Home হৃৎস্পন্দন হৃৎস্পন্দন পর্ব ৪৪ (৩)

হৃৎস্পন্দন পর্ব ৪৪ (৩)

হৃৎস্পন্দন পর্ব ৪৪ (৩)
সাঞ্জেনা শাজ

আবারও শুভ্রতার জ্ঞান ফিরেছে। কিন্তু সময় এখন কতটার ঘরে তার জানা নেই। ক্যাবিনের ভেতরটা নিস্তব্ধতায় ঘেরা। জ্ঞান ফিরার সাথে সাথে শরীর মনের অসহনীয় পীড়া গুলোও মেয়েটার কাছে ফিরে এসেছে। একটা পা নাড়াচাড়া করা যাচ্ছে না কোন ভাবেই। হাতে ক্যানোলা ফিট করা। বুকে কয়েক প্রজাতির সরঞ্জাম লাগানো।
মেয়েটা বহু কষ্টে টেনে চোখ খুলতে চাইলো। চোখ খুলার সাথে সাথেই হুরমুড়িয়ে চোখের পানি ঝড়া শুরু করেছে চোখের কোল ঘেঁষে। মেয়েটা তবুও জোড়পূর্বক খুলে রাখলো চোখ। মাথাটা এত্তো ভার! দেহে বুঝি কোন শক্তিই অবশিষ্ট নেই!
মেয়েটা তবুও ভার ঠেকা মাথাটা নিয়ে শোয়া থেকে উঠতে চাইলো। ওঁকে উঠতে দেখে একজন নার্স দৌড়ে এসে আটকালো। বললো,

“এ কি উঠছেন কেন আপনি? শুয়ে পড়ুন। হাতে টান পড়লে ক্যানলায় রক্ত উঠে যাবে। “
“উঁহু। আমি একটু বসতে চাই। পুরো শরীর ব্যাথা করছে। মাথাটা খুব ভার লাগছে। কিন্তু কেমন কেমন যেনো খালি খালি। আমায় একটু সাহায্য করুন দয়ে করে।” খুবিই নিভু নিভু স্বরে বললো মেয়েটা।
নার্স তবুও তা শুনলো না। তাদের শুনা বারন। শুয়িয়ে দিতে চাইলো। শুভ্রতা পেড়ে না উঠে আবার শুয়ে পড়লো। পরাশ্র সৈনিকের মতো বললো,
“এখন ক’টা বাজে? আমার পরিবারের… “ বলতে গিয়েও আটকালো মেয়েটা। তার পরিবার? আসলেই কি তার পরিবার? তার তো কোন পরিবারই নেই। সে কে আসলে? এতিম? কারো জারজ? কারো দয়া?
গলায় যেন শক্ত কোন পাথর চেপে দিলো কেউ। এতো তীক্ষ্ণ ব্যাথা এর! ঢোক গিলতে চেয়েও পারলো না। কন্ঠরোধ হতেই দু’চোখ বেয়ে ঝড় ঝড়িয়ে অশ্রু গড়তে শুরু করলো। খুব অসহায়ের ন্যায় শক্ত ঢোক চেপে বললো,

“বাড়ির…বাড়ির কাউকে ঢেকে দিন না.. একটু?“
“কথা বলবেন না, কষ্ট হবে আপনার। আমি ডক্টরকে ডাকছি। আপনার বাড়ির লোক সকলে ব্যাস্ত। আপনার সাথের জনকে আজ সিঙ্গাপুর পাঠানো হবে। ওনার অবস্থা বেশ ক্রিটিক্যাল। “
শুভ্রতার পৃথিবীতে যেন ঘোর আমানিষা নেমে এলো। মেহরাদের কথা মনে পড়তেই ক্রমান্বয়ে হৃৎস্পন্দনের বেগ বাড়তে লাগলো। তার এ অবস্থাতেই এতো কষ্ট হচ্ছে! লোকটার কেমন লাগছে! সে কেমন সার্থপর! লোকটার কথাতো তার একটুও মনে পড়লো না! মেহরাদ ভাই জানলে নিশ্চয়ই বলবে, — শুভ্রতা তুই আদও আমায় ভালোবাসিস নি। আর বাসলেও আমার মতো বাসতে পারিসনি।
অথচ, মেয়েটা নিজেই সেন্সলেস ছিলো এতক্ষণ যাবৎ!
বুকের ভিতর চাপা কষ্টে কান্না করা শুরু করলো মেয়েটা। ওঁকে কাদতে দেখে নার্স হকচকিয়ে গেলো। শুভ্রতাকে থামানোর চেষ্টা করলো। বারবার জিজ্ঞেস করলো,

—” কি হয়েছে? কষ্ট হচ্ছে আপনার? কোথায় কষ্ট হচ্ছে?“
শুভ্রতা ক্রমাগত মাথা নাড়িয়ে নিষেধ করলো। অস্ফুট স্বরে কেদেকেটে বলল,
—”আমায় নিয়ে যান ওনার কাছে। আমি দেখতে চাই ওনায়। কথা বলতে চাই। আমার যে, উনি ছাড়া আপন কেউ নেই আর। আমায় দয়া করে একটু বার নিয়ে যান প্লিজ!“
কান্না করতে করতে অতি দ্রুতই ক্লান্ত হিয়ে গেলো শুভ্রতা। দুর্বল শরীর ভেঙে আসতে হেলে পরে যেতে নিলো নার্স আটকালো আতংকিত হয়ে। বেচারি বেশ ঘাবড়ে গিয়েছে। কিছুতেই কান্না থামাতে না পেরে অসহায় হয়ে ডক্টর ডাকলেন ইন্টারকমে।
শায়ান তালুকদারকে শুভ্রতার পাগলামু জানাতে উনি ছুটে এলেন ক্যাবিনে। আর আধ ঘন্টা পরেই মেহরাদকে হসপিটাল থেকে বের করা হবে। এখান থেকে আদনান আর আলতাফ তালুকদার যাবেন সাথে। ছেলের জন্য দিশেহারা তিনি কিছুতেই ছেলেকে বগল ছাড়া করতে নারাজ। এদিকটা জাবের আর আমজাদ তালুকদার সামলাবে। আর শায়ান তালুকদার তো আছেই!

মেহরাদের এ অবস্থায় কাউকেই দেখার সুযোগ দেওয়া হয়নি। সে জায়গায় শুভ্রতা তো অসুস্থ, ওঁকে দিবে? শায়ান তালুকদার মেয়েকে বুঝাতে ব্যার্থ হচ্ছে। শুভ্রতা আহাজারি করে বলল,
“আমার কথা কেন শুনছো না বাবা? আমি তোমাদের মেয়ে না বলে কি আমার একটা আবদারও রাখা যায় না? ও বাবা, এটা অন্তত রাখো! আর কখনো কোন আবদার করবো না। কিচ্ছু চাইবো না। আমার…আমার মনে হচ্ছে, আমি মেহরাদ ভাইকে আজকে না দেখলে আর দেখতে পারবো না। কোথায় নিয়ে যাবে তোমরা ওনায়? উনি সুস্থ হচ্ছেন না কেন বাবা? উনি জানে না, আমি এখানে পরে আছি? আমার নিশ্বাস আটকে আসছে, বাবায়ায়ায়া! শুনছো তুমি? শুনতে পাচ্ছো? আমায় দেখতে দাও ওনায় একবার… “
মেয়ের কথায় শায়ান তালুকদারের চোখ বেয়ে ঝড়ঝড়িয়ে অশ্রু গড়ালো। এমন হাহাকার ভরা আকুল আবেদনে শায়ান তালুকদার সের্ফ মেয়ের মাথাটা বুকে চেপে ধরতে চাইলেন, কারণ ওনার মুখের বুলি যে ফুরিয়েছে! কি বলবে মেয়েকে? অনাদারে অবহেলায় বড় হওয়া মেয়েটাকে এটা বলেও তো সান্ত্বনা দেওয়া যায় না যে,
—আমরা কি তোমায় কখনো পর ভেবেছি? কখনো কষ্ট দিয়েছি?
মেয়েটাকে তো বেঈমান ধোকাবাজ স্ত্রীর জন্য কখনো বুকে জড়িয়েও কাছে রাখতে পারে নি। আদর করতে পারেনি। আজ কোন মুখে সান্ত্বনা দিবে? কিভাবে গ্রহন করবে মেয়েটা সান্ত্বনা!

ডক্টররা শুভ্রতার এরকম পাগলামু দেখে সেডাটিভ দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিতে চাইলো। ইঞ্জেকশন নিয়ে কাছে এগতেই সাদা ব্যান্ডেজ এ মুড়ানো ভাঙ্গা পা নিয়ে বেডে হুলুস্থুল লাগিয়ে দিল মেয়েটো। এক পা’য়ে কি অসহনীয় ব্যাথা! কোন ভাবেই নাড়ানো দায়। তবুও মেয়েটা নাছড় বান্দা পাগলামু করছে। দূর থেকে উবু হয়ে একটা সার্জিক্যাল ব্ল্যাড নিয়ে হাতের শীরায় চাপতেই সকলে সংকিত হয়ে স্থীর হলো।
একজন সিনিয়র ডক্টর এলো। রিল্যাক্স হতে বললো ওঁকে। খুবই শান্ত ভাবে বলল,
“রিল্যাক্স হও, সুইট গার্ল। কে বলেছে তোমায় দেখতে দেওয়া হবে না? আমি নিয়ে যাবো তোমায়। আমার সাথে যাবে তুমি। রিল্যাক্স হও। ওটা ফেলে দাও।”
শুভ্রতা মানলো না। বলল,

“আপনারা দিবেন না। আবার ঘুম পাড়িয়ে দিবেন আমায়। আমি শুধু একটু দেখবো ওনায়। প্লিইইইজ। কোন ডিস্টার্বনেস ক্রিয়েট করবো না। আমায় একটু দেখতে দিন?“
“ওকে। ওকে। নিয়ে যাবো তো মামনি। তুমি শান্ত হিও। ওটা ফেলো? “ নার্সকে আদেশ দিলো একটা হুইল চেয়ার নিয়ে আসতে ওর জন্য।
নার্স ছুটে গেলো বাইরের দিকে। শুভ্রতা কিছুটা শান্ত হলেও ফের বলল,
“আমায় ধোকা দিবেন না বলে দিলাম? আমি কিন্তু নিজেকে শেষ করে দিতেও দু’বার ভাববো না!“
সিনিয়র ডক্টর আশ্বস্ত করলো ওঁকে। কোন ধোকা দেওয়া হবে না জানালো। নার্স হুইল চেয়ার আনতেই শুভ্রতা ব্ল্যাড নামালো। দু’জন নার্স ধরে ওঁকে হুইল চেয়ারে বসালো। পায়ে চাপ পরতেই কুকিয়ে উঠলো মেয়েটা।হাতের ক্যানোলা গুলো কখনোই রক্ত উঠে যেতে নার্সরা সড়িয়ে নিয়েছে। শুধু নাসাল ক্যানোলাটা রয়েছে। ওটা সমেতই বাহিরে নিয়ে যাওয়া হলো ওঁকে।

আই সি ইউর রুম এর দিকে যেতে যেতে শুভ্রতা আই সি ইউ’র বাইরে তার পরিবারের অতি পরিচিত চেহারা গুলো দেখলো। সকলের চোখ কান্না ভেজা। চোখে মুখে হাহাকার। সোহানা দৌড়ে এসে জাপ্টে ধরতে চাইলে ডক্টর নিষেধ করলো। ওর এ অবস্থা দেখে শান্তা সোহানা দু বোনই খুব করে কাদলো। মেয়েটা এতো অভাগী!
শুভ্রতাকে যখন নিস্প্রভ নিস্তেজ মেহরাদের আই সি ইউ রুমে নেওয়া হলো। মনিটরের ভিপভিপ শব্দ। পড়নে হসপিটালের পোশাক। কেমন নিস্তেজ। শুভ্রতা না চাইতেও অস্ফুট স্বরে চিৎকার করে উঠতে নিলো। আবার নিজেই নিজের মুখ চেপে ধরলো। থরথর করে কাপছে দেহ। হুইলচেয়ার থেকে ছুটে গিয়ে মেহরাদের বুকে আছড়ে পড়তে মন চাইলো। এ মানুষটাকে এভাবে দেখার কষ্ট তার রুহ কাপিয়ে দিচ্ছে। শরীরে অজস্র ব্যান্ডেজ। চোখ খুলে না। তার দিকে তাকায় না। শুভ্রতাকে দু’চোখে হুশিয়ারি দেয় না ভ্রু কুচকে। য়ার যে বুক ভেঙে আসছে!

হৃৎস্পন্দন পর্ব ৪৪ (২)

শুভ্রতা হাউমাউ করে কাদতেই অতিরিক্ত প্যানিকে শরীর ছেড়ে দিলো। গড়িয়ে নিচে পড়তেই সকলের আতংকিত হয়ে ওঁকে ধরে স্ট্রেচারে শুয়িয়ে দিলো। মেয়েটা প্যানেক এট্যাক করছে। শ্বাস প্রশ্বাস নিচ্ছে বেগতিক। নাসারন্ধ্র গড়িয়ে তরল তাজা রক্ত গড়াতেই ডক্টররা হুলুস্থুলি লাগিয়ে ওঁকে আবার আই সি ইউতে নিয়ে গেলো। এদিকে মেহরাদ কে নিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময়ও হয়ে গিয়েছে।
শুভ্রতাকে আই সি ইউ’তে ঢুকাতে ঢুকাতে মেহরাদকে হসপিটাল থেকে এম্বুলেন্স এ তোলা হলো। ফ্লাইট ঢিলে হয়ে যাবে নাহয়।
শুভ্রতার আর দেখা হলো না তার মেহরাদ ভাইকে যেতে। মেয়েটার মতে এটাই কি তবে শেষ দেখা ছিলো….

হৃৎস্পন্দন পর্ব ৪৫