Home শ্রাবণ ধারার রূপকথা শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ৯

শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ৯

শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ৯
অনামিকা তাহসিন রোজা

পৃথিবীতে যত ধ্বংস নেমে এসেছে, তার মনে হয় অর্ধেক হয়েছে শুধু মিথ্যা নামক এক অদেখা বস্তুর জন্য। আর সরল চিত্তের ধারা যতই যা হোক না কেনো? মিথ্যা জিনিসটিকে খুব বাজে ভাবে ঘৃণা করে। অথচ এখন সে জানতে পেরেছে তার চাচা মিথ্যে বলে তাদেরকে গ্রামে আনিয়েছে।
শ্রাবণ সকাল সকাল নিজেকে অকর্মার ঢেঁকি হিসেবে আবিষ্কার করেছিল। খাওয়া-দাওয়ার পর তার কোনো কাজ না থাকায় লিজান, সাইম আর সাদিকের সাথে গ্রামটা ঘুরে ঘুরে দেখতে বেরিয়েছে সে। যাওয়ার আগেই অবশ্য খাওয়ার পর্ব শেষ।

এদিকে দুপুরে এক বড়সড় ভোজের জন্য করিম সাহেব বাজার করে এনেছেন। সেটারই আয়োজন করতে ব্যস্ত কনিকা, ধারা আর সোহাগি বেগম। সাদামাটা একটা শাড়ি কোনোভাবে শরীরের সাথে পেঁচিয়ে পিড়িতে বসে সবজি কাটছে ধারা। গ্রামে তো শাড়ি ছাড়া অন্য কিছু পড়া যাবেনা। লোকমুখে কথা হবে৷ তাই উপায়ন্তর না হয়ে শাড়িই পড়েছে ধারা, সাহায্য নিয়েছে কনিকার। এদিকে কনিকাও ধারার পাশে বসে মরিচ পেঁয়াজ কাটছে। মূলত তিনজনই একসাথে উঠানে বসেছে দুপুরের রান্নার আয়োজন করতে।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

মুরগি ধুতে থাকা সোহাগি বেগম কপাল কুঁচকে বারবার ধারার দিকে তাকাচ্ছে। সে আসলেই ভেবেছিল শহরে গিয়ে হয়তো ধারা কাজের মেয়ের মত জীবনযাপন করবে। যতই ভালো পরিবার হোক না কেনো? শ্বশুরবাড়িতে নিশ্চয়ই তথাকথিত অবহেলিত হতে হবে মেয়েটাকে। কিন্তু প্রত্যাশিত কোনো কিছুই দেখতে পাচ্ছেন না সোহাগি। ধারার চেহারা দেখে মোটেই মনে হচ্ছে না যে সে খারাপ আছে, বা তাকে অ”ত্যা”চার করা হয়েছে৷ আর শ্রাবণকে দেখেও অনেক অবাক হয়েছেন তিনি। ছেলেটার ভদ্র নম্র ব্যবহার, ধারার প্রতি নমনীয়তা সবকিছুই লক্ষ্য করেছেন তিনি।
সোহাগি বেগমের জায়গায় ধারার মা থাকলে হয়তো এসব দেখে লাখ লাখ শুকরিয়া আদায় করতেন, খুশিতে বুকে প্রশান্তি পেতেন। হয়তো চাচি হিসেবে সোহাগিরও উচিত ছিল একই রকম প্রতিক্রিয়া দেয়ার। কিন্তু বাস্তবতা তো ভিন্ন! হিংসেতে জ্বলছেন মহিলা! বিরক্ত লাগছে তার! নেহাত স্বামীর মার খাওয়া থেকে বাঁচতে রান্নাবাড়ি করে আপ্যায়ন করছেন তাদের। কিন্তু নিজের মেয়ে কনিকার ভবিষ্যতে কি এমন স্বামী, শ্বশুরবাড়ি থাকবে? নিশ্চয়তা আছে? নেই! সব ভেবে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিরক্তিতে মুখ কুঁচকেই রইলেন সোহাগি বেগম।
সবজি কাটার এক পর্যায়ে কিছু একটা মনে পড়লো ধারার। সবজি কাটার হাতটা সহসা থামলো। ভ্রু কুঁচকে ব্যস্ত চাচির দিকে তাকিয়ে ধারা ব্যকুল কন্ঠে বলে উঠলো,

—” ছোট মা, চাচ্চু যে বলেছিল ফুফু এসেছে বাড়িতে। ফুফু কে তো বাড়িতে এখনো দেখলাম না!”
এ পর্যায়ে তড়াক করে দৃষ্টি ফেললেন সোহাগি বেগম। বাজখাঁই গলায় বলে উঠলেন,
—” ক্যান রে? ওই শাকচুন্নি মহিলার জন্যে এত দরদ ক্যা তোর? ওয় আইলে তো তোর ভালাই হয় তাই না? বসে বসে কুটনামি করতে পারোস তোরা দুইজন মিইল্লা! বুঝিনা কিছু ভাবছোস?’
কনিকা নিত্যকার চেঁচামেচি শুরু হওয়ার আভাস পেয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এদিকে ঘৃণার সহিত বলা কথাগুলো গায়ে মাখালো না ধারা। ছোট থেকে শুনতে শুনতে অভ্যস্ত সে। কিন্তু ফুফুর বিষয়টা এখনো পরিষ্কার ভাবে ধরতে না পারায় ধারা আবারো ঠোঁট ভিজিয়ে মাথা নামিয়ে বলল,

—” চাচ্চু শহরে ফোন করে বলেছিল যে ফুফু আসছে। আমি এই কারনে জিজ্ঞেস করলাম। ফুফু কি…
ধারার কথা শেষ হওয়ার আগেই সোহাগি বেগম এবার বলে উঠলো,
—” আসেনাই ওই মহিলা। তোর চাচা মিথ্যা কইছে, হইছে? চুপ থাক, কাটাকুটি শেষ কর! ভাবিস না যে তুই শহরে গেছোস বইলা তোরে খুন্তি দিয়া পিডাইতে পারুম না? এক্কেরা ঠ্যাং ভাইঙ্গা ফেলমু মুখের তেজ দেখলে!”
অত কথা শুনলো না ধারা। শুধু মিথ্যা — শব্দটা মাথায় বেজে উঠলো ওর। হাতের ছুরিটা মাটিতে রেখে সে এবার সোজা হয়ে বসল। খানিক জোরেই বলে উঠলো,

—”কী বলছো এসব ছোট মা? মিথ্যা বলেছে মানে? ফুফু আসেনি ভালো কথা, কিন্তু মিথ্যা বলেছে কেনো? আর ফুফু আসেই নি বা কেনো? ফুফু তো বলেছিল বিয়ের পরে যখন এ বাড়িতে ঘুরতে আসব তখন আমায় দেখতে আসবে!”
ধারার গলা যেন একটু বেশি জোরে বেরিয়ে গেল। এ কথাটা বলার পরই চারপাশে হঠাৎ একটা থমথমে নীরবতা নেমে এলো। কনিকা থমকে গেল।
সোহাগি বেগম এবার চোখ কুঁচকে তাকালেন ধারার দিকে। কাটা মুরগির ভেতর থেকে হাত টেনে বের করে কাঁথার পাশে হাতটা ধুয়ে ফেললেন। তারপর রীতিমতো গর্জেই উঠলেন,

—”অ্যাই! কি কইলি তুই? এত বড়সড় গলা কই থাইকা আইলো তোর রে? মুখে দুধের ঘ্রাণ না গ্যাছে, সেই মুখ দিয়া আমারে প্রশ্ন করোস? আমি তোদের লালন পালন করছি, পেট কেটে খাইয়াছি, আর এখন তুই আমারে জিজ্ঞেস করিস তোর ওই বা”লের ফুফু ক্যান আয়নি!”
ধারা মাথা নিচু করে ফেলেছিল এক মুহূর্তের জন্য। কিন্তু পরমুহূর্তে আবার মুখ তোলে, স্থির চোখে তাকায় ছোট মা’র চোখে। ফুফু আসেনি, এটা নিয়ে কোনো সমস্যা নেই ধারার। সমস্যা টা হচ্ছে মিথ্যা কথাটা নিয়ে। ধারা চেনে তার এই চাচার পরিবারকে। আর সে খুব ভালো করেই জানে কোনো কারণ ছাড়া এভাবে মিথ্যা কথা বলার মানুষ না তার চাচা-চাচি। নিশ্চয়ই এতে কোনো সুপ্ত স্বার্থ লুকিয়ে আছে, কোনো স্বার্থ ছাড়া এমন কথা বলাটা মোটেই স্বাভাবিক নয়। তাই ধারা নিজেকে ধাতস্থ করে বলল,

—” তুমি কথাটা ঠিকঠাক বোঝোনি চাচি! ফুফুর আসার সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু মিথ্যা বলেছো তোমরা, এর কারনটা কি? বলো! তোমরা এভাবে এত বড় একটা মিথ্যা বলবে, সেটা আমি মুখ বুঁজে মেনে নেবো না।”
কনিকা হতভম্ব হয়ে তাকালো ধারার কথা শুনে। আগে কখনো এমন কথা বলেনি ধারা। যদিও খুব নরম স্বরে বরাবরের মত দুর্বল চিত্তেই বলেছে। কিন্তু অনেক কঠিন কথা বলেছে বটে, তাই এই কথাগুলো শোনার সাথে সাথে সোহাগি বেগম যেন জ্বলে ওঠেন। ধুপ করে উঠানে বসে বললেন,
—”ওই হারামজাদি! তুই এত সাহস কোথা থাইকা পাইলি রে? শহরের হাওয়া খাইয়া পাখনা গজাইছে তোর? এখন তুই আমার মুখে মিথ্যার দোষ দিবি? আমারে কিছু কবিনা তুই! তোর চাচা রে গিয়া ক যা। আমি কিছু কইনাই৷ আর, তুই তো ওই মহিলার ল্যাজ ধরে ঘরে ঘরে ঘুইরা ফিরবি, আমি তোকে চিনি না? আহারে! কত মায়া রে তোর ওই ফুফুর জন্য!”

ধারা এবার দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিঃশব্দে উঠে দাঁড়ায়। তার চোখ ঠাণ্ডা, কিন্তু গলার স্বর অসাধারণ ঠান্ডা ও সাহসী,
—”হ্যাঁ, মায়া আছে। কারন উনি একমাত্র মানুষ যিনি আমার সাথে কখনো তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেননি। কখনো তোমাদের মত বেইমানি করেননি। তোমাদের মিথ্যার আগুনে আমি পুড়েছি, কিন্তু ফুফু আমার পাশে ছিল ছায়ার মতো। আর…..!”
একটু থেমে ধারা শুকনো ঢোক গিলল। বলতে ভয় লাগছে তার। কিন্তু কেনো যেন তার আজ বলতে ইচ্ছে করছে। চুপ থাকতে থাকতে ক্লান্ত সে। কেনো যেন আজ নিজেকে অসহায় মনে হচ্ছে না, বারবার মনে পড়ছে বাবা রূপে পাওয়া সামিউল শেখের স্নেহ আর মা রূপে পাওয়া সালমা বেগমের ভালোবাসার কথা। ওসব ভেবে নিজেকে শক্ত লাগছে তার। তাই বুকের ভেতর থাকা কথাটা বলেই ফেলল ধারা,

—” আর আমি খুব ভালো করেই জানি, তুমি বা চাচা কেও কখনো কোনো স্বার্থ ছাড়া কাজ করোনা। তোমরা জানো যে ফুফুর কথা বললে আমি গ্রামে আসবোই, ফুফুর টানে হলেও আমি গ্রামে আসব। অবশ্যই আসব। হয়তো তাই তোমরা ফুফুর প্রসঙ্গ এনে শহরে কল করে জানিয়েছো। এছাড়াও যেখানে এতগুলো বছর আমাকে একটা রুটি খাওয়াতেও তোমার কলিজা ছিঁড়ে যেত, আমায় ঠিকঠাক খেতে দিতে না, সেখানে আমার সাথে একজন অতিথি সহ তোমরা গ্রামে দাওয়াত করলে। যতই নিয়ম হোক, তোমরা তো এসব অবজ্ঞা করতে। কোনোমতে আমার বোঝা নামাতে পারলেই বাঁচো। অথচ এখন হাতভর্তি করে বাজার করে করে রান্নাবান্না করে খাওয়াচ্ছো। বিষয়টা খুব অবাস্তব! আর এতেই বোঝা যায়, আমাকে গ্রামে আনার পেছনে নিশ্চয়ই তোমাদের কোনো স্বার্থ আছে।”
ধারার কথার শেষে একটা ভারি নিস্তব্ধতা নেমে এলো উঠানে। বাতাস থমকে গেল যেন। পাশে বসা কনিকা অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে ধারার দিকে,চোখে শঙ্কা, কিন্তু কোথাও কোথাও একটু গর্বও। এতদিন ধরে যে ধারা অন্যায়ের প্রতিবাদ না করে মুখ বুজে সহ্য করে গেছে, সেই ধারা আজ মুখ খুলেছে। এই মুখ খোলাটা ছিল সময়ের ব্যাপার মাত্র। ধারা যে এত কথা বলতে পারে তা জানা ছিল না কারোরই।

কিন্তু এসব আর সহ্য করতে পারলেন না সোহাগি বেগম। ধারার মুখে এমন সাহসী অথচ নির্দয় সত্যগুলো শুনে সোহাগি বেগম যেন ভিতর থেকে কাঁপতে লাগলেন।যাকে এতকাল ধরে চেপে, চাপা দিয়ে রেখে এসেছেন, সেই মেয়েটা আজ দাঁত বের করে কথা বলছে! চোখে চোখ রেখে, অভিযোগের ঝাঁজে চৌচির করে দিচ্ছে তার দম্ভ। এমনিতেই ধারার উপর গোপন ক্ষোভ টার জন্য তার মাথা ঠিক ছিল না, তার উপর সবসময় মুখ বুঁজে সবকিছু সহ্য করা ধারার মুখে এমন অপ্রিয় কথাগুলো শুনে তিনি খেঁই হারালেন, মুখটা রক্তলাল হয়ে উঠল। চোয়াল শক্ত করে ক্ষিপ্ত জন্তুর মত ছুটে এসে হাতের কাছে থাকা চুলার পাশের কাঠের টুকরাটা দিয়ে জোরে আঘাত করলেন ধারার মাথায়। কনিকা বিস্ময়ে হাঁ করে তাকিয়ে রইল। কিছু বোঝার আগেই সব হয়ে গেল। সমস্ত শব্দ থেমে গেল। পাখির ডাকও যেন স্তব্ধ।

ধারা ছিটকে পড়ে গেলো পিঁড়ির উপর, তৎক্ষনাৎ মাথায় এক হাত রেখে চাপা আর্তনাদ করে উঠলো। চোখমুখ কুঁচকে মাটিতে হাত রেখে ভর দিল সে। কাঠের টুকরো খানিক নরম ছিল, তাই বড়সড় আঘাত লাগেনি মাথায়। কিন্তু ব্যাথা পেয়েছে ধারা। পুরো মাথা ভনভন করতে শুরু করল তার। চোখ খুলতে পারছেনা সে। কনিকা বিস্ময়ে দুহাত দিয়ে মুখ চাপলো। পরমুহুর্তে তড়িঘড়ি করে ধারার দিকে ছুটে আসে, গলা ধরে চিৎকার করে ওঠে,
—” বুবু! আল্লাহ কি হইলো! ও বুবু!”

তার কণ্ঠে ভয়, হতবাক দিশেহারা এক যন্ত্রণার আঁচ। ধারার চোখ আধখোলা। সে বুঝে উঠতে পারছে না ঠিক কী ঘটেছে। কানে শুধু কনিকার চিৎকার আসছে, কিন্তু শব্দগুলো কেমন ফাঁকা মনে হচ্ছে। চুলের ফাঁক দিয়ে রক্তের ছোট্ট ধারা বেয়ে নামল কপাল বেয়ে গাল ছুঁয়ে মাটিতে।
সোহাগি বেগম তখনও দাঁড়িয়ে, হাত কাঁপছে তাঁর, কিন্তু চোখ দুটোতে দাপট। যেন জয়ী হয়েছেন। তবুও তাঁর নিশ্বাস হাঁপানোর মতো, রাগ আর ভয় একসাথে গলার ভেতর দলা পাকিয়ে বসে আছে।
ধারা জ্ঞান হারায়নি। সে কোনোমতে মাথায় ব্যাথা পাওয়া জায়গাটায় হাত রেখে চেপে তাকালো সোহাগি বেগমের দিকে। কনিকা বলতে থাকলো,

—” ও বুবু, ঠিক আছো তুমি?”
ধারা কিছু বলল না। ছলছল চোখে তাকালো ছোট মা’র দিকে। সোহাগি বেগম এবার দাঁড়িয়ে হুংকার দিয়ে ওঠেন,
—” হারামজাদি, শু”য়োরের বাচ্চা, তোর ভাষা তো অনেক বড় হইছে! তোকে ঠিক ঠিক জায়গায় আনতে হইব আমার! তোদের মত এতিমের তেজ বেশি দিন ঠিক থাকে না রে, বুইঝা ল! এমন বেয়াদব মাইয়া আর দেখিনাই রে আল্লাহ! মুখের সামনে আমারে উপদেশ দেয়! বড় হইছে শহরে গিয়া, তাই না? মুখে মুখে কথা কয়! তোকে কত সহ্য করলাম, এতক্ষন কিছু বলি নাই বইলা ভাবছোস আমি বোবা? ভাবছোস আমি দয়ালু হইয়া গেছি ?”
এইসব কথা কনিকা অসহায় চোখে শুনে যাচ্ছিল। কিছু বলার সাহস পাচ্ছিল না। এতোদিনের অভ্যাস তার, কিন্তু আজ সে দেখলো, ধারা আর সেই আগের ধারা নেই। সেই মেঘলা মেয়েটা আজ গর্জে উঠছিল। মাথা নিচু নয়, চোখে চোখ রেখে জবাব দিচ্ছিল।

এবার আর ধারা কিছু বলল না। মাথাটা জ্বলে যাচ্ছে তার। হয়তো ফুলে যাবে কিছুক্ষণ পর। ভাগ্যিস একদম কপালে লাগেনি। নইলে সহজেই দেখা যেত। সোহাগি থেমে গেলেন এক মুহূর্ত, কিন্তু চোখের আগুনে যেন ঘি পড়লো। তারপর আরও জোরে গর্জে উঠলেন,
—”তোরে উঠাইয়া আনছি, ঘরে খাওন দিছি, গায়ের কাপড় দিছি! শহরে জায়গা পাইছিস তো এখন বড় বড় কথা কস! আমারে ঠকাইছস তুই, তোর চাচারে ঠকাইছস! হ্যাঁরে, ফুফু ফুফু কইস! ওই শাকচুন্নি পুরাই বিষ! আমার বাড়িত কেউ আসুক তা আমি চাই না। তাই মিথ্যা কইছি! আরেকটা কারনে মিথ্যা কইছি,, ওইডা তোর রক্তের চাচার কাছে শুইনা ল! এখন তুই যা পারিস কর!”

কনিকা এবার সাহস করে দাঁড়ালো, কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,
—”মা, তুমি একটু ঠাণ্ডা হও। এত রাগ করে কি হবে? বুবুর মাথা থেকে তো রক্ত পড়তেছে!”
সোহাগি বেগম চট করে কনিকার দিকে তাকালেন, এমন দৃষ্টিতে যেন তাকেও ছুড়ে ফেলবেন,
—”তুই চুপ থাক বেয়াদব! ওর দেইখা এইসব শিখছোস তুই. এখন তুইও ওর পক্ষে? তোদের পড়াইছি, কইছিলাম মুখের উপর কথা কইতে?”
এতক্ষণ চুপচাপ ব্যথায় কুঁকড়ে থাকা ধারা এবার আস্তে করে সোজা হয়ে বসল। চোখে পানি, ঠোঁট কাঁপছে। তারপর এক নিঃশ্বাসে বলল,

—”তোমরা আমাকে শুধু শরীরের ক্ষত দাও নি ছোট মা। আমার আত্মাকে কষ্ট দিয়েছো। আজ বুঝলাম, রক্তের সম্পর্ক থাকলেই কেউ আপন হয় না। ফুফু যদি আজ এখানে থাকতেন, হয়তো এমন আঘাতও হজম করতাম হাসিমুখে। কিন্তু তার নামেই তোমরা আমাকে ঠকিয়েছো। ফুফু তো নেই, কিন্তু আজ আমি নিজে নিজের পাশে আছি। এতদিন না বলার জন্য লজ্জা পাই। আজ যদি কিছু একটা বদলাতে পারি, তাহলে সেটাই হবে আমার আসল প্রতিবাদ।”
সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়। মাথা ঝুঁকে পড়ছে একপাশে, কিন্তু দৃষ্টিটা তীক্ষ্ণ। এই দৃষ্টিতে ভয় নেই, আত্মবিশ্বাস আছে, অদ্ভুত এক অশ্রুভেজা সাহস আছে। তারপর সে বলল,

—”আমি আর এই উঠানে এক মুহূর্তও থাকবো না। যেখানে মানুষকে মানুষ মনে করা হয় না, সেখানে থাকা মানেই নিজের অস্তিত্বকে অপমান করা।”
ধারা কনিকার হাত ধরল। কনিকা অবাক হয়ে তার দিকে তাকালো। জীবনে কখনো এমন কথা শোনেনি সে। সত্যিই হতবাক হয়ে যাচ্ছে ধারার অভিব্যক্তি দেখে। মেয়েটা কীভাবে পারছে এভাবে কথা বলতে! হুট করে এই সাহস কোথা থেকে আসলো তার!
সোহাগি বেগম এবারও রক্তচক্ষু নিয়ে তাকিয়ে ঘরের ভেতর ঢুকে গেলো। এসবে তার কোনোকিছু যায় আসেনা। কনিকা এবার তড়িঘড়ি করে ধারাকে ধরে বলল,

—” ও বুবু, কই যাবা তুমি? এত তাড়াতাড়ি চলে যাইয়োনা? সত্যিই চলে যাবা?”
মাথায় তীব্র যন্ত্রনা নিয়েই ধারা মিষ্টি হেসে কোনোমতে বলল,
—” সত্যিই আমি আজই এখান থেকে চলে যাব রে। গ্রামে এসেছিলাম আপন মানুষদের সাথে দেখা করতে। সাইম, লিজান, তুই, সবার সাথেই তো দেখা হলো। এখন ফুফুর বাড়িতে যাব, বাকি পাঁচটা দিন ওখানেই থাকব। আমি এখানে থাকতে চাইনা কনিকা!”
কনিকা এবার বিস্ময় ভরা চোখ নিয়ে জানতে চাইলো,

—” বুবু, তুমি অনেক বদলাইছো! কী করে এমন হইলা তুমি? আগে তো কথাই বলতানা? তুমি কেমনে? ”
ধারা ঠোঁট ভিজিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে আসলে নিজেও জানে না কেনো তার কথা বলতে ইচ্ছে হলো। কিন্তু শান্তি লাগছে তার। কনিকার চোখের দিকে তাকিয়ে হালকা মাথা নাড়ল ধারা। তারপর নরম কিন্তু দৃঢ় গলায় বলল,
—” আমি জানি না কনিকা, তবে হয়তো আমি আগের মতো নেই রে। একটু বদলাচ্ছি। কারণ আমি এখন বুঝি, চুপ থাকা মানেই সহ্য করা না, চুপ থাকা মানেই সম্মান রক্ষা না। বরং চুপ থাকলে মানুষ মুখেই ধুলা ছুঁড়ে চলে যায়। আমি চুপ থেকেছি অনেক দিন, অনেক বছর। ভেবেছি, তুই চাচা, ছোট মা, তোরা আমার পরিবার। যত কষ্টই দাও, নিশ্চয়ই একটা দিন ভালোবাসা পাবো। কিন্তু বিশ্বাস কর,পরিবার কী, ভালোবাসা কী — এসব আমি ওই শেখ বাড়িতে গিয়ে বুঝেছি। মাত্র দুদিন থেকেই আমি বুঝেছি যে আসলে পরিবার কেমন হয়!”

সে একটু থামল। মাথার যন্ত্রণায় চোখ কুঁচকে গেল, কিন্তু কণ্ঠটা ভাঙল না। আরও গম্ভীর হল।
—” জানিস, মানুষ যখন অমানবিক আচরণ করে, তখন সে কখনো আপন হয় না। তখন তার সাথে সম্পর্কের নামে জীবনটা কাটানো পাপ হয়ে যায়। আমি এখন এটা বুঝি, কারণ আমি শহরে গিয়ে এমন একটা পরিবার পেয়েছি, যেখানে আমাকে কেউ অপমান করেনি। মা, বাবা, ওনারা না হয় আমার জন্মদাতা না, কিন্তু ভালোবাসার কোনো অংশে কম নন। তারা আমাকে মাথা নিচু করতে শেখাননি, শিখিয়েছেন চোখ তুলে দাঁড়াতে। জানিস, উনারা আমাকে খুব আদর করে, আমায় ভালোবাসে! উনারা আমাকে একটা ঘরও দিয়েছে জানিস কনিকা! অনেক সুন্দর একটা ঘর দিয়েছে। আমায় খেতেও দিয়েছে। ছোট মা তো এ বাড়িতে তোকে আর ভাইদুটোকে বেশি ভালো খাবার দিয়ে আমায় বাসি খাবার খেতে দিত, তোদের এঁটো খাবার খেতাম আমি। জানিস তখনও বুঝতাম না আমি..কেনো আমি সস্তা, কেনো আমি আলাদা। কেনো? অথচ ও বাড়িতে আমাকে আর বাকি সদস্যের মতোই দেখা হয়েছে!”

বলতে বলতেই গলা ভেঙে এলো ধারার। চোখ দিয়ে ইতোমধ্যেই পানি পড়া শুরু করেছে। গাল ভিজে গেল মুহুর্তেই। কিন্তু ধারা সেসব দেখলো না। নাক টেনে চোখ মুছলো দুহাতে, কান্নারত কন্ঠেই আবারো বলতে শুর করল,
—” আর..আর ওই যে আমার সাথে যেই লোকটা এসেছে। যার সাথে আমার বিয়ে হয়েছে। জানিস, উনিও খুব ভালো মানুষ। উনি তো বলে যে আমায় নাকি বউ হিসেবে মানে না, কিন্তু অদ্ভুত ভাবে মুখে ওসব কথা বললেও আমার মনে হয়, স্বামী হিসেবে যা করণীয়, তার থেকেও বেশি কিছু করেছে আমার জন্য। তার চোখে আমি একজন স্ত্রী না হলেও অন্তত একজন মানুষ। তোর মনে নেই,আমার বান্ধবী সুফিয়া যে বিয়ে করল।

ওকে তো ওর বর নাকি প্রতিদিন অনেক মা”রধর করে। অনেক অনেক অত্যাচার করে। বিয়ের রাতে নাকি জোর করে পুরো শরীরে আ”ঘাত করেছে। অথচ জানিস কনিকা, এই লোকটা আমায় একটুও মারেনি। ফুলের টোকাও দেয়নি। এতদিনে আমি বুঝেছি,স্বামী মানেই গায়ে হাত তোলা নয়, চিৎকার করা নয়, সারাক্ষণ ছোট করে কথা বলা নয়। উনি কখনো আমার গায়ে হাত তোলেনি… কখনো নিজের রাগের ভার আমার উপর ফেলেনি। উনি তো আমাকে মেনে নেয় নি। এই রাগ উনি আমার উপরে কিন্তু দেখায় নি। একবারও বলেনি তুমি কেনো আমায় বিয়ে করলে, তোমার জন্য আমার জীবন শেষ। উহু, বলেনি! শুধু নিজের বাবা মাকেই বারবার বলেছে, রাগ দেখিয়েছে। কিন্তু আমায় দোষারোপ করেনি! উনি আমাকে সম্মান দিয়েছে, চুপচাপ পাশে থেকেছে। আমরা তো ভাবতাম, এমন মানুষ শুধু গল্পে থাকে? তুইও তো ভাবতি, তাইনা বল! কিন্তু না কনিকা, বাস্তবে থাকে। এমন মানুষ আছে বলেই পৃথিবী এখনো আছে। শুধু ভাগ্য সব্বার হয় না। খুব কষ্ট করে হলেও আজ একটা সত্যি শুনে নে কনিকা, রক্তের সম্পর্ক নয়, ভালোবাসাই মানুষকে মানুষ করে।”

ধারা কথা শেষ করতেই কনিকা আবিষ্কার করল যে সেও কাঁদছে। তারও চোখ এবার একদম ছলছলে। সে ঠোঁট ভিজিয়ে ফিসফিস করে বলল,
—”তুমি ভাগ্যবতী বুবু। সত্যিই ভাগ্যবতী…”
ধারা হালকা হাসে। চোখে জল, কিন্তু হাসিটা অদ্ভুত সুন্দর।
—”ভাগ্যবতী? জানিনা, আগে বললে প্রতিবাদ করতাম। কিন্তু এখন বোধহয় হতেও পারি। জানিস কনিকা, আমি এখন বুঝতে পারছি নিজের কদর কীভাবে রাখতে হয়। সেটা শিখেছি শহরে গিয়েই। আগে জানতাম না বলেই এত বছর নিজেকে অবহেলা করেছি। এখন আর না। কেউ যদি সম্মান না দেয়, তাহলে আমি তাদের প্রিয় হবার লড়াইও করবো না। এখন আমি শুধু এমন জায়গায় থাকতে চাই, যেখানে আমাকে মানুষ ভাবা হবে।”
ধারা এবার এগিয়ে গিয়ে ঘরের কোণ থেকে তার ছোট ব্যাগটা টেনে নিয়ে এলো। ব্যাগটা খুব ভারী না, তেমন কিছু নেই তাতে। এরপর কনিকাকে উদ্দেশ্য করে বলল,
—” লিজান, সাইম কে নিয়ে উনি কোথায় গেছে রে? যা তো, সবাইকে ডেকে আন!”

কনিকা ভেবেছিল ধারার বান্ধবী জান্নাতি কেও ডেকে আনবে একবার দেখা করানোর জন্য। কিন্তু শেষে জানতে পারল জান্নাতি নাকি শ্বশুর বাড়িতে একটু অবাকই হলো কনিকা। কিন্তু কিছু তো করার নেই। তাই সাদিকের বাবার ধান খেতে পা বাড়ালো। ধীরে ধীরে মাটির ছোট্ট পথ ধরে এগিয়ে চলল সাদিকের বাবার ধানখেতের দিকে। বাতাসে ধানের কচি গন্ধ, ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধ, আর সঙ্গে মিশে থাকা একটা অদ্ভুত চুপচাপ রোদ যেন তাকে কেমন ভারি করে তুলল। মাথার ভিতর জট পাকানো চিন্তা, ধারার রক্তমাখা মাথা, সেই তীক্ষ্ণ অথচ শান্ত দৃষ্টি, সব কেমন গোলমাল লাগিয়ে দিয়েছে তার ভিতরে। যতই পায়ের গতি বাড়ায়, ততই বুকের ভেতরটা চিনচিন করে ওঠে। সামনে ধানখেতের আইল দেখা গেল। দূরে একটা উঁচু জায়গায় বসে আছে চারজন, সাদিক, শ্রাবণ, ছোট লিজান আর সাইম। রোদে রোদে হাসির রোল ভেসে আসছে। সাদিক খালি গায়ে, একটা খড়ের ঢালু গাদার পাশে হেলান দিয়ে বসে আছে, হাসতে হাসতে লিজানকে কিছু বলছে। সাইম মাটিতে বসে কাদার মধ্যে বাঁশের ছিপ দিয়ে মাছ ধরার অভিনয় করছে।

শ্রাবণ হেলান দিয়ে বসে আছে, চোখে নির্লিপ্ততা, একটা তীক্ষ্ণ নির্লিপ্ত ভাব যেন জড়িয়ে আছে তার মুখে। ধারার কথাগুলো মনে পড়ল কনিকার। আসলেই মানুষটা বেশ ভালো। কনিকা একবার দম নিল। তারপর ধানের ভেতর দিয়ে সাবধানে হেঁটে গিয়ে হঠাৎ সামনেই উপস্থিত হল। উঁচু স্বরে ডাকলো,
—” দুলাভাই! ও ভাইজান?”
অপরিচিত সম্বোধনে শ্রাবণ ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। একটু অবাক হলেও কনিকা কে দেখে বলল,
—” তুমিও আসছো এখানে? আসো আসো!”
কনিকা মাথা নেড়ে বলল,
—” না না, যাব না! শুনুন, একটু এদিকে আসুন!
শ্রাবণ ভ্রু কুঁচকে তাকালো, তারপর উঠে দাঁড়াল, খড়ের ওপর থেকে গা ঝেড়ে নিয়ে কথামত এগিয়ে গেলো। এদিকে সাদিকও কপাল গুটিয়ে কনিকাকে দেখলো। শ্রাবণ কাছে এসেই বলল,

—” কী হয়েছে?”
কনিকা জোর করে হাসল, কিন্তু চোখে একরাশ ক্লান্তি, বলল,
—” বুবু আপনারে একটু ডাকছে।”
শ্রাবণ ঠোঁট ভাঁজ করল, চোখ কুঁচকে তাকাল,
—”ধারা?”
কনিকা হ্যাঁ বলল,
—”হ্যাঁ ভাইয়া, একটু জরুরি। কিন্তু আপনি গেলে সে ঠিক বুঝায়ে বলবে। আমি বলতে পারতাছিনা!”
সাদিক হালকা হেসে চিল্লিয়ে বলল,

—” ক্যান রে কনা! কোনো গণ্ডগোল হইছে নাকি?”
কনিকা সেদিকে না তাকিয়ে বলল,
—”না না সাদিক ভাইয়া, এমন কিছু না। হে হে! ”
কিন্তু শ্রাবণের দিকে তাকিয়ে বেশ কাতর কন্ঠে বলল,
—” তাড়াতাড়ি চলেন না ভাইজান! পরে সব কমু তো!”
সন্দেহজনক দৃষ্টিতে তাকালো শ্রাবণ। কথাবার্তা ঠিক মনে হচ্ছে না বুঝেই নীরবে পথ ধরল বাড়ির দিকে। তার মুখে কিছু নেই, কিন্তু চোখে একটা স্পষ্ট প্রশ্ন। যেন কিছু একটা অনুমান করছে সে। কনিকা দাঁড়িয়ে রইল, তাকিয়ে রইল তার পেছন দিকে হেঁটে যাওয়া শ্রাবণের দিকে, পায়ের নিচে মাটির কাদা ধীরে ধীরে শুকিয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু বাতাসে যেন জমে আছে ঘন কিছু, অপার্থিব কিছু একটার পূর্বাভাস।

মাথা নামিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ধারা। দরজার বাইরে থেকে উঁকি দিয়ে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে কনিকা। এদিকে মাথা নিচু করে আঙুল কচলাতে থাকা ধারার দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকালো শ্রাবণ। ঘরে ঢোকার পর থেকেই মেয়েটা চুপ করেই আছে৷ মনে হচ্ছে কিছু একটা বলবে, কিন্তু বলছে না। আবার কি জানি কেনো ঘোমটা দিয়ে মাথা ঢেকে রেখেছে।
শ্রাবণ এবার ধারার অভিব্যক্তি দেখেই একটু নরম কন্ঠে শুধালো,
—” কিছু বলবে?”
ধারা সহসা চোখ উঠালো। ঠিকঠাক শুনতে পায়নি কথাটা হয়তো, তাই অস্ফুটস্বরে নিশ্চিত হতে বলল,
—” হুম? ”
শ্রাবণ এবার লক্ষ্য করল মেয়েটার চোখদুটো খুব ঘোলাটে লাগছে। কেনো? মুখটাও এমন ফোলা কেনো? এতগুলো প্রশ্ন গিলে ফেলে শ্রাবণ ঠোঁট ভিজিয়ে বলল,

—” কনিকা বলল তুমি নাকি আমায় ডেকেছো। কিছু বলতে চাও?”
ধারা এবার শুকনো ঢোক গিলে মাথা নাড়ালো, মিনমিন করে বলল,
—” হুম, চাই। আপনি কিছু মনে করবেন না। আমার পরিবার ভালো না। সামাজিক মানুষ নন এনারা। আমি জানি এখন…..
থেমে গেলো ধারা, তার কণ্ঠটা এতটাই নিচু আর দ্বিধাগ্রস্ত যে শ্রাবণ একপা এগিয়ে আসতেই থমকে গেল। মেয়েটার মুখ দেখে যেন কোনো রহস্যভরা অস্বস্তি ছড়িয়ে পড়ছে ঘরের বাতাসে। ধারা ঠোঁট চেপে ধরল একটু, তারপর চোখ নামিয়ে বলল খুবই আস্তে,

—” আচ্ছা, আপনি কি শহরের জন্য বাসের টিকেট কেটে ফেলেছেন?”
শ্রাবণ মাথা নেড়ে বলল,
—’ হ্যাঁ, আগামী বৃহস্পতিবার বিকেলে বাস! আর চারদিন পর!”
ধারা এবার হতাশ হলো। টিকেট না কাটলে হয়তো এখনি বলতো শহরে ফিরে যাওয়ার কথা। কিন্তু সেটা বলতে না পেরে মিনমিন করে বলল,
—” আমি… মানে… আমি ভাবছিলাম, যদি আপনি. মানে… কিছু মনে না করেন, তাহলে…”
শ্রাবণ এবার ভ্রু কুঁচকে পুরো দৃষ্টিটা গেঁথে দিল ধারার মুখে,
—”তাহলে?”

ধারার কণ্ঠ কাঁপে, মুখটা জোড় করে শক্ত করে সে আবার বলতে চেষ্টা করে,
—”মানে… আমরা তো সাতদিনের জন্য এসেছি এখানে। কিন্তু যদি আমরা… আজকেই, মানে… কিছুদিনের জন্য…..
কথাগুলো বলতে বলতেই যেন শরীরটা গুটিয়ে নিচ্ছে ধারা। এমনভাবে বলছে, যেন কিছু লুকোচ্ছে আবার যেন দম আটকে আসছে তার। হাতের আঙুলগুলো একটার সাথে আরেকটা চেপে ধরে আছে সে, চোখ নামানো, মুখ থমথমে, একদম নিঃশব্দ।
শ্রাবণ থ হয়ে গেল। কিছুক্ষণ কিছু বলল না সে। বুঝে উঠতে পারছে না, এটা ঠিক কিসের ইঙ্গিত। মেয়েটার চোখে ভয় আছে, অস্বস্তি আছে, আবার যেন কান্না পেছনে লুকিয়ে আছে। তার ঠোঁট শুকিয়ে গেল হঠাৎ। ধীরে ধীরে জিজ্ঞেস করল সে,

—” কিছু হয়েছে? কেউ কিছু বলেছে তোমাকে? তোমার কথা ঠিকঠাক বুঝতে পারছিনা আমি!”
ধারা মাথা নাড়ল, কিন্তু চেহারায় সেই ‘না’ বলারও বিশ্বাস নেই।
—”না… কেউ কিছু বলেনি। আসলে, আপনি বিরক্ত হবেন না প্লিজ। আমি… এখানে আর থাকতে পারছিনা। খুব ঘরটাকে দমবন্ধ লাগছে। মনে হচ্ছে কেউ যেন আমাকে গিলতে আসছে চারদিক থেকে। চলুন আমরা এখান থেকে আজই চলে যাই। এখানে থাকতে চাইনা!”
একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল তার বুক থেকে,
—”আমি ফুফুর বাড়িতে থাকতে চাই কয়েকটা দিন। প্লিজ, আপনি কিছু মনে করবেন না। আমি জানি এটা আমার বাড়ি, আর আপনি তো অতিথি। কিন্তু আমি যদি এখনই না যাই, তাহলে হয়তো…”
একটু থেমে ধারা চোখ বন্ধ করে বলল,

—”আমি হয়তো নিজেকে আর সামলাতে পারব না।”
শ্রাবণ এবার একটানা তাকিয়ে রইল তার দিকে। মেয়েটাকে সে চেনে, হয়তো অল্প সময়েই অনেকটা চেনে, কিন্তু এই মুহূর্তে যে ধারা তার সামনে দাঁড়িয়ে, সে যেন সম্পূর্ণ অপরিচিত। নিঃশব্দ, ভাঙা অথচ অসম্ভব সাহসী। শ্রাবণ ধীরে বলল,

—” ঠিক আছে, তুমি চাইলে আমরা আজই চলে যাব। কিন্তু তোমার ফুফুর বাড়ি কোথায়?”
উচ্ছ্বসিত হলো ধারা, তড়িঘড়ি করে বলল,
—” বেশিদুর না! এখান থেকে বিশ মিনিট লাগবে যেতে। খু্ব কাছেই ফুফুর বাড়ি। আমরা বরং ওখানেই বাকি পাঁচটা দিন থাকি? আপনি কি বিরক্ত হবেন?’
শ্রাবণ তাকালো, পূর্ণ দৃষ্টি ফেলল ধারার মুখের উপর। কাতর কন্ঠে বলা গলাটাও কাঁপছে মেয়েটার, ভীষন চিন্তিত সে। হয়তো ভয়ও পাচ্ছে। সেই মুখের দিকে তাকিয়ে শ্রাবণ মাথা নাড়ালো, ধীরে বলল,
—” বিরক্ত হবো না!”

ধারা ঠোঁট ভিজিয়ে মাথা নামিয়ে শুকরিয়া আদায় করল। শ্রাবণ এবার ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
—” কিন্তু একটাই প্রশ্ন, কী হয়েছে তোমার? তুমি ঠিক আছো তো?”
ধারা একটু চমকে তাকাল, চোখ দুটো ভিজে উঠল কিন্তু সে কাঁদল না। মাথা নাড়ল ধীরে,
—”আমি এখনো ঠিক আছি। কিন্তু অনেক কিছু গিলে ফেলেছি ভেতরে। তার চেয়ে বরং এখন চলে যাওয়াই ভালো।”
শ্রাবণ দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল। কিছুক্ষণ চুপ থেকে শুধু বলল,
—”ঠিক আছে। তবে আমি বাড়ি থেকে আর যাচ্ছি না, আমি পুকুরের দিকটায় থাকছি। আর যদি দরকার হয়, একটা ডাক দিয়ো। আমি কাছেই থাকবো। আর কখন বের হতে চাও বলে দিও!”
ধারা কিছু বলল না। শুধু মাথা ঝুঁকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার হাতের মুঠো আঁটসাঁট, যেন কিছু ছাড়ছে না, আবার কিছু ধরেও রাখতে পারছে না।

শ্রাবণ দরজার কাছে গিয়ে আবার থামলো। মনটা খচখচ করছে তার। পেছনে ফিরে তাকালো সে। মেয়েটা এখনো মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে, ঠিক যেমনটা ছিল। যেন সময় থেমে গেছে ওর চারপাশে। একটা অদ্ভুত নীরবতা জমে উঠেছে ঘরের ভেতর। বাইরে গাছে পাখিরা ডাকছে, দূরে কে যেন হাঁস ডাকছে, কিন্তু তার কোনো কিছুই শ্রাবণের কানে ঢুকছে না। তার বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেমন অস্থির হয়ে উঠল। এমন কেন লাগছে? মনে হচ্ছে, কিছু একটা খুব ভয়ানক ঘটে গেছে বা ঘটতে যাচ্ছে—আর সে জানে না কিছুই। সে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নিজের ভেতরের কণ্ঠস্বরকে থামানোর চেষ্টা করল।

ও বলল ঠিক আছে, কিন্তু চোখে পানি ছিল কেন? ঘোমটা দিয়ে মাথা ঢেকে রেখেছে কেন?মুখটা এত ফোলা, চোখে এমন ছায়া… এসব আগে তো ছিল না!
মনটা খচখচ করতে লাগল তার। অবচেতনভাবে ঠোঁট চিবাতে লাগল শ্রাবণ। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে, হঠাৎ এক সিদ্ধান্তে পৌঁছে আবার ঘুরে দাঁড়াল। ভারি পায়ে ধীরে আবার ফিরে এলো ধারার সামনে।
ধারা তখনও মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে। শ্রাবণ এবার আর নরম স্বরে না, বরং একটু চাপা কণ্ঠে বলল,
—” তুমি ঠিক নেই, ধারা।”

ধারা চমকে উঠল। চোখ তুলে তাকাল, চোখদুটো ভিজে। কিছু বলার আগেই শ্রাবণ আবার বলল,
—”আমি জানি তুমি কিছু লুকাচ্ছ। কিন্তু প্লিজ, আমাকে অন্ধকারে রেখো না। তুমি চাইলে চলে যাব, সেটা ঠিক আছে। কিন্তু আমি জানতেই চাই, এমন কী হয়েছে যেটার জন্য তুমি এতটা ভেঙে পড়লে? বলো আমাকে।”
ধারা চোখ সরিয়ে নিল। উত্তর না দিয়ে আবার মুখ নিচু করল। শ্রাবণ এবার একটু এগিয়ে এসে তার সামনে দাঁড়াল, নিচু গলায় জোর দিয়ে বলল,
—”তুমি না বললে আমি এখান থেকে এক পা-ও নড়বো না।”
ধারা অবাক হলো। কেনো যেন হুট করে মা-বাবার কথা মনে পড়লো। এক মুহূর্তের নীরবতা। ঘরের বাতাস ভারি হয়ে উঠল। ধারা এবার ঠোঁট কামড়ে ধরে একবার চোখ বন্ধ করল। মনে হলো, যেন সব গিলে নিচ্ছে ভিতরে। শ্রাবণ আবার বলল,

—”তোমার চোখ ফোলা কেন? মুখে চেহারায় এত ক্লান্তি কেন? কেউ কিছু বলেছে তোমাকে? কেউ কিছু করেছে? দেখে মোটেই স্বাভাবিক লাগছে না!”
ধারা মাথা নিচু রেখেই সজোরে মাথা দুদিকে নেড়ে বোঝালো কেও কিছু বলেনি, করেওনি। কিন্তু শ্রাবণ মানতে নারাজ। সে এবার সরাসরি তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ফেলে কণ্ঠে তীক্ষ্ণতা নিয়ে আদেশ ছুঁড়ে দিল,
—’ ঘোমটা সরাও! ”
ধারা মিনমিন করে বলল,
—” পরে! ”
—” এখনি! এই মুহুর্তে!”

ধারা এবার আর পারলো না। শরীরটা যেন কাঁপছে ভিতর থেকে, ঠোঁটদুটো থরথর করছে। এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থেকে, চোখ বন্ধ করে ধীরে ঘোমটা সরিয়ে দিল মাথা থেকে। শ্রাবণের চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে একটা ক্লান্তে টলে পড়া মুখ, চোখদুটো ফুলা, কপালের পাশটায় একটা কালচে ছোপ, যেন কোথাও লেগে গেছে। গাল বেয়ে শুকিয়ে থাকা অশ্রুর দাগ আছে এখনো। সে হতবাক, ঠিক বিশ্বাসই করতে পারছে না। কয়েক সেকেন্ড কেবল তাকিয়ে রইল স্তব্ধ হয়ে।
এরপর হাত উঠিয়ে ধারার চুল সরিয়ে দেখতে থাকলো, অস্ফুট স্বরে বলল,

—” হোয়াট দ্যা…এই মেয়ে, কে করল এসব? কোথায় কীভাবে ব্যাথা পেয়েছো?’
ধারা এবার আর নিজেকে আটকে রাখতে পারল না। বুক ভেঙে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। এতক্ষণ যে কান্না সে বুকের ভিতরে পাথরের মতো চেপে রেখেছিল, তা যেন ছুটে এলো বানের জলের মতো। কাঁপতে কাঁপতে ভেঙে পড়ল সে শব্দে শব্দে।
—” আমি এখানে থাকব না। আপনি আমায় নিয়ে চলুন প্লিজ। আমি তো চাচা-চাচির জন্যই তো গ্রামে এলাম বলুন। মনে করেছিলাম ওনারা খুশি হবেন। কিন্তু এলেই বুঝলাম ওরা আদৌ চায়নি আমরা আসি। ছোট মা প্রথম থেকেই কেমন সন্দেহ নিয়ে তাকায়। আপনি তো আর জানেন না, ওরা মোটেই আমাদের দাওয়াত খাওয়ানোর জন্য ডাকেনি জানেন!”
ধারা আরেকটু জোরে কাঁদে। কণ্ঠ কেঁপে যায়, সে কোনো মতে বলে চলে,

—” আমি সব শুনে ফেলেছি। চাচা আমাকে গ্রামে ডেকেছে শুধু টাকার জন্যে। ওরা মনে করছে, আমাদের সাথে একটু ভাব জমিয়ে টাকা হাতিয়ে নেবে। ভাবছে, আমায় কাজে লাগিয়ে নিজেদের অভাব দুর করবে। আরো কত কি বলল! আমি অত সব বুঝিনি। শুধু এটুকু বুঝেছি, আপনাকে এই জায়গায় রাখতে আমার খুব খারাপ লাগছে। এখানে থাকতে চাইনা। উনারা কখনো আমায় ভালোবাসেনি, আপন মনে করেনি আর করবেও না!”
সবকিছু শুনলো শ্রাবণ। খুব মনোযোগ দিয়েই শুনলো। কিন্তু কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না। আসলে করিম সাহেব যে শুধুমাত্র টাকার লোভেই তাদের সাথে বনিবনা করার চেষ্টা করছে, ভাব করতে চাইছে, এটা শ্রাবণ অনেক আগেই বুঝে গিয়েছে। সকালে যখন সে করিম সাহেবের সাথে পুকুর পাড়ে ছিল, তখন কথায় কথায় করিম সাহেব বারবার বলছিল যে টিউবওয়েল ভেঙে গেছে, টাকা পয়সা নেই —এসব নিয়ে কথা বলছিল। তাদের কথাবার্তা শুনে বুদ্ধিমান শ্রাবণ অনেক আগেই বুঝেছে এদের উদ্দেশ্য। কিন্তু চুপ ছিল। ভেবেছিল গ্রামের মানুষ, অভাবে এরকম করছে। এই কারণে এসব কথায় কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না শ্রাবণ।

কিন্তু ধারার মাথায় ফোলা ভাব আর কালো ছোপ ছোপ দাগ দেখে শ্রাবণ চোয়াল শক্ত করে বলল,
—” ওসব কথা বাদ দাও। তুমি না থাকতে চাইলে চলে যাব, তুমি আগে বলো, এই দাগটা কীভাবে হলো? মাথায় আঘাত পেলে কীভাবে?”
ধারা এবার শুকনো ঢোক গিলে চোখ মুছে বলল,
—” কিছু হয়নি। আমি ঠিক আছি… মানে… এখন ঠিক আছি। কিছু হয়নি, বেশি কিছু না… মাথায় একটু ব্যথা পেয়েছি। ছোট মা… একটু রেগে গিয়েছিলেন।”
শ্রাবণের মুখ পাথরের মতো কঠিন হয়ে গেল। সে পেছনে এক পা হেঁটে গিয়ে যেন দাঁত চেপে বলল,
—”মাথায় ব্যথা? কিসের ব্যথা? মেয়ে তুমি, ঠিক করে বলো! আমার রাগ সম্পর্কে ধারনা নেই তোমার!”
ধারা ভয় পেলো, এবার গলার স্বর ভেঙে যাচ্ছে, কাঁদতে কাঁদতে কোনো মতে কাঁপা গলায় বলল,
—” ছোট মা কাঠের একটা টুকরো ছুঁড়ে মেরেছে আমার মাথায়!”
শ্রাবণ এবার চোখ বন্ধ করল, দাঁতে দাঁত চেপে নিজেকে সামলাতে চেষ্টা করল। মুঠো শক্ত হয়ে উঠেছে তার। মুখে একটাও কথা নেই, শুধু চোয়াল কাঁপছে রাগে। এবার আর নিজেকে আটকে রাখতে পারল না। চোখ দুটো রাগে জ্বলতে লাগল, কণ্ঠ গাঢ় হয়ে গেল,

—” আর তুমি এখনো চুপ করে আছো?”
ধারা কাঁপা গলায় বলল,
—” খুব বেশি ব্যাথা পাইনি। শুধু একটু ফুলে গেছে…ওটা ব্যপার না, এমন তো আগে রোজ হতো। আমি এখন শুধু চেয়েছিলাম এখান থেকে চলে যেতে…”
শ্রাবণ এবার গভীর দৃষ্টিতে তাকাল ওর দিকে। কয়েক মুহূর্ত চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে কোঁমড়ে দুহাত রেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ইচ্ছে করছে মেয়েটাকে ধমক দিতে। কিন্তু তাও করতে পারছে না। শুধু দাঁতে দাঁত চেপে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল ধারার মুখের দিকে। ওর কথাগুলো বুকের ভেতর কোথাও খুব গাঢ় হয়ে জমে গেল। একটা মেয়েকে কেউ এভাবে আঘাত করে, আর সে সেই আঘাতকে “ব্যাপার না” বলে চালিয়ে দিতে চায়! মাথা নিচু করে শ্রাবণ একটু নড়ে উঠল। ধারা ভেবেছিল সে হয়তো কিছু বলে ফেটে পড়বে, কিংবা রেগে চলে যাবে, কিন্তু না।
শ্রাবণ ধীরে ধীরে ঘরের দরজার দিকে এগোল। ধারা ভেবেছিল সে চলে যাচ্ছে, কিন্তু কয়েক মুহূর্ত পরে তাকে দেখা গেল ঘরে ঢুকতে, হাতে একটা ছোট পাত্র, তাতে ঠান্ডা পানি। এক হাতে একটা পরিষ্কার গামছাও।

—”বিছানায় বসো! ”
কণ্ঠটা ঠান্ডা, কিন্তু ভেতরে যেন চাপা আগুন। ধারা হতচকিত হয়ে তাকাল শ্রাবণের দিকে,
—”না, আমি ঠিক আছি। কিছু লাগবে না….!”
শ্রাবণ এবার ভ্রু কুঁচকে তাকে কঠিনভাবে বলল,
—” তুমি আসলেই বেশি কথা বলছো! চুপচাপ বসতে বলেছি না? কথা না শুনলে এবার আমি বাড়ি মারব তোমার মাথায়!”
ধারা চুপ করে গেল। একটু দ্বিধা নিয়ে ধীরে ধীরে গিয়ে বিছানার কিনারায় বসল। চোখ দুটোতে লজ্জা আর অবিশ্বাস মিশে আছে। শ্রাবণ পাত্র থেকে গামছা ভিজিয়ে এক হাতে ওর মাথার আঘাতের পাশে চেপে ধরল। স্পর্শটা একদম নরম, কিন্তু ভেতরে একরাশ যত্ন জড়িয়ে আছে। ঠান্ডা কাপড় মাথায় লাগতেই ধারা একটু কুঁকড়ে উঠল, কিন্তু কিছু বলল না। শ্রাবণ নিচু গলায় বলল,

—”এটাই তোমার সো কল্ড ‘ব্যাপার না’? মাথা ফেটে রক্ত এসেছে, ফুলে গেছে, ব্যথা করছে, আর তুমি বলছো ‘রোজ এমন হতো’? গুড! সিনেমা নাকি লাইফটা? কেউ প্রতিদিন এমন করে, আর তুমি সেটা সহ্য করে গেছো এতদিন?”
ধারা চোখ নামিয়ে নিল। বলল,
—”আমি… আমি তখন ভাবতাম, এটাই হয়তো আমার কপাল। ছোট মা কখনোই ভালোবাসেননি। আর চাচা… তিনি তো আরও দূরের মানুষ হয়ে গেছিল!”
শ্রাবণ কাপড়টা আলতো করে সরিয়ে দেখল দাগটা কেমন। চোখে-মুখে উদ্বেগ, বিরক্তি আর দুঃখের ছাপ। ধীরে বলল,

—”তোমার কপালে কেউ আঘাত করবে, এটা কোনো ভাগ্য না, এটা অন্যায়। এটা সহ্য করো মানে নিজেকেই কষ্ট দাও। এত বছরেও তুমি সেটা বোঝোনি? তুমি যে একটা গাধা সেটা আমি এখন উপলব্ধি করলাম?”
ধারা কিছু বলল না। শুধু অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল শ্রাবণের দিকে। ওর এই আচরণটা সে কল্পনাও করেনি। এতটা খেয়াল করবে, এতটা যত্ন করে মাথায় ঠান্ডা পানি লাগিয়ে দেবে, এই শ্রাবণকে আগে কখনো দেখেনি সে। বিয়ের রাতে যে বিরক্তির সাথে দুরে সরালো। একটা নরম দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল ধারার মুখ থেকে। সে নিচু গলায় ফিসফিস করে বলল,

—” আপনার ঘৃণা লাগছে না?”
ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে শ্রাবণ বলল,
—” ঘৃণা কেনো লাগবে?”
ধারা সরল চিত্তেই বলল,
—” এইযে আমায় ছুঁয়েছেন! পানি দিয়ে ক্ষত মুছে দিচ্ছেন! ”
একরাশ বিস্ময় নিয়ে তাকালো শ্রাবণ। ধারা নিজে থেকেই বলল,
—” তিন বছর আগে একবার পোকায় কাঁমড়ে দিয়েছিল হাতে। একটা ছোট দগদগে ঘা হয়েছিল। ওই সময় ছোট মা আমায় বাড়িতেই থাকতে দেয়নি। বলেছিল ঘেন্না লাগছে, আমি নাকি নোংরা!”

শ্রাবণ থমকে গেল। ওর হাতের কাপড়টা তখনও ভেজা, কিন্তু হাত আর নড়ছে না। ধারা মাথা নিচু করে চুপচাপ বসে, চোখদুটো লজ্জা আর ভয়ের ছায়ায় ঘোলা। তার কথাগুলো যেন বাতাস ছুঁয়ে হৃদয়ে এসে বিঁধল। শ্রাবণ নিঃশ্বাস ফেলল, খুব ধীরে। কণ্ঠটা কোমল হয়ে এলো, কিন্তু চোখদুটো গাঢ়—দৃঢ় কোনো প্রতিজ্ঞায় টলমল করছে। সে তাকিয়ে রইল ধারার মুখের দিকে, যেন এক মুহূর্তে তার ভেতরের সমস্ত ছেঁড়া ছেঁড়া অতীতগুলো চোখ দিয়ে পড়ে ফেলতে পারছে।

শ্রাবণকে চুপ করে থাকতে দেখে চোখ তুলে তাকালো ধারা। শ্রাবণের দৃষ্টি বুঝতে পারল না। কিন্তু অতীত আর বর্তমান দুটো মিলিয়েই ভেঙে পড়েছে ধারা। গাল বেয়ে গড়ালো অশ্রুকণা! শ্রাবণের কি হলো কে জানে! এক হাত উঠিয়ে ধারান গালে রাখলো, বুড়ো আঙুল দিয়ে সন্তপর্ণে মুছে দিল অশ্রুকণা!
ধারার চোখ জ্বলে উঠল। সে এক ঝটকায় মুখ ঘুরিয়ে নিল, যেন কান্নাটা লুকাতে চায়। কিন্তু চোখের কোনা বেয়ে একফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। শ্রাবণ কিছু বলল না। শুধু চুপচাপ আবার ঠান্ডা পানি ভিজিয়ে ওর মাথায় লাগিয়ে যেতে থাকল। এই নীরবতা, এতটা তীব্র, এতটা ভরাট, যেন পুরো পৃথিবীতে তারাই শুধু আছে, আর চারপাশে কোনো শব্দ নেই, শুধু এই নিঃশব্দ যত্নটাই ভেসে বেড়াচ্ছে।
একটু পর ধারাও উপলব্ধি করল ব্যাথাটা একটু সহনশীল হয়েছে। শ্রাবণ সরে আসলো, মুখে বলল,

—” এই মুহুর্তে ব্যাগ গুছিয়ে ফেলো। এক ঘন্টার মধ্যে বের হবো।”
ধারা এবার চোখ নিচু করে নিঃশব্দে কাঁপতে কাঁপতে মাথা নেড়ে সায় দিল, উঠে দাঁড়ালো বিছানা থেকে। মুখে কোনো কথা নেই, কিন্তু চোখে একটা ধীর স্বস্তির আভাস ফুটে উঠল কারণ কেউ একজন বুঝেছে তাকে, পাশে আছে। শ্রাবণ এবার ধীরে ধীরে আবারো সামনে এগিয়ে এল। হাত বাড়িয়ে তার মাথায় রাখল, খুব নরম স্পর্শে। ধারা এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল, মাথা নিচু করে তার চোখ মুছল, কিন্তু কান্না থামল না।
শ্রাবণ ধীরে বলল,

শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ৮

—” তোমার চাচা-চাচির আচরণ নিয়ে মন খারাপ করার কোনো প্রয়োজন নেই। এসব আমি আগে থেকেই জানতাম। শুধু তুমি মন খারাপ করবে বলে বলিনি। এখন ওসব কথাবার্তা বাদ দাও। ব্যাগ গুছিয়ে ফেলো। আমি একটু বাইরে যাচ্ছি। তোমার মাথায় ওষুধ লাগাতে হবে। ব্যান্ডেজ আর ওষুধ নিয়ে একটু পরেই আসছি। ফিরতে সময় লাগবে না। ঘর থেকে বের হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। আমি এসেই যেন তোমাকে তৈরি থাকতে দেখি। আর একটু কষ্ট করে আমার ব্যাগটা গুছিয়ে দিও। দুপুরে আমরা বাইরেই খাব!”

শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ১০