Home শ্রাবণ ধারার রূপকথা শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ৮

শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ৮

শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ৮
অনামিকা তাহসিন রোজা

সরল মানুষের জন্য পৃথিবীটা আসলেই খুব সহজ। তাদের কখনো অতিরিক্ত চিন্তাভাবনা থাকে না বললেই চলে। ধারা-ই তার জলজ্যান্ত উদাহরণ। রাতে খাওয়া-দাওয়া শেষ করার পর শ্রাবণ পড়েছে মহা বিপাকে। ঘরে ঢুকতেই অসস্তি হচ্ছে তার। আজ তো ওরা একই ঘরে থাকবে। আবার ঘরে কোনো সোফা বা ডিভান কিছু নেই। তবে কি আজ ধারার সাথে এক বিছানায় শুতে হবে? বিষয়টা কোনোভাবেই মানতে পারছেনা শ্রাবণ। সে নিজেও জানে এমন আচরণ করা উইয়ার্ড, খুবই অযৌক্তিক। কিন্তু এতে তারই বা কি দোষ! হুট করে একটা বাচ্চা মেয়ের সাথে সম্পর্কে বাঁধা যায় নাকি। শ্রাবণ যতবারই স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করছে, ততবারই বয়সের ফারাকটা মাথায় ঠোক্কর খাচ্ছে৷ ধারার দিকে তাকিয়ে তাকে বউ ভাবতে গেলেও বিরক্ত লাগছে শ্রাবণের। যতই যা হোক না কেনো, দিনশেষে যখনই মনে পড়়ছে এই মেয়েটা তার বউ। তখনই বিরক্তিতে মুখ কুঁচকে উঠছে তার। কিছুই ভালো লাগছেনা।

বিয়ে-বউ-সংসার — এগুলো নিয়ে প্রত্যেকটা পুরুষের স্বপ্ন থাকে। মনে থাকে গোপন এক ছবির আঁকা ক্যানভাস। একটা সময় তারা ভাবে, সন্ধ্যার পর ক্লান্ত শরীর নিয়ে ঘরে ফিরবে, দরজায় অপেক্ষা করবে একটা চুপচাপ হাসিমাখা মুখ। এক কাপ চা এগিয়ে দেবে কেউ, জানালার ধারে বসে দু’জনে চুপ করে গল্পহীন গল্প বলবে। তারা চায় এমন এক সঙ্গী, যার চোখে নিজের জন্য মায়া থাকবে, অথচ সেই মায়ার ভেতরও থাকবে প্রাপ্তবয়স্ক বোঝাপড়া। কিন্তু সেই স্বপ্ন যখন বাস্তবের বালিতে পা রাখে, তখন অনেক সময়ই তার গড়নটা ভেঙে যায়। শ্রাবণের ক্ষেত্রেও ঠিক সেটাই ঘটেছে।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

আজ রাতটা তাকে একটা অচেনা পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। খাওয়া-দাওয়া শেষে ঘরে পা দিয়েই যেন শরীরের কোথাও সুতোর মতো টান লেগেছে। একটাই বিছানা। কিন্তু একজন সম্পূর্ণ অপরিচিত, বয়সে অনেক ছোট এক মেয়ের পাশে শোয়া? তাকে ‘স্ত্রী’ বলে মানা, এই বিষয়টায় এতটাই বিচ্ছিরি লাগে শ্রাবণের, যেন নিজের ভেতরের স্বাভাবিকতাকে কষ্ট দিয়ে ঠেলে নতুন কিছু মেনে নিতে হচ্ছে। শ্রাবণ যতই নিজেকে বোঝাতে চায়—সব ঠিক, আই নো, এটা এখন রিয়েল লাইফ—ততবারই একটা ঘোর লাগা অস্বস্তি শরীরকে জড়িয়ে ধরে। ধারার দিকে তাকালে সে কাউকে দেখে না যে তার সংসারসঙ্গী হতে পারে; বরং একটা সদ্য কৈশোর পেরোনো বাচ্চা মেয়ের মতো মনে হয়। বয়সের ফারাকটা যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, তুই এই মেয়ের স্বামী? কেমন করে? এবং ঠিক এইখানেই শ্রাবণের এমন আচরণ অস্বাভাবিক নয়, বরং স্বাভাবিকই। কারণ সম্পর্কের মৌলিক ভিত্তি হলো সমতা। বয়স, মানসিকতা, পারস্পরিক বোঝাপড়া, এসব কিছুর যখন ভারসাম্য থাকে না, তখনই সম্পর্ক হয় দায়িত্বের বোঝা।

একটা মানুষ যখন নিজেকে মানাতে গিয়ে প্রতিনিয়ত নিজেকে ঠকায়, তখন সে ধীরে ধীরে বিরক্ত হয়ে ওঠে।
শ্রাবণের সেই বিরক্তি আসলে ধারার উপর নয়, তা তার নিজের বাস্তবতা নিয়ে, নিজেরই সিদ্ধান্তের প্রতি একরকম অভিমান। একটা মানুষ যখন এমন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়, তখন তার অস্বস্তি, ক্লান্তি আর ছটফটানি, সবই আসলে মনের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। শ্রাবণ হয়তো ভালোবাসা খুঁজতে চায়, কিন্তু সেই ভালোবাসার পথে যে ছায়া পড়েছে বয়সের তফাতে, তা তাকে ফিরিয়ে রাখছে, একটা অস্পষ্ট কষ্টে, অজানা অপরাধবোধে।
কিন্তু কি আর করার! জন্ম- মৃত্যু -বিয়ে তো উপরওয়ালার হাতে। দীর্ঘশ্বাস ফেলল শ্রাবণ। বড় করে শ্বাস নিয়ে ঘরে ঢুকলো৷ কিন্তু সহসা অবাক হলো। বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলো মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে মাদুর বিছিয়ে গোছাতে থাকা ধারার দিকে। মেঝেতে বিছানা পাতছে মেয়েটা। কিন্তু কার জন্য? শ্রাবণের জন্য তো মনে হয় না। তাহলে কি নিজের জন্যই? ঠোঁট ভিজিয়ে এগিয়ে আসলো শ্রাবণ। এক পলক ঠিকমত তাকাতেই বুঝলো, মেয়েটা মাত্রই গোসল করেছে। আশ্চর্য! এই রাতে গোসল করার দরকার টা কি? ভেজা চুল নিয়ে এই রাতে শুয়ে পড়লে তো ঠান্ডা লাগতে পারে। গলা খাঁকারি দিয়ে মনোযোগ আকর্ষণ করল শ্রাবণ।
তৎক্ষনাৎ মেঝেতে বিছানা গোছাতে থাকা ধারা ফট করে তাকিয়ে তড়িঘড়ি করে বলল,

—” আমি আপনার বিছানা গুছিয়ে দিয়েছি। খাটে শুয়ে পড়ুন। নতুন বালিশও রেখেছি, ঘুমোতে অসুবিধা হবে না বোধহয়!”
শ্রাবণ শূন্য চোখে তাকিয়ে থাকে মেয়েটার দিকে৷ আচ্ছা, এই রাতের স্নিগ্ধতায় কি মেয়েটাকে আরেকটু মায়াবী লাগছে? এত স্নিগ্ধ দেখাচ্ছে কেনো মেয়েটাকে? এত সুন্দর লাগছে কেনো? শ্রাবণের অপলক দৃষ্টি দেখে চোখ পিটপিট করে তাকালো ধারা, মিনমিন করে বলল,
—” কিছু বলবেন?”
সংবিৎ ফিরে পেলো শ্রাবণ। আশেপাশে তাকিয়ে নিজেকে ধাতস্থ করে বলল,
—” মেঝেতে বিছানা পাতছো যে…. মানে তুমি মেঝেতে ঘুমোতে পারবে?”
ধারা হাসলো। গাল ফুলিয়ে শব্দহীন হাসলো। হাসিটার মানে বুঝলো না শ্রাবণ। তবে মুখটা বেশ শুকনো মনে হলো। এক মুহুর্তের জন্য মনে হলো মেয়েটা উপহাস করে হাসছে। শ্রাবণ তাকিয়ে রইলো ভ্রু কুঁচকে।
হাসি বন্ধ করে একটু সময় নিয়ে ধারা এবার বলল,

—” আপনি শুয়ে পড়ুন।”
শ্রাবণও আর কিছু বললো না। খাটের উপরে রাখা নতুন বালিশটাতে মাথা রেখে শুয়ে পড়ল। ধারা কিছুক্ষণ বসে থেকে আলো নিভিয়ে দিলো। জানালার পর্দা সরিয়ে দিল। চাঁদের আলো ঝিলিক মেরে রুমে আসছে। জোছনামাখা রাত আজ। তাই রুম অন্ধকার থাকলেও সবকিছু মোটামুটি আবছা আলোয় দেখা যাচ্ছে।
ধারা ধীরপায়ে এসে নিজের পাতানো মাদুরে শুয়ে পড়ল। পাতলা একখানা কম্বল নিজেকে মুড়ে নিল। চুলগুলো এখনো কিছুটা ভেজা, কিন্তু সে পাত্তা দিল না। যেন তীব্র ক্লান্তির গায়ে জড়িয়ে আছে নরম ধৈর্য। চোখ বন্ধ করার আগে একবার তাকালো জানালার দিকে।

জানালার পর্দা হালকা সরিয়ে রাখা, সেই ফাঁক গলে চাঁদের আলো ঘরে ঢুকছে। না, আলো নয় ঠিক, যেন দুধে ধোয়া কোনো কোমল ছায়া। সারা ঘরে ছড়িয়ে পড়েছে একটা মায়াবী আবছা স্নিগ্ধতা। দেয়ালের কোণে ছায়ারা নড়ছে। বাতাস নেই তেমন, তবু পর্দাটা টুকটাক দুলছে।
শ্রাবণের চোখও খোলা। মাথা নিচু করে বিছানায় শুয়ে আছে সে, পাশে তাকিয়ে সেই আলোয় মোড়া ঘরটাকে দেখছে। ঘরটা হঠাৎ যেন নিঃশব্দ এক কবিতা হয়ে উঠেছে। মনে হচ্ছে, এ ঘরে এখন আর মানুষ নেই, আছে জোছনার আলোয় পাথরগলা নরম নিঃশ্বাস, আছে দুইটা মন, যাদের মাঝখানে বয়স, অস্বস্তি, এবং কিছু না বলা ভাষা জমে আছে।

শ্রাবণ জানে না এই রাতে সে ঘুমোতে পারবে কিনা।
কিন্তু তার মনের গ্লানি, বিরক্তি, অস্বস্তির ভেতর দিয়েও
এই আলো, এই নীরবতা, আর মেঝেতে শুয়ে থাকা মেয়েটার পাশে একটা অদ্ভুত প্রশান্তি ছায়া ফেলছে।
ঘুম আসুক বা না আসুক, এই রাতটা সে মনে রাখবে। কারণ এই প্রথমবার, সে বাস্তবতাকে আরেকটু নরমভাবে দেখতে শুরু করেছে। জোছনার আলোয় স্নান করছে ঘরের প্রতিটি কোণা। জানালার ফাঁক গলে নরম আলো এসে পড়েছে বারান্দার ভেতরটায়। বাতাসের শব্দ নেই, শুধু দূরের একটা পাখি মাঝে মাঝে ডেকে ওঠে যেন এই নীরবতা আরও প্রকট করে তোলার জন্যই।

পাটিতে মেলে রাখা বালিশের ওপর চুপচাপ ছড়িয়ে রয়েছে ধারার চুল। ও একপাশ কাত হয়ে শুয়ে আছে, তবে ঘুমোয়নি। নিঃশ্বাসের গতিবিধিও যেন শুনতে পাওয়া যায় এতটাই নীরবতা চারপাশে।
অন্যপাশে শ্রাবণ, সামান্য উঠিয়ে রাখা মাথাটা বালিশে রেখে ছাদের দিকে তাকিয়ে আছে। সিলিং ফ্যান ঘোরে না, কেবল থেমে থাকা পাখার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে যেন নিজেরই কিছু ভাবনা পেছনে ফেলে এসেছে। তার চোখে এখন ঘুম নেই, কিন্তু ক্লান্তি আছে। ধারা পাশেই আছে, ঠিক জানে সে। তবু কিছু বলছে না। বলার ইচ্ছেও নেই। কারণ এই নীরবতা তার নিজের ভিতরকার কথাগুলো যেন শুনতে দিচ্ছে।
জোছনার আলো, পাখা, নীরবতা আর এই রাত, সব মিলে যেন একরকম অপার্থিব হয়ে উঠেছে সময়টা। মনে হচ্ছে, এক মুহূর্ত থেমে আছে, না জেগে থাকা, না ঘুমিয়ে পড়া। শুধু নিঃশব্দে বয়ে যাচ্ছে শ্রাবণ আর ধারার মধ্যকার কিছু না-বলা অনুভব।

শ্রাবণের চোখের পাতা কাঁপছে না, চোখজোড়া যেন চিন্তায় আটকে গেছে। মনের গভীরে একটা প্রশ্ন ঘুরছে, ধারা একটু আগে ওভাবে উপহাস করে হাসলো কেনো?ওই হাসির পেছনে কী ছিল? ঠাট্টা? রাগ? কষ্ট? নাকি… লুকানো কিছু? হালকা, ঠোঁট বাঁকানো সেই চেনা ভঙ্গিমার হাসি, কিন্তু আজ যেন সেটার মধ্যে কাঁটার মতো খোঁচা লেগেছে শ্রাবণের মনে। মনে হচ্ছে, কিছু একটা সে বুঝতে পারছে না। কিছু একটা তার হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। ও দেখল, পাশেই ধারা মেঝেতে একপাশ হয়ে শুয়ে আছে। তার মুখ দেখা যাচ্ছে না, কেবল তার চুলগুলো ছড়িয়ে আছে পাটির ওপর। নিঃশব্দ নিঃশ্বাস পড়ছে তার। শ্রাবণের ইচ্ছে করছে জিজ্ঞেস করতে, “তুমি হাসলে কেন?” কিন্তু শব্দ করে না, শুধু নীরবে তাকিয়ে থাকে সিলিং ফ্যানে। যেন উত্তর সেখানেই কোথাও ঘুরপাক খাচ্ছে।
নিজেকে আর দমাতে পারলনা শ্রাবণ। শুকনো একটা ঢোক গিলে মেঝেতে শুয়ে থাকা ধারা দিকে তাকিয়ে গুমোট স্বরে ডাকলো,

—” তুমি কি ঘুমিয়েছো?”
কেবলই চোখ বুঁজেছিল ধারা। শ্রাবণের কন্ঠ পেতেই চমকে তাকালো। ঘাড় ঘুরিয়ে বিছানার দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে না বুঝিয়ে বেশি ধাতস্থ কন্ঠে বলল,
—” কিছু লাগবে আপনার?”
শ্রাবণ এবার সোজা থেকে পাশ ফিরে শোয়। ধারার দিকে কাত হয়ে মেঝেতে তাকিয়ে বলে,
—” তুমি তখন হাসলে কেনো ওভাবে?”
ধারা প্রথমে বুঝতে পারল না। কিছুক্ষণ অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বলল,.
—” কখন?”
শ্রাবণ এবার ঠোঁট ভিজিয়ে বলল,
—” একটু আগে।”

এবার হয়তো মনে পড়ল ধারার। সেও এবার শ্রাবণের দিকে এ পাশ ফিরে কাত হয়ে শুয়ে পড়ল। বিছানায় অধীর আগ্রহী চোখ নিয়ে শুয়ে থাকা শ্রাবণের দিকে তাকিয়ে ঠোঁটে সূক্ষ্ম হাসির রেখা টেনে বলল,
—” আপনি যে জিজ্ঞেস করলেন, মেঝেতে ঘুমোতে আমার সমস্যা হবে কিনা। সেই কথাটা শুনেই হাসি পেলো।”
শ্রাবণ ভ্রু কুঁচকে তাকালো ষোড়শীর দিকে। জিজ্ঞেস করল অবিলম্বে,
—” কেনো?”
ধারা এক মুহূর্ত নীরব থাকে। লোকটা ভীষন আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে। জানার ইচ্ছে বহুত! ধারাও ঠোঁট চেপে তাকালো। জোছনার আলোয় তার চোখদুটো ঝিলমিল করছে, যেন কোনো অতীত তার পাথরের মতো পাঁজরে ধাক্কা মেরে গেছে হালকা করে। তারপর নিঃশব্দে হাসে, সেই একই চেপে রাখা হাসি, যেটা শ্রাবণ আগেও দেখেছে, তবে এবার তাতে ব্যঙ্গ নেই, কেবল বিষাদের ছায়া।
ধারা নিচু গলায় বলে,

—”আমি ছোট থেকে তো মেঝেতেই ঘুমাই। বিছানায় ঘুমানোর অভ্যেস কখনো হয়নি। কখনো বিছানা পাইনি!”
শ্রাবণ ধীরে ধীরে ভ্রু কুঁচকায়। কথাটার মানে বুঝতে সময় লাগবে হয়তো। ধারা একটু থেমে শ্বাস টেনে আবার বলে,
—” আপনি শহরের মানুষ! হয়তো বুঝবেন না। চাচার বড়িতে বড় হয়েছি তো। ছোট থাকতে বুঝিনি, পরে বুঝেছি, এটা তো আমার বাড়ি না। চাচির বিছানায় তো আর আমার জায়গা হতো না। আমাকে তো কনিকার বিছানাতেও ঘুমোতে দিত না। তাই রান্নাঘরের পাশে একটা পাটি পেতে ঘুমিয়েছি..মানে ঘুমাতাম। ছোট থেকে তাই-ই করে এসেছি। শীতে কম্বল জোটে নি, বর্ষায় ছাদ চুইয়ে পানি পড়েছে গায়ে। তারপরও কখনো কিছু বলিনি। বলতে পারিনি।”
হঠাৎ করেই আবারো ফিক করে হাসলো ধারা,

—” তাই আপনি হঠাৎ জিজ্ঞেস করলেন, আমি মেঝেতে ঘুমোতে পারবো কিনা, এই কথাটাই এত অদ্ভুত লেগেছিল। মনে হলো কেউ যেন প্রথমবারের মতো জানতে চাইলো, আমি কেমন আছি। এই কারনে হেসে ফেলেছিলাম। আপনি কিছু মনে করবেন না!”
গলায় কোনো অভিমান নেই, শুধু স্বীকার করে নেওয়া ক্লান্ত সত্য। চুপ করে যায় ধারা। শব্দ নেই আর কোনো। শুধু দূরের কোথাও যেন রাতের কুকুরটা আবার ডাকছে।
কিন্তু শ্রাবণের বুকের মাঝে কিছু একটা ধপ করে পড়ে। তার মুখটা শক্ত হয়ে আসে, কিছু বলার চেষ্টা করেও গলায় শব্দ আটকে যায়। এই মুহূর্তে সে যেন ঠিক করে উঠতে পারছে না, ধারার জন্য কী অনুভব করছে। মায়া? অপরাধবোধ? না একরকম গভীর, গলিত কষ্ট? সে শুধু তাকিয়ে থাকে মেয়েটার দিকে, জোছনায় যার মুখটা এখন আরও মায়াময়, আরও একা।

শ্রাবণের মনে পড়ে, বিয়ের রাতে সেও ধারাকে বিছানাতে জায়গা দেয়নি। নিষ্ঠুরের মত সেই রাতে মেয়েটা সোফাতে ঘুমোতে দিয়েছিল। সেই সময়ে একটুও খারাপ লাগেনি শ্রাবণের। কিন্তু এই মুহুর্তে বুকটা ধ্বক করে উঠছে। ওর চাচা চাচির মত সেও তবে ধারাকে বিছানা দিল না?
কোনোমতে শুকনো ঢোক গিলে শ্রাবণ নিজে শুয়ে থাকা খাটটার দিকে তাকিয়ে বলল,
—” এই খাটটা কি নতুন?”
ধারা খানিকক্ষণ চুপ করে থাকে। জোছনার আলোয় ওর মুখের রেখাগুলো যেন আরও গভীর হয়ে ওঠে। তারপর আস্তে করে বলে,
—” হুম। খাট টা তো নতুন। আপনার জন্যই চাচা আনিয়েছেন। আগে আমার থাকার মতো কিছুই ছিল না এই ঘরে।”
ওর গলার স্বর খুব নরম, কিন্তু সেই নরমতার ভেতরেও একটা চাপা কষ্ট লুকানো, যেন কেউ দীর্ঘদিনের অভিমানকে চুপচাপ বুকে চেপে বসে আছে।
শ্রাবণ মাথা ঘুরিয়ে তাকায় ওর দিকে। ধারা তখনও পাশ ফিরে শুয়ে আছে মেঝেতে, একদম নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে। কিন্তু শ্রাবণের ভেতরটা তোলপাড় হয়ে যায়।
বুকের ভেতর গুঞ্জন তোলে এক অদ্ভুত বেদনার, অনুতাপের ঝড়। সে জানে, ওর জন্যই মেয়েটা একসময় এই ঘরের ভেতরে জায়গাটুকু পর্যন্ত পায়নি। অথচ আজ, তারই থাকার মতো সব তৈরি, আর ধারা শুয়ে আছে মেঝেতে। শ্রাবণ আবার কিছু বলতে যাবে, কিন্তু মুখ খুলে শব্দ পায় না। জোছনায় ঘরটা আরও নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে।
শ্রাবণ চায়নি, তবুও মুখ ফঁসকে জিজ্ঞেস করে ফেলে,

—” তুমি কখনোই বিছানায় ঘুমোওনি?”
এবার খুশিতে কৃতজ্ঞতায় শব্দহীন ভাবে মুখ ভরে হাসলো ধারা। খুশিতে আপ্লূত হয়ে বলল,
—” ঘুমিয়েছি তো! ওই যে আপনার বাড়িতে। আপনার পাশের রুমে যে এক রাত থাকলাম! সে বারই জীবনে প্রথমবার বিছানায় ঘুমিয়েছি। তবে হুট করে বিছানা পেয়েছিলাম তো, সেই রাতে ঘুম হয়নি!”
বলেই বিষাদ মুখে হাসলো ধারা। হয়তো কথাটা বলতে লজ্জা বা অসস্তি অনুভব করল খানিকটা। শ্রাবণ হঠাৎ চুপ করে যায়। আবিষ্কার করে, মেয়েটা হাসিমুখে পৃথিবীর সবচেয়ে বেদনাদায়ক কথা বলতে সক্ষম। ধারার বলা কথাগুলো যেন ধীরে ধীরে শেকড় গেঁথে বসে শ্রাবণের বুকের গভীরে। একটা অদ্ভুত কষ্ট, একটা অক্ষমতা, একটা অনুতাপ ঘিরে ধরে ওকে। মেয়েটা এত সহজে বলে দিল— সেই রাতে ঘুম হয়নি, অথচ সেই রাতে শ্রাবণ নিশ্চিন্তে ঘুমিয়েছিল। মেয়েটার জীবনের সবচেয়ে নরম বিছানা ছিল সেই রাতে, অথচ ঘুম ছিল না। শ্রাবণের ঠোঁট ফাঁক হয়ে যায়, কিন্তু কথাগুলো আর বেরোয় না। এই প্রথম, একেবারে প্রথমবার, ধারাকে সে ভিন্নভাবে দেখছে। একটা নাম, একটা সম্পর্কের চেয়ে অনেক গভীর কিছুতে।
শ্রাবণ গলার কাছে ধরা কষ্টটা লুকিয়ে নিয়ে ধীরে বলল,

—” ঘুমিয়ে যাও। অনেক রাত হয়েছে।”
শ্রাবণ হয়তো নিজেকেই ধাতস্থ করছে। কণ্ঠে কেমন একটা কম্পন টের পাওয়া গেলো, যেন নিজেকেই বোঝাতে চায়, আর যেন কিছু না শুনতে হয় আজ রাতে। আর নিতে পারবেনা শ্রাবণ। বুক চিনচিন করে ব্যাথা করছে তার। ঘরটা নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে আবার। শুধু জানালার পর্দায় জোছনার দোলা। ধারাও আর কিছু বলে না। মেঝেতে শুয়ে জোছনার আলোয় চুপ করে চোখ বন্ধ করে দেয়।

রাত গভীর থেকে গভীরতম হয়েছে। জোছনার আলো বারান্দার ভাঙা কংক্রিটের দেয়ালে ছায়া ফেলে রেখেছে। পাখার ঘূর্ণন নিঃশব্দ, কিন্তু শ্রাবণের মাথার ভেতরে যেন অনবরত শব্দ বাজছে। সে চোখ তুলল একপাশে, ধারা মেঝেতে জড়োসড়ো হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। মুখটা কিছুটা অস্পষ্ট, তবু চেনা। সেই মুখ, যে খানিক আগেও কেমন তাচ্ছিল্যের হাসি হেসেছিল তার দিকে তাকিয়ে। অথচ এখন এতটা নিরীহ, এতটা নির্জন দেখায় তাকে, যেন কোনো পুরনো অভিমানের ওপর ঘুম নেমে এসেছে।
আশ্চর্য! শ্রাবণ জানতো এই গ্রামে এসে রাতে সে বিরক্তিতে ঘুমোতেই পারবনা। কিন্তু তাই বলে যে এমন একটা উদ্ভট অনুভূতি নিয়ে ঘুম হারাবে তা ভাবেনি। শ্রাবণ অপলক তাকিয়ে থাকল। মেয়েটার কাঁধের কিছু অংশ খোলা, চুলগুলো এলোমেলো, নিঃশ্বাস চলার ভারী ছন্দে যেন রাতটা আরও বেশি গভীর হয়ে উঠছে। সে জানে, আজ আর ঘুম আসবে না। নিজের ভিতরে জমে থাকা অনুচ্চারিত প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজবে সে। ও এমন কেন? ওকে দেখলে কেন বুক ভার হয়ে আসে? আর কেন সে থেমে থাকে ওকে দেখতে দেখতে? চোখের পাতা নামাতে পারছিল না সে। মনে হচ্ছিল, একটা মুহূর্তও চোখ ফিরালেই ধারা হয়তো মিলিয়ে যাবে জোছনার সঙ্গে, অথচ তাকে হারানোর জন্য তো সে প্রস্তুত নয়। রাত গড়াতে থাকল, কিন্তু শ্রাবণ শুধু তাকিয়েই রইল। মনে হলো যেন নীরব কোনো প্রহরী।

সকালের আলো ফুটেছে। ধারার চোখ ধীরে ধীরে খুলে আসে। অদ্ভুত এক নীরবতা ঘিরে আছে চারপাশে, যেন রাতের জোছনা এখনো জানালার কাঁচে রয়ে গেছে খানিকটা। শরীরটা কিছুটা ক্লান্ত, তবুও ঘুম ভাঙার পর প্রথমেই চোখ যায় সামনের বিছানার দিকে। খালি বিছানা দেখে অবাক হয় ধারা। বিছানাটা পরিপাটি, পেছনের বালিশগুলো এক পাশে গুটিয়ে রাখা। যেন কেউ রাতের শেষভাগে উঠে গেছে নিঃশব্দে, একটা শব্দও না করে। ধারার কপাল কুঁচকে ওঠে। তারপরই সে ঘাড় ঘুরিয়ে ধীরে ধীরে চারপাশে তাকায়, ঘরের কোণায় কোথাও শ্রাবণ নেই। অদ্ভুত! লোকটা এত তাড়াতাড়ি উঠে পড়েছে! নাকি নতুন পরিবেশে এসে ঘুমই হয়নি?
পাশের জানালার পর্দাটা সামান্য উড়ছে, তার বাইরে সূর্যের কিরণ ফোঁটা ফোঁটা করে ছড়িয়ে পড়ছে ঘরের মেঝেতে, যেখানে সে রাতভর জড়োসড়ো হয়ে ঘুমিয়েছিল। ধারার ঠোঁটের কোণে এক হালকা চিন্তার রেখা উনি কোথায় গেল? এই প্রশ্নটা তার ভেতরেই বেজে ওঠে, কিন্তু মুখে উচ্চারিত হয় না। আসলে এই ভোরবেলায় তার মনে জমে থাকা অন্যরকম এক অনুরণন… সেই রাতের, সেই অপলক দৃষ্টির
শ্রাবণের চোখের গাঢ় নিরবতার।

ধারা ধীরে ধীরে মেঝে থেকে উঠে বসল। চারপাশে নীরবতা। একটু ভ্রু কুঁচকে ঘরের চারপাশে তাকালো। বারান্দায় গিয়ে দেখলো কেউ নেই। রান্নাঘরে নেই, উঠোনেও না। ধারা এবার কেমন অস্থির অনুভব করলো। নিচে নামলো সে, পা গুলো যেন আপনিই পথ খুঁজে নিচ্ছে। বাড়ির পেছন দিকটা ঝাঁপসা আলোয় ঝিম ধরে আছে। শুধু একটা জিনিসই কেমন স্পষ্ট, পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক অচেনা নিঃসঙ্গতা।
ধারা একটু এগিয়ে গিয়ে থমকে দাঁড়ালো। ওইতো শ্রাবণ! সে দাঁড়িয়ে আছে নিঃশব্দে, একদৃষ্টে তাকিয়ে পুকুরের স্থির পানির দিকে। পানিও যেন তার সঙ্গে নীরবতা ভাগ করে নিচ্ছে। শ্রাবণের মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই, তবে চোখ দুটো গভীর, যেন রাতে জমে থাকা সমস্ত প্রশ্ন সেখানে গলে মিশে গেছে। ধারা চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে, কিছু না বলে..না কিছু জিজ্ঞেস করে। তবে মনে মনে বেশ খারাপ লাগে ধারার। ভাবে মানুষটার বোধহয় গ্রামে ঘুমোতে কষ্ট হচ্ছে।

সকাল সকাল সামিউল শেখের ডাক পড়ল তার ছোট ভাইয়ের অফিসে যেখানে বর্তমানে শ্রাবণ কাজ করছে। তাই দেরি না করে তিনি সকাল বেলাই শুধু এক কাপ চা খেয়ে বেরিয়ে পড়েছেন। এদিকে সালমা বেগমও আজ একটু ব্যস্ততার মধ্যেই আছেন। আজ বিকালে তিনি শপিং করতে যাবেন বলে ভেবে রেখেছেন। হুট করেই মনে হলো কয়েকটা নতুন শাড়ি কেনা দরকার। সকাল দশ বা এগারোটা বাজে বোধহয়। সালমা বেগম সোফায় বসে বসে কাঁথা সেলাই করা শুরু করে দিলেন।
হঠাৎ করেই বাড়ির কলিং বেল বেজে উঠলো। চমকালেন সালমা। এই সময়ে তো কারো আসার কথা নয়। সামিউল শেখ তো দুপুরে আসবেন। তবে এখন এলো কে? একগাদা কৌতুহল নিয়ে সালমা বেগম বাড়ির দরজা খুলে দিলেন। দরজার সামনে টপস পড়ে দাঁড়িয়ে থাকা তন্নি কে দেখেই ভ্রু কুঁচকে তাকালেন সালমা বেগম। অবাকের চরম পর্যায়ে পৌঁছে চেঁচিয়ে বলে উঠলেন,

—” তুমি? ”
তন্নি নামের মেয়েটি এক পা এগিয়ে এসে চোখমুখ শক্ত করে বলে উঠলো,
—” কেনো? আশা করেন নি বুঝি?”
সালমা বেগম নিজেকে ধাতস্থ করলেন। মনে মনে শুকরিয়া আদায় করলেন এই মুহুর্তে শ্রাবণের অনুপস্থিতির জন্য। তিনি এবার শক্ত চোখে তাকিয়ে বললেন,
—” অবশ্যই না। তোমাকে এখানে আশা করার প্রশ্নই উঠে না। তোমাকে তো আমি বলেছি, শ্রাবণের বিয়ে হয়ে গেছে। ও এখন বিবাহিত। কথাটা বুঝতে পারো নি তুমি? এক কথা কতবার বলতে হয়? কেনো এসেছো তুমি এখানে?”
তন্নি এবার রীতিমতো হুংকার করে চোখের পানি ছেড়ে দিল, ছিটকে এসে বলতে থাকলো,
—” কেনো এসেছি মানে? আমি আমার অধিকার পেতে এসেছি। ঠকিয়েছেন আপনারা আমাকে। সব বেইমানের দল! আমি আমার অধিকার চাই। গত দু বছর ধরে স্বপ্ন দেখিয়ে এখন পালিয়ে যাবেন? এতই সস্তা? আমাকে বাজারি মেয়ে ভেবেছেন হ্যাঁ?”

সালমা বেগম মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে গেলেন। তন্নির রাগত গলার ধাক্কায় তার চোখ-মুখ শক্ত হয়ে উঠলো।
এই মেয়েটা তার দেবরের শ্বশুরবাড়ির সম্পর্কের আত্মীয়া, সামিউল শেখের মামাতো বোনের মেয়ে। একসময় বাড়িতে যাতায়াত ছিল, হাসিখুশি একটা সম্পর্কই ছিল। কিন্তু পরিস্থিতি যেদিন থেকে জটিল হয়েছে, সেদিন থেকেই এই সম্পর্ক বিষ হয়ে উঠেছে।
দু বছর আগে শ্রাবণ যখন বিদেশে ছিল। তখন শ্বাশুড়ি মারা যাওয়ার সময় সালমা শেখ আবেগে আপ্লূত হয়ে গিয়েছিলেন। তন্নির মা -বাবার সাথে একটা মুখের কথা হয়েছিল। ভুলবশতই হোক, আর মুখের কথাই হোক, তিনি বলেছিলেন শ্রাবণ দেশে ফিরলে তন্নির সাথে বিয়ে দেবেন। তখন অত কিছু ভেবে বলেন নি তিনি। সেই সময় তার মাথায় একটাই কথা ছিল, কিভাবে ছেলেকে দেশে ফিরিয়ে আনবে আর দেশে ফিরিয়ে আনার সাথে সাথে দেশে স্থায়ীভাবে থাকার ব্যবস্থা করে দেবে। এই কারণে তিনি তখন তন্নীর সাথে বিয়ের কথাটা তুলেছিলেন। কিন্তু মেয়েটা যে এতটা সিরিয়াস হয়ে যাবে তা ভাবেন নি।
তন্নির কাঁপা কণ্ঠে উচ্চারিত প্রতিটি বাক্যে সালমা বেগমের মাথার ভিতর যেন বাজ পড়ে। আশপাশে কেউ না থাকলেও জানালার পর্দা যেন নড়ে ওঠে, দেয়ালের ঘড়ির টিকটিক শব্দটা যেন দ্বিগুণ জোরে বাজে। সালমা বেগম এবার দরজার হাতল শক্ত করে ধরে বললেন,

—” তন্নি! নিজের মুখের কথা নিজে শুনছো তুমি? কেমন ভাষা ব্যবহার করছো? আমরা বেইমান! তুমি অধিকার চাইছো? কোন অধিকার? কোন সম্পর্ক ছিল তোমার সাথে শ্রাবণের? শ্রাবণ তো তোমার কথা জানেও না! কিসের ভিত্তিতে তুমি এসেছো এখানে চিৎকার করতে?”
তন্নির গাল বেয়ে জল ঝরছে। সে চিৎকার করে কিছু বলতে চায়, কিন্তু গলার শব্দ আটকে যায়, কণ্ঠনালী যেন কেউ চেপে ধরেছে। তারপর ভেতরে কোথা থেকে যেন একটা কাঁপা আওয়াজ বেরোয়,
—”তাহলে আমি কি ছিলাম মামি? একটা ভুল? একফোঁটা প্রয়োজন? আমার বুকের ভিতর যে জায়গাটা এক বছর ধরে শুধু শ্রাবণের নামেই কাঁপে, সেটার কোনও দাম নেই? আমি কী করে বোঝাবো আপনাকে, আমি তাকে কখনও ব্যবহার করতে চাইনি। শুধু একটা… একটা ছোট্ট জায়গা চাই তার জীবনে।”
সালমা বেগম হঠাৎ মুখ ফিরিয়ে নেন, যেন কারও চোখে ধরা পড়ে যাবেন। জানালার বাইরে তখন মেঘে ঢাকা রাত। বিদ্যুৎ এক ঝলকে আকাশ চিরে যায়। হয়তো কাকতালীয়, হয়তো প্রতীকি। তিনি ধীরে ধীরে বলেন,

—”ভুল করেছিলাম আমি, তন্নি। তখন ছেলের জন্য ছটফট করছিলাম, আর তুমি ছিলে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য, সহজ একটা সমাধান। কিন্তু মানুষ তো সমাধান না, মানুষ তো মানুষ। আবেগ নিয়ে ভুল করেছিলাম আমি, আর তুমি…হয়তো বেশিই ধরে নিয়েছো…!”
তন্নির চোখ ফেটে কান্না আসে।

শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ৭

—”তাহলে আমি কোথায় যাবো এখন? আমার এই অপেক্ষা, এই প্রহর গোনা, আমার সব কিছু তো ওই একটা কথার ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। আপনি বলেছিলেন….আপনি নিজেই বলেছিলেন…..
সালমা বেগম এবার চুপ করে যান। বাতাসে কেমন থমথমে নিস্তব্ধতা। বাইরে দূরে কোথাও কুকুর ডেকে ওঠে। আর ভিতরে, তন্নি দাঁড়িয়ে থাকে, একা, ছিন্নভিন্ন স্বপ্নের ধ্বংসস্তূপে। তন্নি এবার হঠাৎ করেই কাঁদতে কাঁদতে বসে পড়লো সিঁড়ির পাশে। বলতে লাগলো,
—” ভুল করছেন আপনি…ভুল করছে আপনার পরিবার। যার মুল্য আপনাদের একদিন দিতে হবে। আমি এত সহজে ছাড়ব না। শ্রাবণের সাথে আমার এতদিনের ঘর বাঁধার স্বপ্ন সব শেষ হয়ে যেতে পারে না!”

শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ৯