, ক্লান্ত মুখের দিকে কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,

—‘আচ্ছা, থাক। লাগবে না।’
​বলেই সে কিচেনের বাইরে পা বাড়াল লোকটা। ​বারিশকে এভাবে হঠাৎ উঠে চলে যেতে দেখে ঝিলমিল হতবাক হয়ে গেল। মেজাজ আর পারল না ধরে রাখতে। পেছন থেকে ডেকে উঠল,
—‘কোথায় যাচ্ছেন? খাবেন না?’
​—‘না।’ বারিশের কণ্ঠে স্পষ্ট অনীহা।
​—‘তাহলে এই খাবারের কী করব?’
​—‘ফেলে দাও।’
​মাঝরাতে ঘুম থেকে তুলে এত মানসিক অ’ত্যাচার করে খাবার গরম করাল, আর এখন বলছে খাবে না! রাগে, কষ্টে ঝিলমিলের গায়ে আগুন ধরে গেল! সে দ্রুত পায়ে গিয়ে বারিশের পথ আটকে শক্ত করে চেপে ধরল তার বাহুটা।

—‘আচ্ছা আসুন! আমি… আমি খাইয়ে দিচ্ছি, আসুন!’
​ঝিলমিলের স্পর্শে থমকে দাঁড়িয়ে পেছন ঘুরে তাকাল বারিশ। ​কিচেনের বাইরে পুরোটাই নিঝুম অন্ধকার। ওরা এখন লিভিং রুমের সীমানায় দাঁড়িয়ে। সেই অন্ধকার ঘরে কেবল কিচেন থেকে এক চিলতে আবছা, হলুদ আলো এসে পড়েছে ওদের ওপর। সেই আলোয় ঝিলমিলের ফর্সা, বিষাদগ্রস্ত মুখের সাথে তার বিরল হ্যাজেল রঙের চোখের মনি দুটো অদ্ভুত এক আকুলতায় চিকচিক করছে। বারিশ নিজের দৃষ্টি সরিয়ে নিলো মেয়েটার চোখ থেকে। ঝিলমিলের মৃদু স্পর্শ ছেড়ে নিজের বাহু ছাড়িয়ে নিয়ে নিঃশব্দে গিয়ে বসল লিভিং রুমের বড় ডাইনিং টেবিলটায়। কিচেন থেকে ভেসে আসা আবছা আলোটুকু সেখানেও কিছুটা ছড়িয়ে আছে। ​ঝিলমিল নীরবে কিচেনে ফিরে গেল। প্লেটটা তুলে এনে টেবিলের ওপর রাখল, তারপর খাবার মেখে প্রথম লোকমাটা তুলে নিল হাতে। বারিশের মুখের সামনে হাত বাড়িয়ে দিয়ে কিছুটা খোঁচা মেরেই বলল,

—‘হা করতে পারবেন? নাকি এটাও আমাকে করিয়ে দিতে হবে?’
​বারিশ বাকবিতণ্ডায় গেল না, চুপচাপ হা করল। ঝিলমিল বেশ সাবধানেই খাবারটুকু মুখে তুলে দিতে চেয়েছিল, কিন্তু অন্ধকারের কারণে হোক কিংবা হাতের কাঁপুনিতে, খাবারের অর্ধেকটা বারিশের মুখে গেল, আর বাকি অর্ধেকটা গড়িয়ে পড়ল শার্টের ওপর!
​এক মুহূর্তের জন্য দুজনেই থমকে গেল। দুজনের মনেই একসাথে বিরক্তি ফুটে উঠল।৷ একজনের মনে হলো-‘লোকটা কি ঠিকমতো খেতেও জানে না!’ ​আর অন্যজনের মনে হলো-‘একটা মানুষকে ঠিকমতো খাইয়ে দেওয়ার যোগ্যটুকুও মেয়েটার নেই!’

চুপচাপ খেয়ে যাচ্ছে বারিশ। তার দৃষ্টি ফোনের নীল স্ক্রিনে। ঝিলমিল ক্ষণে ক্ষণে বারিশের দিকে তাকাচ্ছে, আর অস্বস্তিতে আবার চোখ ফিরিয়ে নিচ্ছে অন্য কোনো দিকে। জারিফের জন্য আজ তাকে কত কী সহ্য করতে হচ্ছে! আগে যদি একটু বুঝতে পারত, তবে এতটা বড় ভুল সে কিছুতেই হতে দিত না। আর এখন এই দু’দিনের মাথায় যদি সে হেরে চলেও যায়, জারিফের কাছে সারাজীবনের জন্য হাসির পাত্র হয়ে থাকতে হবে। জারিফকে যেকোনো মূল্যে তাকে বোঝাতে হবে যে, সে তার চাচার সাথে খুব সুখে আছে।
বারিশকে এভাবে সেধে সেধে খাইয়ে দেওয়ার একমাত্র কারণই জারিফ! রান্নাঘর থেকে বারিশ বের হওয়ার সময় দোতালার করিডোরে ঝিলমিল আবছা আলোয় জারিফকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিল। এজন্যই টেনে ধরে এনে লোকটাকে খাওয়াচ্ছে সে। ​নাহলে এই কঠিন, মেন্টাল এলিয়েন লোকটাকে সে নিজের হাতে খাইয়ে দিচ্ছে—এমন দৃশ্য তো স্বপ্নের ভেতরেও অবাস্তব!

পরদিন সকালে কলেজের জন্য তৈরি হচ্ছিল ঝিলমিল। তার আগে রুটিনে যা যা ছিল তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করিয়েছে বারিশ তাকে। অর্থাৎ আজও তাকেই নাস্তা বানাতে হয়েছে।
ঝিলমিল এখন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে শরীর দুলিয়ে বেশ চঞ্চল ভঙ্গিতে ইউনিফর্মের বেল্টটা আঁটসাঁট করে বাঁধছিল সে। তখনই আচমকা এক ধাক্কায় বাঁ দিকে সরে গেল। ​কোনোমতে নিজেকে সামলে সোজা হয়ে দাঁড়াল মেয়েটা। ডান দিকে ঘুরতেই দেখে, বারিশ ড্রেসিং টেবিলের পূর্ণ আয়না দখল করে নিজের চুল পেছনে সেট করার চেষ্টা করছে। ​ঝিলমিল রাগে মুখ বাঁকিয়ে বলে উঠল,
—‘আপনি আমাকে এভাবে ধা’ক্কা মেরে সরিয়ে দিলেন কেন?’
​বারিশ আয়না থেকে চোখ না সরিয়েই গম্ভীর গলায় বলল,
—‘একজন মানুষের তৈরি হতে কতক্ষণ লাগে?’
​—‘আমার সারাদিন লাগবে! তাতে আপনার কী?’
​—‘কথা কম বলে দ্রুত চুল বাঁধো। নয়তো ফেলে রেখে চলে যাব, আর ক্লাসে দেরিতে পৌঁছালে কানে ধরে দাঁড় করিয়ে রাখব।’
​কপাল কুঁচকে লোকটার দিকে তাকিয়ে রইল ঝিলমিল। আজ একটা অফ-হোয়াইট শার্টের সঙ্গে কালো প্যান্ট পরেছে সে। চুলগুলো কিছুক্ষণ পরপর জেলের স্পর্শে পেছনে পাঠাতে চাইছে, কিন্তু সেগুলো বারবার নাছোড়বান্দার মতো কপালে লুটিয়ে পড়ছে। লোকটার এই বৃথা চেষ্টা দেখে মনে মনে বেশ মজা পাচ্ছিল সে।
​এমনিতে লোকটার কোনো কিছুতে খামতি নেই… কিন্তু তা বলে এতটা উঁচু কেন হতে হবে? কাছে এসে দাঁড়ালে একদম দানব দানব লাগে!

—‘আচ্ছা, আপনার উচ্চতা কত?’ ​নিজের অজান্তেই প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিল ঝিলমিল।
​বারিশ হালকা ভ্রূ কুঁচকে তাকাল,
—‘কিসের?’
​ঝিলমিলের কপালের ভাঁজ আরও গাঢ় হলো,
—‘কিসের আবার? আপনার!’
​—‘সিক্স-থ্রি।’
​শুনে মুহূর্তের মধ্যেই মিইয়ে গেল কিশরী। নিজের উচ্চতা যে তার টেনেটুনে মাত্র ফাইভ-থ্রি!

চৌধুরী গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রিজের বিশাল হেড অফিসের পরিবেশ বদলে দেওয়ার জন্য আজ আগমন হলো দীঘির। পুরো বিজনেস এত বছর নূজাহান চৌধুরী আর বড়ছেলে আলতাফ চৌধুরীই সামলিয়েছে। এখন যোগ হয়েছে মেহরাজ। তবে এই পুরো প্রক্রিয়ার সবচেয়ে ভরসার নাম তাহসিন। নূরজাহান চৌধুরীর পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট হলেও, অফিসে তাহসিনের গুরুত্ব কোনো ডিরেক্টরের চেয়ে কম নয়। গম্ভীর, অসম্ভব গোছানো আর নিজের কাজে নিখুঁত এক যুবক।
ঠিক সাড়ে দশটায় অফিসের কাঁচের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল ‘দীপানূর চৌধুরী দীঘি’। তাকে দেখা মাত্রই অভ্যর্থনা কক্ষ থেকে শুরু করে করিডোরে দাঁড়িয়ে থাকা এক্সিকিউটিভ, সবার চোখ এক মুহূর্তের জন্য ছানাবড়া হয়ে গেল। পরনে তার করপোরেট ব্লেজার বা ফরমাল পোশাকের বদলে অফ-শোল্ডার টপস আর জিন্স, চোখে চশমা ঝুলানো। মুখে চুইংগম, হেঁটে আসার ভঙ্গিতে রাজকীয় ঔদ্ধত্যের চেয়েও বেশি ফুটে উঠছে এক অদ্ভুত পরোয়া-হীনতা। দীঘিকে চেনে না এমন কেউ নেই এখানে। তাকে সকলে নূরজাহান চৌধুরীর বেপরোয়া উচ্ছৃঙ্খল কন্যা হিসেবেই চেনে। তাই তাকে আজ এভাবে অফিসে দেখে সবার চোখ কপালে। তাকে ঢুকতে দেখে বিভিন্ন অফিসাররা সালাম দিলেও তাদের জবাব দেওয়ার প্রয়োজন মনে করল না।
পুরো অফিসের কর্মীরা আড়চোখে একে অপরের দিকে তাকাচ্ছে। কানাঘুষা শুরু হয়ে গেছে। এই মেয়ে আজ থেকে এই অফিসে বস হিসেবে যোগ দেবে? যে মেয়েকে সামলাতে পুরো পরিবার হিমশিম খায়, সে সামলাবে এই মাল্টি-মিলিয়ন ডলারের ব্যবসা?

​দীঘি কারো দিকে তাকাল না। তার চোখ সোজা গিয়ে থামল নূরজাহান চৌধুরীর কেবিনের বাইরে, নিজস্ব ডেস্কটায় বসা তাহসিনের ওপর। ​তাহসিন ফাইলের পাতা উল্টাচ্ছিল। দীঘিকে দেখেও সে খুব একটা অবাক হলো না, মুখ তুলে কেবল একটা পেশাদার সৌজন্য বজায় রেখে বলল,
—‘ম্যাম ভেতরে আছেন। আপনার জন্যই অপেক্ষা করছেন।’
​দীঘি এক পা এগিয়ে এসে তাহসিনের টেবিলের ওপর দুই হাত ভর দিয়ে ঝুঁকে দাঁড়াল। চোখ দুটো একটু ছোট করে, ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে বলল,
—‘ম্যাম অপেক্ষা করছেন, নাকি তুমি?’
—‘ এটা প্রফেশনাল জায়গা, ম্যাম! এখানে অন্তত নিজের ব্যবহার ঠিক রাখুন।’
—‘ম্যাম বলাটা বন্ধ করো তো! শুনতে অসহ্য লাগে।’
​তাহসিন কোনো উত্তর দিল না। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে শুধু কেবিনের দরজার দিকে ইশারা করল,

—‘ভেতরে যাওয়া দরকার আপনার। আলতাফ স্যার আর মেহরাজ স্যারও উপস্থিত আছেন।’
​দীঘি এক নজর তাহসিনের নির্লিপ্ত মুখের দিকে তাকাল। বুক চিরে একটা নীরব দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসলেও চোখে-মুখে আবার সেই আগের অবাধ্য অভদ্র ভাবটা ফিরিয়ে আনল। সোজা হয়ে দাঁড়াতেই ব্ল্যাক অপিয়াম-এর মাখনের মতো মিষ্টি, তীব্র ঝাঁজালো সুবাসটা ভেসে এলো তার শরীর থেকে। ঘ্রাণটা তাহসিনের টেবিলজুড়ে ছড়িয়ে দিয়ে দীঘি বড় বড় পদক্ষেপে কেবিনের দরজার হ্যান্ডেল ঘুরিয়ে ভেতরে ঢুকে গেল। ​তাহসিন কিছুক্ষণ বন্ধ দরজাটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর একটা ঠাণ্ডা নিঃশ্বাস ফেলে আবার নিজের ডেস্কে ফিরে গিয়ে কাজে ডুবে গেল।
কনফারেন্স টেবিলের মাঝখানে বসা নূরজাহান চৌধুরী। তাঁর ডানপাশে আলতাফ চৌধুরী। হাত দুটো বুকের ওপর আড়াআড়ি করে বাঁধা, চোয়াল শক্ত। বাঁপাশে মেহরাজ ফাইল খুলে পাতা উল্টালেও চোখ দুটো স্থির হয়ে আছে বোনের ওপর। ​দীঘি কেবিনে ঢুকেই সোজা হেঁটে গিয়ে নূরজাহান চৌধুরীর ঠিক বিপরীতে, ডিরেক্টরদের জন্য নির্ধারিত একখানা খালি রিভলভিং চেয়ার টেনে বসল। চেয়ারে একটু হেলে পড়ে এক পায়ের ওপর আরেক পা তুলে দিল সে। আলতাফ সাহেব আর সহ্য করতে পারল না। শক্ত গলায় বলে উঠল,

—‘বসার শিষ্টাচারটুকুও কি তোকে ধরে ধরে শেখাতে হবে, দীঘি? তুই কোনো রেস্টুরেন্টে আসিসনি, এটা চৌধুরী গ্রুপের মেইন বোর্ড রুম।’
​দীঘি চুলগুলো এক ঝটকায় পেছনে ফেলে অলস ভঙ্গিতে আলতাফের দিকে তাকাল,
—‘আলতাফ ভাই, সকাল সকাল হাই প্রেসারের ওষুধ খাওনি?’
​—‘থামো আলতাফ!’
আলতাফ সাহেব কিছু বলতে চাইলেন তবে তার আগেই নূরজাহান চৌধুরীর একটাই আদেশসূচক শব্দে সে চুপসে গেল। তিনি চশমাটা খুলে টেবিলের ওপর রেখে ঠাণ্ডা, তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দীঘির দিকে তাকিয়ে রইলেন কয়েক সেকেন্ড।
দীঘি চুইংগমটা গালে চিপে মৃদু হেসে বলল,
—‘সবাই এভাবে তাকিয়ে আছ কেন? শো শেষ! এখন থেকে প্রতিদিন এই ড্রেস-কোড আর এই মুখটাই সহ্য করতে হবে তোমাদের।’
—‘ এটা তোমার বাবার তৈরি করা অফিস, কোনো ক্লাব ঘর নয়!
অভদ্রতা বাইদে রেখে কাজে মন দাও।’ নূরজাহান চৌধুরী বললেন।
—‘ কাজে মন দিতেই এসেছি মা! আমার নিজের একটা আলাদা পার্সোনাল কেবিন চাই। একদম রিভার ভিউ ফেস করা সাউথ কর্নারের কেবিনটা। আজ বিকালের মধ্যেই ওটা আমার নামে রেডি হওয়া চাই।’
আলতাফ এবার টেবিল চাপড়ে দাঁড়িয়ে পড়ল,

—‘তুই কি পাগল হয়েছিস দীঘি? সাউথ কর্নারের কেবিনটা আমাদের ইন্টারন্যাশনাল ক্লায়েন্টদের প্রজেক্ট ব্রিফিংয়ের জন্য ব্যবহার করা হয়! তুই অফিসে পা রেখেই নিজের নামে কেবিন দাবি করছিস?’
​আলতাফের রাগকে একবিন্দু পাত্তা না দিয়ে সে খুব আয়েশ করে নিজের বাম হাতটা চোখের সামনে তুলে ধরল। তার হাতের নখগুলো নিখুঁতভাবে কাটা, একদম ধারালো অ্যালমন্ড শেপ করা। তাতে লাগানো গাঢ় কালচে-বেগুনী ম্যাট নেলপালিশ, আর অনামিকার নখটিতে কেবল সরু একটা মেটালিক রূপালী রেখা। নিজের সেই ধারালো নখগুলোর দিকে অলস ভঙ্গিতে তাকাতে তাকাতেই সে আলতাফকে উদ্দেশ্য করে বলল,
—‘তাহলে ইন্টারন্যাশনাল ক্লায়েন্টদের অন্য কোথাও বসাও, ভাইয়া। চৌধুরী পরিবারের মেয়ের রুম সাধারণ কোনো কিউবিকেলে হবে না।’
​মেহরাজ এতক্ষণ শান্ত হয়ে শুনছিল। সে ফাইলটা বন্ধ করে নূরজাহান চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে বলল,
—‘মা, শেয়ারহোল্ডারদের আগামী মিটিংয়ে দীঘির উপস্থিতি থাকলে মন্দ হয় না। বোর্ডে আমাদের হোল্ডিং ঠিক রাখতে হলে ওকে পজিশন দিতেই হবে। কেবিনের ঝামেলাটা বড় কিছু না, ওটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে। দীঘি যেটা চাচ্ছে দিয়ে দাও।’
​নূরজাহান চৌধুরী এক মুহূর্ত চুপ করে দীঘির দিকে তাকিয়ে রইলেন। মেয়ের এই অদম্য জেদ আর অবাধ্যতা তাঁর বেশ চেনা। তিনি ঠাণ্ডা গলায় বললেন,

—‘কেবিন পাবে। তবে কেবিনে বসে কেবল চুইংগম ফোলালে চলবে না। টেক্সটাইল প্রজেক্টের যে কাজ তোমাকে দেওয়া হবে, কাল সকাল নটার মধ্যে তার প্রোগ্রেস রিপোর্ট আমার টেবিলে চাই।’
​দীঘির ঠোঁটের কোণে বিজয়ের হাসি ফুটে উঠল। সে সোজা দাঁড়িয়ে বলল,
—‘প্রজেক্ট রিপোর্ট পেয়ে যাবে, মা। তবে আরেকটা কথা, আমার ফাইলের লেনদেন আর কেবিনের কাজ সামলানোর জন্য নতুন কোনো অ্যাসিস্ট্যান্টের দরকার নেই। তোমার পিএ তাহসিনই আমার এই কাজগুলো ক্লিয়ার করবে।’
​নূরজাহান চৌধুরীর চোখের কোণ হালকা সংকুচিত হলেও তিনি কিছু বললেন না। ​দীঘি বের হয়ে এলো সেখান থেকে দরজার হ্যান্ডেলে হাত দিয়ে পেছনে ফিরে একপলক তাকিয়ে বলল,
—‘বিকালে কেবিনের চাবি যেন তাহসিনের হাতে থাকে। লেট হলে কিন্তু আমি আবার একটু অভদ্র হয়ে যাব!’
​কথাটা শেষ করেই এক ঝটকায় দরজা খুলে বেরিয়ে গেল সে।
​বাইরে তাহসিন তখনো কম্পিউটারে চোখ রেখে শান্ত মনে কাজ করছিল। দীঘি তার টেবিলের সামনে এসে দাঁড়াল। আবারও ঝুঁকে পড়ে ঠোঁটের কোণে কুটিল হাসি ফুটিয়ে ফিসফিস করে বলল,
—‘শুনেছ নিশ্চয়ই? সাউথ কর্নারের কেবিনটা আজ থেকে আমার। আর আজ বিকাল থেকেই তোমার ডিউটি আওয়ারস একটু লম্বা হতে যাচ্ছে, তাহসিন!’

———[ Fb page: Ayesha sheikh Rin-আয়েশা শেখ রিন]
রোদের তেজ তখন কিছুটা কমে এসেছে। টিফিনের ঘণ্টা বাজতেই কলেজের বড় মাঠটায় ছেলেদের হৈচৈ শুরু হয়ে গেছে। মাঠের মাঝখানে ইউক্যালিপটাস গাছের ছায়ায় পচাত্তর উইকেটের কাঠের স্ট্যাম্প দুটো পোঁতা। বোলিং এন্ডে দাঁড়িয়ে আছে জারিফ। তার হাতে লাল টেনিস বলটা। গায়ে কলেজের ইউনিফর্মের শার্টের ওপরের দুটো বোতাম খোলা, কপালে হালকা ঘামের বিন্দু। কিন্তু জারিফ বা তার বন্ধুদের পুরো নজর এখন পিচের ওপর স্ট্যাম্পের সামনে যে ব্যাট হাতে দাঁড়িয়ে আছে, তার দিকে। গণিত বিভাগের নতুন লেকচারার পরিণীতা জামান। কলেজে সবাই তাকে আড়ালে পরী মিস বলেই ডাকে।
পরীণীতার পরনে আজ হালকা আকাশী রঙের একটা পাতলা শিফন শাড়ি। রোদের আলোয় শাড়ির আঁচল আর শাড়ির পাতলা বুনন পার হয়ে শরীরের ভাঁজগুলো একদম স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে।
পেটের মেদহীন ভাঁজও স্পষ্ট। শাড়ির আঁচলটা খুব ঢিলেঢালাভাবে বুকে জড়ানো। পরীণিতা ব্যাটটা ডানহাতে ধরে বাঁহাতে পিঠের ওপর ছড়িয়ে থাকা চুলগুলো এক পাশে সরাতে সরাতে এক গাল হাসলেন। তাঁর ঠোঁটে ডার্ক ন্যুড লিপস্টিক। জারিফের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি গলায় বললেন,
—‘কী জারিফ, বল করবে নাকি শুধু দাঁড়িয়েই থাকবে?’
জারিফ হাতের বলটা ঘোরাতে ঘোরাতে ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটাল,
—‘বোলিং তো করবই ম্যাডাম, কিন্তু ফাঁকা মাঠে শুধু শুধু খেলে লাভ কী? কোনো বাজি থাকবে না?’

—‘ বেশ, থাকল। তিন ওভারে যদি আমি একটা বাউন্ডারিও না মারতে পারি তাহলে আমার ফোনের তিনটা সিক্রেট পিকচার পেয়ে যাবে। আর আমি জিতে গেলে। তোমাদের তিনজনের ফোনের প্রাইভেট গ্যালারি আনলক করে আমার হাতে তুলে দেবে। রাজি?’
জারিফ অবাক হবে বাকি খুশি হবে বুঝতে পারল না। ঠোঁটের কোণে এবার আরও বেশি কপট হাসি খেলে গেল। পাশ থেকে বন্ধুরা বলল যেন মিস একটাও বাউন্ডারি না পায়। জারিফের সাথে কভার অফে দাঁড়িয়ে থাকা শাফিন আর পয়েন্টে থাকা আবীর একে অপরের দিকে তাকাল। ছেলেদের চোখ তখন বলের দিকে যতটা না আছে, তার চেয়ে অনেক বেশি পরিণীতার দিকে।
জারিফ হালকা হেসে বলের ওপর গ্রিপ শক্ত করল,
—‘ডিল, ম্যাডাম! রেডি হন।’

জারিফ রান-আপ নেওয়ার জন্য পেছাল। তারপর কিছুটা গতি বাড়িয়ে এসে বলটা ছুড়ল অফ স্ট্যাম্পের বাইরের দিকে।
বলটা পিচে পড়ে একটু নিচু হয়ে টার্ন করল। পরিণীতা বলের লাইন কভার করতে গিয়ে সামনের দিকে অনেকটা ঝুঁকে ড্রাইভ করার চেষ্টা করলেন। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই ঘটে গেল ঘটনাটা।
ঝুঁকে ব্যাট চালাতে গিয়ে তার পাতলা শিফন শাড়ির আঁচলটা কাঁধ থেকে কিছুটা সরে বুক থেকে গড়িয়ে নিচে নেমে এল। সরু ফিতার ডিপ-কাট ব্লাউজের ভেতরের উন্মুক্ত খাঁজ আর পিঠের মসৃণ ত্বক রোদে ঝিলিক দিয়ে উঠল।
মাঠের পরিবেশ মুহূর্তের জন্য একদম নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
হাত বাড়িয়ে ক্যাচ ধরার কথা ভুলেই গেল স্লিপে থাকা রাফসান।
চোখের পলক পড়া বন্ধ হয়ে গেছে পয়েন্টে দাঁড়ানো আবীরের।
এমনকি বলটা ছুড়ে দেওয়ার পর জারিফও নিজের জায়গায় থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। তাদের সবার চোখ তখন ক্রিজে ঝুঁকে থাকা পরিণীতার ওপর স্থির। বাতাসে তাঁর শরীরে থাকা হালকা কোনো চেরি ফ্র্যাগ্রেন্সের সুবাস চারপাশে ছড়িয়ে পড়ছে। পরিণীতা শটটা মিস করলেন, বল সোজা উইকেটের পেছনে চলে গেল। কিন্তু সেদিকে কারও খেয়াল নেই।
নিজের অসাবধানতা বুঝতে পেরে পরিণীতা চট করে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। এক হাতে ব্যাটটা ধরে অন্য হাতে আঁচলটা টেনে আবার কাঁধে তুলে দিলেন। যেন কিছুই হয়নি। এমন একটা ভঙ্গি করে চুলে হাত দিয়ে এক গাল হেসে ছেলেদের দিকে তাকালেন।

—‘কী জারিফ? নেক্সট বলটা করো!’
জারিফ শুকনো ঢোক গিলল। তার চোখ এখনো পরিণীতার ঘামে ভেজা গলার কাছে আটকে আছে। হাত থেকে বলটা প্রায় পিছলে যাওয়ার উপক্রম। কভার ফিল্ডিংয়ে থাকা শাফিন ফিসফিস করে জারিফের উদ্দেশ্যে বলে উঠল,
—‘দোস্ত… আমাদের আবারও কলেজের ফার্স্ট ইয়ারে ভর্তি হতে হবে।’
পরীণিতার চোখ চলে গেল ক্রিকেট মাঠ সংলগ্ন একাডেমিক ভবনের দোতলার করিডোরের দিকে। যেখানে প্রফেসর ফাইজান বারিশ নিজের অফিস রুমের ভারী দরজাটা ঠেলে বাইরে বের হচ্ছেন।
​ফাইজানকে দেখেই পরীণিতার ব্যাটিংয়ের আগ্রহ যেন এক মুহূর্তে উবে গেল। হাতের ব্যাটটা পিচের ওপর ওভাবেই আলতো করে ফেলে দিয়ে, ঠোঁটে ধূর্ত হাসি ফুটিয়ে তিনি করিডোরের সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল। পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা জারিফ অবাক হয়ে হাত থেকে বল ফেলে দিল। পিচ থেকে কিছুটা এগিয়ে, সিঁড়ির মুখে ফাইজানকে থামিয়ে দাঁড়ালেন পরিণীতা। গায়ে শাড়ির আঁচলটা খুব ঢিলেঢালাভাবে জড়ানো, যেন বাতাসের একটানা দোলায় যেকোনো সময় আবার সরে যাবে। চোখের পাতা একটু নাচিয়ে বলে উঠল,

​—‘হ্যালো, মিস্টার ফাইজান! লুক হু ফাইনালি ডিসাইডেড টু শো আপ… ডু ইউ হ্যাভ অ্যানি আইডিয়া কতক্ষণ ধরে এই চোখ দুটো আপনাকে খুঁজছে?’
—‘ হোয়াই? নিখোঁজ বিজ্ঞপ্তি লাগানো হয়েছে আমার নামে?’
—‘ কী হয়েছে, না হয়েছে সেটা কফি খেতে খেতে বলা যাক?’
—‘আই অ্যাম বিজি, মিস জামান। এক্সকিউজ মি।’
​বারিশের স্থির, গভীর নজর তখন আটকে আছে ক্যান্টিনের শেষ মাথার কোণার টেবিলটার দিকে। ​সেখানে বসে আছে ঝিলমিল। রোদের আলো এসে পড়েছে ফর্সা মুখে। কিছু একটা খাচ্ছে আর খিলখিল করে হেসে উঠছে। হাসির সঙ্গে মেয়েটার দুটো চোখের মনি যেন অদ্ভুতভাবে জ্বলে উঠছে। স্বচ্ছ, বাদামী রূপালী আভা সেই চোখের মনি দুটোর কারণে ভিরের মাঝেও কিশোরীকে সবার থেকে আলাদা করে তোলে। যেমনটা এখন বারিশের বুকজুড়ে এক ধরণের নিশব্দ তোলপাড় তুলে দিয়ে গেল।
​বারিশ দেখল ক্যান্টিনে ঝিলমিলের পাশের এক চেয়ারে ফাহিম স্যার এসে বসল। আইসিটি স্যারকে অতটা কাছে দেখে কিছুটা অপ্রস্তুত, আর আড়ষ্ট হয়ে উঠলো ঝিলমিল। ​ফাহিম স্যার কিছু একটা বলছিল। তারপর নিজের পকেট থেকে স্মার্টফোনটা বের করে ঝিলমিলকে কিছু একটা দেখাচ্ছিলেন আর মৃদু হাসছিলেন। এদিকে ঝিলমিলের পাশে বসা রোদ্দুরের টেবিলের ওপর রাখা হাতের মুঠোটা শক্ত হয়ে জমে গেছে। চিবুকের হাড় আর চোয়াল শক্ত করে ফাহিম স্যারের দিকে তাকিয়ে আছে। সবই দেখল বারিশ।

টিফিনের সময় শেষের দিকে। ঝিলমিল ওয়াশরুম থেকে মুখ ধুয়ে বের হতেই আচমকা তার কবজিতে একটা শক্ত টান পড়ল। আতঙ্কে চিৎকার দিতে গিয়েও চোখের সামনে নিজের স্বামীকে আবিষ্কার করে গলাতেই চেপে গেল আওয়াজটা।
—‘ স্যার হয়ে যেখানে-সেখানে স্টুডেন্টকে চেপে ধরছেন? পাবলিক দেখলে গণধোলাই দেবে আপনাকে! দূরে থাকুন।’
ঝিলমিল নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে বারিশের ইস্পাতকঠিন বুকের বেষ্টনী থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার বিফল চেষ্টা করতে করতে বলল। তার ক্ষুব্ধ গলায় রাগের চেয়ে উপচে পড়ছে চঞ্চল ভীতি।
বারিশ সরল না। উল্টো ঝিলমিলের সোনালি-বাদামী মনিঘেরা আতঙ্কিত চোখের দিকে চেয়ে তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল বিষাক্ত হাসি। চোখের চাউনি খানিক গাঢ় করে সে ঝুঁকে এলো কিশরীর আরও কাছে। অত্যন্ত ধীর, ভারিক্কি কণ্ঠে আওড়াল,

—‘দূরে থাকব? আমি তোমার কতটা কাছে আসতে পারি, তার কোনো ধারণা আছে তোমার?’
পুরুষালী সেই গম্ভীর বাক্যে জমে গেল সপ্তদশী! বুকের ভেতর তোলপাড় শুরু হয়ে গেল তার। শুকনো এক ঢোক গিলে ব্যাকুল গলায় কিশরী আবার বলে উঠল,
—‘ সরুন, কেউ দেখে ফেলবে আমাদের।’
—‘দেখুক। তাতে কার কী যায়-আসে?’
—‘ এখানে কেউ জানে না আমাদের সম্পর্ক।’
​—‘না জানলে এখন জানবে।’ যুবকের কণ্ঠে কোনো রকম ইতস্তত করার ছোঁয়া নেই।
—‘ নাহ! জানলে…’
​—‘জানলে কী?’ বাক্যখানা কেড়ে নিয়ে বারিশের গলার স্বর এবার বেশ কিছুটা চড়ে গেল। শান্ত চাউনিতে খেলে গেল হিংস্র ইর্ষার ঝলক। দাঁতে দাঁত চেপে, বিষাক্ত মেজাজে শুধাল,
—‘জানলে তোর আইসিটি স্যার দুঃখ পাবে?’
—‘ সে কেন৷ দুঃখ পাবে? আর পেলেই কী? দেখুন, সমস্যা হলো…’
ঝিলমিল একটু থমকে গেল। কথাটা আর মুখ থেকে ফুটল না। তার সাবেক প্রেমিক জারিফকে ছেড়ে যে সে জারিফেরই আপন চাচাকে বিয়ে করে বসে আছে, এই সত্য জানলে পুরো ক্যাম্পাস তাকে কতটা নোংরা চোখে দেখবে!

—কী হলো? থামলে কেন?
—​‘কিছু না। ক্লাসে যাব, ছাড়ুন আমাকে।’
—​‘কী ক্লাস এখন?’
—​‘আইসিটি।’
​বারিশ তাকে ছাড়ল তো না-ই, বরং সেভাবেই চেপে ধরে রেখে পকেট থেকে ফোনটা বের করল। প্রিন্সিপালকে ডায়াল করে ঝিলমিলের চোখের দিকে তাকিয়েই অত্যন্ত শান্ত গলায় বলল,
—‘স্যার, একাদশ শ্রেণির ঝিলমিল হঠাৎ একটু অসুস্থ হয়ে পড়েছে। ছুটি চাচ্ছিল।’
​ঝিলমিল কিছু একটা বলতে যেতেই বারিশ এক হাতে শক্ত করে চেপে ধরল তার মুখ।
—​‘দিয়ে দাও,’ ওপাশ থেকে প্রিন্সিপালের সায় এলো।
—​‘ধন্যবাদ স্যার। আসলে আমারও আজকের মতো ক্লাস শেষ, কিছু জরুরি কাজ আছে। আমি কি একটু আগে বের হতে পারি?’
—​‘নো প্রবলেম, তুমি যেতে পারো।’
​লোকটা কী অনায়াসে একের পর এক মিথ্যা বলে গেল! মুখের ওপর থেকে তার শক্ত হাতটা সরিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল ঝিলমিল,
—‘এটা কী ধরনের রসিকতা? আমি কখন অসুস্থ হলাম?’
—​‘এই এখন,’ সংক্ষিপ্ত উত্তর বারিশের।
​কথা শেষ হতেই ঝিলমিলের কোনো অজুহাত না শুনেই তাকে টানতে টানতে করিডোর দিয়ে নিয়ে চলল সে। যাওয়ার পথে পাশ কাটিয়ে যাওয়া এক পিয়নের উদ্দেশ্যে হুকুমের সুরে বলল, —‘ঝিলমিলের ক্লাসরুম থেকে ওর ব্যাগটা নিয়ে আমার গাড়ির কাছে নিয়ে এসো। ডিরেক্ট।’

অফিসের বিশাল কাচের টেবিলজুড়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ফাইল ছড়ানো। চশমার ফাঁক দিয়ে ফাইলগুলোয় গভীর মনোযোগ দিয়ে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছিলেন আলতাফ চৌধুরী। ঠিক তখনই টেবিলে রাখা ফোনটা ভাইব্রেট করে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠেছে এক অচেনা নম্বর। ​ফাইল থেকে চোখ না সরিয়েই স্পিকার অন করে কলটা রিসিভ করলেন তিনি।
—​‘অ্যাসসালামু আলাইকুম, স্যার। চিনতে পেরেছেন?’ ওপাশ থেকে ভেসে এলো অত্যন্ত বিনয়ী, নম্র এক যুবকের কণ্ঠ।
​আলতাফ চৌধুরী কলমটা টেবিলে রেখে সামান্য ভ্রূ কুঁচকালেন,
—‘ওয়ালাইকুম আসসালাম। না ভাই, ঠিক চিনতে পারলাম না। কে বলছেন?’
—​‘স্যার, আমি আপনার স্টুডেন্ট ফাহিম মীর।’
​ফাহিম নামটা শুনতেই আলতাফ চৌধুরীর গম্ভীর মুখের অবয়ব এক মুহূর্তে বদলে গেল! একগাল হেসে উঠলেন তিনি,

—‘আরে! মাই ডিয়ার স্টুডেন্ট! কেমন আছ তুমি? কতদিন পর!’
—​‘অনেক ভালো আছি স্যার। আপনি কেমন আছেন?’
—​‘আমিও বেশ ভালো আছি। তা বলো, কী খবর তোমার? পড়াশোনা শেষ করে এখন কী করছ?’ আলতাফ চৌধুরীর কণ্ঠে একজন অভিভাবকতুল্য শিক্ষকের কৌতুহল ও স্নেহ ঝরে পড়ল।
​ওপাশ থেকে হালকা একটু হেসে ফাহিম উত্তর দিল,

শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ১৪

—‘স্যার, আমি আপাতত আপনার মেয়ের শিক্ষকতা করছি।’
​কথাটা শুনে আলতাফ চৌধুরী একটু চমকে উঠলেন,
—‘মানে? কীসের শিক্ষকতা?’
—​‘মানে… আমি এখন ঝিলমিলের কলেজের আইসিটি ইনস্ট্রাক্টর, ফাহিম স্যার!’
সবাই লাইক কমেন্ট করে যাবেন।

শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ১৬

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here