শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ১
আয়েশা শেখ
“২৯ বছরের প্রফেসর হয়ে আমি কিনা একটা ১৭ বছরের মেয়েকে বিয়ে করবো, যে সম্পর্কে আমার ভাতিজিও হয়! ওহ গড, আন্টি–তুমি সজ্ঞানে আছো তো?”
বিয়ের আসরে দাড়িয়ে নূরজাহান চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে ক্ষোভ ও বিস্মিত কন্ঠে বলে উঠল বারিশ।
নূরজাহান চৌধুরী বিচলিত হলেন না একটুও।
_“ আন্টি নয়, দাদীমা বলো! আজ থেকে আমি তোমার দাদী শাশুড়ি। তুমি এ বাড়ির মেয়েকে বিয়ে করতে এসেছ, এই বাড়ির মেয়েকেই বিয়ে করবে! আমার মেয়ে বিয়ের আসর থেকে পালিয়েছে তো কী হয়েছে? আমার বড় ছেলের মেয়েকে বিয়ে করবে। ব্যস, কথা এখানেই শেষ।”
নূরজাহান চৌধুরীর এই আকস্মিক একরোখা ঘোষণায় চৌধুরী বাড়ির পুরো সভাজুড়ে যেন পিনপতন নীরবতা নেমে এল। উপস্থিত সকলেই স্তব্ধ। এ বাড়িতে তার হুকুম অমান্য করার মতো বুকের পাটা কারোর নেই।
কিন্তু এবার আর চুপ থাকতে পারলেন না ঝিলমিলের বাবা আলতাফ চৌধুরী। তিনি মেয়ের ভবিষ্যতের কথা ভেবে প্রতিবাদী কণ্ঠে বললেন,
_“ না আম্মা! আমি আমার এইটুকু মেয়েকে এই ছেলের সাথে কিছুতেই বিয়ে দেব না। তোমার মেয়ের শাস্তি তুমি আমার মেয়েকে দিতে পারো না!”
তার কথার পিঠাপিঠি বারিশও চেঁচিয়ে বলল,
_“ আপনার মেয়েকে আমি বিয়ে করবও না!”
আলতাফ চৌধুরীও তখন রাগে ফুঁসছেন,
_“ তোমার কাছে আমি বিয়ে দিলে তো করবে!”
_“ আমি বিয়ে করলে তো দিবেন!” বারিশের পাল্টা জবাব।
_“দেবোই না!”
_“করবোই না!”
চলমান এই বাকযুদ্ধের মাঝেই সভাকক্ষের এক কোণে ঘোমটার আড়ালে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে ১৭ বছরের তরুণী ঝিলমিল। বিয়েটা হওয়ার কথা ছিল তার ফুপি দীঘির সাথে। সে তার থেকে পাঁচ বছরের বড়। সব ঠিকঠাকই ছিল, কিন্তু বরের বাড়ির লোক আসার পরপরই দিঘি উধাও। তাই দাদীমা তাকে জোর করেই এই বিয়ের শাড়ি পরিয়ে প্রস্তুত করে এনেছেন।
ঝিলমিলের একপাশে দাঁড়িয়ে আছে তার মা নাজমা বেগম, আর অন্যপাশে বান্ধবী ইরান। একের পর এক বাবা আর বারিশের উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় ঝিলমিলের কানে ভেসে আসছে।
এবার আসর কাঁপিয়ে ভেসে আসল নূরজাহান চৌধুরীর হুংকার।
_“আলতাফ! তুই যদি আর একটা শব্দ করিস, তবে তোর মেয়ে আর বউসহ তোকে এই বাড়ি থেকে এক্ষুনি ঘাড় ধরে বের করে দেব!”
মায়ের এমন ভয়ানক ধমকে থমকে গেলেন বড় ছেলে আলতাফ চৌধুরী। অপমানে আর অসহায়ত্বে তার মাথা নিচু হয়ে গেল।
নূরজাহান চৌধুরী নাতনি ঝিলমিলের দিকে এগিয়ে গিয়ে, তার মাথায় হাত রেখে নরম কিন্তু আদেশসূচক কণ্ঠে বললেন,
_“ জাহান, তুই তোর দাদীমার মুখের কথা রাখবি না?”
ঝিলমিল মাথা নিচু করে আছে। দাদীমার খুব আদরের নাতনি সে। দাদীমা নিজের নামের সাথে মিলিয়ে তার নাম রেখেছে, জাহানারা চৌধুরী ঝিলমিল। তার দাদাভাই তার দাদীমাকে জাহান বলে ডাকত। এখন দাদীমা তাকে জাহান বলেই ডাকেন। সে দাদীমার দিকে মুখ তুলে তাকিয়ে অত্যন্ত মিনমিনে, শান্ত আওয়াজে জবাব দিল,
_“তুমি যা বলবে আমি তাতেই রাজি, দাদীমা। তোমার কথার ওপর আমার কোনো কথা নেই।”
মেয়ের মুখে এই কথা শুনে আলতাফ চৌধুরী এবং নাজমা বেগম আকাশ থেকে পড়লেন। দুজনেই চরম অবাক হয়ে মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন। যে মেয়েকে সারাদিন একটা কথা বলে শোনানো যায় না, সে আজ দাদীর এক কথায় নিজের জীবনের এত বড় সিদ্ধান্তে সহজে রাজি হয়ে গেল!
পুরো বাড়ির মানুষ যখন ঝিলমিলের এই আকস্মিক সম্মতিতে কিংকর্তব্যবিমূঢ়। ঝিলমিলের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বারিশ নূরজাহান চৌধুরীর উদ্দেশ্যে বলে উঠলো,
_“ আন্টি, প্লিজ বোঝার চেষ্টা করো! আকাশের ভাতিজি হিসেবে আমিও ওকে নিজের ভাতিজির মতোই দেখি। আর ও আমার থেকে বয়সে অনেক ছোটো! আমি কোনো অবুঝ বাচ্চার ফিডার মুখে দেওয়ার দায়িত্ব নিতে এখানে আসিনি। আমার পক্ষে এই বিয়ে করা কোনোভাবেই সম্ভব না!”
_“ হ্যাঁ মা, বারিশ আর ঝিলমিল কীভাবে কী? ওদের মধ্যে তো কোনো ম্যাচই নেই!” বন্ধুর পক্ষ নিয়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে কিছুটা দ্বিধাবোধ নিয়ে আকাশ বলে উঠল। সে নূরজাহান চৌধুরীর ছোট ছেলে। ঝিলমিল তার বড় ভাইয়ের মেয়ে। অন্যদিকে বারিশ তার ছোট বেলার বেস্টফ্রেন্ড।
ছেলের এমন অযাচিত মন্তব্যে মুহূর্তেই জ্বলে উঠলেন নূরজাহান চৌধুরী। নিজের ছোট ছেলের দিকে কঠোর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন,
_“আমাকে নিয়ম শেখাতে এসো না, আকাশ! বারিশের সঙ্গে ঝিলমিলের বংশিও বা র’ক্তের কোনো সম্পর্ক নেই। আর আমি বারিশের বাবা এবং ভাইয়ের সাথে কথা বলেছি। তাদের কোনো আপত্তি নেই।”
মায়ের কঠোর জবাবে আকাশ দমে গেলেও বারিশ দমবার পাত্র নয়। সে নিজের অবস্থানে অনড়।
_“ আমি একজন প্রফেসর, আর ও মাত্র স্কুলের গণ্ডি পার হওয়া একটা বাচ্চা মেয়ে। আমি কোনোভাবেই এই বিয়েতে রাজি হতে পারছি না। আই অ্যাম সো সরি আন্টি!”
বারিশের এই ক্রমাগত প্রত্যাখ্যান এবার নূরজাহান চৌধুরীর ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে দিল। তিনি বারিশের মুখোমুখি এসে দাঁড়ালেন। মেয়ে পালিয়ে যাওয়ার পরপরই সে বারিশের বাবা চঞ্চল শেহরিয়ারকে সবকিছু জানান। সাথে নিজের সিদ্ধান্তও জানান। তার এ বিয়েতে আপত্তি নেই। তবে ছেলেকেও তিনি জোর করবেন না। তাই চুপচাপ দাড়িয়ে আছে বারিশের বাবা।
_“পরিষ্কার শুনে রাখো বারিশ, তুমি যদি এই বিয়েতে রাজি না হও, তাহলে আজ থেকে আকাশের সাথেও ভবিষ্যতে কোনো যোগাযোগ রাখবে না! আমার বাড়িতে তোমার পা রাখা তো দূরের কথা, আকাশের সাথে তোমার বন্ধুত্বও আজ এই মুহূর্ত থেকে শেষ!”
নূরজাহান চৌধুরীর এই শেষ অস্ত্রটা বারিশের অভিব্যক্তিকে বদলে দিলো। আকাশের সাথে তার বন্ধুত্বটা আর দশটা সাধারণ বন্ধুত্বের মতো নয়, ও তার বেস্টফ্রেন্ড। সেই ছোট্টবেলার বন্ধু। মায়ের এমন হুকুম যে আকাশ অমান্য করতে পারবে না, সেটা বারিশ খুব ভালো করেই জানে। সে এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে আকাশের দিকে তাকাল। আকাশও অসহায় চোখে বন্ধুর দিকে এগিয়ে আসে।
বারিশের কাঁধে একটা হাত রেখে, গলার আওয়াজ যতটা সম্ভব নিচু করে মিনতির সুরে বলল,
_“রাজি হয়ে যা দোস্ত! ঝিলমিলই তো। একটু মানিয়ে নিস প্লিজ। আজ থেকে না হয় তুই আমাকে চাচ্চু বলে ডাকিস! আমি তোর চাচা শ্বশুর হওয়ার জন্য মনে-প্রাণে প্রস্তুত, তাও তুই এই বিয়েটা ভাঙিস না রে ভাই!”
বন্ধুর এমন অসহায় আত্মসমর্পণ দেখে বারিশের রাগ গিয়ে এবার বিস্ময়ে পরিণত হলো। সে অবিশ্বাস্য চোখে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল।
বারিশের বাবাসহ বড় ভাই সবাই তাকে বোঝাল। তবু রাজি হতে চাইছে না।
ঝিলমিল ঘোমটার আড়াল থেকে ইরানের বাহুতে চিমটি কেটে মৃদু আওয়াজে বলল,
_“ এই রাবিশটা বেশি বেশি করছে! আমি কিন্তু কিছু একটা বলে ফেলব।”
_“ চুপচাপ শুনে যা। রাজি না হয়ে যাবে কই?” ইরান বলল।
বলতে না বলতেই ইরানের কথা ফলে গেল। ঝিলমিলের কানে ভেসে এলো বারিশের অনিচ্ছাকৃত সম্মতির বাক্য। বারিশ অত্যন্ত বিরক্তিতে মুখটা বাঁকিয়ে, এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে নূরজাহান চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে বলল,
_“ওকে আন্টি… আমি রাজি। শুধুমাত্র তোমার মুখের দিকে তাকিয়ে, তোমার সম্মান বাঁচাতে আমি এই বিয়েতে রাজি হচ্ছি। নাহলে এই আলতাফ চৌধুরীর মেয়েকে বিয়ে করার বিন্দুমাত্র শখ আমার ছিল না!”
নূরজাহান চৌধুরী এবারও তার ভুল শুধরে দিয়ে কড়া গলায় মনে করিয়ে দিলেন,
_“আন্টি নয়… দাদীমা!”
বারিশ দাঁত কিড়মিড় করে বলল,
_ “ওকে, দাদীমা!”
আলতাফ চৌধুরী আবার রেগেমেগে কিছু একটা বলতে চাইলেন কিন্তু তার স্ত্রী তাকে থামিয়ে দেয়।
অবশেষে সব ঝামেলার অবসান ঘটিয়ে কাজি সাহেব এগিয়ে এলেন। শুরু হলো ঝিলমিল আর বারিশের বিয়ের মূল আনুষ্ঠানিকতা। ঝিলমিলের হাত দুটো এবার কাঁপতে লাগল। এক অজানা ভবিষ্যৎ আর এক বুক জড়তা নিয়ে সে কম্পিত হাতে রেজিস্ট্রি পেপারে সাইন করল। যে সাইনের মাধ্যমে বারিশের নামের সাথে জড়িয়ে গেল তার নিজের নাম। কাজি সাহেবের পড়ানো সব নিয়ম-কানুন মেনে নিয়ে, এক রাশ দীর্ঘশ্বাস চেপে শেষ পর্যন্ত কাঁপা গলায় কবুলও বলে ফেলল।
বিয়ের সব নিয়ম শেষ হতে না হতেই এবার বিদায়ের পালা। নূরজাহান চৌধুরী এগিয়ে এসে ঝিলমিলের ডান হাতটা টেনে নিয়ে বারিশের শক্ত হাতের ওপর রাখলেন। দুজনের হাত একত্রে করে দিয়ে বারিশের উদ্দেশ্যে বললেন,
_“ওকে দেখে রেখো। ওর দায়িত্ব আজ থেকে তোমার হাতে। নিয়ে যাও এবার।”
দাদীমার মুখে নিয়ে যাও শব্দটা শুনতেই ঝিলমিল যেন আকাশ থেকে পড়ল।
_“কোথায় যাবো আমি দাদীমা?”
নূরজাহান চৌধুরী নাতনির এমন অবুঝ প্রশ্নে বললেন,
_“কেন… স্বামীর সাথে স্বামীর বাড়িতে। আজ থেকে ওটাই তোমার আসল ঠিকানা।”
_“মানে কী?” ঝিলমিলের চোখ দুটো এবার গোল গোল হয়ে গেল। সে রীতিমতো ভড়কে গিয়ে বলল,
_“তুমি তো বলেছিলে জাস্ট কবুল বললেই বিয়ে হয়ে যাবে! বাড়ি ছাড়ার কথা তো তুমি আমাকে বলোনি!”
_“বিয়ে হলে কী কেউ নিজের ঘরে থাকতে পারে রে ভাই?”
দাদীমার কথায় ঝিলমিল আহম্মক বনে গেল। হ্যাঁ, তার এই বিয়েতে সম্পূর্ণ মত ছিল। কিন্তু এত কিছু তো ভাবেনি। সে না চাইতেও ধীরে ধীরে মাথা উঁচু করে তাকাল পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বারিশের দিকে। লোকটাকে দেখার জন্য মাথাটা একটু বেশিই উঁচু করতে হলো তাকে। কারণ সে উচু জুতো পড়েও বারিশের কাঁধ অব্দি পৌছাতে পারেনি। বিয়ের শেরওয়ানিতে বারিশকে গ্রিক মূর্তির মতো সুদৃঢ় আর ভয়ানক সুন্দর লাগছিল। তার সিল্কি চুলগুলো মাঝখানে সিঁথি হয়ে দুপাশে ছড়িয়ে আছে।
কিন্তু পাশে দাঁড়ানো পুরুষটির দীর্ঘদেহী, পেশিবহুল, চওড়া কাঁধ আর ধারালো চোয়ালের গম্ভীর বারিশের পাশে নিজেকে বড্ড অসহায় মনে হলো ঝিলমিলের। বিশেষ করে বারিশের শান্ত, গভীর চোখের স্থির চাউনিটা ওর দিকে আসতেই পুরো শরীর অস্বস্তিতে শিউরে উঠল। লোকটাও একদৃষ্টিতে নিচের দিকে তাকিয়ে আছে ঠিক তার দিকেই। কেমন গম্ভীর, রসহীন চাউনি! যেন চোখের দৃষ্টি দিয়েই আস্ত গিলে খেয়ে ফেলবে ঝিলমিলকে।
সে কী করে ফেলল এটা? সে তো কেবল তার ফুপির হবু বরকে বিয়ে করেনি, সে বিয়ে করেছে তার নিজের আপন ছোট চাচ্চুর বেস্টফ্রেন্ডকে! যাকে সে জন্মের পর থেকে বারিশ চাচ্চু বলে ডেকে এসেছে, আজ সে-ই তার স্বামী? আর এই লোকটা তার নিজের কলেজের প্রফেসর! কলেজের যে স্যারকে পুরো ক্লাসের সবাই বাঘের মতো ভয় পায়, আজ থেকে সেই কড়া শিক্ষকের সাথে তাকে অন্য এক বাড়িতে গিয়ে থাকতে হবে?
হঠাৎ খুব ফ্যাকাশে আর দিশেহারা দেখাল ঝিলমিলকে। চোখ দুটোতে তখন স্পষ্ট ভয়ের ছাপ। নাতনির মুখের এই আকস্মিক পরিবর্তন নূরজাহান চৌধুরীর নজর এড়াল না। তিনি কিছুটা চিন্তিত গলায় তাকে জিজ্ঞেস করলেন,
_“কী হয়েছে জাহান? খারাপ লাগছে?”
ঝিলমিল দাদীমার দিকে তাকিয়ে কোনোমতে নিজের ভেতরের অস্থিরতা আড়াল করার চেষ্টা করল। শুকনো একটা ঢোক গিলে বলল,
_“না, আমি একটু রুমে যাবো। প্রয়োজনীয় একটা জিনিস নিতে হবে। আসছি।”
কথাটা বলেই সবাইকে হালকা ঠেলে ঝটপট পা চালিয়ে ভেতরের দিকে চলে গেল।
তার মা নাজমা বেগম মেয়ের মেয়ের পিছু পিছু কিছুটা এগিয়ে গিয়ে ডাকলেন,
_“ঝিলমিল! আমি আসব তোর সাথে?”
ঝিলমিল পেছনে না তাকিয়েই হাত উঁচিয়ে কড়া গলায় নিষেধ করে বলল,
_“না আম্মু, একদম আসবে না! আমি একাই যাচ্ছি। কেউ আসবে না আমার সাথে।”
কিন্তু ঝিলমিল নিজের ঘরে গেল না। সে ডাইনিং স্পেস পার হয়ে সোজা চলে গেল রান্নাঘরের পেছনের দরজার দিকে। চৌধুরী বাড়ির পেছনের এই দরজাটা দিয়ে সচরাচর কেউ যাতায়াত করে না। ঝিলমিল সাবধানে ছিটকিনিটা খুলল। বাইরে তখন ঘুটঘুটে অন্ধকার। সে এক মুহূর্তের জন্য পেছনে ফিরে নিজ বাড়িটার দিকে তাকা, তারপর শাড়ীর কুঁচিগুলো দুই হাতে শক্ত করে জাপটে ধরে সোজা বাইরের পিচঢালা অন্ধকার রাস্তায় দৌড় লাগাল!
নিজের ছোট্ট একটা উদ্দেশ্য আর দাদীমার সম্মান বাঁচাতে না হয় কবুলটা বলেই ফেলেছে, তার মানে এই নয় যে সত্যি সত্যি তাকে এই খড়খড়ে বারিশ চাচ্চুর সাথে গিয়ে সংসার করতে হবে! চাচ্চু তো চাচ্চুই, তার ওপর আবার কলেজের খিটখিটে স্যার! ক্লাসে যে অ্যাসাইনমেন্ট একটু দেরি করে জমা দিলে কাঁচুমাচু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, তার সাথে এক ঘরে এক ছাদের নিচে থাকা? অসম্ভব! তার চেয়ে এই রাতের অন্ধকারেই পালিয়ে যাওয়া ভালো!
বেশ কিছুক্ষণ কেটে গেল, কিন্তু ঝিলমিল আর ফিরে এলো না তো এলোই না। বরযাত্রীরা সব অধৈর্য হয়ে উঠছে।
বান্ধবীর এতক্ষণ ধরে নিখোঁজ থাকা দেখে ইরানের মনে কেমন এক খটকা লাগল। সে স্থির থাকতে না পেরে দ্রুত পায়ে ঝিলমিলের ঘরের দিকে গেল। কিন্তু রুমে পা রাখতেই চোখ তার চড়কগাছ! পুরো ঘর ফাঁকা, কোথাও কেউ নেই। ইরান আর এক মুহূর্তও দেরি না করে হন্তদন্ত হয়ে দৌড়ে ড্রয়িংরুমে ফিরে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
_“ দাদীমা, সর্বনাশ হয়েছে! ঝিলমিল রুমে কোত্থাও নেই!”
ব্যস, চৌধুরী বাড়িতে যেন বজ্রপাত হলো। বাড়ির চাকর-বাকর থেকে শুরু করে সবাই চারদিকে খোঁজাখুঁজি শুরু করে দিল। ছাদ, বারান্দা, ওয়াশরুম সব জায়গায় খোঁজা শেষ, কিন্তু ঝিলমিলের কোনো হদিস মিলল না। হঠাৎ রান্নাঘরের দিক থেকে একজন জানাল পেছনের দরজা খোলা। সবাই ছুটে গিয়ে দেখল বাইরের অন্ধকার রাস্তায় পড়ে আছে ঝিলমিলের মাথার খোঁপার কিছু জুঁই ফুল।
দাদীমা নূরজাহান চৌধুরী সোফায় ধপ করে বসে পড়লেন। আলতাফ চৌধুরী আর নাজমা বেগম নিজেদের কপাল চাপড়াতে লাগলেন। ফুপুর পথ ধরে ১৭ বছরের নাতনি ঝিলমিলও আজ এই বিয়ের আসর থেকে পালিয়েছে!
মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা বারিশের চেহারাটা সত্যিই তখন দেখার মতো। তার চোখ-মুখ রাগে, অপমানে বিস্ময়ে লাল হয়ে গেছে। উপস্থিত বরযাত্রী আর আত্মীয়দের ফিসফিসানি তখন তুঙ্গে। চৌধুরী বাড়ির মেয়েরা যে এভাবে একের পর এক বরকে কাঁচকলা দেখিয়ে পালাবে, তা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। একই বিয়ের আসরে, একই দিনে একে একে দুজন মেয়ে বারিশের সাথে এই কাণ্ড করল! একজন প্রফেসর হিসেবে তার আত্মসম্মানে এর চেয়ে বড় আঘাত আর কী হতে পারে?
আকাশ নিজের বন্ধুর এই অপমানিত আর বিধ্বস্ত দশা দেখে অত্যন্ত অপরাধী মতো করে বারিশের একদম কাছে গিয়ে দাঁড়াল। বন্ধুর কাঁধে হাত রেখে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষায় কিছু একটা বলতে চাইল,
_“দোস্ত, আসলে ও তো ছোট মানুষ…”
কিন্তু আকাশকে কথা শেষ করতে দিল না বারিশ। সে ঝটকা মেরে আকাশের হাতটা নিজের কাঁধ থেকে সরিয়ে দিয়ে পুরো ড্রয়িংরুম কাপিয়ে চিৎকার করে বলে উঠল,
_“ হোয়াট আ ব্লাডি জোক! যাকে বিয়ে করতে এলাম সেও পালাল, যাকে বিয়ে করলাম সেও পালাল! আগে জানলে এই বা’লের বিয়েই করতে আসতাম না!”
গায়ের শেরওয়ানির বোতামগুলো ছিঁড়তে ছিঁড়তে হনহন করে বেরিয়ে গিয়ে নিজের গাড়ির ড্রাইভার সিটে গিয়ে বসল। ইঞ্জিন স্টার্ট দিতেই আকাশ দৌড়ে এসে জানালার কাছে দাঁড়িয়ে আতঙ্কিত গলায় ডাকল,
_“বারিশ! কোথায় যাচ্ছিস তুই?”
বারিশ গাড়ির জানালা নামায়। চোখ দুটো তার আগুনের মতো জ্বলছে, চোয়াল শক্ত।
_“ দোয়া কর তোর ভাতিজি যেন আমার হাতে ধরা না পড়ে। আজ ওর কপালে কী আছে, আমি নিজেও জানি না!”
_“গাড়ি থামা! ও ছোট মানুষ, একটা ভুল করে ফেলেছে… বারিশ, শুনছিস?” আকাশ বলল।
_“ইজ দিস আ ড্যাম গেইম টু হার? নিজে বিয়েতে মত দিয়ে পালিয়ে গিয়ে এমন নাটক করার মানে কী! সেই কৈফিয়ত আজ আমি ওর কাছ থেকে আদায় করে ছাড়ব!”
আকাশকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই চলে গেল বারিশ।
