Home সাঁঝের মায়া সাঁঝের মায়া পর্ব ৬০

সাঁঝের মায়া পর্ব ৬০

সাঁঝের মায়া পর্ব ৬০
দুর এ দিলশাদ্ দুআা

—’ বাচ্চাটা ন*ষ্ট করোনি কেনো এখনো? ‘
ইয়াজের কথার পৃষ্ঠে কথা বলার মতো অবস্থা নেই মিতুর। এলেমেলো বিধ্বস্ত অবস্থায় পরে আছে সে বিছানায়। পাশেই সম্পূর্ণ বস্ত্রহীন অবস্থায় বিছানায় গা ঠেকিয়ে রেখেছে সয়ং ইয়াজ মির্জা। ভোর হওয়ার পথে। তবে এখনো দিনের আলো দৃশ্যমান নয়। ঘড়ির কাটা কত-তে ঘুরছে তাও জানে না মেয়েটা। ইয়াজের ঘন ঘন নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে পাচ্ছে শুধু। আর সে! তার তো শ্বাসই চলছে না বলতে গেলে। খানিক আগের ঘটে যাওয়া ঘূর্ণিঝড় আরেকদফা তছনছ করে গেলো তাকে। বাঁধা দেওয়ার সময়টা অবধি পেলো না সে। আজ কিন্তু ইয়াজ কোনো ধরনের নেশাক্ত নয়। সম্পূর্ণ সজ্ঞানে। কথায় আছে একবার ধরা পরে গেলে পরে আর লুকনোর কিছু থাকে না। ইয়াজের হতে পারে তাই হয়েছে। এতদিন তার অবচেন সত্তা এই হিংস্রতা করলেও, আজ সম্পূর্ণ সজ্ঞানে, হুশে থেকে। মিতুর জখমে জখমে জর্জরিত শরীরটা একবিন্দুও টেনে এদিক ওদিক সরাতে পারার সামর্থ্য নেই। আর না তো হা করে কোনো শব্দ উচ্চারন করার। ইয়াজ – উঠে বসলো। হিংস্র দৃষ্টিতে বিছানায় পরে থাকা মেয়েটিকে দেখলো। চোখেমুখের অবস্থা দেখে বোঝার উপায় নেই মনের ভিতর কি চলছে বা চলতে পারে! মেঝেতে পরে থাকা পোষাকগুলো হাত নিয়ে দ্রুত পায়ে ওয়াশরুমের দিকে ছুটলো। ঘন্টা খানেকের মাথায় বের হলো গোসল সেরে। মিতু তখনো এক অবস্থায় পরে আছে। গোটা ঘরের অবস্থা দূর্বিষহ। ভাঙাচোরা জিনিসপত্র। একগাদা ভাঙা কাচ মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। ইয়াজ তোয়ালে তে মাথা মুছতে মুছতে এসে দাড়ালো মিতুর সমানে। গম্ভীর কন্ঠে বললো,

—’ কাল টাকা রেখে যাবো। আমার লোক এসে নিয়ে যাবে হসপিটালে। এবোরশন করিয়ে আসবে। এই কথার কোনো নড়চড় হলে কি হবে আন্দাজ আছে?’
মিতু জবাব দেয় না, দিতে পারে না। নোনাজল আখি ভেদ করে গালে গড়িয়ে পরতেই কাটা অংশগুলো জ্বলে ওঠে। আজকের হিংস্রতা কে কি দিয়ে পরিমাপ করা যায় জানা নেই মিতুর। এ জীবনকে কতটা দায়ি করা যায় তার আজকের এ অবস্থার জন্য সেটাও জানা নেই। নিজের জন্ম এক ছন্নছাড়ার ঘরে। পিতৃ পরিচয় বিহীন। সে নিজেও এখন এক পাপী নারী। অবৈধ সন্তান পেটে নিয়ে, সেই পুরুষের বাড়িতেই পরে আছে। যাবে কোথায়, কে আছে? রাস্তায় দশটা কাক শকুনে ছিড়ে খাওয়ার থেকে, মাথার ওপর একটা আশ্রয়, একজন মা, একজন পরিবার। আর এক পুরুষের কাছে অসম্মানিত হওয়া ঢের ভালো- বলে মনে করেছিলো সে। ইয়াজ মেয়েটার বিধ্বস্ত মুখের দিকে তাকিয়ে হিসহিসিয়ে বললো,

—’ তোমাকে আমি মেরে ফেলতে চাই না। তার কারণ তো তুমি জানোই। আমি অপরাগ। বাধ্য হয়ে বাঁচিয়ে রাখতে হচ্ছে। আমার দুনিয়ার একটা অংশ দূর্ভাগ্যবশত এখন তোমার ওপর নির্ভরশীল। আমার দুনিয়া তছনছ হয়ে গেলে, তোমারও আমার জীবনে আর জায়গা নেই। ততদিন বাঁচিয়ে রাখবো। আর আমার কথা মতো চললে তারপরও বেঁচে থাকবে তুমি। আগে সজ্ঞানে কাছে না আসলেও, আজ সম্পূর্ণ সজ্ঞানে এসেছি। শাস্তি সরুপ। এই ঝামেলা কালকের মধ্যে সরিয়ে ফেলবে। মাইন্ড ইট?’
দরজার ওপাশ থেকে মৃদু কড়াঘাতের আওয়াজ পাওয়া গেলো। ভারি মেয়েলি কন্ঠস্বর। ক্রমাগত ডেকে যাচ্ছে অন্য এক রমনীর নাম করে। মিতু চোখ বুজে নিলো। ওপাশে ইয়াজ মির্জার দুনিয়া দাঁড়িয়ে আছে।। ভোর হয়েছে, আজান পরবে। তার জন্য হয়তো। ইয়াজ শক্ত কন্ঠে বললো,
—’ দশমিনিটের মাথায় ফ্রেশ হয়ে বাইরে যাবে। আবার রিপিট করছি– আমার দুনিয়া তছনছের চেষ্টা করলে দুনিয়া থেকে তোমাকে সরিয়ে ফেলতে এক মিনিটও লাগবে না আমার।’
—’ আপনার সেই দুনিয়ায় তিতির নামের মেয়েটাকে আনতে এতো মরিয়া? তাহলে নিয়ে আসছেন না কেনো?’
এতক্ষণে প্রথম মুখ খুললো মিতু। তিতিরের নামটা কানে আসতেই মস্তিস্কে অগ্নিবর্ষন হলো যেনো যুবকের। পুরুষালি লম্বা হাতের আঙুল গুলো মুঠো হয়ে এলো। চোয়াল কঠিন হলো। দাঁত কিড়মিড় করতে করতে একদম ঝুঁকে এলো মেয়েটার ওপর। হিসহিসিয়ে বলে উঠলো,
—’ সে কৈফিয়ত চাওয়ার তুই কে? তোকে মারছি না, এটাকে খুশি মনে করে সাহস দেখাবি না। আমার সার্থে অন্য কারোর হাত লাগলে তার সব গুঁড়িয়ে দেবো আমি। যাহ্, যা বললাম কর।’

—’ সব প্রমান ঈশান কে ইঙ্গিত করছে। এটা কি সত্যি? এটা সম্ভব? তোমার মনে হয় এটা? ‘
স্ত্রীর কথার প্রতিত্তোর করতে পারলো না সাজিদ। সারাদিনের ব্যাস্ততা পার করে খানিক আগেই বাড়ি ফিরেছে। এখনো গায়ের পোষাকও বদলায়নি। বিছানার ওপর থ মেরে বসে আছে। হাতের নিচে চেপে রাখা একগাদা কাগজপত্র অনিমা এক এক করে দেখে যাচ্ছে। মেয়েটা কাঁদছে। সাজিদেরও চোখ জ্বালা করছে কি? করছে তো। অনিমা বিছানায় ঠেকানো সাজিদের শীতল হাতের ওপর হাত ছোঁয়ালো। নরম কন্ঠে বললো,
—’ আমি, রিতু, রুষা সেই অল্প বয়স থেকে ওঠা বসা করেছি তোমাদের সাথে। তোমাদের ছেলেদের গ্রুপে এসে আমরা তিনতে মেয়ে ঢুকে গিয়েছিলাম। কখনো অন্য দৃষ্টিতে তো দূর, বাজে কোনো ইশারা ইঙ্গিত ও পাইনি কারোর থেকে। সারাটাজীবন ভাইয়ের মতো আগলে রেখেছে ওরা। ‘
সাজিদের মুখটা অন্ধকার হয়ে আছে। ঘর্মাক্ত মুখটা ডান হাতের উল্টো পিঠে মুছলো। শীতল কন্ঠে বললো,
—’ এই প্রমানগুলো আমি কাউকে দেখাইনি অনি। আমি নিজেই সহ্য করতে পারছি না। মানতে পারছি না। নিজের মধ্যে চাপা দিয়ে রেখেছি। কিন্তু কতদিন? আমি একজন পুলিশ অফিসার। চাকরি জীবনের কয়েক বছরের একটা দূর্নীতিও বর্দাস্ত করিনি আমি। কিন্তু আজ দেখো… আমি নিজের অজান্তেই থমকে আছি। একজন আসামি কে নিয়ে একগাদা প্রমান হাতে নিয়েও, আমি আমার করনীয় বুঝতে পারছি না।’
ভেজা চোখজোড়া ওড়নার অংশে মুছে ফেললো অনিমা। কাগজপত্র গুলো বিছানায় রাখতে রাখতে আচমকাই দৃঢ কন্ঠে বললো,

—’ আমি বিশ্বাস করি না, সাজিদ। ওই ছেলেটাকে আজ থেকে চিনি না আমরা! বুদ্ধি হওয়ার পর থেকে। যে বয়সে কোনো অনূভুতি তৈরিও হয়নি আমাদের, নারী পুরুষের পার্থক্য বুঝি না আমরা। তখন থেকে আজ পর্যন্ত। তোমরা এমন সেমন দুষ্টুমি করেছো। কিন্তু ঈশানকে কখনো এসব বিষয়ে কর্ণপাতও করতে দেখিনি। ‘
সাজিদ জবাব দিতে দ্বিধা করে সামান্য। অতঃপর শান্ত কন্ঠে বলে ওঠে,
—’ প্রমান অন্য কথা বলছে অনিমা। একটা প্রমান হাতে নিয়ে কথা বলছি না আমি। সব প্রমানই ঈশানের বিরুদ্ধে। সেই শুরু থেকে। শেষ অবধি তো ভিকটিমের নখে যে এভিডেন্স পাওয়া গিয়েছে, সেটাও ঈশানের ব্লাড গ্রুপের সাথে মিলে যায়। বাইক, ওর শার্টের বোতাম,টাইমিং…সবথেকে বড় কথা ও নিজ মুখে কেনো দ্ঢ় ভাবে অস্বীকার করে না। আমি নিজে ওর কাছে গিয়েছিলাম কথা বলতে, দেখা হয়নি। তবে ফোনে কথা হয়েছে। ও অস্বীকার করছে না এসব। কেনো!’
অনিমা স্তব্ধ হয়ে বসে রয়। ঈশান এই এলিগেশন গুলো অস্বীকার করছে না মানে!

—’ তবুও। কিছু একটা ভুল আছে সাজিদ। আমরা সারাজীবন যা চোখের সামনে দেখে যাই, আদতে কিন্তু তা না-ও হতে পারে। তাই না? কে জানে, আমাদের চোখে ধুলো দেওয়া হচ্ছে। ‘
এসব কি ভাবেনি সাজিদ! ভেবেছে। ভাবতে ভাবতেই তো এতদূর। নিজের অজান্তেই ঈশানের বিরুদ্ধের প্রমান গুলো লোপাটের চিন্তাভাবনায় মরিয়া হয়ে উঠেছে সে। নিজের কার্যক্রমে নিজেই লজ্জিত সে।
সাজিদ গম্ভীর অথচ মলিন সুরে বললো,
—’ আমি নিজেও মানতে পারছি না। ওপরে ওপরে প্রমানের বড়াই করলেও আমার অবচেতন মন বাঁধা দিয়ে যাচ্ছে বারংবার। আজ জানো কি করেছি আমি?’
সাজিদ ছেলেমানুষী ভঙ্গিতে কৈফিয়ত দেওয়ার উছিলায় ঘুরে বসলো অনিমার দিকে। অনিমার হাত দু’খানা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে ব্যাস্ত কন্ঠে বললো,
—’ কি করেছি জানো? ডিজি স্যার ডেকেছিলেন কি কি এভিডেন্স পেয়েছি বা কাউকে… ইউ ন্যো? আমি কি করেছি? আমি চুপ করে থেকেছি। সজ্ঞানে একটা বিশাল মিথ্যা কথাও বলে ফেলেছি। বলেছি আমি কেনো প্রমানই পাইনি। ‘
অনিমা স্পষ্টত দেখলো স্বামীর করুণ দশা। অপরাধবোধে জর্জরিত মুখখানা। বন্ধুর বিরুদ্ধে প্রমান সাজাতে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে বেচারা। দ্বিধাদ্বন্দ্বের চূড়ান্তে দাঁড়িয়ে আছে৷ অনিমা দু হাতে জড়িয়ে নিলো স্বামীকে। শান্ত সরে বললো,

—’ ঈশানের সাথে মুখোমুখি কথা বলো তুমি। কালই। তুমি যে ইয়াজ মির্জার কথা বলেছিলে? ওর বিরুদ্ধে প্রমান খোঁজো। রুষার পিছু ছেড়ো না। ওদের দুজনের কানেকশন আছে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস। ওটা ক্লিয়ার করো আগে। তারপর না হয়…’
তারপর! তারপর আর কি? কি বলতে চাচ্ছে অনিমা, সেটা খুব ভালো করে জানা আছে সাজিদের। কিছু সুবিধা করতে না পারলে শেষমেশ ঈশানকেই এরেস্ট করতে বাধ্য হবে সে।
—’ ইয়াজ মির্জা দেশে থাকে না। সিঙ্গাপুর থাকে। সেখানে লোকটার প্রকাশ্যে খুব একটা পরিচিতি নেই। প্রকাশ্যে তিনি অত্যন্ত ভালো মানুষ। একটা বুকশপের মালিক। তবে গোপনে অনেক কিছুই আছে। দেশে তার পাত্তা পাওয়া দায়, ওদিকে সিঙ্গাপুর সরকার তাদের নাগরিকের তথ্য ফাঁস করতে নারাজ। আর রুষা? রুষার বিরুদ্ধে প্রমান আমি অনেক আগে পেয়েছিলাম। সেটাও ঈশানই দিয়েছিলো। ওর বিয়ের দিন। সে-সব আমার কাছেই।’
অনিমার ভ্রু জোড়া কুঁচকে এলো।

—’তাহলে ওকে এরেস্ট করছো না কেনো?’
—’ ইয়াজ মির্জার খোঁজ পাওয়ার আসায়। রুষার বিরুদ্ধে সব প্রমান আছে, এটা জানলে ওই লোক রীতিমতো সিঙ্গাপুর গিয়ে মুখ লুকাবে। তখন?’
—’ নূরি কে কাজে লাগিয়ে…’
অনিমাকে থামিয়ে দিলো সাজিদ। স্ত্রীর বুক থেকে মাথা তুলে সজোরে মাথা নাড়লো ডানে-বায়ে। অনিমার বাক্যে না রাজি জানিয়ে বললো,
—’ আমার বিশ্বাস নূরির সাথে এখন আর যোগাযোগ নেই লোকটার। কারণ এর মধ্যে নূরির ফোনে কোনো যোগাযোগ করা হয়নি। তাছাড়া এলাকাতেও দেখা করেনি ওরা। ‘
—’এসবও যদি চোখের ধুলা হয়?’
—’ তা কি করে হয়? নূরি কেনো করবে এসব। ‘
—’ ঈশানকে ফাঁসাতে! আর…
ভ্রু কুচকে তাকালো সাজিদ। কথার পিঠে প্রশ্ন ছুড়লো,
—’আর?’
—’ ভালোবাসায় অন্ধ হয়ে ইয়াজকে বাঁচাতে। ‘
থমকায় সাজিদ। নড়েচড়ে বসে। ঠান্ডা কন্ঠে শুধোয়,
—’ ইয়াজ মির্জার নামে এ দেশে কোনো ক্রিমিনাল রেকোর্ড নেই। ‘
অনিমা ভ্রু জোড়া উঁচিয়ে বলে ওঠে,

—’ তা কি করে বললে? তোমরা যে বললে ইয়াজ মির্জা নামে এদেশে কারোর অস্তিত্বই নেই। তাহলে?’
মাথা ভনভন করে উঠলো সাজিদের। ইয়াজের খোঁজ তারা পেয়েছিলো রুষার বিরুদ্ধে ওই এভিডেন্স গুলোরকে তাড়া করে। হ্যা, এটা সত্যি – ওই নামে এ দেশে কারোর অস্তিত্ব তারা খুঁজে না পেলেও সিঙ্গাপুরে পেয়েছে। রুষার কারবারও সব সিঙ্গাপুর মুখি। তবে এসবের সাথে বর্তমান কেসের কোনো সাদৃশ্য খুঁজতে যায়নি তারা। ওটা ড্রাগ কেস, আর এটা! এটা তো অন্য রকম। তাছাড়া খোঁজ নিয়ে জেনেছে খুনের ওই সময় গুলোতে ইয়াজ মির্জা সিঙ্গাপুর। কোনো ফ্লাইট লিস্টেও তার নাম নেই। তাহলে? কি করে সেই পুরুষটি হয়? অন্য দিকে ঈশানের বিরুদ্ধে এভিডেন্স স্পষ্ট। কিছু একটা মিস করে যাচ্ছে সে। খুব ভাইটাল কিছু। ইয়াজ মির্জাকেও মিস করে যাচ্ছে! নয় কি!

নিস্তব্ধ ঘরের ওপাশে প্রকৃতির তান্ডব চলছে জোরেশোরে। ঘূর্ণিঝড় হওয়ার কোনো পূর্বাভাস ছিলো কি-না মনে করা গেলো না। আধখোলা জানালা টা আর আধখোলা নেই। হাওয়ার গতিতে তা বারংবার সজোরে শব্দ করে ধাক্কা খেয়ে যাচ্ছে। জানালার এপাশে লাগোয়া পড়ার টেবিলের ওপরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখা ঈশানের একগাদা ফাইলপত্র ভিজে একসাড়। ধরলে সম্ভবত ছিড়ে ছিড়ে আসবে কাগজের অংশগুলো। দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে তিতির। এতক্ষণ কাঁদছিলো মেয়েটা। ক্ষনিকের পার্থক্যে সেই কান্না শুকিয়েছে। সুশ্রী, মায়াবী মুখটা বরফ শীতল। চোখের পলক ফেলতেও যেনো ভুলে গিয়েছে মেয়েটা। দু’হাতে জামার অংশ চেপে পাথর হয়ে আছে।
ঈশান মুখোমুখি দাড়ালো। দুই মানব মানবীর মধ্যে সামান্য একটু ফাঁক। অন্য সময় হলে একে অপরের নিঃশ্বাস অনূভব করতে পেরে শিউরে উঠতো হয়তো দু’জনেই। লাজুক মুখটা নত করে ঘন ঘন শ্বাস, উত্তাল বুকের ওঠানামা আড়াল করতে চাইতো তিতির। তবে আজ তা ঘটলো না। ঈশানের ভেজা শরীরে এখন ঘামে ভিজে উঠেছে। উদাম, বলিষ্ঠ দেহের প্রতিটি কারুকার্যগুলো জ্বলজ্বল করছে সিক্ত হয়ে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে মূহুর্তটা অন্য রকম হতো বুঝি। উথাল-পাতাল বুকের ঝড় থামতে সামনের পুরুষের ওই সিক্ত দেহ টা আঙুলে ছুঁয়ে দিতো কি মেয়েটা?
ঈশান কম্পিত হাতে বারংবার ছুঁতে চাইছে তিতিরকে, কিন্তু অজানা অপরাধবোধ থেকে থমকে যাচ্ছে হস্ত দু’খানা। ঈশান দাঁতে ঠোঁট কামড়ে ধরলো। অস্থিরতা কমানোর প্রয়াস। কথাগুলো জড়িয়ে আসছে, গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলো মনে মনে। হচ্ছে না। কন্ঠস্বর কাঁপছে, কাঁপছে সর্বাঙ্গ। ঈশান শুকনো ঢোক গিলে অসহায় কন্ঠে বললো,

—’ আমার মুখে ভালোবাসি শব্দটা শোনার তোর বহু দিনের ইচ্ছে। তাই না? সেটা বলার সুযোগ দিবি না?
সামনের মানুষটার কৈফিয়ত শোনার প্রয়োজন আছে তো নাকি? কি দেখলি, কি শুনলি সে-সবের থেকে আমি কি বললাম, সেটা শোনা বেশি ইম্পরট্যান্ট নয় কি? ‘
তিতির কোনো ধরনের প্রতিত্তোরই করলো না এবারেও। ঘূর্ণিঝড়ের বিশাল প্রভাব এসে পরেছে তাদের দাম্পত্য জীবনেও। গোছানো একটা সম্পর্কের ভিত নড়ে উঠেছে ভয়াবহ ভাবে। তছনছ হতো আর সামান্য একটু বাকি। ঈশান দু’হাতে মুখ ডললো নিজের। হা করে শ্বাস নিলো জোরে জোরে। অতঃপর তিতিরকে উদ্দেশ্য করে বললো,
—’ ভালোবাসি আমি,তোকে খুব ভালোবাসি।
এতক্ষণ তো অনেক কথাই বলছিলি, এখন আমি বলি একটু? আমার কথা গুলো শোন।’’
তিতির আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে রয়। ঈশানের স্পর্শ যে তার পছন্দ হচ্ছে না, সেটার ছাপ মেয়েটার চোখেমুখে। ছটফট করে ওঠে যুবকের হৃদয় খানা। মেয়েটার মুখের এই ঘৃনায় সে কখনো অভ্যস্ত হতে পারবে না। সম্ভবই নয়। তিতির কন্ঠস্বর নিচু অথচ ভীষন দৃঢ় করে বলে ওঠে,
—’ আমাকে স্পর্শ করবেন না। এটা আপনার কাছে আমার অনুরোধ। আমার প্রতি বিন্দুমাত্র অনূভুতি যদি থেকে থাকে, তাহলে আমার কসম। আপনি ছোঁবেন না আমাকে। ‘
তিতির এবার ঈশানের দৃষ্টিতে তে দৃষ্টি মেলালো। মেয়েটার টানা টানা আখিজোড়া রক্তলাল দেখাচ্ছে।অগ্নিবর্ষন হচ্ছে সেখান থেকে।

—’ আমার যা সর্বনাশ করার করে ফেলেছেন। যথেষ্ট হয়নি কি? আমার সম্মতিতে ছুঁয়েছিলেন আমাকে। সুতরাং আমি আপনার নামে ধ*র্ষন মামলা ঠুকতে পারছি না। কারণ আপনি আমার বৈধ স্বামী। দূর্ভাগা আমি, কিচ্ছু করনীয় নেই। নিজের নারী জীবনের সব সঁপে দিয়েছি আপনাকে। নিজের সব খুয়িয়ে বসে আছি। কিচ্ছু নেই। বাবা, মা, নিজের পরিবার আগেই নেই। আপনার মতো একটা মানুষ কে বিয়ে করার অপরাধে এখন এই পরিবারটাও হারাতে হবে আমার। ‘
ঈশান উদভ্রান্তের মতো ছুঁয়ে বসে তিতিরকে। দু’হাতের আজলায় আঁকড়ে নেয় রমনীর মুখটা। থরথর করে কেঁপে ওঠে মেয়েটা। হয়তো ঘৃনার তীব্রতায়। ঈশান ঝরঝর করে কেঁদে ফেললো। ছটফট করে ওঠা হৃদয় টাকে দমিয়ে, ব্যাগ্র কন্ঠে আর্তনাদ করে উঠলো,
—’ আমাকে ছেড়ে কোথায় যাবি তুই। কে আছে তোর আর? আমার কি হবে তারপর? তোকে ছাড়া বাঁচা শিখিয়ে দিয়ে যা, তিতির। তোকে ছাড়া কিভাবে বাঁচবো সেটা বুঝিয়ে, শিখিয়ে তারপর যেখানে যাবি যাহ্।’
তিতির বাঁকা হাসলো। পাথরের মতো স্তব্ধ সে এখনো অবধি।
—’ বিবাহিত জীবনের তিনমাস মাত্র। এতোটা প্রেমে কবে পরে গেলেন, দেওয়ান সাহেব? হু? অপছন্দের এই আমি হুট করে বেঁচে থাকার কারণ! হাস্যকর।’
তিতিরের কথাগুলো কেমন অস্পষ্ট লাগলো ঈশানের কাছে। মেয়েটার বাঁকানো কোমড়ে থাবা বসিয়ে চেপে ধরলো দেয়ালের সাথে। কানের নিম্নাংশ অন্য হাতে আকড়ে ধরে কপালে কপাল ঠেকালো। হিসহিসিয়ে বললো,

—’ মায়া জানিস তুই, জাদু জানিস। ‘
—’ আপনিও জানেন। মায়া। আর এটা ভয়ংকর ঈশান আরশাদ দেওয়ান। মায়া, ছলনা বড্ড ভয়ংকর। আপনি আমার সাথে তাই করেছেন। এতো এতো মেয়ের দেহের স্বাদ নিয়েছেন। তারপরও আমিও ভিকটিম কেনো হলাম। আমাকেও কেনো…আমাকে বিয়ে করে, সাজিয়ে গুছিয়ে বৈধ উপায়ে চরিত্রহনন করলেন। ছিহ্’
ঈশান ব্যাস্ত হয়। সে যা বলতে চায় বলতে পারছে না কেনো? গলায় আটকে আসছে। সব কথাই বলতে পারছে, ওই একটা কাঙ্ক্ষিত কথা বাদে। ঈশান মুখ খুললো পুনরায়। উহু, এবারও কি এক অজানা আতঙ্কে কথাগুলো উচ্চারিত হলো না। তিতির এ যাত্রায় সরে যেতে সজোরে ধাক্কা দিলো ঈশানকে। চেঁচিয়ে উঠলো একপ্রকারে।
—’ আমার গা গোলাচ্ছে ঈশান ভাই। প্লিজ সরে যান। মুক্তি দিন আমাকে। মুক্তি দিন।’
ঈশান চেপে ধরলো মেয়েটার মুখ। দাঁতে দাঁত চেপে হিসহিসিয়ে বললো,
—’ উহু, সম্ভব না। কতবার বলতে হবে? মৃত্যু ছাড়া তোর আমার বিচ্ছেদের কোনো পথ আমি রাখবো না তিতির। এতো সহজে আমাকে ছেড়ে যেতে পারিস না তুই। আমার কথাগুলো শুনতে হবে তোকে।’
কোথা থেকে মেয়েটা এতো শক্তি পেলো কে জানে। নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে ঈশানকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলো একপ্রকারে। চোখের পলকে সরে এলো ওখান থেকে। বেড সাইট টেবিল থেকে উদভ্রান্তের মতো খুঁজে বের করলো কিছু একটা। ঈশান থমকালো, তার রিভলবারটা কোথায় রাখা? ওখানেই কি? কিন্তু ওটা তো লক করা ছিলো। চাবি? চাবি তার ওয়ালেটে। মেয়েটা অবলীলায় কিভাবে খুলে ফেললো ড্রয়ার টা। সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে এগোতে যাবে, তার আগেই আচমকা মেয়েটার হাতে কিছু একটা ছোট্ট শিশি চোখে পরতেই হত-বিহবল হয়ে গেলো ঈশান! এই বোতল এই মেয়েটার হাতে এলো কোত্থেকে! মেয়েটা এটা বের করেছে কোথা থেকে! ঈশান কিছু বলবে তার আগেই ঢকঢক করে মুখে নিয়ে নিলো সে-ই বোতলের তরল টুকু! টলে উঠলো মেয়েটা। মুখটা বিকৃত হয়ে এলো তৎক্ষনাৎ।
কেমন বুনো উল্লাসে হেসে উঠলো মেয়েটা। হাতের শিশিটা ছুঁড়ে দিলো ঈশানের পায়ের কাছে। শব্দ করে হাসির মাঝেই বলে উঠলো,

—’ এটাই চাচ্ছিলেন? নিন, পূরণ করলাম আপনার ইচ্ছেটুকু। আপনি বলেছিলেন মৃত্যু বাদে আর কোনো উপায় নেই আমাদের বিচ্ছেদের, আর আমি বলেছিলাম যদি সেই পথেই হাঁটতে হয়– সাচ্ছন্দ্য সেই মৃত্যু আমিই গ্রহন করবো। করলাম…আমার কথা রাখলাম আমি। আপনার ভালোবাসার বিষ উগরে দিতে, বিষই পান করলাম। দিলাম, আমিই মুক্তি দিলাম…’
ঈশানের হত-বিহবলতা তখনো কাটেনি। মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকা দুটো মানব মানবীই হাঁটু ভেঙে বসে পরলো। ঈশান খপ করে হাতে তুলে নিলো বোতলটা। বোতলের গায়ের নাম দেখে রক্তশূন্য হয়ে এলো চেহারা। তিতিরের খোলা চুলগুলো ততক্ষণে মেঝেতে ছড়িয়ে গিয়েছে। সাদা তরল বের হচ্ছে মুখ দিয়ে। ঈশান আর্তনাদ করে উঠলো। উন্মাদের মতো হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে এলো মেয়েটার দিকে। আটকে আসা শব্দগুলো উচ্চারন করলো কোনোমতে।
—’ এই পাগলী, এই…কোথায় যাচ্ছিস আমাকে ছেড়ে? এই তিতির? কি খেলি এটা? তোর মুখে সাদা এগুলো কি? বিষ? তিতিইইর?’
ঈশান স্পষ্ট খেয়াল করলো মেয়েটার চোখজোড়া উল্টে আসছে। মুখটা নীল হয়ে আসছে। তিতির সেভাবেই অস্ফুটস্বরে বললো,

—’ আমাকে স্পর্শ করবেন না। বিষের প্রতিটি কনা আমার দেহের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বাহিত হবে এখন। বাঁচার জন্য ছটফট করবো। শেষ সময়ে সব ভুলে হয়তো আপনাকে কাছে পেতে মরিয়াও হতে পারি। আপনি সায় দেবেন না। বাঁচার আকুতি করে মেঝেতে কাতরালেও না। এটা আমার শেষ ইচ্ছে। ছোঁবেন না আমাকে। আপনার মতো একজন ধ*র্ষকের স্পর্শ জীবনের এই শেষ মূহুর্তে নিতে চাইনা আমি। ‘
কথাটা বলতে বলতেই মুচড়িয়ে উঠলো মেয়েটার শরীর। ঈশান আরেকদফা বাকরুদ্ধ হলো। মেয়েটার নাক,মুখে লাল ওগুলো কি? রক্ত? ঈশান কাতরাতে থাকা রমনীকে সত্যি স্পর্শ করলো না। নাকি করতে পারলো না? পারলো না বোধহয়। দু হাত মেঝেতে ছুঁয়ে মাথা ঠেকালো মেঝেতে। শব্দ করে কেঁদে ফেললো, ভাঙা কন্ঠে বললো,
—’ আমার মৃত্যু কবুল, তিতির। তুই কোথায় যাচ্ছিস? আমার শেষ কথাটুকু না শুনে আমাকে শেষ বিদায় দিয়ে দিলি? চলে যাসনা… আমিও বাচবনা…তিতিইর? যেতে না করেছি কিন্তু। ‘
হাতের কবজিতে সামান্য একটু ছোঁয়া লাগতেই দূর্বল হাতটা সরিয়ে নিলো মেয়েটা। দু’টো শব্দ উচ্চারন হলো শুধু।
—’ ছোবেন না, প্লিইজ।’

ঈশানের আজ ধ্বংসের দিন। শ্বাস নিতে পারছে না, মুখের শব্দ আটকে আসছে, সামনের নারীটি মৃত্যুসয্যায় কাতরাচ্ছে অথচ তার স্পর্শ করার অনুমতি অবধি নেই। অদৃশ্য দেয়াল সামনে। কে যেনো টেনেহিঁচড়ে পিছনে নিয়ে যাচ্ছে তাকে। তিতিরের থেকে দুরত্ব বাড়ছে কেনো তার? শেষ একটাবার কি ওই নারীটির ঠোঁটের স্পর্শ পাবে না সে, বুকে জড়িয়ে ছটফট করতে থাকা হৃদপাখি টিকে শান্ত করতে পারবে না? মেয়েটা এইটুকুও দিয়ে যাবে না তাকে? ঈশান আরেকদফা আকুতি করে উঠলো। ভালোবাসার ভিক্ষা চেয়ে কেঁদে উঠলো কঠিন পুরুষটি।
—’ একটা চুমু এঁকে দিবি এই ঠোঁটে? হয় এ জীবনে পুরোটা সাথ দে, নয়তো সঙ্গে নিয়ে চল। তোকে ছাড়া এ জীবনের মায়া আমারও ফুরিয়েছে।’

তিতির আর জবাব দিলো না। ছটফট করতে থাকা দেহখানা শান্ত হলো আচমকা। ঈশান থমকে গেলো এক মূহুর্তের জন্য। পরক্ষণেই হু হু করে কেঁদে উঠলো। মেয়েটাকে কাছে না পাওয়ার আক্ষেপের শব্দ বারি খেলো চার দেয়ালের মধ্যে। ঈশান হুড়মুড়িয়ে হাত বাড়ালো তিতিরকে কাছে টানতে। যুবকের এই আর্তনাদে বোধহয় প্রকৃতিও কেঁদে উঠলো। হুংকার করে উঠলো আকাশ। প্রচন্ড শব্দে বজ্রপাত হলো। ধরনী কাপলো ভূমিকম্পের মতো করে। তিতিরের নিষ্প্রাণ দেহটা রক্তশূণ্য, ফ্যাকাসে। ঈশান হাত বাড়িয়ে রমনীর নরম হাতটা ধরতে যাবে তখনই অনুভব করলো খাদের কিনারা গড়িয়ে পরে গেলো মেয়েটা। মেয়েটার নাম ধরে চিৎকার করে উঠলো ঈশান। এবার আর নামটা অবধি মুখে উচ্চারিত হলো না। আটকে আসা শ্বাস বুকেই আটকে এলো। আকাশপাতাল এক করে চিৎকার করে উঠলো ঈশান।

—’ তিতিইর!’
বিছানায় লাফিয়ে বসলো ছেলেটা। চিৎকার টা সে আদতে বাস্তবেও করেছে। উদাম শরীরে শুয়েছিলো শাওয়ার নিয়ে এসে। তিতিরকে দেখতে দেখতে কখন ঘুমের দেশে পারি দিয়েছে টেরই পায়নি। ফজরের আজান শুনতে পাওয়া যাচ্ছে। সকাল হয়ে এসেছে!
তিতিরেরও ঘুম ভেঙেছে তৎক্ষনাৎ। হুড়মুড়িয়ে উঠলো মেয়েটাও। কোমড় অবধি টেনে রাখা চাদর টা একটানে সরিয়ে ফেললো ঈশান। ফুল এসিতেও ঘেমে বিছানা সহ ভিজে উঠেছে। তিতির দু’হাতে ঈশানের বাহু আকড়ে ভয়ার্ত মুখে আর্তনাদ করে ডেকে উঠলো,
—’ এই…কি হয়েছে? ঈশান ভাই? স্বপ্ন দেখেছেন? হ্যা? ভয় পেয়েছেন?’
তিতিরের কথাগুলো সম্ভবত ঈশানের কর্নগেচর হলো না। ছেলেটার বুকের খাঁচার ভিতরে থাকা অঙ্গটা লাফিয়ে বের হয়ে আসছে যেনো। দু’হাতে বিছানার চাদর আঁকড়ে হা করে শ্বাস নিয়ে যাচ্ছে ক্রমাগত। কপাল গড়িয়ে ঘামের কণাগুলো দরদর করে গড়িয়ে পরছে। মাথার লম্বা চুলগুলো লেপটে আছে কপালের সাথে। দৃষ্টি অপরদিকের দেয়ালে। যেখানে এতক্ষণ কাতরাচ্ছিলো তিতির! সব স্বাভাবিক। গোটা ঘরটা স্বাভাবিক। বাইরে কোনো ঝড়বৃষ্টির ছিটেফোঁটা অবধি নেই। জানালা বন্ধ করে রাখা। স্বাভাবিক গতিতে এসি চলছে। সিলিং ফ্যান ঘুরছে মাথার ওপরে। ঈশানের হাতটা পুনরায় ঝাঁকিয়ে ব্যাস্ত কন্ঠে তিতির ডেকে উঠলো,
—’ অ্যাই, শুনছেন… ডাকছি তো। ‘

ঈশান এ যাত্রায় উদভ্রান্তের মতো পাশে চাইলো। এতক্ষণের ঘোর কাটতেই সজল হলো অক্ষিপট। ওপাশের দেয়ালের দিকে, মেঝের দিকে এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে তিতিরকে জড়িয়ে নিলো নিজের বাহু বন্ধনে। বুকের বাঁ পাশে চেপে ধরলো মেয়েটাকে। স্বামীর ঘর্মাক্ত শরীরটা কে দু’হাতে আগলে নিলো তিতির। পিঠে হাত বুলিয়ে আদুরে কন্ঠে তৎক্ষনাৎ শুধালো,
—’ খারাপ স্বপ্ন দেখেছেন? এতটা ভয় পেয়েছেন।’
কথার পিঠে হাতের বাঁধন দৃঢ় হলো আরও। মেয়েটাকে ঝটকা টানে বিছানা থেকে নিয়ে এসে ফেললো নিজের কোলের ওপর। কাঁধে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে উঠলো। পুরুষালী দেহটা থরথর করে কেঁপে উঠলো কান্নার রেশে। তিতির থমকালো, চমকালো। ঈশান কি কেঁদে উঠলো এই মাত্র! নাকি এটাও স্বপ্নের ভয় থেকে। রমনীর কোমল হৃদয় ক্ষতবিক্ষত হলো স্বামীর এই কান্নায়। চোখে পানি চলে এলো তারও। ঈশান কথা বলছে না। হাঁপাচ্ছে এখনো। দীর্ঘ দিনের বন্দি কয়েদি আলোর দেখা পেয়েছে, প্রান ভরে শ্বাস নিতে পারছে যেনো।
তিতির আর কোনো প্রশ্ন করলো না। শক্ত করে জড়িয়ে রেখে স্থির হলো নিজেও। মাথা এলিয়ে দিলো ঈশানের কাঁধে। সময় পেরোলো। সেকেন্ডের কাটা ঘুরে, মিনিটে ঠাঁই নিলো। একক ঘর ছেড়ে দশকের ঘরে এবারে! তিতির ঘেমে উঠেছে নিজেও। ঈশান এখনো দরদর করে ঘামছে। সামান্য হাত বাড়িয়ে এসির রিমোট টা অবধি নিতে পারেনি ছেলেটার হাতের বাঁধনে। একবিন্দুও শিথিল হয়নি সে বাঁধন। তিতিরও আর চেষ্টা করেনি। ঈশান শান্ত হলো। খানিকটা ঘন ঘন নিঃশ্বাসের গতি কমে এসেছে। গরম নিঃশ্বাস একটু কম অনূভব করতে পারছে নিজের কাঁধে।
তিতিরের নরম কোমল ছোট্ট হাতটা অনবরত বুলিয়ে যাচ্ছে ঈশানের বলিষ্ঠ, পেশল পিঠের ওপর। এ যাত্রায় খানিকটা শান্ত হলো ঈশান। মেয়েটা সেটা টের পেতেই মুখ তুললো সিক্ত কাঁধের ওপর থেকে। ফজরের আজান হচ্ছে। সুমধুর ধ্বনি শোনা যাচ্ছে আজানের। পাখির কিচিরমিচির শব্দ শুনতে পাওয়া যাচ্ছে। সঙ্গে কুকুরের আওয়াজ। তিতির হাতের তালুতে ঈশানের মুখের ঘামটুকু সযত্নে মুছে নরম গলায় শুধালো,

—’ এবার বলা যায়? স্বপ্ন দেখছিলেন? হুম?’
বাধ্য পুরুষের মতো ওপর নিচ মাথা ঝাকালো ঈশান। চোখজোড়া রক্তিম হয়ে ফুলে উঠেছে। অসহায় মুখে তাকিয়ে আছে। পলকহীন দেখে যাচ্ছে তার সাথে লেপটে থাকা রমনীকে। কি ভয়ংকর বাস্তব স্বপ্ন। ক্ষুনাক্ষরেও মনে হয়নি বাস্তবতায় ঘটছে না সে-সব। হৃদপিন্ডের দ্রিমদ্রিম এখনো কমেনি বিন্দুমাত্রও। ঈশান এতক্ষণে কিছু বলার জন্য মুখ খুললো। অস্ফুটে বললো,
—’ তুই… তুই.. আমাকে।’

তিতির মাথা ঝাকিয়ে আশকারা দিলো, কি বলতে চায় ঈশান–শুনতে ব্যাস্ত সে। ঈশান কথাটুকু শেষ করলো না। একহাতে কোমড় খামচে, অন্য হাতে মেয়েটার চুলের নিচ গলিয়ে গ্রীবাদেশ চেপে কাছে টেনে, বিনাবাক্যে অধর ছোয়ালো স্ত্রীর পাতলা অধরজোড়ায়। হামলে পরলো একপ্রকার। নরম ছোঁয়ায় স্থির রইলো না মোটেই। বহুদিনের ক্ষুদার্ত যেনো সে। উন্মাদের মতো শুষে নিতে থাকলো মেয়েটার অধরসুধা। ছেলেটার চোখের পানি গড়িয়ে তিতিরের গাল স্পর্শ করতেই, লাজুকতা ভুলে তাকালো মেয়েটা। ঈশান আজ বড্ড মনোযোগি, বন্ধ চোখে আগ্রাসন চালাচ্ছে মেয়েটার অধরোষ্ঠে। তাল মিলিয়ে উঠতে পারছে না তিতির নিজেও। দু-হাত স্বামীর কাঁধ খামচে ধরে সয়ে যাচ্ছে এই উন্মাদনা। মিনিটের কাটা ঘুরতে ঘুরতে পেরিয়েছে দীর্ঘ দশটা মিনিট। ঠোঁট জ্বালা করছে তিতিরের, সম্ভবত কেটে গিয়েছে। নোনতা অনূভব হচ্ছে ক্রমাগত। ব্যাস্ত ভাবে নিজের দিকে টেনে নিচ্ছে ঈশান। এক মূহুর্তের জন্য ছাড়লেও, তড়িৎ কামড়ে ধরছে নিচের অধরখানা। কামড় বসাচ্ছে ঘনঘন। পুনরায় আলতো টেনে নিবারন করছে ব্যাথাটুকু।

ঈশান থামলো, তিতিরের চুলগুলো হাতের মুঠোতে চেপে কপালে কপাল ঠেকিয়ে রাখলো। শ্বাস নিচ্চে দু’জনেই। চোখমুখ ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চাচ্ছে মেয়েটার। ফর্শা মুখটা টকটক করছে একপ্রকার। ঈশান খানিকটা নিজেকে ধাতস্থ করেই কাতর কন্ঠে বলে উঠলো,
—’ এক মূহুর্তের জন্য ভেবেছিলাম তোকে হারিয়ে ফেলেছি আমি। বিশ্রী দুঃস্বপ্ন। খুব বিশ্রী। স্বপ্নেও আমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছিলি। আমি বাঁচতাম কি করে। মরে যাচ্ছিলাম।’
তিতির বুঝলো গোটাটা স্বপ্ন সম্ভবত তাকে নিয়েই ছিলো। জিবে ঠোঁট ভিজিয়ে নিলো। জ্বলে ছারখার হয়ে যাচ্ছে। সে-ও স্থির হয়েছে এবারে। ঈশানের এমন আকুতি আগে কখনো দেখেনি মেয়েটা। হৃদয় দুমড়েমুচড়ে উঠলো। দু’হাতে খসখসে মুখটা নিজের ছোট হাতের আজলায় নিয়ে ঠোঁট ছোঁয়ালো ঈশানের পুরো মুখে। শীতল ললাট, নাকের ডগা, দু গাল, চিবুক সবশেষে পোড়ো ঠোঁটটায় শব্দ করে ভেজা চুমু এঁকে মুখ তুললো। আদুরে কন্ঠে বলে উঠলো,

—’ কি দুঃস্বপ্ন দেখেছেন। আমি শুনতেও চাইনা। কিন্তু বললেন আমি চলে যাচ্ছিলাম আপনাকে ছেড়ে। বাকিটা শোনার প্রয়োজনবোধ করলাম না আমি। যেটা কখনো হবার নয়, সেই দুঃস্বপ্ন শুনে সময় নষ্ট করবো কেনো আমি? হুম? কোথায় যাবো? কেনো যাবো? আপনিই বা কেনো যেতে দেবেন? এতো শরীরে এতো কসরত করে জোর বানিয়েছেন কেনো? ‘
তিতির আঙুল ঠেকালো ঈশানের বুকের বাঁ পাশে। জায়গাটা চিহ্নিত করে বললো,
—’দু’হাতের বাধনে এইখানাটায় শক্ত করে চেপে রাখবেন। এই বুকের মালকিন তো আমিই। এই মালিকানা আমি ছাড়বো কেনো? পাগল নাকি?’
—‘ ভালোবাসি, ভালোবাসি ,ভালোবাসি, তিতির। উন্মাদের মতো ভালোবাসি। যতটা ভালোবাসলে তোর জন্য মৃ*ত্যু কবুল, ততটা।’
তিতির ঈশানের অশ্রুসিক্ত চোখ জোড়ার পাতায় চুমু আঁকলো। শুষে নিলো যুবকের অশ্রু টুকু। শান্ত কন্ঠে বললো,

—’ ওই গানটা যেনো কি… শুনেছেন? “আমায় ছেড়ে কোথায় যাবে তুমি…!’ শুনেছেন গানটা? হুম? আমি উল্টো করে গানটা বলি হ্যা?
“ তোমায় ছেড়ে কোথায় যাবো আমি,
বলবে কে আর এমন করে “ভালোবাসি?’
ঈশান শক্ত করে চেপে ধরলো তিতিরের ধনুকের ন্যায় বাঁকানো কটিদেশ। চোখ বুঝে চারটে লাইন আউরালো কোনো সুর ছাড়া।

সাঁঝের মায়া পর্ব ৫৯

—‘ আমায় দিও একটুখানি ছুঁয়ে
আমায় দিও একটুখানি মন
এই জনমের জন্ম-মৃত্যু জানে
তুমি ছাড়া শূন্য এ জীবন।’
ঈশানের অসহায়, অশ্রুসিক্ত মুখটার ওপর আরেকদফা ঠোঁট বুলিয়ে গেলো মেয়েটা। আচমকাই কেঁদে ফেললো। হু হু করে। আজ প্রথম ঈশান ” ভালোবাসি” শব্দটা বললো! এটা শুনতে চেয়েছিলো তো সে। খুব করে শুনতে চাইতো, স্বামীর মুখে ভালোবাসি শব্দটা! তিতির মুখ এগিয়ে নিয়ে কানের কাছে নিয়ে কান্না আটকে ফিসফিসিয়ে বলে উঠলো,
—’ তোমায় ছেড়ে কোথায় যাবো আমি? কোথাও যাবো না, কোথাও যাবো না।’

সাঁঝের মায়া পর্ব ৬১

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here