Home স্নিগ্ধবিষ স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৬৪

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৬৪

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৬৪
সানজিদা আক্তার মুন্নী

তৃষ্ণা প্রাণপণে চেষ্টা করছে ওয়াসেমের বলিষ্ঠ বাহুডোর থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে। কিন্তু ওয়াসেম তো ওয়াসেমই। নিজের জেদের কাছে হার মানার পাত্র সে নয়। উল্টো ওয়াসেমের দুর্বার হাত দুটো আরও দৃঢ়ভাবে চেপে ধরে তৃষ্ণার সরু কোমর, বোধহয় সে প্রতিজ্ঞা করেছে, একচুলও নড়তে দেবে না তৃষ্ণাকে।
ওয়াসেমের চওড়া বুকের সঙ্গে মিশে যায় তৃষ্ণার কম্পিত দেহ। তৃষ্ণা টের পায়, ওয়াসেমের বুকের ভেতর হৃৎপিণ্ডটা কেমন অস্থির ছন্দে বাজছে, ঠিক একটা কোনো অচেনা সুরের মূর্ছনা। ওয়াসেমের গা থেকে ভেসে আসা উষ্ণ শরীরের চেনা গন্ধ তৃষ্ণার মাথাটা কেমন ঝিমঝিম করে ওঠে। বাধা দিতে গিয়েও তৃষ্ণার হাত দুটো যেন অসাড় হয়ে আসে।

তৃষ্ণার সব বাধা, সব অনিচ্ছাকে মুহূর্তেই অগ্রাহ্য করে ওয়াসেম নিজের উষ্ণ ঠোঁট ছুঁইয়ে দেয় তৃষ্ণার নরম গালে। এই স্পর্শে বিদ্যুতের মতো কেঁপে ওঠে তৃষ্ণার সারা শরীর। ওয়াসেমের খোঁচা খোঁচা দাড়ি তৃষ্ণার কোমল গালে ঘষা লাগতেই এক অজানা শিরশিরানি ছড়িয়ে পড়ে তৃষ্ণার শিরায় শিরায়। ওয়াসেমের উষ্ণ নিঃশ্বাস আছড়ে পড়ে তৃষ্ণার কানের লতিতে, গরম, ভারী, নেশাতুর হয়ে। ফিসফিসিয়ে ওয়াসেম বলে ওঠে,
“কেন রে? আমার বাচ্চার মা হতে চাস না তুই?”

কথাটা কানে পৌঁছাতেই তৃষ্ণার বুকের ভেতরটা দাউদাউ করে জ্বলে ওঠে। শরীরে যে মিষ্টি শিহরণটুকু জেগেছিল, মুহূর্তেই তা মিলিয়ে যায় এক তীব্র জ্বালায়। রাগ, অপমান, আর একরাশ ঘৃণায় শরীরের প্রতিটা রক্তকণিকা ফুঁসতে থাকে। যে মানুষটা বিগত দুই বছর তৃষ্ণাকে মানুষ বলেই গণ্য করেনি, যার চোখে তৃষ্ণা ছিল একটা অবাঞ্ছিত ছায়া, সেই মানুষটাই আজ নিজের বংশরক্ষার তাগিদে, নিজের প্রয়োজনের হিসাব মেলাতে এভাবে তৃষ্ণাকে কাছে টানছে! তবে কি এতদিনের ওই সামান্য কোমল আচরণ, অকারণে বকাবকি না করা, দু-একবার চোখ তুলে তাকানো, সবকিছুর পেছনে লুকিয়ে ছিল শুধু এই একটাই স্বার্থ? এই একটাই অভিপ্রায়, একটা সন্তান? সত্যিটা বিদ্যুৎচমকের মতো তৃষ্ণার বুকে এসে বিঁধে যায়। গলার কাছে দলা পাকিয়ে আসে কান্না। তার চোখের কোণে চিকচিক করে ওঠে অভিমানের নোনা জল। বহু কষ্টে সেই জলটুকু তৃষ্ণা আড়াল করে, ঠোঁট কামড়ে নিজেকে সামলে নেয়। কাঁপা কাঁপা গলায় কোনোরকমে বলে ওঠে,

“আ আমাকে ছাড়ুন। এখন না এসব আপনি অসুস্থ।”
তৃষ্ণার আধো-কম্পিত কণ্ঠ, লজ্জায় নত হয়ে আসা চোখের পাতা, গোলাপি হয়ে ওঠা কান দুটো, সব দেখে সশব্দে হেসে ওঠে ওয়াসেম। এই হাসিতে মিশে আছে এক ধরনের উদ্ধত অহংকার, পুরুষালি দম্ভ। ওয়াসেম তৃষ্ণার থুতনিটা আঙুলে তুলে ধরে, একদম কাছাকাছি এনে চোখে চোখ রাখে। ওয়াসেমের এই গভীর, ঘন কালো চোখের দৃষ্টিতে তৃষ্ণা হারিয়ে যেতে থাকে। তাচ্ছিল্যের সুরে ওয়াসেম বলে,
“এসব সামান্য অসুস্থতায় আমার কোনো বাল আসবে-যাবে না। আয় এদিকে! নিজে উঠে আয়, আমার হাতে ব্যথা, তোকে টেনে তুলতে পারব না আমি।”
ওয়াসেমের এমন নির্লজ্জ, কাঁচা কথা শুনে তৃষ্ণা আরও কুঁকড়ে যায়। লজ্জা আর ঘৃণায় গা রি রি করে ওঠে তার। ওয়াসেমের বুকের ওমটুকু, শরীরের এই মাদকতাময় উষ্ণতা, সবকিছু হঠাৎ বিষের মতো ঠেকে তৃষ্ণার কাছে। এক ঝটকায় নিজেকে ছাড়িয়ে তৃষ্ণা অনেকটা দূরে সরে যায়। এলোমেলো হয়ে যাওয়া ওড়নাটা তাড়াতাড়ি বুকের ওপর টেনে নেয়। তার বুকের ভেতরটা এখনো ঢিপঢিপ করছে। শঙ্কিত, কম্পিত গলায় সে বলে,

“আ আজ না। আমার ভালো লাগছে না এসব।”
তৃষ্ণার এই ছটফটানি, এই প্রত্যাখ্যান ওয়াসেমের কাছে ভীষণ বিরক্তিকর ঠেকে। কপালের রগ ফুলে ওঠে ওয়াসেমের। চোয়ালটা শক্ত হয়ে আসে, ঘন ভ্রু জোড়া কুঁচকে ওঠে। মেজাজ হারিয়ে বিরক্তি নিয়েই ওয়াসেম তৃষ্ণাকে ছেড়ে দেয়। কঠোর, তিক্ত গলায় ধমকে ওঠে,
“আজকের মতো ছেড়ে দিলাম। সুস্থ হই আগে, তারপর দেখাব, ভালো-খারাপ কীভাবে লাগাতে হয়!”
তৃষ্ণা আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়ায় না। নিঃশব্দে মাথায় ওড়না টেনে দিয়ে দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে তৃষ্ণা।

ঘর থেকে বেরিয়ে করিডরের এক কোণে এসে দাঁড়ায় তৃষ্ণা। রেলিং ধরে থাকা তৃষ্ণার আঙুলগুলো এখনো কাঁপছে। তার বুকটা ধড়ফড় করছে, নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। গালে এখনো লেগে আছে ওয়াসেমের ঠোঁটের সেই উষ্ণ স্পর্শের রেশ, কানের কাছে বাজছে ওয়াসেমের সেই ভারী নিঃশ্বাসের শব্দ। তৃষ্ণা কাঁপা হাতে গালটা মুছে নেয়, হয়তো এই স্পর্শটুকু মুছে ফেলতে পারলেই তার মনের ভেতরের এই ঝড়টাও থেমে যাবে। কিন্তু থামে না। ওয়াসেমের আজকের এই আচরণ তৃষ্ণার মনটাকে আরও বেশি বিষিয়ে তুলেছে। একসময় যে ওয়াসেমের দু-চোখের বিষ ছিল তৃষ্ণা, যার উপস্থিতিতেই ওয়াসেমের ভ্রু কুঁচকে যেত, হয়তো এখনো সে-ই আছে। কিছুই বদলায়নি। অথচ সেই মানুষটাই আজ তৃষ্ণাকে এত কাছে টানছে! ভালোবেসে নয়, শুধু নিজের জৈবিক চাহিদা মেটাতে, বংশধর পেতে!

কত কটু কথার আঘাত, কত অবজ্ঞার তীর, কত রাতের নীরব কান্না, কত নির্মম উপেক্ষা, সব কিছু এই ওয়াসেমই তো তৃষ্ণাকে উপহার দিয়েছে! আজ নিজের প্রয়োজনে দেখানো দু-একটা মেকি ভালো আচরণ দিয়ে কি সেই দগদগে ঘা মুছে ফেলা যায়? সেই ক্ষতগুলো তো আর ফুলের পাপড়ি নয় যে হাওয়ায় উড়ে যাবে, ওগুলো তো গেঁথে আছে হাড়ের ভেতর, রক্তের প্রতিটি ফোঁটায়। না, কিছুতেই সম্ভব নয়। তা একেবারেই অসাধ্য।তবু কেন একটু আগে ওয়াসেমের ওই বাহুডোরে নিজেকে এতটা নিরাপদ মনে হয়েছিল? কেন ওয়াসেমের বুকের ওই ওম, কেন ওয়াসেমের ওই উষ্ণ নিঃশ্বাসে তৃষ্ণার শরীরের প্রতিটা লোমকূপ শিহরিত হয়ে উঠেছিল? এ কেমন দুর্বলতা? এ কেমন বিশ্বাসঘাতকতা নিজের মনের সঙ্গে! তৃষ্ণা নিজেই নিজেকে ধিক্কার দেয়। ওড়নার আঁচলে চোখ মুছে নিজেকে প্রশ্ন করে,
“ভালোবাসা ছাড়া কি শুধু প্রয়োজনের সম্পর্ক টিকে থাকতে পারে? আর যদি টিকেও যায়, তার নাম কি সত্যিই সংসার?”
এর উত্তর জানা নেই তৃষ্ণার। শুধু জানে, আজ রাতে আবারও ঘুম আসবে না তার চোখে। বালিশের কোণটা আবারও ভিজে উঠবে নীরব অশ্রুতে।

দুপুরের রোদ সীসার মতো ভারী হয়ে নেমে এসেছে শিকদার বাড়ির উঠোনে। আকাশটা ধবধবে সাদা, একফোঁটা মেঘের চিহ্ন নেই কোথাও। বাতাসে কেমন এক ভ্যাপসা গরম। বাড়ির নিচতলার বারান্দা থেকে ভেসে আসছে বাচ্চাদের কলকাকলি, বড়দের খিলখিল হাসি, কারও মৃদু ধমক আর প্রশ্রয়ের গুঞ্জন। পুরো বাড়িটা একটা জীবন্ত সুর হয়ে বাজছে, আর এই সুরের কারণ তৌসিরের দশ দিনের তিন সন্তান।
ঠিক এই সময়ে গেট ঠেলে ভেতরে ঢোকে তৌসির। তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম, শার্টের কলার সামান্য ভেজা, চোখে-মুখে দীর্ঘ মিটিংয়ের ক্লান্তি স্পষ্ট। জুতোর শব্দ চেপে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠে সে, নিজের ঘরের দরজাটা আধখোলা দেখে ভেতরে পা রাখে, আর ঠিক তখনই থমকে দাঁড়ায় সে।

বিছানার ঠিক মাঝখানটায়, ধবধবে সাদা চাদরের ওপর অঘোরে ঘুমিয়ে আছে ছোট্ট তওশি, তার মেয়ে, তার প্রাণ। জানালার পর্দার ফাঁক গলে একটুকরো নরম আলো এসে পড়েছে ছোট্ট মেয়েটার গালে মনে হয় কেউ ইচ্ছে করেই আলোটাকে ওইখানে সরিয়ে রেখেছে। ঘরটা নিঃশব্দ, শুধু সিলিং ফ্যানের মৃদু ঘরঘর শব্দ, ব্যালকনি থেকে ভেসে আসা ভেজা কাপড়ের টুপটাপ ফোঁটা পড়ার আওয়াজ। নাজহা ঘরে নেই, নাজহা ব্যালকনিতে কাপড় মেলছে। ছেলে দুজন বাইরে, বাড়ির সবার কাছে। সিমরান এইমাত্র তওশিকে এখানে শুইয়ে দিয়ে গেছে। আহা! কী মায়াবী তৌসিরের মেয়েটা! ঘুমন্ত মুখটার দিকে তাকিয়ে তৌসিরের বুকটা কেমন এক মিহি কষ্টে ভরে ওঠে, এ কষ্ট আসলে ভালোবাসার আরেক নাম। তওশির ঠোঁট দুটো আধখোলা, বুকের ওঠানামায় সরু নিঃশ্বাসের ছন্দ। মনে হয় সদ্য ফোটা এক স্নিগ্ধ ফুলের কুঁড়ি, কিংবা চাঁদেরই এক উজ্জ্বল একাংশ দিনদুপুরে নেমে এসেছে বিছানার ওপরে। তৌসিরের বুক চিরে বেরিয়ে আসে একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস।

তৌসির পা টিপে টিপে, প্রায় চোরের মতো সন্তর্পণে বিছানার দিকে এগিয়ে যায়। গিয়ে চারপাশটা একবার সাবধানী চোখে দেখে নিয়ে পকেট থেকে বের করে ছোট্ট এক রঙিন চুড়ির সেট। লাল, সবুজ, সোনালি রোদের আলো পড়ে চুড়িগুলো ঝিলিক দিয়ে ওঠে তৌসিরের হাতে। আজ মিটিং থেকে ফেরার পথে বাজারের ধুলোমাখা এক দোকানের সামনে গাড়ি একটু থেমেছিল। কাচের বয়ামে সাজানো এই চুড়িগুলো চোখে পড়তেই মেয়ের ছোট্ট কচি হাতটা ভেসে উঠেছিল তৌসিরের মনে। আর মন ভাসতেই একশো টাকার নোটটা বাড়িয়ে দিতে সে দুবার ভাবেনি। নিজের সন্তানদের জন্য তৌসির টাকা খরচ করবে, এতে বাধা নেই, তবে অন্য ক্ষেত্রে হিসেব থাকবে।

খুব সাবধানে, প্রায় দম বন্ধ করে তৌসির তওশির ডান হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় তুলে নেয়। কী নরম, কী উষ্ণ এই ছোট্ট হাতখানা, এক টুকরো তুলোর বলের মতো, একটু জোরে চাপ দিলেই মিলিয়ে যাবে। এরপর পরম মমতায়, এক গভীর ধ্যানমগ্নতায় সে একটা একটা করে চুড়ি পরিয়ে দেয় মেয়ের হাতে। চুড়িগুলো সাইজে বেশ ছোট, তবু তওশির কচি হাতের তুলনায় খানিকটা বড়ই হয়ে যায় কব্জির কাছে এসে ঢিলে হয়ে ঝুলে থাকে। কিন্তু ওইটুকু চুড়ি পরা হাতেই তৌসিরের মেয়েটাকে অপরূপ সুন্দর লাগছে, কোনো ছবিতে দেখা রাজকন্যার মতো। চুড়ি পরানো শেষে তৌসির আলতো করে ঝুঁকে পড়ে, মেয়ের কচি হাতে নিজের ঠোঁট ছোঁয়ায়, মৃদু, দীর্ঘ একটা চুমু খায়।
ঠিক তখনই বিছানার ওপাশে, তৌসিরের সামনাসামনি এসে দাঁড়ায় নাজহা। নাজহার ওড়নার আঁচল এখনও কাঁধে এলোমেলো, হাতে ভেজা ওড়নার এক প্রান্ত, চুল থেকে টুপ করে এক ফোঁটা জল ঝরে পড়ে যায় মেঝেতে। ভ্রু কুঁচকে নাজহা জিজ্ঞেস করে, “কী হচ্ছে এসব?”

নাজহার কণ্ঠস্বরটা উঁচু নয়, বরং শান্ত। কিন্তু সেই শান্ত গলাতেই কোথায় একটা ছুরির ধার লুকিয়ে আছে। তৌসির চমকে ওঠে। তওশির পাশ থেকে একটু সরে গিয়ে তড়িঘড়ি করে উঠে বসে সে, ধরা পড়ে যাওয়া কিশোরের মতো তৌসিরের চোখের কোণে অপরাধবোধ ঝিলিক খেলে ওঠে। কিছুটা আমতা আমতা করে তৌসির বলে, “ইয়ে, চ-চুড়ি এনেছিলাম আমার মাইয়াটার জন্য। তাই পরাচ্ছিলাম।”
কথাটা শুনে নাজহা এক দৃষ্টিতে তওশির হাতের দিকে তাকিয়ে থাকে। রঙিন চুড়িগুলো ঘুমন্ত মেয়ের কব্জিতে হালকা কেঁপে উঠছে সিলিং ফ্যানের বাতাসে। নাজহার চোখের ভেতর কী একটা ছায়া নেমে আসে, রাগ নয়, ঠিক অভিমানও নয়, বরং তার চেয়েও ঘন কিছু, যার নাম শুধু নাজহাই জানে। কিছুক্ষণ নিশ্চুপ তাকিয়ে থেকে নাজহা একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। তারপর আর কোনো কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ অন্যদিকে পা বাড়ায়। নাজহার এই নিরুত্তাপ, নির্বিকার আচরণ তৌসিরকে ভেতর থেকে নাড়িয়ে দেয়। রাগ করলেও একটা কথা ছিল, চিৎকার করলেও একটা কথা ছিল, কিন্তু এই নীরবতা, এই দূরত্ব হাজার শব্দের চেয়েও ভারী। তৌসির ধীরে ধীরে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়, তারপর নাজহার দিকে এগিয়ে গিয়ে পেছন থেকে ডাকে, “নাজহা!”
ডাক শুনে নাজহা ঘুরে দাঁড়ায়। জানালা দিয়ে আসা আলোটা এখন সরাসরি এসে পড়েছে নাজহার মুখে, চোখের কোল সামান্য চিকচিক করছে, নাকি সেটা শুধুই রোদের প্রতিফলন, তৌসির বুঝে উঠতে পারে না। চোখে চোখ রেখেই খুব শান্ত স্বরে নাজহা জিজ্ঞেস করে, “কিছু বলবেন?”

তৌসির নাজহার এই শান্ত আচরণে, নাজহার কালচে সবুজ চোখের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ থমকে যায়। তৌসিরের বুকের ভেতর অনেক কথা উঁকি দিতে থাকে, কেন এত দূরত্ব, কেন এত নীরবতা, কেন এই ঘরের চার দেয়ালেও দুজন মানুষ এত অচেনা; কিন্তু আফসোস, তৌসিরের ঠোঁট গলে একটা শব্দও বের হয় না। কণ্ঠনালিতে এসে সব কথা গিঁট বেঁধে যায়। চুপ করে থেকে শেষে একটা ম্লান হাসি ঠোঁটের কোণে টেনে তৌসির বলে, “অ্যাঁ… নাহ! কিছু না।”
তৌসিরের এই নির্লিপ্ততা দেখে নাজহাও আর কথা বাড়ায় না। একটা মৃদু নিঃশ্বাস ফেলে চুপচাপ ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। নাজহার শাড়ির খস্‌খস্‌ শব্দটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায় করিডোরের প্রান্তে। তৌসির সেই যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে থাকে দীর্ঘক্ষণ, বুক ভরে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। এই মানুষটার অভিমান ভাঙানোর কোনো উপায়ই তৌসিরের জানা নেই। এত রাজনীতির প্যাঁচ তৌসির বোঝে, এত শত্রুর চাল সে সামলায়, অথচ ঘরের এই একটা মানুষের নীরব অভিমানের সামনে সে একেবারে নিরস্ত্র।

এমনিতেই সামনে নির্বাচন। চারদিকের পরিস্থিতি নিয়ে তৌসিরের বুকের ভেতর একটা চাপা টেনশন সারাক্ষণ পাক খাচ্ছে। ঘর থেকে বেরিয়ে করিডোরে পা রাখতেই সামনে এসে দাঁড়ায় রুদ্র। রুদ্রের মুখটা থমথমে, চোয়ালে টান, গলার শিরায় স্পষ্ট বিরক্তির রেখা। রুদ্রের কণ্ঠে হতাশা উপচে পড়ে,
“কী করবা ভাই? চারদিকে তো হারামজাদারা চক্কর কাটতাছে! কারে কবে জানি উড়ায়ে দেয়, কে জানে!”
তৌসির এক পা এগিয়ে গিয়ে রুদ্রের কাঁধে শক্ত করে হাত রাখে। সেই স্পর্শে একধরনের নীরব প্রতিশ্রুতি আছে, যা হলো, আমি আছি। বড় ভাইয়ের এই ভরসাভরা স্পর্শে রুদ্রের কাঁধের টান একটু আলগা হয়ে যায়। তৌসির শান্ত অথচ দৃঢ় গলায় বলে, “চিন্তা নিস না। দেখতেছি কী করা যায়। তুই অকারণে বেশি বাইরে বের হস না। এই নির্বাচনটা শেষ হলেই তোর সাথে সিমরানের বিয়েটা দিয়ে দেব।”
হঠাৎ বিয়ের কথা শুনে রুদ্রের বিরক্তিমাখা মুখটায় এক চিলতে হাসি ফুটে ওঠে, মেঘলা আকাশ ফুঁড়ে হঠাৎ এক ঝলক রোদ নেমে আসার মতো। কান দুটো সামান্য লালচে হয়ে ওঠে, চোখের দৃষ্টি নেমে আসে মেঝের দিকে। লাজুক হেসে মাথা নেড়ে রুদ্র বলে, “আচ্ছা ভাই।”

তৌসিরের সাথে কথা শেষ করে রুদ্র সোজা পা বাড়ায় দোতলার দিকে। সিমরানের ঘরের দরজাটা আধভেজানো। ভেতরে পড়ার টেবিলে ঝুঁকে বসে আছে সিমরান, মাথার ওপরে টেবিল ল্যাম্পের হলদে আলো, খোলা বইয়ের পাতায় সিমরানের সরু আঙুল আস্তে আস্তে সরে যাচ্ছে লাইনের ওপর দিয়ে। দরজায় কোনো নক না করেই ধড়াম করে ঘরে ঢুকে পড়ে রুদ্র। সোজা গিয়ে বিছানায় চিত হয়ে শুয়ে পড়ে, দুই হাত মাথার নিচে, চোখ সিলিংয়ের দিকে স্থির করে। মনে হয় এই ঘরটাতে ঢুকে দীর্ঘদিন পর রুদ্র একটু শান্তির নিশ্বাস নিতে পেরেছে।
সিমরান বেশ অবাক হয়। রুদ্র ভাই তো এমন না! রুদ্র কখনোই এভাবে না জানিয়ে ঘরে ঢোকে না। কলমটা বইয়ের ভাঁজে রেখে চেয়ারে বসা অবস্থাতেই পেছনে ঘুরে সিমরান ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে, “রুদ্র ভাই? তুমি হঠাৎ এখানে? কোনো দরকার?”

সিমরানের কথায় রুদ্র শুধু একবার সিমরানের দিকে তাকায়। তারপর বুক ভরে একরাশ শান্তির নিশ্বাস টেনে নিয়ে আবার দৃষ্টি ফিরিয়ে নেয় সিলিংয়ের দিকে। মনে হয় ওই সাদা ছাদটায় রুদ্র ওদের ভবিষ্যতের ছবি আঁকছে একটু একটু করে। খুব শান্ত, প্রায় স্বপ্নের ঘোরে ডুবে থাকা গলায় রুদ্র বলে, “সিমরান, আমাদের বিয়ের কথা চলতেছে। এবার ব্যাপারটা পোক্ত হইয়া গেছে, হয়তো জলদিই হইয়া যাইব বিয়েটা।”
কথাগুলো সিমরানের কানে এসে পৌঁছাতেই সিমরানের বুকের ভেতর খুশির একটা ঢেউ খেলে যায়, উষ্ণ, তীব্র, অথচ কোথাও এক চিমটি ভয় মেশানো। গালে হালকা রঙ ধরে, বইয়ের পাতার ওপর সিমরানের আঙুলটা অজান্তেই একটু কেঁপে ওঠে। কিন্তু সেই উচ্ছ্বাসটা সিমরান সযত্নে চেপে রাখে বুকের ভেতর, এত বড় খুশি এক নিশ্বাসে বেরিয়ে গেলে কোথাও কিছু ভেঙে পড়তে পারে। খুব শান্ত, অথচ চাপা আবেগে ভরা গলায় সিমরান জিজ্ঞেস করে, “আমাদের বিয়েটা সত্যি হবে তো, রুদ্র ভাই?”

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৬৩

প্রশ্নটা শুনে রুদ্র এবার পাশ ফিরে তাকায় সিমরানের দিকে। রুদ্রের চোখে নেমে আসে এক নিবিড় স্নিগ্ধতা, যে চোখে একটু আগেও রাজনীতির উত্তেজনা ছিল, সেই একই চোখ এখন এক ভীষণ কোমল আলোয় ভিজে যাচ্ছে। ধীর, গভীর গলায় রুদ্র বলে,
“হবে। আমাদের বিয়ে হবে। একটা সুন্দর সংসারও হবে আমাদের, আর একটু ধৈর্য ধর।”

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৬৫

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here