Home হৃৎস্পন্দন হৃৎস্পন্দন পর্ব ৩৫ (৪)

হৃৎস্পন্দন পর্ব ৩৫ (৪)

হৃৎস্পন্দন পর্ব ৩৫ (৪)
সাঞ্জেনা শাজ

“আরেহ…আরেহ থামান থামান। গাড়ি থামান। এমন স্পিডে গাড়ি কে চালায়? আরেহ মিয়া আস্তে! আল্লাহ, আমার এখনো বিয়ে হইলো না। একটা জামাই হইলো না। জামাই’র আদর খাওয়া হইলো না। আমি এখনি ম’রতে চাই না….” আহাজারি করে বিলাপ করছে সোহানা।
তুফানের ন্যায় গাড়ির স্পিড দিয়ে রেখেছে আদনান। সোহানার বিলাপে তার কোনো ভাবান্তর নেই। দেদারসে চালাচ্ছে গাড়ি হাই স্পিডে। ওপাশ থেকে সোহানার আবারও শুনা গেল গলা,

“এই মিয়া, গাড়ি থামান! ম’রার হলে নিজে ম’রেন। আমায় রাখেন। আমি বিয়ে করমু। জামাইর সাথে হানিমুনে যামু। বহুত কিছু বাকি। এখন ম’রতে চাই না। ”
এযাত্রায় দাতে দাত চাপলো আদনান। একশোটা কথার মধ্যে নব্বইটাই জামাই নিয়ে আহাজারি ইঁচড়েপাকা মেয়েটার। জামাইয়ের কি বুঝে এটা? এটাকে তো!!!
গাড়ি থামানোর ভাবান্তরের কোন লেশমাত্র দেখা গেলো না আদনানের। সে আসলে গাড়ি হাওয়ায় বেগে উড়িয়ে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে সে নিজেও সঠিক জানে না। তবে মনে মনে শুধু এক প্রতিজ্ঞা, এই বেয়াদবকে জমের দৌড়গাড়া থেকে ঘুড়িয়ে আনবে সে। বুঝুক মজা!
সোহানা আদনানের ভিতরে কোন ভাবান্তর না দেখে এবার কিছুটা ভয়ে সংকুচিত হতে চাইলো। কিন্তু তার দুষ্ট মস্তিষ্ক এতো তাড়াতাড়ি থামতে নাড়াজ। তাইতো কিছুটা ভয়ে উপরের হ্যান্ডেলটা আকড়ে ধরে আদনানকে তাজ্জবের চুড়ান্তে নিয়ে গেয়ে উঠলো,
“ধীরে ধীরে চালাও গাড়ি…..মাথা ঠান্ডা করে……. ”

একাধারে প্রায় ঘন্টা দু’এক হাওয়ায় গাড়ি ভাসিয়ে গাড়ি থামিয়েছে আদনান। শহর থেকে কিছুটা দূরে একটু নিরিবিলি জায়গায় । সে অবশ্য এখনো থামাতো না। কিন্তু দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে যাচ্ছে। তারউপর নভেম্বর মাস! আকাশ যখন তখন মেঘলা হয়ে যাচ্ছে। বেশি দূর গেলে ফিরতে বিপাকে পরে যেতে পারে। তাই আজ এতটুকুই থাক। এমনিতেও খাবারের নাম দিয়ে মেহরাদকে বলে এসেছে সে। খাওয়াতেও তো হবে মেয়েটাকে!
সোহানার চোখ মুখ কিছুটা ফ্যাকাসে সেই সাথে ছোট্ট চোয়ালটা শক্তও। গাট হয়ে বসে গাড়িতে। কই নিয়ে আসছে লোকটা? কিরকম নিরিবিলি জায়গা!
গাড়ি থেকে নেমে কোন কথাই বললো না আদনান। ঘুরে এসে সোহানার পাশের দরজা খুলে দিলো। ভেঙচি কাটলো মনে মনে সোহানা। “ইশশ! এতক্ষণে প্রিনসেস ট্রিটমেন্ট দিতে আসছে! প্রিনসেস ট্রিটমেন্ট মাই ফুট্টট্ট!”
সেভাবেই বসে রইলো সে। নড়লোও না চড়লোও না।

“কিহ? বের হবে না? ক্ষিদে পায় নি?”
সোহানা এবারও চুপ রইলো। তার কথা বলতেই মন চাচ্ছে না লোকটার সাথে। তবে একিই প্রশ্ন আবারও কানে বাজলো। তাই কিছুটা খেঁকিয়ে উঠলো,
“নাহ হাওয়া খেয়ে পেট ভরে গেছে। যেই গাড়ি চালিয়েছেন!”
“হ্যাঁ। তা-ও ঠিক। তবে পেট ভরার সাথে সাথে যদি মাথাও জ্ঞান দিয়ে ভরে যেতো তাহলে আরও ভালো হতো।”
“কি বলতে চাইছেন আপনি? আমার মাথায় জ্ঞান নেই?” তড়াক করে গাড়ির বাইরে পা রেখে বললো সোহানা। কটমট চাহনি।
“বুদ্ধিমানদের জন্য ইশারাই কাফি-হে! ”
সোহানার চোখ দুটো বেরিয়ে আসার জোগার। সরাসরি অপমান তাকে! সে ঠাস করে আবারও গাড়ির দরজাটা লাগালো। ভিতরটা আবারও কেঁপে উঠলো আদনানের।তার সখের গাড়িটা! ইশশশ!
“আবার? আবার এমন করলে তুমি? এতক্ষনের স্বাস্থিটা ভুলে গিয়েছো? একিই শাস্থি যাওয়ার সময়ও বরাদ্দ করা হলো। ” দাতে দাত চেপে বললো আদনান।
সোহানার যেন সব এমনিই এমনিই মাথায় এটে গেলো। ওহ আচ্ছা! ভদ্রলোকের গাড়ি খুব প্যায়ারি হে! হোক! তাতে তার কি? সে তো এখন এই গাড়ির আরও বারোটা বাজাবে! মনে মনেই ভেবে রাখলো সোহানা।

“ভাইয়ার কাছে বিচার দিবো, আপনার নামে।”
“দিও।”
“দিবো?”
“হ্যাঁ, দিও। এখন এসো। খাবে, তারপর আবার ফিরতে হবে।”
“কোথায় খাবো? এই জঙ্গলে কে রেধে বেরে রেখেছে আমাদের জন্য? এটা কোথায় নিয়ে এলেন, আমি যাবো না কোথাও…” বলেই আবারও গাড়ির ভিতরে ঢুকতে নিয়েছিলো সোহাবা। আদনান আটকে দিলো। ওর চিকন বা হাতটা নিজের মুঠোয় চেপে ধরতে ধিরতে বললো,
“হাত ধরছি আর ছাড়ছি না। চুপচাপ আমার সাথে চলবে। এখানেই একটা ছোট খাটো রেস্টুরেন্ট আছে। খাবে তারপর বাসায় নিয়ে যাবো।”
সোহানা আদনানের ধরা হাতের দিকে চেয়ে। বয়সে যথেষ্ট বড় উনি। হুট করেই এ হাত ধরা তার ভিতরকে নাড়াচ্ছে। ছোঁয়াটা অসহ্য তা না, কিন্তু হৃদয় ধুকপুক করছে, অস্বস্তি হচ্ছে। তার অস্বস্তিতা বাড়াতে আদনান হটাৎ করেই থেমে গেল। চলন্ত পদজুগোল থামিয়ে সোহানার দিকে ঘুরে শুধালো,

“ওয়েট, তুমি কি কোন ভাবে আমাকে নিজের জন্য হার্মফুল মনে করছো?”
তড়িৎ মাথা নাড়াল সোহানা। তার এসব মাথাতেও আসেনি। ক্ষতিকর কেন মনে করবে? যথেষ্ট বিশ্বাস আছে তার উনার উপর।
আদনান সন্তুষ্ট চিত্তে আবারও পা বাড়িয়ে একটা বাশ দিয়ে তৈরি রেস্টুরেন্টের সামনে গেল। বেশ সুন্দর চারিপাশ। গুটিকয়েক মানুষেরও উপস্থিতি আছে।
সোহানার মুখখানা হা সদৃশ হলো। কি সুন্দর! তার গুমোট মুখখানা খুশিতে চিকচিক করে উঠলো। মনে মনে ভেবে নিলো যাওয়ার সময় আদনানের কাছ থেকে মোবাইল নিয়ে ছবি তুলে নিয়ে যাবে। বাবাহ, কি সুন্দর মনমুগ্ধকর জায়গাটা!

সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হচ্ছে। বাহিরে বৃষ্টি বইছে ঝুমঝুম শব্দ তুলে। হুটহাট বৃষ্টি বেশ শীত নামাচ্ছে শহরে। এমনিতেতে ব্যাস্ত শহরে শীত ছুয়ে যায় কম। কিন্তু বৃষ্টিতে সমস্ত কিছু ঠান্ডা। একদম স্নিগ্ধ শান্তি দিয়ে ভরিয়ে যায় বারিশ।
তালুকদার বাড়ি শুভ্রতা আর সোহানা ঘুরতে যাবে ঘুরতে যাবে বলে এতক্ষণ গড়ম করে রাখলেও এখন আপাতত সব ঠান্ডা। শুভ্রতা বিছানায় গড়াগড়ি খাচ্ছে পেট আকড়ে ধরে। সোহানা মুখ ভার করে।
“তোর এটার কি আর সময় হলো না আসতে? এই অবস্থায় জিন্দেগীতে কেউ দিবে বের হতে? তুই পাড়বি?”
শুভ্রতা ব্যাথায় কাতর। নিজের ব্যাথা নিয়েই কাহিল আবার ঘুরতে যাবে কি! এই ঘুরতে টুরতে যাওয়া জাহান্নামে যাক। উফফফ্, এই অসহ্য ব্যাথাটা চিরতরে চলে যেতে পাড়েনা! গত দু’তিন মাস যাবৎ এটা একটু বেশিই পীড়া দিচ্ছে তাকে। মাত্রা ছাড়া! এর কারণ কি?

“তুই পাগল হলি? ব্যাথায় আমি নড়তে পারছি না। তুই ঘুরা নিয়ে পড়ে আছিস! ভাগ্যিস তা-ও এক্সামটা শেষ হয়ে গিয়েছে আজ। তা না হলে কিভাবে কি করতাম!”
সোহানা ভোতা মুখে আবারও চুপ করে গেল। তারপর শুভ্রতার দিকে তাকিয়ে মায়া হলো তার। আহারে বেচারি মেয়েটার মুখটাও কেমন লাল হয়ে আছে ব্যাথায়।
“বেশিই ব্যাথা হচ্ছে? এবার একটু বেশি মনে হচ্ছে না? আগে তো ঔষধ খেলে কমে যেতো! ”
“উঁহু। গত দু’তিন মাস যাবৎ এমনিই হচ্ছে। ঔষধ খেলেও কমছে না। ”
সোহানা চিন্তিত হলো। শুভ্রতার নিকট এগিয়ে এসে বসলো,
“আগে বলবি না? কাউকে জানিয়েছিস? ডাক্তার দেখাতে হবে না?”

“এর জন্য কি ডাক্তার? আমিতো ভাবলাম এমনিই সেড়ে যাবে। কিন্তু এটাতো কোন বারই সাড়ছে না। ”
“দ্বারা আমি হট ওয়াটার ব্যাগটা নিয়ে আসছি। ধরলে একটু যদি কমে!” বলেই রুম থেকে বেরয়ে গেলো সোহানা।
শুভ্র‍তা উদরের নিম্নভাগ চেপে কুঁকরে শুয়ে রইলো। কি অসহ্য এ যন্ত্রণা! বাহিরে কি সুন্দর বৃষ্টি হচ্ছে, তার কি এ বৃষ্টিতে গা’য়ে কম্ফোর্টার টেনে ঘুমানোর কথা না! হ্যাঁ ঘুমানোর কথাই তো! অথচ সে ব্যাথায় চোখ লাগাতে পারছে না। এপাশ ওপাশ হচ্ছে বারবার, যদিও এখনো গা’য়ে কম্ফর্টার জড়িয়েই।
“কই দেখি? শুভ্রতা৷ বেশি ব্যাথা হচ্ছে?” বলেই রুমে ঢুকলেন জাহানারা বেগম। হাতে ওয়াটার ব্যাগ। চিন্তিত তার মুখখানা। রাতে মেয়েটা খেলোও না। এখন না ব্যাথা হচ্ছে প্রচুর। আগে জানাবে তো! মেয়েটা মাঝে মাঝে কি যে করে না!

তিনি এগিয়ে গিয়ে শুভ্রতার পেটের নিম্নভাগে হট ব্যাগটা চেপে ধরলেন। শুভ্রতার মাথায় হাত ভুলিয়ে দিলেন। সোহানাও সাথেই বসে রইলো। সময় গড়ালো। ব্যাথা কিছুটা লাঘব হওয়াতে শুভ্রতার চোখ দুটো লেগে আসলো। বাহিরে তখন ঝুম বৃষ্টি। তবে প্রখরতা বোধহয় কিছুটা কমেছে!
রুমের লাইট অফ করে ভালো করে কম্ফর্টারটা জড়িয়ে দিয়ে জাহানারা বেগম রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন। সময় তখন দশটার উপরে বাজে। নিচে যেতে যেতে চিন্তা করলেন আগামীকাল শুভ্রতাকে নিয়ে কোন গাইনোকলজিস্ট এর কাছে যাবে। এসব সমস্যা হেয়ালির না। মেয়েটা কতটা কষ্ট পাচ্ছে! হটাৎ করে কি হলো!

পুরো বাড়ি নিস্তব্ধতায় ঘেরা৷ সকলেই বোধহয় ঘুমে তলিয়ে। মেহরাদ চুলের অগ্রভাগের পানি গুলো ঝেড়ে শুভ্রতার রুমের দিকে এগুচ্ছে। তার আসতে লেট হয়েছে বেশ। তারউপর বৃষ্টি জ্যাম সব মিলিয়ে প্রচুর বিরক্ত হয়েছে আজ সে।
আদনান আর সোহানা অফিসে যেতে বিকেলে শুভ্রতাকে বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছিলো সে। আর দেখা বা কথা হয়নি মেয়েটার সাথে। কতো বায়না ধরলো ঘুরতে যাবে বলে। এটা সেটা কতো কথা বলে জ্বালালো। বলেছিলো তার রুমে থাকতে, মেয়েটা থাকেনি। এই রুমিই সে তালা লাগিয়ে রাখবে। তখন যাবে কোথায়?
অন্ধকারে তলিয়ে থাকা রুমের ভিতরে প্রবেশ করলো মেহরাদ। ডিম লাইটও জ্বালানো নেই আজ। সে নিজেই জ্বালালো ভ্রু কুচকে। চোখ সওয়া আলোয় বিছানার দিকে চেয়ে দেখলো শুভ্রতা নাকে মুখে কম্ফর্টার জড়িয়ে কুজো হয়ে শুয়ে আছে।
এগিয়ে গেলো সে, বালিশের পাশে হট ওয়াটার ব্যাগ দেখলো। কপালে গুটিকয়েক ভাজ পড়লো। কম্ফর্টার টেনে শুভ্রতার মুখখানা দেখতে চাইলো। কিন্তু শুভ্রতা সামান্য নড়াচড়াতেও মুখ কুচকে ‘উফফফফ্ ‘ করে উঠলো ব্যাথায় পেট চেপে।
চেহারায় স্পষ্ট ব্যাথার ছাপ। মেহরাদ অস্থির হলো যেন। শুভ্রতার কাছ ঘেঁষে ঝুকলো ওর দিকে। আস্তে করে শুধালো,

“কি হয়েছে? শরীর ভালো লাগছে না? ”
ঘুমে অবচেতন শুভ্রতার আস্তেধীরে মস্তিষ্ক কিছুটা সচল হলো। চোখ খুলতে গিয়ে চোখে জল জমলো। উঠার চেষ্টা করে আবারও গুঙ্গিয়ে উঠে বললো,
“উমমম, ভালো। আপনি কখন এলেন?”
“উঠতে হবে না। এইমাত্র এসেছি। মুখটা এরকম দেখাচ্ছে কেন? আবার বলছিস ভালো?”
“এমনিই, চিন্তা করবেন না।”
মেহরাদ মানে না। আরও জেরা করে। শুভ্রতা হাল ছেড়ে দেয়৷ না বলেই বা কি করবে। এই লোক যে নাছড়বান্দা!তবে সে বলেছে শুধু পেট ব্যাথার কথা বাকিটা ভদ্রলোক নিজ বুদ্ধিতে বুঝে নিয়েছে।
মেহরাদ বড়ই বিপাকে পড়লো। আর শুভ্রতা বেচারি ব্যাথা ভুলে লজ্জায় কম্ফর্টার গলা অব্দি টেনে টুনে মুখ লুকাতে চাইলো। মেহরাদ সেসবের ধ্যায়ান দিলো না। চিন্তিত বদনে জিজ্ঞেস করলো,

“এই ব্যাথা কমবে কিভাবে? ঔষধ খেয়েছিস?”
“হু। ” শুভ্রতার ছোট্ট জবাব।
“তারপরও কমেনি?”
“উঁহু।”
“এখন কি করলে ব্যাথা কমবে? ডাক্তার কাছে নিয়ে চলি চল!”
“হু?” শুভ্রতা চোখ দুটো বড় বড় করে বলে উঠলো।
“কি হু উঁহু শুরু করেছিস কতক্ষণ ধরে? আশ্চর্য! আমায় জানাবি না আগে? চল ডাক্তার দেখাবি।”
এটা কি ডোল পিটিয়ে বলার কিছু হলো! কি যে বলে না লোকটা!
“ক’টা বাজে দেখেছেন? এই সময় ডাক্তার থাকবে? বাহিরে বৃষ্টি সেটা দেখেছেন? কে বসে আছে আপনার আমার জন্য?” তার গলা ব্যাথায় কাপছে। তবুও নিজেকে সুস্থ দেখানোর প্রয়াস মেয়েটার।
“রাত যতই হোক। তোর জন্য সবাই বসে থাকবে। আমি রাখবো বসিয়ে৷”
শুভ্রতা বাধা দিলো। পাশের হট ব্যাগটা দেখিয়ে বললো,

“এটা দিন। এটাতেই চলবে আপাতত।”
মেহরা হাত দিয়ে ওটা এগিয়ে দিতে চাইলো। কিন্তু ব্যাগটা কিছুটা ঠান্ডা অনুভব করলো। সে কিছু না বলেই আবার নিচে নেমে গেলো। নতুন করে গরম পানি ঢেলে আনলো। শুভ্রতার উপরের কম্ফর্টার সড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো
“কোথায় ধরবো? ”
শুভ্রতার ঘুম হুরহুর করে পালালো। ধরবো মানে কি! সে ব্যাগটা নিজের হাতে নিতে চেয়ে বললো,
“দিন আমি ধরছি। আপনি গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ুন। ”
“হ্যাঁ? তুই বললেই আমি চলে যাবো? গিয়ে ঘুমিয়ে পড়বো?”
এবার নিজেও কম্ফর্টার এর ভিতরে ঢুকলো মেহরাদ। শুয়ে নিজের এক বাহু বিছিয়ে শুভ্রতাকে টেনে বাহুতে শুয়ালো। শুভ্রতার একটু অস্বস্তি হলো। মেহরাদ নিজের হাতের হট ব্যাগটা পাশে রেখে কম্ফর্টার এর নিচ থেকেই শুভ্রতার মেদহীন নরম তুলতুলে ব্যাথিত উদরে হাত চাপলো কামিজ সড়িয়ে। গরম শরীরে শীতল হাতের স্পর্শ শুভ্রতার লোম দাঁড়িয়ে গেল। এদিকে ব্যাথা যেন ক্রমান্বয়ে বারছে৷
উদড়ের মধ্যভাগে হাত চেপে মেহরাদ শুধালো,
“এদিকে ব্যাথা করছে? একটু হাত বুলিয়ে দেই আগে?”
দুটোর উত্তরে শ্যভ্রতা মাথা নাড়িয়ে না বোঝাল। কিন্তু মেহরাদ বুঝলো কি-না সন্দেহ! সে হাত আরেকটু উপরে তুললো এবার।আবারও জিজ্ঞেস করলো,

“এখানে?”
এযাত্রায়ও না করলো শুভ্রতা। তারপর একদম নিম্নভাগে নিয়ে রাখলো বলিষ্ঠ হাত খানা৷ আবার শুধালো,
“এদিকে?”
লজ্জা ব্যাথা অস্বস্তি সব মিলিয়ে শুভ্রতা ছোট্ট করে জবাব দিলো,
“হু।”
মেহরাদের ভিতরে কোন অস্বস্তি বা কিছু দেখা গেল না। সে শুধুই এখন চিন্তিত। খুব চিন্তিত। মেয়েটা এতো ব্যাথা কিভাবে সহ্য কিরছে৷ প্রাপ্তবয়স্ক তার জন্য তো এসব বিষয় অজানা কিছু না, তাই না!
শুভ্রতাকে ঘুরিয়ে তার পিঠ ঠেকালো নিজের বুকে মেহরাদ। উন্মুক্ত উদড়ের নিম্নভাগে হাত খানা বুলিয়ে দিতে থাকলো আস্তে কিরে৷ শুভ্রতার শরীর কাটা কাটা দিয়ে উঠছে। বাহিরের অশান্ত প্রকৃতি তার ভিতরে বিরাজ করতে শুরু করলো। নিশ্বাস ফেললো ঘনঘন। মেহরাদ শুভ্রতার মাথার মধ্যভাগে চুমু খেলো। শুভ্রতার অস্বস্তি ধরতে পেরে জিজ্ঞেস করলো,
“অস্বস্তি হচ্ছে? ভালো লাগছে না?”
শুভ্রতা চুপটি করে রইলো। অস্বস্তি হচ্ছে ঠিক আছে। কিন্তু হাত বুলানোতে আড়ামও পাচ্ছে সে। ঘুম আবারও হানা দিচ্ছে চোখ দুটোয়। বুজে আসতে চাইছে। নিজের একটা হাত মেহিরাদের চলন্ত হাতটা আরেকটু দাবিয়ে রেখে ঘুমুঘুমু স্বরে বললো,
“এভাবেই রাখবেন, হু? ভালো লাগছে। আপনি যাবেন না আমায় ছেড়ে৷ আমি ঘুমোই হে?”
মেহরাদ আরেকটু চাপিয়ে নিলো শুভ্রতা নিজের সাথে। পারলে যেন বুকের ভিতর আটকে নিতো। শুভ্রতার মাথায় ঠোঁট দুটো চেপে আওড়ালো,
“ঘুমো তুই। হেভ এ সুইট ড্রিম, জান। আমি আছি। আছি আমি। I’m always here for you. ”

রাত গড়িয়ে সকাল হয়েছে। শুভ্রতা এখনো ঘুমে। মেহরাদ নাস্তা সেড়ে আরও একবার দেখে গেলো ওঁকে অফিস যাওয়ার আগে। মেয়েটা তখনো ঘুম। রাতে ঘুমের মাঝেও ব্যাথায় কেঁদেছে।
সময় দেখলো মেহরাদ। হাতে সময় কম। অফিসে গুরুত্বপূর্ণ একটা মিটিং আছে। সেটা সেড়ে আবার বাড়ি চলে আসবে। তার এক ফ্রেন্ড এর সাথে কথা বলে রেখেছে। গাইনোকলজিস্ট ও। এসেই নিয়ে যাবে৷
মেহরাদ বেরিয়ে গেল শুভ্রতাকে ঘুমে রেখেয়। চিন্তিত মুকখানা বেশ গম্ভীর হয়ে আছে তার।

শুভ্রতার ঘুম ভাঙ্গলো জাহানারা বেগমের হাতের ছোঁয়ায়। শুভ্রতাকে উঠিয়ে নিজ হাতে নাস্তা করিয়ে দিলেন। এর মধ্যেই খুবিই আশ্চর্যজনক এক ঘটনা ঘটলো, রিমা খান এসেছে শুভ্রতার রুমে। অতি আশ্চর্য দু’জনেই স্তব্দ। এই বুঝি প্রথম দেখলো শুভ্রতা নিজের রুমে নিজের মা’কে আসতে।
“তোমার ব্যাথা কমেছে?” রিমা খান জিজ্ঞেস করলো।
শুভ্রতা একবার জাহানারা বেগমের দিকে তাকালো। তারপর আবার রিমা খানের দিকে তাকিয়ে বললো,
“হুম। কমেছে একটু।”
“হেটে নিচে নামতে পাড়বে?”
শুভ্রতা উপর নিচ মাথা নাড়াল। সে কিছুই বুঝতে পারছে না।
“তাহলে ড্রেস চেঞ্জ করে এসো, ডক্টরের কাছে সিরিয়াল দিয়ে রেখেছি। আশা করি আমার সাথে ডক্টর এর কাছে যেতে তোমার কোন অসুবিধে হবে না? ”

শুভ্রতার যেন আজ আশ্চর্যের পালা। তাকে ডক্টরের কাছে নিয়ে যাবে? যেই মা এক বাড়িতে থেকেও একটু ডাক পর্যন্ত দেয় না, সেই মা?
জাহানারা বেগম কপালে ভাজ ফেলে বললেন,
“মেহরাদ নিয়ে যাবে বলেছে ডক্টরের কাছে।”
“ও কি বাড়িতে এখন? আমার সাথে গেলে কি সমস্যা? আমি কি এখন নিজের মেয়েকে ডক্টরের কাছে নিয়ে যাওয়ার অধিকারও খুয়িয়েছি?”
জাহানারা বেগম চুপ হলো খানিকের জন্য। রিমা খান নিজের কন্ঠঃ নরম করলেন। আরও কোমলতা ঢেলে বললেন,
“আজ আমি দেখিয়ে আনি। সারারাত তো ব্যাথায় কাতড়ালো। ঔষধ এ কাজ না হলে না-হয় ওর যেখানে খুশি সেখানে নিয়ে যাবে?”

জাহানারা বেগম শুভ্রতা দু’জনেই চুপ করে রইলেন। রিমা খানের মতো গম্ভীর মহিলা সেধে এসে কিছু বলছে আবার মা-ও হয়, তাকে না করে কিভাবে? চিন্তিত বাকরুদ্ধ দু’জনেই। কিছুক্ষণ পর শুভ্রতা আটকে আটকে বললো,
“ক….খন যেতে হবে?”
জাহানারা বেগম শুভ্রতার দিকে তাকালেন ফট করে। তার মানে মেয়েটা যাবে? রিমা খান খুশি হলেন বেশ। চেহারায় স্পষ্ট তা প্রতিয়মান। শুভ্রতার দৃষ্টি গাঢ় হলো। মা’য়েদের হাসি খুশি দেখতে কার এ না ভালো লাগে! কিন্তু তার কপালে এই ভালো লাগা বোধহয় নেই!
“দশটায় ডাক্তার বসবে। তুমি রেডি হয়ে নাও। সময় তো নেই বেশি হাতে। আমিও রেডি হচ্ছি গিয়ে।” বলেই বাইরে চলে গেলেন রিমা বেগম।
জাহানারা বেগম শুভ্রতার দিকে তাকাতে শুভ্রতা কিছু বলবে তার আগে তিনিই বললেন,

হৃৎস্পন্দন পর্ব ৩৫ (৩)

“থাক যা। না গেলে কষ্ট পেতো ,মনে রাগ পুষে রাখতো। মেহরাদকে বুঝিয়ে বলা যাবেনে। দেখি, তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নে তো মা।”
শুভ্রতাও বেশ খুশি হলো এতটুকু আশ্বাসে। পেটে চিনচিন করা ব্যাথা নিয়ে রেডি হতে শুরু করলো। আসলেই একটা ডাক্তার দেখানো দরকার। কিন্তু এই দেখানো কতটুকু পর্যন্ত নিয়ে গড়ায় এবার সেটা দেখার পালা…

হৃৎস্পন্দন পর্ব ৩৬