সুইটহার্ট পর্ব ১৫
মোনালিসা মেহরোজ
দেখতে দেখতে বেশ কয়েকটা দিন কেটে গেলো। দিন দশ-বারো বাদে অভ্র-মেহরিনের বিয়ে। ইতিমধ্যে দু’বাড়ি বিয়ের তোড়জোড় শুরু করে দিয়েছেন। সুফিয়া বেগম আর নাজমা তালুকদার মিলে নানান আয়োজনে ব্যাস্ত। অতিথিদের নিমন্ত্রণের লিস্ট থেকে শুরু করে বিয়ের মেনু পর্যন্ত ঠিক করা শেষ তাদের। সাথে শপিংয়ের মতো ঝামেলাময় কাজও তারা সেড়েছেন নিজেদের মতো করে। নাজমা তালুকদার পুরোটা সময় মেহরিনের পরিবারের মন যুগিয়ে চলার চেষ্টা করে চলেছেন। অজানা কারণে নিজের অহংকার ত্যাগ করে সুফিয়া বেগমের মতো একজন সাদাসিধে গৃহিণীর সাথে হাতে হাতে সব কাজ করে চলেছেন। মায়ের কাজে অভ্র বেশ সন্তুষ্ট।
আজ শনিবার। দু’পরিবার নিজেদের মতো করে কেনাকাটা করলেও অভ্র জানিয়েছে সে মেহরিনকে নিয়ে বের হবে শপিং করতে। তাই জন্যই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে তৈরি হচ্ছে রমণী। ভার্সিটি যায়নি বেশ কয়েকদিন। এর বিশেষ কারণ মূলত আদ্রিয়ান। মেহরিন জানে না তার কেনো এমনটা হচ্ছে, কেনো বারবার অবুঝ হৃদয়ে শুধু আদ্রিয়ানের প্রতিচ্ছবিই ভেসে উঠছে৷ অপারগ মনটা কেনো তার নাম’ই বারবার জবছে!
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে খুঁতিয়ে দেখে নিলো মেহরিন। গায়ে জড়িয়েছে শুভ্র রঙা কুর্তি। পাতলা ফিনফিনে ওড়নাখানা একপাশে পিন দিয়ে সেট করা। মাথার লম্বা চুলগুলো এলোমেলো ভঙ্গিতে বিনুনি গাঁথা। মেহরিন নিস্প্রভ দৃষ্টিতে নিজেকে দেখে। আর আচমকায় তার সরু আঙুল ছুঁয়ে যায় নিজের ওষ্ঠদ্বয়। কেঁপে উঠে মেহরিন। মনে পরে সেদিন ভার্সিটির ঘটনা, আদ্রিয়ানের স্পর্শগুলো।
মেহরিনের দম বন্ধ হয়ে আসে কথাখানা মস্তিষ্ক চাড়া দিতেই। এতদিন আদ্রিয়ানের মুখোমুখি হবে না বলে ভার্সিটি যায়নি। পুরুষটির মনে আদৌও কি চলছে তা নিয়ে বেশ সন্দিহান রমণী। তাই তো আর সামনে যাওয়ার সাহস পায়নি। অজানা আশংকা আর একরাশ লজ্জায় নিজেকে আড়াল করে রেখেছে রহস্যময় মানবটির কাছ থেকে। রোজ রোজ মেহরিন নিয়ম করে বেশ কয়েকবার ফোন হাতে নেয়। নজর বুলায় সেই দুষ্টুমিমাখা মেসেজগুলোর পানে। অজান্তেই ভিষন মিস করে পুরুষটিকে।
মেহরিন চোখ বন্ধ করে নিলো। ঠোঁট হতে ধীরে ধীরে হাত সরিয়ে অনেকটা সময় স্থির দাঁড়িয়ে রইলো। অতঃপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে আর একবার নিজেকে আয়নায় পরখ করে চোখে গাঢ় করে কাজল এঁকে নিলো।
মেহরিন ঘরের বাহিরে পা রাখতেই খেয়াল করলো শিফা বসে আছে। তার ধ্যান কোথায় তা বোঝা মুশকিল। ডাইনিং টেবিলে শুকনো মুখে বসে আছে শাওন। মেহরিনকে দেখে আড়চোখে তার পানে একবার তাকালো যুবক। মেহরিন দীর্ঘশ্বাস ফেললো। এই দু’জনের মধ্যে আসলে কি হচ্ছে তা সে ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। একশো-বার শিফা-শাওনকে এই নিয়ে প্রশ্ন করলেও কোন উত্তর পাচ্ছে না। ফলস্বরূপ বেচারি মেহরিন প্রশ্ন করায় বন্ধ করেছে।
মেহরিন আসতেই শিফা গম্ভীর মুখে উঠে দাঁড়ালো। মনোয়ার শেখ বাড়িতেই আছেন। বিকেলে চা ছাড়া চলে না ওনার। তাই স্ত্রীর হাতের বানানো চা’য়ে কাপে চুমুক দিচ্ছেন আপন মনে। মেহরিনকে দেখে মৃদু হেঁসে আওড়ালেন—
—সন্ধ্যার আগে ফিরে এসো৷
মেহরিন মাথা নাড়ে।
—আচ্ছা।
অতঃপর শিফা শাওনকে নিয়ে বেড়িয়ে পরে মেহরিন। অভ্র যখন তাকে শপিংয়ে নিয়ে যাবে বলেছিলো তখন মেহরিন শর্ত দিয়েছিলো শিফা-শাওনকে ছাড়া সে যাবে না। তাই বাধ্য হয়ে অভ্রও রাজি হয়।
রাস্তায় এসে থামতেই আশেপাশে নজর বুলায় তিনজন। তবে রিকশার ‘র’ও চোখে পরে না। শাওন মেহরিনকে থামতে বলে দু’কদম এগিয়ে গিয়েও দেখে এলো। তবে ফলাফল শূন্য। বেচারা মলিন মুখে ফের ফিরে আসতেই হুট করেই তাদের সামনে এসে থামলো কালো রঙা একটা গাড়ি। মেহরিনের ভ্রু কুঁচকে গেলো।
—মেহু! এদিকে এসো।
চমকে উঠলো মেহরিন। সামনের দিকে নজর পরতেই খেয়াল করলো অভ্র তাকে ডাকছে সামনের গাড়িতে৷ গাড়ির গ্লাস তুলে হাত বাড়িয়েছে বাহিরের দিকে। মেহরিন পা বাড়ায় না। শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে রয়। এরমধ্যেই অভ্র নিজ থেকে গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ায়। হাসিমুখে শিফা-শাওনকে গাড়িতে বসতে বলে হুট করেই মেহরিনের হাত ধরে। তাতে মেহরিনের কেমন অস্বস্তি হয়। আলগোছে হাতটা সরে নিতে চেয়েও পারেনা। অভ্র নিজেই মেহরিনকে সামনে বসিয়ে নিজেও ড্রাইভিং সিটে বসে পরে।
—নিতে আসবেন বললেন না তো!
মেহরিনের প্রশ্নে ঠোঁট জোড়া প্রশস্ত করে হাসে অভ্র। মাথার চুলে হাত বুলিয়ে আওড়ায়—-
—সবকিছু বলেই করতে হবে না-কি? সারপ্রাইজ হিসেবে ধরে নাও।
মেহরিন কথা বললো না। মুখ ফিরিয়ে জানালার দিকে তাকিয়ে চোখ বন্ধ করে নিলো কেমন। পিছন থেকে শাওন-শিফা একে অপরের পানে চাইলো। তারা নিজেদের মধ্যে কথা বলেনি আজ অনেকদিন হলো। শাওন যাবে বলে শিফা মেহরিনের সাথে আসতে রাজি হচ্ছিলো না, তবে মেহরিনের জোড়াজুড়িতে আর না করেনি। অন্যদিকে শাওন বেশ কয়েকবার শিফার সাথে কথা বলার চেষ্টা করছে। তবে জেদি মেয়েটা ফিরেও তাকাচ্ছে না তার পানে৷
আজকাল মেহরিনকে বড্ড অদ্ভুত লাগছে শিফার কাছে। সে না-হয় চুপ করে গেছে, আগের মতো কথা বলেনা সকলের সাথে। কিন্তু মেহরিন? তার কি হয়েছে? মেয়েটা কেমন সবসময় চুপচাপ থাকে। আগের সেই চঞ্চলতা কোথায় তার! শিফা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। চুপচাপ তাকালো বাহিরের দিকে।
দেখতে দেখতে শপিংমলে পৌঁছে গেলো তারা। অভ্র গাড়ি পার্ক করে এসে দাঁড়ালো মেহরিনের পাশে। মেহরিন, শিফা-শাওন চারিদিকটা সুক্ষ্ম দৃষ্টিতে দেখে নিলো একবার। বেশ ভালোই আবহাওয়া চারিদিকের। অভ্র মেহরিনের পাশে থেমে বারবার ঘড়ি দেখতে লাগলো। কপাল কুঁচকে গেলো মেহরিনের। ভেতরে না গিয়ে এখানে দাঁড়িয়ে থাকার কারণ খুঁজে পেলো না রমণী। ফলস্বরূপ কপালে ভাজ ফেলে আওড়ালো—-
—কি হলো? কেউ আসবে না-কি? এভাবে দাঁড়িয়ে আছি যে!
অভ্র মনে মনে বাঁকা হাসলো। পাশ ঘেঁসে দাঁড়ালো মেহরিনের। অতঃপর সোজা তাকিয়ে আওড়ালো—-
—সারপ্রাইজ।
—আজকে কি সারপ্রাইজ এর ঝুঁড়ি খুলে নিয়ে বসেছেন না-কি? আশ্চর্য!
মেহরিনের বিরক্তিকর মুখের পানে চেয়ে রহস্যময় হাসলো যুবক। শিফা সুক্ষ্ম দৃষ্টিতে তা দেখে মেহরিনকে টেনে নিজের পাশে দাঁড় করালো। ফিসফিস করে আওড়ালো—
—এই ব্যাডা নিশ্চয়ই কোন প্যাঁচ কষছে মনে মনে।
মেহরিন ‘হুম’ বলে অপেক্ষা করতে লাগলো অভ্রের বলা তথাকথিত সারপ্রাইজ এর জন্য। তবে হুট করেই সামনে একটা কালো গাড়ি থামায় সকলে চমকে উঠলো। অন্যদিকে মেহরিনের বুকটা কেমন ধক করে উঠলো। যার থেকে পালাতে সে নিজেকে আড়াল রাখছে, আজ সেই এখানে? মেহরিন ভাবতে পারেনা। অজান্তেই ঠোঁট ফসকে বেড়িয়ে যায় কয়েকটা বাক্য—
—এটা তো আদ্রিয়ান স্যারের গাড়ি।
—ঠিক চিনেছো।
পিলে চমকে উঠলো মেহরিনের। বিড়বিড় করে বলা কথাটা অভ্র শুনে যে আচমকা এহেন প্রতিত্তোর করবে তা বুঝতে পারেনি। আচমকা অভ্রের বলা কথাটায় বেশ অস্বস্তি হলো রমণীর। ঠোঁট কামড়ে মাথা কেমন নুইয়ে নিলো৷
অন্যদিকে আদ্রিয়ান গাড়ি পার্ক করে গটগট করে এসে থামলো তাদের অভিমুখে।
—এলি তাহলে?
অভ্রের কথার পাছে ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলো যুবক। চুলের ভাজে হাত চালিয়ে আওড়ালো—-
—একমাত্র বড় ভাই তুই আমার। হবু ভাবিকে নিয়ে শপিং করাতে আসবি, আমাকে আসতে বললি আর আসবো না? পরে তো আবার বলবি ভয় পেয়েছে আদ্রিয়ান চৌধুরী।
অভ্র হাসলো বাঁকা। আদ্রিয়ান সুক্ষ্ম দৃষ্টিতে একবার পরখ করলো মেহরিনকে। অন্যদিকে আদ্রিয়ানের মুখে ভাবি ডাকটা শুনে গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে এলো রমণীর। বুকটা কেমন কাঁপছে সেদিনের কথা মনে পরে। অজানা অনুভূতিতে সিক্ত হচ্ছে হৃদয়। মেহরিন শুকনো ঢোক গিলে নিজেকে সামলে নিলো। ওড়নার একাংশ হাতের মুঠোই নিয়ে চাপ প্রয়োগ করলো।
রমণী মাথা তুলে চাইলো না আর। শিফা-শাওন সামান্য কথা বলে চুপ মেরে গেলো। অন্যদিকে মেহরিন বুঝলো অভ্রই আদ্রিয়ানকে এখানে ডেকেছে। তবে কেনো? সে তো মেহরিনের পাশে আদ্রিয়ানকে ঠিক সহ্য করতে পারছে না। সেদিন কত কথা শোনালো! আর আজ নিজ থেকে ডেকেছে? আশ্চর্য!
মেহরিন সন্দিহান দৃষ্টিতে তাকালো অভ্রের পানে। খেয়াল করলো, যুবকের ঠোঁটের আগায় কেমন অদ্ভুত অস্বস্তিকর এক হাসির রেখা জ্বলজ্বল করছে। মেহরিনের বুকটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠলো।
—চল, ভেতরে যাওয়া যাক!
—ইয়াহ্, অফকোর্স।
কথাটা শেষ করেই আদ্রিয়ান তাকালো মেহরিনরে দিকে। অন্যদিকে অভ্র বাঁকা হেঁসে আচমকা মেহরিনের হাতের ভাজে নিজের হাত প্রবেশ করালো। হুট করেই অভ্রের এহেন স্পর্শে জমে গেলো রমণী। তীব্র অস্বস্তিতে কেমন কুঁকড়ে গেলো।
—চল তাহলে!
বলেই মেহরিনকে একপ্রকার টেনে নিজের সাথে নিয়ে যেতো লাগলো অভ্র। শিফা-শাওনও বিরক্তিকর শ্বাস ফেলে পিছু নিলো তার। তবে আদ্রিয়ান পা বাড়ালো না তৎক্ষনাৎ। বাজপাখির ন্যায় তীক্ষ্ণ দৃষ্টি মেলে এক ধ্যানে তাকিয়ে রইলো মেহরিনের হাতের দিকে। যেই হাতের আঙুলের ভাজে আপাতত বিচরণ করছে অভ্র তালুকদারের হাত।
আদ্রিয়ান নিজের হাত মুঠোয় করে নিলো আচমকা। এতোটাই শক্ত করে নিলো যে হাড্ডি ভাঙার মতো শব্দ এলো খানিক। ঘাড় সামান্য কাত করে তাকিয়ে রইলো অভ্রের যাওয়ার পানে। ঠোঁটের কোণায় আঁকলো বিশ্রী এক হাসি। বিড়বিড় করে আওড়ালো—-
—শালা কাপুরুষের বাচ্চা।
—মেহু! এটা দেখো তো! ভালো লাগছে না?
কথাটা বলতে বলতে নিজ থেকে আগ বাড়িয়ে কালোরঙা একখানা পাতলা ফিনফিনে শাড়ী মেহরিনের গায়ে ধরলো অভ্র। মেহরিন তা দেখে নিজেকে গুটিয়ে চোখমুখ কুঁচকে নিলো। পাশ থেকে শিফা বিরক্তিকর মুখে আওড়ালো—
—কি যে বলেন ভাইয়া! এতো পাতলা কাপড় মেহু পড়বে? আজাইরা কি চয়েস করছেন আপনি? ভালো কিছু দেখুন।
বলতে বলতে অভ্রের হাত থেকে শাড়ীটা একপ্রকার ছিনিয়ে দূরে আছড়ে ফেললো শিফা৷ পাতলা ফিনফিনে শাড়ীটির গায়ে সুক্ষ্ম কারুকাজ করা থাকলেও তা দিয়ে শরীর আবৃত হবার নয়। বরং কাপড় পরেও নারী দেহের অর্ধেক ভাজ উন্মুক্ত কিভাবে রাখা যায় তা এই শাড়ী দেখলে বোঝা যাবে।
মেহরিন শাড়ীটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ঠোঁট জোড়া কামড়ে ধরলো নিজের। ভিষন অপমানিত বোধ করলো রমণী। অভ্র তখনো বিরক্তিকর মুখে ব্যাস্ত হাতে সেই শাড়ীগুলো দেখে যাচ্ছে। মেহরিনের কেনো জানি কান্না পেলো। ভিষন অসহায় লাগলো আচানক।
—মেহু! এটা চলবে?
মেহরিন একপলক তাকিয়ে চোখ ফিরিয়ে নিলো। পাশ থেকে শিফা ফের আওড়ালো—-
—আরে ভাইয়া! বিয়ের পোশাক এসব হয় না-কি? আন্টি তো বললেন ভালো জামদানী-বেনারসির মধ্যে নিতে। আপনি এসব মসারি দেখছেন কেনো?
শিফার কথায় এ পর্যায়ে দাঁতে দাঁত চাপলো অভ্র।
—মেহু কি পড়বে না পড়বে সেটা আমাকেই ডিসাইট করতে দাও! ও অভ্র তালুকদারের স্ত্রী হতে যাচ্ছে। ওসব পাতি জামদানী-টামদানী কেনো পরবে বুড়ি মহিলাদের মতো? প্রেস্টিজ বলে কিছু থাকবে তাহলে আমার?
হতভম্ব মেহরিন হা করে তাকিয়ে রইলো অভ্রের পানে। হুট করেই কেনো যেনো একরাশ ঘৃণার উদয় হলো পুরুষটির জন্য। এ কেমন স্বামী সে ঠিক বুঝে উঠতে পারলো না। পাতলা,ছোট্ট-ছোট্ট ড্রেস পরলে ওর মানসম্মান বাড়বে?
—আমি ওয়াশরুমে যাবো।
বলতে বলতে উঠে দাঁড়ায় রমণী। সহসা পা বাড়ায় সামনের দিকে। চোখমুখে নেমেছে ঘোর অমাবস্যা। সুশ্রী মুখখানা হারিয়েছে তাদের চঞ্চলতা।
মেহরিন ওয়াশরুমে ঢুকে চোখমুখে পানি ছিটিয়ে ঠাঁই দাঁড়িয়ে রইলো আয়নার সামনে। কিছু একটা ভুল হচ্ছে সেই দ্বিধায় ভুগছে রমণী। মনের অনুভূতি নিয়েও বেশ সন্দিহান।
—সব ঠিক হচ্ছে তো!
ভাবনার মাঝেই মেহরিন লক্ষ করলো আয়নার সে ব্যতীত দ্বিতীয় মানবের প্রতিচ্ছবি। পিলে চমকে উঠলো মেহরিনের। চোখজোড়া কেমন বড়বড় হয়ে এলো। মেয়েদের ওয়াশরুমে আদ্রিয়ান কি করছে তা ঠিক ঠাওড় করে উঠতে পারলো না। আর না ভাবার মতো ফুরসত পেলো রমণী। ঘাড় ঘুড়িয়ে পিছনে তাকাতে না তাকাতেই আচমকা আদ্রিয়ান করে বসলো আরেক কান্ড। হুট করেই হামলে পরলো মেহরিনের উপর। ডান হাতের কবজি চেপে সেকেন্ডের ব্যবধানে পানি ছাড়লো যুবক। অতঃপর কোনরূপ আগাম বার্তা না দিয়ে সেই পানিতে ডোবালো মেহরিনের হাত।
মেহরিন হতভম্ব, হতবিহ্বল। কথা বলার ভাষা হারিয়েছে রমণী। মাথা কাজ করছে না যুবকের এহেন কান্ডে। ডাগড় ডাগড় আঁখিপল্লব মেলে খালি অবলোকন করে গেলো রূঢ় মানবের কান্ড।
আদ্রিয়ান তখন ব্রেসিন হতে সাবান তুলে নিয়েছে। আপন মনে তা ঘষে চলেছে মেহরিনের হাতে৷ হতভম্ব মেহরিন খানিক ব্যথা পেলো। চোখমুখ খিঁচে সামান্য ‘উহু’ করে উঠলো রমণী। আদ্রিয়ান তা দেখেও চোখ ফিরিয়ে ফের নিজের কাজে মনোযোগ দিলো।
—ক…কি করছেন টা-কি? পা*গল হয়ে গেছেন?
উত্তর করে না যুবক। সে অটল তার কাজে। মিনিট পাঁচেক পর সাবান নামিয়ে আলতো হাতে মেহরিনের হাত পরিস্কার পানি দিয়ে ধুয়ে দিলো আদ্রিয়ান। মেহরিন তখন চোখে ব্যথা নিয়ে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছে যুবকের পানে। আদ্রিয়ানের চোখমুখে আসলে কি আছে তা বুঝার চেষ্টায় বড্ড উতলা রমণী। তবে মানবটির অনুভূতিশূন্য নির্জীব চোখের পানে চেয়ে কিছুই পেলো না।
—আবর্জনা বা যেকোন জীবানুযুক্ত কিছু টাচ করলে হাত ভালোভাবে সাবান-পানি দিয়ে ধুয়ে নিতে হয়, তা জানো না? স্টুপিড!
আদ্রিয়ান পকেট হতে টিস্যু বের করে আলতো হাতে মেহরিনের হাত মুছে দিতে লাগলো। তার এহেন স্পর্শে সামান্য কেঁপে উঠলো রমণী। তার চেয়ে বেশি অবাক হলো তার কথায়।
—মানে? আমি তো তেমন কিছু ছুঁইনি!
ঠোঁট বাঁকিয়ে কেমন হাসলো যুবক। চোখমুখ খানিক গম্ভীর করে নিলো পরমুহূর্তেই। জবাব দিলো না মেহরিনের কথার। অন্যদিকে উৎসুক মেহরিন তাকিয়ে আছে উত্তর পাওয়ার আশায়।
—মেহু! হয়েছে তোমার? এতো সময় লাগছে কেনো?
ভাবনার মাঝেই আচমকা অভ্রের গলায় চমকে উঠলো মেহরিন। তড়িঘড়ি করে দেখতে গেলো অভ্র এদিকে আসছে কি-না! আদ্রিয়ানের সাথে এখন এখানে এভাবে দেখলে নিশ্চয়ই আবারো গন্ডগোল পাকাবে! মেহরিন পরলো মহাবিপদে। অন্যদিকে মেহরিনকে উত্তেজিত হতে দেখেও ঠাঁই দাঁড়িয়ে রয় আদ্রিয়ান। চোখমুখে কোন আতঙ্ক নেই, নেই কোন তাড়া। বরং শীতল দৃষ্টিতে কেবল তাকিয়ে আছে সামনের মানবীটির পানে।
শিফার কথা অনুযায়ী ওয়াশরুম থেকে ফিরে মেহরিন নিজে শাড়ীতে হাত দিলো। কেনাকাটা করার ইচ্ছে না থাকলেও করতে যখন হচ্ছে তখন অভ্রের পছন্দের সেই থার্ড ক্লাস ড্রেসগুলো পরতে রাজি নয় রমণী। তাই অনেক চিন্তা-ভাবনা করে ঠিক করলো এরমধ্যে থেকে মাত্র দু’টো শাড়ী সিলেক্ট করবে। যাতে বাড়ি ফিরে মা’কে কোন কৈফিয়ত দিতে না হয়।
যেই ভাবনা সেই কাজ। শিফা-শাওনের সাথে সাথে মেহরিন নিজেও শাড়ী পছন্দ করতে লেগে গেছে। কিন্তু যাই দেখতে তা’ই কেমন বিরক্তিকর লাগছে। পছন্দসই মিলছে না কিছুই। মেহরিন হাত দিয়ে এটা-ওটা নাড়াচাড়া করতে লাগলো বিষন্ন মনে। পিছনে অভ্র ও আদ্রিয়ান পাশাপাশি পকেটে হাত গুঁজে সটান হয়ে দাঁড়িয়ে। তখন অভ্রের ডাকে মেহরিন তড়িঘড়ি করে ওয়াশরুম থেকে বেড়িয়ে এসেছিলো, আদ্রিয়ানকে তার পরে বের হতে বলে।
অভ্রের কপালে বিরক্তির ছাপ সুস্পষ্ট। তার স্ত্রী হয়ে কি-না এসব সেকেলে শাড়ী বাছায় করছে? অভ্র মেনে নিতে পারলো না। অন্যদিকে গম্ভীর আদ্রিয়ান নিগুর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সামনের দিকে। অভ্র একপলক তাকালো তার পানে, অতঃপর ঠোঁট বাঁকিয়ে চোখ ফিরিয়ে নিলো যুবক।
—শিফা! কিছুই পছন্দ হচ্ছে না।
বিরস মুখে বলে উঠে রমণী। শিফা নিজেও কপাল চুলকে আওড়ালো—-
—অন্য মলে যাবি?
উত্তর করার মতো ফুরসত পেলো বা মেহরিন। তখনি অনুভব করলো তার গায়ে কিছু একটা জড়িয়ে যাচ্ছে। পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে বলিষ্ঠ দেহের এক যুবক। মেহরিন মাথা তুলে উপরের দিকে চায়। হুট করেই দৃষ্টি মিলিত হয় অনাকাঙ্ক্ষিত এক পুরুষের সহিত। মেহরিনের তনু মন কেমন দুলে উঠে। সর্বাঙ্গ শিরশির করে উঠে অজানা অনুভূতিতে।
আদ্রিয়ান তার পানে ঝুঁকে আছে। গায়ে জড়িয়ে দিয়েছে লাল টুকটুকে একখানা বেনারসি। মেহরিনের চোখ কেমন স্থির হয়ে যায়। শিফা-শাওন হা করে দেখতে থাকে তাদের। মেহরিন-আদ্রিয়ানকে ওভাবে একে অপরের পানে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আচমকা আওড়ায়—–
—মাশাল্লাহ। কি সুন্দর লাগছে এদের দেখতে! একদম পার্ফেক্ট জুটি হ্যায় ই্যায়ে….।
শিফার কথায় তার পানে বাঁকা নজরে তাকালো শাওন। তখনি দোকানদার চট করে শিফার সাথে তালে তাল মিলিয়ে আওড়ালো—-
—একদম ঠিক বলেছেন আপা। দু’জনকে মানিয়েছে বেশ।
তাদের এহেন কথায় অভ্রের রাগ তখন সপ্তমে চড়লো। তড়তড় করে তীব্র আক্রোশ ছরিয়ে পরলো তার সারা শরীরের। হাতের মুঠোই শক্ত করে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো আদ্রিয়ান-মেহরিনের পানে। আদ্রিয়ান তা লক্ষ করে বাঁকা হাসলো। মেহরিনকে শাড়ীটা জড়িয়ে দিয়ে সটান হয়ে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত আহ্লাদী গলায় আওড়ালো—–
—বড় ভাই। ভাবিতো কিছু পছন্দ করতে পারলো না, তাই আমিই দেবর হয়ে করে দিলাম। ভালো লাগছে না শাড়ীটা?
হতভম্ব মেহরিন। ভাবি শব্দটা যেনো বাজ ফেলালো রমণীর মাথায়। ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে রইলো মাত্র। অন্যদিকে শিফা হতাশার শ্বাস ফেললো। আদ্রিয়ানের মুখে ভাবী ডাকটা শুনে দোকানি নিজেই মাথা নুইয়ে নিলো। অভ্র তখনো শক্ত চোয়ালে স্থির দাঁড়িয়ে। চোখে তার অদ্ভুত ক্রোধ। আদ্রিয়ান সুক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকে পরখ করে ফের আওড়ায়—-
—কি রে! আমার বেছে দেওয়া শাড়ীটা পছন্দ হয়নি তোর? কথা বলছিস না যে!
—খুব পছন্দ হয়েছে।
সুইটহার্ট পর্ব ১৪
দাঁতে দাঁত চেপে কথাখানা বলেই গটগট পায়ে বিল দিতে চলে গেলো অভ্র। আদ্রিয়ানকে দেখিয়ে দেখিয়ে বিয়ের শপিং করতে এসেছিলো বেচারা, আর এখন শপিং করার তালে নিজেই কেমন অপদস্ত হয়ে ফিরলো।
শপিং শেষ করে সকলে মিলে একটা ফাঁকা রেস্টুরেন্টে গিয়ে বসলো। আদ্রিয়ান চেয়ারে হেলায় দিয়ে ফোন তুলে নিলো হাতে। মেহরিন শিফার হাত ধরে গল্প করছে, আর অভ্র সুক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আদ্রিয়ানের পানে। তার ভাবগতি বোঝার চেষ্টা করছে যুবক, তবে রহস্যময় মানবটির গতিবিধি শনাক্ত করা কি এতই সহজ?
