Home হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ২৭

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ২৭

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ২৭
সাবা খান

“ফাইন ডাইনিং ও প্রিমিয়াম” রিসোর্টের এক কোণের টেবিলের মাঝখানে রাখা ছোট্ট ক্যান্ডল গুলো ধীরে ধীরে জ্বলছে, তার আলোয় স্পষ্ট নজরে আসছে ঈশানীর বিস্মিত আদল। রিজভী এখনো রিংটা তার দিকে বাড়িয়ে উত্তরের আশায় মুখিয়ে আছে। যার ভেতরে ঝলমল করছে একটুকরো প্রতিশ্রুতি। কিন্তু প্রায় মিনিট পাঁচেক পেরিয়ে গেছে কিন্তু রমণীর তরফ থেকে কোন রকম প্রতুত্তর আসেনি। এবার রিজভীর মনে আবারও সন্দেহ রা দানা বাঁধতে শুরু করেছে, কোথাও সেকি ঈশানীর চোখ পড়তে ব্যর্থ হয়েছে নাকি সে এখনো ঈশানীর মনে জায়গা করে নিতে পারেনি।
কিন্তু বিপরীতে থাকা রমণী যেন কিছুই বুঝতে পারছে না। তার বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দটা যেন তার কানে বাজছে। মাথার ভেতর ঘুরছে হাজারো প্রশ্ন,

“এটা কি সত্যি?”
“নাকি সে কোনো স্বপ্ন দেখছে?”
তার ঠোঁট শুকিয়ে আসছে। সে একবার শুকিয়ে যাওয়া গলায় একটা ফাঁকা ঢোক গিলে আওড়ায়,
–“রিজভী ভাই… এসব কি?”
শব্দগুলো বের হতে না হতেই রিজভীর মুখের হাসিটা থমকে যায়। সে হয়তো এমন প্রতিক্রিয়া আশা করেনি। তার চোখে এক ঝলক হতাশার ছায়া নেমে আসে। ধীরে ধীরে সে রিংটা নিজের দিকে টেনে নিয়ে মনে মনে ভাবে কিছু একটা বলে পরিস্থিতি সামাল দিবে কিন্তু তার আগেই ঈশানী হঠাৎ তার হাত থেকে রিংটা নিয়ে নেয়। বিপরীতে মানব সত্যিই চমকে ওঠে। কণ্ঠে বিস্ময়ের মিশেলে শুধালো,
–“ঈশা..”
ঈশানী তাকে থামিয়ে তার দিকে তাকিয়ে ভাবুন চিত্তে বলে,

–“রিজভী ভাই, আপনি তো ডাক্তার, তাই না?”
তার এমন প্রশ্নে রিজভী ভ্রু কুঁচকে তাকায়। সে ঈশানীর কোন মতিগতি কিছুই বুঝতে পারছে না। তাই প্রশ্ন করে,
–“হ্যাঁ… কিন্তু হঠাৎ?”
ঈশানী একটু ঝুঁকে আসে, তার চোখে চোখ রেখে বলে,
–“আপনি বলতে পারবেন… আমি কি কোনো রোগে ভুগছি?”
রিজভী কিছুটা অবাক হয়ে সিরিয়াসলি জানতে চায়,
–“কী ধরনের রোগ?”
ঈশানী চোখ বন্ধ করে বলতে শুরু করে,
–“আমার মনে হচ্ছে, আমি না… আপনি নামক একটা অসুখে ভুগছি এই কদিন”
সাথে সাথে রিজভী থমকে যায়। তার চোখে এক মুহূর্তের জন্য বিস্ময় খেলে যায়, তারপর ধীরে ধীরে ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে ওঠে। এদিকে ঈশানী থামে না,

–“না হলে দেখুন না, আজকাল আপনি কেন হুটহাট মনে পড়ে যান আমার?
কেন আপনার কথা ভাবলেই আমার বুকের ভেতর এমন অদ্ভুত লাগে?
কই আমার তো আরজের জন্য এমন কখনো হয়নি?”
রিজভী একটু ঝুঁকে আসে। কিয়ৎকাল চুপ থেকে তার চোখে চোখ গেঁথে বুলি আওড়ায়,
–“কেননা আরজে তোমার ভালোবাসা নয়, তোমার একটা মোহ ছিল। সত্যিকার অর্থে কেউ কাউকে ভালোবাসলে তাকে অন্যের সাথে দেখা তো দূর ভাবতেও যন্ত্রণাটা মৃত্যুসম মনে হয়”
–“আপনি কীভাবে জানলেন?
আপনিও কি আগে কারো প্রেমে পড়েছেন?”
রিজভী তার প্রত্যুত্তর না করে মনে মনে বলে,
“হুম আমিও তো একটা দস্যি মেয়ের প্রেমে পড়েছি অনেক আগেই। যাকে আমি দূর থেকে চেয়ে গেছি কিন্তু সে ফিরেও তাকায়নি”
কিন্তু কথাটা ঢাকার জন্য ঠোঁটে হালকা হাসি টেনে বলে,
–“তাহলে কি আমি প্রেসক্রিপশন লিখে দিব?”
–“কি লিখবেন?”
রিজভী মৃদু হেসে বলে,
–“দিনে তিনবার আমাকে দেখা, আর রাতে ঘুমানোর আগে আমার কথা ভাবা”
ঈশানী ঠোঁট কামড়ে হেসে জবাব দেয়,
–“ওষুধটা বেশ ডেঞ্জারাস মনে হচ্ছে, তাহলে সাইড ইফেক্টও থাকবে নিশ্চয়?”
রিজভী একটু কাছে ঝুঁকে এসে ঘোর লাগা দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে,

–“আমার প্রেমে পড়ে যাওয়া”
দুজনেই হঠাৎ একসাথে হেসে ওঠে। ঈশানী তার হাতে মুঠো করে চেপে রাখা রিংটা রিজভী দিকে এগিয়ে দেয় সাথে নিজের হাতও। রিজভী তার হাত থেকে রিংটা নিয়ে পড়িয়ে দিয়ে ধীরে ধীরে তার হাতটা ধরে বলে,
–“ঈশা, তুমি কি জানো, আমি কতদিন ধরে এই কথাটা বলতে চেয়েছি?”
ঈশানী তার দিকে তাকিয়ে থাকে, তার চোখে এবার আর দোটানা নেই, আছে একরাশ শান্তি। তারপর বলে,
–“তাহলে আগে বলেননি কেন?”
–“ভয় পেতাম, যদি তুমি দূরে সরে যাও?”
–“আর এখন?”
রিজভী তার আঙুলে থাকা রিংটার দিকে তাকিয়ে বলে,
–“এখন তো তুমিও আমার মতো একই রোগ আক্রান্ত হয়ে গেছো”
–“কি রোগ?”
রিজভী তার হাতটা আলতো করে চেপে ধরে একদম তার মুখোমুখি হয়ে বলে,

–“এই রোগের নাম ‘লাভ সিনড্রোম’ যার কোনো কিউর নেই। আমার সাথে সারাজীবন কাটানোই একমাত্র ট্রিটমেন্ট”
বিপরীতে রমণীর গাল লজ্জায় লাল আভা হয়ে ওঠেছে। আজকাল হঠাৎ যে তার কী হয় সে নিজেও বুঝতে পারছে না। জোর করে টেনে নিজের হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করেছে। অন্য দিকে রিজভী তাকে এতটা লজ্জা পেতে দেখে ইচ্ছা করেই তার হাত ছাড়ছে না। শেষমেশ ঈশানী এক ঝটকায় ছাড়িয়ে পিছিয়ে যায়। তারপর দুজনের মধ্যে আর কোন কথা হলো না। রিজভী একদৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে। ঈশানী তার সেই চোখে চোখ রাখতেই কেমন আতকে ওঠে। মনে মনে ভাবে, কই সে তো তার ভাইয়ের সাথে প্রায় সময় দেখতো আরজে আর রিজভীকে। তাহলে আগে তো তার চোখে এমন কিছুই দেখেনি। তাহলে? পর মুহূর্তে মনে পড়ে, নাহ সে তো কোনদিনই রিজভীকে তেমন ভাবেই নি। রিজভীর দৃষ্টি এখনো হটছে না। রমণী গলা খাঁকারি দিয়ে বলে,
–“সো, ডাক্তার সাহেব…আমি কি তাহলে আপনার পার্মানেন্ট পেশেন্ট হয়ে গেলাম?”
রিজভী সেভাবেই তাকিয়ে বলে,
–“না… তুমি আমার লাইফটাইম পার্টনার হয়ে গেলে”
এরপর আর কোন কথা হলো না। দুটো হৃদয় হারিয়ে গেল একে অন্যের চোখে।

“টাইটান ভল্ট প্রিজনের” সেই সেলটা যেন একটা শীতল, নিঃশব্দ, ভারী অন্ধকারে ডুবে থাকা একটা ছোট্ট পৃথিবী। কংক্রিটের ধূসর রঙের মোটা দেয়ালগুলোতে মাঝে মনে হচ্ছে সময় থেমে গেছে বহু আগে। উপরে একটা মাত্র হলুদ বাল্ব ঝুলছে, আর নিচে ঠান্ডা, শক্ত মেঝেতে বসে আছে সানা। রমণী দুই হাঁটু ভাঁজ করে, হাত কাঁপছে, আর চোখের কার্নিশ বেয়ে অঝোরে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। তার সামনে কিছুটা দূরে দেয়ালের গায়ে হেলান দিয়ে বসে আছে সোফিয়া। তার চোখ দুটো ফাঁকা, ঠোঁট শুকিয়ে গেছে, মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই। কিন্তু তার চারপাশে যেন এখনো ভাসছে তার বলা অতীতের প্রতিটা শব্দ। সেই অতীত যা একজন মানুষকে মানুষ থেকে দানবে পরিণত করেছে। সানা শ্বাস নিতে পারছে না ঠিকমতো। তার বুকটা ধকধক করছে, মনে হচ্ছে এখনই ভেঙে যাবে। সে কখনো ভাবতেও পারে নি একটা মানুষ এতটা কষ্ট পেতে পারে, একটা মানুষ ভালোবাসার জন্য এতটা পাগল হতে পারে, একটু ভালোবাসার জন্য এতদূর যেতে পারে। সে আর নিজেকে সামলাতে না পেরে হঠাৎ সামনে এগিয়ে এসে সোফিয়ার দিকে হাত বাড়ায়। কিন্তু ঠিক তখনই সোফিয়া হঠাৎ পিছিয়ে যায়। তার চোখে ফুটে ওঠে আতঙ্ক। সে বারবার মাথা নাড়িয়ে বলতে থাকে,

–“না… না… না, কেউ… কাউকে ভালোবাসবে না, ভালোবাসা মানে ধ্বংস, ভালোবাসা মানে হারিয়ে যাওয়া, ভালোবাসা মানে নিজেকে শেষ করে ফেলা”
সে দু’হাতে নিজের মাথা চেপে ধরে বলে,
–“আমি চাই না আমার রনো কোনোদিন ভালোবাসুক। না, তার জীবনে কোনো ভালোবাসা আসুক। না হলে, সেও আমার মতো হয়ে যাবে। সেও ধ্বংস হয়ে যাবে।ভালোবাসা সবাই কে মেরে ফেলে, স..সবাই..”
সানা আর শুনতে পারছে না। সে চোখের পানি ছেড়ে এগিয়ে গিয়ে ধীরে ধীরে সোফিয়ার সামনে বসে পড়ে। কাঁপা কাঁপা হাতে সোফিয়ার হাত দুটো চেপে ধরে নিচু স্বরে ডেকে ওঠে,
–“মা…”
সানার কণ্ঠ থেকে শব্দটা নিঃসৃত হতেই সেলটা যেন থেমে যায়। এক পল বিলম্ব না করে তৎক্ষনাৎ সোফিয়া নিজের চমকিত নয়ন জোড়া নিক্ষেপ করে সানার উপর। সে যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না সানা তাকে এই নামে ডেকেছে। কণ্ঠে অগাধ বিস্ময়ের মিশেলে শুধালো,
–“কিহ?..কি বললে তুমি”
সানা আবার বলে,
–“মা…”

বিপরীতে সোফিয়া বারবার নেত্রপল্লব ঝাপটে নিজেকে বিশ্বাস করাতে পারছে না। সানা না থেমে বলে,
–“আপনি এতদিন একা ছিলেন, কিন্তু এখন থেকে আর না। এখন আমি আপনার পাশে থাকব সবসময়”
সোফিয়া তার কথা শুনলো না, তার মতো পাগলের পাশে কে থাকবে? যেখানে তার ইকবাল ছিল না সেখানে সানা থাকবে কীভাবে? এই ভেবে সো মাথা নাড়িয়ে আওড়ায়,
–“না… না… তুমি বুঝবে না, আমি…আমি ভালো না, আমি কখনো ভালো ছিলাম না। আমি শুধু ধ্বংস করতে জানি, আর কিছুই না। আমি খুব খারাপ, ইকবাল বলেছে আমায়…”
সানা কাঁদতে কাঁদতে তার হাত ধরে তাকে থামিয়ে বলে,
–“আপনি খারাপ না, আপনাকে খারাপ বানানো হয়েছে। আপনি শুধু ভালোবাসা চেয়েছিলেন, একটু ভালোবাসা। যেটা কেউ আপনাকে কোনদিনও দেয়নি। তাই আপনি ভুল পথে গেছেন, মা….”
সোফিয়া থমকে যায়। সানা আবারও তাকে সেই নামে ডাকছে। তার দৃষ্টি ধীরে ধীরে সানার উপর থামে,
–“তুমি… আমাকে মা বললে কেন?”
–“কেননা, আমার মা নেই তাই আমার একটা মা লাগবে। আর আজ আপনাকে দেখে মনে হলো, আপনারও কাউকে দরকার, যে আপনাকে মা বলে ডাকবে, যে আপনাকে ছেড়ে যাবে না”
সোফিয়া এক ঝটকায় তার থেকে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বলতে থাকে,

–“না, না, না, আমি মা হতে পারিনি। আমি নিজ হাতে আমার সন্তানদেরও ধ্বংস করেছি। আমি কাউকে ভালো রাখতে পারিনি, ইকবাল কেও না। এজন্য সে তৃণাকে ভালোবেসেছে। আমার কাউকে লাগবে না। ভালোবাসা সবাই কে শেষ করে দিবে….”
সোফিয়া পাগলের মতো বলতেই থাকে। সানা শক্ত করে তাকে চেপে ধরে বলে,
–“না, ভালোবাসা মানুষকে শেষ করে না। “ভুল মানুষকে ভালোবাসা” মানুষকে শেষ করে। আর ইকবাল আপনার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল”
সোফিয়া চুপ হয়ে যায়। তার চোখে এক মুহূর্তের জন্য দ্বিধা জ্বলে ওঠে। ধীরে ধীরে তার হাতটা সানার পিঠে চলে যায়। সেলটা আবার নিঃশব্দ হয়ে যায়। কিয়ৎকাল এভাবে কেটে যায়। তারপর সানা তাকে ছেড়ে তার গালে হাত রেখে শুধালো,

–“চলুন… আমার সাথে চলুন”
সোফিয়া ধীরে মাথা তোলে তাকায়,
–“কোথায়?”
–“আপনার বাড়ি”
সোফিয়া কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থাকে। তার চোখে ফুটে ওঠে অবিশ্বাস, ক্লান্তি, আর একরাশ বিদ্রুপ। ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি টেনে বলে,
–“বাড়ি!! আমার জন্য কোনো বাড়ি নেই সানা”
–“আপনার বাড়ি, গাড়ি, সন্তান সব আছে। শুধু ভুল মানুষ টাকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চেয়েছেন আপনি”
–“তুমি জানো আমি কে? আমি কতজনকে মেরেছি? কতজনের জীবন ভেঙেছি?
তাদের আর্তনাদ গুলো আমার নেশা হয়ে গেছে। আমি ভিতর থেকে পচে গেছি, সানা। তুমি….”
তার হাসিটা ধীরে ধীরে অট্টহাসিতে পরিণত হয়ে যায়,
–“তুমি আমাকে ঠিক করবে, বলছো?”
সানা কাঁদতে কাঁদতেই বলে,

–“আমি না পারলেও চেষ্টা করবো, আপনি চলুন। এখানে থাকলে আপনি কোনদিনও ঠিক হবেন না। রানভীর ঠিক বলেছে, আপনার একটা সুস্থ পরিবেশ লাগবে”
সোফিয়ার হাত ধীরে ধীরে ঢিলে হয়ে যায়। সানা আর কিছু বলার আগেই সেলের বাইরে থেকে আসে দিলরুবা খানমের কণ্ঠস্বর,
–“সুনেহনা”
তিনি দরজা খুলে ভিতরে ঢোকেন, তার চোখে কঠোরতা, কিন্তু ভেতরে উদ্বেগ স্পষ্ট। তিনি একটু শক্ত কণ্ঠে শুধালেন,
–“তোমাকে ডাকতে এক ঘন্টায় কতজন পাঠিয়েছি জানো? সবাইকে ফিরিয়ে দিয়েছো তুমি। ওখানে আরভি তোমাকে খুঁজছে”
সানা সোফিয়ার হাত ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। সে ঐ সময় ঐ গার্ডের সাথে আরভিকে পাঠিয়ে দিয়েছিল। সানা পিছনে না তাকিয়েই বলে,
–“আমি… আসছি”
দিলরুবা খানম একবার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সোফিয়ার দিকে তাকায় তারপর সানার দিকে,
–“চলো”
সানা আবার সোফিয়ার দিকে ফিরে যায়। ধীরে বসে পড়ে তার সামনে। তার হাত তুলে আলতো করে সোফিয়ার গালে রেখে আওড়ায়,
–“আমি কাল সকালে আসবো রানভীর কে নিয়ে। আপনাকে নিয়ে যাবো। আপনার একটা নতুন জীবন হবে। যেখানে কেউ আপনাকে আঘাত করবে না। শুধু ভালোবাসা থাকবে। যেখানে কেউ আপনাকে ছেড়ে যাবে না… মা”
বিপরীতে সোফিয়া নিশ্চুপ, সে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। সানা এগিয়ে এসে তাকে জড়িয়ে ধরে খুব শক্ত করে। তারপর তাকে ছেড়ে দিয়ে উঠে দাঁড়ায়। ঠোঁটে একটা হালকা হাসি টেনে বেড়িয়ে পড়ে। দরজা টা বন্ধ হতেই সেলে আবার নীরবতা নেমে আসে। আবারও সোফিয়া একা। সে ধীরে ধীরে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে হাঁটু জড়িয়ে বসে পড়ে।
মাথা নিচু করে বলতে থাকে,

–“ইকবাল, কেন তুমি আমাকে ভালোবাসলে না?
কেন, আজ পর্যন্ত আমি তোমাকে ঘৃণা করতে পারছি না?”
তার চোখের কার্নিশ বেয়ে উষ্ণ জল ধীরে ধীরে ঠান্ডা মেঝেতে গড়িয়ে পড়ে। ভাঙা ভাঙা স্বরে ফিসফিসায়,
–“কেন, আমি সবটা দিয়ে ভালোবেসেও হেরে গেলাম?
আমি তোমার কাছে আসছি”

টাইটান ভল্ট প্রিজনের ভারী লোহার দরজাটা পেরিয়ে বাইরে বের হতেই ঠান্ডা করিডোরের বাতাস যেন সানার বুক ভেদ করে ঢুকে যায়। তার শ্বাস এখনো দ্রুত, অতিরিক্ত কান্নার কারনে চোখ এখনো লাল হয়ে আছে। সামনেই দাঁড়িয়ে আছেন মিসেস দিলরুবা খানম। তিনি সানাকে কিছু বলার আগেই সানা হঠাৎ তাকে জিজ্ঞেস করে বসে,
–“আমি ওনার মেডিকেল ফাইলগুলো চাই”
দিলরুবা খানম ভ্রু কুঁচকে তাকান,
–“কেন?”
সানা এক মুহূর্তও দেরি না করে জবাব দেয়,
–“কার কাছে আছে সেটা বলুন”
দিলরুবা খানম কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে তারপর একটা দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে বলেন,
–“এখানে আনা প্রতিটা অপরাধীকে প্রথমে সম্পূর্ণ মেডিকেল চেকআপ করানো হয়। ফাইলগুলো প্রিজন মেডিকেল উইংয়ে থাকে। ডক্টর রাঘবের কাছে….”
সানা আর এক সেকেন্ডও না দাঁড়িয় ছুটে যায় সেদিকে।
ডক্টর রাঘবের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে অনুমতি ছাড়াই ধাক্কা দিয়ে দরজা খুলে ভিতরে ঢুকে পড়ে। ভেতরে বসে থাকা অর্ধবয়স্ক ডক্টর রাঘব চমকে মাথা তোলে তাকায়। বয়স চল্লিশের কোঠায়, চশমা পরা, পরিপাটি, স্থির দৃষ্টি। তিনি এই প্রিজনের হেড ডাক্তার। তার অধীনে আরও কয়েকজন জুনিয়র ডাক্তার আছে যারা জরুরি চিকিৎসা, প্রাইমারি ট্রিটমেন্ট সামলায়। কিন্তু মূল সিদ্ধান্ত, ফাইল, রিপোর্ট সবকিছু তার হাতেই।
সানাকে দেখে তাকে চিনতে বিন্দু মাত্র সময় লাগল না। কেননা সানাকে তিনি সোশ্যাল মিডিয়ায় বহুবার আরজের সাথে দেখেছে। তিনি হালকা বিস্মিত হয়ে বলেন,

–“মিসেস আরজে, আপনি এখানে?”
সানা হাঁপাতে হাঁপাতে সামনে এগিয়ে এসে বলে,
–“ডক্টর, মিসেস সোফিয়ার মেডিকেল রিপোর্ট গুলো আমি এখনই দেখতে চাই”
তিনি টেবিলের পাশের চেয়ারটা এগিয়ে দিয়ে শান্ত স্বরে বলে,
–“আপনি আগে বসুন”
সানা বসে তড়িঘড়ি করে বলে,
–“আমি রিপোর্টগুলো দেখতে চাই, প্লিজ”
–“দেখুন, আমাদের কাছে পারমিশন নেই, কারো মেডিকেল রিপোর্ট দেখানোর”
সানা অস্থির চিত্তে বলতে থাকে,
–“প্লিজ, আমি জানতে চাই ওনার আসলে কি হয়েছে”
ডক্টর রাশেদ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকেন। সানা বারবার তাকে অনুরোধ করার পর তিনি আরজের জন্য রাজি হন। তিনি সোফিয়ার ফাইল বের করে সানার দিকে এগিয়ে দেয়। ডক্টর রাশেদ নিচু স্বরে বলতে শুরু করলেন,
–“মিসেস সোফিয়ার কেসটা সাধারণ কোনো কেস না। ওনার শরীরে যে ড্রাগস ব্যবহার করা হয়েছে সেটা দীর্ঘমেয়াদে স্নায়ুতন্ত্রকে ধ্বংস করে দিয়েছে”
তিনি আরও একটা রিপোর্ট সামনে এগিয়ে দিলেন,

–“দেখুন এখানে ওনার নিউরোলজিক্যাল রেসপন্স। তাকে সেলে আনার পর যখন সে ব্যাথার পরিবর্তে হাসতো তখন সবার খটকা লাগে। তাই আমরা তার নিউরোলজিক্যাল টেস্ট করাই”
সানা যদিও কিছুই বুঝতে পারছে না, তবুও তাকিয়ে থাকে। ডক্টর তার দৃষ্টি বুঝে ব্যাখ্যা করে বলেন,
–“মানুষের শরীরে ব্যথা অনুভব করার জন্য কিছু নির্দিষ্ট স্নায়ু কোষ থাকে, যে গুলোকে বলে, পেইন রিসেপ্টর। সোফিয়ার ক্ষেত্রে এই কোষগুলোর একটা বড় অংশ কার্যত মৃত”
–“মানে?”
–“মানে, সে স্বাভাবিকভাবে ব্যথা অনুভব করতে পারে না। তার শরীর আঘাত পায় কিন্তু মস্তিষ্ক সেই সংকেত ঠিকভাবে গ্রহণ করতে পারছে না'”
সানার চোখ বিস্ফোরিত হয়ে যায়। অবাক সুরে আওড়ায়,
–“এজন্য ওনি এত কিছু সহ্য করে, তবুও কিছু বোঝে না?”
ডক্টর মাথা নাড়িয়ে আরেকটা পাতা খুলে বলেন,

–“শুধু তাই না, তার ‘ইমোশনাল রেসপন্সেও অস্বাভাবিক পরিবর্তন হয়ে আছে। কিছু অংশ অতিরিক্ত সক্রিয়, আর কিছু অংশ একদম নিষ্ক্রিয়। এই কারণেই, সে অন্যের কষ্টে শান্তি পায়। কিন্তু নিজের অনুভূতি ঠিকভাবে অনুভব করতে পারে না”
সানার চোখ বেয়ে গড়গড় করে গড়িয়ে পড়ছে। ডক্টর রাঘব একটু থেমে ধীরে বলেন,
–“আমি জানি কেউ জন্মগতভাবে এমন হয় না, ওকে এমন বানানো হয়েছে। মিসেস সোফিয়ার আরও একটা বড় সমস্যা আছে”
সানা চমকে তাকায়,
–“কি?”
–“অতিরিক্ত ড্রাগস ব্যবহারের কারণে, তার কিডনির একটা অংশ ড্যামেজ হয়ে গেছে। রাইট কিডনি প্রায় অকার্যকর অবস্থায়”
সানা যেন শুনেও নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না। ডক্টর রাঘব চুপচাপ তাকিয়ে থেকে ফাইল টা বন্ধ করে বলেন,
–“তার মানসিক অবস্থা খুবই সংকটজনক”
সানা নিঃশ্বাস আটকে আসছে। কান্নায় কথাগুলো দলা পাকিয়ে যাচ্ছে। ডক্টর রাঘব কিয়ৎক্ষণ চুপ থেকে বলতে থাকেন,

–“ওনার পুরোপুরি ঠিক হওয়া সম্ভব না। তার মস্তিষ্কের কিছু অংশ স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। কিছু নিউরাল কানেকশন আর কখনো আগের মতো কাজ করবে না। তার উপর দীর্ঘমেয়াদী ট্রমা, দশ বছর বয়স থেকে আজ পর্যন্ত সে ট্রমার ভেতরেই বেঁচে আছে। আমি তো ভাবছি, ওনি এতদিন ঠিক আছেন কীভাবে?
তার অবস্থা একটা পাগলের থেকেও খারাপ হয়ে আছে, পাগলরা বাস্তবতা বোঝে না। কিন্তু মিসেস সোফিয়া বোঝেন, সে জানে সে কি করেছে, সে জানে সে কি হারিয়েছে, কিন্তু তবুও নিজেকে থামাতে পারে না। আর সবচেয়ে বড় সত্যি হলো, তার হাতে বেশি সময় নেই। যেকোনো সময় যেকোন কিছু হতে পারে, শারীরিকভাবেও, মানসিকভাবেও। এমন ট্রমা থেকে বের হওয়া খুব কঠিন। আর যদি সেটা হয় লাইফটাইম ট্রমা, তাহলে প্রায় অসম্ভব, তবে….”
সানা হঠাৎ আশা নিয়ে তাকায়,
–“তবে?”
–“তার হাতে যতটুকু সময় আছে, ওই সময়টা যদি সে একটা সুস্থ পরিবেশে কাটাতে পারে তাহলে হয়তো তার মানসিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হতে পারে”
সানা কিছু না বলে সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়। ডক্টর রাঘব কে ধন্যবাদ দিয়ে সে দরজা খুলে বেরিয়ে যায় মিসেস দিলরুবা খানমের কেবিনের দিকে।

দিলরুবা খানমের কেবিনে ভারী কাঠের টেবিলের উপর ফাইলের স্তূপ পড়ে আছে। আর মাঝখানে বসে আছেন তিনি কঠোর, অনড় হয়ে। সামনের চেয়ারে সানা চুপচাপ বসে আছে। দিলরুবা খানম তর্জনী দিয়ে কপাল ঘষে রুক্ষ স্বরে বলেন,
–“সুনেহনা, তুমি কি পাগল হয়ে গেছো?
তুমি কি বুঝছো তুমি কি বলছো?
সোফিয়াকে এখান থেকে বের করা ইম্পসিবল। সে একজন কয়েদি। শুধু কয়েদি না একজন ডেঞ্জারাস অপরাধী। তুমি তো জানোই সে কি কি করেছে?”
সানা ধীরে মাথা তোলে তারদিকে তাকায়। তার চোখের পানি শুকিয়ে গেছে। সেও শক্ত কণ্ঠে শুধালো,
–“জানি, সব জানি”
–“তাহলে? তাহলে কেন তাকে বাঁচাতে চাও? হ্যাঁ, তার সাথে খারাপ হয়েছে আমি মানছি। কিন্তু সে কি করেছে সেটা ভুলে যাচ্ছো তুমি। সে মানুষ খুন করেছে, অত্যাচার করেছে, সে চাইলে অন্য পথ নিতে পারত…”
সানা হঠাৎ একটু এগিয়ে এসে তাকে থামিয়ে বলে,

–“কিভাবে নিত?
কিভাবে নিত বলুন?
তার জীবনে কি কখনো ‘ভালো পথ’ ছিল?
কেউ কি তাকে সেই পথ দেখিয়েছে?
কেউ কি তার হাত ধরে বলেছে, এই পথটা বেছে নাও?”
রমণী এক মুহূর্ত থেমে তারপর ধীরে, ব্যথাভরা স্বরে আওড়ায়,
–“যার হাত ধরে সে উপরে উঠতে চেয়েছিল, সেই মানুষটাই তো তাকে নিচে নামিয়েছে। তাহলে সে কীভাবে বুঝবে বলেন?
তার বুঝার জন্য যেই মস্তিষ্কটার দরকার ছিল সেটাতো কবেই নষ্ট হয়ে গেছে। তারপর যার কাছে ভালোবাসা খুঁজতে গিয়েছে, সেই তাকে এই পথে নিয়ে এসেছে”
দিলরুবা খানম তার প্রতুত্তরে ঠোঁট শক্ত করে বলেন,

–“তবুও অপরাধ অপরাধই। এভাবে কেউ ছাড় পায় না। আর তুমি বিষয় টা আবেগ দিয়ে ভাবছো, আর আমি আইনের কথা বলছি। আইন কখনো আবেগ বোঝে না, আইন শুধু অপরাধ দেখে”
–“আইন যদি শুধু অপরাধই দেখে, তাহলে মানুষ হওয়ার দরকারটা কি?”
–“ডোন্ট ট্রাই টু বি স্মার্ট, সিনেহনা। তুমি যাকে বাঁচাতে চাইছো, সে বহু মানুষের জীবন নষ্ট করেছে। এখন তার শাস্তি কমানো যাবে না”
সানা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে তার দিকে। তারপর ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হালকা হাসি টেনে বলে,
–“কি আশ্চর্য তাই না?”
দিলরুবা খানম ভ্রু কুঁচকে তাকান,

–“মানে?”
–“মানে, আমরা সমাজের মানুষ গুলো এতটা নিকৃষ্ট কেন? আমাদের চিন্তা এত নিচু কেন?
আমরা পাপকে ঘৃণা করি না, আমরা পাপীকে ঘৃণা করি। পাপ শাস্তি পায় না, শাস্তি পায় শুধু পাপী”
কেবিনে ভারী নীরবতা নেমে আসে। দিলরুবা খানমের মুখে এবার স্পষ্ট বিরক্তি ফুটে ওঠে,
–“এগুলো দর্শন শোনানোর জায়গা না, সুনেহনা, এখানে আইন আছে, নিয়ম আছে, আর ও একজন ক্রিমিনাল”
–“না, ওনি একজন ভিকটিম। যারা তাকে এমন বানিয়েছে তারা ক্রিমিনাল”
দিলরুবা খানম টেবিলে হাত ঠুকে গর্জে উঠেন,
–“এনাফ, আমি আর কিছু শুনতে চাই না। সোফিয়া এখানেই থাকবে, ওর আর তিনদিন পর ফাঁ*সি হবে, এটাই ফাইনাল”
সানা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়। তার চোখে এখন আর কান্না নেই, আছে শুধু অদ্ভুত এক জেদ। সেও একই সুরে বলে,

–“ঠিক আছে…”
–“মানে?”
–“আমি কাল সকালে আসবো, রানভীর কে নিয়ে আসবো। আর মিসেস সোফিয়াকে নিয়ে যাবো। যদি পারেন রানভীর কে আটকাবেন”
দিলরুবা খানম চমকে ওঠেন। তিনি আরজের নাম শুনেই সাথে সাথে দমে যান কেননা আরজে কে আটকানোর সাধ্য তার কাছে নেই। বরং সে আরজে কে আটকে রেখেছে সানার মাধ্যমে। একটা ফাঁকা ঢুক গিলে আওড়ান,
–“তুমি কি বলছো বুঝছো? তুমি পাগল হয়ে গেছো? এতদূর আসার পর এসব কি বলছো?”
–“এতদূর আসার পরই আমি সত্যিটা জানতে পেরেছি। আমরা সবসময় মুদ্রার এক পিঠ দেখেছি, অন্য পিঠটা দেখার চেষ্টা করিনি। আমরা কখনো তাকে জিজ্ঞেস করিনি, সে কেন এমন করেছে”
দিলরুবা খানম দাঁত চেপে বলেন,

–“পাপ পাপই হয়, সানা। আর পাপের কোন ক্ষমা হয় না”
সানা ধীরে মাথা নাড়িয়ে বলেন,
–“হ্যাঁ…পাপ পাপই হয়। কিন্তু সকল পাপীই পাপ হয় না”
এই বলেই সানা চেয়ার ছেড়ে ওঠে দাঁড়ায়। দিলরুবা খানম কে আর কিছু বলতে না দিয়ে সে দরজা খুলে বেরিয়ে যায়। করিডোরে এসে আরভির হাতটা শক্ত করে ধরে প্রিজনের বাইরে পা বাড়ায়। আরভি চারপাশে তাকিয়ে আবারও জিজ্ঞেস করে,

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ২৬ (৪)

–“মম…আমরা গ্র্যান্ড মাকে বাড়ি নিয়ে যাবো না?”
সানা হাঁটু গেড়ে বসে তার গালে হাত রেখে আওড়ায়,
–“হ্যাঁ সোনা, আমরা কাল সকালেই গ্র্যান্ড মাকে বাড়ি নিয়ে যাবো”

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ২৮