শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ১৭
অনামিকা তাহসিন রোজা
শ্রাবণ আর ধারা গ্রাম থেকে আজ সকালেই চলে যাবে — কথাটি শুনে অস্থির হলেন ললিতা খাতুন। বারবার ধারাকে বললেন আর দুটো দিন থাকতে বল জামাইকে। কিন্তু ধারা অবুঝ নয়। শ্রাবণের কাজের কথাটা বুঝেছে সে। তাই নিজ দায়িত্বে ললিতা খাতুন কেও বুঝিয়ে দিয়েছে। ভদ্র মহিলা শোনামাত্রই আর দেরি করেন নি। যা পারেন তাই রান্না করতে বসে গেছেন। আর পুকুর থেকে টাটকা কিছু মাছ তোলার ব্যবস্থা করেছেন যাতে শহরে নিয়ে যেতে পারে। এদিকে ভোর বেলাতেই ধারা সব ব্যাগ গুছিয়ে ফেলেছে। শ্রাবণ গোসলে গেলো কেবল। সকাল সকাল গোসল করে জার্নিতে বের হলে নিজেকে তরতাজা মনে হয়। এই ফিলোসোফির সাথে মোটেই এক নয় বেচারি ধারা। সে আবার জার্নির আগে নয়, বরং জার্নির পরে বাড়িতে ফিরে গোসল করার সাথে সহমত।
পুকুরের সামনে হাতে দুটো গামছা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ধারা। গোলগোল চোখদুটোর পিটপিট করে তাকানো দেখে যে কেওই ফিক হেসে ফেলবে। শ্রাবণ পুকুরে গোসল করতে নেমেছে। গোসল প্রায় শেষের দিকে। তাই ধারাও দায়িত্ব সহকারে হাতে গামছা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তবে শ্রাবণ যে এই কয়দিন বেশ কষ্ট করে পুকুরে গোসল করেছে তা বেশ বোঝা যাচ্ছে এখন। যা দেখে ধারার একটু মন খারাপও হলো। শ্রাবণ হাতপা থেকে পানি ঝেড়ে ভেজা কাপড়েই উঠে আসলো। ধারার হাত থেকে গামছা নিয়ে মাথা মুছতে মুছতে বলল,
—’ আর দেরি করো না। যাও, রেডি হও!”
ধারা ঠোঁট কাঁমড়ে কিছু একটা ভেবে বলল,
—” সকালের নাস্তাটা করে যাবেন না?”
শ্রাবণ প্রথমে ভাবল আসলেই না খেয়ে বের হবে। কিন্তু ধারার তো খিদে লাগতে পারে। তাই নিজের চিন্তা বাদ দিয়ে বলল,
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
—” হুম। তুমি তবুও তৈরী হয়ে নাও। রেডি হয়েই না হয় নাস্তা করব। কিন্তু দেরি করো না। বাস মিস হয়ে যাবে।”
ধারা বাধ্যের ন্যায় মাথা নেড়ে শ্রাবণকে একটা সাদা শার্ট দিল। শ্রাবণ শার্টটা হাতে নিয়ে ভ্রু কুঁচকে বলল,
—’ আমি যে নতুন একটা শার্ট বের করে রেখেছিলাম। এটা কেনো দিলে?”
ধারা এই ভয়টাই পাচ্ছিল। আসলে সে একটা দুঃসাহসিক কাজ করে ফেলেছে, যেটা শ্রাবণ বুঝতে পারুক এটা চাইছিলা না ধারা। কিন্তু শ্রাবণ শেখ তো সেটাই আগে ধরে ফেলল। তৎক্ষনাৎ লজ্জায় মাথা নিচু করল মেয়েটা। কানের পিঠে চুল গুঁজে কিছুক্ষণ আমতা আমতা করে মিনমিন করে বলল,
—” আসলে, আপনাকে সাদা শার্টে সুন্দর… মানে ভালো লাগে। আর এমনিতেও ওই নীল শার্টটা কেমন যেন পুরোনো লাগছিল আমার কাছে, তাই ভাবলাম ধুয়ে দিই! আর এটা আপনার ব্যাগ থেকে বের করেছি!”
কথাগুলো বলার পুরোটা সময়ই ধারা মাথা নিচু করে রেখেছিল। মনে হচ্ছে এর থেকে বেশি কঠিন আর লজ্জাজনক কথা হতেই পারেনা। সদ্য কেনা নতুন একটা শার্টকে মেয়েটা সেকেন্ডেই পুরোনো বলে দাবি করল দেখেই শ্রাবণ কিছুক্ষণ তব্দা খেয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। তারপর কিছুক্ষণ সময় নিলেই বুঝতে পারলো ধারা ইচ্ছে করে এই কথা বলে সাদা শার্ট টা তাকে দিয়েছে। তার মানে শ্রাবণকে সাদা শার্টে ধারার ভালো লাগে। মনে অদ্ভুত রকম ভালো লাগা কাজ করল শ্রাবণের মাঝে। মেয়েটা কে আর লজ্জা দিতে ইচ্ছে করল না! নইলে কখনো আর এমন করে নিজের মনমতো কাজ করবেনা। তাই শার্টের বিষয়টাও নিজেই ধামা চাপা দিল সে। এ নিয়ে আরো কোনো কথা না বলেই আড়ালে মুচকি হাসলো। বোঝা গেল আজ থেকে শ্রাবণ শেখের আলমারিতে সাদা শার্টের সংখ্যা অনেক বেড়ে যাবে!
ধারা মনে হয় হার্ট অ্যাটাক করে ফেলবে। সকাল সকাল এত বড় চমক সে মোটেই আশা করেনি। হতবাক হয়ে মেয়েটা উঠোনের খুঁটি ধরে তাকিয়ে রয়েছে ললিতা খাতুনের সাথে কথা বলতে বলতে বাড়িতে ঢোকা সাদিক আর কনিকার দিকে। ধারা যেন স্থির হয়ে গেল মুহূর্তেই। বুকের ভেতর ধুপধুপ করছে। কনিকা সত্যিই এসেছে? তাও এবার এখানে? কিন্তু কীভাবে?
ললিতা খাতুন স্বাভাবিক গলায় কিছু একটা জিজ্ঞেস করছেন সাদিককে, কিন্তু ধারার কানে কিছুই ঢুকছে না। ওর দৃষ্টি আটকে আছে। একদম সেজে গুজে দুজনে হাজির হয়েছে। ধারাকে দেখেই কনিকা রীতিমতো দৌঁড়ে এসে জড়িয়ে ধরল, আর অস্থিরভাবে হেসে বলল,
—” বুবু! কেমন চমক খেলে বলো বলো!”
সাদিকও এসে লম্বা এক সালাম দিল। আর স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে দাঁত বের করে হাসলো। ধারা অবাক হওয়ার রেশ কাটাতে পারেনি। কনিকার হাত ধরে ভয়ার্ত দৃষ্টি ফেলে বলল,
—” তুই কীভাবে এলি রে কণা? ছোট মা তোকে আসতে দিল? কিছু বলেনি? তাও আবার সাদিক ভাইয়ের সাথে? মানে এসব কী? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছিনা!”
ললিতা খাতুন বিরক্ত হয়ে বললেন,
—” এ ছেড়ি সর তো সর। জেরা পরে করবি। আগে ঘরে যাইতে দে।”
সবাই গিয়ে উঠোনে বসে পড়ল। ললিতা খাতুন তাড়াতাড়ি করে রান্নাঘরে গেলেন। ধারা এবার আতঙ্কিত চোখের দৃষ্টি ফেলে বলল,
—”সাদিক ভাই, এসব কী? কীভাবে এলেন ওকে নিয়ে? আর হুট করে এভাবে!”
কনিকা এবার তড়িঘড়ি করে বলল,
—” আরেহ বাবা, আমি কইতাছি শুনো। মা গত কাল দুপুরে নানু বাড়িতে ঘুরতে গেছে সবাইরে নিয়া। বাড়িতে শুধু আমি আর বাবা ছিলাম। আর আইজ ভোর বেলা বাবাও শহরে গেছে। কি যেন একখান কাম আছে কইলো। আর আমিও তো জানতাম তুমি এইখানে আছো। তাই দেখা করতে আইলাম, চলেই তো যাবা।”
সাদিকও মাথা নাড়ালো। ধারা শুনলো সবটা। কিন্তু মুখ থেকে কালো ছায়াটা সরলো না। মিনমিন করে বলল,
—” সাদিক ভাইকে নিয়ে আসলি কেনো? গ্রামের কেও যদি দেখে ফেলে, তখন কী হবে?”
এ পর্যায়ে সাদিক বলল,
—” চিন্তা করিও না ধারা। আমি লুকায় আনছি ওরে। একা একা আসবার পারত না। তাই কি আর করুম! সমস্যা নাই। একটু পরেই চইলা যামু। ওরে সাবধানে বাড়িতে ঢুকায় দিমু! ”
বিষয়টা নিয়ে একটু চিন্তা হচ্ছে ধারার। গ্রামের মানুষরা মোটেই সুবিধার না। এর থেকেও বড় কথা, কনিকা কিশোরী একটা মেয়ে। কেও যদি ঘুনাক্ষরেও টের পায় আর সাদিকের সাথে কনিকাকে দেখে ফেলে তাহলে যে কি একটা বাজে অবস্থা হবে তা ভাবলেও গায়ে কাঁটা দিচ্ছে ধারার। মনের খারাপ চিন্তা টা দমিয়ে রাখলো ধারা। হাসিমুখে কনিকার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। একদিক দিয়ে ভালোই হয়েছে। অন্তত বোনটার সাথে দেখা করেই শহরে যেতে পারবে। এদিকে শ্রাবণের সাথে আড্ডা দিতে ঘরের ভেতরে ঢুকলো সাদিক। গিয়েই হুড়মুড়িয়ে জড়িয়ে ধরল জিগড়ি দোস্ত কে। প্রথমে ভয়ই পেলো বেচারা অপ্রস্তুত শ্রাবণ। পরে সেও বিষয়টা বুঝে হেসে ফেলল।
খাওয়া দাওয়ার পাঠ চুকিয়ে তৈরী হয়ে উঠোনে নামছে শ্রাবণ। আজ একটা দূর্লভ কাজ হয়ে গেছে। শুনেছি ছেলে রা নাকি খুব একটা নিজেদের নিয়ে ভাবেনা, অন্তত সাজসজ্জা নিয়ে পুরুষের খুব একটা মাথা ব্যাথা নিয়েই। শ্রাবণও কখনো এমন ছিল না। তবে আজ সাদা শার্ট টা পড়ে রেডি হওয়ার পর সে বারবার আয়না দেখেছে। কি যে ভেবেছে কে জানে! তবে তার মনে হচ্ছিল তাকে সুন্দর লাগছে কিনা! পরে আবার নিজের কাজে নিজেই বিরক্ত হয়েছে বেচারা! কি যে হয়েছে তার! আজকাল কেমন যেন অদ্ভুত অনুভূতি টের পাওয়া যাচ্ছে!
শার্টের হাতা গোটাতে গোটাতেই উঠোনে নামলো শ্রাবণ। গলা উঁচিয়ে ডাক দিল ধারা কে। মেয়েটা সেই কখন রেডি হয়ে ছোট বোন কে নিয়ে পুকুরপাড়ে গেছে! তার ডাক বোধহয় শুনতেই পেলো না। শার্টের হাতের গোটানো শেষ হলে হঠাৎই শ্রাবণের চোখ পড়লো উঠোনে রাখা এক জোড়া জুতোর দিকে। নিঃসন্দেহে ধারার জুতো এগুলো। কিন্তু শ্রাবণ কিছুক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে থেকে ভ্রু কুঁচকে ফেলল। আশেপাশে তাকিয়ে সতর্ক হয়ে ঝুঁকে এলো নিচের দিকে। হাঁটুতে ভর দিয়ে বসে জুতোজোড়া আঙুল দিয়ে দেখলো।
শ্রাবণের আঙুল থমকে গেল জুতোর ছেঁড়া অংশে। চোখের ভেতর হঠাৎ যেন ভারি কুয়াশা জমল। এতদিনে সে খেয়ালই করেনি, ধারার চলার মত ভালো একজোড়া জুতো নেই। আসার দিন শাড়ি পড়েছিল মেয়েটা, তাই পায়ের দিকে লক্ষ্য করেনি শ্রাবণ। আর এখানে এসে তো স্যান্ডেল পড়ে বেড়ায়। কিন্তু তাই বলে, মেয়েটা একবারও বলেনি, একটুও মুখ খোলেনি। অথচ প্রতিদিন এই ছেঁড়া জুতোটাই পায়ে দিয়ে দৌড়েছে, বাইরে গেছে। এই জুতো তো একদমই চলার মত না! আচ্ছা এই কারনেই কি ওইদিন মেয়েটা ধীরে হাঁটছিল!
শুকনো ঢোক গিলল শ্রাবণ। চোখ খিঁচে বন্ধ করে ঠোঁট ভিজালো। বুকের টিপটিপ করে উঠা যন্ত্রনা টা টের পাচ্ছে সে। মনে হলো, সে কি তবে এতটাই অমনোযোগী? পাশে থেকেও কিছুই দেখেনি! না জানি কত বছর আগের জুতো এগুলো! শ্রাবণের বুকের ভেতর হালকা একটা চাপা যন্ত্রণা উঠল। সে তো জানেই ধারা এমন! মরে গেলেও নিজের কোনো সমস্যার কথা বলবে না! হাতের আঙুল আলতো করে ঘুরিয়ে জুতোর তলা ছুঁয়ে দেখল শ্রাবণ। পুরোনো, ক্ষয়ে যাওয়া, তবুও যত্নে রাখা। হয়তো ধারা চায় না কারও সামনে তার অভাব চোখে পড়ুক।
শ্রাবণ নিঃশব্দে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। গলার ভেতর দলা পাকানো অনুভূতি জমে উঠল। ধারা কি জানে, এই ছোট্ট জুতোর ছেঁড়া অংশটাই তার ভেতরে কী তোলপাড় ফেলে দিল? অথচ শ্রাবণ শেখ কখনোই একজোড়া জুতো সর্বোচ্চ আট-নয় মাসের বেশি ব্যবহারই করেনা! শ্রাবণের শার্টের হাতা গোটানো হাতদুটো থেমে রইল হাঁটুর উপর। মনে মনে সে ঠিক করল, আজই, কোনোভাবে, যেকোনো অজুহাতে হোক, ধারার জন্য নতুন জুতো আনবে। না, শুধু জুতো না… ধারা যেন আর কোনোদিন নিজের কষ্ট একা লুকিয়ে রাখতে না হয়। শ্রাবণ দাঁড়িয়ে পড়ল ধীর পায়ে। কিন্তু চোখে অদ্ভুত এক দৃঢ়তা ফুটে উঠল।
শ্রাবণ সেখান থেকে সরে উঠোনে রাখা বেঞ্চের উপর গিয়ে বসতেই ধারা কনিকাকে নিয়ে উঠোনে আসলো। পুকুরপাড়ে গল্প করছিল ওরা। লাল রঙের একটা কামিজ পড়েছে ধারা। এখানে আসার দিন লোকচক্ষুর জন্য শাড়ি পড়েছিল, কিন্তু আজ সালোয়ার কামিজ পড়েই যাবে। শ্রাবণও তাই চেয়েছিল অবশ্য।
শ্রাবণকে সাদা শার্টে দেখে মিষ্টি হাসলো ধারা। লোকটাকে সাদা রঙে অনেক সুন্দর মানায়। আসলে এমনিতেই মানানোর কথা! ফর্সা মানুষের গায়ে রীতিমতো সব রঙের জামাকাপড়ই অনেক ফুটে ওঠে। এটা সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত অন্যরকম এক উজ্জ্বলতা! তবে হ্যাঁ, শ্যামরঙা মানুষদেরও ভিন্ন রকম সৌন্দর্য আছে। ধারার এখনো মনে পড়ে তার বাবা শ্যামবর্ণের ছিল, অথচ সাদা পাঞ্জাবি পড়লে কত শুভ্র নির্মল লাগত! এক মুহুর্তের জন্য শ্রাবণকে দেখে নিজের বাবার কথা মনে পড়লো তার। কনিকা তো শ্রাবণকে দেখে আনন্দে আত্মহারা। পারলে কোলে উঠে বসে এমন খুশি সে। দৌঁড়ে এসে শ্রাবণকে সালাম দিয়ে পাশে বসলো কনিকা।
— ” কেমন আছেন দুলাভাই?”
শ্রাবণ কনিকার সালাম নেওয়ার ভঙ্গিটা দেখে হেসে দিলো। মেয়েটা যেন ছোট্ট একটা পাখির মতো হঠাৎ এসে তার পাশে বসেছে। মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেই কনিকা উচ্ছ্বসিত হয়ে গেল।
শ্রাবণ কোমল গলায় বলল,
—”ভালো আছি। তুমি কেমন আছো?”
কনিকা খুশিতে গদগদ হয়ে উত্তর দিল,
—”আমি দারুণ আছি! দুলাভাই, আপনাকে সাদা শার্টে একদম হিরোর মতো লাগছে! আপনি নায়ক হতে পারতেন!”
কথাটা শুনে শ্রাবণ ফিক করে হাসলেও ধারা হঠাৎ লজ্জা পেয়ে চোখ নামিয়ে নিল। কপালের কোণে টুক করে চুল পড়ে গেল, হাতের আঙুলে খেলা করতে লাগলো। মেয়েটা যেন চাইলেও নিজের অনুভূতি লুকাতে পারছে না। আশ্চর্য! প্রশংসা পেলো শ্রাবণ! অথচ লজ্জা লাগছে তার। এ কি উল্টোপাল্টা অনুভূতি!
শ্রাবণ হাসি চাপতে চাপতে মাথা নেড়ে বলল,
—” তাই নাকি? হিরো লাগছে? তা হিরো হলে তো হিরোইনেরও দরকার পড়ে।”
কনিকা হেসে খিলখিলিয়ে উঠলো, আর ধারা চমকে চোখ তুলে তাকাল শ্রাবণের দিকে। কিন্তু শ্রাবণের চোখ এবার সোজা ধারা’র দিকেই ছিল। শান্ত অথচ ভেতরে চাপা একটা স্রোত বয়ে যাওয়া দৃষ্টি হতবাক করে দিল ধারাকে। কিছুক্ষণের জন্য উঠোনে অদ্ভুত নীরবতা নেমে এলো। কেবল দূরের পুকুরপাড়ে ব্যাঙের ডাক আর বাতাসে দুলতে থাকা গাছের পাতার খসখস শব্দ। কনিকাও আড়চোখে দুজনকে দেখছে।
ধারা দুহাত কচলাতে শুরু করলো। শ্রাবণের এমন দৃষ্টি অপরিচিত। এভাবে তাকিয়ে আছে কেনো? ধারার অসস্তি না হলেও অদ্ভুত অনুভূতি হলো, কি বলবে কোনো কিছু ভেবে না পেয়ে মিনমিন করে বলল,
—” কিছু লাগবে আপনার?”
শ্রাবণ একইভাবে তাকিয়ে থেকেই মাথা উপরনিচ করলো, যার অর্থ হ্যাঁ লাগবে। ধারা এবার উদগ্রীব হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
—” কী লাগবে?”
শ্রাবণ নির্বিকার ভঙ্গিতে বলে উঠলো,
—” হিরোইন! ”
কনিকা তখন আর হেসে থামতেই পারল না। খিলখিলিয়ে হেসে মাটিতে পড়ে যাবে যেন। পেটে হাত রেখে হাসি থামাতে না পেরেও বলল,
—”দুলাভাই, আপনি তো এক্কেবারে ছক্কা মারলেন! ঠিক বলেছেন, আসলেই নায়িকা দরকার!”
ধারার বুকটা ধক করে উঠলো। মনে হলো, চারপাশের বাতাস একসাথে জমাট বেঁধে তার গলা চেপে ধরেছে। ঠোঁট শুকিয়ে এলো মেয়েটার। অবিশ্বাসে বড় বড় চোখে তাকিয়ে রইলো শ্রাবণের দিকে। কিন্তু শ্রাবণ মিটিমিটি হাসলো। যা দেখে ধারার কান টকটকে লাল হয়ে উঠলো। তাড়াহুড়ো করে ওড়না দিয়ে ঘাম মুছার ভান করে মুখের অর্ধেকটা ঢেকে নিলো। গলা শুকিয়ে গিয়েছে, কিন্তু মুখ থেকে কোনো শব্দ বের হচ্ছে না। শ্রাবণ এবার হালকা মুচকি হাসলো। দৃষ্টি সরিয়ে আবার সামনে তাকালো, যেন কিছুই হয়নি। অথচ চোখের কোণে দুষ্টু এক ঝিলিক রয়ে গেল।
ধারা একেবারেই সামলাতে না পেরে তাড়াহুড়ো করে কনিকার হাত ধরে বলল,
—” চল ভেতরে যাই। ফুফুকে ডেকে আনি!”
ধারা কনিকার হাত টেনে নিয়ে যেতে লাগলো, কিন্তু বুকের ভেতর অদ্ভুত কাঁপুনি রয়ে গেল। মনে মনে সে বুঝলো, শ্রাবণের চোখে আজ অন্যরকম কিছু আছে। যা তার বুকের ভেতর কাঁপন ধরিয়ে দেয়!
—” তোমার হিটলার বাবাকে পাবনা তে পাঠানো দরকার মোনা!”
জিহানের কথা শুনে ফুঁসে উঠলো মুনিরা। কিন্তু কিছু বলল না। সে নিজেও টেনশনে আছে। মইনুল হোসেন এক মাসের জন্য জিহানকে তার দায়িত্ব দিয়ে কিসের পরীক্ষা নিতে চাইছেন তা মাথায় ঢুকল না মুনিরার। কী চাইছেন তিনি? শুধু কি জিহানের টাকা-পয়সা দেখতে চাইছেন, নাকি অন্যকিছু।
জিহান এবার থুতনিতে হাত বুলিয়ে বলল,
—” আচ্ছা মোনা, তোমার বাপ কি এক মাসের জন্য আমার হাতে তোমায় তুলে দিল?”
মুনিরা মাথা নেড়ে জোর গলায় বলল,
—” তো এতক্ষণ ধরে তুমি কোন জগতে ছিলে?”
জিহান মুখ কুঁচকে বলল,
—” আহহা! খেপে যাচ্ছো কেনো? আমি তো ভালো করেই জানতে চাইলাম!”
মুনিরা মুখ কুঁচকে বিড়বিড় করল। বিরক্ত লাগছে তার! নির্ঘাত জিহানকে ভালোবেসে ফেলেছে, নইলে এই বলদ কে লাথি মেরে উগান্ডা পাঠাতে কৃপনতা করত না সে। জিহান অনেকক্ষণ ভাবার পর মুনিরা কে বলল,
—” শ্রাবণ আজকালের মধ্যেই শহরে ফিরবে বুঝলে। ও ফিরলেই বরং আলোচনা করব। তোমার চিচিংগা বাপের কোনো কথাই বুঝিনি আমি!”
মুনিরা মাথা নেড়ে সায় দিল। তবে নিজেও ভাবলো কিছুক্ষণ। তার বাবা শয্যাশায়ী হয়েছেন তো কী হয়েছে? দাপট আর মাথার মধ্যে থাকা বুদ্ধি এখনো রয়েছে। এমন এমন ভয়ানক পরিকল্পনা তার মাথায় কিলবিল করে যা সাধারন কারো কল্পনাতেও কখনো আসে না। জিহানকে মুখে না বললেও মুনিরা নিশ্চিত এই এক মাস শব্দটা একটা কথার কথা মাত্র। অন্য কিছু নিশ্চয়ই হবে। মইনুল হোসেন যে কখনো কোথায় কীভাবে পরীক্ষার মধ্যে জিহানকে ফেলবেন তা কেও টেরও পাবে না। এমনকি মুনিরাও না!
বাসস্ট্যান্ডে সকালের রোদটা খানিকটা ঝিমিয়ে এসেছে। চারপাশে গরম বাতাসের সঙ্গে ধুলো উড়ছে, আর লোকজনের কোলাহল ছড়িয়ে পড়ছে। গাড়ির হর্ন, গাড়ির শব্দ, মাঝে মাঝে ফলওয়ালার হাঁক, সব মিলিয়ে এক অস্থির পরিবেশ। নির্ধারিত বেঞ্চটার একপাশে ধারা শান্তভাবে বসে আছে। কোলের উপর
ওড়না গুটিয়ে হাত রাখলেও আঙুলগুলো অনবরত কাঁপছে। তার চোখ যেন বারবার রাস্তার দিকে ছুটে যাচ্ছে, কোথা থেকে বাসটা আসে। ঠোঁট কামড়ে রাখায় গালের রঙ একটু ফ্যাকাসে দেখাচ্ছে।
অন্য পাশে বসে আছে শ্রাবণ। সাদা শার্টে খানিক ধুলো জমলেও, অদ্ভুত এক গাম্ভীর্য আছে তার চেহারায়। চোখ দুটো আধখোলা, যেন ভাবনায় ডুবে আছে। অথচ, প্রতি কয়েক সেকেন্ড পর পর ধীরে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে তাকিয়ে দেখছে ধারাকে। ধারা বুঝতে পারছে না, তার এই টানটান অনুভূতির ভেতর কাকে বেশি ভয় পাবে, বাসের দেরি হওয়া নাকি শ্রাবণের নীরব দৃষ্টি। বেঞ্চের নিচে ছোট্ট কুকুরছানা এসে শুয়ে পড়লো। ধারা তাকাতেই কুকুরছানাটা লেজ নেড়ে দিল। হালকা একচিলতে হাসি ফুটলো তার ঠোঁটে। সেই মুহূর্তে শ্রাবণও তাকালো। হাসিটা দেখতে পেয়েই বুকের ভেতর অদ্ভুত এক উষ্ণতা ছড়িয়ে গেল তার।
ধারা টের পেলো, শ্রাবণ এখনো তার দিকেই তাকিয়ে আছে। সে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে সামনের ধুলোমাখা রাস্তার দিকে স্থির দৃষ্টি রাখলো। কিন্তু মনটা ততক্ষণে অস্থির হয়ে গেছে।
শ্রাবণ আসলে তখন থেকেই ভাবছে। বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় থেকেই কিছু একটা ভাবছে। কীভাবে কাজ টা করবে সেটা ভাবতে ভাবতেই হুট করে ধারাকে জিজ্ঞেস করল,
—” আশেপাশে কি কোথাও এটিএম বুথ বা ব্যাংক আছে?’
ধারা ঠোঁট কাঁমড়ে ভেবে দু’দিকে মাথা নাড়ালো,
—” উহু। এখানে নেই। এই গ্রামেই নেই।”
চ শব্দ করল শ্রাবণ। এই মুহুর্তে একটা ব্যাংক থাকলে সবচেয়ে বেশি সুবিধা হতো। যদিও হাতে যা আছে তা দিয়েও হবে। তবে সে চাইছিল ভিন্ন কিছু করতে। কিছুক্ষণ গভীর চিন্তাভাবনা শেষে শ্রাবণ শেষমেশ উঠেই দাঁড়ালো,
—” তুমি এখানে একটু বসো। আমি আসছি। বাস আরো লেইট করবে বুঝলে। প্রায় ত্রিশ মিনিটের মত লেইট হবে। আমি পনেরো থেকে বিশ মিনিটের মধ্যে আসছি।”
ধারা সবটা শুনলো। কিন্তু ভয় লাগলো খানিকটা। একা একা এতটা সময় থাকতে বোধহয় মন চাইলো না। তাই মিনমিন করে বলল,
—” আমিও যাব আপনার সাথে!”
শ্রাবণ থমকে গেল। এক মুহূর্তের জন্য ধারার দিকে তাকিয়ে তার চোখে কিছু উষ্ণতা জ্বলে উঠলো। ধারা হয়তো বুঝতেই পারছে না, সেই কাঁপা কণ্ঠে বলা কথাটা আসলে কতটা নির্ভরশীলতার প্রকাশ। কিন্তু শ্রাবণ জানে, তাকে এখনই সাথে নিলে চমকের আসল রূপটাই নষ্ট হয়ে যাবে। সে তাই ঠোঁট সামান্য ভিজিয়ে খুব শান্ত গলায় বলল,
—” না, তোমার যাওয়ার দরকার নেই। তুমি এখানে বসে থেকো। আমি কাছে যাচ্ছি, বেশি দূরে না।”
ধারা চোখ বড় করে তাকালো তার দিকে। “কিন্তু আমি একা…”—কথাটা গলার কাছে এসে থেমে গেল। মনে হলো, নিজেকে খুব দুর্বল করে দিচ্ছে। অথচ সত্যিই ভয় পাচ্ছে মেয়েটা। আশেপাশের লোকজনের ভিড়েও নিজেকে একা মনে হচ্ছে। শ্রাবণ খানিকটা ঝুঁকে এলো তার দিকে, কণ্ঠটা নরম করে বলল,
—” ভয়ের কিছু নেই। আমি তো আছি। তাছাড়া, এই বাসস্ট্যান্ডে তো মানুষজন আছে। তোমার কিছু হবে না।”
বলেই দাঁড়িয়ে গেল সে। চোখে দৃঢ়তা, মনে একটাই উদ্দেশ্য, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ধারার জন্য জুতো কিনে ফেলা। ধারা ঠোঁট কামড়ে মাথা নিচু করল। সে জানে, শ্রাবণ যা ঠিক করেছে তা-ই হবে। তবে বুকের ভেতরটা কেমন যেন খালি খালি লাগছে। শ্রাবণ হাঁটতে হাঁটতে ভিড়ের মাঝে হারিয়ে গেল। ধারা তার পেছনের দিকটা দেখতে দেখতে শুধু মনে মনে ভাবলো,
— “এ লোকটা কেনো জানি, আমার জীবনের সাথে এত অদ্ভুতভাবে জড়িয়ে যাচ্ছে!”
শ্রাবণের প্রস্থানের পরই একজোড়া দম্পতি এসে ধারা যেই বেঞ্চে বসে আছে, তার পাশের বেঞ্চে এসে বসলো। দেখেই বোঝা গেলো নবদম্পতি তারা। খুব বেশি হলে সাতদিন আগে বিয়ে হয়েছে! ধারা প্রথমে তাকাতে চায়নি। কিন্তু চোখ যেন নিজে থেকেই সরে গিয়ে নবদম্পতির উপর গিয়ে থেমে রইল। না চাইতেও চোখ চলে যায় তাদের দিকে। কারন মেয়েটার গায়ে জড়ানো লাল-সোনালী মিশ্র জ্বলজ্বল করা জামদানি শাড়ি,রোদে আর বাসস্ট্যান্ডের ধুলোয়ও শাড়ির জৌলুস একটুও কমেনি। মাথার খোঁপা ভারী করে সাজানো, সেখানে টকটকে লাল গোলাপ গুঁজে দিয়েছে। কানের দুল থেকে শুরু করে গলার হার, নাকফুল, এমনকি কপালের টিপটাও চিকচিক করছে। হাতের চুড়ি নড়লেই ঝমঝম শব্দ উঠছে, আর তার হাসির সাথে মিলিয়ে সবকিছু যেন আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। মুখের মিষ্টি হাসিটা তো বলেই দিচ্ছে কতটা সুখী সে। আরেকটা জিনিস লক্ষ্য করল ধারা। মেয়েটাকে দেখতে কিছুটা তার ছোটবেলার বন্ধু জান্নাতির মত!
ছেলেটা পাশেই বসে আছে, একেবারে গা ঘেঁষে। গায়ে সাদা-ক্রিম রঙের পাঞ্জাবি, চেহারায় পরিপূর্ণ সন্তুষ্টির ছাপ। এক হাতে আলতো করে ধরে আছে মেয়েটার হাত। মাঝে মাঝে ঝুঁকে কিছু ফিসফিস করছে, আর মেয়েটা খিলখিল করে হেসে উঠছে।
ধারা নিজের অজান্তেই শ্বাস রোধ করে তাকিয়ে থাকলো। বুকের ভেতরে এক অদ্ভুত টান অনুভব হলো। এমন দৃশ্য, এমন অনুভূতি সে সিনেমা তে দেখেছে। বাস্তবে খুব কমই এত সুন্দর দম্পতি দেখেছে সে। কতটা সুন্দর, পরিপূর্ণ সুখী এক দম্পতি! অজান্তেই ধারা টের পেল অসহায় আর শূন্যতার মিশ্র এক অনুভূতি। যেন নিজের ভেতরটা আরও বেশি ফাঁকা হয়ে গেল।
হঠাৎ ধারার নজর চলে গেল নিজের খালি হাতে, যেখানে কোনো চুড়ি নেই, কোনো আভিজাত্যের ছাপ নেই। পায়ের দিকে তাকাতেই মনে পড়লো পুরনো জুতোগুলোর কথা। মাথা নিচু করলো ধারা। কেন যেন চোখের কোণে একটু জ্বালা লাগছে। চারপাশে এত ভিড়, এত শব্দ। তবুও মনে হলো, এই মুহূর্তে সে একেবারেই একা। নাহ! তার মোটেই আভিজাত্যের জন্য খারাপ লাগছে না! খারাপ লাগছে এক জোড়া দম্পতির ভালোবাসা দেখে। যদিও এও এক অন্যায়! নজর না লাগুক কারো সংসারে! এসবের ভাবনায় সে টেরও পেলো না ভাবতে ভাবতেই কখন শ্রাবণের দেয়া পনেরো মিনিট পার হয়ে গেছে।
হুট করে পায়ের কাছে কারো হাতের ঠান্ডা স্পর্শ পেতেই চমকে উঠলো ধারা। বুকটা ধক করে উঠলো। এতক্ষণ চারপাশের সবকিছু ভুলে বসে থাকা সে যেন হঠাৎ স্বপ্ন ভাঙার মত চমকে উঠলো। পায়ের কাছে নড়াচড়া টের পেয়ে চোখ নামাতেই দেখলো, শ্রাবণ! লোকটা হাঁটু গেড়ে বসে আছে তার সামনে, দুই হাতে সাবধানে ধারার পুরোনো জুতোর ফিতে খোলার চেষ্টা করছে। চোখ নামিয়ে নিবিষ্ট মনোযোগে কাজ করছে সে, যেন চারপাশে কিছুই নেই, কেউ কিছু দেখছে না।
ধারা হতবাক। প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারছিল না। মুখ হা হয়ে গেল, কণ্ঠ বের হলো না। কোনোমতে ধরা গলায় বলে উঠলো,
—” এ কি! কী করছেন আপনি?”
শ্রাবণ মাথা না তুলেই হালকা গম্ভীর গলায় উত্তর দিল,
—” জুতো বদলাতে এসেছি। খোলো দেখি জুতোটা!”
কথা শেষ হতেই সে হাতে আনা ব্যাগ থেকে বের করলো এক জোড়া চকচকে নতুন জুতো। নিখুঁতভাবে প্যাকেট থেকে বের করে এক হাতে ধরে রাখলো, আরেক হাতে সাবধানে ধারার পুরোনো জুতোগুলো খোলার চেষ্টা করতে লাগলো।
ধারার গলা শুকিয়ে এলো। বাসস্ট্যান্ডের ভিড়, মানুষের কোলাহল সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত পরিস্থিতি। চোখে পানি চলে আসতে চাইলো, কিন্তু সে মরিয়া হয়ে গিলে ফেললো।
—” আপনি পা থেকে হাত সরান! সরুন প্লিজ! লাগবে না! আমি পারবো এইগুলোতেই…!” ধারা তোতলাতে লাগলো।
এবার শ্রাবণ মাথা তুললো। শান্ত অথচ কঠিন দৃঢ়তায় ভরা চোখ মেলে তাকালো সরাসরি ধারার চোখের দিকে।
— ” চুপ। বেশি কথা বলবে না। জুতো টা খোলো। আর পা এগিয়ে দাও। আমি চাই না তুমি কারো চোখের সামনে নিজের অসহায়ত্ব লুকিয়ে রাখো, অন্তত আমার সামনে। যতদিন আমার সাথে আছো, তোমার জন্য প্রয়োজনীয় কিছু আনা আমার দায়িত্ব। কথা বুঝেছো?”
শ্রাবণের কণ্ঠের দৃঢ়তা ধারার বুক কাঁপিয়ে দিল। সে স্থির হয়ে তাকিয়ে রইলো মাথা নিচু করে নতুন জুতো পায়ে পড়িয়ে দিতে থাকা শ্রাবণের দিকে। অভিভূত দৃষ্টি তার। শ্রাবণ সেভাবেই বলে উঠলো,
—” আমার কাছে এখন বেশি টাকা ছিল না বুঝলে। এখানে তো বুথও নেই যে টাকা উঠাব। আপাতত এটা ইউজ করতে থাকো। শহরে গিয়ে ভালো কিনে দেব!”
ধারার চোখ টলমল করতে থাকলো। যন্ত্রের মত জিজ্ঞেস করল,
—” এটা কত নিয়েছে?”
শ্রাবণ ভ্রু কুঁচকে বলল,
—” বেশি না। আড়াই হাজার! আপাতত এটাই ইউজ করো হুম?”
কথাটা শ্রাবণ এমনভাবে বললো মনে হয় এই টাকার জুতোকে সে দামি বলে দেখেই না। অথচ ধারা বিদ্রুপ করে শব্দহীন হাসলো। এ জীবনে পাঁচশ টাকার জুতোও সে পড়েনি কখনো! শ্রাবণ আস্তে আস্তে কাজ শেষ করলো। পুরোনো জুতোগুলো একপাশে গুছিয়ে রেখে নতুন জুতোর ফিতে বেঁধে দিল সাবধানে। তারপর হাতের তালু দিয়ে হালকা চাপ দিয়ে ঠিকঠাক বসে আছে কিনা দেখে নিলো। তারপর ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে পাশের বেঞ্চে ধারার পাশে বসলো। এক নিঃশ্বাস ছেড়ে সোজা হয়ে বসল সে। চোখ সরাসরি ধারার দিকে না তাকিয়ে, হালকা আড়চোখে তাকিয়ে শান্ত স্বরে প্রশ্ন করলো,
—” জুতো পছন্দ হয়েছে?”
কিছুক্ষণ নীরবতা। ধারা মাথা নিচু করে আছে, হাতদুটো মুঠো হয়ে আছে কোলের উপর। বুক ভরে আছে অচেনা আবেগে। যেন কথা খুঁজে পাচ্ছে না। ধারা মনে মনে ভাবছে শ্রাবণ কিভাবে তার জুতোর সাইজ এত পারফেক্টলি আনল। শ্রাবণ এবার একটু মুচকি হেসে আবার বলল,
—” না পছন্দ হলে কালকেই অন্যটা কিনে দেব। তবে তোমার পায়ে এটা বেশ মানাচ্ছে, জানো?”
শ্রাবণের কণ্ঠে কোনো বাড়াবাড়ি, দম্ভ নেই। শুধু একরাশ স্বাভাবিক দৃঢ়তা আর যত্ন। ধারা আস্তে আস্তে মুখ তুললো। টলমল চোখে তাকিয়ে রইলো শ্রাবণের দিকে। তারপর খুব নরম কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল,
—” পছন্দ হয়েছে… অনেক।”
তারপর দ্রুত চোখ ফিরিয়ে নিলো ধুলোমাখা রাস্তার দিকে, যাতে শ্রাবণ তার চোখে ভেসে ওঠা অশ্রুজলটা দেখতে না পারে। ভেজা চোখ লুকিয়ে নিয়ে আবারো পাশের নবদম্পতির দিকে তাকালো। মেয়েটা হেসে হেসে স্বামীর হাত ধরে কিছু বলছে, আর লোকটা আদরের ভঙ্গিতে তার শাড়ির আঁচল ঠিক করে দিচ্ছে। দুজনের মাঝে সেই স্বচ্ছ, নির্ভার সুখ, যেটা দেখে মুহূর্তখানেক আগে ধারার বুক ভার হয়ে এসেছিল।
কিন্তু এবার অদ্ভুতভাবে মনে হলো, তার নিজের বুকের ভেতরও একরাশ উষ্ণতা জমে উঠছে। পাশের দম্পতির মতোই তো, তার পাশেই একজন বসে আছে, যে বিন্দুমাত্র না ভেবে ঝুঁকে তার ছেঁড়া জুতো খুলে নতুন জুতো পরিয়ে দিল। লোকে কি বলছে, কার চোখে কেমন লাগছে, সেসব নিয়ে তার বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই। শুধু চাইছে, সে যেন কষ্ট না পায়, যেন লজ্জায় মাথা নিচু না করতে হয়।
ধারা নিজের অজান্তেই দীর্ঘশ্বাস ফেলে দিল। এবার আর হিংসে লাগলো না কারো প্রতি। মনে হলো, সুখ আসলে গয়না-শাড়ি, অর্থ-আভিজাত্যের নয়। সুখ আসলে কারো নিঃস্বার্থ যত্নে, নির্ভরতায়, সঙ্গের নিশ্চয়তায়। চোখ সরিয়ে নিঃশব্দে এক ঝলক তাকালো শ্রাবণের দিকে। লোকটা নির্বিকার মুখে রাস্তায় গাড়ির শব্দ শুনছে, কিন্তু তার চোখে তখনো যেন সেই অদৃশ্য প্রতিশ্রুতির ছাপ। ধারা বুকের ভেতর হালকা কাঁপুনি টের পেল, আবারও দ্রুত চোখ নামিয়ে নিলো। কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে স্পষ্ট অনুভব করলো, সেও সুখী। অন্তত এই মুহূর্তে, এই যত্নে, সে অপার এক নিশ্চিন্ত সুখ খুঁজে পেয়েছে।
খানিকক্ষণ বাদে ধারা কিছু একটা মনে পড়তেই বলে উঠলো,
—” জানেন, আমার যে একটা বান্ধবীর কথা বলেছিলাম। জান্নাত নামের। আমাদের পাশের বসা মেয়েটা কে দেখতে পুরোপুরি জান্নাতির মতো!”
শ্রাবণও এক পলক তাকিয়ে বলল,
—” তাই? আচ্ছা ভালো কথা, তোমার ওই বন্ধুর সাথে তো তুমি দেখাই করলে না! বলেছিলে যে জান্নাতি গ্রামে থাকবে!”
ধারা এবার চিন্তিত স্বরে বলল,
—” ওর বিয়ে হয়ে গিয়েছে তো। শ্বশুর বাড়িতে চলে গেছে। গ্রামে আর আসে না!”
একটু থেমে আবারো ধারা খুশি খুশি ভাব নিয়ে বলল,
—” জানেন, ফুফুর কাছে শুনেছি, জান্নাতির স্বামী নাকি অনেক ভালো। জান্নাতিকে অনেক ভালোবাসে। আমার না শুনেই ভালো লেগেছে। ছোট থেকে কম কষ্ট পায়নি মেয়েটা। এবার অন্তত ভালোবাসার অনুভূতি পেয়েছে! সুখে থাকুক!”
অতকিছু শুনলো না শ্রাবণ। কান আটকে রইলো “ভালোবাসা” শব্দটায়। অনেকক্ষণ চোখ সরু করে ধারার খুশি খুশি ভাবটা পরোখ করল শ্রাবণ। ধারা ঠিকই বলেছে, জান্নাতির মতো মেয়েরা যদি এমন ভালোবাসা পায় তবে সেটা সৌভাগ্যের ব্যাপার। কিন্তু হঠাৎই মনে হলো, ধারা নিজে? সে কি কখনো এমন ভালোবাসা পেয়েছে? তার চোখের হাসির আড়ালে যে গভীর ক্লান্তি, যে না বলা কষ্ট, তা কি কেউ কোনোদিন পূর্ণভাবে বুঝেছে? শ্রাবণ কিছু একটা ভাবল। অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই, ধারাকে দেখলে তার মধ্যে এক অদ্ভুত টান তৈরি হয়। সেটা কি তবে ওই শব্দটার সাথেই মিলে যায়, ভালোবাসা? কিন্তু না! মাথা নাড়ল শ্রাবণ। সে নিজেকে বোঝালো, এভাবে ভাবা ঠিক নয়। ভালোবাসার মতো পবিত্র অনুভূতি এত তাড়াতাড়ি সে কিভাবে দাবি করবে? এত দ্রুত কি এর সান্নিধ্য পাওয়া সম্ভব! কিন্তু যতই যুক্তি সাজাক, শব্দটা বারবার কানে বাজছে। ভালোবাসা। ধারা খুশি খুশি মুখে অন্য কারো গল্প করতে গিয়ে অনিচ্ছায় তার বুকের ভেতর জমে থাকা অস্বস্তিটা উসকে দিল।
শ্রাবণ হঠাৎ গলা খাঁকারি দিয়ে সোজা হয়ে বসল। চুপচাপ ধারার দিকে এক ঝলক তাকাল, তারপর দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে নিল। ভয় পাচ্ছে সে, নিজের চোখের ভেতরটা সত্যি ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়। বেশ কিছুক্ষণ ভাবার পর শ্রাবণ মুখ ফঁসকে জিজ্ঞেস করল,
—”তুমিও ভালোবাসা চাও?”
ফট করে বলল ধারা,
—” যেটা কখনো পাইনি সেটা পাওয়ার আশা করিনা!”
অস্থির হলো শ্রাবণ। সেও এমন কিছুই জানতো। কিন্তু মেনে নিতে পারল না। ভ্রু কুঁচকে শুধালো,
—” অপ্রত্যাশিত ভাবে পেয়ে গেলে?”
হাসলো ধারা, গাল দেবে গেলো দু’দিকে। শুকনো ঢোক গিলে বলল,
শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ১৬
—” আমার কপালে কখনো অপ্রত্যাশিত ভাবেও ভালো কিছু আসবেনা! নিজের ভাগ্যের উপর দৃঢ় বিশ্বাস আছে আমার!”
শ্রাবণের কেনো যেন রাগ হলো। কেনো? এভাবে বলতে হবে কেনো? হতেও তো পারে? কখনোই আসবে না, এমনটা মনে করবে কেনো ধারা! শ্রাবণ আরো কিছু বলতে চাইলো,কিন্তু তখনি বাস এসে থামলো। অর্থাৎ এবার বাসে উঠার পালা!
