Home শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ১৬ (২)

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ১৬ (২)

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ১৬ (২)
‎আফীফা আফনান

‎​”আপনার সমস্যাটা কী বলুন আঙ্ক—”
‎​কথাটা বলতে বলতেই মেহুল ফাইল থেকে মাথা তুলে সামনের দিকে তাকাল। কিন্তু চোখের সামনে বসা পুরুষটির পেছনের লোক দুটোকে এমন অদ্ভুত ভঙ্গিতে তার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে তার মুখের কথা মুখেই আটকে গেল!
‎​পেছনের বিশালাকার লোকটা অন্য এক ছেলেকে এমনভাবে চেপে ধরে আছে, যেন বুথের ভেতরেই কোনো বড় অপরাধ ঘটে গেছে! এমন থমথমে দৃশ্য দেখে মেহুল বেশ খানিকটা বিব্রত ও অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। সে মনে মনেই ভেবে উঠল—’এভাবে তাকিয়ে এরা কী দেখছে শুনি?! আমার পোশাকে কোনো সমস্যা হয়েছে নাকি?’
‎​মেহুল নিজের দিকে একনজর আলতো করে পরখ করে দেখল—না, সবকিছু তো একদম পরিপাটি আর ঠিকঠাকই আছে! তাহলে এরা এমন অদ্ভূত আচরণ করছে কেন?
‎​এদিকে সামনে বসে থাকা সালমান ততক্ষণে চরম বিষাদ নিয়ে মাথা নিচু করে ফেলেছে! সেই সাথে সে তখন মনে মনে নিজের বয়সের নিখুঁত হিসাব কষতে ব্যস্ত—তার বয়স কি সত্যিই ত্রিশ পেরিয়ে পঞ্চাশে গিয়ে ঠেকেছে? তাকে কি আসলেই পাড়ার রিটায়ার্ড আঙ্কেলদের মতো দেখতে লাগছে?

‎এদিকে ​মেহুল সংশয় নিয়ে পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা শান্তা আর মরিয়মের দিকে তাকাল।
‎তখনি ​মরিয়ম মাথা নিচু করে একবার চেয়ারে বসা রাজকীয় চেহারার লোকটার দিকে তাকাল, তারপর কপালে জমে ওঠা ঘাম মুছে কোনোমতে ফিসফিস করে বলে উঠল, “ম… ম্যাম! আপনি কাকে আঙ্কেল বলছেন… এখানে তো তেমন কেউ নেই।”
‎অতঃপর সালমানের দিকে ইশারা করে বলে উঠলো, “উনিই আপনার পেশেন্ট, মিস্টার সালমান শাহ নেওয়াজ!”
‎​মরিয়মের কথাটা কানে যাওয়া মাত্রই সালমান ধীরে ধীরে মাথা তুলল। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই মেহুলও নজর ঘুরিয়ে তাকাল—এবং প্রথমবারের মতো দুজনের চার জোড়া চোখ সামনাসামনি মিলিত হলো!
‎​মেহুল যেন তাকাতেই থমকে গেল। তার চোখের সামনে কোনো বয়স্ক প্রবীণ ‘আঙ্কেল’ বসে নেই! সেখানে বসে আছে ৩০-৩১ বছর বয়সী, শক্ত-পোক্ত চিবুক আর গাঢ় নীল শার্টের হাতা গোটানো এক তীব্র আকর্ষণীয় তরুণ! তার ধারালো চোখ দুটো থেকে যেন এক অদ্ভুত মায়াবী দ্যুতি ঠিকরে বের হচ্ছে। ​নিজের করা বিশাল ভুলটা বুঝতে পেরে মেহুল নিমেষেই লজ্জিত হয়ে পড়ল! মুখটা মুহূর্তের মধ্যে তো লাল হয়ে উঠলই, সেই সাথে সে ব্যাতিব্যস্ত হয়ে তোথলাতে তোথলাতে ক্ষমা চাইতে শুরু করল—
‎​”ওহ্! আই আম এক্সট্রিমলি সরি, মিস্টার সালমান! সিরিয়াসলি এক্সট্রিমলি সরি! আসলে আমি ফাইলে চোখ রেখে অন্যমনস্ক ছিলাম তো, তাই সামনে না দেখেই… মানে আমি একদমই খেয়াল করিনি! প্লিজ আপনি কিছু মনে করবেন না!”

‎​সালমান কিছু একটা বলতে যাবে, কিন্তু তার আগেই রবির হাতের চাপ থেকে সবেমাত্র মুক্তি পাওয়া ধ্রুব আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে পেছনে দাঁড়িয়ে দাঁত কেলিয়ে চটজলদি বলে উঠল, “নাহ্ ম্যাডাম! স্যার একদম কিছু মনে করেনি! আপনার মুখে আঙ্কেল কেন—দাদু, নানা, খালু ডাক শুনলেও স্যার জীবনেও আপনার ওপর রাগ করতে পারবে না!”
‎​কথাটা শোনামাত্রই সালমানের কানের লতি গরম হয়ে উঠল। সে এক সেকেন্ডও দেরি না করে নিজের শক্ত হাতটা আড়ালে টেবিলের নিচ দিয়ে পেছনে বাড়িয়ে ঝড়ের গতিতে ধ্রুবর উরুতে এক বিশালাকার চিমটি কেটে দিল!
‎​”আহহহহহ মা রে!”— সঙ্গে সঙ্গে ধ্রুবর গলা দিয়ে বাঘ-আক্রান্ত পশুর মতো বিকট এক আর্তনাদ বেরিয়ে এলো!
‎​হঠাৎ এই আর্তনাদে মেহুল চমকে দাঁড়িয়ে গেল, “কী হলো আপনার? এনিথিং সিরিয়াস?”
‎​ধ্রুব জানে, এখন যদি সে আর একটাও উল্টাপাল্টা কথা বলে তবে সালমানের হাতে আজই তার চরম মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত! তাই সে তড়িঘড়ি করে পেটের ওপর দুই হাত চেপে ধরে মুখ বিকৃত করে বানিয়ে বানিয়ে বলে উঠল, “আহ্… উহ্… পেটটা বড্ড ব্যাথা করছে ম্যাডাম! সকাল থেকেই থেমে থেমে হঠাৎ পেটে তিব্র ব্যাথা হচ্ছে!”

‎​মেহুল পেশাদারি তাগিদ অনুভব করে সাথে সাথে শান্তা আর মরিয়মকে নির্দেশ দিল, “মরিয়ম! উনাকে দ্রুত পাশের ইমার্জেন্সি বুথে নিয়ে গিয়ে স্ট্রেচারে শুইয়ে দাও। শান্তা, তুমি ডক্টর কামরুল স্যারকে রেফারেন্স দিয়ে বলো পেট ব্যাথার পেশেন্টকে একটু স্যালাইন আর পেইনকিলার দিতে।”
‎মেহুলের ​নির্দেশ পেতেই মরিয়ম আর শান্তা তড়িঘড়ি করে ধ্রুবকে ধরে বাইরে নিয়ে গেল।
‎​ওরা বের হয়ে যেতেই বুথের ভেতরটা আবার শান্ত হয়ে এলো। মেহুল সালমানের দিকে তাকিয়ে হালকা ও লজ্জিত হেসে আবারও বলল, “আই অ্যাম রিয়েলি সরি মিস্টার সালমান, আসলে ভুলবশত…”
‎​সালমান ঠোঁটের কোণে মায়াবী ও সূক্ষ্ম এক হাসি ফুটিয়ে বলল, “কোনো সমস্যা নেই ডক্টর। ভুল মানুষেরই হয়।”
‎​মেহুল একটু সামলে নিয়ে নিজের চেয়ারে বসে পেশাদারি গলায় জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা, বলুন… আপনার শারীরিক সমস্যাটা কী?”
‎​সালমান মুগ্ধ নয়নে মেহুলের মুখের দিকে চেয়ে থেকে এক প্রকার মুখ ফসকলেই বলে ফেলল, “কোনো সমস্যা তো নেই!”
‎​মেহুল অবাক হয়ে ভ্রু কুঁচকে তাকাল, “সমস্যা নেই? তাহলে আপনি এখানে কেন এসেছেন?”
‎​”আপনাকে দেখতে…”—সালমান নিখাদ সত্যটা মোহগ্রস্ত থাকায় হুট মতো বলে ফেলল!

‎এদিকে​ হঠাৎ করে এমন কিছু শোনাতে মেহুল চরম বিস্মিত ও হতবাক চোখে সালমানের দিকে তাকাতেই—সালমান নিজের ভুল বুঝতে পেরে তৎক্ষণাৎ সামলে নিল। সে তড়িঘড়ি করে বাম হাতটা নিজের বুকের ঠিক বাঁ-পাশে, হৃদপিণ্ডের ওপর রেখে গলাটা একটু গমগমে করে প্রসঙ্গ পাল্টে ফেলল—
‎​”আই মিন… আমার বুকটার ঠিক এই খাঁচাটার ভেতরে কেমন যেন একটা অজানা অস্বস্তি আর ব্যথা করে ডক্টর! রাতের পর রাত ঘুম আসে না, বুকটা কেমন আনচান আনচান করে। মনে হয় বুকের ভেতর ঝড় বইছে!”
‎​সালমানের নাটুকে গম্ভীর মুখ আর কথা বলার ধরন দেখে মেহুল ভেতরে ভেতরে একটু অবাক হলেও নিজেকে স্বাভাবিক রাখল। সে প্রেসক্রিপশন প্যাড টেনে নিয়ে গম্ভীর মুখে কলম চালাতে চালাতে বলল—
‎​”রাতে ঘুম না হওয়া আর বুকে আনচান ভাব হওয়ার প্রধান কারণ হতে পারে চরম ডিহাইড্রেশন, অতিরিক্ত মানসিক চাপ অথবা এক্সেসিভ ক্যাফেইন গ্রহণ। আমি একটা হালকা সেডেটিভ আর অ্যান্টি-অ্যাংজাইটি ওষুধ লিখে দিচ্ছি। রাত দশটার মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ার চেষ্টা করবেন, প্রচুর পানি খাবেন আর চা-কফি খাওয়া একদম কমিয়ে দিন। আশা করি আপনার এই ‘আনচান’ ভাব কমে যাবে।”
‎​মেহুল স্লিপটা সালমানের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে হালকা হাসল। আর সালমান স্লিপটা হাতে নিয়ে মনে মনে বলল—’যে রোগ আপনি নিজেই, সেই রোগ তো কোন ঔষধে ঠিক হবে না। তাকে ঠিক করতে হলে তো আমার আপনাকে লাগবে।

‎অতঃপর প্রেসক্রিপশনটা হাতে পেয়ে সালমান ধীরপায়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। ওদিকে মেহুল ততক্ষণে পরবর্তী রোগীর ফাইল গোছাতে এবং তাকে ডাকার প্রস্তুতিতে পুরোপুরি মন সংযোগ করেছে।
‎অন্যদিকে ​সালমান দরজার পর্দার দিকে এগোতে গিয়েও থমকে গেল। সে আলতো করে ঘুরে দাঁড়িয়ে অপলক চোখে মেহুলের দিকে আর একবার তাকাল। ঠোঁটের কোণে এক চিলতে সূক্ষ্ম ও মায়াবী হাসি ঝুলিয়ে সে বিনীত গলায় প্রশ্ন ছুড়ে দিল—
‎​”ডক্টর?”
‎​মেহুল চট করে মুখ তুলে সালমানের দিকে তাকাল, “জি? কিছু বলবেন?”
‎​সালমান দু-পকেটে হাত গুঁজে ধীরপায়ে এক পা এগিয়ে এসে মেহুলের দিকে তাকিয়ে ভারী গলায় বলল, “আপনি আমাকে না দেখেই ‘আঙ্কেল’ সম্বোধন করেছিলেন… জানতে পারি এর কারণটা ঠিক কী ছিল?”
‎​মেহুল আবারো খানিকটা লজ্জিত হয়ে ব্যস্ত গলায় বলল, “আমি তো আগেই বললাম মিস্টার সালমান, সত্যি আমি অত্যন্ত দুঃখিত! আমি আসলে—”

‎​মেহুলের কথায় বাধা দিয়ে সালমান নরম স্বরে আবারো বলে উঠলো , “আরে না না, আমি কিন্তু মোটেও কিছু মনে করিনি। বিশ্বাস করুন, আমি শুধু সত্যিই জানতে আগ্রহী—আমাকে না দেখেই আপনার কেন মনে হলো যে আমি একজন আঙ্কেল বয়সের মানুষ?”
‎​মেহুল এবার একটু হালকা হেসে সরল সত্যটা স্বীকার করে নিল, “আসলে… আপনার নামটা বেশ ভারী! বর্তমান জেনারেশনের ছেলেদের নাম তো সচরাচর এমন হয় না। ‘সালমান শাহ নেওয়াজ’ নামটা প্রথমবার দেখেই আমার মনে হয়েছিল নিশ্চয়ই কোনো বয়স্ক ও প্রবীণ মানুষ হবেন। তাই না দেখেই মুখ ফসকে শব্দটা বের হয়ে গিয়েছিল!”
‎​কথাটা শুনে সালমান যেন কী এক গভীর চিন্তায় ডুবে গেল। সে সামান্য মাথা নেড়ে স্বগতোক্তির মতো বিড়বিড় করল, “ওহ্… নাম ভারী বলে কথা! ওকে, আই সি!”
‎​এরপর সালমানের ধারালো চোখ দুটো সরাসরি গিয়ে নিবদ্ধ হলো মেহুলের চোখের মণিতে। অতঃপর সালমান মায়াবী ও গভীর এক হাসি দিয়ে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে বলে উঠল—
‎​”ধন্যবাদ ডক্টর। আজ তাহলে আসছি। শিঘ্রই আবার দেখা হবে!”

‎​কথাটা বলেই সালমান আর এক মুহূর্তও না দাঁড়িয়ে পর্দার ফাঁক গলে বাইরে বেরিয়ে গেল। অন্যদিকে
‎​মেহুল কয়েক সেকেন্ড একটু অবাক ও বিভ্রান্ত চোখে সেই খালি পর্দার দিকে তাকিয়ে রইল। মনে মনে স্বগত প্রশ্ন করে উঠল—’আবার দেখা হবে মানে? এ কেমন কথা! সে সারাজীবন দেখেছে মানুষ ডাক্তার আর পুলিশের কাছ থেকে দূরে থাকতে চায় আর এই ভদ্র লোক বলছে কিনা আবার দেখা হবে তাও, নাকি শিঘ্রই!’
‎​তবে মেহুলকে বেশি সময় চিন্তার সুযোগ দিল না পরবর্তী রোগী। বুথের ভেতরে এক বৃদ্ধা প্রবীণ নারী প্রবেশ করতেই মেহুল মাথার ভেতর থেকে সালমান শাহ নেওয়াজের ভাবনা ঝেড়ে ফেলে দিল। পরম মমতায় নতুন রোগীর দিকে হাত বাড়িয়ে সে আবারও ডাক্তারির পেশাদারি জগতে নিজেকে বিলীন করে দিল!

‎গাড়ির পেছনের সিটে হেলান দিয়ে বসে আছে সালমান। গাড়ির ভেতরটা নিঝুম, ছমছমে। আধা-খোলা জানালার ফাঁক দিয়ে হু হু করে গরম বাতাস ঢুকলেও সেদিকে সালমানের খেয়াল নেই। কিন্তু সিটের চামড়ায় তার দীর্ঘ আঙুলের টোকা পড়ছে একতালে। চোখ দুটো স্থির হয়ে আছে শূন্যের পানে, আর থমথমে মুখে ফুটে উঠেছে গভীর কোনো চিন্তার ছায়া। ‘আঙ্কেল’ ডাকটা আর মেহুলের সেই লজ্জিত, রক্তিম মুখটা যেন কোনোভাবেই তার মস্তিষ্ক থেকে সরছে না।
‎​ঠিক এমন সময় ধড়ফড় করে গাড়ির দরজার লক খুলে ভেতরে এসে প্রবেশ করল ধ্রুব আর রবি।
‎​বেচারা ধ্রুবর অবস্থা তখন একদম করুণ! হাঁপাতে হাঁপাতে গাড়িতে উঠে সে সোজা সিটে ভেঙে পড়ল। ইমার্জেন্সি বুথে যাওয়ার পর ডক্টর কামরুল আর নার্স মরিয়ম মিলে যখন সত্যি সত্যি কড়া ডোজের ব্যথানাশক ইনজেকশন সিরিঞ্জে ভরছিল, ধ্রুবর বুকের রক্ত যেন হিম হয়ে গিয়েছিল। ভুয়া পেটের ব্যথার চক্করে পড়ে ভালো শরীরে সুচ ফুটানোর কোনো ইচ্ছেই তার ছিল না! শেষমেশ ফাঁক বুঝে বাথরুমে যাওয়ার বাহানা করে পকেট থেকে ফোন বের করে রবিকে কল মেরেছিল—”রবি ভাই! ইমার্জেন্সি গাড়ি পেছনে নিয়ে আসো, নাহলে আজ এরা আমাকে ইনজেকশন দিয়ে শেষ করে দেবে!”

‎ রবি গাড়ি পেছনের গলিতে এনে দাঁড় করাতেই ধ্রুব চারতলার সীমানা প্রাচীর ডিঙানোর মতো চোরের মতো চম্পট দিয়ে একপ্রকার প্রাণ হাতে নিয়ে পালিয়ে এসেছে।
‎তাই ​গাড়িতে উঠে ধ্রুব নিজের বুকের বাঁ দিকে হাত রেখে হাঁসফাঁস করতে করতে বলতে লাগল, “আহ্ বাঁচলাম রে ভাই! উফফ, কেন যে মিথ্যা পেটের ব্যথার নাটক করতে গেলাম, একটু হলে তো তারা জোর করে বিরাট এক সুচালো ইনজেকশন পুশ করতে যাচ্ছিল! আর এক সেকেন্ড দেরি হইলে আজ আমার শরীরে চার আঙুল লম্বা ইনজেকশন ঢুকে যেত রে ভাই!”
‎​ড্রাইভিং সিটে বসে থাকা রবি গিয়ার বদলাতে বদলাতে মেজাজ চরম খিঁচে ফেলল। ব্যাকভিউ মিররে একবার তাকিয়ে আবার ধ্রুবর দিকে রক্তচক্ষু হানিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে ধমকে উঠল—
‎​”চুপ থাকবি তুই একদম, ধ্রুব?! ফালতু বাঁদরামি করার আর কোনো জায়গা পাস না তুই? সবার সামনে নিজের জিব সামলাতে পারিস না, যেখানে সেখানে ফাজলামি মারিস! আবার এখন ইনজেকশনের ভয়ে কুকুর দৌড় দিয়ে এসে ঘ্যানঘ্যান করছিস! আর একটা বাচালতা করবি তো এই চলন্ত গাড়ি থেকে ধাক্কা দিয়ে তোকে রাস্তায় ফেলে দেব, বুঝেছিস?”

‎​রবির সেই কঠিন গর্জন আর চরম গাম্ভীর্য দেখে ধ্রুব চট করে নিজের ঠোঁটে মুখ বন্ধ করার অদৃশ্য কুলুপ এঁটে সিটের কোণে সেঁটে বসে রইল। রবি রেগে গেলে যে রক্ষা নেই, তা সে হাড়ে হাড়ে জানে।
‎এদিকে ​এতক্ষণ ধরে গাড়ির ভেতরে ধ্রুব আর রবির এই কাণ্ডকারখানা নিয়ে সালমান একদম নীরব হয়ে বসে ছিল। তার ভেতরে কোনো বিরক্তি নেই, নেই বাইরের কোলাহলের কোনো স্পন্দন। সে শুধু জানালার কাঁচের ওপারে রোদে পুড়ে যাওয়া রাজপথের দিকে তাকিয়ে এক অচেনা, মায়াবী ঘোরে তলিয়ে ছিল।
‎​বেশ কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থাকার পর, সালমান অবশেষে তার ভারী ও গভীর কণ্ঠস্বর ভেঙে বলল—
‎​”রবি, গাড়ি বাড়ির দিকে নে।”
‎​রবি ড্রাইভিং সিটে বসে ব্যাকভিউ মিররে সালমানের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত বিনীত ও শ্রদ্ধাপূর্ণ গলায় জবাব দিল—
‎​”জি ভাই, আমি গাড়ি বাড়ির দিকেই নিয়ে যাচ্ছি। আপনি মিছে চিন্তায় মন খারাপ করবেন না, ওটা একটা ভুলবোঝাবুঝি ছিলো ভাই। সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে।”

‎​ধাতব চাকার ঘর্ষণে কালো রঙের মার্সিডিস গাড়িটি রাজপথ চিরে গতি বাড়িয়ে ‘শাহ নেওয়াজ’ বাড়ির উদ্দেশ্যে ছুটে চলল। আর ব্যাকসিটে বসে থাকা সালমান সিটে মাথা এলিয়ে দিয়ে চোখ দুটো বুজে ফেলল—যে বোজা চোখের তারায় তারায় তখনো ভেসে উঠছে এক জোড়া মিষ্টি, হরিণী চোখ আর তার অদ্ভুত মায়াবী অপরাধবোধে মাখা ‘সরি’ বলার লজ্জিত মুহূর্তটুকু!
‎বিশাল ফটক পেরিয়ে সালমানের কালো রঙের গাড়িটি যখন বাড়ির আঙিনায় এসে থামল, সে আর এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট না করে চটজলদি নেমে সোজা ভেতরে প্রবেশ করল।
‎​তবে ড্রয়িং রুম পার হয়ে সিড়ির দিকে পা বাড়াতেই সে হঠাৎ থমকে দাঁড়াল। রান্নাঘরের দিক থেকে ভেসে আসছে মাশরুম আর গার্লিকের এক অবিশ্বাস্য প্রলুব্ধকর সুবাস, যা চারপাশের বাতাসকে এক নিমেষে ব্যাকুল করে তুলেছে।
‎​সালমান কৌতুহল নিয়ে কিচেনের দরজার দিকে তাকাতেই তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে অদৃশ্য হাসি ফুটে উঠল।

‎​পুরো রাজশাহী শহর কাঁপানো, মাঠে-ঘাটে চরম দাপটের সাথে রাজনীতি করে বেড়ানো প্রবীণ নেতা মিনহাজ শাহ নেওয়াজ—হাতার কাপড় কনুই পর্যন্ত গুটিয়ে, গলায় অ্যাপ্রন জড়িয়ে পরম শান্তিতে স্যুপের কড়াই নাড়ছেন! আর কিচেন কাউন্টারে হেলান দিয়ে বসে তার সহধর্মিনী বিপাশা শিকদার পা দোলাতে দোলাতে স্বামীর সাথে খুনসুটিতে মেতে আছেন।
‎​সালমান ছোটবেলা থেকেই এই দৃশ্য দেখে অভ্যস্ত। তার বাবা শুধু একজন দক্ষ রাজনীতিবীদই নন, একজন অসাধারণ নিখুঁত স্বামী এবং দারুণ এক বাবা! তার মায়ের প্রতি বাবার অকৃত্রিম ও গভীর ভালোবাসা সে প্রতিটি নিঃশ্বাসে দেখেছে।
‎তাইতো ভালোবেসে বিয়ের আসর থেকে তুলে এনে মিনহাজ সাহেব যাকে নিজের অর্ধাঙ্গিনী বানিয়েছিলেন , আজ এতগুলো বছর পরও তার প্রতি সেই ভালোবাসার উষ্ণতা এক চুলও কমেনি।

‎​সালমানের বুকের ভেতরটা এক অদ্ভুত সুখে ভরে গেল। সে তো এই বাবারই সন্তান! রক্তে আর ডিএনএ-তে ভালোবাসা বাস করার এই উস্কানি তো সে পরিবার থেকেই পেয়েছে। বাবা যদি তার ভালোবাসাকে আগলে রাখতে পারেন, তবে সালমান শাহ নেওয়াজ তার ‘অপ্সরা’ কে ঠিক এমনভাবে বুকের ভেতর জড়িয়ে রাখবে—যা হয়তো তার বাবার ভালোবাসা ও পাগলামিকেও ছাড়িয়ে যাবে!
‎​কিন্তু হঠাৎ করেই মেহুলের সেই ‘আঙ্কেল’ ডাকটার কথা মনে পড়ে যেতেই সালমানের মুখের সেই রোমান্টিক ভাব মিলিয়ে গিয়ে সেখানে নামল একরাশ বিরক্তি আর গাম্ভীর্য! সে মুখটা থমথমে করে সোজা রান্নাঘরের ভেতরে পা রাখল।

‎​রান্নাঘরে পা রাখতেই বিপাশা শিকদার ছেলেকে দেখে হাতের ডিশটা পাশে রেখে পরম স্নেহে দু-হাত বাড়িয়ে দিলেন। সালমান ধীরপায়ে এগিয়ে গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরতেই বিপাশা শিকদারের মাতৃত্ব কেঁদে উঠল, “সারাদিন কেবল কাজ আর কাজ! দিন দিন একদম শুকিয়ে একশেষ হয়ে যাচ্ছিস! চেহারাটার দিকে তাকা একবার শিশির… বাড়িতে কি মন টিকে না তোর!”
‎মায়ের অভিযোগে ​সালমান মায়ের কাঁধে থুতনি রেখে আবছা গলায় বলল, “খুব শীঘ্রই বাড়িতে পাকাপাকি থাকার ব্যবস্থা করছি মা। এর পরে দেখবে তুমিই বিরক্ত হয়ে যাবে আমাকে বাড়িতে বসে থাকতে দেখে।”

‎​ছেলের মুখে এমন অভাবনীয় কথা শুনে মিনহাজ শাহ নেওয়াজ আর বিপাশা শিকদার —দুজনেই চমকে উঠে সালমানের দিকে তাকালেন। কিন্তু সেদিকে কোনো তলোক্কা না করে সালমান মাকে ছেড়ে সোজা গিয়ে তার বাবার পাশে দাঁড়াল।
‎​মিনহাজ সাহেব স্যুপের চামচটা নাড়াতে নাড়াতেই কড়া চোখে ছেলেকে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, “কিছু বলবে?”
‎​সালমান কোনো ভূমিকা না করে, একবিন্দু দ্বিধা ছাড়াই সোজা ঘোষণা দিল—”আমি আমার নাম পরিবর্তন করতে চাই।”
‎​মিনহাজ শাহ নেওয়াজ হাতের চামচটা থামিয়ে অস্বাভাবিক চোখে তাকিয়ে বললেন, “কি বললে তুমি?”
‎সালমান আবারও স্বভাবিক স্বরেই বলে উঠলো, “আমি আমার নাম পরিবর্তন করে নতুন নাম রাখতে চাই!”
‎​মিনহাজ শাহ নেওয়াজ সালমানের দিকে তাকিয়ে গর্জে উঠলেন, “অসম্ভব! আমার বাবার দেওয়া নাম তুমি পরিবর্তন করতে পারবে না!”

‎​সালমান ভ্রু কুচকে, “কেন? আমার নাম, আমার ইচ্ছে। আমি পরিবর্তন করবই! তোমার মতামত কে চেয়েছে?”
‎​মিনহাজ শাহ নেওয়াজ তেজ দেখিয়ে, “আমার বাবার শেষ স্মৃতি তুমি এভাবে মিটিয়ে দিতে পারবে না। কত শখ করে তোমার নামটা নিজের নামে সাথে মিলিয়ে রেখেছিলেন তোমার দাদা!
‎​সালমান নাকমুখ কোঁচকালো, “নিজে তো বুড়ো ছিলো, তাই বুড়োর মতো ভারী নাম রেখে আমার যৌবনের মান-সম্মান এক নিমেষে শেষ করে দিল তোমার বাপে!”
‎​মিনহাজ শাহ নেওয়াজ আবারও গর্জে উঠলো, “একদম ফালতু কথা বলবে না, সালমান! আমার ছেলে তুমি, তাই আমার কথা ও মতামত মানতে তুমি বাধ্য! তুমি কোনোভাবেই এই নাম পরিবর্তন করতে পারবে না, আমি তা কখনো হতে দেব না!”

‎বাবার এমন কথাতে ​সালমান এক সেকেন্ডও সময় না নিয়ে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা রবির দিকে তাকিয়ে চটজলদি হুকুম ছুঁড়ল—
‎​”তাহলে তো দেখছি নামের আগে বাবা-ই পরিবর্তন করতে হচ্ছে! এই রবি, যত দ্রুত পারিস বাপ পরিবর্তনের ব্যবস্থা কর তো!”
‎​পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রবি সালমানের এই অবিশ্বাস্য ও অভাবনীয় কথায় এক মুহূর্তের জন্য ঘাবড়ে গেলেও, নিজের সহজাত আনুগত্য বজায় রেখে সোজা মুখে চট করে বলে উঠল, “জি ভাই!”
‎​”জি ভাই?”
‎এদিকে ​মিনহাজ শাহ নেওয়াজের চোখ দুটো যেন কপালে উঠে গেল! রাগে-ক্ষোভে তার চিবুক কাঁপতে লাগল। তিনি কড়াইয়ের চামচটা সশব্দে কাউন্টারে রেখে, এতক্ষণ ধরে পিতা-পুত্রের এই তুলকালাম কান্ড নীরব দর্শকের মতো দেখতে থাকা স্ত্রী বিপাশা শিকদারের দিকে ঘুরে দাঁড়ালেন।
‎​মিনহাজ সাহেব কটমট করে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বললেন, “তোমার ছেলেকে সামলাও বিপাশা! আমি কিন্তু এসব বেয়াদবি এক চুলও মেনে নেব না! নামের বদলে এখন বাপ পরিবর্তনের প্রসেস বানাচ্ছে শয়তানটা? এ সত্যি আমার ছেলে তো বিপাশা নাকি হসপিটালে কারো সাথে বাচ্চা বদলে ফেলেছিলে?”

‎​বিপাশা শিকদার আর নিজের হাসি চেপে রাখতে পারলেন না। তিনি এক হাত দিয়ে স্বামীর হাত ধরে শান্ত করে, অন্য হাতে সালমানের কানটা চেপে ধরে বললেন, “কী শুরু করেছিস বল তো তোরা বাপ-বেটায় মিলে?! আর তুই… সকাল সকাল কী ভূত চাপল মাথায় যে ত্রিশ বছরের পুরানো নাম বদলাতে চলেছিস?”
‎​সালমান মায়ের হাতের ছোঁয়া থেকে কান ছাড়িয়ে গম্ভীর মুখে বলল, “যে নাম শুনলে তরুণ বয়সেই ‘আঙ্কেল’ ডাক শুনতে হয়, সেই নাম রেখে আমি কী করব মা?”
‎​কথাটা বলেই সালমান আর কারও উত্তরের অপেক্ষা না করে সেখান থেকে গটগট করে নিজের ঘরের দিকে হেঁটে চলে গেল। আর পেছনে মিনহাজ সাহেব ও বিপাশা শিকদার সম্পূর্ণ হতবাক হয়ে পরস্পরের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন—ছেলের এমন অদ্ভুত ক্ষোভের রহস্য উদ্ঘাটন করতে না পেরে!

‎​ওদিকে মেডিকেল ক্যাম্পের ডিউটি কোনোমতে শেষ করতেই মেহুলের যেন আর এক সেকেন্ডও নিঃশ্বাস ফেলার ফুড়সত ছিল না। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সে হন্তদন্ত হয়ে ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে দ্রুত পায়ে বাইরের দিকে ছুটে গেল। হুমার একের পর এক অধৈর্য বার্তা আর আকুল মেসেজে ফোনের নোটিফিকেশন বার ততক্ষণে ছেয়ে গেছে!
‎​আগে কখনো হুমার নতুন বুটিক হাউজে যাওয়া হয়নি মেহুলের। আজই প্রথমবার লোকেশন ট্রাক করে, রিকশায় বসে অস্থির পায়ে আঙুল মটকাতে মটকাতে সে রওনা হলো সেই অজানা গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। মনটা কেবলই এক অদ্ভুত আশঙ্কায় দুলছে—বাচ্চাটা ঠিক আছে তো? অতটুকু একরত্তি শিশু, না জানি কত কষ্ট পাচ্ছে!

‎​রিকশাটা যখন হুমার ড্রেস ডিজাইনিং বুটিকের সামনে এসে থামল, মেহুল ভাড়া মিটিয়ে নামার আগেই স্পষ্ট শুনতে পেল ভেতর থেকে ভেসে আসা এক অবুঝ, আর্ত শিশুর একটানা কান্নার শব্দ! বুকে যেন অচেনা এক ধাক্কা লাগল তার। অতঃপর রিকশাওয়ালার হাতে দ্রুত টাকাটা গুঁজে দিয়ে মেহুল কাঁচের স্লাইডিং ডোর ঠেলে প্রায় দৌড়ে ভেতরে প্রবেশ করল।
‎​মেহুলকে দরজায় প্রবেশ করতে দেখেই হুমা যেন হাতে স্বর্গ পেল! একরাশ স্বস্তির দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে দু-পা এগিয়ে এসে ট্রলিতে কাঁদতে থাকা শিশুটিকে কোলে তুলে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে মেহুলের বাড়িয়ে দেওয়া দু-হাতে সোপর্দ করল।

‎​আর ঠিক তখনই এক অলৌকিক জাদু ঘটল!
‎​মেহুলের বুকের উম, তার গা ঘেঁষে আসা পরিচিত সুবাস আর হাতের উষ্ণ স্পর্শ পাওয়ামাত্রই—এতক্ষণ ধরে গলা ফাটিয়ে কেঁদে আকুল হওয়া একরত্তি রাজকন্যাটি এক নিমেষে একদম চুপ হয়ে গেল! কান্নার আওয়াজ থামিয়ে ছোট ছোট ফোঁপানি ছেড়ে সে তার ফোলা ফোলা, নিষ্পাপ চোখ দুটো বড় বড় করে মেহুলের মুখের দিকে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে রইল!

‎এদিকে ​দৃশ্যটা দেখে হুমা সহ তার বুটিকের দুজন সহকারী রীতিমতো বাকরুদ্ধ হয়ে গেল!
‎​সহকারী মিতু তো বিস্ময়ে চোখ কপালে তুলে মেহুলকে বাচ্চার মা ভেবে বলেই বসল, “দেখেছ হুমা আপু? এতক্ষণ কী তাণ্ডবটাই না করছিল! আমরা কত চেষ্টা করলাম, কোল বদল করলাম, বোতলে দুধ দিলাম—কেউ বাচ্চাটাকে শান্ত করতে পারছিলাম না! আর দেখো, ওর মা আসার সাথে সাথেই কেমন জাদুমন্ত্রের মতো শান্ত হয়ে গেল! একেই হয়তো বলে পরম রক্তের টান, মায়ের অকৃত্রিম ভালোবাসা!”

‎​’মা’ শব্দটা মেহুলের কানে গিয়ে আঘাত করতেই ভেতরটা কেঁপে উঠল। তার বুকের গহীনে অদ্ভুত, অচেনা এক অনুভূতি মোচড় দিয়ে উঠল। এক অজাগতিক পিয়াস যেন হৃদপিণ্ডটাকে চেপে ধরল। সে কোনো উত্তর না দিয়ে শুধু পরম মমতায় একরত্তি রাজকন্যাকে আরও একটু বুকের সাথে জড়িয়ে ধরল।
‎​পরিস্থিতির সংবেদনশীলতা বুঝতে পেরে হুমা চটজলদি স্টাফদের উদ্দেশ্যে বলল, “মিতু, তোমরা যার যার কাউন্টারে গিয়ে কাজে মনোযোগ দাও।”

‎​মিতু ও বাকিরা সরে যেতেই হুমা মেহুলকে ধরে নিয়ে গেল তার নিজস্ব ব্যক্তিগত কেবিনে। কেবিনের রকিং চেয়ারে মেহুলকে বসিয়ে হুমা টেবিল থেকে এক গ্লাস ঠান্ডা পানি এনে মেহুলের দিকে বাড়িয়ে দিল।
‎​মেহুল এক নিঃশ্বাসে পুরো পানিটা শেষ করে গ্লাসটা টেবিলে রাখতেই হুমা তার মুখোমুখি চেয়ারে বসে কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ ফেলে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে বলে উঠল—
‎​”এভাবে আর কতক্ষণ সম্ভব বল তো মেহু? বাচ্চাটাকে নিয়ে তো এবার নির্দিষ্ট কিছু একটা ভাবতেই হবে! তুই কি কিছু ভেবেছিস?”

‎​মেহুল কয়েক মুহূর্ত নিঝুম হয়ে চিন্তায় ডুবে রইল। তারপর কোলে শুয়ে থাকা, ধবধবে গোলাপি জামা পরা শিশুটির দিকে তাকাল। বাচ্ছাটি তখন নিজের পুঁচকে দু-হাত শূন্যে ছড়াক-ছিড়িক করে নাড়িয়ে ‘উই উই’ শব্দ করে এক আপন মনে খেলায় মেতে উঠেছে!
‎​মেহুল পরম মমতায় তার তুলতুলে গালে নিজের বুড়ো আঙুলটা একটু বুলিয়ে দিয়ে হুমার দিকে তাকিয়ে ধীর ও শান্ত কণ্ঠে বলল—
‎​”আর একটু বিকেল হলে আমরা সোজা থানায় যাব, হুমা। সেখানে গিয়ে শিশুটির নামে একটা নিখোঁজ ডায়েরি আর অফিশিয়াল মিসিং রিপোর্ট লেখাব। তারপর আইনের নিয়মে যা হওয়ার, সেটাই হবে।”

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ১৬

‎​মেহুলের কথা শেষ হতেই দুজনই নীরব হয়ে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল ছোট্ট সেই অনাহূত রাজকন্যার দিকে।
‎​যে একরত্তি শিশুটি সকাল থেকে পুরো বুটিকের সবাইকে কান্নাকাটি করে নাজেহাল আর চরম টেনশনে ফেলে রেখেছিল—সে এখন সব ভাবনাহীন নিশ্চিন্তে মেহুলের কোলে পরম আশ্রয়ে শুয়ে, যেন সব কিছু ভুলে বিশ্বজয়ের আনন্দে নিজের হাত-পা নেড়ে আপন মনে খেলে চলেছে!

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ১৭