হৃৎস্পন্দন পর্ব ৩৮ (২)
সাঞ্জেনা শাজ
প্রায় ৬-৭ ঘন্টা জার্নি করে চট্রগ্রাম সুনামধন্য Best western SKS Chottogram হোটেলের সামনে এসে থামলো মেহরাদের গাড়িটা।
মেহরাদের গাড়ি হোটেলের সামনে আসতেই রাসেল সাহেব দৌড়ে এগিয়ে গেলেন স্যারের কাছে। গিয়ে গাড়ির ডিকি থেকে দুটো লাগেজ নামালেন। মেহিরাদের সামনে গিয়ে কিছু বলতে নিলে মেহরাদ হাতের ইশারায় চুপ থাকতে বললো। গাড়ি থেকে একটু দূরে এসে দাড়ালে, রাসেল সাহেব জিজ্ঞেস করলেন,
“ম্যাম আসে নি,স্যার?”
“এসেছে। ঘুমিয়ে গিয়েছে।এখনো ঘুমচ্ছো। আপনি লাগেজ দুটো স্যুটে নিয়ে যান। আমি আপাতত এখানেই থাকছি। আপনায় কল করবো সময় হলে। ”
“কি বলছেন স্যার? এতক্ষণ ড্রাইভ করে এসে এখন আবার গাড়িতে অপেক্ষা করবেন? ম্যামকে জাগিয়ে দিন? রুমে গিয়ে নাহয়…
মেহরাদের গাম্ভীর্য ভিরা চাহনিতে রাসেল সাহেব থেমে গেলেন। তিনি তো ভালোর জন্যই বললেন না-কি! বেচারা মুখে তালা মেরে দু হাতে দুটো লাগেজ নিয়ে হোটেলের ভিতরের দিকে যাবেন এর আগেই পাশের গাড়ির দরজা খুলে শুভ্রতা বের হলো।
চোখ মুখ ফোলানো, ঘুমের রেষ। সেই সাথে কুচকানো কিছুটা। মাজে ধরে আছে। ঘার ধরে আছে। গাড়ি থেকে বের হয়ে মেহরাদকে খুঁজতে চোখ ভুলাতেই পেয়ে গেলো। জিজ্ঞেস করলো,
” এসে পড়েছি আমরা?”
সেই ঘটনার পর থেকে আসা পর্যন্ত তেমন করে মেহরাদের দিকে তাকায়নি মেয়েটা। এমনকি কথাও বলেনি লজ্জায়। মেহিরাদও বুঝেছে, তাই ঘাটাইনি তেমন মেয়েটাকে। তারপর সে কখন ঘুমিয়েছে বলতেও পারবে না৷ শুধু মাঝেমধ্যে গাড়ির হর্ন, শব্দ কানে গিয়েছে। নড়া চড়া করতে গেলে মনে হয়েছে কোন একটা বেষ্টনি তাকে আটকে রেখেছে। সে তখন নড়েচড়ে আরও ভালোভাবে ঘুমিয়েছে। ভালোই হয়েছে।
মেহরাদের উপস্থিতি সামনে অনুভব করতেই ভাবনা থেকে বের হলো শুভ্রতা। মাথা ভনভন করছে হটাৎ ঘুম ভেঙে যাওয়ায়৷ মেহরাদ ওর নিকট এগিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“এসে গিয়েছি। চল, রুমে যাওয়া যাক। ”
শুভ্রতা মেহরাদ এগিয়ে গেলো। সামনে রাসেল সাহেব সেই সাথে স্টাফ হোটেলের। মেহরাদ দেখলো শুভ্রতা ধীর পায়ে হাটছে। হয়তো ঘুম থেকে উঠায় সমস্যা হচ্ছে। পিছু গিয়ে ওঁকে কাধ জড়িয়ে এগোলো এবার। শুভ্রতা অবাক লজ্জার সাথে স্বস্থিও পেলো। একে তো ঘুমের রেষ, তারউপর উপর পড়েছে হিল। কোন আক্কলে যে পড়েছিলো আল্লাহ জানে! হাটু কাপছে তার। মেহরাদ আগলে নেওয়াতে ভালোই হয়েছে।
লিফটের সামনে গিয়ে দাড়াতেই রাসেল সাহেব লিফট খুলে মেহরাদের উদ্দেশ্যে জানালো,
“স্যার, একদম হায়েস্ট ফ্লোরে স্যুট বুক করা হয়েছে। আপনার কথা অনুযায়ী দু’রুমের।”
শুভ্রতারা লিফটের মাধ্যেমে একেবারে স্যুটের সামনে এসে নামলো। রাসেল সাহেব চাবি দ্বারা দরজা খুলে লাগেজ দুটো ভিতরে নিয়ে রাখলেন। জিজ্ঞেস করলেন খাবার আনাবে কি-না। ওরা দু’জনেই নিষেধ করে দিলো।
কিছু প্রয়োজন হলে কলে জানাতে বলে সে বিদায় নিলো।
বিশাল বড় বড় দুটো রুম। কিচেন প্লাস মিনি বারও আছে! ট্যারেসে সামনের দেয়ালটা কাচের। এখান থেকে স্পষ্ট ট্যারেসে অবস্থিত সুইমিংপুলটা দেখতে পেলো শুভ্রতা৷ এর পাশে বাহারি গাছের টব। শুভ্রতার ঘুম যেন হাওয়ায় ভাসলো! এক লাফে ট্যারেসের দিকে এগিয়ে যেতে নিলে মেহরাস বাধা দিলো। ফ্রেশ হতে বললো আগে।
কে শুনে কার কথা! শুভ্রতা হাত ছাড়িয়ে সেদিকে ছুটলো। তা দেখে মেহরাদ ফোস করে নিশ্বাস ফেললো। কাধটা প্রচন্ড ব্যাথা করছে৷ ফ্রেশ হওয়া দরকার আগে৷ এসব ভেবে সে নিজেই একটা রুমে ঢুকে গেলো। যেখানে লাগিজ দুটো রাখা আছে। শার্ট খুলতে খুলতেই ওয়াশরুমের দিকে এগলো সে।
প্রায় আধা ঘন্টা খানিকের মতো পুলসাইডে সময় কাটিয়েছে শুভ্রতা। উফফফফ, তার যে কি আনন্দ হচ্ছে। এর মাঝখানে সোহানা শান্তাকে ভিডিউ কল দেওয়া ও ডান। আপাতত শুভ্রতা লজ্জা সংকোচে হাফসাফ করছে। তারা দু’জনের জন্য দু’রোম নেওয়া হয়েছে শুনে সোহানা যেন আকাশ থেকে পরলো। রেগে গেলো। সে বুঝলো না, এখাবে রাগার কি হলো! তাদের কি এক রুমে থাকার কথা?
এটা মাথায় আসতেই নেয়েটাকে লজ্জা সংকোচ ধরা দিয়েছে। হাফসাফ করছে অন্তরটা৷ তারা কি এক রুমেই থাকবে? না-কি দু রুমে? লালিমায় ছেয়ে গুলো গাল দুটো ভাবিতেই। সে কীসব ভাবিছে! মেহরাদ ভাই এমন কিছু না-ও তো ভাবতে পারে!
হাবিজাবি ভাবিতেই ভাবতেই সে অপর পাশের রুমটায় ঢুকলো। ঢুকে দেখলো তার লাগেজ নেই। আবার বের হলো বাইরে। ড্রয়িংরুমেও দেখলো না। নিশ্চিত হলো পাশের রুমে। তাই সেদিকেই গেল। দরজা অর্ধ খোলা। সে ঢুকলো ইতস্তত করে মৃদু গলা খাকাঁড়ি দিয়ে।
ভিতরে ঢুকতেই চোখে গেলো মেহরাদ উবু হয়ে শুয়ে বিছানায়। কাধের অয়াশে একটা বালিশ। সাদা নরম তুলতুলে বিছানায় শরীরটা ডেবে আছে কিছুটা। রুমের পর্দা টর্ধা সব টানা। যেন আলো প্রবেশ নিষিদ্ধ। আবছা কিছুটা আলোকিত আর কি রুম। শুভ্রতা কোন শিব্দ করলো না। চোখে খুজে নিজের লাগেজটার কাছে গেল। নিয়ে বের হতে যাবে সে সময়ই মেহিরাদের গলার স্বির ভেসে আসলো,
“কথা বলা শেষ হয়েছে?”
“হু।”
“খিদে পেয়েছে?”
“নাহ৷ ”
“ফ্রেশ হিয়েছিস?”
“হুম। ওখান থেকেই হাত মুখ দুয়ে এসেছি। শুধু ড্রেসটা চেঞ্জ করবো। একটু ভিজে গিয়েছে। ”
কথার মাঝখানেই কলিং বেল বেজে উঠলো। মেহরাদ এবার ফোনটা হাতে নিয়ে রাসেল সাহেবকে স্প্রে টা ড্রয়িং এ রেখে যেতে বললো। এসেই এটার কথা ব্লেছে আগে। না-হয় ব্যাথা কমবে না। শুভ্রতা কিছুই বুঝলো না। জিজ্ঞেস করলো,
“কিসের স্প্রে?”
“ব্যাথার৷”
“কার ব্যাথা? আপনার?”
“হু৷ ”
মেহিরাদ রুম থেকেই দরজা খোলার বন্ধের শব্দ পেল৷ উঠে গিয়ে স্প্রেটা নিয়ে আসলো রুমে। চোখ মুখ কিছুটা কুচকানো। শুভ্রতা লাগেজ ছেড়ে মেহরাদের পিছু গেলো। জিজ্ঞেস করলো,
“কোথায় ব্যাথা? ব্যাথা পেলেন কখন? বলুন আমায়।”
মেহরাদ থেমে এক পলক ওর দিকে তাকালো। জানেই না মেয়ে অর্ধ রাস্তা কোথায় ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিয়ে এসেছে! সে বিছানায় বসতে বসতে বললো,
“অল্প ব্যাথা৷ তুই ড্রেস চেঞ্জ কর গিয়ে। আ’ম ফাইন। ”
শুভ্রতা মানলো না। মেহিরাদের মুখোমুখি বিছানায় বসে চিন্তিত স্বরে বললো,
“কোথায় ব্যাথা বলুন। আমি দিয়ে দেই?”
মেহরাদের আসলেই ব্যাথাটা বাড়ছে। সে কাধ ঘষলো আলতো করে। শুভ্রতা যা বুঝার বুঝে গেলো। সে সারা রাস্তা লোকটার কাধে পরে পরে ঘুমিয়েছে! তাই তো ঘুম ভেঙেনি! সে পুরো পুরি উঠে বিছানার মধ্যিখানে বসলো। একটা বালিশ রাখলো সামনে। আশ্চর্য কন্ঠে বললো,
“আমায় উঠাবেন না? কতক্ষণ ঘুমিয়েছি আমি। আপনার কাধেই না? ইশশশ, খুব ব্যাথা হচ্ছে তাই না? দেখি এদিকে আসেন। আমি স্প্রে করে ডলে দিচ্ছি। ”
মেহরাদ নিস্প্রভ চোখে চেয়ে রইলো কিছুক্ষণ মেয়েটার দিকে। মেয়েটার উতলা দেখে তার মনে হলো তার কাধের ব্যাথা অর্ধেক এমনিই সেড়ে গিয়েছে। আবারও শুভ্রতার ডাকে গেলো ওর কাছে। সামনে থাকা বালিশটা সাইডে ছুড়ে ফেলে শুভ্রতার উরুতে মাথা দিয়ে শুলো।
“সেবা যখন করবি, ভালো করেই কর! মাঝিখানে আবার বর্ডার কিসের, হু?” বলেই নাক মুখ ঘষলো নিম্নউদরে।
শুভ্রতার সারা দেহ শিরশির করে উঠলো। শরীর জমে যাওয়ার উপক্রম৷ মেহিরাদের ঠোঁট দুটো আগ্রাসন যেন বাড়ছেই। সে শক্ত করে মেহরাদের কাধ চেপে ধরলো। শুকিয়ে যাওয়া কিন্ঠ ভিজিয়ে বললো,
“আ…আমি চলে যাবো কিন্তু! কাজটা করতে দিন..”
“আটকেছি তোকে? তোরটা তুই কর। আমারটা আমি। ”
“এ..এভাবে করা যাবে?”
“যাবে। ” যাবে বললেও মেহরাদ বুঝতে পারছে মেয়েটা কাপছে থরথর করে। তাই একটু পরে নিজেই থেমে গেলো। শুভ্রতা নিজেকে স্থীর করলো সময় নিয়ে। দম ছেড়ে স্প্রেটা করে দিলো। ফোলে উঠা জায়গাটেয় ছোট্ট হাত দিয়ে ঘষে দিলো। আস্তে আস্তে মেহরাদের ভারী নিশ্বাস অনুভব করলো উদরে। চামড়া বেদ করে মাংশ পিন্ড ঝলসে দিচ্ছে যেন।
শুভ্রতা নিচু হয়ে চেয়ে দেখলো মেহরাদ ঘুমিয়ে গিয়েছে। আহারে, লোকটা কতটা ক্লান্ত ছিলো! মায়া মায়া চোখ দুটোতে চেয়ে থেকে মাথার চুলগুলোতে বিলি কেটে দিতে থাকলো। আস্তে আস্তে সে নিজেও ঘুমিয়ে গেলে।
শুভ্রতাদের ঘুম ভেঙেছে একেবারে সন্ধ্যার পর। উঠে দেখে সাতটা বেজে গিয়েছে। ঘুমের মাঝখানে কখন মেহরাদ তার বুকে এসেছে অজানা দু’জনারই। কিন্তু চোখ খুলে যখন জানতে পারলো শুভ্রতা অস্থিরতায় পড়ে গেল। মেহরাদের মাথাটা নিজের বক্ষপটে অনুভব করে তার নিজেকে পরিপূর্ণ মনে হলো। লোকটাকে এভাবেই সারাজীবন নিজের সাথে বেধে রাখতে ইচ্ছে হলো। শান্তি, শান্তি আর শান্তি।
শুভ্রতারা রেডি হচ্ছে, উপরে রোফটোফে রেস্টুরেন্ট আছে। সেখানে যাবে। খিদে পেয়েছে এখন তাদের। তাছাড়া মেহরাদের না-কি কার সাথে দেখা করতে হবে। তাই যেতে হবে। সে নিজেই একা যেতে চেয়েছিলো। বলেছিলো রুমে পাঠিয়ে দিবে। কিন্তু শুভ্রতা বায়না ধরে যাচ্ছে সাথে। রুমে একা একা সে কি ঘোড়ার ঘাস কাটবে?
অগত্যা মেহরাদ সাথে করেই নিয়ে যাচ্ছে। দু’জনেই পরিপাটি হয়ে বের হলো দু’রুম থেকে। শুভ্রতার গা’য়ে মেরুন রঙের কুর্তি সেট৷ বেশ মানিয়েছে মেয়েটাকে।
মেহরাদ প্যান্টের পকেটে ওয়ালেট আর মোবাইল পুরে বের হতে যাবে শুভ্রতা বাধা দিলো। দিয়ে বললো,
“আপনার মোবাইলটা আমার কাছে দিন।”
“হটাৎ?”
“আরেহ, আপিনার টায় পিক ভালো উঠে না, তাই আর কি। হি হি হি।”
“কল আসলে আমায় পাস করবি। ” বলেই মোবাইল দিয়ে দিলো ওর কাছে। শুভ্রতা হেসে মাথা নাড়ালো। একটু আগে বাবার সাথে কথা হয়েছে। বলেছে তার ক্যান্টনমেন্ট থেকে এখাবে আসতে আধাঘন্টা সময় লাগবে। ডিউটি থেকে ফিরেই চলে আসবে। মেহরাদ বলেছিলো যে, আমরাই গিয়ে দেখা করে আসবো চাচ্চু। কিন্তু তিনি মানেন নি। তিনি নিজেই আসবে জানিয়েছেন। এটাতে শুভ্রতা আরও খুশি এখন।
সে নেচে কুদেই রোফ টোপে উঠলো লিফটের দ্বারা। চারদিকে আলোর ঝলকানি। মানুষের আছে গুটি কয়েক। কি সুন্দর ভিউ, ওয়াও! শুভ্রতা মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইলো। কিন্তু সামনে হেটে এগিয়ে যেতে যেতেই হাসি নিভে যাওয়ার সাথে সাথে মুগ্ধতাও বিলিন হিয়ে গেলো। মুখ হলো অন্ধকারের ঘনঘটা।
হৃৎস্পন্দন পর্ব ৩৮
সামনের টেবিলে বসে আছে এক রমনী। নারীদেহের ঘড়নায় আভিজাত্যের ছোয়া। মার্জিত বেশভূষা। শুভ্রতা মেয়েটিকে চিনে। খুব ভালো করেই চিনে। তার পা চলতে চাইলো না। থেমে থেমে এগোলো। মেহরাদ তার পাশেই, সাবলীল ভাবে যাচ্ছে। সামনে রাসেল সাহেব সহ আরও একজন লোক ফর্মাল বেশভূষায়। তারা টেবিলের সামনে গিয়ে দাড়াতেই মিস আয়রা চৌধুরী উঠে হ্যান্ডশ্যক করার জন্য হাত এগিয়ে দিলো,
“লং টাই নো সি, মি. তালুকদার…..”
