শ্যামা সুন্দরী পর্ব ২৩
সুরভী আক্তার
শ্যামার চুলের ভাঁজে নাক ডুবিয়ে সংগ্রাম পর পর কয়েক বার ঘ্রাণ টানলো চোখ বুজে । শ্যামা ঘাঢ় কাত করে সংগ্রামের এহেন কান্ড দেখে ঠোঁট চেপে মিটিমিটি হাসছে । সংগ্রাম খেই হারিয়ে চুলের ভাঁজে চুমু খেলো । হাস্কি স্বরে বলল…
” চুলে কি মাখো বলো তো , বেগম ? এতো মোহনীয় গন্ধ নাকে লাগছে কেনো ?
শ্যামার শান্ত, নির্লিপ্ত জবাব…
” কিছুই না..!
সংগ্রাম তার বেগমের কাঁধে থুতনি ঠেকিয়ে , পেছন থেকে জড়ালো । অতঃপর ঠোঁট চেপে বললো…
” তাহলে এটা আমায় এতো প্রলুব্ধ করছে কেনো বলোতো ?
” আমি কি জানি ?
শ্যামার মুখের লাজুক আভা অল্প বিস্তর দেখতে পেলো সংগ্রাম । মুচকি হাসলো সে । অতঃপর নিজের কাজে মনযোগ দিলো । একপাশ থেকে শ্যামার চুলের গোছা আলাদা করে করে আলতো হাতে তেল মালিশ করে দিতে লাগলো সে । শ্যামা নরম আবেশে সামনের আয়নাতে চোখ ভরে দেখছে সংগ্রাম কে । সংগ্রাম নিজের কাজে ব্যাস্ত । একদম একাগ্রতা বজায় রেখেছে সে নিজের কাজে । যেন কোনো বিশেষ কার্য করছে । তবে ওর কাছে এটা বিশেষের থেকে কম কিছু নয় । বিশেষের থেকেও বিশেষ । শ্যামার লম্বা চুল গুলো সামলে উঠতে পারছে না সংগ্রাম, মাঝে মাঝে ঠোঁট কামড়ে ফোঁস ফোঁস করে শ্বাস ফেলছে । শ্যামা মুচকি হাসছে এসব দেখে । সংগ্রামের অবস্থা প্রায় বেহাল , পুরুষ মানুষ – এসব কি আগে কখনো করেছে নাকি ? সংগ্রামের অবস্থা দেখেও শ্যামার একটুও অভিপ্রায় জাগলো না ওকে আটকানোর বা বারন করার । সে নিজেও উপভোগ করছে ওর যত্ন টুকু । এসব যে ওর জীবনে আসবে, কখনো কি স্বপ্নেও ভেবেছিল ও ? শ্যামার চাহনি নিগুড়, শান্ত । সে চেয়ে আছে এক দৃষ্টে । দীর্ঘ সময় পর সংগ্রাম তার পুরো কাজ শেষ করে হাঁফ ছাড়ল । চুলে মোটা বেনি করে দিয়েছে শ্যামার । এতোক্ষণ নিরবতা ছিল দু’জনের মাঝেই । এবার নীরবতা ভেঙে মুখ খুললো সংগ্রাম….
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
” ঠিক ঠাক হয়েছে তো বেগম ? দেখো তো…
শ্যামা আয়নায় নিজেকে দেখলো এক ঝলক । সংগ্রাম আয়নাতেই শ্যামার পানে চেয়ে আছে । শ্যামাও একই ভাবে চেয়ে বললো…
” একদম ঠিকঠাক…
কিন্তু , আপনি বেনি করা শিখলেন কিভাবে ?
সংগ্রাম ফের পেছন থেকে জড়ালো । স্বাভাবিক কন্ঠে বলল…
” ছোট বেলায় একবার দেখেছিলাম । যখন দাদি জান বালার চুলে বেনি করে দিচ্ছিল তখন । এক দেখাতেই শিখে রেখেছিলাম । দেখো,আজ কাজে আসলো..!
” ওও..
শ্যামার ছোট্ট জবাবে মন ভরলো না সংগ্রামের । খটকা লাগতেই সে তৎক্ষণাৎ নিজে থেকেই বললো…
” আমার সব কিছুই শুধু তোমার জন্য বেগম । আমার যত্ন, ভালোবাসা , আমার দৃষ্টি , এমনকি এই আমি পুরোটাই শুধু তোমার । আমার জীবনের একমাত্র নারী ,, আমার অস্তিত্ব জুড়ে শুধুই তুমি আর তুমি ।
আমায় নিয়ে কখনো ভুল ধারণা পোষণ করো না নিজের মাঝে !
” আপনাকে নিয়ে ভুল ধারণা কখনোই জন্মায় না আমার মনে !
” জন্মাবে কি করে ,, আমার বেগম তো আমার , আর আমিটাই তো আমার বেগমের , তাহলে আমাকে নিয়ে ভুল ধারণা জন্মাবে কি করে ? আমরা একে অপরের , আমি তোমার আর তুমি শুধু আমার…
” আমি তো আপনারি ছোট জমিদার সাহেব ,, আপনি শুধু আমার হয়ে থাকবেন সারা জীবন । তাতেই হবে আমার….
শ্যামার নরম ব্যাহত স্বরের বিপরীতে সংগ্রাম ও নরম কন্ঠে বলল…
” আমিও তো তোমারই , শুধু আমার বেগমের… আমার ডালিয়ার..।
শ্যামা নরম হাসলো । ওর নজর কাড়ক স্নিগ্ধ হাসি টুকু দেখে সংগ্রাম আপ্লুত চোখে চেয়ে আবারো বললো…
” তোমার কোন জিনিস টা আমার সবচেয়ে প্রিয়, জানো বেগম ?
শ্যামা আগ্রহী হয়ে শুধালো…
” কোন জিনিস ?
সংগ্রাম মুচকি হাসলো , হাত বাড়িয়ে শ্যামার গালে রাখলো । বৃদ্ধা আঙ্গুলের ডগা শ্যামার ঠোঁটের কোণে রেখে সেদিকটায় স্নিগ্ধ নয়নে তাকিয়ে মোলায়েম স্বরে বলল…
” তোমার এই ঠোঁটের হাসি টুকু ! এটা আমার অতিব প্রিয় প্রাপ্তি, আমার প্রশান্তি । তুমি নিজেও জানো না, তোমার এই নরম হাসিটা ঠিক কতটা সুন্দর ! আমিও বলে প্রকাশ করতে পারবো না , হয়তো । মহাবিশ্বের সকল কিছুর উর্ধ্বে তোমার এই হাসি প্রাপ্তির মূল । যা আমি কিনে নিয়েছি , শুধু আমার জন্য , আমার চোখের প্রশান্তির জন্য ।
প্রত্যেক বারের মতো হতবাক শ্যামা । সংগ্রামের এই কথা গুলোর পরিপ্রেক্ষিতে বলার মতো কথা খুঁজে পায় না সে । খুঁজে পায় , তবে যা পায় , তা দ্বারা শুধু নিজেকে তাচ্ছিল্য করাই হয় । ছোট করা হয় নিজেকে । যা সংগ্রামের পছন্দ নয় । সংগ্রামের কথা শেষ হতেই শ্যামা আচমকা বলে ফেললো…
” আমার হাসিটা আপনার প্রিয় । কিন্তু জানেন ,, আপনি পুরোটাই আমার প্রিয় । আমার প্রিয়র কারনে আমার ঠোঁটে হাসি ফোটে , আবার দেখুন, সেই হাসিটাই আবার আমার প্রিয়র প্রিয় ! কি অদ্ভুত না ?
সংগ্রাম হেসে ফেললো । শ্যামা চেয়ে দেখলো, পরমুহূর্তে কৌতুহলি হয়ে শুধালো….
” আচ্ছা ,, আপনি এতো সুন্দর কেনো , ছোট জমিদার সাহেব ? অতি মাত্রার সুন্দর পুরুষ আপনি । জীবনে পুরুষ দেখেছি কম , দেখেছি হাতে গোনা দু-একটা । তবে তারা কেউই আপনার মতো নয় , আপনার ধারের কাছেও নেই কারোর অবস্থান । কি জানেন ? আপনাকে দেখার পর অন্য যে দু একটা পুরুষের চেহারা দেখেছিলাম, সে দুটোও বেমালুম ভুলে গেছি । একদম মুছে গেছে স্মৃতি থেকে । আপনাকে দেখার পর দুনিয়াবি অন্য সকল পুরুষ যে যেমনই হোক না কেনো , আমি জানি আপনার কাছে সবাই তুচ্ছ , আপনার মতো কেউ নয় । আপনি আলাদা সবার থেকে । আমার ছোট জমিদার সাহেব এই দুনিয়ায় সবথেকে সুন্দর পুরুষ…
” যে শুধুই তোমার…
শ্যামার মুখের কথা কেড়ে ঝট করে বললো সংগ্রাম । আবারো বলতে শুরু করলো…
” তোমার চোখে আমি কেনো এতো সুন্দর জানো ? কারন তুমি পুরুষ দেখোনি , আমি কিন্তু মেয়ে দেখেছি অনেক , তবে তোমার মতো দেখিনি দুটোও । তাহলে ভাবো , তুমি আমার চোখে কতটা সুন্দর ! আমরা একে অপরের চোখে সুন্দর , কারন আমরা একে অপরকে ভালোবাসি । সৌন্দর্য চোখে নয় , মনে ধরা দেয় । যে যাকে যত বেশি ভালোবাসে, তার চোখে সে ততো বেশি সুন্দর , আর মনেও । আমি যদি তোমাকে বোঝাতে পারতাম, আমি তোমাকে কতটা ভালোবাসি, তাহলে তুমি বুঝতে – তুমি ঠিক কতটা তীব্র সৌন্দর্যের অধিকারিণী । যে সৌন্দর্য প্রথমে আমার মনে ধরেছে, তারপর চোখে । এখন যার প্রখরতা বেড়েই যাচ্ছে দিন দিন ।
শ্যামার ডাগর চোখা চাহনি বৃহৎ । এই লোকটা যতটা না সুন্দর, তার চেয়েও বেশি সুন্দর তার কথা গুলো । যে কিনা শ্যামার মতো, শ্যামলা একটা মেয়ের সৌন্দর্য নিয়ে এতো গুলো কথা বলছে, তাও আবার অনায়াসে ! শ্যামা গায়ের রং,ওর সৌন্দর্য যেখানে এতো দিন অবহেলিত হয়ে এসেছে, আজ সেই সৌন্দর্যই নাকি এই সুদর্শন পুরুষ টার কাছে অতি যত্নপ্রাপ্ত ।
সবে সকাল । ভোরের আলো ফুটেছে চারদিকে । ঠিক ফজরের পর ঘুম ভেঙ্গে গেছে বালার । একটা পাতলা চাদর জড়িয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছিল সে । শীতের কুয়াশামাখা ভোরে ঘোলাটে ঝাপসা হয়ে আছে আশপাশ । বালা উপর থেকে দেখলো নিচে বাগানের শিউলি গাছের নিচটা পুরো সাদা হয়ে আছে । শিউলি ঝরে পড়ে আছে ভেজা ঘাসের উপর । ফুলে ফুলে ভরে আছে গাছের নিচটা । যেটা দেখতেও বেশ আকর্ষণীয় লাগছে । যা দেখে বালার সদ্য ঘুম ছুটে যাওয়া আধো চোখ দুটো বৃহৎ আকার ধারণ করলো । নিচে যাওয়ার বাসনা জাগলো মনে । যে বাসনা কে দমিয়ে রাখতে পারলো না সে । বারান্দা ছেড়ে ঘরে এসে হাতে কিছু একটা নিয়ে ছুট লাগালো বাইরের দিকে । পা টিপে টিপে সংগ্রামের ঘর পেরিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামলো ।
আবারো এক ছুটে বের হলো অন্দর থেকে । এবার থামলো বাগানে গিয়ে, সোজা শিউলি গাছটার নিচে । আশপাশ ভরে আছে মিষ্টি শেফালির গন্ধে । যা চোখ বুজে শ্বাস টেনে অনুভব করলো বালা । গাছের নিচে এতো গুলো ফুল দেখে উৎফুল্ল হাসি ফুটলো মেয়েটার স্নিগ্ধ মুখে । একে একে ফুল কুড়িয়ে ওরনার ভাঁজে রাখলো সে । অতঃপর একপাশে বসে চিকন লম্বা মালা গাঁথলো সেগুলোর । সবশেষে লম্বা মালা খানা এলোমেলো বিনুনি টাতে জড়ালো । কাল রাতে চুলে বেনি করে ঘুমিয়েছিল , সকাল হতে হতে এলোমেলো হয়ে গেছে বেনিটা । বালা মালা খানা বেনিতে জড়িয়ে বেনিটা সামনে আনলো । নাক এগিয়ে গন্ধ টেনে নিলো সেটার । এবার উঠে দাঁড়ালো ঘরে যাওয়ার জন্য । সূর্য ওঠে নি এখনো । আশপাশ টা কুয়াশার চাদরে তলিয়ে আছে ।
বালা গাঁ ঝেড়ে উঠতেই মালা গাঁথা সুঁই টা ঝট করে পড়লো কোচা থেকে । অমনি তড়াৎ চোখে বালা তাকালো সেদিকে । ছোট্ট সুঁই টা সবুজ ঘাসের মাঝে খুঁজে পাওয়া গেল না কোথাও । ঘাস হাতড়ে খুঁজলো বালা, পেলো না । অতঃপর আশা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো । ভেজা শিশিরে খালি পা ভিজে একাকার । ঠান্ডা উঠছে পা থেকে । বালা পাতলা চাদর টা ভালো করে গায়ে জড়ালো । বেনি খানা আলতো করে ঘাড় ঘুরিয়ে চাদরের উপরে রাখলো । বাগান থেকে বের হতেই দু পা এগোতেই মুখোমুখি হলো সেই দিনের সেই ছেলেটার । বালা সচকিত হয়ে উঠল তৎক্ষণাৎ । চোখ তুললো উঁচু করে । সামনে অযাচিত কাউকে দেখে এড়ানোর চেষ্টা করলো । ভ্রুক্ষেপ দেখালো না কোনোরূপ । ভালো ভাবে দেখার চেষ্টাও করলো না । চোখ নামিয়ে পাশ কাটাতে গেলে পুরুষালি নিরেট কন্ঠ কানে ঠেকলো….
” শোনো….
থামলো বালা । ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে সময় নিয়ে সন্দিহান কন্ঠে প্রশ্ন ছুঁড়লো…
” আমাকে বলছেন ?
মেয়েটার শ্রুতিমধুর চিকন কন্ঠের সোজা প্রশ্নের উত্তর তৎক্ষণাৎ করলো না অংকুর । সটান দাঁড়িয়ে সে । ভ্রু দ্বয়ের মাঝে তিন স্তর ভাঁজ । শক্ত মুখের ভঙ্গিমা । সেও সময় নিয়ে নিরেট থেকেই চোখ ঘুরিয়ে বললো…
” আশেপাশে তো কেউ নেই , তার মানে তোমাকেই বলছি !
বালা সংকুচিত করলো চাহনি । অংকুর কে চোখ বুলিয়ে ভালো মতো দেখলো । কাঁধ পর্যন্ত বাবরি চুল এলোমেলো । শরীরে ছোট হাতা ওয়ালা পাতলা একটা গেঞ্জি । শক্ত পোক্ত বাহু দৃশ্যমান । বালা অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকালো , এই লোকটাকে কি ঠান্ডা লাগছে না, নাকি ? বালা কে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে অংকুর নিজে থেকেই বললো…
” দু-মিনিট দাঁড়াও তো এখানে , আমি আসছি ?
বলেই পা বাড়াতে গেলে,বালার প্রশ্ন সূচক কন্ঠ ভেসে আসলো…
” মানে ?
” সহজ বাংলা ভাষাতেই বললাম ।
তৎক্ষণাৎ উত্তর অংকেরর । না থেমে কথা টা বলে অতিথি শালার দিকে চলে গেলো সে । বালা ঠোঁট উল্টে ভ্রু কুঁচকালো । ওর এমন অদ্ভুত কথা আর ব্যবহার কোনো টাই বোধগম্য হলো না । ওরা যে শহর থেকে এসেছে জানে বালা । ওদের সম্পর্কে অবগত সে । মেয়ে গুলো কেও দেখেছে কয়েকবার ।
অংকুরের কথা এড়িয়ে সেখান থেকে চলে যাওয়ার জন্য পিছন ফিরলো বালা । এভাবে একটা অচেনা, অজানা, অযাচিত ছেলের সাথে কথা বলা শোভা পায় না । তাও আবার, ছেলেটার এমন অদ্ভুত ব্যবহারের পর তো একেবারেই না । বালা অন্দরের দিকে বড় বড় ধাপে কয়েক পা এগোতেই পেছন থেকে উঁচু আওয়াজে ডাকলো অংকুর….
” এই মেয়ে ,, কোথায় যাচ্ছো ? দাঁড়াতে বললাম না এখানে ? কথা কানে যায় না ?
খানিক ক্ষিপ্ত শোনালো গলার স্বর । বালা চমকে পিছন ফিরলো । অংকুর বোধহয় কপাল গুটিয়ে তাকিয়ে আছে । বাবরি চুলে কপাল ঢাকা থাকায় গোটানো কপালের ভাঁজ বোঝার জোঁ নেই । বালা ও সচকিত হয়ে শুকনো ঢোক গিললো । আর কয়েক ধাপ এগোলেই অন্দরের দরজা । এই সাত সকালে বাইরে কেউ নেই । যারা উঠেছে তারা ঘাটে গেছে হয়তো । এখানটা আপাতত ফাঁকা । ভীত সন্ত্রস্ত হলো বালা । এই অদ্ভুত ছেলেটার চাহনি তীক্ষ্ণ । সে তীক্ষ্ণ চোখে চেয়েই আদেশের সুরে বললো…
” এদিকে এসো ?
ভীত বালা ভীত কন্ঠেই শুধালো…
” কেনো ?
অংকুর চাহনি আরো বেশি কুঁচকে ফেললো । বিরক্ত হলো বোধহয় । শক্ত কন্ঠে বলল…
” বেশি কথা বলি না আমি , আর না বেশি কথা বলা পছন্দ করি । ভয় নেই ,,এসো এদিকে..
বালা এগোলো ছোট ছোট ধাপে । অনেকটা দুরত্ব বজায় রেখে সামনে গিয়ে থামলো । অংকুর তপ্ত শ্বাস ফেলে দু কদম এগিয়ে একটা গোল করে মোড়ানো কাগজ এগিয়ে দিলো বালার দিকে । এগিয়ে দিতে দিতে প্রশ্ন করলো….
” আমাকে চেনো ?
বালা কাগজ টার দিকে এক পলক চেয়ে মাথা ঝাঁকিয়ে হালকা কন্ঠে বলল…
” শহর থেকে এসেছেন আপনারা , শুনেছি !
” নাম কি তোমার ?
” সুরবালা !!
” জমিদার কন্যা ?
” না ,, জমিদার মামা হন আমার ?
বালার ভনিতা হীন সোজাসাপ্টা উত্তর দেখে অংকুরের শক্ত মুখশ্রী শীতল হলো । নত জানু বালার দিকে কয়েক পলক তাকিয়ে থেকে হাতের কাগজটা ইশারা করে বললো…
” ধরো এটা !
বালা চোখ তুললো । এক পলক কাগজ টার দিকে অন্য পলক অংকুরের দিকে । ওর প্রশ্ন সূচক চাহনি দেখে অংকুর নিজে থেকেই বললো…
” নাও , দেখো কি আছে ।
বালার কোমল চাহনি কাঁপছে । তবে অদ্ভুত ব্যাপার ভয় লাগছে না । ইতস্তত বোধ হচ্ছে একটু । সে সংশয় কাটালো । হাত বাড়িয়ে কাগজ টা হাতে নিয়ে খুললো সেটা । মোটা শক্ত কাগজ টার ভিতরের পৃষ্ঠে রঙ্গিন আঁকি বুকি দেখে চোখ কপালে উঠলো বালার । হাঁ বনে বৃহৎ নয়নে চাইলো সে । পরমুহূর্তে চোখ কুঁচকে চিত্রের দৃশ্য ধারণ করলো নিজের মস্তিষ্কে । ধারন করা মাত্রই চোখ মুখে নরম শীতলতা ফুটলো মেয়েটার । ঠোঁট জোড়া প্রসস্থ হলো আলতো । নজর সরছে না ওর । সে চেয়ে থেকেই আকস্মিক অবিশ্বাস্য নিয়ে বললো….
” কি সুন্দর !! এটা আমি ?
অংকুরের গম্ভীর মুখে হাসির ঝিলিক দেখা গেল কি না সন্দেহ । সে কপাল কুঁচকে বললো..
” সন্দেহ আছে ?
বালা এখনো চেয়ে আছে চিত্রের পানে । যেখানে তার অঙ্কিত চিত্র স্পষ্ট । বাগানের মাঝে কানে অলকানন্দা গুজে কোন এক দিকে তাকিয়ে আছে সে । হাতে ফুলের ডালা । চারদিকে রঙ্গিন ফুল ফুটে আছে গাছে গাছে । মেয়েটা সবকিছুর মাঝে স্থান পেয়েছে । একটুও সন্দেহ জাগলো না,এটা ও নিজে কি না ! কারন এটা ও নিজেই । নিজেকে চিনতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় । সামনের চিত্রে তার সরাসরি প্রতিবিম্ব ফুটে উঠেছে যে । না চেনার কথাও নয় । একে বারে নিখাদ, নিখুঁত ভাবে অঙ্কনে ফুটে উঠেছে সুরবালা । একটুও কমতি নেই কোনো খানে । এমনকি থুতনির নিচের ছোট তিল টাও স্পষ্ট । যা দেখে অবাক হতেও বোধহয় ভুলে গেলো মেয়েটা । ওর চাহনি এখনো আশ্চর্যের ন্যায় । চক্ষু চড়কগাছ । ওকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে অংকুর বললো…
” অনুমতি ব্যতীত চিত্র হিসেবে কাগজ বন্দি করেছি শুধু ,, ফ্রেম বন্দি করি নি । ইচ্ছে হলে করে নিও ।
বালা এবার চাইলো অংকুরের গম্ভীর মুখশ্রীর পানে । চোখা চুখি হলো দুজনের । বালা সন্দিহান হয়ে শুধালো….
” এটা আমার ? মানে , আমি নিয়ে নেবো এটা ? দেবেন আমায় ?
” কেনো ,, নেওয়ার ইচ্ছে নেই ? নাকি রাখতে চাইছো আমার কাছে ?
” না , না । আমি নেবো ! খুব সুন্দর হয়েছে ।
এটা আমি রাখবো আমার কাছে ! আপনি এঁকেছেন এটা ?
অংকুর এবার বিরক্ত হতে চাইলো । এতো কথা বলার অভ্যাস নেই তার । আর না শোনার অভ্যাস বা অভিব্যক্তি আছে । সে চোখ মুখ কুঁচকালো । তবে কন্ঠ স্বরে বিরক্তি আসলো না । স্বাভাবিক ভাবেই বললো ..
” হুম !
বলেই আর এক মুহূর্ত দাঁড়ালো না । আর না চোখে চোখ মেলালো দ্বিতীয় বার । পিছন ফিরে অতিথি শালার দিকে এগোতে গেলে বালা বলে উঠলো….
” ধন্যবাদ !
অংকুর থামলো । ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলো শুধু । বললো না কিছু । সে কিছু বলার আগেই সংগ্রামের রাশভারী কন্ঠের ডাক শোনা গেল…
” বালা…
ভড়কে,চমকে পিছন ফিরলো বালা । বক্ষ স্থল ধক্ করে উঠেছে তার । ঠিক পেছনে সংগ্রাম কে নিরেট হয়ে স্বভাব সুলভ পেছনে হাত গুটিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভিমড়ি খেলো বালা । কপাল গুটিয়ে রাখা সংগ্রামের । চোখের চাহনি গুঢ়, তীক্ষ্ণ । এমন সময়, এমন অবস্থায় সংগ্রাম কে দেখে বিড়ম্বনায় পড়লো মেয়েটা । ঢোক গিললো শুকনো । সংগ্রাম ফের বললো…
” কি করছিস এখানে ?
থতমত খেলো বালা । ইতস্তত হয়ে চোখ চুরিয়ে কন্ঠ খাদে নুইয়ে বললো…
” ব..বাগানে এসেছিলাম !
সংগ্রাম বালার হাতের দিকে তাকিয়ে এগোলো । একেবারে সামনে এসে থামলো । অংকুর ও নড়চড় না করে একই ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে । কোন প্রকার হেলদোল দেখা যায় নি ওর মাঝে । সংগ্রাম এগিয়ে এসে অংকুর কে দেখলো এক ঝলক । অতঃপর বালার দিকে চোখ ফিরিয়ে স্বাভাবিক কন্ঠে প্রশ্ন করলো…
” হাতে কি এটা ?
বালা চোরা চোখে একবার অংকুর কে দেখলো । তার পর মুখে কিছু না বলে হাতের মোটা কাগজ টা এগিয়ে দিলো সংগ্রামের দিকে । সংগ্রাম অনিচ্ছা সত্ত্বেও দেখলো সেটা । ছবিটার দিকে কয়েক মুহূর্ত চেয়ে থেকে অংকুরের উদ্দেশ্যে বললো…
” তুমি এঁকেছো এটা ?
” হুম !
ভনিতা হীন সোজাসাপ্টা উত্তর অংকুরের । সংগ্রাম ছবিটা বালার হাতে দিলো । গম্ভীর স্বরে আদেশ করলো….
” ঘরে যা । দ্বিতীয় বার যেন অন্দরের বাইরে পা না পড়ে !
বালা এক মুহুর্ত দাঁড়ালো না । চোখ নামিয়ে দ্রুত পা চালালো অন্দরের দিকে । অংকুরের ভাবাবেগ এখনো অপরিবর্তনীয় । সে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে । দৃষ্টি বালার হেঁটে যাওয়ার পানে । সংগ্রাম এবার চোখ ফেরালো অংকুরের দিকে । অতঃপর ভারী গলায় শুধোয়…
” বালা কে দেখলে কবে ?
অংকুর তপ্ত স্বরে বলল….
” সেদিন সন্ধ্যায় একবার দেখেছিলাম,বাগানে । মেয়েদের ছবি আঁকি না আমি , অংঙ্কন কৃত দৃশ্য টা ফাঁকা ফাঁকা লাগছিলো , তাই ওকে বসিয়েছি সেখানে । ভুল কিছু করলে ক্ষমা করবেন ।
” এক বার দেখাতেই এতো নিখুঁত ভাবে এঁকে ফেললে ? তোমার চোখের প্রশংসা করতে হয় দেখছি ।
” প্রশংসনীয় কাজে প্রশংসা পাওয়া টা অস্বাভাবিক নয় । চোখ দেখেছে , এঁকেছে হাত । হাতের প্রসংশা অনেক শুনেছি । আজ না হয় চোখের দৃষ্টিরও শুনলাম ।
” মেয়েদের ছবি আঁকো না বললে ! তাহলে বালার ছবি আঁকালে যে ?
” সবাই কে সব জায়গায় মানায় না । ওকে মানিয়েছে , চোখে ধরেছে । তাই এঁকেছি ! ছবি আঁকাটা আমার স্পৃহা ,, আর আমি সেই ইচ্ছায় প্রাধান্য দিয়েছি ।
প্রত্যেক বার অংকুরের শক্ত পোক্ত সোজা উত্তরে বিস্মিত হচ্ছে সংগ্রাম । ছেলেটা বেশ ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন । শারীরিক গঠন , আকৃতি , কথা বলার ধরন , আচার ব্যবহার , সবকিছুতে স্পষ্ট তা । সংগ্রাম নিজেও তাই । নিজের মতো অন্য একজন কে দেখে খারাপ লাগলো না । বরং উপভোগ্য লাগলো ব্যাপার টা । সংগ্রাম নিঃশব্দে হাসলো । রসিক স্বরে বলল…
” ভালো লাগলো তোমায় । তোমার সাথে বেশ ভালো জমবে । ভালো মানুষ তুমি ! তবে একটু বেশিই কাঠখোট্টা !
আর কিছু বলার আগেই অংকুর বলে উঠলো…
” মিথ্যে বিনয় আর ভালো মানুষি দেখানোর চেয়ে , ভালো মানুষ হওয়া টাকে বেশি গুরুত্ব দেই আমি । সেটাই শ্রেয় নয় কি ?
সংগ্রাম হাসলো । বললো…
” ব্যক্তিত্ব বোধ পুরুষের ভূষণ । কঠোরতা ও । শক্ত হও, তবে সব জায়গায় শক্ত থাকতে নেই । দূর্বল হতেও হয় কিছু কিছু জায়গায় । কিছু জায়গায় দূর্বলতা তৈরি হয় আপনা আপনি । তোমার ও হবে , তখন বুঝবে ।
এখন চলো , সূর্যের আলো ফোটার আগ পর্যন্ত হেঁটে আসি বাইরে থেকে। নাকি যাবে না….
অংকুরের ঠোঁটে নরম হাসি ফুটলো । যেটা সবার চোখে ধরা পড়ে না হয়তো । ক্ষীন লুকায়িত হাসি তার । সে স্বাভাবিক কন্ঠে সায় দিলো সংগ্রাম কে । লম্বা চওড়া, চেহারার গঠন সব দিক থেকেই অংকুর আর সংগ্রাম প্রায় এক । গায়ের রংয়ের দিক দিয়ে তফাৎ আছে একটু । এতে অংকুর পিছিয়ে । ওর গায়ের রং শ্যামলা , আর সংগ্রামের উজ্জ্বল ফর্সা ।
সেই যে বেরোলো,সকালের খাবারের সময় একেবারে বাড়ি ফিরেছে সংগ্রাম , সাথে অংকুর ও । সংগ্রাম অন্দরে ঢুকেছে, অংকুর অতিথি শালায় । অতিথি শালার নিজের জন্য বরাদ্দকৃত ঘরে ঢুকতেই কপালে ভাঁজ পড়লো অংকুরের । দলের সবার ভিড় জমেছে ওর ঘরে । ছয় মাথা এক সাথে । সবাই গোল হয়ে কিছু একটা করছে । নিজেদের কাজে মগ্ন থাকায় অংকুরের উপস্থিতি টের পায় নি কেউ । অংকুর সবাইকে এভাবে দেখে ভারী উঁচু কন্ঠে প্রশ্ন ছুঁড়লো….
” কি হচ্ছে এখানে ?
অমনি তড়াৎ গতিতে আঁতকে উঠলো সবাই । ভুত দেখার মত চমকে পিছন ফিরলো একই সাথে । পিছনে অংকুর কে দেখে শুকনো ঢোক গিলে একে অপরের দিকে তাকালো । একই সাথে কৃত্রিম হাসার চেষ্টা করলো প্রত্যেকে । ওদের চোর ধরা পড়ে যাওয়ার মতো ফিকে মুখগুলো দেখে অংকুর আরো বেশি চোখ কুঁচকালো । কিছু একটা আন্দাজ হতেই, সন্দেহ দূর করার জন্য এগিয়ে গেলো সে । ছয় জনই পিছনে কিছু একটা আড়াল করে সারিবদ্ধ ভাবে দাঁড়িয়ে আছে । অংকুর সবাইকে উপেক্ষা করে পিছনে খাটের দিকে তাকালো । খাটের উপর ওর অঙ্কিত সব ছবি বিছিয়ে রেখেছে এরা । সব ছবির মধ্যে বালার একটা ছবিও আছে । ওর দুটো ছবি এঁকেছিলো সে । একটা দিয়েছে , অন্যটা নিজের কাছেই রেখেছে । এমনিতে ওর জিনিসে হাত দেয় না কেউ । ও এসব মোটেও পছন্দ করে না । স্বভাব সুলভ ওর এসব জিনিস পত্র এলোমেলো দেখে চরম বিরক্ত হলো অংকুর । চোয়াল শক্ত হয়ে আসলো ওর । অগ্নি চক্ষু নিয়ে তাকালো সবার দিকে । সবাই চুপসে আছে আগে থেকেই । ওর ক্ষিপ্ত দৃষ্টি দেখে আরো বেশি চুপসে গেল । রিক্তা সবার হয়ে সাফাই গেয়ে আমতা আমতা করতে লাগলো….
” না মানে, অংকুর, রেগে যাস না ভাই দয়া করে । আমরা এক্ষুনি সব আগের মতো করে গুছিয়ে দিচ্ছি । কি বলতো , তুই তো খুব সুন্দর আঁকিস । তাই তোর আঁকা ছবি গুলো দেখছিলাম আর কি । কোনো কিছু নষ্ট করিনি, আলাদা করে হাতও দেইনি কোনো কিছুতে । আমি আবার সব গুছিয়ে দিচ্ছি…
জবা থামালো রিক্তা কে । ভয় ঠেলে বিরক্তি মাখা কঠিন স্বরে সে বলল…
” এভাবে বলার কি আছে ? আমরা কি ওর কোনো জিনিস নষ্ট করেছি নাকি ? দেখছিলামই তো শুধু । ভাগ্যিস দেখছিলাম,না দেখলে হয়তো জানতেই পারতাম না – যে ওর ক্যানভাসে কোনো মেয়েরাও স্থান পায় আজকাল । তা হ্যাঁ রে অংকুর ,, কোন মেয়ের ছবি এঁকেছিস এভাবে ? আগে তো কখনো দেখিনি এই ছবিটা !
অংকুর উত্তর করলো না । আর না উত্তর করার প্রয়োজন বোধ করলো । সে দাঁতে দাঁত চেপে বিছানার উপর রাখা সব ছবি গোছাতে আড়ম্ভ করলো । সবগুলো গুছিয়ে রাখলো মাঝারি সাইজের ট্রাংক টায় । সেটা তালা বদ্ধ করলো এবার । ভুল ক্রমে তালা খুলে রেখে চলে গেছিলো সকালে । বালা কে দেওয়ার জন্য ছবিটা বের করার পর তালা দেওয়া হয় নি আর । ধ্যানে ছিল না সেটা । অংকুরের কোনো উত্তর না পেয়ে জবা দাঁত খিচলো । আবারো বললো…
” কি রে , কিছু বলছিস না যে ? কোন মেয়ের ছবি এঁকেছিস ওটা ? কে ও ?
অংকুর সহসা পিছন ফিরলো । রাশভারী কন্ঠে বললো…
” ও কে সেটা জানার আগে বল , কে তুই ? তোকে কেনো কৈফিয়ত দিতে যাবো আমি ? তুই খুব ভালো করেই জানিস , আমি কাউকে কৈফিয়ত দেই না । প্রশ্ন করলে উত্তর পাবি না । এটা জানার পরও বৃথা প্রশ্ন করতে আসিস কেনো বলতো ?
আলামিন নামক ছেলেটা জবাকে আর কিছু বলা থেকে আটকানোর জন্য বলে উঠলো….
” হয়েছে ভাই । কি শুরু করলি তোরা । আরে অংকুর বলে দে না ভাই , কে ও ? কার ছবি এঁকেছিস তুই ?
অংকুর হাতে গোসলের জন্য তোয়ালে নিয়ে ঘর থেকে বের হওয়ার উদ্দেশ্যে পা বাড়াতে বাড়াতে বললো….
” চোখ থাকতেও যদি অন্ধ হোস, তাহলে আমার করার কিছু নেই । ও কেউ একজন , যাকে আমি দেখেছি, তোরা দেখিস নি । আর দেখিস নি ভালোই হয়েছে । ছবিতে দেখেছিস এটাই অনেক , বাস্তবে দেখার প্রয়োজন নেই কোনো ।
বলতে বলতে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে । পিছনে সবাই ওর কথার মার প্যাঁচ না বুঝে ড্যাপ ড্যাপ করে তাকিয়ে দীর্ঘ শ্বাস ফেললো খানিক বাদ । এবার সবাই একই সাথে তাকালো জবার দিকে । জবা ফুঁসছে রাগে । এবার ওকে এই ভাবে ফুঁসতে দেখে সবাই আবারো দীর্ঘ শ্বাস ফেললো ।
বিকেলের আগ মুহূর্ত । অলকা রাতের রান্নার যোগান দিচ্ছেন । দুপুরের দিকে জাভেদ চলে গেছে । রুপা ঘুমিয়েছে অলকার ঘরে । আঙ্গিনার চুলায় রান্না বসিয়েছে অলকা । জাঁল নিভে ধোঁয়া উঠেছে । অলকা ফুৎকার দিয়ে আগুন ধরিয়ে দিলেন আবারো । কলসি হাতে উঠে দাঁড়ালেন পানি আনতে যাওয়ার জন্য । পায়ের কদম বাড়ানোর আগেই একটা পুরুষালি ভেঙ্গানো কন্ঠ ভেসে আসলো…
” সালাম শাশুড়ি আম্মা …
অলকা ঝট করে চাইলেন । মানিক কে দেখে অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেন তিনি । দেওড়ি পেরিয়ে ভিতরে এসে দাঁড়িয়ে আছে মানিক । ঠোঁটের কোণে ফিচেল হাসি । চোখের চাহনি অস্বস্তিকর ঠেকলো অলকার কাছে । অলকার বিতৃষ্ণা লাগে এই লোকটা কে দেখলে । আগের কোনো ঘটনাই ভুলে যান নি তিনি । ভুলে যাওয়ার কথাও নয় । মানিকের সাথে কথা বলতেও রুচিতে বাধে অলকার । তবুও ময়নার কথা ভেবে সাধারণ খাতিরে জোর পূর্বক কথা বলেন অলকা । আজ যে মানিক আসবে তা অলকার জানা ছিলো না । ময়না জানে কি না জানা নেই ! অলকা বরাবরের মতো তিক্ততা হটিয়ে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করলেন । কন্ঠ নরম হলো না তবুও , তিনি রুষ্ট কন্ঠে দায় সারা জবাব দিলেন..
” ওলাই কুমুস সালাম…
মানিক হাসলো কেমন করে । এগোতে এগোতে বললো….
” বউ কোই আমার ? আমার সুন্দরী, ময়না পাখি কোই ?
বিরক্তি লাগলো অলকার কাছে । চোখ মুখ কুঁচকে দৃষ্টি সরিয়ে তিনি উঁচু গলায় ময়না কে ডাকলেন । আম্মার উঁচু কন্ঠের ডাকে এক দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়েছে ময়না । ওর দৌড়ে বের হওয়া চঞ্চলা পা বারান্দাতেই থেমে গেছে মানিক কে দেখে । ময়নার নরম দৃষ্টিতে পরিবর্তন এসেছে সাথে সাথে । সংকিত হয়ে বৃহৎ নয়নে তাকিয়ে থমকে দাঁড়িয়েছে সে । কয়েক পলক ফেলে শুকনো ঢোক গিললো ময়না । অতঃপর বারান্দা থেকে নিচে নেমে গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে আসলো । মানিক অস্বাভাবিক ভাবে ঠোঁট কামড়ে বললো…
” আরে ময়না পাখি ,, বাপের বাড়ি উড়াল দিয়া আইসা দেখি আমারে ভুইলা গেছো একেবারে । স্বামীর ঘরে যাওনের ইচ্ছা নাই নাকি আর ?
ময়না কন্ঠ খাদে নামিয়ে বললো…
” আপনি এইহানে ?
মানিক ফের গাঁ দুলিয়ে অদ্ভুত ভাবে হাসলো । বললো…
” ক্যান ? আমার আওনে খুশি হও নাই ? আমি কিন্তু ছটফট করতে করতে আইছি । তুমি আমারে ভুইলা দূরে আইসা ভালো থাকলেও আমি কিন্তু একটুও ভালো নাই, বিশ্বাস করো । এই কয়টা দিন অনেক কষ্টে কাটছে আমার । রাইতটা তো আরো কষ্টকর তোমারে ছাড়া । তাই তো চইলা আইলাম…
অলকা মুখ বিকৃত করে স্থান ত্যাগ করলেন । তার যাওয়ার পানে তাকিয়ে মানিক গলা উঁচিয়ে বললো….
” আরে আম্মা , জলদি খাওনের ব্যবস্থা করেন । খুব ক্ষুদা লাগছে আমার , এই কয়টা দিন ভালো মতো খাওন হয় নাই । আইজ পেট ভইরা খামু !
অলকা থামলেন না । শুনেও প্রতিক্রিয়া দেখালেন না । মানিক এবার ময়নার দিকে তাকালো । এতক্ষণে চোখ মুখ শক্ত হয়ে ঠোঁট টাটিয়ে দাঁত পিষলো । ধীর কন্ঠে হিসহিস করলো….
” কি রে ,,, ভালোই আছোস দেখতাছি ! শরীরের চর্বি বাড়ছে এই কয়দিনে ? বাপ মায়ের আদর সোহাগ অনেক তো পাইছোস । এবার চল ,, স্বামীর আদর সোহাগ পাওয়ার দিন আইছে এবার । শরীরের চর্বি কমাইতে হইবো এবার । অনেক তো হইলো…
ব্যাগ গোছা গিয়া ,, দেরি যেন না হয় । কথাটা মাথায় ঢুইকা ফেলা…
শেষের কথাটা আঙ্গুল তুলে শক্ত গলায় বলল । ময়না কেঁপে উঠে পিছুলো এক কদম । মাথা নোয়ানো ওর । সে মৃদু কাঁপা গলায় বুলি ফুটালো…
” আব্বা বাড়িত নাই । আমি যামু না আপনার লগে..
আবারো হিসহিসিয়ে উঠলো মানিক…
” কি কইলি ? জবানে কথা ফুটছে ? সাহস বাড়ছে ? ডাক তোর বাপেরে ,, যা করার করতে ক । আইজকাই তোরে লইয়া যামু আমি । তোরে বিয়া করছি এমনি এমনি নাকি ? বাপের বাড়ি বসাইয়া খাওনের লাইগা ? খাইবিও আমার বাড়িত , খাটবিও আমার বাড়িত । তৈরি হ গিয়া ,, আর হ্যাঁ, শশুর আব্বারে খবর পাঠা । হের আদরের মাইয়ার জামাই আইছে । জামাইয়ের খাতির করতে হইবো না ? তা খাতিরের ব্যবস্থা আগে থাইকা কইরা রাখোনের কথা তো , করে নাই তোর বাপ ? সময় তো বহু দিলাম , আর কতো ?
ময়না ফের কয়েক পা পিছুলো । চোখে মুখে স্পষ্ট ভয় ওর । কিসের ভয়,সেটা মানিকের অজানা নয় । ময়নার ভীত হাবভাব দেখে বাঁকা হাসলো মানিক । আনন্দ জাগলো মনে । অলকা কে এদিকে আসতে দেখে মোলায়েম মেকি স্বরে বলল…
” ময়না পাখি ,, যাও , ঘরে যাও , আইজ তো স্বামীর ঘরে যাওনের সময় আইসা পড়ছে । তৈরি হও গিয়া । ততক্ষণে আমার শশুর আব্বা আসুক । আমি অপেক্ষা করমু…
অনেক কথা বার্তা , হের-ফের , হিসেব আছে তার লগে ।
ময়না সময় ব্যয় না করে এক ছুটে ঘরে গেল । অলকা কে দেখে নি ও । অলকা মেয়ে কে ওভাবে ছুটে যেতে দেখে সন্দিহান চোখে তাকালেন ।
সন্ধ্যা গড়াচ্ছে । ময়না নিষ্ক্রিয়ের ন্যায় রুপার পাশে গুটিয়ে বসে আছে । তৈরি সে । গায়ে সাদা শাল জড়ানো । মাথায় মাঝ সিঁথি করে টান টান খোপা । ওকে এভাবে দেখে একদম পুরনো গৃহবধূর দের মতো লাগছে । মেয়েটার স্নিগ্ধ মুখ খানা মলিন । আনমনে কি যেন ভাবছে সে । মোখলেছ এসেছে খানিক আগে । জামাই শশুর মিলে ঘরে দোর লাগিয়ে কথা বলছে । তাদের একান্ত কথা , অলকা যায় নি সেদিকে । তিনি ঘরে ঢুকতেই মেয়েকে দেখতে পেলেন । ময়নার আনমনা ভাবগতিক দেখে তিনি নরম কন্ঠে ডাকলেন…
” ময়না…
তড়িতে চাইলো ময়না । চমকেছে বোধহয় । চাইতেই হাসলো নরম । বসা থেকে উঠলো । অলকা এগোতেই ও নিজেও এগিয়ে আসলো । অলকা শাড়ির আঁচলে হাত মুছে কিছু বলার জন্য উদ্যত হতেই ময়না আকস্মিক জড়িয়ে ধরলো আম্মাকে । আকস্মিক কান্ডে থমকালো অলকা । পরমুহূর্তে মুচকি হেসে মেয়ের মাথায় হাত রাখলো । মায়ের আশ্বাস জোগানো পরশ পেতেই ময়না আরো শক্ত করে জড়ালো । গলার স্বর রুদ্ধ ওর , তবুও অলকা কিছু বলার আগেই সে বললো….
” আইজ যাইতাছি আম্মা ,, ভালো থাইকো !
অলকা স্মিথ হাসলেন । নরম কন্ঠে বললেন…
” তুই ও ভালো থাকিস মা । আবার আইবি কবে…
ময়না ছাড়লো । মুখোমুখি দাঁড়ালো । গাল বেয়ে পানি গড়িয়েছে অনেক আগে । অলকা মেয়ের চোখে পানি দেখে উদ্বিগ্ন হলেন । মমত্ববোধ বাড়লো তার । তিনি তৎক্ষণাৎ হাত বাড়িয়ে মেয়ের গালে রাখলেন, প্রশ্ন করলেন….
” কি হইছে মা , কানতাছোস ক্যান ?
ময়না ভেজা চোখেই নরম হাসলো । ঘাড় ঘুরিয়ে পিছন ফিরে খাটে বসে থাকা রুপা কেও দেখলো । রুপাও উদ্বিগ্ন নয়নে চেয়ে আছে । ময়না বললো….
” জানো আপা , মানুষ দাঁত থাকতে দাঁতের মর্ম বোঝে না । আমিও বুঝি নাই । ভাবিয়া কাজ করি নাই , করিয়া এখন ভাবি । কিন্তু এখন তো আর ভাইবা লাভ নাই ।
আমি মনে হয় অনেক ভুল করছি,তাই না আম্মা ? তুমি আমার উপর এখনো রাইগা আছো ? আর রাইগা থাইকো না , ক্ষমা কইরা দিও আমারে ? আমি অনুতপ্ত , আমার প্রায়শ্চিত্ত আমি কইরা নিমু ! তোমরা খালি আমারে ক্ষমা কইরা দিও ।
আমি এখন আর আসমু না আম্মা , আর কবে আসমু জানি না । এবার যদি আসি , তাইলে আমারে আগের মতো কইরা একটু ভালোবাইসো আম্মা । এবারের ভালোবাসা কম আছিলো কিন্তু ।
” কি কইতাছোস এইগুলা ? তোর উপর আমার কোনো রাগ নাই মা । আমি তোগো সবাইরে সমান ভাবে ভালোবাসি ।
ময়না হাসলো । গাল দিয়ে পানি গড়ালো সাথে সাথে । বাইরে বেরিয়ে মোখলেছ কে দেখলো সে । দেওড়ির কাছে মোখলেছ, মানিক দু’জনেই দাঁড়িয়ে আছে । ময়না হাতের ব্যাগটা নিয়ে এগোলো । পিছন পিছন অলকাও । আব্বার সামনে থামলো ময়না । চোখ তুলে করুন চোখে চেয়ে থাকলো কিছুক্ষণ । মোখলেছ ঘন পল্লব ঝাপটে মেয়ের মাথায় হাত রাখলো । জড়ানো গলায় বলল…
” যা,, আমি যামু দুই দিন পর তোরে দেখতে । তত দিন পর্যন্ত খেয়াল রাখিস নিজের , চিন্তা করিস না ।
শ্যামা সুন্দরী পর্ব ২২
পরদিন সকাল । জমিদার বাড়ির বাইরে মানুষের ভিড় জমেছে । প্রধান ফটকের সামনে হট্টগোল, মানুষের সমাগম তৈরি হয়েছে । পুরুষালি একাধিক কন্ঠ ভেসে আসছে একই সাথে । বাইরের হইচই শোনা যাচ্ছে অন্ধদের ভেতর থেকেও ।
