Home হৃৎস্পন্দন হৃৎস্পন্দন পর্ব ২৩

হৃৎস্পন্দন পর্ব ২৩

হৃৎস্পন্দন পর্ব ২৩
সাঞ্জেনা শাজ

শুভ্রতা ডিপডিপ করা বুক নিয়ে খান ভিলায় পা রাখলো। তাকে দেখে তার মামি এগিয়ে আসলো। ওকে ধরেই আক্ষেপের সুরে বলে উঠলো,
“কি মা? কি কাজটা করেছো তুমি? এই কাজ কেউ করে? সত্যি করে বলতো ছেলেটা তোমাকে জোর টোর করেছে না-কি? ”
শুভ্রতার চেহারায় ভীতি। খান বাড়িতে তার যাওয়া আসা কম। কম বলতে খুবিই কম। সে যায়গায় এরকম প্রশ্ন! সে ঘামতে থাকলো। তবে ঠোঁট জোড়া চেপে মাথা নাড়াল। অর্থাৎ, তাকে জোর করেনি।
রায়হানের মা’য়ের যেন আক্ষেপ আরও বাড়ল। হতাশার সুর তুলে বললো,
“আসো, বসো। বয়স কম তাই আবেগে এ কাজ করে বসেছো। পরে বুঝতে পারবে। আমরা তোমার ভালোই চেয়েছিলাম। তোমার মা’ও নাওয়া খাওয়া বন্ধ করে রুমে বসে আছে। বসো তুমি ঢেকে আনি। ” বলেই তিনি নিচ তলার একটি রুমের দিকে গেল।

দু’তলা বিশিষ্ট ‘খান বাড়িটা’ বেশ বড়। আলিশান বাড়ি। তবে মানুষ বরাবরই কম থাকে। এখনো কম। শুভ্রতার এখানে খুব কমিই আসার স্মৃতি মনে পড়ে। একসময় তার মা’য়ের সাথে তার নানু বাড়ির সম্পর্ক ভালো ছিলো না। এরপর যখন ভালো হয়েছে তখন তার মা’য়ের সাথেই তার সম্পর্কই শেষ!
রিমা বেগম কিছুটা অসুস্থ, গম্ভীর মুখে আসলেন ড্রয়িং রুমে। বসলেন মেয়ের সামনের কাউচে। চোখ মুখ গম্ভীর, কালো করা। শুভ্রতার ভিতরের হাফসাফ আরও বাড়ল। কি দিয়ে শুরু করবে তার ভিতরে সংকোচ। এমনিতেই সম্পর্ক তেমন একটা গভীর নয় তারউপর সেদিনকার মা’য়ের কথা না রাখা! এখন আবার অসুস্থতা!
“তোমার শরীর কেমন এখন মা? বাসায় যাবে না? ” শুভ্রতা আটকে আটকে রয়ে সয়ে জিজ্ঞেস করলো।
রিমা বেগমের গম্ভীরতা আরও বাড়ল। শান্ত শীতল কন্ঠে বললেন,
“আমার কথা তোমাকে চিন্তা করতে হবে না। চিন্তা করলে সেদিন ওভাবে সকলের সামনে ছোট করতে না নিশ্চয়ই। আর যেখানে সম্মান পাওয়া যায়না সে বাড়িতে আমি আর দ্বিতীয় বার পা রাখবো বলে তোমার মনে হয়?”
“তোমাকে কেউ অসম্মান করেনি মা। বাবা তো আসছে। তুমি বাড়ি যাবে না?”
“নাহ যাবো না। সেটা যে-ই আসুক। তুমি এখানে কেন এসেছো? বেচে আছি নাকি ম’রে গিয়ে তোমার পথের কা’টা শেষ হয়েছে সেটা দেখতে? ”

শুভ্রতার নিশ্বাস আটকে আসলো। এটা কি কথা বললো তার মা? তার চোখ জোড়া মূহুর্তেই রক্তিম হয়ে এলো নোনাজলে। মা’য়ের দিকে তাকিয়ে ব্যাথিত কন্ঠে বললো,
“তুমি কখনো আমায় মেয়ে হিসেবে দেখেছো? দেখোনি তাই না? কিন্তু আমি তোমায় মা হিসেবে দেখেছি তাই তোমার অসুস্থতার কথায় কাউকে না বলেই ছুটে এসেছি। ভালো করিনি তাই না? ”
রিমা বেগমের মুখে এখনো কোন পরিবর্তন দেখা গেল না। ভদ্রমহিলা বেশ শক্ত ধাচের।
“তুমি আমায় মা হিসেবে দেখেছো? অথচ কিভাবে? সেদিন নিজের মা’কে হাড়িয়ে দিয়ে সেই বেয়াদব ছেলেটাকে বেছে নিয়েছো। এখন আমায় মা মেয়ের সম্পর্ক দেখাচ্ছো? আমার সম্মানের কথা ভেবেছো?”
শুভ্রতা বুঝলো মেহরাদকে তার মা বেয়াদব বলছে। তার একটুও ভালো লাগলো না। এখন কিছু বললে সে নিজেও বেয়াদব হয়ে যাবে ওনার চোখে। তবুও মুখ খুললো কিছু বলবে বলে,
“মেহরা….”

“হয়েছে থামো। ঐ ছেলেকে নিয়ে তোমার মুখ থেকে অন্তত কিছু শুনতে চাই না। নির্লজ্জতামির অনেক পরিচয় দিয়েছো আর না! ” মেয়েকে থামিয়ে নিজে বললেন রিমা বেগম।
তাদের কথার মাঝখানেই রায়হানের মা আসলো। প্রায় বিকেল হয়ে যাচ্ছে। বাড়িতে রায়হানের বাবা নেই। মেয়েটা যা-ই করেছে অনাদর তো করতে পারে না! তার আবার খুবই পছন্দের মেয়েটা। সে কারণেই তো ছেলের বউ করে অনার জেদ ধরে স্বামীকে রাজি করিয়েছিলো। কিন্তু মেয়েটা কি যে করলো!
“হয়েছে রিমা, মেয়েটাকে আর কিছু বলো না। তোমার কথা শুনে কলেজ থেকেই ছুটে এসেছে। ফ্রেশ হয়ে খাবার খেয়ে নিক আগে। পরে কথা বলো।”
“ও কি রিমা’র মেয়েটা না-কি রে ছোট?” রায়হানের খালাম্মি জিজ্ঞেস করে উঠলো পিছন থেকে। তিনি এসেছেন কিছুদিন আগেই বোনের বাড়ি বেড়াতে। বোনের এই আলিশান বাড়ি ছেড়ে যেতেই মন চায়না আসলে।
পান খাওয়া দাত নিয়ে এগিয়ে এলেন শর্মিলা বেগম। শুভ্রতাকে দেখলেন আগা গোড়া খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে। তারপর তেতো মুখে বললেন,

“এই টুকুনি মেয়ে চাচতো ভাইয়ের সাথে পালিয়ে বিয়ে করে ফেলছে? ও রিমা তোমার মেয়েটা… ”
বড় বোনকে আর কিছু বলতে দিলো না রায়হানের মা। হাত চেপে থামিয়ে দিলেন। রিমা বেগমের মুখখানাতেও বিতৃষ্ণা দেখা গেল। এই মহিলা সমালোচক টাইপের। আগে থেকেই জানে সে। এখন আবার তার মেয়েকে নিয়ে পড়বে।। এটা আর বুঝতে বাকি নেই তার। নিজের মেয়েকে নিজে যা খুশি বলবে অন্যে কে বলার?
মেয়ের দিকে তাকালেন রিমা বেগম। মেয়েটা কুকড়ে আছে কেমন। তিনি ভাবির দিকে তাকিয়ে বললেন,
“ভাবি ওকে উপরের রুমে নিয়ে যান। নিজের ইচ্ছেয় এসেই যখন পড়েছে যাবে আমার ইচ্ছেই।”
শুভ্রতার বুকটা ধ্বক করে উঠলো।
“বিকেলে বাড়ির বাকিরাও আসবে বলেছে। আমি তাদের সাথে চলে যাবো। ”
“সেটা সময় হলেই দেখা যাবে। এখন অন্তত অবাধ্যতা করোনা। ”
শুভ্রতা ভোতা মুখে মামির সাথে উপরে উঠে গেল। সোহানারা যে কখন আসবে! তার মোবাইলটাও তো নেই তার কাছে।

সন্ধ্যায় সকলে একত্রিত হয়ে বসে আছে ড্রয়িং রুমে। জাহানারা বেগম চিন্তিত, সাথেও সকলেও কিছুটা। তারা চিন্তিত শুভ্রতার জন্য। মেয়েটা হুট করেই চলে গেল খান বাড়িতে। তারা’ও যাবে কিন্তু এভাবে রোজাকে একা রেখে তো যাওয়া যায়না! মেয়েটা এই মূহুর্তে জার্নি করতে পারবে না। আবার তারা সকলে চলে গেলে বাড়িতে একা হয়ে যাবে। জাবিরও বাড়িতে নেই। এক কাজে বাহিরে গিয়েছে।
“আমিতো বললাম তোমরা যাও, মেয়েটা একা ওখানে। ভাই এসে বাড়িতে না দেখলে রেগে যাবে। তোমরা গিয়ে ছোট মা কে দেখে নিয়ে এসো। জাবির চলে আসবে এখনি, কথা হয়েছে ওর সাথে আমার।” রোজা বললো।
জাহানারা বেগম মেয়ের কথা মানলেন না,
“এতো বাড় বাড়িতে একা রেখে কিভাবে যাই? স্বপ্নাটাও নেই আজ। আরেকটু অপেক্ষা করি। মেহরাদ তো এমনিতেও মাঝেমধ্যে দেরিতে আসে। জাবির আসলেই বের হবো। ”
“শুভ্রতাটা কেন বুঝে না? আগে আগে যাওয়ার কি দরকার ছিলো? আমাদের সাথে গেলেই তো হতো। ” শান্তা বলে উঠলো।

“ও কি বেশি বড় হয়ে গিয়েছে শান্তা? ওর বয়সটাই বা কি? এই বয়সে এতো বিবেক খাটিয়ে কাজ হয়না বুঝলি? তারউপর নিজের জন্মদাত্রী মা! সেখানে মনের দিকটা বেশি টানবে এটাই স্বাভাবিক। ” জাহানারা বেগম বললেন শান্তার উদ্দেশ্যে।
“আমিতো ওর কথা ভেবেই বলছিলাম বড় মা। ভাইয়া যদি রেগে যায়?”
“ওকেও বুঝতে হবে, মেয়েটা কিভাবে বড় হয়েছে। সারাবছর মা’য়ের থেকে দূরে থেকে মা’য়ের বিপদে অসুখে ওর বেশিই খারাপ লাগবে এটা স্বাভাবিক। সবসময় রাগলেই হয় না। ও অন্যসবের মতো এতো বুঝদার স্ট্রং নয়। এমনটা মেনেই ওকে আগলে রাখতে হবে।”

আজ জাহানারা বেগমের কথার পিছে কেউ কিছু বললো না। এর মধ্যেই কলিংবেলটা বেজে উঠলো। সকলে ভাবলো জাবির বোধহয়! সোহানা উপরে উঠে গেল সে পুরো পুরি রেডি যাওয়ার জন্য, শুধু হিজাবটা করে চলে আসবে। জাবির ভাই যেহেতু এসেছে এখনি রওনা দিয়ে দিবে সকলে।
সুরাইয়া বেগম দরজা খুলে দেখলেন, জাবির নয় মেহরাদ দাঁড়িয়ে। আজ এতো তাড়াতাড়ি বাড়ি? তিনি অবাক হয়েই পিছনে তাকালেন। সকলের একিই রিয়েকশন। তিনি নিজেকে সামলে সরে দাঁড়ালেন দরজা থেকে।
ক্লান্ত পরিশ্রান্ত চেহারা নিয়ে বাসায় ড্রয়িং রুমে পা রাখলো মেহরাদ। গলার টাই, কোট সব আগে থেকেই খুলে হাতে নেওয়া। তখন এতো কিছু বললেও ছেলেকে দেখে জাহানারা বেগমও কিছুটা থতমত খেয়ে গেলেন। ছেলেটাকে ঠিক লাগছে না এমনিতেই। আবার এটা জানলে কি কুরুক্ষেত্র লাগায় কে জানে!
“উমমম, মা এক কাপ কফি পাঠাও তো রুমে। মাথাটা প্রচন্ড ব্যাথা করছে আজ। আর শুভ্রতাকে দিয়ে বামটা পাঠাও!” উপরের দিকে পা বাড়াতে বাড়াতে বললো মেহরাদ।
বিচিলিত হলেন জাহানারা বেগম। ছেলেটাকে অন্য কোন কিছু কাবু না করলেও এ মাথা ব্যাথা ঠিক কাবু করে ফেলে। মাথা ব্যাথাটা ইদানীং বেশি হচ্ছে ওর। বেশি প্রেশার নিচ্ছে না-কি ছেলেটা? তিনি বিচিলিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,
“কি হয়েছে বাবা? বেশি মাথা ব্যাথা নাকি? আজ চলেও আসলি তাড়াতাড়ি। ”
সিড়ির কাছটায় দাঁড়ালো মেহরাদ। মা’য়ের দিকে তাকালো। অসহ্য ব্যাথায় কপালের নীল রগ গুলো ধপাধপ্ করছে। হটাৎ ই ব্যাথার কারণ কি?

“একটু হচ্ছে। কফি পাঠাও আর বামটা নিয়ে আসতে বলো। শাওয়ার নিয়ে দেখি একটু ঠিক হয় কি-না! ”
“তুই যা,আমি নিয়ে আসছি….”
তিনি বলতে বলতেই উপর থেকে সোহানা চেচিয়ে বলতে বলতে আসছে,
“বড় মা এবার চলো। আর দেরি করো না। শুভ্রতা হয়তো অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য। মেয়েটার কাছে মোবাইলটাও নেই ফোন দিয়ে জানাবো যে। ভাইয়া আসার আগেই চলে আসবো….”
অনর্গল বলতে থাকা কথা গুলো গলায় আটকে গেল সোহানার, মেহরাদকে দেখে। চরম অবাকে বাকহারা হয়ে গেল মেয়েটা। এ কাকে দেখছে সে? মেহরাদ ভাই এই টাইমে, এদিকে?
সকলের মাথায় হাত। কি জবাব দেবে এবার?

মেহরাদ সোহানার থেকে চোখ সড়িয়ে মা’য়ের দিকে তাকালো ভ্রু কুচকে।
“তোমরা কোথাও যেতে? শুভ্রার কাছে? ও বাড়িতে নেই? কোথায় ও?”
একের পর এক ছেলের প্রশ্ন শুনে জাহানারা বেগম চুপ মে’রে রইলেন। কি জবাব দেবে?
“শুভ্রা তো এই এদিকেই ভাইয়া। ঐ যে সামান্তাদের বাড়িতে। আমিই গিয়ে নিয়ে আসছি। ”
মেহরাদের কপালের ভাজ আরও প্রগাঢ় হলো। সামান্তা আশিককে সে চেনে। কিন্তু সেখানে যাওয়ার কারণ কি? আর গেলেও সন্ধ্যা অব্দি থাকারিই বা কারণ কি?
“ওদের ওখানে কি? আর ও একাই কেন? কোন প্রয়োজন?”
“আসলে….”
“কি আসলে….?”
“একটু প্রয়োজন ছিলো আর কি! আমি ড্রাইভারের সাথে গিয়ে নিয়ে আসছি ভাইয়া। ”
“উঁহু, তোকে আর রাত্র করে বের হতে হবে না। আমি নিয়ে আসছি।” আবারও ঘুরে দরজার দিকে পা বাড়াতে চাইলো মেহরাদ। সকলের ভিতরে ভয়েরা টগবগ করে উঠলো।
আৎকে উঠলো জাহানারা বেগম। কোন কিছু না ভেবেই অস্ফুট স্বরে বলে উঠলেন,

“এই অবস্থায় ওখানে যাবে কেন? ও নেই ওখানে। শুভ্রতা ওর মা’কে দেখতে গিয়েছে, খান বাড়িতে।”
মেহরাদের পদযুগল চকচক করা ফ্লোরে আটকে গেল।বেশ ক’সেকেন্ড সময় লাগলো তার মা’য়ের উক্ত বাক্য টুকু বুঝতে। তার মনে হলো ভুল শুনেছে সে। শুভ্রতা খান বাড়িতে? তা-ও তাকে না জানিয়েই? স্থির পদযুগল ঘুরিয়ে মা’য়ের দিকে তাকালো মেহরাদ।
ছেলের তাকানোয় শ’খানেক প্রশ্ন দেখলো জাহানারা বেগম। নিজে থেকেই আবারও বলে উঠলো,
“কলেজ থেকে ফেরার পথে গিয়েছে ঐ বাড়িতে। ছোট’র শরীরটা না-কি ভালো না, দেখতে। আমরাও যাবো, ওকে দেখে আসবো। শুভ্রতাকেও নিয়ে আসবো। ”
মেহরাদ শান্ত স্থীর হয়ে শুনলো সবটা। কোন অভিব্যক্তি বুঝা গেল না। ব্যাথায় ধপাধপ্ করা কপাকের রগ গুলো এবার ফুটে উঠেছে দৃশ্যমান রুপে। এক হাতের মুঠোয় কোটটা চেপে ধরলো শক্ত হাতে। আরেক হাতে কপালের নীল রগটা চুলকে শুধালো ,

“কার সাথে গিয়েছে?”
ছেলের হিমশীতল কন্ঠ শুনে জাহানারা বেগম তৎক্ষনাৎ কোন জবাব দিতে পাড়লো না। মেহরাদ এবার তাকালো সোহানার দিকে। ওর দিকে ঘুরে জিজ্ঞেস করলো,
“হু,কার সাথে গিয়েছে ও? ”
“ঐ…..ঐ…..”
“হু?”
“ঐ….ওর মামাতো ভাই’য়ের সাথে। রায়হান খানের সাথে।। ”
“আচ্ছা।”
হটাৎ করেই গুমোট এক পরিবেশ সৃষ্টি হয়ে গেল ড্রয়িং রুমে। যেন মধ্যরাতের গভীরতা তালুকদার ভিলাই নেমে এসেছে। গুমোট রুদ্ধশ্বাস পরিবেশে মেহরাদের শীতল কন্ঠঃ ধ্বনিত হলো,
“তোমরাও যেতে ও বাড়ি? ও’কে নিয়ে আসতে! আজ কেউ বের হবে না তালুকদার বাড়ি থেকে। ”
“মেয়েটা ওখানে একা মেহরাদ। অসুস্থ মা’কে দেখতে গিয়েছে, অন্যায় তো করেনি। আমরা যাবো বলেই গিয়েছে আরও।” জাহানারা বেগম বলে উঠলেন ছেলেকে।

“একা কে বললো! ওর মা আছে না! অসুস্থ মা’কে দেখতে গিয়েছে তো গিয়েছে, একটু সেবা করুক! ”
“আমরা যেতাম ছোট’কে দেখতে।”
“এখন যেতে পাড়বে না। মানে,কেউ-ই যেতে পাড়বে না। এর বেশি একটা কথাও বলবো না মা। থাকুক আদরের মা’য়ের কাছে। ”
“তুই জেদ করছিস মেহরাদ। মা’য়ের কাছে যেতে পাড়বে না?”
“কে বললো পাড়বে না! পেড়েছে দেখেয় তো ওখানে। আবার গিয়েছেও তো মা’য়ের ঠিক করা পুরনো বাগদত্তার সাথে! ভালো!! ”
“ওর ভাই’ও হয় মেহরাদ। ”
“হোক….!”
মেহরাদের এক গুয়ে জবাব। সকলে স্থম্বিত। কি করবে এখন বুঝে আসছে না তাদের। অসহ্য রকমের মাথা ব্যাথা রাগ সব মিলিয়ে মেহরাদের মুখশ্রী রক্তিম। তবে ভাব ভঙ্গি খুবিই ঠান্ডা। সে সেভাবেই উপরে চলে আসলো। আসতে আসতে আরেকবার ওয়ার্ন করে আসলো সকলকে, কেউ যেন না যায় আজ ও বাড়ি।

ঘড়ির কাটায় প্রায় বারোটা বেজে যাচ্ছে। মেহরাদ সেই যে রুমে এসে দরজা লক করেছে তা আর খুলেনি শত ডাকেও। জাহানারা বেগর দরজার কাছেই আহাজারি করে গিয়েছেন কতো! ছেলেটা মাথা ব্যাথার মলমটাও নিলো না। এ ব্যাথা কিভাবে সহ্য করছে!
রুমে ঢুকে একাধারে শাওয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে আছে মেহরাদ। । চুল বেয়ে টপাটপ পানি পড়ছে । অনাধারে ঝাড়ছে ফোটা ফোটা পানি গুলো।
প্রচন্ড মাথা যন্ত্রণা, হৃদয়ের অস্থিরতা সব মিলিয়ে মেহরাদ নিশ্চল হয়ে আছে। সন্ধ্যা থেকে শাওয়ারের নিচে ভিজেছে।চোখ দুটো রক্তিম হয়ে আছে। মাথায় বার বার একিই কথা ঘুরছে,

“ঐ রায়হানের সাথে গিয়েছে! শুভ্রা বাড়ি নেই, তার কাছে নেই। তাকে না জানিয়েই চলে গিয়েছে! ”
“আত্নার রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে আছিস তারপরও কিভাবে চলে যেতে পারিস বার বার! আমার আত্নার সাথে এমন ভাবে মিশে আছিস যেন জান, তা-ও কিভাবে পারিস? আমার এই জান তো আগে থেকেই কোরবান! তুই চাইলে মানা করতাম? ঐ ছেলেটার সাথে কেন গেলি? তা-ও না জানিয়ে!”
এগুলো মূহুর্তেই ছন্নছাড়া করে তুলছে মেহরাদকে। রুমের অবস্থাও তেমন একটা ভালো না৷ পড়নের ভেজা টাওয়াল দূরে ছুড়ে ফেললো মেহরাদ। গায়ে প্যান্ট সহ একটা টি-শার্ট জড়িয়ে নিলো। তারপর দরজা খুলে বের হয়ে গেল বাড়ি ছেড়ে। শুভ্রাকে ছাড়া বাড়িটাই যেন বিষাক্ত ঠেকছে! এই মেয়েটাকে না দেখে থাকাটা তার মন মানে না।
মেয়েটা কিভাবে পাড়লো তাকে না জানিয়ে যেতে! কিভাবে???

শুভ্রতা পাইচারি করছে রুম জুড়ে। অস্থিরতায় তার বেচেইন লাগছে। তার বাড়ি থেকে আজ কেউ আসেনি। সে নিয়েও তাচ্ছিল্য করেছে তার মা। সেটা করুক,কিন্তু বড় মা ‘রা কেন আসলো না? সে কোন ভাবেই যোগাযোগ করতে পাড়লো না তাদের সাথে। মেহরাদ ভাই নিশ্চয়ই জেনে গিয়েছে সে নেই বাড়িতে! রেগে গিয়েছে না-কি বুঝবে তাকে! সে-ও তো সন্তান, অসুস্থ মা’য়ের জন্য খারাপ লাগবে না!
তার মা’কে আসলেই কিছুটা অসুস্থ দেখায়। তবে,ততটা না যতটা রায়হান ভাই বলেছে। সন্ধ্যার পর আর তার সাথে তেমন কথা হয়নি। সে-ইই বের হয়নি রুম ছেড়ে। তার মা এসেছিলো দুটো কথা শুনিয়ে গেল। মামি এসে খাবার দিয়ে গিয়েছিল নিচে যাইনি বলে।
অস্থির শুভ্রতা বেলকনিতে চলে আসলো দরজা খুলে। সেখানেই ঘুরঘুর শুরু করলো। বিশাল বড় খান বাড়ির চারদিকে বাউন্ডারি করা। রাস্তার পাশেই বাড়িটি অবস্থিত। সে দু’তলায় বিধায় বাউন্ডারি টপকে রাস্তাতেও নজর গেল আনমনে। রাস্তার ধারে ল্যাম্পপোস্টের আলোয় একটি পরিচিত গাড়ি নজড়ে আসলো। শুভ্রতা কিয়ৎপল স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। সে যা ভাবছে এটা কি সত্যি?

রুমে এসে ঘড়িতে সময় দেখে নিলো শুভ্রতা, প্রায় সাড়ে বারোটার কাছাকাছি। কখন এতটা বেজে গিয়েছে সে বুঝতেও পাড়েনি। মোবাইল নেই কাছে সময়েরও গুরুত্ব ছিলো না। চিন্তায় বিভোর ছিল।। আবারো দৌড়ে বারান্দায় গিয়ে দেখলো গাড়িটা এখনো আছে। খুশিতে কান্না করতে ইচ্ছে হলো শুভ্রতার। মেহরাদ ভাই এসেছে?
মেহরাদ গাড়ির ভিতরে থেকেই শুভ্রতার ছটফটানি দেখলো স্থীর চোখে। নির্ঘুম চোখ দুটো এই মেয়েটাকে শত দেখেও ক্লান্ত হয় না। তার মনে হয় না,সে কখনো ভেবেছিলো তার শুভ্রাকে দেখতে এ বাড়ির সামনে এতো রাতে কখনো ছুটে আসতে হবে! সে যে না দেখে থাকতে পারে না মেয়েটাকে! সে খুব ভাজে ভাবে আটকে গিয়েছে এ মেয়েটার মধ্যে। মেয়েটা যদি তার এ আটকে যাওয়াকে গুরত্ব দিতো!

এক ঘন্টার রাস্তা আধ ঘন্টায় এসেছে উন্মাদের মতো গাড়ি চালিয়ে। মেয়েটাকে এক পলক দেখতে। এসেছে পর থেকেই খোলা দরজা দিয়ে দেখছে ঘরময় পাইচারি করছে। মেহরাদের মনে হলো শুভ্রার এ অস্থিরতা তার ভিতরের অস্থিরতার দশ ভাগের এক ভাগ। তার ভিতরটা এর থেকেও বেশি! সেটা কি মেয়েটা বুঝেছিলো? ও কখনো বুঝে না কেন তাকে? বয়স কম বলে? না-কি তার ফিলিংসের গুরুত্ব নেই ওর কাছে!
জ্বরের ঘোরে উন্মাদ মেহরাদ একের পর এক পয়েন্ট তাক করেই যাচ্ছে শুভ্রতার উপর। তার মাথা ঠিক নেই। এতো সময় শাওয়ারে ভিজা মাথা ব্যাথা সব মিলিয়ে জ্বর হানা দিয়েছে অস্থিরতা ভরা দেহটায়। তবে সে সবে পাত্তা নেই তার। মেয়েটাকে দেখা চাই সবার আগে, বাদ বাকি পরে। এতো সব কিছুর মধ্যেও শুভ্রতার প্রতি রাগটা যেন চক্রাকারে বেড়ে যাচ্ছে। মেয়েটা কখনোই তাকে গুরুত্ব দেয় না, কখনো না!
শুভ্রতা এক ছুটে দু’তলার সিড়ি বেয়ে সদর দরজা খুলে বের হয়ে গেল। গভীর রাত হওয়ায় কেউউই জেগে নেই।
বাড়ির সামনে লাইট জ্বালানো একটা। সেই লাইটের আলোয় বড় গেটটার দিকে এগিয়ে গেল সে দৌড়ে। গেটে তালা দেওয়া দেখে শুভ্রতার এবার সত্যি সত্যিই কান্না পেল। সে কিভাবে যাবে এখন মেহরাদ ভাইয়ের কাছে? সে শতভাগ নিশ্চিত এটা মেহরাদ ভাই।

চারিদিকে ঘুরন দিয়ে দেখলো শুভ্রতা, বের হওয়ার কোন ওয়ে দেখলো না। মস্তিষ্ক খাটিয়ে তালা দেওয়া গেটের চাবি খুজলো তা-ও পেল না। গেটটা ভালো ভাবে পরখ করে আল্লাহর নাম নিয়ে গেটের মধে পা রাখলো একটা। এটা বেয়েই বাহিরে যাবে সে।
গাড়িতে বসা মেহরাদ হয়তো বুঝতে পাড়লো শুভ্রতা তার কাছে আসছে। কিন্তু কিভাবে সেটা ধারনাতে নেই। সে সামনের রাস্তার দিকে তাকিয়ে রইলো একাগ্রচিত্তে। এক হাত স্ট্যয়ারিং এ আরেক হাত হুইলে।
প্রায় পাচ মিনিট পর কষ্ট করে গেটের উপরে উঠেছে শুভ্রতা। আস্তেধীরে কিছুটা নেমে বাকি টুকু লাফ দিয়ে নেমে গিয়েছে, যার ফলে দু হাতের তালু গিয়ে হাটু মুড়ে রাস্তায় ঠেকেছে। পুরো মুখ কুচকে নিলো শুভ্রতা। হাত দুটোর তালু বুঝি ছিলে গিয়েছে! সেকেন্ডের মধ্যেই মুখশ্রী ঠিক করে নিলো শুভ্রতা। ব্যাথাকে গুরুত্ব দেওয়ার সময় নেই এখন। যদি মেহরাদ ভাই চলে যায়!

রাস্তা থেকে উঠে হাত দুটো আস্তে আস্তে ঝেড়ে রাস্তার মোর ঘুরলো। ইশশ,হাতের তালু জ্বলছে!
মেহরাদ দেখলো ছোট্ট একটি অবয়ব চোখের সামিনে স্পষ্ট হচ্ছে। তার গাড়ি থেকে মিনিট পাচেকের দুরত্বে হাটছে। এগিয়ে এদিকেই আসছে। ল্যাম্পপোস্টের ছড়ানো আলোয় নিস্তব্ধতা বড়া রাস্তায় দু’জনের চোখাচোখি হলো। শুভ্রতার ব্যাথিত মুখে হাসি ফুটে উঠলো। মেহরাদ ভাই নিশ্চয়ই রেগে নেই! রাগলে কি আর আসতো এদিকে?
শুভ্রতার চেচিয়ে মেহরাদকে ডাকতে ইচ্ছে হলো। দৌড়ে তার কাছে চলে যেতে মন চাইলো। কিন্তু এতো রাতে চেচানো যাবে না। আবার পা’য়েও চোট, দৌড়ানো যাবে না।
শুভ্রতা যত এগিয়ে আসছে মেহরাদের হাত ততো শক্ত হচ্ছে। শক্ত শীতল চোখে শুভ্রতার ব্যাথিত হাসি হাসি মুখটায় তার দৃষ্টি স্থীর। চিড়বিড় করছে রাগ ভিতরে।

মেহরাদের কাছে শুভ্রতার পৌছাতে আর মিনিট দু’য়েক লাগবে বোধহয়! আকস্মিক গাড়ি স্টার্ট দিয়ে দিলো মেহরাদ। সামান্যতম দূর থেকেই সে শব্দ পেল শুভ্রতা। খালি পদযুগল দুটো আটকে গেল পিচডালা রাস্তার পাথরে। মুখে আধার নামলো। কোন কিছু সঠিকভাবে বুঝে উঠবে তার আগেই দমকা হাওয়ার ন্যায় মেহরাদের গাড়িটা তার সামনে দিয়ে চলে গেল। যেতে যেতে গাড়ির খোলা উইন্ডোতে বরফ কাটার ন্যায় শীতল চোখে চেয়ে বুঝিয়ে গেল ‘এসেছিস না এখানে নিজের ইচ্ছেয়?আমার কাছে কি?’

হৃৎস্পন্দন পর্ব ২২

শুভ্রতা বুঝি বুঝে গিয়েছে চোখের ভাষা! তবে, আকস্মিক এ কান্ডে হকচকিয়ে দু কদম পিছুতে গিয়ে আবারও রাস্তায় পড়ে গেল শুভ্রতা ব্যালেন্স হাড়িয়ে। গাড়ি চালাতে চালাতে সাইড মিররে দেখলো মেহরাদ শুভ্রতাকে। তবে আজ আর ছুটে গেল না শুভ্রতার কাছে, গাড়িও থামালো না। শুধু রাগ’ই বাড়ছে কারণে অকারণে। আর সব শুভ্রতার উপরই গিয়ে পড়ছে।
মেহরাদের গাড়ি চোখের আড়াল হতেই রাস্তায় উবু হয়েই ফুপিয়ে উঠলো শুভ্রতা। তার দিকে ফিরেও তাকালো না আর? কেন তাকালো না? এতো রাগ? এতো জেদ?এতো অবগ্যা?

হৃৎস্পন্দন পর্ব ২৪