স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৫০
সানজিদা আক্তার মুন্নী
ঈদের দ্বিতীয় প্রহর আজ। দুপুরের আকাশটা আজ সীমাহীন নীল ক্যানভাস যেখানে পেঁজা তুলোর মতো এক টুকরো সাদা মেঘ আপন খেয়ালে ভেসে বেড়াচ্ছে। পাটোয়ারি বাড়ির শতবর্ষী, শ্যাওলা-ধরা প্রাচীন দেয়ালগুলোর প্রতিটি ইটে এখনো লেপ্টে আছে গতকালের আনন্দোৎসবের সুবাস। বাতাসে ম-ম করছে আতর, আগরবাতি আর গোলাপজলের ঘ্রাণ। আজ সকালেই আয়রদা এসেছে তার কাজে পাটোয়ারি বাড়ি। এখন সিতুজা বেগম উঠোনের এক কোণে, ছাতিম গাছের ছায়ায় এক কসমেটিকস-ওয়ালিকে বসিয়েছেন। রঙ-বেরঙের কানের দুল, মিনে করা নাকফুল, কাঁচের চুড়ি আর টিপের ঝাঁপি খুলে বসেছে সে প্রায় এক ফালি আস্ত রঙধনু খসে পড়েছে পাটোয়ারি বাড়ির ধুলোমাখা মাটিতে। সিতুজা একমনে এক জোড়া ঝুমকো পরখ করছিলেন। হঠাৎ কী মনে করে গলা উঁচিয়ে ডাক দেন,
“তৃষ্ণা! ও তৃষ্ণা, এদিকে আয় তো মা! নিজের জন্য কিছু একটা পছন্দ করে নে, ঈদের সময় বলে কথা। ”
তৃষ্ণা বেরিয়ে আসে। বারান্দার এক কোণে কাঠের চেয়ারে বসে আয়রাদ তখন চা খাচ্ছিল। সিতুজার ডাক কানে আসতেই চায়ের কাপটা ধীরলয়ে পিরিচের ওপর নামিয়ে রাখে সে। ভেতরের কোনো এক অদম্য, দুর্নিবার আকর্ষণ তাকে চুম্বকের মতো টেনে নেয় উঠোনের দিকে। আয়রদাও এসে দাঁড়ায় সিতুজা আর তৃষ্ণার পাশে। তারপর হাতে নেয় এক জোড়া রেশমি কাঁচের চুড়ি গাঢ় নীল আর কুচকুচে কালো। আয়রাদ তার স্বাবাভ মতো মাপা প্রশান্ত হাসিটি হেসে চুড়িগুলো বাড়িয়ে ধরে তৃষ্ণার দিকে আর গলা মোলায়েম সুর মিশিয়ে বলে,
“তৃষ্ণা, তুমি এগুলো নাও। তোমায় ভীষণ মানাবে।”
তৃষ্ণার হাতটা মুহূর্তের মধ্যে কেঁপে ওঠে ঠিক পৌষের ভোরের কুয়াশাভেজা কোনো দুর্বল পাতা উত্তুরে হাওয়ায় থরথর করে কেঁপে ওঠে ওর হাত। নিজের বুকের ভেতর হাতুড়ি পেটার মতো ঢিপঢিপ শব্দটা সে নিজের কান দিয়ে স্পষ্ট শুনতে পায়। ওয়াসেমের তো এখনই চলে আসার কথা! সকালেই কড়া গলায় বলে গেছে, দুপুরে বাড়িতে এসে খাবে। যদি একবার, মাত্র একবার সে এই দৃশ্য দেখে ফেলে আয়রাদের হাত থেকে তৃষ্ণা চুড়ি নিচ্ছে তাহলে আজ এই বাড়িতে প্রলয় নেমে আসবে। নিশ্চিত খুন করে ফেলবে ওয়াসেম তৃষ্ণা কে, কিংবা ঘটাবে তার চেয়েও ভয়ংকর, অকল্পনীয় কোনো ধ্বংসলীলা। কিন্তু সবার সামনে দাঁড়িয়ে মুখের ওপর ‘না’-ও তো বলা যায় না! এরমধ্যে ওকে সিতুজাও যে চোখের ইশারায় তাগিদ দিচ্ছেন “নিয়ে নে মা, না করলে অতিথি অপমানিত হবেন।” একদিকে শাশুড়ির প্রচ্ছন্ন, অলঙ্ঘনীয় নির্দেশ, অন্যদিকে অতিথির হাসিমুখ এই দুই ভারী, দমবন্ধ করা পাথরের মাঝখানে তৃষ্ণার অসহায়ত্ব এক পাষাণ জাঁতাকলে পিষ্ট হতে থাকে। তারপর অগত্যা, কাঁপা কাঁপা, রক্তশূন্য আঙুলে সে চুড়িগুলো হাতে তুলে নেয়। নীল চুড়িটা মসৃণ স্পর্শ যখন তার ফর্সা কব্জিতে লাগে, ঠিক তখনই কোনো এক অজানা আশঙ্কায় সে চোখ তুলে সামনের দিকে তাকায়।
আর সেই মুহূর্তেই তার বুকের ভেতরটা ছ্যাঁততত করে ওঠে। হৃৎপিণ্ডটা এক ঝটকায় খসে পড়ে গলার কাছে এসে দলা পাকিয়ে যায়। কিছুটা দূরে, গেটের কাছেই দাঁড়িয়ে আছে ওয়াসেম। স্থির, পাষাণমূর্তি, নিস্তব্ধ এক কালভৈরবের মতো। তার চোখ দুটো জবা ফুলের মতো রক্তবর্ণ মনে হচ্ছে দুই কুণ্ডে দাউদাউ করে জ্বলছে সর্বগ্রাসী দাবানল। মুখে বিন্দুমাত্র অভিব্যক্তি নেই, ঠোঁট দুটো এমন শক্ত করে চেপে আছে মনে হচ্ছে ভেতরের এক ভয়ানক প্রলয়কে সে গায়ের জোরে বন্দি করে রেখেছে। তার ওই নিঃশব্দ, তীক্ষ্ণ, হিংস্র দৃষ্টিই তো তৃষ্ণার শিরা-উপশিরার সমস্ত রক্ত হিম করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। তৃষ্ণা কাঁপতে শুরু করে প্রচণ্ড ঝড়ের মুখে দাঁড়িয়ে থাকা এক অসহায়, ছোট্ট পাখির মতো কাঁপতে থাকে। কাঁপা কাঁপা হাতে সে দ্রুত চুড়িগুলো খুলে ফেলতে চায়। কিন্তু ভয়ে তার আঙুলগুলো অসাড়, অবশ হয়ে গেছে। চুড়িগুলো হাতের মুঠোয় ধরা পড়েও বারবার পিছলে যায় ঘামে ভেজা তালু থেকে। তার আগেই, লম্বা লম্বা, ভারী পদক্ষেপে এগিয়ে আসে ওয়াসেম। ক্ষিপ্রগতিতে, বাজপাখির মতো ছোঁ মেরে সে এক ঝটকায় তৃষ্ণার হাতটা চেপে ধরে এমন প্রচণ্ড, নির্দয়, অমানুষিক চাপে যে মনে হয় কব্জির হাড়গুলো বুঝি এক্ষুনি মড়মড় করে গুঁড়িয়ে যাবে। সিতুজা আর আয়রাদ বোবা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন কারো মুখে কোনো শব্দ নেই, চোখের পলক পড়ছে না তাদের। ওয়াসেমের হাতের বজ্রকঠিন, পৈশাচিক চাপে চুড়িগুলো ‘ক্যাচ ক্যাচ’ শব্দে খানখান হয়ে ভেঙে যায়। কাঁচের তীক্ষ্ণ, ধারালো টুকরোগুলো নির্মমভাবে বিঁধে যায় তৃষ্ণার নরম হাতের চামড়ায় এমনকি ওয়াসেমের নিজের বলিষ্ঠ আঙুলেও। কাঁচগুলো মাংসের গভীরে ঢুকে যায় দুজনের হাত থেকেই ফিনকি দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়তে থাকে লাল, উষ্ণ, জীবন্ত রক্ত। সেই রক্ত ফোঁটায় ফোঁটায় মেঝেতে ঝরে পড়ে আঁকতে থাকে এক ভয়ংকর, এবং মর্মান্তিক চিত্রকর্ম।
তৃষ্ণা তীব্র যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যায়। তার দু’চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে বাঁধভাঙা অশ্রু, গলা চিরে বেরিয়ে আসে এক আর্ত, ভাঙা চিৎকার,
“ছাড়ুন কী করছেন আপনি!”
কিন্তু ওয়াসেমের কানে কোনো শব্দ পৌঁছায় না। সে তৃষ্ণার রক্তাক্ত হাত ধরে টানতে টানতে ঘরের ভেতর নিয়ে দরজটা টাশ করে বন্ধ করে দেয় দিয়ে তৃষ্ণাকে দরজার পাল্লার সাথে শক্ত করে চেপে ধরে ওয়াসেম। তার তপ্ত, রাগী, আগুনের মতো নিঃশ্বাস তৃষ্ণার ভীত মুখে এসে আছড়ে পড়ে। তৃষ্ণার অশ্রুসজল চোখের দিকে তাকিয়ে, দাঁতে দাঁত চেপে হিসহিস করে সে বলে ওঠে,
“তোকে কতবার বলেছিলাম ওর ছায়াও যাতে না মাড়াস! তুই না কথা দিয়েছিলি যাবি না? তাহলে কেন গেলি? ওর দেওয়া চুড়ি কেন হাতে পরলি? বল, এই জানোয়ারের বাচ্চা, বল!”
প্রতিটি শব্দ একেকটা জ্বলন্ত, সিসার চাবুক হয়ে আছড়ে পড়ে তৃষ্ণার নগ্ন আত্মায়। সে হু হু করে ডুকরে কেঁদে ওঠে,
“আমি নিজে থেকে যাইনি! মা ডেকে নিয়ে গেছেন। উনি আমায় দিয়েছেন, আর মা ইশারা করে নিতে বলেছেন দেখেই আমি নিয়েছি। আমার হাতটা ছাড়ুন না, খুব লাগছে।!’
কিন্তু ওয়াসেমের ভেতরে তো এখন এক অন্ধ, সর্বনাশা প্রলয় চলছে। ঈর্ষার লেলিহান আগুন আর তৃষ্ণা কে হারানোর তীব্র ভয়, আর সর্বগ্রাসী দখলের পাগলামি সব মিলেমিশে এক বিষাক্ত, নেশাজাতীয় তরল তৈরি করেছে তার শিরায় শিরায়। সে দাঁত কড়মড় করে, হিংস্র জানোয়ারের মতো গোঙানির সুরে বলে,
“এতদিন আমার ভাইয়েরা ছিল, তাই সবার সামনে তোকে কিছু বলিনি। সেই সুযোগে তোর এত বাড় বেড়েছে? উল্টো করে ঝুলিয়ে যদি কয়েকটা দিই, তাহলে সব শখ, সব দেমাক মিটে যাবে!”
এই বলে সে তৃষ্ণার রক্তাক্ত হাতটা সজোরে ছুড়ে দিয়ে তার নরম চোয়ালটা এক হাতে শক্ত করে চেপে ধরে। ওয়াসেমের শক্ত, নির্দয় আঙুলগুলো বসে যায় তৃষ্ণার ফ্যাকাশে গালে। যন্ত্রণায় তৃষ্ণার কলিজা তো শুকিয়ে কাঠ হয়ে আসছে। কিন্তু ঠিক এই মুহূর্তে, তার বুকের ভেতর কোনো এক নিভৃত, অন্ধকার কোণে হঠাৎ একটা সূক্ষ্ম তার ছিঁড়ে যায় যে তারটা এতদিন তাকে মান-অভিমান, ভয় আর সামাজিকতার বেড়াজালে বাঁচিয়ে রেখেছিল।
এই দমবন্ধ করা জীবন, এই প্রতিদিনের লাঞ্ছনা তার আর একবিন্দুও ভালো লাগে না। দু’মুঠো ভাতের আশায়, একটুখানি আশ্রয়ের জন্য, মানুষের মতো পরিচয়ের কাঙাল হয়ে সে এই অহংকারীর সংসারে পড়ে আছে কিন্তু আজ সেই পরিচয়ের শেষ সুতোটুকুও ছিঁড়ে টুকরো টুকরো হয়ে ধুলোয় মিশে গেল। ভেজা, রক্তাক্ত, শ্রান্ত চোখ দুটো সে সরাসরি তুলে ধরে ওয়াসেমের জ্বলন্ত চোখের ওপর। আজ আর এই দৃষ্টিতে কোনো ভয় নেই, কোনো ত্রাস নেই সেখানে শুধু জমে আছে এক মহাসমুদ্রের সমান পাথরচাপা অভিমান। ক্ষীণ শান্ত কণ্ঠে সে অভিযোগের সুরে বলে,
“দু’মুঠো ভাতের লোভে আপনার সংসারে কুকুরের মতো পড়ে থাকি, তাই বলে আপনি আমায় এভাবে মারবেন? মানুষ তো রাস্তার কুকুরের সাথেও এমন জঘন্য আচরণ করে না আমাকে কুকুর মনে করেও তো অন্তত একটু দয়া করতে পারেন।”
কথাগুলো কোনো বিষাক্ত, ধারালো বর্শার মতো সজোরে বিঁধে যায় ওয়াসেমের বুকে। সে একটা নামহীন প্রচণ্ড ধাক্কা খেয়ে এক পা পিছিয়ে যায়। তার ভেতরের পুরুষালি অহংকার নিমিষেই চূর্ণ হয়ে যায়। তারপর গলা চড়িয়ে, মরিয়া হয়ে, প্রায় আর্তনাদের মতো চিৎকার করে ওঠে,
“আমি তো চাই তোর সাথে ভালো থাকতে! কিন্তু তুই তো সেটার যোগ্য না! তুই যদি আজ ওর সামনে না যেতি, আমি কি তোর সাথে এমন জানোয়ারের মতো আচরণ করতাম?”
তার কণ্ঠে গগনবিদারী, অসহায় চিৎকারে গোটা ঘরটা কেঁপে ওঠে। তৃষ্ণা শান্তভাবে চোখ নামিয়ে নেয়। নিজের অবশ, রক্তাক্ত বাঁ হাত দিয়ে ডান দিকের গাল আর চোখ থেকে পানি মুছে নেয় ধীরলয়ে। আর সেই মোছার সাথে সাথেই তার ফর্সা গালে, কপালে লেপ্টে যায় তাজা রক্তের গাঢ়, লাল দাগ। তার মুখশ্রী এখন এক বিধ্বস্ত, পরিত্যক্ত, রক্তাক্ত যুদ্ধক্ষেত্র যেখানে অশ্রু আর রক্ত মিলেমিশে এক করুণ ট্র্যাজেডি এঁকে রেখেছে। ফ্যাকাশে, প্রাণহীন কণ্ঠে আবার বলে ওঠে তৃষ্ণা,
“আমি নিজে যাইনি। মা ডেকেছেন চুড়ি কেনার জন্য। তখন তিনি এসে চুড়ি দিয়ে বলেছেন এটা পরতে। মা ইশারা করেছেন, তাই নিয়েছি। এর বেশি কিচ্ছু নয়।”
ওয়াসেমের ভেতরে চলতে থাকা প্রলয়ংকরী ঝড়টা এবার ধীরে ধীরে, ক্লান্ত হয়ে শান্ত হতে শুরু করে। মাথার ভেতরের দপদপ করা রাগের আগুনটা নিভে আসে। উঠোনে দৃশ্যটা দেখার পর তার মনে হচ্ছিল সব শেষ। তার পৃথিবী ধ্বংস হয়ে গেছে। তৃষ্ণাকে সে চিরতরে হারিয়ে ফেলেছে। আয়রাদ বুঝি তাকে ছিনিয়ে নিল। এই ভয়, এই তীব্র, মানসিক ব্যাধির মতো নিরাপত্তাহীনতা তাকে দিনের পর দিন কুরে কুরে খাচ্ছিল। আজকের ওই চুড়ি গুলো সেই জমে থাকা ভয়ের বিষাক্ত ফোসকাটাকে এক নিমেষে ফাটিয়ে দিয়েছে। সাদা, ঝকঝকে ফ্লোরে এখন টপ টপ টপ করে রক্ত ঝরছে তৃষ্ণার আঙুলের ডগা হতে। নিস্তব্ধ ঘরে ওই শব্দের প্রতিধ্বনি হচ্ছে বারবার। তৃষ্ণার প্রতিটি ফোঁটা একেকটা না-বলা অভিযোগ, একেকটা চাপা, দীর্ঘশ্বাস হয়ে আছড়ে পড়ছে মেঝেতে। তৃষ্ণা ধীরে ধীরে দরজার দিকে পা বাড়ায়, বাইরে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য। কিন্তু ওয়াসেম খপ করে তার বাঁ হাতটা ধরে আটকে দেয়। তৃষ্ণা শিউরে ওঠে আবার মারবে বুঝি! কাঁপা কাঁপা, ভীতু হরিণীর মতো চোখে সে তাকায় ওয়াসেমের দিকে।
কিন্তু ওয়াসেমের চোখে এবার আর সেই দাবানল নেই। সেখানে এখন বিরাজ করছে অচেনা কোমলতা আর অপ্রকাশিত, বুক-ফাটা অনুতাপের ছায়া। সে এবার তৃষ্ণাকে খুব আলতো করে, যেমন কাঁচের পুতুল ধরছে, সেভাবে টেনে এনে সোফায় বসায়। ধরা গলায়, প্রায় ফিসফিস করে, নিজের অপরাধবোধটুকু গিলে নিয়ে বলে,
“রক্তগুলো পরিষ্কার করতে হবে।”
কথাটা শুনে তৃষ্ণা এক চিলতে ম্লান, করুণ হাসে। এই হাসিতে মিশে থাকে এক আকাশ অভিমান, পাহাড়সমান ক্লান্তি আর অতলস্পর্শী বিষাদ। তৃষ্ণা নিজের ক্ষতবিক্ষত হাতের তালু থেকে সে নিজে নিজেই একে একে কাঁচের তীক্ষ্ণ টুকরোগুলো টেনে টেনে বের করতে থাকে। প্রতিটি টানে তীক্ষ্ণ যন্ত্রণা বিদ্যুৎবেগে ছড়িয়ে যায় শিরায় শিরায় কিন্তু এই শারীরিক যন্ত্রণা তার বুকের ভেতরের রক্তক্ষরণের কাছে আজ একেবারেই তুচ্ছ, একেবারেই মূল্যহীন। পরনের ওড়নার আঁচলের এক প্রান্ত দিয়ে হাতের রক্ত মুছতে মুছতে দৃষ্টি অবনত রেখেই নিচু গলায় বলে,
“আমি নিজেই মুছে নেব। কুকুরের রক্ত দু-এক ফোঁটা আপনাদের দামি ফ্লোরে পড়লে এমন কোনো ক্ষতি হবে না। চিন্তা করবেন না।”
তৃষ্ণার এই কথাটা মরিচা-ধরা ছুরি হয়ে সোজা ওয়াসেমের হৃৎপিণ্ড এফোঁড়-ওফোঁড় করে দেয়। তার ভেতরটা ভেঙে একেবারে চুরমার হয়ে যায়। হু হু করে, চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করে তার। এ কী সর্বনাশ করল সে! যাকে সে নিজের প্রাণের চেয়েও, নিজের অস্তিত্বের চেয়েও বেশি চায় এখন। আর নিজের অন্ধ ঈর্ষার আগুনে পুড়ে তাকেই আজ নিজের হাতে এতটা রক্তাক্ত করল! আসলে ভালোবাসা যখন অন্ধ, বিষাক্ত দখলের পাগলামিতে পরিণত হয়, তখন তা আর ভালোবাসা থাকে না তা হয়ে ওঠে ধ্বংসাত্মক অভিশাপ।
আর একটা শব্দও উচ্চারণ না করে ওয়াসেম। ও এক টানে তৃষ্ণাকে পঁজাকোলা করে কোলে তুলে নেয়। তৃষ্ণা চমকে ওঠে আকস্মিকতায়। ওয়াসেম এবার নরম, কিন্তু পাথরের মতো কণ্ঠে বলে,
“আর হাত লাগাবি না ক্ষতে। চুপচাপ চল আমার সাথে!”
তৃষ্ণা কোল থেকে নেমে যাওয়ার জন্য ছটফট করে,
“আমি যাব না আপনার সাথে কোথাও নামান আমাকে!”
কিন্তু ওয়াসেম আজ তার কোনো বাধাই শোনে না। দু’হাতে শক্ত করে তাকে নিজের চওড়া বুকে আগলে নিয়ে ঘর থেকে, বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে। বাইরে ঈদের ঝকঝকে রোদ্দুর এখনো চারপাশ আলোকিত করে আছে, দূর মাঠে বাচ্চারা নতুন জামা পরে আনন্দে ছুটোছুটি করছে, বাতাসে ভাসছে মেহেদি আর পোলাওয়ের উৎসবমুখর গন্ধ কিন্তু এই দম্পতির পৃথিবীটা এই কোলাহল থেকে সম্পূর্ণ আলাদা, একাকী এক বিষণ্ণ দ্বীপ।
ওদের পারিবারিক হাসপাতালটা বাড়ির ঠিক পাশেই। ওয়াসেম রাস্তায় নেমেই দ্রুত পায়ে, প্রায় ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়াতে শুরু করে। তৃষ্ণা তার বুকের কাছে একটা নিথর, ডানা-ভাঙা পাখির মতো পড়ে থাকে, তার রক্তে ভেজা হাতটা শূন্যে ঝুলতে থাকে অসহায়ভাবে। ওয়াসেমের পরনের শুভ্র, ইস্ত্রি করা শার্টের বুকটা ধীরে ধীরে তৃষ্ণার রক্তে লাল হয়ে যেতে থাকে আঘাত তৃষ্ণার হাতে লাগলেও, রক্ত ঝরছে ওয়াসেমের নিজের বুক চিরে, তার ক্ষতবিক্ষত অন্তর থেকে। হাসপাতালে পা রাখতেই সে পাগলের মতো গলা ফাটিয়ে ডাকতে থাকে ডাক্তারদের।
তিন-চারজন ডাক্তার আর নার্স তড়িঘড়ি করে ছুটে বেরিয়ে আসেন। তাদের মধ্যে পরিচিত এক মহিলা ডাক্তারের দিকে চোখ পড়তেই ওয়াসেম হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে যায়।
“আমার স্ত্রীর হাতে কাঁচের চুড়ি গভীরভাবে বিঁধে গেছে। এগুলো এখনই বের করে যা করার করো যা করার দ্রুত করো!”
তৃষ্ণা এখনো ওয়াসেমের কোলে নিশ্চল হয়ে শুয়ে আছে। তার চোখ দুটো ফ্যাকাসে, তার রক্তমাখা ঠোঁটের কোণে লেপ্টে আছে এক ক্ষীণ, রহস্যময়, করুণ হাসি যে হাসির অর্থ পৃথিবীর কেউ বোঝবে না। হয়তো, সে নিজেও বোঝে না।
ডাক্তার বলেন,”জি স্যার, আপনি উনাকে কেবিনে নিয়ে আসুন!”
একটু পর,,
ডাক্তার হাতে তৃষ্ণার ক্ষতবিক্ষত তালু পরিষ্কার করছেন। একে একে কাঁচের ধারালো টুকরোগুলো চিমটে দিয়ে বের করে আনছেন এমনকি কাঁচের মিহি ধুলো পর্যন্ত যত্নে সরিয়ে নিচ্ছেন। গভীর ক্ষতগুলোতে ওষুধ লাগিয়ে সাদা ব্যান্ডেজ জড়িয়ে পেশাদারিত্বের সাথে কাজ শেষ করেন তিনি। আর তৃষ্ণা একদৃষ্টে মেঝের দিকে তাকিয়ে থাকে, এখন সে এক নিষ্পন্দ অনুভূতিহীন পাথরের মূর্তি। আজ সে আর রক্ত-মাংসের মানুষ নেই, পরিণত হয়েছে এক যান্ত্রিক সত্তায়, যার ভেতরের সব শব্দ, আর্তি আর আকাঙ্ক্ষা চিরতরে নিঃশেষ হয়ে গেছে। আজ, এত মানুষের সামনে, এই হাসপাতালের আলোতে ওয়াসেম তাকে ‘আমার স্ত্রী’ বলে পরিচয় দিল। যে পরিচয়ের জন্য তৃষ্ণা চাতকের মতো তৃষ্ণার্ত প্রহর গুনেছে, আজ সেই কাঙ্ক্ষিত স্বীকৃতি পেয়েও তার ঠোঁটে একচিলতে হাসি ফোটে না। কারণ যে তৃষ্ণা এই পরিচয়ের জন্য দিন গুনেছিল, সে তো আজ অসহনীয় যন্ত্রণার স্তূপের নিচে চাপা পড়ে কবেই মরে গেছে! এখন যা টিকে আছে, তা শুধু এক শক্ত নির্বাক পাথর। প্রথমে নির্মম আঘাত দিয়ে পরে রাজকীয় যত্ন নেওয়ার এই অভিনয়ে সে আর কোনো অর্থ খুঁজে পাচ্ছে না।
তার পাশে বসে ওয়াসেম অস্থিরভাবে নিজের আঙুল মটকাতে থাকে। তার দৃষ্টি আঠার মতো আটকে থাকে তৃষ্ণার ব্যান্ডেজ-মোড়া হাতটিতে। ডাক্তার কাজ শেষ করতে করতে সামান্য ভ্রু কুঁচকে বলেন, “খুব বাজেভাবে বিঁধেছে কাঁচগুলো। দেখে তো মনে হচ্ছে কেউ খুব জোরে কবজি আর তালু কয়েকবার চেপে ধরেছে। এভাবে ইনজুরি হওয়া কিন্তু বেশ ঝুঁকিপূর্ণ।”
কথাগুলো ওয়াসেমের বুকের ভেতর অপরাধবোধের তীক্ষ্ণ কাঁটা হয়ে বিঁধতে থাকে। সে হয়তো মুখ খুলে সত্যিটাই বলে দিত, কিন্তু তার আগেই তৃষ্ণা শান্ত গলায় বলে, “আমি পড়ে গিয়েছিলাম। হাতটা শরীরের নিচে আড়াআড়িভাবে চাপা পড়েছিল, তাই এমন হয়েছে।”
ডাক্তার আর কথা বাড়ান না কিছু ওষুধের নাম লিখে দিয়ে চলে যান। তৃষ্ণা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়। পা বাড়ায় দরজার দিকে। ওয়াসেম এগিয়ে এসে তাকে আবার কোলে তুলে নিতে চাইলে সে হাত তুলে থামিয়ে দেয়। তার দৃষ্টি এখনও মেঝের দিকে নিবদ্ধ। অবলীলায় সে বলে ওঠে, “আমি হেঁটে যেতে পারব। আপনার অহেতুক কষ্ট করতে হবে না।”
কিন্তু ওয়াসেম কবে কার কথা শুনেছে! এক ঝটকায় সে তৃষ্ণাকে আবারও পাঁজাকোলা করে তুলে নেয় নিজের বুকে আর বলে, “তোর মত জানতে চাইনি আমি।”
তৃষ্ণা আর প্রতিবাদ করে না। তার শরীরটা ওয়াসেমের কোলে পাথরের মতো ভারী হয়ে পড়ে থাকে।
বাড়ি ফিরে ওয়াসেম তাকে বিছানায় বসিয়ে রেখে ওষুধ আনতে বাইরে যায়। সেই ফাঁকে ঘরে ঢোকেন সিতুজা বেগম। তৃষ্ণা ডাক্তারের সামনে বলা শেখানো বুলিটাই যন্ত্রের মতো আউড়ে যায়। সিতুজা হয়তো পুরোপুরি বিশ্বাস করেন না, কিন্তু তৃষ্ণার চোখের ওই পাথুরে শূন্যতার দিকে তাকিয়ে আর প্রশ্ন বাড়ানোর সাহস পান না তিনি। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তাকে বিশ্রাম নিতে বলে বেরিয়ে যান।
কিছুক্ষণ পর ওয়াসেম ঘরে ঢুকে এক বীভৎস দৃশ্য দেখে থমকে দাঁড়ায়। তৃষ্ণা তার সেই সদ্য ব্যান্ডেজ বাঁধা, ক্ষতবিক্ষত হাত দিয়েই মেঝেতে পড়ে থাকা নিজের রক্তের দাগ মুছছে। একহাতে ন্যাকড়া চেপে ধরে ঘষে ঘষে সে বোধহয় শুধু মেঝে নয়, নিজের অপমান, নিজের ব্যথা আর নিজের অস্তিত্বের সবটুকু চিহ্ন মুছে ফেলতে চাইছে।
ওয়াসেমের ভেতর প্রথমে রাগের আগুন দপ করে জ্বলে ওঠে, কিন্তু পরমুহূর্তেই সেই আগুনকে ঢেকে ফেলে এক বোবা হাহাকার। সে তৃষ্ণার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে বলে, “তোকে কে মুছতে বলেছে এসব? তোর হাত কাটা। ঔষধ খেয়ে চুপচাপ শুয়ে থাকবি!”
তৃষ্ণা তার দিকে তাকায় না পর্যন্ত। তার হাত চলতেই থাকে আপন ছন্দে। এক মৃতস্বরে সে জবাব দেয়, “আমি এ বাড়ির কাজের লোক। ফ্লোর পরিষ্কার রাখা তো আমারই কাজ।”
এই কথায় ওয়াসেমের ধৈর্যের শেষ বাঁধটুকুও ভেঙে খানখান হয়ে যায়। সে ক্ষিপ্ত হয়ে পাশে রাখা পানির বালতিটায় সজোরে লাথি মারে। বালতিটা ভেঙে ছিটকে যায়, পানি ছড়িয়ে পড়ে সারা ঘরে। ও গর্জে ওঠে, “তুই সবসময় কথার প্যাঁচ ধরিস কেন? যা বলছি, তাই শোন! উঠে গিয়ে চুপচাপ বস!”
এত বড় শব্দেও তৃষ্ণা চমকে ওঠে না। তার চোখের পাতাও কাঁপে না। ভয় নামের আদিম অনুভূতিটুকুও তার ভেতর থেকে চিরতরে শুকিয়ে গেছে। সে নীরবে উঠে দাঁড়ায়, ছড়িয়ে পড়া পানিটুকু মুছে ফেলে এবং ভাঙা বালতিটা তুলে বারান্দায় রেখে আসে।
তার এই নিশ্চুপ সাহস, এই নির্বাক বিদ্রোহ দেখে ওয়াসেম মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে পড়ে। তারপর বারান্দায় গিয়ে সে তৃষ্ণার বাহু শক্ত করে চেপে ধরে, দাঁতে দাঁত চেপে হিসহিস করে ওঠে, “এই বেয়াদবের বাচ্চা! কথা কানে যাচ্ছে না তোর?”
এবারও তৃষ্ণা নিজের হাত ছাড়ানোর কোনো চেষ্টা করে না। পাথরের মতো স্থির গলায় সে সরাসরি ওয়াসেমের চোখে চোখ রাখে। ওর দৃষ্টিতে আজ আর ভয়ের লেশমাত্র নেই, আছে তো শুধু এক মহাসাগর পরিমাণ ক্লান্তি, বীতশ্রদ্ধতা আর জমাট বাঁধা ঘৃণা। সে শান্ত স্বরে বলে, “আপনি আমায় তালাক দিয়ে এই বাড়ি থেকে বের করে দিন। আমার জান, মন আর মস্তিষ্ক, কিচ্ছু আর সহ্য করতে পারছে না আপনার এই তাণ্ডব।”
কথাটা শুনে ওয়াসেমের আঙুলগুলো হঠাৎ থরথর করে কেঁপে ওঠে। পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যাচ্ছে তার। সে তৃষ্ণাকে হিঁচড়ে টেনে নিজের বুকের কাছে নিয়ে আসে। ও চিল্লিয়ে ওঠে “এই! তুই কী বলছিস এসব? মাথা ঠিক আছে তোর?”
তৃষ্ণার উত্তর আসে স্থির, “আমি একদম ঠিক বলছি। আমি আর নিতে পারছি না। রাস্তায় থাকব, ভিক্ষা করে খাব, তবুও আপনার এই সোনার সংসারে কুকুরের মতো পড়ে থাকব না।”
এবার ওয়াসেমের সারা শরীর কেঁপে ওঠে। সে তৃষ্ণার দুই বাহু ধরে পাগলের মতো ঝাঁকিয়ে বলে, “কেন? তুই যাবি কেন? পথে পথে ভিক্ষা করার চেয়ে আমার সঙ্গে থাকা কি বেশি ভালো না?”
তৃষ্ণার শুষ্ক ঠোঁটে তাচ্ছিল্যের এক বিষাদমাখা হাসি ফুটে ওঠে। “আপনার সঙ্গে থাকা? আপনার সঙ্গে কি আমার মানায়? একটা রাস্তার কুকুরের তো রাস্তায় থাকাই জায়েজ। এতদিনে নিজের জায়গাটা চিনতে পেরেছি আমি। আমি এতিম। আর এতিমদের ঘরবাড়ি সংসার হয় না।”
কথাগুলো ওয়াসেমের বুকের ভেতরে শূন্যতা হয়ে বাজতে থাকে। তাও সে মরিয়া হয়ে জিজ্ঞেস করে, “আমি যদি তালাক না দিই?”
তৃষ্ণা নিঃস্পৃহ স্বরে বলে, “আপনার তালাক দেওয়া আর না দেওয়ায় কী আসে যায়? আপনি তো এই বিয়ে কোনোদিন মানেননি।”
এই বাক্য সোজা গিয়ে বিদ্ধ হয় ওয়াসেমের হৃদপিণ্ডে। সে আর কোনো যুক্তি খুঁজে পায় না। হঠাৎ এক উন্মাদের মতো তৃষ্ণাকে বুকের সঙ্গে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে সে। তার চোখে এখন বিকার, “তুই কোথাও যাবি না! আমি তোর সঙ্গে থাকতে চাই।”
তৃষ্ণা তার সর্বশক্তি দিয়ে তাকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। দম বন্ধ হয়ে আসে ওর। হাঁসফাঁস করতে করতে সে বলে, “আপনি সরুন! আমার নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে দম বন্ধ লাগছে।
কিন্তু ওয়াসেম একবিন্দুও সরে না। বরং আরও আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে তাকে। ওর গলায় ভর করে এক হিংস্র জেদ, “লাগলে লাগুক! কিন্তু শুনে রাখ, তুই আমার কাছ থেকে যেতে পারবি না। আমি না তোকে ছাড়ব, না তোকে নিজের করে ধরব, তুই আমার জীবনে একটা জেদ হয়ে থাকবি। তুই যেখানেই যাস, আমি তোকে ঠিক খুঁজে বের করবই।”
তৃষ্ণা কুঁকড়ে গিয়ে ফিসফিস করে ওঠে, “আর যদি মরে যাই?”
এক মুহূর্তের জন্য ওয়াসেমের বুকটা সত্যিই ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। কিন্তু সেই ভাঙনকেও সে নিখুঁতভাবে লুকিয়ে ফেলে এক পাশবিক, বিকারগ্রস্ত হাসির আড়ালে, সে বলে, “মরে যাবি? তাহলে তোর লাশ নিয়ে বসে থাকব আমি। তুই আমাকে চিনিস না, তৃষ্ণা। আমি যে জেদ একবার ধরি, সেটা আর ছাড়ি না। আর এখন তুই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় জেদ।”
তৃষ্ণা সর্বশক্তি দিয়ে তাকে ধাক্কা দেয়। “আমাকে ছাড়ুন!”
কিন্তু ওয়াসেম টলে না। বরং তার আঙুলের অস্থির, এলোমেলো স্পর্শ নেমে আসে তৃষ্ণার কোমরে। দখলদারির এক অন্ধ উন্মাদনায় সে তাকে আরও শক্ত করে চেপে ধরে নিজের সঙ্গে আর বলে, ” তোর উপর অধিকার আছে আমার তোকে ধরার ছাড়ব কেন?”
যন্ত্রণায় তৃষ্ণা ফেটে পড়ে, “কিসের অধিকারের কথা বলছেন আপনি? কাজের লোকের ওপর মনিবের অধিকার?”
আজ ওয়াসেমও তার সব মুখোশ খুলে ফেলে। তার চোখে এক অসুস্থ নেশা ওর কণ্ঠ হতে বেরিয়ে আসে নগ্ন স্বীকারোক্তি, “না, স্বামী হওয়ার অধিকার। তুই আমার বিবাহিতা স্ত্রী, আর আমার স্ত্রীর শরীরের প্রতিটি অঙ্গে ছোঁয়া দেওয়ার অধিকার আমার আছে।”
সন্ধ্যা ঠিক সাতটা। শিকদার বাড়ির রান্নাঘরের ভাজা রুটির সুঘ্রাণ আর চুলার গনগনে আঁচ বিরাজ করছে। এই উষ্ণ আবহের মাঝেই ইকরা, নাজহা আর সিমরানের কথার ফুলঝুরি ফুটছে। কাজের ফাঁকে ফাঁকেই চলছে তাদের খুনসুটি আর অবিরাম হাসি-ঠাট্টা। আজ তো নাজহাকে কথার জাঁতাকলে ফেলে ইকরা সিমরান ওকে কোণঠাসা করে দিয়েছে।
ইকরা আটার দলাটা হাতে নিয়ে গোল করতে করতে চোখ পাকিয়ে জিজ্ঞেস করে, “আচ্ছা, এবার একদম সত্যি করে বল তো! কাল রাতে তোর ঠিক কী হইছিল? অত ডুকরে কাঁদছিলি কেন? আমি তো মাঝরাতে পানি নিতে এসে তোর কান্নার আওয়াজ শুনে ভয়ে প্রায় জ্ঞান হারানোর অবস্থায় ছিলাম! ভেবেছিলাম কোনো বিপদ হলো নাকি!”
নাজহা লজ্জায় একেবারে গুটিয়ে যায়। চুলার আঁচে এমনিতেই ওর ফর্সা গাল দুটো লাল হয়ে ছিল, এখন সেখানে আস্ত একটা টমেটোর আভা ফুটে উঠেছে। তাও ও নিজেকে কোনোরকমে সামলে নিয়ে আমতা আমতা করে বলে, “আরে না না, কী সব বলছো আজেবাজে! আমি তো একটা খারাপ স্বপ্ন দেখছিলাম। তাই হয়তো ঘুমের ঘোরে।”
ওর কথা শেষ হওয়ার আগেই সিমরান ঠোঁটের কোণে এক চিলতে শয়তানি হাসি ঝুলিয়ে বলে ওঠে, “সে তো আমরা খুব ভালো করেই জানি কেমন স্বপ্ন! নিশ্চিত তৌসির ভাই কাঁদিয়েছে। তাই না?”
নাজহা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আটার লেচি কাটতে কাটতে অবশেষে সত্যিটা স্বীকার করে নেয়, “হ্যাঁ, ওই আর কি আমি আসলে ইচ্ছে করেই একটু শব্দ করে কাঁদছিলাম। কারণ, ঝগড়ার পর উনি আমার রাগটা আর ভাঙাননি।”
কথাটা শুনে ইকরা আকাশ থেকে পড়ে। রুটি বেলার বেলনটা হাত থেকে নামিয়ে হতাশ ভঙ্গিতে বলে, “আমার কপালটাই বোধহয় সবচেয়ে খারাপ! আজ জামাই থেকেও নাই। আমার কপালে জুটল একটা আস্ত মাদারচোদ। নয়তো এমন আহ্লাদী কান্না তো আমিই করতাম! হায়রে আমার পোড়া কপাল, এই দুঃখ আমি কোথায় রাখি!”
বলেই সে নাটকীয় কায়দায় কাঁদো কাঁদো মুখ করে পাশ থেকে সিমরানের ওড়নাটা টেনে নিয়ে নিজের চোখ-মুখের ঘাম মুছতে শুরু করে।
সিমরান চমকে উঠে নিজের ওড়নাটা বাঁচাতে বাঁচাতে চিৎকার করে ওঠে, “এই, কী করছ কী তুমি! ছাড়ো বলছি!”
ইকরা এবার নাছোড়বান্দার মতো নাজহার ওড়না টেনে নিয়ে মুখ মুছতে মুছতে বলে, “একটু কষ্ট পেয়ে চোখের পানিটাও কি মুছতে দিবি না তোরা? দেখ, কত বড় হারামি তুই! দে এদিকে।”
নাজহা খিলখিল করে হেসে ফেলে বলে, “হ্যাঁ, তা তো দেখতেই পাচ্ছি কত দুঃখ তোমার! চোখের পানি নয়, তুমি তো কপালের ঘাম মুছছো। আচ্ছা, ওসব বাদ দাও। এবার সত্যি করে বলো তো, ধ্রুব ভাই কি এখনও তোমায় পুরোপুরি মেনে নেয়নি?”
ইকরার মুখের হাসিটা নিমিষেই মিলিয়ে যায়। একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বিষণ্ণ গলায় বলে, “না রে, ও তো আমাকে নিজের সবচেয়ে বড় দুশমন মনে করে! কেন যে এই বিয়েতে বসতে গেলাম, কে জানে! একেবারে সাউয়ার জীবন। ডিভোর্স দিয়ে দেব ওকে। তারপর সুন্দর সুন্দর, রোমান্টিক পুরুষ দেখে বিয়ে করব।”
ইকরার এমন বেপরোয়া কথা শুনে সিমরান আর নাজহা রীতিমতো ভড়কে যায়। চোখ বড় বড় করে একে অপরের দিকে তাকিয়ে অবাক স্বরে বলে, “অ্যাঁ! বলছো কী! তুমি কয়টা বিয়ে করবি শুনি?”
ইকরা এবার আগের বিষণ্ণতা ঝেড়ে ফেলে নিখাদ মজার ছলে বলে, “আরে বেশি না! ডিভোর্সের পর প্রথমে আমার নানাকে বিয়ে করব, তারপর নাজহার দাদাকে। তোর দাদার তো মারাত্মক পাওয়ার ভাই, আমি এই পাওয়ারটা আমিও নিতে চাই। ওই পাওয়ার নেওয়া শেষ হলে তারপর ভেবেচিন্তে একটা সিরিয়াস বিয়ে করব।”
ইকরার এমন আজগুবি আর পাগলাটে কথা শুনে নাজহা আর সিমরান আর নিজেদের আটকে রাখতে পারে না। রান্নাঘরের চারদেয়ালের মধ্যেই হু হু করে খিলখিল হাসিতে ফেটে পড়ে তারা।
ওদের সেই হাসির আওয়াজ বসার ঘর পর্যন্ত স্পষ্ট পৌঁছে যায়। সেখানে সোফায় বসে থাকা তৌসির বিবিজানকে উদ্দেশ্য করে বলে, “বিবিজান, তিনটে ভূতকে যে রান্নাঘরে ঢুকাইছ, একটু নজর রাইখো ওদের দিকে। খিলখিল করে হাসতে হাসতে শেষে রান্নাঘরটাই না আবার উড়ায়া দেয় ওরা!”
বিবিজান প্রশ্রয়ের হাসিতে হাত নেড়ে সস্নেহে বলেন, “আরে বাদ দে তো! মেয়েমানুষের একটু হাসিখুশি থাকাটাই তো স্বভাব। ওরা হাসুক, তুই নিজের কাজে মন দে।”
এদিকে ধ্রুব নিজেদের ঘরে বিছানায় আয়েশ করে শুয়ে আছে। পরনে কেবল একটা কালো রঙের হাঁটু-ঝুল শর্টস। তার সুঠাম, ফর্সা আর পেশিবহুল পুরুষালি শরীরটা ঘরের আলোয় নিখুঁতভাবে স্পষ্ট। বুকের কাছে কয়েক ফোঁটা ঘাম চিকচিক করছে।খুব আরাম করে বালিশে হেলান দিয়ে সে টিভির পর্দায় মগ্ন হয়ে ক্রিকেট ম্যাচ দেখছে। কাজ শেষে ইকরা চা-নাস্তা শেষ করে ঘরে প্রবেশ করে। কিন্তু বিছানায় ধ্রুবর এমন খোলামেলা আর উদাসীন অবস্থা দেখে সে চোখটা আধা-বন্ধ করে তীক্ষ্ণ স্বরে চিৎকার করে ওঠে, “এই! তোমার কি লাজ-লজ্জা বলতে দুনিয়ায় কিছুই নেই? একজন যুবতী মেয়ে ঘরে আছে, আর তুমি এমন বেহায়ার মতো একটা শর্টস পরে বসে আছো?”
ধ্রুব ঘাড় ঘুরিয়ে একবার ইকরার দিকে তাকায়। তারপর নির্বিকার ভঙ্গিতে রিমোট চেপে টিভির সাউন্ডটা মিউট করে দেয়। ইকরার রাগে লাল হয়ে থাকা মুখের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলে, “মেয়েটা আবার কে? তোকে তো আর এমনি এমনি আনিনি। ঢাক-ঢোল পিটিয়ে, আমার চৌদ্দগোষ্ঠী নেচে-গেয়ে, কোমরের হাড়গোড় দুলিয়ে তোকে একেবারে কাবিন করে এই ঘরে তুলেছে। আমার তো পূর্ণ অধিকার আছে নিজের বউয়ের সামনে কোনো কিছু না পরেও হাঁটার। কিন্তু আমি তো আবার ভীষণ ভালো মানুষ, তাই অতটা করলাম না। শুধু শুয়েই আছি।”
ইকরা হনহন করে ধ্রুবর সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। চোখে-মুখে রাজ্যের বিরক্তি নিয়ে বলে, “তোমার হয়েছেটা কী ভাই বলো তো? ইদানীং এমন অদ্ভুত আর পাগল পাগল আচরণ কেন করছ তুমি?”
ধ্রুব এবার একটু নড়েচড়ে বিছানায় সোজা হয়ে বসে। ইকরার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে ঠোঁটের কোণে এক চিলতে দুষ্টু আর বাঁকা হাসি ফুটিয়ে নবলে, “হওয়াতে তো চেয়েছিলান সাত-আটটা পোলাপান। কিন্তু সুযোগ-সুবিধাই তো করে উঠতে পারছি না।”
কথাটা শুনে ইকরার চোখের দৃষ্টিতে আগুন জ্বলে। সে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে চোখ গরম করে বলে, “সাউয়া মারানি কথা রাখো, তোমার মতলবটা কী?”
ধ্রুবর ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা হাসি ফুটে ওঠে। সে ইকরার দিকে অত্যন্ত ধূর্ত ভঙ্গিতে আড়চোখে তাকায়। গলার স্বর কিছুটা খাদে নামিয়ে বলে, “তোর সাথে এমন কিছু একটা করা, যেটায় এই বিছানার কাঠগুলো ভেঙে খানখান হয়ে যায়। আশা করি বুঝতে পেরেছিস। তুই তো আবার আইনস্টাইনের সৎ মা, ব্রেন তোর বেশ ভালো।”
ইকরার চোয়াল শক্ত হয়ে আসে। সে ধ্রুবের দিকে একপ্রকার ঠান্ডা আর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে, “তোমাকে আমি ভালো মনে করতাম ধ্রুব ভাই। কিন্তু তুমি এত শয়তান! ছিঃ! সেদিন আমার ইনার ছিঁড়লে, আজ তুমি কিসব শয়তানি ইঙ্গিত দিচ্ছো!”
ধ্রুব এবার শব্দ করেই নির্লজ্জের মতো হাসে। “আমি তো একটা কালনাগ রে ইকরা। এতদিন তোর সামনে নিজের আসল পরিচয় প্রকাশ করিনি শুধু। আর সেদিনেরটা ছিঁড়ে মজাই লেগেছিল। আয়, আজও করি।”
এ কথা বলেই ধ্রুব নিজের জায়গা থেকে উঠে ধীর পায়ে ইকরার দিকে হাত বাড়ায়। ইকরাও দমে যাওয়ার পাত্রী নয়। সে ক্ষিপ্র গতিতে ধ্রুবর একটা আঙুল শক্ত করে চেপে ধরে শাসায়, “যদি হাত আর একটু এগোয় না, আর আঙুল থাকবে না।”
ধ্রুবর চোখেমুখে কোনো বিকার নেই। সে এটা শুনে অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় নিজের অন্য হাতে ইকরার পরনের আর্জেন্টাইন অ্যাওয়ে জার্সিটা খপ করে টেনে ধরে। সে পালটা শাসায়, “আঙুল ছাড় বলছি, নয়তো জার্সি ছিঁড়ব।”
ইকরার রাগ সপ্তমে চড়ে। সে দাঁত চেপে ধ্রুবের আঙুলটা সজোরে মুচকে দিয়ে বলে, “ছিঁড়লে হাতও থাকবে না।”
ধ্রুব এবার আর কোনো কথা না বাড়িয়ে ইকরার জার্সি ধরে হ্যাঁচকা টানে ওকে একেবারে নিজের চওড়া বুকের কাছে নিয়ে আসে। ইকরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই ধ্রুব সর্বশক্তি দিয়ে টেনে এক নিমেষে ছিঁড়ে নেয় জার্সিটা আর শান্ত গলায় বলে, “দেখ, ছিঁড়লাম।”
আকস্মিক এই ঘটনায় ইকরা তো লজ্জায় আর অপমানে একেবারে কুঁকড়ে যায়। সে তাড়াতাড়ি নিজের ছেঁড়া জার্সির অংশটা দিয়ে উন্মুক্ত শরীর ঢাকতে যায়। ধ্রুবর হাত ছেড়ে নিজের দিকে হাত বাড়াবে, ঠিক তার আগেই ধ্রুব সাপের মতো ক্ষিপ্রতায় ওর দুই হাতের মুঠো নিজের দুই হাতের মধ্যে শক্ত করে বন্দি করে নেয়। তারপর কোনো সুযোগ না দিয়েই ধপাস করে বিছানায় ইকরাকে ফেলে দেয়। সাথে সে নিজেও নিজের শরীরের পুরো ভার নিয়ে তার উপর আছড়ে পড়ে। ইকরা ভয়ে আর রাগে চোখ বড় বড় করে চিল্লায়, “বাইনচোদ গিরি করছো ক্যান? আমার জার্সি ছিঁড়ে ফেলেছো, সবকিছু দেখা যাচ্ছে। সরো বলছি!”
ধ্রুবর গায়ে তো অনেক জোর। সে এক হাতেই ইকরার দুই হাত মাথার উপর শক্ত করে চেপে ধরে। অন্য হাতে ওর ছেঁড়া জার্সিটা একেবারে টেনে ওর শরীর থেকে আলাদা করে নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক সুরে বলে, “তোর তো পাওয়ার নেওয়ার অনেক শখ! এলন মাস্কের বোন, বেলুন মাস্ক! আয়, আমি তোকে কিছু পাওয়ার দিচ্ছি। তোর ধ্রুব ভাই আবার অনেক দয়ালু, তাই তোর শখটা পূরণ করে দেই।”
“তোমার থেকে পাওয়ার আমি নেব না, সরো বলছি। সাউয়ার সাউয়ার করিও না, ধ্রুব ভাই।”
ধ্রুব এক হাতে ওর দুই হাত চেপে ধরে, অন্য হাতে ওর উন্মুক্ত পেটে হাতের আঙুলের অবাধ্য স্পর্শ এঁকে দিতে দিতে বলে,
“আমারটা নিতে চাস না, অথচ চার বিয়ে করে বুড়ো হয়ে মরার পর্যায়ে আসা লোকের কাছে যেতে চাস! আবার রোমান্টিক পুরুষও চাস! আয়, তোর সাথে একটু রোমান্স করি। তুই আমার না-মানা একমাত্র বউরূপী সতিন। তোর ইচ্ছেটা পূরণ করি।”
ইকরা ছটফট করতে থাকে। ধ্রুবের স্পর্শ ইকরাকে উত্তাল করে দিচ্ছে। ইকরা চিৎকার করে ওঠে,
“এই, তুমি আমাদের কথা শুনেছ? লজ্জা নেই? বেহায়া কুত্তা, বাইনচোদ! মানুষের কথা লুকিয়ে শুনো! ছুঁবে না আমাকে, সরো বলছি!”
ধ্রুব তো আর থামবে না। ও ইকরার মুখের সামনে মুখ নিয়ে এসে বলে,
“তুই তো নিজেই বললি, তোর রোমান্টিক পুরুষ দরকার। দেখ, তুই যদি চাস, তাহলে আমি তোর জন্য ফিফটি শেডস অফ গ্রে এর ক্রিশ্চিয়ান বা থ্রি হান্ড্রেড সিক্সটি ফাইভ ডেইজ-এর মাসিমোও হতে পারি, তুই যদি চাস আরকি। আমি কিন্তু খুব ভালো মানুষ।”
ইকরার রাগে পুরো গা রী রী করে জ্বলে, কিন্তু সে এবার আর চিল্লায় না। সে শান্ত থেকে মোক্ষম সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। সুযোগ বুঝেই সে ধ্রুবর উরুতে সজোরে এক লাথি মেরে ওকে নিজের উপর থেকে একপাশে ফেলে দেয়। তারপর মুহূর্তের মধ্যে ধ্রুবের বুকের উপর উঠে বসে এই অনাবৃত অবস্থাতেই ওর নাকে মুখে এলোপাতাড়ি থাপ্পড় বসিয়ে দেয়। সে বাঘিনির মতো চিল্লিয়ে ওঠে, “তোমার সাউয়ার সাহস বেশি বেড়ে গেছে দেখতাছি।”
ধ্রুব যেন থাপ্পড়গুলো খেয়েও কোনো ব্যথা পায় না, বরং কয়েকটা থাপ্পড় সাধ করেই গ্রহণ করে নেয়। তারপর সে অত্যন্ত দক্ষতায় ইকরার দুই হাত আবারো চেপে ধরে। ধ্রুব একদম ইকরার চোখে চোখ রেখে, ঠোঁটে এক চিলতে মুচকি হাসি ঝুলিয়ে ইকরার চিকন উন্মুক্ত কোমরে নিজের দুই হাত রেখে বলে, “ওয়াও! তোকে তো এই অবস্থায় অনেক হট সট লাগছে রে ইকরা। আমার ঘরে এত ছটফটে নায়িকারূপী বউ আছে, আমার তো জানাই ছিল না।”
ধ্রুবর এমন পর্যায়ের কথা শুনে ইকরার মেজাজ পুরোপুরি বিগড়ে যায়। সে রাগের মাথায় ধ্রুবের মুখে এক গাল থুতু ছুঁড়ে মারে আর ফুঁসতে ফুঁসতে বলে, “ছাড় আমাকে! শয়তান, নির্লজ্জ!”
ধ্রুব থুতু হজম করে চোখের পলকে ইকরাকে উলটে বিছানায় আবারো ফেলে দেয়। তারপর নির্লজ্জের মতো ইকরার বুকেই নিজের মুখ ঘষে মুখটা পরিষ্কার করে। ইকরা এবার লজ্জায় আর পার পেয়ে যাওয়ার কোনো উপায় না দেখে জোরে চিৎকার করে ওঠে, “নানিজান! কই তুমি? এই দেখো তোমার শয়তান নাতি আমার সাথে কী করছে!”
ধ্রুব এবার কিছুটা ঘাবড়ে গিয়ে ধমকে ওঠে, “এই হারামি, মুখ বন্ধ কর! গোষ্ঠীসুদ্ধা চলে আসবে। আমি তোর সাথে কী করলাম? আমি তো শুধু মুখ মুছলাম!”
ইকরা এই সুযোগে ধ্রুবের পেটে সজোরে একটা লাথি মেরে নিজেকে ছাড়িয়ে দ্রুত উঠে বসে। তারপর আর এক মুহূর্ত দেরি না করে তাড়াতাড়ি ওয়ার্ডরোব থেকে গিয়ে আরেকটা জার্সি নিয়ে নিজের গায়ে জড়ায়। ও দাঁত চেপে রাগে কাঁপতে কাঁপতে চিৎকার করে, “ধ্রুব ভাই, তোকে আমি ভালো ভাবছিলাম! কিন্তু এখন দেখি তুই একটা মাদারচোদ। আমার যে জার্সি ছিঁড়েছিস, ঐটা কিনে দিস! নয়তো সারাজীবন বাপ ডাকার আক্ষেপ থেকে যাবে।”
ধ্রুব বিছানা থেকে উঠে এসে ধীর পায়ে ইকরার ঠিক পিছনে এসে দাঁড়িয়ে বলে, “তোর কী মনে হয়, আমি দিতে পারব না? তোকে আমার ফকির মনে হয়?”
ইকরা জার্সিটা ঠিকঠাক পরে নিয়ে সটান পিছনে তাকায়। সে তাচ্ছিল্যের সুরে বলে, “মনে হবে ক্যান? তোরা তো জন্মগত ফকির। না ফকির না, তোরা হলি কাঙ্গাল! যারা টাকার পাহাড় থাকার পরও খরচ করে না।”
এই কথা শুনে ধ্রুব কোনো জবাব দেয় না। সে শুধু শক্ত করে ইকরার একটা হাত চেপে ধরে ওকে সোজা রুমের বেলকনিটায় নিয়ে যায়। বেলকনিতে পা রেখেই ইকরা তো রীতিমতো অবাক!ইকরার চোখ কপালে ওঠার জোগাড়। বেলকনির একপাশে অনেকগুলো বড় বড় কার্টন রাখা আছে। গুনে দেখলে প্রায় বিশটা কার্টন একেবারে ঠাসাঠাসি করে রাখা। এতগুলোতে কী থাকতে পারে? ধ্রুব ইকরাকে কার্টনগুলোর দিকে চোখের ইশারা করে বলে, “খোল! খুলে দেখ, যা থাকবে সব তোর।”
ইকরা তো জন্মগত ঘাড়ত্যাড়া। এত সহজে গলে যাওয়ার পাত্রী সে নয়। তাই ও ভ্রু কুঁচকে বলে, “আমি কেন খুলব? তুমি খোলো। যদি ভিতরে বোম থাকে তাহলে?”
ধ্রুব রাগে চোখ কটমট করে একবার ইকরার এই অবুঝ মুখটার দিকে তাকায়। তারপর সে নিজেই এগিয়ে গিয়ে একে একে কার্টনগুলোর মুখ খুলে দেয়। কার্টনের ভেতরের জিনিসগুলো দেখে ইকরা একেবারে বাকরুদ্ধ। সে চোখ বড় বড় করে বিস্ময়ে ধ্রুবের দিকে তাকায়, “অ্যাঁ! এগুলো কার?”
ধ্রুব কার্টনগুলোর পাশ থেকে সোজা হয়ে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে খুব ক্যাজুয়াল ভঙ্গিতে বলে, “গতকাল সালাম করেছিলি তো, তাই এটা তোর ঈদ সালামি।”
ইকরা একবার আড়চোখে ধ্রুবর দিকে তাকায়। ধ্রুবর ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা হালকা প্রশান্তির হাসিটার অর্থ বোঝার চেষ্টা করে সে। আসলে বেলকনি জুড়ে রাখা বাক্সগুলোর ভেতরে থরে থরে সাজানো এক্সক্লুসিভ সব প্রিমিয়াম জার্সি র চোখ-ধাঁধানো কালেকশন।
শুধুমাত্র ক্রিকেট সেকশনেই নজর কাড়ছে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ইংল্যান্ড আর নেদারল্যান্ডসের প্রায় একশোটার মতো প্রিমিয়াম জার্সি। তবে ইকরার জন্য আসল সারপ্রাইজটা হলো ফুটবল কালেকশনে।
বক্সগুলো খুলতেই নীল-মেরুন রঙের ছটা এসে চোখে লাগে ইকরার দেখতে পায় বার্সা সমগ্র কে। বার্সার হোম, অ্যাওয়ে, থার্ড আর ফোর্থ কিট তো জাস্ট বেসিক! এর সাথে পরম যত্নে ভাঁজ করা আছে গোলি কিট, লং স্লিভ, রেট্রো, ক্লাসিক, হেরিটেজ, অ্যানিভার্সারি, সেন্টেনারি, এল ক্লাসিকো এডিশন, সেনয়েরা কিট, কাতালান এডিশন, স্পটিফাই এডিশন, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ কিট, ইউসিএল এডিশন, ম্যাচডে জার্সি, অথেনটিক, স্টেডিয়াম, ভেপার ম্যাচ, প্লেয়ার ইস্যু, ফ্যান ভার্সন, ট্রেনিং, প্রি-ম্যাচ টপ, ওয়ার্ম-আপ শার্ট, স্পেশাল অ্যান্ড লিমিটেড এডিশন, ব্ল্যাকআউট কিট, গোল্ড এডিশন, ড্রাগন এডিশন, ক্রুইফ ট্রিবিউট, মেসি এডিশন থেকে শুরু করে সেইন্ট-লাইক আইকনিক ব্লাউগ্রানা হোম কিট। ১৯৭০ দশক থেকে শুরু করে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বার্সার মেইন কিট ডিজাইন আর প্রতি সিজনের প্লেয়ার ভার্সন মিলিয়ে এই সেকশনে জার্সির সংখ্যা প্রায় ৪,৫০০ পিস! এত নিখুঁত আর বিশাল সংগ্রহ দেখে ইকরার নিঃশ্বাস আটকে আসার উপক্রম হয়।
পরের বক্সগুলোতে আছে আর্জেন্টিনাইন জার্সি। এখানে ক্রেজিনেসটা আরও এক ধাপ ওপরে। আর্জেন্টিনার হোম, অ্যাওয়ে, থার্ড আর গোলকিপার কিটের পাশাপাশি এই রয়্যাল কালেকশনে আছে ওয়ার্ল্ড কাপ, কোপা আমেরিকা, ফিনালিসিমা, চ্যাম্পিয়ন্স এডিশন, গোল্ড চ্যাম্পিয়ন্স, অ্যানিভার্সারি এডিশন, রেট্রো ১৯৭৮ অ্যান্ড ১৯৮৬, ম্যারাডোনা অ্যান্ড মেসি এডিশন, ক্যাম্পেওনেস দেল মুন্ডো, অথেনটিক, ফ্যান ভার্সন, প্লেয়ার ইস্যু, হিট রেডি, অ্যারোরেডি, ম্যাচডে, ট্রেনিং, প্রি-ম্যাচ টপ, ওয়ার্ম-আপ, লং স্লিভ, লিমিটেড অ্যান্ড ব্ল্যাকআউট এডিশন, স্কাই ব্লু ক্লাসিক, থ্রি স্টারস চ্যাম্পিয়ন্স, কাতার ২০২২ উইনার্স, ফিফটিয়েথ অ্যানিভার্সারি এবং সেন্টেনিয়াল স্টাইল কিট। মেইন কিট ডিজাইনের সাথে টুর্নামেন্ট আর সিজনভিত্তিক প্লেয়ার ভার্সন মিলিয়ে এখানে চকচক করছে প্রায় ১,৬১০টা এক্সক্লুসিভ পিস!
ইকরা একটা একটা করে জার্সি আনবক্স করছে আর মন্ত্রমুগ্ধের মতো অবাক চোখে দেখছে। নরম আর প্রিমিয়াম ফ্যাব্রিকের ছোঁয়া তার আঙুলে লাগছে, আর তার কাছে পুরো ব্যাপারটা একদম আনরিয়েল লাগছে। এত বড় আয়োজন আর পাগলামি দেখে একপর্যায়ে ইকরা থ মেরে ফ্লোরে বসে পড়ে। স্পিচলেস হয়ে যায় সে, শুধু একটা কথাই তার মাথায় এখন ক্রমাগত ঘুরপাক খাচ্ছে এত এত এক্সপেন্সিভ আর রেয়ার কালেকশনের পেছনে ধ্রুব ঠিক কত লাখ টাকা ইনভেস্ট করেছে! সব মিলিয়ে জার্সি হবে ৬,২১০ টি।
ইকরার ভেতরের সব রাগ মুহূর্তের মধ্যে যেন উধাও হয়ে যায়। সে খুশিতে আত্মহারা হয়ে লাফিয়ে উঠে ধ্রুবকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। খুশিতে ওর গলা কাঁপছে, ” তুমি এগুলো কিনেছো ধ্রুব ভাই? এমন ঈদ সালামি আমার প্রতিবছর চাই! আমার এক জীবনের আফসোস মেটানোর জন্য তোমাকে একটা চুমু।”
এ কথা বলেই ইকরা আনন্দে গদগদ হয়ে ধ্রুবের গালে আলতো করে একটা চুমু খায়। ধ্রুবর বাইরের রূপ গম্ভীর হলেও, বউয়ের এমন আদরে সে তো মনে মনে খুশিতে তা ধিন ধিন করে নাচছে। সে এই সুযোগে নিজের ইগো বজায় রেখে বলে ওঠে, “অতো আদিখ্যেতার কী আছে? এসব অল্প টাকার কিছু জিনিস। মাত্র ৫২ লাখ খরচ হয়েছে। এসব আর তেমন কী!”
ইকরা এখন আর এসব টাকার অঙ্ক শোনার পাত্রী নয়। এতগুলো নিজের পছন্দের জিনিস আর জার্সি দেখে সে চরম উত্তেজনায় প্রায় জ্ঞান হারিয়ে ফেলার জোগাড়। সে এই খুশির খবরটা সবাইকে জানাতে এক দৌড়ে ঘর থেকে বাইরে চলে আসে নাজহা আর সিমরানকে ডেকে আনতে। ধ্রুব দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ইকরার এই পাগলামি ভরা যাওয়ার পথের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে। ঠোঁটে তার প্রশান্তির হাসি। এই টাকাগুলো ওকে বিবিজান দিয়েছিলেন। বিয়ের সময় সত্তর লাখ দিয়েছিলেন যাতে বিয়ে টা করে ঘুষ হিসেবে। ধ্রুব সে টাকা খরচ করার কোনো জায়গাই পাচ্ছিল না। তাই সে ইকরা কে সারপ্রাইজ দিতে এই ভণ্ডামিটা করল। সে এমনিতে পরিবারের টাকায় নিজে কিছু করে না, নিজের পরিশ্রম দিয়ে নিজের সব খরচ নিজেই চালায়। কারণ তার পরিবারের কোনো টাকাই হালাল না তা সে জানে।
রাত এখন দশটার কাছাকাছি। রাতের খাওয়া দাওয়া চুকিয়ে শিকদার বাড়ির সদর দরজার সামনে ভারী বিচারসভা বসেছে।
একপাশে তৌসির, রুদ্র, নাযেম চাচা আর কেরামত বসে আছে। তাদের ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে আছে তাদের নিজস্ব দলবল। আর ঠিক উল্টোদিকে বসে আছে গ্রামের মেম্বার, তার পেছনেও দাঁড়িয়ে আছে তার কিছু লোক। মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে অপরাধী দুজন মেম্বারের ছোট ভাই এবং তৌসিরের চাচাতো ভাই কাব্য। সামান্য ক্রিকেট খেলা নিয়ে কথা কাটাকাটি, সেখান থেকে হাতাহাতি। আর তারই ফয়সালা করতে রাতের এই জমায়েত।
তৌসির বিরক্তি নিয়ে ওদের দিকে একবার তাকায়। তারপর মেম্বারের দিকে ফিরে তাচ্ছিল্যের সুরে বলে, “কী আর কমু রে আমার সাউয়ার মেম্বার! এইসব ছোট বিষয়েও বিচারে বসতে হয়? এখনকার পোলাপানের ভেতর জিগর নাই। মারামারি কইরা হাত ছিলে, পা ছিলে!”
কথাটা বলেই তৌসির মেম্বারের ভাইয়ের দিকে আর কাব্যের দিকে তাকিয়ে এক ধমক দিয়ে ওঠে, “আরে ব্যাটা, একজনে আরেকজনরে ধরবি, ডিরেক্ট ফাড়বি, ছিঁড়বি! তারপর নাহয় সিরিয়াস হইয়া দেখতাম কী সাউয়া করছস! শুধু নাক-মুখ ফাটাইছোস, এসবের বিচার কী করমু?”
মেম্বার মাথা নিচু করে আমতা আমতা করে বলে, “তৌসির ভাই, কী কমু, লজ্জার কথা। তাও একটা সমাধান কইরা দেন।”
তৌসির নিজের কোমরে রাখা পিস্তলটা বের করতে করতে খুব স্বাভাবিক গলায় জিজ্ঞেস করে, “কে কাকে মারছে?”
উভয় পক্ষ সমস্বরে বলে ওঠে, “দুজনেই দুজনকে মারছে!”
তৌসিরের গলার স্বর এবার একদম ঠান্ডা শোনায়, “তাইলে আর কী বিচার? দুইজনে মারছোস দুইজনরে। নে, কোলাকুলি কইরা নে, হিসাব খতম।”
কিন্তু দুই তরুণ রক্ত এই সিদ্ধান্তে নারাজ। দুজনেই একরোখা গলায় বলে ওঠে, “অসম্ভব!”
তৌসির এই প্রত্যাখ্যান শুনে একবার নাযেম চাচার দিকে তাকায়। নাযেম চাচা ধীরেসুস্থে মাথা নাড়েন। তৌসির এবার মেম্বারের দিকে তাকিয়ে চোখ দিয়ে ইশারা করে। পরিস্থিতি বুঝে মেম্বারও নীরবে মাথা নাড়ায়।
সবুজ সংকেত পেয়েই তৌসির উঠে দাঁড়ায়। চোখের পলকে পিস্তল তুলে ‘ঠাশ’ করে এক রাউন্ড গুলি চালায় মেম্বারের ভাইয়ের পায়ের ঠিক ডান পাশ ঘেঁষে। মুহূর্তেই রক্তের ফোয়ারা ছুটে যায়। পরমুহূর্তেই দ্বিতীয় গুলিটা বেঁধে কাব্যের পায়ে। যন্ত্রণায় আর্তনাদ করে দুজনই মাটিতে লুটিয়ে পড়ে।
তৌসির নির্বিকার ভঙ্গিতে পিস্তলটা লুঙ্গির কোমরে গুঁজে রাখতে রাখতে মেম্বারকে বলে, “যা, বিচার ডান! তোর ভাই তুই নিয়া যা, আমার ভাই আমি নিয়া যাইতাছি।”
এ কথা বলে তৌসির পা দিয়ে বাল্লা মেরে তুলে লুঙ্গির কোঁচ হাতে নিয়ে কোমরে গুঁজে নেয়। তারপর রক্তাক্ত কাব্যকে একরকম পাঁজাকোলা করে কোলে তুলে নিয়ে সদর দরজার দিকে এগোয়।
বসার ঘরে কাব্যকে বসিয়ে মতলব মিয়াকে ডাকে তৌসির। টুকটাক ডাক্তারি জানা মতলব মিয়াকে এসব কাজের জন্যই রাখা হয়েছে। তাকে ব্যান্ডেজ করার নির্দেশ দিয়ে তৌসির দাঁত চেপে কাব্যকে শাসিয়ে বলে, “এরপর যদি দেখছি শুধু এসব ঠুনকো বিষয়ে তোর নামে বিচার আসছে, তাহলে দেখিস কী করি! যার লগে বিবাদ বাধব, একদম ধরে খাইয়া দিবি। খাইয়া আইসা কবি যে আমি একজনরে খাইয়া দিছি, বাকিটা আমরা দেখে নিমু। বুঝছস?”
তৌসিরের বাঘের মতো ধমকে কাব্য ব্যথার মাঝেও কেঁপে উঠে বলে, “হ্যাঁ হ্যাঁ।”
তৌসির এবার কাব্যের মাকে ডেকে কড়া গলায় বলে, “চাচি, ওরে শরবত খাওয়াও। সাথে ফলমূল। কলিজা ছিঁড়ার সাহস থাকার কথা ওর, কিন্তু কারো বালও ছিঁড়তে পারল না ও।”
রক্তাক্ত আর রূঢ় পরিবেশটা পেছনে ফেলে তৌসির নিজের ঘরে এসে ঢোকে। ঘরের ভেতর থেকে নাজহা বেলকনি থেকে পুরো ঘটনাটাই দেখেছে। তৌসির ঘরে পা রাখতেই সে ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলে ওঠে, “আপনি অযথাই গুলি করলেন কেন? বুঝিয়েও তো বলা যেত!”
তৌসির এক পলক নাজহার দিকে তাকিয়ে নিজের পাঞ্জাবিটা খুলতে খুলতে নির্লিপ্ত গলায় বলে, “তুমি ওসব বুঝবা না।”
নাজহা ফেঁস করে ওঠে, “হ্যাঁ, আমি কেন বুঝব? সব তো আপনিই বোঝেন! কাব্য ভাইয়ের পরীক্ষা আর চার-পাঁচদিন পর। হয়তো এখন এই পা নিয়ে সে পরীক্ষা দিতে যাবে কী করে?”
কথাটা শুনে তৌসির পাঞ্জাবিটা বিছানায় ছুঁড়ে মারে। নাজহার দিকে ধীর পায়ে এগিয়ে আসতে আসতে বলে, “তো তোমার কাব্য ভাই পরীক্ষা রাইখা গ্যাঞ্জাম চুদায় ক্যান? আর চুদাইলেও তো ভালোভাবে চুদায় নাই। এই জন্য মারছি, যাতে শিক্ষা হয়।”
নাজহা চরম বিরক্তি নিয়ে বলে, “যত্তসব!”
বলেই সে তৌসিরকে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে চায়। কিন্তু পারে না। তৌসির এক ঝটকায় নাজহার কোমর পেঁচিয়ে ধরে নিজের সাথে একেবারে মিশিয়ে নেয়। তৌসির নাজহাকে নিয়ে বিছানায় আষ্টেপৃষ্ঠে বসে পড়ে। ওর চোখের মণি দুটোতে ক্লান্তির ছায়া, অথচ সেই ক্লান্তির আড়ালে মনে হচ্ছে আগুনের মতো ধিকিধিকি জ্বলছে কিছু একটা। নাজহা তৌসিরের শক্ত হাতটা নিজের মুঠোয় চেপে ধরে ওর কণ্ঠে বিরক্তি আর ক্লান্তির সংমিশ্রণ, “ছাড়ুন তো, এখন একদম মুড নেই আমার।”
তৌসির তো কিছুই শুনতে পায় না। কিংবা শুনেও না শোনার ভান করে থাকাটাই তার এখনকার নেশা। সে নাজহার শুভ্র গালে নাক ঘষে, তারপর ওর ঠোঁটের কোণে আর কপালের অবাধ্য চুলগুলোতে নিজের ঠোঁট বসিয়ে চুমু খেয়ে এক পশলা উষ্ণ দীর্ঘশ্বাস নাজহার কানে ছেড়ে ফিসফিসিয়ে বলে, “কীয়ের মুড? বল তো শুনি কীয়ের মুড নেই তোর?”
তার তপ্ত ঠোঁটের ছোঁয়ায় নাজহার শরীরে এক শিরশিরে হিল্লোল বয়ে যায়। এক অজানা আবেশে সে শিউরে ওঠে, তাও কৃত্রিম আড়ষ্টতায় তৌসিরের কাঁধে আলতো ধাক্কা দিয়ে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বলে, “সরুন তো, কিছু না।”
তৌসির এবার শব্দহীন এক হাসি হাসে। সেই হাসিতে যেমন আছে দুষ্টুমি, তেমনি আছে তৃষ্ণা। সে নাজহার নরম গালটা দাঁত দিয়ে আলতো করে কামড়ে ধরে, তারপর কামিজের কাপড়টা কাঁধ থেকে সরিয়ে দিয়ে ভারী, খসখসে গলায় বলে, “সরার সময় এখন না কৈতরী। সারাটা দিনই তো সরে সরে থাকি। এইটুকু সময় এই রাইতটুকু তো একান্তই আমার, তাই না?”
নাজহার বুকটা হঠাৎই ধক করে ওঠে। এই বুনো লোকটার চোখের গভীরে তাকানোর সাহস ওর কোথায়! তৌসিরের প্রতিটি স্পর্শ ওর শিরায় শিরায় বিদ্যুৎ খেলে দেয়। তৌসির ধীরে ধীরে নাজহার কাপড়ের ভাঁজগুলো আলগা করে দিয়ে নাজহাকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে সে নিজেও ঝুঁকে পড়ে ওর ওপর। তৌসিরের মুখ ডুবে যায় নাজহার গলার খাঁজে, বুকের উষ্ণতায়। সারাদিনের সমস্ত যুদ্ধ, সমস্ত আগ্রাসন আর অস্থিরতা সে তার কৈতরীর শরীরের সুবাসে এসে জুড়িয়ে নিতে চায়। নাজহার ত্বকে তৌসিরের নিঃশ্বাস আছড়ে পড়ে যা গরম, ভারী আর অনিয়ন্ত্রিত।
বাইরে রাতের মৌনতা এখন তুঙ্গে। জানালার পর্দার ফাঁক গলে আসা এক চিলতে রুপোলি জোছনা এসে পড়েছে ওদের দেহের ওপর। সেই আলোয় নাজহার মনে হয়, তৌসিরের চুলগুলো কালো রেশমের মতো চিকচিক করছে। মুহূর্তের এই ঘোর নাজহাকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। সে ধীরে ধীরে নিজের আঙুলগুলো চালিয়ে দেয় তৌসিরের ঘন চুলের অরণ্যে। ওর ভেতরটা হঠাৎই মায়ায় টইটম্বুর হয়ে ওঠে। খুব নরম সুরে, সাবধানে নাজহা জিজ্ঞেস করে, “তৌসির গতকাল রাতে আপনি এত হতাশ ছিলেন কেন? আমি তো এর আগে কখনো আপনাকে এতটা ভেঙে পড়তে দেখিনি। কী হয়েছে আপনার? আমাকে বলবেন আমি আর বিশ্বাসঘাতকতা করব না!”
কথাটা জাদুমন্ত্রের মতো কাজ করে। থমকে যায় তৌসির।
এতক্ষণের এই আগ্রাসী, উন্মত্ত পুরুষটা নিমেষেই অদৃশ্য হয়ে যায়। এক মুহূর্তের জন্য তৌসিরের শরীরটা পাথরের মতো শক্ত হয়ে আসে, তারপর ধীরে ধীরে শিথিল হয়ে যায়। সে নাজহার ওপর থেকে সরে এসে পাশে শুয়ে পড়ে। তবে দূরত্ব বাড়ায় না। বরং সে নাজহাকে দুই হাতে জাপটে ধরে টেনে নেয় নিজের প্রশস্ত আর উষ্ণ বুকের ভেতর। খুব শক্ত করে জড়িয়ে ধরে খুব শক্ত করে।
নাজহা হতবাক হয়ে যায়। কয়েক মুহূর্ত আগেও যে মানুষটা ছিল দাবদাহের মতো উত্তপ্ত, সেই মানুষটা এখন কেন এত ভঙ্গুর, কেন এত শিশুর মতো অসহায় হয়ে যাচ্ছে? সে তৌসিরের বুকে কান পাতে। আর তখনই সে স্পষ্ট শুনতে পায় তৌসিরের হৃদপিণ্ডের অশান্ত, এলোমেলো ধুকপুক শব্দটা। নাজহার মনে হয় এক বিশাল ঝড় বয়ে যাচ্ছে ওই বুকের গহীনে। প্রতিটি স্পন্দনে চাপা পড়ে আছে কোনো এক অকথিত হাহাকার। এই তৌসির তাকে আগলে রাখে পাহাড়ের মতো, অথচ নিজের ভেতরের ক্ষতটা কেন বলতে পারে না? সে আলতো করে তৌসিরের তপ্ত বুকে একটা ভালোবাসার চিহ্ন এঁকে দেয়।
তৌসির ধীরে ধীরে নাজহার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে গাঢ় স্বরে বলে, “তুই বুঝবি না, নাজহা। এই যন্ত্রণা তুই বুঝবি না।”
স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৪৯
নাজহা আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরে তৌসিরকে। বুকের ভেতর মুখ গুঁজে বলে, “বলুন না। আমি কাউকে বলব না আমি বিশ্বাস ভাঙব না।”
তৌসির নাজহার বক্ষের বাঁক মুঠোয় নিয়ে তার কপালে গভীর একটা চুমু খায়। তারপর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, “বিষয়টা বিশ্বাস ভাঙার না। আমি বললে তুই বিশ্বাস করবি না।”
নাজহা তৌসিরের হাতটা নিজের মুঠোয় তুলে নেয়। ওর বুকে মাথা এলিয়ে দিয়ে অবিচল কণ্ঠে বলে, “বিশ্বাস করব আমি। আপনার অতীত নিয়ে আমার কৌতূহল, আমার জানার ইচ্ছে। আমি থাকতে চাই আপনার সাথে, জানতে চাই আপনাকে।”
অন্ধকারে তৌসিরের ঠোঁটে একটা ফিকে হাসি ফুটে ওঠে। সে ফিসফিস করে বলে, “শুনবি তাহলে?”
নাজহা চোখ বন্ধ করে বলে, “হুম।”
