Home স্নিগ্ধবিষ স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৪৫

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৪৫

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৪৫
সানজিদা আক্তার মুন্নী

ওয়াসেম নিজের ঘরে ফিরে আসে। ফিরে তো ঠিকই, কিন্তু তার ভেতরে জমে থাকা কথাগুলো আর বলা হয়ে ওঠে না। রাতের অন্ধকারে বিছানায় গা এলিয়ে দিলেও ঘুমের দেখা মেলে না। চোখের পাতায় তার অদৃশ্য জেদ, কিছুতেই তারা এক হতে চায় না। বুকের ভেতরটায় হাহাকার অন্তরের প্রতিটি স্পন্দনে অবিরাম ‘তৃষ্ণা, তৃষ্ণা’ নামটাই প্রতিধ্বনিত হতে থাকে। ঘড়ির কাঁটা টিকটিক করে এগিয়ে যায়। দীর্ঘ তিন ঘণ্টা এপাশ-ওপাশ করে, বিছানায় ছটফট করে যখন বুকের ভেতরের দাউদাউ করা অস্থিরতা আর কোনোভাবেই বশে রাখা যায় না, তখন সে একপ্রকার বাধ্য হয়েই পুনরায় পা বাড়ায় তৃষ্ণার ঘরের দিকে।

নিঃশব্দে ঘরের দরজা ঠেলে ভেতরে পা রাখতেই প্রশান্তি তাকে ছুঁয়ে যায়। আবছা আলোয় সে দেখতে পায়, তৃষ্ণা তাহাজ্জুদের নামাজ শেষ করে জায়নামাজে স্থির হয়ে বসে আছে। প্রার্থনারত সেই শান্ত মুখশ্রীর দিকে তাকিয়ে ওয়াসেম বুক ভরে একটা দীর্ঘশ্বাস টেনে নেয়। কোনো প্রকার বাক্যালাপ না করে, ধীরপায়ে এগিয়ে গিয়ে সে সটান বসে পড়ে তৃষ্ণার ঠিক সামনে। এত রাতে, এমন অপ্রত্যাশিতভাবে ওয়াসেমকে নিজের ঘরে দেখে তৃষ্ণার চোখে-মুখে স্পষ্ট বিস্ময় ফুটে ওঠে ও এত রাতে এখানে কী করছে?
ওয়াসেম টু-শব্দটিও করে না। কোনো উত্তরের অপেক্ষা না করেই সে একপ্রকার অধিকারবোধ নিয়ে তৃষ্ণার কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়ে। তারপর ক্লান্ত অথচ প্রশান্ত কণ্ঠে বলে ওঠে, “আমার ঘুম ভেঙে গেছে। ভীষণ ঘুম পেয়েছিল, কিন্তু বড্ড মাথা ব্যথা করছে। চুলগুলো একটু টেনে দে তো।”

হঠাৎ এমন আদেশে তৃষ্ণা ঘোরের মধ্যে পড়ে যায়। অবচেতনভাবেই তার নরম আঙুলগুলো ওয়াসেমের ঘন চুলে বিলি কাটতে শুরু করে। চুল টেনে দেওয়ার ফাঁকে অসাবধানতাবশত ওয়াসেমের উন্মুক্ত গলায় হাত ছুঁয়ে যেতেই তৃষ্ণা চমকে ওঠে গা বেশ জ্বরে পুড়ছে! মৃদু উদ্বেগ নিয়ে সে নিচু স্বরে মিনমিন করে বলে, “আপনার তো মনে হচ্ছে জ্বর আসবে! রাতের বেলা ওইভাবে গোসলটা না করলেও তো পারতেন!”
ওয়াসেম যেন ঠিক এই সুযোগটারই অপেক্ষায় ছিল। তৃষ্ণার এই সামান্য উদ্বেগ, এই নরম হাতের স্পর্শ বুকের ভেতরের দাউদাউ করা অস্থিরতাগুলোকে নিমিষেই জুড়িয়ে দেয়। গত কয়েক ঘণ্টার দমবন্ধ করা শূন্যতা কেটে গিয়ে সেখানে জায়গা করে নেয় প্রশান্তি। চোখ দুটো বুজেই সে তৃপ্ত কণ্ঠে জবাব দেয়, “এইসব অল্প জ্বরে আমার কিচ্ছু হবে না। আমি তো আর তোর মতো মুরগির ছানা নই যে এত সামান্যতেই দুর্বল হয়ে পড়ব!”
কথাটা শুনে তৃষ্ণা আনত মুখে, অত্যন্ত ধীর গলায় উত্তর দেয়, “মেয়েমানুষ তো একটু দুর্বল হয়ই, এটাই তো নিয়ম।”
ওয়াসেমের চোখ এখনও বোজা। সেই অবস্থাতেই সে বলে ওঠে, “হ্যাঁ, হয়তো। জানি। কিন্তু তুই তো একটু বেশিই দুর্বল।”

তৃষ্ণা এবার একদম নিশ্চুপ হয়ে যায়। কী জবাব দেবে ভেবে পায় না। এমনিতেই এই লোকটা ভালো কথার উল্টো অর্থ ধরে অযথাই রেগে যায়, এখন আবার মুখ ফসকে উল্টোপাল্টা কিছু বেরিয়ে গেলে খামোখাই পরিস্থিতি ঘোলাটে হবে। তৃষ্ণাকে এমন বাধ্য মেয়ের মতো চুপ হয়ে যেতে দেখে ওয়াসেমও আর কথা বাড়ায় না। বরং তৃষ্ণার উষ্ণ কোলে মাথা রাখার যে পরম আশ্রয়টুকু সে পেয়েছে, সেই প্রশান্তিতেই নিজেকে পুরোপুরি সঁপে দেয়। এর চেয়ে বেশি আর কী-ই বা চাওয়ার আছে তার! এই স্তব্ধতা আর স্পর্শের নীরবতাই এখন তার কাছে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শান্তি।

দিগন্তজোড়া ধূসর আকাশ আজ চিত্রকরের তুলিতে আঁকা এক ক্যানভাস। মেঘের গুরুগম্ভীর গর্জনের পর কিছুক্ষণ আগের প্রলয়ংকরী তুফান এখন শান্ত হয়েছে। ঘন কালো মেঘের চাদরে রৌদ্রের সোনালি হাসি পুরোপুরি অবরুদ্ধ। আকাশ ভেঙে এখন ঝরছে মিহি জলের রেণু, এই রেণু বোধহয় মেঘেদের নীরব কান্না। সেই সজল ধারায় গোসল করে চারপাশের প্রকৃতি মায়াময়ী রূপ ধারণ করেছে। বাতাসের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে আছে ভিজে মাটির সোঁদা গন্ধ। রাস্তার দুপাশের শান্ত জলাশয়ে বৃষ্টির ফোঁটারা অবিরাম এঁকে চলেছে সুন্দর সব জলতরঙ্গ। বৃষ্টির আদুরে ছোঁয়ায় পথের ধারের বুনো ঘাসের গালিচা হয়ে উঠেছে আরও সতেজ, আরও গাঢ় শ্যামল।
পথের ধারে সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকা প্রাচীন বৃক্ষগুলো এই বর্ষামুখর দিনের এক নিস্তব্ধ, প্রশান্ত সাক্ষী হয়ে আছে। দূরে আবছা হয়ে আসা দিগন্তরেখায় সারি সারি গাছ আর ইটের ভাটার চিমনিগুলো মিলেমিশে এক বিষণ্ণ অথচ অপরূপ মায়াজাল বুনেছে।

আর এই অবারিত বারিধারা ও নিস্তব্ধ প্রকৃতির বুক চিরে গ্রামের কর্দমাক্ত মেঠোপথ ধরে ধীর পায়ে হেঁটে চলেছে তৌসির আর তার কৈতরী। শ্বেত-শুভ্র বসনে তারা তো এখন এই বর্ষার কোনো এক অমর কাব্যের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। নাজহার পরনে একটি সাদা শাড়ি, যা স্যাঁতস্যাঁতে হাওয়ায় কিছুটা লেপ্টে আছে তার অবয়বের সাথে। তৌসিরের বাঁ হাতে ধরা একটা লম্বা ছাতা, আর তার সাথেই ঝোলানো শ্বশুরবাড়ির জন্য নেওয়া বিশ টাকা দামের এক প্যাকেট মুড়ি সে মহা কিপ্টা তাও মুড়ি নিয়ে যাচ্ছে এটাই অনেক। তার ডান হাতে যত্নে আগলে রাখা নাজহার জুতোজোড়া, কাদায় যাতে নাজহার দামি জুতো নষ্ট না হয়, সেই খেয়াল তার পুরোমাত্রায়। তৌসিরের পরনে সাদা পাঞ্জাবির সাথে ধুতি স্টাইলে পরা সাদা লুঙ্গি, আর পাঞ্জাবির ওপর তার অতি প্রিয় কালো মুজিব কোট।
তালুকদার বাড়ির উদ্দেশে তাদের এই যাত্রা। গাড়ি করেই আসার কথা ছিল তাদের, মূলত সে কারণেই নাজহা এত সুন্দর করে শাড়ি পরেছে। কিন্তু বাড়ির কাছাকাছি আসতেই বাধে বিপত্তি। বৃষ্টির কাদায় আটকে যায় তাদের গাড়ি। ঠেলতে গিয়ে ছিঁড়ে যায় আগে থেকেই বিকলপ্রায় সিএনজিটির তার। তাই বাধ্য হয়েই যান্ত্রিক বাহন ছেড়ে প্রকৃতির এই কাদা-মাখা পথ ধরে হেঁটেই এগোতে হচ্ছে তাদের। তবে এই বিপত্তি তাদের দুজনের মাঝে এক অনাকাঙ্ক্ষিত, একান্ত মুহূর্তের জন্ম দিয়েছে।

মেঠোপথের কাদা এড়িয়ে সাবধানে পা ফেলতে ফেলতে নাজহা একসময় নির্ভরতায় জড়িয়ে ধরে তৌসিরের হাতটা। এই বিশাল পৃথিবীতে এই হাতটাই তার একমাত্র নিশ্চিন্ত আশ্রয়। তৌসির মৃদু হেসে, চোখের কোণে এক চিলতে আদর নিয়ে নাজহার দিকে তাকায়, “কী হইলো?”
নাজহা দুদিকে মাথা নেড়ে বিষণ্ণ গলায় বলে, “কিছু না।”
তৌসির নাজহার মনের জমতে থাকা মেঘটুকু পড়তে পেরে হালকা গলায় জিজ্ঞেস করে, “মন খারাপ?”
নাজহা মুখ তুলে তাকায় তৌসিরের দিকে। ঠিক এক নিরীহ, মায়াবী হরিণীর দৃষ্টিতে। সেই নিটোল, সজল চাহনিতে তৌসিরের প্রতি তার ব্যাকুল আকুলতা আর না-বলা ভয়গুলো স্পষ্ট পড়া যায়। নাজহা নরম, অভিমানী গলায় জিজ্ঞেস করে, “কবে আসবেন? মন খচখচ কেন করছে আমার?”
তৌসির মুচকি হাসে। লম্বা ছাতাটা মেলে দুজনের মাথার ওপর ধরতে ধরতে এক নিশ্চিন্ততার স্বরে বলে, “চলে আসমু তাড়াতাড়ি। হঠাৎ কইরা যাইতেছি তো, তাই মন খুঁতখুঁত করতেছে তোমার। বাড়ির সবার লগে দেখা করলে দেখবা মন ঠিক হইয়া যাইব।”

কিন্তু নাজহার মনের শূন্যতা এত সহজে পূরণ হওয়ার নয়। প্রিয় মানুষকে দূরে পাঠানোর আশঙ্কায় তার বুকটা ভারী হয়ে আছে। সে তৌসিরের একদম গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে, মিনমিন করে বলে, “আপনার অভাব পুরো পৃথিবীর মানুষ দিয়েও পূর্ণ হবে না।”
তৌসির কথাটা শুনতে পেয়েও না বোঝার ভান করে। সে খানিকটা ঝুঁকে এসে বলে, “কী বললা?”
নাজহা অন্যদিকে দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে। ভেজা পাতার দিকে আনমনেই তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস গোপন করে বলে, “কিছু না।”
বৃষ্টির ধারা আরেকটু বাড়ে। ছাতার নিচে পৃথিবীর সমস্ত কোলাহল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তারা পাশাপাশি হাঁটতে থাকে।
দীর্ঘক্ষণ পর…

বাড়ি ফিরে সবার সাথে নিয়মমাফিক কুশল বিনিময় পর্ব চুকিয়ে তৌসির আর নাজহা এসে ঢোকে নাজহার ঘরে। বসার ঘরে নাজহার বাবা-চাচাদের সাথে তৌসিরের কথোপকথন অবশ্য শ্বশুর-জামাইয়ের চেয়ে শত্রুর মতোই শুনিয়েছে বেশি কথায় কথায় একে অপরকে বাক্যবাণে বিদ্ধ করার চেষ্টা।
তৌসিরের এবার ফেরার পালা। যাওয়ার আগে সে নাজহার ঘরে আসে। নাজহা এরই মাঝে শাড়ি পাল্টে একটা সুতির থ্রি-পিস গায়ে জড়িয়ে নিয়েছে, আনমনে চোখ বোলাচ্ছে নিজেরই চেনা ঘরের চারধারে।
তৌসির বড্ড অবাক চোখে দেখছে চারপাশ। তার মতো এক সাধারণের ছাপোষা ঘরের তুলনায় এই ঘর অন্তত দশগুণ বেশি সুন্দর আর বিলাসবহুল। দামি বিছানা, ড্রেসিং টেবিল, পেলব সোফা, পেল্লায় আলমারি, নামাজের জন্য সুসজ্জিত আলাদা কর্নার কী নেই এখানে! বড় জানালার পাশে প্রশস্ত বসার জায়গা, খোলামেলা বারান্দা, এসির হিমেল হাওয়া, মিনি ফ্রিজ, বড়সড় টেবিল আর তাক। এত প্রাচুর্য আর আভিজাত্য পেছনে ফেলে নাজহা যে তার ওই সাদামাটা বাড়িতে গিয়ে উঠেছে, সেটাই আজ তৌসিরের কাছে পরম বিস্ময় বলে মনে হচ্ছে!
যাওয়ার সময় ঘনিয়ে আসে। তৌসির নাজহাকে আলতো করে নিজের কাছে টেনে নিয়ে শান্ত স্বরে বলে, “আমি যাইতেছি। সাত-আট দিনের মইধ্যেই চইলা আমু। কোনো সমস্যা হইলে তুমি চইলা যাইয়ো, আমি বাড়ি থাইকা নাযেমরে পাঠামু নে। আর ফোন তো আছেই।”

নাজহার ভেতরটা কেমন একটা ভারী হয়ে আসে। তৌসিরকে কোনোভাবেই যেতে দিতে ইচ্ছে করে না তার; মন চায় দু’হাতে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে রাখতে তৌসির কে। নিজের একটা হাত তৌসিরের গালে রাখে সে, অন্য হাতে মমতায় এলোমেলো হয়ে থাকা সামনের চুলগুলো গুছিয়ে দিয়ে ম্লান কণ্ঠে শুধু বলে, “আচ্ছা!”
নাজহার মনের অবস্থা তৌসিরের অজানা নয়। সে সব বোঝে, কিন্তু কিছু করার নেই। আবেগ আর পিরিতে তো জীবন চলে না, তাকে ফিরতেই হবে। তৌসির একদৃষ্টে নাজহার চোখের দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করে, “কিছু দিবা না?”
নাজহা কপালে হালকা ভাঁজ ফেলে জানতে চায়, “কী দেব?”

“আদর করার লাইগা কিছু সুযোগ!”
তৌসিরের কথা শুনে নাজহার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে প্রশ্রয়ের হাসি ফুটে ওঠে। ওর চোখের পাতায় এখন প্রেমের আবেশ। সে অত্যন্ত আদুরে ভঙ্গিতে ঘাড়ের কাছে লেপ্টে থাকা নিজের অবাধ্য চুলগুলো একপাশে সরিয়ে দেয়। সরিয়ে দিতেই উন্মুক্ত হয় তার শুভ্র, সুডৌল গ্রীবা। নিজের সমস্ত সত্তাকে তৌসিরের কাছে সঁপে দিয়ে এক মোহময় ফিসফিসানিতে নাজহা বলে, “নিন!”
তৌসিরের ভেতরে এই প্রশ্রয়ে এক তীব্র ঝোড়ো হাওয়া বইছে। তৌসির এক টানে নাজহার চিকন কোমরটা দুই হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নিয়ে নাজহার উন্মুক্ত গলায় অতি আবেশে মুখ গুঁজে দেয় । তৌসিরের এই এলোমেলো, তপ্ত নিশ্বাস যখন নাজহার গলার সংবেদনশীল ত্বকে আছড়ে পড়ে, তখন নাজহার মনে হয় ওর শিরায় শিরায় বিদ্যুৎ খেলে যাচ্ছে। এক অনাবিল শিহরণে আবেশে বুজে আসে ওর চোখের পাতা। তার চেনা পৃথিবীটা এক মিষ্টি ঘোরে শূন্যে বিলীন হতে শুরু করে। তৃষ্ণার্ত প্রেমিকের মতো তৌসির নাজহার গলার ভাঁজে ভাঁজে এঁকে দিতে থাকে ভালোবাসার অজস্র উষ্ণ চুম্বন। ভালোবাসার এই তীব্র প্লাবনে নাজহা নিজেও দিশেহারা। ঘোরের মাঝেই সে আলতো করে তৌসিরকে একটু সরিয়ে দেয়, তবে তা দূরে ঠেলে দেওয়ার জন্য নয়। বরং নির্ভরতায় নিজের ডান কাঁধের মসৃণ অংশটুকু তৌসিরের আদরের জন্য প্রসারিত করে দেওয়ার জন্য। তৌসির এই সুযোগেরই তো অপেক্ষায় ছিল একবুক তৃপ্তি নিয়ে সে সেখানে নিজের উষ্ণ ওষ্ঠের ছোঁয়া এঁকে দেয়। তৌসির এক মাতাল ভ্রমর মতো হয়ে গেছে, কোনোভাবেই সে নাজহার মোহময় সান্নিধ্য থেকে নিজেকে সরাতে চায় না। এক জাদুবলে সে নাজহার মাঝেই সম্পূর্ণ ডুবে আছে।

তৌসিরের এই অবাধ্য প্রেমের পাগলামি থেকে নাজহা কিছুতেই নিজেকে ছাড়াতে পারছে না। আদরে আদরে ক্লান্ত, আবেশে জড়ানো নাজহা অবশেষে একরাশ আদুরে অভিমান আর নেশাতুর গলায় তৌসিরের চওড়া কাঁধে আলতো ধাক্কা দিয়ে ফিসফিসিয়ে ওঠে, “উহুহ আস্তে! আর কতক্ষণ?”
তৌসির এবার দু’হাতে নাজহার গাল দুটো আগলে ধরে। গাঢ় স্বরে বলে, “টানা সাত দিন তোমারে কাছে পামু না, তুই বুঝস এর জ্বালা? একটু কাছে থাকতে দে! নড়িস না, বকিস না।”
নাজহা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে চাপা স্বরে বলে, “এখন অন্য কিচ্ছু করা যাবে না। চুমু খান আর সোজা চলে যান। বাকি সব বাড়ি ফেরার পর,,,,,

কথাটা শেষ করার সুযোগই পায় না নাজহা।বাক্যটি সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই নাজহার লাজরাঙা, আরক্তিম অধরপল্লব নিজের প্রবল অধিকারে তুলে নেয় তৌসির। আচমকা এই আবেগের স্ফুরণে নাজহা প্রথমটায় ঈষৎ চমকে ওঠে, তবে পরক্ষণেই তার ভেতরের সমস্ত প্রতিরোধ গলে পানি হয়ে যায়। থরথর করে কাঁপতে থাকা তার পেলব দু’হাত মন্ত্রমুগ্ধের মতো ধীরে ধীরে উঠে আসে তৌসিরের চওড়া, সুঠাম কাঁধে। এরপর সলজ্জ আঙুলগুলো আলতো করে স্লাইড করে তৌসিরের ঘাড়ের পেছনের ঘন চুলে জড়িয়ে যায়,অতি নির্ভরতায় তৌসিরের মাথাটা আরও শক্ত করে নিজের দিকে চেপে ধরে সে। তৌসিরের চুম্বনের তীব্রতার সাথে এক ছন্দে তাল মিলিয়ে নাজহাও সাড়া দিতে শুরু করে। তার কিশোরী মনের সমস্ত আড়ষ্টতা, সমস্ত দ্বিধা নিমিষেই কর্পূরের মতো উবে যায় শূন্যে। তৌসিরের এই পাগলাটে, উষ্ণ ভালোবাসার সে পূর্ণ প্রতিদান দেয় নিজের সর্বস্ব ঢেলে।
নাজহা নিজের শিহরিত শরীরটাকে তৌসিরের প্রশস্ত বুকের সাথে একেবারে লেপ্টে দেয়, যাতে দুজনের মাঝে একচিলতে বাতাসেরও প্রবেশের অধিকার না থাকে। তৌসিরের শার্টের সামনের অংশ শক্ত করে খামচে ধরে নিজেকে কোনোমতে সামলানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে মেয়েটি। কারণ তৌসিরের এই অপ্রতিরোধ্য উন্মাদনার কাছে তার শরীর ক্রমশ অবশ হয়ে আসছে, শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে যায় এক অচেনা মাদকতা। তৌসির এবার নাজহার অধরপল্লব মুক্ত করে তার চিকন কোমর দু’হাতে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। আরও শক্ত করে, আরও নিবিড়ভাবে তাকে নিজের বুকের কাছে টেনে নেয়। নাজহা এবার আর কোনো বাধা দেয় না আদরে করে ওর গলা জড়িয়ে ধরে। হাঁপাতে হাঁপাতেই মিষ্টি হেসে বলে ওঠে, “ছেড়ে দিন এবার, সময় আর পরিস্থিতি দুটোই কিন্তু ধীরে ধীরে হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে।”

তৌসিরের অবুঝ মন কিছুতেই এই মোহময়ী বাঁধন ছাড়তে চাচ্ছে না, কিন্তু বাস্তবতার নিয়মে উপায়ন্তর নেই। বুক চিরে বেরিয়ে আসতে চাওয়া দীর্ঘশ্বাসটা চেপে রেখে ধীরে ধীরে নাজহার বাঁধন আলগা করতে করতে সে বলে, “আসি আমি।”
নাজহা চোখ নামিয়ে সম্মতিসূচক মাথা নেড়ে বলে, “জি।”
তৌসির নাজহার প্রশস্ত কপালে শেষবারের মতো গভীর, দীর্ঘ এক চুম্বন এঁকে দেয়। তারপর একদম ফিসফিস করে ভারী গলায় বলে, “ভালো থেকো। আমি আসি। আর যদি কোনোদিন ফিরতে না পারি, তবে নিজের জন্য নতুন কোনো পথ বেছে নিও।”
বজ্রপাতের মতো কথাটা ছুঁড়ে দিয়েই তৌসির দরজার দিকে পা বাড়ায়। বুকের ভেতর চিনচিনে ব্যথা নিয়ে তৃষ্ণার্ত হয়ে একদৃষ্টে সে তাকিয়ে থাকে নাজহার দিকে। এটাই কি তবে শেষ দেখা? আর কি কখনো দেখা হবে না তার কৈতরীর সাথে? এই মর্মান্তিক ভাবনাতেই তৌসিরের কলিজাখানা এফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে যাচ্ছ। ওদিকে নাজহার সারা শরীর অশুভ আশঙ্কায় থরথর করে কাঁপতে থাকে। ছলছল চোখে সে তৌসিরের দূরে সরে যাওয়া অবয়বের দিকে তাকিয়ে থাকে। কী বলে গেল তৌসির? কেন বলল এমন কথা? নাজহার আর্ত মন ডুকরে কেঁদে ওঠে, চিৎকার করে বলতে চায়, ‘তৌসির, দয়া করে থেকে যান!’

কিন্তু সেই সাধ্য বা অধিকার কোনোটাই তার নেই। তৌসির ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঠিক পূর্বমুহূর্তে দরজার কাছে থমকে দাঁড়িয়ে মৃদু, ধরা গলায় বলে, “গেলাম।”
নাজহার আহত, কান্নায় ভাঙা কণ্ঠ থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই বেরিয়ে আসে প্রতিশ্রুতি, “আমি অপেক্ষায় থাকলাম।”
তৌসির আর পেছনে ফেরে না। সামনে পা বাড়িয়ে নিচে নেমে আসে এবং সবার কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক বিদায় নিয়ে চিরচেনা তালুকদার বাড়ির সীমানা পেরিয়ে যায়।
তৌসিরের প্রস্থানের রেশ কাটতে না কাটতেই ঝড়ের বেগে ঘরে প্রবেশ করে নওমি। ঘরের ভেতর পা রেখেই সে নাজহার দিকে তীক্ষ্ণ, বিষাক্ত দৃষ্টিতে তাকায়। সেই দৃষ্টি যেন নাজহার শরীরটাকে ভস্ম করে দিতে চায়। নাজহা তড়িঘড়ি করে নিজের খসে পড়া ওড়নাটা টেনে গলার কাছে জড়িয়ে নেয় কারণ সে খুব ভালো করেই জানে, সেখানে এখন স্পষ্ট লালচে দাগ বসে আছে। তৌসির নিজের প্রবল প্রেমের চিহ্ন হিসেবে সেখানে দাঁত বসিয়েছে একটু আগেই।

নাজহাকে তটস্থ হয়ে ওড়না দিয়ে নিজেকে ঢাকতে দেখে নওমির কপট রাগ যেন একেবারে চরমে পৌঁছায়। তীব্র শ্লেষ আর নোংরা আক্রোশে ফেটে পড়ে সে। বীভৎস গালাগাল দিয়ে বলে ওঠে, “সংসার করার খুব ভূত চেপেছে তোমার ঘাড়ে, তাই না? সংসার করা আমি বের করছি, বিশ্ব মাগি এদিকে আয়!”

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৪৪

নাজহা জানত, এমন কদর্য কথাই তাকে শুনতে হবে। এই বাড়ির দেওয়ালগুলোর মতোই নওমির এই রূপ তার পরিচিত। তবে আজ আর সে একটুও দমে যায় না। ও দাঁত চেপে শক্ত কণ্ঠে জবাব দেয়, “বিয়ে দিয়েছ, সংসার করব না? এ কেমন কথা! তোমরাই তো জোর গলায় বলেছিলে ঐ সংসারে আমাকে থাকতে হবে!”

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৪৬

1 COMMENT

Comments are closed.