Home হৃৎস্পন্দন হৃৎস্পন্দন পর্ব ২৬

হৃৎস্পন্দন পর্ব ২৬

হৃৎস্পন্দন পর্ব ২৬
সাঞ্জেনা শাজ

ঊর্ধ্ব শ্বাসে রাস্তা ধরে দৌড়েচ্ছে শুভ্রতা। পিছনেও তাকাচ্ছে না ভয়ে। আশেপাশে মানুষ জনের দেখা নেই। সন্ধ্যা নেমে গিয়েছে চারিদিকে। এটা কোন রাস্তা সে নিজেও বুঝতে পাড়ছে না। মাথা কাজ করছে না এই মূহুর্তে। সারাদিন না খাওয়া শুভ্রতার শরীরটা বার বার ভেঙে আসছে, হাপাচ্ছে। প্রচন্ড বুকে ব্যাথা অনুভব হচ্ছে।
আরও অনেকটা দৌড়ালো শুভ্রতা। মরুর বুকে এক পশলা বৃষ্টির ন্যায় একটা লোককে দেখলো হাতে ব্যাগ নিয়ে এদিকটায় আসছে। শুভ্রতা কেদে উঠে লোকটার সামনে গিয়ে দাড়ালো, কোন দিক না তাকিয়ে লোকটার কাছে হাত জোর করে বললো,

“আংকেল আংকেল বাঁচান আমায়। একটা ছেলে আমার পিছু করছে।আপনি ছাড়া কেউ নেই আমায় এখন রক্ষা করার। আংকেল সাহায্য করুন আমায়। দয়া করুন আংকেল।”
“এই মেয়ে কে তুমি? আর আমি তোমায় কি সাহায্য করবো? এই ভর সন্ধ্যা বেলা মেয়ে মানুষকে বারি থেকে ছাড়ে কারা? কোন ফেমিলির মেয়ে এসব?রাস্তা ঘাটে এইভাবে ঘুরাঘুরি করো ছেলেরা তো নজর দিবেই। ” অপরিচিত লোকটা তেতো গলায় বলে উঠলো।
শুভ্রতার কাছে বুঝানোর সময় নেই। সে পিছু দেখলো কাউকে দেখিতে পেল না৷ আবারও লোকটার কাছে কেদে কেদে হাতজোড় করে বললো,
“আংকেল বিশ্বাস করুন আমি ভালো ফেমিলিরই মেয়ে। বিপদে পড়েছি আংকেল। একটু সাহায্য করুন আংকেল। ”
“আমি এসব সাহায্য টাহায্য করতে পাড়বো না মেয়ে। পরে কোন না কোন বিপদে ফাসিয়ে দাও। সরো তাড়া আছে আমার। ” লোকটা চলে যেতে নিলো।
শুভ্রতা এবার আরও জোরে কেদে উঠলো। সে লোকটা কে বোঝাতেই পাড়ছে না! এ কোন দুনিয়ায় আছে সে,? বিপদে মানুষ কে পাওয়া যায় না! মনুষ্যত্ব কোথায় এখন? ফাসানোর ভয় পাচ্ছে! শুভ্রতা আবারও লোকটার সামনে গিয়ে দাড়ালো,

“আংকেল আংকেল প্লিজ আমায় ফিরিয়ে দিবেন না। আচ্ছা আপনায় কিচ্ছু করতে হবে না। আমায় আপনার ফোনটা দিন একটু দয়া করে। এইটুকু দয়া করুন আংকেল প্লিজ।”
শুভ্রতার আকুতিভরা কন্ঠে এযাত্রায় আর লোকটা ফিরয়ে দিতে পাড়লো না৷ পকেটে হাতড়ে ফোনটা বের করে দিলো। শুভ্রতা ফোনটা নিয়ে মা বাবা কারো নাম্বারেই ডায়াল করলো না আগে৷ কাপা কাপা হাতে সবার আগে যে নাম্বারটি ডায়াল পেডে উঠালো সেটা হলো মেহরাদের।
রিং হচ্ছে, শুভ্রতা বার বার পিছু তাকাচ্ছে আর অস্থির ভাবে ঘুরছে লোকটার সামনে মোবাইল হাতে। কল তিসিভ হচ্ছে না!
‘আল্লাহ, আল্লাহ ফোনটা ধরিয়ে দাও আল্লাহ৷ রহম করো আল্লাহ। মেহরাদ ভাই দয়া করে ফোনটা তুলুন! আজকে যদি আপনার দরজা থেকে ফিরে যাই আমি শুভ্রতার লাশ যাবে তালুকদার বাড়িতে। দৌড়ে গাড়ির নিচে পরে ম’রে যাবো তবুও জা’নোয়ার গুলোর হাতে নিজেকে পড়তে দিবোনা।আপনি আমায় কেন রাতে সাথে করে নিয়ে এলেন হে? আমি মা’রা গেলে খুশি হবেন তাই না? তখন রাগ দেখাইয়েন ভালো করে? হে? আল্লাহ…’

উদ্ভ্রান্তের মতো গাড়ি চালাচ্ছে মেহরাদ। কোথাও খবর পাচ্ছে না শুভ্রতার। এর মাঝেই ফোনটা বাজতে লাগলো। আননোন নাম্বার। ভাবলো পুলিশ তার বন্ধু কায়েসের টিম থেকে কারো হবে হয়তো! তার আর আদনানের বন্ধু ”কায়েস শিকিদার’ একজন আই পি এস পুলিশ অফিসার। মেহরাদ তৎক্ষনাৎ তাদের ইনফর্ম করে দিয়েছে। সাথে আশিক এবং তারা ঘন্টার রাস্তাটা চারবার টহল দিয়ে ফেলেছে ইতিমধ্যে। কিন্তু খুজ পাচ্ছে না শুভ্রার। এখন কোন খুঁজ পেয়েছে কি? ইয়ার পডে কানেক্ট করে রিসিভ করলো।
আজেবাজে বকতে বকতে অস্থির শুভ্রতা মোবাইলের দিকে তাকিয়ে দেখল কল রিসিভ হয়েছে। ওপাশ থেকে ‘হ্যালো হ্যালো ‘ ভেসে আসতেই ফোনটা কানে চাপলো শুভ্রতা,
“হ্যালো হ্যালো মেহরাদ ভাই? মেহরাদ ভাই?”
মেহরাদ সেকেন্ডের জন্য থমকে রইলো। শুভ্রতার অস্থির কন্ঠটা যেন তার বুকে ছুড়ি চেপে ধরেছে। উদ্ভ্রান্তের মতো বললো,

“আমার জান, কোথায় আছিস তুই? কোথায়য়য়? এটা কার নাম্বার?”
মেহরাদের আদূরে ডাক শুনে শুভ্রতা কেদে ফেললো, কাদতে কাদতে অস্পষ্ট স্বরে বললো,
“মেহরাদ ভাই বাচান বাচান আমায়? ঐ ঐ ছেলেটা পিছু করছে আমার। আমায় ধরে নিয়ে যাবে। আমার সাথে….. আমার সাথে….”
মেহরাদ গাড়ির ব্র‍্যাক কষলো জুড়ছে। পুরো শরীর ঘেমে নেয়ে একাকার আতংকে। অস্থির হয়ে শুধালো,
“কোন ছেলে? কোথায় আছিস তুই জান? জায়গাটা কোথায়? চিনিস? ভায় পাসনা একদম। তোর মেহরাদ ভাই আছে না? আমি আসছি, আসছি আমি। জায়গাটা কই?”
শুভ্রতা চিনেনা জায়গাটা। অন্ধকারে সাইনবোর্ড টাইনবোর্ড কিছুই দেখলো না। আসার সময় এই রাস্তায় এসেছে সেটা বুঝেছে। তারপর খেয়াল করে দেখলো, আরও কিছুটা সামনে একটা বড় ব্রিজ। হ্যাঁ, আসার সময়ও দেখেছিলো এটা।
“আমি জানি না জায়গার নাম মেহরাদ ভাই। কিন্তু একটা ব্রিজ আছে বড়। চারদিকে জঙ্গলের মতো। ”
মেহরাদ চিনে ফেলেছে জায়গাটা। মেইন রাস্তা থেকে ব্রিজ পেড়িয়ে লোকালয়ের দিকে জায়গাটা। তার থেকে দূরত্ব বিশ পঁচিশ মিনিটের মতো।

“তুই ওখানেই থাক আমি আসছি। বুঝে…”
“এই মেয়ে ফোন দাও দেড়ি হচ্ছে আমার। কার সাথে কথা বলছো? আমায় কোন ঝামেলায় ফাসাবে আবার?” শুভ্রতার দিকে এগিয়ে গিয়ে কান থেকে ফোনটা কেড়ে নিয়ে নিলো লোকটা। শুভ্রতা একটু দূরত্বতে এসেছিলো কথা বলতে বলতে।
“আংকেল আর একটু দিন দয়া করে। কথাটা শেষ করেই দিয়ে দিচ্ছি।”
“এই মেয়ে অনেক হয়েছে। আর এক মূহুর্তও এখানে থাকিবো না। নিজের যা খুশি করো। আমি কোন ঝামেলায় জড়াতে পাড়বো না। ” বলেই লোকটা হাটা দিলো সামিনে শুভ্রতার সকল ডাক উপেক্ষা করে।
লোকটা চোখের সামনে থেকে মিলিয়ে যেতেই আশেপাশে নজর দিলো শুভ্রতা৷ পাতার মরমর শুধু ব্দ আসছে। অন্ধকারে বুঝায় দায় কোথা থেকে এ শব্দ।
দাঁড়িয়ে থেকেই একটু পর দেখলো সেই ড্রাইভারটা জঙ্গলের ভিতর থেকে রাস্তায় উঠছে দৌড়ে। শুভ্রতার দিকেই আসছে।

শুভ্রতা দিকবিদিকশুন্য হয়ে আবারও ছুটলো সামনের দিকে।
এদিকে একের পর এক কল করেই যাচ্ছে মেহরাদ সেই নাম্বারটাতে কিন্তু ফোন বন্ধ বলছে। মেহরাদ গাড়ির স্পিড বাড়ালো, গাড়ি ঘুরিয়ে সেই ব্রিজের রাস্তার দিকে ছোটালো।
ছোট্ট পাথরে হোচট খেয়ে শুভ্রতার পা দুটো কিছুটা অবশ হয়ে আসতেই পিছন থেকে শক্ত একটা হাত ঘার চেপে ধরলো শুভ্রতার৷ আৎকে উঠে চেচিয়ে উঠলো শুভ্রতা। আরেকটা হাত এসে শুভ্রতার মুখ চেপে ধরলো। শুভ্রতার দু চোখ বড় বড় হয়ে গেল। নিজেকে ছুটাতে চাইলো বারবার, কিন্তু ব্যার্থ!
“কই যাতাছিলা মামনি? বোকা সোকা ভাবছিলাম তুই তো চালাক নিকলা রে! এই তোরা দুইটায় বেরা ধর এইডারে।” শুভ্রতার মুখ চেপে ধরা ছেলেটা সাথের দুটো ছেলেকে বললো।
ছোটা ছোটি করতে চাওয়া অবস্থায় শুভ্রতা দেখলো পিছনে আগের ড্রাইভারটার সাথে আরও দুটো ছেলে যুক্ত হয়েছে। এরা কখন এসেছে? সে তো পিছনে তাকাইনি আর তাই হয়তো দেখতে পায়নি।
তিন তিন জন ছেলে থেকে সে কিভাবে বাচবে? কেউই যে নেই আশেপাশে। শুভ্রতাকে বাচাবে?
শুভ্রতার মনে হলো এই ছেলে গুলোর থেকে বেশি সে আজরাইল কে দেখতো তাও সে এতটা ভয় পেত না যতটা সে এখন পাচ্ছে। মৃত্যু ভয় না নারী হয়ে নিজের সম্ভল হারানোর ভয় পাচ্ছে সে। এর চেয়ে মৃত্যু ভালো! শত গুনে, লক্ষ কোটি গুনে ভালো।

ছেলে গুলো শুভ্রতাকে টেনে আবার সেই সি এন জি’র কাছে নিয়ে যাচ্ছে। শুভ্রতা প্রানপনে চেষ্টা করছে ছাড়া পেতে কিন্তু ব্যার্থ হচ্ছে বারবার। দস্তাদস্তি করে টেনে নিয়ে যেতে যেতে শুভ্রতার পা’য়ের জুতো গুলোও খুলে গেল। কংক্রিটের রাস্তায় পা’য়ের পা’তা দুটো ছিলে গেলো। রক্ত ঝড়ছে ইতিমধ্যে। সেই ব্যাথা শুভ্রতার মস্তিষ্ক পর্যন্ত পৌছায়নে এখনো। বুকের ভয়, ব্যাথা এগুলোতেই কাবু মেয়েটা।
ছেলে তিনটে টানতে টানতে শুভ্রতাকে সি এন জির কাছে নিয়ে এসেছে। এবার সেখান থেকে টেনে রাস্তা ফেলে জঙ্গলের দিকে টেনে নিয়ে যেতে থাকলো। চেপে রাখা হাতের নিচেই শুভ্রতা গগন কাপিয়ে চিৎকার করছে আর ছেলে গুলো ওকে অশ্রাব্য বিশ্রী ভাষায় এটা সেটা বলছে।
কিছুটা দূরে যেতেই শুভ্রতা করে বসলো অভাবনীয় কাজ। মুখ চেপে ধরা হাতে স্বজোরে কামড় বসিয়ে দিল সে। ছেলেটা ব্যাথায় আর্তনাদ করে ছেড়ে শুভ্রতাকে। পাশে থাকা দুটো ছেলে এতে ক্ষেপে গেলো। চুলের মুঠি ধরে টেনে হিসহিসিয়ে বললো,

“বেশি তেজ বে’ড়ে গিয়েছে না ***?দাড়া….”
আবারও সামনে টেনে নিয়ে যেতে চাইলে শুভ্রতার মাথায় হটাৎই এক বুদ্ধির আবির্ভাব ঘটলো, হয়তো রবের’ই ইশারা সব। শুভ্রতার মনে হতে লাগলো, সে কিভাবে এখান থেকে ছাড়া পেতে পারে! একটা মেয়ে হয়ে তিনটা ছেলের সাথে শক্তিতে কোন ভাবেই পেরে উঠবে না। বুদ্ধি খাটাতে হবে।
ছেলে গুলোকে কোন ভাবে আঘাত করে পালানোর ব্যবস্থা করতে হবে। কিন্তু কোথায় আঘাত করলে কাবু করা যাবে? আর আঘাতিই বা করতে পারবে কিভাবে?
চোখ! হ্যাঁ, একটা মানুষ যতই শক্তিশালী হোক তার সবচেয়ে নরম কোমল দুর্বল জায়গা হচ্ছে চোখ। যদি সেখানে আঘাত করা যায়!
ভাবতে ভাবতেই রক্তাক্ত খালি পা’য়ের নিচে থাকা বালু মাটির মিশ্রণে থাকা জায়গা থেকে নিচু হয়ে মুঠো পুরে ছেলেগুলোর চোখের দিকে ছুড়ে মারলো দু হাতে। তিনটা ছেলেই চোখ চেপে চেচিয়ে উঠলো। ছেড়ে দিলো শুভ্রতাকে। নিজেদের চোখের জ্বালা নিয়ে ব্যাস্ত হয়ে পড়লো।
শুভ্রতা আবারও ক্ষতবিক্ষত পা নিয়ে ছুটে চললো সেই পুরনো রাস্তা দিয়ে যেখান থেকে নিয়ে এসেছিলো। চারদিকে এখন ঘুটঘুটে রাত। চাঁদের স্বল্প আলোয় সব কিছু আবছা আলোকিত কেবল। শুভ্রতার বাঁধনহারা চুল গুলো দৌড়ানোর তালে তালে উড়ছে। দৌড়াতে দৌড়াতেই গা’য়ের এলোমেলো ওড়নাটা ভালো করে গা’য়ে চাপিয়ে নিলো।

মেহরাদের গাড়িটা এসে থামলো ব্রিজের কাছে। ও গাড়ি চালানো অবস্থায়ই তার বন্ধু কায়েস কে জানিয়ে দিয়েছে লোকেশন এদিকের। তাঁরা-ও এদিকেই আসছে, সাথে আদনানও।
গাড়ি থেকে বের হয়ে পা’গলের মতো এদিকে সেদিক দেখতে থাকলো মেহরাদ। গাড়ির হেড লাইট দুটো জ্বালানো বিধায় ব্রিজটা আলোকিত হয়ে আছে। নিচে বহমান নদী। কিছুটা বড়ই৷
মেহরাদ ব্রিজের এপাশের চারদিক ভালো ভাবে চেয়ে সামনের দিকে দৌড় দিলো। দৌড়ের তালে তালে তার গা’য়ের হাই কোটটিও দুলছে। মোবাইলে ফোন আসলো আবার। দাঁড়িয়ে হাপাতে হাপাতে ফোনটা রিসিভ করে কানে ঠেকালো,

“কোথায় আছিস তুই? আমরা ব্রিজের কাছে প্রায় এসে গিয়েছি।” আদনান বললো।
“আ’ম অলরেডি হেয়ার।শুভ্রাকে কোথাও দেখছি না ইয়ার। ও কোথায়? ওয়েট,আমি ব্রিজের ওপারে গিয়ে দেখছি। তোরা তাড়াতাড়ি আয়।”
ফোন কেটে মেহরাদ আবারও ছুট লাগালো সামনে।
শুভ্রতা পিছনের দিকে তাকিয়ে দেখলো ছেলে গুলো খুব কাছে এসে পড়েছে তার। চোখ মুখ কেমন হিংস্র জন্তু জানোয়ারদের মতো হয়ে আছে।
শুভ্রতার দৌড়ে ব্রিজের উপর উঠতে থাকলো।পা দুটো আর দিচ্ছে না। যদি আর নিজেকে রক্ষা করতে না পারে তাহলে ব্রিজ থেকেই ঝাপ দিয়ে নিজেকে শেষ করে দিবে এই জানোয়ারদের হাতে পরার থেকে।
শুভ্রতা যখন ব্রিজের মধ্যবর্তীতে পৌছালো একটা ছেলে ওর চুল ছুই ছুই হয়েও ধরতে পারলো না। ভয়ে শুভ্রতা কান্না করে উঠলো। ছেলে গুলোর অশ্রাব্য ভাষায় গালাগালি তার কান্নাকে দাবিয়ে ফেলছে।
মেহরাদের দুরন্ত পা জোড়া থমকালো সেকেন্ডের জন্য। তার থেকে কিছুটা দুরত্বে একটা মেয়ে তার পিছু তিনটা ছেলে। দৌড়ে এদিকটায় আসছে। মেহরাদের নিশ্বাস আটকে আসলো। এটা তার শুভ্রা!
শরীর কাটা কাটা দিয়ে উঠলো তার। অবচেতন তার পা দুটো এমনিই চলতে শুরু করলো আরও দ্বিগুণ ভেগে।
শুভ্রতা আর ছেলেগুলো কেউই খেয়াল করেনি এখনো যে সামনে আলো আসছে কোথা থেকে আর তাদের সামনে যে কেউ দৌড়ে আসছে।
দৌড়ানো অবস্থাতাতেই পিছু ঘুরে ছেলে তিনটের অবস্থান দেখতে গিয়ে সামনে কোন কিছুর সাথে বড় সড় ধাক্কা খেলো শুভ্রতা। কিছু না দেখেই চেচিয়ে উঠলো। কোন দিক না তাকিয়ে নিচে বসে গেল ভয়ে। মুখে হাত চেপে পিছুতে পিছুতে ব্রিজের সুরক্ষামূলক সাইড ওয়ালে গিয়ে ঠেকলো তার ছোট্ট কাপা কাপা দেহটা। কেদে কেদে বলতে থাকলো,

“ছেড়ে দিন আমায় দয়া করে। আমায় ছেড়ে দিন। আমার এতো বড় সর্বনাশ করবেন না। আমি ম’রে যেতে দিন, এটা ভালো। আমার উপর জানোয়ারদের মতো ঝাপিয়ে পড়বেন না দয়া করে। আল্লাহর দোহায় লাগে ছেড়ে দিন আমায়। ” নিজের মতোই বলে যাচ্ছে শুভ্রতা।
ওদিকে মেহরাদ এগিয়ে যেতে চাইছে শুভ্রতার কাছে। সে ডাকছে কিন্তু শুভ্রতা সোনার মতো কোনো অবস্থাতে নেই। অতিরক্ত ভয়ে আতংকে সে দিশাহারা হয়ে আছে। কোন কিছুই আর তাকে তার ভয় আতংক থেকে বের করতে পাড়ছে না।
ছেলে তিনটা মেহরাদের সামনে এসে বললো,

“কি ভাই? মা*ল কষ্ট কইরা আমরা খাচায় আটকাইতাচছি। আমনে আবার কেডা?”
মেহরাদের পা’য়ের রক্ত মাথায় চড়ে গেল। মা*ল! দাত কপাটি শক্ত করে লাগিয়ে চেচিয়ে উঠলো,
“জানো*য়ারের বাচ্চা! কি বললি? আবার বল! তোর কলিজা কত্তো বড়? শু’য়রের বাচ্চা! তোর জিভ কেটে নেড়িকুত্তাকে খাওয়াবো। ” বলেই ছেলেটার বুকে এক লাথি মা’রলো।
মূহুর্তেই চারজনের মধ্যে মারা’মারি লেগে গেলো তুমুলভাবে। মেহরাদ ওয়েস্টে হাত দিয়ে দেখলো, রিভাল বারটা নেই সাথে। গাড়িতে। তার কাছে লাইসেন্স করা গান থাকে সবসময়। বিপদের সময় এখন নাই। এদের একেকটার লাশ ফেলে দিতো এখন না হয়। জানোয়ার গুলোর কলিজা কতো বড় সে মেপে দেখবে একেকটার।
পুলিশের গাড়ির হর্ন পাওয়া যাচ্ছে দূর থেকে। অর্থাৎ কায়েস, আদনান তারা এসে পড়েছে মেইবি। পুলিশের গাড়ির সাইরেন শুনে ছেলে গুলো মা’র খেয়ে পালিয়ে যেতে চাইলো। দু’জনের অবস্থা খুব খারাপ। একজন পালিয়ে গেলো আর দু’জন ব্রিজে অর্ধজ্ঞান হয়ে পড়ে রইলো।
মেহরাদ দৌড়ে এগিয়ে গেলো শুভ্রতার কাছে। শুভ্রতা এখনো মুখে হাত চেপে কান্না করছে আর তাকে ছেড়ে দিতে বলছে৷ এদিকটায় কি হচ্ছে তার জ্ঞানে নেই। ধারনায় নেই।

“শুভ্রা? শুভ্রা? এই দেখ তোর মেহরাদ ভাই আমি। তাকা এদিকে। চেয়ে দেখ। আমার জান,এই দেখ আমি এসে গিয়েছি। তাকা আমার জান….”
শুভ্রতা কিচ্ছু শুনলো না। তার মাথায় এটাই চাপলো তাকে কেউ ছুঁয়েছে। সে মেহরাদের হাত দুটো নিজের বাহু থেকে সড়িয়ে দিতে দিতে বললো,
“ছাড়ুন, ছাড়ুন আমায় বলছি। আমি এখান ঝাপ দিবো নয়তো বলে দিলাম। আল্লাহ তুমি আমায় রক্ষা করো। আল্লাহ….”
মেহরাদ শুভ্রতাকে কিছুতেই মানাতে পাড়ছে না। তার দিকে তাকাতেই পাড়ছে না ওকে। আদনান কায়েস এসে দেখলো এই দৃশ্য। তারা এসে পরে থাকা দুটো ছেলেকে আটক করে নিয়েছে প্রথমেই। একটু পর বাইক নিয়ে এসে থামলো আশিক। সে-ও এতক্ষণ যাবৎ খুঁজেছে শুভ্রতাকে প্রানপনে।

“তাকা আমার দিকে…., কথাটা তো শুনবি!”
“নাহ নাহ ছাড়ুন আমায়, ছাড়ুন…”
এক পর্যায়ে শুভ্রতা মেহরাদকে ঠেলে উঠে পালিয়ে যেতে চাইলে মেহরাদ কোন উপায় না পেয়ে হাবিজাবি বকতে থাকা শুভ্রতার ওষ্ঠ জোড়া শক্ত করে আঁকড়ে ধরলো । শক্ত করে চেপে ধরেছে বাহু দুটো। তবুও শুভ্রতার চেষ্টার অন্ত নেই। মুখ বন্ধ হলেও হাত দুটো চালাতে থাকলো মেহরাদের বক্ষপটে। একের পর এক কিল ঘুষি খামচি দিতে থাকলো মেহরাদের বুকে।

হৃৎস্পন্দন পর্ব ২৫

আদনান, কায়েস, আশিক আকস্মিক এ কান্ডে কেশে উঠে ঘুরে দাড়ালো। অপর পাশে তাকিয়ে দেখলো আরও দুটো গাড়ি আসছে এদিকে। তাদের বুঝতে বাকি রইলো না এরা কারা। খান বাড়ি আর তালুকদার বাড়ির গাড়ি। আজ মেহরাদের যে অবস্থা! ওকে কে আটকাবে আজ?
কার সাদ্ধ্যি!

হৃৎস্পন্দন পর্ব ২৭