সোনাডিঙি নৌকো পর্ব ২৪
মৃধা মৌনি
বৈঠক বসবে চৌধুরীদের হলঘরে। এমনটাই ভেবে রেখেছিল তৃণা। কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে অরুণিমাভ চৌধুরী তাকে নিজের বেডরুমে ডেকে পাঠালেন। তৃণা গুটিশুটি পায়ে গিয়ে দাঁড়াল দরজার সামনে।
উশখুশ করতে থাকা গলায় শুধালো, ‘আসব?’
সাদা শুভ্র রংয়ের পাঞ্জাবি পরিধান করছেন তিনি। আবার কোথাও বেরোবেন বুঝি। আয়নার ভেতর দিয়ে তৃণার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন। হালকা গলায় বললেন, ‘এসো।’
তৃণা ভেতরে ঢুকল। ওকে কি জন্য ডাকা হয়েছে সেটা বেশ ভালো করেই বুঝতে পারছে, কিন্তু এর পরিণামে কি শাস্তি দেওয়া হবে- তা ধরতে পারছে না। এই লোককে দেখে ওর ততটা কঠিন কেউ মনে হয়নি। তবে নিজের ছেলের ব্যাপার যখন, কঠোর হতে কতক্ষণ? হয়তো বের করে দিবেন?
তৃণা ভেতর দিয়ে ভয় পাচ্ছে। কিন্তু উপর দিয়ে যথেষ্ট শক্ত মনোভাব দেখিয়ে নিজে থেকেই বলল, ‘দেখুন, যেটা হয়েছে সেটা অজান্তেই হয়ে গেছে। আমি ইচ্ছেকৃতভাবে কিছু করতে চাইনি।’
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
অরুণিমাভ কিছু বললেন না। যেন শুনতে পাননি, নিজের কাজ যত্ন সহকারে করে যেতে লাগলেন। পাঞ্জাবির কলার ঝেড়ে দুটো টান নিয়ে ফিটিং টা আরও একবার যাচাই করে নিলেন। বুকের বোতাম গুলি সুন্দর করে আঁটকালেন। ড্রেসিং টেবিলের সামনে থেকে পারফিউমের শিশিটা তুলে নিয়ে তিনটে স্প্রে করলেন, একদম বেছে বেছে নির্দিষ্ট জায়গায়। যেন অন্য কোথাও পারফিউম লাগানো বড় কোনো গুনাহ বা অপরাধ।
তৃণা অবাক মুগ্ধতা নিয়ে মানুষটিকে দেখছে। কে বলবে, এই লোকের এত বয়স! তার গাম্ভীর্য, তার এটিটিউট- সবকিছু তৃণাকে কেমন একটা ঘোরে ফেলে দিচ্ছে। সে চোখ সরাতে পারছে না। মন্ত্রমুগ্ধের মতো চেয়েই আছে। মানুষটির কর্মকাণ্ড তাকে বেশ আনন্দ দিচ্ছে।
হঠাৎ করেই ভদ্রলোক আয়নার ভেতর দিয়ে আবারও তার দিকে তাকালেন, তৃণাও তাকিয়ে ছিল। দুইজনের চোখাচোখি হতেই তৃণা চোখ নামিয়ে নিলো। অরুণিমাভ মৃদু হাসলেন।
হাতঘড়িটা পেঁচিয়ে নিতে নিতে বললেন, ‘তুমি আমাকে মিথ্যা বলেছ তৃণা!’
তৃণা বিস্ময়ে হতবিহ্বল হয়ে গেল। ঢোক চাপলো অজান্তেই, বুকের ভেতর ধকধক ধকধক করছে তার।
‘ক…কি মিথ্যা বলে…ছি?’
‘তোতলাচ্ছো কেন? এখানে তোতলানোর মতো কিছু তো হয়নি।’
অরুণিমাভ মৃদু হাসলেন, ‘ভয় পাচ্ছ কেন? এর মানে সত্যিই কি তুমি আমাকে মিথ্যা বলেছ?’
তৃণা কোনো রকমের জবাব দিতে পারল না।
একটু আগের ঘোর কেটে গেছে তার। এই মুহূর্তে মানুষটিকে আর সরল নয় বরং বেশ জটিল লাগছে। কঠিন নয়, ইস্পাত-দৃঢ় মনে হচ্ছে। তৃণা আবারও ঢোক গিললো। এই বাড়িটা ছাড়া তার মাথার উপর আর কোনো ছাদ নেই। এই বাড়ি থেকে বের করে দিলে তার কোথাও যাওয়ার জায়গা থাকবে না। যেভাবেই হোক, উনার পায়ে পড়ে গেলেও এখানেই থাকার ব্যবস্থা করতে হবে।
অরুণিমাভ বের হবেন, অত্যন্ত জরুরি মিটিং আছে তার। আজ রাতটা ফিরবেন না আর।
টেবিলের উপর অনেকগুলো কাগজ ছড়িয়ে ছিটিয়ে। সেখান থেকে কিছু পেপার আলাদাভাবে বাছাই করে নিয়ে উনি একটা ব্যাগে ঢোকাতে ঢোকাতে কথা ছুঁড়ে দিলেন, ‘আমার দুই সন্তান আমার হৃদপিণ্ডের দুটো অংশ। তাদের মা চলে যাওয়ার পর আজ পর্যন্ত কোনোদিন আমি তাদেরকে শাসন করিনি। যখন যা চেয়েছে তাই দিয়েছি। সেখানে তুমি এসেই… আমার কাছে আয়ান সবটাই বলেছে, তবে সেই বলাতে যে মিথ্যে ও মেশানো আছে, তাও আমি জানি। ওরা যে মা হারিয়ে বখে গিয়েছে, সেটা আমি আরও আগে থেকেই বুঝতে পেরেছিলাম, কিন্তু কখনো ওদের বুঝতে দেইনি। ভেবেছি, ওরা না কষ্ট পায়। তুমি যেটা করেছ, সেটা একদিক দিয়ে ঠিক, আবার একদিক দিয়ে ভুল। কিন্তু আয়ান তোমাকেও পালটা ভাবে আঘাত করায়- কাটাকাটি হয়ে গেছে। পরের বার থেকে তুমি শাসন করো, কিন্তু কখনো শারিরীক ভাবে আঘাত করো না। যদি করেছ, তবে এই বাড়িতে সেদিনই তোমার শেষ দিন…’
তৃণা মাথা নিচু হয়ে শুনল। মৃদু মাথা ঝাঁকাল। অরুণিমাভ আর কিছু বললেন না। বেরিয়ে গেলেন। তবে একটা খচখচানি রেখে গেলেন তৃণার ভেতরে। তিনি কি মিথ্যার কথা বললেন? তৃণার কোন সত্যিটা সে জেনে গেছে? ভাবতে ভাবতেই মাথায় চক্কর দিয়ে উঠল মেয়েটার। গা গুলিয়ে এলো। সহ্য হলো না, দৌড়ে অরুণিমাভ চৌধুরীর বাথরুমেই হড়বড় করে বমিতে ভাসাল সে।
অরুণিমাভ চৌধুরী গাড়িতে বসে ড্রাইভারকে বললেন গাড়িটা সোনাডিঙির উদ্দেশ্যে ঘুরাতে। আজ সে ছোট্ট একটা মিথ্যে বলেছে তার ছেলেদেরও। কোনো অফিসিয়াল মিটিংয়ে নয় বরং সে যাচ্ছে আজ এমন একজনের সাথে দেখা করতে, যে পুরো সোশ্যাল মিডিয়ায় একটা আলোড়ন তৈরি করে ফেলেছে। মাত্র একটি পোস্টের মাধ্যমে বর্তমানের ভাইরাল টপিকে উপনীত হয়েছে। সেই মেয়েটির ব্যাপারে জানতে গিয়েই তৃণার সংযোগ পেয়েছে অরুণিমাভ। এত ছোট একটা মেয়ে কী করে এতবড় প্রতারণায় জড়ালো, কে জানে! আপাতত তৃণাকেও কিছু জানতে দেয়নি সে। সঠিক সময়ে সবটাই জানাবে। তার আগে সেই মেয়েটির সঙ্গে দেখা হওয়া দরকার। তার গল্পটা সামনা সামনি শোনা প্রয়োজন।
আজ সকাল থেকেই দীক্ষার মনে একধরনের অসহায় অস্থিরতা বিদ্যমান। কেমন যেন লাগছে সবকিছু। সামান্য শব্দেই বুকের ভেতরটা কেঁপে কেঁপে ওঠে। কোথাও কি খুব খারাপ কিছু হচ্ছে? নাকি খারাপ কিছু হতে যাচ্ছে? কিসের উচাটনে মনবাড়ি এতো উথাল-পাতাল!
খালেদা মেয়ের মাথায় তেল দিচ্ছেন রোদে বসে। দীক্ষা চুপটি করে বসে চেয়ে রয়েছে দরজার দিকে। বারবার মনে হচ্ছে, আজ কেউ আসবে, কেউ আসবে… কিন্তু কে আসবে? শিশির? ভাবতেই ভেতরটা নড়ে উঠল। না, না, ওই মানুষটির মুখপানে দেখতে চাই না আর.. হে আল্লাহ, তুমি আমার মন শান্ত করে দাও, এই অস্থিরতা কমিয়ে দাও।
দীক্ষা নিচু স্বরে ডাকল, ‘মা..’
খালেদা জবাব দিলেন সংক্ষেপে, ‘হুম?’
‘একটা কথা বলো তো, আল্লাহ তো আমাদের খুব ভালোবাসেন তাই না? তাহলে কেন আমাদের এত দুঃখ-কষ্ট দেন?’
খালেদা মুখে মৃদু হাসি ফুটিয়ে তুললেন, শান্ত স্বরে জবাবে বলতে লাগলেন, ‘আল্লাহ আমাদের ভালোবাসেন বলেই দুঃখ-কষ্ট দেন। কারণ দুঃখ-কষ্ট ছাড়া মানুষের ইমান, হৃদয়, ধৈর্য কোনোটাই পরিপূর্ণ হয় না। যাকে আল্লাহ ভালোবাসেন, তাঁকে তিনি পরীক্ষা করেন। এই পরীক্ষার ভেতর দিয়েই মানুষ পাপমুক্ত হয়, শক্ত হয়, সুন্দর হয়।’
‘আর যারা অন্যায় করে, তারাই দুনিয়াতে ভালো থাকে কেন! ওদেরও তো কষ্ট হওয়া উচিত!’
দুনিয়া তো জাহান্নামীর জান্নাত আর মুমিনের কারাগার। দুনিয়ায় কষ্ট হবেই। যারা আল্লাহর পথে থাকে, তারা কষ্টের মাধ্যমে উচ্চ মর্যাদা পায়।
আল্লাহ কোনো প্রাণীর ওপর তার সহ্যের বাইরে কষ্ট চাপিয়ে দেন না। মানে আমাদের যে দুঃখ আসে, তা আমাদের শক্তির মধ্যেই দেওয়া হয়।’
তিনি মেয়ের মাথার উপর স্নেহের হাত রেখে বললেন, ‘যে কষ্টে তুই ধৈর্য ধরলি, সেই কষ্টই তোর জন্য রহমত হয়ে যাবে। কষ্ট মানে শাস্তি না। কষ্ট মানে আল্লাহর ডাক। তুই যদি ধৈর্য রাখিস, আল্লাহ তোর জন্য আরও ভালো কিছুই রেখে দিয়েছে ইনশা আল্লাহ। সময়ের ব্যবধান মাত্র!’
দীক্ষা মৃদু শ্বাস ফেলল, খালেদা বললেন, ‘কিন্তু এসব কেন জিজ্ঞেস করছিস? আবার ওসব নিয়ে ভাবছিস তুই?’
এদিক ওদিক মাথা দোলালো দীক্ষা, ‘না মা…ভাবছি না। কিন্তু মনে কেন যেন শান্তি নেই। কেমন যেন লাগছে মা। অস্থির অস্থির লাগছে। ভয় হচ্ছে, আবার কোনো খারাপ কিছু…’
তার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে খালেদা বললেন, ‘একদম উল্টাপাল্টা ভাবিস না। ভরসা আছে না আল্লাহর উপর? তিনি নিশ্চয়ই দুর্বলের সঙ্গে আছেন। মনে ভরসা আর দৃঢ়তা রাখ। এই সময়ে এরকম হুটহাট অস্থিরতা চেপে বসবেই… একবার তোর সন্তান সুস্থ ভাবে দুনিয়াতে আসুক, তারপর দেখবি তোর শক্তি কতগুণ বেড়ে গেছে।’
‘তোমারও অনেক শক্তি বেড়ে গিয়েছিল আমাদের জন্মের পর, তাই না?’
‘তাই না আবার! তোর দাদী তো কিরকম খ্যাঁচখেঁচি করত আমার সাথে সারাদিন, এটাতে দোষ, ওটাতে দোষ, যেটাই করি ভুল। আমি কিছুই বলতাম না, ভয় পেতাম, কিন্তু তোরা যখন হলি, এরপর আমার জোরই অন্যরকম হলো। তোদের দিকে বিন্দুমাত্র আঙুল ও কেউ তুললে আমি তার আঙুল ভেঙে দিতাম। শেষ বয়সে আমার শ্বাশুড়ি আমার কাছে ক্ষমা চেয়েছিলেন, মানুষটাকে আল্লাহ ভালো রাখুন।’
‘হুম। বাবা চলে যাওয়ার পরেও তুমি আমাদের দুই…’
দীক্ষা হঠাৎই চুপ হয়ে গেল। খালেদাও বুঝতে পারলেন নীরবতার কারণ। যতই মুখে বলুক, তৃণা তার সন্তান না কিন্তু ওর জন্য তো তার হৃদয় ও পুড়ে ছারখার! যতই দূরে সরিয়ে দিক, হৃদয়ের তো খুব কাছাকাছি তার অবস্থান। চাইলেই নাড়ির সম্পর্কে ছিন্ন করা যায় না। যত রাগ অভিমান থাকুক। খালেদা বুকের ভেতর কতবড় পাথর চাপিয়েছেন, তা সে কোনোদিন কাউকে বোঝাতে পারবে না।
খালেদা আঙুল চালাতে লাগলেন, ‘দুপুরে কি খাবি? একটু ভর্তা করে দেই?’
দীক্ষাও প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে ফেলল। আনমনে জবাব দিলো, ‘করো। ঝাল একটু বেশি করে।’
‘আচ্ছা।’
‘বকুল কোথায়?’
‘আছে কোথাও.. ঘরে তো নেই।’
‘সারাদিন পুকুর ঘাটে করে কি?’
‘বসে থাকে। ভালো লাগে নাকি ওর। নিরিবিলি জায়গা..’
‘হুম, গ্রামে থাকার এই এক মজা মা। খোলামেলা পরিবেশ, হাঁটার, বসার অফুরন্ত জায়গা পাওয়া যায়।’
‘আবার কুফল ও আছে। কাজের সময় গাড়ি পাওয়া যায় না। হাসপাতাল কত দূরে!’
দীক্ষা হাসল, ‘সবকিছুরই এপিঠ ওপিঠ আছে তো মা।’
‘তা আছে…আচ্ছা শোন না..’
‘বলো?’
খালেদা বেগম উশখুশ করছেন। বলবে কীভাবে, দীক্ষা আবার অন্য কিছু ভেবে বসে কিনা, কিন্তু না বলেও তো উপায় নেই… এখন না গেলে পরে আর যেতে পারবে জার্নি করে?
‘কি হলো মা, বলো?’ আবারও বলল দীক্ষা।
খালেদা বেগম ভাবনার সুতো ছিঁড়লেন, ‘আমি বলছিলাম কি, এই দুইটা মাস ঢাকায় থাকলে হতো না? হাসপাতাল কাছাকাছি, প্রয়োজন তো যখন তখনই পড়তে পারে..’
দীক্ষার চোখমুখ শক্ত হয়ে উঠল, ‘ঢাকায় কই থাকব মা? তুমি কি আমাকে আবার ওই বাড়িতে উঠ..’
‘না না, ওখানে কেন! ছিঃ আমি এটা বুঝাইনি। আমি বলতে চাচ্ছি, আলাদা একটা বাসা নিয়ে দুই মাস থাকা যায় না? তুই আর আমি- এখানে সামলানোর জন্য তো বকুল তো আছেই। ওই সময় নাহয় সবাই এলো। হাসপাতালের কাছাকাছি বাসা নিবো।’
এ কথা যে দীক্ষা ভাবেনি, তা না।
সেও ভেবেছে তবে ততটা গুরুত্ব দেয়নি। খালেদা বেগমের কথা শুনে নিজে আরও একবার নিজের ভাবনা গুলিকে ঝালাই করে নিলো। তাদের বাড়ি থেকে বড় হাসপাতাল যেতে সময় লাগে চল্লিশ মিনিটের মতোন তাও যদি মুহূর্তে গাড়ি ঘোড়া পাওয়া যায়। দীক্ষার ইচ্ছে, অপারেশনের ভেতর দিয়ে না যাওয়ার তবু আল্লাহর ইচ্ছে তো বলা যায় না। কি আছে কপালে…সব ভাবেই প্রস্তুতি নিয়ে রাখা উচিত। এসব নিয়ে ভাবার এখন কেউ নেই। হয়তো সব ঠিক থাকলে শিশিরই সব গুছিয়ে রাখত। কিন্তু নেই বলে যে হেলাফেলা করবে দীক্ষা, তা হয় না। একটা নতুন প্রাণকে পৃথিবীর আলো দেখানো কোনো ছেলেখেলা বিষয় না। সুতরাং দীক্ষাকেই তার জন্য বেস্টটা বেছে নিতে হবে।
মেয়েকে গভীর চিন্তায় ডুবে যেতে দেখে খালেদা বেগম হাতের মৃদু ধাক্কায় বললেন, ‘কি রে, কি ভাবিস? আমার কথা আবার অন্যভাবে নিস না।’
দীক্ষা সম্বিৎ ফিরে পেয়ে জবাব দিলো, ‘আরে না, আমি আবার অন্য কি ভাবব। তুমি বললে তো, আমি শুনলাম, দেখি, সময় আসুক.. আর আমি ভাবি। ঢাকায় একটা বাসা খুঁজে উঠাও তো কম হ্যাপা না।’
‘তা ঠিক আছে।’
‘ভাবছি মা। তুমি আপাতত এসব নিয়ে ভেবো না। বকুলকে পাঠাও তো আমার কাছে, দরকার আছে।’
‘আচ্ছা।’
খালেদা চলে যেতেই দীক্ষা উঠানের মাঝ বরাবর পাতা বড় মোড়াটার সামনে হেলান দিয়ে বসল। দু’পা ছড়িয়ে দিয়েছে সে। পিঠে মোড়ার শক্ত তক্তার পরশ, গায়ে সকালের মিঠে রোদ- সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত আরাম ধরেছে শরীরে। রোদের উষ্ণতা গা গরম করে তুলছে, আর দীক্ষার চোখের পাতায় টান পড়ছে হালকা। মনে হলো এই জায়গাটায় যদি একটা বালিশ দিতো কেউ! ভাবনাটুকু আনমনে মাথায় এল আর মিলিয়েও গেল।
পরনে তার হালকা নীল ম্যাক্সি, বুকের সামনে সাদা বড় ওড়না জড়ানো। খালেদা একটু আগেই যত্ন করে চুলগুলো মাঝবরাবর সিঁথি করে দিয়েছিল; চুলগুলো এখন খোলা, রোদে হালকা চকচক করছে। ফর্সা গোলগাল মুখে রোদের ছটা পড়ে যেন আরও কোমল, আরও মায়াবি লাগছে তাকে।
দীক্ষা চোখ বুজে রইল দীর্ঘক্ষণ। তার মাথার ভেতর চলতে লাগল একের পর এক ভাবন। জীবনের হাঁটা পথগুলো, হারিয়ে যাওয়া দিনগুলো, আর অজানা ভবিষ্যতের ফাঁকা রাস্তাগুলো… কত ছবি, কত প্রশ্ন, কত স্মৃতি! রেলগাড়ির একটানা চলমান চেইনের মতো থামতেই চায় না এসব ভাবনা। শেষমেশ যেন হাঁপ ধরে আসে তার।
ঠিক তখনই বন্ধ চোখের অন্ধকারে শিশিরের মুখ ভেসে ওঠে। অস্বস্তি লাগে। দীক্ষা চমকে চোখ মেলে।
আর চোখ মেলামাত্রই, সে ধড়মড়িয়ে সোজা হয়ে বসে যায়। হৃদপিণ্ড যেন হুড়মুড়িয়ে বুকের ভেতর থেকে বাইরে লাফ দিতে চাইছে। তার সামনে, কিছু দূরে দাঁড়িয়ে এক অচেনা মেয়ে তাকিয়ে আছে স্থির, গভীর, অদ্ভুত দৃষ্টিতে।
দীক্ষার বিস্ময় দেখে আগন্তুকটিও চমকে ওঠে। তারপর দ্রুতই নিজেকে সামলে নিয়ে নরম গলায় বলে, ‘ভয় পাবেন না। আমি নয়ন… নয়নতারা।’
দীক্ষার ভ্রু কুঁচকে একত্র হয়ে আসে।
এই মেয়ে কে?
এখানে এল কখন?
আর তার দিকে এভাবে চুপচাপ দাঁড়িয়ে তাকিয়ে ছিল কেন?
দীক্ষার মনে প্রশ্নের পর প্রশ্ন জমতে থাকে।
সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে চৌধুরী বাড়ির বিশাল জানালাগুলো দিয়ে ফ্যাকাশে, ঠান্ডা, নির্দয় আলো ঢুকে পড়ে। ঠিক তেমন করেই তৃণার ভেতরের মনটাও আজ ফ্যাকাশে। সারারাত ঠিকমতো ঘুম হয়নি তার। হাতে কালচে দাঁতের দাগ, ত্বকে হালকা জল পড়ে থাকা ব্যথা। গালে এখনো টের পাওয়া যায় আয়ানের থুতুর পরশ।
তবুও সকাল মানেই দায়িত্ব। সকাল মানেই কর্তব্য।সকাল মানেই নতুন যুদ্ধ।
তৃণা ধীরে ধীরে ডাইনিং রুমের দিকে এগিয়ে গেল। ঘরটা এখনও একদম একই রকম- নীরব অথচ বিলাসিতা-ঢাকা শূন্যতা। যেন মানুষ না, শুধু অহংকার আর জৌলুসের প্রতিধ্বনি ভাসছে চারদিকে।
আরহাম,আয়ান দু’জনেই তাদের ঘরে। অঞ্জলির মা বলেছেন, দশটা বাজলেই তাদের কিছু খাইয়ে দিতে। আরহাম নিজে থেকে খেয়ে নিলেও আয়ান খেতে চায় না৷ তাকে মুখে তুলে খাইয়ে দিতে হয়। সব শুনে তৃণা একটা রুদ্ধশ্বাস ফেলল। এসবের চেয়ে বুঝি শিশিরের সঙ্গে যুদ্ধ করাটাও ভালো ছিল। কি এক যন্ত্রণার পাল্লায় পড়েছে.. ওহ গড! তৃণা বিড়বিড় করে দোয়া দুরুদ পড়তে পড়তে ওদের বেডরুমের দিকে পা বাড়ালো। সেই সঙ্গে একটু সাহস রাখল, যেহেতু অরুণিমাভ নিজেই ওদের শাসনের দায়িত্ব তার হাতে তুলে দিয়ে গেছেন!
দু ভাই জেগে, দু’জনের হাতেই ফোন, তা থেকে গোলাগুলির বিকট শব্দ আসছে। গেম খেলছে। আজ তাদের চেহারায় আলাদা উজ্জ্বলতা। মুখে কৌতুকের হাসি। চোখে তৃণাকে ছোট করার রোমাঞ্চ।
তৃণা ঢুকতে ঢুকতেই বুঝতে পারল, আজ আবার ঝড় আসছে।
সে ধীরে বলল, ‘বাবুরা, ব্রেকফাস্ট রেডি। টেবিলে এসে বসো।’
আরহাম ঘাড় গুঁজেই গম্ভীর গলায় বলল, ‘We know when to eat. তোমার বলার দরকার নেই।’
আয়ান পায়ের ওপর পা তুলে বসে কাটকাট করে বলে, ‘She thinks she is our stepmom now!’
তৃণা গলায় শক্তি এনে শান্ত স্বরে বলল, ‘আমি মা নই, ঠিকই। কিন্তু তোমাদের শাসন করার দায়িত্ব আমায় দেওয়া হয়েছে। তোমাদের পাপাই আমাকে বলেছেন তোমাদের রুটিন ঠিক রাখতে।’
দু’ভাই একসঙ্গে এমনভাবে হেসে উঠল যেন কেউ একটা বোকা কৌতুক শুনিয়েছে।
আরহাম তৃণার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘পাপা? পাপা নাকি তোমাকে বলেছে আমাদের শাসন করতে? We don’t believe that.’
আয়ন এবার আরও চোখ সরু করে বলল, ‘পাপা তো আমাদের শাসনই করে না। আর তোমার মতো কাউকে কি পাপা বলবে আমাদের রুলস শেখাতে? তুমি তো… তুমি তো মাথাই নষ্ট করে ফেলেছ!’
তৃণা মুখ শক্ত করল। গতকালের থাপ্পড় আর কামড়ের পর আজও তাদের একই আচরণ, তার ধৈর্য ভেঙে পড়তে চাইছে।
সে পূর্বের ন্যায় ধীর গলায় জবাব দিলো, ‘কাল যা হয়েছে সেটা খুব ভুল হয়েছে। আমি তোমাদের মার-ধর করব না। কিন্তু শাসন করব। তোমরা যেভাবে ইচ্ছে আচরণ করতে পারবে না। এই বাড়ির নিয়ম আছে।’
আরহাম ভ্রু নাচাল এই শুনে, ‘Rules? তুমি? You follow our rules. না হলে টিকে থাকতে পারবে না।’
তৃণা এবার কড়া গলায় বলল, ‘টিকে থাকার কথা আমাকে ভাবতে হবে না। তোমাদের আচরণ ঠিক না হলে সবাই জানবে, তোমাদের পাপাকেও বলতে হবে।’
আয়ন ঠোঁট উল্টে বলল, ‘You are blackmailing us?!!’
তৃণা কঠোরভাবে তাকিয়ে রইল।
‘না। আমি আমার দায়িত্ব পালন করছি।’
এই যেন কথাটা দু’ভাইকে আরও ক্ষেপিয়ে দিল।
আরহাম সামনে এগিয়ে এসে তৃণার একদম মুখোমুখি দাঁড়াল। তার চোখে বয়সের চেয়ে বেশি অহংকার।
‘Listen, তুমি একটা caretaker। আমাদের ওপর তোমার কোনো রাইট নেই। So stop acting like you own this house.’
তৃণার গলা শুকিয়ে গেল। কিন্তু সে পিছিয়ে গেল না।
‘এই বাড়ির কেউ না হলেও আমাকে বলা হয়েছে তোমাদের ব্রেকফাস্ট, পড়াশোনা, সবকিছুর রুটিন ঠিক রাখতে। তোমরা যদি আমার কথা মতো না চলো…’
‘তাহলে কি করবে?’
আয়ন তৃণার কথা কেটে দিয়ে বলল, ‘Again slap us?’
তৃণার মুখ শক্ত হয়ে গেল, ‘আর কখনো তোমাদের গায়ে হাত তুলব না। কিন্তু তোমাদের অন্যায়, অভদ্রতায় চুপ করে থাকব না। আমি অন্যায় সহ্য করতে পারি না, বুঝেছ? তোমাদের আচরণ ঠিক না হলে তোমাদের পাপাকে বলব। তিনি বলবেন কী শাস্তি তোমাদের প্রাপ্য।’
‘Papa believes us, not you! তোমাকে বিশ্বাস করবে কেন? তুমি একটা পালিয়ে আসা মেয়ে, কোথা না কোথা থেকে পালিয়ে এসে আমার পাপার ঘাড়ে উঠেছ! by the way, তুমি চোর টোর ছিলে না তো? চেহারায় তো চোর চোর ভাব…’
তৃণার মাথার উপর বাঁজ পড়ল যেন।
এত বিচ্ছিরি ভাষায় তার সঙ্গে এই পুচকেরা কথা বলছে অথচ সে কিছুই করতে পারছে না, কোনো প্রত্যুত্তর না, কোনো জবাব না… এতই খারাপ দিন এলো তোর তৃণা?
মনে মনে ফুঁসে ওঠে সে।
‘স্টপ ইট!! আজকে আসুক তোমাদের পাপা, আমি সব বলব। তোমরা যে কি পরিমাণ বেয়াদব এবং অসভ্য, সেটা সেও জানুক…’
‘Go and say whatever you want bitch..’ বলল আয়ান, ‘আমরা তোমাকে ভয় পাই না। এটা আমাদের ঘর, তোমার না, এন্ড তুমি আমাদের মা ও নও! ওকে?’
ঠোঁটে একচিলতে হাসি ফুটে উঠল তৃণার, ‘ওহ আচ্ছা, এই জোর খাটাচ্ছো, এই জোরে এত অহংকার!
যদি তোমার মা হয়ে যাই, তখন? তখন তো এই ঘর আমারও হবে তাই না? ঠিক আছে… দেখা যাক।’
বেরিয়ে পড়ল তৃণা। রেখে গেল দু ভাইয়ের হতভম্ব মুখ। দু’জনে একে অপরের দিকে চাওয়া চাওয়ি করছে। এই রাস্তার মেয়ে তাদের থ্রেট করে গেল? How dare she!
ফন্দি আঁটতে লাগল তৃণা।
অরুণিমাভ চৌধুরী বয়স্ক সেটা ঠিক। কিন্তু তার হাতে অগাধ সম্পত্তি, প্রভাব, সম্মান আর মানুষটাকে দেখতেও মোটেই খারাপ লাগে না। তৃণার মাথায় হিসেবটা সহজ; এ রকম একটা বাড়িতে জায়গা যদি পাকা করা যায়, তবে জীবনের বাকিটা নিয়ে তাকে আর ভাবতেই হবে না।
রাস্তায় নামলে নিজের ভরসা নিজেকেই হতে হয়- তৃণা সেটা খুব ভালো জানে। তাই নিজের ভবিষ্যৎটাকে আঁকড়ে ধরতে হলে তাকে যেভাবেই হোক পথ খুঁজে নিতে হবে। আজকাল বয়স কোনো বাধাই নয়। না প্রেমে, না সম্পর্কে। তৃণা ভাবে, অরুণিমাভ চৌধুরীকে যদি নিজের মায়া, যত্ন আর প্রেমের জালে আস্তে আস্তে জড়িয়ে ফেলা যায়… তবেই কেল্লাফতে। সেই সঙ্গে ওই বান্দরের কটাক্ষগুলোরও জবাব দিতে পারবে সে- গায়ে হাত না তুলেই, ক্ষমতার জোরে, অবস্থানের দাপটে।
এই ভাবনাতেই শিরশির করে ওঠে তৃণার শরীর। এখন তার অপেক্ষা শুধু একটাই, কখন ফিরবেন অরুণিমাভ চৌধুরী।
আজ থেকেই তার কাজ শুরু। শুধু দুই ছেলেকেই নয়, মানুষটাকেও তার সামলাতে হবে, যত্ন নিতে হবে, খুশি রাখতে হবে। কারণ সে জানে, মন জিততে পারলে, একদিন… মানুষটাকেও পাওয়া যাবে।
সেই উত্তেজনার আগুনে তৃণা যখন ভিতরে ভিতরে মুগ্ধতার ঘৃতাহুতি দিচ্ছে, ঠিক তখনই এক মুঠো বরফ-ঠান্ডা পানি ঢেলে দিলেন অরুণিমাভ চৌধুরী নিজ হাতে।
রাতের মধ্যেই তিনি বাড়িতে ঢুকলেন তবে সঙ্গে দীক্ষাকে নিয়ে! দীক্ষার গায়ে রাজকীয় শাড়ি, হাতে ছোট্ট পার্স, মুখে হালকা হাসি… নায়িকাদের জন্য যে স্লো-মোশন এন্ট্রি হয় – একদম সেইরকম!
তৃণা নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে এমন ব্যাক্কল হয়ে গেল, মনে হলো দুই কান দিয়ে হাওয়া ঢুকছে আর বের হচ্ছে। আর দীক্ষা? দীক্ষা তার দিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না। একদম টপ-ক্লাস অবজ্ঞা!
যেন তৃণা কোনো মানুষ না, ভ্যাকুয়াম ক্লিনারের স্ট্যান্ডবাই বোতাম।
চলল রাজকীয় ভাবেই ওয়েলকামিং গ্রিট। অভ্যর্থনা শেষ হতেই অরুণিমাভ গম্ভীর গলায় বললেন, ‘আজ থেকে তুমি ম্যাডামের সেবা করবে, বুঝেছ? ম্যাডামের যা প্রয়োজন… সব নিজের হাতে করবে। সামান্যতম অযত্ন হলে… জবাব চাইবো। মনে থাকে যেন।’
তৃণা ভিতরে ভিতরে ‘হাঁ?? ম্যাডাম?? আবার সেবা?? আমি??’ আওড়ে চলেছে উদ্ভ্রান্তের মতো অথচ মুখ দিয়ে কিছুই বের হলো না।
এরপর তিনি দীক্ষার দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বললেন, ‘তোমার তো পা ব্যথা করছে। গাড়িতেই বারবার বলছিলে। যাও, তোমার ঘরে গিয়ে বিশ্রাম করো। ও (তৃণাকে দেখিয়ে) গরম তেলে মালিশ করে দেবে। ঠিক আছে?’
দীক্ষা মাথা নেড়ে রাজকীয় ভঙ্গিতে চলে গেল।
তৃণা তাকিয়ে রইল, চোখ বড়ো, মুখ ফাঁক, আক্ষেপে কান ঝাঁঝরা!
সোনাডিঙি নৌকো পর্ব ২৩
তৃণার মনে হলো, এটা কি স্বপ্ন? নাকি কেউ আমার কান ধরে সাইলেন্ট গিয়ারে চড় মেরে দিল? ভেতরে সব ঝিনঝিন করছে কেন? মাথা ঘোরাচ্ছে কেন? আশপাশ কই? ধরার জায়গা..পড়লাম…পড়লাম.. বলতে বলতেই তৃণা সরাসরি চিৎপটাং হয়ে ফ্লোরে পড়ে গেল। অবস্থা দেখে মনে হলো তার শরীরে আত্মা ঢোকা-বেরোনো নিয়ে এখনই মিটিং শুরু হবে। হতভম্ব অরুণিমাভ শুধু বললেন, ‘এই মেয়ে আবার তার একটিং শুরু করল!’
