Home হৃৎস্পন্দন হৃৎস্পন্দন পর্ব ৩০

হৃৎস্পন্দন পর্ব ৩০

হৃৎস্পন্দন পর্ব ৩০
সাঞ্জেনা শাজ

পা’য়ের নুপুর টুপুর বিছানায় ছুড়ে ফেলে রুম’ময় পাইচারি করছে শুভ্রতা। সয়তান লোকটা নিজেও পাত্তা দিবে না! আবার তাকে নিজের মতো করে থাকতেও দিবে না! চাইছে টা কি? মাথা কিনে বসে আছে? সব ওনার ইচ্ছেয় করতে হবে? কোন দুঃখে?
“ঐ কিরে কি করিস? আরেহ তুই তো আগে বাগেই রেডি! আমি লেট লতিফ হয়ে গেলাম!” বলতে বলতেই হুরমুর করে রুমে ঢুকলো সোহানা। তার কন্ঠে উচ্ছ্বাস। সে আবারও শুভ্রতার কাছে এগিয়ে গিয়ে কন্ঠে উপচে পড়া উচ্ছ্বাস ঢেলে বললো,
“জাবির ভাইয়া আমাদের জন্য রেস্টুরেন্টে থেকে খাবার নিয়ে এসেছে। ট্রিট হিসেবে। তারাতাড়ি চল ছাদে, আপু ব্যবাস্থা করছে সবকিছু ছাদে গিয়ে। ভাইয়াও নাকি আজ তাড়াতাড়ি বাড়ি এসেছে। সকলে একসাথে খুব মজা হবে৷ আমি দু মিনিটে আসছি। ”

“তুই যা, আমি কোথাও যাবো না। ”
“কি বলিস? আগে বাগে রেডি হয়ে বসে আছিস এখন বলছিস যাবি না! আজিব! তোর হয় কি মাঝে মাঝে?”
“তুই জানস আমি কেন রেডি হয়েছি?”
“না জানিনা। না বললে কেমনে জানমু? জানা..”
“ধুর ভাল্লাগে না। যা তো এখান থেকে। আমি কোথাও যাবো না। তোরাই গিয়ে এনজয় কর তোদের ভাইয়ায়র সাথে। ” মুখটা ভেঙিয়ে বললো শুভ্রতা৷ তাকে অপমানে লাল নীল বেগুনি বানিয়ে দিয়েছে লোকটা।
“কি ব্যাপার শুভ্রতা আপু সোহানা আপু তোমরা আসছো না কেন ছাদে? রোজা আপু শান্তা আপু ডাকাডাকি করছে তো তোমাদের। রাত্র বেশি হয়ে গেলে কিন্তু রোজা আপু চলে আসবে ছাদ ছেড়ে। ভাইয়ারাও’ কিন্তু চলে আসছে। তাড়াতাড়ি এসো।” বলতে বলতেই শুভ্রতার রুমে ঢুকলো শাফি।
শুভ্রতার নাকোচ এখনো বহমান। সে যাবে না। সোহানা শাফি নাছড়বান্দা। তারা জোর করেই নিয়ে গেল মেয়েটাকে। শুভ্রতা যাওয়ার আগে আবারও নুপুর জোড়া পায়ে জড়িয়ে গেল। এই লোক তার সামনে আসলে সে আজ জ্বালিয়ে মারবে। মনে মনে পন করে গেল।

চারদিকে আলোকিত ঝলমলে বিশাল ছাদটায় সকলে গোল করে বসে। মেহরাদ জাবির উপস্থিত হয়নি এখনো। তারা আদনানের জন্য নচে গিয়েছে। ওঁকে সাথে করে একেবারে উপরে আসবে৷
শান্তা ফটাফট কয়েকটা ছবি তুলে নিয়েছে আগে। রোজা বসে বসে বাচ্চাদের উচ্ছ্বাস দেখছে। জাহানারা বেগম সুরাইয়া বেগম এসে দেখে গেলেন বাচ্চাদের আয়োজন। মেয়েকে বারবার বলে গেলেন আটটার মধ্যে নিচে নেমে যেতে। এর বেশি রাত্র করে ছাদে থাকা যাবে না। তারা একটু থেকে যার যার মতো চলে গেলেন। বাচ্চাদের পার্টি সার্টি তারা থেকে কি করবে?
সবাই যখন এটা সেটা নিয়ে দুষ্টুমিতে ব্যাস্ত শুভ্রতাও তাদের সাথে মিলেমিশে সব কিছু ভুলে বসলো। কথায় কথায় চার বোন কতো হাসি মজা করলো। তাদের হাসি মজার মাঝেই ছাদের সিড়িতে ভারী কদমের শব্দ ভেসে আসলো।
সকলে সেদিকে তাকিয়ে দেখলো জাবির, আদনান সব শেষে মেহরাদ ঢুকছে ছাদে। হাতে বিয়ার টিয়ারের ব্যাগ। বুঝলো এগুলো আনতেই বোধহয় দেরি হয়েছে!

শাফি হই হই করে ভাইদের কাছে ছুটে গেল। সকলে গোল হয়ে পরিপাটি বিছানো পাটির উপরে বসে পড়ল। বিশাল বড় ছাদ তালুকদারদের। একপাশে সখের ফুল গাছ শুভ্রতার। অবশ্য এখন কিছুটা মুছড়ে আছে তাদের ছোট্ট বাগান খানা! সামনে শীত আসছে। আবারও নতুন করে সব ফুল গাছ লাগাবে সে। একপাশে দোলনা ও আছে। চারিপাশে লাইটিং করা। মৃদু ভলিউমে গান ছাড়া। সেই একটা মূহুর্ত!
গোল হয়ে বসতে বসতে স্পষ্ট আলোতে নিজের সামনে পছন্দনীয় বালিকার আবারও সেই লাস্যময়ী রূপ দেখলো মেহরাদ। অভিভূত হওয়ার চেয়ে মেজাজটা চিড়চিড় করে বাড়লো যেন! এখনো এভাবে আছে! এগুলো চেঞ্জ করে নি? তাকে আর কতো জ্বালাবে মেয়েটা? এই রূপ সে ছাড়া অন্য কেউ দেখবে কেন? হুয়াই? এই শাস্তি সে তোলা রাখলো। ভালো করে বুঝিয়ে দিবে কথা অমান্য করার পরিনাম কি!
নিজের উপর কারো তীক্ষ্ণ চাহনি না তাকিয়েও বুঝলো শুভ্রতা। সোহানা শান্তার সাথে এটা সেটা বলে হাসতে থাকা মুখের হাসিটা আস্তে আস্তে বিলীন হলো কিছুটা। চোরা নজরে সামনে তাকালে দেখলো লোকটা কেমন ভঙ্গিমায় তাকিয়ে আছে এদিকে। মনে মনে মুখ মোচড়াল শুভ্রতা। হুহ! চোখ দিয়ে গিলে খাচ্ছে!
সে আর সেদিকে তাকালোই না। তার কাজ সফল হয়েছে। এ লোক আবারও চেতেছে। চেতলে চেতুক! তার কি! সে আবারও খোশ গল্পে মশগুল হলো সকলের সাথে। খাবারে মনযোগ সকলে।
এসবের মাঝখানে আদনান জিজ্ঞেস করলো,

“কি অবস্থা তোমাদের দু’জনের? পরিক্ষার প্রিপারেশন কেমন? ”
“আর প্রিপারেশন? ভাই এসব লেখা পড়া কে বাইর করছে! এর থেকা বিয়ে কইরা জামাই নিয়া সংসার করা ভালা।” মুখের লাগামহীন কথা ছাড়লো সোহানা লেগ পিসে কামড় দিয়ে। মেয়েটার লেখা পড়ায় এতো অনীহা!
মূহুর্তেই পিঠে চাপড় মারলো শান্তা। বড় ভাইদের সামনে এসব কি কথা! সোহানারও হুশ হলো। এদিকে বাকি সকলে হেসছে ওঁকে নিয়ে। মেয়েটা কিছুটা লজ্জা পেল এবার। আদনান বলে উঠলো,
“তুমি সংসারও করতে পাড়বে না ঠিক মতো। পায়ে পা লাগিয়ে ঝগড়া করবে শুধু। ”
সোহানা এযাত্রায় ফুসে উঠলো,
“আপনি জানেন?”
“জানি মানে! হান্ড্রেড পার্সেন্ট শ্যিউর। ”
সোহানা কটমট করে চেয়ে রইলো। মেহরাদ ভাইয়ের জন্য কিচ্ছু বললো না। তবে মনে মনে বদদোয়া দিতে ভুললো না। ‘তুই বেটা দেখিস, তোর বউ সারাক্ষণ ঝগড়া করবে তোর সাথে। আদর করতে গেলে বলবে ছেড়ে দিন ছেড়ে দিন। আপনার আদর চাইনা।’
মনে মনে বদদোয়া দিয়ে সোহানা বাকা হাসলো আদনানের দিকে চেয়ে। তার চিন্তা; দিয়েছি দোয়া করে এরপর সংসার করবি ঝগড়া করে। তখন বুঝবি অন্যকে বলা কেমন লাগে! আদনান ওর বাকা হাসি দেখলো। মুটেও সুবিধার ঠেকলো না। আবার কি বজ্জাতি করে কে জানে! আস্ত বজ্জাত মেয়েটা!

খাওয়া দাওয়া শেষ প্রায়৷ রোজাকে নিয়ে শান্তা আর জাবির নেমে গিয়েছে। মেহরাদের কল এসেছে একটা সে উঠে এক কিনারায় গেল ছাদের। এদিকে আদনানও নেমে গেল ওর কাছে হাত নাড়িয়ে বিদায় নিয়ে। সোহানাও ছুটলো আদনানের পিছু পিছু। উদ্দেশ্য, কয়েকটি কড়া কড়া কথা শুনিয়ে দেওয়া। তখন ভাইয়ার সামনে কিভাবে অপমান করল! সে ভালো তাই তখন কিছু বলেনি। কিন্তু এখন! সে ঠিক শুনিয়ে দিবে দুটো কথা। বদদোয়া দিয়েছে কবে না কবে ফলে কে জানে! এতোদিন বসে থাকবে অপমানের শোধ নিতে? উঁহু।
আস্তে আস্তে ছাদ খালি হলে শুভ্রতা বসে রইলো ঠাই৷ তার দৃষ্টি মেহরাদের পৃষ্ঠ দেশে। লোকটা অবছা অন্ধকারে৷ কিন্তু অবিচল ভঙ্গিতে হাত নাড়িয়ে নাড়িয়ে কথা বলছে কার সাথে জানি! কে? ঐ আয়রা টায়রা নয়তো আবার?
লাফ দিয়ে বসা থেকে উঠলো শুভ্রতা৷ তার পায়ের নুপুর ঝপঝপ শব্দ করে উঠলো। এখনো মৃদু ভলিউমে গান চলমান। তাই এত দূর থেকে মেহরাদ শুনলো না সে শব্দ।

কদম বাড়িয়ে এগিয়ে গেল শুভ্রতা মেহরাদের দিকে। যেতে যেতে তাকেও অন্ধকার মুড়িয়ে নিল। সে শুনলো মেহরাদের দু একটা শব্দ – ‘ইয়াহ, এজ ইউর উইশ, ইটস উইল বি আওয়ার প্লেজেন্ট মিস।’
শুভ্রতা আবারও হাতের মুঠোয় ওরনা চেপে পাইচারি করতে লাগলো মেহরাদের পিছনে। সে নিশ্চিত ঐ টায়রার সাথেই কথা বলছে! বেজায় খারাপ লাগলো তার হুট করেই৷ কেন? সে জানে না। তবে কারনে অকারণে ধপ ধপ ফেলতে লাগলো আবছা অন্ধকারে। লোকটা কতদিন তার সাথে ভালো করে কথা বলে না৷ মিষ্টি কথায় তাকে কাছে টেনে নেয় না। ছোট ছোট আদরে ভড়িয়ে দেয় না৷ যদি তাকে ভুলে যায়? দূরে সড়ে যায়?
না না না। কি ভাবছে সে! এট কক্ষনও হবে না। সে জানে মেহরাদ ভাই তার বোকামতে তাকে শাস্তি দিচ্ছে দূরে সড়িয়ে তাই এড়িয়ে চলছে। তাই বলে ভুলে যাবে? তার মন মানে না।
মন খারাপ নিয়ে মেয়েটা মেহরাদের দৃষ্টি আকর্ষণে বার বার বড় বড় পা ফেলে নুপুরের ঝুমঝুম শব্দ করলো। মেহরাদ বুঝেছে শুভ্র‍তার উপস্থিতি। এই মূহুর্তে তাদের বাড়িতে শুধু মেয়েটাই নুপুর পায়ে আর কে শব্দ করবে নয়তো তার ধারে এসে! তার উপর মাতাল করা মেয়েলি ঘ্রাণ তো আছেই! তবুও সে পিছু তাকালো না। এভাবেই কথা বলায় ব্যাস্ত রইলো।

বেশ কিছুক্ষণ যাবত মেহরাদের নজর কারতে ব্যার্থ শুভ্রতা অধৈর্য হয়ে আরও একটু মেহরাদের নিকট এগিয়ে যেতে নিলেই বাধে বিপত্তি। মেহরাদের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে মেয়েটা সামনে এগুতে গিয়ে কিসে যেন পা বেধে ধপ করে উপর হয়ে পড়েছে খসখসে ছাদের মেঝেতে। তীব্র ব্যাথায় আর্তনাদ করে উঠে মেয়েটা।
ধপ করে পরার শব্দে তড়িৎ পিছনে ঘুরে মেহরাদ। শুভ্রতার আর্তনাদে ফোন রেখেই ওর কাছে ছুটে। শুভ্রতা নিজে থেকেই উঠে বসেছে মেঝেতে পায়ে হাত চেপে। ব্যাথায় মুখশ্রী নীল। উফফফ, পায়ে ভিষণ ব্যাথা হচ্ছে। হাটুর উপরিভাগ জ্বলে যাচ্ছে। নুপুর পড়া স্থানে তীব্র ব্যাথা। উফফ, কি ব্যাথা! চোখে জল জমেছে মেয়েটার। ব্যাথাটা ভালোই পেয়েছে রক্তিম নোনা জলের মুখশ্রী দেখেই বুঝা যাচ্ছে।
শুভ্রতাকে বিনা নোটিশে পাজোকুলে তুলে নিয়ে আলোতে আসে মেহরাদ। অস্থির ভঙ্গিতে শুধায়,
“কি হয়েছে? কোথায় ব্যাথা পেয়েছিস? কষ্ট হচ্ছে?”
কেন জানেনা শুভ্রতার পায়ের ব্যাথা লাঘব না হলেও হৃদয় প্রসারিত হলো মেহরাদ ভাইয়ের কনসার্নে। অশ্রু চোখে চিবুক ভেঙে লোকটার দিকে তাকালো আহ্লাদী হয়ে। লোকটা চিন্তিত বধনে তাকে দোলনায় বসালো। সেখানে আলো আছে বেশ কিছুটা। চেপে ধরা পায়ের কাছ থেকে হাত সড়িয়ে দেখলো, নুপুর পড়া স্থান থেকে রক্ত ঝড়ছে। ভালো করে দেখে বুঝতে পাড়লো নুপুরের কড়া বিধে গিয়েছে পাতলা চামড়ার ভিতরে।
মেহরাদের মস্তিষ্কটা মূহুর্তেই বিগড়ে যেতে চাইলো। এই বা*ল পড়ে ঢং করতে গিয়ে কি বিপদ বাধালো এবার মেয়েটা! কতটা কষ্ট হচ্ছে ওর! সে কর্কশ কন্ঠে বলে উঠলো,

“এইসব জিনিস খুলতে বলে ছিলাম না? কথা কানে যায় না, না? আমায় বেশি ভালো পেয়ে নিয়েছিস? ধরলে ছাড়বো না, বলে দিলাম।” বলতে বলতেই হাত ছোয়াল ক্ষত স্থানে।
শুভ্রতা ব্যাথায় চোখ খিচে ‘আহহ্, উহহ ‘ করে উঠলো।
খুব আবেদনময়ী শুনালো শুভ্রতার এ সুর। না চাইতেও মেহরাদের মস্তিষ্ক তাকে অন্য কোথাও খিঁচে নিয়ে গেল৷
গাল মন্দ করলো মেহরাদ তার নষ্ট মাইন্ডকে। মেয়েটা ব্যাথায় কাতর। আর সে বেড….!
নুপুরের কড়াটা বের করার চেষ্টায় মেহরাদ। এর মধ্যেই শুভ্রতার গাল বেয়ে অশ্রু ঝড়তে শুরু করলো। একে তো ব্যাথা, তার উপর মেহরাদ ভাইয়ের ধমক! মেয়েটার ছোট্ট পাখির ন্যায় কলিজা কাপে বারবার। সে নাক টেনে শুধায়,
“”আহহহ্! আর পাড়ছি না। আর কতক্ষণ? ”
” হয়ে গিয়েছে, আর একটু! ভিতরে ঢুকে গিয়েছে একদম.. ” তৎক্ষনাৎ নিজ কাজে ব্যাস্ত থেকে জবাব দেয় মেহরাদ।

“বেশি-ই ঢুকে গিয়েছে তাইনা? “ব্যাথায় নীল তার নাজুক দেহ।
“এইতো বের করে দিচ্ছি। ” আলগোছে মেয়েটাকে আশ্বাস দিয়ে বলে উঠে মেহরাদ।
“উফফফ্ কত্তো ব্যাথা হচ্ছে! রক্ত ঝড়ছে। ” কেদে কেদে বলে মেয়েটা৷ হাটুটাও কি ভিষণ জ্বলছে তার! পাজামার উপরেও কিছুটা কাপড় ফেটে গিয়েছে।
“এই তো শেষ। বের করে ফেলেছি কড়াটা। ” বলেই নুপুরের ছোট্ট ভাঙা কড়াটা পা’য়ের ক্ষতস্থান থেকে বের করে দিলো মেহরাদ। তারপর নিজ হাতে পা’য়ের নুপুর দুটো খুলে ছুড়ে ফেললো দূর অজানায়৷ ঝনঝন করে উঠলো ছাদে মূহুর্তেই। পা দুটো বুকের কাছটায় টেনে নিলো ভালো করে। আর কোথাও ব্যাথা আছে কি!
সেই সাথে কেউ আকস্মিক ছাদের দরজায় হাত দিয়ে ঠেলে ভিতরে ঢুকতে নিলে মেহরাদ দু শব্দের এক বাক্যে থামিয়ে দেয়,

“নিড প্রাইভেসি। ”
রিমা খানের চলন্ত পা জোড়া থেমে যায়। এমনিতেই মহিলার মুখশ্রী ঘোর অন্ধকার। তারউপর যেসব কথাবার্তা শুনেছে সিড়ি বেয়ে আসতে আসতে! নিজেরই লজ্জা ঘৃণা ঝেকে বসেছে। কতটা নির্লজ্জ পনা করে!
সে এসেছিলো সকলকে নিচে দেখে শুভ্রতা আর মেহরাদকে একা ছাদে ভেবে। তার উদ্দেশ্য শুভ্রতা আর মেহরাদ এখন একে অপরের উপর নাখোশ। এই সুযোগে দূরে দূরে রেখে যদি সব শেষ করা যায়,মন্দ কি?
তাই তিনি ছুটে এসেছিলেন মেয়েটাকে ঢেকে নিয়ে যেতে। কিন্তু আসতে আসতে তিনি যেসব কিছু শুনলেন তার কানও বিশ্বাস করলো কি-না সন্দেহ! এখন আবার বলছে নিড প্রাইভেসি? বেয়াদব কি সাধে বলে এই লম্পট ছেলেকে তিনি!
আর এগোলেন না রিমা খান। নিজ লজ্জায় নিজেয়ই নেমে গেলেন সিড়ি বেয়ে ধুপধাপ পা ফেলে।
শুভ্রতা মেহরাদ জানেনা সিড়িতে কে ছিলো। তারা ভেবেছে শাফি নয়তো সোহানা হবে হয়তো!
ব্যাথা থেকে উপশম পেয়েছে কিছুটা শুভ্রতা। কান্না থামালো মেয়েটে। চোখ মুখ রক্তিম হয়ে ফুলে উঠেছে। এক হাতের উপর শুভ্রতার এক পা এখনো। সে তাকালো মেয়েটার কান্নারত ভেজা মুখশ্রীতে। শুভ্রতা পা ছাড়িয়ে নিতে চাইলো। মেহরাদ ততই আরও শক্ত করে চেপে ধরলো। শুভ্রতা মৃদু চেচায়,

“আহহ্, ব্যাথা পাই তো!”
“সেড়ে যাবে। মলম দিয়ে দিবো। আর কোথাও ব্যাথা আছে?”
শুভ্রতা একবার উপর নিচ মাথা দুলালো তারপর আবার ডানে বামে মাথা নাড়িয়ে না বুঝালো। অর্থাৎ, ব্যথা নেই। মেয়েটা চিন্তিত, তার ব্যথা তো হাটুতে। সেখানে যদি দেখতে চায়? অসম্ভব!!
তার অসম্ভব কে সম্ভব করতে মেহরাদের নজর ঠেকলো হাটুর উপরের সাদা পাজামার দিকটায়। জামা সড়ে শুভ্র পাজামা ময়লার সাথে কিছুটা ছুপছুপ রক্তের দাগ যেনো! সে কিচ্ছু চিন্তা করে অতি দ্রুত পা’য়ের নিচ থেকে পা’জামা উপরে তুলতে তুলতে বলে থাকলো,
“হাটুতেও ব্যাথা পেয়েছিস? চুপ করে ছিলি কেন ইডিয়েট? রক্ত ঝড়ছে তো।”
তার বলিষ্ঠ হাত দুটো বাধা প্রাপ্ত হয় দুটো চিকন মেয়েলি নরম তুলতুলে হাতের বাধায়। শুভ্রতার চোখের দিকে তাকায় মেহরাদ। ভয়ার্ত দৃষ্টিতে দু দিকে মাথা নাড়িয়ে না বুঝায় মেয়েটা। মেহরাদ মেয়েটার নিষেধাজ্ঞা বুঝে। অতি গভীরে ছুঁয়ে দিতে মানা করছে মেয়েটা। কিন্তু কেন? সবে তো তার অধিকার! তাহলে? লজ্জায়?

“তোর কথা শুনবো আমি? মানা করার কারণ? ”
“আপনি…আপনি এমনটা করতে পারেন না মেহরাদ ভাই। ”
“কারণ জানতে চাইছি।”
“এটা পাপ। কোন অধিকার নেই আপ…আপনার আমার গভীর দেহে আপনার ছোঁয়ার।”
মেহরাদের মস্তিষ্ক জ্বলে উঠলো মেয়েটার আটকে আটকে ভিতু স্বরে কথাতে। মূহুর্তেই চড়া স্বরে বলে,
“আমার অধিকার নেই? সিরিয়াসলি? তোর পায়ে কেন সারা অঙ্গে আমার ছোঁয়ে দেওয়ার অধিকার আছে শুভ্রা। হালাল আছিস অধিকারও আছে। যেদিন অধিকার দেখাবো পুরো হজম করে ছাড়বো তোকে।”
শুভ্রতা কেপে উঠলো মেহরাদের মুখ থেকে নিংসৃত বাক্য শুনে। ব্যাথিত পায়ের তালু শিরশির করে উঠলো কেমন। কিন্তু তাদের বিয়ে তো কেউ মেনে নেই। রেজিস্ট্রেশন ও তো হয়নি না-কি বলে। তাহলে? তাহলে সে হালাহ হলো কিভাবে?

মেয়েটার ছোট্ট মস্তিষ্ক কিছুই ধরতে পাড়লো না। মেহরাদও এখন পর্যন্ত সব কিছু ক্লিয়ার করেনি। তবে মেহরাদ ভাইয়ের প্রতি তার অঘাত বিশ্বাস। তাই মেনে নিলো। তবুও! মেহরাদের এ চাওয়া সে মানতে পাড়বে না।
কিন্তু তার মানা না মানার ধার ধারলো না মেহরাদ। নিজ উদ্দ্যেগে তার হাটু মুড়ে বসা পায়ের উপর চিকন মেয়েলি পা তুলে সেথা হতে বস্র হাটায়। মূহুর্তেই চিকন সফেদ পা উন্মুক্ত হয়। মেহরাদের গলা শুকিয়ে কাঠ। দেহের রক্ত যেন ছুটছে উল্কার বেগে। মোলায়েম স্পর্শে বড় বড় আঙুল পৌছায় ক্ষতস্থানে।
হাটুরও কিছুটা উপরে চোট। শুভ্রতা লাজে চোখ খিঁচে। মেয়েটা উপুড় হয়ে ঝুকে মেহরাদের কাধ খামচে ধরে। লাজে তার প্রান যায় যায় অবস্থা। তার উপর যখন ক্ষতস্থানে মেহরাদের তপ্ত ঠোঁটের ফহরা ফুরে ফো পড়ে সেথা, মেয়েটার রক্ত ছলকে উঠে ছোট্ট দেহের। আন্দলিত হয় বক্ষস্থল। রি রি করে উঠে সমস্ত নারী সত্তা। ভিতরে ব্যাথার কষ্ট ভুলে ভিন্ন অনুভূতিরা মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে টালমাটাল তার অনুভূতি।

“অনেকটা ছিলে গিয়েছে। ড্রেসিং করে ওয়োনমেন্ট লাগাতে হবে। রুমে যেতে হবে আগে।”
আবারও তাকে কোলে নিবে? শুভ্রতা দু পাশে মাথা নেড়ে উঠে দ্রুত। অতি লাজে চঞ্চল বালিকা বলে উঠে,
“নাহ, নাহ, আমি পাড়বো। আমি পাড়বো যেতে।” বলে পাজামা টেনে নিচে নামাতে চাইলো মেয়েটা। কেউ এসে গেলে!
মেহরাদ তাকালো কঠোর চোখে। শাশিয়ে বললো,
“মুক্তি চেয়েছিলি না? দিয়েছিলাম তো। দেখ কি অবস্থা? আরও দিবো মুক্তি। তবে নিজেকে সুস্থ রাখতে হবে। তাহলেই আমি আর কিছুতে আসবো না। আর যদি আসা লাগে, আমি কারো বাধাও মানবো না। সামনের জনেরও না। নোট ইট। ”

শুভ্রতার হৃদয় ব্যাথিত হলো। নিজের সেদিনকার কথায় সে লজ্জিত। অনুতপ্ত। দুঃখীত। তার মস্তিষ্ক তখন এলো মেলো ছিলো। মেন্টালি ডিপ্রেসড ছিলো। লোকটাকে না বুঝে কষ্ট দিয়ে ফেলেছে। জেদ ধরে ক্ষমাও চায়নি। সে কি পাষাণ! হায় হায়! তার তো আরও এমন শাস্থি পাওয়া উচিৎ! আরও ব্যাথা পাওয়া উচিৎ! তাহলেই যদি তার শিক্ষা হয়।
আবারও অশ্রু গড়া চোখের কোল ঘেষে মেয়েটার। নাক টেনে আওড়ায়,
“আমি বোকা। তাইতো সকলকে চিন্তায় ফেলি। কষ্ট দেই। আমার জন্যই সকলের মধ্যে কতো সমস্যা। আমি সবার রাগেরই কাজ করি।”
এমন একটা মূহুর্তে এসব কথা শুনেও মেহরাদ টললো না। সে টলবেও না। এ মেয়েকে আজেবাজে কথার ঝাঝ যদি সে না ভুলিয়েছে সেও মেহরাদ না। যেদিন সরি সরি বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলনে সেদিন ভেবে দেখবে৷
পাজামাটা টেনে আবারও আলগোছে মেয়েটাকে কোলে তুলে নিলো মেহরাদ। কাধ জড়িয়ে ধরে শুভ্রতা। নিচের দিকে হাটা দিলে সংকুচিত হয়ে আসে মেয়েটার তনু লাজে। কারো সামনে পরলে?

শুভ্রতার চিন্তা মতো কারো সামনেই পড়েনি তারা। তার রুমে নিয়ে এসেছে মেহরাদ ভাই। বিছানায় শুয়িয়ে ছোট্ট ড্রয়ার থেকে ফার্স্ট এইড বক্স নিয়ে আবারও তার সামনে বসলো পা টেনে। দরজা আটকানো।
সেই একি অনুভূতি ঝেকে ধরলো তাকে। মেহরাদ ভাবলেশহীন। প্রথমে নুপুর পড়া ক্ষতস্থানে মল লাগিয়ে পা উন্মুক্ত করলো। হাটুর কিছুটা উপরে হওয়ায় প্রায় অনেকটাই উন্মুক্ত। শুভ্রতা লাজে চোখে খিচে মটকা মেরে পড়ে থাকে। ব্যাথা হলে উফফ তাক ও করেনা।

মেহরাদ বার কয়েক শক্ত ঢোক চাপার চেষ্টা করলো। কিন্তু হায়্! বৃথা এ চেষ্টা। গলা শুকিয়ে চৌচির। এ সেবাধানে সে না আবার কন্ট্রোল হাড়িয়ে মেয়েটাকে আরও শয্যাশায়ী বানিয়ে রাখে! তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘামের রেখা। চোখ বন্ধ শুভ্রতা তা দেখলে নিশ্চিত বিচিলিত হতো তার মেহরাদ ভাইয়ের কি হয়েছে ভেবে।
আবারও মেহরাদের ওষ্ঠপুট সফেদ পাতলা চামড়ার খুব কাছে অনুভব করলো শুভ্রতা। বুকের ধিমধিম ধব্দ বুঝি রুম ছেড়ে বেড়িয়ে যাচ্ছে! তার তো তাই-ই মনে হচ্ছে। এত্তো জোরে বাজছে হৃদযন্ত্রটা!
হাটুর নিচে মেহরাদের বলিষ্ঠ এক হাতের ছোঁয়া কিছুটা প্রগাঢ় অনুভব করলো শুভ্রতা। বারবার নড়ছে আঙুল গুলো। ছুঁয়ে ছুঁয়ে দিচ্ছে কাটা কাটা স্পর্শে। মেহরাদ যেন ঘোরে কোন। শুভ্রতার নিশ্বাস আটকে আসে। পড়নের কামিজ খামচে ধরে। তাও চোখ খুলে না মেয়েটা। যদি নিজেকে হাড়িয়ে ফেলে ঐ মাতাল করা চোখে!
মেহরাদ আবারও ঝুকে। দেরি করলো না এবার। হুশ হাড়িয়ে কিছু না ভেবেই তপ্ত ওষ্ঠ জোড়া চেপে ধরলো ক্ষতস্থানের পাশে। শুভ্রতা শব্দ করে বড় নিশ্বাস টানলো।। তার সাড়া শরীর মুশরিয়ে উঠেছে। পেটে অসংখ্য প্রজাপতিরা যেন আস্তানা গেড়েছে। চোখের কোনে জল। এ জল কিসের?
পরিস্থিতি বেসামাল। শুভ্রতার টিকে থাকা দায়। সে হটাৎই শুধালো খুব আবেদনময়ী আহ্লাদী সুরে,

“আমার নুপুর গুলো কই ফেলে দিলেন!”
“আবার কিনে দিবো। ”
“আমি পরবো। ”
“পরিয়ে দিবো।”
“কবে?”

হৃৎস্পন্দন পর্ব ২৯

“যেদিন এই তুলতুলে নরম চিকন পা দুটো আমার কাধ….” আর বললো না মেহরাদ। ঘোর কেটেছে তার।
পাজামা টেনে অতিদ্রুত রুম ত্যাগ করলো। শুভ্রতার চোখ দুটি বিস্ফোরিত। কি বলতে চলেছিলো অশ্লীল লোকটা?
মেয়েটা গায়ে চাদর টেনে গুটিয়ে শুয়ে পরে। থরথর করে কাপে নাজুক লজ্জিত নেতানো তনু। গরম ধোঁয়া বের হচ্ছে শরীরের চামড়া বেধ করে। আহহ্! কি জ্বালা আল্লাহ! লোকটা তাকে কথা দিয়েই কাবু করে ফেলছে।
আর….যেদিন…যেদিন…..

হৃৎস্পন্দন পর্ব ৩১