সোনাডিঙি নৌকো পর্ব ১৫
মৃধা মৌনি
অনেকটা নির্ভার হয়েই বাড়ি ফিরে এলো শিশির। তৃণারও আজ মন ভালো। চালে ডালে মিশিয়ে একটা খিচুড়ি রেঁধে ফেলেছে। সঙ্গে দুটো সেদ্ধ ডিম হালকা ভেজে নিয়ে পাতে তুলে দিয়েছে। একটুখানি পেয়াজ বেরেস্তা করে উপর দিয়ে ছড়িয়েও দিয়েছে। আর সহেলির থেকে আনা দু চামচ ঘি- পুরোটাই দিয়েছে শিশিরের থালায়।
শিশির মন ভরে খাবার খেলো। বুকের ভেতর জমাট বাঁধা ভার নেমে গেল নিমিষেই।
খেতে খেতে প্রশংসাও করল একদফা, ‘দারুণ হয়েছে খেতে। রান্না শিখলে কবে?’
তৃণা গদগদ কণ্ঠে বলল, ‘আপনার জন্যেই তো এত কাঠখড় পোড়ানো। সবসময় অন্যমনস্ক থাকেন, চিন্তায় থাকেন, ভাবলাম একটু ভালোমন্দ রেঁধে যদি মন হালকা করতে পারি।’
শিশির বা হাতে তৃণার গাল টেনে দিলো।
‘তুমি আসলেই অনেক লক্ষী। সরি, খুব বাজে ব্যবহার করেছি এতদিন!’
‘ব্যাপার না। আচ্ছা, আপনার ইন্টারভিউর আজ কি হলো?’
শিশির মুখের কাছে লোকমা তুলেও থেমে গেল।
তৃণার দিকে নিষ্পলক চাইতেই ও বলল, ‘নাহলে নাই। এত চাপ নিবেন না। একটা না একটা ব্যবস্থা হবেই। আপনি তো আমাকে গ্রামেও পাঠালেন না।’
শিশির গম্ভীর স্বরে বলল, ‘দরকার নাই। আর আমি একটা ব্যবস্থা করছি। টাকাপয়সা নিয়ে ভাবতে হবে না। আসবেই।’
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
‘আসবে? সত্যি বলছেন?’ তৃণা অবাক না হয়ে পারে না।
শিশির আবার খাওয়ায় মন দিলো। খেতে খেতে বলল, ‘হুম আসবে। আমাকে কি এত কমজোর মনে করো? ব্যবস্থা করে ফেলছি।’
তৃণা উৎসুক হয়ে গলা বাড়াল, ‘কি ব্যবস্থা?’
‘সে তোমার শুনে লাভ নেই। মেয়ে মানুষ ঘর সংসার সামলাবে। বাহিরের চিন্তা আমি করব। বুঝতে পারছ?’
‘পারছি। কিন্তু আমিও যে একটা টিউশনি…’
শিশির সরু চোখে চাইল, ‘কিসের টিউশনি?’
ঢোক চাপল তৃণা। শিশিরের উপর পরিপূর্ণ আস্থা করতে পারছে না সে। সত্যি সত্যি শিশির কি কোনো কাজের সন্ধান পেয়েছে নাকি সবটাই ঢপ! যদি ঢপ হয়ে থাকে তবে হাসিব ভাইকে মানা করে দেওয়ার ফল ভালো হবে না। আবার সত্য হলে তৃণার কি দরকার এত পরিশ্রম করার! ওর সব খরচ তো শিশিরই সামলাবে। কি যে করবে তৃণা.. আবারও একটা দ্বিধায় পড়ে গেল।
ওকে চুপ করে থাকতে দেখে শিশির বলে উঠল ফের,
‘বললে না তো, কিসের টিউশনি?’
তৃণা অন্যমনস্ক হলো, ‘উঁ, না আসলে আমি ভাবছিলাম টিউশন করালে দু একটা, টুকটাক.. সহেলি আপাকে বলার পর উনি বললেন ব্যবস্থা করে দেবেন।’
‘কোনো দরকার নাই। আমি বলছি তো, ঘর কীভাবে চালাতে হয় ওটা আমি দেখব, তুমি শুধু ঘরটা সামলাবে। বাহির নিয়ে তোমার মাথাব্যথা করার কোনো দরকার নাই।’
তৃণা জবাব দিলো না। কিন্তু বুকের ভেতর কাঁকড়ার মতো কামড়ে ধরে আছে কিছু একটা। নির্ভার হতে গিয়েও পারছে না। সত্যি কি শিশির পারবে সবকিছু সামলাতে? তৃণার পড়াশোনার খরচ জোগাতে? নাকি সবটাই তার চাল.. তৃণাকে শান্ত রাখার?
পরেরদিন তৃণা গেল হাসিব ভাইয়ের কাছে। তিনি সিড়ি বেয়ে নামছেন, তৃণাও সুযোগ পেয়ে পিছু পিছু নামলো। হাসিব ভাই খেয়াল করে থেমে দাঁড়িয়ে দাঁত কেলিয়ে হাসি ছুঁড়ে দিলেন, ‘ও তুমি.. বিকালে বাইর হমু তোমারে নিয়া। এখন না।’
তৃণা তরতর করে নেমে দাঁড়াল, উশখুশ করে বলল, ‘একটু সমস্যা হয়েছে ভাইয়া। আসলে আমার হাজবেন্ড চাচ্ছে না আমি বাইরে কাজ করি।’
‘মানে কি? আমি তোমাকে বলছিলাম না, কাউকে না বলতে! মানা করছিলাম না?’
হাসিব হঠাৎ করেই উত্তেজিত হয়ে উঠলেন, তাই দেখে ভয় পেয়ে পিছিয়ে দাঁড়াল তৃণা।
আড়ষ্ট কণ্ঠে বলল, ‘না না, আমি আপনার কথা কিছু বলিনি। বাড়ি থেকে বাইরে থাকব, একটা পারমিশনের দরকার আছে তো তাই না? সেই জন্যেই আমি বলছিলাম টিউশনের কথা- কিন্তু সে শুনেই না করে দিছে। বলছে বাড়ির বাইরে পা দেওয়ার কোনো দরকার নাই। বুঝতেই পারছেন, তার অবাধ্য হলে…’
‘তোমারে দিয়া কিছুই হইবো না। ভালো জায়গায় কাম ফিট করছিলাম। যাইতে পারলে নগদ পাঁচ হাজার টাকা…ধুরো.. এখন আবার নতুন লোক খুঁজতে হইবো।’
তৃণা সাহস করে এগিয়ে এলো। হাসিবের খুব কাছাকাছি দাঁড়াল। এতই কাছে যে হাসিব নিজেও একটু ভড়কে গেলেন।
তৃণা বলল, ‘আমার উপর রাগ করবেন না। আমি কি নিজ ইচ্ছায় মানা করতেছি বলেন? ও জানতে পারলে আমাকে না বাসা থেকেই বের করে দেয়। আর আপনি তো জানেন আমার কেউ নেই। বাবা নেই, মা নেই, বের করে দিলে কোথায় যাবো বলেন? তাই ও যা বলে যেভাবে বলে আমি তাই চুপচাপ মেনে নিয়ে থাকি। আপনি রাগ হবেন না হাসিব ভাই.. প্লিজ।’
এত সুন্দর করে কোনো তরুণী যদি রাগ না হওয়ার আকুল আবেদনে গরম নিঃশ্বাস মিশিয়ে দিয়ে যায়, তবে কি কুকুরের মতো ছোঁকছোঁক করতে থাকা কিছু অমানুষ পুরুষ আর রাগ হতে পারে? পারে না! হাসিব ও পারলেন না। তিনি মুখটাকে স্বাভাবিক করলেন।
‘ঠিক আছে। হইলাম না রাগ, কিন্তু তোমার জন্য আমার মায়া লাগে বুজছ। তোমার মতো আমার একটা বইন আছে গেরামে। ওর কথা মনে পড়ে। আহারে.. মা বাপ না থাকনের কি যে যন্ত্রণা! শোনো তোমার যখন যা লাগে আমারে জানাইবা। দ্বিধা করবা না। আমারে আপন মানুষই মানবা। আমি সবসময় তোমার পাশে আছি। কিন্তু এই খবর যেন তোমার আপায় না জানে। ভুলেও না জানে। বুঝতে পারছ?’
তৃণা ঘাড় কাত করল, ‘পারছি। আপনি চিন্তা করবেন না। কেউ জানবে না।’
হাসিব আশ্বস্ত হলেন, ‘ঠিক আছে। যাও। আমি একটু কাজে যাইতেছি। বিকালে তাড়াতাড়ি আসলে আমার ঘরে আসবা।’
তৃণাও রাজি হয়ে উপরে উঠে গেল। উঠতে গিয়ে থলথল করে কেঁপে উঠল শরীরের বাচনভঙ্গি। তার দিকে লোলুপ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন হাসিব। মেয়েটার বয়স কম, একদম কচি…এরকম মেয়ের স্বাদই অন্যরকম!
শিশিরের বিশ্বাসই হলো না, এত কম সময়ে একটা কাজ হয়ে গেল! হাতে টাকাও চলে এলো। এত কম সময়? কতক্ষণ হবে? বড়জোর পঁচিশ মিনিট! ঠিক করে আধঘন্টা ও হয়নি। মকবুল ভাইয়ের সঙ্গে বেরিয়েছিল দুপুর বেলা, সবে মাত্র ভাত খেতে বসবে ঠিক সেই সময়ে ফোন, খাওয়া শেষ করার সময়টুকুও দেয়নি পরে। শিশির বেরোলো। তাকে নিয়ে অনেক গলি ঘুপচি পেরিয়ে একটা খোলামেলা বেরিবাঁধ রোডে এসে থামল। ওখানে আরও একজন দাঁড়িয়ে ছিল। কথা যা বলার মকবুল ভাই-ই সাড়লো। কথাও গুণে গুণে দুইটা। কি নাম, নতুন নাকি? শিশির নিজের নাম বলতে নিচ্ছিল, মকবুল ভাই তাকে থামিয়ে বললেন, ‘সোহাগ নাম। এই লাইনে নতুন কিন্তু বিশ্বস্ত।’
অপরিচিত লোকটা আর কোনো কথাই বলল না। একটা কাগজে প্যাঁচানো বক্স হাতে ধরিয়ে দিয়ে চলে গেল। মকবুল ভাই ঠিকানাটা দেখালেন, ওটাও কাগজে লেখা ছিল ভিতরে, শিশির এলাকাটা চিনলো, কাছেই। কোথায় গিয়ে দিতে হবে তাও লেখা… আল আরমান মুদি দোকানের চালের ড্রাম। কাজটা করতে শিশিরের সর্বোচ্চ পঁচিশ মিনিট সময় লাগল। চালের ড্রামে পারসেলটা ফেলতেই দোকানি খামে ভরা একটা প্যাকেট এগিয়ে দিয়ে দোকানের কাজ করতে লাগল। একটা কথাও বলল না তার সাথে।
একরাশ কৌতূহল নিয়ে শিশির সরে এলো। ওখান থেকে অনেকটা দূরে, একটা টং দোকানে চা খেতে বসে খামের মুখটা খুলতেই ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো এক হাজার টাকার তিনটি নোট। শিশির হকচকিয়ে গেল। মাত্র পঁচিশ মিনিটের একটা কাজের জন্য তিন হাজার টাকা! প্রতিদিন একটা করে কাজ পেলেই তো… কৃতজ্ঞতায় চোখ ভরে উঠল শিশিরের। মকবুল ভাই দূত হয়ে এসেছেন তার কাছে! আজকে অনেকদিন পর দু’হাতে বাজার করল শিশির। অনেক কিছু কিনলো। দরজায় দেওয়ার দুটো পর্দা, বিছানার জন্য নতুন চাদর, চাল, ডাল, মাছ-মাংস, কি মনে করে একটা গোলাপও নিলো তৃণার জন্য। এও ভাবল, পরের কাজটা হলেই মেয়েটার জন্য সুন্দর একটা থ্রিপিস কিনবে সে। আসছে পর থেকে অভাবে কষ্টই করছে… আহারে বেচারি!
দুপুরের খাবার পর আজ কোনো ভাতঘুম নামেনি দীক্ষার চোখে। শীতের মোলায়েম রোদটা দাওয়ার ওপর তিরতির করে কাঁপছে, চারপাশে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। সে দুই পা ছড়িয়ে বসে আছে, পিঠটা হেলান দিয়ে, কিন্তু মাথার ভেতর যেন হঠাৎই ঝড় উঠেছে। শিশিরের কথা, তার ভাঙা সংসারের স্মৃতি, একটার পর একটা ছবি ভেসে আসতে লাগল। গলায় একটা চাপা কষ্ট উঠে আসে- নিঃশব্দ অথচ ভারী।
হঠাৎই মনে পড়ে যায় গত বছরের শীতের সেই বিকেলটা। সেদিনও এমনই রোদের দুপুর ছিল। দাওয়ার বাইরে শুকনো পাতার ওপর হালকা কুয়াশা ভাসছিল। শিশির হাসতে হাসতে বলেছিল, ‘চল, তোর জন্যে এক কাপ গরম চা করি।’
দীক্ষা তখন শাল গায়ে জড়িয়ে বসে আছে। শিশির চুলার ধারে দাঁড়িয়ে চা নেড়েছিল বেশ যত্ন করে। তারপর দু’টা মাটির কাপ ধরে এনে বলেছিল, ‘তোর হাত ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। চা ধরে থাক, গরমে ভালো লাগবে।’
দুটো আঙুল ছুঁয়ে গিয়েছিল তার- খুব সামান্য, অথচ আজ মনে হলে বুকের ভেতরটা খালি হয়ে যায়।
সেদিন তারা দুইজন বসে ছিল এই দাওয়ার ঠিক এই জায়গাটায়। বাতাসে শুকনো পাতার গন্ধ, আকাশে ধোঁয়াটে সোনালি আলো- সব মিলিয়ে এক শান্ত, উষ্ণ মুহূর্ত। মনে হয়েছিল পৃথিবীটা একটু থেমে গেছে।
দীক্ষা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা নিচু করে।
মাত্র এক বছরের ব্যবধানে সবকিছু কী অদ্ভুতভাবে বদলে গেছে! চোখটা হঠাৎ ভিজে ওঠে। সে দ্রুত হাতের আঙুল দিয়ে পানি মুছে নেয়। ‘না… কাঁদবি না দীক্ষা,’ নিজের মনে বলে ওঠে।
ধীরে ধীরে তার হাতটা চলে আসে পেটের ওপর। ঠাণ্ডা বাতাসে তার আঙুল উষ্ণ হয়ে ওঠে। স্নেহে, ভয়ে, ভালোবাসায় যেন কাঁপতে থাকে সে। খুব আস্তে আস্তে কথা বলা শুরু করে, যেন পেটের ভিতর ছোট্ট প্রাণটা শুনছে,
‘কেমন আছিস মা? নাকি বাবা? তুই ছেলে না মেয়েরে? মা তো একবারও ডাক্তারকে জিজ্ঞেস ও করিনি। আমি একটা সারপ্রাইজ চাইছি। মনেপ্রাণে ভাবছি তুই মেয়ে হবি, সবাই ও তো তাই বলে। দেখি তুই আমাকে কোন সারপ্রাইজটা দিস। শোন না, বকুল ভেবেছে আমি মেয়ে চাই না। আমি চাই ছেলে। কিন্তু মনেপ্রাণে আমিও একটা মেয়ে চাই, যার ভাগ্যের চাকা আমি নিজের হাতে ঘোরাবো।
আমার যত দুঃখ, যত বেদনা তা যেন তোকে ছুঁয়ে যেতে না পারে কক্ষনো, বরাবরই সে চেষ্টাই করব। তবে একটা জিনিস তোকে হয়তো দিতে পারব না রে। বাবার আদর! জানিস তো, মেয়েদের কাছে বাবার আদর মানে অনেক বড় কিছু… পরম পাওয়া! এই আদরের স্বাদ যে কি.. তোকে আমি শত ভালোবাসায় ভরিয়ে রাখলেও এই ভালোবাসাটুকুর চাহিদা পূর্ণ করতে পারব না রে। তুই রাগ করিস না। আফসোস ও করবি না। যখন তুই বড় হবি, সব বুঝতে শিখবি, তখন মা’কে ভুল বুঝবি না। বরং মায়ের শক্তি হোস। জানিস তো, তোর জন্যেই বেঁচে আছি মা। আমার যত কান্না, তোর ওই ছোট্ট ছোট্ট হাতে মুছিয়ে দিবি- এই আশায় আবারও বুক বেঁধেছি। সবাই মা’কে ধোঁকা দিলো, প্রতারণা করল, তুই করবি না তো সোনা? মায়ের শক্তি হয়ে থাকবি তো? আমার লক্ষী সোনা, আমার জান পাখি ময়না টিয়া… মা তোকে দু’হাতে জড়িয়ে ধরার অপেক্ষা নিয়ে আছি। জলদি আসিস… খুব জলদি!’
বাতাস হালকা করে বইছে। দূরের খেজুর গাছ থেকে পাতার ঝিরঝির শব্দ আসে। শীতের নরম রোদের তাপ গায়ে পড়ছে, আর দাওয়ার পুরোনো কাঠের উপর তার ছায়াটা একটু একটু করে লম্বা হচ্ছে।
দীক্ষা আবার পেটের ওপর হাত রেখে হাসল। তার একমাত্র অবলম্বন! তার শক্তিটুকু….
দরজা খোলার মৃদু ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ হতেই দীক্ষা চোখজোড়া ভালো করে মুছে নিলো। গলা বাড়িয়ে দেখল, কে এসেছে। শান্ত? হ্যাঁ শান্তই তো। সে ভেতরে ঢুকেই দীক্ষাকে দেখল।
দীক্ষা ডাকল, ‘এই যে, এদিকে.. হ্যাঁ এদিকে আসুন।’
শান্ত বিব্রত পায়ে দাওয়ার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। দু’হাতে পেছনে কিছু একটা আঁকড়ে ধরা।
দীক্ষা ভ্রু যুগল কুঁচকে বলল, ‘এই আপনি কি লুকাচ্ছেন আমার থেকে, হুম?’
শান্ত আরও গুটিয়ে গেল, ‘ক…ই কিছু না তো।’
‘না না, আমি তো স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি একটা লাল ব্যাগ। ওটা কি?’
অস্বস্তিতে কাটা হয়ে ব্যাগটা সামনে আনলো শান্ত। মুখে কিছু বলতে পারল না। ঘর থেকে সেই মুহূর্তে বেরিয়ে এলো বকুল ও। একটু শুয়েছিল, দীক্ষার মুখে শান্তর ডাক শুনে উঠে এসেছে।
বকুল ও মোড়া টেনে বসে পড়ল। সে নিজেও হতচকিত চোখজোড়া মেলে তাকিয়ে।
দীক্ষা বলল, ‘কি আছে এতে?’
শান্ত ব্যাগটা প্রায় ছুঁড়েই ফেলল। দীক্ষাকে ধরিয়ে দিয়ে বলল, ‘আমি যাই, পরে আসব, কাজ আছে।’
তারপর পড়িমরি করে ছুটল। তার এমন কান্ডে হতবাক হলো দুই বোন।
‘এমন করল কেন?’ জানতে চাইলো দীক্ষা।
ঠোঁট উল্টে উত্তর দিলো বকুল, ‘কি জানি।’
তারপর ব্যাগটা খুলতেই ভীষণ ভীষণ অবাক হলো দু’জনেই। দীক্ষা রীতিমতো একটা ঝটকা খেল। কি নেই ওতে.. ছবি আঁকার সবকিছু আছে! সবকিছু!
একটা ওয়েল পেইন্টিং সেট, ব্রাশ সেট, পেইন্টিং নোটপ্যাড- দীক্ষা শূন্য দৃষ্টিতে তাকাল বকুলের দিকে। বকুলের ভেতরটা কামড়ে ধরেছে কিছু একটা। হাতজোড় অসাড় হয়ে পড়তে চাইছে। সে তড়িঘড়ি ওগুলো ঠেলে দিলো, কোনোরকমে বলল, ‘তোমার জন্য এনেছে আপা, নাও।’
‘আমার জন্য আনতে গেল কেন! আর ও জানলোই বা কীভাবে আমি আঁকতে ভীষণ পছন্দ করি? তুই বলেছিস?’
‘আমি কেন বলতে যাব? আর খেয়েদেয়ে কাজ নেই…’
যেন কিছুই হয়নি, এমন ভঙ্গিতে বকুল উঠে দাঁড়াল। হাত-মুখ ধোবার কথা বলে চলে এলো। দীক্ষা নেড়েচেড়ে দেখতে লাগল ওগুলো। ছেলেটা তার জন্য এসব আনতে গেল কেন! কেইবা তাকে বলেছে, আঁকলে দীক্ষার মন ভালো হয়? ছেলেটা এত নরম সরম, বোকা বোকা ধরনের, ওর অনুভূতি গুলোও লুকাতে পারছে না। প্রথমদিনেই ওর হা করে চেয়ে থাকা দৃষ্টি ধরা পড়েছিল দীক্ষার কাছে। আজ তো রীতিমতো বাড়াবাড়ি!!
বকুল কি ভাবল কে জানে। বোকা ছেলেটা ওর কিসে ভালো মন্দ খুঁজে বের করতে পারল, অথচ এত কাছে থেকে বকুলের মন পড়তে পারল না! মেয়েটার দু’চোখে স্পষ্ট ভেসে ওঠে… ভালো লাগার কথা, ভালোবাসার কথা, দীক্ষা দেখেছে। এই একটু আগেও.. এসব দেখে থমকে গিয়েছিল মেয়েটা, দীক্ষা খেয়াল করেছে ঠিকঠিক! ইশ.. না জানি কি ভাবছে। দীক্ষা সবকিছু আবার ব্যাগে ঢুকিয়ে রাখল। আজ আসুক বান্দর মহাশয়… খুব করে কঠিন কয়টা কথা শোনাতে হবেই হবে….
সহেলি আপা আজকেও দুপুরের পর পর চলে গেছেন বাইরে। দরজায় তালা লাগিয়ে। তৃণা একটু শুয়েছিল, হঠাৎ দরজার সামনে কারো ছায়া পড়তেই ধড়মড় করে উঠে বসল। ওরা মোট তিন ফ্যামিলি এই ছাদের উপরে, আরেক ফ্যামিলি গার্মেন্টসে চাকরি করে। সকালে বেরোয়, রাতে ফেরে। কে এলো তবে.. তৃণা বুকে ওড়না জড়িয়ে বাইরে বেরোতেই হাসিবের হাসিমুখটা দেখল। দরজার তালা খুলছেন।
‘আপনি?’ তৃণা একটু ধাতস্থ হলো।
হাসিব হাসলেন, ‘ক্যান, অন্য কাউরে ভাবছিলা নাকি?’
‘না মানে.. একটু শুয়েছিলাম তো…’
‘একা একা? ভায়ে কই?’
‘বাইরে বেরিয়েছে।’
‘ওহ, কাজ পাইছে নাকি?’
‘শুনলাম পাইছে।’
‘কি কাজ?’
‘বলতে পারি না।’
হাসিব রহস্য করে বলল, ‘খেয়াল রাইখো, ব্যাডা মানুষ কিন্তু ভালো হয় না। ঘরে বউ রাইখা বাইরে মুখ দিয়া বেড়ায়।’
বিনিময়ে কিছু বলল না তৃণা। হাসিব তার ঘরের ভেতর ঢুকলেন, ‘আসো ভিত্রে আসো।’
তৃণার মন সায় দিলো না। সে রয়েসয়ে বলল, ‘না থাকুক, আপনি আসছেন, রেস্ট করেন।’
‘আরে রেস্ট তো কতই করি, তুমি আসো, সমস্যা নাই, গল্প টল্প করি। একা একা ভালো লাগে না বুজছ। কপাল কইরা একটা বউ পাইছি, সারাদিন বাইরে টইটই…’
‘আপারে বলবেন ঘরে থাকতে, তাহলেই তো হয়।’
হাসিব বাইরে বেরিয়ে এলেন, ‘ধুর, কত্ত বলছি, শোনে নাকি। আমার চাইয়া গপ্পো কইরা বেড়ানো তার কাছে বেশি দরকারী… আহা তুমি দাঁড়াইয়া রইলা ক্যা.. আসো না…’
‘না মানে…’
হাসিব হঠাৎ করেই একটা কান্ড করে বসলেন। তৃণার হাত চেপে ধরলেন, প্রায় টানতে লাগলেন, ‘আসো, সমস্যা কি?’
তৃণা হকচকিয়ে উঠল, ভয়ে তার বুক কাঁপছে দুমদুম শব্দে, ‘কি করেন হাসিব ভাই, হাত ছাড়েন, হাত ছাড়েন আমার..’
‘কতক্ষণ থেইকা ডাকতাছি, শোনো না ক্যান? বোজো না ক্যান? আসবা না? আচ্ছা তাইলে আমি আসি..’
হাসিব তৃণাদের ঘরে ঢুকে পড়লেন। ওকে ঠেলে ভেতরে ঢুকিয়ে দরজা আঁটকে দিলেন। তৃণার রুহ কেঁপে উঠল। গলার ভেতর স্বর বুঁজে গেল। হাসিবের চোখ থেকে কামনার আ গু ন ঝরে ঝরে পড়ছে… সে লোলুপ নেত্রে তার দিকে তাকিয়ে আছে।
তৃণা বলার চেষ্টা করে, ‘আপনি আমার সাথে কি…কি করতে..’ তার আগেই হাসিব বলে উঠেন, ‘ভয় পাইয়ো না, আমি তোমারে বড়ই পছন্দ করি। তুমি যদি আমার বউ হইতা, তোমারে মাথায় উঠাইয়া রাখতাম। কিন্তু সেইটা তো পারতাম না তাই… তুমি আমারে একটু ভালোবাসো, বিনিময়ে যা চাও তাই দেব…সত্যি বলছি সোনা…’
‘হাসিব ভাই…’
‘হাসিব, আমারে হাসিব বলবা, আমি তোমার হাসিব জান…’
হাসিব এগিয়ে এসে তৃণা কে বুকে জড়িয়ে নিলেন। তৃণার সমস্ত শরীর বরফ শীতল হয়ে জমে গেছে। সে নড়তে চড়তেও ভুলে গেছে যেন। ঠাঁট হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। হাসিব তার গলায় চুমু এঁকে দিতেই তৃণার হুঁশ ফিরে। ততক্ষণে দেড়ি হয়ে গেছে.. হাসিবের হাত চলে গেছে তৃণার থ্রিপিসের নিচে… মুখ দিয়ে কামাতুর স্বরে আওয়াজ করছেন। তিনি বোধশক্তি সব হারিয়ে ফেলেছেন। তৃণার মতো এমন সুন্দরী রূপবতী নারী.. তার নরম বুকের স্পর্শ – সবকিছু তাকে আজ পাগল করে দিয়েছে। শরীর বলছে, একে চাই চাই চাই….
কিন্তু তৃণার ধস্তাধস্তিতে হাসিব বিষিয়ে উঠলেন এক প্রকার। তিনি ওর গলা চেপে ধরলেন সহসাই…
আক্রোশ ভরা গলায় বললেন, ‘একটু ভালোবাস না বা*ল…তোরই তো লাভ, এই দ্যাখ দুই পকেট ভইরা তোর জন্যে কি আনছি.. দ্যাখ…’
সোনাডিঙি নৌকো পর্ব ১৪
হাসিব অনেকগুলি নোট বের করলেন। সব পাঁচশো টাকার নোট…. ‘তোর জন্য আনছি রে মা * গী.. একটু ভালোবাস, আরও দিমু, তোরে রানী বানাইয়া রাখমু, আমার একলার রানী.. কসম… এই নে, নে..’
তিনি নোট গুলি তৃণার হাতের মুঠোয় গুঁজে দিয়ে একটানে তার জামা টেনে ছিঁড়ে ফেলল মাঝ বরাবর। তৃণার বোধশক্তি হারিয়ে গেছে। সে কি করবে কিছুই বুঝে উঠতে পারল না। হঠাৎ মনে হলো, ঘরে একটা ব’টি আছে… ওটা দিয়ে এক কো’প বসিয়ে দেবে নাকি? একদম ঘাড় বরাবর… এক কো’পেই সব শেষ।
