সোনাডিঙি নৌকো পর্ব ১৩
মৃধা মৌনি
—“কেমন আছিস?”
প্রশ্নটা শুনে দীক্ষা এক ঝলকে হেসে উঠল। সে হাসি নয়, যেন হৃদয়ের গহীনে জমে থাকা কষ্টের স্রোত হঠাৎ বাঁধ ভেঙে বেরিয়ে এলো। তার সমস্ত সত্তা যেন চিৎকার করে বলতে চাইল- দেখো না সবাই! এই সেই মানুষ, যে আজ আমায় জিজ্ঞেস করছে কেমন আছি! সেই কণ্ঠস্বর, যা একদিন আমার ভালো থাকার একমাত্র কারণ ছিল, সেই কারণটিকে নির্মূল করে, আমাকে শূন্যতার পথে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে আজ আবার জানতে চাইছে কুশল-বিনিময়!
দীক্ষার অপ্রকৃতিস্থ হাসি দেখে শিশিরের কপালে ভাঁজ পড়ল। বিরক্তিতে কুঁচকে এলো ভ্রু। সামান্য রাগও হলো বৈকি। সে কি এমন মারাত্মক কিছু জিজ্ঞেস করে ফেলেছে? মেয়েটির আদিখ্যেতা এত কিছুর পরেও কমলো না!
—“আমি কি হাস্যকর কিছু বললাম?”
শিশিরের কণ্ঠস্বর পুনরায় ভারী, গমগমে শোনালো।
দীক্ষা প্রাণপণে হাসি থামানোর চেষ্টা করে। অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে নিয়ে শুধাল,
—“উম..না না, আমার আসলে…”
কয়েকবার খকখক করে কেশে শেষমেশ হাসি থামাল সে। দু’চোখের পাতা বেয়েই টপটপ করে জল গড়িয়ে পড়ছে। শিশির হয়তো ভাবছে, হাসির দমকে তার চোখে জল এসেছে। কিন্তু দীক্ষা নিজেই জানে, এই অশ্রুজল কতখানি বুক-ফাটা, স্বপ্ন-ভাঙ্গা জলের প্রতিচ্ছবি!
—“মাথার নাটবুল্টু ঢিল হয়ে গেছে বুঝলি। কেন যে হাসছি, কেন যে কাঁদছি- নিজেই বুঝতে পারছি না।”
—“কাঁদছিস নাকি?”
তার কপালে সামান্য উদ্বেগ মিশলো এবারে।
রুক্ষতায় ভরা সেই চোখ দু’টির দিকে চোখ রেখে দীক্ষা মাথা নাড়ল,
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
—“উঁহু, কাঁদছি না।”
একটা দীর্ঘশ্বাস সন্তর্পণে তার বুক চিরে বেরিয়ে আসে। গভীর সেই হাহাকারকে শিশির খেয়াল করার আগেই হাওয়ায় মিশিয়ে দিলো দীক্ষা।
—“ভেতরে চল।”
শিশিরের কথায় দীক্ষা খুব আলগোছে হাঁটুর উপর থুতনিটা রাখে- ঠিক সেভাবে, যেভাবে তার ভাঙা হৃদয়ের টুকরোগুলি সে নতুন করে যত্ন করে আগলে নিচ্ছে…
—“এখানেই বসি।” সংক্ষেপে শুধালো।
ওরা বসেছে বেলকনির সেই চিরচেনা, পাশাপাশি রাখা চেয়ার দু’টিতে। এই সেই জায়গা, যেখানে শুরু হয়েছিল তাদের ভালোবাসার রূপকথা। যেখানে কত নির্ঘুম রাত জ্যোৎস্নার মায়াবী আলোয় মাখা হতো তাদের শরীর, যেখানে একজন আরেকজনের জন্য ভরসা, আস্থা আর বিশ্বাসের প্রতীক হয়ে উঠেছিল।
দীক্ষার আজও মনে পড়ে সেই রাতের কথা, তাদের বাসর রাত হিসেবে পরিচিত রাতটি! ঘোর অমাবস্যা ছিল সেইদিন। ঢাকা শহরের ব্যস্ত জীবনে এসবের হিসেব রাখে ক’জন? রাখলে হয়তো ভরা পূর্ণিমার আলোয় বিয়েটা করত তারা। সেই তমসাছন্ন রাতের আঁধারে, এই বেলকনির ঝিরিঝিরি বাতাসে দাঁড়িয়ে ছিল দু’জনে… দীক্ষার মাথাটা ছিল শিশিরের বুকে, আর শিশির দেয়ালের বুকে পিঠ ঠেকিয়ে শান্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়েছিল। যেন এক জীবনে যা কিছু চাওয়া ছিল, সব কিছুই পূর্ণ হয়ে গেছে তার। যেন চাওয়ার আর কিচ্ছু নেই… কিচ্ছু না! পুরো পৃথিবীটাই যেন তার হাতের মুঠোয় চলে এসেছে… সেই রাতে শিশির বলেছিল,
—“মহারাণী শোন, এই রাতটা কি অন্ধকার দেখছিস?”
বুকের ভেতর খরগোশের বাচ্চার মতো ঢুকে থাকা দীক্ষা জবাব দিয়েছিল,
—“দেখছি।”
—“এই রাতের মতোই আমার জীবনটা হয়ে ছিল এতদিন। আলোর ছিটেফোঁটা হয়তো ছিল, কিন্তু অন্ধকারটাই ছিল বেশি। ভয়ংকর এক অমাবস্যা। জ্যোৎস্নার লেশমাত্র ছিল না। কেন ছিল না, জানিস?”
—“কেন?”
—“কারণ আমার আকাশে চাঁদ ছিল না। আজ সেই চাঁদটাকে রেজিস্ট্রি করে নিজের নামে লিখে নিয়ে এসেছি। এবার আর অমাবস্যা হবে না, শুধুই জ্যোৎস্না।”
দীক্ষার চোখ ভিজে এসেছিল সেদিন। নিজেকে পরম সৌভাগ্যবতী মনে হয়েছিল তার। জীবনের চাওয়া-পাওয়া যা কিছু ছিল, তা যেন সেদিনই পূর্ণ হয়েছিল। সেই রাতের কথা আজও ভাবতে বসলে দু’চোখ ভিজে ওঠে। মন কথা শুনতে চায় না, অবাধ্যতার চূড়ান্ত করে যেন নিঃশ্বাসটাকেও আঁটকে দিতে চায়।
দীক্ষা মাথা তুলে সোজা হয়ে বসল। ভালো লাগছে না, কিচ্ছু ভালো লাগছে না আর। প্রবল ইচ্ছে করছে ঝাঁপিয়ে পড়তে ওই বুকে- যে বুকের রাজত্বে একসময় কেবলই দীক্ষার নাম লেখা ছিল!
কিন্তু…
দীক্ষার বুক জ্বলে যায়, চোখ লাল হয়ে আসে, চারপাশের সবকিছুকে পুড়িয়ে ছাঁই করে দিতে ইচ্ছে করে ভীষণভাবে। কেন কিছু কিছু ক্ষেত্রে মানুষ এতটা অসহায় হয়? কেন এই অসহায়ত্বকে মেনে নিতে হয়?
চারপাশে থমথমে নীরবতা। সেই নীরবতা ভেঙে শিশির নড়েচড়ে উঠল। কণ্ঠটা অদ্ভুতভাবে কাঁপছে তার,
—“কি হলো? এমন করছিস কেন?”
দীক্ষা ঠাণ্ডা স্বরে বলল,
—“কেমন করছি?”
—“হাঁসফাঁস করছিস।”
দীক্ষার চোখে নিস্ফল রাগের ঝিলিক দেখা গেল উত্তর দিতে নিয়ে,
–“তো আমার কি করা উচিত? পায়ে ঘুঙুর বেঁধে নাচব? তুই বল, আমি নাচি দেখ।”
শিশির বিরক্ত হল, ভেতরের দমিত উত্তাপটা বেরিয়ে এলো,
—“আমার সাথে ত্যাড়ামি করবি না। অনেক সয়েছি।”
—“আমি ত্যাড়ামি করে কথা বলি?”
—“তা নয়তো কি? সাপের মতো হিসহিস করছিস দেখে ভালো মনে জিজ্ঞেস করলাম, অসুবিধা নাকি, সুন্দর করে উত্তর দিলেই তো হতো।”
দীক্ষার কণ্ঠটা নিমেষেই ভারী হয়ে গেল,
—“আমার জীবনে তুই সুন্দর কিছু রাখিসনি শিশির। সুন্দর উত্তরটা আসবে কোথা থেকে? এই যে এখন বিরক্তি ঢালছিস- এটা আরও আগে করলে ভালো হতো। তাহলে তোর আসল মনটা আমি চিনতাম। হয়তো আমরা আজ এখানে আসতাম না।”
শিশির একটু ঝুঁকে এলো। চোখে কঠিন নিরাসক্তি নিয়ে,
—“তুই কখনো আমাকে আমার মতো হতে দিয়েছিস? সবসময় তোর পছন্দ, তোর মতামত। আমি? আমি কোথায় ছিলাম? বিয়ের দিনটাও! তোর অফ-হোয়াইট পছন্দ, তাই আমায় সেটাই পরতে হলো। আমার যে সি-গ্রিন পরার সাধ ছিল, জানতিস?”
দীক্ষা থমকে গেল,
—“বলোয়নি কখনো! আর শপিং এ তুই-ই তো বললি ‘তুই পছন্দ করে নে’। আমি তো জোর করিনি।”
শিশির তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল,
—“মুখে বলেছিলাম বটে… কিন্তু তুই তো চাইতি সবকিছুর উপর তোর ছড়িটা ঘুরুক। ঝামেলা এড়াতে আমি চুপ থেকেছি।”
—“আর ফলাফল?”
শিশির উত্তর দিতে পারল না।
চেয়ারটা ঠেলে পেছনে হেলান দিল। একটা অস্থিরতা নেমে এলো ওর শরীরভঙ্গিতে। পায়ের ওপর পা তুলে সিগারেট ধরালো।
দীক্ষা সাথে সাথে বলল,
—“বাহানা খুঁজলে হাজারটা পাওয়া যায়। আর একসাথে থাকার কারণ খুঁজলে একটা হলেই যথেষ্ট। তুই থাকতে চাসনি—এই তো মূল কথা। তাই আমাদের মাঝে তৃতীয় কেউ এল। কেমন আছিস? ভালোই নিশ্চয়ই। আমি যা দিতে পারিনি, তৃণা দিচ্ছে তো?”
শিশিরের মুখ বিরক্তিতে বিকৃত হয়ে গেল। সিগারেটটা ছুঁড়ে ফেলল বেলকনি দিয়ে।
—“আমি কেমন আছি সেটা ফ্যাক্ট না। ফ্যাক্ট হলো- আমাদের কি করবি?”
দীক্ষা খুব হালকা হাসল।
—“কিছু করার আছে?”
—“তাহলে ডেকেছিস কেন?”
—“একটা কথা জিজ্ঞেস করতে।”
—“কি?”
দীক্ষা চেয়ার সরিয়ে ঠিক শিশিরের সামনে এসে বসল। হাঁটু স্পর্শ করে গেল দু’জনের। সেই পুরোনো নির্ভরতার শিহরন যেন মুহূর্তে ছুঁয়ে গেল তাকে। শিশিরের চোখ নিষ্পলক, শান্ত, কিন্তু অচেনা।
দীক্ষার ভেতরটা কেঁপে ওঠে। শিশিরের মুখোভঙ্গিতে কিছু নেই। কেবল কপালে দুয়েকটা ছোট ভাঁজ- চোখজোড়া এই মুহূর্তে নিটোল, পরিশ্রান্ত। দীক্ষার খুব ইচ্ছে করল, একবার ওই চোখজোড়া ছোঁয়। লম্বা ঘন পাপড়ি যুগলে আঙুলের ডগা ছোঁয়ায়। গালের ছোপ ছোপ দাগ পড়েছে কয়েকটা। ব্রণ থেকে খোঁটাখুঁটি করলে যেমন হয়, ওরকম। মানুষটা কি নিজেকে আয়নায় দেখে না? মুখটা দেখে যে কেউ স্পষ্ট বলে দিতে পারে, মানুষটা ভালো নেই। তবু কীসের এত কঠোরতা, কপটতা!
সে তাকাল শিশিরের চোখের ভেতরে।
বুঝতে চাইল, অপরাধী হলে মানুষের চোখ কি থরথর করে না, একটু কি নুয়ে পড়ে না? আসামীর কাঠগড়ায় নিজেকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেও কি করে চোখ লুকিয়ে নেয়?
সে শান্ত শীতল জলের গলায় জানতে চাইল,
—“দু’হাতে তুলে যা দিয়েছিলাম, সেটাতে আঘাত করতে তোদের একবারও অসুবিধা হলো না? একবারও ভাবলি না, আমি চলে গেলে আমায় ছাড়া থাকতে পারবি কি না? আমাদের কথা… প্রতিজ্ঞা… ভাঙার আগে একবারও কি বুক ধড়ফড় করেনি তোর?”
শিশির নড়ল না।
শুধু চোখের গভীরে একবার ঝলকে উঠল কিছু- অপরাধ? না কি অভিমান? না অন্য কিছু?
দীক্ষা বোঝার আগেই নিভে গেল।
মনে ভেসে উঠল কিছু লাইন, টলমলে যন্ত্রণারই প্রতিচ্ছবি-
যাকে চেয়েছিলাম প্রাণের চেয়েও,
সে পেলো আমাকে… তবু নিলো না।
হাত বাড়িয়ে ছিলাম আমি,
একখানা পাথরখণ্ডের দিকে…
দীক্ষা মৃদু হাসল- যন্ত্রণায় চূর্ণ করা হাসি,
—“আমার সাথে থাকতেই হবে- এটা বলছি না। ভালো লাগা কমে গেছে, ইটস ওকে! কিন্তু সেই কমে যাওয়া অনুভূতিটা সবার আগে আমাকে জানানো উচিত ছিল। তৃতীয় কেউ আসার আগে আমাকে একবার সুযোগ দিতে পারতি। পিঠ পিছনে ছু রি চালালে সেটার নাম কাপুরুষতা দেওয়া হয়।”
শিশির ঠাণ্ডা স্বরে বলল,
—“আমি কি করেছি না করেছি, তার জাস্টিফাই তোকে দেবো না। তুই কি চাস তাই বল।”
দীক্ষা তাকিয়ে রইল।
কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেল। তারপর নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
—“একটা সরি। অন্তত জানাতে চাই তোর ঔরসজাত সন্তানটিকে- প্রতারণা করলেও তুই অনুতপ্ত ছিলি।”
—“সরি? হাহ! ভালো বললি..”
—“পাওয়ার যোগ্যতা রাখি না বলছিস?”
—“তাই কি বললাম?”
—“তাই তো বুঝলাম।”
—“তাহলে তাই…”
—“শিশির।”
—“হু?”
—“তুই খুব স্বার্থপররে। ভয় হয় আমার। নিজের জন্য না- তোর জন্য। সেলফিশ মানুষরা কখনো ভালো থাকতে পারে না। জীবনের এক জায়গায় গিয়ে তাদের হিসেব মিলেই যায়। আমি বিশ্বাস করি, যা হারাচ্ছি তার চেয়ে বেশিই পাব। কিন্তু তুই… তুই কি হারালি জানিস না। যদি কোনোদিন এক আনাও পাস, আমাকে জানাস। সত্যিই খুশি হব।”
জবাব দিতে পারল না শিশির, নিঃশব্দতাকে গ্রহণ করতেই দরজা আর বেলকনির হাওয়ার শব্দ ছাড়া আর কিছুই রইল না আশপাশে।
দীক্ষা উঠে দাঁড়াল। চোখ দুটি কেমন আ গু ন নের মতো তবে স্থির।
—“সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি। চল।”
শিশির ভ্রু কুঁচকাল,
—“কিসের সিদ্ধান্ত?”
দীক্ষা খানিক থেমে, খুব শান্ত স্বরে বলল,
–“এই যে দু’হাতে বাড়িয়ে ধরা হৃদয়টা… সেটা কা টা গেছে। সম্পর্কটা মরে গেছে অনেক আগেই। সিপিআর দিয়েও মৃ ত্যু থেকে ফিরিয়ে আনা তো যায় না। এবার দাফনই শ্রেষ্ঠ।”
দু’জনের উপরে শীতল বাতাস বয়ে যেতেই এক সম্পর্কের চিতা যেন ঠিক এইমাত্র নিভে গেল।
বেলকনির শীতল বাতাস আর দুটো মানুষের চিতার মতো সম্পর্কের ছাইটুকু নিয়ে কিছুক্ষণ ঘোরাফেরা করল। দীক্ষা দরজা খুলে ঘরে ঢুকে গেল। শিশির তখনও চেয়ারেই বসে, হাতে সিগারেটের পোড়া অংশটুকু। আবার ধরিয়েছে। একসময় নিঃশব্দে সেও উঠে দাঁড়াল।
এই সিদ্ধান্ত, এই দাফনের প্রক্রিয়াটা আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পন্ন করার জন্য অপেক্ষা করছিল একটি গোটা পরিবার।
ঘরের ভেতরের আবহাওয়াটা থমথমে,ভারী কোনো মেঘ জমে আছে প্রতিটি কোণে। বসার ঘরে সায়েমা বেগম, খালেদা বেগম, শর্মিলা, রুমেল এবং ঝুমা সবাই ছিল। সবার চোখে উদ্বেগ আর চাপা উত্তেজনা। দীক্ষা আর শিশিরের এই মুখোমুখি বসার ফল কী হবে, তা বোঝার জন্য সবাই উৎকর্ণ।
সায়েমা বেগম বারবার চোখ মুছছেন। কোনোভাবেই হৃদয়ের দুর্বলতাকে চাপতে পারছেন না তিনি। খালেদা বেগম পাথরের মূর্তির মতো বসেছিলেন, তার চোখ দূরে কোথাও স্থির। রুমেল হাতের মুঠো শক্ত করে বসে আছে।
দীক্ষা ঘর থেকে বেরিয়ে এল। তার মুখমণ্ডল শান্ত, হিমশীতল। চোখে নেই একফোঁটা জল, শুধু এক স্থির, পোড়-খাওয়া দৃষ্টি। ঠিক তার পিছনেই এলো শিশির, তার চেহারায় এক ধরনের উদ্ধত ঔদাসীন্য।
দীক্ষা কোনো ভূমিকা করল না। ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে সরাসরি তার ঘোষণা দিল।
—“আপনারা সবাই অপেক্ষা করছেন কী হয়, তাই না? আমাদের সম্পর্কের আর কিছু হওয়ার নেই। এই সম্পর্কটা আজকের পর থেকে আর নেই। আমি শিশিরকে ডিভোর্স দিতে চাই।”
ঘোষণাটি যেন বজ্রপাতের মতো শোনাল। ধ্বক করে উঠল উপস্থিত প্রতিটি সদস্যের বুক।
—“আর আমি এই বিচ্ছেদের প্রক্রিয়া নিজের তরফ থেকেই শুরু করব। আমার আর ওর মাঝে কোনো সম্পর্কই আর বাকি নেই।”
শিশির এতক্ষণ চুপ করে ছিল। দীক্ষার এই দৃঢ়তা, এই অগ্রগামিতা দেখে তার পৌরুষে আঘাত লাগল। সে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল।
—“আমাকে কি এতই কমজোর মনে হয় তোর? ডিভোর্স দিলে আমি দিবো। তোকে আমার দয়ার পাত্রী হতে হবে না। দেনমোহর যা বাকি আছে, তা পুরোটা শোধ সহই দিবো। কত যেন বাকি আছে?”
দীক্ষা ধীরে ধীরে শিশিরের দিকে ফিরল। তার চোখে আগুন জ্বললেও কণ্ঠস্বর বরফের মতো ঠান্ডা।
—“যাই থাকুক, আমি চাই না। ওই টাকা তুই গুণে গুণে রাখ। ভিক্ষার থালা হাতে নিলে তখন লাগবে।”
এই অপমান শিশিরকে বিদ্ধ করল। কিন্তু জবাব দেওয়ার আগেই সবাই ফেটে পড়ল।
খালেদা বেগম উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,
—“ধিক! ধিক্কার দিই তোমাকে, শিশির! আমার মেয়ের জীবনটা খেলো করে দিলে! ওর মাথার মুকুট ছিলে তুমি, আর তুমিই ওকে পথের ধূলোয় মিশিয়ে দিতে চাইলে? তোমার মতো একটা কাপুরুষ, বিশ্বাসঘাতকের জন্য সামান্য দেনমোহরের টাকার কোনো মূল্য নেই!”
শর্মিলা ব্যঙ্গ করে বলল,
—“আর কী আশা করা যায়? যে লোক নিজের স্ত্রীকে সম্মান দিতে পারে না, তার কাছে আবার দেনমোহর! দেনমোহর তো আসলে ভালোবাসার বন্ধন, বিশ্বাসঘাতকতার মূল্য না!”
রুমেলের চোখে-মুখে রক্ত জমা হলো। তিনি চেঁচিয়ে উঠলেন,
—“তুই! তুই এ কথা বলতে পারলি? যে মানুষটা তোর জন্য সব ছেড়েছিল, তাকে তুই এইভাবে অপমান করলি? কোন মুখে জিজ্ঞেস করিস ‘কত বাকি’?”
রুমেল এক লাফে শিশিরের দিকে তেড়ে গেলেন,
—“তোর মতো একটা…!”
—“রুমেল! থামো।”
শর্মিলা দ্রুত তাকে পিছন থেকে দু’হাতে জড়িয়ে ধরল।
—“হাত নোংরা করো না তো।”
সায়েমা বেগম কান্না থামিয়ে বললেন,
—“শর্মিলা ঠিক বলেছে। ওর গায়ে হাত তুলে নিজেকে ছোট করিস না। এ পাপের ফল ওকে ওঁর সৃষ্টিকর্তাই দেবে। দীক্ষা, তুমি একদম ঠিক করেছো মা। তোমার কোনো প্রয়োজন নেই এ পাপিষ্ঠের আশ্রয়ে থাকার!”
শিশির সবার সম্মিলিত আক্রমণে নিজেকে গুটিয়ে নিল। তার মুখের অহংকার একটু একটু করে ভাঙছে। সে কাঁপা স্বরে দীক্ষার দিকে তাকিয়ে বলল,
—“তুই… তুই ওদের সামনে আমায় এত ছোট করলি? এক মুহূর্তের ভুলকে তুই এইভাবে জনসমক্ষে টেনে আনছিস? এক বছর আগে তুই কিন্তু…”
দীক্ষা তার কথা শেষ করতে দিল না। দু’পা এগিয়ে এসে সে শিশিরের মুখোমুখি দাঁড়াল। তার চোখে কোনো অভিমান নেই, আছে শুধু ঘৃণা ও চূড়ান্ত মুক্তির জন্য ছটফটে যন্ত্রণা।
গলার স্বর উঁচু করে বলল,
—“এক বছর আগে আমি কী করেছিলাম? এক বছর আগে আমি তোকে ভালোবেসেছিলাম। আমার জীবনের সবটুকু আলো তোকে দিয়েছিলাম। আর তুই? তুই সেই আলোয় অন্য কারও সাথে হাত ধরে হেঁটেছিস। এক মুহূর্তের ভুল? এই যে আমার পেটের ভেতর যে সন্তান, সে তোর প্রতারণার সাক্ষী! এ কোনো ভুল নয়, শিশির। এটা তোর নোংরা চরিত্র! তোর অপরাধ…”
দীক্ষা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। তার ভেতরে জমে থাকা সমস্ত রাগ, কষ্ট, অপমান- সব যেন এক মুহূর্তে বিস্ফোরিত হলো।
দীক্ষা তার ডান হাত তুলল।
শব্দ হলো ‘চটাশ!’ করে।
শিশিরের ডান গালে দীক্ষার পাঁচ আঙুলের কঠিন ছাপ বসে গেল। শিশির হতবাক, তার চোখ বিস্ফোরিত। গোটা ঘর নিস্তব্ধ। রুমেল, শর্মিলা, সায়েমা বেগম- সবাই নিথর।
দীক্ষা থরথর করে কাঁপছে,
—“এটা আমার সেই বিশ্বাসের চড়, যা তুই চূর্ণ করে দিয়েছিস।”
এরপর দীক্ষা দ্রুত তার পায়ের কালো পাম্প শু-টি খুলে নিল। ক্ষিপ্ত হাতে ছুঁড়ে মারল শিশিরের দিকে। জুতোটা গিয়ে লাগল তার বুকে।
— “আর এটা… এটা তোর সেই মিথ্যে প্রতিজ্ঞার জন্য, যেদিন তুই বলেছিলি, তোর আকাশে আর অমাবস্যা হবে না! দূর হ! দূর হ আমার জীবন থেকে! তোর মতো স্বার্থপরের জন্য আমার জীবনে কোনো স্থান নেই!”
দীক্ষা ঘুরে দাঁড়াল। আর একটি মুহূর্তও সে সেখানে দাঁড়াল না। তীব্র ঘৃণার এক ঝলক চোখে নিয়ে সে দ্রুত ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল। ঘরের মধ্যে তখনো জুতো ছুঁড়ে মারার শব্দ আর সেই চড়ের প্রতিধ্বনি ঘুরছে। শিশির গালে হাত দিয়ে হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখ কেবল সেই খোলা দরজার দিকে, যেখান দিয়ে তার ‘চাঁদ’ চিরতরে অদৃশ্য হয়ে গেছে।
রাতের অন্ধকারটা আজ যেন আরও ঘন, আরও ভারী। শহর পেছনে পড়ে গেছে অনেকক্ষণ, বাস ছুটে চলছে ফাঁকা মহাসড়কের বুকে। জানলার কাঁচে আলো-আঁধারির দাগ পড়ে আছে, তার ওপর দীক্ষার অশ্রুর টুকরো জমে আছে মেঘের মতো।
দীক্ষা মাথা রেখেছে মায়ের কাঁধে। সাদা ওড়নার কোণায় মায়ের চোখের পানি ভিজে গিয়েছে বহুবার। বাসের ভেতরটা আধো অন্ধকার- একদিকে ঘুম আরেকদিকে কাঁদতে না-পারা যাত্রীদের উদাস নীরবতা। কিন্তু তাদের দু’জনের ভেতরে যে ঝড়, তা বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই।
দীক্ষার পুরো শরীর একটু পর পর কেঁপে উঠছে। খালেদা বেগম আঁকড়ে ধরে রেখেছেন মেয়েকে- স্নেহে, ভয়ে, অসহায়ত্বে। তার বুকের ভেতরটা গলে যাচ্ছে।
তিনি চুপচুপে কাঁদছেন, ঠোঁটজোড়া কাঁপছে,
মনে মনে বলছেন,
—“হায় খোদা… কেন এই দিনটা আমার মেয়েকে দেখাইলা?
কি দোষ ছিল ওর?
কেন সুখের দোরগোড়ায় পৌঁছানো মেয়েটাকে এমন নিষ্ফলা আঁধারে ফেলে দিলে?”
বাসের জানলা আঁটকানোর পরেও কোথা দিয়ে যেন হাওয়া ঢুকছে টুকটুক করে। দীক্ষার বুকটা দমবন্ধ হয়ে আছে। সে চোখ বন্ধ করল আর অন্ধকারের ভেতরেই নিজের একটা জগৎ খুলে গেল।
সেই জগতে দীক্ষা আর বাসে নেই। সে তার বাবার কাছে।
তার বাবার কোলের ওপর মাথা রেখে শুয়ে আছে সে। বাবা তার প্রিয় ধবধবে লুঙ্গি পরে, স্নেহময় চোখে তাকিয়ে আছেন মেয়ের দিকে। বাবার হাতে সেই চিরচেনা উষ্ণতা- মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন ধীরে ধীরে।
দীক্ষা হুহু করে কেঁদে ফেলল। বাসের ভেতর না, তার মনের গোপন সেই কক্ষে।
বাবার কণ্ঠ ভেসে এলো,
—“সব ঠিক হয়ে যাবে রে মা…সব ঠিক হয়ে যাবে…তুই কাঁদিস না…”
দীক্ষার বুকটা যেন ছিঁড়ে যাচ্ছে। তার ঠোঁট কাঁপতে কাঁপতে মনের ভেতর উচ্চারণ করল,
—“কিভাবে ঠিক হবে বাবা? তুমি তো নেই…কেন চলে গেলে? কেন আমায় একা ফেলে গেলে বাবা?
কেন ছেলেমেয়েরা যতদিন থাকার নিয়ম নিয়ে আসে, ততদিন বাবা-মায়েরা থাকার অনুমতি পায় না?
বিধাতা কি জানেন না… বাবা-মা ছাড়া আমরা কত অসহায়?কত পথভ্রষ্ট? কতটা হারিয়ে যাই?”
বাসের ম্লান আলোয় মা-মেয়ে দু’জনকে দেখে মনে হচ্ছে,
পৃথিবীর কোনো অসহায়তাই যেন এদের চেয়ে বড় নয়।
খালেদা বেগম মেয়ের হাত চেপে ধরলেন।
তার দুচোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে একটানা।
মেয়ে কিছু বলতে না পারলেও মা জানেন, দীক্ষা এখন ভেঙে চূর্ণ হয়ে গেছে।
সারা জীবন বুকের ভেতর আ গু ন আগলে রাখা সেই শক্ত মেয়েটাকে আজ যেন ছোট্ট শিশুর মতো মনে হচ্ছে তার কাছে।
মাঝেমধ্যে বাসের গা দুলে ওঠে আর দীক্ষার ভাঙা শরীরটাও তার সঙ্গে দুলতে থাকে। মা-ও ধরে রাখেন, বুকে টেনে নিতে চান, তবু জানেন, এই যন্ত্রণা এমন…
যেটা কেউ কারো জায়গায় বয়ে দিতে পারে না।
জানলার বাইরে অন্ধকার ধেয়ে আসছে।
ভেতরে দীক্ষার নিঃশব্দ কান্না ছিঁড়ে ফেলছে সবকিছু।
তার মনে শুধু একটাই কথা ঘুরপাক খেয়ে বেড়ায়,
সোনাডিঙি নৌকো পর্ব ১২
—“বাবা থাকলে আজ এভাবে ভেঙে পড়তাম না…
তার কোলে মাথা রাখলেই মুছে যেত পৃথিবীর সব ব্যথা…
কোথায় গেল সেই আশ্রয়?”
বাস চলছে। অন্ধকারও এগোচ্ছে।
আর ভেতরে, দুই নারীর পৃথিবী ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে নিঃশব্দে।
