Home শ্রাবণ ধারার রূপকথা শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ১৫

শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ১৫

শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ১৫
অনামিকা তাহসিন রোজা

লাউয়ের তরকারি সত্যিই ভালো লেগেছে কিনা তা শ্রাবণ জানেনা, তবে ধারা রান্না করেছে শুনে সে তিন চামচ বেশি তরকারি নিয়েছে। আজ মনে হচ্ছিল বিশেষ কিছু খাচ্ছে সে। ললিতা খাতুন অভিজ্ঞ মানুষ, পলকেই সব বুঝে ফেলে মুচকি হেসেছিলেন। বোকা ধারা সেটাও বুঝলো না। মনে মনে ভাবলো হয়তো শ্রাবণের বেশ খিদে পেয়েছিল। তাই মনে মনে নিজেকে দোষ দিল। ইশ! মানুষটার আতিথিয়েতা কি ঠিকমত হচ্ছে না?

গত কয়েকটা রাত ঘরে এসে শ্রাবণ দেখেছে খাটে শ্রাবণের জন্য বিছানা ঠিক করে দিয়ে ধারা মেঝেতে বিছানা গোছায়। তবে আজ সেটা না দেখলেও ঘরে ঢুকে ঠিকই অবাক হলো। আজ ধারা থম মেরে হাতে বালিশ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে অসহায়ের ন্যায়। দুহাতে বালিশ শক্ত করে জড়িয়ে পিটপিট করে বিছানার দিকে তাকিয়ে আছে। কিছুক্ষণ দুহাত বুকে গুঁজে বিষয়টা পর্যবেক্ষণ করে বাঁকা হাসলো শ্রাবণ। কারন বিকালে সে মাদুর কাঁথা সব লুকিয়ে রেখেছে। নইলে দেখা যেত আজও ধারা মেঝেতে বিছানা গোছাচ্ছে। মাদুর কাঁথা খুঁজে না পেয়েই হয়তো মেয়েটা বিষাদ মুখে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু কিছু করার নেই শ্রাবণের। সে অনেক কষ্টে মাদুর কাঁথা সব লুকিয়েছে।
গলা খাঁকারি দিল শ্রাবণ। চমকে তাকালো ধারা। শ্রাবণ এবার ঘরের ভেতর ঢুকে খাটের উপর বসতে বসতে বলল,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

—” খাম্বার মত দাঁড়ানোর কারণটা কী?”
ধারা মিনমিন করে বলল,
—” মাদুর আর কাঁথা খুঁজে পাচ্ছিনা।”
শ্রাবণ ছোট করে বলল,
—” ওও। ”
বলেই নিজের পায়ের দিকে কাঁথা ঠিক করে শোয়ার প্রস্তুতি নিতে থাকলো। ধারা এবার চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে বলল,
—” আপনি কি মাদুর আর কাঁথা কোথাও দেখেছেন?”
শ্রাবণ ভ্রু কুঁচকে বলল,
—” তুমি গুছিয়ে রাখো নি? ”
তড়িঘড়ি করে ধারা বলল,
—” রেখেছিলাম তো। কে জানে কোথায় গেলো! খুঁজেই পাচ্ছিনা।”

খুব বিষাদ মুখে কথাটা বলেই ঠোঁট কাঁমড়ালো ধারা। ভীষণ কান্না পাচ্ছে তার। এই ছোট বিষয়টা কান্না করার মত না হলেও তার কান্না পাচ্ছে। কারন এভাবে জিনিসপত্র হারিয়ে ফেলাটা মোটেই ভালো নয়। আর ললিতা খাতুনের জিনিস এগুলো।
শ্রাবণ এমন ভান ধরে আছে যেন সে কিছুই জানেনা। একবার ধারার দিকে তাকালো শ্রাবণ। মেয়েটা এখনো চঞ্চল চোখজোড়া এপাশ ওপাশ করে মাদুর খুঁজছে। কিন্তু শ্রাবণ নিশ্চিত সারারাত খুঁজলেও পাবে না। ধারার বিষাদ মুখটা নজরে আসলেও চোখের দিকটায় নজর দিতে পারেনি শ্রাবণ। সে ভাবল ধারা নিজে থেকেই বিছানায় শুয়ে পড়বে। তাই পাশে ফাঁকা রেখে শ্রাবণ অন্যপাশ ফিরে শুয়ে পড়ল। ধারা কে উদ্দেশ্য করে বলল,

—” খুঁজে না পেলে তো কিছু করার নেই। শুয়ে পড়ো!”
ধারা কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো ওপাশ ফিরে শুয়ে পড়া শ্রাবণের পিঠের দিকে। “শুয়ে পড়ো” — বলতে মেয়েটা ভাবলো শ্রাবণ তাকে মাদুর না বিছিয়েই শুয়ে পড়তে বলেছে। এটা অবশ্য মোটেই অস্বাভাবিক নয় তার জন্য। তাই একটু চিন্তিত হলেও শ্রাবণের ঘুমের জন্য ধারা এগিয়ে গিয়ে আলো নিভিয়ে দিল আর পর্দা সরালো প্রতিদিনের মত। এরপর ফিরে এসে আবারো একই জায়গায় দাঁড়িয়ে পড়ল।
এদিকে বেশ অনেকক্ষণ পেরোনোর পরও পাশে কারো অস্তিত্ব অনুভব করল না শ্রাবণ। বারবার চোখ বন্ধ করে বোঝার চেষ্টা করল পাশে কেও এসে শুয়েছে কিনা। তাকিয়ে তো দেখতে পারবেনা। কিন্তু তবুও অনুভব করল না কিছুই। গত রাতের মত চুলের ঘ্রাণটাও পাচ্ছেনা। তাই একটু আড়চোখে ধীরে ধীরে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো। কিন্তু পাশের জায়গা খালি দেখে ভ্রু কুঁচকে তাকালো। আশ্চর্য! শোয়নি ধারা? তাহলে কোথায় গেলো! এবারে চট করে উঠে বসলো শ্রাবণ। আশেপাশে তাকিয়ে মেঝেতে চোখ পড়তেই চক্ষু চরকগাছ হলো। ধারা ওভাবেই খালি মেঝেতে শুয়ে পড়েছে! অন্যপাশ ফিরে গুটিয়ে শুয়ে আছে। এক মুহুর্তের জন্য মাথা কাজ করল না শ্রাবণের। ও ভাবতেও পারেনি ধারা খালি মেঝেতে শুয়ে পড়বে!

বিকালের পরেই খানিক বৃষ্টি হয়েছিল। মেঝে নিশ্চয়ই ভিজে ঠান্ডা হয়ে গিয়েছে। মেয়েটা সেই ঠান্ডা মেঝেতে ওভাবে শুয়ে পড়ল। এ পর্যায়ে ধারার কাজে বিরক্ত হলো শ্রাবণ। হতবাক হয়ে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল ধারার দিকে। ম্লান আলোয় মেয়েটার গুটিয়ে শোওয়া ছোট্ট শরীরটা যেন আরো ভঙ্গুর লাগছিল। ঠান্ডা মেঝেতে নিঃশব্দে পড়ে আছে, মাথার কাছে কেমন এলোমেলো চুল ছড়িয়ে আছে। তার গলা শুকিয়ে এলো।
—”ধারা!”
কণ্ঠে বিরক্তি নেই, বরং একধরনের তীক্ষ্ণ বিস্ময় মিশে আছে। ধারা জেগেই ছিল, শ্রাবণের ডাক শুনে একটু নড়েচড়ে তাকাতে গেল, কিন্তু শ্রাবণ ততক্ষণে তড়িঘড়ি খাট থেকে নেমে এসেছে। ওভাবে শ্রাবণকে আসতে দেখে উঠে বসলো ধারা, মাথা উঁচিয়ে তাকালো সামনে দাঁড়িয় থাকা শ্রাবণের দিকে। কিছু না বুঝে মিনমিন করে বলল,

—” কী হয়েছে?”
শ্রাবণ কিছুক্ষণ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়েই রইলো। এরপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঝট করে নিচু হয়ে দুহাতে মেয়েটাকে কোলে তুলে নিল। তাল সামলাতে না পেরে এবারও গলা ঝাপটে ধরল ধারা। রাত বেরাতে এমন চমক খেয়ে চোখ বড় করে তাকালে শ্রাবণ বিছানায় ধারা কে রীতিমতো ফেলে দিয়ে ধমক দিয়ে বলতে শুরু করল,
—” এই মেয়ে, মাথা খারাপ নাকি তোমার? নাটক করার জায়গা পাও না? মাদুর কাঁথা নেই দেখে খালি মেঝেতে শুয়ে পড়বে? মাথায় বুদ্ধি সুদ্ধি বলতে কি কিছুই নেই? ঠান্ডা লেগে যেতো না? তোমাকে গত রাতে বলিনি আমার সাথে ঘুমোতে? দুই লাইন বেশি বোঝো কেনো?”
ধমক দিলেও শ্রাবণের গলায় কেমন যেন অস্থিরতার মিশেল। ধারা হতভম্ব হয়ে গেল। হাত-পা কেমন জড়িয়ে এলো, মনে হচ্ছিল বুকের ভেতরটা ধড়ফড় করছে। কাঁপা কন্ঠে বলতে চাইলো,

—”আমি…আমি ভেবেছিলাম…!”
শ্রাবণ ঠোঁট চেপে রাগান্বিত গলাতেই বলল,
—” কী ভেবেছিলে? কী ভেবেছিলে তুমি হ্যাঁ? জাস্ট শাট আপ! ইমম্যাচিইউর্ড মেয়ে একটা! এক কথা বুঝতে পারো না তুমি? বারবার কেনো বলতে হবে? কাল কী বলেছি শোনো নি?”
ধারা শ্রাবণের এমন রূপ দেখে খানিকটা ভয়ই পেলো। তাই গলা থেকে কথা বের হতেই চাইলো না। ঠোঁট কেঁপে উঠলো তার। প্রশ্নের জবাব না পেয়ে আরো বেশি খেপে উঠলো শ্রাবণ,
—” স্পিক আপ! ড্যাম ইট! গত রাতের কথা শোনো নি তুমি? তোমায় বিছানায় ঘুমোতে বলিনি? বলো, বলিনি?”
ধমকে কেঁপে উঠলো ধারা। বিছানার চাদর চেপে ধরে ঠোঁট কাঁপিয়ে মিনমিন করে বলল,

—” জ্বি বলেছেন!”
আরো বেশি গর্জে উঠলো শ্রাবণ,
—” তাহলে শোনো নি কেনো?”
শ্রাবণের একেকটা ধমকে কেঁপে উঠছে ধারা। শ্রাবণের কণ্ঠ একেকবার উঠছে, আর প্রতিটা শব্দ যেন ধারার বুকের ভেতর সরাসরি ধাক্কা মারছে। চোখের পাতা কাঁপছে, আঙুলগুলো চাদরের কিনারা এমনভাবে চেপে ধরেছে যেন ছেড়ে দিলে পড়ে যাবে কোথাও। শ্রাবণ আবার গর্জে উঠল,
—”বলছি, শোনোনি কেনো?”
ধারা এতক্ষণ ঠোঁট কাঁপিয়ে জবাব দেওয়ার চেষ্টা করছিল, কিন্তু এবার আর ধরে রাখতে পারল না। বুক ভেঙে যেন কিছু বেরিয়ে এলো,

—”আমি… আমি! ”
কথাটা শেষ করার আগেই গলার ভেতর আটকে গেল। ভেতরটা যেন শক্ত হয়ে গেছে, শ্বাস ভারী হয়ে উঠছে। হঠাৎ করেই বড় বড় চোখে শ্রাবণের দিকে তাকিয়ে শিশুর মতো ফুঁপিয়ে উঠল ধারা। প্রথমে একবার, তারপর হুহু করে কান্না শুরু হয়ে গেল। গলা বুজে গেছে, শব্দও স্পষ্ট বেরোচ্ছে না, শুধু কাঁপতে কাঁপতে ভাঙা ভাঙা স্বরে বলল,
—”আমি… দুঃখিত… আমি ভুল করেছি…”

শ্রাবণের গলা যতবার উঁচু হচ্ছে, ততবার ধারার মাথার ভেতর ফিরে আসছে সেই পুরোনো দৃশ্যগুলো, চাচার অপমানজনক কথা, চাচির হাতের চড়, টানা ধমক, কান মুলে টেনে নেওয়া, গায়ে গরম পানি ঢেলে দেওয়া। সেই দিনগুলোতে একটুখানি ভুল করলেই মনে হতো এখনই মার পড়বে, কোথাও পালাবার জায়গা নেই।
শ্রাবণের এমন আচরণের হুট করে যেন ধারা ট্রমার মধ্যে চলে গেল। তার এখন কেনো যেন মনে হচ্ছে, শ্রাবণ তাকে মারবে, চাচা চাচির মত গায়ে হাত তুলবে। ভয় পেল ধারা! আতঙ্কে হুঁশ জ্ঞান হারিয়ে ফেলতে শুরু করল। শ্রাবণের চোখে রাগের ঝলক দেখে হঠাৎ করেই মনে হলো, সে-ও হয়তো মারতে পারে! যেন ঠিক এই মুহূর্তেই হাত উঠবে তার দিকে।

হৃদপিণ্ড ধকধক করছে, আঙুলের ফাঁকে চাদর আরও শক্ত করে চেপে ধরল ধারা, ঠোঁট কেঁপে উঠে ভাঙা ভাঙা স্বরে বলেই ফেলল,
—”প্লিজ… প্লিজ, আমাকে মারবেন না…আমি ভুল করেছি…আমি আর করব না… আপনার সব কথা শুনবো, প্লিজ…মারবেন না!”
শেষ কথাগুলো প্রায় ফুঁপিয়ে বেরোল। শ্রাবণ নিজেই রেগে গিয়ে হুঁশ হারিয়ে ফেলেছিল। তবে হঠাৎ করে মারার কথাটা শুনে সে নিজেই থমকে গেল। প্রথমে যেন কথাগুলো বুঝতেই পারল না। তারপর ঠিকমতো উপলব্ধি হতেই শরীরটায় একধরনের শীতল ধাক্কা লাগল। মেয়েটা ভাবছে আমি ওকে মারব? স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল শ্রাবণ। তার গলার রাগ মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল, চোখে বিস্ময় আর কিছুটা অপরাধবোধ এসে ভিড় করল। সে বুঝতে পারছিল, এটা স্রেফ ভয় না, বরং গভীর, পুরনো কোনো ক্ষত থেকে বের হওয়া আতঙ্ক। একটা ধমকেই মেয়েটা অতীতে ফিরে গেছে, যেখানে হয়তো কেউ তাকে সত্যিই আঘাত করত।

শ্রাবণের মুঠো করা হাত ধীরে ধীরে শিথিল হয়ে এলো, কিন্তু গলা দিয়ে কোনো কথা বেরোলো না। ধারার ছোট্ট কাঁধের কাঁপুনি আর কান্নার শব্দ ঘরের ভেতর পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়তেই শ্রাবণ থমকে গেল। ধমকের তেজ যেন মুহূর্তেই কোথাও মিলিয়ে গেল, কিন্তু ঠোঁটের কোণ কেঁপে উঠলেও সে এখনই কিছু বলল না। মনে মনে নিজেকে ধিক্কার দিল শ্রাবণ। বিড়বিড় করে বলল— শিট! অনিমেষ শুধু তাকিয়ে রইল ধারার ভেজা চোখের দিকে, নিজেরই আচরণে কেমন অস্বস্তি লাগছে এখন। বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা টান তৈরি হচ্ছে, যেন কেউ ভিতরে ভিতরে শক্ত করে মুঠি বেঁধে আছে। সে ধীরে ধীরে গলা নামিয়ে আনল, চেষ্টা করল রাগের আঁচটা পুরোপুরি ঢেকে ফেলতে।
শ্রাবণ বড় করে শ্বাস নিয়ে নিজেকে ধাতস্থ করল। বুঝতে পারল, একটু বেশিই হয়ে গিয়েছে। অনেক উগ্র হয়েছে সে। তাই দুহাত বাড়িয়ে বলার চেষ্টা করল,

—” শোনো, শান্ত হও। দেখো.. ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আমি.. আমি শুধু রেগে গিয়ে চিৎকার করেছি, এইটুকুই।”
গলার স্বর স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করলেও, শব্দের ফাঁকে ফাঁকে হালকা কম্পন লুকিয়ে রাখা যাচ্ছিল না।
সে এক মুহূর্তের জন্য ধারার হাতের ওপর হাত রাখতে চাইলো। কিন্তু মেয়েটা চমকে হাত সরিয়ে নিল। আরও একবার সেই পুরনো অভ্যাস, আঘাত থেকে বাঁচার চেষ্টা। শ্রাবণ থেমে গেল, দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
ধারা বিছানায় বসেই একটু একটু করে পেছাতে চাইলো, আর কান্নারত মুখ নিয়ে বলতে থাকলো,
—” আমি জানি আপনি আমাকে মারবেন। আমি জানি..মারবেন। অবাধ্য হওয়ার জন্য আপনি এখন আমাকে খুব মারবেন। মারবেন না প্লিজ। আমাকে মারবেন না। আর এমন হবে না… সত্যি আর হবে না!”
আর নিতে পারল না শ্রাবণ। অপরাধবোধে এমনিতেই ভেতরে ভেতরে তার অবস্থা খারাপ। ধারার এমন অসহায়ত্ব দেখে নিজেকে খু”নি মনে হলো তার। কোনো উপায় না পেয়ে দ্রুত কাছে গিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল ধারাকে। বুকের মাঝে জাপ্টে আগলে নিল কান্নারত মুখটাকে। বিছানায় বসাতে খুব সহজেই শ্রাবণের বুকের মাঝে জায়গা করে নিল ধারা। কিন্তু কাঁপতে থাকলো আর বিড়বিড় করে বলতেই থাকলো,

—” মারবেন না, মারবেন না আমাকে। আমি আপনার সব কথা শুনবো। মারবনে না আমায় প্লিজ!”
কথাগুলো শুনে মেয়েটাকে আরো বেশি শক্ত করে বুকের মাঝে চেপে ধরল শ্রাবণ। চোখ খিঁচে বন্ধ করল। আবারো এমন কথা শুনে হৃদয়ে টান পড়ছে তার। না চাইতেও মেয়েটাকে কষ্ট দিল সে। ধারার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে শ্রাবণ অসহায় কন্ঠে বলল,

—” সরি। আ’ম সরি। শান্ত হও। শান্ত হও সোনা। মারব না তো তোমায়। খুব বেশি ভয় পেয়েছো? আমি তোমায় বকতে চাইনি বিশ্বাস করো! মোটেই বকতে চাইনি! কষ্ট দিতে চাইনি তোমায়! সরি! সরি ধারা, সরি! আর হবে না! এই মেয়ে, শান্ত হও না প্লিজ! আমি তোমাকে মারব কেনো, হ্যাঁ? আমি কি কখনো হাত তুলেছি তোমার ওপর?”
কথাটা নরম স্বরে বললেও ভিতরের অপরাধবোধ যেন চেপে বসে আছে, মুখের কোণে তা স্পষ্ট। ধারা তখনও কাঁপছে, চোখে ভয়ের ছাপ যেন গাঢ় হয়ে বসে গেছে। ফুঁপানো কান্নাটা কমে এলো শ্রাবণের বুকের উষ্ণতায়।
শ্রাবণ আরেকটু জড়িয়ে নিল ওকে। ধারার হাত দুটো নিজ দায়িত্বে পিঠের কাছে দিল, নীরবে বুঝিয়ে দিল যেন ধারাও আঁকড়ে ধরতে পারে। হাতের কাছে শ্রাবণের পরনে থাকা টি শার্ট টা পেয়ে সত্যি সত্যিই আঁকড়ে ধরল ধারা। শক্তপোক্ত বুকটাতে মুখ গুঁজে দিল। এবারে শ্রাবণ ধারার চুলে হাত বুলিয়ে খুব সাবধানে আড়ালে লুকিয়ে একটা চুমু খেলো চুলের উপর, কেও বুঝতেও পারেনি। বারবার চুল গুছিয়ে দিয়ে বুলিয়ে দিতে দিতে সরি বলল। হাজার বার হয়তো সরি বলা হয়ে গেছে। তবুও শ্রাবণ বিড়বিড় করে বারবার সরি বলতেই থাকলো যতক্ষণ না পর্যন্ত ধারা শান্ত হয়।

দরজার বাইরে থেকে এই দৃশ্য দেখে চোখের পানি মুছলেন ললিতা খাতুন। তিনি মোটেই এভাবে একটা দম্পত্তির ব্যক্তিগত সময়ে আসতে চাননি। কিন্তু রাতের বেলায় এভাবে শ্রাবণের ধমক আর চিৎকার শুনে তিনি দৌঁড়ে এসেছিলেন। যদিও ঘরে ঢুকতে পারেননি। কিন্তু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এতক্ষণে পুরো সময়ই ঠিকই দেখেছিলেন এবং এখন ধারাকে বুকের মাঝে জাপ্টে নিয়ে থাকা শ্রাবণকে দেখে তিনি অভিভূত হলেন। তিনি সত্যিই বুঝতে পারলেন যে, সর্বদা আকাশে মেঘ থাকে না। সর্বদাই মেঘে ঢাকা আকাশ আঁধার থাকেনা। একটা সময় মেঘ সরে গিয়ে সূর্যের আলো দেখা যায়। চারিদিক আলোতে ভরে যায়। সুখের আলোতে প্রজ্জ্বলিত হয় জীবন!

রাতবেরাতে স্ত্রীর পাঙখা মার্কা প্লান শুনে মুখ কুঁচকে তাকালেন সামিউল শেখ। সবুজ একখানা শাড়ি পড়ে সালমা বেগম বিছানার উপর পা তুলে বসে তাকিয়ে রয়েছেন নিজের একমাত্র স্বামীর দিকে। অথচ সামিউল শেখ চশমা ঠেলে সামনে শাড়ি পরিহিত বউকে দেখে মুগ্ধ না হয়ে সালমা বেগমের উদ্ভট একটা প্ল্যান শুনে মুখ কুঁচকেই তাকিয়ে রয়েছেন তার দিকে। মনে হচ্ছে এর থেকে জঘন্য উদ্ভট প্ল্যান এই জীবনে শোনেননি তিনি। এমন অকাজের পরিকল্পনা কখনোই কাজ করতে পারে না। তাই দীর্ঘশ্বাস ফেলে সামিউল শেখ বললেন,
—” সালমা শোনো, তোমার হীরের টুকরোর মত ছেলের বদৌলতে তোমারও মাথাটা পুরোপুরি গেছে। শুয়ে পড়ো তো! ঘুমাও!”
আরেকটু উচ্ছাসিত হলেন সালমা বেগম। এগিয়ে এসে পাশে বসলেন সামিউল শেখের। খুব আহ্লাদী কন্ঠে বললেন,

—” আগে শোনোই না প্লানটা!”
সামিউল শেখ ব্যর্থ হলেন বরাবরের মত। হাতে থাকা একাডেমিক বইটা রেখে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে মেকি হেসে বলেন,
—” হুম, বলো তাহলে। শুনি!”
সালমা বেগম একগাল রহস্যময় হাসি দিয়ে সামিউল শেখের দিকে তাকালেন। শাড়ির আঁচল ঠিক করে আরও একটু কাছে সরে এসে অভিজ্ঞ ভঙ্গিতে বললেন,
—”শোনো, ব্যাপারটা এমন.. যেহেতু আমাদের শ্রাবণ বউমাকে মানে ধারাকে, বউ হিসেবে মন থেকে মানছে না, তাই ওর মন বোঝার জন্য আমাদের একটু চালাক হতে হবে। কখনো কখনো কাঁটা দিয়ে কাঁটা তুলতে হয়!”
সামিউল শেখ ভ্রু কুঁচকে তাকালেন,

—” চালাকি? কিসের চালাকি আবার? কাঁটা মানে?”
সালমা বেগম হাত নেড়ে বললেন,
—”আহহা, শোনো, চালাকি মানে হলো অস্ত্র! আর এখানে একমাত্র অস্ত্র, জেলাসি! বুঝলে না? হিংসা..এই জিনিসের জোরটা অনেক। ওটা মেয়েদেরও নড়াচড়া করিয়ে দেয়, ছেলেদেরও মাথা খারাপ করে দেয়। আর…কাঁটা হিসেবে ব্যবহার করতে হবে তোমার ওই বোনের মেয়ে তন্নিকে!”
সামিউল শেখ ধীরে ধীরে চশমা নামিয়ে তাকালেন, মুখে অবিশ্বাসের ছাপ,
—”মানে? বলো কী?”
সালমা বেগম এবার চওড়া হাসি দিয়ে বললেন,

—”মানে, তন্নি যেহেতু শ্রাবণের সাথে কথা বলতে চাইছে। আমাদের বাড়িতে আসতে চাইছে। তাহলে ওকে আসতে দাও। ওকে বাড়িতে আনতে হবে। এমনভাবে আনতে হবে যেন সবাই ভাবে সে আমাদের খুব ঘনিষ্ঠ। আর ওই মেয়ে যখন বাড়িতে থাকবে, তখন ধারা নিশ্চয়ই অস্থির হয়ে যাবে, ভেতরে ভেতরে হিংসে খাবে। তখন এটাও বোঝা যাবে শ্রাবণের মন কোথায় দাঁড়িয়ে আছে।”
সামিউল শেখ ঠোঁট কুঁচকে বললেন,
—” সিরিয়াসলি? তুমি? তুমি এসব কথা বলছো? তোমার এই প্লানটা শুনে মনে হচ্ছে তুমি সিরিয়াসলি টিভি সিরিয়াল বেশি দেখছো সালমা। সিরিয়াল দেখা কমাও!”
কিন্তু সালমা বেগম হাল ছাড়লেন না। দুই হাত জোড় করে অনুনয়ের ভঙ্গিতে বললেন,

—” তুমি এমন কোরো না গো! সত্যি বলছি, এই পদ্ধতি কাজ করবে। ছেলে বা মেয়ের মনস্তত্ত্ব বোঝার জন্য জেলাসি একটা মারাত্মক টুল। আর ওই মেয়ে যখন বাড়িতে থাকবে, তখন শ্রাবণও একটু নড়েচড়ে বসবে, আর আমরা চোখে দেখে বুঝে ফেলবো আসলেই ওর মনোভাব কী। ”
সামিউল শেখ মাথা নেড়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, কিন্তু মনে মনে ভাবলেন, যদিও উদ্ভট, তবু বউয়ের এই
প্লান মাঝে মাঝে বিপজ্জনকভাবে কার্যকর হয়ে যায়। তাই কিছুক্ষণ বেশ সময় নিয়ে ভাবলেন সামিউল শেখ। এরপর সালমা বেগমের দিকে তাকিয়ে বললেনে,
—” ওকে ফাইন, তাহলে পুরো প্লানটা কী বলো!”
খুশিতে লাফিয়ে উঠে মনোযোগ দিয়ে গুছিয়ে পুরো পরিকল্পনা টা বলতে শুরু করলেন সালমা বেগম। প্রথমে শুনে বিরক্ত লাগলেও পরবর্তীতে বিষয়টা বেশ ভালো আর কার্যকর মনে হয়েছে সামিউল শেখের। আশা করা যায়, এক ঢিলে দুই পাখি মরবে!

অনেকটা সময় কেটে গেল। শ্রাবণের বুকের ভেতরে ধারা প্রায় স্থির হয়ে এসেছে, কিন্তু তার আঙুলের টান এখনো ঢিলে হয়নি। মুখটা যেন আরও গভীরে গুঁজে রেখেছে, যেন সেখানে লুকিয়ে আছে নিরাপত্তার শেষ আশ্রয়। শ্রাবণও নড়েনি। হাতের ভেতরে মেয়েটার ক্ষীণ কাঁপুনি ধীরে ধীরে থেমে এলেও, সে বোঝে, ভয় পুরোপুরি যায়নি। তাই কোনো কথা না বলে শুধু একহাত দিয়ে ওর পিঠে আর চুলে হাত বুলিয়ে দিতে থাকল, মনে হয় যেন প্রতিটি ছোঁয়ায় আশ্বাস ঢেলে দিচ্ছে। ঘরে নীরবতা নেমে এসেছে, শুধু মাঝেমধ্যে ধারার চাপা শ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে। শ্রাবণ চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে, অথচ ভেতরে এক অদ্ভুত অস্থিরতা। মনে হচ্ছে, যদি এখন হাত সরিয়ে নেয়, ধারা আবার ভেঙে পড়বে। তাই সে আঁকড়ে রাখল, একটু শক্ত করেই। ধারার মাথায় গাঢ় কালো চুলের গন্ধ মিশে আছে তার নিজের নিঃশ্বাসে। বুকের ভেতরে টের পাচ্ছে মেয়েটার ধীরে ধীরে শান্ত হওয়া স্পন্দন।

তবুও, ধারা একবারও উঠল না। যেন সে নিশ্চিত, যতক্ষণ শ্রাবণের বুকের ভেতরে আছে, ততক্ষণ কিছুই তাকে ছুঁতে পারবে না। আর শ্রাবণও বুঝে গেছে, আজ রাতে সে নিজেও ছাড়তে পারবে না। এই মুহূর্তটা ভাঙতে তার নিজেরও মন চাচ্ছে না। শুধু নীরবে, স্থিরভাবে, দুজন একইভাবে জড়িয়ে রইল অনেকক্ষণ।
অবাস্তব হলেও সত্যি যে, না চাইতেও সারারাত শ্রাবণ শেখ তার মেনে না নেয়া বউকেই আদর করে জড়িয়ে ধরে চোখের পানি মুছে দিয়েছিল। অবিশ্বাস্য হলেও এটাই সত্যি যে, সারাটা রাতই একইভাবে জড়িয়ে ধরেছিল তারা একে অপরকে। একটুর জন্যেও শ্রাবণ ছেড়ে দেয়নি ধারাকে। অনেকটা সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর শ্রাবণ বুঝতে পেরেছিল ক্লান্ত হয়ে নেতিয়ে পড়েছে ধারা। তাই সেভাবেই বুকের মাঝে ধারাকে জড়িয়ে শ্রাবণ বিছানায় হেলান দিয়ে শুয়ে পড়েছিল। আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছিল ছোট্ট দেহখানা, আর নিজেদেরকে আবৃত করেছিল কাঁথা টা দিয়ে যেন ঠান্ডা না লাগে। বেচারি ধারাও হুঁশ জ্ঞান সব হারিয়ে সেভাবেই ধরে রেখেছিল শ্রাবণ শেখ নামক অমানবিক পুরুষটিকে এবং সেভাবেই ঘুমিয়ে গিয়েছিল দুজন।

ভোরের ম্লান আলোটা পর্দার ফাঁক গলে ঘরে ঢুকে পড়েছে। বাইরে কোথাও দূরে মোরগ ডাকার ক্ষীণ শব্দ ভেসে এলো। শ্রাবণের চোখের পাতায় হালকা নড়াচড়া হলো, কিন্তু সে এখনো আধো ঘুমে। একসময় বুকের ভেতর অদ্ভুত এক ভার অনুভব করল, গভীর, উষ্ণ, স্থির এক ভার। মনে পড়ল সে তো একটা ছোট্ট দেহ বুকে নিয়েই ঘুমিয়েছে। চোখ মেলে বুঝতে দেরি হলো না, তার বুকের ভেতরে এখনো গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে ধারা। কাল রাতের সমস্ত ঘটনা মনে পড়তেই তার নিঃশ্বাস আটকে গেল। এতটা কাছে, এতটা নির্ভর হয়ে কেউ তাকে শেষ কবে এভাবে আঁকড়ে ধরেছিল, মনে করতে পারল না শ্রাবণ।

ধারার নিঃশ্বাস এখন ধীর আর গভীর, যেন প্রতিটি শ্বাসে শান্তি টেনে নিচ্ছে। তার মাথার কিছু চুল শ্রাবণের গলা ও চিবুকে বিছিয়ে আছে, কপালের পাশে লেগে আছে তার হাতের উষ্ণতা। ঘুম এতটাই গভীর যে বাইরের আলো, শব্দ, কিছুই তাকে স্পর্শ করতে পারছে না। শ্রাবণ যতটুকু জানে ধারা খুব ভোরে ওঠে, কিন্তু আজ ধারার ঘুম দেখে শ্রাবণের মনে হলো, মেয়েটা বেশ শান্তিতে ঘুমাচ্ছে। এমন প্রশান্তির ঘুম হয়তো আগে কখনো হয়নি।
শ্রাবণ ধীরে ধীরে মাথা উঠিয়ে তাকাল সেই শান্ত মুখের দিকে। ঘুমন্ত অবস্থায়ও ধারার ঠোঁট সামান্য ফাঁকা, চোখের কোণে এখনো শুকনো কান্নার দাগ স্পষ্ট। বুকের ভেতর হালকা ব্যথার মতো কিছু অনুভব করল সে, অপরাধবোধ আর এক অদ্ভুত মমতার মিশেল। শ্রাবণ নড়ল না। শুধু একটু বেশি আরাম করে কাঁথাটা টেনে দিল মেয়েটার গায়ের ওপর, যেন সকালে ঠান্ডা না লাগে। বুকের সেই উষ্ণ ভারটাকে সামান্য শক্ত করে আগলে রাখল শ্রাবণ, হয়তো নিজেরও অজান্তে, যেন ঘুমন্ত মেয়েটার নিরাপত্তা এক মুহূর্তের জন্যও ভেঙে না যায়।

মিষ্টি হেসে ছোট শ্বাস ফেলতেই হুট করে শ্রাবণের মাথায় এলো সূক্ষ্ম চিন্তাটা। হতবাক হলো সে। আশ্চর্য! এটা কী হলো? সে না এই মেয়েকে বউ হিসেবে মেনেই নেয়নি? এই মেয়ে না পিচ্চি? তাহলে এখন এভাবে এতটা কাছে টেনে নেয়ার মানে টা কী? আবার কি সুন্দর করে বুকে জড়িয়ে রেখেছে? ওমা! এটা তো নিজের সাথেই চরম বেইমানি! নিজে নিজেই হতবিহ্বল হয়ে গেল শ্রাবণ। গতরাতে যা হয়েছে তা নিতান্তই পরিস্থিতি শিকার হয়ে হয়েছে। কিন্তু সে যে ধারাকে কখনো এতটা কাছে টেনে নেবে এটা তো সে নিজেও ভাবে নি। ভাবা যায়? এতদিন যাকে পাশে ঘুমোতে দেয়নি, গতরাতে তাকে বিছানায় ঘুমাতে দিতে চেয়ে একদম ছক্কা মেরে এখন বুকের উপর নিয়ে ঘুমিয়ে আছে? এটা কি হলো?

শ্রাবণ ভ্রু কুঁচকে নিজের ভেতরের এই অচেনা অনুভূতিটা বোঝার চেষ্টা করল। বুকের ভেতরে ধারা যেন নিঃশ্বাসের সঙ্গে গেঁথে গেছে, অথচ মাথায় প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে,এটা কি করছিস তুই, শ্রাবণ শেখ? এই মেয়েটাকে তো বউ হিসেবেও মানিস না, বরং যতটা সম্ভব দূরে রাখিস। তবুও কেন এমন করে আগলে রেখেছিস? কেন মনে হচ্ছে, ওকে ছাড়লে কিছু হারিয়ে যাবে? মাথার ভেতর তর্ক যেন চলতেই লাগল। একদিকে মনে করিয়ে দিচ্ছে, গত রাতের সবই ছিল পরিস্থিতির ফল, আরেকদিকে হৃদয়ের গভীর থেকে ফিসফিস আসছে—তুই চাইলেও এই মুহূর্তে ওকে ছাড়তে পারছিস না।

নিজের এই দুর্বলতায় বিরক্তি নিয়ে হালকা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল শ্রাবণ। তারপর ধীরে, খুব ধীরে, যাতে ধারা ঘুম থেকে না জাগে, বুকের ভেতর থেকে ওকে আলগা করল। এক হাত দিয়ে মাথার নিচে বালিশ ঠিক করে দিল, কাঁথাটা যত্ন করে টেনে দিল গলার কাছে পর্যন্ত। কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, চোখে সেই অপরাধবোধ আর এক অদ্ভুত টান এখনও মিশে আছে।
তারপর নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। ভোরের শীতল বাতাস মুখে লাগতেই যেন বুকের ভার কিছুটা হালকা হলো। সিঁড়ি পেরিয়ে উঠোনে নেমে এলো, পা থামল পুকুরপাড়ে। পানি তখনও কুয়াশার আস্তর ঢেকে রেখেছে, মাঝে মাঝে হালকা ঢেউ এসে ভাঙছে ঘুমন্ত পুকুরের নিস্তব্ধতা। শ্রাবণ দুই হাত পকেটে ঢুকিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল, নিজের ভেতরের প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে খুঁজতে।
পুকুরপাড়ের ভেজা ঘাসে দাঁড়িয়ে, শ্রাবণ পায়ের নিচের মাটি চাপতে চাপতে আকাশের দিকে তাকাল। কুয়াশায় ঢাকা ভোরটা তার চোখে আজ অন্যরকম লাগছে। মনে হচ্ছে, ভেতরে কোথাও এক অদ্ভুত অস্বস্তি জমে আছে, কিন্তু সেটাকে নাম দেওয়ার মতো সাহস বা ইচ্ছা, কোনোটাই তার নেই।

—” এই মেয়ে তো আমার কিছুই না… মানে, আছে ঠিকই… বউ…কিন্তু নিজের মনেই তো মেনে নিইনি। তাহলে কেন গতরাতে ওকে এতটা আগলে রাখলাম? চোখের পানিটা সহ্য হলো না কেনো? শুধু পরিস্থিতি? নাকি..!”
ভাবনাটা শেষ করতে গিয়েও থেমে গেল সে। নিজের মনেই যেন একটা দেয়াল তুলে রাখল, যেন সেখানে পা দিলেই ডুবে যাবে কোনো গভীরে, যেখান থেকে ফেরার রাস্তা থাকবে না।
—” নাহ… এটা বোকামি। আমি শুধু…ওকে ভয় পেতে দেখেছি, অসহায় দেখেছি, আর… হ্যাঁ, তাই…তাই কাছে টেনেছি। এর বেশি কিছু না।”

তবুও মনে হচ্ছে, বুকের ভেতরে সেই নরম ভারটা এখনও রয়ে গেছে, যদিও ধারা এখন ঘরে ঘুমিয়ে আছে। হাতের তালুতে যেন এখনও লেগে আছে ওর চুলের ছোঁয়া, আর কানে বাজছে ওর ফুঁপিয়ে বলা কথাটা —”মারবেন না..!”
শ্রাবণ দাঁত চেপে মুখ ফিরিয়ে নিল পানির দিক থেকে।
—” না, আমি দুর্বল হবো না। যতই হোক, আমার নিজের একটা নিয়ম আছে। ও আমার জীবনে জোর করে আসা একজন… আমি এসব এত সহজে মানতে পারি না… পারব না।”
কিন্তু বুকের কোথাও খুব হালকা একটা ফিসফিস, দমাতে চাইলেও বলেই যাচ্ছে,

শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ১৪

—” তুই পারবি না, শ্রাবণ শেখ, কারণ তুই ইতিমধ্যেই ওকে নিয়ে ভাবা শুরু করে দিয়েছিস।”
সে গভীর শ্বাস নিল, ঠান্ডা বাতাসের সঙ্গে যেন নিজের অস্থিরতাটাকেও গিলে ফেলতে চাইল। পকেটে থাকা হাত দুটো মুঠো করে চেপে ধরে ধীরে ধীরে উঠোনের দিকে ফিরে গেল, কিন্তু জানত, আজ এই মনকে বোঝানো সহজ হবে না। জানেনা কী হতে যাচ্ছে!

শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ১৬