Home শেহেজাদার আদর শেহেজাদার আদর পর্ব ৪৬

শেহেজাদার আদর পর্ব ৪৬

শেহেজাদার আদর পর্ব ৪৬
সুমাইয়া ইসলাম নূর

অবশেষে চলে এলো সেই প্রতীক্ষিত মুহূর্ত।
যে দিনের জন্য গত কয়েক মাস ধরে নির্ঘুম রাত কাটিয়েছে ইনায়া, অসংখ্য অ্যাসাইনমেন্ট করেছে, বিজনেস মডেল নিয়ে গবেষণা করেছে—আজ সেই দিনেরই পরীক্ষা।
লন্ডনের অন্যতম প্রভাবশালী কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান ASU Company-র বিশাল Executive Boardroom-এ আজ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বহু প্রতীক্ষিত বিজনেস ডিল মিটিং।
ফ্লোর-টু-সিলিং কাঁচের দেয়াল ঘেরা আধুনিক বোর্ডরুম।মাঝখানে বিশাল ওভাল আকৃতির টেবিল।চারপাশে নীরব অথচ গম্ভীর পরিবেশ।

টেবিলের একপাশে বসে আছে ইনায়া নূর চৌধুরী।
তার ডান পাশে রেদওয়ান।অন্য পাশে বসে আছে তিয়া চৌধুরী।তার পাশে রাইহান চৌধুরী।
দুজনের সামনেই নিজ নিজ কোম্পানির প্রেজেন্টেশন ফাইল, ল্যাপটপ আর প্রজেক্ট রিপোর্ট সাজানো।
ASU কোম্পানির কয়েকজন সিনিয়র স্টাফও ইতোমধ্যে নিজেদের জায়গায় বসে পড়েছে।
সবার চোখে অপেক্ষা।কারণ এখনো আসেননি ASU Company-এর CEO।মিটিং শুরু হওয়ার নির্ধারিত সময়ের ঠিক দুই মিনিট আগে বোর্ডরুমের দরজা খুলে গেল।সাথে সাথে সবার দৃষ্টি সেদিকে চলে গেল।কালো শার্ট কালো স্যুট।
রূপালি টাই।এক হাতে ফাইল।অন্য হাতে ট্যাব।
সোজা ভঙ্গিতে হেঁটে ভেতরে প্রবেশ করলেন একজন সুদর্শন, ব্যক্তিত্বময় যুবক।
তার প্রতিটি পদক্ষেপে যেন আত্মবিশ্বাস ঝরে পড়ছে। আর ঠিক তার পাশে পওয়াসা দারিয়ে আছে দুজনকে দেখেই ইনায়া থমকে গেল।
তিয়া হতবাক হয়ে তাকিয়ে আছে ।রাইহান চৌধুরীও বিস্ময়ে চোখ বড় করে তাকিয়ে রইলেন।শুধু রেদওয়ানের মুখে হালকা হাসি ফুটে উঠল।কারণ একমাত্র সে-ই আগে থেকেই জানত।মানুষটা আর কেউ নয়।শেহজাদ ইউভি চৌধুরী।রাইহান চৌধুরী অবাক কণ্ঠে বলে উঠলেন—

— “ইউভি!”
সাথে সাথে পিয়াসা ঠান্ডা গলায় বলল—
Mister Raihan Chowdhury.
এখানে আপনি শুধুই একজন ক্লায়েন্ট।শেহজাদ ইউভি চৌধুরী এখানে পারিবারিক আলোচনা করতে আসেননি।এটি একটি ব্যবসায়িক বৈঠক।
পিয়াসার স্পষ্ট ও দৃঢ় কণ্ঠে পুরো রুমের সআাই কয়েক সেকেন্ডের জন্য নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
রেদওয়ান পর্যন্ত অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল।মনে মনে বলোলো ওহো! এই ভার্সনের পিয়াসাকে তো আমি আগে দেখি নাই!
এদিকে ইউভির মুখে কোনো পরিবর্তন দেখা গেল না।সে অত্যন্ত পেশাদার ভঙ্গিতে টেবিলের শীর্ষে গিয়ে বসল।
তারপর বলল—
গুড মর্নিং এভরিওয়ান
সবাই একসাথে উত্তর দিল গুড মর্নিং।
ইউভি ফাইল খুলে বলল—

—আমি শেহজাদ ইউভি চৌধুরী, ASU কোম্পানির সিইও।
— “Today we will evaluate both companies based on strategy, market potential, sustainability and product quality.
” (আজ আমরা দুটি কোম্পানিকে তাদের কৌশল, বাজার সম্ভাবনা, স্থায়িত্ব এবং পণ্যের গুণগত মানের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করব।)
এরপর পিয়াসার দিকে তাকিয়ে বলল—
— “And she is my assistant.”
(এবং তিনি আমার সহকারী।)
পিয়াসা গম্ভীর মুখে মাথা নাড়ল।
এদিকে ইনায়া এখনও ইউভির দিকে তাকিয়ে আছে।তার বুকের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে ধুকপুক করছে।এতদিন সে জানত ইউভি একজন সফল ব্যবসায়ী।কিন্তু আজ প্রথমবার সে ইউভিকে পুরোপুরি একজন কর্পোরেট লিডার হিসেবে দেখছে।অদ্ভুত এক গর্ব ছড়িয়ে পড়ল তার ভেতরে।
কিছুক্ষণ পর ASU-র একজন সিনিয়র স্টাফ দাঁড়িয়ে বললেন—

— “Let’s begin the meeting.
চলুন মিটিং শুরু করা যাক।
— “LLB Company will present first
প্রথমে LLB কোম্পানি প্রেজেন্টেশন দেবে।
সাথে সাথে রাইহান চৌধুরী উঠে দাঁড়ালেন।
— “From LLB Company, Miss Tiya Chowdhury will present today.”
LLB কোম্পানির পক্ষ থেকে আজ মিস তিয়া চৌধুরী প্রেজেন্টেশন উপস্থাপন করবেন।
তিয়া আত্মবিশ্বাসের সাথে সামনে এগিয়ে গেল।
বড় স্ক্রিনে তার প্রেজেন্টেশন ভেসে উঠল।
সে সুন্দরভাবে মার্কেট অ্যানালাইসিস, সেলস গ্রোথ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরল।তার কণ্ঠে আত্মবিশ্বাস ছিল।উপস্থাপনাও যথেষ্ট ভালো ছিল।
ASU-র স্টাফরা মনোযোগ দিয়ে শুনল।শেষে কয়েকজন নোটও নিল।প্রেজেন্টেশন শেষ হলে ভদ্র করতালি শোনা গেল।তিয়া সন্তুষ্ট মুখে নিজের আসনে ফিরে বসল।এরপর স্টাফ ঘোষণা করলেন
“Now, IVA Brand.” (এখন IVA ব্র্যান্ড।)
রেদওয়ান একবার ইনায়ার দিকে তাকাল।

চোখে নীরব উৎসাহইনায়া কয়েক সেকেন্ড নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইল।তারপর ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এল।বিশাল স্ক্রিনে নিজের প্রেজেন্টেশনের প্রথম স্লাইড তুলে শান্ত কণ্ঠে বলল—
সুপ্রভাত সবাইকে। আজ আমি এখানে কোনো পণ্য বিক্রি করতে আসিনি।আমি এখানে একটি ভিশন উপস্থাপন করতে এসেছি।কথাটা বলতেই পুরো মিটিং রুম নিস্তব্ধ হয়ে গেল।সবার দৃষ্টি গিয়ে স্থির হলো ইনায়ার উপর।ইনায়া পরের স্লাইডে ক্লিক করল।স্ক্রিনে IVA-এর নতুন প্রোডাক্ট লাইনের ছবি ভেসে উঠল।
— “A good product attracts customers once.”
একটি ভালো পণ্য একজন ক্রেতাকে একবার আকর্ষণ করে।
But a trusted product creates loyal customers for years.”
কিন্তু একটি বিশ্বস্ত পণ্য বছরের পর বছর ক্রেতাকে ধরে রাখে।
ASU-এর কয়েকজন স্টাফ মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।
ইনায়া আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে বলতে লাগল—

এই পণ্য বাজারে আনার আগে আমরা মাসের পর মাস গ্রাহকদের আচরণ নিয়ে গবেষণা করেছি।
— “We did not create what we wanted to sell
.আমরা যা বিক্রি করতে চেয়েছি তা তৈরি করিনি।
— “We created what customers actually needed.”
আমরা তৈরি করেছি গ্রাহকদের প্রকৃত প্রয়োজন।
স্ক্রিনে গ্রাফ, ডাটা এবং মার্কেট অ্যানালাইসিস একের পর এক ভেসে উঠতে লাগল।
রেদওয়ান মুগ্ধ হয়ে বোনের দিকে তাকিয়ে আছে।
পিয়াসার মুখে গর্বের হাসি।আর ইউভি?
সে চুপচাপ বসে আছে।আঙুল জোড়া করে টেবিলের উপর রেখেছে।কিন্তু তার চোখের গভীরে স্পষ্ট গর্বের ছাপ।
ইনায়া এবার একটু সামনে এগিয়ে এল।
— “Many companies focus on profit first.”
অনেক কোম্পানি প্রথমে লাভের কথা ভাবে।
IVA প্রথমে মূল্য দেওয়ার কথা ভাবে।কারণ প্রকৃত মূল্য দিলে লাভ নিজে থেকেই আসে।
কথাটা শুনে ASU-এর কয়েকজন সিনিয়র কর্মকর্তা একে অপরের দিকে তাকাল।তাদের চোখে স্পষ্ট প্রশংসা।
ইনায়া এবার শেষ অংশে চলে গেল।যদি ASU আজ IVA-কে নির্বাচন করে।তাহলে আপনারা শুধু একজন সাপ্লায়ার পাবেন না।আপনারা একজন দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক অংশীদার পাবেন।
একটু থেমে ইনায়া আবার বলতে লাগলো

— “And we are ready to prove it
.আর আমরা তা প্রমাণ করতেও প্রস্তুত।
শেষ স্লাইডে IVA-এর লোগো ভেসে উঠল।
ইনায়া ল্যাপটপ বন্ধ করে বলল—
— “Thank You.” (ধন্যবাদ।)
কয়েক সেকেন্ড…
পুরো রুমের সবাই নিস্তব্ধ হয়ে গেছে
এরপর পুরো কনফারেন্স রুম করতালিতে ভরে উঠল।ASU-এর স্টাফরা পর্যন্ত মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে।তিয়া চৌধুরীর মুখের হাসিটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।কারণ সে বুঝে গেছে—
ইনায়ার প্রেজেন্টেশন শুধু ভালো হয়নি।
এটা ছিল অসাধারণ।
রাইহান চৌধুরীও অবাক হয়ে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে আছেন।এত অল্প সময়ে ইনায়া এতটা পরিণত হয়ে উঠবে, তিনি কল্পনাও করেননি।
আর ইউভি?তার ঠোঁটের কোণে অদৃশ্য একটা হাসি ফুটে উঠল।
মনে মনে বলল—

“That’s my Ador..
“আমি জানতাম তুই পারবি।
মেয়েটা আজ শুধু একটা প্রেজেন্টেশন দেয়নি।
সে প্রমাণ করেছে ইনায়া নূর চৌধুরী কারও পরিচয়ে পরিচিত হতে চায় না।সে নিজের পরিচয় নিজেই তৈরি করতে এসেছে।আর আজকের এই মিটিং রুমে উপস্থিত প্রত্যেকটা মানুষ সেই সত্যের সাক্ষী হয়ে রইল।
তিয়ার হাত দুটো ধীরে ধীরে মুষ্টিবদ্ধ হয়ে এলো।
নখগুলো তালুর ভেতর এত জোরে বসে গেছে যে ব্যথা অনুভব হওয়ার কথা, কিন্তু এই মুহূর্তে সে কোনো ব্যথাই টের পাচ্ছে না।তার দৃষ্টি স্থির ইনায়ার দিকে।চারপাশে সবাই ইনায়ার প্রশংসা করছে।
ASU-এর কর্মকর্তারা মুগ্ধ।রেদওয়ানের চোখে গর্ব।
পিয়াসার মুখে বিজয়ী হাসি।আর সবচেয়ে বেশি যেটা তিয়ার সহ্য হচ্ছে না ইউভির চোখে সেই অদৃশ্য গর্ব।যে গর্ব সে কোনোদিন নিজের জন্য দেখতে পায়নি।
তিয়ার বুকের ভেতর যেন আগুন জ্বলতে লাগল।
মনে হচ্ছিল প্রতিটা করতালি তার কানে নয়, সরাসরি তার ব্যক্তিত্ব আঘাত করছে।
“কেন?সবসময় কেন ইনায়া?যেদিকে তাকাই, সেখানেই ইনায়া!মেয়েটার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।
ঠোঁট কামড়ে নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করল।
কিন্তু ভেতরের হিংসা আর অপমানবোধ তাকে শান্ত থাকতে দিচ্ছে না।আজকের এই পরাজয় শুধু ব্যবসার মঞ্চে হয়নি।তার কাছে মনে হচ্ছে—

সে যেন আবারও হেরে গেল ইনায়া নূর চৌধুরীর কাছে।আর সেই পরাজয়ের তীব্রতা তার চোখে স্পষ্ট ফুটে উঠল।
ASU-এর সিনিয়র বোর্ড সদস্যরা নিজেদের মধ্যে বেশ কিছুক্ষণ আলোচনা করলেন।
কনফারেন্স রুমজুড়ে তখন টানটান উত্তেজনা।
তিয়া চৌধুরী স্থির হয়ে বসে আছে।ইনায়াও নিজের অনুভূতি লুকিয়ে শান্ত মুখে বসে আছে।
আর ইউভি?সে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে দূরের লন্ডন শহরের দিকে তাকিয়ে আছে। যেন এই সিদ্ধান্তের চেয়েও বড় কোনো চিন্তা তার মাথায় ঘুরছে।অবশেষে ASU-এর Chief Procurement Director ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন।
তারপর সবার দিকে তাকিয়ে বললেন—

— “After reviewing both presentations, market strategies, product quality reports and future growth plans…
দুই প্রতিষ্ঠানের প্রেজেন্টেশন, বাজার কৌশল, পণ্যের মান এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা পর্যালোচনা করার পর…
We have reached our final decision.
” (আমরা আমাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি।)
তিয়ার বুক ধড়ফড় করতে লাগল।
রাইহান চৌধুরীও গম্ভীর মুখে বসে রইলেন।
লোকটি ফাইল বন্ধ করে বললেন—
ASU কোম্পানি তাদের অফিসিয়াল বিজনেস পার্টনার হিসেবে IVA কোম্পানিকে নির্বাচিত করেছে।
মুহূর্তেই পুরো রুম করতালিতে ভরে উঠল।
পিয়াসা খুশিতে প্রায় চেয়ার থেকে লাফিয়ে উঠল।
রেদওয়ানের মুখে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল।
ইনায়া কয়েক সেকেন্ড বিশ্বাসই করতে পারল না।
তার এতদিনের পরিশ্রম নিদ্রাহীন রাত অসংখ্য স্ট্রাগল আজ যেন সবকিছুর ফল সে হাতে পেল।
কিন্তু ঠিক তখনই—তিয়া চেয়ার ঠেলে দাঁড়িয়ে গেল।
তার চোখ দুটো রাগে লাল হয়ে আছে।
মুখমণ্ডল ক্রোধে কাঁপছে।

সে সরাসরি ইউভির দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলল—
— “What is this, Shehjad Uvi Chowdhury?”
(এটা কী, শেহজাদ ইউভি চৌধুরী?)
সবাই চমকে তার দিকে তাকাল।
তিয়া আবার বললআপনি আপনার ব্যক্তিগত জীবন আর ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত এক করে ফেলছেন অবশ্যই IVA-ই জিতবে কারণ ইনায়া নূর চৌধুরী আপনার স্ত্রী!পুরো মিটিং রুম মুহূর্তেই নীরব হয়ে গেল।পিয়াসার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
রেদওয়ানের ভ্রু কুঁচকে উঠল।
রাইহান চৌধুরী বিব্রত হয়ে বললেন—
— “তিয়া, স্টপ ইট!”
কিন্তু তিয়া থামল না।
এই সিদ্ধান্ত পক্ষপাতদুষ্ট!
তিয়া ক্রোধে কাঁপতে কাঁপতে আবার বলে উঠল—
সহানুভূতি দেখিয়েছেন! IVA ব্র্যান্ডের মান একদম খারাপ!ওরা কীভাবে ASU কোম্পানির সঙ্গে কাজ করার যোগ্যতা রাখে।তাহলে কি ধরে নেব ASU কোম্পানির খারাপ সময় শুরু হয়ে গেছে?
কথাটা শেষ হতেই মিটিং রুমের পরিবেশ মুহূর্তেই ভারী হয়ে উঠল।এতক্ষণ নিজেকে সংযত রাখা ইউভি আর স্থির থাকতে পারল না।
সজোরে হাত টেবিলের উপর আঘাত করতেই পুরো কনফারেন্স রুম কেঁপে উঠল।
সবাই চমকে ইউভির দিকে তাকাল।তার চোয়াল শক্ত হয়ে গেছে চোখ দুটো বরফশীতল।

—Enough is enough, Miss Tiya Chowdhury!
(যথেষ্ট হয়েছে, মিস তিয়া চৌধুরী!)
অনেকক্ষণ ধরে আপনার ভিত্তিহীন কথা শুনছি।এটা আপনার বাসা নয়।এটা ASU কোম্পানির অফিসিয়াল মিটিং রুম।ইউভি এবার ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এল।আর কী বললেন?আমি সহানুভূতি দেখিয়েছি?
ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল। ইউভির যদি IVA-কে নির্বাচন করার ইচ্ছে আমার আগেই থাকত।তাহলে আমি এই মিটিংয়ের আয়োজনই করতাম না।।প্রেজেন্টেশন, পণ্যের মূল্যায়ন, বাজার বিশ্লেষণ—কিছুরই প্রয়োজন হতো না।ইউভির কণ্ঠ আরও দৃঢ় হয়ে উঠল।ASU আবেগ দেখে নয়, যোগ্যতা দেখে পার্টনার নির্বাচন করে।
IVA জিতেছে কারণ তারা নিজেদের যোগ্য প্রমাণ করেছে।তাদের বাজার সম্প্রসারণের হার বেশি।
তাদের গ্রাহক ধরে রাখার সক্ষমতা বেশি।তাদের পণ্যের গ্রাহক প্রতিক্রিয়া উল্লেখযোগ্যভাবে ভালো।আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ইউভি ইনায়ার দিকে তাকিয়ে বললো।তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা আপনাদের চেয়ে অনেক শক্তিশালী।

পুরো রুমে চাপা গুঞ্জন শুরু হয়ে গেল।
ইউভি এবার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করল—
এবং হ্যাঁ।আমার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তও IVA কোম্পানির পক্ষে আজ থেকে IVA কোম্পিই হবে ASU কোম্পানির অফিসিয়াল বিজনেস পার্টনার।
তিয়ার মুখ মুহূর্তেই ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
ঠিক তখনই—ইনায়া ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।
মুখে শান্ত হাসি।
মাফ করবেন, আমি একটা কথা বলতে চাই।
ASU-এর সবাই তার দিকে তাকাল।
ইনায়া তিয়ার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললো তিয়া চৌধুরী, আপনি একটু আগে কী যেন বললেন?
IVA এর মান খারাপ? আমরা নাকি খারাপ পণ্য বিক্রি করি?তারপর একটু থেমে বললতাহলে তো বলতেই হয় আপনি ভীষণ লোভী।

কারণ টাকার জন্য আপনি বছরের পর বছর এই ‘খারাপ পণ্যের’ বিজ্ঞাপন করেছে হয়তো আপনি ভুলে গেছেন.IVA ব্র্যান্ডের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর ছিলেন আপনি নিজেই, মিস তিয়া চৌধুরী।
কথাটা শেষ হতেই পুরো মিটিং রুম স্তব্ধ হয়ে গেল।
কেউ কোনো কথা বলতে পারল না।কারণ কথাটা ছিল নির্মম সত্য।তিয়া নিজেই নিজের যুক্তির বিপরীতে দাঁড়িয়ে গেছে।আর দূরে বসে থাকা ইউভি…মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে আছে ইনায়ার দিকে।
তার ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে গর্বিত একটুখানি হাসি ফুটে উঠল।মনে মনে শুধু একটাই কথা বলল—
“That’s my Ador..
যুদ্ধটা তুই নিজেই জিততে শিখেছিস।
ইনায়ার কথার পর পুরো মিটিং রুম কয়েক সেকেন্ডের জন্য একদম নিস্তব্ধ হয়ে রইল।
তিয়ার মুখে কোনো উত্তর নেই।
কারণ সত্যের সামনে দাঁড়িয়ে অনেক সময় সবচেয়ে বড় যুক্তিগুলোও হার মেনে যায়।
ইউভি ধীরে ধীরে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল।
তারপর নিজের কোটের বোতাম লাগাতে লাগাতে শান্ত কণ্ঠে বলল আমার মনে হয় আজকের জন্য এতটুকুই যথেষ্ট।
এরপর সে সরাসরি রাইহান চৌধুরীর দিকে তাকাল।

—মিস্টার রাইহান চৌধুরী, আপনার সঙ্গে আমার কিছু গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক আলোচনা আছে।রাইহান চৌধুরী মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন।
তিয়া আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়িয়ে থাকল না।
অপমান আর পরাজয়ের ভার নিয়ে দ্রুত মিটিং রুম থেকে বেরিয়ে গেল।তার হাই হিলের শব্দ করিডোরে মিলিয়ে যেতেই পরিবেশটা যেন অনেকটা হালকা হয়ে উঠল।ধীরে ধীরে সবাই বেরিয়ে যেতে লাগল।
ASU-এর স্টাফরা পিয়াসা,রেদওয়ান,ইনায়া।
শেষে রুমে শুধু রইলেন ইউভি আর রাইহান চৌধুরী।

বেশ কিছু সময় পর মিটিং রুমের দরজা আবার খুলল।ইউভি আর রাইহান চৌধুরী একসাথে বেরিয়ে এল।করিডোরের একপাশে দাঁড়িয়ে ছিল ইনায়া, রেদওয়ান আর পিয়াসা।দূর থেকেই ইনায়াকে দেখতে পেল ইউভি।
আর এক মুহূর্তের জন্য তার চোখ স্থির হয়ে গেল মেয়েটার উপর ইনায়া ও একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি ইউভির দিকে
আজকের আত্মবিশ্বাসী ইনায়া আজকের দৃঢ়চেতা ইনায়া. আজকের সফল CEO ইনায়া নূর চৌধুরী.
যে কারণে এতদিন ইউভি নিজের অনুভূতিগুলো দূরে সরিয়ে রেখেছিল।যে কারণেন ইউভি কে। কঠিন হতে হয়েছিল।যে কারণে দূরে থাকতে হয়েছিল।আজ সেই অপেক্ষা সার্থক হয়েছে।
ইউভির বুকের ভেতর অদ্ভুত এক প্রশান্তি নেমে এলো।কিন্তু মুখে কিছুই প্রকাশ করল না।
এদিকে ইনায়া চোখ সরিয়ে রেদওয়ানের দিকে তাকিয়ে বললথ্যাংক ইউ, ভাইয়া।রেদওয়ান ভ্রু কুঁচকে বলল হঠাৎ থ্যাংক ইউ কেন?ইনায়া মৃদু হেসে বলল।কাল রাতে আমি কাজ সম্পূর্ণ না করেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।”বাকি কাজগুলো করে দেওয়ার জন্য। না হলে আজ এত সুন্দর প্রেজেন্টেশন দিতে পারতাম না।”
রেদওয়ান এবার সত্যিই অবাক হয়ে গেল।
“আমি?”আমি তো কিছুই করি নাই, বোনু!
ইনায়া থমকে গেল।তুমি করো নাই?”

— “না।”আর আমি তো করিনি। আমার একদম স্পষ্ট মনে আছে।”দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ হয়ে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে একই সঙ্গে মাথা ঘুরিয়ে সামনে তাকাল।সোজা ইউভির দিকে।
রেদওয়ানের ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল।
ইনায়ার চোখ বড় হয়ে গেল। বুঝতে আর বাকি রইল না তার এলোমেলো কাগজপত্র কে গুছিয়েছিল
ইউভি ধীরে ধীরে ইনায়াদের দিকে এগিয়ে এলো।
তার গম্ভীর মুখেও আজ এক অদ্ভুত তৃপ্তির ছাপ।
ইনায়ার সামনে এসে দাঁড়িয়ে মুচকি হেসে বলল—
— “Well done, Inaya Noor Chowdhury.”
আজ থেকে আপনি শুধু আমার লাইফ পার্টনার নন বিজনেস পার্টনার ও।দায়িত্বগুলো সুন্দরভাবে পালন করবেন আশা করি।ইনায়া ঠোঁটের কোণে ছোট্ট হাসি ফুটিয়ে বলল—
বিজনেস পার্টনার হিসেবে আমি পুরো একশো পারসেন্ট দিয়ে কাজ করব। কিন্তু লাইফ পার্টনার হিসেবে শূন্য পারসেন্ট ও পারব না।”কথাটা শুনে রেদওয়ান আর পিয়াসা মুখ চেপে হাসল।
আর ইউভি?

সে যেন আগেই এমন উত্তর আশা করেছিল।
হালকা হেসে বলল—ওইটা আমি একাই পারলে হবে।তারপর রেদওয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল—
রেদওয়ান, সন্ধ্যা ছয়টায় গার্ডেনে সবাইকে দেখতে চাই।এরপর পিয়াসার দিকে তাকিয়ে যোগ করল—
— “বোনু, তুইও থাকবি।”আজ তুইও অনেক ভালো পারফরম্যান্স করেছিস।আমি তোকে নিয়ে গর্বিত।
কথা শেষ করেই ইউভি পিয়াসাকে বুকে জড়িয়ে নিল।পিয়াসাও হাসিমুখে ভাইকে জড়িয়ে ধরল।
অন্যদিকে রেদওয়ান দুষ্টুমি করে ইনায়াকে নিজের কাছে টেনে নিয়ে বলল আমার বোনুও কিন্তু অনেক ভালো করেছে। ইনায়া হেসে ফেলল।

সন্ধ্যা ঠিক ছয়টা।
ম্যানশনের বিশাল গার্ডেন আলোয় ঝলমল করছে।
চারপাশের সাজানো ফুলগাছ আর ফোয়ারার পানির শব্দ পরিবেশটাকে আরও মনোরম করে তুলেছে।গার্ডেনের মাঝখানে গোল টেবিল ঘিরে বসে আছে চারজন।ইউভি,রেদওয়ান,ইনায়া আর পিয়াসা।আজকের আলোচনা শুধুই ব্যবসা নিয়ে।
চৌধুরী পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে।ইউভি টেবিলের উপর ছড়িয়ে থাকা ফাইলগুলোর দিকে তাকিয়ে বলল”আমরা অনেক দূর এসেছি।কিন্তু এখানেই থেমে থাকলে চলবে না।রেদওয়ান মাথা নেড়ে বলল ইউরোপিয়ান মার্কেটের পাশাপাশি এশিয়ান মার্কেটেও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে হবে। ইনায়া নিজের নোটপ্যাডে দ্রুত কিছু পয়েন্ট লিখতে লিখতে বলল—
— “IVA Brand-এর নতুন পণ্যের নতুন ধারা চালু করা যেতে পারে।আর online distribution আরও শক্তিশালী করা দরকার।
পিয়াসা ক্লান্ত মাখা কন্ঠে বলল
তোমরা তিনজন আবার সারারাত জাগার প্ল্যান করছো নাকি? সাথে সাথে সবাই হেসে উঠল।

ঠিক তখনই ইউভির ফোনে ভিডিও কল ভেসে উঠল।লিখন চৌধুরী।ইউভি সঙ্গে সঙ্গে কল রিসিভ করল।স্ক্রিনে একে একে ভেসে উঠল পুরো চৌধুরী পরিবার।সবার মুখেই আনন্দের হাসি।লিখন চৌধুরী গর্বিত কণ্ঠে বললেন মাশাআল্লাহ। আজ তোমাদের চারজনকে নিয়ে খুব গর্ব হচ্ছে। এক এক করে সবাই অভিনন্দন জানাতে লাগল।
কেউ ইনায়ার প্রশংসা করল কেউ রেদওয়ানের কেউ আবার ইউভি আর পিয়াসার।হাসি আর আনন্দে ভরে উঠল পুরো পরিবেশ।
তবে আজকের মিটিংয়ে তিয়া আর রাইহান চৌধুরীর ঘটনার কথা কেউই তুলল না।
আনন্দের দিনে সেই বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে চাইল না কেউ।আরও কিছুক্ষণ গল্প করার পর ইউভি কল কেটে দিল।

কিছুক্ষণ পর একজন গার্ড চার কাপ গরম কফি এনে টেবিলে রেখে গেল।
রেদওয়ান, পিয়াসা আর ইনায়া কফি খেতে শুরু করল।আলোচনাও চলতে লাগল সমান তালে।
ইনায়া নিজের কাপ থেকে কয়েক চুমুক কফি খেয়ে কাপটা টেবিলে রেখে দিল।ঠিক তখনই ইউভি খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে সেই কাপটা তুলে নিল।
এক চুমুক খেল।তারপর আবার কাপটা ইনায়ার সামনে এগিয়ে দিল।ইনায়া ভ্রু কুঁচকে ইউভির দিকে তাকাল।ইউভি ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি এনে চোখ টিপ দিল।সাথে সাথে ইনায়া হালকা কাশতে শুরু করল।পিয়াসা মুখ ফিরিয়ে হাসি চাপার চেষ্টা করছে।রেদওয়ানের অবস্থাও প্রায় একই।

শেহেজাদার আদর পর্ব ৪৫

কিছুক্ষণ পর ইনায়া আবার একই কাপ থেকে কফি খেল।আর কাপটা নামানোর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ইউভি আবার সেটা তুলে নিল।ঠিক আগের মতোই কফি খেল।
বার আর রেদওয়ান আর পিয়াসা নিজেদের সামলাতে পারল না।জনেই একে অপরের দিকে তাকিয়ে হাসতে লাগল।কিন্তু সবচেয়ে মজার বিষয় হলোইউভি আর ইনায়া দুজনের মুখেই কোনো কথা নেই।কেউ কাউকে কিছু বলছে না।
তবুও তাদের নীরবতার মধ্যেই যেন হাজারো কথা লুকিয়ে আছে।

শেহেজাদার আদর পর্ব ৪৭

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here