Home শেহেজাদার আদর শেহেজাদার আদর শেষ পর্ব

শেহেজাদার আদর শেষ পর্ব

শেহেজাদার আদর শেষ পর্ব
সুমাইয়া ইসলাম নূর

সকাল হতেই পুরো চৌধুরী পরিবার ব্যস্ত হয়ে উঠেছে। আজ সবাই ইচ্ছের বাড়িতে যাবে। সেখানেই আজকের জন্য আয়োজন করা হয়েছে এক জমজমাট পিকনিকের। একে একে বাড়ির সবাই নিচের ড্রয়িংরুমে জড়ো হতে শুরু করেছে। লিখন চৌধুরী, রাতিব চৌধুরী, রোবিউল চৌধুরী ও রাইহান চৌধুরী আড্ডায় মেতে উঠেছেন। সবার  হাতে সকালের খবরের কাগজ আর  ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ। খবরের কাগজ পড়ার ফাঁকে ফাঁকে চলছে চার ভাইয়ের  হাসি-ঠাট্টা আর জমিয়ে আড্ডা। চারপাশের পরিবেশটা যেন সকাল থেকেই আনন্দের আমেজে ভরে উঠেছে।

ঠিক তখনই সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে দেখা গেল ইউভি ইনায়া আর ইচ্ছেকে।  ইচ্ছে ভোর হতেই তার মা-বাবার কাছে ফিরে গিয়েছিল মা বাবাকে  পেয়ে একেবারে খুশিতে আত্মহারা। বাবার বুকের ওপর মাথা রেখে আপনমনে আঁকিবুঁকি  করতে করতে খেলছে সে। ইউভিও মেয়েকে বুকের সঙ্গে নিয়ে নিচে নামছে। তাদের পেছন পেছন পিয়াসা, রেদোয়ান ও প্রণয়ও প্রস্তুত হয়ে নিচে নেমে এলো।

অন্যদিকে বাড়ির তিন গিন্নি তখন পিকনিকের সব আয়োজন গুছিয়ে নেওয়ার কাজে ব্যস্ত। হেল্পিং হ্যান্ডদের সঙ্গে নিয়ে  কোন জিনিস কোথায় যাবে, কী কী সঙ্গে নিতে হবে সবকিছু নিজেরা দাঁড়িয়ে থেকে তদারকি করছেন।  ঠিক সেই সময় রিটা এসে উপস্থিত হলো। ইউভি রিটার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল সব ঠিক আছে তো, রিটা?রিটা সঙ্গে সঙ্গে মাথা নেড়ে বলল সব ওকে, স্যার।এরপর কিছুক্ষণ পর রিমঝিম রৌদিককে সঙ্গে নিয়ে নিচে নেমে এলো। তাদের সঙ্গে ছিল তুবা, রাজ্জো ও তুর্য সবাইকে একসঙ্গে নিচে আসতে দেখে লিখন চৌধুরী সবার দিকে তাকিয়ে বললেন সবাই চলে আসছো?

ঠিক তখনই আয়াত আর আতিকা দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে নামতে একসঙ্গে বলে উঠল নো, চাচ্চু! আমরা দুজন আসছি!দুজনকে সিঁড়ি বেয়ে ছুটে নিচে নামতে দেখে উপস্থিত সবাই মুগ্ধ হয়ে তাদের দিকে তাকিয়ে রইল। দুজনের পরনেই একই রকম দুটি বেগুনি রঙের গাউন। হালকা কোঁকড়ানো চুল দুজনেই খোলা রেখেছে  চুলের মধ্যে গুঁজে রাখা কাঠগোলাপের ক্লিপ।  দুজনের হাতে দুটো বেতের ঝুড়ি  । সবাইকে একে একে নিচে আসতে দেখে ইউভি চারদিকে চোখ বুলিয়ে বলল।ছোট নবাব কই?

ইউভির কথা শেষ হতে না হতেই সিঁড়ি দিয়ে টুংটাং শব্দ তুলে একটি বক্স বাজাতে বাজাতে নিচে নামতে দেখা গেল রিদকে। পরনে সাদা টি-শার্ট  কালো থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট গলায় হেডফোন পায়ে সাদা জুতা পরেছে  আর মাথায় ক্যাপ পরেছে সব মিলিয়ে  রিদের মধ্যে যেন একেবারে রকস্টারের ভাইব ফুটে উঠেছে সে বক্সটা বাজাতে বাজাতে সবার সামনে এসে দাঁড়িয়ে  বলল পিকনিকে বক্স না বাজলে ফিল হবে না! ইউভি হাসতে হাসতে বললো চলো ছোট নবাব।

.

একে একে সবাই নিজেদের নির্ধারিত গাড়িতে উঠে রওনা দিল ইচ্ছের  ভিলার উদ্দেশে। ইউভি ইনায়া ও  ইচ্ছে উঠল একটি গাড়িতে। তাদের সঙ্গে অন্য গাড়িতে রওনা দিল রেদোয়ান পিয়াসা ও প্রণয়। রাজ্জো তুর্য ও পিয়াসা আরেকটি গাড়িতে উঠল। লিখন চৌধুরী ও রেশমা চৌধুরী উঠলেন একটি গাড়িতে  আর রাতিব চৌধুরী নুসরাত চৌধুরী ও রিদ উঠল অন্য একটি গাড়িতে। রোবিউল চৌধুরী, সাবিহা চৌধুরী, আয়াত ও আতিকা একসঙ্গে একটি গাড়িতে রওনা দিল। আরেকটি গাড়িতে ছিল রিমঝিম ও রৌদিক। একের পর এক  গাড়িগুলো চৌধুরী পরিবারের ভিলার  গেট পেরিয়ে বেরিয়ে এলো, তখন পুরো বহরটির সামনে পেছনে ছিল সুসজ্জিত বডিগার্ডদের গাড়ি। বাংলাদেশের অন্যতম প্রভাবশালী ও বিত্তশালী ব্যবসায়ী পরিবারের বহর রাস্তায় চলতে থাকা সেই সারি সারি দামি গাড়ি আর নিরাপত্তার বিশাল আয়োজন দেখে যে কারও চোখ আটকে যাওয়ার মতো অবস্থা  সামনে ও পেছনে বডিগার্ডদের গাড়ি, মাঝখানে  চৌধুরী দের  গাড়িগুলো সব মিলিয়ে পুরো বহরটিই ছিল চোখ ধাঁধানো।

ব্যস্ত শহরের কোলাহল   যানজট আর উঁচু উঁচু ভবন পেরিয়ে ধীরে ধীরে শহরের ব্যস্ততা পেছনে ফেলে এগিয়ে চলল গাড়িগুলো। বেশ কিছুক্ষণ পর একে একে সবাই এসে পৌঁছাল ইচ্ছের নতুন ভিলার সামনে। গাড়িগুলো থামতেই সবাই নেমে চারপাশে তাকিয়ে যেন কিছুক্ষণের জন্য বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। বাড়িটিকে ঘিরে চারদিকে যতদূর চোখ যায় শুধু সবুজের সমারোহ। বড় বড় গাছ, ঘন পাতার ছায়া আর বিস্তৃত বাগান সবকিছু এতটাই মনোরম যে দেখে বোঝার উপায় নেই জায়গাটি ঢাকার ব্যস্ত শহরের মধ্যেই অবস্থিত। শহরের কংক্রিটের জঙ্গল পেরিয়ে যেন হঠাৎ করেই এক টুকরো সবুজের রাজ্যে এসে পড়েছে এখানে।

 

সবাই গাড়ি থেকে নেমে ধীরে ধীরে বাগানে একত্রিত হলো। ইউভি রিটা সহ সঙ্গে থাকা সবাইকে নিয়ে পুরো আয়োজনটি বুঝিয়ে দিতে লাগল।  ইনায়া চারপাশে তাকিয়ে সবাইকে উদ্দেশ্য করে  বলল

শোনো সবাই আজ আমরা বাগানেই মাটির চুলায় রান্না করব। একদম গ্রামের মতো করে। আর সবকিছু সবাই মিলে-মিশে করব ঠিক আছে ইনায়ার কথা শুনে মুহূর্তেই সবাইসঙ্গে রাজি হয়ে গেল। কথারা শুনে সবার কাছে পিকনিকের আনন্দ যেন দ্বিগুণ হয়ে উঠল।

বাগানের একপাশে বড়  সাদা কাপড় বিছিয়ে তার ওপর সাজিয়ে রাখলো ইনায়া পিয়াসা তুবা রিমঝিম নানান ধরনের শুকনা খাবার গুলো।  একদিকে রাখা হলো বিভিন্ন রকমের চিপস ও স্ন্যাকসের প্যাকেট অন্যদিকে সাজানো হলো রঙ বেরঙের  ফল। আপেল, কমলা, আঙুর, স্ট্রবেরি, তরমুজসহ নানা ধরনের ফল সুন্দর করে কেটে বড় বড় ট্রেতে সাজিয়ে রাখা হলো। পাশে রাখা হলো বিভিন্ন ধরনের জুস সফট ড্রিংকস ও ঠান্ডা পানীয়। আরও ছিল বিস্কুট কেক, মিষ্টি, চকলেটসহ ছোট-বড় সবার পছন্দের নানা খাবার।

 

এদিকে ইউভি রেদোয়ান রাজ্য সবার বসার জন্য বাগানের মনোরম পরিবেশে সুন্দর করে চেয়ার ও টেবিলের ব্যবস্থা করছেন। নরম কুশনসহ আরামদায়ক বসার জায়গার ব্যাবস্থা করেছে।  চারপাশে সবুজ গাছের ছায়া আর মৃদু বাতাস সব মিলিয়ে পিকনিকের জন্য একেবারে আদর্শ পরিবেশ তৈরি হয়েছে।এরই মধ্যে বাড়ির হেল্পিং হ্যান্ডরা রান্নার প্রস্তুতি শুরু করে দিল। বাগানের একপাশে মাটির চুলা তৈরি করা হলো। পাশে রাখা হলো বড় বড় হাঁড়ি, কড়াই, রান্নার উপকরণ ও প্রয়োজনীয় সব সামগ্রী। কেউ সবজি কাটছে, কেউ মসলা গুছিয়ে রাখছে, আবার কেউ রান্নার জন্য অন্যান্য জিনিসপত্র প্রস্তুত করছে।

লিখন চৌধুরী চারপাশে তাকিয়ে  বললেন,

 

শোনো সবাই সারা বছর তো বাড়ির গিন্নিদের হাতের রান্নাই খাই। আজ আমরা সবাই মিলে গিন্নিদের রান্না করে খাওয়াব বুঝেছো।  লিখন চৌধুরীর  কথা শেষ হতে না হতেই রেশমা চৌধুরী বিরক্ত মুখে বলে উঠলেন দয়া করে  প্লিজ! তুমি চুপ করে থাকো। বাচ্চাদের খাবারটা নষ্ট কোরো না। আসছে, ওনারা রান্না করবেন! যখন বয়স ছিল, তখন তো রান্না করোনি। এখন বুড়ো বয়সে এসে ঢং করতে হবে না। চুপ করে বসো তো রেশমা চৌধুরীর কথা শুনে লিখন চৌধুরী যেন নিজের সম্মানেই আঘাত পেলেন। সঙ্গে সঙ্গে বুক ফুলিয়ে বললেন দেখো রেশমা বুড়ো বলবে না আমাকে! আমাকে দেখে কোন দিক থেকে বুড়ো মনে হচ্ছে, বলো তো? এখনো বিদেশি সুন্দরী  ক্লায়েন্ট এলে আমাদের তিন ভাইয়ের দিকে হা করে তাকিয়ে থাকে, জানো!

 

লিখন চৌধুরীর কথদ  শুনে সাবিহা চৌধুরী সঙ্গে সঙ্গে সায় দিয়ে বললেন সত্যি ভাইয়া।তাই নাকি তিনজনের দিকেই তাকিয়ে থাকে।সাবিহা চৌধুরীর   কথা শুনে রাতিব চৌধুরী আর চুপ করে থাকতে পারলেন না। সঙ্গে সঙ্গে  হেসে বলে উঠলেন না না, সাবিহা। ভাইয়া মিথ্যা কথা বলেছে। আসলে ওরা রবিউলর দিকেই বেশি তাকিয়ে থাকে। আর আমাদের দিকে কে তাকাবে ভাইয়া মিথ্যা কথা বলো না তো!রাতিব চৌধুরীর  কথা শুনে লিখন চৌধুরীর মুখের হাসি মুহূর্তেই উধাও হয়ে গেল। দাঁত কিড়মিড় করে তিনি বললেন,চুপ থাক! তুই ঝগড়ায় জিততে দিবি না কি।

লিখন চৌধুরীর  এমন বিরক্ত মুখ দেখে চারপাশে থাকা সবাই হেসে উঠল। হাসির রেশ তখনো কাটেনি  এরই মধ্যে ইনায়া পেছন থেকে এসে রেশমা চৌধুরীকে জড়িয়ে ধরে মিষ্টি গলায় বলল বুঝলাম না, শাশুড়ি মা! ছেলেরা বুড়ো কথাটা শুনলেই  রেগে যায় কেন।বুড়োকে বুড়োও বলা যাবে না নাকি? কী দিনকাল আসলো রে বাবা! কথা টা ইউভির কানে যেতেউ তখনই ইউভির দৃষ্টি গিয়ে পড়ল ইনায়ার ওপর।সেই দৃষ্টি!এমন তীক্ষ্ণ, স্থির আর অর্থপূর্ণ দৃষ্টি যে ইনায়ার চোখ পরতেই গলা শুকিয়ে গেল। এক মুহূর্তের জন্য তার মনে হলো এই দৃষ্টি ভালো কোনো কিছুর ইঙ্গিত দিচ্ছে না। ইউভির চোখের ভাষা যেন স্পষ্ট করেই বলে দিচ্ছে ধরতে পারলে খবর আছে, বেয়াদব!

ইনায়া আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। চোখ বড় বড় করে ভয়ে ছুট দিল। ইউভিও সঙ্গে সঙ্গে তার পেছনে দৌড় দিল।দাঁড়া বিয়াদোব

 

—না! আমি দাঁড়াব না!ইনায়া দৌড়াতে দৌড়াতে ভিলার পেছনের দিকে চলে গেল। ইউভিও তার পিছু পিছু ছুটে গেল। তাদের এমন কাণ্ড দেখে বাগানে থাকা পুরো চৌধুরী পরিবার হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল। পিয়াসা তুবা হেসে কুটিকুটি হয়ে পরছে বাড়ির সবাই   অবাক হয়ে দুজনের দিকে তাকিয়ে আছে। শেষমেশ লিখন চৌধুরী  হেসে বলেই ফেলল,

এই ইউভি! মেয়েটাকে কেন তারা করছিস কেন?

।ইনায়াকে ধরার জন্য ইউভি যখন দ্রুত এগিয়ে আসছিল, তখন ইনায়া ভয়ে কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বলল সরি, বর মজা করে বলছিলাম। সরি! আর বলব না। এই কান ধরছি, প্লিজ আসো না তুমি ইনায়ার এমন মিনমিনে কণ্ঠ শুনেও ইউভির মুখের গাম্ভীর্য কাটল না। সে ধীর পায়ে এগিয়ে এসে বলল এত দ্রুত ভুলে গেলে সব চব্বিশ ঘণ্টা ও হয় নি ইনায়া বুঝতে পারল, এখন আর আদুরে বিড়ালের মতো ম্যাও ম্যাও করলে কাজ হবে না। তাই সে গলা ঝেড়ে একটু সাহসী হওয়ার চেষ্টা করে বলল।দেখো বর…

 

কথা শেষ হওয়ার আগেই ইউভি এক ঝটকায় ইনায়াকে নিজের বাহুর মধ্যে বন্দি করে ফেলল। ইনায়া কিছু বুঝে ওঠার আগেই ইউভি তার কানের লতিতে কুটুস করে একটি কামর  দিয়ে দুষ্টু হেসে বলল কী দেখব বলো? কোনটা রেখে কোনটা দেখব নাকি সব কিছু ই দেখবো ইনায়া মৃদু চিৎকার করে উঠল মেরে ফেলব তোমাকে! অসভ্য।

ইউভির ধীরে ধীরে ইনায়ার আরও কাছে এগিয়ে গেল। তাদের মাঝের দূরত্ব ক্রমেই কমে এলো। ইউভির চোখের দৃষ্টি গিয়ে স্থির হলো ইনায়ার ঠোটে সেই দৃষ্টিতে ইনায়ার বুকের ভেতরটা কেমন যেন ধক করে উঠল। ইউভি ধীরে ধীরে তার মুখের কাছে ঝুঁকে আসতেই। ইনায়া লজ্জায় আর ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলল এবং অজান্তেই ইউভিকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।ঠিক তখনই পেছন থেকে রাজ্জোর চিৎকার ভেসে এলো ছি ফুফাতো ব্রো ছি এত এত টাকা পয়সা দিয়ে কী করবি? এতগুলো বাড়ি দিয়েই বা কী করবি? এত গুলো বেড দিয়েই বা কী করবি? সেই তো জঙ্গলে মঙ্গল করতে আসছিস  ছি।

 

রাজ্জোর কথা শুনেও ইউভি একচুলও নড়ল না। । অন্যদিকে ইনায়া লজ্জায় ছটফট করতে করতে বলল ছাড়ো রাজ্জো ভাইয়া পেছন থেকে তুবাও বলে উঠল আহা! কী সিন হে, জিজু এদিকে পিয়াসা ইতিমধ্যেই রেদোয়ানের হাত ধরে টানাটানি শুরু করে দিয়েছে চলো না! দেখে আসি কী করছে দুজন!রেদোয়ান যেতে যেতে বললতুমি যাও।  ভুলে যেও না, ওখানে আমার ছোট বোন আছে।পিয়াসা তার হাত টানতে টানতেই বলল আরে চলো তো! ওদের রোমান্স আমরা কি নতুন দেখছি? আর দুজনকে দেখে তো মনে হচ্ছে এখন রোমান্স না, মারামারি শুরু হয়ে গেছে!রেদোয়ান হাঁটতে হাঁটতে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল ভাইয়া তো বনুকে ভালোবেসেই কূল পায় না মারামারি করবে কখন?

পিয়াসা এবার রেদোয়ানকে জড়িয়ে ধরে হাঁটতে হাঁটতে মিষ্টি গলায় বলল আমার ভাইয়ার কাছ থেকে কিছু শিখলে তো পারো!রেদোয়ান সঙ্গে সঙ্গে পিয়াসার দিকে তাকাল। তার সেই দৃষ্টি বুঝতে পেরেই পিয়াসা তাড়াতাড়ি প্রসঙ্গ পাল্টে বলল,

 

ওইভাবে তাকিও না। চলো, সোনা ময়েন  আমার! তুমিও তো আমাকে অনেক ভালোবাসো। আমি তো শুধু মজা করলাম!

এরই মধ্যে দুজন সেখানে এসে পৌঁছাতেই ইউভি অবশেষে ইনায়াকে ছেড়ে দিয়ে রাজ্জো ও রেদোয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল ছি ব্রো! তোদের মিনিমাম লজ্জাও নেই? ছোট বোনের রোমান্স দেখতে চলে আসছিস।এই বলে ইউভি বাগানের দিকে হাঁটতে হাঁটতে বিড়বিড় করে বলল যেমন বেয়াদব ভাই, তার তেমন বেয়াদব বোন!তারপর পিয়াসার হাত ধরে তাকে সঙ্গে নিয়ে যেতে যেতে বলল,চল বনু। এই বেয়াদবটার সঙ্গে বেশি থাকলে তুইও বেয়াদব হয়ে যাবি।পিয়াসা যেতে যেতে রেদোয়ানের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে ফেলল। রেদোয়ান তখন রাজ্জোর দিকে তাকিয়ে ভ্রু নাচিয়ে বলল দেখেছিস, ব্রো? তার বোনই আমাকে জোর করে এখানে নিয়ে এলো!

রেদোয়ানের কথা শুনে ইনায়া হাসতে হাসতে এসে তাকে জড়িয়ে ধরে বলল কষ্ট পেও না, ভাইয়া। চলো, আমরা বেয়াদবই ভালো আছি!

 

দুজনেই হাসতে হাসতে সেখান থেকে চলে গেল।এদিকে রাজ্জো তখন তুবার দিকে  তাকিয়ে আছে সে যেন চোখের পলক ফেলতেও  ভুলে গেছে। তুবা প্রথমে বিষয়টা বুঝতে না পেরে একটু অস্বস্তিতে পড়ল। তারপর আলতো করে রাজ্যর মুখে হাত রেখে  মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিয়ে বললওই দিকে তাকাও।রাজ্জো আবারও চোখ ঘুরিয়ে তুবার দিকেই তাকাল।তুবা এবার বিরক্ত হয়ে আবার তার মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিয়ে বলল পাগল হয়ে গেলে নাকি?রাজ্জো মুচকি হেসে তুবার দিকে তাকিয়ে বলল চলো না, পিচ্চি। আমিও একটু জঙ্গলে মঙ্গল করে আসি।তুবা সঙ্গে সঙ্গে এক পা তুলে রাজ্জোর পায়ের ওপর হাইহিল দিয়ে পাড়া দিয়ে দাঁত কিড়মিড় করে বলল স্বপ্ন দেখো, শালা!

রাজ্জো ব্যথায় ককিয়ে উঠল। তারপর  নিজের পা দুহাতে ধরে সেখানেই বসে পড়ল আহহ! ডাক্তার সাহেবা আপনার চিকিৎসা তো রোগীকে সুস্থ করার বদলে সরাসরি হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে দেবে!তুবা ভ্রু কুঁচকে একেবারে  বলল চিন্তার কোনো কারণ নেই। রোগীর পা দেখে মনে হচ্ছে, বুদ্ধির সঙ্গে পায়েরও সমস্যা আছে। চিকিৎসা হিসেবে আজীবন আমার থেকে দশ হাত দূরে থাকার প্রেসক্রিপশন দিলাম!রাজ্জো পা ধরে বসেই অসহায় মুখে বলল,

এ কেমন ডাক্তার রে বাবা! ওষুধ না দিয়ে সরাসরি দূরে থাকার প্রেসক্রিপশন দিয়ে দিলে।

 

সবাই  বাগানের  এসে পৌঁছাতেই হঠাৎ তাদের চোখে পড়ল রিটা  মুন্টু চাচাকে সঙ্গে নিয়ে এদিকেই এগিয়ে আসছে। মুন্টু চাচাকে দেখামাত্র ইনায়া, পিয়াসা ও তুবা একসঙ্গে আনন্দে চিৎকার করে বললো চাচা!তিনজনই যেন মুহূর্তের মধ্যে ছোট্ট বাচ্চা হয়ে গেল। একসঙ্গে ছুটে গিয়ে মুন্টু চাচাকে ঘিরে দাঁড়াল তারা।পিয়াসা হাসতে হাসতে বলল,

চাচা কেমন আছো তুমি? তুমি আসছো!মুন্টু চাচা মুচকি হেসে বললেন না এসে কি আর উপায় আছে? ইউভি বাবা জোর করে ধরে নিয়ে আসছে!ইনায়া হেসে বললনএকদম ঠিক করেছে। আজ সারাদিন আমাদের সঙ্গে থাকবে।পিয়াসা আর তুবাও বলল চাচা, তোমাকে দেখে ভীষণ ভালো লাগছে প্রণয়  তুর্জো আর ইচ্ছেও তোমাকে দেখলে অনেক খুশি হবে। মুন্টু চাচা তারাহুরো করে বললো  ওরা কোথায়?

মুন্টু চাচা আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালেন না ওদের কাছে   এতক্ষণ ধরে শুধু বাচ্চাদের কাছে যাওয়ার অপেক্ষাতেই ছিলেন সে সঙ্গে সঙ্গে বললেন তোমরা সরে দাঁড়াও, আমি আমার দাদুভাইদের কাছে যাই!কথা শেষ করেই প্রায় দৌড়ে চলে গেলেন বাচ্চাদের কাছে। দূর থেকেই প্রণয়, তুর্জো আর ইচ্ছেকে দেখতে পেয়ে তার মুখ আনন্দে ভরে উঠল। বাচ্চারাও মুন্টু চাচাকে দেখে ছুটে এসে তাকে ঘিরে ধরল দাদুভাই বলে ডাকতে লাগলো

 

এভাবেই হাসি-ঠাট্টা আর গল্পের মধ্যে কেটে গেল বেশ কিছুটা সময়।  রান্না শেষ হতেই রেশমা চৌধুরী নুসরাত চৌধুরী সবাই কে খেতে দিল একে একে সবাই খাবার খেতে  বসে পড়ল। মাটির চুলায় রান্না করা গরম গরম খাবারের গন্ধে পুরো বাগান মাতোয়ারা ওয়ে উঠেছে  সবাই তৃপ্তি করে খাওয়া-দাওয়া শেষ করে আবার গোল হয়ে বসে গল্পে মেতে উঠল। ঠিক তখনই ইউভি উঠে দাঁড়িয়ে  সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করল। তারপর মুচকি হেসে বললো লেডিস অ্যান্ড জেন্টলম্যান! এবার শুরু হবে আসল মজা। এবার একটা ছোট্ট গেম হবে। আর এই গেমে চৌধুরী পরিবারের সবাই অংশগ্রহণ করবে।ইউভি একটু  চারপাশে তাকিয়ে বলল শুধু ছোট নবাব বাদ!

রিদ সঙ্গে সঙ্গে ভ্রু কুঁচকে ইউভির দিকে তাকাল। ইউভি হেসে বলল কারণ ছোট নবাবের ওপর আজ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দিচ্ছি আমি তোর গান অন-অফ করার দায়িত্ব দিলাম । ইউভি এবার গেমের নিয়ম বুঝিয়ে বলল,খেলা খুব সহজ। সবাই গোল হয়ে বসবে। সবার হাতে হাতে একটা বালিশ ঘুরবে। গান বাজতে শুরু করলে যার হাতে বালিশ থাকবে, সে সঙ্গে সঙ্গে পাশের জনের দিকে ছুড়ে দেবে। এভাবে বালিশটা ঘুরতে থাকবে। কিন্তু গান  বন্ধ হয়ে গেলে যার হাতে বালিশ থাকবে, সে এই রাউন্ড থেকে বাদ বুঝেছো।

 

—এভাবে একে একে সবাই বাদ পড়বে। শেষ পর্যন্ত যে দুজন থাকবে, তাদের মধ্যে আবার ফাইনাল রাউন্ড হবে। আর আজ দেখা যাবে, চৌধুরী পরিবারের আসল চ্যাম্পিয়ন কে!কথা শেষ হতেই সবাই উৎসাহে হাততালি দিয়ে উঠল।বাগানের মাঝখানে সবাই গোল হয়ে বসতে শুরু করল। একদিকে ইউভির পাশে ইনায়া তারপর পিয়াসা, রেদোয়ান তুবা, রাজ্জো, প্রণয়, তুর্জো, রিমঝিম, রৌদিক লিখন চৌধুরী নুসরাত চৌধুরী আয়াত আতিকা, একে একে পরিবারের সবাই জায়গা করে নিল। একটু দূরে মুন্টু চাচা ইচ্ছের সঙ্গে বসে গেম খেলা দেখার জন্য বসলেন।সবশেষে গোলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে রিদ নিজের বক্সটা ঠিক করে নিল।রেডি?সবাই একসঙ্গে চিৎকার করে উঠল রেডি!

রিদ বক্সে গান চালু করতেই বালিশটা প্রথমে ইউভির হাতে ছিল। গান বাজতেই ইউভি বালিশটা ইনায়ার দিকে ছুড়ে দিল। ইনায়া সঙ্গে সঙ্গে সেটা পিয়াসার দিকে ছুড়ে দিল। পিয়াসা রেদোয়ানের দিকে, রেদোয়ান তুবার দিকে, তুবা রাজ্জোর দিকেএভাবেই বালিশটা একে একে সবার হাতে ঘুরতে লাগল।কেউ বালিশ ছুড়ে দিতে গিয়ে ভুল করে পাশের জনের কোলে ফেলে দিচ্ছে, কেউ আবার বালিশ হাতে নিয়ে এত দ্রুত ছুড়ে দিচ্ছে যে অন্যজন ধরতেই হিমশিম খাচ্ছে। হঠাৎ রিদ গান বন্ধ করে দিল।সবাই থমকে গেল।যার হাতে বালিশ ছিল, সে হলো রৌদিক।রৌদিক নিজের হাতে থাকা বালিশটার দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর মুখ কুঁচকে বলল আমি বাদ?

রিদ বলল হ্যাঁ, প্রথম উইকেট পড়েছে!রৌদিক ভীষণ বিরক্ত মুখে উঠে গিয়ে পাশে বসে পড়ল। খেলা আবার শুরু হলো।দ্বিতীয় রাউন্ডে বালিশ ঘুরতে ঘুরতে এবার এসে থামল তুর্জোর হাতে। তুর্জো বালিশটা হাতে নিয়ে বলল,

আমি ও বাদ এই টা অন্যায় রিদ  সঙ্গে সঙ্গে বলল,

 

গেমে কোনো অন্যায় নেই। ভাগ্য খারাপ তোমার

তুর্জো অনিচ্ছায় উঠে দাঁড়াতেই সবাই আবার গেম শুরু করল।তৃতীয় রাউন্ডে বাদ পড়ল তুবা। তুবা উঠে দাঁড়িয়ে রাজ্জোর দিকে তাকিয়ে বলল,

তুমি নিশ্চয়ই আমার দিকে ইচ্ছে করে বালিশটা ধীরে দিয়েছিলে এর শোধ আমি নিব দশ হাত না বিশ হাত দূরে থাকবে আমার থেকে।

 

রাজ্জো সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করে বলল আমি? আমি তো তোমাকে জেতাতেই চেয়েছিলাম তুবা চোখ রাঙিয়ে বলল চুপ।এভাবে একের পর এক রাউন্ড চলতে থাকল।একসময় খেলায় রয়ে গেল মাত্র কয়েকজন।ইনায়া, ইউভি, রাজ্জো, রিমঝিম, রেশমা চৌধুরী এবং লিখন চৌধুরী।গান আবার বাজতে শুরু করল। বালিশ ঘুরতে লাগল দ্রুত। সবার চোখ তখন বালিশের দিকে। কেউ কারও দিকে তাকাচ্ছে না, শুধু বালিশটা নিজের হাতে না থাকে হঠাৎ গান বন্ধ হতেই বালিশ রিমঝিমের হাতে ছিল রিমঝিম হেসে মাথা নেড়ে বললেন,ঠিক আছে, আমি বাদ।এবার রইল পাঁচজন।পরের রাউন্ডে বাদ পড়ল রাজ্জো। এরপর একে একে ইনায়া ও ইউভিও বাদ পড়ল। শেষ পর্যন্ত গোল হয়ে বসে রইলেন মাত্র দুজন লিখন চৌধুরী ও রেশমা চৌধুরী।চারপাশ থেকে সবাই চিৎকার করে তাদের উৎসাহ দিতে

লাগল।

 

রেশমা চৌধুরী লিখন চৌধুরীর  দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললেন এখন কিন্তু বুড়ো বয়সের ঢং দেখিয়ে জিততে পারবে না আর চিটিংবাজি একদম করবে না বুঝেছো। লিখন চৌধুরী  সঙ্গে সঙ্গে বললেন আর দেখো নিয়ো। রেশমা, প্রমাণ করেই দেব  এই বুড়ো এখনো যথেষ্ট ফিট!রিদ আবার গান চালু করল।বালিশটা প্রথমে রেশমা চৌধুরীর হাতে ছিল  তিনি দ্রুত লিখন চৌধুরীর  দিকে ছুড়ে দিলেন। লিখন চৌধুরী ও  সঙ্গে সঙ্গে সেটা ফিরিয়ে দিলেন।  হঠাৎ গান থেমে গেলেই দেখা গেল বালিশটা রেশমা চৌধুরীর হাতে

এক মুহূর্তের জন্য সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল। তারপর সবাই একসঙ্গে চিৎকার করে  উঠল।লিখন চৌধুরী সঙ্গে সঙ্গে  উঠে দাঁড়িয়ে দুই হাত উঁচু করে বললেন,বলেছিলাম না! এখনো বুড়ো হইনি!রেশমা চৌধুরী  হেসে বললেন হয়েছে হয়েছে! এবার থামো তো সারাদিন এই এক কথা শুনতে হবে এখন থেকে। লিখন চৌধুরী বিজয়ীর হাসি হেসে বললেন,

কী করব বলো? প্রতিভা জিনিসটাই এমন!

তার কথা শুনে সবাই আবারও হেসে উঠল। আর এদিকে  রিদ  বক্স এ  বিজয় সঙ্গীত বাজিয়ে দিয়ে বললো চাচ্চু তোমার পুরষ্কার।

 

বিকালের নাস্তার জন্য রেশমা চৌধুরী মাংস আর চালের রুটি করবে। সেটারি প্রস্তুতি নিচ্ছে সে।ইউভি দূর থেকে মাকে দেখতে পেয়ে  সোজা এগিয়ে গেল রেশমা চৌধুরীর কাছে। রেশমা চৌধুরী  তখন মাংস রান্নার প্রস্তুতির জন্য আলু ভেজে রাখছিলেন। ইউভি কাছে গিয়ে  ভাজা আলুর এক টুকরো তুলে মুখে দিয়ে খেতে খেতে মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,মা, ইচ্ছে কই?রেশমা চৌধুরী সঙ্গে সঙ্গে ছেলের দিকে তাকিয়ে  বললেন কী রে? তোর এক মা সামনে দাঁড়িয়ে আছে, তাতেও তোর  হচ্ছে না?ইউভি মায়ের কথায় হেসে ফেলল। তারপর এক পা এগিয়ে মায়ের গালে আলতো করে চুমু দিয়ে আদুরে কণ্ঠে বলল,

তোমার সঙ্গে কি আর অন্য কোনো মায়ের তুলনা হয় বলো তো? আমার জীবনে এমন হাজারটা মা এলেও তুমি আমার বেস্ট মা হয়েই থাকবে।রেশমা চৌধুরী মুখে বিরক্তির ভাব এনে বললেন হয়েছে, হয়েছে! এবার দূরে যা। ঝাল লেগে যাবে। আর নূরকে ওইভাবে তাড়া করলি কেন?ইউভি হেসে বলল ও বুঝবে না। কথাটা বলে ইউভি একটু থেমে মায়ের মুখের দিকে তাকাল।  পরক্ষণেই তার চোখে পড়ল, রেশমা চৌধুরী কেমন এক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছেন। ইউভি ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,

 

কী দেখো?

রেশমা চৌধুরী চোখের কোণে তখন চিকচিক করছে পানি । তিনি তাড়াতাড়ি আঁচল দিয়ে চোখের পানি মুছে নিলেন। তারপর ধীর কণ্ঠে বললেন যখন তুই ছোট ছিলি চৌধুরী বাড়ি থেকে চলে যাওয়ার আগে তুই ঠিক এভাবেই আমার কাছে এসে দাঁড়াতি। আমি যখন মাংসর জন্য আলু ভেজে রাখতাম, তুই ঠিক এভাবেই এক টুকরো করে তুলে নিয়ে খেতি। একসময়  এই আলু ভাজাটাই ছিল  তোর  সবচেয়ে পছন্দের খাবার।কিন্তু যখন ফিরে এলি, তখন তোকে আর কোনোদিন আলু খেতে দেখিনি। শুধু ওই ডায়েট করিস  ওই সব শাকপাতা আর সেদ্ধ খাবার খেয়ে  আমার ছেলের মুখে স্বাদ নেই!

ইউভি মায়ের কথায় মৃদু হেসে তার আচলে হাত টা মুছে  তারপর বলল এখন থেকে খাব। তোমার হাতের আলু ভাজা থেকে আর নিজেকে দূরে রাখব না প্রমিচ মা ।

 

ইচ্ছে কোথায় আছে  সেটা খুঁজতে খুঁজতে কিছুটা দূরে যেতেই তার চোখে পড়ল ইচ্ছে একটি বড় কাঠগোলাপ গাছের নিচে বসে আছে।  পাশে আয়াত আর আতিকা। তিনজন মিলে গাছের নিচে পড়ে থাকা কাঠগোলাপের ফুল কুড়িয়ে ছোট্ট ঝুড়িতে রাখছে। তাদের হাসি আর ছোটাছুটিতে বাগানের সেই কোণটুকুও যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে।কাছেই রিদ বক্স বাজিয়ে চলেছে। অন্যদিকে প্রণয়, তুর্জো ও রৌদিক ছুটোছুটি করে বল খেলছে। আর কিছুটা দূরে রিমঝিম চৌধুরী দাঁড়িয়ে কারও জন্য অপেক্ষা করছেন সম্ভবত রাশেদ মির্জার।

ইউভি ধীরে ধীরে ইচ্ছের কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে মেয়ের মাথায় হাত রেখে বলল মা কী করো তুমি?ইচ্ছে মাথা তুলে বাবার দিকে তাকিয়ে  বলল,ফুল কুলাই পাপা! দেখো, কত সুন্ সুন্দল ফুল!ইউভি মেয়ের ছোট্ট ঝুড়িটার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল। ঠিক তখনই ইনায়া ইচ্ছেকে খুঁজতে খুঁজতে সেখানে এসে পৌঁছাল। দূর থেকেই মেয়ে আর তার বাবাকে একসঙ্গে দেখে সে নিঃশব্দে একটু পেছনে দাঁড়িয়ে গেল। তার চোখে ফুটে উঠল একরাশ মায়া একটা মেয়ের জীবনে এর থেকে সুখের মূহুর্তে বুজি আর কিচ্ছুটি তে নেই।

ইউভি গাছের নিচ থেকে একটি সুন্দর কাঠগোলাপ তুলে নিল। তারপর ইচ্ছের কানের পাশে ফুলটি গুঁজে দিয়ে আদুরে গলায় বলল নো, মা। ফুলটা সুন্দর ঠিকই কিন্তু ফুলের থেকেও বেশি সুন্দর তুমি।ইচ্ছের মুখ মুহূর্তেই আনন্দে ঝলমল করে উঠল। খিলখিল করে হেসে বলল থ্যাঙ্ক ইউ পাপা!

 

কিছুক্ষণ পর ইচ্ছে যেন গভীরভাবে কিছু ভেবে বাবার দিকে তাকিয়ে বলল নো, পাপা! আমাল মাম্মা বেশি সুন্দল। মাম্মার তুল বেশি সুন্দল মাম্মার মুখ নলম. মাম্মাই বেশি সুন্দল।ইচ্ছের কথা শুনে ইউভির ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠল।হ্যাঁ মা, তোমার মাম্মা অনেক সুন্দর। চাঁদের মতো সুন্দর। তবে শুধু চাঁদের মতো বললে তো তোমার মাম্মার সৌন্দর্য পুরোটা বলা হয় না। তোমার মাম্মার মুখে যে মায়া আছে সেটা ভোরের নরম আলোয়ের মতো। তার হাসিটা যেন কাঠগোলাপের সুবাসের মতো নীরবে চারপাশটা সুন্দর করে দেয়। আর তার চোখ দুটো সেখানে তাকালে মনে হয়, পৃথিবীর সব শান্তি যেন ওই দুই চোখের ভেতর লুকিয়ে আছে। তোমার মাম্মা শুধু দেখতে সুন্দর নয় তার মনটাও ভীষণ সুন্দর। তাই তো তোমার পাপার চোখে তোমার মাম্মাই পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর নারী।

ইনায়া দূর থেকে ইউভির কথাগুলো শুনে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। নিঃশব্দে এসে তাদের দুজনের পাশে বসে পড়ল। দুজনের দিকে তাকিয়ে বলল কী হচ্ছে এখানে?ইচ্ছে সঙ্গে সঙ্গে মায়ের কোলে উঠে বসল। তারপর ছোট্ট দুহাত দিয়ে মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে আদুরে কণ্ঠে বলল তোই কিতু না, মাম্মাম!এরপর মায়ের গালে ও কপালে টুপটাপ কয়েকটা চুমু দিয়ে ইচ্ছে মিষ্টি গলায় বলল সরি মাম্মাম। তোমাল সাথে আর আরি করব না।ইনায়া মেয়ের কপালে আলতো করে চুমু দিয়ে তাকে বুকে জড়িয়ে বলল।আমার সোনা মা!

 

ইউভি পাশে বসে মা-মেয়ের মিল দেখে  বলল, বাহ মা মেয়ের ভাব হয়ে গেছে! এখন তো আর আমাকে লাগবে না। আমি তাহলে যাই।ইউভি উঠে যাওয়ার ভান করতেই ইচ্ছে সঙ্গে সঙ্গে তার হাত ধরে ফেলল। ছোট্ট মুখে দুষ্টু হাসি ফুটিয়ে বলল বতো বতো পাপা! তুমি মাম্মাকেও আমাল মতো ফুল দাও।মেয়ের পাকা পাকা কথা শুনে ইউভি হেসে ফেলল। সে আবার  হাত বাড়িয়ে একটি সুন্দর কাঠগোলাপ তুলে নিল। তারপর ইনায়ার কানের পাশে আলতো করে ফুলটি গুঁজে দিল। ইচ্ছে এবার আনন্দে দুজনের মাঝখানে এসে বসে পড়ল। একবার মায়ের দিকে, আবার বাবার দিকে তাকিয়ে খুশি গলায় বলল লাভ ইউ পাপা  লাভ ইউ মাম্মা!

ইনায়া আর ইউভি দুজনেই একসঙ্গে নলল,

 

লাভ ইউ, প্রিন্সেস!ইউভি ইনায়ার দিকে তাকিয়ে ও একি ভাবে বলল,ভালোবাসি, আদর।ইনায়া কথাটা শুনে ইউভির দিকে তাকাতেই ইউভি একটু এগিয়ে এলো। তারপর ইনায়ার কপালে আলতো করে চুমু দিয়ে  ফিসফিস করে বলল ভালোবাসি, আদর। বড্ড ভালোবাসি। ভালোবাসার থেকেও বেশি ভালোবাসি।

ইনায়ার ইউভির হাতটা নিজের মুঠোর মধ্যে নিয়ে আলতো করে চুমু খেয়ে নরম কণ্ঠে বলল আমিও তোমাকে ভীষণ ভালোবাসি, আমার শেহজাদা।ইচ্ছে বাবা-মায়ের এমন ভালোবাসা দেখে নিজেও যেন বাদ পড়তে রাজি নয়। সে দুজনের কপালে পরপর দুটো চুমু দিয়ে  বলল,ইত্তেও তোমাদেল দুদনকে অনেক ভালোবাতে  মাম্মা-পাপা দুজনতেই!

 

ইচ্ছে কথা শেষ করতেই ইউভি আর ইনায়া একসঙ্গে মেয়েকে চুমু খাওয়ার জন্য এগিয়ে গেল। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে ইচ্ছে দুষ্টুমি করে একটু নিচু হয়ে গেল। ফলে দুজনের মাথা একসঙ্গে গিয়ে ঠুকল।দুজনেই কপালে হাত দিয়ে থমকে গেল।  তাদের এই অবস্থা দেখে ইচ্ছে কিছুক্ষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে থেকে খিলখিল করে হেসে উঠল

ইউভি কপালে হাত বুলাতে বুলাতে ইনায়ার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল তোমার মেয়ে না একটু তো দুষ্টু হবেই।ইনায়াও একইভাবে ফিসফিস করে বলল তোমার মেয়ে।ইউভি এবার ইনায়ার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল না আদর। আমাদের মেয়ে।

 

কথাটা বলেই সে ইনায়াকে আলতো করে নিজের বুকের এক পাশে  টেনে নিল অন্য পাশে ইচ্ছে কে। ইনায়ার কপালে একটি ভালোবাসার পরশ একে বললো। আমার আদর!!!!,ইনায়া কিছু না বলে শুধু মৃদু হেসে ইউভির বুকে মাথা রাখল। আর তাদের মাঝখানে বসে থাকা ছোট্ট ইচ্ছে দুজনের দিকে তাকিয়ে আবারও খিলখিল করে হেসে উঠল।

 

সমাপ্ত

সকাল হতেই পুরো চৌধুরী পরিবার ব্যস্ত হয়ে উঠেছে। আজ সবাই ইচ্ছের বাড়িতে যাবে। সেখানেই আজকের জন্য আয়োজন করা হয়েছে এক জমজমাট পিকনিকের। একে একে বাড়ির সবাই নিচের ড্রয়িংরুমে জড়ো হতে শুরু করেছে। লিখন চৌধুরী, রাতিব চৌধুরী, রোবিউল চৌধুরী ও রাইহান চৌধুরী আড্ডায় মেতে উঠেছেন। সবার হাতে সকালের খবরের কাগজ আর ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ। খবরের কাগজ পড়ার ফাঁকে ফাঁকে চলছে চার ভাইয়ের হাসি-ঠাট্টা আর জমিয়ে আড্ডা। চারপাশের পরিবেশটা যেন সকাল থেকেই আনন্দের আমেজে ভরে উঠেছে।
ঠিক তখনই সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে দেখা গেল ইউভি ইনায়া আর ইচ্ছেকে। ইচ্ছে ভোর হতেই তার মা-বাবার কাছে ফিরে গিয়েছিল মা বাবাকে পেয়ে একেবারে খুশিতে আত্মহারা। বাবার বুকের ওপর মাথা রেখে আপনমনে আঁকিবুঁকি করতে করতে খেলছে সে। ইউভিও মেয়েকে বুকের সঙ্গে নিয়ে নিচে নামছে। তাদের পেছন পেছন পিয়াসা, রেদোয়ান ও প্রণয়ও প্রস্তুত হয়ে নিচে নেমে এলো।
অন্যদিকে বাড়ির তিন গিন্নি তখন পিকনিকের সব আয়োজন গুছিয়ে নেওয়ার কাজে ব্যস্ত। হেল্পিং হ্যান্ডদের সঙ্গে নিয়ে কোন জিনিস কোথায় যাবে, কী কী সঙ্গে নিতে হবে সবকিছু নিজেরা দাঁড়িয়ে থেকে তদারকি করছেন। ঠিক সেই সময় রিটা এসে উপস্থিত হলো। ইউভি রিটার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল সব ঠিক আছে তো, রিটা?রিটা সঙ্গে সঙ্গে মাথা নেড়ে বলল সব ওকে, স্যার।এরপর কিছুক্ষণ পর রিমঝিম রৌদিককে সঙ্গে নিয়ে নিচে নেমে এলো। তাদের সঙ্গে ছিল তুবা, রাজ্জো ও তুর্য সবাইকে একসঙ্গে নিচে আসতে দেখে লিখন চৌধুরী সবার দিকে তাকিয়ে বললেন সবাই চলে আসছো?
ঠিক তখনই আয়াত আর আতিকা দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে নামতে একসঙ্গে বলে উঠল নো, চাচ্চু! আমরা দুজন আসছি!দুজনকে সিঁড়ি বেয়ে ছুটে নিচে নামতে দেখে উপস্থিত সবাই মুগ্ধ হয়ে তাদের দিকে তাকিয়ে রইল। দুজনের পরনেই একই রকম দুটি বেগুনি রঙের গাউন। হালকা কোঁকড়ানো চুল দুজনেই খোলা রেখেছে চুলের মধ্যে গুঁজে রাখা কাঠগোলাপের ক্লিপ। দুজনের হাতে দুটো বেতের ঝুড়ি । সবাইকে একে একে নিচে আসতে দেখে ইউভি চারদিকে চোখ বুলিয়ে বলল।ছোট নবাব কই?
ইউভির কথা শেষ হতে না হতেই সিঁড়ি দিয়ে টুংটাং শব্দ তুলে একটি বক্স বাজাতে বাজাতে নিচে নামতে দেখা গেল রিদকে। পরনে সাদা টি-শার্ট কালো থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট গলায় হেডফোন পায়ে সাদা জুতা পরেছে আর মাথায় ক্যাপ পরেছে সব মিলিয়ে রিদের মধ্যে যেন একেবারে রকস্টারের ভাইব ফুটে উঠেছে সে বক্সটা বাজাতে বাজাতে সবার সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলল পিকনিকে বক্স না বাজলে ফিল হবে না! ইউভি হাসতে হাসতে বললো চলো ছোট নবাব।
.
একে একে সবাই নিজেদের নির্ধারিত গাড়িতে উঠে রওনা দিল ইচ্ছের ভিলার উদ্দেশে। ইউভি ইনায়া ও ইচ্ছে উঠল একটি গাড়িতে। তাদের সঙ্গে অন্য গাড়িতে রওনা দিল রেদোয়ান পিয়াসা ও প্রণয়। রাজ্জো তুর্য ও পিয়াসা আরেকটি গাড়িতে উঠল। লিখন চৌধুরী ও রেশমা চৌধুরী উঠলেন একটি গাড়িতে আর রাতিব চৌধুরী নুসরাত চৌধুরী ও রিদ উঠল অন্য একটি গাড়িতে। রোবিউল চৌধুরী, সাবিহা চৌধুরী, আয়াত ও আতিকা একসঙ্গে একটি গাড়িতে রওনা দিল। আরেকটি গাড়িতে ছিল রিমঝিম ও রৌদিক। একের পর এক গাড়িগুলো চৌধুরী পরিবারের ভিলার গেট পেরিয়ে বেরিয়ে এলো, তখন পুরো বহরটির সামনে পেছনে ছিল সুসজ্জিত বডিগার্ডদের গাড়ি। বাংলাদেশের অন্যতম প্রভাবশালী ও বিত্তশালী ব্যবসায়ী পরিবারের বহর রাস্তায় চলতে থাকা সেই সারি সারি দামি গাড়ি আর নিরাপত্তার বিশাল আয়োজন দেখে যে কারও চোখ আটকে যাওয়ার মতো অবস্থা সামনে ও পেছনে বডিগার্ডদের গাড়ি, মাঝখানে চৌধুরী দের গাড়িগুলো সব মিলিয়ে পুরো বহরটিই ছিল চোখ ধাঁধানো।
ব্যস্ত শহরের কোলাহল যানজট আর উঁচু উঁচু ভবন পেরিয়ে ধীরে ধীরে শহরের ব্যস্ততা পেছনে ফেলে এগিয়ে চলল গাড়িগুলো। বেশ কিছুক্ষণ পর একে একে সবাই এসে পৌঁছাল ইচ্ছের নতুন ভিলার সামনে। গাড়িগুলো থামতেই সবাই নেমে চারপাশে তাকিয়ে যেন কিছুক্ষণের জন্য বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। বাড়িটিকে ঘিরে চারদিকে যতদূর চোখ যায় শুধু সবুজের সমারোহ। বড় বড় গাছ, ঘন পাতার ছায়া আর বিস্তৃত বাগান সবকিছু এতটাই মনোরম যে দেখে বোঝার উপায় নেই জায়গাটি ঢাকার ব্যস্ত শহরের মধ্যেই অবস্থিত। শহরের কংক্রিটের জঙ্গল পেরিয়ে যেন হঠাৎ করেই এক টুকরো সবুজের রাজ্যে এসে পড়েছে এখানে।

সবাই গাড়ি থেকে নেমে ধীরে ধীরে বাগানে একত্রিত হলো। ইউভি রিটা সহ সঙ্গে থাকা সবাইকে নিয়ে পুরো আয়োজনটি বুঝিয়ে দিতে লাগল। ইনায়া চারপাশে তাকিয়ে সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলল
শোনো সবাই আজ আমরা বাগানেই মাটির চুলায় রান্না করব। একদম গ্রামের মতো করে। আর সবকিছু সবাই মিলে-মিশে করব ঠিক আছে ইনায়ার কথা শুনে মুহূর্তেই সবাইসঙ্গে রাজি হয়ে গেল। কথারা শুনে সবার কাছে পিকনিকের আনন্দ যেন দ্বিগুণ হয়ে উঠল।
বাগানের একপাশে বড় সাদা কাপড় বিছিয়ে তার ওপর সাজিয়ে রাখলো ইনায়া পিয়াসা তুবা রিমঝিম নানান ধরনের শুকনা খাবার গুলো। একদিকে রাখা হলো বিভিন্ন রকমের চিপস ও স্ন্যাকসের প্যাকেট অন্যদিকে সাজানো হলো রঙ বেরঙের ফল। আপেল, কমলা, আঙুর, স্ট্রবেরি, তরমুজসহ নানা ধরনের ফল সুন্দর করে কেটে বড় বড় ট্রেতে সাজিয়ে রাখা হলো। পাশে রাখা হলো বিভিন্ন ধরনের জুস সফট ড্রিংকস ও ঠান্ডা পানীয়। আরও ছিল বিস্কুট কেক, মিষ্টি, চকলেটসহ ছোট-বড় সবার পছন্দের নানা খাবার।

এদিকে ইউভি রেদোয়ান রাজ্য সবার বসার জন্য বাগানের মনোরম পরিবেশে সুন্দর করে চেয়ার ও টেবিলের ব্যবস্থা করছেন। নরম কুশনসহ আরামদায়ক বসার জায়গার ব্যাবস্থা করেছে। চারপাশে সবুজ গাছের ছায়া আর মৃদু বাতাস সব মিলিয়ে পিকনিকের জন্য একেবারে আদর্শ পরিবেশ তৈরি হয়েছে।এরই মধ্যে বাড়ির হেল্পিং হ্যান্ডরা রান্নার প্রস্তুতি শুরু করে দিল। বাগানের একপাশে মাটির চুলা তৈরি করা হলো। পাশে রাখা হলো বড় বড় হাঁড়ি, কড়াই, রান্নার উপকরণ ও প্রয়োজনীয় সব সামগ্রী। কেউ সবজি কাটছে, কেউ মসলা গুছিয়ে রাখছে, আবার কেউ রান্নার জন্য অন্যান্য জিনিসপত্র প্রস্তুত করছে।
লিখন চৌধুরী চারপাশে তাকিয়ে বললেন,

শোনো সবাই সারা বছর তো বাড়ির গিন্নিদের হাতের রান্নাই খাই। আজ আমরা সবাই মিলে গিন্নিদের রান্না করে খাওয়াব বুঝেছো। লিখন চৌধুরীর কথা শেষ হতে না হতেই রেশমা চৌধুরী বিরক্ত মুখে বলে উঠলেন দয়া করে প্লিজ! তুমি চুপ করে থাকো। বাচ্চাদের খাবারটা নষ্ট কোরো না। আসছে, ওনারা রান্না করবেন! যখন বয়স ছিল, তখন তো রান্না করোনি। এখন বুড়ো বয়সে এসে ঢং করতে হবে না। চুপ করে বসো তো রেশমা চৌধুরীর কথা শুনে লিখন চৌধুরী যেন নিজের সম্মানেই আঘাত পেলেন। সঙ্গে সঙ্গে বুক ফুলিয়ে বললেন দেখো রেশমা বুড়ো বলবে না আমাকে! আমাকে দেখে কোন দিক থেকে বুড়ো মনে হচ্ছে, বলো তো? এখনো বিদেশি সুন্দরী ক্লায়েন্ট এলে আমাদের তিন ভাইয়ের দিকে হা করে তাকিয়ে থাকে, জানো!

লিখন চৌধুরীর কথদ শুনে সাবিহা চৌধুরী সঙ্গে সঙ্গে সায় দিয়ে বললেন সত্যি ভাইয়া।তাই নাকি তিনজনের দিকেই তাকিয়ে থাকে।সাবিহা চৌধুরীর কথা শুনে রাতিব চৌধুরী আর চুপ করে থাকতে পারলেন না। সঙ্গে সঙ্গে হেসে বলে উঠলেন না না, সাবিহা। ভাইয়া মিথ্যা কথা বলেছে। আসলে ওরা রবিউলর দিকেই বেশি তাকিয়ে থাকে। আর আমাদের দিকে কে তাকাবে ভাইয়া মিথ্যা কথা বলো না তো!রাতিব চৌধুরীর কথা শুনে লিখন চৌধুরীর মুখের হাসি মুহূর্তেই উধাও হয়ে গেল। দাঁত কিড়মিড় করে তিনি বললেন,চুপ থাক! তুই ঝগড়ায় জিততে দিবি না কি।
লিখন চৌধুরীর এমন বিরক্ত মুখ দেখে চারপাশে থাকা সবাই হেসে উঠল। হাসির রেশ তখনো কাটেনি এরই মধ্যে ইনায়া পেছন থেকে এসে রেশমা চৌধুরীকে জড়িয়ে ধরে মিষ্টি গলায় বলল বুঝলাম না, শাশুড়ি মা! ছেলেরা বুড়ো কথাটা শুনলেই রেগে যায় কেন।বুড়োকে বুড়োও বলা যাবে না নাকি? কী দিনকাল আসলো রে বাবা! কথা টা ইউভির কানে যেতেউ তখনই ইউভির দৃষ্টি গিয়ে পড়ল ইনায়ার ওপর।সেই দৃষ্টি!এমন তীক্ষ্ণ, স্থির আর অর্থপূর্ণ দৃষ্টি যে ইনায়ার চোখ পরতেই গলা শুকিয়ে গেল। এক মুহূর্তের জন্য তার মনে হলো এই দৃষ্টি ভালো কোনো কিছুর ইঙ্গিত দিচ্ছে না। ইউভির চোখের ভাষা যেন স্পষ্ট করেই বলে দিচ্ছে ধরতে পারলে খবর আছে, বেয়াদব!
ইনায়া আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। চোখ বড় বড় করে ভয়ে ছুট দিল। ইউভিও সঙ্গে সঙ্গে তার পেছনে দৌড় দিল।দাঁড়া বিয়াদোব

—না! আমি দাঁড়াব না!ইনায়া দৌড়াতে দৌড়াতে ভিলার পেছনের দিকে চলে গেল। ইউভিও তার পিছু পিছু ছুটে গেল। তাদের এমন কাণ্ড দেখে বাগানে থাকা পুরো চৌধুরী পরিবার হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল। পিয়াসা তুবা হেসে কুটিকুটি হয়ে পরছে বাড়ির সবাই অবাক হয়ে দুজনের দিকে তাকিয়ে আছে। শেষমেশ লিখন চৌধুরী হেসে বলেই ফেলল,
এই ইউভি! মেয়েটাকে কেন তারা করছিস কেন?
।ইনায়াকে ধরার জন্য ইউভি যখন দ্রুত এগিয়ে আসছিল, তখন ইনায়া ভয়ে কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বলল সরি, বর মজা করে বলছিলাম। সরি! আর বলব না। এই কান ধরছি, প্লিজ আসো না তুমি ইনায়ার এমন মিনমিনে কণ্ঠ শুনেও ইউভির মুখের গাম্ভীর্য কাটল না। সে ধীর পায়ে এগিয়ে এসে বলল এত দ্রুত ভুলে গেলে সব চব্বিশ ঘণ্টা ও হয় নি ইনায়া বুঝতে পারল, এখন আর আদুরে বিড়ালের মতো ম্যাও ম্যাও করলে কাজ হবে না। তাই সে গলা ঝেড়ে একটু সাহসী হওয়ার চেষ্টা করে বলল।দেখো বর…

কথা শেষ হওয়ার আগেই ইউভি এক ঝটকায় ইনায়াকে নিজের বাহুর মধ্যে বন্দি করে ফেলল। ইনায়া কিছু বুঝে ওঠার আগেই ইউভি তার কানের লতিতে কুটুস করে একটি কামর দিয়ে দুষ্টু হেসে বলল কী দেখব বলো? কোনটা রেখে কোনটা দেখব নাকি সব কিছু ই দেখবো ইনায়া মৃদু চিৎকার করে উঠল মেরে ফেলব তোমাকে! অসভ্য।
ইউভির ধীরে ধীরে ইনায়ার আরও কাছে এগিয়ে গেল। তাদের মাঝের দূরত্ব ক্রমেই কমে এলো। ইউভির চোখের দৃষ্টি গিয়ে স্থির হলো ইনায়ার ঠোটে সেই দৃষ্টিতে ইনায়ার বুকের ভেতরটা কেমন যেন ধক করে উঠল। ইউভি ধীরে ধীরে তার মুখের কাছে ঝুঁকে আসতেই। ইনায়া লজ্জায় আর ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলল এবং অজান্তেই ইউভিকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।ঠিক তখনই পেছন থেকে রাজ্জোর চিৎকার ভেসে এলো ছি ফুফাতো ব্রো ছি এত এত টাকা পয়সা দিয়ে কী করবি? এতগুলো বাড়ি দিয়েই বা কী করবি? এত গুলো বেড দিয়েই বা কী করবি? সেই তো জঙ্গলে মঙ্গল করতে আসছিস ছি।

রাজ্জোর কথা শুনেও ইউভি একচুলও নড়ল না। । অন্যদিকে ইনায়া লজ্জায় ছটফট করতে করতে বলল ছাড়ো রাজ্জো ভাইয়া পেছন থেকে তুবাও বলে উঠল আহা! কী সিন হে, জিজু এদিকে পিয়াসা ইতিমধ্যেই রেদোয়ানের হাত ধরে টানাটানি শুরু করে দিয়েছে চলো না! দেখে আসি কী করছে দুজন!রেদোয়ান যেতে যেতে বললতুমি যাও। ভুলে যেও না, ওখানে আমার ছোট বোন আছে।পিয়াসা তার হাত টানতে টানতেই বলল আরে চলো তো! ওদের রোমান্স আমরা কি নতুন দেখছি? আর দুজনকে দেখে তো মনে হচ্ছে এখন রোমান্স না, মারামারি শুরু হয়ে গেছে!রেদোয়ান হাঁটতে হাঁটতে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল ভাইয়া তো বনুকে ভালোবেসেই কূল পায় না মারামারি করবে কখন?
পিয়াসা এবার রেদোয়ানকে জড়িয়ে ধরে হাঁটতে হাঁটতে মিষ্টি গলায় বলল আমার ভাইয়ার কাছ থেকে কিছু শিখলে তো পারো!রেদোয়ান সঙ্গে সঙ্গে পিয়াসার দিকে তাকাল। তার সেই দৃষ্টি বুঝতে পেরেই পিয়াসা তাড়াতাড়ি প্রসঙ্গ পাল্টে বলল,

ওইভাবে তাকিও না। চলো, সোনা ময়েন আমার! তুমিও তো আমাকে অনেক ভালোবাসো। আমি তো শুধু মজা করলাম!
এরই মধ্যে দুজন সেখানে এসে পৌঁছাতেই ইউভি অবশেষে ইনায়াকে ছেড়ে দিয়ে রাজ্জো ও রেদোয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল ছি ব্রো! তোদের মিনিমাম লজ্জাও নেই? ছোট বোনের রোমান্স দেখতে চলে আসছিস।এই বলে ইউভি বাগানের দিকে হাঁটতে হাঁটতে বিড়বিড় করে বলল যেমন বেয়াদব ভাই, তার তেমন বেয়াদব বোন!তারপর পিয়াসার হাত ধরে তাকে সঙ্গে নিয়ে যেতে যেতে বলল,চল বনু। এই বেয়াদবটার সঙ্গে বেশি থাকলে তুইও বেয়াদব হয়ে যাবি।পিয়াসা যেতে যেতে রেদোয়ানের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে ফেলল। রেদোয়ান তখন রাজ্জোর দিকে তাকিয়ে ভ্রু নাচিয়ে বলল দেখেছিস, ব্রো? তার বোনই আমাকে জোর করে এখানে নিয়ে এলো!
রেদোয়ানের কথা শুনে ইনায়া হাসতে হাসতে এসে তাকে জড়িয়ে ধরে বলল কষ্ট পেও না, ভাইয়া। চলো, আমরা বেয়াদবই ভালো আছি!

দুজনেই হাসতে হাসতে সেখান থেকে চলে গেল।এদিকে রাজ্জো তখন তুবার দিকে তাকিয়ে আছে সে যেন চোখের পলক ফেলতেও ভুলে গেছে। তুবা প্রথমে বিষয়টা বুঝতে না পেরে একটু অস্বস্তিতে পড়ল। তারপর আলতো করে রাজ্যর মুখে হাত রেখে মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিয়ে বললওই দিকে তাকাও।রাজ্জো আবারও চোখ ঘুরিয়ে তুবার দিকেই তাকাল।তুবা এবার বিরক্ত হয়ে আবার তার মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিয়ে বলল পাগল হয়ে গেলে নাকি?রাজ্জো মুচকি হেসে তুবার দিকে তাকিয়ে বলল চলো না, পিচ্চি। আমিও একটু জঙ্গলে মঙ্গল করে আসি।তুবা সঙ্গে সঙ্গে এক পা তুলে রাজ্জোর পায়ের ওপর হাইহিল দিয়ে পাড়া দিয়ে দাঁত কিড়মিড় করে বলল স্বপ্ন দেখো, শালা!
রাজ্জো ব্যথায় ককিয়ে উঠল। তারপর নিজের পা দুহাতে ধরে সেখানেই বসে পড়ল আহহ! ডাক্তার সাহেবা আপনার চিকিৎসা তো রোগীকে সুস্থ করার বদলে সরাসরি হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে দেবে!তুবা ভ্রু কুঁচকে একেবারে বলল চিন্তার কোনো কারণ নেই। রোগীর পা দেখে মনে হচ্ছে, বুদ্ধির সঙ্গে পায়েরও সমস্যা আছে। চিকিৎসা হিসেবে আজীবন আমার থেকে দশ হাত দূরে থাকার প্রেসক্রিপশন দিলাম!রাজ্জো পা ধরে বসেই অসহায় মুখে বলল,
এ কেমন ডাক্তার রে বাবা! ওষুধ না দিয়ে সরাসরি দূরে থাকার প্রেসক্রিপশন দিয়ে দিলে।

সবাই বাগানের এসে পৌঁছাতেই হঠাৎ তাদের চোখে পড়ল রিটা মুন্টু চাচাকে সঙ্গে নিয়ে এদিকেই এগিয়ে আসছে। মুন্টু চাচাকে দেখামাত্র ইনায়া, পিয়াসা ও তুবা একসঙ্গে আনন্দে চিৎকার করে বললো চাচা!তিনজনই যেন মুহূর্তের মধ্যে ছোট্ট বাচ্চা হয়ে গেল। একসঙ্গে ছুটে গিয়ে মুন্টু চাচাকে ঘিরে দাঁড়াল তারা।পিয়াসা হাসতে হাসতে বলল,
চাচা কেমন আছো তুমি? তুমি আসছো!মুন্টু চাচা মুচকি হেসে বললেন না এসে কি আর উপায় আছে? ইউভি বাবা জোর করে ধরে নিয়ে আসছে!ইনায়া হেসে বললনএকদম ঠিক করেছে। আজ সারাদিন আমাদের সঙ্গে থাকবে।পিয়াসা আর তুবাও বলল চাচা, তোমাকে দেখে ভীষণ ভালো লাগছে প্রণয় তুর্জো আর ইচ্ছেও তোমাকে দেখলে অনেক খুশি হবে। মুন্টু চাচা তারাহুরো করে বললো ওরা কোথায়?
মুন্টু চাচা আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালেন না ওদের কাছে এতক্ষণ ধরে শুধু বাচ্চাদের কাছে যাওয়ার অপেক্ষাতেই ছিলেন সে সঙ্গে সঙ্গে বললেন তোমরা সরে দাঁড়াও, আমি আমার দাদুভাইদের কাছে যাই!কথা শেষ করেই প্রায় দৌড়ে চলে গেলেন বাচ্চাদের কাছে। দূর থেকেই প্রণয়, তুর্জো আর ইচ্ছেকে দেখতে পেয়ে তার মুখ আনন্দে ভরে উঠল। বাচ্চারাও মুন্টু চাচাকে দেখে ছুটে এসে তাকে ঘিরে ধরল দাদুভাই বলে ডাকতে লাগলো

এভাবেই হাসি-ঠাট্টা আর গল্পের মধ্যে কেটে গেল বেশ কিছুটা সময়। রান্না শেষ হতেই রেশমা চৌধুরী নুসরাত চৌধুরী সবাই কে খেতে দিল একে একে সবাই খাবার খেতে বসে পড়ল। মাটির চুলায় রান্না করা গরম গরম খাবারের গন্ধে পুরো বাগান মাতোয়ারা ওয়ে উঠেছে সবাই তৃপ্তি করে খাওয়া-দাওয়া শেষ করে আবার গোল হয়ে বসে গল্পে মেতে উঠল। ঠিক তখনই ইউভি উঠে দাঁড়িয়ে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করল। তারপর মুচকি হেসে বললো লেডিস অ্যান্ড জেন্টলম্যান! এবার শুরু হবে আসল মজা। এবার একটা ছোট্ট গেম হবে। আর এই গেমে চৌধুরী পরিবারের সবাই অংশগ্রহণ করবে।ইউভি একটু চারপাশে তাকিয়ে বলল শুধু ছোট নবাব বাদ!
রিদ সঙ্গে সঙ্গে ভ্রু কুঁচকে ইউভির দিকে তাকাল। ইউভি হেসে বলল কারণ ছোট নবাবের ওপর আজ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দিচ্ছি আমি তোর গান অন-অফ করার দায়িত্ব দিলাম । ইউভি এবার গেমের নিয়ম বুঝিয়ে বলল,খেলা খুব সহজ। সবাই গোল হয়ে বসবে। সবার হাতে হাতে একটা বালিশ ঘুরবে। গান বাজতে শুরু করলে যার হাতে বালিশ থাকবে, সে সঙ্গে সঙ্গে পাশের জনের দিকে ছুড়ে দেবে। এভাবে বালিশটা ঘুরতে থাকবে। কিন্তু গান বন্ধ হয়ে গেলে যার হাতে বালিশ থাকবে, সে এই রাউন্ড থেকে বাদ বুঝেছো।

—এভাবে একে একে সবাই বাদ পড়বে। শেষ পর্যন্ত যে দুজন থাকবে, তাদের মধ্যে আবার ফাইনাল রাউন্ড হবে। আর আজ দেখা যাবে, চৌধুরী পরিবারের আসল চ্যাম্পিয়ন কে!কথা শেষ হতেই সবাই উৎসাহে হাততালি দিয়ে উঠল।বাগানের মাঝখানে সবাই গোল হয়ে বসতে শুরু করল। একদিকে ইউভির পাশে ইনায়া তারপর পিয়াসা, রেদোয়ান তুবা, রাজ্জো, প্রণয়, তুর্জো, রিমঝিম, রৌদিক লিখন চৌধুরী নুসরাত চৌধুরী আয়াত আতিকা, একে একে পরিবারের সবাই জায়গা করে নিল। একটু দূরে মুন্টু চাচা ইচ্ছের সঙ্গে বসে গেম খেলা দেখার জন্য বসলেন।সবশেষে গোলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে রিদ নিজের বক্সটা ঠিক করে নিল।রেডি?সবাই একসঙ্গে চিৎকার করে উঠল রেডি!
রিদ বক্সে গান চালু করতেই বালিশটা প্রথমে ইউভির হাতে ছিল। গান বাজতেই ইউভি বালিশটা ইনায়ার দিকে ছুড়ে দিল। ইনায়া সঙ্গে সঙ্গে সেটা পিয়াসার দিকে ছুড়ে দিল। পিয়াসা রেদোয়ানের দিকে, রেদোয়ান তুবার দিকে, তুবা রাজ্জোর দিকেএভাবেই বালিশটা একে একে সবার হাতে ঘুরতে লাগল।কেউ বালিশ ছুড়ে দিতে গিয়ে ভুল করে পাশের জনের কোলে ফেলে দিচ্ছে, কেউ আবার বালিশ হাতে নিয়ে এত দ্রুত ছুড়ে দিচ্ছে যে অন্যজন ধরতেই হিমশিম খাচ্ছে। হঠাৎ রিদ গান বন্ধ করে দিল।সবাই থমকে গেল।যার হাতে বালিশ ছিল, সে হলো রৌদিক।রৌদিক নিজের হাতে থাকা বালিশটার দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর মুখ কুঁচকে বলল আমি বাদ?
রিদ বলল হ্যাঁ, প্রথম উইকেট পড়েছে!রৌদিক ভীষণ বিরক্ত মুখে উঠে গিয়ে পাশে বসে পড়ল। খেলা আবার শুরু হলো।দ্বিতীয় রাউন্ডে বালিশ ঘুরতে ঘুরতে এবার এসে থামল তুর্জোর হাতে। তুর্জো বালিশটা হাতে নিয়ে বলল,
আমি ও বাদ এই টা অন্যায় রিদ সঙ্গে সঙ্গে বলল,

গেমে কোনো অন্যায় নেই। ভাগ্য খারাপ তোমার
তুর্জো অনিচ্ছায় উঠে দাঁড়াতেই সবাই আবার গেম শুরু করল।তৃতীয় রাউন্ডে বাদ পড়ল তুবা। তুবা উঠে দাঁড়িয়ে রাজ্জোর দিকে তাকিয়ে বলল,
তুমি নিশ্চয়ই আমার দিকে ইচ্ছে করে বালিশটা ধীরে দিয়েছিলে এর শোধ আমি নিব দশ হাত না বিশ হাত দূরে থাকবে আমার থেকে।

রাজ্জো সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করে বলল আমি? আমি তো তোমাকে জেতাতেই চেয়েছিলাম তুবা চোখ রাঙিয়ে বলল চুপ।এভাবে একের পর এক রাউন্ড চলতে থাকল।একসময় খেলায় রয়ে গেল মাত্র কয়েকজন।ইনায়া, ইউভি, রাজ্জো, রিমঝিম, রেশমা চৌধুরী এবং লিখন চৌধুরী।গান আবার বাজতে শুরু করল। বালিশ ঘুরতে লাগল দ্রুত। সবার চোখ তখন বালিশের দিকে। কেউ কারও দিকে তাকাচ্ছে না, শুধু বালিশটা নিজের হাতে না থাকে হঠাৎ গান বন্ধ হতেই বালিশ রিমঝিমের হাতে ছিল রিমঝিম হেসে মাথা নেড়ে বললেন,ঠিক আছে, আমি বাদ।এবার রইল পাঁচজন।পরের রাউন্ডে বাদ পড়ল রাজ্জো। এরপর একে একে ইনায়া ও ইউভিও বাদ পড়ল। শেষ পর্যন্ত গোল হয়ে বসে রইলেন মাত্র দুজন লিখন চৌধুরী ও রেশমা চৌধুরী।চারপাশ থেকে সবাই চিৎকার করে তাদের উৎসাহ দিতে
লাগল।

রেশমা চৌধুরী লিখন চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললেন এখন কিন্তু বুড়ো বয়সের ঢং দেখিয়ে জিততে পারবে না আর চিটিংবাজি একদম করবে না বুঝেছো। লিখন চৌধুরী সঙ্গে সঙ্গে বললেন আর দেখো নিয়ো। রেশমা, প্রমাণ করেই দেব এই বুড়ো এখনো যথেষ্ট ফিট!রিদ আবার গান চালু করল।বালিশটা প্রথমে রেশমা চৌধুরীর হাতে ছিল তিনি দ্রুত লিখন চৌধুরীর দিকে ছুড়ে দিলেন। লিখন চৌধুরী ও সঙ্গে সঙ্গে সেটা ফিরিয়ে দিলেন। হঠাৎ গান থেমে গেলেই দেখা গেল বালিশটা রেশমা চৌধুরীর হাতে
এক মুহূর্তের জন্য সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল। তারপর সবাই একসঙ্গে চিৎকার করে উঠল।লিখন চৌধুরী সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়িয়ে দুই হাত উঁচু করে বললেন,বলেছিলাম না! এখনো বুড়ো হইনি!রেশমা চৌধুরী হেসে বললেন হয়েছে হয়েছে! এবার থামো তো সারাদিন এই এক কথা শুনতে হবে এখন থেকে। লিখন চৌধুরী বিজয়ীর হাসি হেসে বললেন,
কী করব বলো? প্রতিভা জিনিসটাই এমন!
তার কথা শুনে সবাই আবারও হেসে উঠল। আর এদিকে রিদ বক্স এ বিজয় সঙ্গীত বাজিয়ে দিয়ে বললো চাচ্চু তোমার পুরষ্কার।

বিকালের নাস্তার জন্য রেশমা চৌধুরী মাংস আর চালের রুটি করবে। সেটারি প্রস্তুতি নিচ্ছে সে।ইউভি দূর থেকে মাকে দেখতে পেয়ে সোজা এগিয়ে গেল রেশমা চৌধুরীর কাছে। রেশমা চৌধুরী তখন মাংস রান্নার প্রস্তুতির জন্য আলু ভেজে রাখছিলেন। ইউভি কাছে গিয়ে ভাজা আলুর এক টুকরো তুলে মুখে দিয়ে খেতে খেতে মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,মা, ইচ্ছে কই?রেশমা চৌধুরী সঙ্গে সঙ্গে ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন কী রে? তোর এক মা সামনে দাঁড়িয়ে আছে, তাতেও তোর হচ্ছে না?ইউভি মায়ের কথায় হেসে ফেলল। তারপর এক পা এগিয়ে মায়ের গালে আলতো করে চুমু দিয়ে আদুরে কণ্ঠে বলল,
তোমার সঙ্গে কি আর অন্য কোনো মায়ের তুলনা হয় বলো তো? আমার জীবনে এমন হাজারটা মা এলেও তুমি আমার বেস্ট মা হয়েই থাকবে।রেশমা চৌধুরী মুখে বিরক্তির ভাব এনে বললেন হয়েছে, হয়েছে! এবার দূরে যা। ঝাল লেগে যাবে। আর নূরকে ওইভাবে তাড়া করলি কেন?ইউভি হেসে বলল ও বুঝবে না। কথাটা বলে ইউভি একটু থেমে মায়ের মুখের দিকে তাকাল। পরক্ষণেই তার চোখে পড়ল, রেশমা চৌধুরী কেমন এক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছেন। ইউভি ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,

কী দেখো?
রেশমা চৌধুরী চোখের কোণে তখন চিকচিক করছে পানি । তিনি তাড়াতাড়ি আঁচল দিয়ে চোখের পানি মুছে নিলেন। তারপর ধীর কণ্ঠে বললেন যখন তুই ছোট ছিলি চৌধুরী বাড়ি থেকে চলে যাওয়ার আগে তুই ঠিক এভাবেই আমার কাছে এসে দাঁড়াতি। আমি যখন মাংসর জন্য আলু ভেজে রাখতাম, তুই ঠিক এভাবেই এক টুকরো করে তুলে নিয়ে খেতি। একসময় এই আলু ভাজাটাই ছিল তোর সবচেয়ে পছন্দের খাবার।কিন্তু যখন ফিরে এলি, তখন তোকে আর কোনোদিন আলু খেতে দেখিনি। শুধু ওই ডায়েট করিস ওই সব শাকপাতা আর সেদ্ধ খাবার খেয়ে আমার ছেলের মুখে স্বাদ নেই!
ইউভি মায়ের কথায় মৃদু হেসে তার আচলে হাত টা মুছে তারপর বলল এখন থেকে খাব। তোমার হাতের আলু ভাজা থেকে আর নিজেকে দূরে রাখব না প্রমিচ মা ।

ইচ্ছে কোথায় আছে সেটা খুঁজতে খুঁজতে কিছুটা দূরে যেতেই তার চোখে পড়ল ইচ্ছে একটি বড় কাঠগোলাপ গাছের নিচে বসে আছে। পাশে আয়াত আর আতিকা। তিনজন মিলে গাছের নিচে পড়ে থাকা কাঠগোলাপের ফুল কুড়িয়ে ছোট্ট ঝুড়িতে রাখছে। তাদের হাসি আর ছোটাছুটিতে বাগানের সেই কোণটুকুও যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে।কাছেই রিদ বক্স বাজিয়ে চলেছে। অন্যদিকে প্রণয়, তুর্জো ও রৌদিক ছুটোছুটি করে বল খেলছে। আর কিছুটা দূরে রিমঝিম চৌধুরী দাঁড়িয়ে কারও জন্য অপেক্ষা করছেন সম্ভবত রাশেদ মির্জার।
ইউভি ধীরে ধীরে ইচ্ছের কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে মেয়ের মাথায় হাত রেখে বলল মা কী করো তুমি?ইচ্ছে মাথা তুলে বাবার দিকে তাকিয়ে বলল,ফুল কুলাই পাপা! দেখো, কত সুন্ সুন্দল ফুল!ইউভি মেয়ের ছোট্ট ঝুড়িটার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল। ঠিক তখনই ইনায়া ইচ্ছেকে খুঁজতে খুঁজতে সেখানে এসে পৌঁছাল। দূর থেকেই মেয়ে আর তার বাবাকে একসঙ্গে দেখে সে নিঃশব্দে একটু পেছনে দাঁড়িয়ে গেল। তার চোখে ফুটে উঠল একরাশ মায়া একটা মেয়ের জীবনে এর থেকে সুখের মূহুর্তে বুজি আর কিচ্ছুটি তে নেই।
ইউভি গাছের নিচ থেকে একটি সুন্দর কাঠগোলাপ তুলে নিল। তারপর ইচ্ছের কানের পাশে ফুলটি গুঁজে দিয়ে আদুরে গলায় বলল নো, মা। ফুলটা সুন্দর ঠিকই কিন্তু ফুলের থেকেও বেশি সুন্দর তুমি।ইচ্ছের মুখ মুহূর্তেই আনন্দে ঝলমল করে উঠল। খিলখিল করে হেসে বলল থ্যাঙ্ক ইউ পাপা!

কিছুক্ষণ পর ইচ্ছে যেন গভীরভাবে কিছু ভেবে বাবার দিকে তাকিয়ে বলল নো, পাপা! আমাল মাম্মা বেশি সুন্দল। মাম্মার তুল বেশি সুন্দল মাম্মার মুখ নলম. মাম্মাই বেশি সুন্দল।ইচ্ছের কথা শুনে ইউভির ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠল।হ্যাঁ মা, তোমার মাম্মা অনেক সুন্দর। চাঁদের মতো সুন্দর। তবে শুধু চাঁদের মতো বললে তো তোমার মাম্মার সৌন্দর্য পুরোটা বলা হয় না। তোমার মাম্মার মুখে যে মায়া আছে সেটা ভোরের নরম আলোয়ের মতো। তার হাসিটা যেন কাঠগোলাপের সুবাসের মতো নীরবে চারপাশটা সুন্দর করে দেয়। আর তার চোখ দুটো সেখানে তাকালে মনে হয়, পৃথিবীর সব শান্তি যেন ওই দুই চোখের ভেতর লুকিয়ে আছে। তোমার মাম্মা শুধু দেখতে সুন্দর নয় তার মনটাও ভীষণ সুন্দর। তাই তো তোমার পাপার চোখে তোমার মাম্মাই পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর নারী।
ইনায়া দূর থেকে ইউভির কথাগুলো শুনে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। নিঃশব্দে এসে তাদের দুজনের পাশে বসে পড়ল। দুজনের দিকে তাকিয়ে বলল কী হচ্ছে এখানে?ইচ্ছে সঙ্গে সঙ্গে মায়ের কোলে উঠে বসল। তারপর ছোট্ট দুহাত দিয়ে মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে আদুরে কণ্ঠে বলল তোই কিতু না, মাম্মাম!এরপর মায়ের গালে ও কপালে টুপটাপ কয়েকটা চুমু দিয়ে ইচ্ছে মিষ্টি গলায় বলল সরি মাম্মাম। তোমাল সাথে আর আরি করব না।ইনায়া মেয়ের কপালে আলতো করে চুমু দিয়ে তাকে বুকে জড়িয়ে বলল।আমার সোনা মা!

ইউভি পাশে বসে মা-মেয়ের মিল দেখে বলল, বাহ মা মেয়ের ভাব হয়ে গেছে! এখন তো আর আমাকে লাগবে না। আমি তাহলে যাই।ইউভি উঠে যাওয়ার ভান করতেই ইচ্ছে সঙ্গে সঙ্গে তার হাত ধরে ফেলল। ছোট্ট মুখে দুষ্টু হাসি ফুটিয়ে বলল বতো বতো পাপা! তুমি মাম্মাকেও আমাল মতো ফুল দাও।মেয়ের পাকা পাকা কথা শুনে ইউভি হেসে ফেলল। সে আবার হাত বাড়িয়ে একটি সুন্দর কাঠগোলাপ তুলে নিল। তারপর ইনায়ার কানের পাশে আলতো করে ফুলটি গুঁজে দিল। ইচ্ছে এবার আনন্দে দুজনের মাঝখানে এসে বসে পড়ল। একবার মায়ের দিকে, আবার বাবার দিকে তাকিয়ে খুশি গলায় বলল লাভ ইউ পাপা লাভ ইউ মাম্মা!
ইনায়া আর ইউভি দুজনেই একসঙ্গে নলল,

লাভ ইউ, প্রিন্সেস!ইউভি ইনায়ার দিকে তাকিয়ে ও একি ভাবে বলল,ভালোবাসি, আদর।ইনায়া কথাটা শুনে ইউভির দিকে তাকাতেই ইউভি একটু এগিয়ে এলো। তারপর ইনায়ার কপালে আলতো করে চুমু দিয়ে ফিসফিস করে বলল ভালোবাসি, আদর। বড্ড ভালোবাসি। ভালোবাসার থেকেও বেশি ভালোবাসি।
ইনায়ার ইউভির হাতটা নিজের মুঠোর মধ্যে নিয়ে আলতো করে চুমু খেয়ে নরম কণ্ঠে বলল আমিও তোমাকে ভীষণ ভালোবাসি, আমার শেহজাদা।ইচ্ছে বাবা-মায়ের এমন ভালোবাসা দেখে নিজেও যেন বাদ পড়তে রাজি নয়। সে দুজনের কপালে পরপর দুটো চুমু দিয়ে বলল,ইত্তেও তোমাদেল দুদনকে অনেক ভালোবাতে মাম্মা-পাপা দুজনতেই!

ইচ্ছে কথা শেষ করতেই ইউভি আর ইনায়া একসঙ্গে মেয়েকে চুমু খাওয়ার জন্য এগিয়ে গেল। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে ইচ্ছে দুষ্টুমি করে একটু নিচু হয়ে গেল। ফলে দুজনের মাথা একসঙ্গে গিয়ে ঠুকল।দুজনেই কপালে হাত দিয়ে থমকে গেল। তাদের এই অবস্থা দেখে ইচ্ছে কিছুক্ষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে থেকে খিলখিল করে হেসে উঠল
ইউভি কপালে হাত বুলাতে বুলাতে ইনায়ার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল তোমার মেয়ে না একটু তো দুষ্টু হবেই।ইনায়াও একইভাবে ফিসফিস করে বলল তোমার মেয়ে।ইউভি এবার ইনায়ার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল না আদর। আমাদের মেয়ে।

শেহেজাদার আদর পর্ব ৭৪

কথাটা বলেই সে ইনায়াকে আলতো করে নিজের বুকের এক পাশে টেনে নিল অন্য পাশে ইচ্ছে কে। ইনায়ার কপালে একটি ভালোবাসার পরশ একে বললো। আমার আদর!!!!,ইনায়া কিছু না বলে শুধু মৃদু হেসে ইউভির বুকে মাথা রাখল। আর তাদের মাঝখানে বসে থাকা ছোট্ট ইচ্ছে দুজনের দিকে তাকিয়ে আবারও খিলখিল করে হেসে উঠল।

সমাপ্ত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here