অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৪৩+৪৪
সাজিয়া জাহান সুবহা
মেলায় যাওয়ার অহেতুক বায়নাটি পূরণ করার একমাত্র কারণ ছিলো সায়েরীর জন্মদিন। যেদিন সব বন্ধুরা মিলে বিনা পরিকল্পনায় মেলায় গিয়েছিলো, ঠিক তার পরের দিনই আঠারো এর কোটায় পা রেখেছে সায়েরী। দিনটি ছিলো শুক্রবার। বন্ধুরা মিলে রেস্টুরেন্টে ছোট খাটো সেলিব্রেশনের পরিকল্পনা করেছিল ঠিকই। কিন্তু দুর্ভাগ্য বশত মামার অসুস্থতার কারণে মায়ের সাথে সায়েরীকে চলে যেতে হয়েছিল নানু বাড়ি। সেখানে কেটেছে গোটা ছয় দিন। মামার শারিরীক অবস্থা কিছুটা উন্নতি হতেই এপ্রিল মাসের ১৩ তারিখ পুণরায় ফিরেছে এসেছে তারা।
বিগত দিনগুলোতে বন্ধুদের সাথে খুব কমই যোগাযোগ হয়েছিল বিধায় সায়েরী জানতেই পারলো না পরের দিন পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে কলেজে অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। যখন এই খবর শুনলো তখন ধরনীতে সন্ধ্যা নেমে এসেছে। বান্ধবীরা জানালো তারা লাল রঙে সজ্জিত করবে নিজেদের। একথা শুনে সায়েরীর চিত্ত চনমনে করে উঠলো। মনে পড়ে গেলো বান্দরবানে বলা সাফওয়ানের নির্দিষ্ট কিছু বাক্য। যা পূণরায় কর্ণগোচরে বেজে উঠতেই আরক্তিম হলো মুখশ্রী। ব্যাপারগুলো তখন না বুঝলেও এখন সব ঝকঝকে পরিষ্কার তার দৃশ্যপটে। সাফওয়ান ভাই পছন্দ করে তাকে! একথা ভাবতেই শিরশির করে তনু। বক্ষস্পন্দন অস্বাভাবিক ভাবে ঢিপঢিপ করে। নিশপিশ করে অন্তরস্থ। সর্বদা এই একটা চিন্তায় ঘুরপাক খেতে থাকে মন, মস্তিষ্কে।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
সকাল ৮টা বেজে ৪০মিনিট। এই সময় শরীরে আকাশ সমান আলসেমি নিয়ে সায়েরীর বাসায় হাজির হয়েছে পিউ। আজ সে ভার্সিটি যাবেনা বলে সারা রাত জিমনের কথা বলে ভোর রতে ঘুমিয়েছিল। কিন্তু ঘড়ির কাটা ৮টার ঘরে প্রবেশ করতেই ঘূর্ণিঝড়ের ন্যায় হাজির হলো সায়েরী। জোর জবদস্তি করে ঘুম ভাঙিয়ে দিল তার। পিউ বুঝে উঠতে পারলো না সায়েরীর মনোভাব। অনিচ্ছা স্বত্তেও ফ্রেশ হয়ে, নাশতা করে মাত্র এসেছে সায়েরীদের বাসায়। সায়েরীর বেডরুমে প্রবেশ করতেই চোখে পড়লো চুলে তোয়ালে পেছিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মিটিমিটি হাসছে সায়েরী। এই দৃশ্যে কপাল কুঁচকে আসলো পিউ’র। লম্বা হাই তুলে সে ধর করে গিয়ে শুয়ে পড়লো বিছানায়। তার উপস্থিতি অনুভব করে সায়েরী চট করে ফিরে তাকায়। আমোদিত গল্য বলে,
‘ এসেছো? ‘
‘ না এসে উপায় রেখেছিস? সাত সকালে কি এমন প্রয়োজন পড়লো শুনি? তার চেয়ে বড় কথা তুই এতো সকাল সকাল উঠলি কি করে? আমাকে ডাকছিস ৮টা থেকে। মানে তুই এর আগে উঠেছিস। মাই গড, সায়ু! শরীর ঠিক আছে তোর? এই অসাধ্যসাধন কি করে করলি? ‘
পিউ’র এতো এতো কথার বিপরীতে সায়েরী নিশ্চুপ। বলবে কি? সারা রাত ঘুমুতেই তো পারলো না সে৷ উত্তেজনায় ছটফট করেছে শুধু। ভোরের আলো ফুটতেই আর থাকতে না পেরে ছুটে গেছে পিউ’র কাছে। তপ্ত শ্বাস ফেলে বিছানার উপর হতে একটা প্যাকেট নিয়ে তা এগিয়ে দিলো পিউ’র দিকে। চঞ্চল কন্ঠে সুধাল,
‘ দেখে বলতো কেমন? ‘
প্যাকেটের ভিতর হতে বেরিয়ে আসলো চকচকে নতুন মেরুন রঙের আনারকলি ড্রেস। বিশাল ঘের। ফুল স্লিভ হাতা। মেরুন দুপাট্টা এবং চুরিদার রয়েছে সাথে। কাপড়ের নিচের ঘের-এ,হাতায় এবং দোপাট্টায় সিলভার রঙের কারুকাজ করা। সিম্পল ডিজাইন। পিউ ড্রেসটা নেড়েছেড়ে দেখে জবাব দিলো, ‘খুব সুন্দর। কবে কিনলি? ‘
‘ কাল রাতেই। ‘ সায়েরীর অকপট স্বীকারোক্তি।
‘ রাতে মানে? বিকেলে না নানু বাড়ি থেকে ফিরেছিলি? তাহলে রাতে আবার শপিংয়ে যেতে হলো কেনো? ‘
এবারেও জবাব দিতে পারলো না সায়েরী। মনে পড়ে গেলো গত রাতের কথা। তার কাছে পছন্দসই কোনো মেরুন জামা না থাকার দরুন গত কাল ৭টা হতে মায়ের কাছে বায়না ধরেছিল নতুন জামা কিনবে বলে। মা নিষেধ করবে ভেবে নিজের জমানো টাকা বের করে রেখেছিলো। অপেক্ষা ছিলো শুধু শপিংয়ে যাওয়ার। অবশেষে তার জেদের কাছে হার মেনে রাত ৮টা বাজে আবরার শপিংয়ে নিয়ে গিয়ে এই জামাটা কিনে দিয়েছে তাকে।
মেহরিন বেগম মাত্রই রুমে প্রবেশ করেছে। এমন সময় পিউও’র কথাটা শুনে তিনি নালিশ জানাতে ভুললেন না। একে একে বলতে লাগলেন কীভাবে রাতের বেলা সায়েরী জেদ চেপে বসেছিল নতুন জামা কিনবে বলে। উনার কথাগুলো শুনে সরু চোখে চাইলো সায়েরীর দিকে। মেহরিন বেগম প্রস্থান করতেই সে জহুরি চোখে তাকিয়ে বলে উঠলো,
‘ তুই তো এমন ভাবে জেদ চেপেছিস যেনো প্রেমিকের সাথে দেখা করতে যাবি৷ এই রঙ না পরলে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে। ঘটনা কি? কাকে দেখানোর জন্য এতো তোরজোর শুনি? ‘
একথা শুনে সায়েরীর গাল ফুলে উঠলো। নিশ্চুপ সে নজর লুকাল পিউ’র জহুরি নজর হতে। এই দৃশ্যে পিউ’র সন্দেহ যেনো বিশ্বাসে পরিণত হলো। বিশ্বাস, অবিশ্বাসের মাঝে আটকে সে অবাক কন্ঠে বললো,
‘ হায় আল্লাহ! সায়ু, তুই সত্যি সত্যিই প্রেমে পড়েছিস?? ‘
সায়েরী আঁতকে উঠল। দৌড়ে গিয়ে রুমের দরজা লাগিয়ে দিল দ্রুত। চাপা স্বরে বললো,
‘ আস্তে বলো। কেউ শুনে ফেলবে। ‘
পিউ’র খেয়াল নেই সেসবের দিকে। সে হা করে তাকিয়ে রইলো সায়েরীর লাজে রাঙা মুখখানার দিকে। সায়েরী কাছে আসতেই সে হাত টেনে পাশে বসিয়ে দিলো। ভিতরের উত্তেজনা চেপে রাখতে না পেরে বলে উঠলো,
‘ কবে থেকে প্রেম করছিস? তুই প্রেম করছিস অথচ আমি জানি না! ছেলেটা কে? কলেজের নাকি? নাম কি? বল তাড়াতাড়ি। ‘
‘ প্রেম করছি সেটা কবে বললাম? ‘ সায়েরীর মিনমিন কন্ঠের জবাব।
‘ তাহলে? প্রেমে পড়েছিস! ‘
ঠোঁটে ঠোঁট চেপে মাথা নত করে ফেললো সায়েরী। শ্বাস আটকে অস্ফুট স্বরে বললো, ‘ হয়তো। ‘
‘ এটা কেমন উত্তর? আচ্ছা ছেলেটা কে সেটা বল। পরিচিত কেউ? আমি চিনি? ‘
মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো সায়েরী। তা দেখে কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে কিছু একটা চিন্তা করলো পিউ। এরপর আচমকা দাঁড়িয়ে গিয়ে চোখে মুখে একরাশ বিষ্ময় নিয়ে বলে উঠলো,
‘ সাফওয়ান ভাই! তুই কি সাফওয়ান ভাইয়ের কথা বলছিস, সায়ু? ‘
অস্বস্তি, বিষ্ময়ে হাসফাস করে উঠলো সায়েরী। অবাক কন্ঠে সুধাল, ‘ তুমি কি করে বুঝলে? ‘
পিউ বুকে হাত চাপড়ে চেঁচিয়ে উঠে,
‘ মাই গড! মানে সত্যি সত্যিই সাফওয়ান ভাই? আমার বিশ্বাস হচ্ছে না। কীভাবে কি? একটু চিমটি কাট তো। ‘
বলেই হাত বাড়িয়ে দিলো পিউ। সায়েরী ভোঁতা মুখে হাত টেনে পুণরায় পাশে বসিয়ে দিলো পিউ’কে। বললো,
‘ তুমি কি করে আন্দাজ করলে সেটা বলো। ‘
‘ আরে তোরা বান্দরবান থেকে ফিরার কিছুদিন পর জিমন একদিন বলেছিল, সাফওয়ান ভাই হয়তো-বা তোকে পছন্দ করে। সে নিজেও সিউর ছিলো না। সন্দেহ করেছিলো এই আরকি। আমি শুনেই উড়িয়ে দিয়েছিলাম একথা৷ কিন্তু এখন তো মনে হচ্ছে ঘটনা ভিন্ন। আমার কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছে না রে সায়ু। মানে সাফওয়ান ভাই আর তুই? হাউ ম্যান, হাউ?? ‘
বলতে বলতে ধপ করে শুয়ে পড়লো সে। একই ভঙ্গিমায় শুয়ে পড়লো সায়েরী নিজেও। পিউ’র কথার প্রতিউত্তর স্বরূপ সে ঠোঁট উলটে বললো,
‘ কেন? কীভাবে? এসব তো আমিও বুঝতে পারছি না পিউ দি। ‘
মাথার নিচে একহাত রেখে সায়েরীর দিকে কাত হয়ে শুলো পিউ। কৌতুহলী কন্ঠে বললো,
‘ সাফওয়ান ভাই তোকে পছন্দ করে সেটা বলেছে কি? ‘
‘ উঁহু। ‘
‘ তাহলে বুঝলি কি করে? তুই-ই বা হঠাৎ উনার উপর দুর্বল হলি কি করে? রোবন মানব ছাড়া তো কথায় বলতি না। এখন সেই রোবট মানবেরই প্রেমে পড়ে গেলি? কিভাবে? ‘
বুকের উপর বালিশ জড়িয়ে তাতে মুখ গুঁজল সায়েরী। নিম্ন কন্ঠে বলতে আরম্ভ করলো,
‘ উনাকে আমার কেনো পছন্দ এর সঠিক ব্যাখা আমারও জানা নেই। আজ থেকে পাঁচ আগেও প্রথম দেখায় উনার উপর আকর্ষিত হয়েছিলাম আমি। যেটা শুধু আকর্ষন ছিলো। আর কিছু না। কিন্তু.. কিন্তু বিগত কিছুদিন ধরে উনাকে নিয়ে অন্যকিছু অনুভব করছি। এর আগে কখনো, কারো প্রতি আমার এমন অনুভূতি হয়নি জানো! আব্বু আর ভাইয়ার পরে আয়ান আমার লাইফের বেস্ট একজন৷ যাকে আমি চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করি। কিন্তু সাফওয়ান ভাই! উনি বোধহয় এদের কেও ছাড়িয়ে গিয়েছেন। বান্দরবান এর সেই ঘটনার পর আরও কতো কিছু ফেস করেছি। সব সময় মানুষটা ডাল হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো।
এমন এমন কিছু মুহুর্ত ছিলো, যখন আমি প্রচন্ড হেল্প লেস ফিল করেছি। ঠিক ওই মুহুর্তে উনি এসে ম্যাজিকের মতো সব সমস্যা সমাধান করেছেন। আমার বিপদে উনাকে উদগ্রীব হতে দেখেছি আমি। উনার মতো রুড মানুষটাকে আমার জন্য ব্যাকুল হয়ে দেখেছি। এর চেয়ে বড় চাওয়া কিছু হতে পারে বলো? উনার ছোট ছোট কেয়ার গুলো এখন গিয়ে উপলব্ধি করতে পারছি আমি। ধমকের পেছনে লুকানো চিন্তাগুলো এখন বুঝতে পারছি। অন্য মেয়েদের মতো উনার বাহ্যিক সৌন্দর্য আমাকে দুর্বল করেনি। উনার ব্যাক্তিত্ব দুর্বল করেছে। উপর থেকে কঠোর হলেও উনার ভিতরের নরম মনটা আমি আজকাল ফিল করতে পারছি। ভীষণ ভাবে ফিল করছি। ‘
একনাগাড়ে কথাগুলো বলে থামলো সায়েরী। পিউ’র সাড়াশব্দ না পেয়ে পিটপিট করে চোখ মেলে সে পাশে তাকালো। দেখল, দুইহাত ছড়িয়ে, ফ্যালফ্যাল নজরে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে আছে পিউ। শ্বাস অবধি ফেলছে না। তাকে এমন অবস্থায় দেখে তাজ্জব বনে গেলো সায়েরী। মৃদু ধাক্কা দিয়ে বললো,
‘ তোমার আবার কি হলো? ‘
‘ আমি বেহুশ হয়ে গিয়েছি। চুপ থাক। একটু শোক পালন করতে দে। ‘
সায়েরাই চট করে উঠে বসে। ঘড়ির কাটা নয়টার ঘরে পৌঁছেছে তখন। পিউকে টেনে তুলে সে তাড়া দিয়ে বললো,
‘ শোক পালনের জন্য সারাদিন পরে আছে। আগে আমাকে তৈরি হতে সাহায্য করো। উঠো। লেট হচ্ছে। ‘
‘ মেরুন জামা কি সাফওয়ানের ভাইকে দেখানোর জন্য কিনেছিস? উনি বলেছে নাকি? ‘
সায়েরী লাজুক মুখে জবাব দিলো, ‘ বলেছে হয়তো আকারে ইঙ্গিতে। ‘
পিউ হাত বাড়িয়ে এক হাতের চেপে ধরলো সায়েরীর দুই গাল৷ গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো,
‘ একদম লজ্জায় গাল ফোলাবি না। আমি সিউর তোর এই গাল দেখে সাফওয়ান ভাই পটে গেছে। মাই গড সায়ু! আমার ক্রাশ বয় তোর গাল দেখে পটে গেছে একথা আমি বিশ্বাস করতে পারছি না। আ’ম সো জেলাস। ‘
সায়েরী হেসে উঠলো। জবাব না দিয়ে জামা নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে গেলো। সাফওয়ানের উপর তার চেনা পরিচিত সব মেয়েই দুর্বল। একথা তার বেশ ভালো করে জানা আছে। পিউ বিলাপ করছে ঠিকই। সেই সাথে খুশি মনে সায়েরীকে তৈরি হতে সাহায্যও করছে। পুরোপুরি তৈরি হয়ে যেতেই সে কিছুটা দুরত্বে দাঁড়িয়ে সায়েরীকে আগাগোড়া পরখ করে বলে উঠলো,
‘ বাহ! সাফওয়ান ভাইয়ের পছন্দ আছে বলতে হবে। মেরুন রঙে তোকে ভীষণ সুন্দর লাগছে। যার উদ্দেশ্য এতো সাজগোছ, আজ সে…. ‘
‘ চুপ করো!!!!! তুমি বুঝতে পারছো না আমার লজ্জা লাগছে? ‘
পিউ হেসে উঠলো। সায়েরীর গাল টেনে বললো,
‘ আচ্ছা, দিলাম না লজ্জা। এবার বল, তোর বন্ধুরা জানে? নাজরাত? ও জানে? ‘
‘ উঁহু। কাউকে বলিনি। ‘
‘ সে কেমন কথা? ওর কাছে তো কিছুই গোপন রাখিস না। এটা বললি না কেনো? ‘
হাসফাস করে উঠলো সায়েরী। মিনমিন কন্ঠে বললো,
‘ আসলে..আমার না ভীষণ ভীষণ লজ্জা লাগছে। আমি মুখ দিয়ে একথা বলতেই পারবো না। কখনোই না। ‘
পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে লালা, সাদা রঙে রঙ্গিন করেছে আজ কলেজ ক্যাম্পাস। নব্বই শতাংশ স্টুডেন্ট পরিধান করেছে লাল, সাদা সংমিশ্রণের বস্ত্র। মাঠজুড়ে স্টুডেন্টস দের ছড়াছড়ি। একপাশে স্টেজ করা হয়েছে। এবারেও নানান পারফরম্যান্স এর আয়োজন করা হয়েছে। অনার্স ভবনের নিচ তলায় একটা রুমের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে সাফ্রিন, নাজরাত এবং ফায়াজ। তিনজনই চুপচাপ নিজ নিজ ভাবনায় মশগুল হয়ে আছে। সাফ্রিন’কে আজকাল বড্ড বেশি রেসট্রিকশন মেনে চলতে হচ্ছে। সপ্তাহ খানিক আগের ঘটনায় নওশাদ খান সত্যিই দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন। ছেলে, মেয়ের জীবন রক্ষার্থে টিকেট ছেড়ে দিবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলেন। কিন্তু সাফওয়ানের মনোবলের কাছে উনার দুর্বলতা হেরে গিয়েছে। কিন্তু চাপ বেড়েছে সাফ্রিনের উপর। আজও তাকে আসার পথে বাঁধা দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে সাফওয়ান নিয়ে এসেছে নিজের সঙ্গে।
সাফ্রিনের কাঁধে মাথা রেখে সাদিফের সাথে চ্যাটিং-এ ব্যাস্ত নাজরাত। মুখে মিটিমিটি হাসি। সম্পর্ক এখন আপনি থেকে তুমি-তে নেমে এসেছে দুজনের। কৃতিত্ব-টা অবশ্য সাদিফেরই।
অন্যদিকে ফায়াজের ভাবনার ব্যাপারে জানা নেই বাকি দুজনের। কপাল কুঁচকে মুখে একরাশ গম্ভীর্য নিয়ে কি যে ভাবছে সে , তা বুঝে উঠতে পারলো না বাকি দুজন। এমন সময় সেখানে এসে উপস্থিত হলো আয়ান এবং নুহাশ। মাত্রই ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেছে তারা। উপস্থিত তিনজনের দিকে তাকিয়ে আয়ান বলে উঠলো,
‘ সায়ু আর তোহা আসেনি? ‘
‘ তোহা এসেছে। এই রুমেই গেলো বোধহয়। ‘
আয়ান কিছু না বলে ক্লাসরুম টাতে প্রবেশ করলো। হাতে থাকা গিফট বক্সটা কোথাও রাখা প্রয়োজন। সায়েরী আসলেই নাহয় দেওয়া যাবে তাকে। এই ভাবনা নিয়েই ক্লাসরুম টাতে প্রবেশ করলো সে। প্রবেশ করতেই চোখে পড়লো, সাদা রঙের কামিজ পরিহিতা, পরিচিত নাদুসনুদুস মেয়েটার দিকে। সাদার উপর লাল কারুকাজ করা কামিজ পরেছে তোহা। কাঁধের দুইপাশে মেলে রেখেছে উড়নাটা। পিট সমান চুলগুলোর অর্ধেক ক্লিপ দ্বারা আটকানো। মুখে হালকা প্রসাধনী। কানে ছোট ছোট ঝুমকা। এছাড়া অন্য কোনো অর্নামেন্টস নেই। বাম কানে এক হাত চেপে সে ফ্লোরে উঁকিঝুঁকি মারছে। আয়ানের উপর দৃষ্টি পড়তেই একপলকের জন্য তাকিয়ে পুণরায় চোখমুখ অসহায় করে দৃষ্টিপাত করলো ফ্লোরে। সে কি করছে বুঝে উঠতে না পেরে আয়ান ভ্রুঁ কুঁচকে বললো,
‘ কি হয়েছে? কি খুঁজছিস? ‘
‘ আরে আমার কানের দুল এর হুকটা পড়ে গিয়েছে এখানে কোথাও। খুঁজে পাচ্ছি না। একটু দেখ না প্লিজ। ‘
বলে আবারো ঝুঁকে গেলো সে। সুক্ষ্ম চোখে খুঁজতে লাগলো কানের দুলের হুক। হাতের বক্সটা ব্যাঞ্চের উপর রেখে আয়ান বলে উঠলো,
‘ তোর চশমা কোথায়? ‘
‘ এখানেই কোথাও রেখেছিলাম। ভুলে গিয়েছি। ‘
আয়ান নিজেই তাকালো আশেপাশে। এক কোনায় ব্যাঞ্চের উপর একত্রিত তিনটা পার্স ব্যাগ রাখা। পাশেই তোহার রাউন্ড গ্লাসের চশমাটা পড়ে আছে। সেটা হাতে নিয়ে তোহার কাছে এগিয়ে আসলো আয়ান। সম্মুখে দাঁড়াতেই তোহা মাথা তুলে চাইলো প্রশ্ন চোখে। এক হাতে তখনো কানের ঝুমকাটা ধরে আছে সে। আয়ান কোনো কথা না বলে নিজেই চশমাটা লাগিয়ে দিলো চোখে। এরপর বললো,
‘ চুপচাপ দাঁড়া। আমি দেখছি। ‘
বলতে বলতে সে নিজেই উঁকিঝুঁকি মারলো ফ্লোরে। এবং ভাগ্যবশত কয়েক সেকেন্ডের মাঝেই পেয়ে গেলো কাঙ্ক্ষিত বস্তুটি। তোহাকে দেখিয়ে বললো,
‘ দেখ তো, এটা খুঁজছিলি নাকি? ‘
‘ হ্যাঁ। এটাই তো। ভাগ্যিস পেয়েছিস তুই। নয়তো আজ কি যে হতো। ‘
কথা বলতে বলতে সে চেষ্টা চালানো হুকটা লাগানোর। পরপর কয়েকবার চেষ্টা করার পরেই সঠিক দিশা খুঁজে পেলো না সে। ব্যাপারটা লক্ষ্য করে চলে যেতে গিয়েও থেমে গেলো আয়ান। পুণরায় কাছে এসে বললো, ‘ আমি হেল্প করবো? ‘
তোহা এমনিতেই বিরক্ত হয়ে উঠেছিলো হুক লাগাতে না পেরে। আয়ান বলা মাত্র সে ঘাড় হতে চুল সরিয়ে হুকটা এগিয়ে দিয়ে বলে উঠলো,
‘ লাগিয়ে দে তো। খুঁজেই পাচ্ছি না আমি। ‘
ছোট্ট হুকখানা হাতে নিয়ে তোহার কানের উলটো পিঠে দৃষ্টি দিতেই চোখ ছোট ছোট করে ফেললো আয়ান। টকটকে লাল হয়ে উঠা যায়গাটাতে মৃদু চাপ দিতেই তোহা অস্ফুট স্বরে আর্তনাদ করে উঠলো, ‘ আহ!! লাগছে।
আয়ান দ্রুত হাত সরাল। টেনে বের করে ফেললো মিডিয়াম সাইজের ঝুমকাটা। সঙ্গে সঙ্গে কান চেপে ধরলো তোহা। ব্যাথায় মুখ বিকৃত করে বলে উঠলো,
‘ করছিস টা কি? হুক লাগিয়ে দিতে বলেছিলাম। ঝুমকা বের করতে বলিনি। ‘
বলার সঙ্গে সঙ্গে আয়ান ধমকে উঠলো তাকে।
‘ কানের কি অবস্থা হয়েছে দেখেছিস? এই অবস্থায় এই ভারী-ভারী দুল পরার কি দরকার? তোরা মেয়েরা পারিসও বটে। ‘
‘ কিছু হবে না। আমাদের অভ্যাস আছে। তাছাড়া এই আউট ফিট এর সাথে কান খালি থাকলে একদম বেমানান লাগবে। দে ঝুমকা। আমি লাগিয়ে নিচ্ছি। ‘
আয়ান দিলো না। বরং তোহাকে অবাক করে তার চুলের ক্লিপটা খুলে উন্মুক্ত করে দিলো সব চুল। এরপর একগুচ্ছ চুল বাম কাঁধে এনে নির্লিপ্ত কণ্ঠে বললো,
‘ একদম বেমানান লাগবে না। এভাবেই থাক। সুন্দর লাগছে। ‘
তোহা থমকে গেলো একথা শুনে। ফ্যালফ্যাল নজরে তাকিয়ে রইলো আয়ানের দিকে। চুল হতে দৃষ্টি সরিয়ে আয়ান নিজেও তাকালো। কাঁচের গ্লাসের অপর প্রান্তে আইলাইনারের সরু প্রলেপ লাগানো হরিণী টানা দুই চোখের বিষ্ময় ভাব দেখে বাস্তবে ফিরলো সে। দ্রুত চুল হতে হাত সরিয়ে নিলো। অস্বস্তি অনুভব করে তোহার হাতে ঝুমকাটা ধরিয়ে দিয়ে বেরিয়ে গেলো দ্রুত পায়ে৷ তোহা স্তব্ধ মুখ দাঁড়িয়ে তখনো। আয়ান বেরিয়ে যেতেই লজ্জা পেয়ে মাথা ঝুঁকিয়ে ফেললো সে। অবচেতনেই হোক না কেনো, এটুকু প্রসংশা পেয়ে পুলকিত হলো তার হৃদয়। অপর কান হতেও ঝুমকা খুলে নিয়ে চুল ছড়িয়ে দিলো দুই প্রান্তে।
আয়ান বের হতেই কানে আসলো সাফ্রিন এবং নুহাশের উচ্চ কন্ঠের ঝগড়াঝাটি। কি হয়েছে জানতে চাওয়া মাত্র সাফ্রিন নালিশ দিতে লাগলো একে একে। আজ সে অফ হোয়াইট কালারের টপ পরেছিল। সঙ্গে একই রঙের লং কটি, এবং জিন্স। চুলগুলো হাই পোনিটেল করে বাঁধা। বরাবরের মতোই কোনোরূপ প্রসাধনী মাখেনি মুখে। এমনিতেই চোখ ধাধানো সৌন্দর্যের অধিকারীনি সে। আজও সুন্দর লাগছিলো মাত্রাতিরিক্ত। কিন্তু নুহাশ তাকে দেখা মাত্র ফিচেল হেসে বলেছে,
‘ আবে, কাকুর মেয়ে! তোকে তো আজকে পুরাই ফার্মের মুরগী লাগছে রে। একদম খাঁটি ব্রয়লার মুরগী। ভেরি নাইচ। ‘
সাফ্রিনের কথাগুলো শুনে আয়ানের হাসি পেয়ে গেলো। কিন্তু সাফ্রিনের রাগান্বিত মুখশ্রী দেখে হাসতে পারলো না। তাই নিঃশব্দে সরে গেল। গিয়ে বসলো ফায়াজের পাশে। সে মোবাইল হাতে নিয়ে বসে আছে কিন্তু বার বার গেইটের দিকে তাকাচ্ছে। আয়ান বুঝল, সায়েরীর অপেক্ষায় আছে সে। ছয় দিন আগে সায়েরীর জন্মদিনেই ফায়াজ নিজের মনের কথাগুলো সায়েরীকে জানাবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো। কিন্তু সেই পরিকল্পনা যখন সফল হলো না, তখন সে ভেবে নিয়েছে আজই বলে দিবে। এখনের কেটে যাওয়া এক একটা দিন সায়েরীকে ভিতর থেকে আরো বেশি দুর্বল করে দিবে সাফওয়ানের প্রতি। যা সে মেনে নিতে পারছে না কোনো ভাবেই। যা বলার আজই বলে দিবে বলে স্থীর হয়েছে সে।
সায়েরীর আগমন ঘটলো আরো মিনিট পাঁচেক পর। বন্ধুরা তখন মাঠে দাঁড়িয়ে পারফরম্যান্স দেখছে। সে এগিয়ে আসতেই ছয় জোড়া চোখ স্থীর হয়ে তাকিয়ে রইলো তার দিকে। সায়েরী এমনিতেই উত্তেজনায় ছটফট করছিল। তন্মধ্যে বন্ধুদের এমন দৃষ্টি দেখে উত্তেজনা দ্বিগুণ হলো তার৷ নুহাশ বুকে হাত দিয়ে বলেই ফেললো,
‘ অনুষ্ঠান আসলে আমার পিচ্ছি বান্ধবীটা কই উধাও হয়ে যায় রে? এই মায়াবতী কই থেকে আইলো? এই মায়াবতী গিরগিটি রে সরা সামনে থেকে। একে আমার সহ্য হচ্ছে না। ‘
তার কথায় হেসে উঠলো বাকিরা। সায়েরী ছোট ছোট চোখ করে রাগী চোখে তাকায়। চিমটি কাটে নুহাশের বাহুতে। অসন্তোষ্ট কন্ঠে বলে,
‘ গিরগিটি বললি কেনো? মেক আপ করলাম কোথায়? ‘
বাহুতে হাত ঘষতে ঘষতে হেসে ফেলে নুহাশ। এবার সিরিয়াস কন্ঠে বলে,
‘ এসব আদা ময়দা মাখার দরকারও নেই তোর। এমনিতেই সুন্দর লাগছে। মাশা আল্লাহ! ‘
‘ উহুম। ধন্যবাদ। ‘
নুহাশ এবার কাছাকাছি এসে ফিসফিস কন্ঠে বললো,
‘ শুন না, দোস্ত! ওইযে, শাড়ি পরা মেয়েটাকে দেখতে পাচ্ছিস?
‘ মেরুন শাড়ী? ‘
‘ হুহ। সুন্দর না? ‘
‘ খুব! ‘
খুশিতে গদগদ হয়ে নুহাশ বলে উঠলো, ‘ ওটার নাম্বার ম্যানেজ করে দে না প্লিজ। ‘
‘ শরম কর। বারো মাসে তেরোটা লাগে তোর? ‘
‘ আরে তেরোটার মধ্যে তিনটাকেও পটাতে পারলাম না আজ অবধি। একটা পটেছিলো বোধহয়, কিন্তু একদিন তিন মিনিট কথা বলেই সব যায়গা থেকে ব্লক করেছে। আমি কি এতো খারাপ বল! ‘
সায়েরী ঠোঁট চেপে হাসে৷ নুহাশের মতো করেই বলে,
‘ একটু না অনেক বেশি খারাপ। এবার চুপ কর। এই গান বাজনা বিরক্ত লাগছে। নাজ! চল না ভিতরে যাই? ‘
বাকিরাও বিরক্ত হচ্ছিলো। সায়েরী যাওয়ার জন্য বলতেই একে একে সকলে উঠে দাঁড়ালো। যেতে যেতে আশেপাশে চোখ বুলালো সায়েরী। কিন্তু কোথাও কাঙ্ক্ষিত চেহারাটার দেখা পেলো না। নিজেদের ডিপার্টমেন্টের দ্বিতীয় তলায় পৌঁছে একে একে সকলে ক্লাসরুমে ঢুকতে লাগলো। সায়েরী পা বাড়াতে গিয়ে থেমে গেলো ফায়াজের ডাকে।
‘ কি হয়েছে? ‘
‘ একটু আমার সাথে আয়। কিছু কথা বলবো। ‘
সায়েরী প্রশ্ন চোখে তাকিয়ে রইলো। আয়ান নিজেও উপস্থিত ছিলো সেই স্থানে। সায়েরীর নিরবতা দেখে আয়ান বললো,
‘ যা তুই ওর সাথে। আমরা এখানেই আছি। ‘
অগত্যা ফায়াজের পিছু নিলো সায়েরী। বারান্দার শেষ মাথায় এসে দাঁড়িয়েছে দুজন। সায়েরী রেলিংয়ের সঙ্গে হেলান দিয়ে দাঁড়ালো। ভবনের নিচের দিকে দৃষ্টি রেখে আশেপাশে তাকিয়ে বললো,
‘ কেনো ডেকেছিস? ‘
ফায়াজ দম নিলো বড় করে। নিজেকে পুরোদমে প্রস্তুত করলো। যেই না মুখ খুলবে এমন সময় আচমকা কিছু দেখতে পেয়ে ছটফটিয়ে উঠল সায়েরী। আয়ানের দেওয়া গিফট বক্সটা ফায়াজের হাতে ধরিয়ে দিয়ে উত্তেজিত কন্ঠে বললো,
‘ এটা রাখ। আমি আসছি। ‘
ফায়াজ অবাক কন্ঠে বললো, ‘ কোথায় যাচ্ছিস? ‘
জবাব না দিয়ে একপ্রকার দৌঁড়ে সিড়ি বেয়ে নেমে গেলো সায়েরী। ফায়াজ কৌতুহল বশত রেলিং ঘেষে নিচের দিকে তাকালো। শুধু মাত্র কোনো এক পুরুষের একঝলক চোখে পড়লো। পেছন থেকে দেখে মনে হলো মানুষটা সাফওয়ান। যা দেখে রাগে, ক্ষোভে চোয়াল শক্ত হলো ফায়াজের। অন্যদিকে, সায়েরীকে চলে যেতে দেখে আয়ান এসে কৌতুহলী কন্ঠে বললো,
‘ সায়ু চলে গেলো কেনো? মাত্রই তো আসলি এখানে। বলেছিস কিছু? ‘
‘ নাহ! ‘
‘ এই মেয়েটাকে নিয়েও আর পারা গেলো না। আচ্ছা, ওকে ছাড়। তুই আমার সাথে আয়। একটু কাজ আছে। ‘
তিন ইঞ্চি উঁচু হিল পরে দুই ধাপ সিড়ি বেয়ে নামতে বেশ বেগ পেতে হলো সায়েরীকে। তারউপর রীতিমতো দৌঁড় নেমেছে। যার কারণে হাঁপিয়ে উঠেছে সে। কিন্তু নিচ তলায় নেমে শুনশান নীরবতা ছাড়া কিছুই মিললো না। কোথায় গেল? এখানেই তো দেখেছিল উপর তলা হতে। একদিকে কলেজের অন্য ভবনগুলো, অন্যদিকে হলো ক্যাম্পাসের পেছনের গেইট। যে জায়গাটা বরাবরই নিরিবিলি থাকে। সায়েরী কৌতুহল বশত সেদিকেই এগিয়ে গেলো ব্যাস্ত পায়ে। শেষ মাথায় পৌঁছে সম্মুখের দৃশ্যটুকু দেখে থমকে গেলো সে। থরথরিয়ে কেঁপে উঠলো শরীর। অবিশ্বাস্য নয়নে সামনে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই দুই কদম পিছিয়ে গেলো সে। তার চেয়ে প্রায় দশ হাত দুরত্বে তিনজন ছেলে দাঁড়িয়ে। যাদের দৃষ্টি ফ্লোরে পড়ে থাকা এক যুবকের উপর। যার নাক ফেটে রক্ত ঝরছে। সম্পূর্ণ মুখশ্রী রক্তে রঞ্জিত হয়ে আছে। চোখজোড়া নিবু নিবু। সম্ভবত জ্ঞান হারাচ্ছে। তার চেয়ে বড় কথা হলো, যুবকটার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে আছে সাফওয়ান। যাকে পেছন থেকে চিনতে বিন্দুমাত্র ভুল হলো না সায়েরীর।
সাফওয়ান বসা হতে দাঁড়িয়ে উপস্থিত ছেলে তিনজনকে নির্দেশ দিলো আহত ছেলেটাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। সেই সাথে সে লক্ষ্য করলো তিনজন ছেলে-ই তার দিকে তাকাতে গিয়েও মাথা নত করে ফেললো। কথামতো তুলে নিলো আহত ছেলেটিকে। তাদের ভাব ভঙ্গি দেখে কি মনে হতে যেন পেছন ফিরে তাকালো সাফওয়ান। সঙ্গে সঙ্গে তার দৃষ্টি আটকে গেলো দশ হাত দুরত্বে অবস্থানরত মেয়েটার উপর। যে চোখ দিয়ে তীব্র রাগ ঝড়ছিলো এতক্ষন, সেখানে এসে ভর করেছে একরাশ মুগ্ধতা। বুকের বাম পাশে জেঁকে বসেছে সুক্ষ্ম ব্যাথাটা৷ যে ব্যাথাটাও আজকাল মিষ্টি লাগে তার কাছে। সাফওয়ান স্থীর চোখে দেখতে লাগলো।
মেরুন আনার কলি ড্রেসটা অসম্ভব মানিয়েছে মেয়েটার হলদেটে তনু-তে। গোলগাল মুখশ্রী’র দুইপাশে কিছু সংখ্যক ছোট ছোট চুল লেপ্টে আছে। বাকি চুলগুলো বরাবরের মতোই খোপায় আটকানো৷ ডাগরডাগর, সম্মোহনী চোখজোড়ায় আজ কালো কাগজের প্রলেপ আঁকা। যা দূর থেকেই নজর কাড়ছে। সেই সাথে অধর জুগল জ্বলজ্বল করছে কৃত্রিম রঙে৷ সহজ ভাষায় বলতে গেলে রেড ওয়াইন লিপগ্লস-এ । যা দেখে ফাঁকা ঢোক গিললো সাফওয়ান। ধীর পায়ে এগোতে এগোতে আরো লক্ষ্য করলো মানুষটার কানের ছোট ছোট ঝুমকা সহ পায়ের ইঞ্চি তিনেক উঁচু হিল জোড়াও। আগাগোড়া পরখ করতে করতে অনেকটা কাছাকাছি পৌঁছে গেল সে।
এদিকে সাফওয়ান দাঁড়াতেই সায়েরীর দ্বিতীয় বারের মতো আতংকের সাথে লক্ষ্য করলো সাফওয়ানের ডান বাহুর ক্ষত চিহ্ন। ধূসর বর্ণের পোলো টি-শার্ট পড়েছিলো সাফওয়ান। যার দরুণ দুই বাহু স্পষ্ট দৃশ্যমান হয়ে আছে। তার ডান বাহু হতে, কনুই এবং আঙুল বেয়ে টুপটুপ রক্তবিন্দু গড়িয়ে পড়ছে ফ্লোরে। যা দেখে শ্বাস আটকে এসেছে সায়েরীর। আতংকিত হয়ে সে রক্তাক্ত হাতটার দিকে তাকিয়ে ছিলো বলে খেয়ালই করলো না কবে সাফওয়ান কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছে তার। খেয়াল হতেই টলমল পায়ে পেছাতে গিয়ে আকস্মিক পা মচকে ধপ করে পড়ে গেলো। মুখ দিয়ে আপনা আপনি মৃদু চিৎকার বেরিয়ে আসলো। সাফওয়ান নিজেও চমকে উঠলো হঠাৎ এমন হওয়ায়। ঘোর কেটে গেলো তার। তপ্ত শ্বাস ফেলে হাটু গেড়ে বসলো সে সায়েরীর অনেকটা কাছাকাছি। অসন্তুষ্ট কন্ঠে বললো,
‘ সব কিছুতে কোনো না কোনো ঝামেলা যুক্ত করতেই হবে তাইনা? শুকনো মাটিতে দিনে চারবার হোচট খাও, তার উপর আজকে হিল পরেছ। ইডিয়ট! দেখি, পা দেখাও৷ ‘
সায়েরী যেন শুনতেই পেলো না কিছু। তার ভীতু নজর তখনো সাফওয়ানের রক্তাক্ত হাতের দিকে। ব্যাপারটা বুঝতে পেরে তার থুতনি চেপে নিজের দিকে ফিরিয়ে দিলো সাফওয়ান। শান্ত কন্ঠে বললো,
‘ ওদিকে তাকাতে হবে না। সামান্য কেটেছে। নাথিং সিরিয়াস। ‘
সায়েরীর মুখখানা আতংকে রক্তশূণ্য হয়ে উঠেছে। জ্বলজ্বল করছে চোখ। সাফওয়ানের দিকে তাকিয়ে সে কম্পিত কন্ঠে বলে উঠলো,
‘ ছেলেটা আপনাকে মারতে চেয়েছিলো কেনো? আমি স্পষ্ট দেখেছি। ছুরি তুলেছিলো, আপনার পেছনে দাঁড়িয়ে। ‘
‘ বিরোধী দলের লোক ছিলো। বাবাকে হারাতে চাই, আর কিছু না। আমার কিছু হয়নি। এইটুকুন ব্যাথা। সেরে যাবে দ্রুত। ‘
এতো সাবলীলভাবে বলা কথাগুলো শুনে সায়েরী ফ্যালফ্যাল নজরে তাকিয়ে রইলো। বিস্তারিত কিছু জানতে চাইলো না কারণ সাফ্রিনের কাছে এই বিষয়ে শুনেছে আগেই। পরপর দুইবার সচক্ষে সাফ্রিন এবং সাফওয়ানের উপর আক্রমণ হতে দেখে, মনে ভয় জেঁকে বসলো তার। তার এমন চিন্তমগ্ন চেহারা দেখে সাফওয়ান উঠে দাঁড়িয়ে বাম বাড়িয়ে দিলো তার দিকে। খানিকটা ইতস্তত বোধ করলেও শেষ অবধি হাত ধরেই উঠে দাঁড়ালো সায়েরী। ডান পায়ের গোড়ালিতে চাপ পড়তেই ব্যাথা অনুভব করলো অল্প। জামা ঠিক করে, এলোমেলো হয়ে যাওয়া দোপাট্টা পুণরায় ঠিক করলো। মুখের উপর বিরক্ত করা চুলগুলো সরাতে গেলেই তার হাতের আগে এগিয়ে আসলো অন্য একটি হাত। সঙ্গে সঙ্গে চোখ তুলে তাকালো সায়েরী। সাফওয়ানের গভীর দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলতেই রক্তিম হয়ে উঠলো মুখশ্রী। বাম হাত দ্বারা তার ছোট ছোট চুলগুলো মুখের উপর হতে সরিয়ে দিলো সাফওয়ান। এরপর হুট করে অনামিকা আঙ্গুল দ্বারা ছুঁয়ে দিলো কাজল লাগানো চোখের কার্নিশ। সায়েরী অবুঝ চোখে তাকাতেই সে ঝুঁকে এসে ঝুমকা পরিহিতা কানের পিঠে আঙুল ছুঁয়ে মৃদু কন্ঠে বলে উঠলো,
‘ বোকাপাখি’র এই মায়াবতী রূপে কারো নজর না লাগুক। ‘
নিস্তব্ধ পরিবেশ। কলেজের পেছন দিকের ভবনে গান বাজনার শব্দ একেবারে পাওয়া যাচ্ছে না বললেই চলে। এমন নিস্তব্ধতায় এক টগবগে তরুণের সম্মুখে একাকী, নত মস্তকে দাঁড়িয়ে আছে সায়েরী। তার কেমন অনুভূতি হচ্ছে তা বর্ণনা করা মুশকিল। কারণ, এই অদ্ভুত অনুভূতির কোনো সংজ্ঞা তার নিজেরও জানা নেই। উঁহু! কোনোরূপ ভয়, ভীতিকর অনুভূতি নয় এটি। এই অনুভূতি ভালোলাগার। এই তো মিনিট খানিক আগে, তার সম্পূর্ণ সত্তা’য় কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছিল সাফওয়ানের বলা সামান্য একটা বাক্য। সম্মোহনী কন্ঠে উচ্চারিত ‘আমার বোকাপাখি’ সম্মোধনটা এখনো কানে বেজে চলছে তার। রন্ধ্রে রন্ধ্রে শিহরণ বয়ে চলছে এখনো অবধি। রক্তিম হয়ে উঠেছে মুখশ্রী। পেটে উড়ুউড়ি করছে অংসখ্য প্রজাপতি। সাফওয়ান সটানভাবে দাঁড়িয়ে আছে তার চেয়ে কিঞ্চিৎ দুরত্বে। ঠিক কি করছে তা ঠাহর করতে পারলো না সায়েরী। সেই যে মাথা নত করেছে, এরপর আর তুলেইনি। ফাঁকে একবার লক্ষ্য করলো পকেট হতে মোবাইল বের করেছে সাফওয়ান। কয়েক সেকেন্ড সেটাতে আঙুল চালিয়ে পুণরায় তা ঢুকিয়ে নিয়েছে পকেটে। এরপর বিনা বাক্যে,বিনা সংকোচে নিজের পুরুষালী হাতের ভাঁজে সায়েরীর নরম একহাত মিশিয়ে বললো, ‘ চলো।’
অনেকটা বাধ্যগত হয়ে, প্রশ্ন মুখে তার সঙ্গে পা বাড়ালো সায়েরী৷ মানুষটার লম্বা লম্বা পদচারণের সঙ্গে তাল মিলাতে বেশ কসরত করতে হলো তাকে। রীতিমতো দৌড়ের গতিতে পা চালিয়েও একত্র হতে পারলো না সে। ব্যাপারটা দৃষ্টিগোচর হওয়া মাত্র সাফওয়ান গতি কমিয়ে আনলো নিজের। ধীরে সুস্থে এগিয়ে চললো সামনের দিকে। তার এহেন কান্ডে সায়েরী আরও একবার পুলকিত হয়। লজ্জা, ভালোলাগার মিশ্র অনুভূতিতে বুঁদ হয়ে গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে চললো অজানা গন্তব্যে। ভবনের মাঝামাঝি ফাঁকা একটা ক্লাসরুমে প্রবেশ করেছে দুজন। হাট করে খোলা দরজা৷ জনশূন্য ক্লাসরুম৷ সায়েরী অবুঝ চোখে তাকিয়ে রইলো শুধু। সাফওয়ান তার ভাব গতি বুঝে নিজের রক্তাক্ত ডান হাত মৃদু ঝাড় মেরে বেঞ্চের দিকে ইশারা করে বললো, ‘ বসো। ‘
ফ্লোরে ছিটকে পড়া বিন্দু বিন্দু রক্ত ফোঁটা গুলো দেখে গলা শুকিয়ে আসলো সায়েরীর। একবুক উৎকন্ঠা নিয়ে সে সুধাল,
‘ এখনো রক্ত পড়ছে। ব্যান্ডেজ না করে বসে আছেন কেনো? হসপিটালে যান। এভাবে থাকলে ইনফেকশন হতে পারে। জিমন ভাইয়াদের কে হলেও ব….. ‘
‘ হুশশ! চুপ। ‘ কথার মাঝে আচমকা নিজ অধরের উপর সাফওয়ানের তর্জনী ছুঁতেই কন্ঠ থেমে গেলো সায়েরী’র৷ নিজের অনেকটা কাছাকাছি সাফওয়ানের উপস্থিতি ঠের পেয়ে আবারও তীব্র হলো তার হৃদস্পন্দন। ড্যাবড্যাব চোখ করে তাকিয়ে রইলো সে। সাফওয়ান হাত নামালো। কদম এগিয়ে ঘনিষ্ঠ হলো আরও কিছুটা। সঙ্গে সঙ্গে পা পিছিয়ে নিলো সায়েরী। কোমর ঠেকল বেঞ্চের সাথে। সাফওয়ান পুণরায় কদম বাড়ালো। বেঞ্চের দুইপাশে হাত রেখে ঝুঁকে আসলো সম্মুখের মায়াময়ী মুখশ্রী-টির নিকট।
খুব সুক্ষ্ম চোখে অবলোকন করলো ফুলোফুলো গাল জোড়ার আরক্তিম আভা, উৎকন্ঠায় ঘন ঘন ভারী পল্লব ঝাপটানো, চোখের ইঞ্চিখানেক নিচে ক্ষুদ্র তিলটা৷ সেই সাথে প্রবল উত্তেজনায় শ্বাস নেওয়ার তাগিদে কিঞ্চিৎ ফাঁক ঠোঁট জোড়া। যা রক্তিম রঙে রাঙিয়েছে আজ। সাহসা দৃষ্টি সরিয়ে নিলো সাফওয়ান। বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকলে যেন খুব অন্যায় কিছু হয়ে যাবে। বেঞ্চে ঠেকানো হাতজোড়া মুষ্টিবদ্ধ হলো তার। শ্বাস ফেললো বুক ফুলিয়ে। উষ্ণ নিশ্বাসটুকু সায়েরীর মুখ ছুঁয়ে যেতেই, এই যাত্রায় চোখ খিচে ফেললো সে। হাসফাস করে উঠলো তীব্র লজ্জায়। সাফওয়ানের এই গভীর দৃষ্টির তোপ সহ্য করতে না পেরে শ্বাস আটকে মিনমিন কন্ঠে বললো,
‘ এ..এভাবে তাকাবেন না, প্লিজ। ‘
চকিতে ফিরে তাকালো সাফওয়ান। লজ্জায় গুটিয়ে যাওয়া রক্তিম মুখশ্রীটি দেখে, মিনমিন কন্ঠের আবদার টুকু শুনে অধর কোণে বক্র হাসি ফুটল তার। অনেকটা দুষ্টুমির ছলে ঘাড় কাত করে সুধাল, ‘ কীভাবে তাকাচ্ছি? ‘
এবার বোধহয় লজ্জায় মরেই যাবে সায়েরী। নত করে রাখা মস্তক সাফওয়ানের কৌতুক কন্ঠের বাণীতে আরও নত হয়ে গেল। থুতনি ঠেকল বুকের সঙ্গে। বিড়বিড় করে নিজ মনে আওড়াল,
‘ উনি কি বুঝতে পারছেন না, আমি লজ্জা পাচ্ছি? এভাবে আরও লজ্জা দিচ্ছে কেনো? ‘
হঠাৎ গালে উষ্ণ ছোঁয়া পেলো৷ সাফওয়ান তার কানের নিচে বাম হাত গলিয়ে মুখ উপরে তুলেছে। বৃদ্ধ আঙ্গুল দ্বারা থুতনি উঁচু করে ধরেছে, অবশিষ্ট চার আঙ্গুল ছুঁয়েছে চোয়াল, ঘাড়, কান। সায়েরী বিবশ হয়ে রইলো। এটুকু স্পর্শে তার ছোট্ট তনু-তে কম্পনের সৃষ্টি হলো। গলা শুকিয়ে চৌচির। মানুষটা না ছুঁয়েও বুকে অদ্ভুত অনুভূতি’র উৎপত্তি ঘটায়। আর ছুঁয়ে দিলে ইলেক্ট্রিক শকের মতো কেঁপে উঠে সর্বাঙ্গ। সে যখন নিজ অনুভূতিগুলোর সঙ্গে নিরব যুদ্ধে মত্ত, ঠিক সেই মুহূর্তে সাফওয়ান নিজের রক্তাক্ত ডান হাতে ধরে রাখা ধবধবে সাদা একখানা রুমাল দিয়ে ঘষা মারলো সায়েরীর লালচে ঠোঁট জোড়ায়। আচমকা তার এমন কান্ডে বোকা বনে গেলো সায়েরী। কপাল কুঁচকে, বিষ্ময় চোখে তাকালো। রুমালে চাপা পড়লো তার বিমূঢ় কন্ঠ, ‘ এটা কি করলেন? ‘
সাফওয়ান যেন শুনেও শুনলো না। একই ভঙ্গিতে পুণরায় রুমালের সহিত অবশিষ্ট লিপগ্লসটুকু মুছে ফেললো সে৷ এরপর ঝটপট রুমালটা পকেটে ঢুকিয়ে নিলো। সায়েরীর ঠোঁটের আশেপাশে লালচে হয়ে যাওয়া জায়গাটাতে বৃদ্ধ আঙ্গুল ছুঁয়ে দিলো। দেহের কম্পনকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে গমগমে গলায় বললো, ‘ আর কখনো ঠোঁটে লিপস্টিক লাগিয়ে আমার সামনে আসবে না। ‘
বিমূঢ় সায়েরী যন্ত্রের মতো চট করে প্রশ্ন করলো, ‘ কেনো? ‘
সাফওয়ান গভীর চোখে তাকায়। সায়েরীর একহাত ঠেনে নেয় বুকে। ঠিক বুকের বাম পাশে হাতটা চেপে ধরে লম্বা শ্বাস নিয়ে, কন্ঠে খাদ নামিয়ে বলে,
‘ এখানে ব্যাথা করে, মাথা ঝিমঝিমিয়ে উঠে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে চাই। ‘
এটুকু বলে আরও একটু কাছ ঘেঁষল সে৷ ফিসফিস কন্ঠে বললো,
‘ সত্যিই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে, এই তোপ তুমি সামলাতে পারবে না। তখন কিন্তু দায়ভার আমি নিব না। ‘
স্তব্ধ সায়েরী কথাটার গভীরতা বুঝে উঠতে পারলো না। কিন্তু তার হাতের নিচে অস্বাভাবিক গতিতে লাফাতে থাকা সাফওয়ানের হৃদস্পন্দন অনুভব করে টালমাটাল হয়ে উঠলো সে। নিজের হৃদ কম্পনের গতিও বাড়লো। বাদামি চোখজোড়ার গভীর দৃষ্টি ঠাহর করতে পেরে গাল গরম হয়ে উঠলো তার।
‘ আবার কোন উল্লুকের গর্দান নিয়েছিস রে তুই? এবার কোথায় লাগল? ফার্স্ট এইড বক্স লাগছে কেন? ‘
উচ্চ কন্ঠে কথাগুলো বলতে বলতে হাট করে খোলা দরজা পেরিয়ে ভিতরে ঢুকলো মিহাদ। রুমে অবস্থানরত দুজন আচমকা তার আগমনে হকচকিয়ে গেলো। সাফওয়ান দ্রুত সরে গেল সায়েরীর নিকট হতে। মিহাদের আকস্মিক আগমনে সায়েরী বেশ বিভ্রান্তি তে পড়লো। অন্যদিকে মিহাদ বিনা দ্বিধায় ক্লাসরুমে প্রবেশ করলেও ভিতরের দৃশ্যটুকু দেখে ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলো। স্পষ্ট দেখেছে সাফওয়ান ঝুঁকে ছিলো সায়েরীর মুখোমুখি, কাছাকাছি। যা দেখে সে থমকে গেলেও মুখ থামলো না। বিড়বিড় করে বলেই ফেললো,
‘ লে হালুয়া! এখানে তো দেখি বিনা টিকেটে-ই মুভি চালু হয়ে গেছে। ‘
কিন্তু মুখে বললো আরেক কথা। সায়েরীকে বিব্রত হতে দেখে সে অমায়িকভাবে হেসে বলে উঠলো,
‘ আরে সুন্দরী! তোমার কি আজ পথভ্রষ্ট হয়েছিল নাকি?
সায়েরী অবুঝ চোখে তাকায়, ‘ কেনো ভাইয়া? ‘
সাফওয়ানের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি উপেক্ষা করে মিহাদ মিটিমিটি হেসে জবাব দিলো,
‘ না মানে এতো নিশ্চিন্তে যমরাজের গুহায় দাঁড়িয়ে আছো। তাই মনে হলো আরকি। ‘
ইঙ্গিত টুকু বুঝতে পেরে পুণরায় লজ্জা পেয়ে গেলো সায়েরী। তার এমন নাস্তানাবুদ অবস্থা দেখে সাফওয়ান মিহাদের উদ্দেশ্যে গম্ভীর কন্ঠে বলে,
‘ কি চাই এখানে? ‘
‘ ফার্স এইড বক্স আনতে বললি টেক্সট করে। ভাবলাম হয়তো আমারও প্রয়োজন আছে। কিন্তু…. ( সায়েরীর দিকে তাকিয়ে) এখন মনে হচ্ছে না আমাকে আর লাগবে। চললাম আমি৷ ‘
সায়েরী দ্রুত জবাব দিলো,
‘ আপনি ব্যান্ডেজ করে দিন ভাইয়া। আমি..আমি যাচ্ছি। ‘
তার কথাটা শুনা মাত্র সাফওয়ানের দিকে তাকালো মিহাদ। শক্ত চোয়াল এবং অতী মাত্রায় গম্ভীর দৃষ্টি যেন জানান দিচ্ছে,
‘ এক্ষুনি যদি এখান থেকে না বের হোস, তবে এই রক্তাক্ত হাতেই ঘাড় মটকাবো তোর। ‘
দৃষ্টির অর্থ টুকু বুঝতে পেরে ঢোক গিললো মিহাদ। জোর পূর্বক হেসে দ্রুত গলায় সায়েরীকে বললো,
‘ নাহ না!! তুমি থাকো সুন্দ…না মানে সায়েরী। আমাকে যেতে হবে৷ অনেক কাজ আছে। এই মাত্র মনে পড়েছে যে প্রোগ্রামের সব দ্বায়িত্ব প্রধানমন্ত্রী আমাকে শপে দিয়েছে। আমি না গেলে কেলেংকারী বেজে যাবে। আসমান ধসে পড়বে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আজই ঘটে যাবে। বুঝেছ কতটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাক্তি আমি? তাই গেলাম হ্যাঁ? তুমি রোমে..থুক্কু ব্যান্ডেজ করো। মন দিয়ে করো। কোনো তাড়াহুড়ো নেই। পারলে রাতটুকু থেকে যাও। হে হে। আলবিদা। ভালো থেকো।
এক নিশ্বাসে সব কথা বলে একপ্রকার প্রাণ হাতে নিয়ে বেরিয়ে গেলো মিহাদ। তার গমন পথের দিকে হা করে তাকিয়ে রইলো সায়েরী। কি সব বলে গেলো কিচ্ছুটি বুঝতে পারলো না সে। সব যেনো মাথার উপর দিয়ে দিয়ে গেছে। আনমনেই প্রশ্ন করলো,
‘ আশ্চর্য! সামান্য কলেজ প্রোগ্রামের দ্বায়িত্ব প্রধানমন্ত্রী কেনো উনাকে দিতে যাবে? এখানে প্রধানমন্ত্রীর কি কাজ? ‘
কথাটা শুনা মাত্র হতাশ হয়ে কপালে আঙ্গুল ঘষল সাফওয়ান। শ্বাস ফেললো অসহায়ের মতো। দুনিয়ার সব মাথামোটা কি তার কপালেই জুটতে হলো?
তপ্ত শ্বাস ফেলে বেঞ্চে গিয়ে বসলো সে। সায়েরী তাকাতেই খানিকটা অভিনয় করে বললো,
‘ চাইলে চলে যেতে পারো। আই ক্যান হ্যান্ডেল মাইসেল্ফ। ‘
বলেই বাম হাতে বক্স খুলে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম বের করলো। যা করতে গিয়ে কিছুটা কসরত পোহাতে হলো তাকে। সেটা দেখে দমে গেলো সায়েরী। সাফওয়ানের ট্রিকস কাজ করল একেবারে যেমনটা চেয়েছিল তেমন ভাবে। তাকে হিমশিম খেতে দেখে সায়েরী এগিয়ে আসলো দ্রুত। পাশে বসে বক্স টেনে নিলো নিজের দিকে। নিম্ন কন্ঠে বললো, ‘ আমি করছি। ‘
কিন্তু কীভাবে কি করবে বুঝে উঠতে পারলো না বেচারি। প্রশ্নবিদ্ধ দৃষ্টিতে চাইলো সাফওয়ানের দিকে।
‘ আগে তুলো দিয়ে ব্লাড মুছে দাও ‘
কথামতো তুলো হাতে নিয়ে একহাতে সাফওয়ানের বাহুতে হাত রাখলো সায়েরী। দগদগে রক্তাক্ত ক্ষতটা দেখে শরীরের লোমকূপ দাঁড়িয়ে গেলো তার। খুব গভীর ক্ষত নয়। শুধু মাত্র চামড়া ছুঁয়ে বেরিয়ে গিয়েছে চাকুটা। কিন্তু তাতেই রক্তের ফোয়ারা বসে গেছে যেন। সায়েরীর হাত কাঁপছে। সাহস হচ্ছে না এই ক্ষততে তুলো ছোঁয়াতে। ব্যাপারটা লক্ষ্য করে তার হাতের উপর হাত রেখে নিজেই ঘষে ঘষে রক্ত সব মুছে ফেললো সাফওয়ান। যা দেখে আৎকে উঠলো সায়েরী। শ্বাস আটকে আসলো অস্বাভাবিক ভাবে। সাফওয়ান নিজ কার্য শেষ করে পুণরায় বললো,
‘ তুলো-তে সেভলন লাগিয়ে ক্লিন করে দাও। ব্যান্ডেজ করতে হবে না। ডক্টর কে দেখাব। ‘
নিজেকে সামলে কথামতো তুলো ভিজিয়ে নিলো সায়েরী। সাহস সঞ্চয় করে নিজেই ছুঁয়ে দিলো ক্ষতস্থান। সেই সাথে সাফওয়ানের দিকে তাকিয়ে ধীর কন্ঠে জানতে চাইলো, ‘ জ্বলছে? ‘
যান্ত্রিক মানবের মতো মাথা নাড়লো সাফওয়ান। সায়েরী পুণরায় মনোনিবেশ করলো নিজ কার্যে। যন্ত্র সহকারে, ঠোঁট গোল করে মৃদু বাতাস ছেড়ে ক্ষতস্থান পরিষ্কার করছে সে। কাঁচের চুড়ির রিনি রিনি শব্দ তুলছে। সাফওয়ানের ঘোর লাগা, গভীর দৃষ্টি তখন সায়েরী তে নিবদ্ধ। বক্ষস্থলে বয়ে চলেছে এক সুখ সুখ অনুভূতি। এই যে মেয়েটা বিনা সংকোচে তার পাশে এসে বসেছে, যত্ন নিচ্ছে, তার বিপদের আভাস পেয়ে অস্থির হয়ে ছুটে এসেছিলো। এখনো, কোনোরূপ ভয়,ভীতি,অস্বস্তি ছাড়া স্ব-ইচ্ছায় তার সাথে আছে। এসব পদক্ষেপে পুলকিত হয়ে উঠেছে তার হৃদয়। আপন প্রেয়সীর সবচেয়ে বড় ভরসার স্থানটুকু হতে পেরে দাম্ভিকতা ভর করেছে বুকে। এ যেন সবথেকে বড় প্রাপ্তি।
সায়েরীর ধ্যান নেই সেদিকে। তার মনযোগে ব্যাঘাত ঘটলো আচমকা চুলের পাঞ্চ ক্লিপটা খুলে ঝরঝর করে তার এলোকেশ পিঠ ময় ছড়িয়ে পড়ায়। চকিতে দৃষ্টি তুললো সে। সম্মুখের মানবটার গাঢ় বাদামি মণি দুটো তখন তার এলোকেশের ভাঁজে ভাঁজে ঘুরে বেরাচ্ছে। বাম হাতে পাঞ্চ ক্লিপ-টা। সায়েরীর অবুঝ দৃষ্টি দেখে সে লম্বা শ্বাস টেনে শান্ত, ধীর কন্ঠে সুধাল, ‘ এভাবে থাকুক। ভালো লাগছে। ‘
সায়েরী কিছু বলার ভাষা পেলো না। তবে তার বুকের কম্পন ধরা দিলো হাতেও৷ উপচে পড়া লজ্জাটুকু লুকাতে সে পুণরায় নজর দিলো সাফওয়ানের বাহুতে। কিন্তু সেটা স্থির হলো না বেশিক্ষণ। কানের কাছে তপ্ত শ্বাস ফেলে, ভেসে আসা নেশাতুর কন্ঠস্বর-টা এবার থমকে দিলো তাকে। সাফওয়ানের মোহনীয় কন্ঠে দুষ্টুমি স্পষ্ট, ‘ এই সাজসজ্জা কি আমার জন্য? ‘
কথাটা কর্ণগোচর হওয়া মাত্র থমকে গেলো সায়েরী। ধরা পরে যাওয়া চোরের মতো নজর লুকোতে ব্যাতিব্যস্ত হয়ে উঠলো সে। চুপচে গেল মুখ। সাফওয়ানের ঠোঁটের কোণে স্পষ্ট কৌতুকের আভাস৷ এই একটুখানি, তীর্যক হাসিটা আজকাল বড্ড বেশি নাস্তানাবুদ করে ছাড়ে সায়েরীকে। এই মুহূর্তেও বেচারি লজ্জায় পারছে না মাটি ফাঁক করে ঢুকে যেতে। এভাবে ধরা পড়ে যেতে হলো! এতো লজ্জা কোথায় লুকাবে সে!
তাকে এই আকাশস্পর্শী লজ্জার হাত থেকে বাঁচাতে, ক্লাসরুমের বাইরে থেকে একাধিক ব্যাক্তি বর্গের কন্ঠ ভেসে আসলো। যা শুনে মুহুর্তেই নিজের রসিকতা ছেড়ে গম্ভীর ফর্মে ব্যাক করলো সাফওয়ান। পরিচিত কন্ঠগুলো শুনে সে পাঞ্চ ক্লিপ-টা বাড়িয়ে দিয়ে গম্ভীরমুখে বললো,
‘ চুল বাঁধ। ‘
সায়েরী দ্বিমত করলো না। সাফওয়ান গভীর দৃষ্টিতে অবলোকন করছে তাকে। পাতলা ঠোঁট জোড়ার ফাঁকে ক্লিপ আটকে দুইহাতে কোমর ছড়ানো চুলগুলো খোঁপায় আটকে ফেলার দৃশ্য-টা বেশ মনযোগ দিয়ে দেখল সে। যতক্ষণ না হাতদুটো ঘাড় ছুঁয়ে নিচে নেমেছে, ততক্ষণ একধ্যানে তাকিয়ে রইলো। পরপরই রুমে হুড়মুড়িয়ে প্রবেশ করলো নীতি,রায়ান,জিমন এবং সর্বশেষে মিহাদ। একত্রে সকলকে এভাবে প্রবেশ করতে দেখে সায়েরী আরেকদফা চমকাল। দাঁড়িয়ে পড়লো চট করে। কিন্তু উপস্থিত চারজন একেবারে নির্বিকার। সায়েরীকে দেখেও চমকাল না কেউ। যেন জানত এবং জেনেশুনেই এসেছে। সাফওয়ান বিরক্ত মুখে বললো, ‘ কি চাই এখানে? ‘
নীতি’র বাঁকা কন্ঠের জবাব, ‘ ডিস্টার্ব করালাম বোধহয়? ‘
‘ হুম। খুওব! ‘ সাফওয়ানের নির্লিপ্ত কণ্ঠ।
নীতি কৌতুক গলায় সায়েরী’র দিকে তাকিয়ে বললো,
‘ তাই নাকি সায়েরী? ডিস্টার্ব হয়েছো আমরা এসেছি বলে? ‘
বন্ধুদের ঠোঁটের কোণে মিটিমিটি হাসি। যা দেখে সায়েরী আরেক দফা লজ্জায় পড়লো। জুবুথুবু হয়ে সে কোনো রকমে জবাব দিলো,
‘ একদম না আপু। আমি..আমি তো চলেই যাচ্ছিলাম। ‘
বলতে বলতে ছোট ছোট পা ফেলে উদ্যত হলো রুম ত্যাগের উদ্দেশ্যে। ঠিক সেই সময় সাফওয়ান ডাকল অতি মাত্রায় শান্ত কন্ঠে। চিরচেনা সেই নাম ধরে, ‘ সুবহা! ‘
সায়েরী বাধ্য হলো থামতে। দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলতেই সাফওয়ান একই সুরে বললো, ‘ ছুটির পর একা একা বের হবে না। আমি পৌঁছে দিয়ে আসবো। ‘
বাধ্যগত রমণীর মতো ঘাড় কাত করে সম্মতি জানালো সায়েরী। পরপর ছুটে বেরিয়ে গেলো। বিগত মুহুর্ত গুলো ভাবতে গিয়ে চুপসে গেলো বেচারি। আশ্চর্য! আজ কি তার লজ্জা পাওয়ার দিন!
সায়েরী রুম ত্যাগ করা মাত্র বন্ধুদের জেরার মুখে পড়তে হলো সাফওয়ানকে। সকলে কেমন মিটিমিটি হাসছে তার দিকে তাকিয়ে। ভিতরে ভিতরে সে বিব্রত হলো খনিকটা। কিন্তু মুখে যথাসম্ভব গাম্ভীর্য ধরে রেখে বললো,
‘ কি সমস্যা? হাসছিস কেনো পাগলের মতো? ‘
নীতি হাসিমুখেই পাশে এসে বসলো। বকিরাও বসেছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। সাফওয়ানের হাতের ক্ষত টা সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে নীতি গদগদ কন্ঠে বললো,
‘ সায়েরীকে প্রপোজ করেছিস তুই? ‘
সাফওয়ান ভ্রুঁ কুঁচকে তাকায়, ‘ প্রপোজ করতে হচ্ছে কেনো? ‘
‘ কেনো মানে? না বললে বুঝবে কি করে? ‘
‘ এতো বেশি বুঝতে হবে না। যেটুকু বুঝেছে তাতেই হবে। ‘
সাফওয়ানের এমন দায়সারাভাব দেখে বিরক্ত হলো সকলে। তাদের ভাষ্যমতে, মুখ ফুটে না বললে সায়েরী কীভাবে বুঝবে সাফওয়ানের মনের খবর? এটা নিয়ে অনেক্ষন ধরে তারা বুঝালো সাফওয়ানকে। সাফওয়ান চুপচাপ শুধু শুনেই গেল। বন্ধুরা না বুঝলেও, সে যে বুঝে গিয়েছে প্রেয়সীর মনের কথা। যেটা সে অনুভব করতে পারছে ক্ষণে ক্ষণে। ক্ষণিক আগের মিষ্টি মুহুর্তগুলো, লজ্জায় নতজানু হয়ে থাকা মুখটা মনে করে ঠোঁট কামড়ে হাসলো সে। ঠিক তখনি পাশ থেকে মিহাদ নিম্ন কন্ঠে দুষ্টু হেসে বলে উঠলো,
‘ তখন এতো কাছাকাছি, মুখোমুখি, গালে হাত রেখে কি করছিলি বলতো? চুপিসারে চুমু টুমু খাসনি তো আবার?
সাফওয়ান ঘাড় কাত করে, বাঁকা চোখে তাকায়।
‘ চুপিসারে কেনো? তোর সামনে খেলেও কি তুই আটকাতে পারতি? ‘
তার নির্লিপ্ত কণ্ঠের জবাবটা শুনে চোখ বড় বড় করে তাকালো মিহাদ। সে ঘূর্ণাক্ষরেও ভাবেনি সাফওয়ান এতোটা সাবলীলভাবে এমন একটা জবাব দিবে। দুই আঙ্গুল দ্বারা গাল ছুঁয়ে, তওবা পড়ে সে অবিশ্বাস্য কন্ঠে বলে উঠে,
‘ আসতাগফিরুল্লাহ্! নাউজুবিল্লাহ! প্রেমে পড়ে তুই এতোটা নির্লজ্জ হয়ে গিয়েছিস?
অন্যমনস্ক হয়ে জনশূন্য বারান্দায় হেঁটে চলছে সায়েরী। আচমকা পথ রুখে দাঁড়ালো কেউ৷ হটাৎ আগমনে, অন্যমনস্ক থাকায় সে ভয় পেয়ে গেলো। ফায়াজ দাঁড়িয়ে, ঠিক তার সম্মুখে। সায়েরী একটুখানি হাসলো তাকে দেখে। কিন্তু ফায়াজকে দেখাল অতি মাত্রায় গম্ভীর। চোখে মুখে অন্য এক তোপ তার৷ দুই চোখের উপচে পড়া ক্রোধ সায়েরী’র নজরে আসলো না। সে স্বাভাবিকভাবে কিছু বলবে এমন সময় আচমকা তার হাত টেনে ধরলো ফায়াজ। গম্ভীর সুরে বললো,
‘ কথা আছে। চল আমার সাথে৷ ‘
তার জোর গলার বিপরীতে সায়েরী প্রতিউত্তর করার ভাষা পেলোনা কোনো। অনুষ্ঠানের দরূন আজ প্রায় সবগুলো ভবন খালি পরে আছে। এমনি এক ফাঁকা রুমে সায়েরীকে নিয়ে ঢুকল ফায়াজ। রুমের মাঝামাঝি স্থানে এসে হাত ছাড়লো। ছাড়া পেতে দেখা গেল নরম কব্জিতে পাঁচ আঙ্গুলের লালচে ছাপ পড়ে গিয়েছে। সায়েরী বুঝে উঠতে পারেনা ফায়াজের এমন জোরজবরদস্তির কারণ। ছেলেটা আজকাল এমন আগ্রাসী হয়ে ধরা দেয় কেনো? এক সাফওয়ান ছিলো তার জীবনে, যে হুটহাট রেগে গিয়ে এমন আচরণ করতো। কারণও ছিলো অবশ্য। সায়েরীর কর্মকাণ্ড গুলোই এমন ছিলো যে সাফওয়ান বাধ্য হতো বাজে আচরণ করতে। কিন্তু এখন এই মানুষটা সম্পূর্ণ বিপরীত। একই মুদ্রার এপিট উপিট যেন। পূর্বের সাফওয়ান ভাই যতোটা রুড ছিলো, বর্তমানে ঠিক ততটা কিংবা তার চেয়েও বেশি যত্নশীল। যা প্রতিটি পদে পদে অনুভব করতে পারছে সায়েরী। ভাবনা চিন্তা বাদ দিয়ে ফায়াজের দিকে তাকালো সে৷ চোখ, মুখ কুঁচকে বলে উঠলো,
‘ কি কথা বলবি যার জন্য এখানে আনতে হলো? বাকিরা কোথায়? ওদের সামনেও তো বলা যেত নাকি? ‘
শান্ত হয়ে যাওয়া ছেলেটা একটা শুনে ধপ করে জ্বলে উঠলো পুণরায়। সায়েরী নিজেও লক্ষ্য করলো বিষয়টা। যা দেখে চমকে উঠলো সে। তার কথার প্রতিউত্তরে ফায়াজ হিসহিসিয়ে বলে উঠলো,
‘ আমার সাথে ফাঁকা রুমে কথা বলতে রুচিতে বাঁধছে, কিন্তু সাফওয়ান ভাইয়ের সাথে ঠিকই ঘন্টা খানিক সময় কাটিয়ে এসেছিস। বাহ! ‘
সায়েরী চমকে উঠলো। খানিকটা ভয়ও পেল। ফায়াজ এমনভাবে বলছে কেনো? তাছাড়া, কি দেখেছে সে? ঢোক গিলে আমতাআমতা করে সে বলে উঠলো,
‘ ত..তুই এমন ব্যাবহার করছিস কেনো? তোকে অস্বাভাবিক লাগছে। ‘
সায়েরীর ভীতু চেহারা দেখে নিভে গেল ফায়াজ। সে মোটেও আগ্রাসী হয়ে চায়নি। শান্তভাবে মনের কথাটুকু জানাতে চেয়েছিল শুধু। কিন্তু কিয়ৎক্ষণ পূর্বে, ফাঁকা রুমে সাফওয়ানের সাথে সায়েরীকে এতোটা কাছাকাছি, মুখোমুখি দেখে সে ঠিক রাখতে পারেনি নিজেকে। বুকের ভিতরটা পুড়ে যাচ্ছিলো দহনে। মিহাদকে আসতে দেখে সরে গিয়েছিলো সে৷ পরবর্তীতে আর যায়নি সেদিকে। সাহস হয়নি সায়েরীকে অন্য কারো সাথে এতোটা ঘনিষ্ঠ রূপে দেখার। লম্বা শ্বাস ফেলে নিজেকে সামলে নিলো সে। ছোট্ট করে বললো,
‘ সরি সায়ু। আমি..আমি আসলে ওভাবে বলতে চাইনি। ‘
সায়েরী মাথা নাড়ে। জোরপূর্বক হেসে পরিস্থিতি সামাল দিতে চাই। ফায়াজ এগিয়ে আসে তার নিকট। ইঞ্চি চারেক দূরত্বে দাঁড়ায়। অদ্ভুত চোখে তাকিয়ে, আচমকা প্রশ্ন করে,
‘ আমার সাথে তোর কত বছরের বন্ধুত্ব বলত? ‘
সায়েরী অবাক হয়। হঠাৎ এমন প্রশ্ন করার মানে খুঁজে পেলো না সে।
‘ কি হলো? জবাব দে। ‘
‘ অনেক। অনেক বছরের বন্ধুত্ব। যবে থেকে হাই স্কুলে ভর্তি হয়েছি, তখন থেকেই। ‘
‘ এই এতো বছরে, তোর কি কখনো আমার জন্য একটুও অন্যরকম কোনো ফিলিং আসেনি? একটাবার মনে হয়নি আমি তোকে পছন্দ করতে পারি কিংবা ভালোবাসতে পারি? ‘
সায়েরী থমকে গেলো একথা শুনে। ঘূর্ণাক্ষরেও কখনো সে কল্পনা করেনি এমন কিছু৷ কই, কখনো সে এধরণের কিছু উপলব্ধিও করেনি। সায়েরীকে নিশ্চুপ, বিবশ দেখে ফায়াজ আরও বেশি নিভে গেল। এতগুলো বছরে সে বিন্দুমাত্র উপলব্ধি করাতে পারেনি নিজের অনুভূতি-টুকু? বুকের দহন চোখেও ধরা দেয় তার। দৃষ্টি জ্বলজ্বল হয়ে উঠে। ঢোক নিয়ে আবেগ টুকু নিয়ন্ত্রণ করে নেয়। দীর্ঘ শ্বাস ফেলে ক্ষীণ সুরে বলে,
‘ তুই কি সাফওয়ান ভাইকে ভালোবাসিস? ‘
বিবশ হয়ে থাকা মেয়েটা একথা শুনে আশ্চর্য হলো বেশ। পছন্দ, ভালোলাগা, এবং ভালোবাসা। তিনটা শব্দের মধ্যে বিস্তার ফারাক। পছন্দ যে কারো প্রতি হতে পারে। ভালোলাগা হয় কিছু সংখ্যক, কাছের মানুষদের ঘিরে। যাদের কে আমরা কাছ থেকে চিনি, জানি, বুঝি। না বুঝলে ভালোলাগা সৃষ্টি হয়না। আর ভালোবাসা! সে তো সব চেয়ে মূল্যবান এক অনুভূতির নাম। যার উৎপত্তি হয় নির্দিষ্ট একজনকে ঘিরে। যার মাঝে পছন্দ, ভালোলাগা, ভালোবাসা সব কিছুই খুঁজে পায় আমরা। ভালোবাসা থাকে সর্বশেষ ধাপে। প্রথমে মানুষটাকে পছন্দ হয়। তাকে জানার পর সৃষ্টি হয় ভালোলাগার। যা পরবর্তীতে ভালোবাসায় রূপ নেয়। সায়েরীর মনে সাফওয়ানের জন্য জন্ম নেওয়া অনুভূতিগুলো এখনো ভালোলাগা অবধি সীমাবদ্ধ। কিংবা বলা যায়, ভালোলাগার চেয়েও বেশি কিছু। কিন্তু, সপ্তাহ দুয়েকে অনুভব করা এই অনুভূতিকে সে ভালোবাসা বলে আখ্যায়িত করতে পারবে না। ভালোবাসতে হয় নিভৃতে, যতনে, অনেকটা বেপরোয়া রূপে। সায়েরী মোটেও নিজের মাঝে এসব অনুভূতি অনুভব করেনি এখনো। যে অনুভূতির রেশ ধরে সে “ভালোবাসি” বলে দাবি করতে পারবে৷ তাই ফায়াজের কথার বিপরীতে সোজাসাপটা জবাব দিলো,
‘ না। সাফওয়ান ভাইকে আমি ভালোবাসি না। ‘
অতল সমুদ্রে ডুবতে থাকা কেউ সামান্য খড়কুটো দেখলে যেমন বাঁচার শেষ আশায়, উত্তেজনায় ছটফটিয়ে উঠে, সায়েরীর মুখ থেকে কাঙ্ক্ষিত উত্তরটা শুনার পর ফায়াজের হৃদয়ও ছটফটিয়ে উঠল একই রকম ভাবে। একবুক আশা নিয়ে সে নিজের হাতের মুঠোয় বন্ধি করলো সায়েরীর দুই হাত। চমকিত চোখদুটোর দিকে তাকিয়ে অস্থির কন্ঠে বলে উঠলো,
‘ কিন্তু আমি তোকে ভালোবাসি সায়ু। আজ থেকে না, স্কুল লাইফের শেষ সময়টা থেকে ভালোবাসি। কখনো সাহস করে বলতে পারিনি। কারণ.. কারণ আমি চাইনি আমাকে ভুল বুঝে আমাদের বন্ধুত্বটা তুই শেষ করে দে। সায়ু! বিশ্বাস কর, অনেক ভালোবাসি তোকে। অনেক বেশি। আমাকে ফিরিয়ে দিস না প্লিজ৷ আমি..আমি বাঁচব না তোকে ছাড়া। ‘
একনাগাড়ে কথাগুলো বলে বড় বড় দম নিলো ফায়াজ। সায়েরী তখনো স্তব্ধ হয়ে ঠাই দাঁড়িয়ে। হাতদুটো ফায়াজের হাতের মুঠোয়। বিবশ দৃষ্টি। বুকের ভিতর কেউ যেন হাতুড়ি পেটাচ্ছ। এসব কি শুনল সে! বিমূঢ় হয়ে সে আটকে আসা কন্ঠে বলতে চাইল কিছু,
‘ ফ..ফায়াজ আহ..আমি…. ‘
কিন্তু তাকে আরেক দফা চমকে দিয়ে হুট করে দুই হাটু ভেঙ্গে বসে পড়লো ফায়াজ। ধরে রাখা হাতদুটোর বন্ধন আরও একটু দৃঢ় করে বিষন্ন গলায় বললো,
‘ প্লিজ সায়ু, আর যাই বল। কিন্তু আমাকে ফিরিয়ে দিস না দয়া করে। তোর সময় লাগলে সময় নে। যতদিন, যত মাস ইচ্ছা সময় নে। আমি..আমি অপেক্ষা করতে রাজি। প্রয়োজনে সারাজীবন অপেক্ষা করবো৷ তবুও আমাকে ফিরিয়ে দিস না, প্লিজ! ‘
বলতে বলতে কন্ঠস্বর রূদ্ধ হয়ে আসলো ফায়াজের৷ দৃষ্টি টলমল করে উঠলো। পলক ফেললেই যেন অশ্রু গড়িয়ে পড়বে৷ এ দৃশ্যে বাকরুদ্ধ হয়ে গেলো সায়েরী। বুঝে উঠতে পারলো না কীভাবে পরিস্থিতি সামলাবে। ফায়াজের মুখ থেকে ভালোবাসার কথা শুনে মানতে পারলো না সে। অল্প কিছুদিন আগে বললেও হয়তো বিষয়টা ভেবে দেখার মত হতো। কিন্তু এখন! এখন যে তার মন, মস্তিষ্কে অন্য কারো অধিপত্য, অন্য কারো বিচরণ। এই মুহূর্ত তার পক্ষে ফায়াজকে গ্রহণ করা অসম্ভব বটে। একেবারে অসম্ভব। ঢোক গিয়ে শুষ্ক গলা ভেজাল সে৷ তপ্ত শ্বাস ফেলে, জোর করে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিতে নিতে বলে উঠলো,
‘ ফ..ফায়াজ! দেখ, আমি কখনো তোকে সে নজরে দেখিইনি। এ..এটা অসম্ভব। আমি..আমি পারবো না। ‘
ফায়াজ উঠে দাঁড়ায়। বহু কষ্টে অশ্রুসিক্ত আঁখিদুটি সামাল দেয়৷ শক্ত হাতে চেপে রাখে সায়েরীর নরম হাত। একই সুরে পুণরায় আওড়ায় পূর্বের বাক্যগুলো। সায়েরী বারবার হাত ছাড়াতে চায়। এলোমেলো সুরে বলে তার পক্ষে সম্ভব নয়৷ কিন্তু ফায়াজের একরোখা মনোভাবের কাছে তার কথাগুলো ফিকে পড়ে যাচ্ছে। এক পর্যায়ে অধৈর্য হয়ে চিৎকার করে উঠলো ফায়াজ,
‘ কাউকে ভালো না বাসলে আমাকে এক্সেপ্ট করতে কি সমস্যা সায়ু? কেনো এমন করছিস? ‘
‘ কারণ আমি পছন্দ করি সাফওয়ান ভাই’কে। ভালো বাসিনা বলেছি কিন্তু বাসবো না সেটা বলিনি। ভালো লাগে উনাকে। তুই যে অনুভূতি গুলো আমার পক্ষ হতে নিজের জন্য চাচ্ছিস, তা আমি সাফওয়ান ভাইয়ের জন্য অনুভব করি। পারবো না অন্য কারো জন্য একই অনুভূতির সঞ্চার করতে। আমাকে ক্ষমা কর, ফায়াজ। প্লিজ। এই বিষয়টা এখানেই শেষ কর। এসবের চক্করে আমাদের বন্ধুত্বটা শেষ করতে বাধ্য করিস না আমাকে। ‘
ফায়াজের মতো, একই সুরে চেঁচিয়ে কথাগুলো বললো সায়েরী। কথা শেষে বড় বড় দম নিলো সে। ফায়াজের হাত আলগা হয়ে আসতেই সে ঝটকা মেরে ছাড়িয়ে নিলো নিজের হাত৷ আর কোনো বাক্য ব্যয় না করে গটগট পায়ে এগিয়ে গেল দরজার দিকে। কাছাকাছি পৌঁছেও বের হতে পারল না সে৷ তার আগেই বিকট শব্দ তুলে দরজা বন্ধ হয়ে গেলো। সম্মুখে দেখা গেল ফায়াজের রণমুর্তি। বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠলো সায়েরীর। আপনা আপনি পিছিয়ে গেল দুই কদম। ফায়াজ থাবা মেরে দরজা লাগিয়েছে শুধু। লক করার মত মানসিকতা নেই আপাতত। যার দরূন দরজাটা কিঞ্চিৎ ফাঁক হয়ে আছে। সেদিকে তাকিয়ে মনে মনে কিছুটা সাহস জাগাল সায়েরী৷ ফায়াজকে এগিয়ে আসতে দেখে সে দ্রুত গলায় বলে উঠলো,
‘ ফ..ফায়াজ! তোকে..তোকে ঠিক লাগছে না। আমরা নাহয় পরে কথা বলি? যেতে দে আমাকে… ‘
এটুকু বলে পাশ কাটিয়ে, পুণরায় দরজার দিকে পা বাড়ালো সে। ঠিক তখনি আচমকা শক্ত হাতের থাবা পড়লো কব্জিতে।টেনে নিলো তাকে। পুরুষালী হাতের চাপে রক্ত রাঙা কাঁচের চুড়িগুলো মচমচ করে ভেঙ্গে গুড়িয়ে গেলো। ভাঙ্গা কাঁচের আঘাতে বিধ্বস্ত হলো মেয়েলি, নরম হাত। ব্যাথায় আর্তনাদ করে উঠলো মেয়েটি। কিন্তু ফায়াজের বুকের দহনের কাছে ফিকে পড়লো সেই আর্তনাদ। সায়েরীর কান্নারত মুখটা আজ যেন চোখেই পড়লো না ফায়াজের। বাহু খামচে ধরে নিজের মুখোমুখি এনে সে রাগ্বত স্বরে বলে উঠলো,
‘ যা কথা হবে আজ, এক্ষুনি হবে। যাকে ভালোবাসিস না তার সাথে লেপ্টে থাকতে যখন সমস্যা হয়নি৷ বন্ধুর সাথে বন্ধ রুমে পরে থাকতেও সমস্যা হওয়ার কথা নয়। ‘
একথা শুনে কান জ্বলে উঠলো সায়েরীর। কান্না থেমে গেলো আপনা আপনি। কি বিশ্রী শোনাল কথাগুলো৷ সত্যিই কি লেপ্টে ছিলো সে সাফওয়ান ভাইয়ের সাথে? কই! মানুষটা একটুখানি গাল স্পর্শ করা ছাড়া, শরীরের অন্য কোথাও তো স্পর্শ করেনি তাকে। কাছাকাছি ছিল ঠিকই। কিন্তু তার মেয়েলি মন তো অস্বস্তি তে ছটফট করেনি। যা এখন করছে। ভয়ে হৃদপিণ্ড কাঁপছে। কিন্তু এমন হওয়ার কথা ছিল না। ফায়াজ তার বন্ধু। অনেক ভালো বন্ধু। তার প্রতি অগাধ ভরসা ছিলো মনে। কিন্তু,এই মুহুর্তে তা মিলিয়ে যাচ্ছে ক্ষণে ক্ষণে। কান্না চেপে সে ক্ষীণ গলায় বললো,
‘ ফায়াজ প্লিজ! ছাড় আমাকে। ভয় করছে আমার। ‘
বাহু খামচে ধরা হাতদুটোর জোর আরও বাড়লো বোধহয়। টগবগিয়ে উঠা ক্রোধে জর্জরিত হয়ে দেওয়ালের সাথে চেপে ধরলো সায়েরীকে। হিসহিসিয়ে বলে উঠলো,
‘ ভয় করছে? আমার সাথে থাকতে তোর ভয় করছে সায়ু! এই ভয়টা না সাফওয়ান ভাইয়ের জন্য ছিলো? সে ছিলো তোর অপছন্দের, আমি না। তাহলে আজ সবটা উল্টো হয়ে গেল কিকরে বল? আরে হঠাৎ করে কি এমন দেখেছিস তার মাঝে, যেটা আমার কাছে নেই হ্যাঁ? আট বছর ধরে একসাথে আছি আমরা সায়ু। এই আট বছরে তোর মনে নিজের জন্য একটুও দাগ কাটতে পারিনি আমি? আমার যত্ন,আমার ভালোবাসাগুলো কখনো কেনো চোখে পড়ল না তোর?? কেনো বান্দরবান এর তিনটা দিন এতোটা ভারী পড়ল আমার এতোগুলা বছরের অনুভূতির কাছে? ‘
একনাগাড়ে কথাগুলো বলে থামল ফায়াজ। শ্বাস ফেলছে দ্রুত গতিতে। তার হাতের নিচে পিষ্ট হচ্ছে সায়েরীর বাহুদ্বয়। ব্যাথায় কুঁকড়ে গেছে মেয়েটা। মোটা মোটা অশ্রুতে গাল ভিজেছে৷ যেই কাজল কালো, সম্মোহনী চোখজোড়া দেখে ক্ষণিক আগে এক প্রেমিক হৃদয় থমকে গিয়েছিল। এখন সেই চোখের কাজল বিধ্বংসী রূপে লেপ্টে গিয়েছে। কিছু সময় আগে লজ্জায় রক্তিম আকার ধারণ করা গালগুলোতে দাগ বসেছে অশ্রুপাতের। কাঁচের চুড়ি ভেঙ্গে পুরুষালী হাতের চাপে তা ক্ষতবিক্ষত করে ছেড়েছে দুই হাতের কব্জি। ক্ষীণ স্বরে ছেড়ে দেওয়ার জন্য বারবার আকুতি করে সে৷ অথচ ফায়াজের কর্ণগোচর হয়না সে স্বর। বিবেক যেন হারিয়ে বসেছে সে৷ রাগ কমছে না একেবারেই। কোনো ভাবে মেনে নিতে পারছে না সাফওয়ানের প্রতি সায়েরীর অনুভূতি আছে বলে। কান্নারত সায়েরী এবার ক্ষীণ সুরে চেঁচিয়ে উঠলো,
‘ ফায়াজ প্লিজ! ছাড় আমাকে। আর সহ্য করতে পারছি না। ‘
কথাটা শেষ হওয়া মাত্র আচমকা একহাতে তার কটিদেশ খামচে ধরলো ফায়াজ। ক্ষিপ্ত স্বরে চেঁচিয়ে উঠলো পূর্বের ন্যায়,
‘ সহ্য হচ্ছে না? আমার সঙ্গ, আমার ছোঁয়া সহ্য হচ্ছে না, কিন্তু সাফওয়ান ভাইয়ের গুলো ঠিকই সহ্য করে এসেছিস। ভালো না বাসলে এতোটা কাছাকাছি কি করছিলি উনার সাথে? কতদিন ধরে চালাচ্ছিস এসব? বান্দরবানে যাওয়ার পর থেকে নয়তো! গোটা একটা রাত যে সাথে ছিলি দুজন৷ তখন নিশ্চয় কিছু ক…. ‘
বাকি কথাটুকু শেষ করার আগে শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে তার গাল চড় বসিয়ে দিলো সায়েরী। এমন কুরুচিপূর্ণ কথাগুলো শুনে কান ঝাঁ ঝাঁ করে উঠলো তার। অবিশ্বাস্য, ঘৃণিত দৃষ্টিতে ফায়াজের দিকে তাকিয়ে তার মুখ থেকে বের হলো একটা শব্দ, ‘ ছিঃ! ‘
এটুকু আক্রমণে, ছিঃ! শব্দটা শুনে অগ্নি দৃষ্টিতে চাইলো ফায়াজ। তা দেখে তীব্র ভয়ে, যন্ত্রণায় নেতিয়ে পড়লো মেয়েটি। শ্বাস আটকে আসছে তার। ঝাপসা চোখে তাকিয়ে ফায়াজের বুকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতেই আচমকা বাহু ছেড়ে হাত চেপে ধরে ফায়াজ। পূর্ব হতেই চুবে থাকা কাঁচের খন্ডাংশ এবার প্রবলভাবে আঘাত হানে৷ সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার করে উঠে সায়েরী। কেঁদে ফেলে শব্দ করে৷ এই পর্যায়ে এসে হুশ ফিরল বোধহয় ফায়াজের৷ নিজের হাতের দিকে লক্ষ্য করে দেখল, তালু বেয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে৷ রাগে অন্ধ হয়ে ব্যাথাটুকু উপলব্ধি-ই করতে পারেনি সে। সায়েরীর রক্তাক্ত হাতের দিকে দৃষ্টি পড়তেই থমকে গেলো সে৷ এতোটা আঘাত দিয়েছে সে মেয়েটাকে! টনক নড়তেই দ্রুত হাতের বাঁধন আলগা করে দিলো। দ্রুত গতিতে নিজের রক্তাক্ত হাত দ্বারা ক্রন্দনরত সায়েরীর গাল ধরলো সে। অশ্রু মুছে, আকুতি ভরা কন্ঠে বলতে লাগল,
‘ স.. সায়ু! আ’ম সরি৷ ভীষণ সরি। আমি..আমি ইচ্ছে করে করিনি বিশ্বাস কর। বেশি ব্যাথা করছে? আমি একদম তোকে কষ্ট দিতে চাইনি ।তবুও এটা…কীভাবে! এই সায়ু! তাকা আমার দিকে। ‘
সায়েরী কিছু শুনার মতো অবস্থায় নেই তখন। বাম হাতের মাঝে ডান হাতের কব্জি আলতো করে ধরে কেঁদে চলছে অনবরত। তার কান্না দেখে ফায়াজ নিজেও ভেঙ্গে পড়ে। দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে তার। দুই হাতে সায়েরীর মুখখানা তুলে সে ধরা গলায় বলে উঠে,
‘ তুই কেন আমার কথাগুলো বুঝতে চাইছিস না বল? আমার মতো করে তোকে অন্য কেউ ভালোবাসতে পারবে না দেখিস৷ আমি..আমি তোকে অনেক ভালোবাসি। অনেক বেশি। তিন বছর ধরে ভালোবেসে আসছি। আমার তিন বছরের ভালোবাসার আগে মাত্র কিছুদিনের ভালোলাগাটুকু – কে বেশি প্রাধান্য কেনো দিচ্ছিস তুই? ‘
এটুকু বলে থামল সে। কন্ঠস্বর রূদ্ধ হয়ে আসছে। গলায় কাছটায় আটকে আছে গুমোট এক অনুভূতি। অদ্ভুত এক ব্যাথা তাতে। অবচেতনে সায়েরীকে আঘাত করে অপরাধবোধে জর্জরিত ভিতরটা। ছটফট করতে থাকা মেয়েটা এই যাত্রায় আবারও পালিয়ে যেতে চাইলে পুণরায় হাত টেনে ধরে সে। মন যে আজ জেদ চেপে বসেছে, সায়েরীকে রাজি করিয়ে ছাড়বে বলে। ক্রন্দনরত সায়েরী ছাড় পাওয়ার আকুতি জানায়। সেদিকে কান না দিয়ে পূর্বের ন্যায় হাটু ভেঙ্গে ধপ করে বসে পড়ে ফায়াজ। নিজের পুরুষ সত্তার অহং গুড়িয়ে এই পর্যায়ে অশ্রু ছেড়ে দিলো সে। অশ্রুতে গাল,চোয়াল সিক্ত হলো তার। এই দৃশ্য বাকরুদ্ধ হয়ে গেলো আতংকে গুটিয়ে যাওয়া মেয়েটা। দেওয়ালের সাথে মিশে যেতে চেয়েও আটকে গেল। কারণ তার দুই হাত পূণরায় নিজের হাতের মাঝে বন্ধি করে ফেলেছে ফায়াজ। সায়েরীর স্তব্ধ মুখটার দিকে তাকিয়ে সে ধরা গলায় আকুতি জানায়,
‘ আমাকে ক্ষমা কর সায়ু। আমি..আমি তোকে কষ্ট দিতে চায়নি, বিশ্বাস কর। কিন্তু তোকে আর সাফওয়ান ভাইকে ওই অবস্থায় দেখে আমি পাগল হয়ে গিয়েছিলাম। আ’ম সরি। প্লিজ! এসবের জন্য ফিরিয়ে দিস না আমাকে। সবকিছুর জন্য ক্ষমা চাচ্ছি আমি। সবটা ভুলে যা। আমাকে এক্সেপ্ট করে নে প্লিজ৷ তুই রাজি না হওয়া অবধি আমি যাব না এখান থেকে৷ একটাবার রাজি হয়ে যা। আমি তো বলললাম সময় নিতে। তোর যত সময় লাগে নিতে পারিস। জোর করবো না তখন৷ প্লিজ সায়ু! আজ ফিরিয়ে দিস না আমাকে। তোকে রাজি হতে হবে। আমি ভালোবেসেছি আগে৷ এতোগুলা বছর যাবত ভালোবেসে আসছি। আমার অনুভূতির চেয়ে সাফওয়ান ভাইয়ের অনুভূতি গভীর হতেই পারে না। ‘
শেষের কথাটা বলতে গিয়ে গলার স্বরে অন্য এক তেজ ধরা দিয়েছিল। যেন সে স্থির করে নিয়েছে, তার অনুভূতির কাছে বাকি সকলের অনুভূতি ফিকে। তার এমন জোর গলার কাছে সায়েরী পূর্বের মতোই গুটিয়ে আছে। ফায়াজের এমন উন্মাদনা দেখে ভয়ে চুপসে গেছে সে৷ প্রাণপণে চাচ্ছে এই দমবন্ধকর পরিস্থিতি হতে বেরিয়ে যেতে। নয়তো কেউ আসুক, আর উদ্ধার করুক তাকে। শেষ বারের মতো ডুকরে কেঁদে উঠে, মিনতি কন্ঠে বলে উঠলো সে,
‘ আ..আমাকে যেতে দে ফায়াজ প্লিজ! আমার..আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে৷ ‘
সত্যিই দম বন্ধ হয়ে আসছে তার। শ্বাস ফেলতে কষ্ট হচ্ছে বলে মুখ দিয়ে টেনে টেনে শ্বাস নিচ্ছে৷ রুমের বাইরে হতে পদচারণের শব্দ ভেসে আসতেই কান খাড়া করে সে। চঞ্চল হয় দৃষ্টি। ফায়াজ আবারো কিছু বলার জন্য উদ্যত হতেই একপ্রকার জোর করে ছাড়িয়ে নিতে চাই নিজেকে। জেদ নিয়ে ফায়াজও উঠে পরে তাকে থামাতে। এক পর্যায়ে অধৈর্য হয়ে হিল পরিহিতা পা দিয়ে সজোরে আঘাত করে ফায়াজের পায়ে। নিজেকে সামলাতে গিয়ে হাত আলগা করা মাত্র সায়েরী ছুটে পালাতে উদ্যত হয়। কয়েক কদম এগুতেই পুণরায় টান পরে বাহুতে। ফরফর শব্দ তুলে বাহু হতে কনুই অবধি জামার হাতা ছিরে যায়।
বেকায়দায় আঁচড় বসে চার চারটে নখের। আকস্মিক এ ঘটনায় উপস্থিত দুজনেই স্তব্ধ, বিমূঢ়। ফায়াজ চাইনি এমন কিছু হোক। কিন্তু সে নিজের বিষ্ময়টুকু সামাল দেওয়ার আগে ঘটনা ঘটলো আরেকটা। ছেড়া জামা, শরীরে নখের আঁচড়, রক্তাক্ত হাত এসব দেখে মাথা ঘুরে আসলো সায়েরীর। মাস দেড়েক আগে ঘটে যাওয়া ঘটনাটা হতে পুরোপুরি বের হতে পারেনি সে। মস্তিষ্কে আজও গেঁথে আছে সেই কালো রাত, নোংরা ছোঁয়া, বিধ্বস্ত, রক্তাক্ত দেহ৷ তাই আজ অনাকাঙ্ক্ষিত এই ঘটনায় মস্তিষ্কের অত্যাধিক চাপে তার শ্বাস কষ্ট বেড়ে গেল কয়েক গুন৷ চোখের সামনে সবটা অন্ধকার ঠেকল তার। ফায়াজ কিছু বুঝে উঠার আগেই ধপ করে ছোট্ট দেহটা আঁচড়ে পড়ল জমিনে৷ কয়েক সপ্তাহ আগে, কপালে চোট পেয়ে শুকিয়ে আসা ক্ষতস্থানে পুণরায় আঘাত পেলো বেঞ্চের কোণায়।
মুহুর্তেই গলগল করে রক্তের ফোয়ারা ছুটে ভিজে গেল মুখের একপাশ, গলা, ঘাড় বেয়ে বুক। এই দৃশ্যে থমকে গেলো ফায়াজের হৃদপিণ্ড। মস্তিষ্ক এলোমেলো হয়ে গেলো তার। জমে গেল সে নিজের স্থানে। ছুটে এসে সায়েরীকে ধরবে তার আগেই হঠাৎ ভেজানো দরজা ঠেলে প্রবেশ আসলো দুই দুইটি হাসিমুখ। দেখা মিললো আয়ান এবং নাজরাতের। কিন্তু বেশিক্ষণ স্থির হলো না তাদের মুখের হাসিটুকু। চোখের সামনে এলোমেলো ফায়াজকে দেখে একটুখানি চমকালো তারা৷ এবং পরবর্তীতে সায়েরীর বিধ্বস্ত দেহটা দেখে থমকে গেলো পুরোপুরি। চিৎকার করে দুজনেই ছুটে গেলো। ফ্লোর হতে বুকে টেনে নিলো সায়েরীকে৷ তার অবস্থা দেখে মুহুর্তেই ডুকরে কেঁদে উঠলো নাজরাত। উন্মুক্ত বাহুটা নজরে আসতেই কম্পিত হাতে তা ঢেকে দিলো আয়ান। দৃষ্টিতে অবিশ্বাস, মায়া, ব্যাথা। নাজরাত নিজের বুক হতে অচেতন মুখটা সামনে এনে বারবার ঝাঁকিয়ে তুলছে। কপালের রক্ত মুছে, গালে চাপড় মেরে অবুঝের মতো আওড়াচ্ছে,
‘ সায়ু! এই সায়ু ওঠ না। চোখ খোল সায়ু, প্লিজ! আয়ান..আয়ান ও উঠছে না কেনো? ওকে উঠতে বল। এতো রক্ত! ইয়া আল্লাহ! এই সায়েরী চোখ খোল…. ‘
আয়ান কয়েক মুহুর্ত স্তব্ধ হয়ে তাকিয়েই রইলো শুধু। নাজরাতের হাহাকার কানে বাজতেই মস্তিষ্কে খেলে গেলো একটাই প্রশ্ন, ‘ এসব কীভাবে হলো? ‘ এরপর ঘাড় ফিরিয়ে তাকালো টলমল চোখে, কয়েক হাত দুরত্বে দাঁড়িয়ে থাকা ফায়াজের দিকে। আয়ান অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকায়। মন বলছে, ‘ এসবের কারণ ফায়াজ হতেই পারে না। ‘ যান্ত্রিকভাবে উঠে দাঁড়ালো সে। ফায়াজের হাতে থাকা মেরুন রঙের কাপড়ের ছেড়া অংশটা নজরে আসতেই থমকে যায়। পা বাড়ানোর সাহস হয়না। আয়ান উঠে দাঁড়িয়েছে দেখে ফায়াজ নিজেও তাকায় তার দিকে। দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলতেই অদ্ভুত এক ভয়ে ভিতরটা কেঁপে উঠলো তার। আয়ান ঢোক গিলে অনবরত। কাঁপছে সে। বহু কষ্টে নিজের অনুভূতি গুলো সামাল দিয়ে আঙ্গুল তুলে সায়েরীর দিকে। কম্পিত কন্ঠে প্রশ্ন করে,
‘ এসব কীভাবে হলো ফায়াজ? কে করেছে? ‘
প্রশ্ন করে মনেপ্রাণে চাইলো ফায়াজ বলুক এসবের পেছনে তার হাত নেই। কিন্তু তার সমস্ত ভরসা গুড়িয়ে দিয়ে ফায়াজ ধরা গলায় বলে উঠলো,
‘ আমি..আমি ইচ্ছে করে করিনি দোস্ত। আমি চাইনি এমন কিছু হোক। কিন্তু.. ‘
বাকি কথাটুকু শেষ করতে পারলো না সে। সবসময়ের শান্ত ছেলেটা হিংস্র বাঘের ন্যায় গর্জে উঠলো তার আগেই। চোয়াল বরাবর শক্ত এক ঘুষি পড়তেই সে ছিটকে পড়লো ফ্লোরে। নিজেকে ধাতস্থ করে পারলো না। পূর্বেই তেড়ে আসলো আয়ান। উচ্চ কন্ঠে জঘন্য এক গালি দিয়ে বসলো রাগের বশে। পরপরই লাগাতার আঘাতে ফায়াজের নাক থেতলে ফেললো একেবারে। বিনিময়ে নিজেকে রক্ষার জন্য পালটা আঘাত করলো না ফায়াজ। চোখের কার্নিশ বেয়ে জল নেমে, অস্পষ্ট কন্ঠে একটা বাক্য-ই আওড়াল সে,
‘ আমি ইচ্ছে করে করিনি আয়ান। সায়ুকে আঘাত করতে চাইনি আমি। একদম চাইনি। ‘
একথা শুনে পুণরায় গর্জে উঠলো আয়ান। কলার ঝাঁকিয়ে বলে উঠলো,
‘ তুই কিছু না করলে এসব কীভাবে হলো? বারবার করে বলেছিলাম সায়ুকে কোনো কিছু নিয়ে জোর করবি না। জেদ ছেড়ে ঠান্ডা মাথায় বুঝাতে বলেছিলাম। কিন্তু তুই….! সাহস কীভাবে হলো তোর ওকে আঘাত করার! ‘
অন্যদিকে নাজরাত কান্না ভুলে এতোক্ষণ যাবত এই দৃশ্য দেখে যাচ্ছিল। ফায়াজের মুখ থেকে স্বীকারোক্তি শুনে সে নিজেও স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। আয়ানের প্রতিক্রিয়া দেখে অবাক হয়েছে তার চেয়েও বেশি। কিন্তু বুঝে উঠতে পারলো না এসব হলো কেনো?
দুজনের দিকে তাকিয়ে থেকে বুকে আগলে রাখা সায়েরীর গালে হাত বুলাতে গিয়ে আচমকা চমকে উঠলো সে৷ উষ্ণ তরল কিছু উপলব্ধি করতে পেরে চোখ ফিরালো দ্রুত। এবং সঙ্গে সঙ্গে আয়ানের নাম ধরে চিৎকার করে উঠলো সে। ফায়াজকে প্রহার করতে থাকা আয়ান চমকে উঠলো। ঘাড় ফিরাতেই নজরে আসলো, নাজরাত নিজের রক্তাক্ত হাতের দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে আছে৷ পরপর আবার তাকাচ্ছে অচেতন সায়েরীর দিকে। যার কপালে ওড়না দিয়ে রক্ত চাপা দিয়া আছে ঠিকই। কিন্তু নতুন উদ্যমে নাক বেয়ে রক্ত পড়ছে। সহসা ফায়াজকে ছেড়ে ছুটে আসলো সে। পাজা কোলে তুলে নিলো সায়েরীর অচেতন দেহ। কম্পিত কন্ঠে দ্রুত গলায় নাজরাতকে বললো,
‘ সাফাকে কল দে। ওকে হসপিটালে নিয়ে যেতে হবে, ইমিডিয়েটলি। গাড়ি বের করতে বল। ‘
হাসপাতালের করিডরে এলোমেলোভাবে একেক এক জায়গায় বসে রয়েছে চার বন্ধু,বান্ধবী। মেয়ে তিনজনের অবস্থা বেশ শোচনীয়। একটু শক্ত মনোবল ধরে আছে সাফ্রিন। তবুও, মেয়েলি মন যেহেতু, তাই প্রিয় বান্ধবীর এমন করুণ অবস্থা দেখে চোখ ভিজেছে তারও। নাজরাতকে একহাতে জড়িয়ে ধরে চেয়ারে বসে আছে সে। মেয়েটা থেমে থেমে কেঁদে চলছে এখনো। তোহারও চোখে, মুখের বেহাল দশা৷ নুহাশের কাঁধে মাথা রেখে বসে আছে সে। আয়ান আপাতত সাথে নেই তাদের। সায়েরীকে হাসপাতালে নিয়ে আসার পরপরই খবর দেওয়া হয়েছিল আবরারকে। কি হয়েছে বলতে গিয়ে লজ্জায় মুখ থেকে কথায় বের হচ্ছিল না নাজরাতের। কিভাবে বলবে, যে তাদেরই কাছের বন্ধুর জন্য আজ সায়েরীর এই দশা! ফোনকলে শুধুমাত্র সায়েরীর অবস্থার কথা জানিয়ে দেওয়ার পর আবরার সহ পুরো পরিবার ছুটে এসেছিল। তারা উপস্থিত হওয়ার পরপরই ডাক্তার জানালেন প্যানিক অ্যাটেকের কারণে সেন্সলেস হয়ে গিয়েছিলো সায়েরী। এবং পরবর্তীতে নাক দিয়ে রক্ত বের হয়েছিলো। একথা শুনে তার পরিবার ভীষণ অবাক। এই না সকাল সকাল হাসিখুশি মেয়েটা বেরিয়েছিলো ঘর থেকে! তাহলে কি হয়ে গেল কয়েক ঘন্টার মধ্যে?
প্যানিক অ্যাটেক হলো ভীতি ও উদ্বেগের তীব্র অনুভূতি। এটি প্রায়ই ঘটে, যদি কেউ তার জীবনে ঘটছে এমন কিছু নিয়ে উদ্বিগ্ন বোধ করে অথবা কঠিন বা মানসিক চাপযুক্ত কোনো পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়। সায়েরীর ক্ষেত্রেও এটাই ঘটেছিলো। ফায়াজের আগ্রাসী রূপ, শরীরের ক্ষত, যন্ত্রণা এবং পরবর্তীতে অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে নিজ বাহু অনাবৃত হয়ে তাতে নখের আঁচড় লাগা, এসকল দৃশ্য দেখে মস্তিষ্কে অত্যাধিক চাপ সৃষ্টি হয়েছিল তার। যার কারণে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলো সে।
সায়েরীর শরীরের অবস্থা জেনে নিয়ে, আবরার উপস্থিত পাঁচ জনের কাছ থেকে জানতে চাইলো আসল ঘটনা। কীভাবে কি হলো? সায়েরীর কেনো প্যানিক অ্যাটাক হলো হঠাৎ। মেয়েটা বিগত দুয়েক সপ্তাহে মানসিকভাবে পুরোপুরি রিকোভার হয়ে উঠেছিলো। তাহলে আজ হঠাৎ এই ঘটনা কি করে হলো? আবরারের একের পর এক প্রশ্নের বিপরীতে বন্ধুমহলের সকলে নিশ্চুপ। মূলত আয়ান ব্যাতিত তারাও অবগত নয় আসল ঘটনা সম্পর্কে। তাই তারাও উৎসুক নজরে তাকিয়ে রইলো আয়ানের দিকে। সকলের দৃষ্টির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে মাথা নত করে দাঁড়িয়ে রইলো আয়ান। সাহস হলো না আবরারের চোখে চোখ মিলানোর। আবরার পুণরায় একই প্রশ্ন আওড়ালে তখন গিয়ে মুখ খুললো আয়ান। ফায়াজ এবং সায়েরীর মাঝে ঠিক কি হয়েছে তা সঠিকভাবে জানা নেই তার। কিন্তু পূর্ব হতে ফায়াজের অনুভূতি, আজকে তা সায়েরীর কাছে স্বীকারোক্তি করতে চাওয়া সবটাই জানিয়ে দিলো সে। ফায়াজ হয়তোবা জেদের বশে আঘাত করেছে সায়েরীকে একথাও বললো সে। সবটা শুনার পর স্তব্ধ হয়ে গেলো সকলে। নাজরাত,সাফ্রিন, তোহা এবং নুহাশ হতবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে। এতকিছু চলছিলো অথচ তারা বুঝতেও পারলো না!
আবরার রেগে মেগে গর্জে উঠলো। ফায়াজকে পারলে যেন এক্ষুনি জানে মেরে ফেলবে। রাগে অস্থির হয়ে উঠলেন সায়েরীর বাবা এবং আবরারের বাবাও। এতগুলো বছর ধরে সায়েরীর বন্ধুদের চিনে তারা। এত স্নেহ করে আসছে তাদের। অথচ আজ কি না ফায়াজ এই প্রতিদান দিল সেটার? ফায়াজকে না পেয়ে আবরারের রাগে ভস্ম হলো আয়ান। উপস্থিত সকলকে চমকে দিয়ে সে হঠাৎ করেই চেপে ধরলো আয়ানের কলার। রাগ্বত স্বরে চেঁচিয়ে উঠলো,
‘ তুমি প্রশ্রয় দিয়েছিলে না ওই জানোয়ার টা কে? তোমার আশকারা পেয়েই আজ সায়ু’র সাথে এসব করতে সাহস পেয়েছে সে। এখানে এসে এখন নিজে সাধু সাজছ? ‘
আয়ান অপরাধীর ন্যায় মাথা পেতে শুনে সব অভিযোগ। নুহাশ সহ আবরারের বাবা, চাচা মিলে আবরারকে জোর করে সরিয়ে আনতে চাই। কিন্তু বলিষ্ঠ শরীরের যুবকটাকে এক বিন্দু নাড়তেও ব্যার্থ হয় তারা। পরবর্তীতে আবরার নিজ থেকেই ছেড়ে দেয়। একপ্রকার ছুড়ে ফেলার মতো করে কলার ছাড়ে আয়ানের। বন্ধুরা তাকে এমন অপদস্ত হতে দেখে ভার মুখে তাকিয়ে রই। তোহার গাল ভিজে উঠে উষ্ণ জলে। আয়ানকে এতোটা অপমানিত হতে কখনো দেখেনি সে। কখনো না। সায়েরীর প্রতি আয়ানের যত্ন, ভালোবাসা সম্পর্কে সকলে অবগত। অথচ আজ তার উপরই আসতে হলো সব অভিযোগ!
আবরারের রাগ কমলো না তখনো। চোয়াল শক্ত করে ফোঁসফোঁস নিঃশ্বাস ফেলছে সে। সায়েরীর কেবিনের দিকে আরেকবার নজর দিয়ে ধুমধাম পা ফেলে স্থান ত্যাগ করলো সে। তার ভাব গতি দেখে কারোরই বুঝতে বাকি রইলো না যে, তার গন্তব্য এবার ফায়াজ। যতক্ষণ না ফায়াজের উপর এই ক্রোধ ঝারবে ততক্ষণ অবধি শান্ত হবে না সে। বন্ধুরা ভিতরে ভিতরে আতংকিত হয়ে উঠলো। যতোই হোক,ফায়াজ বন্ধু হয় তাদের। আবরার যে পরিমাণ রেগে আছে, তাতে ফায়াজের জান নিতেও দুইবার ভাববে না হয়তো সে৷ তাই পিছু পিছু নুহাশ ছুটে গেল। আবরারের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে পুণরায় চেয়ারে বসে পড়লেন সায়েরীর বাবা ও চাচা। আবরারের মা এবং নাজরাত মেহরিন বেগম কে শান্ত করতে ব্যস্ত। তিনি কেঁদে চলছেন অনবরত। বিগত এক, দেড় মাসে মেয়েটার উপর কম ঝড় ঝাপ্টা গেলো না। একটু সুস্থ হয়ে উঠতেই নতুন কিছু এসে হাজির হয়। এসবের শেষ কোথায়!
আয়ান এক পলক উনার দিকে তাকিয়ে উল্টো ঘুরে চলে যেতে নিতে আচমকা হাত টেনে ধরে কেউ। চোখ তুলে চাইতেই দৃষ্টি মিলে নাজরাতের সঙ্গে। তার চোখেও একটা চাপা ক্রোধ স্পষ্ট। তপ্ত শ্বাস ফেললো আয়ান। না হাত ছাড়িয়ে নিলো, না কোনো কথা বললো৷ কেবল অপেক্ষা করলো আরো একবার অভিযোগের পুটলি নিজের কাঁধে তুলে নিতে। হলোও তাই। নাজরাত চাপা স্বরে তাকে প্রশ্ন করলো,
‘ ফায়াজ আজকে সায়েরীর কাছে কনফেশন করবে, সেটা তুই জানতি? ‘
আয়ানের সকল,সরল স্বীকারোক্তি, “জানতাম।”
‘ মানে তুই জেনে বুঝে ওকে সুযোগ করে দিয়েছিলি সায়ু’র সাথে আলাদা ভাবে কথা বলার জন্য? ‘
আয়ান নিশ্চুপ। তার নিরবতা দেখে নাজরাত পুনরায় চাপা কন্ঠে চেঁচিয়ে উঠলো,
‘ তোর কাছে এটা আশা করিনি আমি আয়ান! সায়ুকে চিনিস না তুই? জানতি না যে ফায়াজের প্রতি ওর অন্যরকম কোনো ফিলিংস নেই? আর কেউ না জানুক, এমন কিছু হলে আমি আর তুই অবশ্যই জানতাম তাইনা? সবটা জেনে বুঝে কীভাবে পারলি ফায়াজকে ওর কাছে পাঠাতে? তুই জানতি সায়ু মানবে না। তবুও কেনো পাঠালি? ‘
উত্তেজিত কন্ঠে কথাগুলো বলতে বলতে গিয়ে হাঁপিয়ে উঠলো সে। শ্বাস ফেললো জোরে জোরে। আয়ানের নিষ্প্রাণ মুখশ্রী দেখে তোহার বুকের ভিতরটা কেঁপে কেঁপে উঠতে লাগলো। সাফ্রিন নাজরাতকে টেনে সরিয়ে নিতে চাই৷ চাপা স্বরে বারবার চুপ করায়। হাতের উল্টো পিঠে গাল মুছে তোহা কান্না মিশ্রিত কন্ঠে বলে উঠে,
‘ চুপ কর নাজ,প্লিজ। সবাই মিলে ওকে কেনো শুনাচ্ছিস? ফায়াজকে সাপোর্ট দিয়েছে বলে তোরা ওকে কেনো দোষারোপ করছিস? ও যদি জানত এমন কিছু হবে, তাহলে ফায়াজের সঙ্গ দিতো না। সায়ুকে ও কতোটা কেয়ার করে এটা জানিস না তোরা? ‘
‘ জানি বলেই অবাক হচ্ছি। জেনে বুঝে আগুনের মুখে ঠেলে দিয়েছে ও সায়ুকে। আজ এই পরিস্থিতির জন্য ও নিজেও দায়ী। ফায়াজকে আশকারা না দিলে এই সাহস ও কখনোই পেত না। ‘
তোহার কথার বিপরীতে নাজরাতের প্রতিউত্তর শুনে আর এক সেকেন্ডও দাঁড়ালো না আয়ান। নিঃশব্দে প্রস্থান করলো। তার যাওয়ার দিকে ঝাপসা চোখে তাকিয়ে রইলো তোহা। নিজেও পিছু নিতে গিয়ে আবার থেমে গেল। ভাবলো, কিছুক্ষণ নাহয় একা থাকুক আয়ান। সামলে নিক নিজেকে।
আয়ান চলে যেতেই ধপ করে চেয়ারে বসে পড়লো নাজরাত। দুইহাতে মাথা চেপে ধরলো। পাশে বসে সাফ্রিন কাঁধে হাত রাখলো তার। আয়ানের উপর নাজরাতের এই অভিমান,অভিযোগ সম্পূর্ণ যুক্তিযুক্ত। সায়েরী তার বান্ধবী কম বোন বেশি। ছোট থেকে একসঙ্গে বড় হয়েছে দুজন। বয়সে ছোট হওয়ায় সায়েরীকে সর্বদা ছোট বোনের মতোই আগলে রেখেছে সে। তাই আজ বোনের এই করুণ দশা দেখে না চাইতেও সে চড়াও হয়ে উঠেছে আয়ানের উপর। আয়ানও হয়তো বুঝেছে সেটা। তাই চুপচাপ মেনে নিয়েছে সব।
সকলে স্তব্ধ মুখে বসে রইলো মিনিট দশেক। সায়েরীর জ্ঞান ফিরতে একটু সময় লাগবে বলে জানিয়েছে ডক্টর। এর মধ্যে ফোন বেজে উঠলো সাফ্রিনের। নুহাশের কল। তারা গিয়েছে আধঘন্টা হচ্ছে। কি না কি হয়েছে এই ভেবে দ্রুত রিসিভ করলো সে। তোহা এবং নাজরাত সহ খানিকটা আড়ালে গিয়ে দাঁড়ালো। লাউডস্পিকার অন করে ‘হ্যালো’ বলা মাত্রই উপাশ থেকে ভেসে আসলো নুহাশের উত্তেজিত কন্ঠস্বর,
‘ দোস্ত! ফ..ফায়াজ… ‘
কন্ঠস্বর যেন কাঁপছে তার। এই কন্ঠ শুনে মেয়ে তিনজনের বুক কেঁপে উঠলো। সাফ্রিন উত্তেজিত হয়ে বলে উঠলো,
‘ ফায়াজ কি? কি হয়েছে ওর? ‘
পরপর নাজরাতও একই সুরে সুধাল,
‘ কি হয়েছে ওর? আবরার ভাইয়া কি বেশি কিছু করেছে নাকি? ‘
নুহাশ হাঁপিয়ে উঠা কন্ঠে জবাব দিলো,
‘ আবরার ভাই কিছু করেনি। ওরে তো সামনেও পাইনাই আমরা। অনেকে বলছে ওকে কেউ বাজেভাবে মারছে৷ আমরা আসার আগেই নাকি হাসপাতালে নিয়ে গেছে কয়েক জন৷ অবস্থা ভালো না। প্রচুর রক্ত ঝরেছে। ‘
একথা শুনে থমকে গেলো তিনজন। মোবাইল ধরে রাখা হাতখানা কেঁপে উঠলো সাফ্রিনের। হতবাক নয়নে চাইলো সে নাজরাতের দিকে। তোহাও প্রশ্ন চোখে তাকিয়ে। তারা যতটুকু জানে আয়ান হাত তুলেছিলো ফায়াজের গায়ে। দুজনের তাকানো দেখে নাজরাত দ্রুত গলায় জবাব দিলো,
‘ অসম্ভব! আয়ান ওকে দুই একটা ঘুষি মেরেছিলো শুধু। বেশি কিছু হয়নি। দেখেছি আমি। সায়ুকে নিয়ে ফিরার সময়ও ফায়াজ দাঁড়িয়ে ছিলো সেখানে। ‘
একথা শুনে ভাবুক হলো বাকি দুজন। তোহা অবাক কন্ঠে সুধাল,
‘ তাহলে ওকে মেরেছে কে? তাও এতোটা বাজেভাবে? ‘
সকলের মনেই কড়া নাড়লো এই প্রশ্নটি। ভাবনার মাঝে পুণরায় নুহাশের কন্ঠ ভেসে আসলো। সে জানালো ফায়াজকেও একই হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছে যেখানে সায়েরীকে আনা হয়েছে। সে আসছে। ততক্ষণে অবধি ফায়াজের কোনো খুঁজ পেলে যেনো জানানো হয়। কল কেটে উক্ত স্থানেই চিন্তিত মুখে দাঁড়িয়ে রইলো তিনজন। সায়েরীর চিন্তা সরে গিয়ে মাথায় এখন ফায়াজের চিন্তা ভর করেছে। এমন সময় তোহার নজর গেল বারান্দা হতে নিচের দিকে। হাসপাতালের গেইটে মাত্র এসে দাঁড়ানো সি এন জি হতে তিনজন ছেলে মিলে অচেতন এক দেহ ভিতরে নিয়ে যাচ্ছে। আহত ছেলেটার পরণের শার্ট দেখে বুকের ভিতরটা ধ্ক করে উঠলো তার। ফায়াজ!
আতংকিত হয়ে বাকি দুজনের উদ্দেশ্যে চিৎকার করে উঠলো সে। তিনজনের বিষ্ময়কর নজর গিয়ে ঠেকল অতেচন মানবটার উপর। এতো রক্ত! রক্তের স্রোতে মুখ চেনা দায়। শার্ট ভিজে জবজবে। বেশিক্ষণ দেখার সুযোগ পেলো না তারা। তার আগেই অতেচন দেহটাকে ভিতরে ঢুকিয়ে ফেললো অন্য তিন যুবক। কিন্তু ক্ষণিকের দর্শনে সারা শরীর জমে গেল তিন বান্ধবীর। সেকেন্ড কয়েক স্তব্ধ হয়ে সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলো তারা। এর পর হুশ ফিরতেই ছুট লাগালো সিড়ির দিকে। চারতলা হতে দ্রুত পায়ে নামতে গিয়ে হাঁপিয়ে উঠলো তারা। নিচ তলায় হাজির হওয়া মাত্র তাদের সামনে দেখা মিললো আয়ানের। সেও হতবাক চোখে তাকিয়ে সম্মুখে। তাদের চেয়ে মাত্র কয়েক হাত দূরত্বে স্টেচারে শুইয়ে আছে রক্তাক্ত দেহটি। এটা যে ফায়াজ তাতে কোনো ভুল নেই। কিন্তু এই অবস্থা কেনো তার? কে করেছে?
ফায়াজকে বেশিক্ষণ সেখানে না রেখে ইমার্জেন্সি তে নিয়ে যাওয়া হলো। তাকে নিয়ে আসা তিন মানব-ই কলেজের সিনিয়র। আয়ান চিনে তাদের। দেখেছে বহুবার। সে নিজেকে সামলে তাদের কাছে জানতে চাইলো বিস্তারিত। কীভাবে কি হলো? ফায়াজের এমন অবস্থা কে করলো? ছেলে তিনজন মুখ চাওয়া চাওয়ি করে। এরপর ছটফট গলায় জবাব দেয় তারা জানে না কিছু। আয়ান সুক্ষ্ম চোখে পরখ করে তাদের। খটকা লাগে কিছুটা। ফায়াজের পরিবারকে খবর দিতে বলে ছেলেগুলো বেড়িয়ে গেলো। আয়ান সহ বাকিরা গিয়ে দাঁড়ালো ইমার্জেন্সি রুমের বাহিরে। সকলের বুকের ভিতরটা ঢিপঢিপ করছে আতংকে। এর মাঝেই আয়ান কল করে ফায়াজের ফ্যামিলিকে জানিয়ে দিলো তার অবস্থার কথা। মিনিট খানিকের মধ্যেই ইমার্জেন্সি রুম থেকে একজন নার্স বেরিয়ে আসলো। অতিরিক্ত ব্লাডলস হয়েছে বলে ব্লাড লাগবে জানালো। একথা শুনে আয়ান আবার ব্যাস্ত হয়ে উঠলো ডোনার খুঁজতে। যেটার জন্য খুব বেশি বেগ পেতে হলো না তাকে। কলেজের কয়েকজন বন্ধুর সাথে যোগাযোগ করে কিছুক্ষণের মধ্যেই দুজনকে পেয়ে গেল ভাগ্যক্রমে। নার্স আরো একবার এসে খুঁজ নিলো ডোনার পেয়েছে কিনা। যেতে যেতে হা হুতাশ করে বলে গেল,
‘ আজকালকার ছেলেদের জীবনের মায়া নেই একেবারে৷ এতো মারপিট কীভাবে করে! ডান হাতের যাচ্ছেতাই অবস্থা। এই ছেলে আগামী ৬ মাসেও পুরোপুরি রিকোভার হবে কিনা আল্লাহ ভালো জানে। ‘
তার এহেন বাক্যে বন্ধুরা আরেক দফা চমকালো। পুণরায় মনে প্রশ্ন জাগলো, কে করেছে ফায়াজের এই হাল! কার এতো ক্রোধ জন্মেছে ফায়াজের প্রতি?
আয়ান বিমূঢ় দৃষ্টিতে সেকেন্ড দুয়েক তাকিয়ে থেকে চুপচাপ প্রস্থান করলো। মিনিট দুয়েক পর একই পথ ধরে রওনা হলো তোহা। চেয়েও মনকে আটকাতে পারছে না সে৷ আয়ানকে এতোটা অসহায় হয়ে পড়তে কখনো দেখেনি সে। কখনো না। করিডরের শেষ প্রান্তে ছোট্ট একটা বারান্দা জাতীয় জায়গা। তাতে টোল রাখা আছে দুটো। ধূলোপড়া একটা টোলের উপর মাথা নত করে বসে আছে আয়ান। তোহা গিয়ে দাঁড়ালো তার সম্মুখে। এদিকটা বেশ নিরিবিলি। দেওয়ালের জন্য তাদের দেহও ঢাকা পড়েছে। করিডর হতে সরাসরি কারো চোখে পড়বে না৷ সেকথা চিন্তা করে আয়ানের কাছে এসেছে তোহা। কম্পিত কন্ঠে, ছোট করে সে ডেকে উঠলো,
‘ আয়ান! ‘
আয়ান মাথা তুলে তাকায়। লালছে, টলমল চোখজোড়া দেখে বুকের ভিতর টা হু হু করে উঠলো তোহার। আয়ান ঢোক গিলে নিজেকে যথাসম্ভব সামলে নিয়ে ধরা গলায় বলে,
‘ তোরও আমাকে দোষী মনে হচ্ছে তাইনা? আমার জন্যই আজ সায়ুর এই অবস্থা। আর ফায়াজ…. ‘
কন্ঠ থেমে গেলো তার। ফের ঢোক গিলে বলে উঠে,
‘ আমি সাপোর্ট না দিলে আজ এসব কিছুই হতোনা। সবটা আমার জন্য হয়েছে। ‘
তার এমন কন্ঠ শুনে অজান্তেই চোখ ভিজে উঠলো তোহার। সে পাশে বসে সান্ত্বনা স্বরূপ কিছু বলবে এমন সময় আয়ান তার দিকে তাকিয়ে কম্পিত কন্ঠে পুণরায় বলে উঠলো,
‘ ট্রাস্ট মি তোহা! ফায়াজকে আমি শুধু বলেছিলাম সায়ুর কাছে নিজের অনুভূতি স্বীকার করার জন্য। আমি জানতাম সায়ু প্রথমে রাজি হবে না। ফায়াজকে বলেছিলাম যাতে ও জোর না করে। ফায়াজের কথা ভেবে আমি দুজনকে আলাদা কথা বলার সুযোগ করে দিয়েছিলাম। কিন্তু…. ‘
কন্ঠস্বর অসম্ভব ভাবে কাঁপছে তার। এই দৃশ্য তোহার কোমল মন সহ্য করতে পারলো না। সে বিনা বাক্যে দুইহাতে ঝাপটে ধরলো আয়ানকে। কাঁধে থুতনি রেখে কেঁদে ফেলল ঝরঝর করে। কান্না মিশ্রিত কন্ঠে বলে উঠলো,
‘ আমরা তোকে বিশ্বাস করি, আয়ান। সবাই জানি তুই সায়ুকে কতোটা কেয়ার করিস। কেউ তোকে ভুল বুঝছে না। নাজরাত আর আবরার ভাই রাগের মাথায় ওসব বলে ফেলেছে। সায়েরী বোন হয় তাদের। যা বলেছে ভুলে যা। কিছু করিসনি তুই। কোনো দোষ নেই তোর। ‘
ক্রন্দনরত কন্ঠে কথাগুলো বলে থামলো তোহা। নিজের অবস্থানের কথা স্মরণে আসলে বিব্রত হয় সে। সরে আসতে গেলে আচমকা অনুভব করে আয়ানের পুরুষালী হাতজোড়া শক্ত করে চেপে ধরেছে তার কোমর, পিঠ। কপাল ঠেকিয়েছে নরম কাঁধে। তার এহেন কান্ডে তোহা বাকরুদ্ধ, বিবশ। কান্না থেমে গেল আপনা আপনি। ঢিপঢিপ করছে বুক। বুকের কম্পন কানে বাজছে যেন৷ বাহুবন্ধন আরও একটু দৃঢ় হয়ে, কাঁধের কাছে আয়ানের উত্তপ্ত শ্বাস উপলব্ধি হতেই চোখ বুজে আসলো তার। শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠলো যেন। এই মানুষটাকে সে ভালবাসে। তাই কাঙ্ক্ষিত পুরুষ হতে অনাকাঙ্ক্ষিত এই স্পর্শে মিইয়ে পড়লো সে। কিন্তু তার এই উড়ুউড়ু অনুভূতি টিকলো না বেশিক্ষণ। কাঁধের কাছে জামার অংশ ভেজা ভেজা অনুভব হতেই চমকে উঠলো। আয়ান কাঁদছে! উত্তেজনায় ছটফটিয়ে উঠল তোহার মন। নিজেকে ছাড়াতে চাইলেও ব্যর্থ হই সে। আয়ান শক্তভাবে জড়িয়ে রেখেছে তাকে। তোহাও জোর করলো না আর। বরং দুইহাতে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা স্বরূপ হাত বুলিয়ে দিলো চুলে, পিঠে। তার এটুকু ভরসায় আয়ানের পুরুষ সত্তা আরও নেতিয়ে পড়লো বোধহয়। ভঙ্গুর সে চাপা কন্ঠে থেমে থেমে বললো,
‘ সবটা এমন এলোমেলো হয়ে গেল কেনো! ফায়াজ কেনো এমন করলো? আমি ওয়ার্ন করেছিলাম ওকে। তবুও… ‘
ফের আটকে আসলো তার কম্পিত কন্ঠ৷ তোহার গাল বেয়ে আবারো নোনাজল গড়ায়। আয়ানের নিরব অশ্রুতে তার কাঁধ ভিজে জবজবে হয়ে উঠে। কানের কাছে পুণরায় ভেসে আসে আয়ানের কন্ঠস্বর,
‘ সায়ুর সামনে কোন মুখে দাঁড়াব আমি? আমি না বললে ও যেতো না ফায়াজের সাথে। আমার জন্যই আজ ওর এই হাল। কি করে এই মুখ নিয়ে দাঁড়াব! ‘
‘ বারবার নিজেকে দোষারোপ করা বন্ধ কর। সায়ু কেনো ভুল বুঝতে যাবে তোকে? এমন কিছুই হবে না। ফায়াজের দোষ নিজের ঘাড়ে চাপানো বন্ধ কর তুই। ‘
তোহার সান্ত্বনা বাক্যে আয়ান নিশ্চুপ রই কিয়ৎকাল। এরপর আচমকা খেয়াল করে, সে জড়িয়ে ধরে আছে তোহাকে। বিষয়টা মস্তিষ্কে খেলে যেতেই বুকে এক অদ্ভুত ধুকপুকানি অনুভব হয় তার। দ্রুত হাত সরিয়ে ছিটকে সরে আসে সে। তার এহেন কান্ডে তোহা হকচকিয়ে গেলো। আয়ান সরে গেলেও তোহা জড়িয়ে ছিলো বিধায় সরে আসতে গেলে মুখোমুখি হয়ে পরে দুজন। অশ্রুসিক্ত দুইজোড়া চোখের মিলন ঘটলে দুই পক্ষেই অস্বস্তিতে পড়ে। আয়ান স্পষ্ট লক্ষ্য করে তোহার গালের লাজুক রক্তিম আভা, কাঁধের ভেজা অংশ। যা দেখে বেচারা আরো একদফা বিব্রত হয়। মুখ ঘুরিয়ে ফেলে দ্রুত। দুই হাতে ঘষে ঘষে সম্পূর্ণ মুখ মুছে। তোহাও গাল মুছে হাতের উলটো পিঠ দিয়ে। আয়ান দাঁড়িয়ে পরে রেলিং ঘেষে। নজর হসপিটালের গেইটের ব্যস্ত সড়কে। মূলত নিজের বিব্রত ভাব লুকানোর চেষ্টায় সে। তোহা যেন বুঝল সবটা। সে লজ্জা পেলেও আয়ানকে এমন নাস্তানাবুদ হতে দেখে ঠোঁট চেপে হাসে। এরপর আবার লক্ষ্য করে আয়ানের চোখজোড়া তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখছে কিছু একটা। মুখশ্রীতে একটা চিন্তিত ভাব। কপাল কুঁচকে তাকিয়ে আছে সে নিচের দিকে। বিষয়টা বুঝে নিতে তোহা নিজেও পাশাপাশি দিয়ে দাঁড়ালো। দৃষ্টি ফেললো হসপিটালের গেইটের বাম দিকের পার্কিং এরিয়ায়। তিনটি বাইক এসে থেমেছে মাত্র। পরিচিত বাইক, মানুষগুলোও পরিচিত। কিন্তু আয়ানের এমন জহুরি নজরের মানে বুঝতে না পেরে তোহা কৌতুহলী কন্ঠে জনতে চাইলো,
‘ ওভাবে কি দেখছিস? ‘
আয়ানের নজর তখন কালো বাইক হতে নেমে দাঁড়ানো টগবগে যুবকটার উপর। নেভি ব্লু রঙের ফুল স্লিভ গেঞ্জি এবং অফ হোয়াইট গেবাডিং প্যান্ট পরিহিত যুবকটাকে দেখে তপ্ত শ্বাস ফেললো সে। স্পষ্ট লক্ষ্য করলো মানুষটার ডান হাতের উপরিভাগ ব্যান্ডেজ দ্বারা মোড়ানো। ভেজা চুল এলোমেলো ভাবে লেপ্টে। যেন তাড়াহুড়ো করে এসেছে বলে পরিপাটি করার সময়টুকু পায়নি সে। এই তাড়াহুড়োর আসল কারণটা আয়ান বুঝতে পেরেছে। এবং বুঝতে পেরেই চিন্তিত হয়েছে সে। তাই তোহার কথার প্রতিউত্তর সরূপ সে বললো,
‘ দেখছি, মানুষ চিনতে কতো বড় ভুল করেছি আমি। ‘
তার জবাবের মানে বুঝতে পারলো না তোহা। কিন্তু ব্যাঙ্গাত্মক গলায় চট করে প্রতিউত্তর করলো,
‘ তা আর বলতে, নয়তো আমার ভালোবাসা উপেক্ষা করে ওই ছিনিমিনির পিছু ছুটতি? ঢেঁড়স কোথাকার! ‘
কথাটা কর্ণগোচর হতেই আশ্চর্য চিত্তে ঘাড় ফিরিয়ে তাকালো আয়ান। জায়গাটা ফাঁকা। তোহা নেই। আয়ান ভীষণ রকমের অবাক হলো তার এহেন জবাবে। কি বলে গেল মেয়েটা! সে ঢেঁড়স! আর ছিনিমিনি কে? এই নামের কোনো মেয়েকে চিনে বলে মনে পড়লো না তার। অনেক ভাবার পর হঠাৎ খেয়াল হলো, মাস দুয়েক আগে মিনি সিদ্দিকী নামক এক মেয়ে চিঠি পাঠিয়েছিল বলে তোহা ক্ষেপে গিয়েছিলো আয়ানের উপর। সেই মেয়েটাকে ছিনিমিনি বলে সম্মোধন করেছিলো নুহাশ। এখন তোহাও!
চিন্তিত ভঙ্গিতে কপাল ঘষল সে। নিজ মনে ভাবলো, কত কাল আগে এক মেয়ে চিঠি দিয়েছিল বলে তোহা এখনো জেলাস! ভালোবাসার মানুষের কাছে মেয়ে মানুষ কি এমনই জেলাসিতে টইটম্বুর হয়ে থাকে নাকি? আশ্চর্য ব্যাপার!
গোধূলি বিকেল। মাঝারি আকারের ছাদ টাতে আম গাছের ছায়াতলে মাদুর বিছিয়ে বসে আছে নাজরাত, সাফ্রিন, তোহা এবং নুহাশ৷ সকলের মধ্যবর্তী স্থানে পরিবেশন করা আছে চটপটি, ফুচকা, কোল্ড ড্রিংকস সাথে চিপস, চানাচুর। খেতে খেতে আড্ডা জমানোর চেষ্টায় তারা। কিন্তু আড্ডা জমে উঠছে না ঠিক। কারোরই মন, মেজাজ ভালো নেই৷ তোহা মুখ ভাড় করে অপ্রাসঙ্গিক কথা তুললো কিছু। কিন্তু কারো সাড়াশব্দ পেলো না তাতে। ফুসকাতে টক ঢেলে তা মুখে নিয়ে সে চোখ তুলে চাইলো সকলের দিকে৷ নাজরাত ফোনে ব্যস্ত। সাফ্রিনের দৃষ্টি পশ্চিম দিকের নির্জন জায়গাটাতে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ দুটোর উপর। আর নুহাশ! সে উঁকিঝুঁকি মারছে কাছাকাছি একটা বাড়ির জানলার দিকে তাকিয়ে। তা দেখে কপাল কুঁচকে ফেললো তোহা। ঠাশ করে এক চড় মারলো নুহাশের মাথার পেছনে। আচমকা আক্রমণে হকচকিয়ে গেলো ছেলেটা। চোখ বড় বড় করে তোহার দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো ,
‘ মারলি কেনো? এখন কিছু বলছি তোকে? ‘
‘ আমরা আছি আমাদের চিন্তায় আর তুই নতুন প্রেমিকা জোটানোর ধান্দায় উঁকিঝুঁকি মারছিস? এ্যাঁই! তোর লজ্জা নেই? ‘
‘ আমি কি তোর মতো যে উঁকিঝুঁকি মারতে গিয়ে চার চোখ লাগাতে হবে? আমার চোখে হেব্বি পাওয়ার আছে। তোর মতো কানা নয় আমি। তাই যেখানে ইচ্ছা উঁকিঝুঁকি মারবো। সমস্যা? ‘
‘ আলবাত সমস্যা। কোথায় একটু সলিউশন দিবি তা না করে তুই… ‘
দুজনের অযাচিত কথায় বিরক্ত হতে তোহার কথায় মাঝে তাকে ধমকে উঠলো সাফ্রিন। তার ধমক শুনে দুজনেই চুপ। নাজরাতের হাত থেকে ফোন কেড়ে নিতেই সে চমকে উঠলো। মুখ ফসকে বলে উঠলো,
‘ আরেএএএ! সাদিফ মেসেজ দিচ্ছে… ‘
সাফ্রিন পাত্তা দিল না সেদিকে। গম্ভীর মুখে তাকাতেই চুপসে গেল নাজরাতও। সাফ্রিন বিড়বিড় করে বললো,
‘ সাদি ভাইকে দেখে কখনো মনেই হয়নি সে এতোটা বউ পাগল হবে! ‘
এরপর গম্ভীরমুখে সকলের উদ্দেশ্যে বললো,
‘ নিজেদের ফালতু কাজ বাদ দিয়ে ওদিকেও একটু ফোকাস দে। এখানে কেন এসেছি আমরা? কতদিন হলো সায়ুকে চিয়ার আপ করার ট্রাই করছি। কিন্তু ও সোজা মুখে কথায় বলছে না। ফায়াজ যে কাজ করেছে তার জন্য ওর মনে কতটা আঘাত পেয়েছে, ভাবতে পারছিস? ‘
নাজরাত ফুঁস করে শ্বাস ফেললো। হতাশ কন্ঠে বললো,
‘ কত কি করলাম। ওকে হসপিটাল থেকে রিলিজ দেওয়ার পর থেকে এখানে পরে আছি আমি। সারাক্ষণ সাথে সাথে থাকছি। কিন্তু ও তো পাত্তায় দিচ্ছে না। এমন গুমসুম হয়ে থাকে যে কি বলবো, কি করবো খুঁজেও পাইনা। আর ভালো লাগছে না এসব। একটা ঘটনায় সব লণ্ডভণ্ড হয়ে গেলো। ‘
কথাগুলো বলতে গিয়ে গলা ধরে আসলো নাজরাতের। বাকিদেরও মন ভাড় হলো খুব। নাজরাতের মনে পড়লো সেদিনের কথা। সায়েরীর জ্ঞান ফিরার পর শুরুতেই তার মা, বাবা, পরিবারের সকলে দেখা করেছিলো তার সাথে। সায়েরী তখন একদম শান্ত ছিলো। নিষ্প্রাণ এক পুতুলের মতো স্তব্ধ হয়ে বসে ছিলো সে। এরপর কেবিনে প্রবেশ করলো নাজরাত সহ বাকি দুই বান্ধবী এবং নুহাশ। তাদের দেখে সায়েরীর শান্ত মুখশ্রীতে মেঘ জমে উঠলো। কেঁপে উঠলো দৃষ্টি।
নাজরাত কাছে গিয়ে জড়িয়ে ধরতেই হাউমাউ করে কেঁদে উঠেছিলো মেয়েটা। তার ক্রন্দনরত আর্তনাদে কেবিনের চার দেওয়াল ও কেঁপে উঠেছিলো বোধহয়। বান্ধবীদের চোখ ভিজে উঠেছিলো। তিনজন একই সঙ্গে জড়িয়ে ধরে নিরব কান্নায় মেতে ছিলো। এই দৃশ্য সহ্য করতে না পেরে বেরিয়ে গিয়েছিল নুহাশ ৷ কান্নার দমকে শ্বাস আটকে এসেছিলো সায়েরীর। নাজরাত জোর করে ছাড়িয়ে নিয়েছিলো তাকে। গাল মুছে শান্ত করার আপ্রাণ চেষ্টা করছিলো। কিন্তু সায়েরীর অশ্রু থামছিল না। সাফ্রিন পুণরায় তার মাথাটা বুকে টেনে নিয়েছিলো। সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা ছিলোনা মুখে। বেশ অনেক্ষন পর শান্ত হয়েছিল সায়েরী। এরপর দরজার দিকে তাকিয়ে সে অদ্ভুত ভঙ্গিমায় বলে উঠেছিলো, সে বাড়ি যাবে। আজ এবং এক্ষুনি।
ডাক্তার বলেছিলো বিকেলের দিকে রিলিজ দিয়ে দিবে। কিন্তু সায়েরীর জেদের কাছে হার মেনে ঘন্টা খানিকের মাঝেই রিলিজের ব্যবস্থা করতে হয়েছিলো। এই ঘন্টা খানিক সময়ে সায়েরী তার পাশ হতে নড়তে দেয়নি মেহরিন বেগমকে। তিনি না থাকলে কাউকে না কাউকে বসিয়ে রেখেছিলো নিজের সাথে। তার এই অদ্ভুত ব্যবহারের কারণটা জানা নেই কারো। হসপিটাল থেকে ফিরার পর তার বাসায়ও বেশ কয়েক বার এসেছে বন্ধুরা। কেবল আয়ান বাদে। সকলে অনেক চেষ্টা করেছে তাকে স্বাভাবিক করতে। কিন্তু বারবার ব্যর্থ হয়ে ফিরে যেতে হয়েছে তাদের। হসপিটাল থেকে ফেরার তৃতীয় দিন সায়েরীর খেয়াল হলো আয়ানের কথা। তার সাথে এতো কিছু হয়ে গেল। অথচ আয়ান একটাবার খোঁজ নিলো না! ব্যাপারটা চরম আশ্চর্যের। নাজরাত তার সাথেই ছিলো তখন। আয়ানের ব্যাপারে জানতে চাওয়া মাত্র নাজরাত অপরাধী কন্ঠে খুলে বললো সব কথা। যা শুনে ভয়ংকর রেগে গেল সায়েরী। নাজরাতকে বকাঝকা তো করেছেই। সেই সাথে আবরারকেও কথা শুনাতে ছাড়েনি। বিপরীতে আবরার কিছু বললো না। অনেক পরে হলেও সে বুঝতে পেরেছিলো, রাগের মাথায় আয়ানকে কথা শুনিয়ে বিরাট ভুল করেছে সে। আয়ানের ব্যাপারে সকলের জানা। আবরারের পর ভাই রূপে সায়েরীর অন্য এক রক্ষা কবজ সে। তার দিকে আঙ্গুল তোলা একদন ঠিক হয়নি।
আয়ানের উপরেও সুপ্ত এক অভিমান জমলো সায়েরীর। অভিমানী কন্ঠে জানালো আজকের পর আয়ানের মুখও দেখবে না সে৷ ভুলে যাবে এই নামের কোনো বন্ধু আছে বলে। কথাগুলো সোজাসাপটা আয়ানের কাছে পাচার করে দিলো নাজরাত। সেই সাথে জোর গলায় বললো, যত দ্রুত সম্ভব সে যেন এসে সায়েরীর সঙ্গে দেখা করে যায়। এখন একমাত্র আয়ানই শেষ আশা, ভরসা।
নাজরাতের কথা ধরে ঠিক দুই দিন পর আজ বিকেলে আয়ান সহ সব বন্ধুরা হাজির হয়েছে সায়েরীর বাসায়। আসার পর থেকে আয়ান বেশ অনেক বার চেষ্টা করেছে সায়েরীর সাথে কথা বলার। কিন্তু মেয়েটা ফিরেও তাকাইনি তার দিকে। ছাদে আসার পরপরই আয়ান একপ্রকার জোর করে তাকে নিজের সাথে এনে অন্য প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে। ছাদের পশ্চিম দিকে রেলিংয়ের সঙ্গে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে দুজন। সায়েরী গম্ভীরমুখে অন্যদিকে তাকিয়ে রয়েছে। আয়ান এবার আর থাকতে না পেরে অস্থির কন্ঠে বলে উঠলো,
‘আচ্ছা, সরি বললাম তো! আর কতোদিন চুপ করে থাকবি? ‘
‘এতদিন খোঁজ না নিয়ে এখন এসে একটা স্যরি বলেই শেষ? ‘
‘ আর কি করবো? কান ধরতে হবে? আচ্ছা, তোর জন্য এটাও করতে পারি কিন্তু এই বিচ্চু গুলোর সামনে…. ‘
কথাটা বলেই আড়চোখে তাকালো সে। বাকিরা তাদের দিকেই তাকিয়ে। সায়েরীও তাকালো। আয়ানের এই নাস্তানাবুদ চেহারা দেখে মনে মনে সে স্থির করলো, একে দিয়ে কান ধরিয়েই ছাড়বে। তাই গম্ভীরমুখে বললো,
‘ কিন্তু কি? কান ধর। এটাই বড় শাস্তি। ‘
আৎকে উঠলো আয়ান। এভাবে নিজের জালে নিজেই ফেঁসে যাবে, তা ভাবে নি সে। করুণ চোখে তাকালো সায়েরীর দিকে৷ কিন্তু আজকের এই সায়েরী যেন ভিন্ন কেউ। কিঞ্চিৎ পরিমাণ ও দয়া মায়া দেখাচ্ছে না মেয়েটা। উপায় না পেয়ে চোখ খিচে কান ধরলো আয়ান। থমথমে কন্ঠে বললো,
‘ স্যরি। দুঃখীত। এই ভুল জীবনেও হবে না আর। এবারের মতো মাফ করে দে দোস্ত, প্লিজ!!! ‘
সায়েরী প্রতিউত্তর করবে এর আগে দূর থেকে ভেসে আসলো চার জনের হাসির শব্দ৷ নুহাশ হাততালি দিয়ে শিস বাজায়। আয়ান কটমট চোখে তাকায় তার দিকে। সায়েরী নিজেও ঠোঁট চেপে হাসে ওদের কান্ড দেখে। আয়ান কান ছাড়তে নিলে নুহাশ তড়িঘড়ি করে মোবাইল বের করে বলে উঠে,
‘ ওই খাড়া! এই মোমেন্ট ক্যাপচার না করলে জীবন যুদ্ধে পিছিয়ে যাব আমরা। এভাবেই থাক। হেব্বি লাগছে। ‘
আয়ান তেতে উঠে। নুহাশ ভিডিও করছে দেখে কান ছেড়ে সহসা পায়ের স্লিপার খুলে ছুড়ে মারে তার দিকে৷ এই পর্যায়ে সায়েরীও হেসে ফেলে শব্দ করে। তার হাসির শব্দে আয়ান ঘাড় ফিরিয়ে তাকায়। বুক থেকে বিশাল এক পাথর সরে গেছে এমন করে শ্বাস ফেলে সে। চোখাচোখি হতেই সে স্বভাবগত ভাবে হাত বুলিয়ে দেয় সায়েরীর মাথায়। হাসিমুখে বলে,
‘ তোর এই হাসির জন্য আমরা সব করতে পারি, সায়ু। সব। আবারো স্যরি, আমি বুঝতে পারিনি আমার অনুপস্থিতিতে তুই এতোটা কষ্ট পাবি। ‘
সায়েরী ছলছল চোখে তাকায়। জীবনের অন্যতম এক প্রাপ্তি এই বন্ধুরা। আয়ানকে ক্ষমা করে দিলেও সে অভিমানী কন্ঠে পুণরায় বলে উঠে,
‘ তুই কি করে ভাবলি আমি তোকে দোষারূপ করবো? যা হয়েছে, সব আমার ভাগ্যে ছিলো। এতে তোর কোনো দোষ নেই। ‘
তপ্ত শ্বাস ফেলে পুণরায় রেলিঙের সঙ্গে হেলান দিয়ে দাঁড়ালো আয়ান। অনিচ্ছা স্বত্তেও জানালো,
‘ ফায়াজ হসপিটালে। ‘
এহেন বাক্যে সায়েরী চমকে উঠে। কেউ বলেনি তাকে এই ব্যাপারে। সেদিন হসপিটাল থেকে বাড়ি ফিরার পর পরই ফায়াজের মা, বাবা এসেছিলো বাসায়। ভদ্রমহিলা লজ্জায়, অপমানে সায়েরীর হাত ধরে কেঁদে ফেলেছিলেন। সায়েরী নতুন দেখেনি না তাদের। সে যতটুকু পেরেছে, তাদের অপরাধবোধ কমানোর চেষ্টা করেছে। সায়েরীর বাবা, মায়ের কাছেও ক্ষমা চেয়ে প্রস্থান করেছিলেন তারা। ফায়াজের ব্যাপারে কিছুই বলেনি। হয়তো বলে সায়েরীকে আরো অস্বস্তিতে ফেলতে চায়নি। এই কয়েক দিনেও কেউ ফায়াজের কথা তুলেনি তার সম্মুখে। তাই আজ আয়ানের কাছে এমন কিছু শুনে অবাক হয়েছে সে। তার মুখশ্রী দেখে আয়ান পুণরায় বলে উঠলো,
‘ স্টেবল আছে। তবে অবস্থা খুব বেশি ভালো না। ডান হাতে ফ্রেকচার হয়েছে। মাথায় বেশ চোট পেয়েছে। রিকোভার হতে বেশ সময় লাগবে জানিয়েছে ডক্টর। ‘
সায়েরী ভীষণ অবাক। ঘন ঘন শ্বাস ফেলে সামলায় নিজেকে। কম্পিত কন্ঠে বলে,
‘ ক..কবে হয়েছে এসব? ‘
‘ যেদিন তোর সাথে ঘটনাটা হলো, সেদিন। ‘
‘ কীভাবে? এক্সিডেন্ট? ‘
‘ উঁহু। মেরেছে কেউ। ‘
চমকিত নজরে তাকালো সায়েরী। আকাশ সমান বিষ্ময় নিয়ে বলে উঠলো,
‘ মেরেছে মানে? কে মেরেছে? তাও এতো বাজেভাবে? কি করেছে ও? ‘
‘ তোর সাথে এত বড় একটা দুর্ঘটনা ঘটিয়েছে। সেটার শোধ তো দিতেই হতো তাইনা? ‘
‘ কিসব বলছিস! খুলে বল। আমি বুঝতে পারছি না কিছু৷ ‘
আয়ান মৃদু হাসে। সায়েরীর কথাটা পুরোপুরি উপেক্ষা করে বাকিদের কাছে এগোতে এগোতে বলে,
‘ কিছু না। বাদ দে৷ এখানে আয়। ‘
সায়েরী তখনো দাঁড়িয়ে। মাথা ভনভন করছে তার৷ কিলবিলিয়া উঠছে হাজারো প্রশ্ন৷ আয়ান গিয়ে বাকিদের সাথে জয়েন হতেই সাফ্রিন নিম্ন কন্ঠে জানতে চাইলো, ‘অল সেট?’
বিনিময়ে মাথা নেড়ে সায় জানাল আয়ান। তা দেখে বড় করে শ্বাস ফেললো বাকিরা। নাজরাত ডাকতেই গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে আসে সায়েরী। সাফ্রিন এবং নাজরাত মিলে সবাইকে ফুসকাতে টক ঢেলে এগিয়ে দিতে থাকে। আয়ানের দিকে বাড়িয়ে দেওয়া মাত্রই পাশ থেকে তোহা চেঁচিয়ে উঠে,
‘ আরে সাফা! ও টক খায়না৷ খালি চটপটি দে বাটিতে৷ ‘
সাফ্রিন বেশি কিছু না ভেবে সেটাই করে। কিন্তু অবাক চোখে তাকায় আয়ান৷ তোহার অবশ্য তার দিকে খেয়াল নেই। সে খেতে মগ্ন। আয়ান অবাক হয়ে ভাবে, তার এই ছোট ছোট পছন্দ,অপছন্দ গুলোও তোহা লক্ষ্য করেছে! মনে রেখেছে! মন গহীনে দোলা লাগলো যেন তার৷ ভাবনার মাঝেই তার কাঁধে মাথা রাখলো সায়েরী। আয়ান ফিরে তাকালো। সায়েরীর মুখখানা এখনো থমথমে। মেঘে ঢেকে আছে যেন। দৃষ্টি জোড়া বড্ড বেশি উদাসীন। আয়ান পুণরায় তাকায় নাজরাতের দিকে। সেও লক্ষ্য করেছে ব্যাপারটা। দুজনই বুঝতে পেরেছে, সায়েরী গোপন কিছু নিয়ে আপসেট হয়ে আছে। এই মন খারাপ দুর্ঘটনাটার জন্য নয়। বরং অন্য কিছু নিয়ে। হাতের চিপসের প্যাকেট টা সে সায়েরীর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে নিম্ন কন্ঠে জানতে চাই,
‘ কি নিয়ে এতোটা আপসেট হয়ে আছিস? ‘
সায়েরী মাথা তুলে। জোর পূর্বক হেসে ধীর কন্ঠে জবাব দেয়,
‘ কিছু না। ‘
‘ ফায়াজ যা করেছে তার শোধ আমরা পূরণ করে দিয়েছি। তোকে চিনিনা আমরা? আমাদের সাথে থাকলে দুনিয়ার সব কষ্ট ভুলে যাস তুই। সেখানে আজ ৫-৬ দিন থেকে চেষ্টা করেও তোর মন বুলাতে পারছি না কেন কেউ? ফোন সুইসাইড অফ৷ কলেজে যাচ্ছিস না, বাহিরে বের হতে বলেছি সেটাতেও না করেছিস। ঠিক কাকে ইগনোর করছিস বলত? ‘
সায়েরীর উদাসীন দৃষ্টিতে বিষ্ময় খেলে গেল শেষের বাক্যে৷ যা স্পষ্ট লক্ষ্য করলো আয়ান। সে তো একটু বাজিয়ে দেখছিলো শুধু। কিন্তু সঠিক জায়গায় তীর লেগে যাবে ভাবেনি। সায়েরীর প্রতিক্রিয়া দেখেই সিউর হয়ে গেছে সে৷
‘ ক..কাকে ইগনোর করবো? এমন কিছুই না। এমনতেই ভালো লাগছে না। কিছুদিন যাক, ঠিক হয়ে যাব। ‘
আয়ান আর কথা বাড়ালো না। মনযোগ দিলো বাকিদের দিকে৷ আগের মতো হইহট্টগোল ওয়ালা আড্ডা ঠিক জমে উঠে না এখন। স্বাভাবিক থাকার শত চেষ্টা করেও ব্যার্থ তারা। চেয়েও ফায়াজকে ভুলে যেতে পারছে না। বুকভরা রাগ নিয়েও আয়ান রোজ খোঁজ নিচ্ছে তার। অন্যরাও তাই। যা হয়েছে তা পুরোপুরি মেনে নিতে সময় লাগবে অনেক। অপেক্ষা শুধু সময়ের। সময়ে সময়ে সব ঠিক হয়ে যাবে। ফায়াজের অনুপস্থিতি টাও মেনে নিতে অভ্যস্ত হয়ে উঠবে তারা। ফায়াজ কে ছাড়াই বাকি জীবনের আড্ডা গুলো হয়তো পুণরায় জমে উঠবে নতুন আমেজে।
সন্ধ্যা নামার আগে বিদায় নিলো বন্ধুরা। সায়েরী এবং নাজরাত গেইট অবধি এগিয়ে দিতে গিয়েছে তাদের। তোহার সাথে নাজরাত কথা বলতে বলতে অনেকটা সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। পেছনে আয়ান এবং সায়েরী। বিদায় নিয়েও হুট করে আবার ফিরে আসলো আয়ান। সায়েরী প্রশ্ন চোখে তাকাতেই সে গমগমে সুরে বলে উঠলো,
‘ দেখ সায়ু! তুই হয়তো ভাবছিস আমি এখানে তোর কথায় এসেছি। কিন্তু আসলে তোর কথায় আসেনি। মানে এসেছি তোর জন্যই কিন্তু অন্য কারো কথা ধরে। আর সেই অন্য কেউটা সাফওয়ান ভাই। ‘
বিষ্ময়ে কিংকর্তব্যবিমুঢ় সায়েরী। নামটা শুনেই বুক ধরফরিয়ে উঠেছে তার। তার বিষ্ময় ভাব পুরোপুরি উপেক্ষা করে আয়ান পুণরায় বলে উঠলো,
‘ তোকে জানানো নিষেধ ছিলো। তবুও না বলে থাকতে পারছি না। তুই যে সাফওয়ান ভাইকে ইগনোর করার চেষ্টা করছিস সেটা ভাইয়া আর আমি বেশ ভালো করে বুঝেছি। তোর বিহেভিয়ারে নয় বরং সাফওয়ান ভাইয়ের চোখ, মুখ দেখেই বুঝেছি। আমি জানি না আদো তোদের মাঝে কি চলছে। কিন্তু আমি তোকে সাবধান করছি। এই ইগনোর ইগনোর খেলা বন্ধ কর। সাফওয়ান ভাইকে আমার চেয়ে ভালো হয়তো তুই বুঝিস। তোর ইগনোরেন্স চুপচাপ এতোদিন ধরে মেনে নিচ্ছে বলে সামনেও মেনে নিবে, এই ধারণা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেল। ঝড় আসার পূর্বের সিনের মতোই মুখ করে আছে সে। পরে যে তান্ডব চালাবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। তোর ভালোর জন্যই বলছি দোস্ত, যা ক্লিয়ার করার মুখোমুখি হয়ে করে ফেল। নয়তো পরে খুব পস্তাবি। আমি চাইনা তোর উপর সে রাগ মেটাক। তাই প্লিজ, যা করবি ভেবে চিন্তে কর। ‘
আয়ানের নির্লিপ্ত কণ্ঠের কথাগুলোর বিপরীতে সায়েরী হতভম্ব, বিমূঢ়। প্রতিউত্তর করার ভাষা নেই কোনো। আয়ান একটু থেমে সায়েরীর মাথায় হাত রেখে, শান্ত কন্ঠে বলে উঠলো,
‘ আমি মানুষ চিনতে ভুল করেছি বলে তোকে এত কিছু সহ্য করতে হলো। একমাত্র আমার সাপোর্টের জন্যই ফায়াজ…..। সেসব ছাড়, আই মাস্ট সে সায়ু, হি ইজ দ্যা রাইট ওয়ান ফর ইউ। উল্টো পাল্টা চিন্তা বাদ দিয়ে মেনে নে সব। এ ছাড়া তোর নিস্তার আছে বলে মনে হয়না। ‘
শেষের কথাটা বলতে গিয়ে ফিচেল হাসে আয়ান। সায়েরী তখনো স্তব্ধ। কেবল ফাঁকা ঢোক গিলেছে অজানা এক আতংকে। আয়ান বিদায় নিতেই সে সোজা ফিরে আসে নিজের রুমে। থম মেরে বসে থাকে কিছু সময়। অনেকটা ভয় ভয় অনুভূতি নিয়ে সুইচড অফ করে রাখা মোবাইলটা চালু করে সে। কানেকশন পাওয়া মাত্র একের পর এক টুংটাং মেসেজের শব্দে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়লো বেচারি। হাজার খানিক মেসেজের জোয়ারে মোবাইল হ্যাং হওয়ার জোগাড়। আন সেভড একটি নাম্বার হতে শতের অধিক মেসেজ দেখে বুক ধরফর করে উঠে তার। অবচেতন মন বুঝে নিয়েছে এই মেসেজ দাতা কে। কোনো মেসেজেই পূর্ণ মনযোগ না দিয়ে একটাবার শুধু চোখ বুলালো সে। মেসেজ সিন করে ফেলেছে, এই ভুলটা বুঝতে পেরে চোখ খিচে ফেলে সে। নিজের বোকামিতে নিজের উপরই রাগ হয়। পুণরায় মোবাইল বন্ধ করে রেখে দেয় আগের স্থানে। মাথা চেপে ধরে বসে থাকে অনেক্ষন। মস্তিষ্ক ব্যাস্ত হয় এলোমেলো ভাবনায়।
সাফওয়ানের সামনে নিজেকে বড্ড বেশি তুচ্ছ বলে মনে হচ্ছে তার। এই ভাবনা আগে কখনো আসেনি মাথায়। সাফওয়ান কখনো উপলব্ধি করতেই দেয়নি খারাপ কিছু। তার গভীর দৃষ্টি দেখে নিজেকে সর্বদা বিশেষ মনে হয়েছে তার। কিন্তু এখন! এখন যেন ঘোর কেটে বাস্তবে ফিরে এসেছে সে। সচ্ছ পর্দার মতো চোখের সামনে জ্বলজ্বল করছে নিষ্ঠুর বাস্তবতা। যাতে সে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে নিজের কমতি,অযোগ্যতা। বিশাল সাম্রাজ্যের একমাত্র বংশধর সাফওয়ান। রূপ,গুন, বংশ,অর্থ সম্পদ কিছুরই কমতি নেই তার। তার পাশে মধ্যবিত্ত পরিবারের তাকে বেমানান -ই লাগবে। রূপের দিক দিয়েও পিছিয়ে সে। কৃষ্ণ বর্ণের ত্বক নয়। অনেকটা হলদেটে গায়ের রঙ তার। কিন্তু এই সমাজ যে ধবধবে ফর্সা মেয়েদেরই রূপবতী বলে আখ্যায়িত করে, সুতরাং সেদিক দিয়েও পিছিয়ে সে৷ তন্মধ্যে, বান্দরবানের সেই ভয়াবহ দুর্ঘটনা…সোজা কথায় বলতে গেলে কিছু নরপিশাচ মিলে কলঙ্কিত করেছে তাকে। পুরোপুরি না হোক।
যেটুকু আক্রমণ করেছে, তাতে যে সায়েরীর শরীরের সঙ্গে মনেও ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে। এই ক্ষত নিয়ে সাফওয়ানের পাশে দাঁড়ানোটা একেবারে মানন সই নয়। এই ঘটনার পরবর্তী তে কলেজে সকলের সামনে তার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিলো। সকলের মনে কিছুটা হলেও সংশয় জন্মেছে তাকে নিয়ে। সাফওয়ান নামক সচ্ছ, দৃঢ় ব্যাক্তিত্বের যুবকটার পাশে এই দাগ লাগা মেয়ে আদো কি শোভা পায়? এসব ছাড়াও মাত্র কিছুদিন পূর্বে, বিশ্বস্ত বন্ধুর দ্বারা আরো একবার কলঙ্কিত হলো সে। যে ঘটনাতে তার শরীর ও মন উভয়েই গভীর দাগ লেগেছে। এত এত অযোগ্যতা, অপবিত্রতা নিয়ে সে কি করে সাফওয়ানকে মেনে নিবে? কোনো যোগ্যতায় যে নেই তার। এই যুক্তি,দহন,স্বপ্ন ভাঙ্গার বেদনা সে কাকে বুঝাবে!
ভালোবাসাকে আপন করে নিতে চেয়েও দূরে ঠেলে দেওয়ার মতো মর্মবেদনা যে আর নেই তা হারে হারে ঠের পাচ্ছে সে। এই কথাগুলো সাফওয়ান কে কিভাবে বুঝাবে সে? নিজ সিদ্বান্তে সর্বদা অনড় থাকা মানুষটা বুঝতে চাইবে কিছু! সেদিন হাসপাতালে বান্ধবীদের সাথে দেখা করার পরপর কেবিনের দরজার ফাঁকে সাফওয়ান কে এক ঝলক দেখে সে অস্থির হয়ে উঠেছিলো বাড়ি ফিরার জন্য। সাফওয়ানের মুখোমুখি হতে চাইনি সে। বেনামি সম্পর্কে আর মায়া বাড়াতে চাইনি। ভাগ্যক্রমে দেখা মিলেনি সেদিন সাফওয়ানের। পরের দিন গুলোতে সে নিজেই সাক্ষাৎকারের সব রাস্তা বন্ধ করে রেখেছিলো। ভেবেছিলো তার অবহেলা বুঝতে পেরে তুখোড় আত্মমর্যাদা সম্পন্ন মানুষটা পিছিয়ে যাবে। নিজেকে নত করবে না সায়েরীর কাছে। কিন্তু আজ আয়ানের বক্তব্য শুনে সে বুঝে গিয়েছে যে সাফওয়ান পিছু হাঁটেনি। বরং সায়েরী এগিয়ে আসার অপেক্ষায় সে।
দরজা খোলার শব্দে ধ্যান ভাঙ্গে তার। দ্রুত চোখ মুছে। লম্বা শ্বাস ফেলে নিজেকে স্বাভাবিক দেখানোর চেষ্টা করে। নাজরাত এসেছে। হাসি হাসি মুখে সে সায়েরী কিছু একটা বলতে এসে সায়েরীর লালছে মুখশ্রী দেখে অবাক হয়। এই না সব ঠিক ছিলো! বন্ধুরা যেতেই আবার কি হয়ে গেল মেয়েটার। দরজা আটকে সে সায়েরী পাশে গিয়ে বসে। উদ্বিগ্ন কন্ঠে মুখ ছুঁয়ে প্রশ্ন করে একের পর এক। তার এটুকু স্নেহে ভঙ্গুর মেয়েটা পুরোপুরি গলে গেল যেন। দুইহাতে নাজরাতকে ঝাপটে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠলো। তার এলোমেলো কান্নার সুরে বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠলো নাজরাতের। এক হাতে সায়েরী কে জড়িয়ে অন্য হাত দিয়ে মাথা বুলিয়ে দিতে দিতে সে অস্থির কন্ঠে বলতে কারণ জানতে চাই। বিপরীতে সায়েরী কেঁদেই চলেছে। এক পর্যায়ে হেঁচকি তুলে ক্রন্দনরত কন্ঠে সে বলে উঠে,
‘ সবসময় আমার সাথেই কেনো এমন হয়? ‘
নাজরাত থমকে যায় একথা শুনে। কতটা মর্মান্তিক শোনাল এই কন্ঠ, এই বাক্য। কতটা গভীর শোক বুকে চেপেছিল এই ছোট্ট মেয়েটা, তার ধারণা তাদের কারোরই নেই। নাজরাত আর কিছু জানতে চাইনা। চুপটি করে সায়েরীকে জড়িয়ে ধরে বসে রয়।
মাঝে আরও দুই দিন কেটেছে। আয়ানের শত বলার পরেও সায়েরী ফোন চালু করেনি। পূর্বের মতোই ঘরে বন্ধী করে রেখেছে নিজেকে। নাজরাত কেও যেতে দেয়নি। সন্ধ্যা ৬টা বাজে এখন। কাবার্ড হতে নতুন জামা বের করে ভোঁতা মুখে বসে রয়েছে সে। ঠিক তখনই ওয়াশরুম হতে তাড়াহুড়ো ভঙ্গিতে বেরিয়ে আসে নাজরাত। সায়েরীকে এখনো বসে থাকতে সে ধমকে উঠে,
‘ এখনো কাপড় পড়িসনি! দেখ সায়ু, তোকে রেডি আমাকেও রেডি হতে হবে। এতগুলো দিন পর আমার একমাত্র বরটা সময় বের করেছে দেখা করার। অ্যাটলিস্ট, আজকে আমি লেট হতে চাইনা। ফটাফট চেঞ্জ কর, যা। ‘
‘ না গেলে হয়না? ‘ সায়েরীর অনুভূতিহীন কন্ঠ।
তার একথা শুনে নাজরাত তেতে উঠে,
‘ তুই মার খেতে চাস আমার? নাকি নীতি আপুকে অসম্মান করতে চাস বলত? এতো রিকুয়েস্ট করেছে তোকে। আর তুই… যা ইচ্ছে কর। আমি আর বলছি না কিছু। ‘
উপায় না পেয়ে সায়েরী ড্রেস নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে পরে৷ গতকাল সকালের দিকে আচানক রায়ান এবং নীতি হাজির হয়েছিলো তাদের বাসায়। কারণ আজ রায়ানের জন্মদিন। আবার সেই সঙ্গে দুজনের অ্যানিভার্সেরি। কয়েক বছর আগে এই দিনেই রায়ানকে প্রপোজ করেছিলো নীতি। আজ তাই সেলিব্রেশন পার্টির আয়োজন করা হয়েছে রায়ানের বাসায়৷ বন্ধু হিসেবে যদিও আবরারকে আগেই ইনভাইট করেছিলো তারা। বাসায় আসার কারণ হলো সায়েরীকে ইনভাইট করা। তারা জানত সায়েরী সহজে রাজি হবে না। তাই নীতি ব্যাক্তিগত ভাবে তাকে রিকুয়েস্ট করেছে। তার জোড়াজুড়ি তে অনিচ্ছা স্বত্তেও মন পোষণ করতে হয়েছিলো সায়েরীকে। আবরারও চাই সে ঘর থেকে বের হোক, মনে শান্তি মিললে হয়তো ধীরে ধীরে আগের রূপে ফিরে আসবে। এই ভাবনা নিয়েই সে নীতিকে জানিয়েছে, সায়েরীকে সাথে আনবে বলে।
কিন্তু সায়েরীর ভয় হচ্ছে সাফওয়ান কে নিয়ে। পার্টিতে সাফওয়ান থাকবে এতে কোনো ভুল নেই। কিন্তু তাকে সামনে পেলে সাফওয়ান কি করবে সেটা ভেবেই অস্থির হয়ে উঠছে সে।
ঘন্টা খানিকের মধ্যে দুই বোন তৈরি হয়ে নিয়েছে। নাজরাত ইচ্ছে মতো নিজেও সেজেছে সেই সাথে সায়েরীকেও সাজিয়েছে। সায়েরী বারণ করলেও পাত্তা দেয়নি সে। সাদিফ এসেছে অল্প কিছুক্ষন হলো। ড্রয়িংরুমে বসে সে মামা শ্বশুর দের সাথে কথায় মগ্ন। নাজরাত আসতেই বেরিয়ে পড়ে দুজন। এর কিছুক্ষণ পর ডাক পড়ে সায়েরীর। আবরার ডাকছে। নিজেকে স্বাভাবিক রেখে বেরিয়ে পড়ে সে। কয়েক সিড়ি নেমে আবরার গিফট বক্সটা সায়েরীর হাতে ধরিয়ে দিয়ে পুণরায় ফিরে যায় নিজের ওয়ালেট নিতে৷ অগত্যা সায়েরী একাই নেমে আসে। গেইট খুলে সম্মুখে দৃষ্টি দিতেই হতবুদ্ধি হয়ে পড়ে সে।
ধ্ব্ক করে উঠে বুক। না চাইতেও স্থির হয়ে যায় দৃষ্টি। নিঃশ্বাসের গতি বাড়ে। কালো শার্ট, প্যান্ট পরিহিত সুদর্শন মানবটাকে দেখে মুগ্ধ হতে বাধ্য হয় সে। নিয়মের বাইরে গিয়ে আজ বুকের কাছে দুটো বোতাম উন্মুক্ত রেখেছে মানবটা। যার ফাঁকে উঁকি দিচ্ছে ধবধবে ফর্সা বুকটা। স্পষ্ট দেখা মিলছে পুরনো ক্ষতচিহ্নের। কনুই অবধি স্লিভ গুটিয়ে উন্মুক্ত করে রেখেছে লোমশ হাতজোড়া। বাম হাতে সব সময়ের মতো কালো অ্যাপল ওয়াচ টা সুভা পাচ্ছে। কালো একখানা সানগ্লাস ঝুলছে বুকের কাছের শার্টের সঙ্গে। হোয়াইট স্নিকার্স পড়া পা জোড়া আড়াআড়ি ভাবে ভাঁজ করে গাড়ির সঙ্গে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে। মাথা ঝুঁকিয়ে মনোনিবেশ করেছে ফোনে। যার দরূন কিছু সংখ্যক চুল ছড়িয়ে পড়েছে কপালের মধ্যিখানে। এই চোখ ধাধানো রূপে বিমোহিত হয় সায়েরী। পরমুহূর্তেই আবার ঢোক গিলে। যার কাছ থেকে পালানোর এতো এতো কুবুদ্ধি নিয়ে ঘর থেকে বের হয়েছে, তার সামনেই পড়তে হলো এতো তাড়াতাড়ি! কি করবে এখন সায়েরী? মানুষটা লক্ষ্য করার আগে ফিরে যাবে কি? কিন্তু কি জবাব দিবে আবরারকে? নীতি কে?
অত্যাধিক উত্তেজনায় শরীর কাঁপছে তার। ফলস্বরূপ হাতের বক্সটা পড়ে যেতে নেয়। লোহার গেইটের সঙ্গে আওয়াজ হতেই সে দ্রুত সামলে ধরে সেটাকে। এটুকু শব্দে সাফওয়ানের মনযোগে ব্যাঘাত ঘটলো। অন্যমনস্ক হয়ে একপলক সামনে তাকিয়ে পুণরায় ফোনে নজর দেয় সে। কিন্তু চমকে উঠে ফের নজর তুলে তাকায়। চোখ জুড়ে অদৃষ্ট বিষ্ময়, মুগ্ধতা। আকাশী-নীল গাউন পরিহিতা রমনী টিকে দেখে হৃদস্পন্দন নতুন উদ্যমে জেগে উঠেছে যেন। কতদিন পর দেখছে সে তার হৃদয় হরনীকে? আট দিন? না নয় দিন? এই আট,নয় দিনকে কি সে বছর খানিক সময়ের সাথে তুলনা করতে পারবে? কারণ আট, নয়দিনের দুরত্ব টাকে তার কাছে এক একটা যুগ মনে হয়েছে।
অবশেষে আজ গিয়ে নিষ্ঠুর সেই রমনীর দেখা মিলেছে। আজ নতুন করে আরো একবার প্রেমে পড়লো বোধহয় সে। এইযে মেয়েটা তাকে দুর্বল করতে আজও সম্মোহনী চোখজোড়াতে কাজল টেনেছে। নিষেধ সত্ত্বেও অধর রাঙিয়েছে। গালজোড়া কৃত্রিম ভাবে হালকা গোলাপি করেছে। এতে সে কতোবার মরছে তা কি জানে মেয়েটা? নিশ্চয়ই না। আর জানে না বলেই বারবার মারছে তাকে। খোঁপা বাধা সত্বেও গালের দুইপাশে লেপ্টে থাকা চুলগুলো দেখে হিংসায় বুক জ্বলছে তার। বুকে উদিত হয়েছে সেই চিনচিনে মিঠে ব্যাথা। সহসা সেথায় হাত চেপে ধরে সাফওয়ান। কিন্তু উপাশের মানবী একেবারে অজ্ঞাত এসব ব্যাপারে। চোখাচোখি হওয়া মাত্রই সায়েরী নজর লুকায়। যা দেখে কপাল কুঁচকে ফেলে সাফওয়ান। ঠোঁটে ঠোঁট চেপে গম্ভীর চোখে লক্ষ্য করতে থাকে মাত্র পাঁচ, ছয় হাত দুরত্বে দাঁড়িয়ে ফ্লাপি গাউনটা সামলাতে হিমশিম খেতে থাকা মেয়েটাকে। এর মধ্যেই হেলেদুলে উপস্থিত হয় আবরার। সায়েরী দ্রুত কাছ ঘেঁষল তার। নিম্ন কন্ঠে ফিসফিস করে বললো,
‘ তোমার বাইক কোথায় ভাইয়া? উনাকে কেনো আসতে বলেছো? সব কিছুতে বন্ধুকে লাগে কেনো? নিজে কিছু করতে পারো না নাকি? ‘
সাফওয়ানের প্রতি শুরু থেকেই সায়েরীর এই ব্যাবহার দেখে আসছে বলে আবরার বেশি কিছু ভাবে না। সোজা মুখে জবাব দেয়,
‘ বাইক রিপেয়ার করতে দিয়েছি। আর ও নিজেই বললো নিতে আসবে তাই না করিনি। এতো কি সমস্যা ওকে নিয়ে বুঝি না। চল, আয়। ‘
থমথমে মুখে এগিয়ে যায় সায়েরী। সাফওয়ান পূর্বেই ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসেছে। সায়েরী ব্যাক সিটের দরজার কাছে যেতেই আচমকা একটা মাথা বেরিয়ে আসে ভেতর হতে। কানে ভাসে চিরপরিচিত পুরুষালি কন্ঠস্বর,
‘ হ্যালো সুন্দরী! ‘
আকস্মিক মিহাদের এমন আচরণে সায়েরী ভয় পেয়ে যায়। মৃদু চিৎকার দিয়ে, বুকে হাত চেপে পিছিয়ে যায় কয়েক কদম।তাকে ভয় পেতে দেখে আবরার এবং সাফওয়ান একই সুরে ধমকে উঠলো মিহাদকে। যা শুনে মিহাদ থমথমে মুখে সায়েরীর জন্য সায়েরীর দরজা খুলে দিয়ে নিজের জায়গায় গিয়ে বসে। পুণরায় মগ্ন হয় ফোনে গেমস খেলতে। সায়েরী বসতেই চালু হয় গাড়ি। তীব্র অস্বস্তি নিয়ে হাঁসফাঁস করে সায়েরী। মিহাদ খেলতে খেলতে টুকটাক কথা বলে তার সাথে। সায়েরী জানলার দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে। এ সি চলা সত্ত্বেও দরদর করে ঘামছে সে। খুব করে চাইছে জানলা খুলে একটু প্রাকৃতিক বাতাসে মন হালকা করতে। কিন্তু মুখ ফুটে বলতে পারে না কিছু। সেকেন্ড দুয়েকের মাঝে হুট করে এ সি বন্ধ হয়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গে মিহাদ এবং আবরার দুজন প্রাশ্ন করে,
‘ এ সি বন্ধ করলি কেনো? ‘
‘ দম বন্ধ হয়ে আসছে। কাঁচ নামিয়ে দে। এভাবে থাকুক কিছুক্ষণ। ‘
সাফওয়ানের কথামতো সেটাই করে দুজন। সায়েরী মিররের দিকে তাকিয়ে। কিন্তু সাফওয়ানের দৃষ্টি রাস্তায় নিবদ্ধ। ফিরেও তাকায় না সে। না চাইতেও এই দৃশ্যে বুক ভাড় হয় সায়েরীর। তার উত্তেজনা লক্ষ্য করে সামনের সিট হতে আবরার প্রশ্ন করে,
‘ সায়ু, খারাপ লাগছে? পানি দিব? ‘
সায়েরী ছোট্ট করে জবাব দিলো, ‘ দাও।’
পানির বোতল বের করে তা এগিয়ে দিলো আবরার। টিস্যু নেওয়ার জন্য ড্রয়ার খুলে অবাক হলো সে। সাফওয়ানের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করলো,
‘ কি ব্যাপার? ফার্স্ট এইড বক্স, ব্যান্ডেজ, এক্সটা টিস্যু বক্স এতকিছু হঠাৎ! আগে তো এসব রাখতি না। এখন কি হলো? ‘
সাফওয়ান জবাব দেওয়ার আগে পেছন থেকে মিহাদ ঠাট্টার সুরে বলে উঠলো,
‘ কি হয়েছে মানে? আস্ত একটা ঝামেলার দ্বায়িত্ব নিয়েছে। এসব তো মামুলি প্রিপারেশন। আরো কত কি দেখার আছে…পিকচার আভি বাকি হে দোস্ত। ‘
অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৪১+৪২
তার এহেন বাক্যে গলায় পানি আটকে কেশে উঠলো সায়েরী। চকিত নজর দিলো মিররে, সঙ্গে সঙ্গে চোখাচোখি হলো সুগভীর বাদামি চোখজোড়ার সঙ্গে। সায়েরীর হতবাক দৃষ্টি উপেক্ষা করে নজর ফিরিয়ে নিলো সাফওয়ান। আবরার বিস্তারিত জানতে চাইতেই কোনো ভাবে কথাটা কাটিয়ে নিলো সে। অন্যদিকে তার শীতল ব্যাবহার ঝড় তুলে সায়েরীর বুকে। সে বুঝে উঠতে পারে না কি চলছে সাফওয়ানের মস্তিষ্কে। এই উপেক্ষা কিসের? রাগের? না অভিমানের?
