স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৬১
সানজিদা আক্তার মুন্নী
হাসপাতালের লম্বা সাদা করিডোরে অস্থির পায়ে পায়চারি করছে তৌসির। ফ্লুরোসেন্ট আলোর নিচে তার ছায়াটা বারবার দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়ে উঠছে। সারা শরীর তার বরফের মতো হিম হয়ে আসছে, অথচ কপাল বেয়ে নেমে আসছে ঘামের সরু ধারা। ভেতরের অপারেশন থিয়েটার থেকে ভেসে আসছে নাজহার চাপা চিৎকার, আর সেই প্রতিটি আর্তনাদ ধারালো ছুরির মতো এসে বিঁধছে তৌসিরের বুকে। আহা, কী অসহ্য যন্ত্রণা হচ্ছে তার নাজহার। মনে মনে কাতর হয়ে উঠছে সে। বুকের ভেতরটা মুচড়ে উঠছে বারবার।
কিছুক্ষণ আগেই রক্তের ব্যবস্থা করে এসেছে তৌসির। ডাক্তাররা আশ্বস্ত করেছেন, সিজার লাগবে না, কারণ প্রসব ব্যথা স্বাভাবিকভাবেই শুরু হয়েছে। কিন্তু এই খবরেও তার মনে এতটুকু স্বস্তি নেই। একটাই ভয় তাকে ভেতরে ভেতরে কুরে কুরে খাচ্ছে, আর সেটা হলো নাজহাকে হারানোর ভয়। এই ভয়টা হয়তো তার বুকে পাথরের মতো চেপে বসে আছে। নাজহার ব্যথা কিছুটা প্রশমিত করার জন্য এনেস্থিসিয়া দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ডাক্তাররা। নার্সের হাতে চকচকে লম্বা সুঁইটা দেখেই নাজহা আঁতকে উঠেছিল। তার ফ্যাকাশে মুখটা আতঙ্কে আরও সাদা হয়ে গিয়েছিল। ভয়ার্ত চিৎকারে সে আঁকড়ে ধরতে চেয়েছিল কাউকে।তখন তৌসির দ্রুত তার পাশে গিয়েছিল। নাজহার কাঁপতে থাকা হাতটা নিজের দুই হাতের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরে। অন্য হাতে আলতো করে তার ঘামে ভেজা কপালে ভালোবাসার পরশ বুলিয়ে দিয়ে কণ্ঠস্বরে যত্নের আদর মিশিয়ে বলেছে,
“ভয় পেও না, কৈতরী। আমি আছি তোমার পাশে। এই একটুখানি সুঁইয়ের ব্যথা সহ্য করে নাও। তারপর দেখো, তুমি অনেকটা আরাম পাবে।”
এখন চলছে অপেক্ষার পালা। ওর যোনিপথ পুরোপুরি দশ সেন্টিমিটার প্রসারিত না হওয়া পর্যন্ত ডাক্তাররা চূড়ান্ত পদক্ষেপ নিতে পারবেন না। মহিলা ডাক্তাররা নিয়মিত বিরতিতে এসে হাত প্রবেশ করিয়ে পরীক্ষা করে যাচ্ছেন যে খুলল কি না । প্রতিবার পরীক্ষার সময় নাজহার মনে হচ্ছে, যে তার প্রাণপাখি দেহ ছেড়ে উড়াল দিতে চাইছে।
এই অসহ্য যন্ত্রণা সহ্য করার মতো এতটুকু শক্তিও আর অবশিষ্ট নেই তার ক্লান্ত শরীরে। এমনিতেই গর্ভাবস্থার শেষ পর্যায়ে শরীরটা ভীষণ দুর্বল ও ভারী হয়ে আছে, তার ওপর তার গর্ভে বেড়ে উঠেছে তিন তিনটে ছোট্ট প্রাণ। ডাক্তাররা এনেস্থিসিয়া দিয়েছেন এই আশায় যে, তার শরীরে একটু জোর ফিরে আসবে এবং চূড়ান্ত মুহূর্তে সন্তান প্রসবের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি সঞ্চয় করতে পারবে সে। বালিশে এলিয়ে থাকা নাজহার চুলগুলো ঘামে জট পাকিয়ে গেছে। ঠোঁট শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। তবু সে দাঁতে দাঁত চেপে এই যন্ত্রণার সঙ্গে লড়ে যাচ্ছে, কারণ ওপারে যে তিনটে ছোট্ট হৃদস্পন্দন তার সাহসের অপেক্ষায় আছে।
বাইরে করিডোরে তৌসিরের অবস্থা এক অসহায় পথিকের মতো হয়ে গেছে। সে এক পা এগোয় তো দু’পা পিছিয়ে আসে। দেওয়ালে হাত রেখে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়ায়, তারপর আবার অস্থিরভাবে পায়চারি শুরু করে। ঘড়ির কাঁটা আজ থেমে গেছে হয়তো তার জন্য। প্রতিটি সেকেন্ড তার কাছে এখন একেকটা যুগের মতো দীর্ঘ মনে হচ্ছে।
ভেতর থেকে ভেসে আসা নাজহার প্রতিটি আর্তনাদে তার বুকের পাঁজর ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। হাসপাতালের সাদা করিডোরটা আজ তৌসিরের কাছে এক অন্তহীন মরুভূমির মতো লাগছে। তার চোখ দুটো লাল হয়ে ফুলে উঠেছে, চুলগুলো এলোমেলো, শার্টের কলারটা কুঁচকে আছে। বারবার হাত দিয়ে মুখ মুছছে সে, কিন্তু ঘাম আর অশ্রু কোনটা মুছছে, তা সে নিজেও জানে না।ভেতর থেকে যখনই নাজহার চাপা গোঙানি ভেসে আসে, তৌসিরের পা দুটো নিজে থেকেই থমকে যায়। মনে হয়৷ বুকের ভেতরে কেউ বোধহয় মুঠো করে হৃদপিণ্ডটা চেপে ধরছে। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে তার। গলার কাছে একটা দলা পাকিয়ে আছে, যা না পারছে গিলতে, না পারছে ফেলতে।তৌসিরের ভেতরে চলছে এক নিঃশব্দ যুদ্ধ। একদিকে ভয়, অন্যদিকে বিশ্বাস। একদিকে নাজহাকে হারানোর আশঙ্কা, অন্যদিকে তিন সন্তানের মুখ দেখার আকুতি।ওর মনের এক কোণে ফিসফিস করে কেউ বলছে, “যদি কিছু হয়ে যায় ওর? যদি তিনটে সন্তান একসাথে আনতে গিয়ে। ” তৌসির দু’হাতে কান চেপে ধরে। “না, না, না! এসব ভাবব না আমি! আমার কৈতরী ঠিক থাকবে।” কিন্তু পরক্ষণেই আবার সেই দুঃস্বপ্নের ছায়া এসে গ্রাস করে তাকে। তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে নাজহার ফ্যাকাশে মুখ, যা সে কিছুক্ষণ আগেই দেখে এসেছে। ঠোঁট দুটো শুকিয়ে কাঠ, চোখের নিচে কালি, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম।আর সামলাতে পারে না তৌসির নিজেকে। করিডোরের কোণে রাখা বেঞ্চটায় বসে পড়ে সে। কনুই দুটো হাঁটুতে ঠেকিয়ে, দু’হাতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে। পুরুষমানুষের কান্না বড় ভারী হয়। সেই কান্নায় কোনো শব্দ থাকে না, কিন্তু থাকে গভীর এক বেদনার তরঙ্গ, যা সমস্ত শরীর কাঁপিয়ে দেয়। কাঁধ দুটো কেঁপে কেঁপে উঠছে তার। বুকের ভেতর থেকে চাপা গোঙানি বের হয়ে আসছে। আঙুলের ফাঁক বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে অশ্রু, টুপটাপ ঝরে পড়ছে মেঝেতে।
অনেক্ষন পর,,,,,
লেবার রুমের বাতাসে এখন আর অক্সিজেন বলে কিছু অবশিষ্ট নেই। সিলিং থেকে ঝুলে থাকা সার্জিক্যাল লাইটের সাদা আলো নাজহার ঘামে-রক্তে ভেজা, কম্পমান শরীরের ওপর সরাসরি এসে পড়ছে। নাজহার শরীরটা এখন আর কোনো মানুষের শরীর নয়, মনে হচ্ছে সে কোনো অন্ধকার কসাইখানার মার্বেল টেবিলে শুইয়ে রাখা একটি জীবন্ত, ছটফট করতে থাকা মাংসপিণ্ড, যার প্রতিটি ইঞ্চি চামড়া ছিঁড়ে নিচ্ছে অদৃশ্য কোনো শকুনের নখ।
গত দুই ঘণ্টা ধরে এক আক্ষরিক নরককুণ্ডের ভেতর দিয়ে হেঁটে চলেছে নাজহা। তার জরায়ুর ভেতর তিনটি ক্ষুদে, অথচ অদম্য প্রাণ এক অন্ধ, পাশবিক, আদিম আক্রোশে পৃথিবীর আলো দেখার জন্য তার নাড়িভুঁড়ি ছিঁড়েখুঁড়ে, মাংসের প্রাচীর ভেঙে পথ তৈরি করছে। তিনটি ছোট ছোট কোমল শরীর অথচ তাদের সম্মিলিত ওজন মনে হচ্ছে তিনটি বড় পাথরের চাঁই, যা নাজহার তলপেট ফাটিয়ে, চামড়া ছিঁড়ে, হাড় গুঁড়িয়ে নিচে নেমে আসতে চাইছে নিরবচ্ছিন্নভাবে। নাজহার তলপেটের গভীর থেকে এক সর্বনাশা, প্রাণঘাতী, কুণ্ডলী পাকানো মোচড় সাপের মতো পেঁচিয়ে নেমে আসছে নিচের দিকে, মনে হচ্ছে কেউ তার ভেতরে আগুনে লাল করে তোলা একটা লোহার শিক ঢুকিয়ে ধীরে ধীরে, পৈশাচিক আনন্দে মোচড়াচ্ছে, প্রতিটি মোচড়ে পুড়িয়ে দিচ্ছে স্নায়ু। তার জরায়ুর পেশিগুলো অমানুষিক সংকোচনে দলা পাকিয়ে উঠছে, পাথরের মতো শক্ত হয়ে যাচ্ছে নাজহার গোটা পেট, মনে হচ্ছে কেউ লোহার বেড়ি দিয়ে তার কোমর থেকে বুক পর্যন্ত পেঁচিয়ে ধরে টানছে। তার দুই উরুর মাঝখানের নরম মাংসপেশিগুলো অসম্ভব রকম প্রসারিত হতে হতে বোধহয় এখুনি বিকট শব্দে ফেটে চৌচির হয়ে যাবে, চামড়া ছিঁড়ে বেরিয়ে আসবে ভেতরের সব। নাজহার মনে হচ্ছে, তার শরীরটা মাঝখান থেকে দু’ভাগ হয়ে যাচ্ছে, বোধহয় কেউ একটা পাকা ফলকে দু’হাতে চেপে ধরে মাঝখান থেকে চিরে ফেলছে।
“জোর দিন নাজহা! মাথাটা দেখা যাচ্ছে আর একটু পুশ করুন! শাবাশ মা, আর একটু!”
ডাক্তারনি রা ক্রমাগত নাজহা কে এ বলে জোর দিতে বলছেন।নাজহা শুধু দিশেহারার মতো মাথা নাড়ছে এপাশ-ওপাশ, কিন্তু তার শরীর এখন আর তার নিজের নয়। সেটা হয়তো কোনো পরাক্রমশালী, নিষ্ঠুর শক্তির হাতে বন্দি একটি ক্রীড়নক। দু’হাতে বিছানার সাদা চাদরটা প্রাণপণে খামচে ধরছে সে। তার হাতের নখগুলো উল্টে যাওয়ার দশা, কোনো কোনোটা ইতিমধ্যেই গোড়া থেকে ছিঁড়ে গিয়ে রক্ত ঝরাচ্ছে,ওর আঙুলের গাঁটগুলো রক্তশূন্য হয়ে হাড়ের মতো সাদা হয়ে গেছে।
চোয়াল চেপে, দাঁতে দাঁত পিষে, ঠোঁট কামড়ে রক্ত বের করে ফেলে নাজহা শেষ শক্তিটুকু একত্র করছে। পেটের নিচ থেকে, পিঠের মেরুদণ্ড বেয়ে, কোমরের সবচেয়ে গভীর থেকে এক প্রচণ্ড, অমানুষিক চাপ সে ঠেলে দিচ্ছে নিচের দিকে। তার চোখ দুটো কোটর থেকে ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছে, কপালের দু’পাশের শিরাগুলো নীল কেঁচোর মতো ফুলে উঠেছে, ঘাড়ের পেশিগুলো দড়ির মতো শক্ত হয়ে গেছে। এবং তখনই অভিশপ্ত মুহূর্তটা ঘনিয়ে আসে। তার যোনিপথের চারপাশের নরম, কোমল মাংস এক অসহ্য, অসহনীয় টানে প্রসারিত হতে হতে হঠাৎ একটা ভেজা, ভয়ংকর ফড়াৎ শব্দে কোথাও কিছু একটা ছিঁড়ে যায়, মনে হয় রেশমি কাপড় ছিঁড়ছে, কিন্তু সেই রেশম আসলে তার নিজেরই মাংস। জ্বলন্ত, তীক্ষ্ণ, ছুরির ফলার মতো ধারালো যন্ত্রণার এক বিদ্যুৎ-তরঙ্গ নাজহার মেরুদণ্ড বেয়ে বিদ্যুতের গতিতে মাথার তালু পর্যন্ত উঠে আসে,তার চোখের পেছনে ফেটে পড়ে হাজারো সাদা স্ফুলিঙ্গে। তার মনে হয় কেউ তার দুই উরুর সন্ধিস্থলে একটা জ্বলন্ত, লাল হয়ে ওঠা কয়লা চেপে ধরেছে তার চামড়া পুড়ে যাচ্ছে, মাংস সিদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ গোলাকার, পাথরের মতো শক্ত কিছু যা শিশুর মাথার খুলি, তা নাজহার পেলভিক হাড়ের সরু, রক্তাক্ত গলিপথে এসে আটকে যায়। মাথাটা হাড় আর মাংসের মাঝখানে চিড়ে-চ্যাপ্টা হয়ে, ঘষা খেতে খেতে নিচে নামতে চাইছে। শিশুটির শরীর এর প্রতিটি মিলিমিটার অগ্রসর হওয়ার সাথে সাথে নাজহার মনে হচ্ছে তার ভেতরের সবকিছু অন্ত্র, জরায়ু, মূত্রথলি সব একসাথে নিচে নেমে আসছে, ছিঁড়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে।
“আল্লাহ! ” এক অমানুষিক আর্তনাদ বেরিয়ে আসে নাজহার রক্তশূন্য, শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাওয়া গলা চিরে। এই আর্তনাদে আছে দুই ঘণ্টার জমে থাকা সমস্ত যন্ত্রণা, সমস্ত হতাশা। ওর মেরুদণ্ড ধনুকের মতো বেঁকে যায়, পিঠ বিছানা থেকে উঠে আসে, ঘাড়ের শিরাগুলো দড়ির মতো ফুলে ওঠে, চোয়ালের পেশি কাঁপতে থাকে।
তারপর পিচ্ছিল আর অপ্রত্যাশিত মুক্তি সে পায়।জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরির লাভার মতো এক ঝলক উষ্ণ, ঘন রক্ত আর অ্যামনিওটিক ফ্লুইডের প্রবল স্রোতে পিছলে, ছিটকে বেরিয়ে আসে তার প্রথম সন্তান। মাথা, কাঁধ, ধড়, পা পরপর একটানে বেরিয়ে আসে। নাজহার যোনিপথের ছিঁড়ে যাওয়া, দগদগে কাঁচা মাংস থেকে গরম, ঘন, কালচে-লাল রক্ত অবিরাম ধারায় গড়িয়ে নামছে নিতম্বের নিচে জমে থাকা রক্তের পুকুরে।সেই পুকুর ক্রমশ বড় হচ্ছে, চাদর ছাপিয়ে গদিতে শোষিত হচ্ছে, ফোঁটায় ফোঁটায় মেঝেতে টপটপ করে পড়ছে।
ঘরের বিষাক্ত নীরবতা ভেঙে তীক্ষ্ণ প্রাণস্পন্দনে ভরা এক কান্নায় জানান দেয় তাদের প্রথম সন্তান নিজের অস্তিত্ব। ফুটফুটে, লাল টুকটুকে ছেলে হয়েছে তাদের। তার ক্ষুদে মুঠো বাতাসে ছুঁড়ে মারছে সে। নাজহার মনে হয় তার পেট থেকে বোধহয় একটা বড় পাথর সরে গেল, একটা মুহূর্তের জন্য তার ফুসফুসে ফিরে আসে বাতাস, চোখের সামনের অন্ধকার একটু পাতলা হয় কিন্তু সেই স্বস্তি স্থায়ী হয় না এক মুহূর্তও, এক পলকও।প্রথম সন্তানের নাড়ি কাটার আগেই নার্স যখন রক্তাক্ত কাঁচি হাতে এগিয়ে আসেন। তখনি নাজহার ক্লান্ত, বিধ্বস্ত, রক্তাক্ত জরায়ুতে আছড়ে পড়ে দ্বিতীয় প্রসববেদনার এক ধ্বংসাত্মক, পৈশাচিক সুনামি। এবার যন্ত্রণাটা আসে আরও নির্মম, আরও বিকৃত হয়ে কারণ ছিঁড়ে যাওয়া, কাঁচা, দগদগে মাংসের ক্ষতের ঠিক ওপর দিয়েই, সেই একই বিধ্বস্ত পথে, দ্বিতীয় শিশুকে পথ করে নিতে হবে। নতুন কোনো পথ নেই পুরনো ক্ষতকেই আরো ছিঁড়তে হবে, আরো বিস্তৃত করতে হবে। নাজহার দম আটকে আসছে। আর সে পারছে না, কিছুতেই পারছে না। তার ভেতরের ফুসফুস মনে হচ্ছে চুপসে যাচ্ছে কাগজের ব্যাগের মতো, তার চোখের সামনে গাঢ় লাল-কালো রঙের অন্ধকার নাচানাচি করছে। তার কানের ভেতর এক তীব্র, কর্ণভেদী শোঁ-শোঁ শব্দ হচ্ছে।
নাজহার ছিন্নভিন্ন, রক্তাক্ত, দগ্ধ যোনিপথ দিয়ে আবারও এক অকল্পনীয় যন্ত্রণা ধেয়ে আসে। এবার নাজহার মনে হয় তার কাঁচা, খোলা ক্ষতের ঠিক ওপরে কেউ মুঠো মুঠো মোটা দানার লবণ আর কাচের ভাঙা গুঁড়ো ছিটিয়ে দিল। তারপর সেগুলোকে ঘষে ঘষে আরো ভেতরে ঢুকিয়ে দিল। এত যন্ত্রনায় নাজহার প্রতিটি স্নায়ুতন্তু আলাদাভাবে চিৎকার করে উঠছে। দ্বিতীয় শিশুর মাথাটা প্রথম জনের চেয়েও বড় মনে হচ্ছে। তার পেলভিসের হাড় দুটো মনে হয় বাঁকা হয়ে যাবে, ফেটে যাবে। মাতৃত্বের অন্ধ, পাশবিক, আদিম তাড়নায় যা যুক্তির ঊর্ধ্বে, যা চেতনার ঊর্ধ্বে সেই সবকুটু নিয়ে নিজের শরীরের শেষ রক্তবিন্দু আর শক্তিটুকু নিংড়ে নাজহা আবারও চাপ দেয়, প্রাণপণে, মরিয়া হয়ে চাপ দেয়। ওর পেটের পেশিগুলো এমনভাবে সংকুচিত হয় যে, মনে হয় পাঁজরের হাড় ভেঙে গুঁড়ো হয়ে ফুসফুসে ঢুকে যাবে,আর তার হৃৎপিণ্ডে এসে বিঁধবে। যন্ত্রণায় আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে চিৎকার করতে চায় নাজহা, কিন্তু ওর গলা দিয়ে কোনো স্বর বের হয় না। বের হয় শুধু একটা চাপা, পশুর মতো গোঙানি। ওর থুতনি বেয়ে গড়িয়ে পড়ে লালা,রক্ত আর কান্নার মিশ্রিত স্রোত। নাজহার যেহেতু আগ হতেই একটু বেশি কষ্ট বা উত্তেজিত হলে নাক দিয়ে রক্ত পড়ত। সে জন্য ওর নাক মুখ দিয়েও রক্ত বের হয়ে যায়। আরেকটা উষ্ণ, ভেজা, পিচ্ছিল, কাঁপতে থাকা শরীর রক্তের গাঢ় স্রোত ভাসিয়ে পৃথিবীতে নেমে আসে। দ্বিতীয় সন্তান জন্ম নেয় একটু দুর্বল কান্নায়, তাদের আরেকটি ছেলে জন্ম নেয়। নাজহার দুই উরুর মাঝখান থেকে রক্তের একটা গাঢ়, কালচে-লাল স্রোত ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে চাদর ভিজিয়ে নিচে মেঝেতে টপটপ করে পড়তে থাকে।
এবার তৃতীয় জনের পালা। কিন্তু নাজহার শরীর এতক্ষণে এক রক্তাক্ত, ছিন্নভিন্ন মাংসের দলা ছাড়া আর কিছুই নয়। প্রচুর রক্তক্ষরণে তার হাত-পায়ের শিরাগুলো নীল হয়ে আসছে ফ্যাকাশে, প্রাণহীন নীল, ঠিক কোনো মৃতদেহের শিরার মতো। তার আঙুলের ডগাগুলো অবশ, সংবেদনহীন হয়ে গেছে। চাইলেও আর সেগুলো নাড়াতে পারছে না সে।তার ঠোঁটের রঙ ক্রমশ কালচে হয়ে আসছে। জিভটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে তালুতে আটকে যাচ্ছে, কথা বলতে চাইলে গলা থেকে শুধু খরখরে শব্দ বের হচ্ছে।ডাক্তারদের চোখেমুখে এবার সুস্পষ্ট আতঙ্ক এই আতঙ্ক পেশাদারিত্বের মুখোশ ভেদ করে বেরিয়ে এসেছে। মনিটরে হৃৎস্পন্দনের সবুজ রেখাটা ভয়ংকরভাবে অনিয়মিত হয়ে উঠেছে। ব্লাড প্রেশারের সংখ্যাটা হুড়মুড় করে নামছে ৯০/৬০, ৮০/৫০, ৭০/৪০ একটা ভূপাতিত বিমানের মতো।
চারপাশের নার্সদের অস্থির ছোটাছুটি, ধাতব যন্ত্রপাতির ঝনঝনানি, কাচের শিশি ভাঙার তীক্ষ্ণ শব্দ, “ও-নেগেটিভ ব্লাড লাগবে, এখনই! জলদি! ব্লাড ব্যাঙ্ক থেকে দৌড়ে আনো!” এই সব শব্দ, এই সব ছোটাছুটি, এই সব আতঙ্কিত মুখ সবকিছু একসাথে জানান দিচ্ছে পরিস্থিতি এখন আর কারো নিয়ন্ত্রণে নেই, মৃত্যু এখন এই ঘরের দ্বিতীয় বাসিন্দা। অনেক কসরত করে, রক্তমাখা যন্ত্র দিয়ে, প্রশিক্ষিত হাতের কৌশলে তৃতীয় শিশুটির মাথাটুকু বের করা সম্ভব হয়েছে, কিন্তু পুরো শরীরটা বিশেষ করে কাঁধটা মায়ের সংকুচিত, ক্লান্ত, রক্তশূন্য পেলভিসে আটকে আছে, মনে হচ্ছে একটা চাবি যা দরজায় ঢুকেছে কিন্তু ঘুরছে না। শোল্ডার ডিসটোশিয়া প্রসূতিবিদ্যার সবচেয়ে ভয়ংকর জরুরি অবস্থাগুলোর একটি, যেখানে প্রতিটি মুহূর্ত শিশুর জীবন আর মৃত্যুর মধ্যে ব্যবধান গড়ে দেয়।
শিশুর গলার চারপাশে নাড়ি জড়িয়ে আছে কিনা, ডাক্তার রক্তাক্ত, পিচ্ছিল হাত ভেতরে ঢুকিয়ে অন্ধের মতো হাতড়ে বোঝার চেষ্টা করছেন। প্রতিটি স্পর্শ, প্রতিটি ঘষা নাজহার কাঁচা ক্ষতের ভেতর একটা গরম, লাল হয়ে ওঠা শিক ঢুকিয়ে দেওয়ার মতো যন্ত্রণা, আর এই যন্ত্রণা এতই তীব্র যে সেটা আর যন্ত্রণা নেই, রূপান্তরিত হয়ছে অনুভূতিহীনতায়।
চিকিৎসক একজন বলে ওঠেন নাজহাকে,
“নাজহা, আর একবার! মা, আর একটু চেষ্টা করো! তোমার বাচ্চা মা তোমার নিজের রক্ত! নাহলে বাচ্চাটা শ্বাস নিতে পারবে না, মরে যাবে! তোমার বাচ্চা মরে যাবে নাজহা!”
চিকিৎসকদের মরিয়া, কাঁপতে থাকা আকুতি নাজহার কানে পৌঁছাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু তার ক্লান্ত, অক্সিজেনহীন মস্তিষ্ক আর কোনো নির্দেশ মানছে না। তার শরীর আর মনের মধ্যে যে যোগাযোগের সুতোটা ছিল, সেটা হয়তো কোথাও ছিঁড়ে গেছে। সেন্ট্রাল এসির কনকনে, হাড়-কাঁপানো ঠান্ডার মাঝেও তার কপাল, ঘাড়, বুক, তলপেট বেয়ে বিন্দু বিন্দু ঠান্ডা ঘাম ঝরছে এ হয়তে মৃত্যুর ঘাম, সেই ঘাম যা চলে যাওয়ার আগে শরীর শেষবারের মতো বের করে দেয়।
তবু কোন অজানা উৎস থেকে, এক শেষ, অলৌকিক, অবিশ্বাস্য শক্তি জেগে ওঠে নাজহার মধ্যে। মায়ের শরীরের সেই আদিম, প্রাচীন, পশু-প্রবৃত্তি, যা মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও সন্তানকে বাঁচাতে চায় যা লক্ষ লক্ষ বছর ধরে বিবর্তনের মাধ্যমে নারীর প্রতিটি কোষে গেঁথে গেছে তার জোরে নাজহা দাঁতে দাঁত চেপে ধরে চোখ বুজে, পেটের সমস্ত পেশি একসাথে সংকুচিত করে। এতে ওর মেরুদণ্ড ধনুকের মতো বেঁকে যায়, ঘাড়ের রগ ছিঁড়ে যাওয়ার মতো ফুলে ওঠে, মুখ থেকে রক্তমাখা থুতু ছিটকে বেরিয়ে এসে তার নিজেরই গাল ভিজিয়ে দেয়। তবে এতেও তৃতীয় শিশুটি কাঁধ বেরিয়ে আসে না। কারণ নাজহা আর জোর দিতে পারে না একটুও পারে না। চোখের সামনের পৃথিবীটা এবার সত্যি সত্যিই দুলতে শুরু করে নাজহার। নাজহা বুঝে নেয় তার সময় আর নেই। তার সময় যে ফুরিয়ে আসছে। মৃত্যুর এই পরিচিত-অপরিচিত হাতছানি নাজহা তার প্রতিটি কোষে, প্রতিটি অণু-পরমাণুতে অনুভব করতে পারে। সে বুঝতে পারছে, পরিষ্কার বুঝতে পারছে এটাই তার শেষ, এটাই তার অন্তিম মুহূর্ত, এর পরে আর কোনো মুহূর্ত নেই।
মৃত্যুর এই অন্তিম মুহূর্তে এসে নাজহা শেষবারের মতো, অমানুষিক কষ্টে, প্রায়-নিষ্ক্রিয় ফুসফুসে একটিমাত্র সরু সুতোর মতো বাতাস টেনে নিয়ে, রক্তে ভেজা বালিশে লেপ্টে থাকা মাথাটা সামান্য, খুব সামান্য ঘুরিয়ে সে তাকায় উপস্থিত চিকিৎসকদের দিকে আর ফিসফিস করে উচ্চারণ করে,
“আমার স্বামী কে বলুন আসতে। মৃত্যুর আগে তাকে আমি একবার ঘৃণা ভরা দৃষ্টিতে মন ভরে দেখতে চাই।”
একজন নার্স গিয়ে এইটা তৌসিরকে বলেন। উনার মুখে খবরটা শুনে তৌসির হন্তদন্ত হয়ে লেবার রুমে ছুটে আসে। তড়িঘড়ি করে নার্সের দেওয়া মাস্কটা মুখে লাগিয়ে নিয়ে দরজাটা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করে সে। প্রবেশ করেই বেডের ওপর শুয়ে থাকা নাজহার বিবর্ণ, রক্তশূন্য মুখটা দেখে তৌসিরের বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত করে ওঠে। মনে হয়, কেউ বোধহয় তার বুকের ভেতর থেকে প্রাণপাখিটাকে এক ঝটকায় ছিনিয়ে নিয়ে চলে যাচ্ছে দূরে, বহু দূরে, যেখান থেকে আর কোনোদিন ফিরে আসা যায় না সেখানে। চাদরের তলায় নাজহার শরীরটা থরথর করে কাঁপছে, আর এই কম্পনের প্রতিটি তরঙ্গ তৌসিরের সর্বাঙ্গে বিষের মতো ছড়িয়ে পড়ছে। নাজহাকে চিরতরে হারানোর এক ভয়ঙ্কর আশঙ্কা সাপের মতো আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে তাকে, এতটাই শক্ত করে যে তার নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে এখন।
টলটলায়মান পায়ে, প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে তৌসির এগিয়ে যায় নিজের কৈতরীর মাথার কাছে। নাজহার ঠান্ডা, রক্তশূন্য হাতটা নিজের দুই মুঠোয় চেপে ধরে, নিজের শরীরের সমস্ত উষ্ণতা ঢেলে দিয়ে সে নাজহার হাতখানা চেপে ধরে ভেজা গলায় ফিসফিস করে বলে, “কিচ্ছু হবে না, এই তো আমি এসে গেছি, কৈতরী। তুই জোর দে, একটু জোর দে। দেখ, কিচ্ছু হবে না, কিচ্ছু না।”
কথাগুলো বলতে বলতে তার দুচোখ বেয়ে নামতে শুরু করে উষ্ণ অশ্রুর ধারা। এই নোনাজল মাস্কের কিনার বেয়ে গড়িয়ে পড়ে নাজহার হিম হয়ে আসা হাতের ওপর। কিন্তু এই উষ্ণতাও তাকে আর জাগিয়ে তুলতে পারে না।
নাজহা ধীরে ধীরে চোখ মেলে তৌসিরের মুখের দিকে মন ভরে তাকায়। কিছুক্ষণ একদৃষ্টিতে তৌসিরকে দেখে সে, তারপর তার রক্তহীন ঠোঁট দুটো কেঁপে ওঠে মৃদু, প্রায় শোনা যায় না এমন অস্ফুট স্বরে সে তৌসিরকে বলে, “আমার সময় ফুরিয়ে এসেছে তৌসির। আমাকে আপনি মাফ করে দিয়েন। আমি আপনায় মাফ করতে পারলাম না, কিন্তু আমার সব ভুল, সবটুকু স্বার্থপরতার জন্য আপনি আমায় ক্ষমা করে দিয়েন কেমন? আমি চিরতরে চলে যাচ্ছি, একটুখানি মনে রাইখেন আমায়। আমাদের দুটো ছেলে হয়েছে ওদের একটু আগলে রাখইখেন! বিদায়।”
কথা শেষ করেই কাঁপা হাতটা তৌসিরের গাল শেষবারের মতো ছুঁতে চায় নাজহা, কিন্তু তার হাত আর গন্তব্যে পৌঁছায় না। মাঝপথেই অবশ হয়ে নেতিয়ে পড়ে তা শূন্যে ঠিক একটা ভাঙা পাখির ডানার মতো। প্রসব বেদনার এক প্রবল ঢেউ এসে তার গোটা শরীরটাকে মুচড়ে কুঁকড়ে দেয়, দাঁতে দাঁত চেপে অবশিষ্ট প্রাণটুকু এক মুঠোয় জড়ো করে শেষবারের মতো প্রাণপণ জোর দেয় সে।
আর ঠিক সেই মুহূর্তে পৃথিবীর আলোয় প্রথম চোখ মেলে তাদের তৃতীয় সন্তান। ওর তীক্ষ্ণ, ভেজা এক কান্নায় কেঁপে ওঠে ঘরের প্রতিটি দেয়াল। এক ফুটফুটে মেয়ে হয়েছে এবার তাদের, মনে হচ্ছে স্বয়ং নাজহার আরেকটা প্রতিচ্ছবি সে। কিন্তু তার এই প্রথম কান্নার সুর বাতাসে মিলিয়ে যাওয়ার আগেই নাজহার দুনিয়ার সব আলো নিভে যেতে থাকে।
তৌসির ফিরেও তাকায় না নবজাতকের দিকে। তার সমস্ত পৃথিবী এখন নাজহার নিস্তেজ মুখাবয়ে আটকে আছে, যার মুখটা ধীরে ধীরে রঙ হারাচ্ছে। পাগলের মতো দুহাতে নাজহাকে আঁকড়ে ধরে ঝাঁকাতে শুরু করে সে। তার বুকের গভীর থেকে উঠে আসে এক বুকফাটা আর্তনাদ, “এ নাজহা! চোখ খোল! আমাদের একটা মাইয়া হইছে রে, দেখ! চোখ খোল তাড়াতাড়ি! নাজহা!”
কিন্তু তীব্র আফসোস কোনো সাড়া নেই। নাজহা একবার ক্ষীণ চেষ্টা করে চোখের পাতা তুলতে, পারে না। তার নাক মুখ দিয়ে ধীরে ধীরে ফেনা গড়িয়ে পড়তে থাকে সাদা বালিশের ওপর, তার চোখের পাতা দুটো ধীরে ধীরে নেমে আসে একবার, আরেকবার, তারপর চিরতরে।
চোখের সামনে নিজের প্রাণপাখিকে এভাবে নিভে যেতে দেখে তৌসির উন্মাদ হয়ে পড়ে, এক হ্যাঁচকা টানে নাজহাকে বুকের সঙ্গে চেপে ধরে এত শক্ত করে, যে মনে হচ্ছে এই আলিঙ্গনের জোরেই নাজহাকে মৃত্যুর কাছ থেকে ছিনিয়ে আনবে সে। আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে চিৎকার করে ওঠে তৌসির, “নাজহা! এ নাজহা! চোখ খোলা রাখ কৈতরী!”
কিন্তু আফসোস, হায় আফসোস, তার বুকফাটা ডাকের জবাব নাজহা আর দেয় না। তৌসির নাজহার থুতনিতে হাত রেখে, কাঁপতে কাঁপতে, ভাঙা গলায় বিলাপ করতে থাকে, “এ নাজহা, নাজহা! এ নাজহা, চোখ খোল! আমাদের দুইটা পোলা, একটা মাইয়া হইছে! দেখ না একবার, কত সুন্দর হইছে! এক্কেরে তোর মতো হইছে রে কৈতরী, এক্কেরে তোর মতো! চোখ খোল, একটাবার চোখ খোল! তোর কিছু হইলে আমায় ঘেন্নাইবো কে কৈতরী? কে রাগ কইরা মুখ ফিরাইয়া থাকবো? আমার লগে তোর যে বহুত হিসাব বাকি রে, এত সহজে চইলা গেলে আমি কী লইয়া বাঁচমু? নাজহা, উঠ! চোখ খোল কৈতরী, চোখ খোল!”
প্রধান চিকিৎসক ডাক্তার রাবেয়া ভারী পায়ে এগিয়ে আসেন তৌসিরের দিকে। চোখের কোণে তাঁরও পানি চিকচিক করছে। তৌসিরের কাঁধে আলতো একটা হাত রেখে শান্ত, সংযত স্বরে তিনি বলেন, “আমরা সিজারেও ঝুঁকির কথা বলেছিলাম, আর নরমালেও। আপনারা নরমাল ডেলিভারিই চেয়েছিলেন, আর পরিস্থিতি অনুযায়ী সেটাই আমাদের কাছে সেরা মনে হয়েছিল। কিন্তু এমন জটিল কেসে সব সময় মাকে বাঁচানো সম্ভব হয় না। আমরা চেষ্টার কোনো ত্রুটি রাখিনি, বিশ্বাস করুন।”
কথাগুলো কানে পৌঁছাতেই তৌসিরের চারপাশের পৃথিবীটা মুহূর্তে থেমে যায়। তার কাছে সমস্ত শব্দ, সমস্ত আলো, সমস্ত গন্ধ, সব একসঙ্গে নিভে যায়। তার সারা শরীর অসাড়, পাথরের মতো হিম হয়ে আসে। তার বুকের ভেতর থেকে নাজহার নিথর দেহটা ধীরে ধীরে ফসকে গিয়ে লুটিয়ে পড়ে বালিশের ওপর, ঠিক একটা ঝরা ফুলের মতো, যার গন্ধটুকুও আর অবশিষ্ট নেই।
স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৬০
তৌসির নিজেকে আর দাঁড় করিয়ে রাখতে পারে না। ধপাস করে বসে পড়ে সে ঠান্ডা, পাথুরে মেঝেতে। তার হাঁটু দুটো বুকের কাছে গুটিয়ে আসে আপনাআপনি।
চারপাশের এই পৃথিবীটাকে আর সত্যি বলে মনে হচ্ছে না তার। সবকিছু এক নিদারুণ বিভ্রম, এক দীর্ঘ দুঃস্বপ্ন মনে হচ্ছে।
তার নাজহার কী হলো? তার কৈতরীর চোখ দুটো কেন বোজা? তার পৃথিবীর কী হলো, তার প্রাণের কী হলো!
