হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ৩৪ (৩)
সিনথিয়া ইসলাম সীমা
পিনপতন নীরবতায় থমকে আছে ভোরের স্নিগ্ধ পরিবেশ। হালকা মৃদু হাওয়ায় ক্ষণে ক্ষণে শব্দহীন দুলে উঠছে পত্তর। সেই সাথে এক পশলা সুখময় অনুভূতিতে দুলে উঠল দুটি ভিন্ন হৃদয়। অপ্রত্যাশিত এই সুখের সংস্পর্শে এসে নির্বাক হয়ে গেছে হুমায়রা। মস্তিস্ক কাজ করছে না মেয়েটার। বারবার মনে হচ্ছে- কোনো বিভ্রমে ডুবে আছে সে। তখনি ঘাড়ের কাছে টের পেল মানুষটার উষ্ণ নিঃশ্বাস। শুনতে পেল অতিশয় ক্লান্ত স্বর,
“ পাগল করে ছাড়লি আমায়! ”
পুরোপুরি বাস্তবতায় ফিরে এলো হুমায়রা। বুঝতে পারল – এটা তার ভ্রম নয়, সত্যিই কৃশান তাকে জড়িয়ে রেখেছে। মেয়েটা শ্বাস টেনে নিজেকে ধাতস্ত করল। মিহি স্বরে শুধাল,
“ ফিরে এলেন যে? কি হয়েছে? ”
“ মনটাকে এখানে ফেলে গিয়ে, ওখানে শূন্য দেহখানা নিয়ে কি করে থাকি বল! ”
হুমায়রার কপালে কপাল ঠেকিয়ে বলল কৃশান। পরপর নিজের পুরুষালী হাত দ্বয়ের আজলায় স্ত্রীর ছোট্ট মুখখানা নিয়ে এক ধ্যানে দেখতে লাগল। স্বামীর অভিব্যক্তি বুঝতে পুরোপুরি সক্ষম হলো না হুমায়রা। কৃশানের লালিত চোখ ও এলোমেলো সত্ত্বা দেখে চিন্তিত হলো সে। ক্ষীণ স্বরে প্রশ্ন করল,
“ আপনার কি শরীর খারাপ লাগছে? ”
“ নাহ, ওখানে গিয়ে ঘুম হয়নি। ”
“ ওহ আচ্ছা, এরজন্য এই অবস্থা হয়েছে চোখে মুখের? ”
“ হুম। ”
“ তাহলে এখন গিয়ে ঘুমিয়ে নিন। ”
“ হুম, রুমে আয়। ”
বলেই হুমায়রার হাত ধরে হাঁটা ধরল। তার কাণ্ডে কিছুটা হকচকিত হলো হুমায়রা। পথিমধ্যে তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
“ আপনি যান, আমি গাছগুলোতে পানি দেওয়া শেষ করে আসছি। ”
অদ্ভূত দৃষ্টিতে ফিরে চাইল কৃশান। শক্ত কণ্ঠে বলল,
“ পরে দেওয়া যাবে। ”
“ আর মাত্র কয়েকটা গাছে………”
কথা সম্পূর্ণ করতে পারল না মেয়েটা। এর আগেই কোনোরূপ বাক্যহীন হুট করে তাকে পাঁজাকোলো করে নিল কৃশান। ঘটনার আকস্মিকতায় চোখ বড় বড় হয়ে গেল রমণীর। ভরকানো চিত্তে তৎক্ষনাৎ আঁকড়ে ধরল মানুষটাকে। কণ্ঠ চিরে বেরিয়ে এলো অস্পষ্ট আর্তনাদ,
“ এই, এই কি করছেন! ”
“ চুপ! মুখ খুলবি তো মার খাবি। ”
ধমক খেয়ে দমল না মেয়েটা। ড্রয়িং রুমে নাজমিন বেগম ও ইয়াসমিন বেগম থাকার সম্ভাবনা আছে। তাদের চোখে পড়ার ভয়ে মিনমিন করে বলল,
“ দয়া করে আমায় নামিয়ে দিন। আমি এখুনি যাব, আপনার সাথেই যাব। নামিয়ে দিন আমায়। ”
তার এতো আকুতি মিনতি কানে নিল না কঠোর মানব। সে নিজের মতো হনহন করে এগিয়ে চলল। ড্রয়িং রুমে এসে কাউকে দেখতে না পেয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল হুমায়রা। সম্মুখের বেপরোয়া পুরুষটিকে উদ্দেশ্য করে বিড়বিড়াল,
“ বখাটে পুরুষ! ”
অনেকদিন পর হুমায়রার মুখে এই সম্বোধনটা শুনতে পেয়ে ঠোঁটে সূক্ষ্ম হাসি ফুটল কৃশানের। পরপর নিজেও সেই পরিচিত সম্বোধন করল,
“ হুজুরনী…! ”
রুমে এনে হুমায়রাকে খাটের সাথে হেলানরত অবস্থায় বসিয়ে দিল কৃশান। কপাল কুঁচকে তার কান্ড কারখানা দেখছিল হুমায়রা। তখনি তাকে অবাকের সপ্তম আকাশে পৌঁছে দিয়ে টুপ করে তার কোলে শুয়ে পড়ল মানুষটা। পরপর আদেশের সুরে বলল,
“ চুল টেনে দে। আর হ্যাঁ, ঘুমে ডিস্টার্ব করলে মার খাবি! ”
বলেই পুরোপুরি ঘুমানোর প্রস্তুতি নিয়ে হুমায়রার নরম উদরে মুখ গুঁজে দিল। অত্যধিক বিস্ময়ে কিছুক্ষন অভিভূত হয়ে রইল রমণী। অনড় চিত্তে বসে রইল। ওমনিই ধমকে উঠল কৃশান,
“ এই হুজুরনী। ”
সাথে সাথেই চুলের মাঝে হাত লাগাল হুমায়রা। তার কোমল হাতদ্বয় চুলে বিলি কাটতেই বুক ভরে শ্বাস নিল কৃশান। ঠোঁট জোড়া আপনা আপনিই প্রসারিত হলো। হৃদয় রাজ্যে নেমে এলো ভালোলাগার জোয়ার। ভিতরের সব শূন্যতা ও ছটফটানির সমাপ্তি ঘটে চোখে ঘুম ধরা দিল নিমিষেই। গতকালের এইটুকু সময়ে কৃশান একটা বিষয় পুরো নিশ্চিত যে,
“ এক হুজুরনীর ধারেই এই কৃশান মির্জার সকল বিন্দাস গিরী বেকার! ”
ঘড়ির কাঁটা টিকটিক করে এগারোটা পেরিয়ে গেছে। জনমাবনের সরবতায় মুখরিত হয়ে উঠেছে ধরণী। সূর্যের তেজস্ক্রিয় রশ্মিতে অতিষ্ট পরিবেশ।
অথচ এতো বিরক্তিকর পরিবেশের বিপরীতে গিয়ে এক শান্তিময় ঘুম দিয়ে উঠল কৃশান। চোখ মেলতেই সামনে দৃশ্যমান হলো হুমায়রার হেলানো শরীর। খাটের সাথে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে আছে সে। গতরাতে ঘুম না হওয়ায় কৃশানের চুলে হাত বুলাতে বুলাতে একসময় নিজেই ঘুমিয়ে পড়েছে মেয়েটা। হাত দুটো তখনো কৃশানের চুলের মাঝেই বিদ্যমান। মারাত্মক মায়াবী লাগছে মেয়েটাকে। পলকহীন মেয়েটার দিক তাকিয়ে রইল কৃশান। পরপর সতর্ক দেহে শব্দহীন উঠে বসল। হুমায়রার হেলে পড়া ঘাড়ের নিচে এক হাত দিয়ে তা সোজা করে কোলে তুলে নিল। যত্ন সহকারে শুইয়ে দিল বালিশের উপর। কিয়ৎক্ষণ ঝুঁকে থেকে পর্যবেক্ষণ করল তার ঘুমন্ত মায়াবিনীকে। ভিতরের পুরুষসত্ত্বা টা খুব করে চাইল ঘুমন্ত পরীর কপালে একটু খানি ভালোবাসার পরশ এঁকে দিতে। তবে মন গহীনে লুকানো কোনো এক কারণে দমিয়ে রাখল নিজেকে। অতঃপর ফ্রেস হতে ওয়াশরুমে চলে গেল সে।
লম্বা শাওয়ার নিয়ে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসলো কৃশান। খট করে দরজা খোলার শব্দে ঘুম ছুটে গেল হুমায়রার। পিটপিট করে চোখ মেলে চারপাশের আলোকিত পরিবেশ দেখতেই এক লাফে ঘুম থেকে উঠে বসল। তড়িঘড়ি করে নামতে নিল। তখনি সামনে এসে দাঁড়াল কৃশান। তাকে দেখতেই হুমায়রা ব্যস্ত কন্ঠে বলল,
“ কটা বাজে? আপনি কখন ঘুম থেকে উঠলেন? ডাকলেন না আমায়? ”
তার এতো এতো প্রশ্নের জবাবে নির্বাক রইল কৃশান। পুরোটা সময় হুমায়রাকে নিখুঁত ভাবে পরখ করল। অকস্মাৎ কিছুটা ঝুঁকে বলে উঠল,
“ ঘুম থেকে উঠলে কি মারাত্মক লাগেরে তোকে! ভারী ভারী চোখের পাতা, ফোলা ফোলা গাল,মুখ- সবকিছু মিলিয়ে একেবারে দেশি টমেটো! ”
তার এহেন কথায় থতমত খেয়ে গেল হুমায়রা। ঘন ঘন পল্লব ঝাপটে চেয়ে রইল অবাক নয়নে। অবিশ্বাস্য কণ্ঠে বলল,
“ কি! ”
“ দেশি টমেটো। ”
“ এটা তো বুঝলাম এর আগে কি বললেন? ”
“ ঘুম থেকে ওঠার পর ভয়ানক মায়াবী লাগে তোকে, একেবারে ঘায়েল করা যাকে বলে! ”
মানুষটার এমন সোজাসাপ্টা উক্তিতে নেত্রযুগল মারবেল আকার ধারণ করল হুমায়রার। পরক্ষণেই লজ্জায় এলোমেল দৃষ্টি ফেলে আমতা আমতা করে বলল,
“ আম্মু হয়তো আমাকে অনেক ডেকেছে আমি যাই। ”
ত্রস্ত পায়ে হেঁটে রুম ছাড়ল হুমায়রা। বাইরে গিয়ে বড় বড় শ্বাস নিল। হাঁটার মাঝেই বলল,
“ মানুষটার আজকাল কি হয়েছে আল্লাহ মালুম! ”
এইদিকে হুমায়রার পালানো দেখে হেসে উঠল কৃশান। বলল,
হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ৩৪ (২)
“ হুজুরনীকে দেখি লজ্জা পেলেও মারাত্মক লাগে! নাকি আমিই মারাত্মক লেভেল ভাবে ফেঁসে গেলাম? যাই হোক, মাত্র তো শুরু করলাম নিজেকে প্রকাশ করা। এই বখাটে কৃশানের ভালোবাসার গভীরতার শেষ তো সে নিজেও জানে না! সেই অব্দি দেখার প্রস্তুতি নাও বা-ই-কো(বউ) ”
শেষটা খানেক লো ভয়েসে টেনে টেনে বলল। কথাগুলো শুনতে পেলে এতক্ষণে হুমায়রার মুখখানা লজ্জায় পুরো দেশি টমেটোর মতো হয়ে যেত বোধ হয়।

Nice….