সোনাডিঙি নৌকো পর্ব ২২
মৃধা মৌনি
ঘরটা বিশাল, ছিমছাম আর নীরব। মেঝেতে নরম কার্পেট, দেয়ালের রং দুধ-সাদা। বাইরে তখন ব্যস্ত শহরের হাজারো কোলাহল, কিন্তু এই ঘরের ভেতরে এক অদ্ভুত প্রশান্তি। তৃণা একটা আরামদায়ক সোফায় হেলান দিয়ে বসে আছে। সে এখন আর পথে পড়ে থাকা ক্লান্ত, বিক্ষিপ্ত মেয়েটি নয়; গত চব্বিশ ঘণ্টা তাকে নিরাপত্তা দিয়েছে এই ঘর।
সামনে বসে আছেন বাড়ির কর্তা। তার নাম অরুণিমাভ চৌধুরী। তিনি দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীর মালিক। অরুণিমাভ চৌধুরীকে দেখলে মনে হয়, শান্ত নদীর মতো গভীর এবং স্থির। বয়স চল্লিশের কোঠায়, মাথায় অল্প পাক ধরেছে, যা তাকে আরও বিচক্ষণ ও ভরসাযোগ্য করে তুলেছে। পরনে ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি, চোখে সোনালী ফ্রেমের চশমা। তার শান্ত, গভীর দৃষ্টিতে কোনো কৌতূহল নেই, আছে শুধু এক নির্ভেজাল উদ্বেগ। তিনি যেন এই পৃথিবীর সব অস্থিরতা পেরিয়ে আসা এক মানুষ।
অরুণিমাভ তার কফির কাপ নামিয়ে শান্ত, কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,
‘নাম কি?’
এই সহজ প্রশ্নেও তৃণার বুকটা কেঁপে উঠল হঠাৎই। সে মাথা নিচু করে জবাবে জানাল, ‘তৃণা।’
উত্তরটা দিয়েই সে মাথা গুঁজল। সে এই ভদ্রলোকের বাড়িতে এসেছে একদিন পূর্ণ হলো। কাল রাতে গাড়ির হেডলাইটের ঝলকানি আর ফুটপাথের ভিড়ে যখন সে বিধ্বস্ত অবস্থায় বসে ছিল, তখন ইনিই তাকে গাড়িতে তুলেছিলেন। জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘কোথায় যাবে মা? এত রাতে একা কেন?’ তৃণা শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ছিল, কোনো উত্তর দিতে পারেনি।
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
অরুণিমাভ চশমার ফাঁক দিয়ে তার দিকে তাকালেন।
‘আমি তোমাকে জোর করব না, তৃণা। কিন্তু তোমার শরীর এখন অনেকটাই ভালো। এবার বলো, আমি তোমাকে কোথায় রেখে আসব? তোমার মা-বাবা? বা কোনো আত্মীয়, যার কাছে তুমি নিরাপদে থাকতে পারো?’
তৃণা মাথা ঝাঁকাল। সেই ভঙ্গিতে জেদ ছিল না, ছিল এক গভীর ক্লান্তি।
‘কেউ নেই, স্যার। আমার কেউ নেই।’ শব্দগুলি উচ্চারণ করল চিবিয়ে চিবিয়ে।
‘সে কী! কোনো বাবা-মা, ভাইবোন… কেউ না?’
অরুণিমাভর কণ্ঠে অবিশ্বাস, ‘তুমি এত বড় একটা মেয়ে, নিশ্চয়ই কোনো পরিবার আছে তোমার। হয়তো কোনো কারণে রাগ করে বা অভিমান করে চলে এসেছ। আমি কথা দিচ্ছি, আমি তোমার দিকটা বোঝাব, যাতে তারা তোমার ওপর রাগ না করে।’
তৃণা ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। শিশির তার সাথে যা করেছে, দীক্ষার সঙ্গে তার সম্পর্ক—এই সব সত্য কি এই সহজ-সরল মানুষটাকে বলা যায়? এই বিশাল সমাজের চোখে সে নিজেই তো এখন পাপের প্রতীক।
‘না, স্যার। আমার কেউ নেই। বাড়ি ফিরে যাওয়ার মতো কোনো জায়গা আমার নেই।’ তৃণার কণ্ঠস্বর রুদ্ধ হয়ে এলো। সে মিথ্যা বলছে। কিন্তু সে জানে, এই মিথ্যাই তার একমাত্র সুরক্ষা।
অরুণিমাভ কিছুক্ষণ নীরব রইলেন। তিনি গভীর দৃষ্টিতে তৃণার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলেন, যেন তার ভেতরের কথাগুলো পড়ে নিতে চাইছেন। তিনি বুঝতে পারলেন, মেয়েটা এক গভীর ক্ষত নিয়ে এসেছে, যা সহজে প্রকাশ করতে রাজি নয়।
‘ঠিক আছে, তুমি যদি না বলতে চাও, আমি আর জোর করব না।’ অরুণিমাভ এবার নরম হলেন, ‘তবে আমি তোমাকে এভাবে রাস্তায়ও ফেলে দিতে পারি না। তুমি শিক্ষিত, রুচিশীল। তোমাকে দেখে বোঝা যায়, তুমি কোনো নিম্ন মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়ে নও। কী করবে তুমি এখন? একটা কাজ খুঁজবে? নাকি… এখানে থাকতে চাও?’
তৃণা চমকে উঠল। কাজ! কি কাজ করবে সে! আবার এভাবে তো থাকাও যায় না একটা বাসায়। তবে এখানে যদি একটা কাজ পেতো কিছু.. ওই উছিলায় এই বাড়িতেই নির্বিঘ্নে থাকা যেতো।
সেই ভাবনা থেকেই পরবর্তী উত্তরটা করল তৃণা, ‘যদি কোনো কাজ পাই, তবেই থাকব স্যার।’
অরুণিমাভ মৃদু হাসলেন। সেই হাসিতে একটা নির্ভরতার ছোঁয়া ছিল। তিনি সোফা ছেড়ে উঠে জানালার কাছে গেলেন। বাইরে তার বিশাল বাগান।
‘আমার স্ত্রী…’ তিনি এক মুহূর্ত থামলেন, ‘সে আমাদের ছেড়ে চলে গেছে। আর আমি ব্যবসা নিয়ে এতো ব্যস্ত থাকি যে ছেলেদের সময় দিতে পারি না। আমার দুটো ছেলে। বড়টার বয়স এগারো, ছোটটার সাত।’
তিনি ঘুরে দাঁড়ালেন। ‘তুমি কি পারবে আমার বাবুদের দেখাশোনার দায়িত্ব নিতে? শুধু দেখাশোনা নয়, তাদের সঙ্গে গল্প করবে, তাদের সব অভিযোগ মনোযোগ দিয়ে শুনবে, তাদের একটু যত্ন করবে। এটা তোমার জন্য একটা নিরাপদ আশ্রয় হবে। আর বেতনের চিন্তা করতে হবে না।’
তৃণার চোখ ভিজে এলো। সে এই লোকটার কাছে এসেছিল এক আশ্রয়প্রার্থী হিসেবে, আর আজ তিনি তাকে একটা কাজ দিচ্ছেন! একটা সম্মান দিচ্ছেন! ভাগ্য তাকে এক বাসার কেয়ারটেকার বানিয়ে দিল এভাবেই। কিন্তু এই কাজটা তার কাছে একটা সুযোগ। একটা নতুন জীবন শুরু করবার প্রথম ধাপ…
তৃণা মাথা নিচু করে বলল, ‘পারব, স্যার। আমি ওদের মন দিয়ে দেখব।’
অরুণিমাভ হাসলেন, সেই হাসিটা এবার উষ্ণতায় ভরা।
‘ঠিক আছে। তোমার নতুন জীবন শুরু হলো, তৃণা। এখন থেকে তুমি এদেরই খেয়াল রাখবে।’
তৃণা সোফায় আরও গুটিয়ে বসল। বাইরে নয়, এই নতুন, শান্ত সংসারে নিজের অতীতের সব যন্ত্রণা ফেলে সে যেন প্রবেশ করল এক অজানা ভবিষ্যতে। তার ভেতরের আগুনটা হয়তো এখনো জ্বলছে, কিন্তু এখন সেই আগুনটা আর ধ্বংসাত্মক নয়, বরং নতুন করে টিকে থাকার ইচ্ছাশক্তি।
তৃণার চলে যাওয়ার পরের আভাসটা এখনো পুরোপুরি মেটেনি এ বাড়ি থেকে। বাতাসে এক ধরণের নীরবতা, অব্যক্ত শূন্যতা। তবুও নিত্যদিনের কাজ থামিয়ে বসে থাকার তো কোনো মানে হয় না। জীবন তার নিজস্ব ছন্দে এগিয়ে চলে। দীক্ষা নিজেকে শক্ত হাতে সামলে নিলো। মনের গভীরে কোথাও একটা শীতলতা, আশ্চর্যজনকভাবে তার মনে ততটা কষ্ট জমা হচ্ছে না তৃণাকে এভাবে তাড়িয়ে দেওয়ার জন্য। বরং এক ধরণের স্বস্তি, হয়তো অনিচ্ছাকৃত এক মুক্তির নিশ্বাস।
অন্যদিকে, বকুলের মনে শান্তি নেই। সে অস্থির, ছটফট করছে। শান্ত ভাই আর এ বাড়ি আসছেন না। কেন? কারণটা কি তবে সে নিজে? সেদিন রাগের বশে সে-ই তো আসতে মানা করে দিয়েছিল লোকটাকে। সেই মানা কি তবে অভিমানে পরিণত হলো? লোকটা কি সত্যিই আর আসবে না? বকুলের অস্থিরতা কেবল বাড়তেই থাকে। সেটা চোখ এড়ায় না দীক্ষার। বোনকে কিছু না বললেও, তার চোখজোড়া দেখেই সে ভেতরের তোলপাড়টা বুঝে নেয়।
দীক্ষা বকুলকে ডেকে পাঠালো।
‘আপা।’ দরজা ধরে দাঁড়াল বকুল।
‘আয় ভেতরে আয়।’
সে ভেতরে ঢুকল। দীক্ষা কতগুলো নকশা আঁকা কাগজে তোলা ডিজাইন ধরিয়ে দিলো।
‘এগুলো সুতো দিয়ে কাপড়ে ফুটিয়ে আনতে হবে।’ দীক্ষা শান্ত কণ্ঠে বলল, ‘তার জন্য যেতে হবে ওস্তাদ বাড়ি।’
বকুলের মনটা যেন মুহূর্তেই নেচে উঠল। যদিও মুখে সে আমতা আমতা করে, দ্বিধা দেখায়, কিন্তু মন থেকে সে বেশ খুশি। কারণ, ওই বাড়ি যাওয়ার জন্য শান্তদের উঠোন মাড়িয়েই যেতে হবে যে! এক ঝলক দেখার ক্ষীণ আশা জন্মে অবাধ্য অসভ্য হৃদয় কোণে।
‘বেশ তো, তুমি তৈরি হয়ে নাও আপা।’ কাগজগুলো নিতে নিতে বলে বকুল, ‘এগুলো কি থ্রিপিসের গলা হবে?’
‘হুম। হাতাতেও দেওয়া যাবে। আগে দেখি সুতোয় ফোটে কেমন। কোন রংয়ে কোনটা হবে, আমি আলাদা করে লিখে দিয়েছি। রঙ এঁকে দেখিয়েও দিছি। ওই পেজটা ভালো করে দেখিয়ে দিয়ে আসিস।’
‘তুমি যাবে না?’ বকুল অবাক হলো।
‘না, আমি এই অবস্থায় অতদূর যাবো না। তাছাড়া শরীরটা যুত লাগছে না। কিন্তু হাত গুটিয়ে বসে থাকলেও যে হবে না। আমাদের ‘রুদ্রাণী’ পেজটায় পঁয়ত্রিশ হাজার মানুষ যুক্ত হয়েছে। আজকে একটা পোস্ট করে সম্ভাব্য ওপেনিং তারিখটা জানিয়ে দেবো। তার আগেই আমাকে সব গুছিয়ে নিতে হবে। বুঝেছিস?’
‘বুঝেছি আপা। কিন্তু এসব তো বাবু আসার পর করলেও হতো। এই সময়ে…’
‘অসুবিধা নেই। বাবুর পর কত খরচ, জানিস? মা কত আর সামলাবে বল? তার ও তো বয়স হয়েছে। যতটুকু যা পারি। আর আমি একা তো নই, তুই আছিস, শান্ত ভাই আছে, কাজল আছে- সবাই মিলে সামলাবি আমি অসুস্থ থাকলেও। ভালো কথা, ওই ভদ্রলোক আসেন না কেন? ঘটনা কি?’
বকুলের গাল জোড়া হঠাৎই রক্তিম হয়ে উঠল। সে মাথানিচু করে চাপা স্বরে বলল, ‘কি জানি আপা.. কেন আসে না।’
‘তুই কিছু বলিসনি তো?’ ভ্রু পাঁকালো দীক্ষা।
অস্বস্তিতে মিশে গেল বকুলের মন, ‘উঁহু না..’ ঘাড় নাড়লো দু’ধারে, ‘আমি আবার কি বলতে যাব? আমার তো খেয়েদেয়ে কাজ নেই, আগ বাড়িয়ে কথা বলতে যাব..’
‘এমন করিস কেন? একটু সহজ সরল হলেও লোকটা ভালো তো।’
‘ইশ, কত যে ভালো.. জানা আছে। আপা তুমি তার কথা ছাড়ো তো। আমি তবে বেরোই।’
‘যাবি তো, কিন্তু শোন, যদি দেখা টেখা হয়, আসতে বলিস। এই পরিবারটা শুধু আমার না, তারও- সে যদি ওস্তাদ বাড়ির খোঁজ না দিতো, আমরা জানতাম কোথা থেকে?’
বকুল কিছুই বলল না। তৈরি হলো বেরিয়ে পড়বার জন্য। প্রথমে একা যেতে চাইলেও পরে কাজলকে নিলো। দুই ভাই-বোন পা বাড়ালো ওস্তাদ বাড়ির উদ্দেশ্যে।
পা বাড়াতে বাড়াতে বকুলের মন কেবলই দোয়া করতে থাকল, একটিবার যেন শান্তর সাথে তার দেখা হয়ে যায়। ওই উঠোনে, ওই পথে… কেবল একবার!
আল্লাহ বুঝি সত্যিই বকুলের ফিসফিসানি শুনেছিলেন। তাই তো বড় রাস্তার মোড় ঘুরতেই চোখে পড়ল মানুষটাকে- শান্ত। লোকটা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘাসের ডগা চিবুচ্ছে, উদাস দৃষ্টি তাঁক করে রেখেছে দূর দিগন্তে….
শান্তকে দেখেই বকুলের হৃদয়ে কিছু একটা তীব্র গতিতে দৌড়ে গেল। সেটা র ক্ত, নাকি আশা, সে নিজেও ঠাহর করতে পারল না। সে থমকে গেল, দ্বিধা তাকে গ্রাস করল। সে কি দৌড়ে গিয়ে লোকটার কাছে দাঁড়াবে? নাকি এমন ভান করবে যেন দেখেইনি, তারপর এড়িয়ে দ্রুত চলে যাবে? কিন্তু না, প্রিয় মানুষটিকে এত কাছে পেয়েও এড়িয়ে যাওয়া এত সহজ নয়। মনের সমস্ত বাঁধ ভেঙে গেল।
সে সোজা শান্তর কাছে গিয়ে থামল।
কাজলকে কেবল বলল, ‘তুই যা, আমি আসছি।’
কাজল অবাক হলেও কথা বাড়াল না। বকুলের চোখ-মুখের ভাব তাকে চুপ করিয়ে দিলো। সে আর কোনো প্রশ্ন না করে, তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে ওস্তাদ বাড়ির দিকে চলে গেল।
শান্ত ভ্রু কুঁচকে বকুলকে দেখল। সে হয়তো অবাক হলো, কিন্তু তার চেহারায় এমন একটা ভাব ফুটিয়ে তুলল যেন বকুলের এখানে আসা-যাওয়ায় তার কিচ্ছুটি আসে যায় না। সম্পূর্ণ উদাসীন। এমনকি একটা কথাও বলল না। পাথরের মতো স্থির হয়ে মনোযোগ দিয়ে ঘাসের ডগা চিবুতে লাগল। যেন এই মুহূর্তে এরচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তার জীবনে আর কিছু নেই।
বকুল অস্বস্তিতে মিশে দাঁড়িয়ে রইল এই আশায়, হয়তো সে নিজ থেকেই তার সঙ্গে কথা বলে উঠবে। কিন্তু সে আশায় গুড়ে বালি দেখে দীর্ঘ নীরবতার পর, বকুলই শেষমেশ নিজ থেকে কথা বলতে শুরু করল।
ছোট একটা নিঃশ্বাস ফেলে, ঠোঁটে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে শুধালো, ‘কি করেন শান্ত ভাই?’
এই অপেক্ষাতেই ছিল শান্ত। তাকে ত্যাড়া ত্যাড়া কথা শোনানোর ফলাফল আজ হাতে নাতে ফেরত দেবে সে। যতটা ত্যাড়ামি বকুল দেখিয়েছে তারচেয়ে দ্বিগুণ…
কপালের ভাঁজগুলো আরও স্পষ্ট করে জবাবে বলে উঠল শান্ত, ‘নৃত্য করি।’
বকুল থতমত খেলো, ‘কই, আপনি তো ঘাসের ডগা চিবাচ্ছেন!’
‘চোখে যখন দেখতেই পাচ্ছিস তখন আবার জিজ্ঞেস করছিস কেন? নাকি ছেলে মানুষ দেখলে মুখের ভেতর কুটকুট করে…চুপ থাকতে পারিস না!’
বকুলের চোখে পানি চলে এলো।
কীভাবে ক্যাটক্যাট করে কথা বলছে দেখো!
একটু কি দয়ামায়া নেই? এত রাগ? রাগ হলেই সেটা দেখাতে হবে বুঝি?
মন ছোট করে বকুল বলল, ‘আপনি আমাদের বাড়িতে যান না কেন আর? দীক্ষা আপা আপনার কথা আজকেও জিজ্ঞেস করল।’
‘বলে দিস, আমি আর ও বাড়িতে আমার ছায়াও ফেলব না। যেখানে আমার মান সম্মানের কোনো দাম নেই।’
‘আপনি এমন করছেন কেন? আমি নাহয় সেদিন একটু রাগ হয়েই…’
‘তোদের মতো ছোটলোকদের সঙ্গে মেশাটাই আমার গ্রেট মিস্টেক বুঝছিস?’
‘শান্ত ভাই!’
‘কি? সত্য বলায় আঁতে লাগল? লাগুক গে… আই নো কেয়ার।’
বকুল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল এবারে। কণ্ঠস্বর অপরাধী সূচক করে তুলল, ‘আমি মাফ চাইলাম। আপনাকে আর কোনোদিন অসম্মান করব না।’
শান্ত ভ্রু উঁচিয়ে তাকাল, মনে মনে পৈশাচিক শান্তি অনুভূত হচ্ছে। কিন্তু উপর দিয়ে ভাব এমন, যেন বকুলের নত মাথাতেও তার কিছু আসে যায় না।
সে মুখ থেকে চাবানো ঘাসের ছাবনাটুকু থু করে ছুঁড়ে ফেলল। তারপর নিচু হয়ে আরেকটি ঘাসের ডগা ছিঁড়ে নিলো। কি এমন ব্যস্ত বাবা!
উত্তরও দিচ্ছে না।
বকুল মনে মনে আওড়ালো, একবার আপনাকে রেজিস্ট্রি করে নেই, তারপর দেখাবো এইসব ভাবের গুল্লি মা রি। এখন শুধু সহ্য করে নিলাম, হুহ!
মুখে বলল, ‘আমরা ওস্তাদ বাড়ি যাচ্ছি। আপা অনেকগুলি ডিজাইন দিয়ে দিয়েছে।’
‘তার শরীর কেমন?’ জানতে চাইলো শান্ত, মুখে গাম্ভীর্য টেনে ধরা।
বকুল জানালো, ‘ভালো আছে। তবে শরীরের অস্থিরতা বেড়েছে। আর সেদিনের পর তো…তবে আপা নিজেকে সামলে নিয়েছে এটা একটা ভালো দিক।’
‘ঠেকতে ঠেকতেই শেখে মানুষ। যার আবেগ ভরা মন থাকে, একসময় সে আবেগ শূন্য হয় পরিস্থিতির কারণে… ব্যাপার না।’
‘হুঁ। আপনি কি যাবেন?’
‘না। তুই যা।’
‘আমাকে ক্ষমা করেননি? আমি কিন্তু সত্যি সরি!’
শান্ত কোনো অতিরিক্ত কথা বলল না। কেবল জানিয়ে দিল, আজ সন্ধ্যার দিকে সে আসবে ওদের বাড়িতে। এখন তার একটু গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে।
এইটুকু শুনেই বকুলের মনটা অদ্ভুত এক শান্তি আর আনন্দে ভরে উঠল। মানুষটা তাকে ভালোবাসে কিনা, সেটা এখনো নিশ্চিত নয়, তবু তার বুকের গভীরে একটা ক্ষীণ আশা ধীরে ধীরে জায়গা করে নিচ্ছে। যেন মনে হচ্ছে, হয়তো… হয়তো শান্তকে একদিন সত্যিই নিজের করে পাওয়া যাবে।
সেই আশাতেই বকুল আজ একটা সিদ্ধান্ত নিল।
আর লুকোচুরি নয়, আর বুক চেপে রাখা নয়, আজই সে শান্তকে তার মনের সব অব্যক্ত কথা খুলে বলবে।
ভালোবাসার কথাগুলো, ভরসার কথাগুলো…
যা এতদিন কেবল নিজের ভেতরই জমে রেখেছিল।
দেখা যাক… শান্ত হয়তো বুঝবে তাকে।
হয়তো সাড়াও দেবে সেই ভালোবাসায়।
আর যদি না দেয়?
বকুল আপাতত সেই ভাবনায় যেতে চায় না।
যা হওয়ার হবে, আজ সে নিজের ভেতরের সত্যিটা জানিয়ে দেবে।
অন্যদিকে শান্তের মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা। দীক্ষাকে যা বলতে চায়, সেটা কি আদৌ কোনোদিন বলতে পারবে? বলতে পারলেও দীক্ষা কীভাবে নেবে? রাগ করবে? কষ্ট পাবে? নাকি বুঝে নেবে?
তার মনে শক্ত একটা বিশ্বাস আছে, দীক্ষা সবকিছু শুনে হয়তো ইতিবাচকভাবেই নেবে। তবু অস্বস্তি হচ্ছে তার। কারণ কথাগুলো কীভাবে সাজাবে, কোনটা আগে বলবে, কোনটা পরে- সেই ভাবনাই তাকে অদ্ভুত এক অস্থিরতায় ফেলে দিয়েছে।
কথা বলতে পারলেই বোধহয় সব হালকা হয়ে যেত…
কিন্তু সেই প্রথম পদক্ষেপটা নেওয়াই যেন সবচেয়ে কঠিন শান্তর জন্য।
আলো ঝলমলে সকালের বিপরীতে, দোতলার তিন নম্বর ঘরের সেই গাঢ় অন্ধকার এখনো শিশিরের চোখের পাতায় জমাট বেঁধে আছে। যখন সে চোখ খুলল, মাথার ভেতর যেন একটানা ঢোল বাজিয়ে যাচ্ছে কেউ। পুরো শরীরটা ব্যথায় আড়ষ্ট, তলপেটে এমন এক ভোঁতা যন্ত্রণা, মনে হচ্ছে কেউ যেন তার ভেতরকার সমস্ত টিউবলাইট একসঙ্গে নিভিয়ে দিয়েছে। সে নড়তে পারছে পারছে না, কেবল গোঙাচ্ছে।
চোখ খুলে নিজেকে আবিষ্কার করল হাসপাতালের নোংরা, তেলচিটে চাদর দেওয়া একটি বেডে। চারপাশে বোটকা জীবাণুনাশক আর ডেটল মেশানো এক অদ্ভুত গন্ধ। বেডের পাশে একটি চেয়ারে মুখ ভোঁতা করে বসে আছে সবুজ, রূপালী হোটেলের সেই ম্যানেজার।
সবুজের মুখখানা দেখে মনে হচ্ছে সে কেবলই বিলের সবচেয়ে বিষণ্ণ মাছটা গিলে গলা ব্যথায় কাতরাচ্ছে ভেতরে ভেতরে।
শিশির কোনোমতে ফ্যাসফেঁসে গলায় বলতে পারল, ‘সবুজ ভাই… ই… ইয়ে… ক.. কী হয়েছে আমার? আমি এখানে কেন? আর আমার… আমার এত… ব্যথা কেন হচ্ছে? নয়ন কোথায়? উফ মাথাটা এত ভারী লাগছে। উফফফফ কি বিদঘুটে যন্ত্রণা…’
সবুজ ধীরে ধীরে মাথা তুলে তাকাল। তার চোখে কোনো সমবেদনা নেই, আছে কেবলই এক অদ্ভুত আতঙ্ক মেশানো বিরক্তি।
‘কথা বইলেন না তো। আপনার জন্য আমি পড়ছি মহাবিপদে। আমারে এখানে আঁটকাইয়া রাখছে। আপনার জ্ঞান না ফিরা অবধি যাইতে পারব না। এই আপনি বলেন, আপনার গুরুত্বপূর্ণ জিনিস খোঁয়ানোর ব্যাপারে আমার কোনো হাত আছে কিনা, বলেন সবাইকে…’
শিশির ভ্রু কুঁচকে ফেলল, ‘গুরুত্বপূর্ণ জিনিস? কী গেছে? টাকা? ব্যাগ? আরে বাবা! ভালো করে বলেন না। আমার মাথা কাজ করছে না!’
শিশির উত্তেজিত হয়ে উঠল। ড্রাগসগুলো কোথায়?
ওটা হারালে সাড়ে সর্বনাশ! হায় আল্লাহ!
সবুজ এবার টেবিল থেকে একটি ছোট স্টিলের বাটি তুলে নিয়ে টেবিলে চাপড় মারছে। তাতে খট করে শব্দ হলো।
‘টাকা-পয়সার কথা ছাড়েন ভাই! আপনার যে টুনটুনি পাখি গেছে! নয়নতারা… সে আপনার যৌবনের অহংকারটা কেটে নিয়ে চলে গেছে!’
কথাটা শুনে শিশিরের মস্তিষ্কে যেন হঠাৎ দশ হাজার ভোল্টের কারেন্ট খেলে গেল। যন্ত্রণার অনুভূতি ছাপিয়ে এক ভয়ংকর শূন্যতা তাকে গ্রাস করছে। সে বিছানায় তড়পে ওঠার ব্যর্থ চেষ্টা করে কিন্তু পারছে না।
‘কী! কী বলছো তুমি! কেটে নিয়েছে মানে!’ শিশিরের কণ্ঠস্বরটা আতঙ্কে চিঁ চিঁ করে ওঠে, যেন সে দুম করে ফুটো হয়ে যাওয়া একটা বেলুন।
সবুজ কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, ‘হুম। কাটাকুটি। নিখুঁত সার্জারি। ডাক্তার বলেছে, আপনি এখন সম্পূর্ণ অ-পুরুষ। এই জগতে আপনার আর পুরুষত্ব বলে কিছু রইলো না। অভিনন্দন!’
শিশিরের চোখ দুটো কপালে উঠে গেল। মনে হচ্ছে যেন সেগুলো দুটো টেনিস বল হয়ে বেরিয়ে আসবে যেকোনো মুহূর্তে। সে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে এক অভূতপূর্ব চিৎকার করে উঠল। তার সেই চিৎকারটা কোনো পুরুষের দুঃখের আর্তনাদ নয়, বরং এক কার্টুন চরিত্রের বিকট আওয়াজ-এর মতো শোনাচ্ছে!
‘আহহহহহহহ! আমার টুনটুনি! আমার! আমার সব চলে গেল! এখন আমি কী করব! আমি এখন কীভাবে… আমার… আমার মান – সম্মান… সব!’
শিশিরের চিৎকার শুনে পাশের বেডের এক বৃদ্ধ রোগী হাঁফাতে হাঁফাতে বালিশ মাথায় চাপা দিলেন।
সবুজ এবার উঠে দাঁড়িয়ে শিশিরের দিকে ঝুঁকে পড়ল। তার কণ্ঠে কোনো আবেগ নেই, যেন সে বাজারের দর জানাচ্ছে।
‘দেখুন শিশির সাহেব। শান্ত হোন। যেটা গেছে সেটা গেছে। আর নিশ্চয়ই আপনি এমন কিছুই করেছিলেন যার কারণে.. কত কাস্টমার আসে যায়, কই এমন তো কোনোদিন হলো না।’
‘নয়নতারা… ওই বে’শ্যা বে’জ’ন্মা.. কই ও?’
‘ইশ, এখন একদম গালি বের হইতেছে। খুব তো দুইদিন তুলুতুলু করলেন দেখলাম। মানা করছিলাম আপনাকে, অতিরিক্ত ঘেইষেন না। শুনবেন তো না, এবার ভোগেন…’
শিশির থরথর করে কাঁপছে। খুব ইচ্ছে করছে এইসব কিছু মিথ্যে প্রমানিত হোক, সে এখনই ঘুম থেকে জেগে উঠবে আর দেখবে সে শুয়ে আছে রূপালী হোটেলের বিছানায়। কিন্তু না, এইসব সত্যি..৷ চাইলেও এসব মিথ্যে হয়ে যাবে না। সত্যিই আজ শিশির একজন অপুরুষ। খাবারের ভেতর ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে খাইয়ে নয়নতারা এই কাজ ঘটিয়ে পালিয়েছে। ঘুমের ঘোরে ব্যথাবোধ কিংবা কি হচ্ছে- তার বিন্দুমাত্র বোধশক্তি শিশিরের হয়নি। র’ক্তের নরম স্রোতে ভেসে গেছে গোটা বিছানা, শরীর হাল ছেড়ে দিয়ে মস্তিষ্ককে অবশ,শিথিল করে দিয়েছিল,ফলে জ্ঞান হারিয়েছিল শিশির…
এমন যদি হতোই, তবে সে কেন বেঁচে রইল? ম রেই যেতো নাহয়। এই বেঁচে থাকার কোনো মানে আছে? নেই.. কেন জ্ঞান ফিরলো তার! শিশিরের ইচ্ছে করছে চিৎকার করে কাঁদতে। কিন্তু পারছে না সে.. পারছে না। বুকের ভেতর ভেঙে গুড়িয়ে চূর্ণবিচূর্ণ হচ্ছে সবকিছু…
নয়নতারা, কি করলে তুমি? কেন করলে!
বোকা শিশির…নয়নতারা সেই রাতে শুধু আপনার পুরুষত্বই কাটেনি, সে আপনার সব অহংকারও কেটে নিয়েছে। আপনি তো বলছিলেন, নারীরা কেবল দেহের পোশাক! এখন আপনিই তো খোসা ছাড়ানো নারকেলের মতো পড়ে আছেন! এখন আপনি শুধু শরীর, যার ভেতরে আর কোনো জোর নেই। অহংবোধ ও নেই। আপনি বেঁচে থাকবেন, ম রে যাওয়ার জন্য। এটাই আপনার সবচেয়ে বড় শাস্তি, সবচেয়ে বড় অভিশাপ! অভিশপ্ত জীবনে আপনাকে স্বাগতম…
সবুজ উঠে দাঁড়াল, ‘আমি এবার যাবো। আপনার জ্ঞান ফিরছে, আমার মুক্তি ভাই..’
‘নয়ন কোথায়?’ আবারও জানতে চাইলো শিশির।
সবুজ ঠোঁট উলটে বলল, ‘ফুরুৎ… বনের পাখি বনে উইড়া গেছে।’
‘সবুজ ভাই, হেয়ালি করবেন না খবরদার!’
‘আমার সাথে রাগ দেখাইবেন না। আমি আপনার কোন বালডাও করি নাই। নয়নরে আমি নিজেই খুঁজতেছি বুঝছেন? এতবড় অঘটন ঘটাইয়া সে কি এখানে বইসা পোলাও বিরানি খাবে? কি আক্কেল..’
শিশির আরও কিছু বলতে যাবে, ঠিক তখনই তার চোখ ছানাবড়া হয়ে উঠল। সে দেখল ধীর পায়ে হেঁটে আসছে পুলিশের একটি দল। সামনে লম্বা, মোটারাম এক অফিসার, তার মুখে বিরক্তির স্পষ্ট ছাপ। মনে হচ্ছে, সকালে কড়া লিকারের চা খেয়ে তার মুখ বিস্বাদ হয়ে গেছে।
সবুজ যেন হাফ ছেড়ে বাঁচল। সে ঝট করে পুলিশ অফিসারদের দিকে এগিয়ে গেল। তার চোখে-মুখে বিরাট এক নির্দোষ সেজে বসার চেষ্টা, কিন্তু গলার স্বর কাঁপছে থরথর করে, স্যারদের দিকে হাত জোড় করে বলল,
‘স্যার, আমারে আগে ক্লিয়ার করেন! এই যে রোগী, তার মুখেই শুনেন, আমি কিছু করি নাই! সব করছে ওই নয়নতারা। ওরে ধরেন স্যার, আমারে ছাড়েন। আমি তো গরীব ম্যানেজার, এইসব কাণ্ড আমার পক্ষে করা সম্ভব?’
ওসি ঠান্ডা দৃষ্টিতে সবুজকে স্ক্যান করে, তারপর চোখ সরিয়ে শিশিরের দিকে তাকাল।
শিশির ততক্ষণে অর্ধেক উঠে বসেছে, কাঁদোকাঁদো মুখে গলা বাড়িয়ে দিলো, ‘স্যার… স্যার… আমারে বাঁচান… ওই মেয়েটা আমারে শেষ করে দিছে। আমার সর্বনাশ করে পালাইছে। ওরে ধরেন স্যার, আমারে ন্যায় দেন স্যার… আমারে পুরুষ থেকে অপুরুষ বানিয়ে দিছে…’
ওসি ভুরু তুলে তাকাল, ‘হুম… যেখানে সেখানে ঢুকানোর নেশা থাকলে এমনই হয়। কম তো দেখলাম না এই পেশায়… তবে তার আগে আপনার নিজের ব্যবস্থাই করতে হইতেছে।’
এ কথা শুনে শিশির থমকে গেল।
‘মানে? আমার কি ব্যবস্থা?’
ওসি তার পেছন থেকে একটি কালো রঙের ব্যাগ এগিয়ে ধরল।
‘এই যে, এই ব্যাগটা চিনতেছেন?’
শিশির ব্যাগটা দেখে মুহূর্তে রং বদলে গেল।
এই তো! ঠিক এই ব্যাগে ছিল তার ড্রাগস আর টাকা- ভরপুর করে ঠাসা অবস্থায়। এ ব্যাগ তাদের হাতে তুলে দিলো কে! সর্বনাশ!
সে তোতলাতে তোতলাতে বলল, ‘এ…এটা তো… মানে… আমারটা… কিন্তু…’
ওসি ব্যাগটি খুলে ভিতরের জিনিস একটু নেড়েচেড়ে দেখল।
‘ওহো! বাহ! টুনটুনিটা গেছে কিন্তু ব্যাগে মাল–টাকা–ড্রাগস সব ঠিকই আছে। ভালো। এখন আপনারে হাসপাতাল থেকে সিধা থানায় নিতে হবে।
শরীর সুস্থ করেন তাড়াতাড়ি ভাই- এরপর আমাদের প্যাদানীও তো নিতে হবে, নাকি?’
সবুজ পাশে দাঁড়িয়ে মুখ মাটিতে পুঁতে ফেলার মতো নিচু করে বলল, ‘স্যার, আমারে ছাড় দেন। তারপর তাদের যা করার করেন..’
ওসি হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিলো, ‘তোমাকেও আমাদের সাথে যেতে হবে। অত সোজা নাকি সবকিছু। কে অনুমতি দিয়েছে এই হোটেল চালানোর? হোটেলের নামে পিছনে কি কি কইরা বেড়াও, আমরা জানি না মনে করো? খবর তোমারও হবে চান্দু..’
‘স্যার, স্যার আমারে মাফ করেন স্যার, আমি কিছু করি নাই স্যার, বিশ্বাস করেন আমি এসবে নাই স্যার…’
সবুজ ভেউভেউ করে কেঁদে ফেলল।
ওসি বড্ড বিরক্ত হলেন। তাকে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিতেই দু’জন কনস্টেবল ঠেলে ধাক্কিয়ে হাসপাতাল থেকে নিচে নামিয়ে নিতে লাগল।
শিশির জড়ভরত হয়ে আছে।
তার মনে হচ্ছে সবকিছু মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে।
কীভাবে কী হচ্ছে,কিছুই মাথায় খেলছে না।
এগুলো সব সত্যি না স্বপ্ন? একটা চিমটি দিয়ে দেখা উচিত। কিন্তু সেই সুযোগ পেল না বেচারা। তার আগেই ওসির নির্দেশে তাকে তুলতে এগিয়ে এলো দু’জন,
‘বহুত চিকিৎসা হইছে। এবার বাকি চিকিৎসা আমরাই দিবো। ওরে উঠাও…’ ওসির হুকুমে শিশিরের হৃদয় নড়ে উঠল।
সোনাডিঙি নৌকো পর্ব ২১
‘স্যার, স্যার…’ কোনোমতে উচ্চারণ করল শিশির।
‘এই আস্তে আস্তে, বেচারার আবার সোনাদানা দুইটাই ছিনতাই হইছে। সাবধানে ধরো।’
কনস্টেবল দু’জনেই ঠোঁট টিপে হাসি আঁটকালো।
শিশিরের মাথা ঘুরছে। ভনভন করছে। একটু অজ্ঞান হওয়া গেলে কি খুব ক্ষতি কিছু হতো?
ধুর, অজ্ঞান হওয়ার কোনো মন্ত্রও তার জানা নেই!!
উঠে দাঁড়ানোর সময় অজান্তেই বেরিয়ে এলো একটি আর্ত চিৎকার, ‘আহহহহহ….’
লজ্জায়, শরমে, ভয়ে শিশিরের চোখে পানি চলে এলো।
