সিকান্দার শাহ্ পর্ব ৪৪
Raiha Zubair Ripti
ইমাম সাহেব কিছুক্ষণ বিনোদিনীর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। রাতের নীরবতায় মসজিদের টিনের চালে চাঁদের আলো এসে পড়েছে। বিনোদিনীর চোখমুখ গম্ভীর, দৃষ্টি নত মাটিতে। ইমাম সাহেবের বয়স হয়েছে কিছুটা। চোখেও আগের মতো পরিষ্কার দেখেন না। চেয়ারম্যান বাড়ির হিন্দু মেয়েটা এসেছে মুসলিম হতে! কারণ কী? ওর বাপ জানে? যদি জানে, তাহলে আসতে দিল কী করে? আর যদি না জানে, তাহলে যখন জানবে, তখন কী হবে!
ইমাম সাহেবকেই বা কী করবে? মেরে টুকরো টুকরো করে নদীতে ভাসিয়ে দেবে না তো? এতসব ভাবনায় কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ধীরে বললেন,
“তুমি হঠাৎ ইসলাম গ্রহণ করতে চাইতাছো কেন, বিনু?”
বিনোদিনী বিরক্ত চোখে তাকাল। সেই সঙ্গে ঠোঁটের কোণে তীক্ষ্ণ হাসি ফুটে উঠল। “কেন? মুসলিম হতে গেলে কি কারণ দেখাতে হবে?”
ইমাম সাহেব নড়েচড়ে বসে বললেন, “না। কিন্তু ইসলাম তো শুধু একটা পরিচয় না, বিনু। এর লগে অনেক কিছু জড়ায় আছে। কালেমা পড়ানোর আগে জানতে চাই, কোন বিশ্বাস থিকা তুমি এই সিদ্ধান্ত নিছ?”
বিনোদিনী এবার সরাসরি তাঁর চোখের দিকে তাকাল।
“আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এতটুকুই তো যথেষ্ট।”
“হঠাৎ?”
“হঠাৎ নয়।”
“তাইলে? তোমার আব্বা জানে?”
” না জানে না। কাউকে জানাই নি। আর আপনিও জানাবেন না। আমি লুকিয়ে ইসলাম গ্রহন করতে আসছি। ”
” কী বলো! তোমার আব্বা যহন পরে জানতে পারবো,তহন কী হইবো ভাবছো সেটা নিয়া? ”
” বাড়ি থেকে বের করে দিবে,সম্পর্ক ছিন্ন করবে,টর্চার করবে,ঘরবন্দী করে রাখবে। না হয় মেরে ফেলবে। এই তো। এর বেশি তো আর কিছু করতে পারবে না। ”
” জানার পরও ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে চাইতাছো! বিনু আরেকবার ভাবো। ধর্ম কিন্তু খেলার জিনিস না। ”
বিনোদিনী বিরক্ত হয়ে নিঃশ্বাস ফেলল। “আপনি কি আমাকে মুসলিম বানাবেন, নাকি শুধু বকবকই করে যাবেন?”
ইমাম সাহেব মৃদু গলায় বললেন,
“আমি শুধু নিশ্চিত হইতে চাইছিলাম, তুমি বুইঝা-শুইনা ধর্ম বদলাইতাছো কি না। ”
“আমি জানি সব, ইমাম সাহেব। কথা না বাড়িয়ে আমার কাজটা সম্পূর্ণ করেন।”
কথাটা বেশ তীক্ষ্ণভাবেই ছুড়ে দিল বিনোদিনী। ইমাম সাহেব কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আবার বললেন,
“কেউ তোমারে কোনো কথা কইছে? কারও প্রতি টান থেইকা কি এই সিদ্ধান্ত তুমার?”
বিনোদিনীর চোখে এবার ক্ষণিকের জন্য আগুন জ্বলে উঠল।
“আপনার প্রশ্নগুলো আমার ভালো লাগছে না। আপনি বড্ড প্রশ্ন করছেন।”
“আমি সত্যটা জানতে চাই, বিনু। হুট কইরা এই সিদ্ধান্ত কেন নিলা? আমাকে সত্যটা বলো। কী দেইখা তুমি ইসলামের প্রতি টান অনুভব করলা?”
“সত্য এটাই যে আমি ইসলাম গ্রহণ করতে চাই। এর চেয়ে বেশি আর কিছু জানার প্রয়োজন নেই।”
“কিন্তু কেন ইসলামই? আল্লাহর জন্য?”
বিনোদিনীর মুখ মুহূর্তেই শক্ত হয়ে গেল। ধুর! এই বুড়ো এত প্রশ্ন কেন করছে? তার কাছে কেউ মুসলিম হতে চাইছে। সে কালেমা পড়িয়ে দেবে, ব্যস। এতে তো তারই সওয়াব হবে। লোকটা সওয়াব না কামিয়ে বিনোদিনীকে প্রশ্নই করে যাচ্ছে! সে কোনো উত্তর দিল না।
তার চোখের আড়ালে লুকিয়ে রাখা কথাটা হয়তো প্রশ্নের চেয়েও বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। তবু সে স্বীকার করল না।
করবেও না। অন্তত আজ নয়। বিনোদিনী আবার ইমামের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমি এখনই এমন কোনো কথা বলব না, যার উত্তর আমার নিজের কাছেই পরিষ্কার নয়। আমি কেবল কালেমা পড়তে এসেছি। সেটাই পড়ান। আপনি মুসলিম হতে চাই।”
ইমাম সাহেব এবার আর কোনো প্রশ্ন করলেন না। মসজিদের বারান্দার একপাশে দাঁড়িয়ে ধীর গলায় বললেন,
“বিনু, তুমি যদি সত্যিই ইসলাম গ্রহণ করতে চাও, তাইলে তোমারে সাক্ষ্য দিতে হইবো। আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নাই আর মুহাম্মদ ﷺ আল্লাহর রাসুল।”
বিনোদিনী স্থির চোখে তাকিয়ে রইল। “এরপর?”
“আমার কথার পুনরাবৃত্তি করবা। মুখে কওয়ার লগে লগে অন্তর থিকাও এই সত্য মাইনা নিবা।” তিনি ধীরে ধীরে শাহাদাহ পাঠ করলেন, ” আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, ওয়াহদাহু লা শারীকালাহু, ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু। ”
বিনোদিনী একবার শুনে স্পষ্ট কণ্ঠে কথাগুলো পুনরাবৃত্তি করল,
“ আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, ওয়াহদাহু লা শারীকালাহু, ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু। ”
কালেমা পাঠ করার সময় তার বুকের হৃৎস্পন্দন কেঁপে উঠছিল। শ্বাস ভারী হয়ে আসছিল। দমকা ঠান্ডা হাওয়া এসে তার সর্বাঙ্গে ধাক্কা খাচ্ছিল। কী এক অদ্ভুত অনুভূতি হলো তখন! ইমাম সাহেব বললেন,
“আলহামদুলিল্লাহ। এখন থেইকা তুমি মুসলিম।”
বিনোদিনীর মুখে কোনো উচ্ছ্বাস দেখা গেল না। শুধু ধীর গলায় বলল, “এত সহজ ছিল! ”
ইমাম সাহেব মাথা নাড়লেন। “কালেমা কওয়া সহজ। কিন্তু এই কালেমার দায়িত্ব নিয়া জীবন চালানো সহজ না। এখন থেকে তোমার আল্লাহর সব আদেশ নিষেধ মাইনা চলতে হইবো। হালাম হারামের পার্থক্য বুঝতে হইবো। ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভ মাইনা চলতে হইবো কালিমা শাহাদাত,সালাত,সাওম,যাকাত,হজ। যাকাত হজ এইটা তোমার সামর্থ্যের উপর নির্ভর করবো। এগুলো ছাড়াও আরো অনেক অনেক বিষয় আছে বিনু। সেসবও মাইনা চলতে হইবো। নারীদের জন্য পর্দা ফরজ জানো। চেষ্টা কইরো এটাও করার। ”
বিনোদিনী দীর্ঘক্ষণ নীরব থাকল। সে নামাজ ওজু এসব তো দেখেছে মুনতাহার থেকে। এখন কেবল ধারাবাহিক ভাবে নামাজের সূরা দোয়া শিখতে হবে। ওসব সে শিখে নিবে। কুরআন তো পড়ছে,শিখছে।
“আজ থেকে আমার নাম কী হবে তবে?”
ইমাম সাহেব মৃদু হেসে বললেন,
“তোমার নাম বিনোদিনী বইলা ডাকলে ইসলামে কোনো সমস্যা নাই, যদি নামের অর্থে শরিয়তবিরোধী কিছু না থাকে। মুসলিম হইছো বইলা নাম বদলানো ফরজ না।”
বিনোদিনী কিছুক্ষণ ভাবল। “তাহলে নাম এখনই বদলাব না।”
“বেশ। যেইটা তোমার ভালো লাগে, তাই করো।”
ইমাম সাহেব উঠে দাঁড়ালেন। সাথে বিনোদিনীও। কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে আবার থেমে গেল। পেছন ফিরে তাকাল।
“ইমাম সাহেব।”
“কী?”
“আজকের কথাটা কারও কাছে বলবেন না। ইটস টু সিক্রেট। ”
ইমাম সাহেব কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর ধীরে বললেন,
“তুমি চিন্তা কইরো না। তোমার কথা আমি গিয়া কারও কাছে কইব না। তবে কোনো বিপদে পড়লে একা একা বইসা থাকবা না। আমার কাছে আইসো।”
বিনোদিনী কোনো উত্তর দিল না। শাড়ির আঁচল দিয়ে মুখ ঢেকে চলে গেল। পেছনে দাঁড়িয়ে ইমাম সাহেব একবার দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। চেয়ারম্যানের বাড়ির মেয়েটা আজ মুসলমান হয়েছে। কিন্তু কেন হয়েছে সেই উত্তরটা এখনও অন্ধকারেই রয়ে গেল। তবে ইমাম সাহেব আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বললেন, ” আল্লাহ তোমারে সবসময় তার ছায়াতলে রাখুক বিনু। তোমারে হেদায়েত দান করুন আল্লাহ। আমার মন যেমন ঘোর বিপদের আশঙ্কা পাইতাছে তেমনই সুসংবাদের ঘ্রাণ ও পাইতাছে। নিশ্চয়ই একদিন তুমি পৃথিবীর কাছে দৃষ্টান্ত হিসেবে পরিচিতি পাইবা। আমার মন বলতাছে এইডা। ”
বিনোদিনী ধীর পায়ে হেঁটে বাড়ি ফিরলো। কয়েকটা দিন ধরে সে অনেক ভেবেচিন্তে তারপর এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে কী সে আল্লাহ কে ভালোবেসে ধর্ম গ্রহণ করলো? না বিষয়টা এমন না। এই উত্তর টা তার নিজেরও জানা নেই। সে যতক্ষণ ইসলাম কুরআন নিয়ে পড়ে থাকে ততক্ষণ তার দিনদুনিয়া কোনো কিছু মাথায় থাকে না। সব ভুলে অন্য জগৎে চলে যায়। সেই জগৎে সিকান্দার ও ঠাই পায় না। কিন্তু যেই বিনোদিনী দিনদুনিয়ার জগৎে ফিরে আসে তখনই শয়তান তাকে আবার মনে করিয়ে দেয় বিনুর আসল উদ্দেশ্য কী ছিল। সে তো আল্লাহর ইবাদত করার জন্য মুসলিম হয় নি। হলো সিকান্দার কে পাবার জন্য।
একদিন সে সিকান্দারের বাড়িতে গিয়ে মুনতাহার থেকে কোন ওয়াক্তের নামাজে কোন সূরা আর কত রাকাআত, কিভাবে পড়তে হয় তা জেনে মুখস্ত করে নিলো। সবশেষে যেদিন সে সিকান্দারের বাড়ি থেকে বের হয়ে আসলো,সেদিন আকস্মিক মুনতাহা কে সে জড়িয়ে ধরে বলল, ” তুমি ভীষণ ভালো মানুষ মুনতাহা। তোমার এই ভালো মানুষিই না একদিন তোমার জন্য বড় বিপদ হয়ে নেমে আসে। আমার তোমার জন্য মাঝেমধ্যে চিন্তা হয়। ”
মুনতাহা অবশ্য সেদিন একটু অবাক হয়েছিল। কিন্তু এই কথার গভীরতা টা বুঝতে পারে নি। বিনোদিনী বিদায় নিয়ে চলে গেল। তারপর আর আসলো না।
বিনু আজ এশার নামাজ আদায় করবে এই বাড়িতে নিজ কক্ষে। সেজন্য কলপাড় থেকে লুকিয়ে ওজু করে রুমের দরজা বন্ধ করে একটি পরিষ্কার ওড়না মেঝেতে পেতে কেবলা’র দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করতে শুরু করলো। ট রাকাআত ফরজ শেষ করে সুন্নত পড়তে নিলে এমন সময় ঐ রুমের সামনে করিডর দিয়ে হেঁটে যাওয়া প্রতাপ এক অদ্ভুত মিষ্টি সুগন্ধ পেয়ে থেমে যায়। সুগন্ধ টা আসছে বিনুর রুম থেকে। কোনো পারফিউমের ঘ্রাণ?
না সেটা কোনো পারফিউমের ঘ্রাণ না। ওটা আতরের ঘ্রাণ।
প্রতাপ আসার পর থেকে বিনুর সাথে তেমন একটা কথা হয় নি। সে দরজায় হাত রাখলো। বুঝলো ভেতর থেকে লাগানো। জানালার কাছে গেল। জানালা খোলা। সে পর্দা সরিয়ে যা দেখলো তাতে চমকে উঠলো। বিনু নামাজ পড়ছে! সে কী ভুল দেখছে তবে! পরপর কয়েকবার চোখের পলক ফেললো। এটা সত্যি! বিনু নামাজ পড়ছে!
প্রতাপ সাথে সাথে সরে গেল ওখান থেকে। অন্য মনস্ক হয়ে গেল। ও নামাজ কেনো পড়লো? ভুলে? ভুলে হলে ও জানবে কী করে যে নামাজ এভাবেই পড়তে হয়! কার থেকে শিখেছে? কাকা জানে? নাহ্ বিনুর সাথে কথা বলতে হবে।
বিনোদিনী নামাজ শেষ করে বিছানায় বসলো। মন মেজাজ ফুরফুরে লাগছে। হরিমতি কে ডেকে চা দিয়ে যেতে বললো। বিনু চা খেতে খেতে আবার সেই কুবুদ্ধি গুলো চিন্তা করতে শুরু করলো। সে মোনাজাতে কেবল সিকান্দার শাহ্ কে চেয়ে যাচ্ছে।
নির্বোধ বিনোদিনী। অথচ তার চাওয়ার কথা ছিল ক্ষমা!
প্রতাপ পরের দিন গ্রামের দিকে বেরিয়ে পরলো। হাঁটতে হাঁটতে একেবারে শেষ মাথায় সেই অচেনা কন্ঠের মালিকের বাড়ির কাছটায় আসলো। দূর থেকে চোখ বুলালো। গেট বন্ধ। বাহিরে গেটের পাঁচিলে লেখা আছে,“ অনুমতি ব্যতিত বাড়ির ভিতরে পুরুষ প্রবেশ নিষেধ। ”
সেদিন হয়তো খেয়াল করে নি। আজ খেয়াল করলো। আচ্ছা ঐ বাড়িতে কে কে থাকে? ঐ নারীর মা বাবা,ভাই বোন,দাদা দাদি? ঐ নারী টির নাম কী? একবার জানতে পারলে অন্তত ভালো লাগতো। প্রতাপ ঐ বাড়ি থেকে কিছুটা দূরেই বট গাছের নিচে বসলো। সিকান্দারের বাড়িটাই বা কোনটা? কাকে জিজ্ঞেস করবে? ঐ লোকটাকেও তো দেখতে হবে। সিকান্দার তখন ঐ রাস্তা দিয়েই হাতে বাজার নিয়ে ফিরছিল। মুনতাহা এখন ভার্সিটি তে। সিকান্দার বাজার গুলো বাড়িতে নিয়ে কেটে রান্না বসাবে। যাতে মুনতাহা ফ্রেশ হয়ে দুপুরে খেতে পারে। কিন্তু পথিমধ্যে এক যুবক কে বসে থাকতে দেখে একবার তার দিকে তাকালো। তারপর সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় প্রতাপ নিজেই তাকে ডেকে উঠলো। বলল,
” সিকান্দার শাহ্ এর বাড়ি কোনটা আপনি জানেন? ”
সিকান্দার কিছুটা অবাক হলো অপরিচিত এক যুবকের মুখে নিজের ব্যপারে জিজ্ঞেস করতে দেখে। সে দাঁড়িয়ে পাশ ফিরে বলল,
” জি,আমিই সিকান্দার শাহ্। ”
প্রতাপ সাথে সাথে বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো। ভালো করে এবার নজর বুলালো। লোকটার নামের সাথে চেহারা গঠনের কী অদ্ভুত এক মিল! তাকিয়েই রইলো। এত সুদর্শন!
সিকান্দার যুবকটাকে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে বলল,
” কিছু বলার ছিল আমাকে আপনার? ”
প্রতাপ উপর নিচ মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, ” জি। কাকা জানালো আপনি নাকি গ্রামের মানুষজন কে তার বিরুদ্ধে উষ্কানি দিচ্ছেন। ”
” আপনার কাকাটা কে? ”
” রমেশ রায় চন্দ্র। ”
” ওহ্! চিনেছি। চেয়ারম্যান সাব। তবে আপনার চাচা আপনাকে ভুল কথা জানিয়েছেন। গ্রামের মানুষজনকে আমি তাঁর বিরুদ্ধে উসকাইনি। বরং গ্রামের মানুষ এখন নিজেরাই আপনার চাচার করা অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে শিখেছে। আপনার চাচাকে একটা কথা বলবেন। এভাবে আর বেশি দিন চলতে পারবে না। গ্রামের মানুষের সমস্যাগুলো সমাধান করতে হবে। গ্রামের উন্নতির দিকে নজর দিতে হবে। অথচ উনি সেসব না করে মানুষের ওপর নিজের মতামত চাপিয়ে দিচ্ছেন।”
“উনি কিছুটা দাম্ভিক প্রকৃতির,” প্রতাপ শান্ত গলায় বলল। “সবকিছু নিজের মুঠোর মধ্যে রাখতে পছন্দ করেন। উনি চান, উনার ইশারাতেই সবকিছু হোক।”
“তাহলে তাঁকে তাঁর স্বভাবটা বদলাতে বলুন।” সিকান্দার এবার একটু থামল। তারপর বলল,“সামনেই তো নির্বাচন। এমন চলতে থাকলে মানুষ এবার তাঁকে ভোট দেবে কি না, সেটাও ভাবার বিষয়।”
প্রতাপ মৃদু হেসে ফেলল।
“আপনি হয়তো জানেন না। এই গ্রামে চেয়ারম্যান পদে কেবল একজন প্রার্থীই দাঁড়ায়।”
সিকান্দার তাকাল। ” তাহলে এবার ব্যতিক্রমও হবে।”
“যেমন?”
“যেমন গ্রামের কোনো যুবক আপনার চাচার বিপরীতে দাঁড়াল।”
প্রতাপ হেসে মাথা নাড়ল। “যা এত বছরে হয়নি, তা এ বছর হবে?”
“হতেই তো পারে।”
“কিন্তু এমন যুবক তো কাউকে আমি দেখি না।”
সিকান্দারও মৃদু হাসল। “চেয়ারম্যান হতে গেলে খুব শিক্ষিত কিংবা খুব সুদর্শন হতে হবে। এমন কোনো নিয়ম আছে? আপনার চাচা শিক্ষিত, সামর্থ্যবান, সমাজে পরিচিত মানুষ। কিন্তু এত কিছু থাকার পরও যদি গ্রামের মানুষ তার কাছে নিজেদের কথা বলতে ভয় পায়, তাহলে সেই শিক্ষার লাভ কী? এই গ্রামের মানুষ তাদের গ্রামকে খুব ভালোবাসে। তারা চায় তাদের চেয়ারম্যান তাদের পাশে দাঁড়াক, তাদের ওপর দাঁড়িয়ে না থাকুক। এতদিন হয়তো সুযোগ পায়নি। কিন্তু এবার যদি তাদের সামনে সত্যিই একটা বিকল্প আসে, আমি বিশ্বাস করি তারা নিজেরাই সিদ্ধান্ত নেবে।”
প্রতাপ এবার একটু আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“আপনি কি মনে করেন, গ্রামের মানুষ সত্যিই চাচার বিপক্ষে একজনকে দাঁড় করাবে?”
“মানুষ যখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে শেখে, তখন পরের ধাপটা খুব কঠিন নয়।”
“আমি দেখতে চাই সেই দলকে। সেই যুবককে। কিন্তু নির্বাচন তো কেবল কয়েকজন মানুষের ইচ্ছায় হয় না। প্রার্থী লাগবে, দল লাগবে, মানুষের সমর্থন লাগবে।”
“সবই হয়ে যাবে।”
“আপনি এতটা নিশ্চিত কীভাবে?”
সিকান্দার এবার একটু গম্ভীর হলো।
“কারণ আমি এই গ্রামের মানুষগুলোর চোখ দেখেছি। ক্ষেতে দাঁড়িয়ে তাদের দীর্ঘশ্বাস শুনেছি। খাজনা দিতে না পারায় কারও গরু চলে গেছে, কারও জমি। কারও ঘরে খাবার নেই, অথচ চেয়ারম্যানের লোকজন এসে পাওনা চাইছে। দিনের পর দিন মানুষ মুখ বন্ধ করে সহ্য করেছে। কিন্তু মনে রাখবেন চুপ থাকা আর মেনে নেওয়া এক কথা না। নির্বাচন মানে শুধু একটা ভোটের দিন না। নির্বাচন মানে মানুষকে একটা সুযোগ দেওয়া। সে কাকে নিজের প্রতিনিধি হিসেবে দেখতে চায়, সেটা বলার সুযোগ। এতদিন যদি একটাই নাম ব্যালটে থাকে, তাহলে মানুষ পছন্দ করবে কীভাবে? এবার অন্তত তাদের সামনে একটা বিকল্প থাকা দরকার।”
প্রতাপের চোখে কৌতূহল আরও গাঢ় হলো। “আপনি কি কাউকে দাঁড় করানোর কথা ভাবছেন?”
সিকান্দার হেসে মাথা নাড়ল। “আমি কাউকে দাঁড় করানোর কে? গ্রামের মানুষ নিজেরাই নিজেদের নেতা খুঁজে নিবে। আমি তাদের প্রতিটি সিদ্ধান্তের পাশে আছি ।”
প্রতাপ কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলল, “আপনি জানেন, আমার চাচা সহজে কাউকে তার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে দেবে না।”
“তাই তো দেখতে হবে, তার ক্ষমতা কতটা আর গ্রামের মানুষের ঐক্য কতটা।”
প্রতাপ মৃদু হেসে বলল,
“আপনি কথাগুলো খুব আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলছেন।”
“আত্মবিশ্বাস না। মানুষের ওপর বিশ্বাস।”
কথাটা শুনে প্রতাপ চুপ হয়ে গেল। সিকান্দার বাজারের ব্যাগটা একটু উঁচু করে ধরল। তারপর বলল,
“আপনার চাচাকে আমার একটা কথা বলবেন।”
“কী কথা?”
“এবারের নির্বাচন যেন তিনি আগের মতো ধরে না নেন। কারণ এবার হয়তো গ্রামের মানুষ শুধু একজন চেয়ারম্যানকে ভোট দেবে না। তারা নিজেদের ভবিষ্যৎকে ভোট দেবে। মানুষের ওপর জোর করে সম্মান আদায় করা যায় না। সম্মান অর্জন করতে হয়।”
কথাটা শেষ করে সিকান্দার হাঁটা ধরলো। প্রতাপ তাকিয়ে রইলো। আকস্মিক সিকান্দার কে ঐ বাড়িতে ঢুকতে দেখে অবাক হলো। ঐ বাড়িটাই কী তবে সিকান্দারের! তাহলে ঐ রমণী টা কে? সিকান্দারের বোন?
বিনোদিনী আজ দুপুরে কুরআন শরীফ পড়তে গিয়ে দরজা আটকাতে ভুলে গিয়েছিল। প্রতাপ তখনই ঢুকে পড়ে নক না করে। বিনোদিনী চমকে উঠে। তড়িঘড়ি করে কুরআন টা বন্ধ করে লুকাতে গেলেও প্রতাপ তা দেখে ফেলে। সামনে এসে দাঁড়িয়ে হুঙ্কার দিয়ে বলে উঠলো,
” ওটা কি পড়ছিলে তুমি? দেখি, দেখাও আমাকে। ”
” ক…কিছু না প্রতাপ। তুমি আমার রুমে নক না করে ঢুকলে কেন? ”
প্রতাপ টেনে দেখলো বিনুর হাতে কুরআন শরীফ। সে বলল,
” আমি তোমাকে গতকাল রাতে নামাজ পড়তে দেখিছি বিনু। সত্যি করে বলো। তুমি কী কোনো ভাবে….”
” তুমি ভুল ভাবছো প্রতাপ। ”
” কী ভুল ভাবছি আমি? তুমি হিন্দু হয়ে নামাজ কেন পড়লে? কুরআন কেন পড়লে? তুমি কী করেছো কী এসব বিনু। জবাব দাও। ”
প্রতাপের গলার আওয়াজ ক্রমশ বাড়তে লাগলো। তার গলার আওয়াজ শুনে রমেশ রায় নিজের রুম থেকে বেরিয়ে আসলেন। বাবার গলার আওয়াজ পেয়ে বিনু তাড়াতাড়ি করে কুরআন টা লুকিয়ে রাখে। আর নিচু স্বরে বলল,
” প্রতাপ বাবা কে কিছু বলো না দয়া করে। আমি সবটা বলবো পরে তোমায়। ”
রমেশ রায় প্রতাপের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো, ” কী হয়েছে প্রতাপ? চেঁচাচ্ছ কেন? বিনু কী করেছে? ”
প্রতাপ শান্ত গলায় বলল, ” কিছু হয় নি কাকা। আপনি রুমে যান। আপনার সাথে আমার কথা আছে। সিকান্দারের সাথে দেখা হয়েছিল আজ। ”
” কী বললো ঐ ছেলে? ”
” রুমে যান। এসে বলছি। ”
রমেশ রায় চলে গেল। প্রতাপ বিনুর দিকে তাকালে বিনু মাথা নত করে বলল, ” প্লিজ প্রতাপ তুমি কাউকে বলো না এই বিষয়টা। আমার জীবন। সেটা নিয়ে আমি যা ইচ্ছে তাই করতে পারি। তোমার কাকা একবার আমার জীবনটা নষ্ট করেছে। আমি সেই নষ্ট জীবনটা গুছিয়ে নিচ্ছি। আমাকে গোছাতে দাও। বাঁধা হয়ে দাঁড়িও না। আজ বাদে কাল তুমি তোমার বাড়ি ফিরে যাবে। আমার ব্যক্তিগত ইচ্ছে নিয়ে ঢাকঢোল বাজিও না। ”
” কী জন্য এমনটা করলে? আমাকে কারন বলো। ”
” তুমি কাউকে বলবে না তো? ”
” না। বলো। ”
” সিকান্দারের নাম শুনেছ না? ”
” হ্যাঁ, দেখা হলো আজ। লোকটাকে বেশ ভালো মনে হলো। ”
” আমার তাকে খুব পছন্দ প্রতাপ। আমি তাকে বিয়ে করতে চাই। ”
” তার জন্যই কী তবে তুমি ধর্ম পরিবর্তন করলে? ”
” হুমম। আমি উনার জন্য নিজের ধর্ম ত্যাগ করেছি। ”
প্রতাপের কান টা ঝা ঝা করে উঠলো। এক মুসলিম ছেলেকে পছন্দ, তাকে বিয়ে করার জন্য মুসলিম হলো! তার রাগে হাত পা কাঁপছে। নিজের আপন বোন হলে হয়তো চড়িয়ে গাল এতক্ষণে লাল করে ফেলতো। পরক্ষণে মনে আবার একটা চিন্তা উদয় হলো। তার মানে সিকান্দার অবিবাহিত। বিনু তো আর বিবাহিত পুরুষ কে বিয়ে করতে চাইবে না তাই না? তাহলে ঐ রমণী সিকান্দারের বোন তবে?
” সিকান্দার কী রাজি? ”
” না উনি জানেন না এই বিষয়ে। তবে খুব শীগ্রই জানাবো। ”
” আর কাকা জানলে কী হবে ভেবে দেখেছো? ”
” আমাকে ত্যাজ্য করবে। করুক। আমার তাতে যায় আসে না। তুমি শুধু কাউকে জানিও না। ”
প্রতাপ কিছু বললো না। সে চলে গেল কাকার রুমে। গিয়ে জানালো সিকান্দারের সাথে কী কী কথা হলো। সিকান্দার কী কী বললো। সব বলা শেষে প্রতাপ বললো, ” কাকা নিজেকে বদলান। নিষ্ঠার সাথে কাজ করুন। গ্রামের লোকজনের উপর জুলুম করা বন্ধ করুন। একবার ক্ষমতা হারালে ফিরে পাওয়া কঠিন। ”
বিনোদিনীর দিনকাল এভাবে বেশ ভালোই যাচ্ছিল। তবে তার একদিন হুট করে মনে হলো সিকান্দার তাকে কোনোদিন গ্রহণ করবে না। কারন গায়েরতবান পুরুষরা তাদের স্ত্রী কে খুব ভালোবাসে। সেখানে সেই সিকান্দার কেন বিনুকে গ্রহণ করবে? কিন্তু শয়তান তখনও উষ্কানি দিলো। ভালোবাসার যে সবসময় সম্মতির মাধ্যমে পূর্নতা পেতে হবে এটা কোথায় লেখা আছে? বিনু একটা পরিকল্পনা করলো। সিকান্দার প্রতিদিন মসজিদে নামাজ পড়তে যায়। এবং অনেকক্ষন সময় নিয়ে নামাজ পড়ে সবার শেষে বাড়ি যায়। লোক লাগিয়ে খবর নিয়েছিল। কালও নিশ্চয়ই নামাজ পড়তে আসবে! কাল তো ১২ই রবিউল আউয়াল। তারমানে অনেকক্ষণ থাকবে সে। মনে মনে কিছু একটা ভেবে কাজে মনোযোগ দিলো।
সন্ধ্যা নেমে এসেছে পশ্চিমাকাশে। সিকান্দার আর মুনতাহা আজ রোজা রেখেছিল। মাগরিবের আজান কানে আসতেই দোয়া পড়ে খেজুর মুখে দিয়ে রোজা ভাঙলো। তারপর হাল্কা পাতলা খাবার খেয়ে নিলো। সিকান্দার মসজিদে গেলো মাগরিবের নামাজ পড়তে। মুনতাহা বাসায় পড়লো। নামাজ শেষ হতে সিকান্দার বাড়ি ফিরে দেখলো মুনতাহা বারান্দায় বসে আছে। এগিয়ে এসে পাশে বসে বলল,
” চুপচাপ বসে আছেন যে? ”
মুনতাহা তাকালো। ” একা একা কী আর বকবক করা যায়? আপনি চলে গেলে আমাকে তো একাই থাকতে হয়। মিনিটাও ঘুমিয়ে গেছে। ”
” এজন্য এখন আপনার স্বামীর করণীয় কী ম্যাডাম? আপনার একাকীত্ব দূর করার জন্য কী কাউকে নিয়ে আসবো? আই মিন ছানাপোনা? তাহলে আর একা একা লাগবে না। বাড়িটা ভরা ভরা লাগবে। ”
” হুমম। ইনশাআল্লাহ একদিন আমি পূর্ণাঙ্গ নারী হব। আল্লাহ যদি আমাকে মাতৃত্বের স্বাদ গ্রহণের সুযোগ দেন, তবে আমি দুটো সন্তানের জননী হতে চাইবো।
আমার ছেলে হবে জুলাইবীব (রা.)-এর মতো আত্মত্যাগী, মুস‘আব ইবনু উমাইর (রা.)-এর মতো দ্বীনের জন্য সর্বস্ব ত্যাগকারী, সা‘দ ইবনু মু‘আয (রা.)-এর মতো ঈমানের প্রশ্নে আপসহীন।
আর আমার মেয়েটা হবে খাওলা বিনতে আল-আজওয়ারের মতো সাহসী, রাবিয়া আল-আদাবিয়ার মতো আল্লাহভীরু, আর ফাতেমা (রা.)-এর মতো লজ্জাশীল, মর্যাদাবান ও দ্বীনের প্রতি অটল।
তাদের এমনভাবে গড়ে তুলব, যেন আমার মৃত্যুর পরও তাদের নেক আমল আর দোয়ার মাধ্যমে আমার আমলনামা ভারী হতে থাকে। তারা যেন আমার জন্য সদকায়ে জারিয়ার কারণ হয়। ”
” আল্লাহ আপনার সকল ইচ্ছে কবুল করুন। ”
রাত অনেক গভীর হয়েছে। আকাশে চাঁদ নেই। চারপাশ নিস্তব্ধ। কালো মেঘে ঢাকা চরিপাশ। দূরের কোনো মসজিদ থেকে ভেসে আসছে মৃদু দরুদের আওয়াজ। আজ ১২ রবিউল আউয়াল। দিনটি নিয়ে মানুষের নানা আমল, নানা অনুভূতি। সিকান্দারও আজকের রাতটাকে অন্য রাতের মতো কাটাতে পারেনি। দিনের বেলায় সে বেশি বেশি দরুদ পড়েছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সীরাতের কিছু অংশ পড়েছে। মসজিদের ছোট কয়েকজন ছেলেকে বসিয়ে তাদের সঙ্গে নবীজির ﷺ চরিত্র ও মানুষের প্রতি তাঁর দয়া নিয়ে কথা বলেছে। নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী দু-একজন অভাবী মানুষকে খাবারও দিয়েছে। কিন্তু রাত যত গভীর হয়েছে, তার বুকের ভেতরের অস্থিরতাও যেন তত বেড়েছে।
মুনতাহা বাসাতেই নামাজ পড়ছে। আর সিকান্দার চলে গেল মসজিদে। এশার নামাজ শেষ করে কিছুক্ষণ নফল ইবাদতে দাঁড়িয়ে রইল সে। তারপর দীর্ঘ সময় ধরে দরুদ পড়ল। শেষরাতে যখন মসজিদ প্রায় নিস্তব্ধ হয়ে গেল, সিকান্দার জায়নামাজে বসে পড়ল। দুই হাত বুকের কাছে তুলে ধরল।
চোখ দুটো এতক্ষণে লাল হয়ে গেছে। গাল বেয়ে নেমে আসা অশ্রুগুলো মুছে ফেলার কোনো চেষ্টা নেই। আজ নিজের জন্য তার চাওয়ার মতো অনেক কিছু থাকলেও, সেগুলোর কোনোটি তার মনে নেই। আজ সে শুধু একটি আক্ষেপ নিয়ে আল্লাহর সামনে বসেছে। ঠোঁট কাঁপল। অনেকক্ষণ। তারপর কণ্ঠটা এমনভাবে আটকে গেল, যেন বুকের ভেতর থেকে কথাগুলো বের করাটাই তার জন্য অসম্ভব হয়ে পড়েছে। আস্তেধীরে ঠোঁট নাড়িয়ে বলল,
” ইয়া রব…আজ বারোই রবিউল আউয়াল। আপনার হাবিব, আমার নবী, আমার প্রাণের চেয়েও প্রিয় মুহাম্মদ ﷺ-এর জন্মের মাস। আজ পৃথিবীর কত মানুষ তাঁর কথা বলছে, তাঁর জন্য কাঁদছে। হৃদয় ব্যথিত হচ্ছে। তাঁর ওপর দরুদ পড়ছে। আর আমি? আজ আমি আপনার কাছে এমন এক আক্ষেপ নিয়ে হাত তুলেছি, যে আক্ষেপের কোনো ভাষা হয় না। এমন এক শূন্যতা নিয়ে আপনার দরবারে এসেছি, যার কোনো প্রতিকার দুনিয়ায় নেই।
আজ আমার ভীষণ আফসোস হচ্ছে ইয়া রব। সেটা আমার জন্ম নিয়ে। আমি কেন তাঁর জামানায় জন্মালাম না? কেন? কেন আমাকে এত পরে পাঠালেন, ইয়া রব? কেন আমার জন্ম হলো এমন এক সময়ে, যখন আপনার হাবিব ﷺ পৃথিবীতে নেই? কেন আমার চোখ খুলল এমন এক যুগে, যেখানে তাঁকে ভালোবাসার কথা শুনতে পারি, তাঁর নাম শুনে দরুদ পড়তে পারি, কিন্তু তাঁকে একবার চোখের সামনে দেখতে পারি না?
আমি জানি, আমার এই প্রশ্ন আপনার ফয়সালার বিরুদ্ধে নয়। আমি জানি, আপনি যা নির্ধারণ করেছেন, সেটাই উত্তম। কিন্তু আমি তো মানুষ, ইয়া রব। আমার একটা মন আছে। আর সেই মনটা মাঝে মাঝে বড় বেশি আফসোস করে।
আমি যদি তার জামানায় জন্ম গ্রহণ করতাম। আমি জানি না আমি কেমন মানুষ হতাম। জানি না, তাঁর সান্নিধ্যের যোগ্য হতে পারতাম কি না। হয়তো আমার মতো পাপী মানুষ তাঁর চারপাশে দাঁড়ানোরও যোগ্য ছিল না। তবু মন চায়, একবার যদি সেই যুগের বাতাসে শ্বাস নিতে পারতাম! একবার যদি মদিনার কোনো পথে তাঁর পদচিহ্নের কাছে দাঁড়াতে পারতাম! একবার যদি দূর থেকে হলেও তাঁকে দেখতে পারতাম! আমি তাকে একনজর দেখার জন্য অস্থির হয়ে থাকতাম।
আচ্ছা ইয়া রব, কেমন ছিলেন আমার প্রিয় রাসূল ﷺ ? কেমন ছিল তাঁর হাসি? কেমন ছিল তাঁর কণ্ঠ? কেমন করে তিনি মানুষের দিকে তাকাতেন?
আমি জানি না, সেই সৌভাগ্যবান মানুষগুলো কতটা ভাগ্যবান ছিল। যারা তাঁকে সামনে থেকে দেখেছে। যারা তাঁর সঙ্গে কথা বলেছে। যারা তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে থেকেছে। যারা তাঁর কাছ থেকে দ্বীনের কথা শিখেছে। যারা তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করেছে।
আমি জানি না, তাঁকে সামনে দেখলে আমার কেমন লাগত। আমি জানি না, তাঁর নূরানী চেহারার দিকে তাকিয়ে আমার চোখ কতক্ষণ স্থির থাকতে পারত। জানি না, তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে আমার জবান দিয়ে কোনো কথা বের হতো কি না।
আচ্ছা ইয়া রব তিনি যদি আমার দিকে একবার তাকাতেন আমি কি সেই দৃষ্টির ভার সহ্য করতে পারতাম? আমি কি চোখ তুলে তাকাতে পারতাম? নাকি লজ্জায় মাথা নিচু করে কাঁদতেই থাকতাম?
আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে, ইয়া রব। আমি যদি তাঁর জামানায় থাকতাম, তিনি যদি আমাকে চিনতেন, তাহলে কেমন হতো আমার জীবন? আমি নিশ্চয়ই প্রতিদিন তাঁর কাছে যাওয়ার অজুহাত খুঁজতাম? কোনো প্রশ্ন না থাকলেও শুধু তাঁকে দেখার জন্য তার হেঁটে চলা রাস্তার ধারে বসে থাকতাম? আমি যদি তাঁর সময়ের একজন উম্মতি হতাম! যখন খুব ক্লান্ত লাগতো। ব্যথায় জর্জরিত হয়ে যেতাম। ব্যথিত,আহত এক হৃদয় নিয়ে আমি তাঁর কাছে চলে যেতাম। তার পাশে বসতাম। আর তিনি তার স্নেহভরা হাতটা আমায় মাথায় রাখতেন।
আমি জানি না, আমার সেই কল্পিত মুহূর্তটা বাস্তবে কেমন হতো। কিন্তু আমার মন বলে। আমি হয়তো তাঁর সামনে বসেই বাচ্চাদের মতো কাঁদতাম। অনেকক্ষণ কাঁদতাম।
অথচ সম্ভব নয়। এই একটা আক্ষেপ আমার বুকের ভেতর কেমন করে যেন থেকে যায়। আমি তাঁর হাত ধরতে পারিনি। তাঁর পাশে বসতে পারিনি। তাঁর কণ্ঠ শুনতে পারিনি। তাঁর মুখের হাসি দেখতে পারিনি। তাঁর কাছে গিয়ে বলতে পারিনি,‘ইয়া রাসূলাল্লাহ ﷺ, আজ আমার মনটা খুব খারাপ। বলতে পারিনি,আজ আমি খুব ক্লান্ত। আমার কেউ নেই। আমার জন্য দোয়া করবেন। রাসূল ﷺ নিশ্চয়ই আমার জন্য আপনার কাছে দোয়া করতেন। আমি চিৎকার করে বলতাম। আমি একা নই আমার রাসূল ﷺ আছেন। কী যে শান্তি ছিল সেই কথাটার মধ্যে!
আমি জানি, এসব আমার কল্পনা। আমি জানি, সময় ফিরে যায় না। আমি জানি, আপনার হাবিব ﷺ দুনিয়ার জীবন শেষ করে আপনার কাছে চলে গেছেন। তবুও আমার এই মনটা কেন বোঝে না? কেন মনে হয়, যদি আরেকটা জীবন পেতাম। আমি সেই জীবনটা তাঁর জামানায় চাইতাম!
আমি তো জানি না আমার পাপের ভার কতটুকু। জানি না আমার আমল কতটুকু। জানি না, কত ভুল আপনি ক্ষমা করে আড়াল করে রেখেছেন। জানি না, কত গুনাহ আমি ভুলে গেছি, আপনার কাছে তার হিসাব রয়ে গেছে। জানি না, আমার নামাজ কতটুকু কবুল হয়েছে। জানি না, আমার তওবা কতটুকু সত্য ছিল। জানি না, আমার অন্তর কতটা পরিষ্কার। আপনি আমার সবকিছু জানেন।
আমার প্রকাশ্যটাও জানেন, গোপনটাও জানেন। যে পাপ মানুষ দেখেনি, সেটাও জানেন। যে অপরাধের কথা আমি নিজেই ভুলে গেছি, সেটাও আপনার অজানা নয়। ইয়া রব আমার গুনাহ অনেক। আমি জানি না, আমি তাঁর উম্মত হওয়ার যোগ্য কি না। আপনার কাছে আমার জন্য ক্ষমার কতটুকু আশা রাখা উচিত। তবুও আপনি তো পরম ক্ষমাশীল আমার অজস্র ভুল, গুনাহ আর অক্ষমতা ক্ষমা করে দিন। আমি যে আপনার রহমতের ভীষণ মুখাপেক্ষী । তাই আমার গুনাহের দিকে তাকাবেন না, ইয়া রব। আমার ভালোবাসার দিকে তাকান। আমার চোখের পানির দিকে তাকান। আমার দরুদের দিকে তাকান। আমার এই আক্ষেপের দিকে তাকান।
আমার জীবনটা এমন করে দিন, যাতে কিয়ামতের দিন আপনার হাবিব ﷺ-এর সামনে দাঁড়িয়ে আমার পাপের ভারে লজ্জায় মাথা নত হয়ে না যায়। আমার আমলনামার এমন কোনো পাপ যেন তাঁর সামনে না আসে, যার জন্য আমি তাঁর দৃষ্টি থেকে লজ্জায় মুখ লুকাতে চাইব। যেদিন মানুষ নিজের নাজাতের জন্য ব্যাকুল থাকবে, আর আপনার অনুমতিতে রাসূল ﷺ তাঁর উম্মতের জন্য শাফাআতের আবেদন করবেন। সেদিন যেন আমার আমলনামা দেখে তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে লজ্জায় চোখ নামিয়ে ফেলতে না হয়। যিনি উম্মতের জন্য এত মমতা নিয়ে সুপারিশ করবেন, আমি যেন সেই উম্মতের এমন একজন না হই, যার কর্মকাণ্ডের দিকে তাকিয়ে তাঁর হৃদয় ভারী হয়ে যায়।
ইয়া রব, আমাকে তাঁর শাফাআতের হকদার হওয়ার মতো জীবন দিন তাঁর সুন্নাহকে ভালোবেসে চলার তাওফিক দিন, তাঁর উম্মত হিসেবে কবুল করুন এবং আমার গুনাহগুলো আগেই ক্ষমা করে দিন।
দুনিয়ায় যে সাক্ষাৎটা আমার ভাগ্যে রাখেননি, আখিরাতে সেই সাক্ষাৎটা আমার জন্য লিখে দিন। ইয়া রব আমাকে জান্নাতুল ফিরদাউস দান করুন। আর আমার এই পাপী, দুর্বল, ক্লান্ত হৃদয়টাকে আপনার রহমতের ছায়ায় রেখে দিন।
আমি তাকে বড্ড ভালোবাসি ইয়া রব। তাকে কি করে ভালো না বেসে থাকতে পারি বলুন ইয়া রব? তিনি তো আমাকে না দেখেও ভালোবেসেছিলেন সেই ১৪০০ বছর আগে। অশ্রুসিক্ত নয়নে ভাই বলে সম্বোধন করেছিলেন। আসন্ন সে বিভীষিকাময় দিনে আমার জন্য পেরেশান হয়ে উম্মাতি উম্মাতি বলে কাঁদবেন। মাকামে মাহমুদে সিজদায় লুটিয়ে পড়ে আমার মুক্তির জন্য আকুতি জানাবেন। সেই তাকে না ভালোবেসে কী থাকা যায়?
রাসূল ﷺ বলেছিলেন, “যে আমাকে স্বপ্নে দেখেছে, সে সত্যিই আমাকে দেখেছে, শয়তান আমার আকৃতি ধারণ করতে পারে না।” সহিহ মুসলিম ২২৬৬।
ইয়া রব আমাকে স্বপ্নে আপনার নবী মুহাম্মদ ﷺ-কে দেখার সৌভাগ্য দান করুন, তাঁর ভালোবাসা ও তাঁর সুন্নাহ অনুসরণের তাওফিক দিন এবং আমাকে তাঁর দলের সঙ্গে হাশর করুন।
আমীন, ইয়া রব্বাল আলামীন।
দীর্ঘ এক মোনাজাত শেষে সিকান্দার নামাজ থেকে উঠে পাশ ফিরতেই দেখল, মসজিদের ইমাম সাহেব তার পাশেই বসে আছেন। রোজই তিনি এই ছেলেটাকে নামাজে কাঁদতে দেখেন। এমন কোনো ওয়াক্ত নেই, যখন সিকান্দারের চোখের পানি তাঁর নজর এড়িয়েছে। কখনো নীরবে, কখনো অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে,ছেলেটা যেন প্রতিবারই নামাজের জায়নামাজে এসে নিজেকে সম্পূর্ণ ভেঙেচুরে রবের কাছে সমর্পণ করে দেয়। দুনিয়ার সব অহংকার, ব্যস্ততা আর শক্তির আবরণ খুলে রেখে সিজদায় পড়ে থাকে এক অসহায় বান্দার মতো।
মাঝেমধ্যে ইমাম সাহেব দূর থেকে মুগ্ধ হয়ে সিকান্দারকে দেখেন। বয়সে তরুণ, অথচ ইবাদতে তার যে একাগ্রতা, তা অনেক বয়স্ক মানুষকেও লজ্জায় ফেলে দেওয়ার মতো।
আজ আর দূরে বসে থাকলেন না। ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে সিকান্দারের পাশে বসলেন। স্নেহভরে তার মাথায় হাত রেখে বললেন,
“তোমার মতো যুবক আমি খুব কমই দেখেছি, সিকান্দার। এই বয়সে মানুষ দুনিয়ার পেছনে ছুটে বেড়ায়। আর তুমি প্রতিবার নামাজে এসে এমনভাবে কাঁদো, যেন তোমার রব ছাড়া এই দুনিয়ায় তোমার আর কোনো আশ্রয় নেই। ”
সিকান্দার মাথা নিচু করে রইল। চোখের কোণে তখনও পানি জমে আছে।
ইমাম সাহেব তার মাথায় হাত বুলিয়ে মৃদু হেসে বললেন,
” তোমার কান্না দেখে আমার মাঝে মাঝে নিজের কথাই মনে পড়ে। মানুষ যখন সত্যি সত্যি নিজের রবকে চিনতে শুরু করে, তখন তার চোখের পানি আটকে রাখা কঠিন হয়।
তোমার চোখের পানি দেখলে আমার নিজেরও লজ্জা লাগে। আমরা কত বছর নামাজ পড়ি, অথচ কতবার মনটা সত্যি সত্যি আল্লাহর সামনে নত করতে পারি? আর তুমি… তুমি তো প্রতিবারই নিজেরে একেবারে সঁপে দাও। আল্লাহ তায়ালা তোমারে তাঁর প্রিয় বান্দাদের মধ্যে রাখুন। তোমার এই কান্না কবুল করুন। তোমার গুনাহ মাফ করুন। আর তোমার অন্তরে যে ভালোবাসা দিয়েছেন, সেই ভালোবাসাকে আমল দিয়ে সত্য করার তাওফিক দিন।
সিকান্দার মাথা নত করল। “আমীন। ”
ইমাম সাহেব আরো কিছুক্ষণ কথাবার্তা বললেন। তারপর সিকান্দার কে বাড়ি ফিরতে বললেন। সিকান্দার শরীর টা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়াল। তারপর মসজিদ থেকে বের হয়ে হাঁটা ধরলে বাড়ির পথে। রাত তখন অনেক। গ্রাম নিস্তব্ধ প্রকৃতিও তখন ঘুমিয়ে পড়েছে। কেউ জাগ্রত নেই। সবাই ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। সিকান্দার ধীর পায়ে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ করে পশ্চিমের বাশ ঝোপ থেকে এক নারীর চিৎকার শুনতে পায়। তার পায়ের গতি সম্পূর্ণ রূপে থেমে যায়। চিৎকার টা আবার ভেসে আসলো। বাঁচাও বাঁচাও করে। সিকান্দারের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
সিকান্দার শাহ্ পর্ব ৪৩
সে বাড়ির পথের দিকে আর একবারও তাকাল না। ধীরে ধীরে শরীর ঘুরিয়ে পশ্চিমের বাঁশঝোপের দিকে হাঁটা শুরু করল। যত এগোতে লাগল, ততই চিৎকারটা স্পষ্ট হয়ে উঠতে লাগল। সিকান্দারের মনে হলো, সেখানে নিশ্চয়ই কোনো নারী বিপদে পড়েছে। আর বিপদে পড়া একজন মানুষের আর্তনাদ শুনে বাড়ি ফিরে যাওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়….কোনো মতেই!
