Home হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৩১ (৩)

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৩১ (৩)

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৩১ (৩)
সাবা খান

রাতটা যেন আজ পৃথিবীর সমস্ত অন্ধকার নিজের বুকে টেনে নিয়েছে। সন্ধ্যা নামার পর থেকেই আকাশের বুকে অদ্ভুত এক অস্থিরতা ঘুরে বেড়াচ্ছিল। কালো মেঘগুলো সারাদিন ধরে একে অপরকে ধাক্কা মেরে জমাট বেঁধেছিল, যেন বহুদিনের জমে থাকা ক্রোধ আজ বিস্ফোরিত হবে। আর এখন মধ্যরাতে সত্যিই তা হয়েছে, মুষলধারে বৃষ্টি নেমেছে। এই শীতের মধ্যেই হঠাৎ আচমকা এমন বৃষ্টি হয়তো কেউ কল্পনা করেনি কিন্তু বৃষ্টির প্রতিটা ফোঁটা যেন মাটির বুক চিরে পড়ছে। বিদ্যুতের সাদা ঝলক বারবার আকাশ ছিঁড়ে ফেলছে। দূরে কোথাও বজ্রপাতের প্রচণ্ড শব্দে জানালার কাঁচ পর্যন্ত থরথর করে কেঁপে উঠছে। আর সেই ভয়ংকর বর্ষণর মধ্যেই দাঁড়িয়ে আছে ব্ল্যাক ম্যানশন।

বাইরে থেকে পুরো ম্যানশনটাকে মনে হচ্ছিল কোনো অভিজাত পূর্ণ অভিশপ্ত প্রাসাদ, চারপাশে বৃষ্টির জল গড়িয়ে পড়ছে, ছাদের কিনারা বেয়ে টুপটাপ নয়, একেবারে ঝর্ণার মতো ধারা নেমে আসছে। এই বৃষ্টির মধ্যেই প্রতিটা করিডোর নিস্তব্ধ। কখনো বিদ্যুতের আলো ঝলকে পুরো ম্যানশনটা এক মুহূর্তের জন্য সাদা হয়ে উঠছে, আবার পরক্ষণেই সব ডুবে যাচ্ছে গভীর অন্ধকারে। আর এই গভীর, শীতল, ঝড়মুখর রাতেই ম্যানশনের এক কক্ষে, ওয়াশরুমের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে ইবেলিনা।
রমণীর মুখে অদ্ভুত এক মিশ্র অনুভূতি, অস্বস্তি, উৎকণ্ঠা, অবিশ্বাস মিলে মিশে একাকার। আর কোথাও গভীর, নিভৃত এক আনন্দ। তার দুহাত মুষ্টিবদ্ধ করে শক্ত করে চেপে ধরা ছোট্ট একটা প্রেগন্যান্সি কিট। ইবেলিনার বুক ওঠানামা করছে দ্রুত। সে যেন সাহস সঞ্চয় করছে শেষবারের মতো তাকানোর জন্য। ইবেলিনা ধীরে ধীরে চোখ নামিয়ে হাতে ধরা কিটটার দিকে। আর তারপর, তার শ্বাস থেমে গেল যেন কেননা চোখের সামনে দুটো দাগ স্পষ্ট, মানে পজিটিভ।

এক মুহূর্তের জন্য তার পৃথিবী যেন থেমে গেল। তার চোখজোড়া বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। এতক্ষণ ধরে বুকের ভেতর আটকে রাখা শ্বাসটা সে ধীরে ধীরে ছেড়ে দিল। অতঃপর হঠাৎ করেই ঠোঁটের কোণে কাঁপা কাঁপা একটা হাসি ফুটে উঠে সাথে চোখও ভিজে এলো। সে… মা হতে চলেছে। এই ছোট্ট একটা সত্য যেন মুহূর্তেই তার ভেতরের পৃথিবীটা পাল্টে দিল। তার বুকের ভেতর উথালপাথাল ঢেউ বইতে শুরু করে। ‘মা’ হওয়ার অনুভূতি বুঝি এমনই। তার কতদিনের স্বপ্ন এটা, অসংখ্য রাতে নিঃশব্দে কল্পনা করা এক অসম্ভব সুন্দর অনুভূতি। কতবার সে ভেবেছে, একটা ছোট্ট প্রাণ তাকে “মাম্মাম” বলে ডাকছে।
অবচেতনভাবেই সে নিজের পেটের উপর হাত রাখে। রমণীর চোখে তখন একরাশ অবিশ্বাস মেশানো মমতা। কিন্তু এই আনন্দের মাঝেও কোথাও একটা অদ্ভুত অস্বস্তি নাড়া দিয়ে ওঠে। কারণ এই খবরটা শুধু তার একার না, জ্যাকেরও। জ্যাক এটা কিভাবে নেবে?

এই ভাবনাটা মাথায় আসতেই তার মুখের হাসিটা কিছুটা ফিকে হয়ে গেল। গত কয়েকদিন ধরেই শরীরটা অদ্ভুত লাগছিল। মাথা ঘুরত, হঠাৎ হঠাৎ দুর্বল লাগত। এর আগেও তার সাথে এমন হয়েছিল যখন বাংলাদেশে প্রথম এসেছিল। তখন আশ্রমের দাইমা তাকে বলেছিল সে হয়তো সন্তান সম্ভাবনা। ওনার সেই কথার উপর বিশ্বাস করে ইবেলিনা কোন দিকে না তাকিয়ে সোজা বাংলাদেশে চলে আসে। পরে অবশ্য চেক করার পর নেগেটিভ আসাতে সে দুইদিন মনমরা হয়ে বসে ছিল। কিন্তু কালকে কিছুটা বমি বমি ভাবও হচ্ছে তাই আজ সকালে সে চুপিচুপি ঈশানীকে দিয়ে কিটটা আনিয়েছিল। কিন্তু সে কল্পনাও করেনি এটা সত্যিই পজিটিভ আসবে। এখন তার মাথায় একটাই প্রশ্ন ঘুরছে, জ্যাক খুশি হবে?
নাকি…না, না সে আর বাকিটা ভাবতে চায় না।

রমণী চোখ বন্ধ বন্ধ করতেই জ্যাকের রাগী মুখটা ভেসে উঠে আর বুকের ভেতরটা কেমন হালকা কেঁপে উঠল। না, এখনই বলা যাবে না। আগে বুঝতে হবে জ্যাক আসলে কি চায়। তার মতামত জানতে হবে। এই ভেবে ইবেলিনা শক্ত করে কিটটা চেপে ধরে গভীর নিঃশ্বাস নিয়ে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এলো। আর ঠিক তখনই সে থমকে গেল চক্ষু সম্মুখে দাঁড়িয়ে থাকা মানব কে দেখে।
রমণীর সামনে এক হাত পকেটে ঢুকিয়ে সটান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে জ্যাক। ইবেলিনার বুক ধক করে উঠে, চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। মনের কোণে প্রশ্ন জাগে, জ্যাক তো তো কক্ষে ছিল না, আরজে তাকে কোনো কাজে বাইরে পাঠিয়েছিল। তাহলে… কখন ফিরল?

ঠিক সেই মুহূর্তেই হাতে থাকা কিটটার কথা মনে পড়তেই ইবেলিনা তাড়াহুড়ো করে সেটা নিজের পেছনে লুকিয়ে ফেলল। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। জ্যাকের তীক্ষ্ণ, শিকারির মতো ধূসর চোখ সেটা দেখে ফেলেছে। তার চোখ সরু হয়ে এলো সাথে চোয়াল শক্ত হয়ে উঠে। ইবেলিনা তার থেকে কিছু লুকোচ্ছে, এই উপলব্ধিটাই যেন মুহূর্তে তার ভেতরের সমস্ত সংযম টেনে ধরল। ধীরে ধীরে সে সামনে এগিয়ে আসে। তার ভারী বুটের শব্দ নিস্তব্ধ কক্ষে অদ্ভুত ভয়ংকর শোনাচ্ছে রমণীর কানে। ইবেলিনা ভয়ে একটা ফাঁকা ঢোক গিলে। জ্যাকের চোখদুটো এমন ঠান্ডা হয়ে গেছে যে সেগুলোর দিকে তাকাতেই তার বুকের ভেতর কেমন কুঁকড়ে উঠে। জ্যাক যত সামনে আসছে, সে তত পিছিয়ে যাচ্ছে। একসময় গিয়ে তার পিঠ ঠেকে গেল ওয়াশরুমের দরজায়। আর পিছু হটার জায়গা নেই। জ্যাক তার ঠিক সামনে এসে দাঁড়ায় ঠিক এমন সময়ে বাইরে বজ্রপাত হয় আর সেই ঝলকানিতে এক মুহূর্তের জন্য জ্যাকের মুখ আলোকিত করতেই ইবেলিনার বুক কেঁপে উঠে কেননা যন্ত্রমানবের চোয়াল শক্ত, চোখ রক্তবর্ণ, হাত দুটো মুষ্টিবদ্ধ হয়ে আছে। সে গম্ভীর, কর্কশ স্বরে প্রশ্ন ছুড়ে,

—”কি লুকাচ্ছো?”
ইবেলিনা দ্রুত মাথা নাড়িয়ে বলে,
—”কি…কিছু না…”
জ্যাকের দৃষ্টি আরও ধারালো হয়ে উঠে। ফের রুক্ষ পুরুষালী স্বরে আওড়ায়,
—”পিছনে কি আছে?”
—”কিছু না বললাম তো…”
সামনের মানবী মিথ্যা বলছে এটা সম্পূর্ণ স্পষ্ট জ্যাকের কাছে যার কারণে তার ক্রোধ টা ক্রমশ বাড়তে শুরু করে। জ্যাক এবার এক পা আরও কাছে এসে গলায় চাপা হুমকির সুরে বলে,
—”লিনা, আমি শেষবারের মতো বলছি। বের করো”
ইবেলিনা মাথা নাড়ায়, সে পারছে না। তার হাত কাঁপছে। মনে হচ্ছে এখনই যদি জ্যাক দেখে ফেলে, সে হয়তো ভীষণ রেগে যাবে, হয়তো চিৎকার করবে। হয়তো…আর বাকিটা ভাবার আগেই জ্যাকের কণ্ঠস্বর আবার কানে আসে,

—”বের করো”
হঠাৎ জ্যাক এত জোরে ধমক দিল যে ইবেলিনা পুরো শরীর নিয়ে কেঁপে উঠে। তার চোখ ভিজে এলো ভয়ে। কাঁপা কাঁপা হাতে ধীরে ধীরে সে পেছন থেকে কিটটা বের করে। তার আঙুলগুলো এতটাই কাঁপছিল যে মনে হচ্ছিল যেকোনো মুহূর্তে সেটা পড়ে যাবে। জ্যাক এক ঝটকায় সেটা তার হাত থেকে ছিনিয়ে নিল। তারপর রক্তচক্ষু নিয়ে তাকাল ইবেলিনার দিকে। বিপরীতে ইবেলিনা শ্বাস আটকে দাঁড়িয়ে রইল। জ্যাক ধীরে ধীরে চোখ নামাল হাতে থাকা জিনিসটার দিকে।
জ্যাকের তীক্ষ্ণ দৃষ্টির সামনে দাঁড়িয়ে রমণীর মনে হচ্ছে, তার বুকের ভেতরকার সমস্ত গোপন শব্দ বুঝি আজ বাইরে বেরিয়ে আসবে। বাইরে ঝড়ের গর্জন ক্রমশ তীব্র হয়ে উঠছে, জানালার কাঁচে বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটা আছড়ে পড়ে অদ্ভুত এক বিষণ্ণ সুর তুলছে। আর সেই অন্ধকারাচ্ছন্ন রাতের মধ্যে
জ্যাক কিটটার দিকে তাকিয়ে আছে ভ্রু কুঁচকে। তার শক্ত চোয়াল আরও কঠিন হয়ে উঠেছে যেন সে বুঝতেই পারছে না, ছোট্ট এই জিনিসটা এত লুকিয়ে রাখার কি আছে। জ্যাকের দৃষ্টি এক মুহূর্তে কিটটার দিকে গেল অতঃপর আবারও যায় রমণীর দিকে। ইবেলিনা ঠোঁট কামড়ে মাথাটা আস্তে আস্তে ওপর-নিচ নাড়িয়ে “হ্যাঁ…” বুঝায়।

ব্যাস, ঠিক সেই মুহূর্তেই যেন সময় আচমকা থমকে গেল। জ্যাকের চোখদুটো স্থির হয়ে রইল কিটটার উপর। তার আঙুলের শক্ত মুঠো ধীরে ধীরে শিথিল হয়ে এলো। কয়েক সেকেন্ড… হয়তো আরও কিছুক্ষণ… সে কোনো শব্দই করল না। শুধু নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইল সেই দুটো স্পষ্ট দাগের দিকে।
তারপর যেন আচমকা বাস্তবে ফিরে আসতেই সে অন্য হাতটা দ্রুত এগিয়ে এনে কিটটার উপর ঘষে দেখল। যেন নিশ্চিত হতে চাইছে, এটা কোনো ভুল নয় তো? কোনো বিভ্রম নয় তো?
কিন্তু নাহ, দুইটা দাগই স্পষ্ট, অত্যন্ত স্পষ্ট। আর সেই সত্যিটা উপলব্ধি হতেই ধীরে ধীরে তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক অচেনা হাসি, একটা তৃপ্ত, প্রশান্ত, বিস্মিত হাসি। যে মানুষটার মুখে ইবেলিনা বছরের পর বছর কেবল কঠোরতা, রক্তপিপাসা আর নির্মমতা দেখেছে সেই মানুষটার চোখের কোণে আজ শিশুসুলভ বিস্ময়। ইবেলিনা অনিচ্ছাসত্ত্বেও একটা দীর্ঘ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। এতক্ষণ ধরে বুকের ভেতর যে ভয়টা জমে ছিল, সেটা যেন ধীরে ধীরে গলে যাচ্ছে। সে ভেবেছিল জ্যাক হয়তো রেগে যাবে, হয়তো বিরক্ত হবে, হয়তো চুপ করে চলে যাবে।

কিন্তু নাহ, জ্যাকের চোখের ভিতর এই মুহূর্তে যে আবেগটা জ্বলছে, সেটা নিখাদ আনন্দ। একজন পুরুষের প্রথমবার ‘বাবা’ হওয়ার আনন্দ। হঠাৎই জ্যাক কিটটা একপাশে ফেলে দিয়ে দুহাতে ইবেলিনাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। এতটা শক্ত করে… যেন সে ভয় পাচ্ছে, এই মুহূর্তটা যদি স্বপ্ন হয়, যদি চোখ খুলতেই সব হারিয়ে যায়। ইবেলিনা বিস্ময়ে স্থির হয়ে গেল। তার কাঁধের কাছে মুখ গুঁজে জ্যাক বড় বড় শ্বাস নিচ্ছে, ইবেলিনা স্পষ্ট বুঝতে পারছে যন্ত্রমানবের বুকটা কাঁপছে স্পষ্টভাবে। জ্যাক কর্কশ গলায় ফিসফিস করে বলে ওঠে,
—”“লিনা… আমি… আমি বাবা হতে চলেছি?”
ইবেলিনা ঠোঁট কামড়ে মাথা নাড়ে। জ্যাক চোখ বন্ধ করে তাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। তার মনে হচ্ছিল, বহু বছরের জমে থাকা অন্ধকারের মধ্যে কেউ বুঝি হঠাৎ একটা আলো জ্বেলে দিয়েছে। সে ধীরে ধীরে আওড়ায়,
—”অবশেষে… পৃথিবীতে আমার হয়ে কেউ আসছে… আমার নিজের কেউ, আমার রক্ত, আমার অস্তিত্ব”
সে কিছুক্ষণ থেমে রইল। তারপর নিচু স্বরে হেসে ফের বলল,

–“ইউ নো লিনা, আমি কখনো ভাবিনি… আমার মতো মানুষের জীবনে এমন কিছু আসবে। আমি ভেবেছিলাম আমার শরীরে যে রক্ত বইছে, সেটা এতটাই কলঙ্কিত, এতটাই অভিশপ্ত যে সেখানে কোনো পবিত্র প্রাণ কখনো জন্ম নেবে না”
ইবেলিনার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল।
জ্যাক ধীরে ধীরে তার কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিয়ে বলে,
—”আমি সব সময় ভাবতাম, আমার মতো মানুষদের জন্য সৃষ্টিকর্তা হয়তো পরিবার, সন্তান এসব লিখে রাখেন না। কিন্তু… কিন্তু হয়তো তিনি আমার প্রতি একবার সদয় হয়েছেন, সরি একবার না দুবার। তাইতো তিনি প্রথমে তোমাকে দিয়েছে আর এখন….”
সে আলতো করে ইবেলিনার উদরের দিকে তাকিয়ে ঠোঁটের কোণে হাসি টেনে বলে,
—”আমাদের বাচ্চাকে”
ইবেলিনার চোখ ভিজে আসে। জ্যাক তার দুই গাল আলতো করে ধরে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলে,

—”থ্যাঙ্কস, মোরনি জান, এই পৃথিবীতে আমাকে এত বড় উপহার দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ”
ইবেলিনা হতভম্ব হয়ে গেল। জ্যাক… তাকে ধন্যবাদ দিচ্ছে? যে মানুষটা কখনো নিজের অনুভূতি প্রকাশ করত না, যে সবসময় নিজেকে বরফের মতো শক্ত খোলসে আবদ্ধ রাখত আজ সে সম্পূর্ণ ভিন্ন। আজ তার চোখে আগুন নেই, আজ সেখানে আছো কোমলতা, আছে ভালোবাসা, আছে অদ্ভুত এক ভয়মিশ্রিত মায়া। হঠাৎ জ্যাক ধীরে ধীরে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল তার সামনে। ইবেলিনা বিস্ময়ে চোখ বড় করে তাকিয়ে রইল। জ্যাক অত্যন্ত সতর্কভাবে তার উদরের উপর হাত রাখল। যেন সেখানে পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান কিছু লুকিয়ে আছে। তারপর মাথা তুলে তাকিয়ে আস্তে করে শুধালো,
–“এখানে… আমার অস্তিত্ব আছে, তাই না লিনা?”
ইবেলিনার চোখ ঝাপসা হয়ে এলো। সে কেবল মাথা নেড়ে “হ্যাঁ” বোঝায়। জ্যাক কিছুক্ষণ নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইল সেই স্থানে। তার চোখের গভীরে এমন এক অনুভূতি ফুটে উঠে, যেটার নাম হয়তো ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে সে ইবেলিনার হাত নিজের হাতে তুলে নিয়ে তার আঙুলের গাঁটে আলতো করে চুমু খেল।
তারপর নিজের কপাল ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে বলল,

—”ইউ আর দ্য বেস্ট গিফট অফ মাই লাইফ.. তুমি আমাকে এমন একটা অনুভূতি দিয়েছো… যেটা আমি কোনোদিন পাইনি। প্রথমবার মনে হচ্ছে, এই পৃথিবীতে সত্যিই আমার কেউ আছে”
ইবেলিনার চোখ দিয়ে নিঃশব্দে উষ্ণ জল গড়িয়ে পড়ে। জ্যাক তাকে ধীরে ধীরে বেডে এনে বসায়। নিজেও তার পাশে বসে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। বাইরে তখনো বৃষ্টি ঝরছে অবিরাম। হঠাৎ ইবেলিনার যেন কিছু মনে পড়তেই সে তড়িঘড়ি করে বলে,
—”আপনার অলরেডি কেউ আছে, জ্যাক…”
জ্যাক ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকায়। ইবেলিনা শান্ত স্বরে বলল,
–“আপনার উচিত… একবার আপনার বাবার কবরে যাওয়া”
কথাটা শুনতেই জ্যাকের দৃষ্টি কিছুটা স্থির হয়ে গেল। তার মুখের হাসিটা ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে এলো। কয়েক মুহূর্ত সে নিশ্চুপ রইল। তারপর নিচু স্বরে বলল,
—”শুধু জন্ম দিলেই বাবা হয় না, লিনা…”
জ্যাক জানালার বাইরে ভারী বৃষ্টির দিকে দৃষ্টিপাত করে আনমনে বলে,

—”বাবা হওয়ার মানে দায়িত্ব, নিজের সন্তানের জন্য ঢাল হয়ে দাঁড়ানো, তাকে নিরাপত্তা দেওয়া, তাকে এমন একটা জীবন দেওয়া… যেখানে সে নিজের বাবাকে ঘৃণা করবে না। আমি আমার সন্তানের প্রতি সেই কর্তব্য পালন করে দেখাবো, যে বাবা কিভাবে হতে হয়”
ইবেলিনা নীরবে তার দিকে তাকিয়ে রইল। রমণীর হাতটা আরও শক্ত করে ধরে জ্যাক আবার বলে,
—”আমি চাই না আমার সন্তান কোনোদিন আমার মতো বড় হোক, অন্ধকারের মধ্যে, রক্তের মধ্যে, ঘৃণার মধ্যে, আমি চাই… ও আলো দেখুক”
ইবেলিনার বুকটা হঠাৎ ভরে উঠল অদ্ভুত এক আবেগে। সে আর কিছু বলল না শুধু ধীরে ধীরে মাথাটা এনে জ্যাকের বুকে রেখে দিল।
জ্যাকও নিঃশব্দে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। বাইরে তখন ঝড় বয়ে চলেছে।
কিন্তু সেই ঝড়ের মাঝেও, প্রথমবারের মতো, তাদের দুজনের বুকের ভেতর জন্ম নিচ্ছিল এক টুকরো শান্তি।

ঘন কালো মেঘে ডুবে থাকা সমগ্র আকাশ জুড়ে অবিরাম বর্ষণের তীব্র শব্দে চারদিক কেঁপে উঠছে বারবার। বিদ্যুতের হিংস্র ঝলক অন্ধকার আকাশকে চিরে দিচ্ছে ক্ষণেক্ষণে। এই বৃষ্টিভেজা নিশীথের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে “নূরে সাফা এস্টেট”
বিশাল ফার্মহাউসটা দূর থেকে দেখতে যেন অন্ধকারের বুকের উপর দাঁড়িয়ে থাকা কোনো নিঃশব্দ অভিশাপ। সেই ফার্মহাউসের বিশাল লিভিং রুমে তখনও এক অদ্ভুত চাপা উত্তেজনা। চারদিকে ছড়িয়ে থাকা হলদেটে আলোয় সবার মুখ স্পষ্ট হলেও কারও অভিব্যক্তি পুরোপুরি বোঝা যাচ্ছিল না। বাতাস পর্যন্ত যেন থমকে আছে, কেউ নিঃশ্বাস ফেললেও সেটা শোনা যাচ্ছে।

লিভিং রুমের একপাশে দাঁড়িয়ে আছে আরজে, মাথায় কালো ক্যাপ, বাদামী চোখজোড়া ভয়ংকর শান্ত আর ঠোঁটের কোণে বাঁকা, তীক্ষ্ণ এক হাসি খেলছে। বিপরীতে সারহাদও একইভাবে দাঁড়িয়ে। তার চোখেও অদ্ভুত শীতলতা। তবে এক মুহূর্তের জন্য যখন তার দৃষ্টি গিয়ে পড়ল সানার উপর, তখনই পাশে দাঁড়ানো আরজের রক্তচক্ষু তার চোখে পড়ে। সাথে সাথে সারহাদ বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে অন্যদিকে ফিরিয়ে নিল।
আর এই পুরো মুহূর্তটার কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে ছিল সানা। রমণীর হালকা ভেজা চুল, কাঁপতে থাকা ঠোঁট, ফ্যাকাশে মুখ যেন কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই তার পৃথিবীটা সম্পূর্ণ বদলে গেছে। আর এদিকে দিলরুবা খানমের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। তার অভিজ্ঞতা বলছিল, সানা সব জেনে গেছে, সব, রিয়ানার মৃত্যু, প্রতিশোধ, মিথ্যে, প্রতারণা, সবকিছু। হয়তো সারহাদ রেকর্ডিং টা সানাকে পাঠিয়েছে, এটা ভাবতেই হঠাৎ যেন তার পায়ের নিচের মাটি সরে গেল। বুকের ভেতর কেমন ফাঁপা শূন্যতা তৈরি হলো। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল তবুও ফিসফিস করে,

—”সুনেহনা…..”
দিলরুবা এক দৌড়ে চারপাশের সবাইকে উপেক্ষা করে সোজা সানার সামনে এসে দাঁড়াল। কাঁপা কাঁপা হাতে সানার গালে হাত রেখে অস্থির কণ্ঠে বলতে শুরু করে,
—”সানা, না, না, আমার সুনেহনা, প্লিজ… তুমি আমার কথাটা শোনো মা… আমি… আমি ইচ্ছে করে কিছু করিনি… বিশ্বাস করো… আমি রিয়ানাকে মারতে চাইনি..”
তিনি আর কিছু বলার আগেই সানা সাথে সাথে তার হাত ঝটকা মেরে সরিয়ে দিল। তার চোখভর্তি ঘৃণা দেখে দিলরুবা খানমের বুকটা হাহাকার করে উঠে। তিনি আবারও তার কাছে এসে বলে,
—”আমার দিকে এভাবে তাকিও না, মা… প্লিজ… তুমি জানো না আমি কতটা একা ছিলাম… কতটা ভেঙে পড়েছিলাম….”
—”একদম আমাকে মা বলবেন না”
হঠাৎ সানার আকষ্মিক চিৎকারে তিনি কেঁপে উঠেন। সানার চোখ বেয়ে উষ্ণ অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে একের পর এক,

—”কোন মা এমন করতে পারে?
কোন মা নিজের সন্তানের মতো কাউকে মেরে ফেলতে পারে?
রিয়ানা কি এত বড় অপরাধ করেছিল?”
দিলরুবা খানম ব্যাকুল হয়ে মাথা নাড়িয়ে বলেন,
—”সে নির্দোষ ছিল না, তুমি জানো না ও কি করত, ও নিজের মায়ের সাথে মিলে কত মেয়ের জীবন নষ্ট করেছে, মানবপাচার করত, কত মায়ের বুক খালি করেছে”
—”তবুও তার বাচ্চাগুলোর কি দোষ ছিল?”
সানা না চাওয়া সত্ত্বেও ঠুকরে কেঁদে উঠে,
—”ওই নিষ্পাপ দুটো বাচ্চা কেন তাদের মায়ের মুখটাও দেখতে পারল না? কেন? আপনি জানেন একটা বাচ্চার জন্য মায়ের মমতা কি?”
দিলরুবা খানমও তার সাথে কেঁদে ফেলেন,
—”আমি শুধু প্রতিশোধ চেয়েছিলাম…”
—”প্রতিশোধের নামে আপনি একটা পরিবার শেষ করে দিয়েছেন”
—”না, না, সুনেহনা….”

—”আপনি এই নামে আর আমাকে ডাকবেন না। আমি আপনাকে নিজের মায়ের জায়গা দিয়েছিলাম। আপনি জানেন আমি আপনাকে কতটা বিশ্বাস করতাম? আপনি জানেন আমি কতবার মনে করেছি, হয়তো আল্লাহ আমার জীবনে আরেকটা মা পাঠিয়েছে? অথচ আপনি… আপনি…”
কথা শেষ করতে পারল না সে, কান্নায় তার গলা জড়িয়ে আসছে। দিলরুবা খানমের চোখেও জল।
সত্যিই তো, স্বামী বীরজাদা খানমের মৃত্যুর পর, সুনেহনার লাশ দেখার পর, জীবনে প্রথমবার সে আবার কারও প্রতি এতটা মমতা অনুভব করেছিল। ‘সানা’ মেয়েটা তার শূন্য বুকের ভেতর আবার আলো জ্বালিয়েছিল।
চায়নায় সে তাকে নিজের সবচেয়ে গোপন আশ্রয়ে লুকিয়ে রেখেছিল। শুধু এই ভেবে, কেউ যেন তাকে কেড়ে নিতে না পারে। প্রতিটা রাত সে আতঙ্কে কাটিয়েছে এই চিন্তায় যে, আরজে যদি সানাকে খুঁজে পায়?
সানা যদি তাকে ছেড়ে চলে যায়?
আজ সেই ভয়টাই সত্যি হয়ে দাঁড়িয়েছে তার সামনে। সে আবার এগিয়ে এলো। কাঁপা হাতে সানার মুখ ছুঁতে গিয়ে বলল,

—”তুমি বুঝতে পারছ না, মা… আমি তোমাকে সত্যিই নিজের মেয়ে ভেবেছি… তোমার জন্য আমার ভেতরে….”
—”থামুন”
সানা এবার দুই হাতে তাকে সরিয়ে দিয়ে চোখ মুছে শক্ত কণ্ঠে আওড়ায় ল,
—”আপনার এই মায়া, এই ভালোবাসা সব মিথ্যে। যদি সত্যিই ভালোবাসতেন, তাহলে কখনো এমন করতেন না”
সানার এমন কঠিন বাক্যের তোপে দিলরুবা খানম যেন নিঃশ্বাস নিতে ভুলে গেলেন। সানা আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। এক দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে গেল। প্রচণ্ড বৃষ্টির মধ্যে ছুটে গিয়ে সোজা আরজের গাড়িতে উঠে পড়ল। দিলরুবা খানম তার পিছু নিতে গিয়েও থেমে গেলেন। কারণ ঠিক তখনই ফার্মহাউসের সামনে এসে থামল কয়েকটা সিআইডির গাড়ি। গাড়ির দরজা খুলে নেমে এলো এ.সি.পি তালহা আদিল, তার পাশে সিতারা আদিল। সাথে দিহান, আবু এবং আরও কয়েকজন সিআইডি অফিসার।
চারদিক মুহূর্তেই অস্ত্রধারী অফিসারদের দ্বারা ঘিরে ফেলা হলো। রায়ান ও বাকি বডিগার্ডরা অস্ত্র তুলতে যাচ্ছিল, কিন্তু দিলরুবা খানম হাত তুলে থামিয়ে দিলেন। ধীরে ধীরে তারা অস্ত্র নামিয়ে ফেলল। সিতারা এগিয়ে এসে ঠান্ডা গলায় শুধায়,

—”মিসেস দিলরুবা খানম, ইউ আর আন্ডার অ্যারেস্ট”
তালহা রায়ানকে ধরে ফেলল। বাকি অফিসাররা অন্যদের গাড়িতে তুলতে শুরু করে। প্রচণ্ড বৃষ্টির মধ্যে দিলরুবা খানমকে যখন গাড়ির দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, তখনও তিনি বারবার ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাচ্ছিলেন আরজের গাড়ির দিকে। তিনি গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে ডাকেন,
—”সুনেহনা, মা, তুমি আমাকে ভুল বুঝো না… প্লিজ… আমি তোমাকে ভালোবাসি…”
কিন্তু বিপরীতে গাড়ির ভিতরে বসে থাকা সানা দুই হাত দিয়ে নিজের মুখ চেপে ধরে কাঁদছে, হিচকি উঠছে বারবার। সে বুঝতেই পারছে না কেন তার চারপাশের পরিচিত মানুষগুলো একে একে এত অচেনা হয়ে যাচ্ছে, কেন প্রত্যেকটা মুখের আড়ালে লুকিয়ে আছে আরেকটা ভয়ংকর মুখোশ, প্রতিটা চেহারার পিছনে আরেকটা কদর্য রূপ লুকিয়ে। এদিকে পুলিশের গাড়িতে বসে থাকা দিলরুবা খানমের চোখ তখনও সানার দিকেই স্থির। তার নিজের গ্রেফতার হওয়া নিয়ে কোনো আফসোস নেই, কোনো অনুশোচনা নেই। কিন্তু বুকের ভেতর একটাই ভয় কুরে কুরে খাচ্ছিল তাকে। সানা কি তাকে ঘৃণা করবে?
সানা কি তাকে ছেড়ে চলে যাবে?
আবারও কি সে একা হয়ে যাবে?
“না… না…হঠাৎ মাথা নাড়তে লাগলেন তিনি,
—”সানা আমাকে ছেড়ে যাবে না…সুনেহনা….”
তার ঠোঁটে কাঁপা কাঁপা হাসি ফুটে উঠে, কিন্তু পরমুহূর্তেই সানার ঘৃণাভরা চোখদুটো আবার সামনে ভেসে উঠতেই তার বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠে। গাড়ি ধীরে ধীরে চলতে শুরু করেছে, বাইরে তখনও মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে। আর সেই বৃষ্টির শব্দে চাপা পড়ে যাচ্ছে এক ভাঙা মায়ের নিঃশব্দ আর্তনাদ।

এদিকে ফার্মহাউসের ভেতরের সেই ভারী নীরবতা যেন হঠাৎ করেই আরও ঘন হয়ে উঠল। বাইরের মুষলধারে বৃষ্টির শব্দ কাঁচের জানালায় আছড়ে পড়ে ভেতরের বাতাসকে আরও ভারী করে তুলছে। সবার বেরিয়ে যাওয়ার পর লিভিং রুমটা এক অদ্ভুত শূন্যতায় ডুবে গেল, শুধু রয়ে গেল দুই মানব, আরজে আর সারহাদ।
দুজনই এক মুহূর্তের জন্যও চোখ নামায় না, আবার ইচ্ছা করেও সরায় না দৃষ্টি। সেই দৃষ্টির মধ্যে কি আছে? হয়তো দীর্ঘ আঠারো বছরের চাপা রক্তক্ষরণ, প্রতিশোধ, অবিশ্বাস আর অপূর্ণ যুদ্ধ। পরক্ষণেই আরজে হঠাৎ বন্দুক তাক করে সারহাদের দিকে। সমস্ত নিস্তব্ধতা কাটিয়ে আরজে দাঁত কিড়মিড় করে প্রশ্ন করে,
–“তুই আমার ওয়াইফির দিকে সাত সেকেন্ড তাকিয়েছিলি… কেন?”
তার এমন অদ্ভুদ প্রশ্নে সারহাদ ঠোঁটের কোণে একগাল তাচ্ছিল্যের হাসি টেনে আনল। ধীরে ধীরে সেও পকেট থেকে বন্দুক বের করে আরজের দিকে তাক করে,

—”সাত সেকেন্ড মাই ফুট, আমি….”
সারহাদ নিজের বাক্য সম্পন্ন করার আগেই আরজে অগ্নি দৃষ্টি নিক্ষেপ করে তার কথা কেটে দন্ত পাটি পিষে আওড়ায়,
—”তোর ভাগ্য ভালো… ওইদিন তোর বাপ আমার পায়ে পড়েছিল, না হলে আমি তোকে সেদিনই শেষ করে দিতাম”
সারহাদ মাথা কাত করে তাচ্ছিল্যে করে বলল,
—”তোরও তো ভাগ্য ভালো… তোর বাপ আমার কাছে একটা প্রতিশ্রুতি চেয়েছিল। না হলে তোকে গায়েব করা আমার সাত সেকেন্ডের কাজ ছিল”
আরজে হঠাৎ সারা ঘর কাঁপিয়ে হেসে উঠে। তার সেই ঝং ধরা হাসি কি ভয়ংকর শোনাচ্ছে সেই নিস্তব্ধ কক্ষে তবে সারহাদ নির্বিকার। আরজে নিজের হাসি থামিয়ে ঘাড় কাত করে চোয়াল শক্ত করে হিসহিসিয়ে উঠে,
—”তাই নাকি? তাহলে শোন… আমি তোকে সাত সেকেন্ড দিলাম। পারলে আমাকে উড়িয়ে দেখা”
এই কথার পরই সারহাদের চোখ স্থির হয়ে গেল। সে ধীরে ধীরে ট্রি*গারে হাত রাখে। হঠাৎ তার কৃষ্ণকালো দৃষ্টিজোড়ায় অতীত ভেসে ওঠল।

ঠিক সেই আঠারো বছর আগের সেই অন্ধকার, জাওয়ান ম্যানশনের বেজমেন্ট, স্টিলের ভারী সাউন্ডপ্রুফ সেল, যেখানে একবার ঢুকলে বেরোনোর একমাত্র পথ ছিল সেই লকড দরজা যা শুধুমাত্র কোড দিলেই খোলে। সেই দিন সেই দরজার ভিতরে সোফিয়া আরজেকে “ম্যানবিস্ট” ড্রাগস ঘাড়ে পুশ করে দিয়ে ছেড়ে দিয়েছে। তারপরে একে একে সবাই বেরিয়ে পড়ে এবং সেই সেলের লোহার ভারী দরজাটা বন্ধ হয়ে যায়।
এদিকে আরজে, সেই ভয়ংকর ড্রাগসের প্রভাবে তার চোখের মণি বদলে গিয়েছিল রক্তে, শিরায় শিরায় আগুন ছুটছিল। তার সামনে পড়েছিল একটা নিথর দেহ, “ফাহাদ চৌধুরী” আর একটু দূরে সারহাদ। ঐ মুহূর্তে আরজের মধ্যে আর কোন মনুষ্যত্ব বেঁচে ছিল না পরিবর্তে সেখানে ছিল এক দানব যে রক্তের নেশায় বুদবুদ। দনব রূপী আরজে দুইদিকে ঘাড় নাড়িয়ে মটকা ফুটিয়ে সারহাদের দিকে তাকায়।

পরমুহূর্তে তার ওপর ঝাপিয়ে পড়ে। তার ধারালো নখের আঁচড়ে অচিরেই চিরচির করে ছিঁড়ে যায় সারহাদের দেহের চামড়া। বিপরীতে সারহাদ আটকানোর সময়টুকুও পায় না। এমনিতেই সে তার বাপ আর দাদাকে নিজের চোখের সামনে মরতে দেখে হতভম্ব হয়ে আছে। তার ওপর তার রক্তে ইনসমনিয়া থাকার কারণে সে নড়তেও পারছে না। ঘরের দেয়ালে ছিটকে যাচ্ছিল তার রক্ত। সারহাদ কিছুই বুঝে উঠতে পারছিল না, একদিকে শক, অন্যদিকে শরীরের অসহায়তা। প্রতিটা আঘাত যেন তার শরীর ভেঙে দিচ্ছিল। বিপরীতে আরজে এক মুহূর্ত থামছিল না বরং এক নরপশুর মতো, এক অবিরাম ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে সে। সারহাদ ছিটকে পড়ছিল দেয়ালে, আবার পড়ছিল মেঝেতে। তার শরীর থেকে রক্ত বের হচ্ছিল, কিন্তু তার চেয়েও বেশি বের হচ্ছিল অবিশ্বাস, একটা মানুষ এতটা হিংস্র হতে পারে কীভাবে। আরজে আবারও সারহাদ কে প্রহার করবে ঠিক ঐ মুহূর্তে সারহাদের তীব্র চিৎকারের কারণে হঠাৎ ফাহাদ চৌধুরীর চোখটা আধো আধো খুলে যায়। চোখের সামনে ছেলেকে এমন অবস্থায় দেখে তার শরীরে একফোঁটা শক্তি না থাকা সত্ত্বেও অর্ধমৃত শরীর নিয়ে পা টেনে হিচড়ে যেভাবে পেরেছে গিয়ে আরজের পা চেপে ধরে। নিচু স্বরে বহু কসরতে বের হয়,

—”থাম… থাম… প্লিজ…”
আরজে একবার নিচের দিকে তাকিয়ে তার পা আটকে আছে দেখে বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে এক ঝটকায় পা ছাড়িয়ে ফেলতেই ফাহাদ আবার ছিটকে পড়ে গেল। আরজে আবারও ঝাঁপিয়ে পড়ে সারহাদের ওপর। আবারও তার ধারালো নখের সাহায্যে ছিন্নভিন্ন করতে শুরু করে। সারহাদের গা থেকে ঝরে পড়া লাল রঞ্জিত রক্ত যেন তার মস্তিষ্ককে আরও বেশি পশুতে পরিণত করছে। সে দিক্বিদিক হারিয়ে আবারও আক্রমণ করতে যাবে, ফাহাদ চৌধুরী আবারও কোথা থেকে এসে তার পা টা একদম শক্ত করে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করতে থাকে,
—”ছাড় না, ছাড় না”
এই একই শব্দ বারবার প্রতিধ্বনিত হতে থাকে আরজের মস্তিষ্কে। ‘ছাড় না… ছাড় না’ আর সেই শব্দ আরজের মাথায় বিকৃত হয়ে ফিরে আসছিল। তার ভেতরের ড্রাগসে ভরা অন্ধকার মস্তিষ্কে শব্দটা বদলে যাচ্ছিল,
“সা… না… সা… না…”
সে ড্রাগসের কারণে বুঁদবুঁদ হয়ে থাকা সত্ত্বেও তার মস্তিষ্কে একটা ছোট বাচ্চার চেহারা খেলে যায়। একটা ছোট হাসিখুশি বাচ্চা মেয়ে, যে তার দিকে তাকিয়ে খিলখিল করে হাসছে।
আরজে মাথা নেড়ে আবারও রক্তচক্ষুতে তাকাতে ফাহাদ চৌধুরী আবারও এখনো চিৎকার করে,

—”ছাড় না, ছাড় না”
আর আরজের মাথায় আবারও সেই বাচ্চা মেয়েটা খেলে যায়, যে তার দিকে তাকিয়ে খিলখিলিয়ে হেসে হেসে বলছে,
—”তোমাকে একদম ভূতের মতো লাগছে”
পর মুহূর্তে আবছা আবছা ভেসে ওঠে আরেকটা দৃশ্য, যখন তার বাবা বলেছে, —”সানা মা, আরজেকে একটা চকলেট দাও”
তখন বাচ্চা মেয়েটা মুখটা গম্ভীর করে আরজের বাড়িয়ে রাখা হাতে চারটা চকলেট দেয়। আরজে সেই চকলেটগুলোর দিকে তাকিয়ে ছিল। কিন্তু পরমুহূর্তে সানার বাবা মোস্তাক খান বেরিয়ে যাওয়ার সাথে সাথেই সানা দৌড়ে এসে খপ করে আরজের হাত থেকে চকলেটগুলো নিয়ে চলে যায়। আরজে সেদিকে, সেই বাচ্চাটার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে।
হঠাৎ স্মৃতি ভেঙে গেল। সপ বর্তমানে ফিরে আসতেই তার শ্বাস ভারী হয়ে উঠল, তার হাত কাঁপতে শুরু করেছে, এদিকে ড্রাগসের প্রভাব ধীরে ধীরে কমছে। চোখের রক্তিমতা ফিকে হতে শুরু করেছে। সে এক মুহূর্ত থমকে গেল। চারপাশটা আবার দেখতে পেল নজরে আসে, রক্তাক্ত সারহাদ, অর্ধমৃত ফাহাদ, রক্ত। আর ঠিক তখনই তার মুখের সেই পশুসুলভ ভাব ধীরে ধীরে ভেঙে যেতে লাগল।

ড্রাগসের শেষ ধোঁয়াটে প্রভাবটা যখন আরজের শরীর থেকে ধীরে ধীরে সরে যেতে লাগল, তখন সে যেন হঠাৎই বাস্তবতার এক নির্মম দেয়ালে ধাক্কা খেল। তার দৃষ্টি ঝাপসা থেকে পরিষ্কার হলো। সে ধীরে ধীরে নিজের হাতের দিকে তাকায়, রক্ত। আঙুলের ফাঁকে শুকিয়ে জমে থাকা গাঢ় লাল রক্ত। সে ধীরে ধীরে মাথা নিচু করে নিজের শরীরটা দেখে। তার পোশাক রক্তে ভেজা, কিন্তু সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপারটা হলো, এই রক্ত তার নিজের নয়। তার ভেতরের কোনো অংশ খুব ভালো করেই জানে, এটা সে করেছে।
তার ডান পা এখনো আটকানো, ফাহাদ চৌধুরী অর্ধমৃত শরীর, তবুও এক অসীম জেদ নিয়ে তিনি আরজের পা দুটো শক্ত করে ধরে আছেন। তিনি এখনো চিৎকার করছেন,
—”তুমি আমার ছেলেকে মেরে ফেলবে… ছেড়ে দাও… ছেড়ে দাও ওকে…”
আরজে বিরক্ত আর ভেতরে ভেতরে অস্থির হয়ে সে পা নাড়ানোর চেষ্টা করল। কিন্তু ফাহাদ আরও শক্ত করে ধরে রাখল। আরজে নিচু গলায় শুধালো,

—”ছাড়ুন, আমি তাকে কিছু করব না”
কিন্তু বিপরীতে ফাহাদ মাথা নাড়ে,
—”না… না… তুমি মেরে ফেলবে… আমি দেখেছি… তুমি মেরে ফেলবে…”
আরজে চোখ বন্ধ করে ফের আওড়ায়,
—”আপনি ভুল দেখছেন, আমি ওকে ছেড়ে দিয়েছি”
—”না, তুমি মিথ্যা বলছ, তুমি তাকে মেরে ফেলবে”
আরজে এবার একটু ঝুঁকে পড়ে, তার কণ্ঠে দৃঢ়তা এনে বলল,
—”আমি বলছি, ছেড়ে দিয়েছি। আপনার ছেলে বেঁচে আছে”
ফাহাদ চৌধুরী এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেলেন। তিনি আবারও মাথা নাড়িয়ে বলেন,
—”না… না… তুমি তাকে শেষ করবে…”
আরজে এবার ধীরে ধীরে শ্বাস ফেলল। তার কণ্ঠে বিরক্তি নেই, আছে একধরনের ক্লান্ত আত্মসমর্পণ,
—”আমি ওকে ছেড়ে দিয়েছি। আপনি আমাকে বিশ্বাস করেন বা না করেন, সেটা আপনার ব্যাপার”
এই কথার পরেও ফাহাদ যেন বিশ্বাস করতে পারলেন না। তিনি ফিসফিস করে বলতে থাকলেন,
—”আমার ছেলে… আমার ছেলে…”
আরজে চোখ ঘুরিয়ে দরজার দিকে তাকায় নজরে আসে দরজায় সবুজ আলো টিমটিম করছে। তার মানে কেউ বাইরে থেকে কোড দিচ্ছে। সে বুঝে গেল আর সময় নেই। তার ভেতরের সব অস্থিরতা একসাথে চেপে বসল। সে আবার ফাহাদের দিকে তাকিয়ে বলে,

—”আপনি এখন আমাকে ছাড়ুন”
ফাহাদ মাথা নাড়েন,
—”না… না… তুমি মিথ্যা বলছ…”
আরজে ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করল। সে চাইলেই তাকে ঝটকা মেরে সরিয়ে দিতে পারে কিন্তু তা না করে বরং কঠোর গলায় শুধালো,
—”আমি কথা দিচ্ছি, আমি আপনার ছেলেকে মারব না, ছাড়ুন”
ফাহাদের চোখে তখন একধরনের ভাঙা বিশ্বাসের আলো ফুটে ওঠল। তিনি কাঁপতে কাঁপতে ফিসফিস করলেন,
—”তুমি… সত্যি বলছ?”
—”হ্যাঁ, আমি ওকে আঘাত করব না”
ফাহাদ আবার জিজ্ঞেস করলেন,
—”তুমি শপথ করছ?”
আরজে এক মুহূর্ত চুপ থেকে ধীরে ধীরে বলল,
—”আমি কথা দিলাম”

এইবার ফাহাদের হাত ধীরে ধীরে শিথিল হলো। তার শরীর পাশ ফিরে মাটিতে পড়ে গেল। তিনি নিঃশ্বাস হারানো এক ক্লান্ত মানুষের মতো নিস্তব্ধ হয়ে গেলেন। আরজে একবার তাকাল তার দিকে। পরমুহূর্তে সে নিজের শার্ট খুলে ধীরে ধীরে ফাহাদ চৌধুরীর নগ্ন শরীরের ওপর রাখল। তারপর ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল সারহাদের দিকে যে দেয়ালের পাশে আধশোয়া হয়ে আছে, নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে তার।
আরজে এক মুহূর্ত বিলম্ব না করে তাকে টেনে নিয়ে সেলের এক অন্ধকার কোণে লুকিয়ে রাখল। ঠিক তখনই ভারী দরজাটা খুলে ভেতরে প্রবেশ করল সোফিয়া জাওয়ান। তার সাথে আলী মির্জা, ওয়াসিম হায়দার, রনি হায়দার, সাজেদুল হক আরও কয়েকজন। ঘরে ঢুকেই তাদের চোখ প্রথমে চারদিকে ঘুরে সারহাদকে খুঁজল, কিন্তু সারহাদ নেই। সোফিয়ার চোখ সরু হয়ে এলো। সে চারদিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে,

—”সারহাদ কোথায়?”
আরজে ধীরে মাথা তুলে তারপর শান্ত গলায় প্রতুত্তর করে,
—”পালিয়ে গেছে”
এক মুহূর্ত পুরো সেল যেন থমকে গেল।সোফিয়ার মুখ শক্ত হয়ে গেল। সে বিস্ফোরিত কণ্ঠে গর্জে উঠে,
—”অসম্ভব, এই সেল থেকে কেউ বের হতে পারে না, কেউ না”
হঠাৎ কিছু একটা ভেবে তার চোখ সরু হয়ে গেল। তিনি সন্দেহ জনিত দৃষ্টিতে আরজের দিকে তাকিয়ে শুধালো,
—”তুমি মিথ্যা বলছ, তুমি পাসওয়ার্ড ব্যবহার করেছ, তাই না?”
আরজে কোনো উত্তর দিল না, শুধু মাথা নাড়িয়ে ‘হ্যাঁ’ বুঝায়। এই একটিমাত্র স্বীকারোক্তিই যেন আগুনে ঘি ঢেলে দিল।সোফিয়া হঠাৎ চিৎকার করে উঠল,
—”ইডিয়ট, তুমি জানো না তুমি কী করেছ”
তার মুখ লাল হয়ে উঠল রাগে, হাত পর্যন্ত কাঁপছে। ওয়াসিম হায়দার ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে তাচ্ছিল্যের স্বরে বলল,

—”সোফিয়া, এই তোমার ছলে, একদম ‘পারফেক্ট অস্ত্র”
আলী মির্জা তাচ্ছিল্যে যোগ করল,
—”মনে হয় ট্রেনিং একটু কম হয়ে গেছে”
সোফিয়ার চোখ আরও লাল হয়ে উঠল। সে হঠাৎ চিৎকার করে উঠল,
—”গার্ড…”
মুহূর্তে কয়েকজন গার্ড ছুটে এল তড়িঘড়ি করে,
—”চাবুক মারো ওকে”
এক মুহূর্তে ঘর থেমে গেল। ওয়াসিম আর আলী মির্জার হাসি মুছে গেল। তবে কেউ কিছু বলল না। গার্ডরা সোফিয়ার আদেশ মতো এগিয়ে গেল। আর পরের মুহূর্তেই চাবুকের প্রথম আঘাত পড়ল আরজের পিঠে।
আরজের শরীর কেঁপে উঠল একবার, কিন্তু কণ্ঠ থেকে কোনো শব্দ বের হলো না। সে দাঁতে দাঁত চেপে দাঁড়িয়ে রইল চুপচাপ। এদিকে একের পর এক চাবুকের আঘাত হানতে থাকে তার পিঠে। রক্ত ধীরে ধীরে তার পিঠ বেয়ে নামতে লাগল। শেষে সে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না, হাঁটু ভেঙে মাটিতে বসে পড়ল। কিন্তু তবুও একটা শব্দও না। সোফিয়া তখনি হাত তুলে থামিয়ে দিল। সে দন্ত চেপে বলল,
—”এভাবেই থাকবে”
তারপর ঘুরে বলল,
—”সারহাদকে খুঁজে আনো, আর ওকে শেষ করো”

এই বলে সে বেড়িয়ে পড়ে তার পিছু পিছু সবাই ও চলে গেল। সেলে আবারও নীরবতা ফিরে এল, শুধু রক্ত, শ্বাস, আর ভাঙা শরীর। আরজে ধীরে মাথা নিচু করে বসে আছে। ঠিক তখনই পিছনের কোণ থেকে সারহাদ
ধীরে ধীরে ভাঙা শরীর নিয়ে বেরিয়ে এলে। সে একপলক আরজে কে দেখে অতঃপর তার বাবার দিকে ছুটে গেল। ফাহাদ কে কোলে নিয়ে বিচলিত কণ্ঠে ডেকে ওঠে,
—”ড্যাড, ড্যাড, প্লিজ গেট আপ”
সে বারবার ফাহাদ চৌধুরীর নিথর শরীরটাকে নাড়িয়ে ডাকছে কিন্তু বিপরীতে কোন শব্দ নেই। কিয়ৎকাল পর বহু কসরতে টেনে টেনে ফাহাদ চৌধুরী চোখ খুলে। তিনি একপল আরজে কে দেখে তারপর রক্তে ভেজা কণ্ঠে সারহাদ কে বলল,

—”তোমাকে… ওর রক্তের… দাম চুকাতে হবে…”
অতঃপর একটা শেষ নিশ্বাস, ছেড়ে চলে যান এই স্বার্থপর পৃথিবী, যেখানে বন্ধু নামক কালসাপ দের হাতেই তার শেষটা হয়। এদিকে সারহাদ গলা ছিঁড়ে তার বাবাকে ডাকতে শুরু করে। সে ছোট বাচ্চাদের মতো হাউমাউ করে কাঁদতেও শুরু করল। কিছুক্ষণ এভাবে কেটে যায়। ধীরে ধীরে সে ঘুরে আরজের দিকে তাকায় যে এখনো মাথা নিচু করে বসে আছে, একেবারে স্থির ভাবে। তার দৃষ্টি নিচের মেঝেতে স্থির হয়ে আছে, যেন নিজের ভেতরের কোনো অদৃশ্য গহ্বরের দিকে তাকিয়ে আছে। রক্তে ভেজা শরীর, ছিন্নভিন্ন পোশাক, আর ক্লান্ত চোখ সবকিছু মিলিয়ে তাকে মানুষের চেয়ে বেশি কিছু মনে হচ্ছিল কোনো যুদ্ধ থেকে ফেরা এক নিঃশব্দ ধ্বংসস্তূপ।
তার পাশে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে সারহাদ।
আরজে ঠিক তখনই হঠাৎ সে মাথা তোলে। এক মুহূর্তেই পুরো পরিবেশ বদলে যায়। আরজের রক্তাভ, গভীর, ঠান্ডা বাদামী চোখজোড়া দেখে সারহাদ পিলে চমকে পিছিয়ে যায় এক কদম। তার বুকের ভেতর ধাক্কা লাগে। মনে হয়, এই মানুষটার চোখে তাকানো মানে নিজের ভিতরের সব দুর্বলতা উন্মোচন করা। সারহাদের একটা শুকনো ঢোক গিলে তার ভেতরের ভয়টা চাপা দিয়ে সে কাঁপা কাঁপা গলায় বলে,

—”রক্তে ভয় করে না তোমার?”
আরজে ধীরে ধীরে তার দিকে তাকায় একটু সময় নিয়ে তারপর একেবারে নিচু, ভারী কণ্ঠে বলে,
—”রক্ত আমার নেশা”
বলেই আবারও দৃষ্টি নামিয়ে নেয়। সারহাদ এক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে থাকে। তার চোখ আরজের পিঠের দিকে যায় যেখানে গভীর চাবুকের দাগ, ছেঁড়া মাংস, শুকনো রক্তের স্তর। তার মুখ কুঁচকে যায়। সে ধীরে ধীরে আরজের পাশে বসে হালকা হেসে বলে,
—”তুমি কি সবসময় এমনই থাকো?”
আরজে কোনো উত্তর দিল না। সারহাদও আর কিছু বললো না। শুধুই নীরবতা, এই নীরবতা রাত থেকে দিন, দিন থেকে রাত বয়ে নিয়ে যায়। সেই সেলেই একটা দিন কেটে যায়। না কোনো খাবার আসে, না কোনো শব্দ। শুধু সময় নিজের ভার নিয়ে চলে যায়। পরদিন ভোরে সবুজ আলোটা টিমটিম করে জ্বলে ওঠে আবার। আরজে চোখ তোলে তাকিয়ে সারহাদের দিকে একটুখানি ইশারা করে। সারহাদ দ্রুত দেয়ালের আড়ালে সরে যায়। কিন্তু এবার দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করে, ইকবাল জাওয়ান। ইকবাল কাল রাতে নিজের লোকেদের মাধ্যমে খবর পেয়েছে আরজেকে সোফিয়া আবারও বদ্ধ সেলে আটকে রেখেছে। এটা শোনামাত্রই সে রাতে রাতেই দেশের মধ্যে চলে আসে এবং আজকের সকালবেলায় বেজমেন্টে আসে।
তার চোখ প্রথমেই আরজের দিকে পড়ে। আর সেই মুহূর্তেই তিনি থমকে যান। তিনি আতঙ্কিত হয়ে এক দৌড়ে এগিয়ে আসেন,

—”আরজে, তুমি কী অবস্থা করেছো নিজের?”
তার চোখ আরজের রক্তাক্ত পিঠ, ভাঙা শরীর দেখে কেঁপে ওঠে,
—”এভাবে… তোমার সাথে…”
তার কণ্ঠ ভেঙে যায়। একজন বাবা নিজের ছেলেকে এমন অবস্থায় দেখে আর নিজেকে সামলাতে পারেন না। আরজে ধীরে ধীরে মাথা তোলে কিছুনা বলে শুধু পিছনে তাকিয়ে ইশারা করে। সারহাদ অন্ধকার থেকে এগিয়ে আসে। ইকবাল তাকে দেখে এক মুহূর্তে চমকে যান। তার চোখ বড় হয়ে যায়। কিন্তু আরেক মুহূর্তেই তিনি দূরে পড়ে থাকা ফাহাদ চৌধুরীর নিথর দেহ দেখে তার মুখ শক্ত হয়ে যায়। একটা ভারী নিঃশ্বাস বেরিয়ে আসে। আরজে শান্ত গলায় বলে,
—”ড্যাড, ওকে বের করে নিয়ে যাও”
ইকবাল মাথা নেড়ে সারহাদের দিকে তাকান,
—”তুমি…”
আরজে একগাল হেসে তিক্ত স্বরে আওড়াল,
—”মম, একটু পর এসে নিজেই নিয়ে যাবে”

ইকবাল আর কথা বাড়াল না। সে ঐ মুহূর্তেই সারহাদ কে নিয়ে বেড়িয়ে পড়ে।
ইকবাল সারহাদ কে সবার আড়ালে বের করে তাকে নিয়ে আসে খুশদিল ফারুকীর বাড়িতে। তিনি কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থাকেন। ইকবাল ফাহাদ চৌধুরী ও আজাদ চৌধুরীকে খুব ভালো করেই জানেন এবং চৌধুরীদের রক্ত কতটা ভয়ংকর, সে সবকিছুই তিনি অনুমান করতে পেরে হঠাৎ সারহাদের হাত ধরে তাকে বলে,
—”তুমি জানো, আজকে তোমাকে বাঁচানোর জন্য আমার ছেলে নিজের রক্ত ঝরিয়েছে। আজ ওই চার দেয়ালের বদ্ধ সেল থেকে তোমার লাশ বের করতে হতো”
সারহাদ মাথা ওপর-নিচ নাড়িয়ে বোঝায় হ্যাঁ।
ইকবাল জাওয়ান মনে মনে কিছু একটা ভেবে সারহাদের দিকে তাকিয়ে ফের বলে,
—”আমি আশা করব ভবিষ্যতে তুমি আমার ছেলের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার আগে হাজারবার তার রক্তের কথা ভাববে, তার দেওয়া রক্তের কথা ভাববে”
সারহাদ ধীরে মাথা নেড়ে বলে,
—”আমি তার রক্তের ঋণ আমি ভুলব না”
ইকবাল দীর্ঘশ্বাস ফেলে তারপর চলে যান।

হঠাৎ সারহাদ চোখ খোলে বাস্তবে ফিরে আসে। সব স্মৃতি ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়। সে অতীত থেকে বেরিয়ে এসে সামনে তাকাতেই দেখে আরজের ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি। দেখে সে ধীরে ধীরে নিজের বন্দুকটা নামিয়ে ফেলে। সারহাদ একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আরজের দিকে হ্যান্ডশেকের জন্য হাত বাড়িয়ে দেয় শেষবারের জন্য, কেননা সে আজ রাতের ফ্লাইটে ফিরে যাচ্ছে ইতালি। আরজে এক পলক তার হাতের দিকে তাকিয়ে নাক সিটকিয়ে অন্যদিকে তাকায়। তারপর তার দিকে হাত বাড়িয়ে হঠাৎ মাথার চুল ব্রাশ করে ফেলে। এতে সারহাদ ভীষণ অপমানিত বোধ করলেও দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করে দাঁত কিড়মিড়িয়ে বলে,

—”ভাগ্যিস তুই হাত মিলাসনি। না হয় তোর সাথে হাত মিলানোর পর দশটা টিস্যু দিয়ে হাত পরিষ্কার করতে হতো আমাকে”
আরজে তার দিকে রক্তচক্ষু নিক্ষেপ করে। সেও তার মতো দাঁত কিড়মিড় করে বলে, —”হাত মিলানো তো দূরের কথা, তোকে দেখলে আমার দশটা হ্যান্ডওয়াশ দিয়ে শাওয়ার নিতে হয়”
সারহাদ বিপরীতে আর কিছু বলবে, তার আগে আরজে বাঁকা হেসে আবারও বলে,
—”আরে, বউটা আমার একা বসে আছে। আর আমি এখনে তোর সাথে ফালতু বকে টাইম নষ্ট করছি, দূর। দেখি গিয়ে কতটা মিস করছে আমাকে। বুঝতেই তো পারিস, আমাকে ছাড়া কিছুই বোঝে না ও। যেখানেই যায় শুধু রানভীর, রানভীর, রানভীর করে”
এদিকে সারহাদ দাঁত কিড়মিড় করে তার সবটা সহ্য করে নেয়। তার এমন মনে হচ্ছে কেউ তার কাটা গায়ে নুন ছিটিয়ে দিয়েছে। আরজে শেষবারের মতো তার দিকে তাকিয়ে বাঁকা হেসে মুখে শিস বাজিয়ে পকেটে হাত ঢুকিয়ে চলে যায় গাড়ির দিকে। সারহাদের ঠোঁটের কোণে একটা তাচ্ছিল্যের হাসি চলে আসে। বাইরে বেরোতে গিয়ে দেখে আরজের গাড়ি ততক্ষণে চলে গেছে। তবে সে যাওয়ার আগ পর্যন্ত তাকিয়ে থাকে।

বৃষ্টি তখনও থামেনি, আকাশ যেন নিজের সমস্ত ভার নামিয়ে দিয়েছে পৃথিবীর বুকের উপর। ভারী ফোঁটাগুলো পড়ছে এমন শব্দে, যেন কেউ অদৃশ্য হাতে বারবার দরজায় কড়া নাড়ছে। চারপাশে কাদা, ভেজা পাথর, আর ধোঁয়াটে আলো সব মিলিয়ে পরিবেশটা এক অদ্ভুত বিষণ্ণতার চাদরে ঢেকে আছে। দিলরুবা খানমের বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা প্রশস্ত প্রাঙ্গণটাও এখন রীতিমতো জলমগ্ন। এই বৃষ্টির মাঝখানে সারহাদ দাঁড়িয়ে আছে, একেবারে একা। তার শরীর ভেজা, কিন্তু সে টের পাচ্ছে না। চোখ স্থির, সামনে কোথাও নয় বরং যেন নিজের ভেতরের কোনো দূরবর্তী শূন্যতায় আটকে আছে। ঠিক তখনই তার পাশে কারো উপস্থিতি অনুভব হয়। সে ধীরে ধীরে পাশে তাকায় নজরে আসে সিতারা।
এক মুহূর্তের জন্য সারহাদের চোখে সামান্য বিস্ময় ফুটে ওঠে। তবে সে কিছু বলল না বরং সিতারা নিজেই বলে,
—”আমাদের টিম এখনো পুরো বাড়ি সার্চ করছে”
সারহাদ আবারও সামনে তাকায়। একটু নীরবতার পর সিতারা ধীরে বলে,

—”আপনি সত্যিই চলে যাচ্ছেন”
সারহাদ মাথা ঘোরায় না। শুধু বলে,
—”হুম, আজ সব শেষ। এরপর আর কিছু থাকবে না”
সিতারা ভেতরে ভেতরে কেঁপে ওঠে,
—”মানে?”
সারহাদ এবার তার দিকে তাকায়। তার চোখে কোনো কোমলতা নেই। সে নিরেট কণ্ঠে শুধালো,
—”আমি ইতালি ফিরে যাচ্ছি। সব কিছু এখানেই শেষ করে”
এই কথাটা যেন সিতারার বুকের ভেতর একটা শূন্যতা তৈরি করে। তার ঠোঁট নড়ে ওঠে, কিন্তু শব্দ বের হয় না। সে কিছু বলতে চায় কিন্তু শব্দগুলো হারিয়ে যায় বৃষ্টির শব্দে। তার ভাবনার মধ্যেই সারহাদ আবারও বলে,
—”আমি আশা করব, আপনি সব ভুলে নতুন জীবন শুরু করবেন”
এই কথাটা যেন সবচেয়ে ভারী, সবচেয়ে নিঃশব্দ আঘাত হানল সিতারার বুকে। সে আর কিছু বলবে তার আগেই এজাজ গাড়ি নিয়ে আসে আর সারহাদ চলে যায়। এদিকে সিতারার কাছে যেন হঠাৎ পৃথিবীর সব শব্দ বন্ধ হয়ে গেছে। তার চোখ গাড়ির শেষ আলোটুকুর দিকে স্থির। তারপর হঠাৎ সে হাঁটু গেড়ে ধীরে ধীরে মাটিতে বসে পড়ে। বৃষ্টি তার মুখে পড়ছে, চুলে পড়ছে, কাঁধে পড়ছে কিন্তু সে নড়ছে না। তার ভেতরে যেন সব কিছু ভেঙে গেছে, সব শক্তি শেষ। তার কণ্ঠ ভেঙে, কাঁপতে কাঁপতে বেরিয়ে আসে,

—”আমাকে যদি জিজ্ঞেস করা হতো পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কাজ কোনটি…আমি বলতাম… কাউকে ভুলে যাওয়া”
তার চোখ বেয়ে পানি মিশে যায় বৃষ্টির সঙ্গে,
—”সাদ…আপনাকে ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করতে করতে আমি আপনাকেই আরও গভীরভাবে ভালোবেসে ফেলেছি। যতবার দূরে যেতে চেয়েছি… ততবার মনে হয়েছে আমি আরও আপনার কাছে চলে আসছি। এখন বলুন… আমি কী করব?
কিভাবে আপনাকে ভুলে যাব?”

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৩১ (২)

তার কণ্ঠ ভেঙে যায় পুরোপুরি। পরমুহূর্তে কিছু একটা ভেবে তার ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে ওঠে,
—”ওহ… আপনি তো বলেছিলেন আমাকে ভুলে যেতে…কিন্তু আমি তো পারছি না…আমি তো পারছি না…”
সে কাঁদতে থাকে অঝোরে। হঠাৎ তার কাঁধে কারো হাত অনুভূত হতেই সে চমকে উপরে তাকায়। আর চোখের সামনের ব্যক্তিকে দেখে এক মুহূর্ত জমে যায়। সে আর কিছু না ভেবে তড়িঘড়ি করে উঠে তাকে জড়িয়ে ধরে। তার কণ্ঠ থেকে কাঁপা কাঁপা স্বরে বের হয়,

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৩২