শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ১৬
অনামিকা তাহসিন রোজা
—” আমি কালই ঢাকায় ফিরে যেতে চাইছি।”
শ্রাবণের কথা শুনে ভিজে কাপড় শুকোতে দিতে থাকা ধারা থ মেরে তাকিয়ে চোখ পিটপিট করল। মাত্রই গোসল করে এসেছে সে। এই সময় শ্রাবণের এমন কথা আশা করেনি। সকালে নাস্তার সময়ও ধারা খেয়াল করেছে যে শ্রাবণ তাকে কেনো যেন ইগনোর করছে, একটু অবহেলা করছে। কিন্তু ধারার মনোভাব উল্টোটা। সে শ্রাবণকে ভয় পাচ্ছে। কারন গত রাতে কার বুকে মাথা রেখে ঘুমিয়েছে তা তো আর ধারা জানেনা। শুধু বকাবকি টাই মনে আছে। আবার সে ঘুম থেকে উঠার পর থেকে চিন্তা করছে যে কেনো ঘাড় টা এত ব্যাথা করছে? বালিশ এত শক্ত ছিল? অথচ জানেনা যে সে শ্রাবণ শেখের বুকে ঘুমিয়েছে। আর এসব চিন্তা ভাবনা নিয়ে দুপুর বারোটার মধ্যেই গোসল সেড়ে এসেছে ধারা। এখনো মাথার চুলে পেঁচানো গামছাটাও খোলেনি।
শ্রাবণ কিছুক্ষন সদ্য গোসল করে আসা স্নিগ্ধ রমণীর অপরূপ সৌন্দর্য্যটা দেখে নিয়ে শুকনো ঢোক গিলল। তারপর নিজের অসস্তি লুকোতে দু আঙুুলে তুড়ি বাজিয়ে বলল,
—” হা করে কী দেখছো? ”
সংবিৎ ফিরে পেলো ধারা। নিতান্তই এক অপবাদ! ধারা হা করে তাকিয়ে ছিল না। বরং হা করে শ্রাবণ নিজেই দেখছিল, ধারা তো শুধু তাকিয়ে ছিল। কিন্তু বিরোধীতা না করে ধারা মিনমিন করে বলল,
—” নাহ কিছু না। আপনি কী যেন বললেন!”
শ্রাবণ এবার অন্য দিকে দৃষ্টি রেখে বলল,
—” কালই ঢাকায় ফিরে যেতে চাইছি। ”
ধারা এক পলক তাকিয়ে তৎক্ষনাৎ মাথা এলিয়ে বলল,
—” ঠিক আছে যান। আমি ব্যাগ গুছিয়ে দেব।”
ভ্রু কুঁচকালো শ্রাবণ,
—” ঠিক আছে যান, মানে?”
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
ধারা আবারো চোখ পিটপিট করে তাকালো। ঠোঁট কাঁমড়ে তাকিয়ে ভদ্রলোকের অভিব্যক্তি বোঝার চেষ্টা করলো। কিন্তু না বুঝার ফলে চুপ রইলো। শ্রাবণ এবার নিজেই বলল,
—’ পাকনামো করার জায়গা পাও না? চুপচাপ নিজের ব্যাগও গুছিয়ে নেবে। তোমাকে রেখে যাব কেনো?”
ধারা এবারও অবাক হলো না। বরং আঙুলে আঁচল দিয়ে খুট পেঁচাতে পেঁচাতে বলল,
—” আরেকদিন থাকি আমি। আবার কবে আসব তা তো ঠিক নেই! আরেকটা দিন থেকে যাই!”
প্রশ্ন ছুঁড়লো শ্রাবণ,
—” শহরে ফিরবে কীভাবে? ”
—” নিজে নিজেই যেতে পারব। এখান থেকে বাসে উঠব, তারপরই সোজা গিয়ে তো শহরে নামিয়ে দেবে!”
ধারার কথা শুনে শ্রাবণ ঠোঁট কামড়ে নিজের অস্বস্তিটা আড়াল করল। আর জগতের সব কঠোরতা এক করে হালকা ভ্রু কুঁচকে বলল,
—”হ্যাঁ, বুঝলাম। তুমি একাই যাবে.. গ্রামে এইভাবে, একা মেয়ে হয়ে, কাকে কাকে জিজ্ঞেস করে বাসে উঠবে? পথে কেউ কিছু বললে কী করবে? কীভাবে যাবে তুমি? আর সবচেয়ে বড় কথা, এ জীবনে একা একা কখনো বাসে উঠেছো? মাতব্বরি করার জায়গা পাও না?”
কণ্ঠটা সে যতটা সম্ভব নিরাসক্ত রাখার চেষ্টা করল, কিন্তু কথার তীরের ভেতরে লুকানো অস্থিরতা গোপন রইল না। ধারা চুপ করে রইল। চোখ নামিয়ে আঁচলটা আঙুলে পেঁচিয়ে যাচ্ছিল। ভাবলো কিছু একটা! কাল রাতে লোকটা তাকে বকেছে। তাই মনে মনে কেনো যেন ধারার একটু কষ্ট হচ্ছে। আজ আবার জোরও করছে। মগের মুল্লুক নাকি?
শ্রাবণ একটু রুক্ষ সুরে আবার বলল,
—”নাটক করার দরকার নেই। কাল সকালে আমি ফিরব, মানে তুমিও ফিরবে। শহরে ফিরতে হলে আমার সাথেই ফিরতে হবে। কথা বুঝেছ?”
ধারা চমকে তাকাল। মনে মনে বিশ্বাসই করতে পারছে না শ্রাবণের এই হুকুমের ভেতরে আসলে কী আছে। চোখ মেলে এক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে ধীরে ধীরে আবার চোখ নামিয়ে নিল সে। ঠোঁট নড়ল হালকা,
—”কেন? মানে আমি তো নিজেই যেতে পারি…!”
শ্রাবণ এবার সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে সামনে এগিয়ে গেল। কণ্ঠে এক অদ্ভুত দৃঢ়তা নিয়ে বলল,
—”আমি না বলেছি একা যাবে না। যাবেনা বলেছি মানে যাবেই না। আমার কথার অবাধ্য হলে জান্নাত পাবেনা মেয়ে। কথাটা মাথায় ঢুকিয়ে নাও। আবারো বলছি তুমি একা কোথাও যাবে না।”
ধারা কিছু বলল না। ” জান্নাত” শব্দটা শুনেই দমে গেলো। এই একটা জিনিসেই থেমে যেতে হয় তাকে।ধারা এবার ফোঁস করে একবার নিঃশ্বাস ফেলল, হয়তো একটু অভিমান, হয়তো খানিকটা অবাক হওয়া। শ্রাবণ এবার কিছু একটা ভেবে বলতে শুরু করল,
—” অফিসে হুট করে কিছু কাজ পড়ে গেছে। পরশু এটেন্ড না করলে সমস্যা হবে। ওখানে থাকাটা জরুরী। নইলে যেতাম না। আর তোমাকে একা রেখে গেলে আমার মহামান্য পিতা আমায় বাড়িতেই ঢুকতে দিবেন না!”
ধারা বাধ্যের ন্যয় মাথা নেড়ে বলল,
—” জ্বি বুঝেছি!”
শ্রাবণ ছোট করে মাথা নাড়লো৷ ধারা এবার হাতে থাকা বাকি ভেজা কাপড়গুলো ধীরে সুস্থে মেলে দিল। শ্রাবণ তখনো দাঁড়িয়েই। ধারা বুঝলো না শ্রাবণ কিছু বলতে চায় কিনা, তাই শ্রাবণকে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে চাইলো। কিন্তু এগোতেই হঠাৎ পেছন থেকে টান খাওয়ায় শাড়ির আঁচলের সাথে সাথে ধারাও থমকে গেল। এক ঝটকায় চমকে উঠে পিছনে তাকাল সে। আঁচলের প্রান্তটা শক্ত করে ধরা শ্রাবণের হাতে। চোখে গাঢ় তীক্ষ্ণতা, তবে মুখে এক অদ্ভুত অস্থিরতা।
ধারা বিস্ময়ে কিছু বলতে চাইছিল, কিন্তু ঠোঁট খুলতেই শব্দ আটকে গেল। শ্রাবণ গলা খাঁকারি দিয়ে খুব নিচু স্বরে বলল,
—”একটা কথা জিজ্ঞেস করি..?”
ধারা শ্রাবণের হাতের মুঠোয় বন্দি আঁচলের কোণটার দিকে অসহায় দৃষ্টি ফেলে বলল,
—” জ্বি করুন!”
শ্রাবণ হয়তো নরম হলো। এ পর্যায়ে দুনিয়ার সমস্ত মায়া একত্র করে চোখে মুখে মিশিয়ে বলল,
—” গত রাতের জন্য কি তুমি এখনও ভয় পাচ্ছ?”
ধারা স্তব্ধ হয়ে রইল। চোখের পলক পড়ল না। বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দটা যেন বাইরে থেকে শোনা যাচ্ছিল। গত রাতের ভাঙা ভাঙা স্মৃতি, চিৎকার, কান্না, ভয়ের ছায়া আর শেষে সেই অচেনা নিরাপদ আলিঙ্গন, সব মিলেমিশে হঠাৎ মাথায় ভিড় করে এলো। ধারার মনে আছে যে শ্রাবণ তাকে জড়িয়ে ধরেছিল। কিন্তু পরে কীভাবে সে ঘুমিয়ে গেছে, সেটা এখন পর্যন্ত মনে করতে পারেনি ধারা। তবে হ্যাঁ শ্রাবণ যে তাকে জড়িয়ে ধরেছিল, বিষয়টা মাথায় আসতেই লজ্জায় মাথা তুলতে পারেনি সে। কণ্ঠ শুকিয়ে গেল ধারার। এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থেকে ধীরে ধীরে মুখ নামিয়ে নিল। চোখের কোণে আতঙ্কের পুরোনো ছাপটা যেন আবার হালকা হয়ে উঠল।
শ্রাবণ এবার আরও এক পা এগিয়ে এলো। আঁচলটা ছাড়ল না, বরং ঢিলেঢালা করে ধরেই বেশ নরম স্বরে বলল,
—”আমি…সত্যি জানতে চাই। আমি কি তোমাকে ভীত করে ফেলেছি? এখনো কি তুমি ভাবছো, আমি তোমাকে আঘাত করব? খুব বেশি ভয় পেয়েছো?”
শ্রাবণের কথার মধ্যে চাপা অনুশোচনা, অপরাধবোধ, আর এক ধরনের ভঙ্গুর কোমলতা স্পষ্ট হয়ে বেরিয়ে এলো। ধারার আঙুল আঁচল চেপে ধরল আরও শক্ত করে। মুখ তুলল না, তবে কণ্ঠ কাঁপিয়ে বলল,
—”আমি… আমি জানি না…!”
ওর এই অসহায় উত্তর শুনে শ্রাবণের বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। আঁচলটা আলগা করে ছেড়ে দিয়ে ধীরে নিঃশ্বাস ফেলল সে। মুখ ঘুরিয়ে যেন নিজের অনুভূতি লুকোতে চাইলো। ধীর গলায় বলল,
—”আমি চাই না তুমি ভয় পাও, ধারা। আমি…চাই না। মোটেই চাই না!”
অসহায় নরম কন্ঠটা শুনে ধারা হঠাৎ বিস্মিত চোখে তাকাল তার দিকে। শ্রাবণ এবার ঠোঁট ভিজিয়ে একটু মাথা নিচু করে বলল,
—” আ’ম সরি ধারা। আমি মোটেই তোমায় বকতে চাইনি, বিশ্বাস করো একটুও চাইনি। রাগের মাথায় যা-তা বলে ফেলেছি। তুমি দয়া করে ওসব কথা ধরো না! মন খারাপ করে থেকো না প্লিজ! কাল অনেক কেঁদেছো। আমি চাইনা কেও আমার জন্য কষ্ট পাক! আমি চাইনা তোমার কান্নারত মুখ দেখতে। বুঝেছো তো হুম?’
ধারা এবার শ্রাবণের দিকে তাকিয়ে মাথা এলিয়ে বোঝালো সে বুৃঝেছে। শ্রাবণ সস্থির শ্বাস ফেলতেই ধারা এবার সরল মনে জিজ্ঞেস করে বসলো,
—” তাহলে.. আপনি আসলে আমায় কীভাবে দেখতে চান?”
প্রশ্নটা শুনেই শ্রাবণ এক মুহুর্তেই জমে গেল। বুকের ভেতরটা হঠাৎ করেই থেমে গেল বলে মনে হলো। চোখ মেলে কিছু বলতে চাইলো, কিন্তু ঠোঁট নড়ল না। প্রশ্নটা এতটা সরাসরি, এতটা নিষ্পাপ, অথচ ভেতরের ভার যেন পাহাড়সম। ধারার চোখে কোনো অভিযোগ নেই, নেই ঝগড়া করার ইচ্ছে, শুধু অদ্ভুত কৌতূহল, আর সামান্য ভয়। মেয়েটা নিজেও জানেনা কি মারাত্মক প্রশ্ন ছুঁড়েছে সে।
শ্রাবণ এবার মাথা ঘুরিয়ে নিঃশ্বাস ফেলল। কণ্ঠে দ্বন্দ্ব আর গুমোট চাপা আবেগ ভেসে উঠল,
—”আমি..আমি জানি না, ধারা। সত্যিই জানি না।”
চোখ নামিয়ে এক মুহূর্ত চুপ থেকে আবার বলল,
—”কখনো মনে হয় তুমি আমার দায়িত্ব… কখনো মনে হয় তুমি…কিছুটা অন্যরকম। কিন্তু আমি স্বীকার করতে চাই না। পারিও না।”
ধারা স্তব্ধ হয়ে রইল। বুঝলো না গভীর কথাটুকু। বুকের ভেতর হঠাৎ হালকা ঝড় বয়ে গেল। অথচ শ্রাবণের মুখে সেই অপরাধবোধ আর টানাটানির ছাপ এত স্পষ্ট যে, ওর মনে হলো, এ মানুষটা যতই অস্বীকার করুক, ভেতরে কোথাও তাকে নিজের ভেবেই বসেছে। কে জানে হুট করে কি হলো মেয়েটার! চুপচাপ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল শ্রাবণের দিকে। চোখে শুধু গভীর একরাশ অনিশ্চয়তা। তারপর খুব নরম স্বরে বলল,
—”আমি ভয় পেতে চাই না আপনার কাছে…আপনি যেভাবেই আমাকে দেখেন না কেন।”
ধারার নির্ভেজাল স্বীকারোক্তি আবারো অসস্তিতে ফেলল শ্রাবণকে। সে ধরা গলায় বলল,
—”আমি… আমি চাই না তুমি ভয় পাও। বিশ্বাস করো, চাই না।”
ধারা এবার চোখ নামিয়ে আঁচলের কোনা মুচড়ে ধরল। ঠোঁট কাঁপলেও সে আর কিছু বলল না। শুধু ভেতরে যেন স্বস্তির একটা রেখা টের পেল, কারণ অন্তত এই প্রথম শ্রাবণের কণ্ঠে ভয় নয়, অদ্ভুত কোমলতা ভেসে আসছে। শ্রাবণ দাঁড়িয়ে রইল, এক অদ্ভুত দ্বন্দ্ব নিয়েই। ওর মনের অস্বীকার আর সত্যের টানাটানি যেন আরও বেড়ে গেল। তবুও ধারা ঠিকই বুঝতে পারল, এই মানুষটা যতই মুখে কঠিন হোক, ভেতরে কোথাও সে আর তার প্রতি নির্লিপ্ত নেই।
সকাল সকাল বাড়িতে এক অপরিচিত ছেলেকে নিজের মেয়ের সাথে দেখে অবাক হলেন মইনুল হোসেন। অচল পা দুটো ঠেলে কোনোমতে উঠে বসলেন বিছানায়। মুনিরা ইশারা করতেই জিহান তৎক্ষনাৎ পা ছুঁয়ে সালাম করতে চাইলে মইনুল এক হাত উঠিয়ে আটকে দেন তাকে। এ পর্যায়ে মেয়ে মুনিরার দিকে তাকিয়ে গুরুগম্ভীর স্বরে বলেন,
—” কে ও?”
মুনিরা ঠোঁট ভিজিয়ে ভয়ে ভয়ে একবার জিহানের দিকে তাকালো। ফট করে বলল,
—” বাবা, তুমি যে বলেছিলে আমার পছন্দের ছেলে টা কে দেখতে চাও। এই যে, ও জিহান।”
এবার মুনিরা থেমে গিয়ে জিহানের দিকে ইশারা করে। চোখ পাঁকিয়ে ভদ্র থাকতে বলে। ইশারা পেয়ে জিহান এবার ভদ্র ভাবে দাঁড়িয়ে দুহাত সামনে গুটিয়ে মাথা নিচু করে রোবটের মত বলতে শুরু করে,
—” আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়াবারকাতুহু। আঙ্কেল আমি জিহান, বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আমার বাবা-মা নেই। এই জন্য এই পৃথিবীতে আপন বলতে আপনার মেয়ে ছাড়া আমার আর কেউ নেই। বলতে ভয় লাগছে তবুও বলতে হয়, আমি আপনার মেয়েকে অনেক ভালোবাসি আংকেল। আপনার মেয়েকে বিয়ে করতে চাই। অনুমতি দিলে আজ কালের মধ্যে বিয়ে করে নিলে মাথার চিন্তা দূর করতে পারতাম আর কি! বাকিটা আপনার উপর নির্ভর করছে। আপনি না দিলে তো আর আমি আপনার মেয়েকে নিজের হাতে তুলে নিতে পারি না। তবে আপনার মেয়েকে ছাড়া আমি বাঁচবো না আঙ্কেল!”
মইনুল হোসেন একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন ছেলেটার দিকে। জিহানের গলা শুকনো হয়ে গেছে, গলা ফেটে ফেটে কাঁপছিল, অথচ সে যন্ত্রের মতো মুখস্থ করা ডায়লগ বলে যাচ্ছিল। হাত দুটো সামনের দিকে গুটিয়ে, চোখ নিচে নামানো, যেন ভুল কিছু করলে আকাশ ভেঙে পড়বে।
কিন্তু মইনুলের কঠিন দৃষ্টি একটুও নড়ল না। মুহূর্তটা যেন অনেক দীর্ঘ হয়ে গেল। নীরবতা এতটা ঘন হয়ে উঠল যে জিহানের নিজের বুকের ধুকপুকানি যেন সবাই শুনতে পাচ্ছে। মুনিরা বাবার মুখের অভিব্যক্তি পড়তে চেষ্টা করল। ভেতরে ভেতরে ভয় আর দুশ্চিন্তায় হাতের আঙুল জোড়াজুড়ি করে ধরে রেখেছে সে। এক সেকেন্ডে মনে হচ্ছিল বাবার কপালের ভাঁজ গভীর হচ্ছে, আরেক সেকেন্ডে মনে হচ্ছিল ঠোঁট সামান্য নড়ল কি না। অবশেষে মইনুল ধীরে ধীরে গলা ভেজালেন, ভারী স্বরে বললেন,
—”হুঁ… এটুকু বয়সে বড্ড শখ হয়েছে তোমার।”
জিহান কেঁপে উঠল। মাথা না তোলে বলল,
—”জি আঙ্কেল.. তবে শখ হয়নি, ভালোবাসা হয়েছে..!”
একটু নীরবতা নেমে এলো। তারপর মইনুলের চোখ এবার ঘুরল মেয়ের দিকে। গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
—”মুনিরা, তুই নিশ্চিত?”
মুনিরার বুক কেঁপে উঠল। সে বাবার মুখের ভাঁজের ভেতর অনুমোদন খুঁজতে চাইল। তারপর কাঁপা গলায় বলল,
—”হ্যাঁ বাবা…আমি নিশ্চিত।”
মইনুল ধীরে ধীরে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। চোখ নামালেন। আবারও জিহানের দিকে তাকালেন। তাঁর চোখে কঠোরতা আগের মতোই, কিন্তু ভেতরে যেন সামান্য নরম হয়ে এসেছে। মইনুল হোসেন অনেকক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে রইলেন জিহানের দিকে। তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি যেন ছেলেটার বুক ভেদ করে যাচ্ছিল। অবশেষে ধীরে ধীরে গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন,
—”বিয়ের কথা মুখে বললেই হয় না বাবা। আমার মেয়ে খেলনা নয়, যাকে ইচ্ছে মত তুলে নিয়ে যাবে। একসাথে জীবন কাটানোর জন্য শুধু ভালোবাসা যথেষ্ট নয়, দায়িত্ববোধ আর সামর্থ্যও লাগে। আর, আমার অবস্থা তো দেখতেই পাচ্ছো তুমি। আমি যেকোনো সময় মারা যেতে পারি। আমি চলে গেলে, এই পৃথিবী থেকে আমার চিহ্ন মুছে গেল আমার মেয়েকে দেখাশোনার জন্য কেউ থাকবে না। তাই আমি চাইছিলাম এমন একজন আসুক, যে কিনা আমার মেয়েকে আমার মত করেই সুখে রাখতে পারবে, আদরে রাখবে, যত্নে রাখবে, ভালোবাসায় রাখবে। তাই আমারও তো কিছু চাওয়া পাওয়া আছে। সেগুলো যদি মিটে যায়, তাহলে নিশ্চয়ই যা হবার তাই হবে। বুঝেছো?”
জিহান শুকনো ঠোঁট চেটে মাথা নেড়ে বলল,
—”জি আঙ্কেল, বুঝেছি।”
মইনুল এবার একটু সামনের দিকে ঝুঁকলেন, চোখ সরাসরি জিহানের মুখে,
—”তাহলে শোনো। আমি তোমাকে এক মাস সময় দিচ্ছি। এই এক মাসে তোমাকে প্রমাণ করতে হবে, তুমি সত্যিই আমার মেয়েকে সুখী রাখতে পারবে কি না। শুধু মুখে নয়, কাজে দেখাতে হবে।”
মুনিরা চোখ খিঁচে বন্ধ করে বিড়বিড় করে শিট বলল। সে মনে মনে এই ভয়টাই পাচ্ছিল। জিহান হতভম্ব হয়ে গেল, মিনমিন করে বলল,
—”মানে…আঙ্কেল…কীভাবে প্রমাণ করব?”
মইনুল ঠোঁট চেপে সামান্য হাসলেন, তবে চোখ কঠোর করে বললেন,
—”সেটা আমি ঠিক করব। আমার দেয়া পরীক্ষা যদি পাস করতে পারো, তাহলে বিয়ের কথা ভাবব। নইলে…!”
তিনি গলা ভারী করে বললেন,
—”নইলে আমার মেয়ের কথা চিন্তাও করবে না।”
জিহানের বুকের ভেতর ধপাস করে কিছু পড়ে গেল। সে ঢোক গিলে ফেলল , আর মুনিরার দিকে তাকালো। মুনিরা চোখ দিয়ে আশ্বাস দিল৷ জিহান এবার দৃঢ় সংকল্প নিয়ে বলল,
—”জি আঙ্কেল! আমি রাজি। আমি প্রমাণ করব।”
মুনিরা ভয়ে ভয়ে বাবার মুখের দিকে তাকাল। তার চোখে যেমন দুশ্চিন্তা, তেমনি খানিকটা স্বস্তিও
,অন্তত বাবা সরাসরি না তো বলেননি।
মইনুল হোসেন এবার কিছুক্ষণ ভেবে বলতে শুরু করলেন,
—”আমার মেয়ে একটু জেদি, আবার সরলও। ওর সাথে সারা জীবন টিকে থাকার জন্য ধৈর্য আর সহনশীলতা দরকার। আবার একটা মেয়ের জীবনে অনেক কিছু চাওয়া পাওয়া থাকে। আমি আমার মেয়েকে কোনো দিক দিয়ে অভাবে রাখিনি। আমার সাধ্যমত সব দিক পূরণ করেছি। কিন্তু তবুও সংসার জীবনে কিছু চাওয়া পাওয়া থাকে, সেগুলো পূরণের জন্য যথেষ্ট উপার্জন প্রয়োজন। শুনেছি তুমি এনজিও তে চাকরি করো। বেশ ভালো। তো সবকিছু হিসেব মিলিয়ে আমি তোমাকে এক মাস সময় দিচ্ছি। এই এক মাস আমি তোমাদের দু’জনকে কাছ থেকে দেখব। আমিও দেখব কীভাবে তুমি ওর জেদ সহ্য করো, কীভাবে ওকে সামলাও, আর কীভাবে ওর চাওয়া পাওয়া পুরণ করো। যদি দেখি তুমি রাগের মাথায় বেয়াদবি করো বা হাল ছেড়ে দাও, আর আমার মেয়ের যদি এক মাসে নিজের সমস্ত চাহিদা পূরণ না হয়, তাহলে বুঝব তুমি যোগ্য নও।”
গতরাতের কথা মাথায় রেখেছে ধারা। তাই কোনোরকম ভনিতা না করে ভদ্র মেয়ের মত রাতে খাওয়া শেষে সুড়সুড় করে এসে বিছানায় এক পাশে শুয়ে পড়েছে। পাশের জায়গাটা গুছিয়ে দিয়েছে শ্রাবণের জন্য। হুট করেই ধারা গতরাতের চিন্তা করতে থাকলো। সে এখনো বুঝতে পারছে না, কখন কিভাবে কোথায় সে ঘুমিয়েছে?এমনকি ঘুম থেকে ওঠার পরও নিজেকে বিছানায় অন্যরকম ভাবে পেয়েছে সে। মনে হচ্ছিল কেউ যেন তাকে যত্ন করে শুইয়ে দিয়ে গিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে বেশি ভাবলো না ধারা। চুপচাপ শুয়ে পড়লো আর চোখ রাখল সিলিং ফ্যানের দিকে।
একটু পর গামছা দিয়ে হাত মুখ মুছতে মুছতে শ্রাবণ এলো। এক পলক ধারার দিকে তাকিয়ে আড়ালে মুচকি হাসলো। ধমক খেয়ে মেয়েটা আজ নিজে থেকেই বিছানায় এসে শুয়েছে! ভালো লাগলো শ্রাবণের! গামছা মেলে দিয়ে শুয়ে পড়লো ধারার পাশে। একই ভাবে চোখ রাখলো সিলিং ফ্যানের দিকে। আজকের চাঁদটাও বেইমানি করেছে। একটু জোছনার ছিটেফোঁটা নেই। তাই পর্দা সরিয়ে দেয়ার পরেও খুব একটা আলো নেই ঘরে। অন্ধকারে ভরে গেছে চারপাশ।
শ্রাবণ মাথা ঘুরিয়ে তাকালো ধারার দিকে। ধারাও এবার আড়চোখে তাকালো। চোখাচোখি হতেই সোজা হয়ে নড়েচড়ে সোজা হয়ে শুয়ে থাকলো দুজন। কে জানে আজ কারো চোখে ঘুম নেই কেনো? অনেকটা সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর ধারা বলল,
—” ঘুম আসছে না!”
—” আমারও! ”
ধারা অবাক হলো। শ্রাবনেরও ঘুম আসছে না? কিছুক্ষণ চিন্তিত হলো ধারা। অতিথি মানুষ! তার সব বিষয়ে খেয়াল রাখা জরুরি! এরপর ফট করে জিজ্ঞেস করে বসল,
—” ঘুরতে যাবেন?”
শ্রাবণ ভ্রু উঁচিয়ে তাকালো। ইশ! কতটা উদগ্রীব হয়ে তাকিয়ে আছে মেয়েটা! সেই সরল জ্বলজ্বল করা মুখটার দিকে মিষ্টি হেসে বলল,
—” এই মাঝরাতে কি ভূতের বাড়িতে ঘুরতে যাবে তুমি?”
ধারা ঠোঁট উল্টিয়ে মাথা নেড়ে বলল,
—” উহু, ভালো একটা জায়গা আছে। যাবেন?”
শ্রাবণ খানিকটা সময় অপলক দৃষ্টি ফেলে তাকিয়ে রইলো। তারপর হাসি চওড়া করে বলল,
—” যাব!”
—” খবর শুনেছো? তোমার হীরের টুকরো ছেলে কাল নাকি বাড়িতে ফিরবে!”
সামিউল শেখের কথা শুনে মুখভরে হাসলেন সালমা বেগম। খুশিতে গদগদ হয়ে বললেন,
—” সে কি? তাই? আয়হায়! তবে তো আজ ভোরে উঠে রান্নাবান্না শুরু করে দিতে হবে? কখন বলল তোমায়?”
ছেলের প্রতি অতিরিক্ত তোষামোদ করাটা সালমা বেগমের গত সাতাশ বছরের অভ্যাস। পারলে ছেলের জন্য জানটাও দিয়ে দেন। ছেলে যা-ই করুক না কেনো, সেটাই ঠিক, সেটাই উচিত৷ আর এসব দেখে মাঝেমাঝে মুর্ছা যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেন বেচারা পরিবারের চাপে পিষ্ট হওয়া সামিউল শেখ। তিনি সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে বললেন,
—” একটু আগে কল করেছিল শ্রাবণ। বলল, চলে আসবে।”
সালমা বেগম মাথা নেড়ে বললেন,
—” ধারার কথা কিছু বলেছে? কোনো পরিবর্তন হয়েছে কি?”
সামিউল শেখ কাঁধ উঁচিয়ে বললেন,
—” সামনাসামনি না দেখলে কোনো পরিবর্তন বোঝা সম্ভব না। কি জানি হয়েছে কিনা? তবে ধারার বিষয়ে কিছু বলল না।”
সালমা বেগম এবার চিন্তিত হলেন। ঠোঁট কাঁমড়ে ভেবে বললেন,
—” তাহলে কি এমন ঝুঁকি নেয়াটা উচিত হবে? তন্নি কে সত্যিই ডাকব?”
সামিউল শেখ এবার কিছুক্ষণ ভাবলেন। হাতের কফিটা এক চুমুকে শেষ করে বললেন,
—” যা হবার হোক তো। তন্নিকে কাল সকালেই ডেকে নিও। আমিও দেখতে চাই তোমার ছেলে কেমন পারিবারিক শিক্ষা পেয়েছে, বিদেশে পড়াশোনা করালাম, কী অর্জন করল সেটাই দেখব! ”
সালমা বেগম নিজেও চিন্তিত হলেন খানিকটা। তবে কিছুক্ষণ পরেই মিষ্টি হেসে বললেন,
—” আমার ছেলের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস আছে। তুমি দেখে নিও। আমি যা যা আঁচ করেছি, সেসবই হবে। আর তাছাড়া, ও আমার ছেলে! ”
—” সেটাই তো ভয়! ”
সামিউল শেখের কথায় মুখ কুঁচকে তাকালেন সালমা বেগম। মুখ ভেঙচিয়ে বিছানা গোছাতে চলে গেলেন। মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলেন এ সংসারে তিনি আর থাকবেন না। পরে ছেলে বউমার কথা মনে পড়তেই সিদ্ধান্ত বদলালেন!
শ্রাবণ সত্যিই ভেবেছিল এই রাতে ধারা একটা ভূতের বাড়িতে নিয়ে যাবে। অথচ তাকে অবাক করে দিয়ে ধারা শ্রাবণকে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে একটা ঝুলন্ত ব্রিজের দিকে গেলো। গ্রামটা এখনো আধুনিকতার ছোঁয়া পায়নি। তাই ব্রিজটাও ইট সিমেন্ট দিয়ে তৈরী করা হয়নি। ঝুলন্ত ব্রিজটার দিকে এগোতেই শ্রাবণের বিস্ময় বেড়ে গেলো। নীরব রাত্রিরে চারপাশে এক অদ্ভুত শান্তি অনুভব করা যাচ্ছে।
ধারা এগিয়ে গেলেই শ্রাবণ তার পিছু পিছু গিয়ে আবিষ্কার করল ঝুলন্ত ব্রিজটা। গ্রামের একপ্রান্তে, যেখানে দু’পাশে ঘন ঝোপঝাড়ের ভেতর দিয়ে চিকচিক করে বয়ে যাচ্ছে সরু নদী। আর সেই নদীর ওপরে বাঁশ আর দড়ি দিয়ে বানানো একটা লম্বা ঝুলন্ত ব্রিজ। দড়ির ফাঁক দিয়ে হালকা দুলছে সেতুটি। ব্রিজের দুই পাশে বাঁশের খুঁটিতে টিমটিম করে জ্বলছে কেরোসিনের ছোট লণ্ঠন। তার আলোয় আর অল্প চাঁদের আবছায়ায় চারপাশটা এক অন্যরকম রহস্যময় সৌন্দর্যে ভরে উঠেছে। নদীর কালো পানির উপর ছড়িয়ে আছে আকাশের তারাগুলো, মাঝেমধ্যে মাছ লাফ দিয়ে উঠলেই ভেঙে যাচ্ছে সেই প্রতিবিম্ব। আর নদীর দু’ধারে, অসংখ্য জোনাকি উড়ে বেড়াচ্ছে। মনে হচ্ছে, যেন ছোট ছোট প্রদীপ নিয়ে ওরা আকাশ থেকে নেমে এসেছে শুধু এই রাতটাকে সাজাতে।
ধারা নির্ভার ভঙ্গিতে মাটির উঁচু জায়গা বেয়ে উঠে দাঁড়াল ব্রিজে। হালকা দুলুনি পেয়েই শ্রাবণের মনে হলো এ যেন ভূতের বাড়ির চেয়েও ভয়ঙ্কর কোনো জায়গা। মেয়েটা আসলেই তাকে ভূতের বাড়িতে এনেছে? ব্রিজটা এমন নড়াচড়া করছে কেনো? খুলে যাবে না তো? কিন্তু পরক্ষণেই চারপাশের সৌন্দর্যে চোখ আটকে গেল শ্রাবণের। সে অবাক হয়ে তাকিয়ে বলল,
—” বাহ! এত সুন্দর জায়গা! তুমি আমায় আগে কেনো এই জায়গা দেখাওনি? আমি তো কখনো কল্পনাও করতে পারিনি…!”
ধারা এবার মুচকি হেসে বলল,
—” সত্যি অনেক সুন্দর না? শহরে এরকম দেখেছেন কখনো?”
শ্রাবণ ধারার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট উল্টিয়ে দুদিকে মাথা নেড়ে বলল,
—” উহু, দেখিনি!”
একটু পর আবারো শ্রাবণ বলল,
—” সত্যি! গ্রামের অনেক কিছুই অনেক সুন্দর! অন্যরকম সুন্দর! ”
উদগ্রীব হলো ধারা। জানতে চাইলো,
—” আর কী কী সুন্দর? ”
শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ১৫
শ্রাবণ উত্তর দিল না। শুধু জ্বলজ্বল করা চোখের তাক লাগানো দৃষ্টি রাখলো ধারার মুখশ্রীতে। একটু সময় নিয়ে আবারো সামনে তাকাল। ধারা তো উত্তর পেলো না। তাই ভেবে নিল শ্রাবণ আবারো তাকে অবহেলা করেছে, ইংরেজি ভাষায় ইগনোর! অথচ বোকা মেয়ে এবারও বুঝলো না শ্রাবণ গ্রামের সবকিছু সুন্দর বলতে গ্রামের মেয়েটিকেও বুঝিয়েছে! তা তো আর মুখে বলা যায় না!
