স্নিগ্ধবিষ পর্ব ২৩+২৪
সানজিদা আক্তার মুন্নী
সময়ের চাকা ঘুরে কেটে গেছে চারটি দিন। পারিপার্শ্বিক সবকিছুই থমকে আছে আগের মতো, কেবল তৌসির ডুবে আছে তার ‘সবুজ বাঘিনী’র সেবা-শুশ্রূষায়।
ঘড়ির কাঁটা এখন মধ্যগগনে, বেলা বারোটা। তৌসির আর নাজহা এক গভীর উভয়সংকটে পড়েছে। বিষয় নাজহার গোসল। বিগত চার দিন জলের স্পর্শ পায়নি নাজহার শরীরটা, শুধু ভেজা তোয়ালে দিয়ে মুছেই দিন পার হয়েছে। কিন্তু শরীরের কোণে জমে থাকা অসুস্থতার আঁশটে গন্ধটা এখন অসহনীয় অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তৌসিরও জেদ ধরেছে, আজ গোসল করাতেই হবে।
কিন্তু দুশ্চিন্তার ভাঁজ কপালে, গোসলের সময় অপারেশনের ক্ষতে জেনো এক ফোঁটা পানিও না লাগে। নাজহার শরীরটাও বড্ড নাজুক। অপারেশনের ধকল তো আছেই, তার ওপর জ্বরের উত্তাপে শরীরটা পুড়ে যাচ্ছে। তৌসির অত্যন্ত সন্তর্পণে নাজহাকে পাঁজাকোলা করে ওয়াশরুমে নিয়ে আসে সেখানে রাখা টুলের ওপর বসিয়ে দেয় খুব সাবধানে।
সালোয়ার-কামিজের বালাই এখন নেই, অপারেশনের সুবিধার্থে নাজহার পরনে এখন টি-শার্ট। নিজের কোনো টি-শার্ট নেই তার যা আছে তার জার্সি আর্জেন্টাইন আর বার্সেলোনার জার্সিগুলোই হয়ে উঠেছে তার সঙ্গী। ঢিলেঢালা জার্সিতে জরাজীর্ণ শরীরটা আরও ক্ষুদ্র দেখায়। টুলের ওপর নাজহাকে বসিয়ে তৌসির পরম মমতায় তার দুই কাঁধে হাত রেখে জিজ্ঞেস করে, “একলা গোসল করতে পারবা, না আমি করিয়ে দিতাম?”
নাজহা দাঁতে দাঁত চেপে বসে। ঠিক হয় দাঁতে দাঁত চেপে ধরার কারণ ব্যথা হচ্ছে, বসায় চামড়ায় ভাঁজ পড়েছে তাই। নাজহা তৌসিরের পেটের দিকের গেঞ্জির একাংশ খাবলে ধরে জোরে জোরে শ্বাস ছেড়ে বলে, “আমি গোসল করব না, আমাকে রুমে নিয়ে চলুন। ব্যথা করতেছে।”
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
তৌসির নাজহার এমন কথায় বিরক্তি প্রকাশ করে, “এই আছুদা মার্কা কথাবার্তা কইস না তো। লগে গন্ধ করবে, দুই মগ অন্তত শরীরে ঢাল।” নাজহা গালি খেয়ে চোখ বুঁজে মাথা নাড়িয়ে ব্যথাযুক্ত গলায় শুধোয়, “না, না, না, আমি পারব না। সম্ভব না। আপনি যেভাবে পারুন করিয়ে দিন, আমি পারব না।” যন্ত্রণার ঢেউ নাজহাকে মুহূর্তে নিঃস্ব বল করে দেয়। সে তপ্ত নিশ্বাস ফেলতে ফেলতে মাথাটা একটু কাত করে তৌসিরের পেটে ঠেকিয়ে দেয়, কিছুটা স্বস্তি পাওয়ার জন্য।
“আপনি যেভাবে পারুন করিয়ে দিন, আমি পারব না কথাটি শুনে তৌসিরের অভিব্যক্তি নিঃশব্দ বিস্ময়ে জমে যায়। ঠোঁট ফাঁক হয়ে যায় অবাক বিস্ময়ে। তৌসির নাজহাকে কিভাবে এখন গোসল করিয়ে দেবে? হাত-পা কাঁপতে থাকে তৌসিরের। সে হাত বাড়িয়ে নাজহার চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে ম্লান স্বরে বলে, “আমি কি তোমার কিছু দেখছি কও তো? তোমার লগে তো আমার তেমন সম্পর্ক নাই। এই হঠাৎ কেমনে তোমারে আমি গোসল করামু? ব্যান্ডেজের ভেতর পানি যাইব না, তাই কষ্টমষ্ট করে গোসলটা করে সালোয়ারটা পইড়া নাও। আমি গেঞ্জি পরিয়ে দিমু নে। আমি গতর যতটুকু পারি ঘষে দেই?”
নাজহা তৌসিরের পেট থেকে মাথা সরিয়ে তৌসিরের মুখপানে শুষ্ক চোখে তাকায়। তৌসির চাইলেই পারে নাজহার এই কথার সুযোগ নিতে, কিন্তু তা সে করতেছে না। কিছু পুরুষ এমনও হয়, যাদের কাছে নিজের সত্তার মূল্য অনেক যেমনটা তৌসির। নাজহা আর জেদ ধরে না। আলতো মাথা নাড়িয়ে উত্তর দেয়, “আচ্ছা!”
তৌসির নাজহার থেকে অনুমতি নিয়ে ফেস টাওয়ালে সাবান লাগায়। ধীরে ধীরে নাজহার দুই হাত কনুই পর্যন্ত, দুই পা হাঁটুর নিচ পর্যন্ত ঘষে দেয়। ঠান্ডার দংশনে নাজহা চোখ-মুখ কুঁচকে ওঠে। “উফ কী ঠান্ডা!” বলতে বলতেই চোখ-মুখ সঙ্কুচিত করে ফেলে। তৌসির নাজহার কথায় ওর মুখের দিকে তাকায়। রক্তিম অধরে জড়োয় কম্পন ধরে গেছে ঠান্ডায়। তৌসির চোখ ফিরিয়ে নিয়ে নাজহার ঘাড়-গলা মুছে দিয়ে লুঙ্গির কোণ গুটিয়ে নিতে নিতে নাজহার সামনে হাঁটু গেড়ে বসতে বসতে বলে, “ঠান্ডার দিন ঠান্ডা তো লাগবেই। এমনে ন্যাকামির কী আছে?”
নাজহা ‘ন্যাকামি’র কথা শুনে ফুঁসে ওঠে বলে, “ন্যাকামি কী? ঠান্ডা লাগতেছে তাই ঠান্ডা বলছি। এখন আমার ঠান্ডা লাগলে আমি ‘গরম লাগতেছে’ বলব নাকি?”
তৌসির সালোয়ারের মুড়ি যতটুকু ওঠে, ততটুকু উপরে তুলে নাজহার পা-টা নিজের হাঁটুর ওপর নিয়ে ভালো করে ঘষে ঘষে দিতে দিতে বলে, “তুমি এমনে ফ্যাতফ্যাতি কর ক্যান? ভালো কথাই তো কইলাম।”
“আপনি আমায় ন্যাকা কেন বললেন? কোন সাহসে এত বড় তকমা আমায় দিলেন?”
তৌসির দীর্ঘ শ্বাসের সাথে বলে, “আচ্ছা, আমার ভুল। আমি ‘গাদ্দার’ বলতে গিয়ে ‘ন্যাকা’ বলছি। আমি ভেরি দুঃখিত, মাফ করুন আমাকে।”
নাজহা নিশ্চুপ হয়ে যায়, আর কোনো উত্তর দেয় না। তৌসির নাজহার পাগুলো ভালো করে ঘষে দিয়ে উঠে দাঁড়ায়। নাজহার হাতে টাওয়ালটা দিয়ে বলে, “আমি যাই। তুমি গোসল করে নাও।”
নাজহা টাওয়ালটা হাতে নিয়ে তৌসিরের দিকে মুখ তুলে চেয়ে বোকার মতো জবাব দেয়, “আপনি এখানে থাকুন, যাবেন কেন?”
তৌসিরের মেজাজ তুঙ্গে উঠে যায় এই কথায়। সে তীক্ষ্ণ স্বরে বলে, “ধুর বদমাশনি! তুই গোসল করবি আর আমি এখানে থেকে কি করমু? উত্তেজিত সিনারি দেখমু নাকী?”
নাজহা তৌসিরের কথায় লজ্জা অনুভব করে, কারণ সে সেভাবে ভেবে বলেনি, মুখে এসেছে বলে দিয়েছে। নাজহা আমতা-আমতা করে বলে, “থাক, আপনি যান।”
তৌসির আর কোনো বাক্য ব্যয় না করে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসে। দরজা আগলিয়ে দেয়, কিন্তু লক করে না। নাজহা তৌসিরের যাওয়ার পানে কিছুক্ষণ চেয়ে বসে থাকে। ভেবে পায় না, নাজহার সাথে কিভাবে তৌসির এত নরমাল ব্যবহার করছে। আজ এই চার দিনে তৌসির ছোট্ট বাচ্চার মতো নাজহাকে আগলে রেখেছে। সময়মতো খাওয়ানো, ওষুধ দেওয়া, চুল আঁচড়ে দেওয়া। নাজহার পায়ে মালিশ করে দেওয়া ইনজেকশন দেওয়া হয়েছিল, তার প্রভাবে পায়ের রগগুলো ফাত-ফাতি করে। নাজহা যতবার বলেছে পায়ে ব্যথা করতেছে, ঝিনঝিন করতেছে, ততবারই তৌসির বিনা দ্বিধায় ওর পায়ে মালিশ করে দিয়েছে। নাজহা এই লোককে ঠকাতে পারবে না। না, সম্ভব নয় তার পক্ষে তা। নাজহা সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছে সুস্থ হলেই এই মিথ্যার জাল সে স্পষ্ট করবে। তৌসির খারাপ হলেও আজ অবধি নাজহার প্রতি এক চুল পরিমাণ কোনো খারাপি সে করেনি। বিশ্বাসঘাতক জেনেও কলিজায় বেঁধে নিয়েছে। নাজহা এক লম্বা শ্বাস ফেলে নিজেকে সামলে নিয়ে গোসল করতে মন দেয়।
তৌসির বাইরে আসতেই নুহমানের ফোন আসে তার কাছে। নুহমানকে সে পাঠিয়েছে করিমগঞ্জ। সেখানে কিছু লোকাল পাণ্ডা আছে, যারা নিজেকে ‘গ্যাংস্টার’ দাবি করে। তারা তৌসিরদের কিছু ড্রাগের সাপ্লাই বন্ধ করে দিয়েছে। নুহমান আর মিনহাজ মামা গেছেন সেটা মেটাতে। কিন্তু এখন নুহমান ফোন করে বলতেছে, “ভাইসাব, এ নটির পোলারা তো মানতাছে না। মাদা*চুত গুলা লাফাইতাছে।”
তৌসিরের কপালের রগ ফুলে ওঠে। তেলাপোকার ভাব যখন হাতির সমান দেখতে হয়, তখন আর কী-ই বা হবে! রাগ উঠবেই, স্বাভাবিক। তৌসির দাঁত চেপে বলে, “সাউয়া মাউয়া টাইন্যা ছিঁড়িয়া নে খান**কির পোলাগো।”
“মিনহাজ মামা তো কিছু করতে দিতাছে না!”
“দেখ, তোরা যে বাল ছোঁড়ার ছোঁড়, কিন্তু মাল আমার যেন আস্ত পাই। মামারে ক, চাপাতি দিয়া গলায় টান দিতে দু-একটার। দেখবি, বাকিগুলোও সোজা হইয়া যাইব।”
“আচ্ছা, দেখতেছি” বলে।
“আচ্ছা, রাখ।”
ফোন কেটে দেয় তৌসির। ফোন কেটে ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়ায়। নাজহাকে নিয়ে আসবে বলে, কিন্তু দেখে নাজহা ধীর পায়ে বেরিয়ে এসেছে। গায়ে একটা বার্সেলোনার জার্সি আর কালো সালোয়ার পরা। চুলগুলো কোনোমতে টাওয়াল পেঁচানো।
তৌসির তাড়াতাড়ি নাজহার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। নাজহা ওকে দেখে হিসহিসিয়ে বলে, “আমি যেতে পারব।”
তৌসির এ কথায় পাত্তা না দিয়ে সাবধানে নাজহাকে নিজের বাহুবন্ধনে তুলে নেয়। তার কোলে নাজহার নিস্তেজ দেহটা ধীরেসুস্থে ভর করে রয়। নাজহা আর নড়ে না, চুপচাপ করে তৌসিরের বক্ষের মাঝে মাথা হেলিয়ে দিয়ে নাক টেনে তৌসিরের শরীরের সেই পুরুষালি ঘ্রাণ এই ঘ্রাণ নাজহার অত্যন্ত প্রিয়। এই ঘ্রাণের প্রতি সে অগাধভাবে আকৃষ্ট, যা অন্তরঙ্গ নয়, কিন্তু অন্তর-ঘনিষ্ঠ।
তৌসির নাজহাকে বিছানায় এনে বসায়। বসিয়ে নাজহার চুলগুলো আলতোভাবে টাওয়ালের ভাঁজে নিয়ে মুছে দিতে থাকে। নাজহা তৌসিরকে ফিসফিসিয়ে বলে, “তৌসির, আমায় কিছুদিনের জন্য বাড়িতে যেতে দিন। আপনি কেন অকারণে এত কষ্ট করবেন আমার জন্য? আর কেনইবা এত যত্ন?”
তৌসির চিরুনি নিয়ে নাজহার ভেজা চুলের ফাঁকে চালিয়ে দিতে দিতে বলে, “বউ কার তুমি? আমারই তো। বউ যখন আমার, কষ্ট আমিই করি। তোমারে বাড়ি পাঠাই, আর তুমি সেইখান থাইকা নতুন প্ল্যান নিয়ে এসে গাদ্দারি করো।”
‘গাদ্দারির’ কথাটা শুনে কলিজা খচ করে ওঠে নাজহার। সে নিরলসভাবে বলে, “যখন জানেনই গাদ্দার, তাহলে কেন এত আদিক্ষেতা? কী হবে এসব করে? আমি তো গাদ্দার, আমি তো খারাপ। এই খারাপের সঙ্গে সংসার করে ধ্বংস ব্যতীত কিছুই পাবেন না। তালাক দিয়ে দিন আমায়।”
‘তালাক?’ তালাকের কথাটা শুনে তৌসিরের ভেতর তোলপাড় শুরু হয়ে যায়। এত কিছু ঘটার পরও তৌসিরের একবারের জন্যও মনে হয়নি ওকে তালাক দিতে হবে অথচ নাজহা নিজেই এই বাণী বকতেছে? কী আশ্চর্য! কী নির্দয় এক বাণী। তৌসির শান্ত গলায় উচ্চারণ করে, “ও আমার রূপসী নাগিন! তালাক আবার কী? আমি জানি তুই আস্ত একটা কালনাগিন। ছোবল তুই আমায় কথায় কথায়-ই মারবি, তবে আমি তোর থেকে ছোবল খেতেও রাজি।”
নাজহা এমন উক্তি শুনে আর কিছু বলে না, চুপ হয়ে যায়। তৌসির ওর চুল আঁচড়ে দেওয়া শেষ হলে বলে, “বিছানায় দু’পা তুলে বসো।”
নাজহা তৌসিরের কথামতো পা তুলে বিছানায় বসে। এখন কী জন্য তুলব জিজ্ঞেস করলে আবারও বাজে কিছু শুনতে হবে। তৌসির ওয়ারড্রোবের ওপর থেকে জারা তেল নিয়ে নাজহার দু’পা মালিশ করে দিতে থাকে। নাজহা শুধু আবিষ্ট চোখে তৌসিরের দিকে চেয়ে থাকে। এই মানুষটাকে কী করে সে ঠকাবে? নাহ, সম্ভব নয় তার পক্ষে এটা, আর সম্ভব নয়।
তৌসির নাজহার পায়ের আঙুলগুলো টেনে দিতে দিতে বলে, “আরাম লাগছে?”
নাজহা কোনো উত্তর দেয় না। সে মাথা নিচু করে বসে থাকে। তৌসির নাজহাকে চুপ থাকতে দেখে হালকা ধমকে ওঠে, “কী হইলো? কথা কও না ক্যান?”
নাজহা এমন ধমক খাবে আশা করেনি। সারা শরীর আলতো ঝাঁকি দিয়ে ওঠে নাজহার এই ধমকের তীব্রতায়। নাজহা তৌসিরের মুখপানে চেয়ে দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে বলে, “হয়েছে, পা থেকে হাত সরিয়ে নিন।”
তৌসির নাজহার কথায় সত্যি সত্যি হাত সরিয়ে নিয়ে উঠে দাঁড়ায় আর বলে, “আমি গিয়ে খাবার নিয়া আসি। তুমি বসো।”
নাজহা বাঁধা দেয়, “না, আনবেন না। আমি নিজে গিয়ে খাব।”
তৌসির এ কথা শুনে বিরক্ত হয়। হাঁটতে পারতেছে না ঠিকমতো, সে নাকি নিচে গিয়ে খেয়ে আসবে! তৌসির গলার আওয়াজ শক্ত করে বলে, “নাটক মারাস তুই আমার লগে? পা মাটিতে ফেলার শক্তি নাই তোর, আর নিচে যাবি বলতাছোস?”
তৌসিরের কথায় নাজহাও কঠোর গলায় শুধোয়, “তো কী করব? আপনি আমার যত্ন কেন নিবেন, কী জন্য নিবেন? আপনার বিবিজান রাতে একবার আর সকালে একবার এসে খোঁচান। একটু আগেও এসে বলে গেছেন, ‘আমি নাকি আপনায় কালো জাদু করেছি। তাই আপনি আমার প্রতি এত আসক্ত।’ আমি মানলাম আমি বেঈমান, আমি খারাপ। তাই বলে এভাবে বলবেন? যে জাদুটোনা করে, সে মুসলিম নয়। আমাকে আমার ধর্ম থেকেই কথা দ্বারা বের করে দিবেন?”
তৌসির নাজহার করা অভিযোগগুলো শুনে মনে মনে ভাবে, “বুড়ি নাগিন সুযোগ পাইলেই আমার নাগিনের পিছনে পড়ে যায়, আর আমার নাগিন আমারে ছোবল দেয়।”
তৌসিরেরও খারাপ লাগে কথাটা। তারপরও সে বলে, “তুই যে কাম করছস, ঐটা পুরোটা বিবিজান জানলে এতক্ষণ কবর দিয়া দিত তোরে। তালুকদারের মাইয়া, শুকরিয়া আদায় কর তেমন কিছু হয়নি।”
নাজহা রাগী চোখে তৌসিরের দিকে তাকিয়ে ক্রুদ্ধ গলায় বলে, “তাহলে জানিয়ে দিন। বললাম তো, মরণে আমার দ্বিধা নাই। আমি মরে যেতে চাই, মেরে ফেলুন। সব দোষ তো আমার! আপনি নিজের বিবিজানের দোষ দেখেন? বা দেখেছিলেন পূর্বে?”
তৌসির নাজহার দিকে কঠোর দৃষ্টিতে তাকায়। বড্ড সাহস হয়ে গেছে নাজহার! যে বিবিজানের সম্পর্কে এমন ধারণাই তৌসির রাখে না, সেসব কথা নাজহাকে তাকে নিয়ে বলতেছে। তৌসির ঝাঁঝালো কণ্ঠে বলে, “না, দেখিনি। আর আমার বিবিজানের লগে নিজের তুলনা দিস না। উনার পায়ের ধুলোর সমানও তুই না। খাবার আমি সিমরানরে দিয়া পাঠামু। চুপচাপ খেয়ে ঔষধ খেয়ে নিবি। আমার বাইরে যাইতে হইবো।”
এ বলে তৌসির লুঙ্গির দুই কোণ হাতে তুলে নিয়ে কোমরে গুঁঁজতে গুঁঁজতে রুমের বাইরে চলে যায়। নাজহা নিশ্চুপ বসে থেকে ঠিক করে সে খাবে না। কেন তার ভেতর থেকে এমন নীরব বিদ্রোহ আসছে, সেই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর সে নিজেও খুঁজে পাচ্ছে না।আসল সত্যটা হলো, তৌসিরের সদ্য করা ব্যবহার নাজহার মনঃপূত হয়নি। নাজহা যে খারাপ, সেই সত্য সে নিজের কাছেও স্বীকার করে তবুও তৌসির কেন এমন রূঢ় আচরণ করলো?
যদিও তৌসিরের কাছ থেকে এই ধরনের কঠোরতা একরকম প্রত্যাশিত ছিল, তবুও কেন যেনো আজকের আচরণটা নাজহার পক্ষে মেনে নেওয়া কঠিন হলো। সম্ভবত তৌসির তাকে বড্ড বেশি আহ্লাদ আর যত্নে রেখেছে। ভালোবাসার এই উষ্ণ আস্তরণ ভেদ করে আসা এই তিক্ততা নাজহার পক্ষে হজম করা আর সম্ভব হলো না। তার মনের মধ্যে কেবলই এক অবুঝ অভিমান জেঁকে বসল।
তৌসির কুঠিরে এসেছে রুদ্র আর নাযেম চাচা কে নিয়ে পার্টি অফিসে যাবে বলে। কিন্তু এসে দেখে কেরামত আর নাযেম চাচা উড়াধুড়া নাচতেছে আর রুদ্র বসে বসে তাদের উৎসাহ দিচ্ছে। এই নাচের কারণ কি? শেখ হাসিনার ফাঁসির রায়। স্পিকারে টাশ টাশ করে বাজতেছে।
রায় দেখেছে দেশের মানুষ,
খুশি আজ আমর।
বঙ্গকন্যার ফাঁসিতে,
মিছিলও দেও তোমরা।
রায় দেখেছে দেশের মানুষ
খুশি আজ আমরা।
জুলাই হত্যা বিডিয়ার
শাপলা হলো ম্যাছছাকার।
ডাইনি খুনি পালাইছে।
জুলাই যুদ্ধার হলো জয়।
ফাঁসি চাই (শেখ হাসিনা)
ফাঁসি চাই ( শেখ হাসিনা)
ফাঁসি চাই (শেখ হাসিনা)
ফাঁসি চাই (শেখ হাসিনা)
জয় বাংলা , ফাঁসি এবার সামলা
জয় বাংলা শেখ হাসিনার মামলা
জয় বাংলা, ফাঁসি এবার সামলা
জয় বাংলা শেখ হাসিনার মামলা
তৌসিরের মন চাইতেছে এই গান শুনে একটা ডান্স দিতে কিন্তু তারপরও সে এদের এসব পাগলামি তে মত না দিয়ে রুদ্রের পাশে এসে বসতে বসতে রুদ্র কে বলে, “মাঙ্গের নাতি রুদ্র, নুহমান রে কল লাগা।”
নাযেম চাচা আর কেরামত নাচ থামিয়ে তাদের অপজিট সোফায় বসতে বসতে বলেন, “ভাতিজা, আপার রায় তো হইয়া গেছে।”
তৌসির মুচকি হেসে বলে, “এসবে কি হইবো? ফাঁসি কি আর হইবো? দেখো, আপা বিন্দাসি বাঁচবো।”
নাযেম চাচা সিগারেটের পেকেট থেকে একটা মুখে নিতে নিতে বলেন, “সে তো হইবো না, তারপরও শান্তি লাগিতেছে।”
রুদ্র তাদের কথার মাঝখানে দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে বলে, “সামনে নির্বাচন, আমাদের দলে তো মেলা মানুষ যোগ দিতাছে। তন্ময় চাচার মিছিলেও বহুত লোক আছিলো।”
তৌসির রুদ্রের কথার উল্টো পিঠে গলার স্বরে লবণাক্ত ঝাঁজ টেনে বলে, “কিছু মদন আছে যারা বিগত ষোল বছর লীগের লুঙ্গির নিচে লুকাইয়া আছিল। লুঙ্গি খুইল্যা যাওয়া তারা এখন মারায় জিয়া ছাড়া নাই কোনো উপায়।”
তৌসিরের এই কথায় সবার মুখজুড়ে হাসির আলো থিতিয়ে বসে। রুদ্র এরপর নুহমান কে ফোন দিয়ে তৌসিরের কাছে দেয়। নুহমান ঐ পাশ থেকে বিতৃষ্ণা নিয়ে বলে, “কি করমু ভাইজান? ওরা মানতেছে না তো। এখন আমাদের লোক ওদের ইচ্ছা মতো ছিলতাছে।”
তৌসির এ শুনে আলাদা একটা পৈশাচিক আনন্দ অনুভব করে ও দাঁতে দাঁত চেপে বলে, “মাতারি ঘরে মাতিরিদের ধরে একদম জায়গা মতো ভরে দে। চু*** দে মাদার**চুত দের! সাউয়া মাউয়া ফাইরা নে খান*কির পোলাগো।”
রাত বাজে দশটা। চারপাশটা কেমন থমথমে, ভারী হয়ে আছে। শহরের যান্ত্রিক কোলাহল সারাদিনের ক্লান্তি শেষে ঝিমিয়ে পড়েছে। নাজহা বেলকনিতে রাখা সোফাটায় শরীরটাকে এলিয়ে দিয়েছে। পা দুটো সামনের ছোট টি-টেবিলের ওপর তুলে রাখা। খোলা চুলগুলো রাতের এলোমেলো বাতাসে বারবার মুখে এসে পড়ছে, কিন্তু সেগুলো সরিয়ে দেওয়ার কোনো তাগিদ সে বোধ করতেছে না।
বাইরের অন্ধকারের চেয়েও গভীর এক অন্ধকার তার অন্তর গ্রাস করেছে। নিজেকে বড্ড একা লাগছে তার। একার চেয়েও বেশি একা। এই একাকিত্ব বাইরের নয়, ভেতরের। এমন এক শূন্যতা, যা বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে। গালের ওপর শুকিয়ে যাওয়া লোনা দাগের ওপর দিয়েই গড়িয়ে পড়ে আরও এক ফোঁটা তপ্ত অশ্রু। নাজহা কাঁদছে, নিঃশব্দে।
এই শূন্যতার মধ্যেই সে একটা কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। পাথরের মতো ভারী আর অটল একটা সিদ্ধান্ত। আর নয়। এই গ্লানির জীবন আর নয়। সে তৌসিরের মুখোমুখি হবে। সব বলে দেবে। জানতে চাইবে, কেন সে এই অভিনয় করছে, কী তার আসল উদ্দেশ্য। তারপর, এই ধিক্কারের জীবন থেকে মুক্তি নেবে। সে তৌসিরের কাছ থেকে তালাক নেবে। সিদ্ধান্তটা নিতে গিয়ে তার বুক কাঁপেনি, তা নয়। সে জানে, এই পথে কত বাধা। তার বাবা, চাচারা এই চরম পদক্ষেপে কখনোই রাজি হবেন না। অদৃশ্য শেকল দিয়ে তারা তাকে বেঁধে ফেলতে চাইবেন।
কিন্তু নাজহার আর কিছু করার নেই। অসহ্য এক অপরাধ বোধ আর অনুশোচনা এক অদৃশ্য ফাঁসের মতো তার গলা টিপে ধরেছে। প্রতিটি মুহূর্তে সে নিজেকে ঘৃণা করছে। আয়নায় নিজের চোখ দেখতেও ভয় হয়। এই সত্তাটাকে সে আর বইতে পারতেছে না। বড্ড কষ্ট হচ্ছে বড্ড যন্ত্রণা হচ্ছে।
নাজহা চোখ বন্ধ করে। এই মিথ্যার জীবন কাটানোর চেয়ে নিঃসঙ্গ জীবনও অনেক শ্রেয়। সেই জীবনে কষ্ট থাকবে, একাকিত্ব থাকবে, কিন্তু এই আত্মগ্লানি থাকবে না। অন্তত নিজের সত্তার কাছে নিজে সৎ থাকা যাবে। নিজের কাজের জন্য নিজেকে এতটা ঘৃণা করতে হবে না।
রাতের অন্ধকার নাজহার মনের অন্ধকারের সাথেই একাত্ম হয়ে গেছে। শুধু তার ভেতরের সিদ্ধান্তটা ঐ দূর আকাশের সবচেয়ে ম্রিয়মাণ তারাটির মতো একাকী জ্বলজ্বল করতেছে।
কাজ কর্ম খাওয়া দাওয়া শেষে তৌসির রুমে ফিরছিল। আসার সময়ই তার চোখে পড়ল সিমরান তাদের রুমের দিকেই যাচ্ছে, হাতে খাবারের প্লেট।
তৌসির পিছন থেকে ওকে ডাক দেয়, “এই খালি, {কালো}এদিকে আমার কাছে দে। আমি নিয়ে যাচ্ছি।”
’খালি’ ডাকটা শুনেই সিমরানের রাগ হলো। সে পিছনে ফিরে নাক-মুখ কুঁচকে বলল, “আমি খালি হলে তুমি কালা পাঠা! তুমি আমারে খালি ডাকো ক্যান?”
তৌসির হাসতে হাসতে সিমরানের সামনে দাঁড়ায়। ওর হাত থেকে ট্রে-টা নিতে নিতে বলে, “ভাইয়ে ঢং করি বুঝিস না? এমনে চ্যাতস ক্যান?”
সিমরান আলতো হেসে বলল, “আচ্ছা বাদ দাও। ভাবি তো দুপুরেও খায়নি। খাবার নিয়ে গেছিলাম, খেলো না।”
কথাটা শুনে তৌসিরের কপাল কুঁচকে গেল। মনে মনে ভাবল, নিশ্চয়ই ঝল দেখিয়ে খায়নি। সিমরানকে সে বলে, “আচ্ছা, আমি দেখছি।”
সিমরান মাথা নাড়ায়, “আচ্ছা।”
তৌসির রুমে এসে দেখে নাজহা এখানে নেই। তার মানে, বেলকনিতে আছে। খাবারের ট্রে-টা রুমে রেখে সে ধীর পায়ে বেলকনির দিকে এগিয়ে যায়।
তৌসিরের উপস্থিতি টের পেয়েই নাজহা চট করে চোখ-মুখ মুছে রুক্ষ ভঙ্গিতে বসে।তৌসির নাজহার সামনে এসে দাঁড়ায়। চোখে পড়ে তার অগোছালো রূপে। লালচে কালো চুলগুলো পিঠে, ঘাড়ে, চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। পরনে ওড়নাও নেই। এই অগোছালো নাজহাকেও কী ভীষণ সুন্দর লাগছে! অতুল্য রূপের অধিকারিণী সে, তাকে তো যেমন তেমন অবস্থাতেও অপরূপা লাগবে।
তৌসির নাজহার পাশে এসে বসতে বসতে জিজ্ঞেস করে, “এইভাবে চুল চারদিকে উড়াইয়া, ওড়না ছাড়া এমন বেফাইশার {হুস জ্ঞান ছাড়া কাজ কর্ম যারা করে } মতো বসে আছো ক্যান লো আমার রূপসী নাগিন?”
রূপসী নাগিন? এ কেমন কথা? নিত্য তৌসির ওকে ব্যঙ্গ করে একেক নামে ডাকে, আজও তাই করলো। নাজহার ইচ্ছে হয় কঠিন কিছু বলতে, কিন্তু দুপুরের তৌসিরের আচরণের কথা মনে পড়তেই একটা আলাদা অভিমানের ছোঁয়া লাগে অন্তরে। সে চুপচাপ স্থির, সামনে চেয়ে উত্তর দেয়, “বেফাইশা কী? চারদিকে পর্দা ফেলা, কেউ দেখবে না আমায়। আমার ইচ্ছে হয়েছে তাই বসে আছি।”
কথাগুলো নাজহা তীক্ষ্ণ অভিমানেই শুধোলো। কেন, কী জন্য অভিমান করলো তা সে নিজেও জানে না। মনটা বিষাদে ভরে আছে, কিচ্ছুটি ভালো লাগছে না, কিচ্ছু না।
তৌসির বুঝে যায় নাজহা চটে আছে, তাই আর কিছু না বলে ধীরে ধীরে নাজহার পাশ ঘেঁষে এসে বসে। হাত বাড়িয়ে ওকে শূন্যে তুলে নিয়ে নিজের কোলে বসায়। নাজহার সারা শরীর তরঙ্গের ন্যায় ঝিরিঝিরি করতে থাকে। তৌসিরের কোলে বসা অস্বাভাবিক কিছু তার কাছে। তৌসিরের বুকের সাথে পিঠ ঠেকে গেছে ওর, এক কথায় তৌসিরের সাথে একদম লেপ্টে গেছে সে। তৌসিরের শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ পাচ্ছে সে। নাজহা পাথরের মতো জমে যাচ্ছে। তৌসির এক হাতে ওর ঘাড়ের চুলগুলো অন্য পাশে সরিয়ে দিতে দিতে ওর চোখের কোণে তাকায়। দেখে দু’ফোঁটা পানির কণা চিকচিক করতেছে। তৌসির এ দেখে নরম গলায় জিজ্ঞেস করে, “চোখে পানি কেন?”
নাজহা তৌসিরের প্রশ্নে তার মুখপানে তাকায়, তথাপি কোনো জবাব সে শোধায় না, নিরুত্তর রয়। এ দেখে তৌসির সরু চাহনি ওর মুখে ছড়িয়ে দিয়ে সন্দিহান স্বরে বুনে, “আমারে ঠকানোর অনুশোচনার পানি নাকি?”
নাজহা এ কথায় তাচ্ছিল্যের এক তুচ্ছ হাসি টেনে তোলে ঠোঁটে আর বলে, “মোটেই না।”
“তাহলে পানি কেন?”
“এমনিই।”
‘এমনিই’ শুনে তৌসির আর পাল্টা প্রশ্ন ছোঁড়ে না। দীর্ঘশ্বাস ফেলে নাজহার গলার কাছে নাক নিয়ে এসে চোখ বুঁজে নাক টেনে তৃপ্তির সহিত তার শরীরের ঘ্রাণ নেয়। নাজহার গা গুলিয়ে ওঠে এতে। নাজহা তৌসিরের বুকে ধাক্কা দিয়ে বলে, “এমন গাঁজাখোরের মতো কাহিনি করতেছেন কেন?”
তৌসির মুচকি হেসে নাজহার থুতনিতে আলতোভাবে চেপে ধরে বলে, “আজ আমার তোমারে একেবারে মনের সাথে শরীরের ভিতরও নিয়া নিতে মন চাইতেছে।”
নাজহার আত্মা কেঁপে ওঠে এই কথায়। তৌসির সত্যি আজ মনে হয় কিছু একটা করে নিবে। নাজহা ভয় পায়, কিন্তু সবসময়ের মতো তা আড়াল করে নেয়। তৌসির নাজহার চোখের দিকে হালকা ভুরু কুঁচকে চেয়ে নাজহাকে জিজ্ঞেস করে, “আজ লুঙ্গির গিট কি খুলতে পারি তোমার লাইগ্য্যাহ?”
তৌসিরের কথাটা শুনে নাজহার অন্তরের অন্তঃস্থল অবধি ঠান্ডা হয়ে জমে যায়। কী উত্তর দিবে বুঝে আসে না তার। স্নায়ুগুলোও বোধহয় তিরতির করে কাঁপতেছে। অনেক দ্বিধায় ভুগে সে তৌসিরকে উত্তর শোধায়, “আপনার ইচ্ছে। আমি তো বলেছি, বিয়ের পরেরদিনই আপনার অধিকার আপনি নিতে পারেন। আজ যদি আপনার মনে হয় এই অসুস্থ শরীরের উপর নিজেকে চাপানো সহজ হবে, তাহলে আপনার মর্জিতে আমি বাঁধা দিব না, কারণ সে ক্ষমতা আমার নেই।”
তৌসির নাজহার কথায় মিষ্টি হেসে বলে, “সব করার পর তো এমনিই অসুস্থ হইবা, তাইলে একেবারেই হও। আর দেরি করা জায়েজ হইবো না।”
তৌসিরের কথাগুলো কাঁটার মতো বিঁধে নাজহার গায়ে, কিন্তু কোনো প্রতিবাদ করে না। চুপচাপ মেনে নিয়ে মাথা নেড়ে বলে, “আমি বে-মত করব না।”
তৌসির নিশ্চিত হতে আবারো জিজ্ঞেস করে, “সত্যি তো? পরে কান্নাকাটি জুড়বা না তো? বলবা না তো আমি তোমার লগে জোর করছি?”
নাজহা স্তম্ভের ন্যায় উত্তর দেয়, “না, তেমন কিছুই আমি করব না!”
তৌসির নাজহার কথায় হো-হা করে হেসে ওঠে এবার। এতক্ষণ ধরে মজা করছিল, দেখতেছিল নাজহার কী অবস্থা হয় তা। তৌসির নাজহার হাত নিজের মুঠোয় নিয়ে শক্ত করে ধরে, কারণ নাজহার হাত অনবরত কাঁপতেছে। তৌসির নাজহার হাতটা নিজ বক্ষের একাংশে চেপে ধরে বলে, “ভয় পেয়ো না। তুমি বিশ্বাসঘাতক হলেও আমি অত্যাচারী নই।”
নাজহা বুঝে যায় তৌসির ফাইজলামি করতেছিল। নাজহা একটু স্বস্তি পায়। অতঃপর তৌসিরকে বলে, “তৌসির সাব, আমাকে তালাক দিয়ে দিন। ছেড়ে দিন আমায়। এই বিশ্বাসঘাতক আমি সারাজীবন শুধু আপনার বিশ্বাসকেই ক্ষতবিক্ষত করব।”
তৌসির এ শুনে তপ্ত শ্বাস ত্যাগ করে বলে, “তোমার দখল আমার আত্মা পর্যন্ত। তোমারে ছাড়তে হইলে তো আপন আত্মারে তালাক দিতে হইবো।”
তৌসিরের কথায় নাজহার দৃষ্টি নিস্তব্ধ হয়ে তৌসিরের চোখে আশ্রয় নেয়। নাজহা নিস্তেজ অনুরণনে বুনে, “বা রে! এই গাদ্দারের জন্য এত প্রেম?”
তৌসির স্বভাবের খাঁটি স্বরেই বলে, “প্রেমের সাওয়া টায়া কিছু না। মায়া হতে পারে। আমার নিজেরও ভালো মতো জানা নাই কোন বাল!”
নাজহা বুক চিরে নিঃশ্বাসের ভার নামিয়ে বলে, “কাউকে ভালোবাসার প্রথম স্তর হয়তো এটি। এমন অনুভব আমারও হয়েছিল, যখন আমি তাকে ভালোবাসতে শুরু করেছিলাম। আপনি আমায় ভালো-টালো বাসতে যাইয়েন না, কারণ আমায় যেই ভালোবেসেছিল, একটুখানি সুখে থাকতে চেয়েছিল, সেই বিরহে পুড়েছে।”
তৌসির মুচকি হাসে। মুচকি হেসে মোহাভিষ্ট চাহনি স্থির নিবদ্ধ করে নাজহার মুখপানে, আর বলে, “যারে ভালোবাসো, তারে এখনো চাও? এখনো আশা রাখো কি?”
নাজহা তৌসিরের প্রশ্ন শুনে মুখ ঘুরিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে, “এখনো চাই। খুব করে চাই। তাকে চাওয়ার, তাকে পাওয়ার তীব্র লালসায় মরি আমি।”
এ বলে তৌসিরের মুখপানে চায়। তৌসির নিরুত্তর। নাজহা তৌসিরের কাছে এবার দুর্বল স্বরে জানতে চায়, “তৌসির বর্তমানে দাঁড়িয়ে সমাজের সব নিয়ম ভঙ্গ করে আমি কি আমার প্রিয় পুরুষ টা কে পেতে পারি না?”
তৌসির নাজহার এ কথায় রাগ করে না, যদিও রাগ হয়; তারপরও তা অপ্রকাশ্য রেখে বলে, “পেতে পারো!”
“কীভাবে?”
তৌসির স্বভাবের খাঁটি স্বরে বুনে, ” এই তো কোনো এক রাইতের বেলায়। আমারে ঘুমের মধ্যে কুপাইয়া দয়ালের দরবারে পাঠাইয়া। তুমি হারিয়া যাইবা তোমার লাঙ্গের হাত ধরিয়া।”
নাজহা জানতো এমন কিছুই তৌসির ওকে বলবে। ভীষণ রাগ হয় নাজহার। রাগের ঝাঁঝে চোখ-মুখ লাল হয়ে ওঠে। দাঁতে দাঁত পিষে তৌসিরের চোখের দিকে তাকিয়ে বলে, “আপনি মিয়া একটা অসহ্য মানব। কোনো ভালো কথা আপনার জবানে নেই, আর না আছে ভালো দিক।”
তৌসির কিছু বলে না। মৃদু হেসে ক্ষয়িষ্ণু সুরভঙ্গিতে শুধোয়, “আমার কোনো ভালো দিক নেই। আমার সর্ব দিক মিলিয়ে আমি মানুষটা ভারী মন্দ।”
এতে নাজহার কেন জানি কিছুটা খারাপ লাগে। ওর বলা উচিত হয়নি যে তৌসিরের কোনো ভালো দিক নেই। নাজহা আর কোনো বাক্য শোধায় না, চুপচাপ নিজের ভেতরে গুটিয়ে যায়। তৌসির নাজহার কপালে পড়া বেবি হেয়ারগুলো কানের পাশে গুঁজে দিতে দিতে জিজ্ঞেস করে, “আমারে যন্ত্রণা না দিলে তুমি শান্তি পাও না? ভাত খাও নাই ক্যান?”
নাজহা কী বলবে এখন? বলবে কি’আপনার উপর অভিমান করে খাইনি,’ এটা বলবে? ‘আপনি কেন আমার ওমন আচরণ করলেন? আপনার যাওয়া কি এত জরুরি ছিল? আমাকে খাইয়ে গেলে কী হতো?’ কথাগুলো নাজহার বুকের গহিনেই চাপা রয়। সে শান্ত গলায় বলে, “আমি খেয়েছি! রুমে প্লেট থাকত না খেলে! প্লেট নেই দেখুন গিয়ে।”
তৌসির নাজহার এই মিথ্যাতে বড়ই বিরক্ত। তিক্ত সুরে তৌসির বলে, “এ বাইচু**দের নাতিন মিথ্যা বলস ক্যান? তুই খাস নাই আমি ভালো কইরা জানি।”
গালি খেয়ে নাজহাও ছ্যাঁত করে ওঠে, “তো খাইনিতো খাইনি, এতে এত কথার কী? এই বিশ্বাসঘাতক আমি না খেয়ে মরে গেলে আপনার কী?”
তৌসির স্পষ্ট খুঁজে পায় নাজহার কথায় অভিমানের আঁচ। নাজহার গালে টুপ করে একটা চুমু খেয়ে জিজ্ঞেস করে, “দুপুরে করা আচরণের জন্য রাগ করতাছো?”
“না, কেন করব রাগ? আমি কে আপনার, আর আপনিই কে আমার?”
তৌসির বিরক্তি তে উচ্চারণ করে, “তোমার সাওয়ায় ঝল আছে জানি, কিন্তু এত ঝলে ভরা তা জানতাম না।”
নাজহার চোখ রাগে লাল বর্ণের রঙ ধারণ করে। সে ক্রোধ নিয়ে বলে ওঠে, “মুখ সামলে কথা বলুন।”
তৌসিরও তেরামি করে উত্তর দেয়, “তুমিও তোমার সাওয়ার ঝল সামলাও।”
“আপনি এত অশ্লীল কেন? এভাবে গালাগালি করছেন কেন?”
তৌসির নাজহার থুতনিতে হাত রেখে বলে, “তুই ছিনালগিরি করবি আর আমি গালি দিলেই দোষ? মন তো চাইতেছে এমনে এক টান আর ওমনে আরেকটা টান দিয়া তোরে ফাইরা নিতে। ঔষধ এক বেলা না খেলে কী ক্ষতি হইবো তুই জানস? কত টাকার ঔষধ আনছি জানস?”
টাকার কথা শুনে নাজহা তৌসিরের কাছ থেকে সরে যেতে চায় আর বলে, “টাকার খোঁটা দিচ্ছেন? বলুন কত টাকা, দিয়ে দিচ্ছি। ছোটলোক কোথাকার! ছিঃ।”
তৌসির ওকে জাপটে ধরে নিজের বক্ষের সাথে মিশিয়ে নিতে নিতে বলে, “টাকার খোঁটা দিচ্ছি না, হিসাব নিচ্ছি। ঔষধগুলো তো টাকা দিয়া আইছে। এগুলো না খাইলে টাকা নষ্ট না? আর আমি এক পয়সাও নষ্ট করার বান্দা না।”
নাজহা উঠে যেতে চাইলো, কিন্তু তৌসির ওকে যেতে দিল না। উল্টো নিজের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে লেপ্টে নিয়েছে। নাজহা তৌসিরের কোলে সুবিধামতো বসতে বসতে বলে, “হ্যাঁ, জানি তো। টাকা-পয়সার যদি অভাব হতো, তাহলে এই আখেরি কিপ্টেমি মানা যায়। কিন্তু টাকা-পয়সা রেখেও কিপ্টেমি! ছিঃ ছিঃ।”
তৌসির নাজহার পরনের জার্সিটা ধীর হাতে উপরে তুলে ওর উন্মুক্ত পেট, পিঠে, কোমরে হাতের উষ্ণ স্পর্শ এঁটে দিতে দিতে বলে, “আমার কাছে কোনো অতিরিক্ত টাকা-পয়সা নাই। যা আছে, সীমিত। তাই ব্যয় না করে আয় করার চেষ্টা করি।”
নাজহা তৌসিরের কথায় উত্তর দিবে কী, ও চেঙি মাছের মতো ছটফট করতে থাকে। তৌসিরের এই ছোঁয়া আজ আলাদা, বড্ড প্রগাঢ় এই ছোঁয়া। গা তরঙ্গের ন্যায় ত্বরান্বিত হচ্ছে। নাজহার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে এই উষ্ণ, নেশাক্ত স্পর্শে। নাজহা তৌসিরের দু’হাত খাবলে হাঁপিয়ে ওঠে চিৎকার করে, “তৌসির, এভাবে ছুঁবেন না, আমি শেষ হয়ে যাব।”
এ বলে নাজহা অসুস্থিতে তৌসিরের কাঁধে হেলান দেওয়ার মতো মাথা হেলিয়ে রাখে। তৌসির এই সুযোগে নাজহার টানটান গলায় মুখ গুঁজে ঠোঁট বসিয়ে দেয় বারংবার। কয়েকবার দাঁতও বসায়। সাথে তো তার অবাধ্য আঙ্গুলের ছোঁয়া নাজহার কোমরে পেরেক ঠোকার মতো বিচরণ করতেছে। নাজহার শ্বাস নিতে খুব কষ্ট হচ্ছে এখন তৌসিরের দাড়ির আঘাতগুলো বড্ড অসহনীয়। ও খুব কষ্টে ঠোঁট নাড়ায়, “তৌসির, ছাড়ুন, স্বস্তি পাচ্ছি না।”
তৌসির নাজহার গলা থেকে মুখ তুলতে তুলতে বলে, “এতটুকুই তোর যাই-যাই অবস্থা? যেদিন মন মতো ধরমু, ঐ দিন কি তুই আদৌ বাইচা রইবি? আর এমনি অল্পতেই এত চিৎকার করস ক্যান লো ছিনাল?”
নাজহা তৌসিরের দু’হাতের চামড়ায় নখ বসিয়ে দেয়, যাতে হাত সে সরিয়ে নেয়। কিন্তু তা হয় না। তৌসির তো হাত সরাবেই না। নাজহা বিরক্ত হয়ে তীক্ষ্ণ গলায় বলে, “হাত সরান বলছি, বদমাশ পুরুষ!”
তৌসির নাজহার গালে কয়েকটা চুমু খায় তার গাল থেকে আবারো নিজের গাল ঘেঁষে নিতে নিতে নামিয়ে গলায় নিয়ে আসে অতঃপর গালায় অনবরত চুমু খেতে থাকে। নাজহা হাত ঘুরিয়ে তৌসিরের চুলগুলো মুঠো করে ধরে চোখ বুঁজে চিৎকার করে ওঠে , ” তৌসির মুখ সরান দাড়ি দিয়ে লাগতেছে। ” তৌসির নাজহার কথায় মুখ তুলে নিয়ে ওকে বলে, “তা একটা কথা জিগাইবার আছে।”
নাজহা ছটফট করতে করতে বলে, “কী?”
তৌসির ওর পেট থেকে এবার হাত সরিয়ে নিয়ে ওকে স্বস্তি দেয়। নাজহা এতে শান্তির শ্বাস ছেড়ে ঠিক হয়ে বসে। নাজহা ঠিক হওয়ার পর এবার সরু চোখে তার দিকে তাকিয়ে তৌসির জিজ্ঞেস করে, “আমার ড্রয়ার থাইকা কত টাকা নিছেন ম্যাডাম, একটু কন তো।”
টাকার কথা শুনে নাজহা অন্যদিকে চোখ ঘুরিয়ে নেয়। ধরা খেয়ে গেল! তৌসিরেরদের বাড়িতে কাজ করে একটা ছোট্ট ছেলে। পড়াশোনাও করে টুকটাক, বাড়ির কাজও করে। ফোরে পড়ে। নাজহার কাছে বিকেলে এসে আবদার এঁটেছিল, “ভাবি, আমারে বিশটা টাকা দেন, আমি পেন্সিল কিনমু।”
নাজহা তৌসিরের ড্রয়ার খুলে। তখন ড্রয়ারে একটা ছেঁড়া দশ টাকার নোট আর বিশ টাকার নোট ছিল। নাজহা সেই বিশ টাকাই মাজেদকে দিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু এখন নাজহা তা স্বীকার না করে বলে ওঠে, “আমি ওসব টাকা-পয়সার কথা জানি না।”
” ডাকাইতের বাইচ্ছা আমার ড্রয়ারে চারশো টাকা ছিল। কী করছিস ঐগুলা?”
চারশো টাকা! এটা শুনে নাজহা তৌসিরের দিকে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে বলে, “মিথ্যা বলতেছেন কেন? মাত্র ত্রিশ টাকা ছিল। আমি বিশ টাকা মাজেদকে দিছি, সে পেন্সিল কিনবে।”
তৌসির হেসে বলে, “এই কথাটা আগে কইলে কী হইতো? আর শুনো, এমনে কাউরে টাকা দিও না। বিশ টাকা হইলেও আমার রক্ত পানি করা টাকা।”
“না, দিব না। হাড় কিপ্টে, বদমাশ লোক কোথাকার।”
তৌসির নাজহার ঘাড়ে মুখ গুঁজে দিতে দিতে বলে, “হইছে লো ডাকাতনি, তাড়াতাড়ি রুমে আয়, ভাত খাবি।”
“না, আমি খাব না।”
তৌসির ওর কথায় পাত্তা দেয় না। নিজের ইচ্ছেমতো গলায়, গালে ঠোঁট চুমু খেয়ে ওকে বাহুবন্ধনীতে আবদ্ধ করে নিয়ে আসে রুমে। খাবের প্লেটা নাজহার সামনে রেখে বসতে বসতে বলে,” খেয়ে নাও রাগ করলে তোমারি ক্ষতি আমার না। ”
নাজহাও আর রাগ দেখায় না ক্ষিদেতে পেট জ্বলতেছে সাথে তৌসিরের উপর রাগটাও কমেছে। নাজহা কারো হাতে খাবার খায় না। হসপিটালে যখন ছিল, তখনও কাঁপাকাঁপা হাতে নিজ হাতে খেয়েছে, তারপরও কারো হাতের খায়নি। তৌসির অনেক বার মুখে তুলে দিয়েছে, কিন্তু নাহ, সে নিজের হাত ব্যতীত কারো হাতের খাবার গিলতে পারে না। এই এখন ও খাবে, নিজ হাতে খাবে।
খাওয়া-দাওয়ার পর্ব শেষ করে নাজহা ওযু করার জন্য ওয়াশরুমে ঢুক। তৌসির নিচে গেছে খাবার ট্রেগুলো রেখে আসতে।
ওযু সেরে নাজহা যখন ঘরে পা রাখে, দেখে তৌসির ততক্ষণে ফিরে এসেছে। ইদানীং নাজহা একটা বিষয় খুব স্পষ্ট করে টের পাচ্ছে তৌসির বেশ দ্রুত ঘুমিয়ে পড়ার তাড়া দেখায়। অথচ, বিয়ের পর প্রথম দিনগুলোতে সে তার সঙ্গি দের সাথে কত রাত অবধি জেগে থাকত, টুকিটাকি গল্পে বা নিছক খুনসুটিতে সময় কাটাত। এখন সেই আড্ডার সময়টা কমে গেছে। হয়তো নাজহার জন্যই আড্ডাতে যায় না।
তৌসির শান্তভাবে দরজাটা বন্ধ করে দেয়। কক্ষের একমাত্র আলোটাও নিভিয়ে দিতেই ঘরটি প্রগাঢ় অন্ধকারে ডুবে যায়। মৃদু অন্ধকারে তৌসির নাজহার দিকে এগিয়ে আসে। তাকে কথা বলার সুযোগ না দিয়ে এক মুহূর্তের মধ্যে নাজহাকে আলতো করে কোলে তুলে নিয়ে সে বিছানায় চলে আসে। নাজহাও বিনা বাক্যব্যয়ে তৌসিরের উষ্ণ বুকের আশ্রয়ে মাথা রেখে চোখ বুঁজে নেয় তৌসিরের শরীরের চেনা, প্রিয় ঘ্রাণটা মন ভরে নিঃশ্বাসের সাথে টেনে নিতে নিতে থাকে।
নাজহার মনের গভীরে একটি প্রশ্ন বহুক্ষণ ধরে ঘুরপাক খাচ্ছিল। প্রশ্নটা করা উচিত হবে কি না, সেই দ্বিধায় মন সায় দিচ্ছিল না। কিন্তু সন্দেহ নামক কীট একবার মনে ঢুকলে সহজে শান্তি মেলে না। শেষে অনেক দ্বিধা-দ্বন্দ্বের পর, তৌসিরের বক্ষ থেকে মাথা তুলে তার মুখের দিকে চেয়ে, নাজহা মনের বিরুদ্ধে গিয়েও শেষমেশ প্রশ্নটি করেই ফেলল, “আচ্ছা তৌসির, আপনাদের পরিবারে কি কেউ তামিলের আছেন?”
‘তামিল’ শব্দটি শোনামাত্র তৌসিরের দেহের অভ্যন্তরে মুহূর্তে এক শীতল স্রোত বয়ে যায়। রাগে তার দম প্রায় বন্ধ হয়ে আসার জোগাড়। তার ইচ্ছে হয় নাজহাকে ঠাটিয়ে একটি চড় বসিয়ে দিতে কীভাবে সে এই প্রসঙ্গ তুলল? কিন্তু এমনটা করলে নাজহার সন্দেহ আরও বাড়বে, এই চিন্তা মাথায় আসতেই তৌসির নিজেকে ইস্পাত কঠিন করে সামলে নেয়। মুখমণ্ডলে সামান্যতম উদ্বেগের ছাপও না ফুটিয়ে যথেষ্ট স্বাভাবিক থাকার ভান করে তৌসির উত্তর ধারণ করে, “না, আমাদের বাড়িতে তেমন কেউ নাই।”
তৌসিরের এমন মিথ্যা উত্তরে নাজহা চুপসে যায়। সে জানে, শিকদার পরিবারে একজন তামিল বংশোদ্ভূত মানুষ আছেন, আর তৌসির সজ্ঞানে তাকে মিথ্যা বলতেছে। নাজহা এখন নতুন এক বিপত্তিতে পড়েছে। যদি তৌসির কিছু একটা আঁচ করে নেয়, যদি তার জিজ্ঞাসা করার উদ্দেশ্য ধরে ফেলে? দ্রুত পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং তৌসিরের মনোযোগ সেই সন্দেহ থেকে সরিয়ে অন্য দিকে ঘোরানোর জন্য নাজহা মরিয়া হয়ে একটা ফন্দি খুঁজতে শুরু করে।
তখনই তার চোখ পড়ে তৌসিরের ওষ্ঠের দিকে সুগঠিত ঠোঁটজোড়া। ঠোঁট দেখেই নাজহার মনে একটি দুষ্টু পরিকল্পনা জন্ম নেয়। দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে সে তৌসিরের বুকে হাত দিয়ে ভর দিয়ে উঠে এবং তৌসিরের মুখের উপর মুখ নিয়ে আসে। নাজহাকে হঠাৎ এমন আগ্রাসী হতে দেখে তৌসিরের ভ্রু কুঁচকে আসে। বিস্ময় নিয়ে বলে “কিতা লো ছিনাল? ঘুমাইতে নায় তুই?”
নাজহা মুচকি হেসে বলে, “আমি একটা জিনিস ট্রাই করি?”
তৌসির কপালে ভাঁজ ফেলে জিজ্ঞেস করে, “কিতা?”
নাজহা ঠোঁটের কোণায় এক ঝলক মিষ্টি হাসি টেনে ধরে। এরপর তৌসিরকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে, তার দুই গাল শক্ত করে চেপে ধরে সে ভারী আন্তরিকতায় চোখ বুজে নিজের ঠোঁট বসিয়ে দেয় তৌসিরের রুক্ষ আবহে গড়া টানটান স্বাভাবিক রক্তিম আভাযুক্ত ঠোঁটে। তৌসিরের চোখ দুটো প্রথমে বিস্ময়ে বড় হয়ে গেলেও, দ্রুত সেই বিস্ময় এক উষ্ণ উত্তেজনায় পরিণত হয়। সে বিশ্বাসই করতে পারছে না, নাজহা আজ এত অকপটে তাকে চাইছে! তৌসির এক হাতে নাজহার ঘন খোলা চুলগুলো মুঠো করে ধরে, আর অন্য হাতে ওর কোমরের ডান অংশটা পরম নির্ভরতায় চেপে ধরে। নাজহা আবেগে একের পর এক চুম্বন এঁকে যাচ্ছে তার ঠোঁটে, তৌসিরও আর নিজেকে সংবরণ না করে এই ভালোবাসায় পূর্ণ সায় দিচ্ছে। তাদের ঘনিষ্ঠতা যখন চরম উষ্ণতার দিকে যাচ্ছিল ঠিক সেই মুহূর্তে, নাজহা সুযোগ বুঝে এক গাল থুতু তৌসিরের মুখে পুরে দেয়। এই আকস্মিকতায় তৌসিরের দম আটকে যাওয়ার জোগাড়, থুতু তার গলা পর্যন্ত চলে গেছে।
তৌসির হতভম্ব হয়ে, তীব্র বিতৃষ্ণায় এক ধাক্কায় নাজহাকে নিজের থেকে সরিয়ে দিয়ে দ্রুত উঠে বসে। সে দ্রুত খাট থেকে নেমে মুখ ভর্তি থুতু ডাস্টবিনে ফেলে দেয়। এরপর গড়গড়িয়ে কুলি করে মুখ ধুয়ে পরিষ্কার করতে করতে নাজহার দিকে তাকায়। দেখে নাজহা এখনো পাশে বসে ঠোঁট মুছতে মুছতে মিচকে মিচকে হাসছে। তৌসির কুলি করে গ্লাস জায়গা মতো রাখতে রাখতে চূড়ান্ত বিরক্তি আর অবাক হওয়ার মিশেলে বলে, “ধুর ব্যাটি খবিশনি কি করলি তুই? একদম যাচ্ছেতাই!”
নাজহা এ কথায় চোখ বড় করে বলে, “আমি একটা রিলসে আজ এটা দেখেছি, তাই ট্রাই করলাম। আর আপনি এভাবে করলেন? ওখানে তো নায়ক আরও খুশি হয়!”
তৌসির নাজহার চোখে চোখ রেখে বলে, “তার মানে তুমি সারাদিন ফোনে এইসব চুম্মা-চাটি এসব দেখো? ছিঃ! তালুকদারের মাইয়া, ছিঃ!”
তৌসিরের এমন নাক ছিটকানো দেখে নাজহার অভিমান হলো, “আরে আমি দেখি না এসব! এমনি সামনে এসেছিল।”
”তুমি যা দেখবা তাই আইবো। তুমি এসব রোমান্স-টোমান্স দেখো, তাই আইছে।”
নাজহা মুখ বাঁকিয়ে বলে, “হ্যাঁ দেখি তো, আপনার সমস্যা?”
তৌসির নাজহার গাল টেনে ধরে, কিছুটা শাসন আর কিছুটা সোহাগের সুরে বলে, “বয়স এখনো হয়নি আঠারো। তুমি এইসব দেখো? লজ্জা করে না তোমার?”
নাজহা এবার তৌসিরের এ কথার জবাবে হালকা কঠিন স্বরে, কিন্তু মনের চাপা ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলে, “তাহলে এটা আপনি কেন বুঝেন না? আমার বয়স হয়েছে এসব করার? যে আপনি হঠাৎই কথাবার্তা ছাড়া শুরু করে দেন আমার সাথে!”
”আমি কী করলাম?”
”কেন, ঐসময় সোফায় বসে কী করেছেন?”
তৌসির ভ্রু কুঁচকে কিছুক্ষণ চুপ থেকে, মৃদু হেসে সে বলে, “ওহহো! তার মানে এই সবটাই তখনকার সময়ের প্রতিশোধ?”
”হ্যাঁ।”
”এখন প্রতিশোধ নেওয়া শেষ হইলে ঘুমাও।”
”আচ্ছা।”
নাজহা “আচ্ছা” বলে নিজের বালিশে শুতে যাবে, তার আগেই তৌসির দ্রুতগতিতে বিছানায় উঠে ওকে টেনে নেয়। সে নাজহাকে নিজের বুকের মধ্যে জড়িয়ে নিয়ে শুয়ে পড়ে। নাজহার অভিমান মুহূর্তেই কর্পূরের মতো উবে যায় সেও তৌসিরের বুকে মাথা রেখে নিশ্চিন্তে সেঁধিয়ে রয়।
রাত এখন শেষ প্রান্তে নিস্তব্ধ অন্ধকারে তৌসিরের শরীর ঘামে ভিজে একাকার, ক্ষণে ক্ষণে শিউরে উঠছে সে। অবচেতন মনের গহীনে চলছে এক ভয়াবহ দুঃস্বপ্নের আনাগোনা।
চোখের সামনে ভেসে উঠছে এক নারকীয় দৃশ্য। মেঝের ওপর লুটিয়ে আছে এক নারীর বিবসনা দেহ, লেলিহান অগ্নিশিখা গ্রাস করছে তাকে। অদূরেই একটি টেবিলের ওপর নিথর হয়ে পড়ে আছে আরেক নারীর নগ্ন শরীর। আর এই বিভীষিকার পাশেই কেউ একজন আর্তনাদ করছে বিকট সেই চিৎকার, ভাষাটি তামিল।
ঘুমের ঘোরেই তৌসিরের ঠোঁট নড়ে উঠে সেই আর্তনাদের প্রতিধ্বনি তার কণ্ঠেও বিড়বিড় করে বেরিয়ে আসে, “எனக்கு என்ன நடக்கும்? நான் எப்படி உயிர்வாழ்வேன்?”
তৌসিরের অস্ফুট আর্তনাদ আর গোঙানির শব্দে নাজহার কাঁচা ঘুমটা ভেঙে যায়। অজানা আতঙ্কে বুকটা ধক করে উঠে তার। তৌসিরের বুকের ওপর রাখা মাথাটা দ্রুত তুলে নেয় সে। নিজের জার্সির ভেতর থেকে তৌসিরের হাতটা আলতো করে সরিয়ে খানিকটা দূরে সরে বসে তার থেকে সরে তারপর কান পেতে বোঝার চেষ্টা করে, কী বলছে মানুষটা।
ভাষার কিছুই বোধগম্য হলো না তার, তবে এটুকু বুঝতে বাকি রইল না যে তৌসির ঘোরের মধ্যে তামিল ভাষায় প্রলাপ বকছে। তৌসিরের শ্বাস-প্রশ্বাস তখন দ্রুত ও ভারী, বুকটা হাপরের মতো ওঠানামা করছে।
নাজহা আর এক মুহূর্ত দেরি করে না। তড়িৎ গতিতে তৌসিরকে ধাক্কা দিয়ে প্রবল ঝাঁকুনি দেয় সে। কণ্ঠে একরাশ ভীতি আর উদ্বেগ নিয়ে ডেকে ওঠে
“কী হলো আপনার? তৌসির! এমন করছেন কেন আপনি?”
তৌসিরের ঘুমের ঘোর ভেঙে আসছিল, তার ওপর নাজহার আকস্মিক ধাক্কায় যেন বিদ্যুতের মতো চমকে সে উঠে বসে। কপালে জমে থাকা শীতল ঘাম মুছে নিয়ে সে চারপাশে এক পলক তাকায়। তারপর নাজহার বিস্ময়-ধরা চোখের দিকে তাকিয়ে কণ্ঠে তীব্র অস্থিরতা নিয়ে জানতে চায়, “তোমাকে আমি কিছু করিনি তো? কৈতরি মারিনি তো আমি তোমায়?”
তৌসিরের এই অদ্ভুত প্রশ্ন আর অস্থিরতা দেখে নাজহা হকচকিয়ে যায়। আমতাআমতা করে সে শুধু বলে, “না তো।” তৌসির নাজহার ভয়ে ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া মুখটির দিকে এক মুহূর্তের জন্য তাকায় সেই দৃষ্টিতে কোনো মলিনতা নেই, বরং এক আশ্চর্য নির্মলতা। ধীরে ধীরে বিছানা ছেড়ে নেমে সে পাশের টেবিল থেকে খালি জগটা হাতে নিয়ে নাজহাকে বলে, “তুমি ঘুমাও। আমি পানি পান করে আইতাছি, জগও ভরে নিয়া আইমু।”
নাজহা মাথা নেড়ে উত্তর দেয়, “আচ্ছা, যান।”
তৌসির এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘর ছাড়তেই দ্রুত নিঃশ্বাস ফেলে নাজহা। বালিশের নিচ থেকে সে তড়িঘড়ি ফোনটা বের করে মাস্টার চাচ্চুকে কিছু একটা বার্তা পাঠায়।
দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে সব দেখে তৌসির। সে যায়নি এখানেই দাঁড়িয়ে ছিল। নাজহা আবারও বিশ্বাসঘাতকতা করছে। তৌসিরের নিশ্চিত ধারণা, ঘুমের ঘোরে তার মুখ থেকে বেরিয়ে আসা তামিল প্রলাপ নিয়েই নাজহা কাউকে গোপন খবর দিচ্ছে।
তৌসির এক তপ্ত শ্বাস ফেলে, হাতে জগ নিয়ে সিঁড়ির দিকে পা বাড়াশ। তার ঠোঁটে তিক্ততার সুর। সে সুরে স্বগতোক্তির মতো ও শায়েরি আওড়ায়,
“তিল থেকে তাল,
ধান থেকে চাল,
আমি খারাপ আর
আমার বউ নোবেল প্রাপ্ত ছিনাল।”
এই বলে সে নিজে নিজেই হেসে ওঠে সেই হাসি করুণ নাকি বিদ্রূপাত্মক, বোঝা দায় । তারপর সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে শুরু করে।
সিঁড়ির মাঝামাঝি পথেই বিবিজানের সাথে দেখা হয়। এত রাতে বাড়ির বাইরে থেকে ফিরছেন দেখে থমকে দাঁড়াল তৌসির। জিজ্ঞেস করল, “কোথায় গিছিলা এত রাইতে?” বিবিজান এক মুহূর্ত থেমে গিয়ে মুখে সরলতা টেনে বলেন,
স্নিগ্ধবিষ পর্ব ২২
“এই তো, পশ্চিমের গাছের নিচে ওদের খাবার দিতে গেছিলাম।”
তৌসির শুধু সংক্ষেপে জবাব দেয়, “ওহ।” বিবিজান আর বাক্য বিনিময় না করে দু-ধাপ সিঁড়ি এগিয়ে যান। ঠিক তখনই পিছন থেকে তৌসিরের কণ্ঠস্বর রুক্ষ রুপে ওঠে, “বিবিজান, সময় তো আইসা গেছে। আগামীকালই শিক্ষা দিতে হবে।”
বিবিজান এই কথায় এক পৈশাচিক শান্তি অনুভব করেন। তিনি গ্রীবা হেলিয়ে, তৌসিরের চোখে চোখ রেখে, ঠোঁটে এক অমানবিক রহস্যময় হাসি টেনে ধরেন। তৌসিরও হাসে। হিংস্র, প্রতিশোধপরায়ণ এই হাসি দুজনের ঠোঁটেই ফুটে ওঠে।
