Home সে খলনায়ক সে খলনায়ক পর্ব ৩১

সে খলনায়ক পর্ব ৩১

সে খলনায়ক পর্ব ৩১
ফারহানা সানিয়াত

ইভান মনে মনে ভেবে হাটার মাঝে চারপাশে চোখ বুলাতে থাকে।তবে হঠাৎ সামনে থেকে কান্নারত প্রাণপ্রিয়াকে দৌড়ে আসতে দেখে ইভান কপালে ভাঁজ ফেলে দাড়িয়ে যায়।
এদিকে প্রানপ্রিয়াও হাত দিয়ে চোখের জল মুছতে মুছতে দৌড়ানোর মাঝে মানুষ চলাচলের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা ইভানকে দেখে দামিয়ানের বলা কথা গুলো কানে বেজে ওঠে।
” আর টাকার অহংকার দেখাচ্ছ, কারন কি ধনী ডক্টরের ছেলে,
তোমার জন্য আমি আগে থেকে দুঃখ প্রকাশ করছি তোমার প্রেমিক মুখে বললেও কাজে কিছু করতে পারবে না। এখন যা সব তার গরিব মেয়ের প্রতি করুনা।”
তার উপহাস কণ্ঠ প্রানপ্রিয়ার বুকের ভেতর আরো ভারি হয়ে ওঠে। তার অপমানে শরীর রিরি করছে। ওই বাজে লোক আজ তাকে সর্বোচ্চ কষ্ট দিয়ে বিনোদন পেয়েছে।
ইভান আবার হাঁটা শুরু করে তার চোখে মুখে প্রাণপ্রিয়ার এই অবস্থা দেখে অস্থিরতার ভির করে নিয়েছে। কি হয়েছে এই মেয়ের!!!
দুজন দুজনের অনেকটা কাছে চলে আসতেই ইভান তার পায়ের গতি কমিয়ে প্রাণপ্রিয়াকে কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করতে নেয় কিন্তু প্রানপ্রিয়া তাকে উপেক্ষা করে পাশ কেটে চলে যেতে নিলে ……

__ প্রিয়া!
কপালে কুঁচকে ইভান তার হাত ধরে আটকে নেয়।
প্রানপ্রিয়া ছলছল চোখে তার দিকে তাকিয়ে কান্নারত কন্ঠে বলে,
__ হাত ছাড় ইভান,
ইভানের কপাল দ্বিগুন কুঁচকে যায়,
__ কেনো কি হয়েছে আর কান্না ……
__ বলছি না হাত ছাড়!!
কিছুটা উঁচু আর রুক্ষ কণ্ঠ প্রাণপ্রিয়া বলে ওঠে। এতে আশেপাশের মানুষ তাদের দিকে তাকানো শুরু করেছে।
ইভান প্রাণপ্রিয়ার ব্যবহারে স্তব্ধ।
প্রানপ্রিয়া ঘনঘন নিঃশ্বাস নেওয়ার সাথে টান মেরে তার থেকে হাত ছাড়িয়ে নেয়, কান্নার কারনে তার চোখ মুখ লাল হয়ে গেছে তারমধ্যে দামিয়ানের অপমান ভেতরে জ্বালিয়ে দিচ্ছে।
সে ইভানকে পাশ কাটিয়ে আবারো চলে যেতে নিলে থেমে যায়।
__ আচ্ছা ইভান আমি কি কখনো বলেছিম তুই আমার প্রতি দয়া দেখা। তার রুক্ষ কণ্ঠ,
ইভান নিশ্চুপ তার দিকে তাকিয়ে।
তাহলে কেনো ভালোবাসার দয়া দেখাচ্ছি ইভান।

তোর আর আমার দুনিয়া আলাদা বুঝতে পারিস না কেনো। তোদের দুনিয়ার মানুষের চোখে আমার মত মেয়ে যে মূল্যহীন। আশ্রিতা হয়ে আমাকে যতটা না কষ্ট দেয় একজন ধনী ডক্টরের ছেলের সাথে কথা উঠিয়ে অপমান করা আমাকে ভেঙে ঘুরিয়ে দিচ্ছে। মানুষ আমাকে অপমান করে বিনোদন নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। তুই ভাবতে পারছিস এসব গভীরে গেলে আমার সাথে আরো কি কি হতে পারে। সমাজের মানুষ আমাকে কি কি বলবে।নাহ তোর ভাবনায় এসব নেই কারন সমাজে ধনীর ছেলেকে কখনোই কিছু বলা হয় না। তুই যদি সমাজের চোখে সম্মানের সাথে আমাকে নিজের করতে পারিস তাহলে যাহ আমি ও রাজি হবো একসাথে থাকবো সারা জীবন আর যদি না পারিস তাহলে কখনো আর আমার সাথে যোগাযোগ করবি না আমাদের বন্ধুত্বের সম্পর্ক ও শেষ হয়ে যাবে মনে রাখবি এর জন্য শুধু তুই দাই থাকবি ।
বলেই প্রানপ্রিয়া আর এক মুহূর্তের জন্য দাড়ায় না সে হাত দিয়ে চোখের জল মুছতে মুছতে চলে যায়।
ইভান নির্বিকার তার চলে যাওয়ার দিকে অনুভূতি শূন্য হয়ে তাকিয়ে …
পাশ দিয়ে দামিয়ান চোখের সানগ্লাস পড়তে পড়তে হেঁটে চলে যায় ঠোঁটের কোণে তার বাঁকা হাসি।

পরদিন,আবরার ম্যানশনে বসার ঘরে ডক্টর ইসরাফিল আর কল্পনা বসা তাদের বরাবর হুমায়ূন আবরার। তিনজনের মাঝে গুরুত্বপূর্ণ কথোপকথন
মিসেস কল্পনা বলে ওঠেন,
__ আমি সত্যিই ভাবতে পারিনি ইভান এমন একটা সুযোগ পাবে তাও এত দ্রুত, মিস্টার আবরার আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।
পাশে বসা ইসরাফিলও স্ত্রীর সাথে ধন্যবাদ জানান হুমায়ূনকে।
হুমায়ূন হেসে বলেন, এভাবে ধন্যবাদ জানাবেন না। আমরা একটা পরিবার এটা আমি মানি তাই ভালো কিছুর সুযোগে পরিবারের ছেলের কথাই প্রথম মনে আসে আর মিসেস কল্পনা আমাকে পার্টি তে বলেছিলেন ইভানকে বাকি পড়াশোনার জন্য বাইরের দেশে পাঠাতে চান তাই ভাবলাম রাশিয়া যাওয়ার সুযোগ ইভান পেলে আমার নিজের ও ভালো লাগবে।
__ কি বলব মিস্টার আবরার আমি এখন স্বস্থির শ্বাস ফেলবো । ছেলের খামখেয়ালি ভবিষ্যতের অতি জলদি একটা দিক হবে। আর এমনিতে বললেই তো বাহিরের দেশে চলে যাওয়া যায় না। সময়ের একটা ব্যাপার থাকে সেখানে গিয়ে আবার পড়াশোনা জব। তবে আপনাদের জন্য সহজ হয়ে গেছে আমি এখন নিশ্চিন্ত।

__ আচ্ছা কেমন সময় লাগতে পাবে মিস্টার আবরার ইভানের পাসপোর্ট অলরেডি করা আছে ।
শুধু ভিশার এপ্লাই ।এর মধ্যে কোনো ঝামেলা সময় দেরি কিছু হবে না তো, ইসরাফিল জিজ্ঞেস করলেন।
হুমায়ুন হাসিমুখে দুদিকে মাথা নাড়ান, কোনোকিছু ঝামেলা হবে না নিশ্চিন্তে থাকবেন কি বলো দামিয়ান।
হুমায়ূনের পাশের সোফায় পায়ের উপর পা তুলে বসা দামিয়ান এতক্ষণ চুপচাপ তাদের কথা শুনছিল,
__ হুম আমার দায়িত্বে আমি তাকে ব্যবসায়িক কাজে রাশিয়া পাঠাবো, এখানে ঝামেলার কিছু হবে না। তাকে যতদ্রুত সম্ভব পাঠানোর চেষ্টা হবে । দামিয়ানের ঠোটের কোণে কিঞ্চিৎ হাসি।
ইসরাফিল আর কল্পনা দুজন যেন আরো স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। কাল রাতে হঠাৎ হুমায়ুন নিজে থেকে ফোন করে ইভানকে বাহিরে দেশে পাঠানো নিয়ে নানান কথা তাদের বলছিলেন। প্রথমে কিছুটা অবাক হয়েছিলেন । তবে কিছু একটা ভেবে রাজি হয়ে যান তারা যেন এমন সুযোগ হাত ছাড়া করতে চান না। তাই ভালোভাবে বিষয়টা নিয়ে আলোচনা করার জন্য সকাল সকাল এই বাড়িতে চলে এসেছেন।
__ কিন্তু ইভান কি এই ব্যাপারে রাজি? তার মতামত কি ?আজকাল ছেলে মেয়েদের মতামত খুবই গুরুত্বপূর্ণ, হুমায়ুন বললেন।
কল্পনা কিছুটা অপ্রস্তুতি হেসে ইসরাফিল কে এক নজর দেখে বলেন,

_ আআসলে আমরা যা বলবো সেটা তেই সে রাজি। রাজি না হওয়ায় মতো তো আর পিছুটান নেই।
দামিয়ান মনে মনে হেসে ওঠে, সে ও মানে ডক্টরের ছেলের পিছুটান নেই আর যদি থেকেও থাকে কোনো লাভ নেই। তার দূরে যেতে হবে তার রাজ্য যেখান থেকে চাইলেও আসা যাবে না।
__ তাহলে তো খুব ভালো তার এতবড় সুযোগ হাতছাড়া করা ঠিক হবে না সে বুঝতে পারবে সেখানে তারজন্য চাকরি পড়াশোনা দুটিই অপেক্ষা করছে ।
ডক্টর ইসরাফিল আর কল্পনা বসা থেকে উঠে দাঁড়ান,
__ আপনাদের মুখে ধন্যবাদ বলা কম হয়ে যাচ্ছে। মিস্টার আবরার তবুও অসংখ্য ধন্যবাদ এখন তাহলে আমরা নিশ্চিন্তে বাসায় যাচ্ছি আপনার সাথে আবারো দেখা হবে।
হুমায়ুন ও বসা থেকে উঠে দাঁড়ান হাসি মুখে তাদের সাথে কথা বলতে বলতে সদর দরজার দিকে হাঁটা ধরেন।
সোফায় বসা দামিয়ান তাদের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে বাঁকা হেসে। কালকে রাতের কথা ভাবে যখন সে তার বাবার সাথে কথা বলার মাঝে ইচ্ছে করে বলেছিল রাশিয়াতে বাঙালি কাউকে নিয়ে যেতে চায়। তার সুবিধার জন্য সেখানকার ব্যবসায় বিশ্বস্ত বাঙালি কাউকে প্রয়োজন তাদের চেনা জানা আত্মীয়দের মধ্যে হলে ভালো হবে ।
ব্যাস এতটুকু কথায় তার বাবা মুহূর্তে ডাক্তারের ছেলের কথা বলে ওঠে ছিলেন। সে জানতো তার বাবা ওই ছেলের কথাই বলবে বাহিরে পাঠানো পড়াশোনার নিয়ে সে সর্বশেষ ওই ছেলেকে নিয়ে শুনেছিল।
দামিয়ান বসা থেকে উঠে পা বাড়ায় গেস্ট হাউসের যাওয়ার জন্য তার ঠোঁটে মৃদু উপহাসের হাসি। সেটা কেনো?
ওই মেয়ের জন্য ?

অবশ্যই,
কারন সে খবর নিয়েছে ডক্টর আর তার স্ত্রী আশ্রমের মেয়েকে কখনোই মানবে না। আর এই সুযোগের পুরোপুরি সৎ ব্যবহার সে সূক্ষ্ম কৌশলে নিবে সে জানে এখন কি হতে পারে এবং হবে ।
ডক্টর ইসরাফিল আর কল্পনা হুমায়ুনকে বিদায় জানিয়ে তাদের গাড়িতে উঠে বসেন। অতঃপর ড্রাইভার গাড়ি স্টার্ট দিয়ে ধীর গতিতে গার্টেন পার হয়ে বিশাল বড় গেট দিয়ে বের হয়।
কল্পনা ঠোঁটের কোণে হাসি নিয়ে স্বামীকে উদ্দেশ্য করে বলেন,,
__ চুপ থাকার সময় এবার শেষ হয়েছে আমাদের, ছেলের সাথে সরাসরি কথা বলতে হবে।
ইসরাফিল চোখের চশমাটা হাত দিয়ে ঠিক করে গভীর শ্বাস ফেলেন,,

__ তোমার কি মনে হয় রাজি হবে,
কল্পনা ঘাড় ঘুরিয়ে বাহিরের দিকে তাকায়,
__ করাতে হবে যেভাবেই হোক যে কোনো উপায়ে,
নাহলে ছেলে যা শুরু করেছে শেষমেষ ওই রাস্তার মেয়েকে ঘরে তুলতে হবে। ইসরাফিল স্ত্রীর দিকে তাকান,
কল্পনার মুখ থেকে হাসি সরে গেছে,
__ তিন মাস অনেক সহ্য করেছি। ছেলেকে হাতে রাখার জন্য এই ব্যাপার নিয়ে কিছু বলিনি আশেপাশে মানুষের কানাঘষা আমি কতটা ছোট হয়েছি বলার মতো না।

সে খলনায়ক পর্ব ৩০ (২)

এখন উপরওয়ালা আমার দিকে মুখ তুলে চেয়েছেন ছেলেকে বাহিরে পাঠানোর স্বপ্ন আমাদের ছিল। খোদা তায়ালা আমাদের ভালোবাসেন বলে সঠিক সময় সুযোগের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন কোনো ভাবে ছেলেকে ওই মেয়ের থেকে দূরে সরাতে পারলে আমি নিশ্চিন্ত হব।
__ তুমি কি কিছু ভেবে রেখেছো? ইসরাফিল জিজ্ঞেস করলেন।
কল্পনা হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ান , ভেবে তো অনেক কিছু রেখেছে সময় মতো তোমার সাহায্য প্রয়োজন হবে।

সে খলনায়ক পর্ব ৩২