Home হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৭

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৭

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৭
সাবা খান

রাত তখন আরও ঘন হয়ে উঠেছে। নিচের হলরুমে পার্টি এখনো তুঙ্গে। ঝলমলে আলো, সুরেলা মিউজিক আর মানুষের কোলাহলে ভরে আছে পুরো ‘অরোরা গ্র্যান্ড পাভিলিয়ন’ হাসি, গ্লাসের ঠোকাঠুকি, ব্যবসার গোপন আলাপ আর ক্যামেরার ফ্ল্যাশ সব কিছু মিলিয়ে। কিন্তু এই ঝলমলে পার্টির ভেতরেই চলছে আরেকটা অদৃশ্য একটা লুকোচুরি।
ঈশানী দ্রুত ভিড়ের মধ্যে দিয়ে হাঁটছে। তার চোখ চারদিকে ঘুরছে, কোনমতে আরজের লোকেরা যেন তাকে না দেখে, কেউ যেন তাকে না ধরে।
সে দ্রুত হাঁটতে হাঁটতে একটা কর্নার ঘুরতেই হঠাৎ কারও সাথে ধাক্কা খায়। সে মাথা তুলে মুখ থেকে বিরক্ত সূচক শব্দ বেরুবে তার আগেই চোখ বড় হয়ে গেল। কেননা সামনে দাঁড়িয়ে আছে জ্যাক, যে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। ঈশানীর বুক ধক করে উঠল।
এক সেকেন্ডের জন্য সে স্থির হয়ে গেল তারপর নিজের অজান্তেই হঠাৎ দুহাত নেড়ে দ্রুত বলে উঠে,

-“আমি সানাকে চিনি না..”
জ্যাক ভ্রু কুঁচকে তাকায়। কিন্তু বিপরীতে ঈশানী থামল না। সে বলতেই থাকে,
-“সানা কোথায় আমি জানি না, আমি এখানে ওর সাথে আসিনি, আমি ওকে দেখিনি, আমি কিছুই জানি না”
রমণীর ব্যবহারে জ্যাকের যা বুঝার সে বুঝে নিল। জ্যাক ধীরে ধীরে মাথা কাত করে ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত হাসি ফুটিয়ে বলে,
-“মিস ঈশানী শাহ, আমি তো আপনাকে কিছু জিজ্ঞেসই করিনি”
ঈশানী মুহূর্তে থেমে গেল। তার মুখটা এক সেকেন্ডের জন্য ফ্যাকাশে হয়ে গেল। নিজের ভুলের কারণে নিজেকে থাপড়াতে ইচ্ছা করছে। সে একটা ফাঁকা ঢোক গিলে তোতলাতে লাগে,
-“ইয়ে… মানে… আমি আসলে…আমি… আমি এখানে ফ্যাশন শো দেখতে এসেছি। মানে… আমি তো এখন ওয়ার্ল্ড ট্যুরে আছি।
সে হাত নাড়িয়ে বলে,

-“বিভিন্ন দেশের কালচারার ইভেন্ট, ফ্যাশন ইভেন্ট এসব কভার করছি”
জ্যাক হাত গুটিয়ে দাঁড়ায়, তার চোখে সন্দেহ স্পষ্ট,
-“রিয়েলি?”
ঈশানী তাড়াতাড়ি বলে,
-“হ্যাঁ, তুমি জিজ্ঞেস করবে ভেবেই আমি আগে বলে দিলাম”
জ্যাক কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে বলে,
-“ইন্টারেস্টিং”
ঈশানী বুঝলো না তার এটা বলার মানে তাই ভুরু কুঁচকে বলে,
-“কি?”
-“কারণ আমি আসলে শুধু বলতে যাচ্ছিলাম আপনি আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন”
মুহূর্তে ঈশানী ওহ বলে সড়ে দাঁড়ায়। জ্যাক তার পাশ কাটিয়ে সামনে যেতে যেতে কানে থাকা ইয়ারপিসে বলে,

-“বস, মনে হচ্ছে, ম্যামের সাথে মিস ঈশানীও ছিল”
এদিকে ঈশানী একটা স্বস্তির নিশ্বাস ছাড়ে।
ঠিক তখনই সামনে থেকে আরেকজন এসে দাঁড়ায়, ঈশানীর পা থেমে গেল। সামনে দাঁড়ানো মানুষটাকে দেখে সে এক মুহূর্তের জন্য ভ্রু কুঁচকাল। কিন্তু লোকটা, সে যেন স্থির হয়ে গেছে। তার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেছে।
সে বিশ্বাসই করতে পারছে না সামনে যাকে দেখছে তাকে একপলক দেখার জন্য সে গত ছয় বছর চটপট করেছে। তার বুকের ভেতর যেন হঠাৎ ঝড় বয়ে গেল। আজ তার চোখের সামনে এখন সেই মেয়েটা দাঁড়িয়ে আছে ঈশানী। কিন্তু ঈশানী যেন ততটা গুরুত্ব দিল না। সে হালকা ভ্রু তুলে একটা ছোট্ট হাসি দিল বলে,

-“ওহ… হাই, রওনাক”
রওনাক স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখে এখনো অবিশ্বাস। ঈশানী ঘড়ির দিকে তাকিয়ে তড়িঘড়ি করে বলে,
-‘ওকে… আই হ্যাভ টু গো”
রওনাক তাড়াতাড়ি বলে,
-“ওয়েট, ঈশানী… ”
কিন্তু বিপরীতে রমণী থামল না। সে ভিড়ের মধ্যে ঢুকে গেল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সে মানুষের ভিড়ের মধ্যে মিলিয়ে গেল।
রওনাক যেন এখনো বিশ্বাস করতে পারছে না। সে ধীরে ধীরে চারদিকে তাকাতে লাগল,
-“ঈশানী…”
সে দ্রুত ভিড়ের মধ্যে হাঁটা শুরু করে, তার চোখ চারদিকে খুঁজছে। মনে হচ্ছে যেন হারিয়ে যাওয়া কিছু ফিরে পেয়েছে, আবার হারিয়ে ফেলেছে। ঠিক তখনই, তার ফোন বেজে উঠে। সে পকেট থেকে ফোন বের করে স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই তার ভ্রু কুঁচকে গেল।
কলটা কেটে দিতেই দুই সেকেন্ড পরে আবার ফোন বেজে উঠল। সে বিরক্ত হয়ে ফোনটা কানে তুলে,
-“আই উইল কল ইউ ব্যাক”
বিপক্ষে ব্যক্তিকে কিছু বলতে না দিয়ে
সে কলটা কেটে দিল। ফোনটা আবার পকেটে ঢুকিয়ে, তার চোখ আবার ভিড়ের মধ্যে খুজতে শুরু করে কাঙ্ক্ষিত রমণীকে।

পার্টির এই ঝলমলে রাতের মধ্যেও সানার ভিতরটা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়া এক নিঃশব্দ অন্ধকার। কিছুক্ষণ আগে থেকেই তার বুকের ভেতরটা যেন ভারী হয়ে উঠছিল। চারপাশের মানুষের হাসি, আলো, সুর সবকিছু তার কাছে অসহ্য লাগছিল। তাই সে ধীরে ধীরে ভিড় এড়িয়ে সোজা চলে আসে পাভিলিয়নের বিলাসবহুল ওয়াশরুমের দিকে।
সানা বাথরুমে ঢুকে দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করে দেয়। দরজায় পিঠ ঠেকিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে সে। তার বুকটা যেন খুব জোরে ওঠানামা করছে। একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে তারপর ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে বেসিনের সামনে দাঁড়ায়। তার চোখদুটো লালচে হয়ে আছে। মাথার ভেতর বারবার ঘুরে বেড়াচ্ছে আরজের বলা কথাগুলো। রমণী ধীরে ধীরে বেসিনের সামনে এসে দাঁড়ায়। মাথাটা নিচু করে হাত দুটো শক্ত করে বেসিনের ধারে রাখা। আর তখনই ভেতরে জমে থাকা সেই অনুভূতিগুলো হঠাৎ করে ঝড়ের মতো উঠে আসে। মনে পড়ে সেই সকাল, সেই কাগজটা
‘ডিভোর্স পেপার’ যেটা সে ভুলার অনেক চেষ্টা করেছে কিন্তু ভুলতে বরাবরই অক্ষম হয়েছে।
তবে সে বিশ্বাস করছিল, আরজে সাইন করবে না। এটা মনে পড়তেই সানার বুকের ভেতরটা যেন আবার ছিঁড়ে যায়। সে হঠাৎ করে দুই হাত দিয়ে নিজের মুখ চেপে ধরে। ভিতরের যন্ত্রণা গুলো বেরিয়ে আসতে চাইছে কিন্তু সে মরিয়া হয়ে সেটা আটকাতে চাইছে। নিজেকে মনে মনে বোঝায়,

-“না… না… এখানে না”
তার হাত কাঁপছে, কিছুপলের নিঃশব্দ লড়াই, তারপর সে তাড়াতাড়ি বেসিনের কল খুলে মুখে পানি ছিটিয়ে ধীরে ধীরে মাথা তোলে। ঠান্ডা পানির ফোঁটা তার গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে। সে গভীর শ্বাস নিয়ে, নিজেকে সামলে নিতে চায়। এই পার্টিতে আসার সিদ্ধান্তটাই ভুল ছিল, ‘এখন সেটা আরও স্পষ্ট লাগছে’
সে চোখ তুলে আয়নার দিকে তাকায়। আর ঠিক তখনই তার বুকের ভেতরটা ধক করে ওঠে কেননা আয়নায় তার নিজের প্রতিচ্ছবির ঠিক পিছনে দাঁড়িয়ে আছে এক মানব। দুই হাত বুকে আড়াআড়ি ভাবে বেঁধে রাখা, তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আরজে। সানার আঙুলগুলো বেসিনের ধারে শক্ত হয়ে যায়। এক মুহূর্তের জন্য তার মনে হয় শরীরটা জমে গেছে। কিন্তু পরের মুহূর্তেই সে দ্রুত নিজের ভেতরের সব অস্থিরতা চাপা দিতে চেষ্টা করে। একটা শুকনো ঢোক গিলে ধীরে ঘুরে দাঁড়ায়। ঠোঁটের কোণে জোর করে একটা ভদ্র হাসি এনে বলে,

-“মিস্টার জাওয়ান, আপনি এখানে?”
আরজের দিক থেকে কোনো প্রত্যুত্তর আসে না। সে শুধু ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে আসে। তার চোখের দৃষ্টি এতটাই গভীর যে মনে হচ্ছে যেন সানার মুখের ভেতর দিয়ে সরাসরি তার আত্মাটা পড়ে ফেলতে চাইছে। কিন্তু ঠোঁটের কোণের বাঁকা হাসি তা বুঝতে দিতে অক্ষম। দেখেই বুঝা যাচ্ছে সে ভিতরের রাগটাকে কতটা সংবরণ করে রেখেছে। কিছু সেকেন্ড চুপ থেকে সে বলে,
-“ইন্টারেস্টিং….”
সানা বুঝল না তার কথার মানে তাই সে ভ্রু কুঁচকে তাকায়। আরজে ফের বলে,
-“আমি ভাবছিলাম হয়তো চোখ ভুল দেখছে”
সে আরও এক পা এগিয়ে আসে রমণীর দিকে। ঠান্ডা স্বরে আওড়ায়,
-“কিন্তু এখন কাছে এসে দেখছি, ভুল না”
সানা আরেকটু পিছনে গিয়ে স্বাভাবিক গলায় বলে,
-“আমি বুঝতে পারছি না আপনি কি বলতে চাইছেন”
আরজে হালকা হেসে ঘাড় কাত করে তার পা থেকে মাথা পর্যন্ত তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করে বলে,
-“হাউ ইজ দিস পসিবল?
আপনি আর আমার ওয়াইফ…সরি এক্স ওয়াইফ কিভাবে এতটা একরকম হতে পারেন?”

আরজের মুখ থেকে এই এক্স ওয়াইফ শব্দটা শুনা মাত্রই সানার মনে হলো যেন কেউ বুকের ভেতর ছুরি ঘুরিয়ে দিল। তবুও সে মুখে তার ছিটেফোঁটাও প্রকাশ হতে দেয় না, শুধু নিষ্প্রভ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। আরজে এবার হাত বাড়িয়ে রমণীর পেলব গালে বুলায়। সাথে সাথে সানা তার হাতটা সরানোর আগেই আরজে দুই হাতে তার গাল চেপে ধরে ঠোঁটে হাসি টেনে বলে,
-“ঠিক আমার ওয়াইফের মত…”
সানা দ্রুত তার হাত সরিয়ে দেয়। কিন্তু বিপরীত পাশের মানব থামে না, সে এবার তার নাক, গলা, চোখে হাত রেখে বারবার বলছে,
-“একদম সেম….এই চোখ, এই ঠোঁট”
রমণী বিরক্ত হয়ে এক ঝটকায় তার হাত সরিয়ে শক্ত কণ্ঠে শুধালো,
-“মিস্টার জাওয়ান, প্লিজ”
কিন্তু আরজে যেন শুনছেই না। সে যেন এসব কাজে আরও বেশি আনন্দ পাচ্ছে। আরজে আবারও সানাকে একটানে নিজের কাছে নিয়ে এসে তার কেশবে মুখ ডুবিয়ে দিল। মুহূর্তে সেই কাচা গোলাপের সুবাস পৌঁছে গেল তার নাসারন্ধ্র বেদ করে। সানা তড়িঘড়ি করে সরে গেল। আরজে তারদিকে ঝুঁকে ফিসফিস করে,

-“সেম স্মেল….”
সানা আবারও তাকে হাত দিয়ে সরিয়ে দেয়।নিজেকে শক্ত করে বলে,
-“পৃথিবীতে একরকম দেখতে সাতজন মানুষ থাকে। হয়তো সেটা আপনি ভুলে গিয়েছেন”
-“আচ্ছা তাই নাকি? মনে হচ্ছে আপনি সিনেমা একটু বেশি দেখেন”
সানার তরফ থেকে কোন শব্দ এলো না। কিন্তু ভেতরে তার হৃদস্পন্দন এত দ্রুত চলছে যেন বুক ফেটে বেরিয়ে আসবে। আরজে আবারও বিভিন্ন প্রশ্ন করতে থাকে, পুরোনো স্মৃতির কথা বলতে থাকে। আর সানা বারবার সেগুলো এড়িয়ে যায়। কিন্তু তার কণ্ঠে সামান্য নার্ভাসনেস স্পষ্ট। সে ধীরে ধীরে পিছিয়ে যেতে থাকে। একসময় তার পিঠ বেসিনে ঠেকে যায়। আরজে এখন একদম কাছে এতটা যে তার প্রতিটা গরম নিঃশ্বাস সানার মুখে লাগছে। সানা চারদিকে তাকিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজছে। ঠিক তখনই তার কানে আসে পুরুষালী ভারী কণ্ঠস্বর,

-“মিসেস জাওয়ান…”
মুহূর্তে সানা চোখ তুলে তার দিকে তাকায়, সাথে সাথে আরজে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে,
-“সরি… মিস খানম, লেট মি চেক ওয়ান মোর থিং, আমার ওয়াইফের বাম কাঁধে একটা তিল ছিল”
সানার বুক ধক করে ওঠে, তার চোখ স্থির হয়ে যায় আরজের উপর। আরজে ফের বলে,
-“আমি সেটা দেখতে চাই”
সানা তৎক্ষণাৎ নিষেধ করে দিল,
-“নো, মিস্টার জাওয়ান…”
কিন্তু আরজে তার একটা কথাও শুনল না। সে অনুমতির তোয়াক্কা না করে একটানে তার ড্রেসের উপরে কোট খুলে ফেলে। সানার পোশাকটা অফ শোল্ডার হওয়ার দরুন তার উন্মুক্ত কাঁধ পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। আরজে ঝুঁকে পড়ে সেখানে, মন দিয়ে খুঁজতে থাকে। কিন্তু নজরে আসে সেখানে কোন তিলের চিহ্নও নেই। মুহূর্তে তার চোয়াল শক্ত হয়ে যায়,

-“এখানেই তো ছিল…”
সে আবার তাকায়। চোখ প্রায় উন্মত্তের মতো খুজতে থাকে যেন কোন গুরুত্বপূর্ণ কিছু সে হারিয়ে ফেলেছে। বারবার বলছে,
-“কোথায়?
-“এখানেই ছিল, আই নো….”
সানার আর সহ্য করতে পারল না। সে কখন থেকে আরজেকে বলছে কিন্তু তার কানে যেন ঢুকছেই না। সে এবার দু হাতে জোরে ধাক্কা দিয়ে বলে,
-“স্টপ ইট, মিস্টার জাওয়ান, আর ইউ ক্রেজি?”

সানা বড় বড় শ্বাস ফেলছে, অন্য দিকে আরজে দুই কদম পিছিয়ে যায়। কিন্তু পরের মুহূর্তেই আবার এগিয়ে আসে। হঠাৎ একটানে সানাকে টেনে বেসিনের পাশের খালি জায়গা টায় বসিয়ে কোনরকম আগমনী বার্তা ছাড়াই তার অধর দুটো শক্ত করে চেপে ধরে। সানা হতভম্ব, সে হাত দিয়ে ধাক্কা দিতে থাকে। কিন্তু আরজে তার দুই হাত তুলে দেয়ালে চেপে ধরে। তারপর আবার ঠোঁটে ঝুঁকে পড়ে, একটার পর একটা গভীর কামড় বসিয়ে দিল তার অধরে। বিপরীতে রমণী কিয়ৎকাল পর শান্ত হয়ে আসে।আরজে ধীরে তাকে ছেড়ে দিয়ে তার চোখের দিকে তাকায়। নজরে আসে সানা অগ্নিদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। আরজে ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটে ওঠে। তার কানের কাছে মুখ নিয়ে নেশালো কণ্ঠে ফিসফিসায়,

-“লিপ টেস্ট… ও সেম”
তারপর সে সানার হাত ছেড়ে দেয়। মুহূর্তের মধ্যেই সানা তাকে নিজের সর্বশক্তি দিয়ে ধাক্কা মেরে সরিয়ে এক দৌড়ে দরজা খুলে বেরিয়ে যায়। তার পদক্ষেপ দ্রুত, প্রায় পালানোর মতো। করিডরের আলো রমণীর মুখে পড়তেই বোঝা যায় তার বুক ওঠানামা করছে দ্রুত শ্বাসে।
আরজে কিছুক্ষণ একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে। বাথরুমের নিস্তব্ধতার ভেতর শুধু পানির টুপটাপ শব্দ। তারপর সে ধীরে ধীরে মাথা তুলে দরজার দিকে তাকায়, যেদিক দিয়ে সানা বেরিয়ে গেছে। হঠাৎ করেই তার ঠোঁটের কোণে একটা অদ্ভুত তৃপ্তির হাসি ফুটে ওঠে। হাত বাড়িয়ে নিজের ঠোঁট মুছে পরের মুহূর্তেই সেই হাসি বড় হতে হতে একসময় অট্টহাসিতে পরিণত হয়। তার হাসির শব্দ যেন পুরো বাথরুমে প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসে।
কয়েক সেকেন্ড পর সে নিজেই ধীরে ধীরে হাসি থামায়। তার চোখে তখন এক অদ্ভুত ঝলক, একটা ভয়ংকর নিশ্চয়তা। ফিসফিস করে আওড়ায়,

-“তুমি তার থেকে পালাতে চাইছো,
যার কাছে অন্ধকারে তোমার ছায়াটা পর্যন্ত চিরচেনা”
আরজে ধীরে ধীরে বেসিনের কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। তার আঙুল দিয়ে হালকা করে স্পর্শ করে সেই জায়গাটা, যেখানে কয়েক মুহূর্ত আগে সানা বসেছিল। তার ঠোঁটে আবার সেই রহস্যময় হাসি,
-“মাই লাভ,
তোমার প্রতিটি নিঃশ্বাস, প্রতিটি মুহূর্ত এখনো আমার অন্ধকারের বন্দী”
আরজে আয়নার দিকে তাকায়। নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে ফিসফিস করে,
-“দার্স, ওয়ান থিং ইউ’র ফরগেটিং
মানুষ পৃথিবীর সবার কাছ থেকে লুকাতে পারে, কিন্তু যার সাথে তার আত্মা জড়িয়ে থাকে, তার কাছ থেকে কখনো না।
আমি সেই অন্ধকার পথ,
যার একমাত্র যাত্রী তুমি।
আমি সেই গন্তব্য,
যেখানে শেষ পর্যন্ত তুমি শুধু আমার ”

ফ্যাশন শো তখন জমে উঠেছে। আলো, সঙ্গীত আর মানুষের ভিড়ে পুরো ‘অরোরা গ্র্যান্ড পাভিলিয়ন’ যেন এক অদ্ভুত উত্তেজনায় ভাসছে। কিন্তু এই ঝলমলে পরিবেশের আড়ালেই কয়েকজন মানুষের জন্য রাতটা হয়ে উঠেছে ধাওয়া আর লুকোচুরির। এসপি দ্রুত ভিড়ের মধ্যে দিয়ে সরে যাওয়ার চেষ্টা করছে, উদ্দেশ্য একটা সুযোগ পেলেই নিজের রুমে গিয়ে দরজা দিয়ে বসবে যে আর সাতদিন পর বেরুবে। কিন্তু সেই সুযোগ টাই মিলছে না যেন। সবদিকে আরজের গার্ড। তার চোখ দুটো বারবার চারদিকে ঘুরছে। ঠিক তখনই সামনে এসে দাঁড়ায় কাইলিন। এসপি থমকে গেল,
মুহূর্তের মধ্যে তার মাথা কাজ করতে শুরু করে। কাইলিনের চোখ তখন তার মুখের দিকে উঠার আগেই এসপি পাশের টেবিল থেকে দ্রুত একটা টিস্যুর গোছা তুলে নিল। এক সেকেন্ডের মধ্যে সে টিস্যু দিয়ে নিজের পুরো মুখ ঢেকে ফেলল। কাইলিন থমকে ভ্রু কুঁচকে তাকাল তার দিকে। সে একটু এগিয়ে এসে বলে,

-“এক্সকিউজ মি…”
এসপি তৎক্ষণাৎ মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিল। তার এমন ব্যবহারে কাইলিনের চোখে সন্দেহ বাড়ছে। সে ধীরে ধীরে এসপির চারপাশে হাঁটা শুরু করে। একবার ডান দিক থেকে দেখছে, একবার বাম দিক থেকে।
মনে হচ্ছে যেন সে কারও সাথে মিল খুঁজছে।
সে চোখ সরু করে তাকিয়ে বলে,
-“স্ট্রেঞ্জ…আই ডোন্ট নো হুয়াই, বাট ইউ লুক ভেরি ফ্যামিলিয়ার….”
এসপির মস্তিষ্কে দ্রুত দুষ্ট বুদ্ধি এসে হানা দিল। সে গলা খাঁকারি দিয়ে তারপর গলাটা ইচ্ছে করে একটু ভাঙা করে বলে,
-“আ… হ্যাঁ…আমাদের তো আগে দেখা হয়েছিল”
-“রিয়েলি?”
-“হ্যাঁ… চার রাস্তার মোড়ে….”
কাইলিন একদম থেমে গেল, তার মুখে স্পষ্ট বিস্ময়। সে ভ্রু কুঁচকে বলে,
-“চার রাস্তার মোড়!”
এসপি টিস্যু গুলোকে আরও চেপে ধরে তড়িঘড়ি করে বলে,
-“আরে আপনি ভুলে গেছেন, আপনি তখন লাল জ্যাকেট পরে ছিলেন”
-“আমি তো লাইফেও লাল জ্যাকেট পরিনি”
এসপি তাড়াতাড়ি প্রত্যুত্তর করে,
-“না না, আপনি ভেবে দেখুন”
কাইলিন এখন সত্যিই ভাবতে শুরু করেছে।

তার চোখ উপরে উঠল। কিন্তু কোনমতেই তার মনে পড়ছে না সে এ জন্মে লাল জ্যাকেট পড়েছে বলে। হঠাৎ তার মস্তিষ্ক সতর্ক হয়ে ওঠে। মনে মনে প্রশ্ন জাগে, ‘চায়নার পার্টিতে বাংলা কিভাবে বলছে এই ছেলে’।
ঠিক তখনই এসপি সুযোগটা লুফে নিল। সে ধীরে ধীরে পিছিয়ে যেতে লাগে। আর ঠিক ভিড়ের মধ্যে ঢোকার আগে হঠাৎ চিৎকার করে বলে,
-“ভাব চাইনিজ সান্ডা, ভাব”
তারপর এক সেকেন্ডে ভিড়ের মধ্যে মিলিয়ে গেল। ততক্ষণে কাইলিনের বিভ্রম কেটে গেছে মুখ থেকে নিঃসৃত হয় বিরক্তিকর শব্দ,
-“ওহ শিট…এই পুঁচকে ছেলেটা আবার আমাকে ঘোল খাইয়ে দিল”
সে চারদিকে তাকিয়ে এসপিকে খুঁজতে শুরু করে দিল কিন্তু ততক্ষণে এসপি উধাও। তার মাথায় দ্রুত একটা চিন্তা ঢুকে গেল,
-“যদি বস জানতে পারে, আমি তাকে সামনে পেয়েও গুলি করতে পারিনি। তাহলে বস আমাকে নিজেই গুলি করবে”
সে দ্রুত মাথা নাড়িয়ে ভিড়ের মধ্যে ঢুকে পড়ল। তার চোখ এখন শিকারির মতো চারদিকে ঘুরছে। একটাই লক্ষ্য ‘এসপিকে খুঁজে বের করা’ আর সাথে সাথে গুলি মেরে দেওয়া।

সমস্ত পার্টি থেকে ভেন্যুর এক পাশে কাচ দিয়ে আলাদা করা ভিআইপি লাউঞ্জে পরিবেশটা অনেকটা ভিন্ন। নরম আলোয় সাজানো সেই ভিআইপি বারে বড় একটা লেদার সোফা জুড়ে বসে আছে আরজে। সে একেবারে আরাম করে পায়ের উপর পা তুলে বসেছে। এক হাত সোফার পেছনে ছড়ানো, অন্য হাতে গ্লাস। তার ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত এক বাঁকা হাসি ‘যেন পুরো পার্টির মালিক সে-ই’
তার সামনে, আরেকটা সোফায় বসে আছে মিসেস দিলরুবা খানম। তার মুখের অভিব্যক্তি পরিষ্কার বিরক্তি আর অস্বস্তির মিশ্রণ। কিন্তু চোখে ঠান্ডা, ধারালো দৃষ্টি। এতক্ষণ আরও অনেকে ছিল তারা সবাই একে একে চলে গেছে। তিনি গ্লাসটা টেবিলে নামিয়ে রেখে ধীরে বললেন,
-“আরজে, আমি সরাসরি কথায় আসতে চাই”
বিপরীত পাশের মানব থেকে আসে রুক্ষ কণ্ঠস্বর,
-“আমি ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে কথা শুনতে পছন্দ করি না”
-“তুমি জানো, জাইফেরার নতুন প্রজেক্টগুলো এখন খুব সেনসিটিভ স্টেজে আছে। দক্ষিণ এশিয়া থেকে শুরু করে ইউরোপ পর্যন্ত আমাদের কয়েকটা রুট খুলতে যাচ্ছে”
আরজে গ্লাসে হালকা করে ওয়াইন ঘুরাতে ঘুরাতে বলে,

-“আই নো…”
দিলরুবা খানম চোখ সরু করে বলেন,
-“তাহলে এটাও জানো এই রুটগুলো একেবারে পরিষ্কার ব্যবসা না”
আরজে হালকা হেসে আওড়ায়,
-“মিসেস খানম, এই পৃথিবীতে বড় ব্যবসা কখনোই পুরো পরিষ্কার হয় না”
-“আমাদের কনসাইনমেন্টগুলো খুব সেনসিটিভ। অস্ত্র, বিরল খনিজ, আর কিছু মেডিকেল কেমিক্যাল যেগুলো সরকারিভাবে ট্র্যাক করা যায় না”
আরজে মাথা একটু কাত করে তার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলে,
-“সোজা ভাষায় বললে ‘ব্ল্যাক মার্কেট”
-“তুমি যেভাবেই বলো। কিন্তু এই ডিলগুলোতে তোমার নেটওয়ার্ক দরকার”
আরজে গ্লাসটা টেবিলে রেখে সামান্য সামনে ঝুঁকল,
-“সেটা না হয় হবে, কিন্তু আপনার আসল বিজনেসের ব্যাপারে বলেন”
আরজের মুখে এমন বাক্য শুনে তার কপালে ভাঁজ পড়ে। তিনি বুঝলেন না তার কথার মানে। তাই ধরা গলায় প্রশ্ন করেন,

-“আসল বিজনেস মানে?”
-“মানুষের বউ চুরি”
-“কি বলতে চাইছো তুমি ,পরিষ্কার করে বল?”
-“আমি বলতে চাইছি, ‘সেকেন্ড মাদার ইন ল’ ওপস, মিসেস দিলরুবা খানম, আজ পর্যন্ত কজনের বউ চুরি করেছেন?”
মুহূর্তে উনার চোয়াল শক্ত হয়ে যায়, নিজের হাত মুষ্টিবদ্ধ করে বলে,
-“ভদ্রভাবে কথা বলো আরজে, সুনেহনা আমার মেয়ে। তুমি সেলিব্রেটি হতে পারো, মাফিয়া হতে পারে কিন্তু…..”
আরজে তাকে মাঝ পথে থামিয়ে শক্ত কণ্ঠে বুলি ছুড়ে,
-“কিন্তু আমি কারো বউ চুরি করতে পারিনা। আপনারা সবকটা মিলে আমার নির্দোষ বউটাকে লুকিয়ে রেখেছেন, তার মধ্যে একটা বারোভাতারি। শা*লাকে একবার খুঁজে পাই, চায়নার মাটিতেই গেড়ে রেখে যাব”
তারপর হঠাৎ সে গম্ভীর হয়ে গেল, সামনে ঝুঁকে হিসহিসিয়ে বলে,

-“কিন্তু আপনি একটা কথা মনে রাখবেন।
আপনার ব্যবসার অনেক ডার্টি সিক্রেট আমি জানি”
দিলরুবা খানমের চোখ সরু হয়ে আসে,
আরজে ফের বলে,
-“আপনার কনসাইনমেন্ট কোথায় যায়, কার কাছে যায়, কোন পোর্ট দিয়ে ঢোকে সব।
তাই আমাকে মিথ্যা বলার আগে একটু ভেবে নেবেন”
-“তুমি কি আমাকে থ্রেট দিচ্ছো?”
-“না, শুধু মনে করিয়ে দিচ্ছি ‘আমাদের ডিলটা সমান সমান’ আর একটা কথা, আপনি যদি ভাবেন আমার বউকে আপনি আমার কাছ থেকে লুকিয়ে রাখতে পারবেন”
আরজে উঠে দাঁড়িয়ে নিজের কোট ঠিক করে মিসেস দিলরুবা খানমকে একটা বাঁকা হাসি উপহার দিয়ে বলে,

-“তাহলে আপনি আরজেকে এখনো ঠিকমতো চিনতে পারেননি”
মুহূর্তে মিসেস দিলরুবা খানমের মুখটায় অন্ধকারে নেমে এলো। তিনি নিজের দন্ত পার্টি চেপে বাক্যটুকু হজম করে নিয়ে মুখ খুলে কিছু বলার পূর্বেই আরজে কোন দিকে না তাকিয়ে সে চলে গেল।
আরজে যাবার পেছনে দিয়ে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা এসপির ঘাড় কাত করে তাকায় পেছনের দিকে। সে ওই সময় কাইলিন কে ঘোল খাইয়ে এখানে এসেছিল। ভেবেছে পার্টি শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত এখানে থাকবে। কিন্তু এখানে এসে দেখে আরজে। তাই সে চুপচাপ নিশ্বাস আটকে এখানে বসে আছে। আরজের এমন হুমকি শুনে সে নাক মুখ কুঁচকে দাঁত কিরমির করে বলে,
-“শা*লা জাওরা এমনভাবে বলছে, যেন এর বউ দুধে ধোয়া তুলসীপাতা না আমপাতা। আর পৃথিবীর সবাই দোষী। তোর জন্য কটকটিই ঠিক আছে একদম”

ভেন্যুর ভেতরে এখন পার্টি তার চূড়ান্ত রূপে পৌঁছেছে। ঝাড়বাতির সোনালি আলো, চারদিকে নরম নীল আর বেগুনি লাইটের মিশ্রণ, মিউজিকের তালে তালে মানুষজনের হাসি সব মিলিয়ে যেন এক ঝলমলে পৃথিবী।
কিন্তু সেই ঝলমলের মাঝেও একটা মানুষ ভীষণ একা। হলের এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে সানা। সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে চারদিকে বারবার তাকাচ্ছে। তার চোখ এসপি ও ঈশানীকে খুঁজছে। সে ডান পাশের ভিআইপি টেবিল, বার কাউন্টার, ডান্স ফ্লোর সবখানে চোখ বুলিয়ে ফেলল। কিন্তু কোথাও ঈশানী নেই। তার বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অস্বস্তি জমতে লাগল। মনে মনে দাঁত চেপে বলে,
-“কোথায় গেল ওরা?
এই সময়ে গায়েব হয়ে গেল কেন?
আমাকে এখানে একা রেখে সব গুলো সরে পড়েছে…”
একটা তিক্ত হাসি ফুটে উঠল তার ঠোঁটে। চারপাশে এত আলো, এত মানুষ, এত শব্দ তবুও তার মনে হচ্ছে সে একদম একা। অদ্ভুত একটা নিঃসঙ্গতা ঘিরে ধরছে তাকে। মিউজিক বাজছে। কিন্তু তার মাথার ভেতর বারবার একটা কথাই ঘুরে বেড়াচ্ছে,
“ডিভোর্স”
সে চোখ বন্ধ করল এক মুহূর্তের জন্য। মনে হলো বুকের ভেতর কিছু একটা মোচড় দিয়ে উঠল। তার বুকের বাম পাশে হঠাৎ একটা চিনচিনে ব্যথা উঠল। তার অজান্তেই হাতটা সেখানে রেখে দিল। গলা দিয়ে ফিসফিস করে বের হয়,

-“আমি তো নিজেই চলে গিয়েছিলাম…
তাহলে এতটা খারাপ লাগছে কেন?”
পরের মুহূর্তেই তার মাথায় রাগ চড়ে গেল। তার চোখে আগুন জ্বলে উঠে। নিজেকে সামলে শক্ত কণ্ঠে বলে,
-“না… খারাপ লাগার কিছু নেই। বরং এখনই গিয়ে ওই লোকটার সবগুলো চুল ছিঁড়ে ফেলতে ইচ্ছা করছে।
কুত্তা, এত বছর পরও আমাকে বলার সাহস হলো কীভাবে, ‘এক্স ওয়াইফ’
তার বুকের ভেতর আবার সেই ব্যথাটা উঠল। সে দ্রুত চোখ খুলে চারদিকে তাকায়, তখনি নজরে আসে পার্টির এক কোণে। সেখানে এক জোড়া কাপল দাঁড়িয়ে আছে। তারা নিজেদের মধ্যে এতটাই ডুবে আছে যে চারপাশের পৃথিবী যেন তাদের কাছে নেই। ছেলেটা মেয়েটার কোমর জড়িয়ে ধরে আছে। মেয়েটা তার গলায় হাত রেখেছে। আর পরের মুহূর্তেই তারা একে অপরকে চুমু খেতে শুরু করল। সানার চোখ থমকে গেল। কারণ ছেলেটাকে পিছন থেকে দেখতে হুবহু আরজের মতো লাগছে। তার বুকের ভেতর ধক করে উঠল, সে এক পা পিছিয়ে গেল। তার গলা শুকিয়ে আসছে তারপরও বহু কসরতে আওড়ায়,

-“না, এটা রানভীর হতেই পারে না”
তার চোখ বড় হয়ে গেছে। সে অবিশ্বাসের চোখে তাকিয়ে আছে সামনে। রমণী বারবার জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজাতে লাগল। কিন্তু তার গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হচ্ছে না। তার মাথার ভেতর যেন হঠাৎ ঝড় শুরু হয়েছে,
-“ও… এত সহজে?
আমি এখানে… আর ও..”
তার বুকের ভেতর যেন কেউ মুঠো করে ধরল, মুহূর্তে শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে তার। পরের মুহূর্তেই তার চোয়াল শক্ত হয়ে আসে। হাত মুষ্টি বদ্ধ করে দাঁতে দাঁত চেপে কোন কিছু না ভেবে ভারী ভারী কদম ফেলে এগিয়ে গেল সেদিকে। কাপলটা এখনও নিজেদের জগতে ব্যস্ত। আর ঠিক তাদের সামনে গিয়ে সানা হঠাৎ তাদের দুজনকে এক ঝটকায় আলাদা করে দিয়ে সে কিছু বলতে যাচ্ছিল কিন্তু পরের মুহূর্তেই তার কথা গলায় আটকে গেল।
কারণ ছেলেটা আরজে না, একজন সম্পূর্ণ অপরিচিত মানুষ। ছেলেটা ভ্রু কুঁচকে বিরক্ত চোখে তাকায়। সানার মুখ মুহূর্তে ফ্যাকাশে হয়ে গেল। সে তাড়াতাড়ি হাত তুলে বলে,

-“সরি, অ্যাম সো সরি”
ছেলে মেয়ে দুটো কিছু বলল না তারা দুজনই বিরক্ত মুখে সরে গেল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে তারা ভিড়ের মধ্যে মিলিয়ে গেল। সানা সেখানে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার বুক দ্রুত ওঠানামা করছে, মাথা ঝিমঝিম করছে। ধীরে ধীরে সে নিজের দুই হাত তুলে মুখ ঢেকে ফেলল। তার আঙুলের ফাঁক দিয়ে গরম শ্বাস বেরিয়ে আসছে। চারপাশে এত মানুষ, এত আলো, এত শব্দ তবুও তার মনে হচ্ছে সে যেন একদম একা দাঁড়িয়ে আছে এই বিশাল পৃথিবীতে। তার মাথায় এখনো ঘুরছে সেই মুহূর্তটা। ভুল মানুষকে গিয়ে টেনে আলাদা করা। নিজের আচরণটাই তার কাছে অদ্ভুত লাগছে। মনে মনে বলে,

-“এসব কি হচ্ছে আমার সাথে…”
ঠিক তখনই হঠাৎ একটা শক্ত পুরুষালি হাত তার কোমড় চেপে ধরল। মুহূর্তের মধ্যে তাকে টেনে নিয়ে গেল নিজের বুকের সাথে। সবকিছু এত দ্রুত ঘটল যে সানা এক সেকেন্ডের জন্য বুঝতেই পারল না কি হচ্ছে। তার শরীর শক্ত হয়ে গেল, আর পরের মুহূর্তেই তার নাকে এসে ধাক্কা খেল একটা খুব চেনা একটা গভীর, উষ্ণ, পরিচিত গন্ধ, যেটা সে হাজার মানুষের ভিড়েও চিনে নিতে পারে, কড়া কফি ও ভ্যানিলার স্মেল। সাথে তার কানের কাছে ভেসে এল সেই ভারী পুরুষালি কণ্ঠ,
-“মিসেস জাওয়ান…..
আপনি কি অন্য কাউকে ভেবেছিলেন?”
সানার গলা শুকিয়ে গেল, সে একটা ফাঁকা ঢোক গিলে ধীরে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে তাকায়। নজর আটকায় আরজেতে। যে কালো স্যুট, ঠোঁটে সেই পরিচিত বাঁকা হাসি, চোখে অদ্ভুত তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে ভ্রুক্ষেপহীন ভাবে। মুহূর্তের জন্য সানা স্থির হয়ে গেল। তার বুকের ভেতর যেন জমে থাকা একটা ভারী পাথর সরে গেল। অজান্তেই তার ভেতর থেকে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস বেরিয়ে এল। আরজে সেটা স্পষ্ট শুনে তার ঠোঁটের কোণে হাসিটা আরও গাঢ় হয়ে উঠল। সে একটু ঝুঁকে কণ্ঠ খাদে নামিয়ে আওড়ায়,

-“রিলিফ?”
সানা সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে সামলে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। তার কোমড়ে রাখা আরজের হাতটা সরিয়ে দিতে চেষ্টা করে,
-“প্লিজ… হাতটা সরান”
আরজে একটুও নড়ল না। বরং একটু শক্ত করে চেপে ধরল যেন নখ চামড়া বেদ করে ঢেবে যাবে। রমণী ব্যাথায় কুঁকড়ে ওঠে। আরজে ধীরে তার হাত একটু আলাদা করে সে নিচু স্বরে বলে,
-“আপনি তো একটু আগেই খুব উত্তেজিত হয়ে একজন মানুষকে টেনে আলাদা করলেন।
আপনি ভেবেছিলেন, সে আমি”
সানার চোখ মুহূর্তে বড় হয়ে গেল। মিনমিন করে বলে,
-“এমন কিছুই না… ”
আরজে এবার তাকে আরও কাছে টেনে আনল। দুজনের মাঝের দূরত্ব প্রায় নেই বললেই চলে। সানা হাত দিয়ে বারবার তাকে সরিয়ে দিচ্ছে। আরজে ফের নিচু স্বরে বলে,

-“আমাকে অন্য কারও সাথে কল্পনা করে….”
সানা তাকে থামিয়ে দ্রুত তার হাত সরিয়ে এক পা পিছিয়ে গেল,,
-“আপনি ভুল ভাবছেন’
আরজে ভ্রু তুলে ধীরে ধীরে সামনে এল। সে আবার হাত বাড়িয়ে তার কব্জি ধরে। সানা সঙ্গে সঙ্গে হাত ছাড়িয়ে নিল,
-“ডোন্ট টাচ মি…”
আরজে এক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল তার দিকে। তার ঠোঁটে সেই চেনা ঠান্ডা হাসি,
-“ইন্টারেস্টিং, একজন মহিলা একটা অচেনা কাপলকে গিয়ে আলাদা করে দেয়। আর যখন সত্যিকারের মানুষটা সামনে আসে তখন বলে ডোন্ট টাচ মি”
সানা একটা ফাঁকা ঢুক গিলে ঠান্ডা গলায় বলে,
-“আপনার কল্পনা শক্তি অসাধারণ”
তার বিপরীতে আরজে হালকা হেসে কানের কাছে ঝুঁকে ফিসফিস করে,
-“মিস খানম, পরের বার যদি কাউকে কিস করতে দেখেন, তাহলে নিশ্চিত হয়ে নেবেন সে আমি কিনা। কারণ যদি সত্যিই আমি হই,
তাহলে সামনের ব্যক্তিটা আপনি-ই থাকবেন”
এই বলে আরজে সানা পাশ কাটিয়ে চলে যায়। এদিকে সানা আর ভালো লাগছে না এইসব।৷ সে দাঁত চেপে চোখ বন্ধ করল এক মুহূর্তের জন্য। মনে মনে বলে,

-“এনাফ…আর না”
এই ভিড়, এই আলো, এই মানুষগুলো সব কিছু হঠাৎ তার কাছে অসহ্য লাগছে। সে বুঝতে পারছে তার এখন একটা জিনিসই দরকার, শান্তি। আর সেই শান্তিটা সে সবসময় পায় এক জায়গায়, তার ছেলে আরভির কাছে। আরভির মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠতেই তার বুকটা একটু নরম হয়ে গেল,
-“ওর সাথে একটু সময় কাটালে হয়তো মাথাটা শান্ত হবে”
একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে তারপর আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। পার্টির আলো, শব্দ, মানুষ সব পিছনে ফেলে দ্রুত হাঁটা শুরু করল। লম্বা করিডোর পেরিয়ে সে লিফটের দিকে এগিয়ে গেল।
সানা ধীরে ধীরে করিডোর দিয়ে হেঁটে এসে থামে তার রুমের সামনে। সে ব্যাগ থেকে কার্ড বের করে দরজার লক খুলে সানা দ্রুত ভেতরে ঢুকে পড়ল। তারপর দরজাটা বন্ধ করে দিল। পরের মুহূর্তেই তার বুক থেকে যেন একটা ভার নেমে গেল। সে গভীর একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়ল,

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৬

-“উফ…”
মনে হলো যেন অবশেষে একটু শান্তি পেল। সে ধীরে ধীরে ঘুরে সামনে তাকায় আর ঠিক তখনই তার শরীরটা যেন জমে গেল। তার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে উঠল। কেননা রুমের ভেতরে সে একা নয়। সামনের সোফায় কেউ বসে আছে। অন্ধকার আর মৃদু আলোয় সেই ব্যক্তির মুখ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। আর তাকে দেখেই সানার চোখ বিস্ময়ে স্থির হয়ে গেল। তার ঠোঁট থেকে প্রায় ফিসফিস করে বেরিয়ে এল,
-“আপনি…..”

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৮