শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৫০
সুরভী আক্তার
প্রগাঢ় চিত্তে ঠোঁট প্রসারিত করে সংগ্রাম ।
আয়নাতে একে অপরের দৃষ্টি স্থির । চোখে চোখ রোপিত হয়েছে ।
মধ্য রজনী । ঘরে একাধিক মোম জ্বলছে । মোমের শিখার সোনালী আলোয় সংগ্রাম মাথা তুলে নিষ্প্রভ ভঙ্গিতে চেয়ে আছে তার বেগমের শ্যামলা মুখশ্রীর পানে । ঘুমিয়েছে শ্যামা । সংগ্রামের বুকের মাঝে সেপ্টে ঘুমিয়েছে । মাথা যন্ত্রণা করছিল ওর । ঘরে এসেই ঘুমিয়ে পড়েছে । সংগ্রাম ওকে জ্বালায় নি । শ্যামা ইদানিং স্বাভাবিক আছে বেশ । ভয় পাওয়ার প্রবনতা টা কমেছে সংগ্রামের সঙ্গ পেয়ে পেয়ে । বাড়িতে এতক্ষণে ঘুমিয়েছে সকলে । সংগ্রামের চোখে ঘুম নেই । ফুল দিয়ে সাজানো ঘরের মোহিত গন্ধে নাজেহাল সে । উপরের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে ছিলো সংগ্রাম । বারান্দা দিয়ে আসা মৃদুমন্দ বাতাসে কাঁপছে মোমের শিখা । দুলে দুলে হলদে আলো ছড়াচ্ছে পুরো ঘরে । খানিক দমকা হাওয়া পেয়ে কয়েকটা মোম নিভেও গেছে । শ্যামার নাক মুখের তপ্ত শ্বাস সংগ্রামের বুকের সাথে বাড়ি খাচ্ছে । সংগ্রাম নিভৃতে অনুভব করছে তা । শ্যামার ভারী নিঃশ্বাসের সাথে ওর ঘুমের গভীরতা আন্দাজ করলো সংগ্রাম । সংগ্রাম শ্যামার পিঠ থেকে হাত তুলে ওর মাথার কাছে রাখলো । হাত বুলিয়ে দিতেই নড়েচড়ে উঠলো শ্যামা ।
শ্যামা নড়তেই ওর ওষ্ঠ স্পর্শিত হলো সংগ্রামের গলার নিকট । ঢোক গিললো সংগ্রাম । চোখ ঘুরিয়ে পাশের দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকালো । রাত্রি তিনটে বাজতে চললো । সংগ্রাম ধীরে দৃষ্টি পাত করলো শ্যামার দিকে । কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে নরম কন্ঠে ডাকলো…
“ বেগম ?
প্রথম ডাকেই ঘুমের মধ্যে অস্পষ্ট স্বরে উত্তর করলো শ্যামা…
“ হুম ।
“ ওঠো , বাইরে যাবো ।
ফের নড়ে চড়ে ওঠে শ্যামা । কাতুরে কন্ঠে বলে ঘোরের মাঝে…
“ কোথায় ?
“ ঘাটে ! তোমার জন্য একটা আয়োজন ছিলো । তোমার এই ঘুম সবটা ঘেঁটে দিলো । এখনো সময় আছে , চলো …
“ যাবো না ।
“ যেতে তো হবেই । ঘাটে যেতে চেয়েছিলে না ?
আমি ট্রলার সাজিয়ে রেখেছিলাম তোমার জন্য । ভেবেছিলাম নদীতে ভাসিয়ে নিয়ে আসবো তোমায় । কিন্তু তুমি তো গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলে তখন । এখন তো ওঠো , নয়তো আমার সব আয়োজন বৃথা হয়ে যাবে । চলো ঘুরিয়ে আসি একবার !
শ্যামার সাঁড়া নেই । সংগ্রাম ওকে বেশ কবার ঝাঁকিয়ে ডাকলো । ঘুমে বিভোর শ্যামা দূর্বলতার জোরে সাঁড়া দিতে গিয়েও পারলো না । জবান খুলছে না ঘুমের ভারে ।
সংগ্রাম দীর্ঘ হাঁফ ছাড়ল । সেভাবেই শ্যামা কে বুকে করে উঠে বসার চেষ্টা করলো । শ্যামা কে ডাকলো না আর । ওর অপুষ্ট ছোট্ট দেহ খানা চট করে কোলে তুলে ওভাবেই বেরিয়ে আসলো ঘর থেকে । ঘুমের ঘোরে শ্যামা কিছুই টের পেলো না । বরং আরামের বিছানা ছেড়ে সংগ্রামের কোলে উঠতেই দুহাতে জাপটে ধরলো সংগ্রামের গলা ।
অন্দর ছেড়েছে সংগ্রাম । সদর দরজা , প্রধান ফটক উভয়েই পেরিয়ে সোজা ঘাটের দিকে এগোলো ও । মধ্য রাত্রি হলেও অন্ধকার নেই কোথাও । বিয়ে বাড়ির কিছু উজ্জ্বল আলো জ্বলছে এখনো ।
ঘাটের দিকেও আলোর ঝলকানি পৌঁছেছে । সংগ্রাম উক্ত আলোতে তার বেগম কে সেপ্টে ধরে হাঁটা লাগালো । ঘাটে ট্রলার ভেড়ানো । আগে থেকেই এটার ব্যবস্থা করে রেখেছে সংগ্রাম ।
সাজিয়েছে ভেতরটা । ট্রলারে একজন ছিলো । এখন তাকে দেখতে পেলো না সংগ্রাম । হয়তো সংগ্রাম আসবে না ভেবে চলে গেছে । সংগ্রাম শ্যামা কে কোলে করেই ট্রলারে উঠলো । শ্যামা কে ভেতরে হেলান দিয়ে বসালো সংগ্রাম । ঘুমে ব্যাঘাত ঘটেছে শ্যামার । ঘুমের ঘোরে বিরক্তি নিয়ে মুখ কুঁচকে চোখ খোলার চেষ্টা করলো ও । সংগ্রাম ট্রলার চালিয়ে ওর কাছে ফিরলো আবার । শ্যামা কে আধো আধো চোখ খুলতে দেখে মুচকি হেসে বললো…
“ আর কতো ঘুমাবেন, বেগম ?
আজ যে আমাদের বিয়ের রাত , এটা দেখি বেমালুম ভুলে গেছেন ! অথচ আমি আপনার ইচ্ছা পূরণের আয়োজন করে কতো কি সাজিয়ে রেখেছি । এসব দেখার ফুরসৎ আছে আপনার ? সময় হলে ঘুম ছুটিয়ে চোখ খুলুন একটু ।
শ্যামা চোখ খোলে । কপালে তিন স্তরের ভাঁজ ফেলে স্বল্প কাতর চোখ দুটো এদিক ওদিক ঘোরায় । পড়নে এখনো সেই বিয়ের শাড়ি । লম্বা চুলে মোটা বিনুনি গাঁথা । ট্রলারের মেঝেতে সাপের ন্যায় পেঁচিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে লম্বা বেনুনি টা ।
এবার পুরোপুরি চোখ খুললো শ্যামা । এতোক্ষণে ট্রলার শব্দ তুলে ভেসে গেছে মধ্য নদীতে । ঘুটঘুটে অন্ধকার বাইরে । নদীর স্থির পানি ট্রলারের ধাক্কায় ঢেউ তুলে পাড়ে গিয়ে মিশে যাচ্ছে । হলদে আলোয় ছেয়ে গেছে পুরো ট্রলার । মোটে দশটা নিভু নিভু হারিকেন জ্বলছে ভেতরে । ভেতরটা ফুল দিয়ে সাজানো । শ্যামা বার বার চোখে পলক ফেলছে । শুভ্র আতরের গন্ধ নাকে আসছে সংগ্রামের শরীর থেকে । শ্যামা শ্বাস টানলো । বাইরে থেকে চোখ সরিয়ে বললো ভার গলায়….
“ এখন এভাবে নিয়ে এসে কি হলো ?
“ কি আবার হলো , তুমিই তো আসতে চেয়েছিলে ।
“ এখন আসতে চাই নি !
সংগ্রাম ডেকের উপর দাঁড়িয়েছে পেছনে হাত গুটিয়ে । শ্যামা কে ডাকলো ও সেখান থেকেই । শ্যামা চোখ ডলে উঠে গেলো । পাশাপাশি দাঁড়াতেই বাতাসের ঝাপটা লাগলো শরীরে । ভেতর থেকে হারিকেনের আলো এসেছে খানিক । তবুও কালো অন্ধকার চারপাশে । গা শিউরে ওঠে শ্যামার । ও শাড়ির আঁচল টেনে নেয় মাথায় ।
চোখ তুলে সংগ্রামের দিকে তাকায় । সংগ্রামের টানটান মুখশ্রী পরখ করে ডাকে…..
“ ছোট জমিদার সাহেব ?
“ জ্বি বেগম !
“ আজ একটা জিনিস চাই আপনার কাছে !
সংগ্রাম শ্যামার দিকে ফেরে । প্রশ্ন করে খানিক ঝুঁকে…
“ কি জিনিস ? চেয়েই দেখুন !
“ আমি আপনাদের সুখের নীড়ে যেতে চাই ! বলেছিলেন আমায় নিয়ে যাবেন সেখানে ।
শ্যামার নরম চাহনায় স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়ায় সংগ্রাম । পেছনে গোটানো হাত দুটো স্থির করে । শ্যামা কে টেনে নেয় নিজের কাছে । আকস্মিক পেছন থেকে জড়িয়ে নেয় ওকে । শ্যামা প্রশ্নাত্মক চাহনিতে ঘাড় ঘোরায় সংগ্রামের দিকে । চোখ উঁচু করে তাকাতেই সংগ্রাম দূরের কালো অন্ধকারে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে অতি স্বাভাবিক কন্ঠে বলে ওঠে….
“ আচ্ছা নিয়ে যাবো ।
এখন এসব কথা বাদ । এখন অন্য প্রসঙ্গে আসি ? তোমার থেকে কিছু একটা জানার আছে আমার ?
শ্যামা বিমূর্ত শুধালো…
“ কি ?
“ আমাকে ভালোবাসো ?
শ্যামা মুখে উত্তর ফোটায় না । ওর শান্ত দৃষ্টির পানে তাকিয়ে সংগ্রাম আবার শুধায়….
“ কতটুকু ভালোবাসো ?
এবারো উত্তর নেই । সংগ্রামকে ভালোবাসার পরিমাপ জানা নেই শ্যামার । শ্যামার বদলহীন ভাবমুর্তি দেখে সংগ্রাম ওর কাঁধে নরম ওষ্ঠ যুগল ছোঁয়ালো । ফের চোখ তুলে তাকিয়ে ঠোঁট নাড়িয়ে ধীর কন্ঠে বলল….
“ আমি কিন্তু তোমাকে ভালোবাসি বেগম । ভীষণ ভালোবাসি তোমায় । ভালোবাসলে কিছু কিছু মেনে নিতে শিখতে হয় ।
মেনে নেওয়া আর মানিয়ে নেওয়া সবক্ষেত্রে এক হয় না । জ্ঞান বোধ বিবেচনা থেকে মেনে নিতে পারলে, মানিয়ে নেওয়া সহজ হয় । তবে শূন্য মস্তিষ্কে জোর পূর্বক মেনে নেওয়ার চেষ্টা করলেও মানিয়ে নেওয়া যায় না ।
“ হঠাৎ এতোসব কঠিন কথা বলছেন যে ?
“ কঠিন করে বুঝতে হবে না তোমায় । তুমি সহজ করেই বোঝো । আর সহজ হয়েই এভাবেই সারাজীবন আমার হয়ে থেকো । আমি তোমাকে এভাবেই সারাজীবন আমার করে পেতে চাই বেগম ।
“ দু – দুবার বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হলাম আমরা । একটাই তো জনম , এই এক জনমে দুবার আপনার নামে কবুল পাঠ করেছি । আপনার না হয়ে আর কোথায় যাবো । আপনি আমাকে ছাড়লেও আমি কক্ষনো ছাড়বো না আপনাকে । কারন , আমার যে আর গতি নেই ।
“ আর আমি তোমাকে কক্ষনো ছাড়বো না ।
উত্তপ্ত শহরের আবহাওয়া । ক’দিনেই টানটান গরম পড়েছে বেশ । হাওয়া বাতাস নেই বললেই চলে । শহরের আবহাওয়া আসলেই গ্রামের তুলনায় রুষ্ট । সূর্য তার প্রখর উত্তাপ ছড়িয়েছে । কদিন আগে বাগানে যে ফুল গাছ গুলো লাগানো হলো , সেগুলোর মধ্যে বেশ কতক গুলো গাছ মিইয়ে গেছে । সকাল বিকেল নিয়ম করে গাছে পানি দেওয়া হয় । তবুও প্রচন্ড উত্তাপে শুকিয়ে গেছে অনেক গাছ । সুরবালা আজ বিকেলে ছাদে উঠেছে একা একা । নিজ হাতে সব গাছে পানি দিয়েছে । টবের মাটি খুঁড়ে খুঁড়ে নরম করে দিয়েছে গাছের গোড়া । অংকুর বাড়িতে নেই সকাল থেকে । সকালে একটা চার চাকা গাড়ি এসেছিল । বেশ বড় সড় মাইক্রো বাস । অংকুরের আর্টের ঘর থেকে সব অঙ্কন কৃত ছবি বের করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে সেই গাড়িতে করে । সাথে অংকুরও গেছে ।
এখনো ফেরে নি বাড়িতে । অংকুর সেভাবে বেরোয় না বাড়ি থেকে । বাড়ি থেকে বের হওয়ার দরকার পড়ে না ওর । সুরবালা এসেছে থেকে ওকে একলা বেরোতে দেখে নি বাড়ি থেকে । সারাদিন ঘরেই থাকে গোমড়া মুখো হয়ে । আজ নেই সকাল থেকে, ঘরটা ফাঁকা ফাঁকা লাগছে । দুপুরের পর থেকে আর একলা ঘরে ঢোকে নি সুরবালা । শায়লার ঘরে ছিলো এতক্ষণ । গল্প গুজবে দুই শাশুড়ি বউমা সময় পার করেছে এতক্ষণ । বিকেল হতেই শায়লা কে ঘরে রেখে ছাদে উঠেছে বালা । এতক্ষণ ঘুরে ঘুরে ফুল গাছ গুলোর দেখভাল করলো । গুটি গুটি পায়ে পুরো ছাদে পায়চারি করলো একা একা । উদাস লাগছে , সকাল থেকে অংকুরের সাথে কথা হয় নি সেভাবে । মূল কথা , অংকুরের সাথে কথা কাটাকাটি হয় নি । ঐ লোকটার সাথে কথা বলতে, তর্ক করতে বেশ ভালো লাগে আজকাল ।
এখন আর ভালো লাগছে না ওনাকে ছাড়া । আনমনা লাগছে । বিষন্নতায় এদিক ওদিক হেঁটে বেড়ালো সুরবালা । আকস্মিক প্রধান ফটকের কাছে চোখ পড়তেই ঝলমলিয়ে উঠলো মেয়েটা । অংকুর গেইট পেরিয়ে ভিতরে ঢুকেছে । দৃঢ় পায়ে সদর দরজার দিকে এগোচ্ছে ও । চিকচিক করে উঠলো সুরবালা । ধড়ফড়িয়ে উঠলো সে । অকস্মাৎ পিছু ফিরে দৌড় লাগালো । সদর দরজা লাগানো । দরজা খুলে দিতে হবে । ছাদ থেকে নেমে ছটফট করে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে লাগলো সুরবালা । ছোটার সাথে সাথে শাড়ির কুচি পায়ের সাথে জড়িয়ে যাচ্ছে বারবার । তবুও হেলদোল নেই ওর । ও শাড়ি সামলাতে পারে বেশ ।
তবে আজ দৌড়ের কবলে শেষমেষ আর সামলাতে পারলো না । আর ক’ধাপ সিঁড়ি নিচে নামার আগেই পায়ের সাথে শাড়ি জড়িয়ে উল্টে পড়লো মেয়েটা । নিজেকে সামলাতে না পেরে হুমড়ি খেয়ে সামনের দিকে টলে পড়লো । পড়তে পড়তে সিঁড়ি গড়িয়ে এসে থামলো নিচে । অমনি ব্যাথাতুর আওয়াজ করে কুকিয়ে উঠলো । একহাত কোমরে অন্য হাত উরুর উপরে রেখে মৃদু স্বরে গুঙ্গিয়ে উঠলো চোখ খিচে ।
অংকুর দরজা ধাক্কায় নি । কড়া নাড়ে নি দরজায় । ও সোজাসুজি চাবি দিয়ে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলো । এমনটাই করে সে । বাইরে গেলে আসার পর সদর দরজা চাবি দিয়ে খুলেই ভেতরে ঢোকে । শায়লা কে বিরক্ত করে না সে । আজ ও করলো না । ভেতরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে চাবি পকেটে ঢুকিয়ে পিছু ফিরলো । চোখ তুলতেই আঁতকে উঠলো অমনি । স্বশব্দে ভড়কানো গলায় চেঁচিয়ে উঠলো অংকুর…..
“ সুরবালা ?
ছুটে আসলো সে । অংকুরের উচ্চ বাক্যে নিজের নাম কর্ণপাত হতেই ছলকে তাকালো সুরবালা । কোমরে চড়কে ব্যথা পেয়েছে খানিক । চোখের কোটরে পানি জমেছে চিনচিনে ব্যথায় । সেই অশ্রু ভরাট চোখ নিয়ে সামনে তাকালো সুরবালা । হুড়মুড়িয়ে ওর সামনে এসে বসলো অংকুর । চোখে মুখে আতঙ্কিত উদ্বেগ । কপালে ভাঁজ ফেলে ঢোক গিলে শুধালো….
“ সুরবালা , তুমি – তুমি পড়ে গেলে কি করে ?
বালা কম্পিত কন্ঠ ভেজায় ঢোক গিলে । আস্তে ধীরে কোমর থেকে হাতটা সরিয়ে নেয় । অতঃপর উত্তর করে…
“ শাড়িতে পা পেঁচিয়ে গেছিলো ।
“ শাড়িতে পা পেঁচায় কিভাবে ? দেখে শুনে হাঁটতে পারো না ? লেগেছে তোমার ? কোথায় লেগেছে বলো ? ঠিক আছো ?
খানিক চড়াও কন্ঠ । শুল্ক মুখে তাকায় সুরবালা । চোখ থেকে স্বল্প পানি টুকু গড়িয়ে নামার আগে হাতের উল্টো পিঠে চোখ মুছে নিলো বালা । নিজের দিকে তাকালো । কুঁচি খুলে গেছে । আঁচল এলোমেলো । ও তড়িতে আঁচল টেনে ঠিক করলো । কন্ঠ খাদে নামিয়ে বললো…
“ লাগে নি ?
“ ওঠো !
সুরবালার সামন থেকে উঠে দাঁড়ালো অংকুর । সুরবালা খুলে যাওয়া কুঁচির মাথা এক হাতে চেপে ধরে অন্য হাত মেঝেতে ঠেসে ধীরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলো । পারলো না । ফের বসে পড়লো ঠাস করে । কোমরের কাছটা চড়াও করে উঠলো বোধহয় । চোখ খিচে ফেললো বালা । মুখে ব্যাথার ছাপ ফুটলো এবার । অংকুর ফের ঝট করে বসলো ওর সামনে । এবার দ্বিধা হীন হাত বাড়িয়ে স্পর্শ করলো ওকে । দুহাতের আজলে সুরবালার মুখ খানা আগলে শান্ত তবে উদগ্রীব স্বরে বলল…
“ সুরবালা , আমার দিকে তাকাও । কোথায় ব্যথা পেয়েছো বলো ? উঠতে পারছো না ? কোমরে ব্যথা পেয়েছো খুব ? বেশি ব্যথা করছে ? লেগেছে বেশি ? ঘরে চলো আগে , আমি সাহায্য করি তোমায় ?
সুরবালা ধীরে মাথা ঝাঁকায় । অংকুর অপেক্ষা করে না । ঝট করে উঠে দাঁড়িয়ে কোলে তুলে নেয় ওকে । সিঁড়ি বেয়ে উপরে ওঠে তড়িঘড়ি করে । অংকুর ওকে নিজের দখলে নিতেই সুরবালা ঝট করে গলা জড়িয়ে ধরেছে ওর । বুকের কাছে মাথা এলিয়ে নিঃশব্দে চোখ বুজেছে ।
শায়লা ঘরে , হয়তো ঘুমিয়েছেন তিনি । বিকেলে তার ঘুমানোর অভ্যাস আছে । অংকুর বড় বড় ধাপ ফেলে ঘরে ঢুকলো । সুরবালা কে খাটে বসালো অতি সন্তর্পণে ।
ওর সম্মুখে বসে ব্যাকুল হয়ে শুধালো আবার….
“ কোমরে ব্যথা পেয়েছো ?
উপর নিচ মাথা ঝাঁকায় বালা । কুচি এক হাতের খামচির মধ্যে আঁকড়ে রেখেছে এখনো । অংকুর দেখেও দেখলো না । সুরবালার অস্বস্তি বাড়ালো না সে । শুধালো নরম কন্ঠে…
“ পড়লে কি করে ?
“ আপনার জন্যই তো ?
কপাল গুটায় অংকুর । শুধায় সন্দিহান হয়ে…
“ আমার জন্য কি করে ?
“ ছাদ থেকে দেখলাম আপনি আসছেন । ভাবলাম দরজা খুলে দিতে হবে । তাই তো ছুটছিলাম আমি । ছুটতে গিয়ে হুবড়ি খেয়ে পড়ে গেছি । কোমর টা ভেঙেই গেছে বোধহয় । সব আপনার জন্য ।
আহত অভিযোগি কন্ঠ সুরবালার । গুটানো কপাল খানিকক্ষণ তীক্ষ্ণ করে সূক্ষ্ম নেত্রে তাকিয়ে রইল অংকুর । এবার অস্বস্তি ভুলে আগা গোড়া পরখ করলো ওকে । কপাল শিথিল হয়ে আসলো । চোখে ফুটলো আবেগি চাহনি । শীতল কন্ঠে বলল অংকুর…
“ আমার জন্য ওভাবে ছটফটিয়ে ছাদ থেকে নামার কি প্রয়োজন ছিলো ?
“ বাহ রে , দরজা খুলে দিতে হতো না ? আমি কি জানতাম নাকি আপনি চাবি ঘুরিয়ে দরজা খুলবেন ?
“ আমার চিন্তা ও করো তাহলে আজকাল ?
চোখ তুলে অংকুরের চোখের দিকে তাকিয়ে মুখ ভেংচালো বালা । কোমরে হাত রেখে মুখে ব্যাথাতুর ভঙ্গিমা টানলো জোর পূর্বক । ব্যাথা হচ্ছে না তেমন । তখন দাঁড়ানোর সময় একটু ব্যাথা লেগেছিল । এখন স্থিতিশীলতায় ব্যাথা অনুভব করতে পারলো না ।
তবুও মুখ কালো করে বললো…
“ আপনার জন্য ব্যথা পেয়েছি । খুব ব্যাথা করছে !
“ তাই , তা কোথায় ব্যথা পেয়েছো ?
“ কোমরে !
“ এখন আমার কি করা উচিত ?
না মানে , হসপিটালে নিয়ে যাবো তোমায় ? যাবে ?
“ এটুকু ব্যথায় হাসপাতালে যায় কে ?
“ তুমি যাবে !
“ মশকরা করবেন না !
অংকুর ভাবেলাশহীন উঠে দাঁড়ালো । ড্রয়ার খুলে ব্যথার মলম জাতীয় কিছু একটা বের করলো । সেটা সুরবালার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল…
“ এটা কোমরে লাগিয়ে নাও । আমি আসছি !
সুরবালার দিকে মলমটা বাড়িয়ে দিয়ে আলমারি খুলে কাপড় বের করে গোসল খানার দিকে এগোলো অংকুর । গরমে গায়ে ঘাম বসেছে । পড়নের টিশার্ট স্যাঁতস্যাঁতে ভেজা ঘামে ।
গোসল সেরে বেরিয়ে আসলো সময় নিয়ে । সুরবালা ততক্ষণে সেরে গেছে । অংকুর বেরিয়ে ঘরে সুরবালা কে পেলো না আর । অমনি কপাল কুঁচকালো । পরমুহূর্তে মুচকি হাসলো ।
সকাল থেকে অংকুর কিছু খায় নি । সুরবালা নিচে নেমেছে ওর খাবার আনতে । অংকুর ভেজা শরীরে টিশার্ট জড়ালো । ভেজা চুল মুছলো আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে । ওর সেই বাবড়ি চুল থেকে টুপটাপ পানি ঝড়ছে । মাথার ক্ষত সেরে গেছে ইতিমধ্যে ।
সুরবালা ঘরে আসলো এর মধ্যেই । হাতে খাবারের প্লেট । অংকুর তখনও আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে । সুরবালা ডাকলো ওকে ….
“ বাবড়ি ওয়ালা , খাবার খেয়ে নিন ।
“ সে কি , তোমার না কোমরে ব্যথা ? তুমি নিচে নামতে গেলে কেনো আবার ?
“ আপনাকে অতো বুঝতে হবে না , খেয়ে নিন চুপচাপ ।
সুরবালা খাবারের প্লেট টেবিলের উপর রাখলো । অংকুর ভেজা গামছা টা ইচ্ছে করেই ছুড়ে মারলো খাটের উপর । সুরবালার চোখে ধরা পড়া মাত্রই কটমটিয়ে তাকালো সুরবালা । খড়খড়ে গলায় ফোঁস করে উঠলো…
“ ওটা ওখানে ছুড়ে মারলেন কেনো ? কাজ বাড়াচ্ছেন আমার ?
“ কই ? বাড়াচ্ছি না তো ।
গা ছাড়া জবাব । ও হেলে দুলে এসে খেতে বসলো চেয়ার টেনে । সুরবালা মুখ বাঁকিয়ে টেবিলের পাশ থেকে সরে আসতে চাইলে আকস্মিক ওর শাড়ির আঁচলে টান পড়লো । অমনি ঝট করে পিছু ফিরলো বালা । আঁচলের এক কোণা দুই আঙ্গুলে টেনে ধরেছে অংকুর । চেয়ে আছে অপ্রতিভ নয়নে ।
সুরবালা বাঁধা পেয়ে শুধালো ভ্রু নাচিয়ে…
“ কি হয়েছে ?
“ এখানে পাশে বসবে একটু ? একলা খেতে ভালো লাগে না ।
“ যাচ্ছি না , ঘরেই আছি ।
“ পাশে থাকো । বসো এখানে ।
সুরবালার স্থির দৃষ্টি । ধীর সুস্থে বসলো ও পাশের চেয়ার টেনে । অংকুর খেতে নিয়ে শুধালো…
“ তুমি খেয়েছো ?
“ হুম ।
সময় চলছে । শ্যামা আর সংগ্রাম জোয়ার্দারের বিয়ের পর মাঝে পেরিয়েছে আরো তিন দিন । সবটা স্বাভাবিক ভাবেই চলছে । তবে বিপত্তি হয়েছে ফুলি কে নিয়ে । আম্মার মৃত্যুর পর বিষন্ন হয়ে গেছে মেয়েটা । অস্বাভাবিক পরিবর্তন এসেছে ওর মাঝে । যে মেয়ে আগে শ্যামা বলতেই অজ্ঞান হতো , সেই মেয়ে এখন শ্যামার সাথেও গুনে গুনে কথা বলে । মাত্রাতিরিক্ত একটা টু শব্দও উচ্চারণ করে না মুখে । সবসময় আনমনা হয়ে হাঁটু জড়িয়ে ঘরের এক কোনায় বসে থাকে । আতিয়া বেগমের ঘরেই ঠাই জুটেছে ওর । আতিয়া বেগম হাজার হাজার গল্প জুড়ে দেন ওর সাথে । তিনি একা একাই বকবক করেন , ফুলি শুনে যায় শুধু । শ্যামার সাথেও কথা বলে না নিজে থেকে । শ্যামা আগ বাড়িয়ে যা বলে , তার উত্তর করে শুধু । ওর এমন চারিত্রিক পরিবর্তন বেশ প্রভাব ফেলেছে শ্যামার উপর ও । আগে যে মেয়ে কথা বলতে বলতে মুখে ফ্যানা তুলতো , সেই মেয়ে এখন মুখে কুলুপ এঁটে বসে থাকে । শরীর শুকিয়ে একাকার । মুখখানা ছোট্ট হয়ে গেছে ওর ।
তাকালেই মায়া লাগে । আগে কি ছিল আর এখন কি হলো ?
ছটফটে মেয়েটা গুটিয়ে নিয়েছে নিজেকে । শরীরের হাল তো বেহাল । বিকেলে বাড়িতে ফিরেছে সংগ্রাম । শ্যামা তখন হেঁশেলে । আজকাল হেঁশেলের সময়সূচিতে পরিবর্তন এসেছে । শ্যামা রান্না বান্নার কাজে হাত লাগায় অনেকটা । সংগ্রাম ফিরতেই হেঁশেল ছেড়ে ঘরে উঠেছে শ্যামা । সংগ্রাম গোসল খানায় ঢুকে পড়েছে ততক্ষণে । ওর কাপড় বের করে খাটের উপর সাজিয়ে রেখে আবার নিচে নেমেছে শ্যামা । সংগ্রামের খাবার গরম করতে হবে ।
ওর খাবার টুকু নিজ হাতে গরম করলো । প্লেটে সাজিয়ে উপরে উঠলো আবার ।
সংগ্রাম গোসল সেরে বেরিয়েছে । পড়নে লুঙ্গি একখানা । উদ্দাম শরীর উন্মুক্ত । কাঁধে গামছা ঝুলিয়ে গোসল খানা থেকে বেরিয়েছে সংগ্রাম । চুল ভেজা । শ্যামা না আসা পর্যন্ত এমনই থাকবে । সে মুছবে না একা একা ।
শ্যামা ঘরে ঢুকতেই সংগ্রামের কার্যকলাপ নজরে আসলো । বড় আলমারিটা ঘাটছে সংগ্রাম । কিছু খুঁজছে হয়তো । শ্যামা ভেতরে এসে শুধালো…
“ কি খুঁজছেন ?
“ এখানে কিছু কাগজ রেখেছিলাম বেগম , এই শালের ভাজেই তো ছিলো । খুঁজে পাচ্ছি না । তুমি সরিয়েছো ?
শ্যামা খাবারের প্লেট রাখলো । এগোতে এগোতে বললো…
“ না তো । আমি তো দেখি নি ।
কপালে ভাঁজ ফেললো সংগ্রাম । মুখে চিন্তার ছাপ ফুটলো । কুঁচকানো মুখে এলোমেলো করে খুঁজতে লাগলো প্রয়োজনীয় কাঙ্ক্ষিত জিনিস । বড় আলমারি সম্পুর্ন টা সাদা কালো শাল দিয়ে ভরা । সব একবার করেই গায়ে চড়ে সংগ্রাম জোয়ার্দারের । অতঃপর গ্রামে অথবা গ্রামের বাইরে বিলিয়ে দেওয়া হয় । শহর থেকে নির্দিষ্ট সময় পর পর এমন হাজার খানেক করে শাল আসে প্রত্যেক বার । শ্যামা এসব গুছিয়ে রাখতে হিমশিম খেয়ে যায় ।
এখন সংগ্রাম কে সব এলোমেলো করতে দেখে তেড়ে গেলো শ্যামা ।
“ একি , করছেন টা কি ? সব এলোমেলো করছেন কেনো ? আমি দেখছি দাঁড়ান ।
কয়েকটা শাল ছড়িয়ে পড়েছে মেঝেতে । সংগ্রাম কে থামিয়ে ঠেলে সরালো শ্যামা । মেঝের শাল গুলো তুলে বিছানার উপর রাখলো । এদিকে ভেজা চুল লেপ্টে সংগ্রামের কপালে । ও চুল গুলো সরিয়ে দিলো , তবুও মুছলো না । শ্যামা একে একে শালের ভাঁজ পরীক্ষন করতে করতে একটা কাগজের গুটলা খুঁজে পেলো । দীর্ঘ হাঁফ ছেড়ে সেটা সংগ্রামের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললো….
“ এটা খুঁজছিলেন ?
সংগ্রামের কপালের ভাঁজ গায়েব । দ্রুত হাতে টেনে নেয় কাগজ গুলো । শ্বাস ফেলে উল্টে পাল্টে দেখে বলে নিঃসন্দেহে….
“ হুম । কোথায় পেলে । আমি তো এক্ষুনি এখানে খুঁজলাম । পেলাম না তো !
“ এখানেই ছিলো । মনযোগ দিয়ে স্থির হয়ে খুঁজলেই পেয়ে যেতেন । নয়তো , আমাকে বললেই হতো । বেকার বেকার সব এলোমেলো করলেন । এখন আবার গোছাতে হবে আমায় ।
সংগ্রাম ঠোঁট কামড়ে প্রথম কথা দুটোর উত্তর করলো…
“ অন্যথায় মনযোগ দেবো কি করে বেগম , মন তো তোমার কাছে । তোমার থেকে মনকে টেনে হিচড়েও সরাতে পারি না । আর তুমি যতক্ষণ সামনে থাকো , ততক্ষণ স্থির থাকি কি করে ?
এসব পরে গোছানো যাবে । আগে আমাকে গুছিয়ে দাও ।
কাগজ গুলো খাটের উপর রাখলো সংগ্রাম । নিজে চোখ বন্ধ করে পেছনে হাত গুটিয়ে লম্বাটে শরীর খানা টান টান করে দাঁড়ালো । রোজকার ন্যায় শ্যামা কে জ্বালাতে উঁচু করলো মাথা । শ্যামা ফিক করে হেসে দুদিকে মাথা নাড়ালো । গামছা টেনে দুষ্টু বুদ্ধি এঁটে সংগ্রামের উন্মুক্ত পেটে সুরসুরি দিতেই অকস্মাৎ কুঁকড়ে গেলো সংগ্রাম । ঝট করে চোখ বড় বড় করে চাইলো । ততক্ষণে শ্যামা সংগ্রামের মাথা নাগালে পেয়ে ভেজা চুলে গামছা চেপে ধরেছে । চুল মোছা হতেই গামছা সরিয়ে ঠোঁট চেপে ভ্রু নাচালো শ্যামা । সংগ্রামের ফ্যাল ফ্যালে দৃষ্টি দেখে হাসি টুকু সংবরন করতে পারলো না । চেপে রাখা হাসি ঠোঁট কেটে বেরিয়ে আসলো । সংগ্রাম ধাতস্থ হয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালো ফের । শিরদাঁড়া সোজা করে গলা খাঁকারি দিয়ে বললো শ্যামা কে বিদ্রুপ করে….
“ খাটো মাইয়ার নাটক বেশি শুনেছি । আসলেই নাটক বেশি । নিজে খাটো সেদিকে খেয়াল নেই , এদিকে আমার সাথে ফাঁকি বাজি করে দাঁত কেলাচ্ছে দেখো !
শ্যামার হাসি শব্দে পরিণত হলো এবার । সংগ্রাম নিজের অপমান বুঝে মুখ ফেরালো । মুচকি হাসলো মুখ ফিরিয়ে । অতঃপর খেতে বসলো গিয়ে ।
রাতে আফতাব রোজ দেরি করে বাড়ি ফেরে । এই কদিনে আরো পরিবর্তন এসেছে । আরো বেশি দেরি করে বাড়ি ফিরছে ও । বাইরে এতক্ষণ কোথায় থাকে কি করে জানা নেই । আফতাবের বন্ধু বান্ধব নেই । যারা আগে ছিলো , তারা এখন যে যার মতো নিজেদের সংসার সামলাতে মত্ত । আফতাবের ও সংসার আছে , তবে সে তা সামলায় উহ্য হাতে ।
আজও দেরিতে বাড়ি ফিরলো আফতাব । বাড়ির সবাই তখন গভীর ঘুমে । একা ঘরে থাকতে ভয় লাগে ময়নার । তবুও একাই থাকতে হয় ওকে । আফতাব না আসা পর্যন্ত ঘুমায় না । ঘুম চোখে ধরা দেয় না । গুটিয়ে শুয়ে শুয়ে পাথার থেকে ধেয়ে আসা শেয়ালের ডাক শোনে ময়না । আজ ও তাই করছিলো । ছিলো অধীর অপেক্ষায় । মন উতলা ময়না । বুক ধক্ ধক্ করছে ।
এর মাঝেই আফতাব হাজির । আফতাব আসলেও অন্যদিন শোয়া ছেড়ে ওঠে না ময়না । আফতাব ডাকে না ওকে । ভাবে ঘুমিয়েছে হয়তো । কিন্তু ময়না তো ঘুমায় না তখনো ।
আজ দরজার খট শব্দে তড়িঘড়ি করে উঠে বসলো ময়না । আফতাব ভেতরে ঢুকেই জাগনা পেলো ময়না কে । অমনি কপাল গুটিয়ে আসলো ওর । রোজকার তুলনায় আজ ব্যতিক্রম । আফতাব দরজা লাগাতে লাগাতে শক্ত কন্ঠে শুধালো…
“ ঘুমাও নি কেনো ?
ময়নার নিচু স্বর….
“ আপনের লাইগা !
“ আমার জন্য কেনো ?
না তাকিয়ে ভরাট কন্ঠে প্রশ্ন ছোড়ে আফতাব । হাত মুখ ধুয়েই এসেছে । গামছা দিয়ে হাত মুখ মুছে মেঝেতে পাটি বিছিয়ে নিলো আফতাব । খাট থেকে ঝাড়া মেরে বালিশ টেনে নিলো ময়নার পাশ থেকে । ময়না চমকালো এতে । আফতাবের খাবার সাজানো । ও ছুঁয়েও দেখলো না খাবারের প্লেট । ময়না কাঁপা গলায় পাল্টা শুধালো…
“ খাইবেন না ?
“ না !
মেঝেতে পাটির উপর বসলো আফতাব । সে অধীর অপেক্ষায় আছে নিজের করা প্রশ্নের উত্তরের জন্য ।
ময়না ভুলেছে সেই প্রশ্ন । সে থেমে থেমে গলা তুললো…
“ এতো রাইত অবধি বাইরে কি করেন আপনি ?
চট করে চোখ কুঁচকে তাকালো আফতাব । অমনি ছ্যাঁত করে উঠে দৃষ্টি সরিয়ে নিলো ময়না । আফতাব চোখ শিথিল করে বললো…
“ কিছু করি না !
তুমি এখনো ঘুমাও নি কেনো আজ ?
শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৪৯
“ আমার ভয় করে একলা ঘরে থাকতে !
“ রোজ তো ঘুমাও ! তখন ভয় করে না ? আজ হঠাৎ ভয় করছে কেনো ?
ময়না মাথা নিচু করে ফেললো জড়তায় । আফতাব শুয়ে পড়েছে মুখ ফিরিয়ে অন্য পাশ হয়ে । ময়নার শরীর কাঁপছে । গলা কাঁপছে ওর । ও কিছু বলতে চাইছে,পারছে না । শব্দরা দলা পাকিয়ে আটকে আসছে কন্ঠ নালিতে । ময়না সমস্ত বাঁধ ঠেলে গলা চিরে বললো….
“ আ…আমি সন্তান সম্ভবা নই !
