৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৫৯ (৩)
রুপান্জলি
বাংলাদেশে আইনি ব্যাবস্থা অত্যন্ত স্মুথ এবং স্ট্রিক্ট। এতোটাই স্ট্রিক্ট যে সন্ধা ৭ টা পেরুতে না পেরুতেই থানার অসি কেদারার পেছনে গা হেলিয়ে ঝিমুচ্ছেন। ব্যাচারা সম্পূর্ণ নির্দোষ,, তার কাজ হচ্ছে অভিযোগ গ্রহন করা। এখন সন্ধার পর যদি কেউ অভিযোগ করতে না আসে তাতে তার কি দোষ? সে কি এখন বসে বসে মসা তাড়াবে? তাও করা যেতো কিন্তু মসা যে নেই। উচ্চমানের কয়েল লাগানোর ফলে আসেপাশে কোনো মসা মাছিও দেখা যাচ্ছেনা। অগত্যা কোনো কাজ না থাকায় সে কাঠের চেয়ারে হেলান দিয়ে,, পা দুখানা টেবিলের মধ্যভাগে এটাস্ট করা কাঠের উপর রেখে দেশে ঘটে যাওয়া নানান নীতি দূর্নীতির চিন্তায় মসগুল হলেন। ভেবে দেখলেন,, নীতি আর দূর্নীতি শব্দটা একই,, শুধু একটা ওয়ার্ডের তফাৎ,, সে কারনেই হয়তো দেশে নীতির চর্চা করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সবাই দূর্নীতির পথ বেছে নেয়। নয়তো সবজায়গায় এতো দূর্নীতি কিসের? দেশে দূর্নীতি, সমাজে দূর্নীতি,, কারোর কারোর তো আবার ঘরের ভিতরেও দূর্নীতি চলে। এই যেমন সে নিজে এখন থানায় বসে দূর্নীতি করে যাচ্ছে। ইদানীং দূর্নীতি করাটাই কেমন মানুষের নীতি হয়ে দাড়িয়েছে। ওসির গভির ভাবনার মাঝেই একজন কনস্টেবল এগিয়ে এলো। হাতে থাকা ফোনটা এগিয়ে এগিয়ে দিয়ে বললো — স্যার!! মিসেস অর্পনা জামান,,
,,, কনস্টেবলের এহেন কথায় চোখ মেলে তাকালেন অসি,, ফোনটার দিকে তাকাতেই দেখলো জমুনা টিভিতে নিউজ চলছে। তিনি ফোনটা হাতে নিয়ে ভিডিওতে ক্লিক করলেন,, একজন অতিবো ভদ্র গোছের নারী নম্রতার সহিত আওড়াচ্ছে —
“ ঢাকা ১০ নং আসনের নেতা দ্বীপ জোহান মির্জার স্ত্রী অর্পনা জামানের অবস্থা বর্তমানে অত্যন্ত সংকটাপন্ন। জরুরি ভিত্তিতে হার্ট ট্রান্সপ্লান্ট প্রয়োজন। চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী উপযুক্ত ডোনার হার্টের আনুমানিক প্যারামিটারসমূহ হলো—
LVEDD: 4.2–5.8 cm
LVESD: 2.0–4.0 cm
EF: 55%–70%
কোনো স্বেচ্ছাসেবী অর্গান ডোনার বা বৈধ অঙ্গদান প্রক্রিয়া সম্পর্কে তথ্য থাকলে দ্রুত Evercare Hospital Dhaka-এ যোগাযোগ করার অনুরোধ জানানো হচ্ছে। বর্তমানে রোগী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছেন।”
,,, অসি চোখে মুখে বিরক্তির আভাস ফুটিয়ে বললো — এটা নতুন করে দেখানোর কি আছে? জানি এসব,, অকারনেই ঘুমটা ভাঙালে,, নিয়ে যাও।
,, কনস্টেবলটি মুখ চুন করে ফোনটা নিয়ে চলে গেলো,, ভেবেছিলো সিনিওর বিষয়টা জানেনা তাই জানাতে এসেছিলো কিন্তু আশানুরুপ কিছুই হলো না উল্টো একটা বিশাল ধমক খেতে হলো। থানার একপ্রান্তের হাজতে আটক থাকা রাত্রি এমন নিউজ শুনে ফুপিয়ে উঠলো,, দুপুর থেকেই মৃধু স্বরে কাদছে মেয়েটা। এখন এমন কথা কর্ন কূহর হতেই মেয়েটার কান্নার জোর বাড়লো। পল্লব বিরক্তিকর দৃষ্টিতে তাকালো একবার,, পরক্ষণেই চোখ সরিয়ে নিলো,, অন্যোর মানুষের দিকে নজর দেওয়া উচিৎ না,, দৃষ্টি সংযত রাখা উচিৎ। পল্লবকে চোখ সরিয়ে নিতে দেখে রাত্রি কান্নার বেগ আরও কয়েক কদম বাড়ালো,, ততক্ষণাৎ ধমকে উঠলো দরজার সামনে দাড়িয়ে থাকা কনস্টেবল। আকষ্মিক ধমকে কেপে উঠলো রাত্রি,,খেই হাড়িয়ে মুখ লুকালো পল্লবের কাঁধে,, এক হাতে খামচে ধরলো পরনের শার্ট। রাত্রির আকষ্মিক কান্ডে হকচকালো পল্লব,, চকিত নজরে কাধে মুখ গুজে রাখা নারীটির দিকে তাকিয়ে আশে পাশে বসে থাকা আরও দুজন আসামির দিকে তাকালো। পরপর কনস্টেবলের ধমকের বিপরীতে খেকিয়ে উঠলো — ধমক দিলি কেনো? দেখছিস না কাদছে? আরেকবার গলা উচালে বিষয়টা ভালো হবে না,, বলে রাখলাম।
,,,পল্লবের চিৎকার শুনে অসি একবার গাড় বাকিয়ে কোনা বরাবর তাকালো। দুর থেকেই দেখলো সুন্দর মুখশ্রীর দুই ছেলে মেয়েকে,, ছেলেটা যেমন সুন্দর তেমনি মেয়েটাও,, দুজনকে মানায় ভিষন। এখনকার জামানা,, প্রেমিক প্রেমিকা হবে হয়তো। দুপুরে ডিয়া বাড়ির ঘটনাস্থল থেকে ধরে এনেছে দুজনকে। প্রধান আসামি অর্পনা জামান বর্তমানে হসপিটালে ভর্তি,, নিজের মাকে দুইবার গুলি করে মার্ডার করার চেষ্টা করেছে,, যদিও ভিক্টিম এখনো মারা যায়নি, তবে এখনো প্রান সংকটে আছেন। ভিক্টিমের ভাইয়েরা অর্পনা জামানের নামে মার্ডার কেইস করেছে। সাথে এই দুই ছেলে মেয়ের নামে আসামিকে সাহায্য করার অভিযোগ এনেছে। যার ফল স্বরুপ এই দুই ছেলে মেয়ে এখনো এখানে বন্দি। আরও একজন ছেলে নাকি আসামির সাথে ছিলো কিন্তু তার নামে কেইস দায়েল করা হয়নি বিদায় সে সাচ্ছন্দ্যে বাহিরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। যতোক্ষণ না বিষয়টার সুরাহা হবে কিংবা আসামির পক্ষ থেকে কেউ হাজির হবে ততোক্ষণ এদের জামিন হবে না। আবার বেশিক্ষণ আটকেও রাখা যাবেনা। প্রধান আসামির স্বামী দ্বীপ জোহান মির্জা,, কূটিল রাজনীতি বিদ সে। হয়তো মাঝরাত হওয়ার আগেই ছাড়িয়ে নিবে এদের তাইতো দুজনকে আর আলাদা আলাদা রাখেননি,, শর্টকাটে কোনা বরাবর হাজতটাতে আটকে রেখেছে। দ্বীপ মির্জার দিক থেকে কেউ একজন এলেই এদের ছেড়ে দেওয়া হবে,, সবি ক্ষমতা আর টাকার ব্যাপার সেপার। এই দুটো থাকলেই মানুষ যা খুশি করে বেড়াতে পারে। ছেলেটার পরিবার থেকে অবশ্য ছেলেটার বাবা উকিল নিয়ে হাজির হয়েছিলো কিন্তু জামিন কার্জকর হয়নি,, আপাতত ছেলেটার বাবাকে কাল আসতে বলা হয়েছে,, আজ কোনো মতেই ছাড়া পাবেনা ছেলেটা। মেয়েটার পক্ষ থেকে এখনো কেউ আসেনি,, হয়তো মেয়ের খবর জানে না,, নয়তো জানে কিন্তু উকিল ঠিক করতে পারছে না। অতো কিছু ভেবে তো আর উনার কোনো কাজ নেই। তিনি পল্লবের থেকে নজর সরিয়ে কনস্টেবলের দিকে তাকিয়ে বললেন —
,, ছাড়ো, ঝামেলা করো না। উঠতি বয়সি ছেলে পুলেরা বেয়াদব,, এরা ঝামেলা করে থানায় আসে আবার থানায় এসেও ঝামেলা করে। এদের জ্বালায় কোথাও শান্তি নেই আজকাল।
,,, কনস্টেবলটি কিছু বলার জন্যই মুখ খুলেছিলো,, হঠাৎই সিনিয়রের হুকুম শুনে দমে গেলো। পল্লব তখনো রাগে ফোসফোস করছে। এরা কি জানে তার পাশে বসা রমনিটি কতোটা ভিতু? সে তো নিজের মায়ের সাথেই সাহস করে দুটো কথা বলতে পারেনা,, কেউ সামান্য তিক্ত কথা বললে গাল ফুলিয়ে কেদে কুটে এক করে দেয়। সেখানে কনস্টেবলের এমন একটা ধমক,, এতোটা সহ্য করতে পারার মতো সামর্থ্য যে নেই এই মেয়ের।পল্লবের ভাবনার মাঝেই শুনা গেলো কাধে মুখ গুজে রাখা রমনীর ভাঙা স্বর — অর্পনার কি হয়েছে? নিউজে ওসব বলছে কেনো? অর্পনা কি বাচবে না? আমাকে যেতে দিতে বল। আমরা তো সেইম সেইম, তাই না? আমার হার্ট আর ওর হার্ট তো মিলবে,, আমার হার্ট টা আমি ওকে দিয়ে দিলে ও বাচবেনা? চল না যাই। অরুন কই? ও কি অর্পনার কাছে? ওকে বলনা আমাদের নিয়ে যেতে।
,,, রাত্রি অনবরত একটার পর একটা কথা বলে যাচ্ছে,, ক্ষনে ক্ষনে ভয়ে কুকরে উঠছে মেয়েটা। এই প্রথম রাত্রি নামক মেয়েটাকে শান্তনা দিতে এক পেশে জড়িয়ে ধরলো পল্লব,, এর আগে অর্পন কিংবা ইরাকে জড়িয়ে ধরা হলেও রাতকে সেরম ভাবে জড়িয়ে ধরা হয়নি কোনোদিন। বরাবরি দুজনার মাঝে ছিলো যোজন যোজন দূরত্ব। বন্ধুরা যখন গ্রুপ হাগ করতো তখন রাত বরাবরি অরুনের পাশে ছিলো,, সেই তরফ থেকে এই আলিঙ্গনটা একদমি নতুন। পল্লব রাতের মাথায় হাত বুলিয়ে কন্ঠে কিছুটা নমনীয়তা ঢেলে আওড়ালো — দ্বীপ ভাইয়া থাকতে অর্পনার কি হবে? টেনশন নিস না,, এবার একটু দূরে সরে বস। সবাই উল্টোপাল্টা ভাববে।
,,, পল্লবের কথায় সম্ভিত ফিরলো রাত্রির,, ছোট থেকেই তার পুলিশ, জেল, হাজতে বেশ ভয়। এর অবশ্য কোনো কারন নেই,, এমনি অকারনেই ভয় পায় সে। তাই এমন একটা জায়গায় এতোগুলো অচেনা লোকের ভীড়ে একমাত্র পরিচিত এবং সবচেয়ে কাছের বন্ধুকে দুঃখের সময় আকরে ধরেছিলো কিন্তু মানুষ তো এটা বুঝবে না। মানুষ হচ্ছে কৌতুহলী প্রানি,, তারা সাদা ফকফকা দুধেও খুত খুজে বেড়ায়। অগত্যাই দূরে সরে গেলো মেয়েটা। এমনিতেও আগে তাদের মাঝে আধ হাতের মতো দূরত্ব ছিলো যা রাত্রি সরে গিয়ে এক হাতে পরিনত করেছে। সে উড়নার কানি দিয়ে চোখ মুছে কিছুটা দূরে বসে থাকা দুইজন আসামির দিকে তাকালো,, দুজনেই পুরুষ,, দেখতে কেমন চোর ডাকাতের মতো দেখায়। নির্ঘাৎ কোথাও চুরি ডাকাতি করে এখানে বন্দি হয়েছে। একজন দেওয়ালে হেলান দিয়ে ঝিমাচ্ছে,, ঘুমাচ্ছে বোধয়। আরেকজন লুঙ্গির পুটলি থেকে কি যেনো বের করছে। রাত্রির তাকিয়ে থাকার মাঝেই লোকটা বি*ড়ির প্যাকেট থেকে বি*ড়ি বের করে ঠোঁটে চাপলো। লাইটার জ্বালাতে নিতেই পল্লব ফ্যাসফ্যাসে গলায় আওড়ালো — দাদা, রাখেন। এসব আজকের জন্য বাদ দেন, ঘ্রাণ নিতে পারেনা। ( ইশারায় রাত্রিকে দেখিয়ে)
,,, মধ্যবয়সি লোকটার কপালে ভাজ পরলো — কি লাগে? প্রেমিকা?
,,, পল্লব কিছু বলার আগেই রাত্রি সুধরে দিয়ে বললো — না না, আমরা ফ্রেন্ড।
,,, বুঝলো না লোকটা– এইডা আবার কি?
,,, পল্লব নিরব কন্ঠে বললো — বন্ধু,, আমরা বন্ধু হই।
,,, লোকটা খেক খেক করে হাসলো। কিযে বিশ্রি শুনালো হাসিটা,, রাত্রি বিরক্ত হলো। লোকটা হাতে থাকা বিড়িটা প্যাকেটে রাখতে রাখতে বললো– হো,, এমন মেলা দেখছি,,
,,, লোকটা কি বুঝাতে চেয়েছে সেটা দুজনেই বুঝলো কিন্তু কিছু বলতে পারলো না,, বললেই না লোকটা আবার কি থেকে কি বলে ফেলে,, তখন দুজনকেই লজ্জায় পরতে হবে। যতই সম্পর্কটা বন্ধুত্বের হোক না কেনো,, মন থেকে তারা কেউ ই কখনো নিজেদের ভাই বোন হিসেবে সম্মোধন কিংবা কল্পনা করেনি,, করার প্রয়োজন ও বোধ করেনি,, অগত্যা লজ্জায় পরাটা কিছুটা আবশ্যাক তাই কেউ আর কথা বাড়ালো না। অনেকটা সময় পেরিয়ে যাবার পর রাত্রি উসখুস নেত্রে হাজতের সামনে দাড়িয়ে থাকা কনস্টেবলের দিকে তাকালো পরপর বাকি হাজত গুলোতে বসে থাকা ছেলেদের দিকে। এটা ছেলেদের হাজত,, মেয়েদেরটা কোনদিকে রাত্রি জানেনা। তাকে আর পল্লবকে যখন এখানে আনা হলো তখন ওকে আলাদা নিয়ে যাবার কথা ছিলো,, রাত্রির তখন ভয়ে হাত পা ঠান্ডা হয়ে যাবার যোগার,, গুনগুনিয়ে কাদছে,, পল্লব তো বরাবরই তাকে বুঝে। এবারো রাত্রির মনের কথা বুঝতে পেরে ওকে নিজের সাথে রাখার জন্য জেদ করলো,, এক চোট হাঙ্গামাও হয়েছে এ নিয়ে,, মার ও খেয়েছে পল্লব। অসিটা পরপর চারটা চর মেরেছে ছেলেটাকে তবুও দমে যায়নি ছেলেটা,, শেষ পর্যন্ত ব্যার্থ হয়ে রাত্রিকে ছেলেদের হাজতে পল্লবের সাথেই রাখা হলো। রাত্রি একবার তাকালো পল্লবের মুখে,, ফর্সা গালের এক পাশে পাঁচ আঙ্গুলের দাগ স্পষ্ট। বড্ড মায়া হলো তার,, ছেলেটা তাকে এতো বুঝে কি করে? এতো মায়াই বা দেখায় কেনো? এমনিতে তো খুব একটা দেখতে পারেনা তাকে,, সারাক্ষণ ন্যাকা বলে। তাহলে ওর ন্যাকামি গুলোকে এতো প্রশ্রয় দেয় কেনো? রাত্রির ভাবনার মাঝেই পেটটা কেমন ঘুরঘুরিয়ে উঠলো,, পেটে হাত চেপে ধরলো মেয়েটা, খিদায় পেট পিঠে মিলে যাবার যোগার। এতোক্ষণ চাপিয়ে রাখলেও আর পারলো না। পল্লবের দিকে তাকিয়ে অসহায় কন্ঠে ডাকলো–
,,, পল্লব!!
,,, ডাক শুনে ফিরে তাকালো ছেলেটা। রাত্রি আমতা আমতা করে বললো– আমার না অনেক খিদা পেয়েছে,, সেই সকালে দুটো রুটি খেয়েছি আর তো কিছুই খেলাম না। খিদায় কেমন পেটটা ছো ছো করছে।
,,, রাতের কথায় তপ্ত শ্বাস ফেললো পল্লব,, হাজতে তাদের খাবার দিবে কিনা সন্দেহ,, দিলেও নয়টার পর দিবে। সে আবারও নরম বাক্যে সুধালো–
,,, অনেক খিদা পেয়েছে? আরেকটু অপেক্ষা করতে পারবিনা?
,,, রাত্রি দুদিকে মাথা নাড়িয়ে না করলো,, পেটে হাত রেখে মুখটা মলিন করে নিজের অসহায়ত্ব বুঝালো। রাত্রির অসহায়ত্ব সামনের মানুষটাকে কতোটা কাবু করলো জানা নেই তবে মানুষটাকে চিন্তিত দেখালো। রাত্রি তখনো অসহায় নেত্রে তাকিয়ে। ঠোঁট চেপে রাত্রির দিকে তাকিয়ে থাকা অবস্থাতেই হুট করে কিছু একটা মনে পরলো পল্লবের,, অগত্যা পকেটে হাত গুজলো। অহমিকার জন্য দুটো কিটকেট চকলেট কিনেছিলো সকালে,, সেটাই বের করে আনলো। রাত্রির দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো — আপাতত এটা দিয়ে কাজ চালা। নয়টার পর খাবার দিবে হয়তো।
,,, চকলেট দেখে এক প্রকার কেড়ে নিলো রাত্রি,, কোনো রুপ বাক্য ব্যায় না করেই প্যাকেট ছিড়ে খেতে লাগলো,, পল্লব সরু চোখে তাকিয়ে রইলো, রাত্রি আনমনে খেতে খেতে যখন শেষের টুকরো টা মুখে পুরলো তখনি পল্লবের চোখে চোখ পরলো,, কি ভেবে যেনো তাড়াহুরো করে মুখে থেকে বের করে আনলো টকরো টা। সে শুধু মুখেই পুরেছে,, হা করে থাকার ফলে ঠোঁট, দাত, জিহ্বা কোনোটাতেই স্পর্শ লাগেনি। সে এবার অংশটুকু পল্লবের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো — তর ও তো খিদে পেয়েছে,, তাইনা? নে এটুকু খা। মুখের সাথে একটুখানিও লাগেনি,, সত্যি!!
,,, পল্লব মুখ ফিরিয়ে নিয়ে রুক্ষ কন্ঠে বললো– আমি চকলেট খাইনা,, তুই খা।
,,, রাত্রি বিশ্বাস করলো না,, আগে কতোই তো চকলেট খেতে দেখেছে,, অহমিকাও কতোবার নালিশ করেছে তার কাছে তাহলে এখন না করছো কেন? রাত্রি মুখ বাকিয়ে বললো — মুখে পুড়েছি বলে খাবিনা তাইনা?
,,,পল্লব প্রতিত্তোর করলো না,, রাত্রিও কেনো যেনো খেলো না,, জেদ দেখিয়ে প্যাকেটে পুরে মেঝেতে রেখে দিয়ে দেওয়ালে হেলান দিয়ে চোখ বুঝে নিলো,, ভালো লাগছে না,, বেশ গরম করছে,, মাথাটা ব্যাথা ব্যাথা করছে। হুট করেই কাগজের মরমর শব্দ শুনে চোখ মেলে তাকালো রাত্রি ,, পল্লবকে চকলেটের অংশটুকু মুখে দিতে দিখে কূটিল হেসে আওড়ালো — কে যেনো বলেছিলো আমি চকলেট খাই না?
,,, পল্লব বিচলিত হলো না,, রাত্রির মাথায় চাটি মেরে বললো — খাবার নষ্ট করা উচিৎ না তাই খেলাম। এভাবে ঝিমাচ্ছিস কেনো? মাথা ব্যাথা করছে?
,,, রাত্রি মাথা ঝাকালো মানে ব্যাথা করছে। পল্লব কাঁধে ইশারা করে বললো — দূরত্ব বজায় রেখে মাথা রাখ,, খাবার দিলে ডেকে দিবো,, একটু ঘুমা।
,,, রাত্রি তাই করলো,, এখন কিছুটা ভালো লাগছে। অর্পনা প্রায়সই গরম লাগলে তার কিংবা ইরার উড়নার কানি দিয়ে বাতাস করে,, রাত্রি সেভাবেই উড়নার কানি দিয়ে বাতাস করতে করতে সুধালো– আমরা বাড়ি যাবো না?
,,, যাবো,, খুব শীগ্রই যাবো। ইনশাআল্লাহ!!
,,, তুই তখন বুঝলি কি করে আমি যে তর সাথে থাকতে চাচ্ছি?
,,, ন্যাকা মেয়েদের মন পড়তে পারি তাই,, আর অমন অসহায় নেত্রে তাকিয়ে থাকলে একটা ছোট বাচ্চাও বুঝে যাবে তুই কি চাস।
,,, আমি মোটেও অসহায় নেত্রে তাকাইনি। আমি কি ওদের ভয় পাই নাকি?
,,, নাহ!! আপনি তো সাহসি,, তাইতো কনস্টেবলের ধমকে মুরগীর বাচ্চার ন্যায় মুখ লুকিয়েছিলেন।
,,, কনস্টেবলটা ভালো না,, কন্ঠ অসুন্দর,, তাই।
,,, বুঝলাম।
,,, তর কি গাল ব্যাথা করছে?
,,, হঠাৎ?
,,, গুনে গুনে চারটা চর খেলি যে,, এখনো ঠিক আছিস কি করে? আমি হলে তো এতোক্ষণে কেদে মরেই যেতাম।
,,, তুই তো ন্যাকা,, আমি কি ন্যাকা?
,,, তর ১৪ গুষ্টি ন্যাকা।
,,, গুষ্টি তুলে কথা বললি কেনো? আমার গুষ্টিতে কি তর কোনো অবদান রয়েছে? যে কথা বলবি।
,,, গুষ্টিতে আবার অবদান থাকে কি করে?
,,, থাকে,, যেমন ধর,, আমার মা আমার বাবাকে বিয়ে করে আমাদের জন্ম দিয়ে আমাদের বংশ বৃদ্ধি করলো না? এটাকেই গুষ্টি ক্ষেত্রে নারীর অবদান বলে।
,,, ওহ!! কিন্তু আমি কিভাবে অবদান রাখবো?
,,, তকে কেউ রাখতে বলেছে? গাধার বাচ্চা। ঘুমা তুই।
,,, রাত্রি মুখ চুন করে চোখ বুঝে নিলো,, সে পল্লবের বলা কথাটা বুঝেছে কিন্তু কি বুঝেছে সেটাই এখন বুঝতে পারছেনা। তাই আপাতত থাক,, পরে নাহয় অর্পন কিংবা ইরার থেকে জেনে নিবে। ইরা আর অর্পনার কথা মনে আসতেই চোখ থেকে পানি গড়ালো মেয়েটার। অর্পনা তো হসপিটালে,, মৃত্যুর সাথে লড়াই করছে,, ইরাদটা কই? সে কি নিউজ দেখে না? কাল কি আসবে একবার? কেমন আছে ইরাদ? কোথায় আছে? মেয়েটা কি বাড়ি গিয়ে ওদের ভুলে গেলো? একটু কি দেখা হবেনা? কাধে গরম জলের ফোটা পরতেই ধমকে উঠলো পল্লব — না কেদে ঘুমা,, আমার কাধে মাথা রাখার পারমিশন দিয়েছি চোখের পানি ফেলার না। সীমা লঙ্ঘন করলে থাপড়ে সোজা বানিয়ে ফেলবো।
( হাজত আর জেল কিংবা কারাগার, আলাদা আলাদা স্থান। হাজত মানে ক্ষনস্থায়ী আসামিদের আটক করে রাখার স্থান)
,,, নার্স স্টেশনের দরজা খুলে বেড়িয়ে এলো একজন নার্স,, হাতে একটা ঝিপ। বাহিরে এসেই রুগির পরিবারের সন্ধান করলো। আপাতত ওয়েটিং রুমে মির্জা বাড়ির সদস্য ব্যাতিত কেউ নেই। নার্সটি এদিক ওদিক নজর বুলিয়ে প্যাসেন্টের স্বামী দ্বীপ জোহান মির্জাকে খুজলেন কিন্তু পেলেন না৷ অগত্যা এগিয়ে গেলো মির্জা বাড়ির সবার সামনে,, নার্সকে দেখে সবাই কান্নাকাটি ভুলে চকিত দৃষ্টিতে তাকালো। মাহিন মির্জা উঠে এসে প্রশ্ন করলেন — হার্ট পাওয়া গিয়েছে?
,,,নার্স দু’দিকে মাথা নাড়িয়ে পেশাদার ভঙ্গিতে বললো– “নো, স্যার। এখনও কোনো ডোনার হার্ট পাওয়া যায়নি। তবে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন হাসপাতাল ও মেডিকেল নেটওয়ার্কে খোঁজ চলছে। পাশাপাশি কয়েকটি সংস্থা, নিউজ চ্যানেল এবং অন্যান্য কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের মাধ্যমেও তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। আশা করি আল্লাহ নিরাশ করবেন না। হার্ট পাওয়া মাত্রই আপনাদের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ করা হবে।”
,,, শাহিন মির্জার চোখ জোড়া ফের ছলছল হলো,, পরশীটা খুব কাদছে,, সবচেয়ে বেশি কান্না বোধয় ও ই করছে। মেয়েটা যে বড়ো ভাবি বলতে অজ্ঞান। মেধা নাক টেনে নিজেকে সামলানোর প্রয়াস করছে,, আরিবটা কেদে কুটে মাত্রই মায়ের কোলে ঘুমালো। সেও বড়ো ভাবির নেওটা,, ভাবি যে ভার্সিটি থেকে ফেরার পথে তার জন্য এটা ওটা আনে,, কেউ ওকে কোলে নিতে চায়না, ভাবি যে নেয়,, তাকে ফোনে গেইম্স খেলতে দেয়,, কত্ত আদর করে সেসব যে বড্ড পিড়া দিচ্ছে বাচ্চা ছেলেটাকে। রোমানা বেগম থম মেরে বসে আছেন,, তাকে এসে থেকে চোখের পানি ফেলতে দেখা যায়নি,, সাথি বেগম এখনো চোখে আচল চেপে পানি মুছে যাচ্ছেন। নার্সটি এবার সবার উদ্দেশ্যে বললো —
,,, এখানে প্যাশেন্টের শ্বশুর কিংবা শ্বাশুড়ি কেউ আছে?
,,, রোমানা বেগম তাকালেন,, মাহিন মির্জা ইশারায় ওনাকেই দেখাতেই নার্সটি এগিয়ে এসে রোমানা বেগমের দিয়ে ঝিপটা এগিয়ে দিয়ে বললো– এটা রাখুন,, এখানে আপনার ছেলের বউয়ের হাতের চুড়ি, কানের দুল, হাতের তিনটে রিং, গলার চেইন, কোমরের চেইন আর নাকের ফুল রয়েছে। এগুলো এম আর আই করার সময় খুলে রেখেছিলাম আমরা,, এখন হসপিটাল থেকে নির্দেশ আসায় ফিরিয়ে দিতে এসেছি।
৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৫৯ (২)
,,, রোমানা বেগম সেদিকেই তাকিয়ে ছিলেন। হাত বাড়িয়ে ঝিপটা নিলেন,, কাছে এনে স্বর্নের চুড়ি গুলো ছুয়ে দিয়ে হুট করেই শ্বব্দ করে কেদে উঠলেন,, এই চু্ড়ি পরা নিয়ে মেয়েটাকে কতো কথা শুনালেন তিনি,, মাকে বাবাকে তুলে বকতেও দুবার ভাবেন নি। মাকে কাদতে দেখে কান্নার জোর বাড়ালো পরশী,, মেধাও ফুপিয়ে উঠলো,, সবাইকে আকস্মিক কান্না করতে দেখে নার্সটি সতর্ক কন্ঠে বললো — এভাবে শব্দ করবেন না, এটা হসপিটাল। আল্লাহ এর উপর ভরসা রাখুন, দোয়া করুন,, আল্লাহ চাইলে সব ঠিক হবে।
