Home অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৪৫+৪৬

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৪৫+৪৬

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৪৫+৪৬
সাজিয়া জাহান সুবহা

গন্তব্যে পৌঁছে গাড়ি পার্ক করা মাত্র সবার আগে লাফিয়ে বের হয়ে আসলো মিহাদ। পরপরই সায়েরী এবং আবরার বের হলো ধীরে সুস্থে। ঢিপঢিপ বুক নিয়ে সায়েরী আবরারের পাশ ঘেঁষে দাঁড়ায়। আড়চোখে তাকায় সাফওয়ানের গম্ভীর মুখখানার দিকে৷ আজ মাত্রাতিরিক্ত শান্ত হয়ে আছে ছেলেটা। যার কারণে গিয়ে সায়েরীর ভয় বাড়ছে। না জানে এই শান্ত রূপ কতটা অশান্তি বয়ে আনে তার উপর! ভেবেই ফাঁকা ঢোক গিললো সে৷ একহাতে আবরারের কনুই জড়িয়ে ধরল। তার চুপসানো মুখখানা দেখে আবরারের চিন্তা হয়৷ কপালে ভাঁজ ফেলে বলে,

‘ খারাপ লাগছে তোর? ফিরে যাবি? ‘
সায়েরী মাথা নেড়ে দ্বিমত করে৷ ধীর কন্ঠে জবাব দেয়,
‘ ঠিক আছি। ‘
আবরার কথা বাড়ায় না। ইতোমধ্যে রায়ান এগিয়ে এসেছে গাড়ির শব্দ শুনে। সায়েরী মিষ্টি হেসে শুভেচ্ছা জানালো তাকে। হাসি হাসি মুখে সকলে প্রবেশ করে ভিতরে। রায়ানের মা, বাবা অনুপস্থিত। দুজনেই গিয়েছেন তাদের গ্রামের বাড়ি। বর্তমানে বাসায় রয়েছে রায়ানের বড় ভাই, ভাবি এবং তাদের দুই বছরের মেয়ে। নীতি এবং রায়ানের সম্পর্কের কথা দুই পরিবারেরই জানা৷ যার কারণে কোনো বাঁধা নেই। ঘরে প্রবেশ করা মাত্রই সায়েরীর চোখ আটকায় কালো এবং ধূসররঙের সংমিশ্রণে শাড়ি পরিহিতা নীতি’র দিকে। সিল্ক শাড়ি, ফুল স্লিভ হাতা এবং ফুল নেক ব্লাউজ। কানে হোয়াইট স্টোনের ছোট্ট এক জোড়া দুল৷ কাঁধ অবধি স্ট্রেইট চুলগুলো সাইড সিথি করে খোলা ছেড়েছে। মুখে লাইট মেকওভার। অন্যদিনের টম বয় মেয়েটাকে আজ একেবারে অন্যরকম লাগছে দেখতে। সায়েরীদের দেখেই নীতি চঞ্চল পায়ে এগিয়ে আসে। কিন্তু শাড়ি সামলাতে বেশ কসরত পোহাতে হয় বেচারিকে। দুই দুইবার হোচট খেতে খেতে বেঁচেছে। রায়ান আগলে নিতেই সে কিড়মিড়িয়ে বলে উঠলো,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

‘ বলেছিলাম শাড়ি পড়বো না। সবার সামনে যদি উষ্ঠা খাই না.. তাহলে এই শাড়ি দিয়েই তোর গলা বেঁধে ঝুলিয়ে রাখবো তোকে। ‘
তার এহেন বাক্যে রায়ান চুপসে যায়। অন্যরা হেসে উঠে শব্দ করে। নীতি কাছে এসে হাসিমুখে জড়িয়ে ধরে সায়েরীকে। নিম্ন কন্ঠে বলে,
‘ ভাগ্যিস তুমি এসেছ। নাহলে আজ আমাদের ঘাড় থেকে মাথা আলাদা হয়ে যেত। বড় বাঁচা বাঁচালে। ‘
ফিসফিস কন্ঠের কথাটা শুনে সায়েরী আবারো নিভে গেল। না চাইতেও চোখ গেল সোফায় রাজকীয় ভঙ্গিতে বসে থাকা সাফওয়ানের দিকে। আজ তার কপালে কি যে আছে একমাত্র উপর ওয়ালা জানে।

সাফওয়ান, জিমন,মিহাদ এবং আবরার একসাথে বসে। জিমন এবং মিহাদের ছোট ভাইকেও আসতে বলা হয়েছিল। কিন্তু আসেনি। সাফ্রিন নিজেও সায়েরীকে জানিয়েছিল আসবে বলে। শেষ মুহুর্তে শরীর খারাপ লাগছিলো বলে সেও আসতে পারেনি। তার অনুপস্থিতিতে সায়েরী বড্ড বেশি বিরক্ত। ইশশ!! সে কেনো দিল না এমন শরীর খারাপের অযুহাত! পরে নাহয় নীতিকে কোনোভাবে বুঝিয়ে বলতো৷ এখন এসেই তো ফেঁসে গেল। অবচেতন মন আভাস পাচ্ছে কিছুর। কিছু একটা যে ঘটবে এতে সন্দেহ নেই। সায়েরী শুধু চায় সাফওয়ান যেন তার নাগাল না পায়৷ এজন্যই সে রায়ানের ভাবীর সাথে ভিতরে এসে ডাইনিং স্পেসে বসেছে। তার কোলে দুই বছরের ছোট্ট আহিয়ানা। রায়ানের একমাত্র ভাতিজি। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই বেশ ভাব হয়ে গেছে দুজনের।

মেয়েটা আদো আদো গলায় অনেক কথা বলছে৷ থেমে নেই সায়েরীও। নাশতা খেতে খেতে আহিয়ানা কেও খাইয়ে দিচ্ছে সে। অনেক্ষন কেটে যাওয়ার পর সে পা বাড়ালো লিভিং রুমের দিকে। পায়ের গোড়ালি সমান গাউন পরণে, কোলে নাদুসনুদুস আহিয়ানা। ফলে হাটতে বেশ কসরত পোহাতে হচ্ছিল তাকে। লিভিং রুমে পৌঁছাতেই দেখা মিললো ইরা’র। সবে মাত্র সদর দরজা পেরিয়ে ভিতরে ঢুকেছে সে। নীতি নিজেই এগিয়ে আনছে তাকে। মুখজুড়ে উপচে পড়া হাসি তার। বেস্ট ফ্রেন্ডের আগমনের খুশি। বন্ধুদের সাথে আড্ডায় মশগুল মিহাদ অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে ইরা’র সাক্ষাৎ পেয়ে থমকে গেল। ইরা নিজেও থমকালো। কিন্তু প্রকাশ করলো না সেটা। নিজেকে হাসিখুশি দেখানোর আপ্রাণ চেষ্টায় সে। ইরা’কে দেখা মাত্র সাফওয়ান উঠে আসে। একহাতে জড়িয়ে ধরে হালচাল জিজ্ঞেস করে। ঠিক তখনই ইরা’র পেছন থেকে বেড়িয়ে আসে তার ছোট বোন ইরিনা। মেয়েটা ফ্যালফ্যাল নজরে সাফওয়ানের দিকে তাকিয়ে। ইরা সরতেই সে দ্রুত পায়ে কাছ ঘেঁষল সাফওয়ানের। মুখভর্তি হাসি নিয়ে বললো,

‘ কেমন আছো, সাফওয়ান ভাই ? ‘
হঠাৎ এভাবে এগিয়ে আসায় সাফওয়ান খানিকটা পিছিয়ে গেলো আপনা আপনি। ইরিনার প্রশ্নের জবাবে মৃদু হেসে জবাব দিলো,
‘ ভালো। তুমি কেমন আছো? ‘
ইরিনা মন্ত্রমুগ্ধের মতো সুদর্শন মুখটার দিকে তাকিয়ে। উত্তেজনায় রীতিমতো হাত,পা কাঁপছে তার। সাফওয়ানের প্রশ্ন শুনে সে আনমনে বিড়বিড় করে জবাব দিলো,
‘ তোমাকে দেখেই ভালো হয়ে গেছি। ‘
তাকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে পাশ থেকে খোচা মারলো ইরা। সাফওয়ান নিজেও বিরক্ত এমন চাহনিতে। ইরিনা সম্বিত ফিরে পেয়ে দ্রুত গলায় জবাব দেয়,

‘ ভালো ভালো। খুব ভালো আছি। ‘
‘ গুড। পড়াশোনা কেমন চলছে তোমার? এবার মেডিকেল দ্বিতীয় বর্ষে তাইনা? ‘
ইরিনার চোখ জোড়া খুশিতে ঝলমল করে উঠে। সাফওয়ান তার পড়াশোনার দিকটাও মনে রেখেছে! উচ্ছ্বসিত কন্ঠে সে বলে উঠে,।
‘ হ্যাঁ। আর দুই বছরের মধ্যেই শেষ হবে। ‘
সাফওয়ান আর কথা বাড়ায় না। ছোট কন্ঠে গুড লাক জানায় শুধু। তার চোরাচোখ তখন আবরারের পাশের সোফায় আরিয়ানাকে নিয়ে হাসতে থাকা মেয়েটার উপর। সেকেন্ড দুয়েকের মধ্যে রায়ানের সাথে শ্যামবর্ণের এক যুবক প্রবেশ করে। বন্ধুদের প্রশ্নবিদ্ধ দৃষ্টি স্থির হয় তার উপর। ইরা আড়চোখে তাকায় ঘরের এক কোণে চেয়ারে বসা মিহাদের দিকে। তারপর মুখে হাসি ঝুলিয়ে অচেনা যুবকটার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। সবার কৌতুহল ভেঙ্গে হাসিমুখে সে সাফওয়ানকে পরিচয় করিয়ে দেয়,

‘ আমার ফিয়ন্সে, ড. জাদিদ এহমাদ। হি ইজ অ্যা কার্ডিওলজিস্ট। আর ও হচ্ছে সাফওয়ান। আমার বেস্ট ফ্রেন্ড। বলেছিলাম আপনাকে৷ ‘
জাদিদ হাসিমুখে হাত বাড়িয়ে দেয় হ্যান্ডশেক করার তাগিদে। সাফওয়ান সেকেন্ড কয়েক ইরা’র মুখটার দিকে তাকিয়ে রইলো। এরপর না চাইতেও মুখে হাসি টেনে হ্যান্ডশেক করে। একে একে আবরার সহ সকলে পরিচিত হয় তার সাথে। লম্বাটে, ফিটফাট গড়নের যুবকটাকে পছন্দ করতে বাধ্য হয় তারা। ফর্মাল গেট আপে বেশ লাগছে দেখতে। বলা বাহুল্য, মিহাদের চেয়েও ইরার পাশে এই ভদ্রলোক কে দারুণ মানিয়েছে। নীতি মৃদু হেসে বলে,
‘ আপনার ব্যাপারে অনেক শুনেছি। আমি এক্সপেক্ট করিনি আপনি আসবেন।থ্যাঙ্কিউ সো মাচ ফর কামিং। ‘
জাদিদ চমৎকার করে হেসে জবাব দেয়,

‘ আপনি এতো রিকুয়েস্ট করে বলেছেন যে, না এসে পারলাম না। বাই দ্যা ওয়ে, আপনাকে খুব সুন্দর লাগছে। ‘
নীতি লজ্জা মিশ্রিত মুখে হাসে। পুণরায় ধন্যবাদ জানায়। মিহাদ এবং সায়েরী ব্যাতিত সকলে পরিচিত হয়েছে জাদিদের সাথে।সবার করুণ দৃষ্টি না চাইতেও মিহাদের দিকে আটকায়। ব্যাপারটা বুঝতে পেরে চরম মেজাজ খারাপ হলো মিহাদের। মোবাইলটা পকেটে ঢুকিয়ে সে হেলেদুলে এগিয়ে আসে। তার এক একটা কদম ইরার হৃদস্পন্দন বাড়িয়ে তুলে। বাকিরাও কৌতুহলী নজরে তাকিয়ে। কিন্তু সকলকে অবাক করে দিয়ে মিহাদ অদ্ভুত ভাবে হাসে। জাদিদের দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলে উঠলো,

‘ হ্যালো! আমি… ‘
‘ মিহাদ, রাইট? আপনার ব্যাপারেও বলেছিলো ইরা। নাইচ টু মিট ইউ। ‘
না চাইতেও অবাক হলো মিহাদ। সরাসরি তাকালো ইরার দিকে। ঠোঁট বাকিয়ে হেসে বলে উঠলো,
‘ বাহ! ভালো তো। ‘

পরিস্থিতি থমথমে হয়ে উঠছে বুঝতে পেরে রায়ান তাগাদা দিলো সকলকে বসার জন্য। নিজেই জাদিদকে সম্মানের সহিত বসালো সোফায়। পাশের অন্য সোফায় তখন সায়েরী বসা। জাদিদকে নম্র কন্ঠে সালাম জানালো সে। জাদিদ স্বভাবগত ভাবে মৃদু হাসে। আহিয়ানার গাল টিপে আদর করে। বাকিরাও এগিয়ে আসে একে একে। ধপধপ বসে পড়ে এক একটা সোফায়। বন্ধুরা ইচ্ছে করেই সায়েরীর পাশের সিটটা খালি ছাড়ে। আবরারকে জিমন নিজের পাশে বসায়। সায়েরী অবাক চোখে লক্ষ্য করে একমাত্র সাফওয়ান ছাড়া সবাই বসে পড়েছে। ধীর কদমে সাফওয়ানকে এগিয়ে আসতে দেখে বেচারি ছটফটিয়ে উঠে। কোনোমতে আহি’কে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়বে এর আগেই ধপ করে পাশে বসে পড়ে সাফওয়ান। মাঝে একহাত সমান দুরত্ব।

এহেন কান্ডে সায়েরী জমে গেল নিজ স্থানে। তার গাউনের বিশাল ঘের ফ্লোরে ছড়িয়ে ছিলো, এবং তাতেই ইচ্ছেকরে পা বসিয়েছে সাফওয়ান। যাতে সে উঠতে না পারে। সায়েরী বুঝে উঠতে পারে না কি করবে৷ উৎকন্ঠায় গলা শুকিয়ে আসে তার। জাদিদের পাশে চেয়ারে বসা আবরার। সরাসরি সায়েরী এবং সাফওয়ান কে দেখা না গেলেও বড় ভাই উপস্থিত রয়েছে ভেবেই সায়েরীর বুক ঢিপঢিপ করে। সে একেবারে চেপে বসে সোফার হাতলের সঙ্গে। মাঝে দুরত্ব বাড়িয়েছে আরও কয়েক ইঞ্চি। তার এহেন আচরণে সাফওয়ানের চোয়াল শক্ত হয়। কিন্তু ফিরে তাকায় না সে। সম্মুখে দৃষ্টি রেখে সে এমন একটা ভাব নিয়ে বসে আছে যেন কোনো প্রভাব পড়ছে না তার উপর। কিন্তু ভিতরে ভিতরে কেমন এক ক্রোধ যে চেপে রেখেছে তা কেবল সে জানে।

আহিয়ানা বেশ উৎসাহ নিয়ে কিছু বলছিলো সায়েরীকে। কিন্তু তার জবাব নআ পেয়ে চোখ তুলে চাইলো সে। আদো আদো গলায় ডাকলো, ‘ সায়লি? ‘ পরপর তিনবার ডেকেও সাড়া না পেয়ে মেয়েটা হাত বাড়িয়ে মুখ স্পর্শ করে। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে তার ছোট ছোট আঙুলের পাতলা নখের স্পষ্ট দুই আঁচড় লাগে সায়েরীর নরম গালে। আকস্মিক এমন কান্ডে সায়েরী চমকে উঠে। না চাইতেও মুখ দিয়ে অস্ফুট স্বরে আওয়াজ করে বসে। সঙ্গে সঙ্গে পাশ থেকে আহিয়ানার হাত টেনে ধরে সাফওয়ান। মৃদু কন্ঠে শাসানোর ভঙ্গিতে ডাকে, ‘ আহি!!! ‘
বাচ্চা মেয়েটা এহেন ধমকে ভয় পেয়ে যায়। কান্নার তাগিদে ঠোঁট উল্টে ফেলতেই সায়েরী বুকে চেপে ধরে তাকে। চোখ বড় বড় করে সাফওয়ানের দিকে তাকিয়ে চাপা স্বরে ধমকায়,

‘ পাগল আপনি? ওকে বকছেন কেনো? ইচ্ছে করে করেছে নাকি? ‘
সাফওয়ান কপাল কুঁচকে, ঠোঁটে ঠোঁট চেপে তাকিয়ে রইলো তার দিকে। ফোঁসফোঁস নিঃশ্বাস ফেলছে দেখে সায়েরী ঢোক গিলে ভয়ের চোটে। আহিয়ানার কান্নার শব্দে রায়ান এগিয়ে আসে। সুযোগ পেয়ে সায়েরী বলে নিজের সাথে ভিতরে নিয়ে যাওয়ার কথা। বলেই আড়চোখে তাকায় ফ্লোরে তার ড্রেস চেপে রাখা সাফওয়ানের পায়ের দিকে। যখনই দেখে পা টা সরে গেছে, উঠে যেতে বিন্দুমাত্র সময় নেই না সে। এর সেকেন্ড দুয়েক পর ইরা এবং ইরিনাও ভিতরে চলে আসে। লিভিং রুমে তখন কেবল ছেলেরা রয়েছে। সায়েরী ডাইনিং রুমের একপাশে চেয়ারে বসা ছিলো। সে লক্ষ্য করে ইরা হাত টেনে ভিতরে নিয়ে আসছে ছোট বোনকে। ইরিনার চোখে মুখে রাজ্যের বিরক্তি তখন। ডাইনিং রুমে পৌঁছাতেই জোর করে হাত ছাড়িয়ে নিলো সে। বিরক্ত মুখে বললো,

‘ তোমার সমস্যা কি আপু? এভাবে জোর করে এখানে এনেছো কেনো? ওখানে সাফওয়ান ছিলো, সবাই ছিলো। ‘
‘ বেয়াদবি কমা। এভাবে হ্যাবলার মতো তাকিয়ে থাকার মানে কি? আমার ফ্রেন্ডস রা সবাই ছিলো সেখানে। কেউ খেয়াল করলে কি ভাবতো তারা? ‘
‘ আই রিয়েলি ডোন্ট কেয়ার তোমার ফ্রেন্ডরা কি ভাবতো। কতদিন পর আমি ওকে সামনে থেকে দেখছি। আর তুমি আমাকে কথা অবধি বলতে দিচ্ছিলে না। সবসময় বাধা দিয়ে রেখেছ, আজকেও বাধা দিচ্ছ। আর ওই মেয়েটা, কি যেন নাম…যেটাই হোক। কেমন ছ্যাচড়ার মতো লেপ্টে বসেছিলো। ইচ্ছে করছিলো…. ‘
কথার মাঝেই ইরিনার নজর যায় রুমের কোণায় আহিয়ানাকে কোলে নিয়ে বসে থাকা সায়েরীর দিকে। সায়েরী কথাগুলো শুনতে পেলো না। সে ব্যস্ত আহিয়ানার কান্না থামাতে। তাকে দেখে চুপ হয়ে যায় ইরিনা। ইরা নিজেও খেয়াল করতেই বেশ বিব্রত হয়। জোরপূর্বক হেসে বলে,

‘ ও কাঁদছিলো কেনো, সায়েরী? ‘
কাঁধে মাথা রেখে চুপটি মেরে থাকা আহিয়ানার পিঠে মৃদু চাপড় মারতে মারতে সায়েরী জবাব দেয়,
‘ সাফওয়ান ভাই ধমক দিয়েছিলো দেখে ভয় পেয়েছে। ‘
‘ ওকে ধমক দিতে গেল সাফওয়ান? ‘
‘ তেমন কিছু না আপু। আসলে ও আমাকে ডাকতে গিয়ে গাল খামচে ধরে ফেলেছিলো, তাই। ‘
একথায় দুই বোনের কপালে ভাঁজ পড়ে। সাফওয়ান এবং সায়েরীর ব্যাপারে ইরা পুরোপুরি অজ্ঞাত। কেউ তাকে বলে নি এই ব্যাপারে। ইরিনা মুখ ফসকে বলেই ফেলে,

‘ ন্যাকামি! নিশ্চয় তুমি কিছু করেছ ওকে। নাহলে খামচি দিবে কেন? সিম্প্যাথি পেতে চাও না সাফওয়ানের? ‘
সায়েরী স্তব্ধ। ইরা নিজেও চমকে উঠলো। ধমক দিলো ইরিনাকে। সায়েরী নিরব পায়ে এগিয়ে গেল কিচেনের দিকে। আহিয়ানার মা আয়োজনে ভীষণ ব্যস্ত বিধায় সায়েরী নিজেই ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছে তাকে। কিচেনের সামনে গিয়ে সে ডাক দিতেই ব্যস্ত পায়ে বেরিয়ে আসলেন ভদ্রমহিলা। হাসিমুখে কৃতজ্ঞ জানালেন সায়েরীকে। এরপর তার কোল থেকে আহিকে নিয়ে রুমে গেলেন শুইয়ে দিতে। সায়েরী আর দাঁড়ালো না সেখানে। এমনিতেই নীতি এসে ডেকে গেছে সকলকে। সায়েরী আড়চোখে ইরিনাকে দেখে নিরবে প্রস্থান করলো নীতির সাথে। সে যেতেই ইরা পুণরায় ধমক দিলো ইরিনাকে। এতে ইরিনার উপর কোনো প্রভাব পড়লো বলে মনে হলোনা। মেয়েটা মুখ ঝামটি মেরে নীতি’র কথামতো ছাদের উদ্দেশ্যে রওনা হলো।

ছাদের পরিবেশ বেশ ঝলমলে। ফেইরি লাইটের আলোয় বেশ আলোকিত হয়ে আছে চারপাশ। বেশ সুন্দর করে সাজিয়েছে চতুর্দিক। মাঝামাঝি স্থানে সজ্জিত টেবিলের উপর কেক রাখা। পঁচিশ বছরে পা রেখে এমন ঘটা করে কেক কাটাকে নিতান্তই বাচ্চামি বলে মনে হয় রায়ানের৷ তাই সে কেক আনিয়েছে অ্যানিভার্সেরি উপলক্ষে। ছাদের রিলিংয়ের উপর পা ঝুলিয়ে বসে রয়েছে সাফওয়ান এবং মিহাদ। পাশেই আবরার দাঁড়িয়ে। মিহাদের ক্ষুব্ধ দৃষ্টি ছাদের অন্য কিনারে পাশাপাশি দন্ডায়মান ইরা এবং জাদিদের দিকে। জাদিদ হাসি হাসি মুখে কথা বলেই চলেছে। থেমে থেমে প্রতিউত্তর করতে দেখা গেল ইরা কেও। তার মুখেও মৃদু হাসি। আবরার এবং সাফওয়ান মিহাদের দিকে তাকিয়ে আবার একে অপরের দিকে তাকায়। মিহাদের জ্বলন্ত বুকে ঘি ঢালার মতো করে ফিচেল হেসে আবরার বলে,

‘ দুজনকে বেশ মানিয়েছে তাইনা? ‘
সাফওয়ান নিশ্চুপ। মিহাদ নজর ফিরিয়ে আবরারের দিকে তাকায়। দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
‘ তোর ওয়ান সাইডেড লাভ যে শাড়ি পড়ে অন্য একজনের সঙ্গে পাঁচ বছরের প্রেম বার্ষিকী মানাচ্ছে, সেটা দেখে আমি কিছু বলেছি? ‘
খুক খুক করে কেশে উঠলো আবরার। সাফওয়ান এবারে না হেসে পারলো না। দুজনের দিকে তাকিয়ে আবরার বেশ সাবলীলভাবে বলে,
‘ ভালোবাসতাম। এখনো বাসি, কিন্তু বন্ধু হিসেবে। ওর জন্য যে দেবদাস হয়ে যাব এমন তো না। ‘
মিহাদ ফের ব্যঙ্গাত্মক স্বরে বলে উঠলো,

‘ মদ খেয়ে যে রাস্তার ছেলেদের পিঠিয়েছিলি, সেটা কি আমাদের মনে নেই ভেবেছিস? চট্টগ্রামে কেনো পালিয়েছিলি সেটাও বেশ জানি। এখন এসেছিস সাধু সাজতে! চল, ধূর হ সামনে থেকে। ‘
আবরার চলে গেল দ্রুত। এর সামনে থাকলে বেঁচে থাকা বাকি ইজ্জতটুকু ও নিলামে উঠবে। তাতে কোনো সন্দেহ নেই। মিহাদ এবার সাফওয়ানের দিকে তাকায়। তার নজর রায়ানের পাশে টেবিলের ডেকুরেশন ঠিক করতে থাকা সায়েরীতে নিবদ্ধ। মেয়েটা নীতি এবং রায়ানের কিচিরমিচির ঝগড়া দেখে হাসছে। সাফওয়ানের এই থমথমে মুখ বিগত নয় দিন যাবত দেখে আসছে সে। এমনিতেও রগচটা। আর গত নয় দিনে রীতিমতো বারুদ হয়ে ছিলো এই ছেলে। কেউ ভালো কথা বলতে আসলেও ছ্যাঁত করে উঠতো। অবশেষে আজ নীতি এবং রায়ানকে হুমকি ধমকি দিয়ে সায়েরীকে হাজির করেছে সে এখানে। কিন্তু কথা না বলে এমন গুমসুম হয়ে থাকার মানে বুঝলো না সে। নিজে তো জ্বলছেই, সাফওয়ান কেও জ্বালিয়ে দেওয়ার জন্য বলে উঠলো,

‘ অমন গন্ডারের মতো মুখ করে তাকিয়ে আছিস কেনো? সামনে গিয়ে কথা বলার সাহস হচ্ছে না নাকি? আমি অবাক হচ্ছি সায়েরীর সাহস দেখে। এই বাচ্চা মেয়েটা নাকে দঁড়ি দিয়ে ঘোরাচ্ছে তোকে। মানে সাফওয়ান তেহজিব খান কে? ছি! খান সাহেব ছি! এই দিন দেখার আগে চশমা অফার করলি না কেনো? এই শিখিয়েছি আমি তোকে! আমার চোখগুলো লজ্জা পেয়ে মূর্ছা যাচ্ছে। ‘

সাফওয়ান মহা বিরক্ত তার ফাউল কথায়। কোনো রকম প্রতিউত্তর না করে রেলিং থেকে নেমে দাঁড়ালো সে। বাকিরাও ততক্ষণে রায়ান এবং নীতিকে ঘিরে দাঁড়িয়েছে। জিমন ক্যামেরা বের করে ছবি তুলছে। হইহট্টগোল নিয়ে কেক কাটলো দুজন। শুরুতেই একে অপরকে খাইয়ে দিয়ে একে একে বন্ধুদের মুখেও তুলে দিলো কেকের অংশ। ইরাকে খাইয়ে দিয়ে অবশিষ্ট অংশ অন্য কাউকে খাওয়ানোর জন্য ঘুরে দাঁড়ালো নীতি। পাশেই ইরিনা দাঁড়িয়ে ছিলো। নীতি তার দিকে আসছে দেখে সে উদগ্রীব হয়ে হাসে। কিন্তু তার মুখের সামনে এসেও নীতির হাতখানা গিয়ে থামে সায়েরীর মুখের কাছে। একহাতে সায়েরীর গাল টিপে ধরে সে সম্পূর্ণ কেক ডুবিয়ে দিলো মুখে। সায়েরী অবাক চোখে তাকাতেই সে উচ্চ কন্ঠে হেসে বলে উঠলো,

‘ আজকের দিনের স্পেশাল গেস্ট তুমি। এটুকু না করলে হয় নাকি? ‘
কথাটার মানে বুঝতে পেরে সায়েরী লজ্জা পেলো খুব। নীতি পুণরায় ব্যস্ত পায়ে ফিরে গেল। এরইমধ্যে জিমন এসে টিস্যু এগিয়ে দিলো সায়েরীকে। অথচ সে তখনো ছবি তুলতে ব্যাস্ত। মুখভর্তি মাখোমাখো কেক নিয়ে সায়েরী সবেমাত্র টিস্যু বক্সে হাত দিয়েছে, এমন সময় জিমন ডাকলো তাকে। তার দিকে ক্যামেরা তাক করে রাখা দেখে বেচারি থতমত খেয়ে গেলো। তাকিয়ে রইলো ফ্যালফ্যাল নজরে। ঠিক সেই দৃশ্যটা ক্যামেরাবন্দী করে ফেললো জিমন। ছবি তুলে পুণরায় সেটা দেখে সে উচ্চ কন্ঠে বলে উঠলো,

‘ পারফেক্ট। ইউ আর লুকিং ড্যাম কিউট শালি সাহেবা৷ এই ছবির বিনিময়ে হাজার টাকা হাতিয়ে নিতে পারবো। ‘
বলেই চোখ টিপ দিলো সে। সায়েরী কোনো রকমে মুখভর্তি কেক সব গিলে ফেললো। টিস্যু দ্বারা মুখ মুছতে মুছতে অবুঝ কন্ঠে জানতে চাইলো,
‘ আমার ছবি কে কিনবে ভাইয়া? আর আপনি সেটা সেল করতে যাবেনই না কেনো? কেমন বাজে দেখতে লাগছিলো। ডিলিট করুন। ‘
‘ একদম না। আজকের দিনে এর চেয়ে ডিমান্ডিং পিকচার আর হতেই পারে না। আর আমি সেল করি না করি, কেউ একজন কিনে নিতেও দুইবার ভাববে না। ‘

কথাটা বলেই অন্যদিকে চলে গেল সে। সায়েরী বেশি ভবলো না। সে ব্যাস্ত নিজের মুখ মুছতে। পাশে অবস্থানরত ইরিনা এতক্ষণ যাবত দেখে যাচ্ছিলো এই মেয়েকে নিয়ে সকলের আদিখ্যেতা। সে বুঝে উঠতে পারে না বন্ধুর বোনকে নিয়ে কেনো সবার এতো মাথাব্যথা। বিগত কয়েক ঘন্টায় খেয়াল না করলেও, এবার সে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালো সায়েরীর দিকে। আহামরি কিছু বলে মনে হলোনা তার। সুন্দরের চেয়েও কিউট বলা চলে। তার চেয়ে বেশি আর কিছুই নেই। হাইট টাও এভারেজ। সায়েরী দুইহাতে গাউন সামলে সিড়ির দিকে যেতেই, ইরিনা মুখ বাকিয়ে অন্যদিকে চলে যায়। সাফওয়ানকে একাকী দেখে পা বাড়ায় সেদিকে। কিন্তু সে গিয়ে দাঁড়াতেই সাফওয়ান রায়ানকে ডেকে চলে গেলো পাশ থেকে। রায়ানের কানে কানে কি যেনো বললো। সবটা শুনে মাথা নেড়ে সম্মতি দিয়ে, রায়ান তাগাদা দিলো সকলে নিচে চলে আসার জন্য।

ডাইনিং স্পেসের পাশে গেস্ট রুমের ওয়াশরুমে এসেছিলো সায়েরী। হালকা পানি লাগিয়ে মেকাপ ঠিক করে বেরিয়ে পড়লো সে ওয়াশরুম থেকে। দরজা খুলে সবে মাত্র বেডরুমের বাহিরে পা রেখেছে, এমন সময় হুট করে ঘরের সমস্ত লাইট নিভে গেল। সায়েরী থমকে গেলো সেখানেই। অন্ধকার জিনিসটাকে এখন তীব্র ভাবে ভয় পায় সে। এই মুহুর্তেও ভয়ের চোটে বুকের ভিতর টা ধকধক করছে তার। কোনোভাবে নিজেকে সামলে সে গলা উঁচু করে ডাকতে উদ্যত হলো,

‘ নীতি আ….. ‘
কিন্তু আচমকা একজোড়া হাত এসে পেছন থেকে মুখ চেপে ধরলো তার। ভয়ে সায়েরী হার্ট ফেইল করার জোগাড়। দুইহাতে সর্বশক্তি দিয়ে সরাতে চাইতেই মানুষটা আরো জোর প্রকাশ করে একহাত দ্বারা তার দুই হাত আটকে ফেললো। কানের কাছে শুনা গেলো চিরপরিচিত পুরুষালি কন্ঠ-টি,
‘ হুশশ!! চুপ.. ‘
বিষ্ময়ে হতবুদ্ধি হয়ে পড়লো সায়েরী। ছটফটানি থেমে গেলো আপনা আপনি। সেটা অনুভব করেই তার মুখ ছেড়ে দিলো মানুষটি। গাঢ় অন্ধকারে কিচ্ছুটি দেখা যাচ্ছে না। সায়েরী কেবল অনুভব করতে পারছে মানুষটা তার পিঠ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে। উষ্ণ নিশ্বাস ঘাড় ছুঁয়ে যাচ্ছে তার৷ নিজ উদরে শক্তপোক্ত হাতের ছোঁয়া পেতেই পুণরায় ছটফটিয়ে উঠল সে। তার এহেন আচরণে মানুষটার মেজাজ বিগড়ে গেল যেন। সায়েরীকে সামনে দিকে ঘুরিয়ে হাতদুটো চেপে ধরলো পিঠের সঙ্গে৷ সায়েরী একটাবার “ছাড়ুন” বলতেই সে চাপা স্বরে ধমকে উঠলো,

‘ চুপ! একদম চুপ। চিৎকার, চেঁচামেচি করেছ তো মাথায় তুলে আছাড় মারবো। ‘
কথাটা বলে সে বিন্দুমাত্র অপেক্ষা করলো না। চট করে তুলোর বস্তার মতো কাঁধে তুলে নিলো সায়েরী কে। এহেন কান্ডে সায়েরী হতবাক। পেটে চাপ পরায় ব্যাথাও পেলো বেশ। উল্টো ঝুলে সে দুইহাতে ধুমধাম কিল বসালো সাফওয়ানের প্রসস্থ পিঠে৷ বিপরীতে সাফওয়ান একেবারে নির্বিকার। মোবাইলের ক্ষীণ আলোয় দেখে দেখে সে সোজা সিড়ির পথে পা বাড়ালো। নিচে আবরারকে ম্যানেজ করার জন্য তার বন্ধুরা আছে বলে টেনশন ফ্রি হয়ে সোজা চলে আসলো ছাদে।

সায়েরীকে নামিয়ে সে পায়ে ঠেলে দরজা লাগিয়ে দিলো। চোখ ঘুরিয়ে, চোয়াল শক্ত করে তাকালো সায়েরীর ভীতু মুখখানার দিকে। সাফওয়ানের এই দৃষ্টিতে বেচারির জান যায় যায় ভাব। সাফওয়ান কিছু বললো না তাকে। মোবাইলে কিছু একটা টাইপ করতেই সেকেন্ডের মধ্যে পুণরায় লাইট জ্বলে উঠলো চারিদিকে। কিন্তু ছাদের বড় লাইট গুলো তখনো বন্ধ। কেবল ছোট ছোট ফেইরি লাইটের আলোয় স্বল্প আলোকিত চারপাশ। শার্টের স্লিভ গোটাতে গোটাতে সামনের দিকে অগ্রসর হয় সাফওয়ান। তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি সরাসরি নিবদ্ধ হয়ে আছে সায়েরীতে। পলক অবধি পড়ছে না। তার এক কদমের বিপরীতে সায়েরী দুই তিন কদম পিছিয়ে যাচ্ছে। বুকের ভিতর টা অদ্ভুত ভাবে কাঁপছে। ধুকপুক ধুকপুক অনুভূতি। ভয়ের চোটে এক্ষুনি কেঁদে দিবে দিবে ভাব। বেঁচে থাকা শেষ সাহস টুকু সঞ্চয় করে সে কাঁদোকাঁদো গলায় বলে উঠলো,

‘ আ..আমি! আমি ন্..নিচে যাব। ‘
‘ কেনো? ভয় লাগছে? ‘ কন্ঠে একরাশ গাম্ভীর্য, রাগ।
সায়েরীর দৃষ্টি টলমল। রেলিঙের সঙ্গে কোমর ঠেকে যেতেই আরেক দফা ভীতি বাড়ে তার। সাফওয়ান ততক্ষণে খুব কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়েছে তার। বেশ সাবলীলভাবে রেলিঙের দুইপাশে হাত রেখে বন্ধী করে ফেললো সায়েরী কে। তখনো পলকহীন চোখে তাকিয়ে সে। এই দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলানোর সাধ্যি নেই সায়েরীর। অদ্ভুত এক ভয়ে হাত, পা কাঁপছে তার। ব্যাপারটা আঁচ করতে পেরে সাফওয়ান গম্ভীর কন্ঠে বললো,
‘ কাঁপছ কেনো? এখনো তো কিছুই বললাম না। ‘
সায়েরী দৃষ্টি নত করে।। গাল বেয়ে জল নামে তার। আটকে আসা কন্ঠে আকুতি জানায়, ‘ য..যেতে দিন আমাকে। ‘
বাম হাতে শক্ত করে তার থুতনি ধরে মাথা উঁচু করলো সাফওয়ান। রাশভারি কন্ঠে বললো,
‘ এতো তাড়াতাড়ি? নয় দিন! নয় দিন, দুইশো ষোল ঘন্টা আমাকে নরক যন্ত্রণা ভোগ করিয়ে বলছো এতো তাড়াতাড়ি ছেড়ে দিতে? ‘

সাফওয়ান এই বাক্যে সায়েরীর বুকে ঝড় উঠলো। সাফওয়ানের চোখের এই নিরব অভিযোগ, অভিমানের বিপরীতে সে যেন আরো একবার নিজের কমতিগুলো দেখতে পেল। যা দেখতে পেয়ে মনটা বিষিয়ে উঠলো তার। দুইহাতে জোর প্রকাশ করে ধাক্কা দিলো সে সাফওয়ানের বুকে । কিন্তু বিন্দুমাত্র সরাতে পারলো না নিজ স্থান হতে। নিজের উপরই জন্মানো এই ক্রোধে জর্জরিত হয়ে সে ক্রন্দনরত কন্ঠে চেঁচিয়ে উঠলো,
‘ কেনো শুধু শুধু পিছে পড়ে আছেন আমার? আমি তো বলিনি নরক যন্ত্রণা ভোগ করতে। উষ্কে দিইনি আপনাকে আমার পিছে ঘোরার জন্য। তবুও কেনো এমন করছেন? আপনার আর আমার লাইফ অনেক বেশি আলাদা সাফওয়ান ভাই। আমাকে আমার মতো বাঁচতে দিন প্লিজ! ‘

অনাকাঙ্ক্ষিত বাক্যগুলো শুনে ধপ করে জ্বলে উঠলো সাফওয়ানের বাদামি মণি দুটো। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে সে একটানে কাছে নিলো সায়েরীকে। ডানহাত দিয়ে সায়েরীর একহাত পিঠে চেপে ধরে অন্য হাত দিয়ে চেপে ধরলো গাল। ক্রোধান্বিত কন্ঠে সে নিজেও চেঁচিয়ে উঠলো,
‘ পিছে পড়ে আছি? কোনো রোড সাইড রোমিও মনে হচ্ছে আমাকে? ওদের সাথে তুলনা করছো? তোমার কি মনে হচ্ছে, মেয়ের কমতি পড়েছে আমার কাছে? বেশি লাই দিয়েছি বলে এখন আমাকেই তুচ্ছ বলে মনে হচ্ছে, তাইনা? ‘

একনাগাড়ে কথাগুলো বলে থামলো সে। যেভাবে চেঁচিয়ে উঠেছে, নিচে মিউজিক চালু না থাকলে নিশ্চিত সকলে ভয় পেয়ে যেত। সায়েরীর মনে হচ্ছে তার কানের পর্দা ফেটে গিয়েছে৷ ভুঁ ভুঁ করছে সেথায়। সাফওয়ানের রাগ কমছে না কোনোভাবেই। মেয়েটা কি ভাবে পারলো তার আত্মসম্মানে আঘাত করতে? বিগত কয়েক দিনে নিজের এই দৃঢ় ব্যক্তিত্ব পায়ে তলায় পিষে সে কত কি করেছে তা কি জানে না মেয়েটা? এই নয় দিনে স্বভাবের বাইরে গিয়ে মিথ্যে অজুহাতে ৪-৫ বার গিয়েছিলো সায়েরীদের বাসায়৷ একটুখানি দেখা পাবে এই আশায় আশায়। কিন্তু মেয়েটা তার নাম শুনে রুম থেকেও বের হয়নি। কল,মেসেজের কথা নাহয় বাদ দিলাম। এসবের পরেও এই মেয়ে কি করে পারলো কথাগুলো বলতে? বুকের ভিতর এক সমুদ্র অভিমান নিয়ে সে ছেড়ে দিলো সায়েরীকে। দৃষ্টি রক্তিম হয়ে উঠেছে তার। সায়েরীকে কাঁদতে দেখে সে ঠোঁট বাকিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসে। নাকের নিচে আঙ্গল ঘষে নিজেকে সামলে পুণরায় কাছাকাছি দাঁড়ায়। অদ্ভুত কন্ঠে বলে,

‘ উষ্কে দাওনি! তাহলে প্রোগ্রামের দিন, আর তার আগের দিনগুলোতে কি অভিনয় করছিলে? নিশ্চয়ই না। মানে দুই দিনের ভালোলাগা এখন শেষ, তাইতো? ‘
কথাটা যেন সায়েরীর বুকে এসে বিঁধল। মানুষটা তার মনের কতোটা জুড়ে তা সে নিজেও বর্ণনা করতে পারবে না। এই অনুভূতি কিনা দুই দিনেই শেষ! আদো সম্ভব সেটা? এক জনমেও এই অনুভূতির মৃত্যু হবে না। সেখানে দুই দিন তো তুচ্ছ কিছু ঘন্টা মাত্র।
সায়েরী এমন নিরবতায় সাফওয়ানের বুকের ভিতরটা জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিচ্ছে। দুই হাতে মুখ ঘষে কয়েক সেকেন্ড পায়চারি করলো সে। এরপর আচমকা ঝড়ের বেগে কাছে আসলো। অত্যন্ত শান্ত কন্ঠে বলে উঠলো,

‘ নিজের মতো বাঁচতে চাও। ইউ মিন, আমাকে চলে যেতে বলছো, এইতো? ফাইন, আরেকবার মুখে বলো। তুমি না চাইলে আর কখনো কাছে আসবো না। কিছুর জন্য জোর করবো না৷ জাস্ট সে ইট এগেইন! ‘
সায়েরীর কথা সব কান্না রূপে গলায় আটকে। চেয়েও মুখ খুলতে পারে না সে। ফিরিয়ে রেখেছে মুখ। সাফওয়ান তাকিয়ে রইল অনিমেষ। মিনিট কয়েক পার হতেই সে পুণরায় হাসে। কেমন এক আহত কন্ঠে বলে,
‘ তোমার এই নিরবতা সব উত্তর দিয়ে দিচ্ছে। ‘

কথাটা বলে আর এক সেকেন্ড ও দাঁড়ালো না সে। পা বাড়ালো উল্টো পথে। কিন্তু মনে প্রাণে চাইলো, সায়েরী একবার ডাকুক তাকে। শুধু একবার। বিনিময়ে সে সব ভুলে ছুটে যাবে পুণরায়৷ কিন্তু প্রথম ধাপের সিড়ি সব পেরিয়ে গেলেও মেয়েটা ডাকলো না। সাফওয়ান নিজেই থেমে গেলো। আশ্চর্য! এমন ব্যাথা লাগছে কেনো বুকে? দম বন্ধ হয়ে আসছে কেনো এমন? ব্যস্ত হাতে বুকের কাছের বোতাম দুটো খুলে দিলো সে৷ কপালে রগ ফুলে ধপধপ করছে। রাগে কিড়মিড়িয়ে উঠে সে পরপর তিনবার ঘুষি মারলো দেওয়ালে। অসহ্য রকমের যন্ত্রণা হচ্ছে বুকজুড়ে।
অন্যদিকে নিজের বোকামিতে বাকরুদ্ধ সায়েরী। সে তো নিজের অযোগ্যতার কারণে দূরে রাখতে চেয়েছিলো সাফওয়ান কে। কিন্তু শেষ মুহুর্তে কেনো সাফওয়ান কেই ছোট করে ফেললো! সে আন্দাজও লাগাতে পারছে না ঠিক কতটা কষ্ট দিয়েছে মানুষ টাকে। দুইহাতে মুখ ঢেকে ডুকরে কেঁদে উঠলো সে। কেনো হলো এমন? তার ভাগ্যটাকে কেনো এতো নির্মম? বারে বারে কেনো সবটা এমন এলোমেলো হয়ে যায়?

বিক্ষিপ্ত মন, মেজাজ নিয়ে বাড়ি ফিরে যাওয়ার জন্য উদ্যত হলেও, নীতি’র জোড়াজুড়ির কাছে হার মানতে হলো সাফওয়ান কে৷ তার চোখে মুখের অগ্নি রূপ দেখে বন্ধুরা বুঝে ফেললো কিছু একটা যে হয়েছে দুজনের মাঝে। কিন্তু সাহস করে কেউ আগ বাড়িয়ে জানতে চাইলো না কিছু। আবরার নিজেই জানতে চাইলো কি হয়েছে সাফওয়ানের। কোনো ভাবে তাকে সামাল দিলো বাকিরা। অতী মাত্রায় গম্ভীর হয়ে লিভিং রুমের সোফায় গা এলিয়ে বসে রইলো সাফওয়ান। ডান পায়ের উপর বাম পা তুলে অনবরত নাড়তে লাগলো সেটা। কিছুতেই শান্ত হতে পারছে না। ভিতরটা জ্বলে পুড়ে যাচ্ছে একেবারে। উপায় না পেয়ে ঘরের বাহির হতে হেঁটে আসলো কিছুক্ষণ। পুণরায় ফিরে আসতেই কানে আসলো আবরারের কন্ঠস্বর,

‘ সায়েরী কোথায়? অনেক্ষন যাবত দেখছি না। ‘
কথাটা শুনে কপালে ভাঁজ পড়লো তার। নীতি আবরারকে জবাব দিতে পারলো না কোনো। উত্তরের আশায় আড়চোখে তাকালো সাফওয়ানের দিকে। সাফওয়ান ভাবুক দৃষ্টিতে সিড়িঘরের দিকে তাকিয়ে। মিনিট বিশেক পেরিয়ে গেল। মেয়েটা এখনো নামেনি নাকি? না চাইতেও শান্ত হয়ে আসা মেজাজ আবারো বিগড়ে গেল তার। তাকে সিড়ি বেয়ে উঠতে দেখে নীতি দ্রুত গলায় আবরারকে জবাব দিলো,
‘ আছে, আছে। ভিতরেই আছে। ওয়াশরুমে গিয়েছিলো। এখানে সবার মাঝে থাকতে অস্বস্তি হচ্ছিলো। তাই রুমে বসে আছে। আমি দেখে রাখবো, চিন্তা করিস না। ‘
জবাব পেয়ে শান্ত হয়ে বসলো আবরার। বেশি মাথা ঘামাল না আর।

বড় বড় পা ফেলে সেকেন্ডের মধ্যেই ছাদে এসে উপস্থিত হলো সাফওয়ান। কিন্তু যেই যায়গায় সায়েরীকে রেখে গিয়েছিলো সেখানটা ফাঁকা পরে আছে দেখে কিঞ্চিৎ ভয় পেলো সে। মেয়েটা যে ঝামেলা পাকাতে উস্তাদ, এজন্যই ভয় হলো তার। ডানদিকের স্থানটা সম্পূর্ণ ফাঁকা। বামদিকে ছোট্ট একটা চিলেকোঠা সহ পানির ট্যাংক, এবং গাছ গাছালিতে ভরপুর। সাফওয়ান নিরব পায়ে এগিয়ে গেলো সেদিকে। কাছাকাছি পৌঁছে, চিলেকোঠার দেওয়াল ঘেঁষে শুকনো ফ্লোরে সায়েরীকে হাঁটু মুড়ে বসে থাকতে দেখে কদম থমকে গেলো তার। হাঁটুতে মুখ গুঁজে রেখেছে সায়েরী। কাঁধ জোড়া দৃশ্যমান রূপে কাঁপছে। কাঁদছে কি সে! সাফওয়ানের হৃদয় ব্যকুল হয়ে উঠলো এই দৃশ্যে। অস্থির চিত্তে সে ডেকে উঠলো ব্যকুল স্বরে, ‘ সুবহা!!! ‘

সঙ্গে সঙ্গে মাথা তুলে চাইলো ক্রন্দনরত সায়েরী। আলো আঁধারিতে তার মুখটা দৃশ্যমান হতেই সাফওয়ানের হৃদস্পন্দন থমকে গেলো যেন। কপালের ভাঁজ শীতল হয়ে চোখে ধরা দিলো একরাশ বিষ্ময়। এ কি অবস্থা করেছে মেয়েটা নিজের! এ কি হাল চোখে মুখের! নিজের বিষ্ময় ভাব কাটিয়ে দুজনের মধ্যবর্তী দুরত্ব টুকু মিটিয়ে নেওয়ার জন্য সে সবে মাত্র এক কদম বাড়িয়েছে। এমন সময় বসা হতে উঠে ঝড়ের বেগে তার বুকে হামলে পড়লো সায়েরী। সাফওয়ানের পৃষ্ঠদেশ খামচে ধরে, বুকে মুখ গুঁজে পুণরায় ডুকরে উঠলো সে। তার এহেন কান্ডে সাফওয়ান হতবাক, বিমূঢ়, বিবশ। বুঝে উঠতে পারলো না কিচ্ছুটি। কেবল অনুভব করলো বুকের সাথে লেপ্টে থাকা নরম দেহখানা থেমে থেমে কান্নার গতি বাড়াচ্ছে। সেই সাথে আরো বেশি শক্ত করে জড়িয়ে ধরছে তাকে। পরপরই কানে ভেসে আসলো সায়েরীর ক্রন্দনরত, অভিমানী কন্ঠ,

‘ আপনি এতো খারাপ কেনো? সবসময়, সবকিছুতে জোর জবরদস্তি করেন। অথচ যখন সত্যি জোর খাটানোর সময় আসলো তখন হার মেনে নিয়েছেন? ‘
একটু থেমে ফের বলে উঠলো,
‘ সবাই মিথ্যে বলেছে। আপনি আমাকে ভালোই বাসেন না। একটুও না। মিথ্যে ছিলো সব। একদম মিথ্যে। ‘
তার অভিমানী কন্ঠের বিপরীতে সাফওয়ান কে দেখা গেল আগের মতোই তব্দা খেয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে। বেচারা বুঝে উঠতে পারলো না কিছু। সায়েরীকে জড়িয়ে ধরার সেন্সটুকু ও হারিয়ে বসেছে যেন। তার এমন নিরবতায় কান্না খানিকটা থেমে আসলো সায়েরীর। মাথা তুলে চাইলো সে। রাগ লাগলো অনুভূতি হীন মুখটা দেখে। নিজেকে সামলাতে না পেরে সহসা পিঠ হতে হাত নামিয়ে সাফওয়ানের বুকের দিকের শার্ট ধরে একটান মারলো সে। পূর্ব থেকেই একটা বোতাম খোলা ছিলো। সায়েরীর ক্ষিপ্ত গতির টান লেগে পরপর আরো দুটো বোতাম খোলে আকর্ষণীয় বক্ষদেশ উন্মুক্ত হয়ে গেলো সাফওয়ানের । দুজনের কারোরই খেয়াল নেই সেদিকে। সাফওয়ানের বিষ্ময় ভরা বাদামি চোখজোড়ার দিকে তাকিয়ে সায়েরী পুণরায় কেঁদে উঠে বললো,

‘ খুব তো নিজেকে বুদ্ধিমান দাবি করার জন্য আমাকে মাথামোটা বলেন। আজকে এই মাথামোটার কথা ধরে ড্যাংড্যাং করে চলে যেতে হলো? আমি নাহয় মাথামোটা, এজন্য ভুলভাল বলে ফেলেছি। তাই বলে আপনি আমাকে রেখে চলে যাবেন? ‘

শেষের কথাটা বলতে গিয়ে শক্ত এক খামচি বসিয়ে দিলো সে সাফওয়ানের উন্মুক্ত বুকে। ফলস্বরূপ কিঞ্চিৎ ব্যথায় সম্বিত ফিরে আসলো যেন তার। অধর কোণে ফুটল বিস্তর এক হাসি। তা দেখে অভিমানী মেয়েটা সরে যেতে চাইল। কিন্তু সফল হলো না। সাফওয়ানের শক্তপোক্ত দুইহাত ততক্ষণে নিজের সঙ্গে ঝাপটে ধরেছে তাকে। মুখের হাসিটুকু বিস্তৃত হচ্ছে ক্ষণে ক্ষণে। ছটফট করতে থাকা সায়েরীকে বুকের সাথে চেপে ধরে এবার সে শব্দ করে হেসে উঠলো। প্রাণখোলা, উচ্চ কন্ঠের হাসি। অনাকাঙ্ক্ষিত এই প্রতিক্রিয়ায় সায়েরী কান্না করতে ভুলে গেল। বুকের সাথে লেপ্টে ছিল বলে এই কলরব শুনে প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারলো না সে নিজের কান’কে। ধীরে ধীরে বুকে মাথা রেখেই পিটপিট চোখ মেলে তাকালো সে। সুদর্শন ছেলেটার ফকফকা, ঝকঝকা দাঁত দেখানো হাসি দেখে হৃদকম্পন বেড়ে গেল তার। নতুন করে প্রেমে পড়লো বোধহয় আরো একবার। এর আগে কখনো সাফওয়ান কে এভাবে হাসতে দেখেনি সে। কখনো না।
প্রাণখোলা হাসি হেসে বিস্তৃত অধর নিয়ে মাথা নিচু করে, বুকের সাথে লেপ্টে থাকা মুখটার দিকে তাকালো সাফওয়ান। মেয়েটার চোখের মুগ্ধ চাহনি দেখে ঠোঁট কামড়ে হাসি আটকায় সে। কিন্তু না চাইতেও ফের হেসে ফেলে। সায়েরীর বোচা,লালচে নাকে নাক ঘষে স্বগতোক্তি করে ,

‘ হোয়াই সো কিউট? ‘
পুণরায় মিটিমিটি হাসে সে। তার এহেন প্রতিক্রিয়ায় সায়েরীর দেহ কাঁপে৷ গাল গরম হয়ে উঠে লজ্জায়৷ নিজেকে ছাড়াতে চাইলেও ব্যর্থ হয় বারবার। সাফওয়ান এবার অধৈর্য কন্ঠে সুধায়,
‘ এমন ছটফট করছো কেনো? শান্ত হয়ে থাকো। ‘
‘ চলেই তো গিয়েছিলেন। এখন এসে দরদ উতলে পরছে কেনো? ‘
কন্ঠে একরাশ অভিমান, অভিযোগ তার। ছলছল দৃষ্টি, আঁধার মুখশ্রী। সাফওয়ান থুতনি ধরে মুখ উঁচু করে তার। বৃদ্ধ আঙ্গুল দ্বারা গাল ছুঁয়ে ফিচেল হেসে বলে,
‘ এত অভিমান? ‘
সায়েরী জবাব দেয় না। মুখ ফিরিয়ে রাখে। সাফওয়ান পুণরায় নিজের দিকে ঘুরিয়ে আনে তাকে। গম্ভীর কন্ঠে বলে,

‘ চলে যেতে বাধ্য করেছিলো কে? ইউ নো হোয়াট! তোমার আগে কখনো কেউ আমার সাথে এই টোনে কথা বলেনি। আমার সেল্ফ রেস্পেক্ট-এ আঘাত করেনি। বাট ইউ ডিড ইট। ‘
একথায় সায়েরী নিভে গেল পুরোপুরি। টলমল করে উঠলো দৃষ্টি। সেচ্ছায় নিজেকে মেলে দিলো সাফওয়ানের প্রসস্থ বুকে। নরম দুইহাতে, ধীরে সুস্থে জড়িয়ে ধরলো পিঠ। নিম্ন কন্ঠে বলে উঠলো,
‘ স্যরি, আমি একদন ওভাবে বলতে চাইনি। আপনাকে অপমান করার কথা কল্পনাতেও ভাবতে পারিনা আমি। আমি তো আপনার ভালোর জন্যই নিজেকে দূরে রাখছিলাম। আপনার সাথে আমার কোনো তুলনা হয়না। আমার সেই যোগ্যতাই নেই। যা ছিলো, যেটুকু ছিলো সব বিগত কয়েক মাসের দুর্ঘটনায় ফিকে পড়ে গেছে। আপনার সাথে আমাকে মানা…. ‘
কথার মাঝে হুট করে বাহু টেনে বুক থেকে তাকে সরিয়ে দিলো সাফওয়ান। গম্ভীর হয়ে রাগ্বত স্বরে ধমকে উঠে বললো,

‘ আরেকবার এই ফালতু কথা শুনলে একেবারে মাথায় তুলে আছাড় মারবো। ‘
ধমক শুনেই চুপসে গেল মেয়েটা। এই না প্রেম প্রেম জোয়ারে ভেসে যাচ্ছিলো সে! আর প্রেমের শুরুতে প্রেমিক পুরুষ হতে পেলো কি? মাথায় তুলে আছাড় মারার ধমক! এই ছিলো কপালে?
তীব্র অভিমানে গাল ফুলে উঠলো তার। এই জন্যই কারো ভালো চাইতেই নেই। সাফওয়ান ভাই নামক অ্যানাকন্ডার তো নয়ই। গাল ফুলিয়ে সরেয়ে আসতে চাইলে সাফওয়ান পুণরায় কোমর জড়িয়ে ধরে তার। অন্যহাতে আলতো চাপ দিয়ে সায়েরীর গাল চেপে ধরে গম্ভীর কন্ঠে বলে,
‘ এই মোটামাথা নিয়ে কেউ এসব ইউজলেস বিষয়ে ভাবতে বলেছিলো তোমাকে? স্পিক আপ ড্যাম ইট! বলেছিলো? ‘

ধমক শুনে দ্রুত মাথা নেড়ে না বুঝালো সায়েরী। তা দেখে সাফওয়ান একই সুরে আবারও বলে উঠলো,
‘ তাহলে ভাবতে গিয়েছ কেনো? এসব লেইম থট (thought) নিয়ে তুমি আমাকে ইগনোর করে গিয়েছো? আমাকে? এতো সাহস কোথায় পেলে হ্যাঁ? ইচ্ছে তো করছে থাপড়িয়ে গাল লাল করে দিতে। ইডিয়ট! ‘
জমানো রাগ সব ঢেলে দিয়ে শান্ত হলো সাফওয়ান। তার একেকটা গর্জনের সম্মুখে ছোট্ট সায়েরী পুরোপুরি চুপসে গিয়েছে। ছাড় পেতেই বিন্দুমাত্র অপেক্ষা করলো না সে। দুইহাতে গাউন ধরে ধুপধাপ পা ফেললো সিড়িঘরের দিকে। পেছন পেছন সাফওয়ানও এগোল। সে মুখ ফুটে কিছু যে বলবে এমন সময় দেখা পেলো সিড়ি বেয়ে উপরে উঠে আসা আবরার এবং জাদিদকে। কথা বলতে বলতে এগিয়ে আসছে দুজন। সম্মুখে সাফওয়ান এবং সায়েরী কে দেখে তারাও দাঁড়িয়ে পড়লো। আবরার সন্দিহান কন্ঠে বললো,

‘ তোরা দুজন এখানে কি করছিস? সায়ু, তুই না নীতির সাথে রুমে ছিলি? ‘
সায়েরী জবাব দেওয়ার আগে সাফওয়ান আগ বাড়িয়ে বলে,
‘ বেশি বেশি সাহস বেড়ে গেছে তোর বোনের। একা একা ছাদে এসে দাঁড়িয়েছিলো। মনে হয় বকাঝকার অভাব পড়ে গেছে খুব। ‘
সুক্ষ খোঁচাটা বুঝতে পেরে গা জ্বলে উঠলো সায়েরীর। অন্যদিকে আবরার একথা শুনে উল্টো সাফওয়ানকে জেরা করে বললো,

‘ বকাঝকা দিতে যাব কেনো? এক মিনিট, তুই আবার বকিসনি তো ওকে? এই সায়ু! বকেছে তোকে? ‘
সাফওয়ান ড্যাম কেয়ার ভাব নিয়ে দাঁড়িয়েছিলো। যেন তার হারে হারে জানা, আর যাই হোক সায়েরী ‘না’-ই বলবে। কিন্তু তার সকল অ্যাটিটিউড চুরচুর করে দিয়ে সায়েরী ক্ষুব্ধ কন্ঠে বললো,
‘ হ্যাঁ। মাথায় তুলে আছাড় মারবে বলেছে। ‘
একথা শুনে বেচারা থতমত খেয়ে গেলো আবরারের সামনে। সায়েরী কথাটা জানিয়েই পগারপার। সাফওয়ানকে ফেলে গেল তার ওভার পজেসিভ বড় ভাইটার সামনে। যেতে যেতে পেছন থেকে শুনতে পেলো আবরারের রাগী কন্ঠ,
‘ আমার বোন নাহয় তোর উল্টো স্বভাবের। তাই বলে সব সময় ধমকা ধমকি করবি তুই? এখন বলছিস মাথায় তুলে আছাড় মারবি। এতো সাহস….. ‘
আর শুনা গেলো না। সায়েরী ঠোঁট চেপে হাসলো এটুকু শুনে। বিড়বিড় করে আওড়াল,
‘ বেশ হয়েছে। সবসময় আমাকে বকাঝকা করে। এবার বুঝুক বকা শুনতে কেমন লাগে। ‘

নিচে নামার পর থেকেই ভিতরের রুমে আহিয়ানা কে নিয়ে বসে ছিলো সায়েরী। আর মুখোমুখি হয়নি সাফওয়ানের। একেবারে ডিনার টাইমে দেখা হয়েছে। যদিও সায়েরী ফিরে তাকাইনি। তবুও বুঝতে পারলো সাফওয়ান ছোট ছোট চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকে। সকলে যখন একত্রিত হয়ে খেতে বসলো। সায়েরী বসা মাত্র সম্মুখের চেয়ারে এসে বসলো সাফওয়ান। একদম মুখোমুখি হয়ে। মেয়েরা সব এক সারিতে বসে ছিলো। কিন্তু ইরিনা নির্লজ্জের মতো সাফওয়ানের পাশের চেয়ারে গিয়ে বসে পড়লো। তার এই কান্ডে ইরা পারেনা সকলের সামনে চড় বসিয়ে দিতে তাকে।

অথচ ইরিনাকে দেখা গেল একেবারে নির্লিপ্ত। সে চেয়ার দখল করে ফেলেছে বলে ইরার পাশের চেয়ারে জাদিদকে বসিয়ে দিলো নীতি। নিজে গিয়ে বসলো রায়ানের পাশে। রায়ান, তার বড় ভাই এবং নীতি মিলে সার্ভ করলো খাবার। সকলেই বেশ সন্তুষ্ট। জিমন, নীতি, আবরার এবং জাদিদের কথার সুরে মুখরিত চারপাশ। অল্প সময়ে জাদিদের বেশ ভাব হয়ে গিয়েছে সকলের সাথে। খাওয়ার মাঝে সে ইরার দিকেও নজর রাখছিলো। যদিও দ্বায়িত্ব টা ইরার। কিন্তু জাদিদ উল্টো তাকেই আপ্যায়ন করছে। ইরা ঠিকঠাক খেতে পারছে না দেখে সে বেজায় চিন্তিত। যদিও আসার পর হতে অনেক কিছু খাওয়া হয়েছে সকলের। নিশ্চয়ই গ্যাস্ট্রিকের কারণে খারাপ লাগছে তার। চুপসানো মুখটা দেখে তাই জাদিদ চিন্তায় পড়লো কিছুটা।
অন্যপাশ থেকে দুজনের এতো এতো আদিখ্যেতা দেখে খাওয়ার রুচি উঠে গেল মিহাদের। অদ্ভুত রাগে কপালের রগ ফুলে উঠেছে তার। ভিতরটা জ্বলে পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে একেবারে। কিন্তু সে তো এটাই চেয়েছিলো। এতো খারাপ কেন লাগছে তবে?

নীতি খাওয়ার ফাঁকে সকলের দিকে নজর দিতে গিয়ে পাশের চেয়ারের সাফওয়ানকে দেখে ভ্রুঁ কুঁচকে ফেললো। ছেলেটা খাওয়া বাদে ছোট ছোট চোখ করে তাকিয়ে আছে মুখোমুখি চেয়ারে অবস্থানরত সায়েরীর প্লেটের দিকে। নীতি নিজেও তাকালো। এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলো,
‘ সায়েরী! এ কি? ভাত উঠিয়ে রেখেছ কেনো? এতো অল্পতে কি হবে? মাছ,গরু মাংস কিছুই তো নিলে না। ‘
বলতে বলতে পুণরায় বাটি হাতে নিলো সে। সায়েরী আৎকে উঠার মতো করে জোর গলায় লাগবে না জানায়। অন্যপাশ হতে আবরারও নিষেধ জানিয়ে বলে,

‘ ওকে নিয়ে ব্যস্ত হোস না। যা নিয়েছে তা খেতে পারে কিনা দেখ আগে। এসবের বাইরে আর কিছু খাবে না। ‘
‘ সে কি কথা। এতো অল্প খাবার? এজন্যই তো এমন শুকনো। ‘
আরো কিছু কথা বলে নীতি পুণরায় খাবারে মনযোগ দিলো। সাফওয়ান তখনো গম্ভীর মুখে সায়েরীর প্লেটের দিকেই তাকিয়ে। অথচ পাশ থেকে ইরিনা সেই শুরু থেকে তাকে এটা সেটা সেধে যাচ্ছে। কখনো জোর করে প্লেটে তুলে দিচ্ছে। সায়েরী লেগ পিছে কামড় বসিয়ে ক্ষুব্ধ দৃষ্টিতে তাকায় মেয়েটার দিকে। পারেনা শুধু এই লেগ পিছের মতো ইরিনাকেও চিবিয়ে খেতে। এত নির্লজ্জ ও হয় মেয়ে মানুষ! আর সাফওয়ান ভাইকে দেখো। তার বেলায় ধমকা ধমকি ঠোঁটের আগায় লেগে থাকবে। ভালো চাইতে গেলেও বকা শুনাবে। কিন্তু এই ইরিনা চিরিয়াখানা কে কিছুই বলছে না!!

খাওয়া দাওয়া শেষ করে সবে মাত্র সোফায় এসে বসেছে সকলে। রাত যদিও বেশি হয়নি তখন। মাত্র সাড়ে ন’টা। মেয়েদের তাড়া থাকবে বলে সব তাড়াতাড়ি শেষ করেছে। এর পর আরো ঘন্টা খানিক আড্ডা দিয়ে তবেই নাহয় বাড়ি ফিরা যাবে। এই মনোভাব সকলের। খেয়ে উঠার পর থেকেই পেটে অদ্ভুত খারাপ লাগছিলো ইরা’র। একটু হাটাহাটি করে ভেতরের ফাঁপিয়ে থাকা ভাবটা কমানোর চেষ্টা করলো সে। কিন্তু তা সম্ভব হলো না বেশিক্ষণ। গা গুলিয়ে বমি পেলো হঠাৎ। ডাইনিংয়ের পাশে অবস্থানরত সিংকে গিয়ে গলগল করে সব উগলে দিলো সে। আকস্মিক তার এহেন আচরণে সকলে ভয় পেয়ে গেল। মিহাদ হতবিহ্বল হয়ে ছুটে যেতে উদ্যত হলো। কদম বাড়িয়েছে মাত্র, এমন সময় দেখলো অন্যপাশ হতে জাদিদ ছুটে গিয়ে আগলে ধরেছে ইরাকে। মিহাদের কদম থমকে গেল সেখানেই। কিন্তু মেজাজ সামলাতে না পেরে সে পাশে থাকা নীতিকে বলে উঠলো,

‘ কি খাইয়েছিস ওকে? বমি করছে কেনো? ‘
নীতি আশ্চর্য হলো এমন অপবাদ শুনে৷ কিন্তু কড়া প্রতিউত্তর করতে বিরত হলো না। ঝাঁজালো সুরে বললো,
‘ আশ্চর্য! আমরা কেনো কিছু খাওয়াতে যাবো? তাছাড়া, ওকে নিয়ে তোকে এতো না ভাবলেও চলবে। ভাবার জন্য এখন ওর হবু বর আছে ওর কাছে। ডাক্তার মানুষ উনি। তোর চেয়ে আরও বেশ যত্নে রাখবে ইরাকে। ‘
একথা শুনার পর আর এক সেকেন্ডও বিলম্ব করলো না মিহাদ। ইরাকে একপলক দেখে সোজা বেরিয়ে গেলো ঘর থেকে। রায়ান আফসোসের সুরে বললো,
‘ কি দরকার ছিলো এসব বলার? ‘
‘ বলবো না? গত পাঁচ-ছয় মাস যাবত মেয়েটাকে কষ্ট দিয়ে আসছে সে। আজ হঠাৎ এসে ভালোবাসা উতলে পরছে আবার। যত্তসব। ‘ নীতির রাগী কন্ঠ।
রায়ান আর কিছু বলার জন্য পেলো না। সাফওয়ান আবরারকে উদ্দেশ্য করে বললো,

‘ গিয়ে দেখ কোথায় যাচ্ছে। মাথা ঠিক নেই এখন ওর। আমার কথা একেবারেই পাত্তা দিবে না। তুই দেখ সামলাতে পারিস কিনা। ‘
‘ আমি কীভাবে যাব? সায়ু আছে এখানে। ওকে রেখে যেতে পারবো না। ‘
‘ রায়ান নাহয় নীতির সাথে ওকেও পৌঁছে দিবে। ওর চিন্তা না করে মিহাদকে দেখ। ‘
কথাটা শুনে নীতি ফিরে তাকায়। সাফওয়ানের ইশারা বুঝতে পেরে সেও তাল মিলিয়ে জবাব দেয়,
‘ হ্যাঁ। সায়েরীকে আমি নিয়ে যাব নিজের সাথে। রায়ান আমাদের দিয়ে আসবে চিন্তা করিস না। ‘
একটু দোমনা করলেও পরে আবার নীতি আশ্বাস দিতেই রাজি হয়ে গেলো আবরার। সাফওয়ান নিজের গাড়ির চাবি এগিয়ে দিলো তাকে। জানালো সে জিমনের সাথে চলে যেতে পারবে। আবরার সায়েরীকে নীতির সাথে ফিরতে বলে মিহাদের খোঁজে বেরিয়ে পড়লো।

অন্যদিকে পরপর দুইবার বমি করে শরীর নেতিয়ে পড়লো ইরার৷ জাদিদের বুকের উপর দেহের ভার ছেড়ে দিয়েছে সে। জাদিদ চিন্তিত মুখে টিস্যু দ্বারা ইরার মুখ মুছে দিয়ে সোফাতে বসিয়ে দিলো। নীতি তার জন্য লেবু পানি নিয়ে এসেছে। সন্তুষ্টি নিয়ে সেটা পান করলো ইরা। শরীরে একটু জোর পেতেই সে সোজা হয়ে বসলো। সকলের থমথমে মুখ দেখে জোরপূর্বক হেসে বললো,
‘ ঠিক আছি আমি। একের পর এক খাবার খেয়েছি বলে হজম করতে পারিনি। তোরা এমন অফ হয়ে গেলি কেনো হঠাৎ! কতদিন পর একসাথে পার্টি করার সুযোগ পেয়েছি আমরা। একটু গান, বাজনা কর। এমন চুপচাপ থাকলে হয়? ‘

তার কথায় পুণরায় আগের আমেজে ফিরে আসলো সকলে। সাউন্ড বক্সে গান বাজিয়ে গেম খেলার প্ল্যান করলেও ইরা আবদার করলো সাফওয়ানের কন্ঠে গান শুনার। বহুমাস পর ইরার এই আবদার টুকু না করতে পারলো না সাফওয়ান। রাজি হয়ে গেল গান গাওয়ার জন্য। হই হই করে নেচে উঠলো বন্ধুরা। কিন্তু এমন বদ্ধ ঘরে না গেয়ে ছাদে, খোলা আকাশের নিয়ে গাওয়ার আর্জি জানাতেই সকলে প্রয়োজনীয় সব নিয়ে রওনা হলো ছাদের উদ্দেশ্যে। ডেজার্ট সব ছাদে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। বসার জন্য মাদুর, চাদর, গিটার আরো কত কি। সকলের হাতেই কিছু না কিছু। সায়েরীকে কেউ কিছু দিচ্ছে না দেখে সে নিজেই বলে উঠলো,

‘ আমাকে দিন না রায়ান ভাইয়া। আমি মাদুর গুলো নিয়ে যায়। ‘
‘ তুমি? না না সামলাতে পারবে না। আমি নিচ্ছি। ‘
সায়েরী পুণরায় কিছু বলবে তার আগে পাশ থেকে নিজ কাজে ব্যস্ত সাফওয়ান কৌতুক গলায় বলে উঠলো,
‘ নিজের জামা কাপড় সামলাতে না পারা বাচ্চাগুলোও এখন আমাদের কাজ সামলাবে। হাউ ফানি। ‘
এ কথায় রায়ান ফিক করে হেসে দিলো। বুঝে ফেললো দুজনের মাঝের নিরব মান অভিমান। তাই সন্তর্পণে সরে গেল সে। সে যেতেই সায়েরী দুইহাতে নিজের গাউন ধরে সাফওয়ানের সামনে এসে দাঁড়ায়। পাখির কিচিরমিচির ঝগড়ার মতো আওয়াজ তুলে বলে,

‘ আমি বাচ্চা! বাচ্চা হলে এসেছেন কেনো বাচ্চা মেয়ের সাথে প্রেম করতে? এডাল্ট কাউকে খুঁজে নিন গিয়ে। ‘
রায়ানের বাদামি গিটার টা কাঁধে ঝুলিয়ে মাথা নিচু করে মায়াময়ী, আদুরে মুখটাতে দৃষ্টিপাত করলো সাফওয়ান। আশেপাশে কেউ নেই দেখে চট করে পিঠে হাত গলিয়ে কাছে টেনে নিলো নরম দেহটি। মেয়েটার আশ্চর্য চাহনি এবং দেহের কম্পনকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে ঝুঁকে আসলো কাছাকাছি। আড়াআড়ি ভাবে ভ্রুঁ নাচিয়ে বললো,
‘ প্রেম করছি কে বললো? কই আমি তো বলিনি। নিজ থেকে নিজেকে আমার প্রেমিকা বলে স্বীকৃতি দিচ্ছো,বাহ! ‘
অপমানে গালের উপর টাশ টাশ দুটো চড় পড়লো বোধহয় সায়েরীর। সে আসলেই মাথামোটা। নয়তো স্ব- ইচ্ছায় কেনো আসে বারবার অপমানিত হতে? চোখ, মুখ খিচে সে সাফওয়ানের বুকে ধাক্কা দিলো। মিনমিন কন্ঠে বললো,

‘ আপনি একটা অসহ্য! ‘
বলেই উল্টো ঘুরে সিড়ির কাছে গিয়ে দাঁড়ালো সে। বিড়বিড় করে আরও বললো,
‘ অসহ্য,ইতর,পাষাণ লোক। ‘
সাফওয়ান তখন ঠিক তার পেছনে। বকাগুলো স্পষ্ট কানে এসেছে তার। সায়েরী লক্ষ্য করে সাফওয়ান তার গাউনের ঘের সব হাতের মুটোই তুলে নিচ্ছে। তার তাকানোর মাঝেই সাফওয়ান চোখ তুলে তাকায়। এরপর একেবারে তার পিঠের সাথে মিশে গিয়ে, কানে ঠোঁট লাগিয়ে জবাব দেয়,
‘ আই নো, আমি অসহ্য, ইতর, পাষাণ। ফরচুনেটলি এসবই সারাজীবন সহ্য করে যেতে হবে তোমাকে। ব্যাড লাক ফর ইউ, বোকাপাখি। ‘
ফিসফিস কন্ঠটা শুনে সায়েরী জমে গেল পুরোপুরি। গাল,কান গরম হয়ে উঠেছে। শরীরের লোম দাঁড়িয়ে গিয়েছে। ধুকধুক করছে বুক। ছাদ হতে ডাক পড়তেই সম্বিত ফিরে পেয়ে দ্রুত পায়ে উঠে যেতে লাগলো সে। বিড়বিড় করে আবারও একই শব্দ আওড়াল,

‘ অসহ্য! অসহ্য! অসহ্য! ‘
পেছনে সাফওয়ান ঠোঁটে দুর্বোধ্য হাসি ফুটিয়ে প্রেয়সীর ড্রেস সামলাতে ব্যস্ত তখন। বোকা মেয়েটা বুঝতেই পারলো না কথার মাঝে কেমন এক স্বীকারোক্তি দিয়ে বসেছে তার প্রেমিক পুরুষ। নিজেকে প্রেমিক বলে দাবি না করেও সারাজীবনের জন্য নিজেকে সপে দিয়েছে এই বোকা মেয়েটার কাছে।
ছাদে পৌঁছে সায়েরী আগ পিছ না দেখে সোজা গিয়ে নীতি এবং ইরার মধ্যবর্তী স্থানে বসে পড়লো। অন্যপাশে ছেলেরা বসেছে। মাঝের ফাঁকা স্থানে সব ধরনের ডেজার্ট রাখা হয়েছে। সায়েরী আইসক্রিমের বাটি তুলে নিলো হাতে। ভুলেও তাকালো না সাফওয়ানের দিকে। অদ্ভুত রকমের লজ্জা লাগছে তার।
এরইমধ্যে সাফওয়ান গিয়ে বসেছে তার জন্য বরাদ্দকৃত চেয়ারটাতে। তার সম্মুখে সকলে বসা। কোলের উপর গিটার টা নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখতে দেখতে সে জানতে চাইল,

‘ কেমন গান শুনাবো? ‘
ইরিনা ফট করে জবাব দিলো,
‘ লাভ এ্যাট ফার্ট সাইড টাইপের। ‘
সায়েরী অগোচরে ভেংচি কাটে একথা শুনে। সাফওয়ান তার দিকে তাকিয়ে গাঢ় স্বরে প্রতিউত্তর করে,
‘ উঁহু! আমার সাথে ঠিক মানাচ্ছে না। ‘
একথা শুনে জিমন বলে উঠলো,
‘ তাহলে তোর ব্যাক্তিগত ফিলিংস নিয়েই গা ভাই। তবুও শুনা কিছু। ‘
সাফওয়ান মৃদু হেসে সম্মতি জানালো। টুংটাং ধ্বনি তুলতেই নীতি চেঁচিয়ে উঠে জানতে চাইলো,
‘ ডেডিকেট টু…..? ‘
সাফওয়ান থামে। চোখ তুলে তাকায় সায়েরীর দিকে। সায়েরী নিজেও তাকিয়ে। ঘোর লাগা চোখে চেয়ে থেকে সাফওয়ান জবাব দিলো,

‘ ডেডিকেট টু, সামওয়ান ভেরি ভেরি স্পেশাল। ‘
গভীর কন্ঠের প্রতিউত্তর টুকু কর্ণগোচর হতেই সায়েরীর হৃদকম্পন বেড়ে যায়। অদ্ভুত ভাবে ঢিপঢিপ করছে বুক। সাফওয়ান মাথা ঝুঁকিয়ে সরু আঙ্গুল দ্বারা সুর তুললো। সকলে মন্ত্রমুগ্ধের তাকিয়ে রইলো তার দিকে। সে পুণরায় নতজানু হয়ে থাকা লজ্জাবতী মুখটার দিকে মনকাড়া কন্ঠে গেড়ে উঠলো,

চাহে কুচ না কেহনা.. ভালে চুল তু রেহনা ;
মুঝে হ্যে পাতা… তেরে পিয়ার কা!!
খামুস চ্যেহরা… আনকো প্যে প্যেহরা ;
খোদ হ্যে গাওয়া… তেরে পিয়ার কা!!
তেরি ঝুকি নাজার… তেরি হার আদা..;
মুঝে ক্যেহরাহি হ্যে ইয়ে দাসতা….!
[ Song : Teri Jhuki Nazar ]

ঘড়িতে ঠিক ঠিক রাত দশ-টা বাজে৷ সকলর বাড়ি ফিরতে আরো কিছুটা দেরি আছে। কিন্তু আড্ডার মধ্যে থেকেই ডাক পড়েছে সায়েরীর। রায়ান এসে জানালো ফিরার কথা। ইরা’দের ফিরতে আরো দেরি আছে বিধায় সে সায়েরীকেও বসতে বললো কিছুক্ষণ। একসঙ্গে নাহয় বিধায় নিবে। সায়েরীর এমনিতেই বোরিং লাগছিলো। তাই সে কথা না বাড়িয়ে বিদায় নিলো সকলের কাছ থেকে। নীতি নিজেও যখন তাকে বিদায় দিলো। তখন সে অবাক কন্ঠে বললো,

‘ ভাইয়া যে বললো তোমার আর রায়ান ভাইয়ার সাথে ফিরতে। তুমি যাচ্ছ না আমাদের সাথে? ‘
নীতি জোরপূর্বক হেসে রায়ানের দিকে তাকায়। রায়ান নিজেই জবাব দিলো,
‘ যাবে তো। কিন্তু আরেকটু পর। আপাতত তুমি চলো আমার সাথে। লেট হচ্ছে। ‘
সায়েরী বিভ্রান্তিতে পড়ে। রায়ান,জিমন কিংবা মিহাদের সাথে আহামরি কোনো সখ্যতা নেই তার। কখনো আসা যাওয়াও হয়নি তাদের সাথে। আজ নীতি ছিলো বলেই আবরার ভরসা করে রেখে গিয়েছে তাকে। কিন্তু একাকী রায়ানের সাথে বাড়ি ফিরতে মোটেও ইচ্ছুক নয় সায়েরী। এমন না যে রায়ান খারাপ বলে সে ভয় পাচ্ছে। ব্যাপারটা আসলে অভ্যাস এবং ভরসার। এখানে দুটোই নেই।

বিগত পাঁচ বছরে একমাত্র সাফওয়ানের সাথেই অংসখ্য বার যাতায়াত করেছে সে। অদ্ভুত হলেও, আবরার একমাত্র সাফওয়ানের উপরই প্রায়সময় সপে দিতো এই দ্বায়িত্ব। হয়তো এই বন্ধুর প্রতি অগাধ বিশ্বাস আছে বলেই এমনটা করতো সে। সেদিক থেকে বলতে গেলে সাফওয়ান-ই অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে সায়েরীর কাছে। আর এখন তো মানুষটার প্রতি অগাধ ভরসায় টইটম্বুর তার দেহ,মন। তাই রায়ানের সাথে বাড়ি যাওয়ার এই বাধ্যবাধকতা ঠিক মানতে পারছে না সে।

গেইটের বাহিরে জিমন এবং সাফওয়ান দাঁড়িয়ে। মাত্রই সাফওয়ানের পরিচিত, এলাকার এক ছোট ভাই এসেছে চকচকে কালো বাইকটি নিয়ে। এসেই সে চাবি এগিয়ে দিলো সাফওয়ানের দিকে। সেটা হাতে নিয়ে মানিব্যাগ হতে পাঁচশো টাকার নোট বের করলো সাফওয়ান। সেটা এগিয়ে দিলো ছেলেটার দিকে। জোরপূর্বক হেসে তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করলো ছেলেটা। বিনিময়ে সাফওয়ান শান্ত দৃষ্টিতে তাকালো শুধু। তা দেখামাত্র ছেলেটা কথা না বাড়িয়ে টাকাটা গ্রহণ করলো। তারপর পুণরায় সালাম দিয়ে প্রস্থান করলো নিজ গন্তব্যে। সে যেতেই মুখ খুলল জিমন। বাইকে চড়ে বসা সাফওয়ানের দিকে তাকিয়ে সে রসিকতার সুরে বললো,

‘ এই রাত বিরাতে বাইক রাইড! মনে রঙ লেগেছে নাকি? ‘
শেষের কথাটা বলতে গিয়ে চোখে মুখে অদ্ভুত এক প্রতিক্রিয়া দেখাল সে। তা দেখে মৃদু হাসলো সাফওয়ান। পরপরই নজর গেলো সবে মাত্র গেইট পেরিয়ে বাহিরে আসা রমনীটির দিকে। দৃষ্টি স্থির রেখেই সে জবাব দিলো, ‘ লেগেছে বোধহয়। ‘
তার নজর লক্ষ্য করে জিমন হেসে ফেললো। সাফওয়ানের কাঁধ চাপড়ে বললো,
‘ কন্ট্রোল ম্যান! কন্ট্রোল! আপনার ভালোবাসার আগুনে পোড়ার ক্ষমতা এখনো হয়নি আমার ছোট্ট শালিকার। তাই একটু ধীরে সুস্থে এগোনোর অনুরোধ রইলো। ‘

সাফওয়ান বিরক্ত হলো তার এহেন বাক্যে। নিজের ব্যক্তিগত মানুষটাকে নিয়ে কাছের বন্ধুদের পক্ষ হতেও কিছু শুনতে রাজি নয় সে। তার ব্যাপার, সে বুঝে নিবে সবটা নিজের মতো করে। এমনই মনোভাব তার।
এরইমধ্যে সায়েরীকে দেখা গেল বড্ড বেশি চিন্তিত। গেইটের বাইরে আসতেই রায়ান তাকে বিদায় জানিয়ে ভিতরে চলে গেছে। তা দেখে ভড়কে গেলো বেচারি। হচ্ছে টা কি তার সাথে! কি শুরু করেছে এই বন্ধুরা মিলে! তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করতে করতে জিমন বলে উঠলো,
‘ দাঁড়িয়ে আছো কেনো সায়েরী?উঠো।দেরি হচ্ছে তো৷ ‘
আহাম্মকের তাকিয়ে থেকে সায়েরী পাল্টা প্রশ্ন করলো,

‘ কোথায় উঠবো? ‘
অঅন্যপাশ থেকে সাফওয়ান বিরক্ত সুরে বিড়বিড় করলো,
‘ আমার মাথায়। মাথামোটা কোথাকার! ‘
কিন্তু মুখে আরেক কথা। হর্ন বাজিয়ে নিজের দিকে আকর্ষণ করে গমগমে সুরে বললো,
‘ আমাকে কি চোখে পড়ছে না? জলদি বাইকে উঠো। কুইক। ‘
জিমন চলে গেছে। উপস্থিত শুধু এই দুই নর-নারী। বাইক দেখেই সায়েরীর অবস্থা টালমাটাল। সাফওয়ানের সাথে কিনা বাইকে করে যাবে সে? এতো কাছাকাছি! ভাবতেই হৃদপিণ্ড ধরাস ধরাস করে লাফিয়ে উঠলো তার। মিনমিন কন্ঠে বললো,

‘ আমার তো নীতি আপু আর রায়ান ভাইয়ার সাথে যাওয়ার কথা ছিলো। তাহলে আপনি কেনো? ‘
রাস্তায় দাঁড়িয়ে একের পর এক জবাবদিহি করতে বেশ বিরক্ত হলো সাফওয়ান। তবুও জবাব দিলো,
‘ গাধা! আজ ওদের জন্য স্পেশাল একটা দিন। গেলে দুজন একাকী যাবে৷ কোয়ালিটি টাইম স্পেন্ড করবে। তোমাকে নিয়ে যাবে কোন সুখে? ‘
সায়েরী গাল ফোলাল এহেন জবাবে। অসন্তোষ্ট গলায় বললো,
‘ তাহলে আমাকে রেখে গেল কেনো ভাইয়া? নিয়ে গেলেই পারতো! ‘
বিরক্তিতে তপ্ত শ্বাস ফেলে কপাল ঘষে সাফওয়ান। এই মাথামোটা কে সাথে নেওয়ার জন্য বন্ধুদের সাহায্যে কত ঢপ খাওয়ালো দুই ভাই বোনকে। অথচ মেয়েটা!! বাইক চালু করে হ্যান্ডেল চেপে ভ্রুম ভ্রুম শব্দ তুললো সে। সায়েরীর চমকে উঠা চেহারাটা দেখে বললো,

‘ ভাবতে থাকো। আমি গেলাম ‘
‘ নাহ না!! এইতো, উঠছি। ‘ দ্রুত গলার জবাব সায়েরীর।
একরাশ অস্বস্তি নিয়েই বাইকে চড়ে বসলো সে। আবরার ব্যতিত কখনো, অন্য কারো বাইকে চড়েনি বিধায় বেশ অস্বস্তি হচ্ছিলো তার৷ যথাসম্ভব দুরত্ব রেখে, একহাতে সাফওয়ানের কাঁধ চেপে ধরলো সে। সাফওয়ান মিররে তাকিয়ে দেখলো চুপসানো, বিব্রত ভাব ফুটে উঠা মুখখানা। শান্ত কন্ঠে সতর্কবার্তা দিলো ধরে বসার জন্য। তা শুনেই সায়েরী গমগমে গলায় বললো,

‘ ধরেই বসেছি। সিনেমার মতো বাইক টান দিয়ে গায়ের উপর হুমড়ি খেয়ে ফেলার চেষ্টা করবেন না একদম। নয়তো আমি নেমে যাবো। ‘
সহসা থেমে গেলো সাফওয়ান। কাঁধ ফিরিয়ে জবাব দিলো,
‘ ভাব দেখে মনে হচ্ছে তোমাকে বাইকে চড়ানোর জন্য পূর্ব পরিকল্পনা সাজিয়েছি আমি! নামো। নেমেই যাও। দরকার নেই আমার সাথে যাওয়ার। ‘

অপমানে থমথমে সায়েরীর মুখশ্রী। তবুও ঠাই বসে সে। সাফওয়ানও কথা না বাড়িয়ে বাইক চালু করে রওনা হল। মিডিয়াম গতিতে ছুটছে বাইক। সায়েরী গাল ফুলিয়ে গভীর চিন্তায় মত্ত তখন। ভাবছে, এ কেমন প্রেমিক জুটেছে কপালে! একজন বুনো ওল তো অন্যজন হলো বাঘা তেঁতুল। যদিও সাফওয়ানের ধমকা ধমকির আগে সায়েরী বরাবরই নেতিয়ে পরে। ভয় ভয় অনুভূতিটা এখনো বিদ্যমান মনে। তবুও তার চঞ্চল সত্তা নিরব থাকতে দেয়না তাকে। এটাই যেন সাফওয়ানের রাগের উৎস। মাথামোটা সায়েরীর অযৌক্তিক কথা,কর্মকাণ্ড গুলোয় যথেষ্ট তাকে রাগিয়ে তুলতে।
ভিন্ন রাস্তা দিয়ে বাইক ছুটছে দেখে চিত্ত চনমনে হলো সায়েরীর। চঞ্চল কন্ঠে সুধাল,
‘ এদিকে কোথায় যাচ্ছেন? ‘
বাতাসের সাথে ভেসে আসলো সাফওয়ানের নির্লিপ্ত জবাব,
‘ তোমাকে বেচতে চাইলেও কেউ কিনবে না। অপহরণ করেও আমার বিশেষ লাভ নেই। তাই চুপচাপ বসে থাকো।
‘ আপনি আবারো আমাকে অপমান করছেন? ‘

মিররে সায়েরীর গাল ফুলিয়ে রাখার দৃশ্যটা দেখে অগোচরে মৃদু হাসলো সাফওয়ান। জবাব দিলো না কোনো। গন্তব্যে পৌঁছে বাইক থামাল সে। সায়েরী বিষ্ময় চোখে তাকিয়ে দেখছে চতুর্দিক। যায়গাটা কেমন পরিচিত বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু ঠিক চিনে উঠতে পারছে না। হর্ন বাজাতেই লোহার কালো গেইট খুলে দিলো দাড়োয়ান। মাথা ঝুঁকিয়ে সালাম জানালো সাফওয়ান কে। গেইটের পাশের নেইম প্লেটে চোখ যেতেই সায়েরী লক্ষ্য করলো নামটা। গোটা গোটা অক্ষরে লেখা “গ্রীন ভ্যালি”। তৎক্ষনাৎ তার মনে পড়লো এই ভিলার ছবি যে সাফ্রিনের কাছে দেখেছে। এটা তাদের ফার্মহাউস। কিন্তু সাফওয়ান এখানে কেনো নিয়ে এসেছে তাকে?

গেইট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইলো সে। রাত হওয়া স্বত্তেও চতুর্দিকে লাইট জ্বলছে অনেকগুলো। সাদা এবং হালকা হলুদ মিশেলের ডুপ্লেক্স বাড়িটি দেখতে সুন্দর লাগছে তাতে৷ সায়েরী নেমে দাঁড়ালো বাইক হতে। ঘুরে ঘুরে নজর বুলালো সব দিকে। বাড়িটি খুব বেশি বড়সড় নয়। আবার ছোট ও বলা যায় না। মাঝারি আকৃতির, সুন্দর ডিজাইন করা। কিন্তু আশেপাশে বিশাল জায়গা রয়েছে খোলা। গাছগাছালি তে ভরপুর সব দিকে। দিনের আলোতে নিশ্চয়ই সবুজের সমাহার বলে মনে হয় তা দেখে! এজন্যই বোধহয় নাম রেখেছে গ্রীন ভ্যালি। সবদিক সবুজ গাছগাছালিতে ভরপুর হলেও বাড়ির সম্মুখে বাগান জাতীয় স্থানটা ক্যাকটাস গাছে ভরপুর দেখে মুখ কুঁচকে গেলো সায়েরীর। দৃশ্যটা ঠিক মনে ধরলো না তার। মনে হলো এখানটাই সাদা গোলাপের সমাহার হলে বেশ মানাতো বাড়িটির সঙ্গে। মনের কথা মনেই রেখে দিলো সে৷ আরো দেখলো পূর্ব দিকে খুবই ছোট্ট কিন্তু গভীর একটা সুইমিংপুল। সেথায় বাতি নেই কোনো। কিন্তু অন্যদিক হতে আলো আসায় নীলচে পানির প্রতিবিম্ব চিকিমিকি করছে। দৃশ্যটা সুন্দর লাগছে দেখতে। উত্তরদিকে, একেবারে এক কোণায় দেখা মিলছে খুবই ছোট্ট একটা ঘরের। যদিও ইট,সিমেন্টের তৈরি। খুব সম্ভবত দুই রুমের ঘর সেটি। সায়েরী অবাক চোখে দেখে সবটা। এরপরই সাফওয়ান কে উদ্দেশ্য করে বলে,

‘ এখানে কেনো এনেছেন আমাকে? ‘
সাফওয়ান বাইকের চাবি পকেটে গুঁজে অন্য হাতের মাঝে অনাসয়ে টেনে নেয় সায়েরীর নরম এক হাত। মেয়েটা চমকে তাকাতেই সে শীতল কন্ঠে জবাব দেয়,
‘ এটা আমার সুখনীড়। তাই আরেক সুখকে পরিচয় করাতে এনেছি। ‘

বাসার সামনে গাড়ি থামতেই ব্যাক সিট হতে বেজার মুখে বেরিয়ে আসলো ইরিনা। জাদিদকে বিদায় না দিয়েই সে গটগট পায়ে ঢুকে গেলো ভিতরে। তার এমন আচরণের কারণ ইরা’র বেশ ভালো করেই জানা। এবং জানে বলেই ছোট বোনের জন্য আফসোস হয় তার। মেয়েটা কেনো ছুটছে এমন এক মরিচীকার পেছনে? যাকে পাওয়া তার ভাগ্যেই নেই!
ভাবনা থামিয়ে পাশের সিটের জাদিদ নামক ভদ্রলোকের দিকে ফিরে তাকালো সে। চোখাচোখি হতেই বিষন্ন গলায় বললো,
‘ সবটা জেনেশুনে ও কেনো বিয়ের জন্য রাজি হয়েছেন? আমি এখনো ভালোবাসি মিহাদকে। মনে যত রাগ, অভিমান, ঘৃণা পুষে রাখি না কেনো। এটাও সত্যি যে ওকে কখনো ভালোবাসতে ভুলবো না। সারাজীবন ভালোবেসে যাব। ‘
কথাগুলো যে অন্য এক প্রেমিক হৃদয়ে কেমন দহন সৃষ্টি করলো তা বুঝতেও পারলো না ইরা। জাদিদ এই দহন নিয়েও মিষ্টি করে হাসলো। নম্র কন্ঠে বললো,

‘ আপনি যদি ঘৃণার সাথেও তাকে ভালোবেসে যেতে পারেন। তাহলে আমি কেবল ভালোবাসা নিয়ে ভালোবেসে যেতে পারবো না কেনো? আগেও বলেছি, আমি আপনাকে ভালোবাসি, ইরা। মিহাদের সঙ্গে বিচ্ছেদ না হলে কখনোই আপনার বাবাকে জোর করতাম না আমি। আপনি কবুল বলার আগ মুহুর্তেও যদি মিহাদ ফিরে আসে, আমি তখনও হাসিমুখে আপনাকে ফিরিয়ে দিতে পারবো। আমার ভালোবাসা ভালো থাকুক, এটাই চাই আমি। যদি তা হয় অন্য কারো সাথে, তবে তাই শ্রেয়। ‘
‘ ছেলেমানুষী কথাবার্তা আপনাকে মানায় না জাদিদ। বিবেক দিয়ে ভাবুন। ‘
‘ প্রেমে পড়ে মানুষ কত উন্মাদনা করে। আমি নাহয় একটু ছেলেমানুষী করলাম। বিনিময়ে আপনাকে পেয়ে গেলে ক্ষতি কি? ‘

‘ এতোটা বিবেকহীনতা আপনার সাথে যায় না। আপনাকে দেওয়ার মতো কিছুই অবশিষ্ট নেই আমার কাছে। বাস্তবতা দেখুন। ফিরিয়ে নিন প্রস্তাব। ‘
‘ আমার শুধু আপনি হলেই চলবে ইরা। ট্রাস্ট মি, আর কিছু চাইনা আমার। ‘
ইরা আর বলার মতো কিছু খুঁজে পেলো না। কেন জানি রাগ লাগলো ভীষণ। গাড়ি থেকে বেরিয়ে গটগট পায়ে ঢুকে গেলো সে ভিতরে। রুমে ঢুকে ব্যাগ ছুড়ে ফেললো একদিকে। টান মেরে ওড়না সরিয়ে ফেললো শরীর থেকে। অসম্ভব ভাবে কান্না পাচ্ছে, রাগ লাগছে, ঘৃণা হচ্ছে। কাকে দেখাব এসব সে! কাকে শুনাবে এই বুকের হাহাকার। তার গন্তব্য আসলে কোথায়? চার বছর যাবত যাকে উজাড় করে ভালোবেসে গেলো, সে কেনো বদলে গেল হঠাৎ? মাত্র পাঁচ মাসের পরিচয়ে অন্য এক পুরুষ তাকে নিঃস্ব রূপে দেখেও গ্রহণ করতে রাজি। কিন্তু পাষাণ সেই প্রেমিক পুরুষ কেনো পারলো শেষ অবধি বুকে ঠাই দিতে?

ডুপ্লেক্স বাড়িটার নিরিবিলি ছাদে দাঁড়িয়ে সাফওয়ান এবং সায়েরী। সিড়িঘরে একটা মাত্র লাইট জ্বলছে। এছাড়া অন্য কোনো আলো নেই ছাদে। আবছা অন্ধকার চারিদিকে। মৃদু বাতাস বইছে। আকাশ অনেক বেশি মেঘলা আজ। বৃষ্টি হবে কি? জানা নেই সায়েরীর। ভাবনায় বিভোর সে আগাছা হতে অবহেলায় বেড়ে উঠা ছোট ছোট ফুলগুলো গুনছে। নিজেকে ব্যস্ত রাখার ব্যর্থ চেষ্টা যাকে বলে। কিন্তু পারছে কই! এলোমেলো, বিষাদময় চিন্তাগুলো আবারও কষ্ট দিচ্ছে তাকে। এইতো, মাত্র এক মিনিট আগে সাফওয়ান অতী মাত্রায় গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠেছিলো,
‘ কলেজে আসছো না কেনো তুমি? ‘

আকস্মিক এমন প্রশ্নে, কন্ঠটা শুনে সায়েরী বেশ অবাক হয়েছিলো। কিছু বলার ভাষা খুঁজে পেলো না। কলেজ, বন্ধুবান্ধব সব কিছু থেকেই ব্যাপক দূরত্বে সে। কারণ হিসেবে সাফওয়ানের নাম বলা গেলেও, অন্য একটি কারণও মনে পুষে রেখেছে সে। নিজের সাথেই নিরব এক যুদ্ধে দগ্ধ হচ্ছে সে প্রতিনিয়ত। যা সে কাউকে জানতে দেয়নি, বুঝতে দেয়নি। ভাবনার মাঝেই অনুভব করলো সাফওয়ান কাছে এসে দাঁড়িয়েছে তার। সায়েরী তাকালো না সেদিকে। ডানে বামে দৃষ্টি ফেলে, থেমে থেমে বললো,

‘ দ..দেরি হচ্ছে। বাসায় যাবো। ‘
সহসা তার থুতনি ছুঁয়ে দিলো সাফওয়ানের পোক্ত হাত। আদুরে মুখশ্রী-টি নিজের দিকে উঠিয়ে সে শান্ত কন্ঠে বললো,
‘ ভয় লাগছে? ‘
এতোক্ষণ যাবত নজর নামিয়ে রাখলেও এবার চোখ মেলে তাকালো সায়েরী। সরাসরি তার ডাগরডোগর আঁখি যোগল ডুব দিলো সুন্দর, সচ্ছ বাদামি চোখজোড়া র মাঝে। স্পষ্ট, দৃঢ় কন্ঠে প্রতিউত্তর করলো ,
‘ উঁহু, আপনি আছেন তো। ‘
কথাটা শুনা মাত্র গম্ভীর মুখটাতে একটুখানি হাসির ঝলক দেখা দিলো। এই হাসি প্রাপ্তির। সায়েরী দুই চোখ ভরে দেখে এই মুগ্ধকর হাসি। সাফওয়ান তখন বৃদ্ধ আঙ্গুল দ্বারা ছুঁয়ে দেয় তার থুতনি। শীতল কন্ঠে বলে,
‘ বিশ্বাস রেখেই তাহলে বলে ফেলো এমন চুপচাপ হয়ে যাওয়ার কারণ। পালিয়ে বেড়ালে যে কিছুই ঠিক হবে না।

সহসা টলমল করে উঠলো মেয়েটার দৃষ্টি। বিষাদে ভরে উঠলো দুই চোখ। সাফওয়ান একহাতে পিঠ জড়িয়ে খানিকটা কাছে টেনে নিলো তাকে। ভিজে উঠা গাল মুছে বলে উঠলো,
‘ ফায়াজকে এই অবস্থায় দেখে অপরাধবোধ হচ্ছে? ‘
চমকে উঠলো সায়েরী। যে কথা সে কাউকে বলেনি, বুঝতে দেয়নি। তা কি করে বুঝে ফেললো সাফওয়ান ভাই? কল্পনার মাঝে সাফওয়ান পুণরায় বললো,
‘ তোমার তো কোনো দোষ নেই। তাহলে এমন পালিয়ে বেড়াচ্ছ কেনো? ‘
সায়েরী কেঁদে ফেললো এবারে। সঙ্গে সঙ্গে তাকে বুকে টেনে নিলো সাফওয়ান। হাত বুলিয়ে দিলো মাথায়। যেন নিরবে সম্মতি দিলো বুক উজার করে কাঁদার। চোখের জলে সব কষ্ট ভাসিয়ে দেওয়ার।
তার এই আহ্বানে মেয়েটা এবার ডুকরে উঠলো। খুলে দিলো মন পিঞ্জিরাবদ্ধ সব বিষাদের উপাখ্যান। ক্রন্দনরত গলায়, থেমে থেমে বলেই চললো,

‘ আমি জানি আমার দোষ নেই। তবুও কোথাও গিয়ে যেন মনে হচ্ছে আমিই প্রকৃত দোষী। ঘটনা যেমনই হোক না কেন,কারণ তো আমি-ই। বন্ধুরাও কেমন হয়ে গিয়েছে। আগের মতো প্রাণখোলে হাসে না, আড্ডা দেয় না। আমার সামনে অভিনয় করে যায়। কিন্তু আমি জানি ওরা ভালো নেই। ওদেরও হয়তো কখনো না কখনো মনে হবে আমার জন্য আজ তারা ফায়াজকে হারিয়েছে। আয়ান আর নুহাশের চেহারা দেখে নিজেকেই অপরাধী মনে হয়। আগে যদি ফায়াজের অনুভূতি সম্পর্কে কিঞ্চিৎ ধারণাও থাকত। তাহলে তখনই বুঝাতাম ওকে। ঘটনা এতদূর আসতোই না। এখন সব এলোমেলো হয়ে গিয়েছে। সবাই এলোমেলো হয়ে গেছে। আমি পারছি না ওদের মাঝে নিজেকে আগের মতো মেলে দিতে। অপরাধবোধ হচ্ছে আমার। খুব করে অপরাধবোধ হচ্ছে। ‘

নিরিবিলি ছাদে সায়েরীর এই করুণ আর্তনাদ শুনে সাফওয়ান সহ প্রকৃতির ও বুঝি মন ভাড় হয়ে উঠলো। তাইতো বাতাসের তান্ডব বেড়ে মুহুর্তেই ধরণীতে নেমে আসলো মেঘেদের মন ভাঙ্গা অশ্রুজল। ঝিরিঝিরি বৃষ্টিতে সিক্ত হলো আলিঙ্গনে আবদ্ধ দুই প্রেমিক যুগল। প্রকৃতির এই পরিবর্তনেও নড়নচড়ন হলো না তাদের অবস্থানের। কেবল কান্নার গতি কমলো সায়েরীর। তখন গিয়ে সাফওয়ান একহাতে কান্নারত মুখটা তুললো। লালছে চোখজোড়া দেখে বুক কাঁপলো তার। ক্রন্দনরত মেয়েটার গালে হাত রেখে সে কোমল গলায় বললো,

‘ তুমি কিংবা আয়ান কেউই এই ঘটনার জন্য দায়ী নও। শুধু মাত্র এই দুর্ঘটনার সাথে জড়িয়ে আছো বলেই অপরাধ বোধ হচ্ছে তোমাদের। যা হওয়ার তা তো হয়েই গিয়েছে। সবটা ভাগ্যে ছিলো। আগে জানতে পারলেও ভাগ্যের লিখন মুছতে পারতে না। তাই সবটা ভুলে গিয়ে স্বাভাবিক হও। বন্ধুরা স্বাভাবিক হতে পারছে না তোমাকে অস্বাভাবিক দেখে। আয়ানের অপরাধবোধও বাড়ছে তোমার ভাড় মুখ দেখে। সবাই পুণরায় হাসিখুশি রূপে ফিরে আসাটা একমাত্র তোমার উপরই ডিপেন্ড করছে সুবহা। ওদের জন্য হলেও নিজেকে দোষ দেওয়া বন্ধ করো। আগের রূপে ফিরে আসো। চঞ্চল, উড়নচণ্ডী মেয়েটাকে আগের রূপে দেখার জন্য কতগুলো হৃদয় ব্যাকুল হয়ে তা তুমি বুঝতে পারছো না? ‘

সামান্য কিছু বাক্য। কিন্তু কেমন জাদুর মতো কাজ করলো তা। এতোদিনের জমানো পাহাড় সমান দুঃখ সব মেঘ হয়ে ভেসে গেলো যেন। সেথায় এসে জমলো আরো কিছু মুগ্ধতা। আরো একবার প্রেমে পড়ার কারণ। সায়েরী মন্ত্রমুগ্ধের মতো আয়ত্তে নিয়ে নিলো কথাগুলো সব। ভাবনার সুতো কাটলো সাফওয়ানের শীতল হাতের ছোঁয়ায়। মানুষটা কেমন এক ঘোর লাগা চোখে তাকিয়ে রয়েছে তার চোখদুটোর দিকে। ঢিপঢিপ বুক নিয়ে সায়েরী সরে আসতে চাইলো। কিন্তু সাফওয়ানের পোক্ত হাতের বন্ধন হতে ছুটতে পারলো না নাজুক সে। সাফওয়ান ঝুঁকে আসলো। নিজের ভেজা কপালে সঙ্গে ঠেকাল সায়েরীর ভেজা কপাল৷ মেয়েটা যেন জমে গেল তার এই কান্ডে। কিন্তু সাফওয়ান থেমে রইলো না। ছোট্ট দেহশ্রীটি আরো কাছে টেনে, কপালে ঠেকিয়ে রেখে আকুতিভরা কন্ঠে বললো,

‘ আমিও ব্যাকুল হয়ে আছি, বোকাপাখি। তোমাকে পুণরায় হাসতে দেখার জন্য ভীষণ ভাবে ব্যাকুল হয়ে আছি। আগের মতো তোমার উদ্ভট কথায়, কান্ডে ধমক দেওয়ার ব্যাকুল হয়ে আছি। ধমক শুনে তোমার গাল ফুলিয়ে রাখা দেখার জন্য ব্যাকুল হয়ে আছি। এসব কিছু ভীষণ ভাবে মিস করছি। পুরনো তুমি টাকে মিস করছি। ভীষণ ভীষণ মিস করছি। ‘

রাশভারি, গুরুগম্ভীর মানুষটার এমন আকুতি ভরা কন্ঠের এক একটা বাণী সর্বত্র নাড়িয়ে তুলল অষ্টাদশীর। মেয়েটার কান্না পেয়ে গেল পুণরায়। এই কান্না কিসের? প্রাপ্তির! হ্যাঁ প্রাপ্তির-ই তো। যার কাছে সাফওয়ান ভাই নামক আস্ত এক ব্যাকুল প্রেমিক রয়েছে। সে তো প্রাপ্তির সুখে কাঁদবেই৷ কিন্তু এই কান্না টুকু সহ্য হলো না সাফওয়ানের। সে মাথা তুলল। সায়েরীর গালে হাত রেখে ভেজা হাতে সায়েরীর ভেজা গাল মুছল। কানের নিচে হাত গলিয়ে মুখটা আর-ও কাছাকাছি টেনে শীতল কন্ঠে বললো,
‘ শুনো মেয়ে, আমি ব্যাতিত অন্য কোনো কারণে যেন আর কাঁদতে না দেখি। এই চোখে একমাত্র আমার জন্য কান্না মানায়। অন্য কারো জন্য না। আমি চাইনা এই সুন্দর চোখদুটোর, মূল্যবান অশ্রুর কারণ আমি ব্যাতিত অন্য কেউ হোক। ‘

সায়েরী ফ্যালফ্যাল নজরে তাকিয়ে। কাজল লেপ্টে গিয়েছে চোখের। চোখের সাদা অংশ লালছে আকার ধারণ করেছে। গালের দুইপাশে লেপ্টে আছে ভেজা চুল। কিঞ্চিৎ বোচা নাকটাও হালকা লাল বর্ণ ধারণ করেছে। ফুলে উঠেছে চোখের চারপাশ। তবুও কেমন আকর্ষণীয় দেখতে লাগছে চোখগুলো। সাফওয়ানের বুক কাঁপে সম্মোহনী এই চোখের দৃষ্টিতে। বুকের ভিতর তোলপাড় করে কিছু নিষিদ্ধ আবদার। মন, মস্তিষ্কের নিরব যুদ্ধে হার মেনে সহসা তার শীতল ঠোঁট জোড়া নেমে আসলো সায়েরীর কাজল লেপ্টানো দুই চোখের পাতায়। সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ স্পর্শের মতো কেঁপে উঠলো মেয়েটা। শিরদাঁড়া বেয়ে শীতল স্রোত বয়ে গেল বোধহয়। অস্বাভাবিক গতিতে ছুটল হৃদস্পন্দন। দুইহাতে খামচি দিয়ে ধরলো সে সাফওয়ানের বুকের কাছের শার্টের অংশ। ঠকঠক কাঁপছে সে। দেহের সবটুকু ভাড় ছেড়েছে সাফওয়ানের প্রসস্থ বুকটাতে। প্রেমিক পুরুষ হতে সজ্ঞানে পাওয়া প্রথম চুমুতেই জ্ঞান হারানোর উপক্রম তার। মেঘেরাও বোধহয় লজ্জা পেলো এই আষাঢ়ে চুমু দেখে। সাফওয়ান বড় যত্নে বক্ষপিঞ্জরে আগলে ধরেছে মেয়েটাকে। সায়েরীর মস্তিষ্ক এলোমেলো তখন। চোখজোড়া নিবুনিবু। সেদিকে দৃষ্টি স্থির রেখে পুণরায় কপালে কপাল মিলিয়ে নিল সাফওয়ান। সম্মোহনী কন্ঠে আওড়াল,
‘ প্রহর শেষে আলোয় রাঙ্গা সেদিন চৈত্রমাস। তোমার চোখে দেখেছিলাম, আমার সর্বনাশ। ‘

রাত প্রায় বারোটা। এগারোটা নাগাদ বাসায় পৌঁছেছিল সায়েরী। তাকে এমন ভেজা অবস্থায় দেখলে সকলে নানান প্রশ্ন করত। তাই সে প্রথমেই কল লাগিয়েছিলো নাজরাতকে। ভাগ্যক্রমে নাজরাত মিনিট দশেক আগেই এসে গিয়েছিল। সে নিঃশব্দে দরজা খুলে দিতেই সায়েরী দ্রুত ছুটে যায় নিজের রুমের দিকে। জামা পালটে চুল বেঁধে মা’কে জানিয়ে আসে বাসার ফিরার কথা। নাজরাত যদিও প্রশ্নবিদ্ধ করেছিলো তাকে। সায়েরী সোজাসাপ্টা জানিয়েছে সাফওয়ানের সাথে এসেছে সেকথা। কিন্তু বাইকের কথা উল্লেখ না করে মিথ্যে হিসেবে বলেছে গেইট পেরিয়ে আসতে আসতে ভিজে গিয়েছে। নাজরাত কথা বাড়ায়নি। সে নিজেই অন্য এক ভাবনার মত্ত ছিলো তখন। বর্তমানে লেপের তলে ঠকঠক কাঁপছে সায়েরী। চোখ বুজে আধ ঘন্টা পূর্বের মুহুর্ত গুলোর স্মৃতি চারণ করে সে। ভাবতেই শিরশির করছে তার শরীর। লজ্জায় গাল গরম হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে দিকে ফিরে পাশের জনের সাথে লেপ্টে গেলো সে। জড়িয়ে ধরলো মোলায়েম হাতে। বিনিময়ে পাশের মানুষটাও কাছ ঘেষতেই চমকে উঠে সে। চট করে মাথা তুলে তাকায়। একই ভঙ্গিতে তাকিয়ে নাজরাত। দুজন দুজনকে দেখে ছিটকে সরে যায়। উচ্চ কন্ঠে বলে উঠে, ‘ ছি!!!!! ‘
নাজরাত তাজ্জব কন্ঠে বলে,

‘ আশ্চর্য! তুই এমন লেপ্টা লেপ্টি করছিস কেনো সায়ু? ‘
সায়েরী লজ্জায় হতভম্ব। তন্মধ্যে নাজরাতের কথা শুনে বেচারি আরো গুটিয়ে গেল। পরমুহূর্তেই আবার বলে উঠলো,
‘ তুইও তো জড়িয়ে ধরেছিলি। ‘
‘ আমি নাহয় আমার বর ভেবে ভুল করেছিলাম। কিন্তু তুই…’
সায়েরীও বিড়বিড় করে বলে,
‘ আর আমি তোর দেবর ভেবে ভুল করেছিলাম। ‘
‘ কি বললি? ‘
‘ক.. কিছুনা, কিছুনা। অনেক রাত হয়েছে। ঘুমুতে আয়। কলেজে যেতে হবে কাল। ‘
নাজরাত পুণরায় অবাক হয়। সায়েরীর কপালে,গালে হাত ছুঁয়ে বলে,

‘ তুই যাবি কলেজে? শরীর ঠিক আছে তো? ‘
‘ একদম। এইতো ঘন্টা দুই আগে শরীর, মন সবই ঠিক হয়ে গেছে। এখন ঘুমা। ‘
নাজরাত কথা বাড়ালো না আর। শুয়ে পড়লো চুপচাপ। অন্যদিকে সায়েরী ছটফট করে ঘুমের তাড়নায়। কোনো ভাবেই চোখে ঘুম ধরা দিচ্ছে না তার। এক পর্যায় শক্ত করে চোখ বুজে সে। কিন্তু এবারেও দৃশ্যপটে ভেসে উঠে আধ ঘন্টা পূর্বের দৃশ্য,

রাত এগারোটা তখন। বৃষ্টির কারণে রাস্তা অনেকটাই নিরিবিলি। চকচকে কালো বাইকের উপর বসে আছে সাফওয়ান এবং সায়েরী। ঝিরিঝিরি বৃষ্টি হচ্ছে। গ্রীন ভ্যালির রাস্তা ছেড়ে কোলাহল বিহীন রাস্তায় বাইক উঠতেই সায়েরী নিজের জড়তা-সংকোচ ভেঙে ধীরে ধীরে দুই হাতে পেট জড়িয়ে ধরে সাফওয়ানের। নিরবে মাথা এলিয়ে দেয় প্রসস্থ পিঠে। আচমকা তার এমন আচরণে সাফওয়ান বেশ অবাক হয়। গতি কমে আসে বাইকের। ভাবে নিজের ভ্রম সব। তাই সে এক হাতে ছুঁয়ে দেয় পেটের উপর থাকা কোমল হাতজোড়া। যখন অনুভব করে সবটা সত্যি, তখনই সুখ সুখ অনুভূতি বয়ে যায় বক্ষস্থলে। অধরে ফুটে চমৎকার এক হাসি। সহসা কোমল এক হাত নিজের হাতে নিয়ে, তালুতে চুমু খায় শব্দ করে। বিনিময়ে পিঠে মাথা রেখে চোখ বুজে রাখা মেয়েটাও হেসে ফেলে নিঃশব্দে। পরপরই গতি বাড়ে বাইকের। ঝিরিঝিরি বৃষ্টি এবং বাতাসের পাল্লা দিয়ে উড়ে সাফওয়ান চুল, তিন তিনটে বোতাম খোলা শার্ট। পাশাপাশি তখন এগিয়ে চলছে চার চাকার অন্য একটি গাড়ি। রাতের নিস্তব্ধতা ভেদ করে সেই গাড়ি হতে ভেসে আসে চির পরিচিত কন্ঠের, পরিচিত গানের কিছু লাইন…

Ke darkhaast hai yeh… ;
Jo aayi raat hai yeh…:
Tu meri baahon mein duniya bhula de!!!

দীর্ঘ দশদিন পর গিয়ে পরিবার এবং বন্ধুদের কাঙ্ক্ষিত চাওয়াটা পূর্ণ হলো। সকলের আদরের ছটফটে, হাসিখুশি মেয়েটা ফিরে আসলো সেই পুরনো রূপে। পূর্বের মতো আজও সকাল সকাল সায়েরীর তাড়াহুড়ো, চেঁচামেচি তে ঘরটা ঝমঝমিয়ে উঠলো একেবারে। কলেজের জন্য দেরি হচ্ছে তাদের। কিন্তু এই খুঁজে পাচ্ছে না সেই খুঁজে পাচ্ছে না, খাওয়ার সময় নেই আরও কত কি অভিযোগ তার। মাঝে আবার হাসি হাসি মুখে গুনগুনিয়ে গানও গাইছে। বিপদ কেটে গিয়ে পুণরায় মেয়েটাকে এমন হাসিখুশি দেখে চোখ জুড়িয়ে গেল সকলের। মেহরিন বেগম মনে মনে উপর ওয়ালা কে শুকরিয়া জানাতে জানাতে প্লেটে খাবার তুলে নিলেন দুই মেয়ের জন্য। সায়েরীর বাবা কাছে এসে বরাবরের ন্যায় মেয়ের জুতোর ফিতেটা বেঁধে দিলেন। আদুরে ভঙ্গিতে চুমু খেলেন কপালে। আবরারের বাবা খুশি হয়ে দুই মেয়েকেই টাকা দিলেন বকশিস সরূপ। বিগত দিনগুলোতে মেয়েটার মুমূর্ষু অবস্থা দেখতে দেখতে তারাও হাসতে ভুলে গিয়েছিলেন যেন। আজ এতগুলো দিন পর গিয়ে পূর্বের মতো মেয়েটাকে হাসতে দেখে বুক থেকে বড়সড় পাথর সরে গেল সবার।
দুজনের পেছনে প্লেট নিয়ে ছুটতে হচ্ছে মেহরিন বেগম কে। যা দেখে নাজরাত সায়েরীর মাথায় গাড্ডা মেরে বললো,

‘ আরও ঘুমা মরার মতো। এখন আমাদের পেছনে ঘর গোষ্ঠী সবাইকে ছুটতে হচ্ছে। ফার্স্ট ক্লাস যদি মিস যায় না তবে আজ দেখাচ্ছি তোকে। ‘
সায়েরী হাওয়ায় ভাসিয়ে দিল সে কথা। অতঃপর বেরিয়ে পড়লো দুজন। ভাগ্যক্রমে বাসার নিচেই পেয়ে গেল রিকশা। যেন দুজনের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে সেটা। কাল বিলম্ব না করে দুজন ছুট লাগালো সেদিকে। রিকশায় বসে স্বস্তির শ্বাস ফেললো দুজন। এরপরই নাজরাত সন্দিহান চোখে সায়েরী’র দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো,

‘ আজ হঠাৎ মেঘ না চাইতেই বৃষ্টির আগমন হলো কেনো? হুট করে এতো পরিবর্তন? ‘
সায়েরীর হাসিমুখ চুপসে গেল। আড়ালে ঢোক গিললো সে। জোরপূর্বক হেসে বললো,
‘ এটা কেমন কথা! আমাকে হাসিখুশি দেখে কি তোর ভালো লাগছে না নাকি? ‘
কথার সাথে সে কি এক অভিনয় তার। যেন পৃথিবীর সব থেকে নিস্পাপ শিশু বাচ্চাটি সে। কিন্তু নাজরাত মোটেও গলে গেল না এমন অভিনয়ে। আগের সুরেই বললো,
‘ সত্যি কথা। একদম ভালো লাগছে না দেখতে। বরং সন্দেহ সন্দেহ লাগছে। কাল রাত থেকেই দেখছি বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো বিহেব করছিস। হয়েছে কি? ‘

সায়েরী হাঁসফাঁস করে অস্বস্তি তে। কি হয়েছে এর জবাবে কি বলবে সে? এটাই যে তোর দেবর আমায় চুমু খেয়েছে? অসম্ভব! দেখা গেল একথা শুনে রিক্সা থেকে উলটে পড়ে গেল নাজরাত। ছোট বোনকে তার গুরুগম্ভীর দেবর চুমু দেওয়ার কথা শুনে অকালে প্রাণও হারাতে পারে বোধহয়। তখন আবার সাদিফ ভাইয়ের কি হবে! বেচারা তো বাসর করার আগেই বিধবা হয়ে যাবে। বিধবা! আচ্ছা, এটার কোনো মেল ভার্সন নেই নাকি?
‘ এখন আবার কি ভাবছিস? নাম রিকশা থেকে। ‘
নাজরাতের কন্ঠে ঘোর কাটলো সায়েরীর। নিজের আজগুবি চিন্তাভাবনায় বিরক্ত হয়ে কপাল চাপড়াল সে। মাথাটা গেছে একেবারে।

এখনো টিচার আসেনি ক্লাসে। তাই দুজনে অনাসয়ে ঢুকে পড়লো। মাঝামাঝি সারিতে খুনসুটি তে ব্যাস্ত চার বন্ধু বান্ধব নাজরাত এবং সায়েরী কে দেখে ভীষণ অবাক হলো। পরমুহূর্তেই খুশিতে ঝলমলিয়ে উঠলো তাদের মুখশ্রী। সায়েরী কাছে যেতেই সাফ্রিন এবং তোহা ঝাপটে ধরে তাকে। ধাক্কা খেয়ে পড়তে গিয়েও নিজেকে সামলে নিলো সায়েরী। বান্ধবীদের কান্ডে হেসে উঠলো সে। ছাড় পাওয়া মাত্র বড় করে শ্বাস ফেললো সে৷ তখন পাশ থেকে নুহাশ বুকে হাত দিয়ে দুঃখী দুঃখী গলায় বলে উঠলো,

‘ আহ, পিচ্ছি রে!!! তোরে ছাড়া জীবন আমার তামা তামা হয়ে গেছে। এই তিন রাজাকার আমারে চার আনার পাত্তা ও দে নাই। ক্রাশের সামনে বেজ্জত করছে। ক্রাশের সামনে। ভাবতে পারতেছস কত বড় জুলুম! ‘
নাটকীয় ভঙ্গিতে কথাটা বলতেই সায়েরী খিলখিল করে হাসে। হাত বুলিয়ে দেয় নুহাশের ঝাকড়া চুলে। নুহাশ এটুকু আদরে আবারো অভিযোগের পুটলি নিয়ে বসে। থমথমে মুখে বলে,
‘ তুই ছাড়া কেউ আপন না রে, কেউ আপন না। সবকটা মীরজাফর। আমার নয়া নয়া ক্রাশ টারে ভাগাইয়া দিলো। এই চার আনা চোখ কানা তো এক নাম্বারের শয়তানের নানী। হেতির বিয়ে হবে না দেখিস। ‘
একথা শুনা মাত্র ফুঁসে ওঠে তোহা। তবুও ভাব নিয়ে বলে,
‘ তোর মতো শকুনের দোয়া’য় গরু মরবে? বিয়ে তো আমার হবেই। ডজন খানিক বাচ্চাও হবে। কত ছেলে লাইন ধরে আছে জানিস? ‘

‘ ছ্যা! ছ্যা! ছ্যা! চোখের সাথে সাথে হায়া শরমও খাইছস? বাচ্চাদের সামনে কথা বলতে মুখে আটকায় না। কোথায় যে গেল এই যুগের মেয়েদের লজ্জা, শরম! ‘
সায়েরীকে ইঙ্গিত করে তোহার উদ্দেশ্যে একথা বলতেই এবার সায়েরী চোখ পাকিয়ে তাকালো। নুহাশের বাহুতে চিমটি কেটে রাগ্বত স্বরে বললো,
‘ বাচ্চা? আমি বাচ্চা? ‘
বাহুতে হাত ঘষে নুহাশ জোরপূর্বক হেসে দ্রুত গলায় জবাব দিলো,
‘ না নাহ! তুই আমার মা লাগস। ‘
তিন জনের ঝগড়া দেখে সাফ্রিন হাসছে। আয়ানের মুখেও মিটিমিটি হাসি। সে পাশ ফিরতেই নজরে আসে নাজরাতের ভাবুক মুখশ্রী। ছোট ছোট চোখে সে সায়েরীর দিকে তাকিয়ে। তা দেখে আয়ান জানতে চাইলো,
‘ তুই এমন করে আছিস কেনো? ‘
‘ ভাবছি। ‘
‘ কি? ‘

‘ কি মানে! সায়ুকে দেখে অবাক লাগছে না তোর? কাল সন্ধ্যা অব্দি মুখ গোমড়া করে ছিলো। রায়ান ভাইয়াদের বাসা থেকে ফিরার পর দেখি বেজায় হাসিখুশি। অকারণেও মিটিমিটি হাসছে, গান গাইছে। আমি সিউর কিছু তো হয়েছে ওর৷ নয়তো অকারণে এমন পরিবর্তন! ‘

নাজরাতের কথাগুলো শুনে খুকখুক করে কেশে উঠলো আয়ান। পেট মুচড়ে হাসি পেলো খুব। বহু কষ্টে লাগাম টানলো তাতে। রায়ানের জন্মদিনের অনুষ্ঠান ছিলো কাল। অর্থাৎ সাফওয়ান ছিলো সেখানে। আর দুজনের মন মালিন্য যে দূর হয়েছে তা স্পষ্ট বুঝতে পারলো আয়ান। সাফওয়ান ভাইয়ের যাদুবলে সায়েরী যে সব খারাপ স্মৃতি পেছনে ফেলে সামনে এগিয়েছে এতেই খুশি সে। ফায়াজ যদি সেই দুর্ঘটনাটা না ঘটাত, তবে আয়ান বুঝতেই পারত না তাদের এই ছটফটে, উড়নচণ্ডী বান্ধবীর ভাগ্যে সাফওয়ানের মতো দ্বায়িত্বশীল কেউ আছে। যদিও আগে থেকে কিছুটা অবগত ছিলো সে৷ কিন্তু অল্প কিছুদিন আগে সাফওয়ানের গম্ভীর মুখের চিন্তিত ভাবটা দেখে বেজায় অবাক হয়েছিলো সে। ভেবে পেলো না এমন এক গম্ভীর পুরুষ কে সায়েরীর মতো ছটফটে, বোকা মেয়েটা কি করে কাবু করে ফেললো!

ব্রেক টাইমে সকলে দিঘির পাড়ে এসে বসেছে। আয়ান সবে মাত্র গিয়ে সায়েরীর জন্য খাবার নিয়ে এসেছে। মেয়েটার ক্ষুধা লাগার শেষ নেই। কিন্তু পেট ভরে খাওয়ার অভ্যাস নেই। ফিরে এসে সে দেখলো তোহা ব্যাতিত সকলে উপস্থিত। তোহার ব্যাপারে জানতে চাইতেই সাফ্রিন জবাব দিলো,
‘ শোয়েব ভাইয়ার সাথেই তো গেলো। কি যেন জরুরি কথা বলবে তাই ডেকে নিয়ে গেছে ওকে। ‘
আয়ানে কপালে ভাঁজ পড়লো। ভাবুক কন্ঠে জানতে চাইলো,

‘ শোয়েব কে? ‘
‘ থার্ড ইয়ারের শোয়েব আহমেদ। তোহার মতোই চাশমিশ দেখতে যে। দুজন একসাথে পারফর্ম করলো না নবীন বরণে? ভুলে গেলি? ‘
মনে পড়তেই মাথা নেড়ে সায় জানালো আয়ান। তারপর গিয়ে বসলো বাকিদের সাথে। সময় কাটলো আর-ও কিছুক্ষণ। এক পর্যায়ে নুহাশ বিরক্ত হয়ে বলে উঠলো,
‘ এই আনা কানা দুইটা কিসের এতো প্রেমালাপ করছে রে? চিপায় চাপায় এত কিসের জরুরি কথা? ‘
আড্ডায় মশগুল আয়ান চমকালো হঠাৎ। “প্রেমালাপ ” শব্দটা তার কানে বাজল বেশ। কপাল কুঁচকে গেলো অদ্ভুত এক বিরক্তিতে। পরপরই শুনা গেল নুহাশের কথার জবাবে সাফ্রিনের উচ্ছ্বসিত কন্ঠ,

‘ প্রেমালাপ হলেও মন্দ হয়না। দুটোই চাশমিশ। বেশ ভালো মানাবে। ‘
একথা শুনে অদ্ভুত এক অস্থিরতা তৈরি হলো আয়ানের বুকে। মনে পড়ে গেলো মাস দুয়েক আগে তোহার করা ভালোবাসার স্বীকারোক্তি। অস্থিরতায় চিত্ত ছটফট করে উঠলো তার। দাঁড়িয়ে গেলো চট করে। বাকিরা তাকাতেই সে নির্বিঘ্ন কন্ঠে জবাব দিলো,
‘ আমি দেখে আসছি তোহাকে। ‘

বলেই গটগট পায়ে চলে গেলো বাকিদের বলা পথ ধরে। দিঘির বিপরীত দিকের জায়গাটা ঝাউগাছে ভরপুর। স্টুডেন্ট রা বসার জন্য মাঝে মাঝে কয়েকটা গাছের চারপাশে সিমেন্ট দ্বারা বাধাই করে সিট তৈরি করেছে। এমনি এক স্থানে সবে মাত্র তোহাকে ধরে বসিয়ে দিয়েছে শোয়েব। দূর থেকে এই দৃশ্য দেখে আয়ান বেজায় অবাক। স্পষ্ট দেখলো তোহার এক হাত ধরে, কাঁধ চেপে বসতে সাহায্য করেছে ছেলেটা। তোহার মুখখানা চুপসানো। চোখ খিচে রেখেছে। ঠোঁটে ঠোঁট চেপে রেখেছে সে। কি হয়ে বুঝে উঠতে না পেরে আয়ান দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেলো সেদিকে। যেতে যেতে টগবগে যুবকটার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালো সে। এমন এক টিউবলাইট মার্কা ছেলের সাথে তোহার কিসের এত গোপন আলাপ তা বুঝে উঠতে পারছে না সে। মেজাজ বিগড়ে গেছে তোহাকে ছেলেটা স্পর্শ করেছে দেখে।
অন্যদিকে শোয়েব তোহার দিকে তাকিয়ে চিন্তিত মুখে জানতে চাইলো,

‘ বেশি ব্যাথা লাগছে? বরফ নিয়ে আসব? অথবা ঠান্ডা পানি…. ‘
‘ আপনি ব্যাস্ত হবেন না। আমি ঠিক আছি। ‘ ব্যাথাতুর, ধীর কন্ঠ তোহার।
সেটা শুনে দুই পুরুষই চিন্তিত হলো। শোয়েব আরও কিন্তু বলতে নিচ্ছিলো, এমন সময় আয়ান এসে গম্ভীর কন্ঠে সুধাল,
‘ কি হচ্ছে এখানে? ‘
শোয়েব কে খানিকটা অপ্রস্তুত দেখাল। তোহা আয়ানকে দেখেও বিশেষ প্রতিক্রিয়া দেখাল না। তা দেখে আয়ানের পুরুষ সত্তা আরও গম্ভীর হলো। ছোট ছোট চোখ করে তাকালো সে তোহার দিকে। গমগমে গলায় জানতে চাইলো,

‘ কি হয়েছে তোর? ‘
তোহা জবাব দেওয়ার আগেই পাশ থেকে শোয়েব বলে উঠলো,
‘ আসলে বেখেয়ালি তে মাঠের গর্তে পা ঢুকে গিয়েছিলো। বোধহয় মচকে গেছে। ‘
এরপর পুণরায় তোহাকে উদ্দেশ্য করে বললো,
‘ আমি বরফ নিয়ে আসি? সেটা লাগালে একটু রিলিফ পাবে। নাহলে তো হাঁটতে পারবে না। ‘
আয়ান বেজায় বিরক্ত ছেলেটার এহেন উদ্বেগ পূর্ণ আচরণে।
তোহাকে বলতে না দিয়ে সে রাশভারি কন্ঠে জবাব দিলো,
‘ আপনার ব্যাস্ত না হলেও চলবে। আমার ফ্রেন্ড যেহেতু আমি দেখছি। আপনি যেতে পারেন। ‘
শোয়েব অপমানিত বোধ করে এভাবে চলে যেতে বলায়। বাকি দুজনও বুঝতে পারে সেটা। তোহা পরিস্থিতি সামাল দিতে জোরপূর্বক হেসে বলে উঠলো,
‘ আপনাকে কষ্ট করতে হবে না ভাইয়া। আমি যেতে পারবো। তাছাড়া আমার বন্ধুরা সবাই আছে। কোনো প্রবলেম হবে না। ‘

শোয়েব না চাইতেও চলে যেতে হলো তাকে। যেতে যেতে বেশ কয়েকবার সাবধান বাণী দিয়ে গেলো। সে যেতেই আয়ান হাঁটু মুড়ে বসলো তোহার পায়ের কাছে। নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলে,
‘ সায়ুর সাথে থাকতে থাকতে ওর রোগ ধরেছে নাকি তোকে? দেখে হাঁটতে পারিস না? ‘
তোহা জবাব দিলো না। পায়ের ব্যাথায় জর্জরিত সে। আয়ানও জবাবের আশায় না থেকে আচমকা ছুঁয়ে দিলো গোড়ালি ফুলে উঠা পা। চমকে উঠলো তোহা। পা সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে দ্রুত গলায় বলে উঠলো,
‘ কি করছিস কি? পায়ে হাত দিচ্ছিস কেন? ‘
‘ বিরক্ত করিস না। দেখতে দে। ‘

বলতে বলতে জোর পূর্বক হাত বাড়ালো সে৷ তোহা বারণ করলেও কান দিলো না সেদিকে। হাতের তালুতে পা তুলে গোড়ালি তে খানিকটা চাপ দিতেই অস্পষ্ট স্বরে আর্তনাদ করে উঠলো তোহা। খামচে ধরলো আয়ানের কাঁধ। চোখ ছলছল করছে তার। আয়ান বুঝলো বেশ ভালোই ব্যাথা লেগেছে। ডক্টর দেখানো ছাড়া উপায় নেই। পুণরায় উঠে দাঁড়ালো সে। নুহাশকে ফোন করে বললো তোহার ব্যাগ নিয়ে আসার জন্য। সেটার অপেক্ষায় থেকে তোহার পাশে গিয়ে বসলো সে। মনের ভিতর খচখচ করতে থাকা প্রশ্নটা এবার করেই ফেললো,

‘ সিনিয়রের সাথে কিসের এমন গোপন আলাপ? আগে তো কখনো দেখিনি কথা বলতে। ‘
সে ভেবেছিলো এবারেও ঠ্যারা কোনো উত্তর দিবে তোহা। কারণ বিগত দুই মাসে মেয়েটা সুযোগ পেলেই তাচ্ছিল্য করে কথা বলে। কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে তোহা নির্লিপ্ত কণ্ঠে জবাব দিলো,
‘ পছন্দ করে আমাকে। অনেক আগেই মেসেজের মাধ্যমে জানিয়েছিলো। রেসপন্স করিনি বলে আজ সামনাসামনি বলেছে। ‘
আয়ান থমকালো একথা শুনে। মস্তিষ্ক এলোমেলো হলো তার। কেমন এক অস্থির অস্থির ভাব শরীর জুড়ে। শ্বাস আটকে সে জানতে চাইলো,

‘ তো..কি জবাব দিয়েছিস? ‘
তোহা এবারে ফিরে তাকালো। মুখশ্রী অতি মাত্রায় স্বাভাবিক মেয়েটার। কিন্তু রাউন্ড গ্লাসের অপর প্রান্তের চোখজোড়াতে কেমন এক চাহনি। মনে হলো যেন কত কত অভিযোগ, অভিমান লুকিয়ে আছে এই চোখজোড়াতে। আয়ানের অস্বস্তি হলো খুব। চোখ সরিয়ে নিলো সে। তা দেখে হেসে ফেললো তোহা। অনুভূতিহীন কন্ঠে বললো,
‘ কি শুনতে চাস? ‘
আয়ান নিশ্চুপ। তোহা পুণরায় একই সুরে বলে,
‘ যদি বলি হ্যাঁ বলে দিয়েছি। বিশ্বাস করবি? ‘

বিষ্ময়কর নজরে ফিরে তাকালো আয়ান। তোহার মুখ দেখে বুঝার উপায় নেই যে সে মিথ্যে বলছে, না সত্যি। উত্তেজনায় আয়ানের বুক ধরফর করে। কি যেন একটা হারিয়ে ফেলছে এমন হাহাকার বুকে। ফাঁকা ঢোক গিলে সে কোনো রকমে জবাব দিলো,
‘ তুই তো বলেছিলি আমাকে ভালোবাসিস। তাহলে.. মানে এই ছেলেকে কেনো হ্যাঁ বলবি! ‘
একথা শুনে তোহা শব্দ করে হাসে। আয়ান বুঝে উঠতে পারে না হাসির অর্থ। বিষ্ময় চোখে তাকিয়ে রইলো সে। তোহা হাসিমুখেই জবাব দিলো,

‘ কোন যুগে পড়ে আছিস তুই? ভালোবাসি বলেছিলাম। বিপরীতে তুই সরাসরি রিজেক্ট করিস নি, কিন্তু বিহেভিয়ার দিয়ে ঠিকই বুঝিয়ে দিলি জবাব টা। আর আমিও বুঝে নিয়েছি। তোকে ভালোবেসেছি এটা যেমন সত্যি। তোকে না পেলে যে মরে যাব না এটাও সত্যি। তুই রিজেক্ট করেছিস বলে কি আমি মুভ অন করবো না নাকি? দেবদাস-এর পার্বতী সেজে থাকার মতো যুগ আছে এখনো? ‘
কথাগুলো আয়ানের মনে কেমন প্রভাব ফেললো তা জানে না তোহা। জানতেও চাইলো না সে। আয়ানকে এমন করে তাকিয়ে থাকতে দেখে এবার সে মুখটা কাছাকাছি আনলো। কন্ঠে খাদ নামিয়ে বললো,
‘ হঠাৎ আমাকে নিয়ে এতো ভাবার মানে কি? প্রেমে ট্রেমে পড়ে যাস নি তো? ‘
আয়ান হকচকিয়ে গেল তার আচরণে,কথায়। থতমত খেয়ে সে দ্রুত গলায় জবাব দিলো,

‘ অসম্ভব। তোকে ভালোবাসতে যাব কেনো? মেয়ের অভাব পড়েছে পৃথিবীতে? ‘
এহেন জবাবে তোহার হাসিমুখ নিভে গেল ধপ করে। স্বচ্ছ কাঁচের অপর প্রান্তে থাকা চোখজোড়া টলমল করে উঠলো। এতোক্ষণ যাবত নিজেকে নির্বিকার দেখানোর চেষ্টা করে এই শেষ সময়ে ব্যার্থ হলো সে। না চাইতেও আয়ানের এমন নির্লিপ্ততায় আঘাত পেলো বেশ। মুখ ফিরিয়ে নিলো সে অন্যদিকে। এরইমধ্যে হাজির হলো নুহাশ। কাছে এসেই সে একের পর এক প্রশ্ন করলো। বাকিরা ক্লাসে বলে আসতে পারিনি। কিন্তু সকলে বেজায় চিন্তিত অজানা কারণে৷
নুহাশের কথার সংক্ষিপ্ত জবাব দিয়ে আয়ান জানালো সে তোহাকে পৌঁছে দিতে যাচ্ছে। এসে আবার জয়েন হবে বাকিদের সাথে। একথা বলতেই তোহা নুহাশের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো,

‘ তুই একটু পৌঁছে দিয়ে আসতে পারবি আমাকে ? ‘
‘ আমি? ‘ অবাক চোখে তাকালো নুহাশ।
‘ হ্যাঁ। কেনো সমস্যা আছে? থাকলে যেতে হবে না। কষ্ট করে একটা রিক্সা ডেকে দে নাহয়। আমি একাই যেতে পারবো। ‘
নুহাশ আহাম্মকের মতো তাকিয়ে রইলো। তোহার এমন আচরণের মানে খুঁজে পেলো না সে। আয়ানের দিকে তাকাতেই দেখলো সে চোয়াল শক্ত করে কপাল কুঁচকে তাকিয়ে আছে তোহার দিকে। তোহা ফিরে তাকালো না সেদিকে। দুজনের এমন নিরবতা দেখে উপায় না পেয়ে সে রাজি হলো তোহাকে পৌঁছে দেওয়ার জন্য। ব্যাগটা কাঁধে তুলে সে ‘চল’ বলেই পা বাড়ালো। খেয়ালই করলো না যে তোহা হাঁটতে পারবে না। তোহাও রাগের মাথায় বললো না কিছু। জেদ দেখিয়ে দাঁড়িয়ে গেলো আপনা আপনি। কিন্তু কদম বাড়াতেই টনটনে ব্যাথায় আর্তনাদ করে উঠলো সে৷ পড়তে গিয়ে আয়ানের পুরুষালী হাতজোড়ায় আটকা পড়লো। নুহাশ আওয়াজ শুনে পেছনে তাকিয়ে এই দৃশ্য দেখে চমকে উঠলো। ভুল বুঝতে পেরে কপাল চাপড়াল নিজের। তোহা জোরপূর্বক আয়ানের বাহুবন্ধনী হতে ছাড়িয়ে নিতে চাইলো নিজেকে। জেদ দেখিয়ে বললো,

‘ আমি যেতে পারবো। ‘
একথা শুনে আয়ানের মেজাজ এবার সপ্তম আসমানে উঠেছে। গর্জে উঠা কন্ঠে সে বলে উঠলো,
‘ মেজাজ খারাপ করবি না তোহা। আমার সাথে জেদ দেখিয়ে নিজেকে কষ্ট দেওয়ার মানে কি? এটা জেদ দেখানোর মতো বিষয় যে তুই জেদ করবি। আর আমি গলে যাব? ‘

বাহু বন্ধনে আবদ্ধ মেয়েটার টলমল চোখ গড়িয়ে অশ্রু নামে। ঝাপসা চোখে তাকিয়ে রই আয়ানের দিকে। ভাবে, এই নিষ্ঠুর পুরুষটাকে কেনো ভালোবাসতে গেলো সে! প্রতিনিয়ত কষ্টগুলো বুকে চেপে হাসিখুশি থাকার অভিনয় করে চলেছে। আর আজ সামান্য জেদ দেখিয়েছে বলে এতো বিরক্ত আয়ান? যাক তাহলে। সব রাগ,জেদ, অভিমান, অভিযোগ মন পিঞ্জিরার দাফন করে ফেলবে সে। আর কখনো ভালোবাসার দাবি নিয়ে দাঁড়াবে না এই পুরুষের সামনে। কখনো বুঝতে দিবে না বুকের এই হাহাকার। ভুলে যাবে, সব ভুলে যাবে৷
দুজনের কথা,ব্যাবহারের আগামাথা না বুঝে বেক্কলের মতো তাকিয়ে থাকা নুহাশের ঘোর কাটে তোহার কন্ঠে।
‘ আমাকে একটু ধর। হাঁটতে পারছি না। ‘

নুহাশ দ্রুত হাত ধরে তোহার। সে ধরতেই তোহা নিজের অন্য হাতটা আয়ানের হাত থেকে একপ্রকার ঝটকা মেরে ছিনিয়ে নিলো৷ আয়ান নির্বাক চোখে তাকিয়ে রইলো শুধু। দুজন চোখের আড়াল হতেই মাথা চেপে পুণরায় বসে পড়লো সে। এলোমেলো লাগছে সব। তোহা খুব ভালো বন্ধু তার। মেয়েটাকে কষ্ট দিতে চাইনা সে। দিয়ে শান্তিতে থাকতে পারে না। কিন্তু সম্পর্কটা এখন এমন হয়ে গেছে সে স্বাভাবিক বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ হয়না এখন আর। সবটা কেমন ছন্নছাড়া হয়ে গেছে।

‘ মুখটা এমন করে রেখেছিস কেনো? কি হয়েছে হঠাৎ? ‘
ক্লাস চলাকালীন নাজরাতের ফিসফিস কন্ঠটা শুনে সায়েরী মাথা নেড়ে বুঝালো কিছু হয়নি। অথচ মুখটা চুপসে আছে তার। কলেজে আসার পর থেকেই তার অবচেতন মন খুঁজছিলো সাফওয়ানকে। কিন্তু দুর্ভাগ্য বশত দেখা মিলেনি তার। ক্লাসে বসে ইনিয়েবিনিয়ে সাফ্রিনের কাছে একথা জানতে চাইতেই সে দুঃখী গলায় বললো তার ভাইয়ের শরীরে ভীষণ জ্বর। রাতে বৃষ্টিতে ভিজেছে বলে সকাল থেকে ধুম জ্বরে গা পুড়ছে তার। একথা শুনে সায়েরী হতবিহ্বল হয়ে গেলো। সাফ্রিন যখন জানালো সাফওয়ান বৃষ্টিতে ভিজতে পারে না। অল্পতেই জ্বর হয়। একথা শুনে মেয়েটা নিভে গেল পুরোপুরি। সে জানতই না এই ব্যাপারে। জানলে কখনো সাফওয়ানকে বৃষ্টিতে ভিজতে দিত না সে। কাল কতক্ষণ যাবত বৃষ্টিতে ভিজেছে দুজন! ছাদে অবস্থানরত সময় যতক্ষণ না সায়েরী স্বাভাবিক হয়েছে, ততক্ষণ বুকে আগলে দাঁড়িয়ে ছিলো সাফওয়ান।

একটাবার বলেনি যে তার সমস্যা আছে বৃষ্টিতে। আর যখন ফিরে যাওয়ার জন্য বের হলো। তখন অবশ্য সাফওয়ান একবার বলেছিলো ছাতা নেওয়ার ব্যাপারে। কিন্তু সায়েরী নিজেই পাকনামি করে বলেছিলো বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে যাওয়ার কথা। বৃষ্টি তার অনেক পছন্দ কিনা। সেকথা শুনে সাফওয়ান বিনা বাক্যে রওনা হয়েছিলো ছাতা বিহীন। সায়েরীকে পৌঁছে দিয়ে ফিরার পথেও নিশ্চয়ই অনেক্ষন ভিজতে হয়েছে? মোট মিলিটে দেড় কি দুই ঘন্টা। উফফ্‌!! বিরক্তিতে ঠোঁটে ঠোঁট পিষল সায়েরী। অসহ্য লাগছে সব। টেবিলে মাথা রেখে চোখ বুজে ফেললো সে৷ সদ্য প্রেম জোয়ারে ভাসতে থাকা মনটা নিমেষেই বিষিয়ে উঠেছে।

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৪৩+৪৪

সাফওয়ানকে নিয়ে ভাবতে গিয়ে তার মনে পড়ে গেল কয়েক মাস আগে, নাজরাতের সাথে শপিংয়ে গিয়ে সাফওয়ানের সাথে ফিরার সময়ও বৃষ্টিতে ভিজে জ্বর হয়েছিলো সাফওয়ানের। চোখজোড়া লাল হয়ে ভয়ংকর দেখাচ্ছিলো তাকে। রাতে জ্বরের ঘোরে চুল টানছিলো মাথা ব্যাথায়। তখন সায়েরী নিজেই চুলে হাত বুলিয়ে দিয়েছিলো তার। ঘটনাগুলো মনে পড়তেই মন খারাপের মাত্রা বাড়লো তার। ছটফটে হৃদয়টা প্রশ্ন তুললো, আজও কি মাথা ব্যাথায় ছটফট করছে সাফওয়ান ভাই? জ্বরের ঘোরে অসহ্য হয়ে চুল টানছে কি? কেউ আছে নাকি পাশে চুলে হাত বুলিয়ে দেওয়ার জন্য? জ্বরের মাত্রা কতটুকু এখন? কবে ঠিক হবে? কবে পুণরায় গম্ভীর কন্ঠটা হৃদয় নাড়বে তার ছোট্ট প্রেয়সীর!

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৪৭+৪৮