শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ৭
অনামিকা তাহসিন রোজা
করিম সাহেব সম্পর্কে ধারার চাচা, অর্থ্যাৎ রহিম সাহেবের ভাই। চাচার সাথে ধারার খুব একটা খারাপ সম্পর্ক ছিল না। করিম সাহেব ধারাকে আদর করতেন খুব। নিজের মেয়ে কনিকা ও ধারার মধ্যে তিনি কখনো পার্থক্য করেন নি। কিন্তু বাস্তবতার ভিত্তিতেই ধারার চাচি সোহাগী বেগম পছন্দ করেন না ধারাকে। পরিবারের বোঝা মনে করতেন। এমনকি এই কারনে ধারাকে কাজের মেয়ের মত বাড়িতে দিনরাত খাটাতেন।
ধারার উপর যে গত সাতটা বছর ধরে কি কি অত্যাচার হয়েছে, তা আসলে কাওকে বলে বোঝানোর মত না। এত কিছুর পরে যখন ধারা শহরে গেল, একটা ভালো পরিবারে নিজের স্থান পেলো, এই খবর সোহাগী বেগমের কানে যেতেই তিনি আরো বেশি ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। হিংসাত্মক মন নিয়ে চলতে শুরু করলেন তিনি। এক মুহুর্তের জন্য আফসোস করলেন, কেনো তিনি ধারাকে বিয়ে না দিয়ে নিজের মেয়ে কনিকা কেই দিলেন না। তাহলে শহরে গিয়ে হয়তো কনিকাও ভালো থাকতে পারত! এদিকে করিম সাহেব সস্থির শ্বাস ফেলেছেন। এত বছর পর ধারার জন্য কিছু করতে পেরে শান্তিতে ভরে উঠেছে তার বুক। কিন্তু জামাইসহ ধারা গ্রামে আসছে, এ নিয়ে তিনিও একটু চিন্তিত। নিজের স্ত্রীকে ভালো করে চেনেন তিনি। এই কারনে আগে থেকেই স্ত্রীকে সতর্কবাণী দিয়ে রেখেছেন যেন কোনো কিছু না করেন। অন্তত বাড়িতে মেহমান আসবে, তাঁর সামনে যেন মান-সম্মান টা বাঁচায়।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
দুপুরের একটু পরেই গ্রামে এসে পৌঁছেছে শ্রাবণ আর ধারা। গ্রামের রাস্তায় ঢোকার সাথে সাথেই বড় করে শ্বাস নিয়েছে ধারা। মনে হচ্ছে যেন কতগুলো বছর পর আবার পা রেখেছে নিজের ভিটে মাটিতে। তবে শ্রাবণও যে বিরক্ত হয়েছে, তা নয়। করিম সাহেবের বাড়ি মোটামুটি ভালোই বলা চলে। আধাপাকা বাড়ি করেছেন তিনি। তবে দিনদিন কৃষিকাজেও অবনতির কারনে আর্থিক অবস্থা একটু খারাপ যাচ্ছে তার। তাই ধারা কে এভাবে শহরে বিয়ে দিয়ে পাঠিয়ে দিতে তিনি নাকোচ করেন নি। মেয়েটাকে দেখা-শোনা করার মত, খাওয়ানোর মত সামর্থ নেই তার। এদিকে শ্রাবনরা বাড়িতে পৌঁছাতেই করিম সাহেব তাদেরকে একটা ঘরে জায়গা করে দিলেন। বেশ গোছগাছ করেই রাখা ঘরটা সাজিয়েছে কনিকা।
করিম সাহেবের বড় মেয়ে কনিকা। এছাড়া আরো দুজন ছোট ভাই আছে তার— সাঈম আর লিজান। তাদের বয়স মোটামুটি নয়-দশ বছরের মত। কনিকার বয়স চৌদ্দ বছর। ছোট থেকে মায়ের পরে সে সর্বদাই ধারাকে ভরসা করে এসেছে। বুবু হিসেবে সম্মানও দিয়েছে অনেক। তাই ওরা বাড়িতে ফেরা মাত্রই খবর পেয়ে খেলার মাঠ থেকে সাইম, লিজানসহ একসাথে ছুটে এসেছে কনিকা।
বাড়িতে ঢুকেই রান্নাঘরে থাকা সোহাগি বেগমকে উদ্দেশ্য করে কনিকা বলল,
—” মা, বুবু নাকি বাড়িতে আইছে? কই ওরা?”
সাইম আর লিজানও বড় বোনের দুপাশ থেকে মাথা ঝুঁকিয়ে উঁকি মারল। তারাও জানতে আগ্রহী। সোহাগি টানা রান্নাঘরে থেকে রান্না করতে করতে ঘেমে একাকার। এই সময়ে মেয়ের কথা শুনে তিনি বিরক্তির সাথে মুখ কুঁচকে বললেন,
—” আইছে তো আইছে। অত লাফানোর কি আছে? এই মেয়ে বাড়িত থাকলেই তোগো শয়তানি মাথা জাগে উঠে। যা, দেখা কইরা আয়। বড় ঘরটাতে জায়গা দিছে তোর বাপ।”
কনিকা আর কিছু শোনার প্রয়োজনবোধ মনে করল না। হাসিমুখে পরনের জামাটা এক হাতে গুটিয়ে ছুঁটলো বড় ঘরের দিকে। পিছু পিছু সাইম আর লিজানও দৌঁড় দিল।
ঘরে ঢুকে সস্থির শ্বাস ফেলল শ্রাবণ। যতটা খারাপ ভেবেছিল, ঘর ততটাও খারাপ নয়। ধারা ইতোমধ্যে ব্যাগ থেকে কাপড়-চোপড় বের করে ড্রয়ারে রাখতে থাকলো। তবে ভ্রু কুঁচকে একটা জিনিস পর্যবেক্ষন করল শ্রাবণ। ঘরে একটাই বিছানা। আশেপাশে কোনো সোফাও নেই যে একজন ঘুমোতে পারবে। এবার ঘুমোবে কীভাবে ও? পরের কথা পরে ভাববে বলে আপাতত ঠোঁট গোল করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল শ্রাবণ। নিজেও ব্যাগ থেকে কাপড় বের করে ধারাকে দিয়ে বলল— গুছিয়ে রাখো।
বড় ঘরের দরজা অর্ধেক খোলা রাখা। কনিকা এক টুকরো বাতাসের মত হুড়মুড় করে ঢুকেই উঠে চিৎকার করে বলে উঠল,
—”বুবু!”
ধারা হকচকিয়ে ঘুরে তাকায়। কয়েক সেকেন্ডের জন্য চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে দুজন। তারপর ধারা চোখ ভিজিয়ে ফেলে, আর কনিকা ছুটে এসে তাকে জড়িয়ে ধরে। সাইম আর লিজান এক পাশে দাঁড়িয়ে খানিকটা অপ্রস্তুতভাবে তাকিয়ে থাকে তাদের দিকে। কনিকা ধারার বাহু ধরে চকচক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
—” বুবু, তুই তো একেবারে সুন্দরী হইয়া গেছস! এতদিন পর তোকে আবার দেখতেছি, বিশ্বাসই হইতেছে না।”
ধারা হেসে বলল,
—” এতদিন পর কোথায়? ক’দিনই তো হলো!”
কনিকা মুখ কুঁচকে বলল,
—” আরেহ ধুর। তুই না থাকলে তো আমার সময়ই যায় না। মনে হচ্ছে কতদিন দেখিনাই তোরে!”
ধারা কনিকার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,
—”তুইও তো অনেক বড় হয়ে গেছিস! কেমন আছিস সবাই?”
এইসময় সাইম এগিয়ে এসে বলল,
—”বুবু, তুমি এখন কি আসলেই শহরের মানুষ হইছো নাকি? তোমার জামা-কাপড় কত সুন্দর লাগছে। শাড়িটা খুব সুন্দর মানাইছে তোমারে। দেখেই রাজকন্যার মত লাগতাছে!”
ধারা ওদের বাচ্চাসুলভ কথা শুনে ঠোঁট চেপে হাসলো। লিজান বাকিদের থেকে একটু বেশিই চালাক। ছোট থেকেই ওর বিচক্ষণতা মুগ্ধ করেছে সবাইকে। তাই বরাবরের মত বাকিরা ধারাকে নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও লিজানের চোখ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষন করছে শ্রাবণকে। হাঁটুর থেকেও কম বয়সী ছেলের এমন দৃষ্টি দেখে ভ্রু কুঁচকে তাকালো শ্রাবণ। ভ্রু উঁচিয়ে ইশারায় জানতে চাইলো কি হয়েছে। লিজান এবার শ্রাবণকে আরেকটু দেখে কৌতুহলী গলায় ধারাকে জিজ্ঞেস করল,
—” বুবু? এটা কে? এটাই কি সেই বুড়ো লোক, যার সাথে তোমার বিয়ে হইছে?”
তৎক্ষনাৎ বিষম খেলো শ্রাবণ। চোখ বড় করে তাকালো পিচ্চিটার দিকে। তাকে কোন দিক দিয়ে বুড়ো লাগছে নিশ্চিত হতে আয়নায় তাকালো। এদিকে ধারা অনুভুতিশূন্য হয়ে তাকালো সবার দিকে। আসলে হয়েছে কি! ধারাকে মোটামুটি জোরজবরদস্তি করে বিয়ে দেয়া হয়েছিল। সে নিজেও তো শ্রাবণকে চোখে দেখেনি বাসর রাতের আগে। তাই করিম সাহেব আর সোহাগি বেগম ছাড়া কেওই দেখেনি শ্রাবণকে। তবে সোহাগি বেগম পুরো গ্রামে পাচার করে বেরিয়েছে যে ধারার বর একটা বুড়ো, যদিও এটা একদমই সত্যি নয়। ছাব্বিশ-সাতাশ বছরের এক যুবক কে বুড়ো বলা যায় না। শ্রাবণ খানিকটা বিচলিত হরেও অস্বস্তিতে হেসে ফেলল। ধারা ওদের দিকে তাকিয়ে ছোট্ট করে বলল,
—”হ্যাঁ, ইনিই… তোদের ভাইয়া হবে।”
কনিকা ঠোঁট গোল করে বোঝার ভঙ্গিতে “ওও” বলল, এবার শ্রাবণের দিকে এগিয়ে এসে বিনয়ের সাথে বলল,
—”ভাইয়া, কেমন আছেন?”
শ্রাবণ একটু হেসে বলল,
—”ভালো। তুমি খুব স্মার্ট মেয়েটা দেখছি।”
কনিকা গর্বের সাথে হাসল। সিয়াম আর লিজানও সাথে সাথে বলে উঠলো,
—” আমরাও তো স্মার্ট! ”
শ্রাবণ এবার হেসে ফেলল। বলল, হুম তোমরাও। কনিকা এ পর্যায়ে বলে উঠলো,
—” ভাইয়া শুনেন, মা অনেক কিছু রান্না করতেছে আপনার জন্য। ততক্ষণে চলেন আমরা একটু পুকুরপাড় থেকে ঘুরে আসি। বুবু এখানে ঘরটা আরেকটু গুছায় ফেলুক।”
শ্রাবণ এবার ঠোঁট ভিজিয়ে তাকালো ধারার দিকে। দৃষ্টি টা কেমন যেন অপরিচিত লাগল ধারার কাছে। মানুষটা কি নীরবেই অনুমতি নিতে চাইছে তার কাছে? বিস্ময়ে অভিভূত হলো ধারা। কিছু বুঝতে না পারলেও মিনমিন করে বলল,
—” বাড়ির পেছনেই পুকুরপাড়। চাইলে ঘুরে আসতে পারেন। ততক্ষণে সব কিছু গুছিয়ে ফেলি!”
শ্রাবণ মাথা নাড়ল। চোখের কোণে এক টুকরো হাসি জমিয়ে বলল,
—” ঠিক আছে। তাহলে একটু ঘুরে আসি। ”
লিজান এবার পেছন থেকে চেঁচিয়ে উঠল,
—”কিন্তু ভাইয়া, আপনি কিন্তু এখনো বলেননি, আপনি আসলেই বুড়ো নাকি?”
শ্রাবণ থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। ভ্যাবাচেকা খেয়ে এক মুহূর্তের জন্য পুরো ঘর চুপসে গেল। তারপর শ্রাবণ নরম গলায় বলল,
—” আমাকে দেখে আসলেই বুড়ো মনে হয়?”
লিজান সরল মনে মাথা নেড়ে,
—” না। নায়কের মত মনে হয়!”
শ্রাবণ এবার চোখ সরু করে বলল,
—” দেখে বুড়ো মনে না হলে বুড়ো হই কী করে? আমার তো এখনো চুলও পাকেনি! ”
সবাই হো হো করে হেসে ফেলল। সবার হো হো করে হেসে ওঠা দেখে লিজান ঠোঁট ফুলিয়ে বলল,
—”তাইলে মা মিথ্যা কইছে?”
সাইম আর কনিকা এবার একসাথেই সশব্দে হাসল। ধারা বুঝতে পারল পরিস্থিতি টা। চাচি বলেছে মানে এমনি এমনি বলেনি। তাই ও সতর্কতার সাথে বলে উঠে,
—” চাচি মনে হয় ঠাট্টা করেছে। ওসব বাদ দে। এইটা তুই আবার বেশি জোরে বলিস না। শুনলে চাচি তোকে রান্নাঘরে আটকে রাখবে!”
সিয়াম হেসে ফেলল। কনিকা তখন শ্রাবণকে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে বলল,
—”চলেন ভাইয়া, একটা জিনিস দেখামু আপনারে। পুকুরপাড়ে একটা বড় জামরুল গাছ আছে। ছোটবেলায় বুবু ওই গাছেই ঝুলতো!”
সাথে সাথে চোখ বড় করে ভ্যাবাচেকা খেয়ে কনিকার দিকে তাকালো শ্রাবণ। একটু সময় নিয়ে পিছনে ধারার দিকে তাকালো। ধারাও বেশ অপ্রস্তুত হয়েছে। এই সময়ে এমন কথা সে আশা করেনি। ঘাড় ঘুরিয়ে ধারার মিইয়ে যাওয়া দেখে ঠোঁট চেপে হাসলো শ্রাবণ। কনিকার দিকে তাকিয়ে হেসে জবাব দিল,
—” তাই নাকি? তোমার বুবুকে তো এখন দেখে মনে হয় না যে আগে এমন বাঁদড় ছিল! আসলেই গাছে ঝুলতো নাকি!”
কনিকা কিছুক্ষণ ভাবান্তর হয়ে ফিক করে হাসলো, মুখে বলল, হুম, ঠিক বলেছেন তো। তারপর কনিকা, সিয়াম, লিজান মিলে চারদিক গমগম করতে করতে বেরিয়ে গেল পুকুরপাড়ের দিকে। ধারা এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইল দরজার কিনারায়, তারপর আস্তে করে চোখ নামিয়ে ঘরের দিকে ফিরে তাকাল। ঘরের ভেতর শীতল বাতাস বইছে, জানালা খোলা। কিন্তু জানালার ফাঁকে ফাঁকে কিছু অদৃশ্য ছায়া, যেন কিছু অপূর্ণ সম্পর্ক, কিছু অপমান, কিছু পুরনো স্মৃতি ওকে ঘিরে রাখছে। ধারা হাঁটু গেড়ে বসে ব্যাগ খুলে গুছাতে শুরু করল। আস্তে করে হাত বুলিয়ে ব্যাগের উপর রাখা বেলী ফুলের মালাটার দিকে তাকাল।
আজ নিজেকে প্রথমবারের মতো নিজের ঘরে অতিথি মনে হচ্ছে। এত বছর পর নিজের ঘরের মধ্যে এতটুকু উষ্ণতা পেয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল সে। কিন্তু সে জানে, এই উষ্ণতার পেছনে একটা অন্ধকার দৃষ্টি সবসময় লুকিয়ে আছে। রান্নাঘরে থাকা সোহাগি বেগম ঠিক তখনই দরজার ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে রয়েছেন। মুখে শুষ্ক গম্ভীরতা, চোখে একরাশ সন্দেহ আর কিছু অজানা হিসেব। জান্নাতির কথা মনে পড়লো ধারার। কাল পরশু জান্নাতির সাথে দেখা করবে বলে মনঃস্থির করল।
আতিথেয়তায় ত্রুটি রাখেন নি সোহাগি বেগম। অনেক পদের রান্না নিয়ে হাজির হয়েছেন তিনি। ধারা তা দেখে মনে মনে সুকরিয়া পাঠ করল। করিম সাহেবও খুশি হলেন। বাড়ির বারান্দার মেঝেতে বড় একটা পাটি বিছিয়ে দিল কনিকা। ধারাও প্লেট, গ্লাস গোছাতে সাহায্য করল। এরমধ্যেই সাদিক কে নিয়ে বাড়িতে প্রবেশ করল শ্রাবণ। কিছু একটা নিয়ে হাসাহাসি করছিল ওরা। পাশে লিজান আর সাইমও আছে। শ্রাবণ সাদিকের সাথেই দেখা করতে গিয়েছিল। করিম সাহেবের কথাতেই বাড়িতে নিয়ে এলো এখন।
সাদিককে দেখে চেয়ারে বসা করিম সাহেব মুখভরে হাসলেন। এগিয়ে এসে বললেন,
—” আরে সাদিক যে! এতদিন পর এই বাড়িতে পা পড়লো তোর হ্যাঁ! আইছিস খুব ভালো করছিস। আয় দুপুরের খাবার টা খাইয়া যা। ”
সাদিক শ্রাবণকে পেয়ে আজ মহাখুশি। অনেকদিন পর বন্ধুর সাথে আড্ডা দিচ্ছে ও। তাই শ্রাবণের জোরাজুরি তেই এই বাড়িতে আসতে বাধ্য হয়েছে ও।
আসলে বাড়িতে না আসার আরেকটা কারন আছে। সেটা হলো – কনিকা। বিষয়টা অবাক করার মত হলেও সত্যি যে মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সী কনিকাকে মনে ধরেছে সাদিকের। এটুকু মেয়ে যে কীভাবে তার মন চুরি করল কে জানে। কিন্তু গত কদিন ধরেই সাদিক উপলব্ধি করেছে, মেয়েটাকে সে অসম্ভব ভালোবাসে। এতটা ভালোবাসার পরেও আজ পর্যন্ত কাওকে সে এ কথা জানাতে পারেনি। এমনকি কনিকাও জানেনা যে সে অজান্তেই কারোও ঘুম হারাম করে দিয়েছে। কনিকা যদি বয়সে আরেকটু বড় হতো, তাহলে সাদিক কোনো সংকোচ ছাড়াই বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে বসতো। কিন্তু আপাতত কিছুই করার নেই তার। এদিকে কনিকাকে চোখের সামনে বারবার দেখলেও ভীষণ কষ্ট হয় ওর। বারবার মনের কথা প্রকাশ করতে ইচ্ছে করে, দুর্বল হয়ে যায়। তাই এতদিন ধরে এই বাড়ি থেকে দূরে আছে সাদিক৷ নইলে প্রায়ই যাওয়া-আসা করতো সে।
করিম সাহেব শ্রাবণের সাথে সাদিককেও নিজ হাতে টেনে নিয়ে এলেন বারান্দার পাটি বিছানো জায়গাটায়।
—” আয় আয় বোস। তোর বন্ধুর বিয়েতে দাওয়াত খাওয়াইতে পারলাম না, আজকে আয় একটু তৃপ্তি কইরা খা!”
সাদিক ভদ্রভাবে হাসল, একপাশে বসল। ওর মুখে স্বাভাবিক ভাব দেখালেও চোখের পাতা কাঁপছে হালকা। কনিকা তখন ধারা আর লিজানের সাথে বসে থালা গুছাচ্ছিল। হঠাৎ চোখ পড়তেই সাদিক চুপচাপ কনিকার দিকে তাকিয়ে রইল। মেয়েটা বেশ বদলে গেছে, মাথায় বিনুনি, ঠোঁটে কিশোরী-সুলভ হাসি, আর কাজের মধ্যে ডুবে থাকা শান্ত স্বভাবটা যেন সাদিকের বুকের ভেতর অনাহূত হাওয়া তুলল। কনিকা তখনো বুঝতেই পারেনি কেউ ওকে এভাবে লক্ষ করছে। খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই সে পানি ঢেলে দিচ্ছে গ্লাসে গ্লাসে।
শ্রাবণ খেয়াল করল বন্ধুর চুপচাপ ভাবটা। মাথা একটু কাত করে বলল,
—” সাদিক! কি রে, চুপ করে আছিস যে? কিছু হয়েছে? কোনো সমস্যা? ”
সাদিক অপ্রস্তুত হয়ে হেসে ফেলল,
—”আরেহ না না! সমস্যা কিসের! এতদিন পর আসলাম তো, জায়গাটাই কেমন নতুন লাগছে।”
করিম সাহেব গম্ভীর মুখে বললেন,
—”নতুন না রে বাপ, জায়গা তো সেই পুরান। তুই বড় হইয়া গেছিস, তাই দূর দূর লাগতেছে। এই বাড়িতে তোরা সব ছেলেপুলেরা, বন্ধুরা এসে খেলাধুলো করতি, মনে আছে?”
সাদিক মাথা নিচু করে বলল,
—”মনে আছে চাচা। খুব ভালো করেই মনে আছে!”
এই সময়ে ধারা এসে কণিকার পাশে বসে প্লেট এগিয়ে দিল। শ্রাবণ আশেপাশে তাকিয়ে সতর্ক হলো। এরপর বেশ নিচু স্বরে বলে উঠলো,
—” তুমি খাবে না?”
কথাটা শুনতে পেলো কনিকাও। চমকপ্রদ হয়ে তাকালো ধারা। সবার দিকে এক পলক তাকিয়ে বলল,
—” আপনি খেয়ে নিন। আমি চাচি আর কনিকার সাথেই খাব।”
শ্রাবণ মাথা নেড়ে ঠিক আছে বলল। কনিকাও হালকা মাথা নাড়ল। তখন চোখ পড়ে সাদিকের দিকে। অদ্ভুত এক মুহূর্তে দুজনের চোখ মেলে যায়। সাদিক সঙ্গে সঙ্গেই চোখ নামিয়ে ফেলে। তার মনটা কেমন যেন ধাক্কা খায়, আবার প্রশান্তিও পায়। লিজান আর সাইম তখনো উৎফুল্লভাবে কথা বলছে।
সাদিকের অপ্রস্তুত ভঙ্গিমা দেখে শ্রাবণ মুচকি হাসে। নিচু স্বরে সাদিকের কানে বলে,
—” হয়েছে টা কী তোর? এতক্ষণ তো ঠিকঠাক ছিলি! এ বাড়িতে ঢোকার পর থেকেই হাওয়া সব কই গেলো?”
সাদিক কথাটা এড়িয়ে যাওয়ার জন্য দুষ্টু হেসে শ্রাবণের কানের কাছে গিয়ে বলল,
—’ তুমি আমার কথা বাদ দাও বন্ধু। নিজের কথা ভাইবো। কাহিনী তো দেখতাছি। তুমি খাবানা? বাপরে! এখনই এত আহ্লাদ! বউ ছাড়া খাইতে মন চায়না হুম?”
শ্রাবণ সাদিকের কথায় এবার পুরোপুরি অপ্রস্তুত হয়ে গেল। এক ঝটকায় মুখ ঘুরিয়ে নিল ও। গলায় হালকা কাশির ভান এনে প্লেটের দিকে মনোযোগ দিল, যেন কিছুই হয়নি। কিন্তু গাল দুটো ঠিকই লাল হয়ে উঠেছে, সেটা চাপা পড়লো না। থেমে গিয়ে একবার আড়চোখে ধারার দিকে তাকালো শ্রাবণ। ধারা তখন চাচির পাশে বসে কনিকাকে সহায়তা করছে, কিন্তু মুখের ভেতর একরকম সংযত হাসি লুকিয়ে আছে। যেন ওরাও সব শুনেছে, অথবা অন্তত আন্দাজ করতে পেরেছে। শ্রাবণ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে মেকি হেসে বলল,
—”এই সব কথাবার্তা এখনো তোর মুখে মানায় সাদিক? তুই আগে বল, কবে এমন প্রেমালাপ শিখলি?”
সাদিক ভেংচি কেটে বলল,
—”জীবন শিখায় রে ভাই। তবে এইবার কিন্তু তোকে দেখে বুঝতাছি, তুইও আর আগের মতো নাই। তোর মধ্যে একটা বদল এসেছে।”
শ্রাবণ মুখ নামিয়ে নিল। নিঃশব্দে খাবার গুঁজে নিচ্ছে প্লেটে। কিন্তু মাথার ভেতরে ঘুরপাক খাচ্ছে সাদিকের কথা। এদিকে কনিকা রান্নার হাঁড়ির ঢাকনা তুলে বাবার জন্য কিছু তুলে দিচ্ছিল। হঠাৎ করেই ওর চোখ গেল সাদিকের দিকে। ছেলেটা চুপচাপ বসে আছে, কিন্তু চোখে একরকম অন্যরকম উজ্জ্বলতা। কনিকা কিছুটা অজান্তেই একটুখানি বেশি সময় ধরে তাকিয়ে রইল ওর দিকে। সোহাগি বেগম সেটা খেয়াল করে হালকা ধমকের সুরে বললেন,
—”কনিকা রে! কি হইলো? ঢাকনাটারে চুড়ি বানাইয়া পরবি নাকি?”
কনিকা চমকে উঠে দ্রুত বলল,
—”না মা, এই দিতাছি তো!”
তারপর চুপচাপ হাঁড়ির ঢাকনাটা রেখে দিল। কিন্তু ওর মনের ভেতর একটা প্রশ্ন কুঁকড়ে কুঁকড়ে উঠতে লাগল। সাদিক ভাইয়া এত চুপ কেন আজকাল? আগে তো কত হাসত, কথা বলত, আজ এমন করে তাকালো কেন? কনিকার মনের কৌতূহল বোধহয় শুনতে পেলো লিজান। পাশ থেকে ও তখন গম্ভীর মুখে সাদিককে প্রশ্ন করল,
—”ভাইয়া, তুমি কি অসুস্থ নাকি?”
এই সরল প্রশ্নে সবাই হেসে ফেলল। শ্রাবণ গলায় একটু রাগ মিশিয়ে বলল,
—” না পিচ্চি নেতা ! তোমার ভাইয়ার ব্যবসায় লাল বাতি জ্বলছে মনে হয়!”
সবাই তখন হেসে উঠল। কিন্তু সাদিক একা চুপচাপ থেকে গেল। ওর দৃষ্টিটা আবার একবার খুঁজে ফিরল কনিকাকে, আর কনিকা ওর দিকেই তাকিয়ে, এবার চোখ সরিয়ে নেয়নি। শ্রাবণ এর মধ্যেই ভাতে আঙুল চালিয়ে বলে উঠলো,
—” তুই চাইলেই আবার নিয়মিত আসতে পারিস এখানে সাদিক। চাচা একা থাকে সবাইকে নিয়ে। লিজান, সাইম ওরাও বড় হচ্ছে। আশেপাশে থাকিস ওদের!”
সাদিক কিছু না বলে মাথা নিচু করল। কেবল পাটির কিনারায় আঙুল চালিয়ে খেলতে থাকল। ওর চোখে যে গভীর কিছু বাসা বেঁধেছে, সেটা বোঝার জন্য আর কিছু দরকার নেই। ভেবেই শুধু হাসল হালকা ও,মনে মনে বলল,
—”যেদিন কনিকার চোখে একটা ভরসার আভা দেখবো, সেদিন না হয় সব বলেই ফেলবো! সারাজীবনের জন্যই তখন পাশে থাকব!”
শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ৬
এদিকে কনিকা সোহাগি বেগমের কানে কানে বলে উঠলো,
—” মা, সাদিক ভাইয়া কেমন চুপচাপ না? আগে তো কত কথা বলত!”
সোহাগি বেগম মুখ কাঁচুমাচু করে বললেন,
—”বুড়ো হয়ে গেছে বোধহয়!”
কনিকাও হেসে ফেলল। তার মা কথায় কথায় সবাইকে বুড়ো বানিয়ে দেয়৷ কিন্তু কে জানে, সেই হাসির পেছনে একটা হালকা কৌতূহল, না বলা কিছু অনুভূতির বীজ কি না জন্ম নিচ্ছে।
