Home শ্রাবণ ধারার রূপকথা শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ৪২

শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ৪২

শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ৪২
অনামিকা তাহসিন রোজা

” মেয়েদের অনেক শক্ত হতে হয়, এটুকু ব্যাথা পেয়ে ল্যটকায় পড়লে মেয়ে হওয়া যায়না! ছেলেদের মত দুর্বল নই আমরা হুহ!” —এই সোনামাখা বাণী শ্রাবণের কানে হাতুড়ি মেরে ঢুকিয়ে দিয়ে সহজ সরল ধারা হেলেদুলে বেরিয়ে পড়ল রুম থেকে। শ্রাবণ কিছুক্ষণ হতবাক হয়ে মেয়েটার প্রস্থান দেখলো। এইতো গত রাত পর্যন্ত ওর অবস্থা দেখার মত ছিল। গভীর রাতে পায়ের ব্যাথায় শ্রাবণকে জড়িয়ে ধরে মরাকান্নাও করেছে। অথচ সকালে উঠেই রূপ বদলে ফেলল। সারারাত নিজের বাচ্চামো রূপে শ্রাবণকে পিষে ফেলে এখন সকালে শপিং করতে যাচ্ছে শ্বাশুড়ির সাথে? শ্রাবণের ইচ্ছে করলো ধারার ব্যান্ডেজ টা খুলে দিয়ে বলতে, “নাও এবার লাফাও তো। দেখি কত লাফাতে পারো।”

তবে সেও নিরুপায়। তাই চুপ রইলো। কোনোমতে নিজেকে ধাতস্থ করে বেরিয়ে পড়লো গাড়ির চাবি নিয়ে।
আজ শনিবার। সপ্তাহের ছুটির দ্বিতীয় দিন। ধারার পা না মচকালে গতকালকেই সমস্ত শপিং শেষ করার পরিকল্পনা করেছিলেন সালমা বেগম। কিন্তু বেচারি মেয়েটা হুট করে এভাবে আহত হওয়াতে তিনি পরিকল্পনা সফল করতে পারেন নি। আজ সকালে তিনি শুধু জিজ্ঞেস করেছিলেন ধারাকে,সে জিহান মুনিরার বিয়ের শপিংয়ের জন্য তার সাথে একটু যেতে পারবে কিনা। সালমা বেগমের কথা শুনে ধারা নিজের বাচ্চামো রূপটাকে জলাঞ্জলি দিয়ে নিজের কঠিন রূপটা ধারণ করে এক লাফে বিছানা থেকে উঠে পড়েছে এবং কোনোমতে একটা গোলাপি সালোয়ার কামিজ পড়ে তৈরী হয়ে নিয়েছে।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

শ্রাবণকেও সালমা বেগম কথাখানা জানিয়েছিলেন। বউয়ের সেবায় মত্ত শ্রাবণ সাফসাফ জানিয়ে দিয়েছিল যে সে তার বউকে রেখে কোথাও যাবেনা। দরকার পড়লে পরে দুজনে মিলে গিয়ে তারা নিজেদের শপিং করে নিয়ে আসবে। অথচ ধারা যে সকাল সকাল উঠে পল্টি খাবে, তা স্বপ্নেও ভাবে নি। ভাবলে হয়তো এখন তব্দা খেয়ে বসে থাকতো না।
ইকরা এবং ধারা দুজনেই শ্রাবণের সাথে সাথে তার গাড়ির কাছে আসলো। শ্রাবণ ভেবেছিল শুধু বউকে নিয়ে যাবে সে। অথচ গাড়ির কাছে এসে দেখে ইকরা এবং ধারা দুজনেই এসেছে। কিছুক্ষণ তাদের দুজনের দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে চাইলো সে। কিন্তু তার আগেই সালমা বেগমও এসে হাজির হয় শ্রাবণের গাড়ির সামনে। শ্রাবণ এবার হা হয়ে তাকিয়ে বলে,

—” তোমরা সবাই মৌমাছির ঝাঁকের মত আমার গাড়িতে আসছো কেনো? মা? তুমি বাবার সাথে যাবেনা? ‘
সালমা বেগম ইতোমধ্যে গাড়ির পেছনের সিটে বসে জায়গা দখল করে বললেন,
—” না। আমি তোর বাপের সাথে যাব না। প্রতারকের সাথে কথাই বলব না।”
শ্রাবণ চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বুঝে ফেললো সপ্তাহের নিত্যকার রুটিন অনুযায়ী তার বাবা মা ঝগড়া করেছে। আর ঝগড়া হলেই সালমা বেগম কখনোই সামিউল শেখের আশেপাশে থাকেন না।

ইকরা এবং ধারা দুজনেই ফিক করে হেসে ফেলল। বলা বাহুল্য, একটু হলেও দুজনের মাঝে মিল হয়েছে। অবশ্য এক্ষেত্রে পুরো ক্রেডিট টাই ইকরার। কোনো একটা সম্পর্কে মেলবন্ধন নির্মাণ করতে হলে কোনো একজনকে আগ্রহী হতে হয়। অপর জনকে আগ্রহী বানাতে একটু মিশতে হয়, যা ইকরা নিজে থেকে করেছে। গত রাতে সে সারাটা রাত ধরে অনেক কিছু চিন্তাভাবনা করে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে যে জীবনে সবকিছুই পেতে হবে এমন কোনো কথা নেই। শ্রাবণ না হয় না পাওয়ার লিস্টেই থাকুক। তবুও তো রয়েছে। এই অনেক। তাই সে ধারাকে মন থেকে পছন্দ করতে শুরু করেছে। যতই হোক, তার বন্ধু এবং কাজিনের বউ ধারা। সেই রেশ ধরেই দুজনের মধ্যে ভালো সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। অবশ্য মেয়েদের ভালো একটা মিল হতে সময় লাগেনা, যদি সেটা যৌক্তিক হয়।
শ্রাবণ কোঁমড়ে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। সে সুনিশ্চিত তার বাবা সালমা বেগম কে ছাড়া ওই গাড়িতে যাবেন না। ড্রাইভার আঙকেল কে ধমক দিয়ে বাড়িতে ফিরে যাবে৷ তাই এখন সালমা বেগমকে সামিউল শেখের কাছে পাঠানো শ্রাবণের একটা গুরুদায়িত্ব। সে আরো বোঝানোর চেষ্টা করলো সালমা বেগম কে। কিন্তু তিনি জেদ করতে থাকলেন।
শেষে ইকরা হেসে হেসে বলল,

—” শ্রাবণ শোন, আমি তাহলে বাপ্পির সাথে যাই? তুই ইকরা আর আন্টিকে নিয়ে আয়।”
সামিউল শেখ এক গাড়িতে একা যাবেন এটা চাইছিল না শ্রাবণ। তার বাবাও কম অভিমান করেনা। বয়সের সাথে সাথে যখন মানুষ এই পর্যায়ে আসে, তখন মনও বাচ্চার মত সহজ সরল হয়ে যায়। তাই ইকরার সিদ্ধান্ত টা মন্দ লাগলো না শ্রাবণের কাছে। সে মাথা নেড়ে বলল,,
—” হুম তাও হয়। তাহলে মিকি মাউস, তুই বাবার সাথে যা।”
ইকরা সময় নষ্ট না করে ধারাকে বাই দিয়ে ওই গাড়িতে উঠে পড়লো। শ্রাবণ এবারে ধারার দিকে তাকিয়ে মুখ কুঁচকে বলল,

—’ আর এই যে পা ভেঙে ল্যাম্পপোস্টের মত দাঁড়িয়ে থাকা ম্যাডাম? দেখি, হাতটা দিন। আপনাকে সযত্নে সিটে বসিয়ে দিই।”
সাথে সাথে অগ্নিঝরা দৃষ্টিতে তাকালো ধারা। লোকটা আবারো অপমান করছে? এসব সে আর সহ্য করবেনা। তাই ফুঁসতে ফুঁসতে বলে উঠলো,
—” দরকার নেই হাত ধরার। আমি হাঁটতে পারি বুঝলেন? খবরদার অপমান করবেন না। বাড়ির গেট থেকে এই পর্যন্ত আমি নিজে হেঁটে এসেছি হুহ!”
শ্রাবণ ঠোঁট চেপে মেকি হেসে বলল,
—” খুব উদ্ধার করেছেন আমায়। আর ঘর থেকে সদর দরজা পর্যন্ত কে এনে দিয়েছিল আপনাকে?”
ধারা মোটেই দমবার পাত্রী নয়। সে আঙুল উঁচিয়ে জেতার চেষ্টা করে বলল,
—” সেটা বড় কথা নয়। আর আমি কাওকে বলিনি যে কোলে তুলে আনতে হবে। কেও যদি নিজে থেকে মানবসেবা করতে চায় তো আমার কী? সে না আসলেও আমাকে মা আনতে পারতো হুহ!”
শ্রাবণ আবারো হেসে বলল,

—” হ্যাঁ হ্যাঁ। খুব পারতো। ছোটখাটো এই তুলোর বস্তা কি আমার মা তুলতে পারতো?”
ধারা হতবাক হয়ে চেঁতে গেলো,
—” কী বললেন আপনি?”
অনেকক্ষন ধরে পটরপটর শুনে সালমা বেগম বিরক্ত হলেন। চেঁচিয়ে ধমক দিলেন দুজনকে,
—” আহহা! চুপ কর তোরা। কী শুরু করলি বল তো দুজনে!”
ধারা সাথে সাথে কাতর নয়নে তাকিয়ে অভিযোগ দিলো সালমা বেগমের নিকট,
—” আপনার ছেলে আমাকে তুলোর বস্তা বলে অপমান করেছে মা!”
শ্রাবণ অন্যদিকে ফিরে বিড়বিড় করে বলে উঠলো,
—” তাও ভালো যে, হাতির বাচ্চা বলিনি!”

কথাটা ধারা শুনতে না পেলেও সালমা বেগম শুনতে পেলেন৷ সাথে সাথে গর্জে উঠলেন, ধমক দিয়ে বললেন,
—’ তোকে কিন্তু তোর বাপের সাথে বনবাসে পাঠাবো শ্রাবণ! তোরা বাপবেটা দুটোই ভীষন খারাপ। পুরা বাপের ফটোকপি হয়েছিস তুই। একটু ভালো করে কথা বলা যায় না বউয়ের সাথে? মুখে মুখে কথা বলিস কেনো? ফের যদি বউমাকে উল্টোবাল্টা কথা বলেছিস, তবে তোকে আর তোর বাপকে রেখে আমি আর বউমা বাপের বাড়ি চলে যাব।”
বলেই সালমা বেগম গাড়ি থেকে বেরিয়ে এলেন। ধারাকে আলতো করে আগলে নিলেন। হাত ধরে বললে মিষ্টি স্বরে,
—” এসো বউমা, হাত ধরে এসো। আস্তে আস্তে। আমার সিটে বসো ঠিক আছে? আর এই ছেলের সাথে কথা বলবে না।”

ধারা শ্রাবণকে আড়ালে মুখ ভেঙচালো। আর সালমা বেগমের হাত ধরে তার কথা শুনে মাথা নেড়ে সত্যি সত্যি পেছনের সিটে বসে পড়লো। দুজনই ঢুকে পড়তেই সালমা বেগম ঠাস করে গাড়ির দরজা লাগালেন।
শ্রাবণের হুঁশ ফিরে এলো। সে এতক্ষণ হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলো প্রায়। এসব কী ছিল.?এখানে কে যে কার মা এ নিয়ে ভীষন বিভ্রান্তিকর অস্থিরতায় পড়লো শ্রাবণ শেখ। শেষে কিনা তার মা তাকে ধারার জন্য বকলো! ব্যপার টা তবে কি দাঁড়ালো,
—” সম্পর্ক বদলে গেলো একটি পলকে!
কে মা, কে যে শ্বাশুড়ি হলো রে!
বধুবেশে ধারা ঘরে এলো রে,
সালমা বেগম কে হাত করে নিলো রে!”

সামিউল শেখ তো শ্রাবণ শেখেরই বাবা। বউ নিয়ে নো কম্প্রোমাইজ মন তারও। সালমা বেগম সত্যি সত্যি এই গাড়িতে আসলেন না দেখে তিনি মনঃক্ষুণ্ন হলেন। ইকরা কে পেয়ে তাই সব ক্ষোভ ঝারতে থাকলেন। ইকরা পাশে বসে হাসলো মিটমিট করে। এরমধ্যেই বকবক করা সামিউল শেখ থেমে বললেন,
—’ তুই কি আমার কথা শুনছিস?’
চমকে উঠে নড়েচড়ে বসলো ইকরা। তারা জ্যামে আটকে গেছে। সেদিকে তাকিয়ে বললো,
—” জ্বি জ্বি শুনছি বাপ্পি। আসলে গাড়িগুলো দেখছিলাম। হ্যাঁ তারপর কী বলো? সেদিন আর তুমি যাও নি?”
সামিউল শেখ আরো উৎফুল্লতার সাথে ক্ষোভ নিয়ে বললেন,
—” আমি কি তোর আন্টির মত প্রতারক নাকি? আমি অনেক নরম মনের মানুষ। তোর আন্টি তো সেই লেভেলের চালবাজি করতে পারে। সেই বিকালে একবাটি পায়েশ রান্না করে টিফিন বাটিতে ভরে আমার অফিসে নিজে এসে খাইয়ে দিয়ে গিয়েছে। নিতান্তই একটা ফর্মুলা ছিল, যেন আমার রাগ ভেঙে যায়!”
অবাক হলো ইকরা। শুকনো ঢোক গিলে বলল,

—’ আর তুমি ওই পায়েশ খেয়েই গলে গিয়েছিলে?”
—”অবশ্যই! আমি কি তোর আন্টির মত অকৃতজ্ঞ নাকি? ভেবেছিলাম দুইদিন বাড়ির ধারের কাছেও যাব না। কিন্তু বেচারি তোর আন্টি আমার জন্য এত কষ্ট করে পায়েশ রান্না করে নিয়ে গিয়েছে বলে দুই ঘণ্টার মধ্যে বাসায় ফিরে গিয়েছিলাম।”
ইকরা আর হাসি আটকাতে পারলো না। সে হো হো হাসতে শুরু করলো। সামিউল শেখ অপ্রস্তুত হলেন। প্রথমে ধমক দিলেন এভাবে হাসার জন্য। কিন্তু কাজ হলো না তাতে। ইকরা হেসে কুল পাচ্ছেনা। তা দেখে সামিউল শেখ নড়েচড়ে বসে বিড়বিড় করে বললেন,
—’ কাকে কী বলছি আমি? মহিলা জাত কি নিজেদের দোষ দেখে নাকি? আর সেখানে আমি এক নারীর কাছে আরেক নারী নিয়ে অভিযোগ করছি।”
ইকরা এবারেও হাসলো। ভীষন হাসলো। প্রেমিক পুরুষেরা এসব ঝামেলাতে পড়েই।

বিশ মিনিটের মধ্যেই বসুন্ধরা সিটি কমপ্লেক্সে পৌঁছালো তারা। ড্রাইভার সামিউল শেখ আর ইকরা কে সামনের দরজার দিকেই নামিয়ে দিয়েছে। আর শ্রাবণ পেছনের দরজায় গিয়েছে গ্যারেজ গাড়ি পার্ক করার জন্য। আন্ডারগ্রাউন্ডে ঢুকে সারি সারি গাড়িগুলোর এক পাশে শ্রাবণ নিজেদের গাড়ি দাঁড় করালো। সালমা বেগম তড়িঘড়ি করে নামলেন। ধারার দিকে হাত বাড়াবেন, তার আগেই শ্রাবণ খু্ব মিষ্টি করে হেসে সালমা বেগমকে বললো,
—” তুলোর বস্তাটা কে আমি নিয়ে আসছি মা। তুমি বরং দ্রুত শপিং মলে ঢুকে পড়ো। বাবা আবার না হয় হারিয়ে যাবে। ইকরাও তো ছোটমানুষ!”

নিতান্তই ছেলেভুলানো অযুহাত। তবুও সালমা বেগমের ক্ষেত্রে খেটে গেলো। কারনও আছে। স্বামীকে ভীষন ভালোবাসেন তিনি। এই যে তিনি সামিউল শেখকে অবজ্ঞা করে এই গাড়িতে এসেছেন, এতে যে শেখ বাড়ির কর্তা ভীষণ অসন্তুষ্ট হয়েছেন, রাগ করেছেন এ বিষয়ে তিনিও জানেন। তাই যত দ্রুত সম্ভব, মানুষটিকে দেখার জন্য তারও মন উতলা হয়ে রয়েছে। যতই হোক না কেন, ভালোবাসার প্রিয় মানুষটিকে অবহেলা করা বড়ই কষ্টকর! খুব বেশি ভালোবাসলে অবহেলা করা সম্ভব হয়না। তাই সালমা বেগমও ধারাকে রেখে তড়িঘড়ি করে চলে গেলেন।
বেচারি ধারা গাড়ির সিটের সাথে চেপকে গেলো। গুটিয়ে গিয়ে শুকনো ঢোক গিলল। আশেপাশে তাকিয়ে দেখলো অনেকগুলো গাড়ি সাজিয়ে দাঁড় করানো, কিন্তু কোনো মানুষ নেই। এত অন্ধকার কেনো আবার? ধারার ভয় লাগলো। এখানেও তো আলো দিতে পারত! কেনো দেয়নি শপিং মলের লোকেরা? এখন শ্রাবণ শেখ যদি এই আবছা আলোর মধ্যে ধারাকে মেরে পুঁতে দিয়ে যায় তাহলে তো কেও টেরও পাবেনা। সিকিউরিটি গেট পার করে সালমা বেগম দৃষ্টির আড়ালে চলে যেতেই গাড়ির ভেতরে তাকায় শ্রাবণ। ধারার হৃদয় ধ্বক করে উঠে।

শ্রাবণ বাঁকা হেসে এগিয়ে যায় গাড়ির কাছে। পেছনের দরজা খুলে বসে পড়ে ধারার পাশে। ধারা এমনিতেই ভয় পেয়েছিল। শ্রাবণকে আবার পাশে বসতে দেখে ঘাম ছুটলো। কারন আছে। রাস্তায় ধারা অনেকবার লক্ষ্য করেছে যে শ্রাবণ শেখ গাড়িতে থাকাকালীন মিরর দিয়ে চোখের ইশারায় তাকে হুমকি দিচ্ছিল, সেই সময়ে ধারা মুখ ভেঙ্গেচিয়ে পাত্তা দেয়নি। কিন্তু এখন তাকে বাঁচাবে কে?
যে করেই হোক বাঁচতে হবে এই ভেবে ধারা মেকি হেসে বলে উঠলো,
—” হে হে। বসে পড়লেন যে? আমরা যাব না?”
শ্রাবণের ঠোঁট থেকে হাসি সরছে না। তবে হাসিটা মোটেই পছন্দ হলো না ধারার। এভাবে ভিলেনি হাসি দিচ্ছে কেনো লোকটা? ধারা আরো কাতর নয়নে তাকিয়ে বলল,

—” আমরা যাচ্ছিনা কেনো? চলুন যাই!”
—” হুম হুম অবশ্যই যাব!”
—” তো নড়ছেন না কেনো? উঠুন।”
শ্রাবণ দুদিকে মাথা ঝাঁকিয়ে গাড়ির সব জানালাগুলো অফ করে দিলো। ট্রান্সপারেন্ট থেকে সব জানালা গুলো ডার্ক করে দিলো যাতে বাইরে থেকে কিছু দেখা না যায়। ধারা প্রায় কেঁদে দেবে এমন অবস্থা, সে কাঁদো গলায় বলে উঠলো,
—” এ কি! জানালা কালো করে দিলেন কেনো? আবার দরজা কেনো লক করছেন আজব! আপনি কি আমায় খুন করার পরিকল্পনা করেছেন? আআআ! এসব কী? কেনো?”
গাড়ির সবকিছু ঠিকঠাক করে এবারে শ্রাবণ ধারার মুখোমুখি বসে পড়ল। ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে বলল,

—” নাও এবার শুরু করো!”
আমতা আমতা করলো ধারা,
—’ কী শুরু করব?”
—” সকাল থেকে সর্বমোট সতেরো বার তুমি আমায় মুখ ভেঙচিয়েছো। নাও, আবার শুরু করো সেসব। সেঞ্চুরি না করে এখান থেকে যাওয়ার পরিকল্পনা নেই।”
বলেই কলার ঝাঁকালো শ্রাবণ। নির্বিকার ভাবভঙ্গি তার।
ধারা কাঁদো কাঁদো চোখে তাকিয়ে বলল,
—’ ও আল্লাহ! আপনি গুনেও রেখেছেন? কি আশ্চর্য! আমি তো মজা করে ওসব করেছি!”
শ্রাবণ ফট করে তাকিয়ে খুশিখুশি ভাব করে বলল

—’ আচ্ছা তাই নাকি?”
—” হ্যাঁ হ্যাঁ। সত্যি বলছি। আপনার সাথে মজা করছিলাম! হে হে। আর করব না তো। এবারের মত ছেড়ে দিন। সত্যি মজা করছিলাম!”
বলেই ঠোঁট কাঁমড়ে তাকালো ধারা। একটুখানি আশা, শ্রাবণ শেখ এবারে হয়তো ক্ষমা করবে। অথচ তাকে অবাক করে দিয়ে শ্রাবণ এগিয়ে আসলো। মুখোমুখি হলো ধারার।
শ্রাবণকে এত কাছে আসতে দেখে ধারা আরেকটু পেছাতে চাইলো। কিন্তু তার আগেই মাথার পেছনে হাত রেখে আটকেছে তাকে শ্রাবণ। শ্রাবণ একদম মুখোমুখি হয়ে ধারার চোখের দিকে তাকিয়ে বাঁকা হাসলো। ধারা ঠোঁট ভিজিয়ে শুকনো ঢোক গিলে মিনমিন করে বলল,

—” ভুল করে মিস্টেক হয়ে গিয়েছে। মজা করছিলাম!”
শ্রাবণ ঠোঁট কাঁমড়ে বলল,
—’ এবার তাহলে আমিও একটু মজা করি। কী বলো বউ?”
চোখ পিটপিট করে তাকালো ধারা
—’ কেমন মজা?”
শ্রাবণ একটুখানি ভেবে বলে উঠলো
—” সতেরো বার মুখ ভেঙচিয়েছো। এর দ্বিগুণ করলে হয় চৌত্রিশ। তাই আমি এবার তোমাকে চৌত্রিশ টা চুমু দেব। বিশ্বাস করো একটা চুমুও সিরিয়াসলি দেব না। মজা করেই দেব। ডিল ডান?”
ধারা চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে তৎক্ষনাৎ দুদিকে মাথা নেড়ে বলল,
—” নো নো নো। কোনো ডান না। কীসের ডিল? কোথাকার ডিল? আমি বাইরে যাব। গাড়ির দরজা খুলুন। আআআ। কেও বাঁচাও।”

শ্রাবণ ধারার মুখ চেপে ধরলো শক্ত করে। চেঁচাতে পারলোনা ধারা। তবে চোখ আটকালো শ্রাবণের চোখে। এ কি সর্বনাশ! লোকটার চোখে যে স্পষ্ট নেশা দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। এ কি নেশায় জড়াচ্ছে! শ্রাবণের চোখ ধারার ঠোঁটের দিকে আটকালো। দৃষ্টিটা প্রচন্ড রকম আকর্ষণ করলো ধারাকে। শ্রাবণ ধীরে ধীরে ধারার মুখ থেকে হাত সরিয়ে আনলো। একটু একটু করে আঙুলের ডগা দিয়ে ছুঁয়ে দিলো ধারার নরম অধরদুটো। গোলাপের পাপড়ির থেকেও নরম মনে হলো তার। সেখানেই চোখ আটকে রেখে শ্রাবণ বিড়বিড় করে বলল,
—” কি নেশা ছড়ালে! কি মায়ায় জড়ালে!”
শ্রাবণেন কন্ঠে কিছু ছিল কি? হয়তো ছিল। নইলে ধারাও কেনো অজানা আবেশে হারিয়ে যাবে। কেনো তারও চোখ শ্রাবণের ঠোঁটে আটকাবে। তবে কি সর্বনাশ টা আবারো হবে? ডিল তাহলে ডান হলো বলে। শ্রাবণ শেখ আবারো জিতে গেলো। শেখ বাড়ির বংশধর বলে কথা! জিততে তো হবেই।

সামিউল শেখ ইতোমধ্যে পাঞ্জাবির কালেকশন দেখতে একটা দোকানে ঢুকে পড়েছেন। ইকরা আর সালমা বেগম এস্কেলেটরের পাশে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে শ্রাবণ ও ধারার জন্য। খানিকক্ষন পরেই দুজনকে আসতে দেখা গেলো। ইকরা হাসি মুখে সালমা বেগম কে বলল,
—” ওইতো ওরা চলে এসেছে আন্টি।”
শ্রাবণ এসেই সালমা বেগমকে বলল,
—” কী ব্যাপার? বাবা কোথায়?”
ইকরা বলল,
—” অলরেডি অন দ্যা স্পট। চল আমরাও যাই। প্রথমে পাঞ্জাবির কালেকশন দেখি। এরপর সবার জন্য শাড়ি দেখব!”
শ্রাবণ ঘাড় উঁচিয়ে বলল,— “ওকে।”
কিন্তু সালমা বেগম লক্ষ্য করলেন বেচারি ধারা কেমন যেন গুটিয়ে রয়েছে। মাথা নিচু করে হাত কচলাচ্ছে অস্থির হয়ে। চোখ তুলে তাকাচ্ছেও না। মেয়েটা তো একটু আগ পর্যন্ত বেশ উচ্ছ্বাসে ছিল। হঠাৎ কি হলো বুঝলেন না তিনি। জিজ্ঞেস করলেন

—” বউমা? কী হয়েছে? মুখটা ওমন ভার করে রেখেছো কেনো?”
এ পর্যায়ে চমকে তাকালো ধারা। জোরপূর্বক মুখে হাসি এনে বলল,— না না, কই? কিছু হয়নি তো!”
বলে আবারো মেকি হাসলো।
তবে ইকরার চোখ সরু হলো। সে দৃষ্টি তুখোড় করে ঠোঁট কাঁমড়ে বলল,
—” ধারা? আমি তো তোমার ঠোঁটে লিপগ্লস লাগিয়ে দিয়েছিলাম। সেটা কোথায় গেলো? খেয়ে ফেলেছো? এত শুকনো হলো কী করে?”
শ্রাবণের মুখে কিছুই ছিল না। চা কফি না খেয়েও খুকখুক করে কাশতে শুরু করলো বেচারা। মুখে হাত রেখে অন্যদিকে ফিরে সতর্ক হলো। পকেটে হাত দিয়ে দ্রুত টিস্যু বের করে সবার আড়ালে নিজের ঠোঁট মুছলো আরো ভালো করে। কি আশ্চর্য! সালমা বেগম মনে হয় অত্যন্ত সহজ সরল। নইলে কেনো তিনি কাতর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে উঠবেন,

—” আহারে! বউমা আসলে এসব আগে কখনো দেয় নি তো। তাই মনে হয় খেয়ে ফেলেছে। ইকরা, আরেকবার দিয়ে দে লিপস্টিক টা।”
ইকরা অত্যন্ত বুদ্ধিমতী। শ্রাবণের গতিবিধি দেখে সে সতর্ক হয়েছে এবং যা বোঝার বুঝে ফেলেছে। তাই ঠোঁট টিপে হাসলো ও। তবে সালমা বেগমের কথায় তাল মিলিয়ে বলল,
—” হ্যাঁ অবশ্যই আন্টি। লিপগ্লস টা কে খেয়েছে সেটা বড় কথা নয়, বড় কথা হলো বেচারি ধারার এইজন্যই মন খারাপ। তাই না ধারা?’
ধারা কাতর নয়নে তাকালো ইকরার দিকে। বিড়বিড় করে বলল, আমি খেয়ে ফেলিনি সত্যি। ইকরা হাসি আটকেছে কোনোমতে। সালমা বেগম এদের কোনো কিছু না বুঝে তাড়া দিয়ে বললেন,
—” ধুর, তোরা কী শুরু করলি? চল তো। ধারা,আয় আমার সাথে।”

বলেই সালমা বেগম ধারার হাত টেনে নিয়ে যেতে লাগলেন। যন্ত্রের মত তাল মিলিয়ে যেতে থাকলো ধারা। শ্রাবণ দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবারো টিস্যু দিয়ে ঠোঁট মুছলো। সে শিউর না যে ঠোঁট ঠিক আছে কিনা।
তখনি ইকরা শ্রাবণের কাছে এসে ধীর কন্ঠে বলল,
—” রিল্যাক্স ব্রো। কিচ্ছু বোঝা যাচ্ছে না। এক্কেরে খেয়েই ফেলেছো।”
সিংহের মত তাকালো শ্রাবণ। চোখ দিয়ে রাগ দেখিয়ে বলল
—” শাটাপ মিকি মাউস! যেমন ভাবছিস তেমন কিছু না।” বলে আবারো সতর্ক হলো শ্রাবণ। এরপর পা চালিয়ে সালমা বেগমের পিছু নিলো। অসস্থি লোকানোর চেষ্টা। শক্ত থাকার প্রয়াস!
ইকরার ভালো লাগছে জ্বালাতে। তাই সে শ্রাবণের সাথে হাঁটতে হাঁটতেই আবারো বলল,
—” টেনশন নট। ব্রান্ডের লিপগ্লস! পেট খারাপ হবেনা।”
—” তুই থামবি? বেয়াদব!”

শ্রাবণের কন্ঠ অনেক কঠোর হলেও ইকরা হাসি থামাতে পারলো না৷ আবারো ঠোঁট চেপে বলল,
—” স্ট্রবেরি পছন্দ করিস না। অথচ স্ট্রবেরি ফ্লেভার একদম পুরোটা খেয়ে ফেললি? সো স্যাড! এইজন্য বেচারি ধারা থমকে গিয়ে চমকে মুড অফ করে আছে। ”
শ্রাবণের এবার ইচ্ছে করলো নিজেকেই পেটাতে, না হয় ইকরাকে দশ তলা বিল্ডিং থেকে ছুঁড়ে ফেলে দিতে। কিন্তু কোনো টাই করতে না পেরে সে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। অথচ মনে মনে ধারা কে আবারো শাস্তি দেয়ার ষড়যন্ত্র করে ফেললো। সব এই মেয়েটারই দোষ! শ্রাবণ তো ছোট করে চুমুই চেয়েছিল। অথচ বেচারি ধারার মোচড়ামুচড়ি তে বিরক্ত হয়েই ঝড় বইয়ে দিয়েছে। এমনিতে অবশ্য, শ্রাবণ শেখ ইজ অলওয়েজ আ জেন্টেলম্যান। বউ টা বেয়াদবি না করলে শ্রাবণ শুধু চৌত্রিশ টা ছোট চুমু দিয়েই আসতো। সেটা আবারো ডাবল প্লাস দশ হয়ে আটাত্তর টা হতো না।

পাঞ্জাবি পছন্দ করা নিয়ে ভীষন সতর্ক সামিউল শেখ। এক্ষেত্রে তিনি অবশ্যই স্ত্রীর মতামতে গুরুত্ব দেন। কারন এই এতগুলো বছরের জীবনে তিনি এটা আবিষ্কার করতে পেরেছেন, স্ত্রীর পছন্দই অলওয়েজ বেস্ট। ফলস্বরূপ তিনি একা একা পাঞ্জাবি পছন্দ করতে গিয়ে এতিমের মত দাঁড়িয়ে থাকলেন। অপেক্ষা করলেন সালমা বেগমের জন্য। সালমা বেগমও ভেবেছিলেন রাগ দেখিয়ে আর পাঞ্জাবি পছন্দ করে দিবেন না। তবে তিনিও আর রাগ ধরতে পারলেন না। ইকরা আর ধারা কে শাড়ির কালেকশন দেখতে পাঠিয়ে শ্রাবণ কে নিয়ে সামিউল শেখের কাছে আসলেন। তবে এখানে এসে শ্রাবণও উপলব্ধি করলো আজ ধারার পছন্দে পাঞ্জাবি কেনা দরকার। সেও দেখতে চায় সামিউল শেখের মত সুপ্রসন্ন ভাগ্য তার কিনা। ধারার পছন্দ বেস্ট হয় কিনা। তাই সে আগে সামিউল শেখের পাঞ্জাবি কেনা নিয়েই ব্যস্ত থাকলো।

পৃথিবীর সবচেয়ে কষ্টের কাজ হলো একজন মানুষের প্রতি ভালোবাসা থাকা সত্ত্বেও তাকে নিজের মনে লুকিয়ে রেখে সারা জীবন একা একা কাটিয়ে দেয়া। যারা ভালোবাসে তারা বুকভরা ভালোবাসা নিয়েই ভালোবাসে। কারও ভালোবাসা একতরফা হয়, আবার কারো ক্ষেত্রে উভয় পক্ষের ভালোবাসাও থাকতে পারে। একতরফা প্রেমে কোনো প্রত্যাশা থাকে না, শুধু একরাশ অনুভব আর অজস্র চুপচাপ কষ্ট জমা হয় বুকে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় যন্ত্রণা হলো, ভালোবাসার মানুষটাকে অন্যের সাথে ভালো থাকতে দেখা, ভালোবাসতে দেখা। প্রেমে পড়া সহজ, কিন্তু সেই প্রেম যদি একতরফা হয়, তাহলে সেটা হয়ে ওঠে সবচেয়ে কঠিন অনুভবের নাম। ইকরার ক্ষেত্রে তা-ই হচ্ছে। সে যতই বাইরে থেকে রসিকতা করুক না কেনো! শ্রাবণের সাথে ধারার এই ভালোবাসার অনুভূতি গুলো দেখে, পাগলামো গুলো দেখে তার হিংসা হচ্ছে। বুকের ভেতর যন্ত্রণা হচ্ছে। কষ্টটা টের পাচ্ছে সে। তবুও বারবার নিজেকে সান্তনা দিয়ে দমে যাচ্ছে মেয়েটা। বারবার নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করল। তবুও, মন কি আর বাস্তবতা মানতে চায়? সে তো আবেগের কাঙাল! আবেগের ইশারায় চলে।
শাড়ি দেখতে এসে ইকরার বুকটা মোঁচড় দিলো। সে যেদিন এয়ারপোর্টে এসে নেমেছে, সেদিনই পরিকল্পনা করেছিল শ্রাবণের সাথে তার বিয়ে হলে এই দোকান থেকেই লাল রঙের শাড়ি কিনবে। অথচ..দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধারার কাছে গিয়ে দাঁড়ালো ইকরা। মিষ্টি হেসে বলল,

—” কোন শাড়িটা পছন্দ হয় দেখো?”
ধারাও হেসে তাকালো ইকরার দিকে৷ কিন্তু মন খারাপ করে বলল,
—” এত ভারি কাঁচের শাড়ি কখনো পড়িনি। এমনিতেই হাঁটতে পারি না। বুঝতে পারছি না কিছু। উনারা আসুক, তারপর পছন্দ করি।”

ইকরা মাথা নেড়ে সহমত প্রকাশ করলো। এরমধ্যেই ধারা ঘুরে দেখতে দেখতে একটা শাড়িতে চোখ রাখলো। তৎক্ষনাৎ চোখ আটকালো তার। একটু করে ছুঁয়ে দিলো ঝুলিয়ে রাখা শাড়িটা। মূলত শাড়িটা গাঢ় লাল, বা মেরুন বলা যায়। এক মুহুর্তের জন্য শাড়িটা পছন্দ হলো ধারার। শাড়ি টা হাতে নিতে চাইল। কিন্তু তখনি চোখে পড়লো তার কিছুটা দূরে একজন দম্পতি দাঁড়িয়ে শাড়ি পছন্দ করছে। স্বামী স্ত্রী দুজন, দেখেই বোঝা যায়। ধারা খেয়াল করলো মেয়েটার স্বামী নিজে থেকে শাড়ি মনোযোগ দিয়ে দেখে পছন্দ করছে বউয়ের জন্য। একটার পর একটা শাড়ি হাতে নিয়ে মেয়েটার গায়ে রাখছে, আবার হেসে হেসে কি যেন বলছে। দৃশ্যটা ভীষন মিষ্টি লাগলো ধারার কাছে। এক মুহুর্তের জন্য লোভও হলো। মন টা চাইলো এমন একটা মুহুর্ত নিজেদের মাঝে তৈরী করতে। শ্রাবণ কি তাকে পছন্দ করে শাড়ি কিনে দেবে? এমনটা কি হয়? মনে মনে এমন একটা আবদার পুষে রেখে নিজের পছন্দ করা শাড়িটা আর ছুঁয়েও দেখলো না ধারা। শ্রাবণের পছন্দ শাড়ি কিনতে চায় সে, সেই কথাই মনে মনে ঠিক করে রেখে ইকরার পাশে গিয়ে দাঁড়ালো।

ইকরা আশেপাশে তাকিয়ে বসার জায়গাটতে গিয়ে বসে পড়লে ধারাও বসে তার পাশে। ইকরা বড় করে শ্বাস নিলো। ধারার দিকে তাকিয়ে এবারে একটু হেসে জিজ্ঞেস করে,
—” আচ্ছা একটা প্রশ্ন করি?”
ধারা চমকে তাকালো। তারপর মুখে হাসি নিয়ে সাবলীল ভাবে বলল,
—” হুম করো।”
ইকরা অপ্রস্তুত হলো খানিকটা। আশেপাশে তাকিয়ে সতর্ক হয়ে বলল,
—”শ্রাবণ তোমায় খু্ব বেশি ভালোবাসে তাই না?”
ধারা প্রতিক্রিয়া দিলো না। তাকিয়ে রইলো চোখে একরাশ মায়া নিয়ে। এরপর সামনের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট কাঁমড়ে বলল,

—” খুব বেশি কিনা জানি না। কিন্তু হয়তো বাসে।”
বলে আবারো চিন্তিত হলো ধারা। ভাবলো কিছুক্ষন। এরপর ইকরার দিকে তাকিয়ে আঙুল দিয়ে ইশারা করে মিষ্টি স্বরে বলল,
—” একটু হলেও বাসে।”
ধারাকে বাচ্চার মত বলতে দেখে ইকরা ফিক করে হেসে ফেলল। চোখে এক আকাশ অভিমান লুকিয়ে ঠোঁট কাঁমড়ে বলল,
—” উহু। অনেকটাই ভালোবাসে। যতটা ভালোবাসলে জীবনে আর কিচ্ছুর প্রয়োজন হয় না, ঠিক ততটাই ভালোবাসে।”
ধারা এবারে সময় নিয়ে তাকালো ইকরার চোখের দিকে। ঠোঁট চেপে মলিন হেসে গম্ভীর কন্ঠে বলল,

—” মানুষের জীবন একটা পয়সার মত। এপিঠ ওপিঠ দুটো একই থাকে না৷ ভাগ্যের ক্ষেত্রেও একই ভাবে খাটে। এই ভালো, তো এই খারাপ। একটা সময় জুড়ে তুমি খুশিতে ছিলে, আর সেই সময়ে আমি ছিলাম জাহান্নামে। এখন ভালো সময় টা হয়তো আমার ভাগ্যে। তাই তুমি বাকিটা সময় অতীতের আমিটার প্রতিনিধিত্ব করবে।”
ভুমিকম্পের সময় এক মুহুর্তের জন্য পৃথিবী যেভাবে থমকে যায়, ঠিক সেভাবেই ইকরা এবং ধারার দৃষ্টি অন্যরকম এক সমীকরণে থমকে গেলো এক অপরের দিকে। ইকরার চোখে বিভ্রান্তি এবং ধারার চোখে মলিনতা। ধারার কথাগুলো ধরতে সময় লাগলো তার। ভয় পেলো খানিকটা। মনের লুকোনো অনুভূতি কি ধারা বুঝে ফেলল? সালমা বেগম তো বলেছেন এসব কখনোই শ্রাবণ বা ধারা জানতে পারবে না। তবে কেনো ধারার কথা শুনে মনে হলো যে ধারা সব জেনে বসে আছে আর সেটারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ইকরা চায় না শ্রাবণের সংসারে অশান্তি সৃষ্টি করতে। এসব কথা ধারা জানতে পারলে যে কতোটা অশান্তি নামবে তা সে ভালোই জানে। তাই ইকরা বিষয়টা সামাল দেয়ার জন্য কোনোমতে মাথা নেড়ে বলে উঠলো,

—” আমি বুঝিনি তোমার কথা!”
—” কিন্তু আমি বুঝেছি।”
ধারা ফট করে বলল।
অজান্তেই ইকরার হাত মুঠো হয়ে এলো। শুকনো ঢোক গিলে জিজ্ঞেস করল,
—” কী বুঝেছো?”
ধারা এবারেও হাসলো। আবারো অন্যদিকে তাকিয়ে মলিন হেসে বলল,
—” আমিও একটা মেয়ে ইকরা আপু।”
ইকরা চোখ খিঁচে বন্ধ করলো। সে বুঝতে পারছে না ধারার মনোভাব। তবে কথাটা ভীত করে তুলল তাকে। অন্যদিকে চোখ ফিরিয়ে এড়িয়ে গেলো ইকরা। ধারার মলিন হাসিটা দীর্ঘ হলো। আর কিছু বলল না।
শ্রাবণ আর সালমা বেগমকে দোকানে ঢুকতে দেখা গেলো। তৎক্ষণাৎ ধারা আবারো আগের মত মিষ্টি হেসে তাড়া দিয়ে বলল,

—” ওইতো উনারা চলে এসেছেন। চলো যাই এবার।”
অপেক্ষা না করেই শ্রাবণের কাছে চলে গেলো ধারা। কিছুক্ষণ থম মেরে বসে থাকলো ইকরা। এরপর নিজেও উঠে গেলো। ধারা শ্রাবনের পাশে এসে দাঁড়িয়ে বলল,
—” আপনি পাঞ্জাবি কিনলেন?”
শ্রাবণ কিছু বলার আগেইসালমা বেগম মুখ কুঁচকে বললেন,
—” নাহ। কিনে নি।”
ধারা অবাক হলো,
—” কেনো?”
সালমা বেগম কিছু না বলে ইকরা কে ইশারা করে শাড়ির কালেকশনের দিকে গেলেন। ওরা চলে যেতেই ধারা আবারো জিজ্ঞেস করলো শ্রাবণকে,

—” আপনি পাঞ্জাবি কিনলেন না কেনো? গায়ে হলুদ আর বিয়ের দিনের জন্য দুটো পাঞ্জাবি তো কিনতেই হবে। শার্ট পড়ে তো যাওয়া যাবে না। কিনেন নি কেনো?”
শ্রাবণ এবারে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বললো,
—” বউ থাকতে আমি নিজে কেনো পাঞ্জাবি পছন্দ করে কিনব। সবার কেনাকাটা শেষ হোক। এরপর তুমি গিয়ে পছন্দ করে দেবে। তখন কিনব।”
শীতল হাওয়া বয়ে গেলো ধারার মনের কিনার দিয়ে। সে এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে লজ্জা পেলো বোধহয়। মাথা নিচু করে ছোট করে বলল,
—” ওও। আচ্ছা। ”
শ্রাবণ খুশি হলো না এটুকু কথায়। একটু খোঁচা দিয়ে বলল,

—” কেও একজন বলেছিল সাদা শার্টে আমায় ভালো লাগে। কিন্তু কখনো তো বলেনি যে কোন রঙের পাঞ্জাবি তে ভালো লাগে। তাই বাধ্য হয়ে সেই কেও একজনের দরবারে এসেছি। নইলে কিনে ফেলতাম!”
ধারা চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করলো। এবং খানিক সময়ের মধ্যে বুঝেও ফেলল। মনে পড়লো সেই দিনের কথা। ইশ! তখনো কি সে ভেবেছিল যে এই মানুষটা তাকে আগলে রাখবে? তাদের সংসার হবে। তারাও স্বাভাবিক জীবনযাপন করবে। সেসব কথা মনে পড়তেই ধারা আবেগি হয়ে পড়লো।
শ্রাবণ বুঝলো। তাই সেসব কথা মনে করাতে চাইলো না আর। এড়িয়ে যেতে জিজ্ঞেস করলো উল্টো,
—” তুমি কোন শাড়ি পছন্দ করলে?”

এবারে চমক খেলো ধারা। কি আশ্চর্য! ধারা এইমাত্র উপলব্ধি করল যে তারা দুজনই একই মনোভাব পোষণ করে কেওই শাড়ি পাঞ্জাবি দেখেনি। এটা কি মনের মিল? ধারার হাসি পেলো বোধহয়। মাথা নিচু করে হেসেও নিলো। এরপর শ্রাবণের দিকে তাকিয়ে সাহস করে শ্রাবণের সুরেই বলল,
—” স্বামী থাকতে আমি নিজে কেনো শাড়ি পছন্দ করব? আপনি নিজে গিয়ে পছন্দ করে কিনে দেবেন। এদিকে দুঃখের কথা হলো, আমাকে কেও তো কখনো বলেই নি যে আমায় কোন রঙের শাড়িতে ভালো লাগবে। তাই বাধ্য হয়ে স্বামীর দরবারে হাজির হতে হলো।”
শ্রাবণ চোখ সরু করে তাকালো ধারাার দিকে। হাসি পেলো খুব। বউ টা দিন দিন বড়দের মত কথা বলা শিখেছে। কথা প্যচাতেও শিখেছে। সে কোনোমতে হাসি আটকে ঠোঁট টিপে হেসে স্বান্তনা দিয়ে বলল,

— হুম। খুবই মর্মান্তিক ঘটনা। সমবেদনা প্রকাশ করছি। আপনার কেও একজন তো খুবই নিষ্ঠুর!”
ধারা উদগ্রীব হলো,
—” তা তো অবশ্যই। আর, আপনার কেও একজন কেমন?”
শ্রাবণ নাক মুখ কুঁচকে বলল,

শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ৪১

—” মন্দ নয়। সে শুভ্র, নির্মল, নিষ্পাপ ফুলের মত। নীল আকাশের মেঘের মত। ডানা মেলে উড়তে থাকা পায়রার মত। পদ্মভরা নদীর মত। সাদা গোলাপের মত। সর্বোপরি, আমার কেও একজন ভীষন সুন্দর। ভীষন আদুরে।”
ঘোর লাগা দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে ছিল ধারা। পুরোটা সময় হতবাক হয়ে শুনলো শ্রাবণের কথাগুলো। কথা গুলো কি ধারার উদ্দেশ্যে ছিল না? এগুলো দিয়ে কি ভালোবাসা টা প্রকাশ করেনি শ্রাবণ? করেছে। করছে।এভাবেই হাজারবার করেছে। আর ততবারই ধারা মুগ্ধ হয়েছে। হারিয়ে গিয়েছে।

শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ৪৩