৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ১২
রুপান্জলি
১৩/০৩/২০১৯
,,,, উদাস মনে ভার্সিটি প্রাঙ্গনে পা রাখলো পারু, আজ তার হাতে ফুলের থোকা নেই, আর না গেইটের সামনে দ্বীপের গ্যাঙরা রয়েছে। পারু না চাইতেও এদিক ওদিক তাকিয়ে দ্বীপকে খুজতে লাগলো। কই লোকটা? ঐ লোক কি সত্যি ই আর তার কাছে আসবেনা? না আসুক। পারু তো এটাই চেয়েছিলো,, ঐ খারাপ পুরুষকে তো সে সহ্যই করতে পারেনা। এটাই ভালো হয়েছে, পারুর মুক্তি মিলেছে। তবে এই মুক্তিতে পারুর কষ্ট হচ্ছে কেনো? ঐ লোকের জন্য মনটা উসখুস করবে কেনো? নাহ!! করা উচিৎ না। পারু ধীরো পায়ে হাটতে হাটতে ক্যাম্পাস পেরিয়ে ভার্সিটির ভিতরে ঢুকলো। ক্লাসে যেতেই সবাই ওকে ঘিরে ধরলো, গতকাল যেই ধামাকাদার নাচ করেছিলো, তারপর এই তেলোবতী এখন সবার কাছে ফেমাস। এইযে সবাই ওকে ঘিরে আনন্দ করছে, তাতে তার কোনো মন নেই। তার মনটার যে কি হলো,, নিজেও জানেনা। সবার উৎফুল্লতার মাঝে একটা মেয়ে পারুকে উদ্দেশ্য করে বললল —
,,, কাল একটু নেচেই তো তাক লাগিয়ে দিয়েছিলে পারু, তারপর যে কোথায় চলে গেলে। সিনিয়র রা তোমাকে অনেক খুজেছে জানো?
,,,আরেকটা মেয়ে বললো — আরে হে, মনে পরেছে। জানো পারু, কাল কি হয়েছে? অনুষ্ঠান শেষ হতে দেরি ভার্সিটি ক্যাম্পাসে সন্ত্রাস ঢুকতে দেরি নেই। তারা অনেক গুলো স্টুডেন্টদের মেরেছে। সবচেয়ে বেশি মেরেছে মাস্টার্স ফাইনালের স্টুডেন্ট দের। ভালোই হয়েছে চলে গিয়েছিলে,, আমরা তো পুরো আতঙ্কে ছিলাম,, কখন না জানি আমাদেরকেও মেরে দেয়।
,,,মেয়েটার কথা শুনে পারু ভয়ার্ত ঢোক গিললো, সে জানে এই কাজ দ্বীপের। এতোদিনে লোকটাকে সে খুব ভালো করেই চিনে নিয়েছে। পারুর মনে দ্বীপের জন্য যতটুকু ভালো লাগা কাজ করছিলো তার থেকে হাজার গুন ঘৃণা তৈরি হয়েছে এই কয়েক মিনিটে। লোকটাকে এতোবার নিষেধ করা সত্তেও কেনো এমন করলো? কেনো মারলো ছেলেগুলোকে? ছেলেগুলোর কি দোষ ছিলো? প্রতিটা ভার্সিটিতে এমন সারপ্রাইজ ডান্সের ব্যাবস্থা করা হয়, সেখানে তো স্টুডেন্টরা নাচবেই। এই সামান্য বিষয়টা নিয়ে কেনো এতো তোলপার চালাবেন এই লোক? খারাপ লোক একটা। পারুর অন্তরে দহন চলছে,, মন বলল সে দ্বীপকে মিস করছে আর মস্তিষ্ক বলে দ্বীপ খারাপ পুরুষ, তর দ্বীপকে ঘৃণা করা উচিৎ । মন মস্তিষ্কের দন্দ কাটিয়ে পারু তপ্ত শ্বাস ফেলে প্রশ্ন করলো — ছেলেগুলোর এখন কি অবস্থা? ভালো আছে তো?
,,, প্রথম মেয়েটি বললো– আর বলোনা!! গতকাল একেকটা রক্তাক্ত অবস্থায় ক্যাম্পাসে পরে ছিলো তারপর দ্বীপ ভাইয়ার লোকজন এসে সবাইকে হসপিটালে নিয়ে গিয়েছে। দ্বীপ ভাই আর বিহান ভাইয়ের মতো মানুষ হয়না,, সন্ত্রাসদের ভাগ্য ভালো তারা থাকা কালিন দ্বীপ ভাই আর বিহান ভাই ভার্সিটিতে উপস্থিত ছিলেন না। যদি উপস্থিত থাকতেন তাহলে ছেলেদের মারা তো দূর হাত দেওয়ার ও সাহস পেতো না।
,,,পারুর কেনো যেনো এসব আর শুনতে ইচ্ছা করলো না, তার জীবনটা এই পর্যায়ে এসে কেমন বিষাধ ময় হয়ে যাচ্ছে। মন চাচ্ছে মরে যেতে,, তার জন্য কতোগুলো ছেলে মার খেলো। হে তার জন্যই তো,, সব দোষ তার নিজের,, সে নেচেছে বলেই ছেলেগুলো দ্বীপের শিকার হয়েছে। ঐ লোকের মতো দূরন্দর বোধয় এই পৃথিবীতে খুব কম আছে। নিজেই মারলো আবার নিজেই কৌশল করে সবার সামনে মহান সাজলো, পারু জল জল চোখে ঘৃণা ভরা কন্ঠে বিরবির করে আওড়ালো — বক্ষক যখন রক্ষক সাজতে চায়। নাটক বাজ লোক একটা।
,,,তিব্র অস্বস্তিতে দ্বীপের বুক পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে,, সারাদিন ঘরে বসে সিগারেট টেনেছে। সিগারেট খেতে খেতে এমন ভাবে অভ্যস্ত হয়েছে যে এখন সারাদিন ব্যাপি সিগারেট খেলেও তার শরীর খারাপ করেনা। হৃদপিন্ড টাও যেনো সব সহ্য করতে শিখে নিয়েছে। আর পারছেনা দ্বীপ,, সারাটা দিন সে তার পারুকে দেখেনি। পারুর ছোয়া পায়নি,, তার এখন মরন যন্ত্রণা হচ্ছে। মন বলছে দ্বীপ তুই এখোনি মরে যাবি,, এখোনি। দ্বীপ আর বসে থাকতে পারলো না,, পুরো রুম জুড়ে তন্ন তন্ন করে বাইকের চাবি খুজলো তবে পেলোনা। মরার চাবি গেলো কই? সব সব সব বেইমান। এই চাবির থেকেও বড়ো বেইমান ঐ পারমিতা হামিদ। তার এক সাগর ভালোবাসাকে এভাবে পায়ে পিষে চলে যেতে একটাবারো বুক কাপলোনা? বেয়াদবের বাচ্চা একটা। দ্বীপের মতো করে ঐ মেয়েকে এতোটা ভালো কেউ বাসতে পারবে? পারবেনা। দ্বীপ পারুকে যতোখানি ভালোবাসে ততোখানি পারুর বাপ মাও বাসতে পেরেছে কিনা সন্দেহ। আর সেই ভালোবাসাকে একটাবার চোখ তুলেও দেখলোনা? খবিশের জাত!! অবাধ্য প্রেমিকা একটা। মন তো চায় তুলে নিয়ে গিয়ে বিয়েটা করে নিতে। একবার বাসরটা হয়ে গেলেই সকল অবাধ্যতা বাতাসের সাথে মিলিয়ে যেতো। দ্বীপ নেহাতি ভদ্রলোক,, তাইতো ঐ মেয়ের মন পাওয়ার আশা করছে। নয়তো বাসর ঘরে আলোরন ছড়াতে, তার একলার মুড ই যথেষ্ট। কিন্তু বউয়ের মুড না থাকলে আবার দ্বীপের ভালো লাগবেনা, বিষয়টাতে তেমন একটা ফিল আসবেনা। সুতরাং বাসর ঘরে দুজনার মুড থাকাটা খুব জরুরি। আর দুজনের মুড ঠিক রাখতে গেলে অবশ্যই পারুকে তার ভালোবাসার সাগরে ডুব দিতে হবে। এসব ভাবতে ভাবতেই বিহানের রুমে পৌছালো দ্বীপ,,বিহান বসে বসে ল্যাপটপে কি যেনো করছে। দ্বীপ এগিয়ে গিয়ে ল্যাপটপ টা কেড়ে নিয়ে বিছানায় ছুড়ে মারলো। দ্বীপের কাজে ঠোঁট বাকিয়ে হাসলো বিহান, সে জানতো দ্বীপ এমনটা করবে। জন্মের পর থেকে একসাথে বড়ো হয়েছে বলে কথা,, এটুকু না চিনলে ভাই শব্দটার মান থাকবে? বিহানকে হাসতে দেখে দ্বীপ বিহানের কলার চেপে ধরে বললো —-
বেয়াদবের বাচ্চা!! দাত কেলাচ্ছিস কেনো? বাইকের চাবি কই? দেখছিস না মরে যাচ্ছি? একেবারে মরে গেলে শান্তি পাবি তরা ? একটা ভীতুর বাচ্চাকে ভালোবেসেছি,,, সারাদিন জ্বালায়। ওর জন্য কোথাও শান্তি পাই আমি? সারাক্ষণ আমার মাথার উপর নেচে বেড়ায়। মন আর মস্তিষ্ক দুটোই আমার শত্রু,, বেয়াদবের বাচ্চাগুলো আমার ভিতরে থেকে আমার সাথেই বেইমানি করে। সারাক্ষণ পারু পারু করে,, কেনো? পারু পারু করতে হবে কেনো ? পারুকে ছাড়া একটা দিন কি থাকা যায় না? মন চাচ্ছে মাথা আর বুক বরাবর একটা একটা স্যুট করে মন মস্তিষ্ককে ঠান্ডা করে দেই। বেইমান গুলোর জন্য কথার খেলাপ করতে হচ্ছে আজ। ২৪ বছরের জীবনে জোহান মির্জাকে এতোটা পাগল হতে দেখেছিস? বেয়াদবের বাচ্চায় আমাকে পাগল বানিয়ে এখন পাগলের উপাধি দিয়ে দূরে সরে যাওয়ার পায়তারা করছে। মন চায় থাপরে গাল লাল করে দেই,, নেহাতি ভালোবাসি,,নয়তো ওর রং করা অনেক আগেই বের করে দিতাম।
,,,বিহান এবার শব্দ করে হাসলো,, আল্লাহ তার অধৈর্য ভাইটার ধৈর্য একটু বাড়িয়ে দিক। ঐ মেয়ে কি জানে? সয়ং দ্বীপ মির্জা তার জন্য কতোটা পাগলামি করছে? জানলে বোধয় মেয়েটার জীবন ধন্য হয়ে যেতো,, এক লহমায় নিজের মনকে দ্বীপের মাঝে সপে দিতো। বিহানকে হাসতে দেখে দ্বীপ ওর কলার ছেড়ে বিছানায় ধপ করে বসে পরলো। কেউ বোধয় তার জ্বালাটা বুঝতে পারছেনা। তাইতো ঐ ইদুরের বাচ্চা তাকে পাগল বলেছে। মন তো চাচ্ছে পাগলামি করতে করতে ঐ ইদুরের বাচ্চাকে টেনে বুকের সাথে মিশিয়ে নিয়ে সকল চিউ চিউ একেবারে মিটিয়ে দিতে। উফফ!! বুকটা কেমন ফাকা ফাকা লাগছে,,এখানে পারু কখন মাথা রাখবে? কখন ঐ নাজুক শরীরটা তার বাহুডরে মিশে যাবে? বাইকের চাবির শব্দে ওর ভাবনার সুতো কাটলো,, বিহান তার সামনে বাইকের চাবি ঝুলিয়ে রেখেছে,, দ্বীপ খপ করে ধরে নিলো সেটা, পরপর বের হওয়ার উদ্দেশ্যে পা বাড়াতেই বিহান গলা উচিয়ে বললো— কে যেনো বলেছিলো? আমি পারুর কাছে গেলে মাহিদ মির্জা আমার বাপ না? কে যেনো বলেছে,, ঠিক মনে করতে পারছিনা। কে বলেছে রে জোহান? তুই কিছু জানিস?
,,, দ্বীপ থমকে দাড়িয়ে সমান তালে গলা উচিয়ে বললো — আমার বাপের নাম শাহিন মির্জা,,, তর মন চাইলে মাহিদ মির্জাকে বাপ ডাকতে পারিস,,, উনি তো আবার সারাক্ষণ তর গুন গান গায়। আর তর বাপ মাহিদ মির্জাকে বলে দিস,, উনার বউমা এখনো বেয়াদবি করছে। যেদিন বেয়াদবটা ঠিক হবে সেদিন বাড়ি নিয়ে যাবো। বউমাকে বাড়িতে আনো, বাড়িতে আনো বলে যেনো আমার কান মাথা গরম না করে দেয়।
,,, বলেই গট গট পায়ে চলে গেলো দ্বীপ,, তার এখন অক্সিজেনের প্রয়োজন। পারুর বাচ্চাকে একটাবার কাছে পেয়ে নিক, সারাদিনে যতোখানি দম বন্ধ লেগেছে তার সব এক্সিজেন একসাথে গ্রহন করে নিবে। অবাধ্য প্রেমিকার অবাধ্যতা যদি সে না ছুটিয়েছে,, তাহলে তার নাম ও দ্বীপ জোহান মির্জা না। ওকে যেতে দেখে বিহান হাসতে হাসতে বিছানায় লুটিয়ে পরলো। ঠিক হয়েছে,, মেয়েটা শান্ত হলেও ঘাড় ত্যারা। আর ঘার ত্যারার সাথে ঘার ত্যারাকেই মানায়,, তার এই ঘার ত্যারা ভাইটাকে কেমন পাগলের মতো নাচাচ্ছে মেয়েটা। বাপরে,,বলতে হবে,, মেয়েটার দম আছে নয়তো দ্বীপ জোহান মির্জার মতো মানুষ কিনা কথার খেলাপ করে তার কাছে ছুটে যাচ্ছে? যাই হোক!! তারা তাদের মতো প্রেম করুক,, বিহান এখন তার মেধা রানীর সাথে কথা বলবে,,, অনেক্ক্ষণ যাবত তারো প্রেম প্রেম পাচ্ছে। শুধু ভাইয়ের মন খারাপ বলে প্রেম টুকুন করতে পারছিলোনা।
,,,, বার বার ফোন বাজছে,, তুলছো না কেনো? দেখতে পাচ্ছোনা পড়তে বসেছি? হয় কল ধরো নয়তো বন্ধ করে রেখো দাও।
,,,, আদিবার ধমকে কেপে উঠলো পারমিতা,, মন জুড়ে অভিমান জমলো। সবাই শুধু তাকে ধমকায়,, ঐ লোকটাও ধমকায়,, কাল তো চুলেও ধরেছে এরপর নিশ্চয়ই মারধর করবে? জানা কথা। রাজনীতি বীদরা কখনো ভালো হয়না। হয়তো এখনো মারবে বলেই তাকে কল করছে। করতে থাকুক , সে ঐ লোকের কল ধরবেনা আর না ঐ লোকের কোনো কথা শুনবে। যা খুশি করুক,,, মারতে মারতে পুরো পৃথিবীর সবাইকে খু*ন করে দিক। সে ঐ লোকের মুখটা অবদি দেখবেনা। মন যতই চাক তবুও যাবেনা। ভেবেই ফোনটা বন্ধ করে দিলো। সময় পেরুতেই ঐদিনের মতো আবারও হল সুপারের আগমন। হল সুপারকে দেখে ভয় পেলো পারু। তারমানে ঐ লোক এখানে আসবে? ওফফ!! আল্লাহ!! রহম করেন। এই লোক এমন কেন? নিজেই না বলেছিলো তার কাছে আসবেনা? তাহলে এখন কেনো আসছে? নিজের দেওয়া কথা নিজেই রাখতে জানেনা। পাগল লোক একটা। নিজে পাগলামি করবে আবার পারু পাগল বললেই দোষ হয়ে যায়। আজো বলে দিবে,, আসুক একবার।
এমন এমন কথা বলে দিবে যেনো রাগে আর কখনো তার সামনে না আসে। পারুর ভাবনাই ঠিক হলো,, হল সুপার কাজের বাহানা দিয়ে সিমি আর আদিবাকে নিয়ে চলে গেলো। প্রথমে মনে মনে শক্ত থাকলেও এবার ভয়ে হাত পা কাপছে পারুর,, লোকটা যদি তাকে সত্যি সত্যি ই মারে? মিনিটের মাথায় দরজা খুলে ভিতরে ডুকলো দ্বীপ। পারু ভয়ে গুটিশুটি মেরে বিছানার এক কোনায় বসে ছিলো। বিদ্ধস্ত দ্বীপকে দেখে হাড় হিম হয়ে এলো তার,, লোকটার এই অবস্থা কেনো? ফরসা মুখটা পুরো লাল হয়ে গিয়েছে,, ধূসর রঙা বিড়ালের ন্যায় চোখ দুটো অসম্ভব লাল হয়ে রয়েছে,, চুলগুলো এলোমেলো হয়ে কপালে ছড়িয়ে আছে,, শার্টের বোতাম এলোমেলো ভাবে লাগানো। পারুর ইচ্ছা করলো দ্বীপের মলিন মুখটা ছুয়ে দিতে। একটু আদর করে দিয়ে জিজ্ঞেস করতে,, কি হয়েছে আপনার? আমাকে ছাড়া খুব কষ্ট পেয়েছেন কি? কিন্তু সাথে সাথেই মন জুড়ে বয়ে গেলো বিষাধের হাওয়া,, ঐ ছেলেগুলোর কথা মনে আসতেই তিব্র ঘৃণায় আবারও মুখ ফিরিয়ে নিলো। ওর মুখ ফিরিয়ে নেওয়াটা সহ্য হলো না দ্বীপের, তেড়ে এসে পারুর হাত ধরে বিছানা থেকে নামিয়ে দিলো। পারু হাত ছাড়াতে মুচড়ামুচড়ি করে বললো–
,,,হাত ছাড়েন,, এখানে কেনো এসেছেন শুনি? আপনি না বলেছেন আমার কাছে আর আসবেন না? তাহলে কেনো আসলেন? অসহ্য লোক একটা।
,,,পারুর হাত দুটো একসাথে করে পিছনে নিয়ে মুচড়ে ধরতেই ব্যাথায় ককিয়ে উঠলো মেয়েটা। দ্বীপ ওকে একদম নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে দাতে দাত চেপে বললো — কল ধরলিনা কেনো? কাহিনী করিস? তর নাটক দেখবো বলে এসেছি এখানে? আমাকে তর মানুষ মনে হয়না? জীবনটা বরবাদ করে দিচ্ছিস। বেয়াদবের বাচ্চা!! মারলে একেবারে মেরে ফেল,, এরকম ইগনর করছিস কেনো?
,,, হাতের ব্যাথা, দ্বীপের বিদ্ধস্ত চেহারা আর নিজের মনের টানাপোড়েন সামলাতে না পেরে ঝরঝর করে কেদে দিলো পারু। আজ ওকে কাদতে দেখেও মায়া হলো না দ্বীপের। কেনো মায়া করবে সে? এই মেয়ে তো তার প্রতি এক টুকরো মায়া ও দেখায়না। তার যে বুকে ব্যাথা হচ্ছে সেই খোজ নিয়েছে এই মেয়ে? নেয়নিতো,, নেয়নি যখন তখন সেও মায়া দেখাবেনা। পারু ফোপাতে ফোপাতে বললো — আপনাকে মারবো কেনো? আপনি ই আমায় মেরে দিন। আপনি না মারলে নিজেই মরে যাবো তাও আপনার কাছে যাবো না। বুঝলেন? আপনি একটা অমানুষ। কেনো মারলেন ছেলেগুলোকে? বলুন!! ওরা কি করেছে আপনাকে? আমি নাচাতে আপনার কয় কোটি টাকা লস হয়েছে? বলেন,, কেনো করলেন এমন টা? এসব করে আমার মন পাবেন? পাবেন না। আমি গ্রামের সাদাসিধা মেয়ে,, আমি ভালোবাসলে অত্যন্ত ভদ্র, সভ্য, মায়াধর ছেলেকে ভালোবাসবো। আপনার মতো অমানু,,,
,,,আর বলতে পারলো না মেয়েটা তার আগেই ওর মুখ চেপে ধরলো দ্বীপ,, মুখের ব্যাথায় ছটফট করে উঠলো পারু। দ্বীপ ওর মুখটা একদম নিজের মুখ বরাবর এনে হিসহিসিয়ে বললো — তুই নাচনেওয়ালি? রাস্তার মেয়ে তুই? তকে নাচাবে কেনো? বল আমাকে। আমার সামনে বয়ান মারাও তুমি? বয়ান মারাও? তুই নাচাতে আমার কোটি টাকা নষ্ট না হলেও আমার ভালোবাসার সম্মান নষ্ট হয়েছে। তুই কেন নাচবি সেটা বল, বেয়াদব। এসব নাচানাচি তকে শিখাইছে কে? তার নাম বল। তার অবস্থা ও খারাপ করে দিবো আমি। আমার পারু হাজার লোকের সামনে কেনো নাচবে? তার কইফিয়ত আগে দে তারপর আমি ওদের মারার কইফিয়ত দিবো। বেয়াদবের বাচ্চা!! তর কাছে আসছি শান্তির জন্য আর তুই? সর সামনে থেকে।
,,, বলতে বলতে পারুকে ধাক্কা দিয়ে নিজের থেকে দূরে সরিয়ে দিলো। আকষ্মিক ধাক্কার ফলে বেডের এক কোনায় ধাম করে পরলো পারমিতা,, শক্ত কাঠের সাথে হাত বাড়ি খাওয়ায়। ওমাহ!! শব্দ করে ককিয়ে উঠলো। এতোটা ব্যাথা পাওয়ার পরেও দ্বীপ এগিয়ে গেলো না। মরে যাক এই বেয়াদবের বাচ্চা। নিজের সম্মান তো বজায় রাখতেই জানেনা আবার আসে গলা বাজি করতে। তবে পারু হাতে ব্যাথা পেয়েছে ভাবতে গেলেও দ্বীপের বুকে ব্যাথা হচ্ছে। ঠাটা পড়া জীবন তার,, শরীরের একটা অঙ্গ ও তার কথা শুনে না। সবকয়টা বেইমান। সবকয়টা শুধু পারুর নাম যপে। ইচ্ছা করে নিজের অঙ্গ পতঙ্গ ছিড়ে খুবলে শেষ করে দিয়ে হলেও এই অবাধ্য প্রেমিকার নাম যপা বন্ধ করে দিতে। সেই ভাবা সেই কাজ,, তেড়ে গিয়ে টেবিলের উপরে রাখা গ্লাস টা দেয়ালে বারি দিয়ে ভেঙে ফেললো। দ্বীপের এহেন কান্ডে ভয়ে ধরফরিয়ে উঠলো পারু। দ্বীপ কি তবে সত্যি ই তাকে মেরে ফেলবে? ওর ভাবনাকে ভুল প্রমান করে ভাঙা গ্লাসটা হাত দিয়ে চেপে ধরলো দ্বীপ। সাথে সাথে হাত থেকে গল গল করে রক্ত পড়া শুরু হলো। এসব দেখে আরও ভয় পেলো পারমিতা,, তবে দ্বীপের হাতের কথা ভেবে অপরাধ বোধে তার কাছে যেতে নিলে দ্বীপ ধমকের স্বরে বললো — থেমে যা,আমার কাছে আসবিনা। মাথা খারাপ হয়ে আছে পারু,, কাছে এলে একদম খুন করে রেখে যাবো, বলে দিলাম। আমাকে তর বেহায়া মনে হয়? তর মতো হাজারটা মেয়ে তুড়ি দিলে দ্বীপ মির্জার পায়ের তলায় এসে ভীর জমাবে। আর তুই আমাকো দেমাগ দেখাস?
ঐ ছেলে গুলো তর কি লাগে? জামাই হয় তর? ওদের জন্য এতো দরদ দেখাস কেন? যাহ তবে!! তুই তর জামাইদের সাথে গিয়ে নাচ। তর মতো সস্তা নারী আমার চাইনা। আজকের পর যদি আমি তর কাছে এসেছি তাহলে তুই বলিস। তর কাছে আমি মরে গেলেও আসবো না। আই রিপিট!! মরে গেলেও না। আর না তুই আমার কাছে আসবি,, আমি মরে গেলে তুই দেখতেও যাবি না আমাকে,, বুঝেছিস? মাথায় ঢুকিয়ে নে এটা। দ্বীপ মির্জা আর তর কাছে আসবেনা, তুই ডাকলেও না,, কোনো অবস্থাতেই না।
,,, বলেই গ্লাসটা ছুড়ে মেরে বিদ্ধস্ত পায়ে রুম ত্যাগ করলো। তাকে কেউ বুঝে না,, কেউ না। বুঝবে কেনো? সে তো অমানুষ। পারু কি একটাবার পারতো না? অধিকার দেখিয়ে বলতে,, আপনি আসবেন,, বারবার আসবেন,,আমি চাইলেও আসবেন,, না চাইলেও আসবেন। বললো না পারু,, দ্বীপের ভালোবাসা বুঝলো না। ভাবতে ভাবতে চোখের কোনে জমা পানি টুকুন রক্তাক্ত হাত দিয়েই মুছে নিলো । দ্বীপ চলে যেতেই পারু হাটু মুরে বসে পরলো,, তার নিজেকে খুব অসহায় লাগছে। মন চাচ্ছে ছুটে গিয়ে দ্বীপকে আটকে দিতে,, কিন্তু পারছেনা। মন মস্তিষ্কের নিরব যুদ্ধে সে এক পরাজিত সৈনিক। মনের সাথে সাথে আজ মতিস্ক ও বলছে,, দ্বীপ তো ভুল কিছু বলেনি,, পারু তুই সস্তা,, তুই যেহেতু হাজার পুরুষের সামনে নাচতে পারিস সেহেতু তুই সস্তা। কোথায় তর সম্মান? কোথায় তর বাবার দেয়া শিক্ষা? শুধু কয়েকজন মানুষের রিকোয়েস্টে তুই এতো বড়ো ভুল কি করে করতে পারলি? শুধু দ্বীপ কেনো? তর বাবাও যদি বিষয়টা জানতে পারে তাহলে বাবার কাছে তর মুখ থাকবে? বাবাও তকে সস্তা বলবে,, যেমন টা দ্বীপ বলেছে। আচ্ছা!!
৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ১১
দ্বীপ কি আর পারুকে ভালোবাসবে না? ভুলে যাবে? অন্য কাউকে ভালোবাসবে? ওফফ!! আর ভাবতে পারছেনা পারু, অতিরিক্ত টেনশনে তার মাথা ব্যাথা করছে। আজকের ব্যাথাটা একটু বেশি ই মনে হচ্ছে,, তাই উঠে গিয়ে ব্যাথার টেবলেট নিলো সাথে একটা ঘুমের ট্যাবলেট ও খেলো। ওর যখন মাথা ব্যাথা করে তখনি ঘুমের ঔষধ খায়। আসলে পারু মাথা ব্যাথা একদমি সহ্য করতে পারেনা,, কেমন যেনো অসহ্য লাগে। তাই ব্যাথা যেনো সহ্য করতে না হয় তাই ব্যাথার টেবলেট আর ঘুমের টেবলেট একসাথে খায়। ঘুমিয়ে গেলে তো আর ব্যাথা অনুভুত হবে না,, তখন কষ্ট ও হবে না।
