শেহেজাদার আদর পর্ব ৪৯
সুমাইয়া ইসলাম নূর
চৌধুরী ভিলার বিশাল হলরুমে তখনও নীরবতা বিরাজ করছে।সবার চোখ স্থির হয়ে আছে সিঁড়ির উপর দাঁড়িয়ে থাকা ইনায়ার দিকে।আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে সিঁড়ির রেলিংয়ে এক হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছে ইনায়া।অন্যদিকে ইউভি ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠছে।
ইনায়া ভ্রু তুলে ইউভির দিকে তাকিয়ে বলল—
এত ধীরে হাঁটছো কেন, মিস্টার চৌধুরী?
আমি কিন্তু অপেক্ষা করতে পছন্দ করি না।
কথাটা শুনে হলরুমের অনেকেই অবাক হয়ে একে অপরের দিকে তাকাল।
আর ইউভি?
তার ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে বিপজ্জনক সুন্দর একটা হাসি ফুটে উঠল।চোখ সরাসরি ইনায়ার চোখে রেখে বলল—
— আমিও না, মিসেস চৌধুরী।
কথাটা বলেই সে বাকি কয়েকটা ধাপ একসাথে উঠে গেল।পরের মুহূর্তেই সবার সামনে কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই ইনায়াকে দুই হাতে তুলে নিল কোলে।
হঠাৎ এমন ঘটনায় ইনায়া নিজেও চমকে উঠল।
— ইউভি ভাইয়া!
নিচে দাঁড়িয়ে থাকা সবাই দৃশ্যটা দেখলেও না দেখার ভান করল।লিখন চৌধুরী হঠাৎ করেই গলা খাঁকারি দিয়ে অন্যদিকে তাকালেন।রেদওয়ান মাথা নিচু করে হাসি চাপার ব্যর্থ চেষ্টা করতে লাগল।
পিয়াসা মুখ চেপে হাসছে।আর নুসরাত চৌধুরী তো সরাসরি সাবিহা চৌধুরীকে নিয়ে ডাইনিংয়ের দিকে হাঁটা দিলেন।যেন কিছুই দেখেননি।
কিন্তু একজন দেখছিল।
নিজের রুমের দরজার ফাঁক দিয়ে সবকিছু দেখছিল তিয়া চৌধুরী।তার চোখে তখন জ্বলছে তীব্র রাগ আর হিংসা।ইউভির চোখ এক ঝলক সেদিকে যেতেই সব বুঝে গেল।
সে ইচ্ছে করেই ইনায়াকে আরও শক্ত করে নিজের বুকে জড়িয়ে নিল।তারপর নিচু গলায় বলল—
— বুঝলে, বউ?
— এই কয়েকদিনে আমি অনেকগুলো অ্যালোভেরা গাছ লাগিয়েছি।ইনায়া অবাক হয়ে তাকাল।
— অ্যালোভেরা গাছ?
ইউভি গম্ভীর মুখে মাথা নাড়ল।
— হুম। কারণ তোমাকে আদর করার পর যেসব জায়গায় ব্যথা পাবে. সেখানে সুন্দর করে অ্যালোভেরা জেল লাগিয়ে দেব।কথাটা শুনে ইনায়ার চোখ মুহূর্তেই বড় হয়ে গেল।
এতক্ষণ যে মেয়েটা সাহসী আর আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে ছিল, সে এখন সত্যিই ভয় পেতে শুরু করেছে।কারণ ইউভি অস্বাভাবিকভাবে শান্ত।
আর ইউভি যত শান্ত থাকে…ততই ইনায়ার জন্য বিপদ।
ইনায়া মনে মনে শুধু একটাই কথা বলল—
“হায় আল্লাহ…লোকটা কি সবকিছু স্বাভাবিকভাবেই নিয়ে নিল?”ইউভি ইনায়াকে কোলে নিয়েই রুমের ভেতরে ঢুকল।পরের মুহূর্তেই—
ঠাস!
দরজাটা জোরে শব্দ করে বন্ধ হয়ে গেল।
করিডোরের অপর প্রান্তে নিজের রুমের দরজার ফাঁক দিয়ে সবকিছু দেখছিল তিয়া চৌধুরী।
দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দটা কানে যেতেই তার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।দাঁত চেপে মনে মনে বলল দরজাও লাগিয়ে দিল…
অন্যদিকে রুমের ভেতরে এসে ইউভি ইনায়াকে ছুরে ফেলে দিল বিছানায়।
কয়েক মুহূর্ত নীরবতা।
তারপর ইনায়া আমতা আমতা করে বলল—
ইউভি ভাইয়া.আমি আসলে একটু অভিনয় করছিলাম।ইউভি ভ্রু তুলল।
ইনায়া দ্রুত বলল ওই তিয়াকে দেখানোর জন্য।
ইচ্ছা করে বলেছি আপনার রুমে থাকব। মানে… কিছুদিন তো থাকতেই হবে। মা, বড় মা আর সেজো মা আমার রুমটা তিয়াকে দিয়ে দিয়েছে।
কথাগুলো বলতে বলতে তার মুখটা গম্ভীর হয়ে গেল। আচ্ছা ইউভি ভাইয়া.. ওরা একবারও আমার কথা ভাবল না?আমি তো ছোটবেলা থেকে ওই রুমে থাকি। ওই রুমটা আমার সবচেয়ে প্রিয়।
তাহলে কীভাবে ওখানে অন্য কাউকে থাকতে দিল?
তার কণ্ঠ ধীরে ধীরে কেঁপে উঠল।
মেয়ে একটা কে। পেয়েই সবাই আমাকে ভুলে গেল.. সবাই শুধু আমাকে কষ্ট দিতে পারে…
ইনায়া চোখ তুলে ইউভির দিকে তাকাল।
আপনার মতো..আপনিও তো আমাকে দূরে সরিয়ে দিয়েছিলেন।
ইউভি তখনও চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে।একটা শব্দও বলছে না। শুধু স্থির চোখে মেয়েটার সব কথা শুনছে।
ইনায়া কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। কি হলো কিছু বলছেন না কেন
তারপর ধীরে ধীরে ইউভির শার্টের একটা অংশ মুঠো করে ধরে কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বলল—
ইমোশনাল একটা মেয়ে থেকে Heartless একটা মেয়ে হওয়ার journey এতটাও সহজ ছিল না।
সব কষ্টগুলো রুহ পর্যন্ত গিয়ে রুহটাকে ছারখার করে দিতে দিতে আজ আমি এই জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছি। তবে এই পরিবর্তনের পুরো credit আমার নয়…আমার খুব কাছের কিছু মানুষের।
অথচ জীবনটা ছিল ভীষণ শখের… ভীষণ সুন্দর কিছু স্বপ্নে সাজানো।
ইনায়া চোখ নামিয়ে ফিসফিস করে বলল—
ইউভি ভাইয়া… আমি যে খুব ক্লান্ত…
একবার জড়িয়ে ধরুন না আমাকে।
শক্ত করে জড়িয়ে ধরুন।আপনার স্নেহভরা আদরে একটু শান্তি খুঁজে নিতে চাই।
— আপনার আদর যে বড্ড ক্লান্ত…ইউভি ভাইয়া
কথাগুলো শেষ হওয়ার আগেই ইউভি আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করল না।এক ঝটকায় ইনায়াকে নিজের বুকের মধ্যে টেনে নিল।
এমনভাবে—
যেন বহুদিনের হারিয়ে যাওয়া নিজের সবচেয়ে প্রিয় মানুষটাকে আবার ফিরে পেয়েছে।তার বাহুর বন্ধন ধীরে ধীরে আরও শক্ত হয়ে উঠল।
কয়েক সেকেন্ড শুধু নীরবতা।তারপর নিচু গলায় বলল—
— সরি, আদর..তোকে Ignore করার জন্য সরি।
হয়তো তুই ভেবেছিস তুই আমার থেকে দূরে সরে গেছিলি। কিন্তু আসল সত্যিটা হলো. আমি নিজেই ইচ্ছে করে তোর থেকে দূরে দূরে ছিলাম।
ইনায়া বিস্মিত হয়ে তাকাল।
ইউভি মৃদু হেসে বলল আমি চাইনি তোর সব অভিমান ভেঙে দিতে। চাইছিলাম তুই শক্ত হ।
আমি যদি আগের মতো সবসময় তোর পাশে থাকতাম…তাহলে তুই সবসময় আমাকে নিয়েই পড়ে থাকতিস। নিজের স্বপ্ন, নিজের লক্ষ্য, নিজের যুদ্ধগুলো লড়তে শিখতিস না।তোর ভেতরে এই জেদটা জন্ম নিত না।সে আলতো করে ইনায়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।
— আর একটা কথা ভালো করে শুনে রাখ বিয়াদোব
তুই চাইলে ও তোকে কোনোদিন আমায় থেকে দূরে থাকতে দিব না। তুই চাইলে ও তুই আমার তুই না চাইলে ও আমার।
— তোকে বুকের মধ্যে আগলে রাখার তৃষ্ণা আমাকেও প্রতিদিন কুরে কুরে খেয়েছে।
কথাগুলো বলে সে আবার ইনায়াকে শক্ত করে নিজের কাছে টেনে নিল।তারপর ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি ফুটিয়ে বলল—
আচ্ছা মিসেস চৌধুরী. আর একবার বলো তো?
শোনো না, একটু দরকার আছে। রুমে আসো…”
ইনায়া মুহূর্তেই লজ্জায় লাল হয়ে গেল।
সে মুখ লুকিয়ে ইউভির বুকে মাথা গুঁজে দিল।
তারপর আস্তে করে ইনায়া হঠাৎ ইউভির বুক থেকে সরে এলো।পরের মুহূর্তেই ধপ করে ইউভিকে বিছানার উপর ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়ে ভ্রু কুঁচকে দুই হাত কোমরে রেখে বলল—
আপনি খুবই স্বার্থপর, মিস্টার ইউভি চৌধুরী!
ইউভি ভ্রু তুলে তাকাল।
— তাই নাকি?ইনায়া সঙ্গে সঙ্গে মাথা নেড়ে বলল—
অবশ্যই! আমি তো আপনাকে Ignore করিনি!
আমি শুধু চুপ ছিলাম।দেখতে চেয়েছিলাম আমার সাথে কথা বলার জন্য আপনি কতটা effort দেন।
কতটা চেষ্টা করেন কতটা অস্থির হন।
কিন্তু না.আপনিও আমার সাথে কথা বলতেন না।
একবারও এসে জিজ্ঞেস করেননি আমি কেমন আছি। একবারও আমার মান-অভিমান ভাঙাতে আসেননি।ইনায়ার গলা ধীরে ধীরে ভারী হয়ে এলো।
আমিও জেদ করে চুপ ছিলাম আর আপনিও চুপ ছিলেন।ইউভি কিছুক্ষণ চুপচাপ তার বিয়াদোব বউ টার কথা শুনল।তারপর হঠাৎ হাত বাড়িয়ে ইনায়ার কবজি ধরে টেনে নিজের কাছে হেচকা টানে নিয়ে এলো।ভারসাম্য হারিয়ে ইনায়া সোজা এসে তার বুকের উপর পড়ে গেল।
চমকে উঠে বলল ইউভি ভাইয়া!
ইউভির ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠল।
— শেষ? নাকি অভিযোগের লিস্টে আরও আছে।
ইনায়া মুখ ফুলিয়ে ইউভির দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর হঠাৎ পাশের বালিশটা তুলে সোজা ইউভির দিকে ছুড়ে মারল। আপনার তো খুব ভালো লাগে!
ইউভি অবাক হয়ে বললো।কী ভালো লাগে?
অন্য মেয়েদের জড়িয়ে ধরতে!আরেকটা বালিশ তুলে আবার ছুড়ে মারল সে।ইউভি এবার সহজেই বালিশটা ধরে ফেলল।ভ্রু তুলে বললো ও আচ্ছা!
তাই নাকি? তোরও তো খুব ভালো লাগে!
অন্য কেউ “ডল” বললে তো দেখেছি খুব খুশি হয়ে যাস!কথা শেষ করেই সেও বালিশটা ছুড়ে মারল।
বালিশটা গিয়ে সরাসরি ইনায়ার মুখে লাগল।
— ইউভি ভাইয়া!সাহস তো কম না আপনার!
ইনায়া এবার বিছানার উপর উঠে দাঁড়িয়ে গেল।
হাতে আরেকটা বালিশ।আজকে আপনার খবর আছে।ইউভি হেসে বলল—
— আয় দেখি। কী করতে পারিস!
পরের মুহূর্তেই শুরু হয়ে গেল বালিশ যুদ্ধ। সুযোগ পেলে দুজনে পাল্টা আক্রমণ করছে দুজনের ।
ইনায়া রাগী কন্ঠে বলল। আপনাকে যখন জড়িয়ে ধরল তখন কিছু বলেননি কেন?
— হ্যাঁ?
বলেননি কেন?
ইউভি একটা বালিশ দিয়ে নিজের মাথা বাঁচাতে বাঁচাতে বললো কী বলেছি, না বলেছি, সেটা তোকে জানতে হবে নাকি? বেয়াদব একটা!
ইনায়া সঙ্গে সঙ্গে আরেকটা বালিশ ছুড়ে মারল।
মিথ্যা কথা! আপনি চুপ করে ছিলেন!
আমি নিজের চোখে দেখেছি!ইউভি এবার ইনায়াকে নিজের বুকের উপর হেঁচকা টানে নিয়ে নিলো
— কোন চোখ দিয়ে দেখেছিস তুই? আয়! আজই সেই চোখ ঠিক করে দিই!
বেয়াদব মেয়ে!আমাকে জেরা করছে!
ইনায়া হেসে ফেলল।কিন্তু যুদ্ধ থামল না।
আরও কয়েক মিনিট ধরে পুরো রুমজুড়ে চলল বালিশ ছোড়াছুড়ি।একসময় বালিশের কভার খুলে গেল।সাদা তুলা উড়তে শুরু করল চারদিকে।
দেখতে দেখতে পুরো রুম যেন তুলার মেঘে ভরে গেল।মেঝে বিছানা..সোফাইসব জায়গায় শুধু সাদা সাদা তুলা।অবশেষে দুজনেই হাঁপিয়ে গেল।
ইনায়া শেষ বালিশটা ছুড়ে মেরে বলল—
আর পারছি না!ধপাস!সে সোজা বিছানার উপর শুয়ে পড়ল।ইউভিও কয়েক সেকেন্ড পর ধপ করে তার পাশে শুয়ে পড়ল।দুজনেই হাঁপাচ্ছে।
কয়েক মুহূর্ত শুধু নীরবতা পালন করলো দুজনে
তারপর ইউভি আলতো করে হাত বাড়িয়ে ইনায়াকে নিজের বুকের মধ্যে টেনে নিল।ইনায়াও কোনো বাধা দিল না।চুপচাপ মাথাটা তার বুকে রেখে দিল।
ইউভি তার এলোমেলো চুলগুলো সরিয়ে দিয়ে ছোট্ট করে বলল আমার বেয়াদব বউ..ইনায়া চোখ বন্ধ করেই মুচকি হাসল।তারপর আস্তে করে বলল—
— আপনারি বেয়াদব বউ।
চৌধুরী ভিলার সকালটা আজ অন্যরকম প্রাণবন্ত।
বিশাল ডাইনিং রুমে প্রায় পুরো চৌধুরী পরিবার একসাথে বসেছে। টেবিলজুড়ে সাজানো নানা ধরনের খাবার। গরম পরোটা, অমলেট, ফল, জুস আর কফির সুবাসে ভরে আছে চারপাশ।
আজ সবাই অফিসে যাবে।টেবিলের একপাশে বসে নাস্তা করছেন ইউভি, রেদওয়ান, রাতিব চৌধুরী, রবিউল চৌধুরী আর লিখন চৌধুরী। ব্যবসার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে নিজেদের মধ্যে কথা বলছেন তারা।ঠিক তখনই সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামলেন রাইহান চৌধুরী আর তিয়া।
আজ থেকে তিয়াও অফিসে যাবে।তিয়াকে দেখেই রেদওয়ান নিচু গলায় ইউভির কানের কাছে ফিসফিস করে বলল—ভাইয়া…
— শয়তান আর শয়তানের বাচ্চা হাজির।
নাটক দেখার জন্য বসে থাকো।ইউভির ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল। আজকে আবার কী করে দেখি।
ওদিকে…
ইউভির রুমের সামনে এসে দাঁড়াল পিয়াসা।
দরজার দিকে তাকিয়ে জোরে বলল—
বেবি।ব্রেকফাস্ট করতে আয় ভেতর থেকে সঙ্গে সঙ্গে উত্তর এলো Just five minutes baby!
পিয়াসা নিচে তাকাতেই দেখতে পেল তিয়া ডাইনিং টেবিলের দিকে যাচ্ছে।
মুহূর্তেই মুখটা কুঁচকে গেল তার।
— ধুর! বাল যাব নিচে! তিয়া নিচে গেছে খেতে।
আমি আর তুই পরে খাব।কথাটা শুনে ভেতরে থাকা ইনায়াও রেগে গেল।কিন্তু পরের মুহূর্তেই তার ঠোঁটে শয়তানি হাসি ফুটে উঠল।
ওহ বেবি…এক মিনিট। আমি আসছি।
কয়েক মিনিট পর ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এলো ইনায়া।তার চুল পুরো ভেজা।
হাতে তোয়ালে।
চুল মুছতে মুছতে বললো চল।পিয়াসা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো।রাতে লাল পানি খেয়ে ঘুমাইছিলি নাকি? বলদের মতো এই সকালে গোসল করে আসলি কেন?ইনায়া শুধু রহস্যময় হাসল।
কে গোসল করছে শুধু চুল ভিজিয়েছি।
চল তো।পরে বুঝবি।
দুজন ফোন স্ক্রল করতে করতে নিচে নামল।
তাদের দেখেই লিখন চৌধুরীর মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। এই তো আয় মা আজ অনেকদিন পর পুরো চৌধুরী পরিবার একসাথে ব্রেকফাস্ট করব।
পিয়াসা আর ইনায়া মুচকি হেসে এগিয়ে গেল।
কিন্তু তারা বসার আগেই তিয়ার নাটক শুরু হয়ে গেল।তিয়া মুখ বাঁকিয়ে নুসরাত চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে বলল মেঝো মা.. আমাকে একটু খাইয়ে দিবেন?
তারপর চোখে পানি আনার ভান করে বললো ছোটবেলা থেকে মায়ের আদর থেকে বঞ্চিত হয়েছি। তোমরা ঠিক আমার মায়ের মতো আদর করো। খুব ভালো লাগে। একটু খাইয়ে দিবে?
নুসরাত চৌধুরী সঙ্গে সঙ্গে মায়াভরা গলায় বললেন অবশ্যই দিবো মা। কেন দিবো না?
তারপর নিজের হাতে তিয়াকে খাওয়াতে শুরু করলেন।দৃশ্যটা দেখে পিয়াসা আর ইনায়া একবার একে অপরের দিকে তাকাল।তারপর একবার ইউভি আর রেদওয়ানের দিকে।ইউভি তখন নিজের বেয়াদব বউটার দিকেই তাকিয়ে আছে।
মনে মনে ভাবছে এত সকালে গোসল করল কেন ওই বিয়াদোব কি বুঝতে চাচ্ছে ও
”
আর ঠিক তখনই ইনায়া নিজের ভেজা চুলগুলো হালকা ঝাঁকিয়ে দিল।ছিটকে যাওয়া পানির ফোঁটাগুলো সোজা গিয়ে পড়ল তিয়ার মুখে।
তিয়া মুহূর্তেই থমকে গেল।মুখের হাসিটাও উধাও।
নুসরাত চৌধুরী অবাক হয়ে বললেন—
এ কী নূর! চুল ভালো করে মুছিসনি কেন?
লন্ডন গিয়ে রোজ সকালে গোসল করার অভ্যাস হয়েছে? ভালো করে চুল মুছ।ইনায়া সম্পূর্ণ ঠান্ডা গলায় উত্তর দিল
মা…তুমি যা করছো তাই করো। আমি আমারটা দেখে নেব।কথাটা বলে আবার নিজের ভেজা চুলগুলো কাঁধের উপর ছড়িয়ে দিল।
সকালবেলার আলোয় তার হালকা লালচে ভেজা চুলগুলো আরও সুন্দর লাগছে। আর সেই দৃশ্য কেউ একজন দেখছে মুগ্ধ হয়ে আর সেটাই তিয়ার হিংসাকে কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিল।
তার চোখ অনিচ্ছাসত্ত্বেও বারবার ইনায়ার দিকে চলে যাচ্ছে। রাগে নিজের চুল মুঠ করে ধরে আছে বেচারি।
ওদিকে কয়েক সেকেন্ড চুপ থাকার পর হঠাৎ পিয়াসা পুরো বিষয়টা বুঝতে পারল।
প্রথমে ঠোঁট চেপে হাসি আটকানোর চেষ্টা করল।
তারপর আর পারল না। হাহাহাহাহা!এমন জোরে হেসে উঠল যে পুরো ডাইনিং রুম তার দিকে তাকাল।রেদওয়ান ভ্রু কুচকে। বলল—
কী হলো পিহু?পিয়াসা হাসতে হাসতেই বলল—
কিছু না!
কথাটা শুনে ইউভির চোখ গিয়ে আটকাল ইনায়ার উপর।আর ইনায়া?
সে সম্পূর্ণ নির্দোষ মুখ করে জুস খেতে শুরু করেছে।যেন কিছুই হয়নি।ইউভি মাথা নিচু করে হাসি চাপল।
তার বউটা যে ইচ্ছে করেই এই কাজ করেছে…
সেটা সে খুব ভালো করেই বুঝে গেছে।
তিয়ার মুখটা তখনো রাগে লাল হয়ে আছে।
ভেজা চুলের পানি মুখে লাগার পর থেকে তার খাওয়ার স্বাদটাই নষ্ট হয়ে গেছে।
হঠাৎ চামচটা টেবিলে নামিয়ে রেখে বলল—
আমার পেট ভরে গেছে, মেজো মা।
আমি আর খাব না।নুসরাত চৌধুরী অবাক হয়ে বললেন এই তো একটু আগে বললি অনেক ক্ষুধা লেগেছে!তিয়া জোর করে হাসল না মেজো মা, সত্যি পেট ভরে গেছে।
তারপর রাইহান চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে মিষ্টি গলায় বলল বাপি, আমার খাওয়া শেষ।আমি অফিসে গেলাম।রাইহান চৌধুরী স্নেহভরা গলায় বললেন—
ঠিক আছে মা। সাবধানে যেও।তিয়া মাথা নেড়ে উঠে দাঁড়াল।কিন্তু যাওয়ার আগে একবার ইনায়ার দিকে তাকাল।আর ইনায়া?
সে তখন সম্পূর্ণ নির্লিপ্ত মুখে নিজের জুস খাচ্ছে।
যেন কিছুই হয়নি।দৃশ্যটা দেখে ইউভি, রেদওয়ান আর পিয়াসা মুখ নিচু করে মুচকি মুচকি হাসতে লাগল।বিশেষ করে পিয়াসার অবস্থা সবচেয়ে খারাপ।হাসি আটকাতে গিয়ে বারবার কাশছে।
ওদিকে লিখন চৌধুরী, রাতিব চৌধুরী আর রবিউল চৌধুরীরও নাস্তা শেষ।
তারা উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললেন আচ্ছা, আমরা বের হলাম। তোরা পরে আয়।রেদওয়ানও উঠে দাঁড়াল।কোটের বোতাম লাগাতে লাগাতে বলল—
ঠিক আছে বড় চাচ্চু।ইউভিও চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল।কালো স্যুটে তাকে আজ আরও বেশি গম্ভীর লাগছে।রেদওয়ানের নেভি ব্লু স্যুটদুই ভাই পাশাপাশি দরজার দিকে এগিয়ে গেল।যাওয়ার সময় ইউভি একবার আড়চোখে নিজের বেয়াদব বউটার দিকে তাকাল।ইনায়াও ফোন স্ক্রল করতে করতে এক সেকেন্ডের জন্য তাকিয়ে আবার চোখ নামিয়ে নিল।
ইউভির ঠোঁটের কোণে অদৃশ্য হাসি ফুটে উঠল।
তারপর দুই ভাই অফিসের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেল।
কিছুক্ষণ পর…
ডাইনিং রুম প্রায় ফাঁকা।
পিয়াসা হঠাৎ ইনায়ার দিকে তাকিয়ে হাত উঁচু করল বেবি ইনায়াও সঙ্গে সঙ্গে হাত বাড়িয়ে দিল।
দুজনের হাই-ফাইভের শব্দে চারপাশ কেঁপে উঠল।
পিয়াসা হেসে বলল—
বেবি!যা দিলি!একদম জায়গামতো লাগছে!
ইনায়া ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল—এখনও তো কিছুই করিনি। এটা শুধু ট্রেইলার ছিল। বাকি খেলা দুপুরে হবে।
পিয়াসা আবার হেসে উঠল।
ঠিক তখনই রেশমা চৌধুরী, নুসরাত চৌধুরী আর সাবিহা চৌধুরী তাদের সামনে এসে দাঁড়ালেন।
তিনজনের মুখেই চিন্তার ছাপ।নুসরাত চৌধুরী চেয়ার টেনে বসে বললেন কী হয়েছে তোদের?
কাল রাত থেকে ঠিকমতো কথা বলছিস না কেন?
সাবিহা চৌধুরীও বললেন— হ্যাঁ মা।
— কিছু কি হয়েছে?পিয়াসা চুপ করে রইল।
আর ইনায়া?সে ধীরে ধীরে ফোনটা টেবিলের উপর রাখল।তারপর সম্পূর্ণ গম্ভীর গলায় বলল—
কিছু না। তোমরা আগে তোমাদের নতুন মেয়েকে কেয়ার করো। তারপর না হয় আমাদের দুইজনের কথা ভাববে।
কথাটা শুনে তিনজনই থমকে গেলেন।
রেশমা চৌধুরী কপাল কুঁচকে বললেন—
— নূর… এসব কী বলছিস? মেয়েটার মা নাই
ইনায়া মৃদু হেসে বললো ভুল তো কিছু বলিনি মা। আমার রুমটা কত বছরের? ছোটবেলা থেকে আমি ওই রুমে থাকি। ওই রুমের প্রতিটা জিনিস আমার নিজের হাতে সাজানো।একটু থেমে আবার বললো ইনায়া। একবারও কি মনে হয়নি…আমি ফিরে এলে কেমন লাগবে?
— একবারও কি কেউ ভাবল না?
পিয়াসাও এবার মুখ গম্ভীর করে বলল—
চৌধুরী ভিলাই কী রুম কম পরছে।
অন্যদিকে চৌধুরী ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যান্ড কোম্পানি আজ যেন আরও বেশি ব্যস্ত।আজকের মিটিংটা খুব গুরুত্বপূর্ণ।পুরো কোম্পানির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা সকাল থেকেই প্রস্তুতি নিচ্ছেন।কর্মচারীরা ফাইল, প্রেজেন্টেশন আর রিপোর্ট নিয়ে এদিক-সেদিক ছুটে বেড়াচ্ছে।টপ ফ্লোরের বিশাল কনফারেন্স রুমটাও ইতোমধ্যেই প্রস্তুত।লম্বা কালো কনফারেন্স টেবিল।
চারপাশে অত্যাধুনিক ডিজিটাল স্ক্রিন।
দেয়ালে কোম্পানির বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অর্জনের ছবি।পরিবেশটায় এক ধরনের ক্ষমতা আর আভিজাত্যের ছাপ স্পষ্ট।
এক এক করে মিটিং রুমে প্রবেশ করলেন লিখন চৌধুরী, রাতিব চৌধুরী, রবিউল চৌধুরী আর রাইহান চৌধুরী।তাদের ঠিক পাশেই বসে আছে ইউভি চৌধুরী আর রেদওয়ান চৌধুরী।
ইউভির পরনে ব্ল্যাক শার্ট ব্ল্যাক স্যুট ।
সামনে রাখা ফাইলগুলো মনোযোগ দিয়ে দেখছে।
আর রেদওয়ান নেভি ব্লু স্যুটে যথারীতি আত্মবিশ্বাসী আর ব্যক্তিত্বময় লাগছে দুজন কেই অন্যপাশে বসে আছে তিয়া চৌধুরী।
আজ তার পরনেও কালো বিজনেস স্যুট।
মুখে আত্মবিশ্বাসী ভাব আনার চেষ্টা করলেও ভেতরে ভেতরে সে অদ্ভুত অস্থির।ধীরে ধীরে সিনিয়র স্টাফরাও নিজেদের জায়গায় বসে পড়লেন।সবাই অপেক্ষা করছে মিটিং শুরু হওয়ার।
ঠিক তখনই…
মিটিং রুমের বিশাল কাঁচের দরজাটা খুলে গেল।
ঠক ঠক…টক…
হাই হিলের শব্দ পুরো রুমে প্রতিধ্বনিত হলো।
মুহূর্তের মধ্যে সবার দৃষ্টি দরজার দিকে ঘুরে গেল।
আর পরের মুহূর্তেই পুরো রুম নিস্তব্ধ হয়ে গেল
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে—
ইনায়া নূর চৌধুরী।
পিয়াসা জান্নাত চৌধুরী।
দুজনকে দেখে মনে হচ্ছে যেন আন্তর্জাতিক কোনো বিজনেস সামিট থেকে সরাসরি এখানে চলে এসেছে।ইনায়ার পরনে অফ-হোয়াইট বিজনেস স্যুট।ভেতরে ব্ল্যাক সিল্ক শার্ট।হাতে ডায়মন্ড ডায়ালের ঘড়ি।হালকা লালচে চুলগুলো সুন্দর করে বাঁধা।চোখে আত্মবিশ্বাস আর দৃঢ়তার মিশ্রণ।
অন্যদিকে পিয়াসার পরনে ব্ল্যাক প্যান্টস্যুট।
চুলগুলো পরিপাটি করে বাঁধা।হাতে ট্যাবলেট আর কিছু গুরুত্বপূর্ণ ফাইল।মুখে সেই চিরচেনা আত্মবিশ্বাসী হাসি।দুজন পাশাপাশি হেঁটে ভেতরে প্রবেশ করল।তাদের হাঁটার ভঙ্গি, আত্মবিশ্বাস আর ব্যক্তিত্ব।
মুহূর্তের জন্য পুরো মিটিং রুম নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
কয়েকজন সিনিয়র কর্মকর্তা অবাক হয়ে একে অপরের দিকে তাকালেন।কারও কারও মুখে স্পষ্ট বিস্ময়।
লিখন চৌধুরীর চোখে গর্বের ঝিলিক ফুটে উঠল।
রবিউল চৌধুরী মুচকি হেসে মাথা নাড়লেন।
রাতিব চৌধুরী ফিসফিস করে বললেন বিশ্বাসই হচ্ছে না…ছোট ছোট মেয়েগুলো কবে এত বড় হয়ে গেল!
রেদওয়ানের ঠোঁটে গর্বিত হাসি ফুটে উঠল।
আর ইউভি?সে কয়েক সেকেন্ড স্থির দৃষ্টিতে শুধু ইনায়ার দিকে তাকিয়ে রইল।
তার চোখে এমন এক গর্ব.যেটা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।
মনে মনে বললো ভয়ংকর জেদি তুই
অন্যদিকে তিয়ার মুখের রং ধীরে ধীরে বদলে যেতে লাগল।সে ভেবেছিল আজ অফিসে সবার নজর থাকবে তার উপর।কিন্তু বাস্তবতা হলো—
ইনায়া আর পিয়াসা প্রবেশ করার পর থেকে পুরো রুমের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে গেছে তারা।
তিয়া দাঁত চেপে বসে রইল।আর ইনায়া?
সে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে টেবিলের সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলল—
শেহেজাদার আদর পর্ব ৪৮
— Sorry everyone.
— একটু দেরি হয়ে গেল।
তারপর ঠোঁটের কোণে ছোট্ট হাসি ফুটিয়ে বলতে শুরু করল আমরা আজ থেকে চৌধুরী ইন্ডাস্ট্রি অ্যান্ড কোম্পানিতে ইন্টার্ন হিসেবে জয়েন করছি।
পিয়াসা হালকা হাসল, তারপর গর্বিত কণ্ঠে বললো
— আমি পিয়াসা জান্নাত চৌধুরী।
ইনায়া সঙ্গে সঙ্গে বললো
— আর আমি ইনায়া নূর চৌধুরী।
