অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৫৫+৫৬
সাজিয়া জাহান সুবহা
গোধূলি বিকেল। রক্তিম সূর্যটা ডুবু ডুবু প্রায়। প্রাইমারি স্কুলের মাঠের এককোনায় ঘাসের উপর শুয়ে আছে আবরার, সাফওয়ান এবং মিহাদ। মাথার নিচে দুই হাত রেখে কলমাটে আকাশটার দিকে দৃষ্টি রেখে আছে তারা। সেই সকাল থেকে এই অবধি পুরো এলাকা চষে বেড়িয়েছে তিনজনে। সেই ছোট্ট বেলার মতো। আবরার সবে মাত্র গত রাতে ফিরেছে চট্টগ্রাম থেকে। বিনা কোনো পরিকল্পনাতে আচানক মিহাদের কথাতে সে এবং সাফওয়ান বের হলো ঘুরাঘুরির উদ্দেশ্যে। সাফওয়ান হাসপাতাল হতে ফিরেছে আজ দুইদিন। শরীর সুস্থ নয় পুরোপুরি। তবুও বিনা বাক্যে রাজি হয়ে গেছে সে। তিনটে বাইক ঘুরে বেরিয়েছে বাল্যকালের স্মৃতি ফেলে আসা সকল চত্তরে।
সারাটাদিন বহু হাসি, তামাশা, আড্ডা চলেছে। কথার ফাঁকে মিহাদ হঠাৎ হঠাৎ সাফওয়ান কে নিরব ইশারায় হুমকি ছুড়েছে আবরারকে সাফওয়ান এবং সায়েরীর ব্যাপারে সবটা জানিয়ে দিবে বলে। বিনিময়ে সাফওয়ান এমন এক দৃষ্টি ছুড়ে যা দেখে অন্য কেউ হলে ভুলেও অন্য কোনো কথা মুখে আনত না। কিন্তু মিহাদ মাছি তাড়ানোর ভঙ্গিতে উপেক্ষা করে সেই দৃষ্টি। সারাটা দিনের ঘুরাঘুরির পর এই প্রাইমারি স্কুল চত্ত্বরে এসে থেমেছে তারা। যেখান থেকে পাকাপোক্ত হয়েছিলো তিন জনের বন্ধুত্ব। কত কত সোনালী স্মৃতি জমে আছে এই চত্ত্বরে! দিনগুলো আজ কোথায়! কতগুলো বছর কেটে গেল। কত কি পাল্টাল। কেবল পাল্টাল না এই তিনজনের বন্ধুত্ব।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
স্কুলের দিকে তাকিয়ে পুরনো স্মৃতি চারণ করতে করতে সাফওয়ানের আচমকা মনে পড়ে গেল বছর দশেক আগের এক স্মৃতি। প্রায় বারো – তেরো বছর আগে, পাঁচ বছরের সায়েরীকে প্রথম যেদিন স্কুলে এনেছিল তার বাবা। মেয়েটা সে কি গলা ফাটানো কান্না জুড়েছিল সেদিন। সে পড়বে না মানে পড়বে না। আবরার এবং সায়েরীর বাবা মিলে কত লোভ লাগাল। কিন্তু মেয়েটা মানল না। সদ্য হাই স্কুলে ভর্তি হওয়া এগারো বছরের সাফওয়ান নিজেও এসেছিল আবরারের সঙ্গে। নিজের বাবা ভাইকে মানাতে না পেরে ছোট্ট মেয়েটা সেদিন ঝাঁপিয়ে পড়েছিল সাফওয়ানের উপর। নাকের পানি, চোখের পানি একত্রিত করে ময়লা করে ফেলেছিল সাফওয়ানের ঝকঝকে সাদা ইউনিফর্ম। বিনিময়ে সাফওয়ান ছিল সমুদ্রের ন্যায় শান্ত। কয়েক দফা আহ্লাদী কন্ঠে বুঝানোর পর এবং সাফ্রিনের সঙ্গ পেয়ে শেষ মেশ ক্লাসে যেতে রাজি হয়েছিল মেয়েটা। কিন্তু পরবর্তীতেও বেশ অনেকগুলো দিন যাবত একই কান্ড ঘটাত রোজ সকালে। মেহরিন বেগমের ধমকে, বাবার জোরজবরদস্তি এবং আবরারের আহ্লাদ না পেয়ে সে সাফওয়ান কে দেখলেই আরও জোড়ে কেঁদে উঠত। ঠোঁট ফুলিয়ে ডাকত, ‘ সান ভাইয়া!!! ‘
দিনগুলোর কথা মনে পড়তেই ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটল সাফওয়ানের। আপনমনে আওড়াল,
‘ জন্মগত ফাঁকিবাজ! ‘
এই মধুর স্মৃতিচারণ বেশিক্ষণ ঠিকল না। কানের কাছে ব্যাঙ্গাত্মক সুরে ভেসে আসল মিহাদের কন্ঠ,
‘ কি বন্ধু! কার কথা ভেবে এত মুচকি মুচকি হাসা হচ্ছে শুনি? না মানে আমরাও একটু হাসতাম আরকি। বহুদিন হাসি না। তাই না রে আবরার? বল। ‘
সাফওয়ান কটমট চোখে তাকায়। বিরক্ত ভঙ্গিতে উঠে বসে। আবরার ভাবুক কন্ঠে বলে,
‘ কথা কিন্তু ভুল বলিসনি। আগের বার এসেছি অবদি ওকে বেশ চেঞ্জ চেঞ্জ লাগছে। ঘটনা কি? আমি কি কিছু মিস করে দিলাম? ‘
সাফওয়ান কেশে উঠল। দম ফাটা হাসি পেল মিহাদের। সাফওয়ানের চাহনিতে সে হাসি ঠেলেঠুলে বেরিয়ে আসতে চাইল। আর আবরারকে বলতে ইচ্ছে হলো,
‘ হ্যাঁ গো বন্ধু। বিরাট বড় ঘটনা মিস করে দিলি৷ তোরই নাকের নিচ দিয়ে তোর আদরের বোন আর প্রিয় বন্ধু যে প্রেমলীলা চালাচ্ছে তা মিস করে দিলি। ‘
কিন্তু আফসোস একথা বললে তার অস্তিত্ব আর খুঁজে পাওয়া যাবেনা। তবে সাফওয়ানের বিব্রত মুখটা দেখতে মজা লাগছে তার। এই ছেলেকে ভবিষ্যৎ শালা বাবুর সামনে জব্দ করতে পেরে বেশ লাগছে।
আবরার ফের একই কথা আওড়ালে সাফওয়ান খুব বিচক্ষণতার সাথে ঘুরিয়ে দিল সেটা। আবরারের মনের খচখচানি কমল না। তবুও সে আর জিজ্ঞেস করল না কিছু। সন্ধ্যা নেমেছে। তবে বাড়ি ফিরার তাড়া নেই কোনো। পরিকল্পনা আছে জিমন এবং রায়ান সহ সন্ধ্যা হতে রাত অবধি আড্ডা জমাবে কোথাও। তারপর খাবার কিনে ডিনার করবে গ্রীণ ভ্যালিতে। রাতটুকু পাঁচ বন্ধু সেখানেই কাটাবে। এই প্রস্তাব টাও মিহাদের। বিনা পরিকল্পনাতে মিহাদের কথায় রাজি হয়ে গেল বাকি দুজন। চনমনে চিত্তে জিমন এবং রায়ানকে কল করে ডাকা হলো। তারা হাজির হতেই সকলে মিলে রওনা হলো দিয়াবাড়ির উদ্দেশ্যে। সেখান থেকে বাকি রাত কাটাবে গ্রীণ ভ্যালিতে। বন্ধুদের আড্ডায় দীর্ঘ হবে আরও একটা রাত্রি।
ইরা’র নানার চিকিৎসা চলছিলো বলে গোটা একটা সপ্তাহ একমাত্র মেয়ে হিসেবে ইরা’র মা সেখানেই কাটিয়ে দিয়েছিলেন। মেয়ে হিসেবে তিনি পারেননি এমন মৃত্যুর মুখের বাবাকে রেখে চলে যেতে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে ঠিকই ছটফট করেছেন ইরা’র ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে। যেভাবেই হোক এই বাচ্চাটা অ্যাবোর্শন করাতেই হবে। তাছাড়া খুব বেশি দেরিও হয়ে যায়নি এখনো। সবে দুই মাস। তাই যা করার এখনই করতে হবে। এই পরিকল্পনা নিয়েই একটা সপ্তাহ কাটিয়ে নিজ সংসারে ফিরে এসেছেন তিনি। আগামীকাল ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট-ও নিয়ে রেখেছেন৷ ইরা’র বাবাকে এখনও জানানো হয়নি কিছু। আগে ভালোই ভালোই কাজটা মিটে যাক। পরবর্তীতে না হয় জানানো যাবে। তাছাড়া ইরা কোনো রূপ ঝামেলা করছে না এটাই স্বস্তির। নয়ত এই কাজ কখনো করতে পারতেন না। ডাক্তার রা মায়ের আপত্তিতে কখনোই বাচ্চাটাকে মেরে ফেলতে চাইবে না। তাই তিনি চাচ্ছেন ইরা স্বাভাবিক থাকতে থাকতেই যেন সবটা ঠিক ঠাক মিটে যায়।
দমবন্ধকর এই পৃথিবীর প্রতিটা প্রাণী হতে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে ইরা। বাসার কারো সাথে কথা বলে না। বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ নেই আজ বহুদিন৷ তন্মধ্যে তিন দিন আগে, মধ্যরাতে আচানক খেয়াল হয়েছে এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকার মতো কোনো প্রিয় কারণ নেই তার। যদি বলে বাচ্চাটার কথা! তবে সেও তো কেবল কয়েক দিনের অতিথি। দুইটা দিন পর-ই মেরে ফেলা হবে এই ছোট্ট প্রাণটাকে। তারপর! ইরা’র কাছে আদো কোনো কারণ থাকবে বেঁচে থাকার! এসব হাজারটা আজগুবি চিন্তা গ্রাস করে নিয়েছিল তাকে৷ ফলস্বরূপ আত্মহত্যার মতো একটা পথ বেচে নিয়েছিল নিজের জন্য৷ মরার হলে মা, বাচ্চা একত্রেই মরে যাক না। কেনো আগে পরে, এত কৌশল করে মরতে হবে! এসব ভাবনাতে নিয়েও শেষ সময়ে এসে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিল সে।
বাচ্চাটার জন্যই কি এই পিছিয়ে যাওয়া! কে জানে! তবে এই নাজায়েজ প্রাণটার প্রতিও মায়া বাড়িয়ে লাভ নেই কোনো। নিষ্ঠুর এই পৃথিবীতে মাথার উপর বাবা নামক ছায়া ছাড়া বেয়ে উঠার চেয়ে মরে যাওয়া টাই উত্তম। তার বাবা না জানুক কিছু। যে পুরুষ টা শত আকুতি মিনতি পায়ে ঠেলে দিয়েছে। সেই নিষ্ঠুর পুরুষ টা কেবল মাত্র বাচ্চার টানে ফিরে আসুক তা চায় না ইরা।
উপরন্তু কথাগুলো এতক্ষণ যাবত প্রাণপ্রিয় বান্ধবী নীতি’র নিকট ব্যক্ত করেছে ইরা। আজ হঠাৎ অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে নীতি হাজির হয়েছে ইরা’র বাসায়। মেয়েটার খোঁজ পাচ্ছে না বলেই সে ছুটে এসেছিল। কিন্তু এখানে এসে যে একের পর এক ধাক্কা খেতে হবে সেটা কে জানত! নীতি’র দিন দুনিয়া দুলছে বোধহয়। প্রথমত ইরা’র প্রেগ্ন্যাসির খবর, মিহাদের রিলেশনশিপ, জাদিদের গায়েব হয়ে যাওয়া এবং অ্যাবোর্শন সহ ইরা’র আত্মহত্যার চেষ্টা..সবটা মিলিয়ে মস্তিষ্ক ফাঁকা ফাঁকা ঠেকছে তার। কিন্তু অপরপক্ষে ইরা’কে দেখা যাচ্ছে সমুদ্রের ন্যায় শান্ত। চোখে পানির লেশ মাত্র নেই৷ নীতি’র সহ্য হলো না ইরা’র এই নির্লিপ্ততা। মেয়েটাকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে উঠলো সে। এত ঝড় ঝাপ্টা গেল মেয়েটার উপর দিয়ে অথচ সে বেস্ট ফ্রেন্ড হয়েও জানতে পারল না কিছু! ধিক্কার লাগছে নিজের উপর। ইরা স্বান্তনা দিল তাকে। নীতি’র উদ্বেগ বাড়ল বই কমল না। অস্থির চিত্তে ইরার দুই হাত চেপে ধরল সে।
‘ এখন কি করবি? সত্যিই মিহাদকে জানাবি না কিছু? ‘
ইরা শূন্য দৃষ্টিতে জানালার বাইরে তাকায়। ধীর কন্ঠে জবাব দেয়,
‘ শুধু মাত্র বাচ্চার টানে কিংবা দ্বায়িত্ব বোধে বাধ্য হয়ে সে ফিরে আসুক তা আমি চাইনা। যদি কেবল আমার জন্য ফিরত, তবে পুরনো সব তুচ্ছতাচ্ছিল্য আমি ভুলে যেতাম। কিন্তু সে তো এখন অন্য কাউতে সুখ খুঁজে নিয়েছে। আমি ওর কোথাও নেই। কোথাও না। ‘
নীতি’র গাল ভিজে ফের একবার। কিন্তু মিহাদ অন্য কারো সাথে সম্পর্কে জড়িয়েছে সেটা বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় তার। কোনো ভাবেই মেনে নেওয়া যাচ্ছে না এই কথা। তারা তো স্বাক্ষী মিহাদের সকল পাগলামি ভালোবাসার। কিন্তু শেষ মুহূর্তে ছেলেটার মন এমন পালটে যাবে তা কে জানত! নিয়তি এত নিষ্ঠুর কেন?
চিন্তায় চিন্তায় দম বন্ধ হবার উপক্রম হলো নীতির৷ এমন সময় আচমকা মাথায় আসলো সাফওয়ানের কথা। সকল সমস্যার চমৎকার সমাধান বের করে দেওয়া তুখোড় মস্তিষ্কের বন্ধুটাকে এই মুহূর্তে ভীষণ দরকার। ভীষণ!
ব্যাস্ত সড়কে সাফওয়ানের কালো রাঙা বাইকটি ছুটছে তীব্র গতিতে। মস্তিষ্ক এলোমেলো ঠেকছে তার। ইরা’র প্রেগন্যান্সির খবর শুনে, মেয়েটার মুখের দিকে তাকিয়ে থমকে গিয়েছিল সে। শুরুতেই ভাবনাতে এসেছিল বান্দরবানের সেই রাতের কথা। যেদিন মিহাদ নেশায় হুশজ্ঞান হারিয়ে বসেছিল। সাফওয়ান আন্দাজ করেছিল যে সারারাত হয়তো-বা একসাথেই ছিল দুজন। মান-অভিমান ভাঙ্গানোর জন্য শেষ চেষ্টা ছিল সেটা। কিন্তু সেই চেষ্টাটা কি বয়ে আনল আজ! সাফওয়ান আর ভাবতে পারে না কিছু। রাগ হয় মিহাদ-ইরা দুজনের প্রতি। কোনো টা কি আর বাচ্চা আছে! এক্সিডেন্টলি হয়ে গেছে মানা গেল, কিন্তু পরবর্তীতে কি পিল নেওয়াটা জরুরি ছিল না? ইরা মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়েছিল। কিন্তু মিহাদ! তার তো দ্বায়িত্ব ছিল এই গুরুত্বপূর্ণ কথাটা ইরাকে মনে করিয়ে দেওয়া। তখন ঠান্ডা মাথায় এই ছোট্ট কাজটুকু করলে আজ কি এই দুর্দশা হতো!
এই বিষয়গুলো নিয়ে সে একদফা রাগ ঝেড়েছে ইরা’র উপর। মেয়েটা লজ্জায় মুখ তুলে তাকাইনি অবধি। সাফওয়ান নিজেও বিব্রত ছিল অনাকাঙ্ক্ষিত এই বার্তাটা শুনে। কিন্তু রাগও দমন করতে পারেনি। তার চেয়েও বড় কথা আজ এই বাচ্চাটার জীবনের শেষ দিন। আগামীকাল অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়েছে ডক্টরের। অথচ তার আগমনী বার্তাটুকু-ও শুনল না তার বাবা। এই অবিচার মেনে নিতে পারল না সাফওয়ান। ইরা’কে বললো এই শেষ বারের মতো একটা চেষ্টা করতে। অন্তত মিহাদের মতামত টা জেনে নিতে। মিহাদ যদি এবারেও মূল্যায়ন না করে তবে ইরা যা চায় তা-ই হবে।
স্বয়ং সাফওয়ান দায়িত্ব নিয়েছে মিহাদকে এই খবরটা জানিয়ে দেওয়ার। সেই উদ্দেশ্য নিয়েই বের হয়েছে সে। মিহাদকে ফোন করা হয়েছে তিন বার। প্রতি বারই রিং বাজতে বাজতে কেটে গিয়েছে। উপায় না পেয়ে মিহাদের রওয়া হয়েছে মিহাদের বাসায় উদ্দেশ্যে। কিন্তু সেখানে গিয়েও মিহাদকে পেল না সে। জানতে পারল, বেশ অনেক্ষন আগেই বাসা হতে বেরিয়ে পড়েছে মিহাদ। এখন ফেরার সময়ও হয়ে গিয়েছে। অগত্যা সাফওয়ান অপেক্ষা করলো কিছু মুহূর্ত। প্রায় বিশ মিনিট পার হওয়ার পরেও মিহাদের দেখা না পেয়ে সে বেরিয়ে গেল বাসা হতে। এবং সেই মুহূর্তেই গেইটের কাছে এসে মুখোমুখি হলো মিহাদের। উষ্কখুষ্ক চুল, অসম্ভব লালছে চোখ, মুখ দেখে সাফওয়ান চমকাল। কেমন বিধ্বস্ত লাগছে দেখতে মিহাদকে। কি হয়েছে? হঠাৎ এমন লাগছে কেনো?
‘ তুই এখানে কি করছিস? ‘
‘ তোর জন্যই এসেছিলাম। ইম্পর্ট্যান্ট কথা আছে। ‘
মিহাদ ধীর কন্ঠে বলে ভেতরে গিয়ে কথা বলার জন্য। দুজন গিয়ে দাঁড়ায় বাসার ছোট্ট ছাদ টাতে।
মিহাদের চোখে মুখের হাল দেখে মনে হচ্ছে যেন কোনো ঝড় বয়ে গেছে তার উপর। সাফওয়ান জানতে চাইলেও কোনো উত্তর দিল না মিহাদ। উল্টো জানতে চাইলো সাফওয়ান অসময়ে তার বাসায় আসার কারণ। সাফওয়ান নিজেকে প্রস্তুত করে সবটা খোলে বলার জন্য। মিহাদ নিশ্চয়ই অবাক হবে খুব। সাফওয়ান নিজেও চায়, সে অবাক হোক। খুশি হোক। পুরনো সব ভুল-ভ্রান্তি মুছে নতুন ভাবে গড়ে উঠুক দুজনের সম্পর্ক।
‘ ইরা কনসিভ করেছে। অলমোস্ট তিন মাস হতে চললো। তোকে জানানো হয়নি। ওর মা চাচ্ছে বেবিকে অ্যাবোর্শন করিয়ে ফেলতে। আমার মনে হলো এই সিদ্ধান্তে তোর মতামত ম্যাটার করে বেশি। তাই তোকে জানাতে এসেছি। ‘
এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে থামল সাফওয়ান। মিহাদের প্রতিক্রিয়া দেখার অপেক্ষায় সে। আশা করেছিলো অনেক কিছু। কিন্তু মিহাদকে দেখাল একেবারে নির্লিপ্ত। কেবল এক দীর্ঘশ্বাসের শব্দ শুনা গেল। সাফওয়ান বেশ অবাক হলো তা দেখে।
‘ তুই শুনেছিস আমি কি বললাম? ‘
‘ শুনেছি। আমি জানতাম সেটা। ‘
সাফওয়ান হতবাক নয়নে তাকায়।
‘ জানতি মানে! ইরা’র প্রেগন্যান্সির খবর আগেই শুনেছিস তুই! ‘
‘ হ্যাঁ। ‘
‘ তবুও চুপ করে আছিস? আসলে তুই চাচ্ছিস টা কি মিহাদ? কেন হঠাৎ করে সুন্দর সম্পর্ক টাকে এভাবে গুড়িয়ে ফেললি? আর এই বাচ্চাটা! এটা তো তোরই। তোর কারণে গিয়ে আজ ইরা’কে সাফার করতে হচ্ছে। মেয়েটা কেমন হয়েছে দেখেছিস তুই? বেঁচে আছে সেটাই তো অনেক। তুই এমন নিষ্ঠুর সেটা কখনও ভাবিনি আমি। একমাত্র তোর কারণে আজ ইরা’র এই দুর্দশা। ‘
অনেকটা রাশভারি কন্ঠে চেঁচিয়ে উঠেছে সাফওয়ান। মিহাদের এই নির্লিপ্ততা সহ্য হচ্ছে না তার। বারবার চোখে ভাসছে ইরা’র শুকনো মুখখানা। সাফওয়ানের রাগ্বত কন্ঠের বিপরীতে মিহাদ নিজেও চেঁচিয়ে উঠল সমান তালে,
‘ আমি তো আগেই বলেছিলাম, ওকে ভালো লাগছে না তাই ব্রেকাপ করেছি। তবুও সে স্বেচ্ছায় কাছে এসেছিল। সেদিন রাতে আমি ড্রাংক ছিলাম সেটা তোরাও জানিস। আমি আউট অফ কন্ট্রোল হয়ে গেলেও ইরা তো সজ্ঞানে ছিল। ওর কি উচিৎ ছিল না আমাকে আটকানোর? আর ও কি ছোট বাচ্চা? পিল নিল না কেনো পরে? নিজ থেকে ফন্দি এঁটে এখন বাচ্চা নিয়ে আমাকে ফাঁসাতে চা.. ‘
কথাটুকু শেষ করার আগেই সাফওয়ানের শক্ত হাতের ঘুষি পড়ল মিহাদের চোয়ালে। অপ্রস্তুত থাকায়, সে ছিটকে পিছিয়ে গেল কয়েক কদম। নিজেকে সামলে পুণরায় সামনে ফিরার আগেই সাফওয়ান তেড়ে এসে কলার টেনে ধরল তার। গর্জে উঠলো হিংস্র বাঘের ন্যায়,
‘ তোর সাহস কীভাবে হলো ইরা’র ব্যাপারে এতটা নোংরা চিন্তা মাথায় আনার? মেয়েটাকে এই চিনলি তুই? এতগুলো বছর একসাথে কাটিয়ে আজ এত বড় অপবাদ দিচ্ছিস! সেদিন রাতে কি হয়েছে আমি জানতে চাই না। ইরা যদি ভুল করেও থাকে তবে সেটা কার জন্য করেছে? কেনো করেছে? কে বাধ্য করেছিল ওকে এত বড় স্টেপ নেওয়ার জন্য, বল? ‘
ক্রোধের অনলে জ্বলতে থাকা বাদামী চোখজোড়ার দিকে নিস্প্রাণ চোখে তাকাল মিহাদ। ঝাড় মেরে কলার ছাড়িয়ে নিয়ে কাঠকাঠ কন্ঠে জবাব দিল,
‘ বান্দরবান যাওয়ার চার মাস আগেই আমি সবটা ক্লিয়ার করেছিলাম ওর কাছে। আজ ওর এই দুর্দশার জন্য সম্পূর্ণ সে দায়ী। আমার কোনো হাত নেই এতে। এসব বাচ্চার হুমকি দিয়েও লাভ নেই। আমি মুভ অন করে ফেলেছি অনেক আগেই। আমার লাইফে ইরা কিংবা ওর সেই নাজায়েজ বাচ্চার কোনো জায়গা নেই। ‘
‘নাজায়েজ’ শব্দটা শুনে ফের একবার সাফওয়ানের পায়ের রক্ত মাথায় চড়ল। রাগে কিড়মিড়িয়ে উঠে পূণরায় ঘুষি বসাল সে মিহাদের নাক বরাবর। কলার টেনে চেঁচিয়ে উঠল,
‘ আমার ঘেন্না লাগছে ভাবতেই যে, তোর মত এমন নিচু মানসিকতার একজন কে নিজের বেস্ট ফ্রেন্ড বলে দাবী করতাম আমি। তুই এতটা নিষ্ঠুর হবি তা আমি কখনো কল্পনাও করিনি মিহাদ। এত গুলো মাস যাবত ইরাকে কষ্ট পেতে দেখেও তোর কথা চিন্তা করে নিজেকে দমিয়ে রেখেছিলাম। ভেবেছিলাম হয়ত কোনো কারণ আছে! কিন্তু তুই তো অন্য কাউকে নিয়ে বেশ ভালোই আছিস। তাইতো আজ ইরাকে নিয়ে বাজে মন্তব্য করতেও রুচিতে বাঁধছে না তোর। এতটা অধঃপতন হয়েছে। ছি! ‘
ধাক্কা মেরে কলার ছাড়ল মিহাদের৷ ঠোঁটের কোণায় লেগে থাকা রক্ত হাত দ্বারা চেক করে অদ্ভুত চোখে তাকাল মিহাদ। সরাসরি চোখ পড়ল সাফওয়ানের চোখে। কেমন এক দৃষ্টি সেটা। সাফওয়ানের বন্ধুসুলভ মন আবেগে টইটম্বুর হয় তা দেখে। মনে হয় যেন কত কথা জমে আছে ওই চোখ দুটোতে। কিন্তু নিজ কানে যা শুনল তাও তো ফেলে দেওয়ার মত নয়। নিজের প্রাক্তন প্রেমিকা হিসেবে না হোক, অন্তত একজন মেয়ে হিসেবেও ইরাকে নিয়ে সম্মানের সহিত কথা বলা উচিত ছিল। কিন্তু মিহাদ তা করেনি। সরাসরি ইরা’র চরিত্রে আঙ্গুল তুলেছে। মেয়েটার সেই একটা ভুল-ই চোখে পড়ল তার? এর পেছনের কারণ টা মাথায় আসল না? চার চারটা বছর যাকে চোখে হারিয়েছে। উন্মাদ প্রেমিক হয়ে মেয়েটার সর্বস্ব দখল করেছে, আজ সেই মেয়েটাকেই এমন তাচ্ছিল্য করছে মিহাদ! এই দিন কি কেউ কল্পনা করেছিল কখনো! সাফওয়ানের বিশ্বাস হচ্ছে না। সে মানতে পারছে না এই নিষ্ঠুর বাস্তবতা। এই মিহাদ তার অচেনা। সকলেরই অচেনা। মিহাদ তো কখনো তার ইরাবতীর মুখ ভাড় দেখাও সহ্য করতে পারে না। সে কি করে নিজ থেকে এত এত আঘাত দিবে মেয়েটাকে! এ হয়না! কখনো না।
আকাশ-কুসুম ভাবনা থামিয়ে লম্বা শ্বাস টানল সাফওয়ান। শান্ত কন্ঠে বললো,
‘ মিহাদ! শেষ বারের মতো জানতে চাইছি। কোনো সমস্যা থেকে থাকলে আমাকে বল। আই প্রমিস আমি সবটা ঠিক করে দিব। একটা বার বল শুধু! ‘
মিহাদ সেকেন্ড দুয়েক শূন্য দৃষ্টিতে সাফওয়ানের দিকে তাকিয়ে থেকে ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল। একটুখানি, মলিন হাসি। অতঃপর স্নান গলায় বললো,
‘ আপাতত আমার জীবনে তোর বান্ধবী আর এই অনাগত বাচ্চা বিশাল সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সমস্যা চুকে গেলেই আমি শান্তি পাব। ‘
সাফওয়ানের শান্ত মস্তিষ্ক ফের জ্বলে উঠল ধপ করে। বহু কষ্টে পূণরায় মিহাদের গায়ে হাত তুলা থেকে দমাল সে নিজেকে। কঠোর চোখে চেয়ে, বুকে পাথর চেপে বলে উঠলো,
‘ সব সমস্যা চুকে যাবে। আমি চাই যার কারণে ইরাকে পায়ে ঠেলে দিলি, অনেক দ্রুত সে ও যেন এভাবেই পায়ে ঠেলে দেয় তোকে। তখন আবার আমাদের কাছে ফিরে আসিস না যেন। আজকের পর আমি ভুলে যাব যে কোনো এক কালে তুই আমার বন্ধু ছিলি। ‘
কথাটা বলেই গটগট পায়ে সিড়ি বেয়ে নেমে গেল সাফওয়ান। মিহাদ আহত চোখে কেবল দেখে গেল। চোখদুটো আবারও লাল হয়ে উঠছে তার। ঠোঁটের কোণ হতে রক্ত গড়াচ্ছে। কিন্তু সেসবে বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই তার। দূর আকাশের দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকাল সে। আপন মনে প্রশ্ন জাগল,
‘এসবের শেষ কোথায়? ‘
বদ্ধ কেবিনে অচেতন অবস্থায় পড়ে আছে ইরা। মায়ের পরিকল্পনা মত আজ হাসপাতালে এসেছিল অ্যাবোর্শন করাবে বলে। ওয়েটিং রুমে বসে ছিল অল্প কিছুক্ষণ। রাত থেকেই অস্থিরতা, উত্তেজনায় ভেতরটা ছটফট করছিল তার। বারবার মনে হচ্ছিলো কোথায় যেন কিছু একটা ঠিক হচ্ছে না। সেই সাথে চারপাশ হতে অদ্ভুত এক শূন্যতা ঘিরে ধরেছিল তাকে। সকাল হতেই সেই শূন্যতা, অস্থিরতা, উত্তেজনা দিগুণ হলো। অতিরিক্ত চিন্তায় প্রেশার ফল হওয়ার দরুণ হুট করে জ্ঞান হারিয়ে বসল সে। বসা অবস্থায় ঢলে পড়ল মায়ের উপর। পর পরই কেবিনে নিয়ে এসেছে তাকে। চেক আপ করিয়ে সেলাইন লাগানো হয়েছে। বেশ কিছুক্ষণ পর গিয়ে অল্প অল্প চেতনা ফিরে পেল সে। নড়তে চেয়ে হঠাৎ অনুভব করল তার উদরের উপর ভারী কিছু একটা চেপে আছে। উদরে উষ্ণ তরল গড়িয়ে পড়ছে বোধহয়।
এমন কিছুই অনুভব হচ্ছে তার। অর্ধচেতন মস্তিষ্কে জোর দিল সে। বুঝার চেষ্টা করল, এসব কি হচ্ছে! কেউ কি আছে কাছে? কি রাখল তার দেহের উপর? ভারী হয়ে থাকা চক্ষুদ্বয় মেলতে চাইলে ফের একবার অনুভব করল অন্য এক স্পর্শ। ঠিক তার উদরের মধ্যভাগে৷ পরপরই আবার কপালে। উষ্ণ নিঃস্বাস এসে আছড়ে পড়ল তার মুখের উপর। অর্ধচেতন ইরা ফের একবার চেতনা হারাবার জোগাড় এই স্পর্শে। এই স্পর্শ তার চেনা। বহু, বহু বছরের চেনা। দেহের সবটুকু শক্তি সঞ্চয় করে নড়েচড়ে উঠল সে৷ ঠিক তখনই হালকা অনুভব করল নিজেকে। দেহের উপর থাকা ভারী জিনিসটা এখন আর নেই। এর কয়েক সেকেন্ড পরই চোখ মেলতে পারল ইরা। ঝাপসা দৃষ্টিতে ঘাড় ফিরিয়ে পরখ করল সে কেবিনের কোনা কোনা৷ নেই! কোথাও কেউ নেই। কিন্তু সে স্পষ্ট অনুভব করেছে এখানে কেউ ছিল। আর সেই কেউ একজন টা মিহাদ। এই ব্যাপারে শতভাগ নিশ্চিত সে৷ মিহাদ এসেছিল। এখানেই ছিল। ঠিক তার পাশে, তার দেহ জড়িয়ে।
অস্থির চিত্তে দ্রুত উঠে বসল সে৷ ফলস্বরূপ টান লেগে হাতের ক্যানোলা হতে রক্ত গড়াল। ইরা পাত্তা দিল না সেদিকে। তার হৃদস্পন্দন কাঁপছে মিহাদের উপস্থিতি ঠের পেয়ে। নিশ্চিত হওয়ার জন্য সে হাত রাখল পেটের উপর। পরনের কামিজটা এলোমেলো হয়ে ছিল। আর পেটের মাঝখানে কামিজের অংশটা ভেজা। ইরা’র সন্দেহ সঠিক হতেই আবেগে,উত্তেজনায় কেঁদে ফেলল সে। মিহাদ এসেছিল? তবে দেখা দিচ্ছে না কেন? কোথায় সে? কেন সামনে আসছে না?
কোথায় মিহাদ?
তার ভাবনার মাঝে আচনক পদধ্বনি শুনা গেল কেবিনের বাইরে থেকে। পরপরই শব্দ করে খোলে গেল দরজাটা। সদ্য প্রবেশ করা যুবকটা কে দেখে ইরা কাঁদতে ভুলে গেল। তাকিয়ে রইল ফ্যালফ্যাল নয়নে। গায়ে গাঢ় নীল শার্ট জড়ানো লম্বা, চওড়া পুরুষ টাকে দেখে সে অস্পষ্ট স্বরে ডেকে উঠল,
‘ জাদিদ! ‘
ইরা’র প্রেগন্যান্সির খবর শুনার পর বিনা কোনো বাক্য ব্যয় করে উধাও হয়ে গিয়েছিল জাদিদ। ইরা ধরেই নিয়েছিল জাদিদ ফের কখনো মুখোমুখি হবে না তার। বিয়ে তো অনেক দূরের কথা। কিন্তু তার সকল ভাবনাকে ভুল প্রমাণ করে দিয়ে আজ হঠাৎ জাদিদের দেখা পেয়ে সে বাকহারা। প্রশ্নবিদ্ধ চোখে, হতবিহ্বল হয়ে তাকিয়ে। ইরা’র এলোমেলো রূপ দেখে চোখ নামিয়ে নিল জাদিদ। গলা খাঁকারি দিয়ে নম্র কন্ঠে জানতে চাইল,
‘ আসতে পারি? ‘
ইরা’র ঘোর কাটল। দ্রুত হাতে পরনের কাপড় গুছিয়ে নিয়ে মাথা নেড়ে সম্মতি দিল সে। জাদিদ এসে বসল বেডের পাশে টোল টেনে। ইরা তখন দরজার দিকে তাকিয়ে। জাদিদ ফের কিছু বলার আগেই সে অস্থির কন্ঠে সুধাল,
‘ বাহিরে কেউ আছে? ‘
‘ না তো। ‘
‘ মা কোথায়? ‘
‘ অ্যাবোর্শনের আগে কিছু ফর্মালিটি’স পূরণ করতে হবে। আন্টি ডাক্তারের সাথে সেসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করছেন৷ ‘
‘ ওহ! আর কেউ নেই বাহিরে? কাউকে দেখেন নি? কেউ বের হয়েছিল কেবিন থেকে? কোনো ছেলে? ‘
উত্তেজিত কন্ঠের একাধিক প্রশ্ন শুনে কপালে ভাঁজ ফেলল জাদিদ। মাথা নেড়ে জবাব দিল,
‘ কেউ-ই ছিলনা। কাউকে তো দেখিনি আমি। আপনি কার কথা জানতে চাচ্ছেন, ইরা? ‘
এই প্রশ্নের বিপরীতে জবাব খোঁজে পেল না ইরা৷ মাথা নুইয়ে ফেলল অপরাধীর ন্যায়। সবটা ভ্রম ছিল তবে! মিহাদ তো আসেইনি এখানে। তাছাড়া সে কেন-ই বা আসবে! নতুন মানুষ থাকতে পুরনো ইরাবতীর মায়া কি আর টানে তাকে!
ইরাকে এমন চুপসে যেতে দেখে জাদিদ স্থীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল কিয়ৎ ক্ষন। তারপর নিম্ন কন্ঠে বলে উঠলো,
‘ শরীর কেমন আপনার? বেবি ঠিক আছে? ‘
তার কন্ঠে ইরা’র ভাবনায় ছেদ পড়ে। ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল সে। নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলে,
‘ এতদিন পর আবার ফিরে এসেছেন কেন? মুখোমুখি প্রত্যাখ্যান করতে? করতে পারেন চাইলে। আমার মত অপবিত্র মেয়ে এসবের-ই যোগ্য। ‘
‘ প্রত্যাখ্যান নয়, আপনার সব ভুল-ত্রুটি নিয়ে আপনাকে গ্রহণ করতে এসেছি। ‘
চোখে চোখ রেখে দৃঢ় গলায় জবাব দিল জাদিদ। ইরা বুঝে উঠতে পারল না এই কথার অর্থ। বুঝতে কয়েক সেকেন্ড সময় লাগল তার। তারপরই কঠোর হল দৃষ্টি। সকলে কেন তাকে নিয়ে খেলছে? সে তো জানে এই মুহূর্তে তাকে আপন করে, পাশে থাকার মত কেউ নেই। যেখানে আপন মা প্রতিনিয়ত ধুর ছাই করছে, সেখানে জাদিদ আর এমন কে! কন্ঠে কঠোরতা বজায় দেখে সে বলে উঠলো,
‘ এসব মিথ্যে বাক্য শুনিয়ে আমাকে আর বিড়ম্বনায় ফেলবেন না জাদিদ। আপনি এখন আর আমাকে বিয়ে করতে চান না সেটা আমি বুঝে নিয়েছি। আপনার প্রতি আমার রাগ, ক্ষোভ কিছুই নেই। এই জায়গায় আজ অন্য কোনো পুরুষ হলে সে-ও একই কাজটাই করত। তাই প্লিজ কথা বাড়াবেন না আর। আপনার প্রতি আমার সম্মান টাকে অন্তত নষ্ট করবেন না। ‘
‘ আপনাকে কি আমি একবারও একথা বলেছি যে আমি আপনাকে বিয়ে করতে চাই না? ‘
‘ কিছু না বলে যে চলে গিয়েছিলেন, তাতেই বুঝে গিয়েছি। ‘
‘ ভুল বুঝেছেন। ‘
‘ তবে বলুন কেন চলে গিয়েছিলেন? ‘
জাদিদ তপ্ত শ্বাস ফেলল। কন্ঠে খাদ নামিয়ে জবাব দিল,
‘ এবার সত্যিই আবেগ দিয়ে না ভেবে, বিবেক দিয়ে ভাবতে গিয়েছিলাম। ‘
ইরা তাকিয়ে থাকে। যান্ত্রিক মানবীর মতই প্রশ্ন করে,
‘ জবাবে কি পেলেন? ‘
‘ আপনাকে। ‘
মেয়েলী, উদাসীন চোখজোড়ায় প্রেমময়ী দৃষ্টি ফেলে জবাব দিল জাদিদ। ইরা স্তব্ধ হয়ে গেল এহেন উত্তরে। দৃষ্টিতে দৃষ্টিতে রেখে জাদিদ ফের বলে উঠলো,
‘ আপনাকে নিয়ে বিবেকের সকল যুক্তি আমার আবেগের কাছে হার মেনে নিয়েছে, ইরা। আমি সত্যিই নিরুপায়। পূর্বে কেবল একজনের প্রাক্তন ছিলেন বলে কিঞ্চিৎ জড়তা ছিল। কিন্তু এখন তো অন্য কারো বাচ্চা মা। এমন একজন মেয়েকে নিজের বউ করার কথা কে – ই ভাববে! আমিও দোটানায় পড়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু আপনাকে ছাড়তে হবে এই ভাবনা আমাকে শান্তি দেইনি এক দন্ড। এই কয়েক দিনে অনেক ভেবেছি। ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করেই পিছিয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু আপনাকে প্রত্যাখ্যান করতে পারিনি। আমার সেই সাহস হয়নি। আমি আপনাকে ভালোবাসি, ইরা। মাত্র ছয়-সাত মাসের পরিচয়ে কারো বিরহে এতোটা পুড়বো তা কখনো কল্পনা করিনি আমি। কিন্তু আমি পুড়েছি। আপনার বিরহে পুড়ছি প্রতিনিয়ত। স্বার্থপরতা বলুন বা অন্য কিছু, কিন্তু আমার ভালো থাকার জন্য হলেও আমার আপনাকে প্রয়োজন। ভীষণ প্রয়োজন। ‘
ইরা বিমূঢ় নজরে তাকিয়ে। জাদিদের কথার বিপরীতে সকল কথা ফুরিয়ে গিয়েছে তার। কিন্তু এত মধুর স্বীকারোক্তি আদো কি তার মন ছুঁয়েছে? উঁহু! মিহাদ নামক প্রেমিক পুরুষ টার নিখাদ ভালোবাসায় যে মেয়েটার দেহ, মন তলিয়ে ছিল দীর্ঘ চারটে বছর। সেই মেয়েটার মন অন্য কারো সামান্য স্বীকারোক্তি-তে গলে যাবে, এমনটা কল্পনা করাও নিতান্তই বোকামি ছাড়া আর কিচ্ছু নয়। ইরা’র মনে বিন্দুমাত্র দোলা লাগল না। নজর ফিরিয়ে নিল সে। পূর্বের ন্যায় কঠোর কন্ঠে বলে উঠলো,
‘ আপনি আবারও ছেলেমানুষী আচরণ করছেন জাদিদ। আপনার পরিবারের কথা চিন্তা করে দেখেছেন একটা বার? তারা যখন জানতে পারবে এসব তখন কি জবাব দিবেন তাদের কে? ‘
‘ সেটা নাহয় আমার উপর ছেড়ে দিন। আমি সবটা সামলে নিব। ‘
‘ এটা কোনো ভাবেই সম্ভব নয় জাদিদ। আপনার মা তাড়াহুড়ো করে বউ ঘরে তুলতে চাইছেন। কিন্তু এদিকে আমার কন্ডিশন দেখুন। আর কিছুক্ষণ পরেই হয়তো আমার অ্যাবোর্শন। পুরোপুরি সুস্থ হতেও অন্তত পনেরো, বিশ দিন সময় লাগবে। এই সময় চাইতে গেলে কি অযুহাত দিব আমি? কি বলব আপনার পরিবার কে? ‘
‘ সময় চাইতে হবে না। আপনি বাচ্চা টা অ্যাবোর্শন করবেন না। আপনার সাথে সাথে তারও সম্পূর্ণ দ্বায়িত্ব নিতে প্রস্তুত আমি। ‘
চমকিত নজরে তাকাল ইরা। হতবিহ্বল হয়ে বিমূঢ় স্বরে বলে উঠলো,
‘ পাগল হয়ে গিয়েছেন? শুনতে পাচ্ছেন তো কি বলছেন সেটা? ‘
বুক ফুলিয়ে শ্বাস ফেলল জাদিদ। ভেবে রাখা কথাগুলো উপস্থাপন করল বুঝদার কন্ঠে,
‘ আমি ভেবে চিন্তে, যথেষ্ট ঠান্ডা মাথায় এই প্রস্তাব রেখেছি, ইরা। আমি একজন ডক্টর। এসব ব্যাপারে আপনার চাইতে অত্যাধিক জ্ঞান আছে আমার। আপনার বয়স এখনো খুব একটা বেশি নয়। তাছাড়া এইটা আপনার ফার্স্ট প্রেগন্যান্সি। অনেক সময় ফার্স্ট প্রেগ্ন্যাসিতে বেবি মিসক্যারেজ হলে বা অ্যাবোর্শন করালে পরবর্তীতে কনসিভ করতে চাইলেও নানান কমপ্লিকেশন দেখা যায়। সবার ক্ষেত্রে হয়না ঠিক। কিন্তু অনেকের ক্ষেত্রে সব ঠিক থাকার পরেও পরবর্তীতে কনসিভ করতে পারে না।
এতে শারীরিক ক্ষতি হওয়ার চেয়েও বেশি উপর ওয়ালা অসন্তুষ্ট হয়। এজন্য আপনাকে বলছি, মিহাদের উপর ক্ষোভ আছে বলে এই বাচ্চাটাকে মেরে ফেলবেন না। বাচ্চা টা তো আপনারও অংশ। ভেবে দেখুন। আর আমি এতটাও নির্দয় নয়,ইরা৷ এই নিস্পাপ বাচ্চাটাকে নিয়ে কোনোরূপ অভিযোগ নেই আমার। ভবিষ্যতেও হবে না। আর না কখনো ওকে অবহেলা কিংবা অবজ্ঞা করব। এটুকু ভরসা আমাকে করতেই পারেন। ‘
ইরা বাকহারা। কি বলবে তা খোঁজে পেল না সে। জাদিদ উধাও হয়ে যাওয়ার পর সে ভেবেই নিয়েছিল বাচ্চাটাকে নষ্ট করে নিজেও পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করবে। কিন্তু এখন সবটা গড়লেম হয়ে যাচ্ছে। জাদিদের কথায় ভরসা খুঁজে পাচ্ছে অবচেতন মন। কিন্তু… কিন্তু এসব কি আসলেই এতটা সহজ! জাদিদের পরিবারের কাছে যখন জানাজানি হবে সবটা। তখন কোন মুখে দাঁড়াবে সে তাদের সামনে? নিজের বাবা-র মুখোমুখি হবে কীভাবে?
‘ এ..এটা হয়না জাদিদ। আপনি যতটা সহজ ভাবে ভাবছেন, পরিস্থিতি মোটেও ততটা সহজ না। সত্যিটা জানলে আপনার ফ্যামিলি কখনো মেনে নিবে না আমাকে। আর আমিও এত সহজে হাসবেন্ড হিসেবে মেনে নিতে পারব না আপনাকে। আমার সময় দরকার। নিজের জন্য, আপনাকে বোঝার জন্য, সংসার মুখী হওয়ার জন্য। আর.. যেখানে ভালোবাসা নেই সেখানে এসব হবে কীভাবে? আমি হয়তো কোনো দিন আপনাকে ভা… ‘
ইরা’র কথাটা অসম্পূর্ণ রেখে চট করে দাঁড়িয়ে পড়ল জাদিদ। হাত ঘড়িতে চোখ বোলালো ব্যস্ত ভঙ্গিতে। এরপর ঠোঁটে হাসি টেনে খানিকটা মাথা নিচু করে শীতল কন্ঠে জবাব দিল,
‘ আগে বিয়েটা করে ফেলি। ভালো তো পরেও বাসা যাবে। ‘
জাদিদের কথায় ভরসা পেয়ে সেদিন ইরা’র মা সত্যিই পিছু হেঁটে গেলেন। বেঁচে গেল ছোট্ট প্রাণ-টা। এরই মধ্যে ইরা’র আবদার রক্ষার্থে জাদিদ নিজ পরিবারকে জানাল সে সাদামাটা ভাবেই বিয়েটা করতে চায়। সেখানে কেবল দুই পরিবার আর কাছের বন্ধুবান্ধব থাকবে৷ কিন্তু জাদিদের মা একথা শুনেই বেঁকে বসলেন। উনার আদরের ছোট ছেলের বিয়ে কিনা সাদামাটা ভাবে হবে! কোন দিকে কি কম আছে নাকি উনাদের? কত কত স্বপ্ন দেখেছেন এই বিয়ে নিয়ে। কিন্তু জাদিদের জেদের কাছে সবটা হার মানল। ইরা’র বাবাকেও নত হতে হলো মেয়ের কাছে।
তবে দুই পরিবার-ই চাইলেন বিয়ে যেন তেন ভাবে হলেও বড় করে রিসেপশন এর আয়োজন যেন হয়। কত নামীদামী মানুষের সঙ্গে উঠা বসা তাদের। এত এত অর্থবিত্ত থেকেও ছোট করে বিয়ে হলে কি মুখ থাকবে সমাজে! ইরা এবং জাদিদ না চাইতেও সম্মতি দিল সেকথায়। কাল বাদ পরশু শুক্রবারে বিয়ে। মাঝে একটা দিন গ্যাপ রেখে রবিবারে রিসেপশন। ইরাদের বাড়িতেই বিয়ের আয়োজন হচ্ছে। যে বিয়ের জন্য গত ছয়টা মাস ধরে তোরজোর চালাচ্ছিল সকলে, অবশেষে মাত্র পাঁচদিনের মধ্যে তাড়াহুড়ো করেই ফিক্সড হয়ে গেল সবটা। তবুও দুই যুবক-যুবতীর মুখ হতে কবুল না শুনা অবধি শান্তি নেই দুই পক্ষের। এই বিয়েতে একের পর এক বাঁধা আসতেই থাকে। এবারেও স্বস্তি পাচ্ছে না তারা। কে জানে, শেষ অবধি সবটা ঠিকঠাক হবে কিনা।
দিনটা শুক্রবার। নিজের বেড রুমের ড্রেসিং টেবিলের সামনে টোলের উপর বসে আছে ইরা। মাত্রই নীতি এবং ইরিনা মিলে বউ রূপে সাজিয়ে দিয়েছে তাকে। তার গায়ে মেরুন রঙের মসলিন শাড়ি। সিলভার স্টোন কারুকাজের মোটা পাড়। মেরুন রঙের ঘোমটা মাথার মধ্যভাগ স্পর্শ করে ডান কাঁধের একপাশে রাখা। চুলের মাঝ বরাবর সিথি। তাতে হোয়াইট স্টোনের মাথা পট্টি। একই ডিজাইনের কানের দুল, হার এবং চুড়ি। বউদের মতো অত্যাধিক প্রসাধনী নেই মুখে। অত্যন্ত সাদাসিধে সাজ। নিজের প্রতিবিম্বের দিকে এক ধ্যানে তাকিয়ে আছে সে। এমন লাল টুকটুকে বউ সাজার কত কত স্বপ্ন ছিল তার। সে বউ সাজবে, মিহাদের বউ। মিহাদ নিজেই তো বারেবারে কানের কাছে এধরণের কথা বলে দিবাস্বপ্ন দেখাত তাকে। অথচ আজ যখন সত্যিকার অর্থে ইরা বউ সাজল, তখম মিহাদ নেই দেখার জন্য। এমন দিন কখনো স্বপ্নেও কল্পনা করেনি ইরা। কখনো না।
নিজের এই বউ রূপ দেখে আচমকা তার মনে পড়ে গেল বছর দুয়েক আগের কথা। কলেজের ফাল্গুনী অনুষ্ঠানে ইরা লাল টুকটুকে একখানা শাড়ি পড়েছিল। সেদিন পহেলা ফাল্গুন এর চেয়েও বেশি ভালোবাসা দিবস উপলক্ষে প্রায় মেয়েরাই লাল রঙ্গে সাজিয়েছিল নিজেদের। তন্মধ্যে ইরাও ছিল। কালো পাড়ের লাল শাড়ি আর খোলা চুলে সে যখন মিহাদের সম্মুখে হাজির হলো, আচানক তাকে এই রূপে দেখে বুকে হাত দিয়ে বন্ধুদের গায়ে ঢলে পড়েছিল মিহাদ। তার এহেন প্রতিক্রিয়ায় বন্ধুরা হেসে কুটিকুটি।
ইরা লজ্জায় লাল হয়ে দ্রুত প্রস্থান করেছিলো সেখান থেকে। ভবনে প্রবেশ করার পরপরই পেছন পেছন হাজির হয়েছিল মিহাদ। ফাঁকা রুমে তখন রায়ান এবং নীতির তুমুল ঝগড়াঝাটি চলছিল। ইরাকে দেখে নীতি গটগট পায়ে বেরিয়ে গেল। পেছনে বাধ্য প্রেমিকের ন্যায় ছুটছিল রায়ান। নীতির এমন রণচণ্ডী রূপ দেখে ইরাও যেতে নিলে বাঁধা পড়েছিল মিহাদের দুই হাতের বাহু বন্ধনে। ছেলেটা সন্তর্পণে ইরাকে কাছে টেনে দরজা লাগিয়ে দিয়েছিল। মিহাদের মাদকীয় চাহনিতে ইরা’র বুক কাঁপছিলো তখন। পুরুষালী হাতজোড়া তার কটিদেশ ছুঁয়ে দিতেই ছটফটিয়ে উঠেছিলো সে। অস্থির চিত্তে আর্জি জানিয়েছিল ছেড়ে দেওয়ার জন্য। কিন্তু মিহাদ কি ছাড়ার পাত্র! ছেলেটা তখন পুরোপুরি ডুবে গিয়েছিল সম্মুখের টুকটুকে লাল ইরাবতী’র ঘায়েল রূপে। ইরা ছেড়ে দেওয়ার আকুতি জানাতেই সে ইরা’র মুখে উত্তপ্ত শ্বাস ছেড়ে মাদকীয় কন্ঠে বলে উঠেছিলো,
‘ এখন ছটফট করছিস কেনো? এমন লাল টুকটুকে বউ হয়ে সামনে আসার আগে মনে ছিলনা আমি কেমন প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারি? ‘
ইরা ভাষা খুঁজে পায়নি প্রতি উত্তর করার। তার স্নিগ্ধ মুখখানার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হুট করে শাড়ির আঁচল দ্বারা মাথা ঢেকে দিয়েছিল মিহাদ। ইরা চোখ তুলে চাইল৷ লাল আঁচলের নিচে রক্তিম লাজে রাঙ্গা প্রিয়তমার মুখখানার দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারেনি মিহাদ। আঁচল ছেড়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছিল দুইহাতে। ইরা’র কানে ঠোঁট ছুঁইয়ে অস্থির কন্ঠে বলে উঠেছিলো,
‘ তোকে এত বউ বউ লাগছে কেনো! আমার বউ! আমার ইরাবতী! ‘
তার এহেন পাগলামিতে ইরা শব্দ করে হেসে উঠেছিল সেদিন। মিহাদ তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিল কেবল। ইরা ফের নিজেকে ছাড়াতে চাইলে আরও দৃঢ় করে জড়িয়ে ধরেছিল মিহাদ। অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার কথা বলতেই মিহাদ জোর গলায় বলেছিল কারো সামনে যাওয়ার দরকার নেই। তার মনোভাব এমন ছিল যেন ইরাবতীর এই রূপ একমাত্র সে ব্যাতিত অন্য কেউ দেখার অনুমতি নেই। বন্ধুরা জোরাজুরি করেও হার মেনে চলে গিয়েছিল তাদের ফেলে। ইরা’র সে কি অভিমান তখন। এই সাজসজ্জা করে লাভ টা কি হলো? এমন বদ্ধ রুমে কতক্ষণ বসে থাকবে এভাবে? অভিমানী প্রেয়সীর মান ভাঙ্গাতে মিহাদ তাকে নিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল কলেজ থেকে। রমনা পার্কের নিরিবিলি স্থানে কাটিয়ে দিয়েছিল সারাটা দিন। শেষ বিকেলে হুড তোলা রিকশায় বসে ইরা যখন মিহাদের কাঁধে মাথা রেখে বলেছিল,
‘ এত পজেসিভ হলে চলবে? এমন হলে তো সবাই ভাববে আমার প্রেমিক আমাকে সন্দেহ করে। কারো সাথে মিশতে দেয় না। ‘
মিহাদ হেসে নিজের সাথে ঝাপ্টে ধরেছিল ইরাকে। কপাল হতে চুল সরিয়ে শব্দ করে ঠোঁট ছুঁইয়ে জবাব দিয়েছিল,
‘ ইরাবতী’র ব্যাপারে মিহাদ সবসময়-ই পজেসিভ। আর এমন বউ রূপে বাইরে ঘুরাঘুরির তো প্রশ্নই আসে না। আমি তো ভেবে রেখেছি, আমাদের বিয়ের দিনও তোমাকে বউ সাজে সবার আগে আমি দেখব। আমার পরেই বাকিদের অধিকার। মনে থাকবে তো? ‘
ইরা শব্দ করে হেসে জবাব দিয়েছিল, ‘ একদম মনে থাকবে। ‘
‘বর এসেছে, বর এসেছে’ হইচই কানে বাজতেই ভাবনার জগৎ হতে বাস্তবে ফিরল ইরা। যেই বাস্তবতা বড্ড নিষ্ঠুর। বড্ড বেশি মিথ্যেবাদী। এই যে আজ মিহাদের ইরাবতী লাল টুকটুকে বউ সেজেছে। কিন্তু দেখার জন্য মিহাদ নেই। থেকেও নেই। লাল শাড়িতে অন্য ছেলেরা চোখ ভরে দেখবে বলে যেই ছেলেটা ইরাকে নিয়ে কলেজ প্রাঙ্গন হতে উধাও হয়েছিল। আজ সেই ছেলেটা স্বেচ্ছায় তার ইরাবতীকে সপে দিচ্ছে অন্য কারো হাতে। এ কথা আজও বিশ্বাস হয়না ইরা’র। আজও মনে হয় এই সকল ঘটনা নিছক এক দুঃস্বপ্ন মাত্র। হয়তো মাত্রই বিরক্তিকর শব্দে মোবাইলের রিংটোন বেজে ঘুম ভেঙ্গে যাবে তার। কল রিসিভ করতেই শুনবে মিহাদের অস্থির কন্ঠ,
‘ ইরাবতী! আমার মত মাসুম ছেলেটার ঘুম হারাম করে আর কত ভোঁস ভোঁস করে ঘুমাবে? এক্ষুনি নিচে নামো। এই অবলা ছেলেটার মন, ঘুম, শান্তি সব চুরি করার দায়ে তুমি বিরাট শাস্তি প্রাপ্য। একশোটা চুমু না দেওয়া অবধি মিহাদ শেখ হতে তোমার মুক্তি নেই। ‘
কিন্তু হায়! এমন কিছুই আর হওয়ার নয়। মাত্র কয়েক মুহুর্তের ব্যাবধানে মিহাদের ইরাবতী অন্য কারো চির সঙ্গিনী হয়ে যাবে। অথচ মিহাদ আসবে না আটকাতে। শক্ত আলিঙ্গনে আবদ্ধ করে বলবে না ‘ আমার ইরাবতী কে ছিনিয়ে নেওয়ার অধিকার কারো নেই। কারো না।’
নিষ্ঠুর এই বাস্তবতা উপলব্ধি করতে পেরে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে উঠলো ইরা। বহুদিন পর ফের মন খুলে হাউমাউ করে কাঁদল। আজ-ই শেষ কান্না। আর কখনো পাষাণ মানবটার জন্য অশ্রু বিসর্জন দিবে না সে। একফোঁটাও না।
আবরার সহ সব বন্ধুরা আজ উপস্থিত ইরাদের বাসায়। সবারই মুখ থমথমে। কেউ-ই খুশি নয় এই বিয়েতে। স্বয়ং কনে যেখানে নিজের অমতে বিয়ে করছে সেখানে বন্ধুরা কি করে খুশি থাকবে? তবে জাদিদ নামক পুরুষটার ভদ্রতায় কিঞ্চিৎ সন্তুষ্ট তারা। অন্তত ইরা’র সবটা জেনে বিয়ে করছে। আর ইরাকে ভালোবেসে বিয়ে করছে দেখেই শান্তি লাগছে তাদের।
কাজি আসার কিছু মুহূর্ত পর ইরাকে নিয়ে আসা হলো। কাজী সাহেব প্রথমেই জাদিদের মতামত নিলেন। কবুল বলতে বলার প্রায় সাথে সাথেই পরপর তিনবার কবুল বলে দিন জাদিদ। সকলে স্বস্তি নিয়ে ‘ আলহামদুলিল্লাহ ‘ পড়ল। এরপর একই রকম ভাবে ইরাকে উদ্দেশ্য করে মতামত চাইলেন কাজী। ইরা তখন স্তব্ধ মুখে বসে। মাত্র তিনটা শব্দ! এই তিন কবুল বলার সাথে সাথে সে অন্য কারো স্ত্রী হয়ে যাবে এটা সে ভাবতেই পারছে না। মাথায় কারো স্পর্শ পেতেই সে চোখ তুলে চাইল। সাফওয়ান দাঁড়িয়ে। পাশেই নীতি। সে এসে কাঁধ জড়িয়ে ধরল ইরা’র। সাফওয়ান মলিন হেসে চোখের ইশারায় কবুল বলতে বলল৷ চোখ নামিয়ে নিল ইরা। বুকে পাথর চেপে বলে দিল কবুল। একই রকমে পরপর আরও দুইবার। সকলে ফের একবার আলহামদুলিল্লাহ পড়ল। জাদিদ শ্বাস ফেলল বুক ফুলিয়ে। অবশেষে! অবশেষে এত গুলো মাসের অপেক্ষা ফুরাল তার।
সকলে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে অভিনন্দন জানিয়ে মিষ্টিমুখ করাতে ব্যস্ত হলো। ইরা ঠাঁই বসা। চোখে পানির লেশ মাত্র নেই। নির্জীব প্রাণীর ন্যায় হয়ে আছে সে। তার এমন মুখ দেখে বন্ধুদের বুক ভাড় হয়ে। নীতি কেঁদে ফেলে আড়ালে দাঁড়িয়ে। সাফওয়ান বেরিয়ে যেতে চায়। কিন্তু ইরাকে বিদায় না দিয়ে যেতেও পারছে না। অসহ্য রকমের অনুভূতি হচ্ছে। মিহাদের ভালোবাসার গভীরতার সব চেয়ে বড় স্বাক্ষী সে। ছেলেটা কেন এমন করছে তা সে জানে না। কিন্তু মিহাদের কথা ভাবতেই কষ্ট লাগছে, রাগও হচ্ছে।
বিদায় বেলায়ও ইরাকে দেখা গেল নির্লিপ্ত। তার মা আহাজারি করে বুকে জড়াল তাকে। বাবা লালছে চোখ মুচ্ছে পাঞ্জাবীর হাতায়। ইরিনারও গাল ভেজা। ইরা তাচ্ছিল্য হাসে এসব দেখে। এতগুলো মাসের তুচ্ছতাচ্ছিল্য চোখে ভাসে তার৷ সরে আসে সে পরিবারের কাছ থেকে। গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে যায় বন্ধুদের নিকট। নীতি তাকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে উঠে। এই পর্যায়ে সকলকে দেখে চোখ গুলো রক্তিম আকার ধারণ করে ইরা’র। কিন্তু তবুও কাঁদে না সে। নীতি ছাড়া মাত্র ইরা সাফওয়ানের দিকে তাকায়। ছেলেটার চোখজোড়াও রক্তিম। হয়তো আন্দাজ করে নিয়েছে ইরা’র মনের অবস্থা। তবুও জোর পূর্বক হেসে আলতো হাতে একপাশ থেকে জড়িয়ে ধরল সে ইরাকে। মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললো,
‘ পেছনের সব কিছু ভুলে জাদিদ ভাইয়ের সাথে সুখে থাক। কোনো পিছুটান রাখিস না। ‘
ইরা মন দিয়ে শুনে সেকথা। ভাবে, আসলেও পারবে তো সকল পিছুটান ভুলতে! আদো সুখী হতে পারবে কি জাদিদের সঙ্গে!
রাত সাড়ে বারোটা। সারাটা দিন বাহিরে কাটিয়ে মাত্রই ঘরে ফিরেছে মিহাদ। পকেট হতে মোবাইল, ওয়ালেট বের করে ড্রেসিং টেবিলের উপর রাখল সে। ওয়াই-ফাই কানেক্ট হওয়া মাত্র মোবাইলের একের পর এক নোটিফিকেশনের শব্দ আসল কানে। শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে অন্য হাতে মোবাইল তুলে নিল সে হাতে। প্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন চেক করে ফেসবুকে ঢুকা মাত্র নিউসফিডের সর্বপ্রথম পোস্টের ছবিটা দেখে থমকে গেল সে। ইরা’র এক ছেলে কাজিনের সাথে অ্যাড ছিল তার। সেই ছেলেটাই সুন্দর একখানা অভিনন্দন ক্যাপশন লাগিয়ে জাদিদ এবং ইরা’র বিয়ের ছবি পোস্ট করেছে। মিহাদের দৃষ্টি স্থির হলো তার ইরাবতী-তে। লাল শাড়িতে, বউ সাজে কত সুন্দর লাগছে মেয়েটাকে। ঠিক তার কল্পনার মত। উঁহু! কল্পনার চেয়েও বেশি।
মিহাদ ফ্যালফ্যাল নজরে তাকিয়ে থাকে। এরপর আচানক খেয়াল করে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা শুভ্র শেরওয়ানি পড়া সুদর্শন পুরুষটা ইরা’র হাত ধরে রেখেছে। দুজনের বাহু স্পর্শ করছে। বিন্দুমাত্র ফাঁক নেই মাঝে। ইরা নত মুখে দাঁড়িয়ে। কিন্তু জাদিদের মুখে বিশ্ব জয়ের হাসি। মুহূর্তেই বেসামাল হয়ে উঠল মিহাদের হৃদস্পন্দন। বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল তীক্ষ্ণ এক ব্যাথায়৷ ঝাপসা হলো দৃষ্টি। এই দৃশ্য সে সহ্য করতে পারছে না। পারছে না ইরাবতী কে অন্য কারো সাথে দেখতে। ভাবতেও অসহ্য লাগছে এই মেয়েটা এখন, এই রাতে অন্য এক পুরুষের সঙ্গে একাকী রুমে আছে। কন্ঠনালী ভারি হয়ে উঠল মিহাদের। বুকের ব্যাথা বাড়ল ধাপে ধাপে। মোবাইল ধরে রাখা হাতটা কাঁপতে কাঁপতে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ছুটে গেল হাত থেকে। বক্ষস্থলের তীক্ষ্ণ ব্যাথাটা ক্রমশ বাড়ছে। শ্বাস আটকে আসছে। সেই সঙ্গে মাথাও যন্ত্রণা করছে অসম্ভব রকমের। সহন ক্ষমতা লোপ পাচ্ছে দেখে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলো না সে। চোখ বুজে, বুকে হাত চেপে, হাঁটু ভেঙ্গে বসে পড়ল ফ্লোরে।
ভোর সাড়ে চারটা৷ ফুলে ফুলে সজ্জিত বিছানাটার এক কোণে গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন ইরা। পরণে এখনো গতকালের লাল শাড়িটা। গয়নাগাটি সব পড়ে আছে বেড সাইড টেবিলে। চোখে মুখে ক্লান্তির চাপ। কাল বেশ রাত অবধি বসার ঘরে মহিলাদের ভীড়ে বসে ছিল সে। প্রায় বারোটার দিকে জাদিদের ভাবী এসে রুমে রেখে গিয়েছিল তাকে। ক্লান্তিতে ইরা’র শরীর টা ভেঙ্গে আসছিলো তখন। ক্ষুধায় পেট খিচে আসছিলো। সকলের সাথে খেতে বসেছিল বলে ঠিকঠাক খাওয়া হয়নি। তাই এখন ক্ষিধে পেয়েছে খুব। দুর্বলতা নিয়ে দেহ হতে ভারী গয়না সব আলাদা করে সঙ্গে সঙ্গে শুয়ে পড়েছিল সে। সবে মাত্র চোখ বুজেছে, এমন সময় রুমে আগমন ঘটেছিল জাদিদের। শেরওয়ানির বদলে তখন সাদা সিদে টি-শার্ট, ট্রাউজার তার গায়ে।
হাতে একটি প্লেট যা ঢেকে রাখা। তার আগমনে অস্বস্তি ভীড় করেছিলো ইরা’র সর্বত্রে। জাদিদ এসেই বিনা বাক্যে হাতের প্লেট টা বাড়িয়ে দিয়েছিল ইরা’র দিকে। ইরা কোনো রূপ আপত্তি ছাড়া গ্রহণ করেছিল তা। জাদিদ তার চোখে, মুখের হাল দেখে কোনো কথা বাড়ায়নি। খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ার নির্দেশ দিয়ে নিজে গিয়ে শুয়ে পড়েছিল ডিভানে। ইরা তখন পুতুলের ন্যায় অনুভূতিহীন হয়ে বসে ছিল। অবচেতন মন ফের একবার কান্না জমালো মিহাদকে স্মরণ করে। এই রাতটা তো অন্য রকম হওয়ার কথা ছিল। মিহাদ নামক প্রেমিক পুরুষ টার সঙ্গে পূর্ণতার এই রাতটা উপভোগ করার কথা ছিল। কিন্তু আজ সবটা এলোমেলো। ভীষণ ছন্নছাড়া। গলা দিয়ে আর খাবার নামল না তার। অর্ধেক খেয়েই শুয়ে পড়েছিল সে। চোখের কোণ বেয়ে অশ্রু গড়াতে গড়াতে একটা সময় তলিয়ে গিয়েছিল গভীর নিদ্রায়।
মাত্র পাঁচ ঘন্টার অপরিপূর্ণ ঘুম ধীরে ধীরে হালকা হতে শুরু করল কারো ডাকাডাকি তে। চোখের পাতা ভীষণ ভারী হয়ে আছে ইরা’র। বিন্দুমাত্র ইচ্ছে, শক্তি নেই চোখ খোলার। কিন্তু পুরুষালী কন্ঠে তার নাম ডাক শুনেই ফট করে চোখে মেলে তাকাল সে। জাদিদ ঝুঁকে আছে তার দিকে৷ চোখে মুখে অদ্ভুত এক উত্তেজনা তার। ইরা ঘুমন্ত মস্তিষ্কে দ্রুত উঠে বসল। কিছু বুঝতে না পেরে জানতে চাইল,
‘ কি হয়েছে? ডাকছেন কেনো এত সকাল সকাল? ‘
এই প্রশ্নে জাদিদ অদ্ভুত দৃষ্টিতে সেকেন্ড দুয়েক তাকিয়ে থাকে ইরা’র পানে। ইরা লক্ষ্য করে চিকন ফ্রেমের চশমা দ্বারা আড়াল করা জাদিদের চোখ দুটো কেমন লালছে হয়ে আছে। ইরা বুঝে উঠতে পারেনা এসবের মানে। জাদিদ তার দিক থেকে দৃষ্টি সরাল। তাড়া দিয়ে বলে উঠলো,
‘ দ্রুত উঠুন, ইরা। আমাদের বেরুতে হবে। ‘
‘ এত সকালে কোথায় যাব? ‘
‘ প্রশ্ন করবেন না। ফ্রেশ হয়ে আসুন দ্রুত। প্লিজ ইরা, তাড়াতাড়ি যান। ‘
‘ আচ্ছা, আচ্ছা। শাড়িটা অন্তত… ‘
‘ সময় নেই। একটু চোখে মুখে পানি দিয়ে আসলেই হবে। দ্রুত যান। ‘
জাদিদের এহেন তাড়াহুড়ায় উপায়ান্তর না পেয়ে ইরা দ্রুত পায়ে ওয়াশরুমে ঢুকল। কোনো রকমে চোখে, মুখে পানি ছিটিয়ে বেরিয়ে আসল। জাদিদ হয়ত তার অপেক্ষাতেই ছিল। ইরা বের হতেই সে ইরা’র হাত টেনে দ্রুত পায়ে বের হয়ে গেল বাসা হতে। পরিবারের সকলেই তখন ঘুমে। কেউ দেখল না তাদের। ইরা অবুঝ নয়নে কেবল চেয়ে চেয়ে দেখল সব। জাদিদের মুখটা আজ কেমন চুপসে আছে। ইরা বারকয়েক জিজ্ঞেস করেও উত্তর পেল না কোনো। অজানা কোনো কারণে ইরা’র বুকে অদ্ভুত এক অস্থিরতা বিরাজ করে৷ শরীর ঘামছে। এত অস্থির লাগছে কেনো?
কাঁচ নামিয়ে রাখা জানালার বাহিরে দৃষ্টি ফেলল সে। অনেকটা দূর যাওয়ার পর পরিচিত রাস্তাটা চিনতে পেরে আচমকা ধুকপুক শুরু হলো তার বুকে। এই রাস্তা দিয়ে তাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে জাদিদ? এলোমেলো কিছু প্রশ্ন এসে ভীড় করল গলায়। সঙ্কোচ নিয়ে সেসব জিজ্ঞেস করতে পারল না ইরা। কিন্তু গাড়ি যত এগোচ্ছে, তার বুকের ধুকপুকানি ততই বাড়ছে। পরিচিত বাড়িগুলোর দিকে গাড়ি এগিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে তার কানে এসে ঠেকল অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন। মুহূর্তেই ধরফরিয়ে উঠল বুক। ঘাড় ফিরিয়ে চাইল জাদিদের দিকে। জাদিদ-ও মলিন চাহনি ফেলল তার দিকে। হাত বাড়িয়ে ইরা’র হাত ছুঁল। নিম্ন কন্ঠে বলল,
‘ শান্ত হোন। বেশি উত্তেজিত হওয়া আপনার শরীরের জন্য ভালো নয়। ‘
ইরা’র কানে গেল না সেকথা। সে দেখার অপেক্ষায় জাদিদ ঠিক কোন স্থানে গিয়ে গাড়ি থামাবে সেটা। মনে, প্রাণে দোয়া করছে তার কল্পনা যেন মিথ্যে হয়। কিন্তু তা হলোনা। অতি পরিচিত বাড়িটার খানিকটা দূরে এসে থামল গাড়ি। বাড়ির প্রবেশ পথে অসংখ্য মানুষের ভীড় বলে সামনে যাওয়া সম্ভব হলো না। সাত সকালে বাড়িটার সম্মুখে এত এত মানুষ দেখে ইরা’র উত্তেজনা বাড়ল। কি হয়েছে? অ্যাম্বুলেন্স কেনো এসেছে? কেনো এত মানুষ ভীড় জমিয়েছে এখানে?
জাদিদ গাড়ি থেকে নেমে ইরাকেও নামাল। হাত টেনে নিয়ে গেল বাড়ির আঙ্গিনায়। মাত্র মিনিট দুয়েকপূর্বে প্রবেশ করা অ্যাম্বুলেন্স টার দিকে ফ্যালফ্যাল নজর তাকিয়ে আছে ইরা। তার দেহ কাঁপছে ভীষণ বাজে ভাবে। আশেপাশে নজর দেওয়ার ফুরসত পেল না সে। অ্যাম্বুলেন্সের দরজা খুলে নেমে আসা, এলোমেলো রূপের মানব টাকে দেখে সে থমকে গেল। সাফওয়ান! হাটুর নিচ অবধি ঠাই পাওয়া প্যান্ট এবং টি-শার্ট পড়া সে। নিজ বাড়ির আঙ্গিনায়-ও কখনো এমন রূপে আসেনা এই ছেলে। আর আজ কিনা এখানে! কি এমন হয়েছে? সাফওয়ানের দৃষ্টি পড়ে ইরা’র দিকে। টকটকে লাল চোখ তার। দৃষ্টি জুড়ে অসহায়ত্ব,হাহাকার। পরপরই গাড়ি থেকে নেমেছে জিমন। তারও একই দশা। চোখ, মুখ ফোলে আছে। ইরা’র শ্বাস আটকে আসে কিছু একটা আন্দাজ করতে পেরে। পিছু হাঁটে সে। খামচে ধরে জাদিদের বুকের শার্ট। কন্ঠে তার এক বুক হাহাকার,
‘ আমার আবার কোন সর্বনাশ হলো, জাদিদ! ‘
জাদিদ জবাব দিতে পারেনা। টলমটল নজরে চেয়ে রই ইরা’র পানে। একহাতে আগলে রাখে তাকে। এরই মাঝে ইরা’র কানে ভেসে আসে চিরপরিচিত মহিলা কন্ঠের করুণ আহাজারি। মহিলা এলোমেলো সুরে কাঁদতে কাঁদতে দ্রুত পায়ে এগিয়ে আসছে সদর দরজার দিকে। ইরাকে দেখে ঝাপটে জড়িয়ে ধরেন তিনি। ইরা থমকাল এহেন দৃশ্যে। বুক কাঁপছে এখনো। আবুঝের ন্যায় সে সুধাল,
‘ ক..কাঁদছেন কেনো আম্মা? ম..মিহাদ! আমার মিহাদ কোথায়? ‘
মহিলার কান্নার গতি বাড়ে। এলোমেলো সুরে কিসব বললেন, কিচ্ছুটি বোধগম্য হলো না ইরা’র। পেছন থেকে দুজন মহিলা এসে টেনে নিয়ে গেলেন তাকে। সতর্ক কন্ঠে বললেন, এমন না করতে, নয়তো ফের জ্ঞান হারাবেন।
অ্যাম্বুলেন্সের সম্মুখে দেখা গেল মিহাদের বাবা এবং ছোট ভাই মাহাদী-কেও। এরই মাঝে হাজির হয়েছে রায়ান, নীতি, আবরার সহ কলেজের অনেকগুলো পরিচিত, অপরিচিত মুখ। অ্যাম্বুলেন্সের দরজার সম্মুখে মিহাদের বাবা, চাচা রা কিসব বলাবলি করার পর দুজন ওয়ার্ড বয় ভেতর হতে নামিয়ে আনল একখানা স্ট্রেচার। সফেদ কাপড়ে গলা অবধি ঢাকা নিথর দেহটা দেখে হাউমাউ কান্না জুড়ে দিল নীতি।
একই সুরের কান্না ভেসে আসলো আরও অনেকগুলো কন্ঠ হতে। জিমনের গায়ে আঁচড়ে পড়ছে মাহাদী। পনেরো বছরের কিশোর ছেলেটা উন্মাদের ন্যায় কাঁদছে। স্ট্রেচার ঘরের মূল ফটকের দিকে এগিয়ে আসছে। ঠিক সেই স্থানেই দাঁড়িয়ে জাদিদ-ইরা। মূর্তির ন্যায় দন্ডায়মান ইরা মিনিট একের এই দৃশ্যে আচমকা ঢলে পড়ল জাদিদের বাহুডোরে। জাদিদ দ্রুত আগলে নিল তাকে। মেয়েটা অচেতন হয়ে পড়েছে। ঠান্ডা হয়ে এসেছে দেহ। প্রিয়’র থেকেও প্রিয়তম মানুষটাকে এই বেশে, এই অবস্থায় দেখে সহ্য করতে পারেনি মেয়েটা। এই সহ্য ক্ষমতা তার ছিল না কখনো। তীব্র অভিমান মনে পুষেও কখনো মানুষ টার খারাপ চাইনি সে। সেখানে আজ কীকরে এই দৃশ্য মেনে নিবে সে? কীকরে বিশ্বাস করবে যে মানুষ টা আর বেঁচে নেই!
ইরা’র চোখে, মুখে পানি ছিটিয়ে জ্ঞান ফিরিয়েছে। চোখ খোলা মাত্র তার নজরে আসল নীতির ক্রন্দনরত মুখশ্রী। চারপাশে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে অনেকগুলো ক্রন্দরত সুর। ইরা উঠা মাত্র তাকে ঝাপটে ধরল নীতি। উচ্চ কন্ঠে আহাজারি করে উঠলো,
‘ ইরা রে! এ কি হয়ে গেল? আমাদের মিহাদ! মিহাদ কীভাবে চলে গেল? এ কি সর্বনাশ হলো ইরা?? ‘
এই আহাজারি ইরা’র বুকে তোলপাড় সৃষ্টি করল। নীতি কে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিল সে। এলোমেলো পায়ে ছুটে বেরিয়ে গেল রুম হতে। বসার ঘরে অসংখ্য মানুষের ভীড়। মিহাদের মা গলা ফাটিয়ে আর্তনাদ করছেন। বাবা, ভাইকে সামাল দিচ্ছে অন্যরা মিলে। মেঝেতে খাটিয়ার উপর শায়িত মিহাদের নিথর দেহটা দেখে এবার যেন হুশ হলো ইরা’র। বুক ফাটা আর্তচিৎকার দিয়ে ডাকল মিহাদের নাম ধরে। পরপরই লুটিয়ে পড়ল নিষ্প্রাণ দেহটার উপর। বুকে হাত টেকিয়ে অনবরত ডাকল। বদ্ধ চোখের পানে চেয়ে চিৎকার করে আহাজারি করে উঠলো সে,
‘ মিহাদ!! এই মিহাদ? চোখ খোল না। দ..দেখ, দেখ আমি এসেছি। তোর ইরাবতী এসেছে মিহাদ। তাকা না আমার দিকে। ‘
কান্নার জোরে কথা আটকে যাচ্ছে তার। এক একটা আর্তচিৎকার উপস্থিত সকলের হৃদয় নিংরে দিচ্ছে। মিহাদের মায়ের দিকে চোখ পড়তেই ইরা ফের আর্তনাদ করে উঠে,
‘ আম্মা! আম্মা ওকে উঠতে বলো। উঠতে বলো ওকে। ও এমনটা করতে পারে না। আমাকে ফেলে রেখে যেতে পারে না। এ কি হয়ে গেল? আ..আমি কি নিয়ে বাঁচব? আল্লাহ! ‘
ইরা’র আহাজারিতে মিহাদের মায়ের কান্না আরও জোড়ালো হলো। মিহাদের বাবা দু’হাতে মুখ ঢেকে ডুকরে উঠেছেন। জিমন, রায়ান,আবরার আলাদা আলাদা স্থানে থম মেরে বসে। অসম্ভব ফোলা সকলের চোখ মুখ। ইরা’র কান্না দেখে নীতি’র ও কান্নার বেগ বাড়ে। এসবের মাঝে একমাত্র স্থির দেখাল সাফওয়ান-কে। বসার ঘরের এককোনায় দেয়াল ঘেঁষে জমিনে বসে আছে সে। মাথা ঠেকেছে দেওয়ালে। হাতে কিসের একটা ফাইল ধরে রাখা। টকটকে লাল চোখজোড়া সেই কখন থেকে স্থির হয়ে আছে বেস্ট ফ্রেন্ড নামক মানব-টার নিথর দেহটার উপর। চোখ দুটোতে সহস্র অভিমান, অভিযোগ, নিজের ব্যার্থতা। সেই সাথে একবুক অনুশোচনা।
লাল শাড়ি পরিহিতা মেয়েটার করুণ আহাজারি অনেকেই বাঁকা চোখে দেখছে। কিন্তু অধিকাংশ মানুষেরই বুক কাঁপছে মেয়েটার আর্তচিৎকারে। উন্মাদের ন্যায় কাঁদছে মেয়েটা। নিথর দেহটা ঝাঁকিয়ে তুলছে বারবার। জাদিদ দূর হতে দেখছিল তাকে। এমন চিৎকার, চেঁচামেচি মোটেও ভালো নয় ইরা’র জন্য। এই কন্ডিশনে এমন আচরণ মোটেও শোভনীয় নয়। সুযোগ বের করে সে নীতিকে গিয়ে বলে ইরা’কে থামাতে। নীতি গাল মুছতে মুছতে এগিয়ে যায়। বুঝে উঠতে পারে না কীভাবে সামলাবে মেয়েটাকে সে! ইরা’র বাহু চেপে উঠাতে নিলেই নীতির হাত টেনে ধরল ইরা। অবুঝ কন্ঠে আওড়াল,
‘ দেখ না নীতি, মিহাদ উঠছেই না। ওকে বল না আমি এসেছি। চোখ খুলতে বল না একটু। একটাবার তাকাতে বল। ‘
নীতি কে কিছু বলতে না দিয়ে পরপরই সে আবার ঢলে পড়ল মিহাদের বুকে। গালে হাত রেখে ঝাঁকিয়ে তোলার চেষ্টা চালিয়ে ক্রন্দনরত করে আকুতি ছুড়ল,
‘ এই মিহাদ! একটাবার চোখ খোল না। এমন করিস না। অ..আমি মরে যাব তোকে ছাড়া। উঠ না মিহাদ। আমাকে আর কত কষ্ট দিবি? কেন এমন করছিস? ‘
এটুকু বলে আচমকা থেমে যায় সে। মনে পড়ার ভঙ্গিতে লাল শাড়িটার আঁচল তুলে ধরে কাঁধে। পাগলের ন্যায় হাসে। মিহাদের দিকে ঝুঁকে বলে উঠে,
‘ দেখ, দেখ আমি শাড়ি পড়েছি। লাল শাড়ি। লাল টুকটুকে বউ সেজেছি। তুই চেয়েছিলি না আমাকে বউ রূপে দেখতে। তাকা না তবে। তাকিয়ে দেখ আমাকে। এই মিহাদ? ‘
তার এহেন আচরণে নীতি সহ রায়ান, জিমন, আবরার ডুকরে উঠে। সাফওয়ান হাত মুষ্টি বদ্ধ করে, দুই হাতে মুখ ঢাকে। পুরুষালী কন্ঠের কান্নাকাটি শুনে ইরা ফ্যালফ্যাল নজরে তাকায়। ফের নজর ঘুরিয়ে আনে মিহাদের দিকে। কান্না চেপে থমথমে গলায় বলে উঠে,
‘ উঠবি না? ওহ! তুই তো চাস না আমার সাথে থাকতে। তাই তো ফিরিয়ে দিয়েছিলি। আচ্ছা, আচ্ছা আর জোর করব না তোকে। কখনো সামনে আসব না। আর কোনো অভিযোগ তুলব না। সব ভুলে যাব, সব। তুই চেয়েছিলি না আমি যেন জাদিদ কে বিয়ে করে ফেলি? দেখ, আমি সত্যিই বিয়ে করে ফেলেছি। তুই যা চেয়েছিস তা-ই করেছি। তবে এসব কেন? আর কিসের শাস্তি দিচ্ছিস আমাকে? ‘
কান্না আটকানোর চেষ্টায় থরথর কাঁপে তার থুঁতনি। কিন্তু তবুও গাল ভিজে উঠেছে। মিহাদকে নিরুত্তর দেখে পূণরায় ডুকরে উঠলো সে। বুকের উপর চাপ প্রয়োগ করে তীব্র অভিমানী গলায় আর্তনাদ করে উঠল,
‘ আজ না উঠলে তোকে আমি কক্ষনো ক্ষমা করব না মিহাদ। কক্ষনো করব না। তোর বাচ্চাকেও রাখব না নিজের কাছে। আমার জন্য না হলেও অন্তত ওর জন্য হলেও উঠ। তোর না কত কত ইচ্ছে ছিল বাচ্চা নিয়ে? তাহলে আজ তোর বাচ্চাকে ফেলে কী করে চলে যেতে পারলি? এতটা স্বার্থপর কী করে হয়ে গেলি তুই? আমি ওকে কার নামে পরিচয় দিব বল? কীভাবে মানুষ করব? কেনো এত বড় শাস্তি দিচ্ছিস তুই আমাকে মিহাদ? কেনো??? ‘
ইরা’র এহেন কথায় ছোটখাট বিস্ফোরণ ঘটল যেন। জাদিদ সহ বন্ধুরা হকচকিয়ে গেল সকলের কেমন প্রতিক্রিয়া হবে ভেবে। মিহাদের বাবা, ভাই হতভম্ব হয়ে চেয়ে। মা-ও খনিকের জন্য কান্না ভুলে গেলেন। পরপরই তিনি উন্মাদের ন্যায় ছুটে এলেন ইরা’র দিকে। বড় বড় চোখে চেয়ে প্রশ্ন করলেন,
‘ বাচ্চা! আ..আমার মিহাদের বাচ্চা? ‘
ক্রন্দনরত অবস্থায় মাথা দুলিয়ে সায় জানাল ইরা। তা দেখেই মহিলা ডুকরে উঠলেন নতুন উদ্যমে। ইরা’কে টেনে নিলেন বুকে। মিহাদের দিকে তাকিয়ে আহাজারি করে উঠলেন,
‘ এ কোন পাপের শাস্তি দিচ্ছ তুমি আল্লাহ! আমার হায়াতের বিনিময়ে হলেও আমার মিহাদকে তুমি ফিরিয়ে দাও। আমি এ দুঃখ কী করে সইব আল্লাহ! আমার ম.মিহাদ! মিহাদের বাচ্চা আসতে চলেছে। আমার ছেলেটার কপালে এ সুখ লিখলে কেন যদি আজকের এই দিন দেখানোর ছিল? ‘
উনার বুকে হাউমাউ করে কাঁদছে ইরা। শ্বাস আটকে আসছে বারে বারে। মনে হচ্ছে যেকোনো মুহূর্তে দম আটকে মরে যাবে সে। ঝাপসা নয়নে মিহাদের দিকে তাকিয়ে সে ফুঁপিয়ে বলে উঠলো,
‘ ওকে উঠতে বলো আম্মা। আমাকে এমন মাঝ সাগরে ফেলে ও কি করে চলে যেতে পারে? এমন কাপুরুষ তো ও ছিল না। ছেড়ে যাওয়ার হলে কেন এতটা ভালবাসা দিল আমাকে? কেন এত এত স্বপ্ন দেখাল? ওকে ভুল বুঝে হলেও বেঁচে থাকতাম। কিন্তু এখন…এখন ও নেই, সেটা ভাবতেই আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে আম্মা। আমি কি নিয়ে বাঁচব আম্মা? এ কোন গুনাহ’র শাস্তি দিচ্ছে আমাকে আল্লাহ! ‘
ইরা’র হাউমাউ কান্না এবং আহাজারিতে কারোরই চোখের জল বাঁধ মানছে না। পাড়া প্রতিবেশী সকলে হা হুতাশ করছে। হাস্যজ্বল, টগবগে যুবকটার এই অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু বিরাট প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে সকলের কাছে। কীভাবে মৃত্যু ঘটেছে তা জানতে চেয়ে উত্তর পেল পাশের ঘরের নিয়াজ নামক অন্য এক যুবক হতে। রাত একটার পর ওয়াশরুমে যাওয়ার জন্য উঠেছিল মাহাদী। তার রুমের ওয়াশরুম এটাচ’ড নয় বলে রুম হতে বের হতে হয়েছিলো তাকে। এত রাতেও মিহাদের ঘরে আলো জ্বলছে, দরজাও অর্ধেকের বেশি খোলা দেখে মাহাদী কৌতুহল বশত এগিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু বড় ভাইকে অচেতন অবস্থায় ফ্লোরে পড়ে থাকতে দেখে ভয়ে, উত্তেজনায় চিৎকার করে উঠেছিল সে। তার ডাকে ছুটে এসেছিল বাবা, মা। অচেতন মিহাদ এবং ফ্লোরে রক্ত বমি দেখে মায়ের জ্ঞান হারাবার জোগাড়।
উপায়ান্তর না পেয়ে মাহাদী ছুটে গিয়েছিল পাশের বাড়িতে। নিয়াজ নামক যুবকটা ছুটে এসেছিল ঘটনা শুনে। তার গাড়িতে করেই মিহাদ কে নিয়ে রওনা হয়েছিল হাসপাতালের উদ্দেশ্যে। চলতি পথে মিহাদের অবস্থা দেখে নিয়াজের অবচেতন মন আশংকা করে যে, এই ভাই সমতুল্য বন্ধুটা আর বেঁচে নেই। এবং হলো-ও তাই। হাসপাতালে নেওয়ার কিছু মুহূর্ত পরে-ই মৃত ঘোষণা করা হলো মিহাদকে। বলা হয়েছে হার্টে, ব্রেইনে অত্যাধিক চাপ প্রয়োগের ফলে প্রথমেই সে স্ট্রোক করে বসে। সেই সাথে বমি হয়, রক্ত বমি। কেবল এটুকু হলে হয়তোবা বেঁচে যেত প্রাণ-টা। কিন্তু একই সাথে হার্ট অ্যাটাকের ফলে মৃত্যু ঘটেছে মিহাদের।
অনাকাঙ্ক্ষিত এই কথাটা মেনে নিতে গিয়ে প্রথমে একবার সেখানে জ্ঞান হারিয়েছেন মিহাদের মা। হাসপাতাল প্রাঙ্গন থমথমে হয়ে উঠেছিল মাহাদীর কান্নায়। পরপরই সে ফোন করেছিল সাফওয়ান কে। মিনিট তিরিশের মাথায় সাফওয়ান এবং জিমন এসে হাজির হয়েছিল হাসপাতালে। জাদিদ যেই হাসপাতালের ডক্টর, মিহাদকেও সেটাতেই নিয়ে গিয়েছিল। সাফওয়ান আসার পর দুজন ডক্টরের সাথে তুমুল কথা কাটাকাটি হয়েছিল। এক পর্যায়ে একজন এসে একটা ফাইল এগিয়ে দিয়েছিল সাফওয়ানের দিকে। সেটাতে কি এমন ছিল কে জানে। কিন্তু ফাইলে চোখ বুলিয়ে ডাক্তারের কথাগুলো শুনার পর থেকে নির্জীব প্রাণীর ন্যায় স্তব্ধ হয়ে গিয়েছে সাফওয়ান। বন্ধুর শোকে কাঁদতে অবধি ভুলে গিয়েছে যেন।
বেলা ছয়টা বাজে এখন। কলেজের অসংখ্য স্টুডেন্ট এসে ভরে গিয়েছে চারিদিকে। মৃত দেহ বেশিক্ষণ রাখা ভালো নয়, তাই সকাল ৮টায় জানাজা ঘোষণা করা হয়েছে। শেষ গোসলের জন্য সকল আয়োজন শেষে পুরুষ-রা এসে দেহ নিয়ে যাবে বলে ঘরে আসতে চাইলেই মহিলারা মিলে মিহাদের মা এবং ইরাকে টেনে নিয়ে যেতে চাইল ভেতরের ঘরে। ইরা মেনে নিতে পারে না সেটা। মিহাদের পাশ হতে নড়তেও নারাজ সে। কিন্তু তাকে জোর করে টেনে নিলো তিনজন। মেয়েটা তখন উন্মাদের ন্যায় চিৎকার চেঁচামেচি জুড়ে দিল। এমন চিৎকারে আকস্মিক টান পড়ল পেটে। কুঁকিয়ে উঠল সে ব্যাথায়। পরপরই গাল ভরে বমি করে দিল। মুহূর্তেই নাক সিটকে সরে গেল সকলে।
এগিয়ে আসল নীতি এবং জাদিদ। ইরা আর ধরে রাখতে পারল না দেহের ভার। লুটিয়ে পড়তে গেলে জাদিদ পাজা কোলে তুলে নিল তাকে। জাদিদের কাছে মোটেও সুবিধার ঠেকল না ইরা’র অবস্থা৷ বিন্দুমাত্র সময় অপচয় না করে সে বেরিয়ে গেল হাসপাতালের উদ্দেশ্যে। ইরা’র হাল দেখে তার মনে হচ্ছে না বাচ্চাটা বাঁচবে। কিন্তু এমন হলে যে ইরাকেও বাঁচানো মুশকিল হয়ে যাবে। কি করবে জাদিদ! আর কত পরীক্ষা নিবে উপর ওয়ালা এই মেয়ের কাছ থেকে? ইরা’র অচেতন মুখটার দিকে তাকিয়ে জাদিদের অবচেতন মন মিহাদকে স্মরণ করে বলে উঠে,
‘ যার সুখের জন্য নিজের সব সুখ পায়ে ঠেলে দিলে, আজ তাকে অন্য কারো সাথে মেনে নিতে গিয়েই চিরতরে হারিয়ে গেলে মিহাদ? ‘
পরপরই সে নজর দিল ইরা’র উদরে। ছোট্ট প্রাণ টাকে উদ্দেশ্য করে বললো,
‘ তোমার আমানত আমি রক্ষা করতে পারব তো? আজ ওর কিছু হলে আমি সে নিজের কাছেই হেরে যাব। এত বড় দ্বায়িত্ব আমাকে কেন দিয়ে গেলে? যদি আমি হেরে যায়? ‘
মিহাদের খাটিয়া তুলে বাহিরে নিয়ে যাওয়ার জন্য কয়েক জন মিলে এগিয়ে আসল। এই দৃশ্য দেখে দূর এক কোণায় স্তব্ধ মুখে বসে থাকা ছেলেটা নির্লিপ্ত পায়ে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।
ভোর হতেই আকাশের অবস্থা বেজায় খারাপ। সাড়ে ছয়টা নাগাদ শুরু হলো তুমুল বৃষ্টি। মিহাদ নামক মানবটার বিদায় বেলায় প্রকৃতিও যেন এক বুক হাহাকার নিয়ে অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছে। এই বৃষ্টির মাঝেই শেষ গোসলের কার্যালয় শেষ করেছে বহু কষ্টে। সময় গাড়িয়ে সাড়ে সাতটা পেরিয়ে গিয়েছে। মহিলাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে শেষ দেখা দেখে ফেলার জন্য। সকলের কান্নায় পরিবেশ আরও বেশি ভারী হয়ে উঠেছে। মিহাদের মায়ের গলা জড়িয়ে হাউমাউ করে কাঁদছে নীতি। বেশিক্ষণ দেখার সুযোগ পেল না তারা। তার আগেই খাটিয়া নিয়ে চলে গেল মসজিদ প্রাঙ্গণে। বিগত এক ঘন্টায় সাফওয়ানের খোঁজ করতে করতে অস্থির সকলে।
জানাজার জন্য কাতারে দাঁড়িয়েও বন্ধুরা ইমাম সাহেব কে অনুরোধ করল আরেকটু অপেক্ষা করার জন্য। হাজার টা কল করেও সাফওয়ানের যখন খোঁজ মিলল না, তখন গিয়ে আবরার নির্দেশ দিল আর অপেক্ষা না করার। বলল, এই জানাজা এবং এই মানবকে মাটি দেওয়ার মতো রূহ নেই সাফওয়ান নামক বন্ধুটার। তাই তো পালিয়ে গিয়েছে সে। সাহস থাকলে এতক্ষণে নিশ্চয়ই চলে আসত।
আবরারের কথায় বন্ধুরা আরও একবার ভেঙ্গে পড়ে। পুরুষালী মনে পাথর চেপে নামাজ আদায় করে প্রাণ প্রিয় বন্ধুটার নিথর দেহ সম্মুখে রেখে। এরই মাঝে বৃষ্টি থামে। ঝকঝকে আকাশে কড়া সূর্য উঠে। সকলের পাঞ্জাবি শুকিয়ে যায় রোদের ঝলকানিতে। ভেজা মাটিতে প্রিয় বন্ধুটার দেহ শায়িত করতে গিয়ে ডুকরে কাঁদে তিন বন্ধু। সকলে বিদায় নিলেও সদ্য কবর দেওয়া উঁচু মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে আবরার শব্দ করে কেঁদে ফেলে। পেছন হতে তার কাঁধে হাত রেখে ঠোঁট চেপে নিজেদের সামলানোর বৃথা চেষ্টা চালায় জিমন এবং রায়ান।
সবে মাত্র তারা গুরুস্থান হতে বেরিয়েছে, এমন সময় জিমনের কাছে কল আসল জাদিদের। কল রিসিভ করা মাত্র অপর প্রান্ত হতে ভেসে আসল জাদিদের অস্থির, অশান্ত কন্ঠ। ইরা’র কন্ডিশন ঠিক নেই। বেবির হার্টবিট মিসিং। কিছুতেই হার্টবিট শুনা যাচ্ছে না। একের অপর এক ধাক্কায় নড়েবড়ে অবস্থা তাদের। এ কোন পরীক্ষায় ফেলেছে উপর ওয়ালা! ইরা নামক রমনীকে কেন এমন কষ্টে ফেলেছে? এই বাচ্চার কিছু হলে ইরাকে বাঁচানো সম্ভব না। একদম সম্ভব না। একে অপরের মুখ চাওয়া চাওয়ি করে তারা ছুটে গেল মিহাদের বাড়ির দিকে। যার যার বাইক নিয়ে রায়ান দ্রুত নীতিকে নিয়ে রওনা দিল হাসপাতালের উদ্দেশ্যে।
জাদিদ ইরাকে নিয়ে গিয়েছিল নিজ হাসপাতালে। হাসপাতালের এম ডি তার আপন বড় ভাই। বাবা এবং বড় ভাবি-ও একই হাসপাতালে কর্মরত। ইরাকে নিয়ে আসার পরপরই ইমার্জেন্সি-তে ভর্তি করা হয়েছে। বাচ্চার হার্টবিট শুনা যাচ্ছে না মানে বাচ্চাটা আর বেঁচে নেই৷ এমনই আশংকা করেছিলেন গাইনী। একথা শুনে জাদিদের অস্থির অবস্থা তখন। মনে হচ্ছে যেন দম গলায় আটকে আছে। দিকবিদিকশুন্য হয়ে সে শুরুতেই ফোন দিল তার ভাবি-কে। যিনি একজন গাইনোলজিস্ট। জরুরি তলবে আসতে বলার কিছু মুহূর্ত পর ভাই,ভাবি দুজন-ই হাজির। পেশেন্ট সিটে ইরাকে দেখে বিষ্ময়ে কিংকর্তব্যবিমুঢ় হলো দুজন। জাদিদ তাড়া দিচ্ছে বলে মনের মাঝে জন্ম নেওয়া প্রশ্ন সব গিলে নিল তারা। চিকিৎসা করে দেখার বেশ অনেক্ষণ পর গিয়ে পূণরায় উপলব্ধি হলো ছোট প্রাণটার অস্তিত্ব। মৃদু মৃদু তালে ঢিপঢিপ ধ্বনি তুলে জানান দিচ্ছে সে নিজের অস্তিত্বের। একথা শুনে আবেগে জাদিদের চোখ টলমল করে উঠল। এই বাচ্চাটার কিছু হলে আজ সে পুরোপুরি হেরে যেত নিজের কাছে। কেউ একজন কে যে কথা দিয়েছিল সে৷ তবে কীভাবে খিয়ানত করতো এই আমানতের!
কিন্তু আবেগের তাড়নায় মস্ত বড় এক ভুল করে বসল সে। পরিবার যেনে গেল ইরা’র প্রেগন্যান্সির ব্যাপারে। তার মা, বাবা দুজনই হাসপাতালে হাজির। একই সাথে হাজির হয়েছে আবরার,নীতি,রায়ান এবং জিমন। ইরা’র ও জ্ঞান ফিরল ঠিক সেই মুহূর্তে। মিহাদের কথা স্মরণ হতেই মেয়েটা ছটফট শুরু করলো। উচ্চ কন্ঠে কেঁদে কেঁদে আহাজারি করছে। তার এহেন আচরণে, অন্য এক ছেলের জন্য আহাজারি শুনে জাদিদের মা, ভাবি বুঝে নিল অনেক কিছু। ঘৃণায় গা ঘিনঘিন করে উঠল দুজনের। জাদিদের সঙ্গে আলাপ করতে চাইলেও মায়ের উদ্দেশ্য বুঝে সেই সুযোগ দিলনা জাদিদ। কেবল জানাল রিসেপশন যেন ক্যান্সেল করা হয়। এই কথায় ক্ষিপ্ত হলো তার বাবা। হাসপাতালে ঝামেলা করতে চাইলেন না বলেই চুপ রইলেন। কিন্তু মনে মনে জাদিদের উপর বেশ ক্ষিপ্ত উনারা। সবটা বুঝতে পেরে জাদিদ বেজায় চিন্তিত। তার পরিবারের সকলে বেশ দাম্ভিক। এত সহজে ইরাকে মেনে নিবে বলে মনে হয়না। ঘুমের ইনজেকশন দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছে ইরাকে। তার দিকে তাকিয়ে গভীর চিন্তায় মত্ত হলো জাদিদ। চিন্তায়, চিন্তায় মাথা ধরে গিয়েছে তার। বুঝে উঠতে পারছে না কীভাবে কি সামলাবে।
টানা তিন ঘন্টা তুমুল বৃষ্টি হওয়ার পর বেলা সাড়ে আটটার পর করে বৃষ্টি থেমেছিল। আকাশে দেখা দিয়েছিল ঝলমলে রোদ। এখন বেলা ন’টা বাজে। পূণরায় ধূসর মেঘে ঢেকে গিয়েছে আকাশ। আধ ভেজা শরীরে গ্রীণ ভ্যালিতে হাজির হয়েছে সায়েরী। সকাল সাতটার দিকে মিহাদের বাড়ি আসতে গিয়ে পুরোপুরি ভিজে গিয়েছিল সে এবং বন্ধুরা। শরীর পুরোপুরি শুকায়নি এখনো। কাঁচা ঘুম ভেঙ্গে যাওয়ার পর অনাকাঙ্ক্ষিত খবরটা শুনে কীভাবে যে ছুটে এসেছে কেবল সে-ই জানে। বহু বছরের চিনা পরিচিত, হাস্যজ্বল মানুষটার এই করুণ পরিণতি দেখে চোখের অশ্রু বাঁধ মানে নি তার। কান্নার দরুন মাথা ব্যাথা লাগছে এখন। কপালে দুই পাশের রগ দপদপ করছে। চোখ জ্বলছে ভীষণ। মিহাদের বাড়িতে যাওয়ার পর সে ভীড়ের মাঝে একপলক দেখেছিল সাফওয়ান কে।
এক কোণায় দেওয়াল ঘেঁষে, নিষ্প্রাণ ভঙ্গিতে বসে ছিল। পরবর্তীতে আর দেখেনি। জানাজার পর সকলের মুখে যখন শুনতে পেল সাফওয়ান আসেনি, তাকে পাওয়া যাচ্ছে না। একথা শুনার পর থেকে সায়েরীর মন অশান্ত হয়ে উঠেছে। সাফওয়ান ভাই যে ঠিক নেই এটা সে জানে। কিন্তু এমন ভঙ্গুর হৃদয় নিয়ে কোথায় পড়ে আছে মানুষটা! এই প্রশ্নের জবাবে হঠাৎ-ই মনে পড়ল সুখ নীড়ের কথা। সাফওয়ানের সুখ নীড়। অর্থাৎ গ্রীণ ভ্যালি। মন খারাপের মুহূর্ত গুলোতে গ্রীণ ভ্যালিতেই সময় কাটায় সাফওয়ান। আজ-ও নিশ্চয়ই এখানেই আছে সে। একথা ভেবেই গ্রীণ ভ্যালি তে ছুটে এসেছে সায়েরী। মনে মনে চাইল, যেন তার ধারণা সঠিক হয়। কিন্তু গ্রীণ ভ্যালির গেইটের সম্মুখে এসে কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল তার। গেইট টা আজ আধখোলা। দারোয়ানের দেখা নেই। এমনটা এই প্রথম দেখল সায়েরী। দারোয়ান থাকুক, না থাকুক। সর্বদা গেইট বন্ধ থাকে। তবে আজ কি হলো!
চিন্তিত মস্তিষ্কে ভেতরে ঢুকে গেইট টেনে দিল সায়েরী। আশেপাশে না দেখে সোজা চলে গেল ঘরের ভেতরে। ডুপ্লেক্স বাড়িটার প্রতিটা কক্ষ চেক করেও হদিস মিললো না সাফওয়ানের। তখন গিয়ে ভয় উঁকি দিল মনে। কোথায় গেল সাফওয়ান! নীতিকে কল করার জন্য মোবাইল বের করতে করতে দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসল সে। লনে দাঁড়িয়ে খেয়াল করল সার্ভেন্ট কোয়ার্টার টাও আজ তালাবদ্ধ। কোথায় গেল করিম চাচা আর উনার বউ,বাচ্চা! আর গেলেও এই ঘরটা তালাবদ্ধ করেনি কেনো?
ভাবনার মাঝে আচানক তার নজর গেল উত্তর দিকের ছোট্ট পুল সাইডে। কাঙ্ক্ষিত মানুষটার দেখে পেয়ে সহসা নজর থমকাল তার। উত্তর দিকে বাউন্ডারির দেয়াল ঘেঁষে বেড়ে উঠেছে সারি সারি কিছু গাছ। তার সম্মুখে ছোট্ট সুইমিংপুল। পাশে ছাউনি যুক্ত দুটি সিট। সেসব কিছু বাদ দিয়ে সাফওয়ান বসে আছে ভেজা মাটির উপর, গাছে পিঠ ঠেকিয়ে। দুই হাঁটু উঠিয়ে তাতে কনুই রেখেছে। মাথা ঝুঁকে আছে নিচের দিকে৷ সায়েরী’র চিত্ত চঞ্চল হয়ে উঠল তাকে দেখে। মোবাইল ব্যাগে ঢুকিয়ে দ্রুত পা ফেলে এগিয়ে গেল কাছাকাছি। অস্থির কন্ঠে, মৃদু স্বরে ডাকল,
‘ সাফওয়ান ভাই! ‘
সহসা মাথা তুলল সাফওয়ান। তার রক্তিম আঁখিদুটি দেখে সায়েরীর বুক কেঁপে উঠল। এতটা রক্তিম! এত বেশি রক্তিম হয়ে আছে কেনো এই চোখজোড়া?
সায়েরীকে দেখে নিরব চোখে সেকেন্ড দুয়েক তাকিয়ে থাকে সাফওয়ান। পরপরই হাতড়ে নিল পাশে পড়ে থাকা নীল বর্ণের ফাইল-টা। তখনই সায়েরী’র নজরে আসল সাফওয়ানের ডান হাতের উল্টো পিঠ। যা রক্তাক্ত হয়ে, থেতলে গেছে। হাতের উপর ইচ্ছেকৃত জুলুম করেছে তা বুঝায় যাচ্ছে। রক্ত শুকিয়ে ছোপ ছোপ ছাপ ফেলেছে কব্জি হতে কনুই অবধি। সায়েরী উত্তেজিত হয়ে উঠল তা দেখে। ক্ষত স্থান ছোঁয়ার জন্য হাত বাড়িয়ে অস্থির কন্ঠে শুধালো,
‘ হাতে কি করেছেন? এত রক্ত পড়ছে কেনো? ‘
হাত বাড়িয়েও ছুঁতে পারল না সে। পূর্বেই নিজ হাত সরিয়ে ফেলল সাফওয়ান। জমিন হতে উঠতে উঠতে ধকমের স্বরে বলে উঠলো,
‘ কেনো এসেছ এখানে? ‘
সায়েরী কেঁপে উঠল উক্ত ধমকে। নিজেও দাঁড়িয়ে পড়ল। মিনমিন কন্ঠে বলল,
‘ আপনাকে দ..দেখতে এসেছি। অ..আপনি ঠিক আছেন? ‘
সাফওয়ান রক্তিম চোখে তাকায়। শ্বাস টানছে ফোঁসফোঁস করে। অপ্রার্থিত রাগে ভষ্ম করে দিবে যেন সায়েরীকে। চোয়াল শক্ত করে গর্জে উঠলো,
‘ আমি বলেছি আসার জন্য? দেখে নিয়েছ? এবার বেরিয়ে যাও। আউট!!!! ‘
এহেন গর্জন শুনে সায়েরী পিছিয়ে গেল কয়েক কদম। দুরুদুরু কাঁপছে বুক। কি দোষ তার! কেন এমন ব্যাবহার করছে সাফওয়ান ভাই? এই রাগ আসলে কার উপর?
সাফওয়ান গর্জন করে কদম বাড়াল যাওয়ার জন্য৷ কিন্তু এক পা এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে শরীর টলে উঠল তার। তাকে ঢলে পড়তে দেখে সায়েরী আৎকে উঠে ঝাপটে ধরল বিশালাকার দেহটা। সঙ্গে সঙ্গে তার শরীর জ্বলে উঠল যেন। এতটা উত্তাপ দেহে! এই উষ্ণতাকে উত্তাপ নয়, বরং জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ড বলা চলে। আচানক এমন উত্তপ্ত হয়ে উঠল কেনো সাফওয়ানের শরীর!
‘ ছাড়ো! ‘
সাফওয়ানের রাশভারি কন্ঠ। সায়েরীর পক্ষেও সম্ভব নয় এই বিশাল দেহটা আগলে রাখা। কিন্তু মনে হচ্ছে ছেড়ে দিলেই পড়ে যাবে। ভীষণ দুর্বল দেখাচ্ছে সাফওয়ান কে। সায়েরীর আঁখি ছলছল করে উঠে। ঢোক গিলে সে নিম্ন কন্ঠে বলল,
‘ আপনি অসুস্থ। একটু বসুন। নাহ…. ‘
কথাটুকু শেষ করার আগে আচমকা ঝটকা মেরে সায়েরীর বাহুবন্ধন হতে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল সাফওয়ান। আঙ্গুল তুলে ফের একবার শাসাতে চাইল। কিন্তু কণ্ঠনালী দিয়ে কথা বের হলো না। দৃষ্টি ঘোলাটে হয়ে উঠছে আবারো। নিজ দুর্বলতা বুঝতে পেরে ধপ করে পূর্বের স্থানে বসে পড়ল সে। বাম হাতের বৃদ্ধ আঙ্গুল এবং তর্জনী দ্বারা চোখ চেপে ধরল নিজের। তাকে এমন দুর্বল রূপে দেখে সায়েরী’র বক্ষস্থলে তোলপাড় সৃষ্টি হলো। সাফওয়ানের এমন রূপ তার সহ্য সীমার বাহিরে। ঠোঁটে ঠোঁট চেপে সে নিজেও হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল সাফওয়ানের সম্মুখে। দৃষ্টি গেল জমিনে অবহেলায় পড়ে থাকা ফাইলটার দিকে৷ পেশেন্ট নামের স্থানে টানা টানা অক্ষরে লেখা “Mihad Sheikh”. সায়েরী কিছুটা বুঝতে পারল সাফওয়ানের অযাচিত রাগের কারণ। এই রাগ মূলত নিজের উপর, প্রিয়’র চেয়েও প্রিয় বন্ধুটার উপর। সাফওয়ান নজর তুলে পূণরায় সায়েরীকে দেখেই চটে গেল। গমগমে গলায় বলে উঠলো,
‘ যাচ্ছ না কেনো? আমাকে একা ছাড়ো৷ চলে যাও এখান থেকে। ‘
সায়েরী এবারে আর ভয় পেল না। বিন্দুমাত্র বুক কাঁপল না তার। বরং সাফওয়ানের সকল রাগ, ক্ষোভ অগ্রাহ্য করে সে দুই হাঁটুতে ভর দিয়ে, আচমকা জড়িয়ে ধরল সাফওয়ানকে। সাফওয়ানের উত্তপ্ত মাথাটা ঠাঁই দিল নিজের ছোট্ট কাঁধের উপর। সাফওয়ান বোধহয় চমকালো এই কান্ডে। কিন্তু পরপরই সে ঠেলে সরাতে চাইল মেয়েটাকে। তবে আজ তার পুরুষালী শক্তিও হার মানতে বাধ্য হলো প্রেয়সীর মনের জোরের কাছে। সায়েরী শক্ত আলিঙ্গনে আবদ্ধ করেছে তাকে। ঘাড়ের পেছনের চুলে হাত ডুবিয়ে সে কান্না চেপে বলে উঠলো,
‘ কেনো এমন করছেন সাফওয়ান ভাই? আমরা জানি আপনি কষ্ট পাচ্ছেন। তবুও সবার সামনে এতটা কঠোর হয়ে আছেন কেনো? একটু স্বাভাবিক হোন। কেন এমন করছেন? ‘
সাফওয়ানের দৃষ্টি কোমল হয়ে সিক্ত হতে চায়। কিন্তু চোয়াল শক্ত করে নিজেকে দমিয়ে রাখে সে। রক্তাক্ত হাতে খামচে ধরে সায়েরীর কটিদেশ। ছিনিয়ে দূরে ফেলতে চায় মেয়েলী দেহটি। ব্যাথায় দাঁতে দাঁত চাপল সায়েরী। দমিয়ে রাখল ব্যাথাতুর আর্তনাদ সব। বাহুবন্ধন ছেড়ে দিল না ঠিক, কিন্তু এই পর্যায়ে সাফওয়ানের মুখশ্রী নিজ দুই হাতে তুলে নিলো সে। সে হাঁটুতে ভর দিয়ে রেখেছে বিধায় দুজনের উচ্চতা সমান হয়ে আছে। নিজ মুখশ্রীর অতি নিকটে সাফওয়ানের আরক্তিম, উত্তপ্ত মুখখানা টেনে নিল সে। সাফওয়ান রক্তাভ চোখে তাকাল। সায়েরীর দৃষ্টি টলমল। ফের একবার পুরুষালী হাতের খামচি অনুভব হতেই চোখ খিচে ফেলল সে। দুই ফোঁটা অশ্রুজলে সিক্ত হলো গাল। তা দেখে সাফওয়ান রাশভারি কন্ঠে বলে উঠলো, ‘ দূরে সরো। ‘
সায়েরী একটুখানি হাসল বোধহয়। পরপরই তার গোলাপি অধর জোড়া ছুঁয়ে দিল অগ্নিকুন্ডের ন্যায় উত্তপ্ত পুরুষালী ললাটে। শীতল ঠোঁট ছুঁইয়ে সে নিম্ন কন্ঠে প্রতিউত্তর করল,
‘ আপনি শতবার বললেও আজ দূরে যাবনা। আমি জানি আপনি ঠিক নেই। এই পরিস্থিতিতে আমি চাইলেও আপনার জন্য কিছুই করতে পারব না। কিন্তু, কাছে থেকে একটুখানি ভরসা দিতে তো পারব! দয়া করে এটাও ছিনিয়ে নিবেন না। একটু কাছে থাকতে দিন। প্লিজ! ‘
সাফওয়ানের দৃষ্টি কোমল হয়ে আসে। রক্তিম আঁখিতে একটু একটু অশ্রু জমে। ছেলেটা ফের দমিয়ে নেয় সেসব। ঠেলে সরিয়ে দিতে চায় সায়েরীকে। সায়েরী সরে না। পূণরায় জড়িয়ে ধরে। সাফওয়ানের চুলে হাত বুলিয়ে ধীর কন্ঠে বলে,
‘ কেনো কষ্ট দিচ্ছেন নিজেকে? একটু কাঁদুন। মনটাকে হালকা করুন। আমি জানি আপনি মেনে নিতে পারছেন না যে মিহাদ ভাইয়া আর…( একটু থেকে লম্বা শ্বাস ফেলে ফের বলল) আমরা তো চাইলেও এটা বদলাতে পারব না। ইরাপুর কথাটা ভাবুন একবার। মিহাদ ভাইয়ের পরে আপনি আপুর কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ জানেন না? আপনি নিজেই যদি এমন গুটিয়ে যান, তাহলে আপুকে কে সামলাবে? একটু আগেই ভাইয়া বলেছে যে বেবি ঠিক নেই। বেবিটার কিছু হলে ইরাপুকে কীভাবে সামলাবে সবাই? একটু স্বাভাবিক হোন, প্লিজ। অন্তত ইরা আপুর জন্য। মিহাদ ভাইয়া ইরাপুকে কত ভালবাসত জানেন তো! ভাইয়ার আমানত রক্ষার জন্য হলেও নিজেকে সামলে নিন। আপনি ছাড়া কেউ পারবে না আপুকে সামলাতে। ‘
সায়েরী কথাগুলো বিস্তার প্রভাব ফেলল সাফওয়ানের হৃদয়ে। দগ্ধ অনুভূতি সব চাপা দিয়ে রাখা কঠোর সত্তা এবারে গুড়িয়ে যেতে লাগল। খামচে ধরা হাতজোড়া কোমল হলো। মেয়েলী দেহখানা ঝাপটে ধরল নিজের সঙ্গে। সেটা অনুভব হতেই আবেগে গাল ভিজে উঠল সায়েরীর। মাথা ঝুঁকিয়ে সে নির্বিঘ্নে ঠোঁট ছোঁয়াল সাফওয়ানের কপালের একপাশে৷ সরু আঙ্গুল সঞ্চালন করলো আধ ভেজা চুলগুলোর মধ্যে।প্রতিটা প্রতিক্রিয়া দ্বারা যেন সে বুঝিয়ে দিচ্ছে, “আমি আছি তো! অন্তত আমার কাছে মন খুলে উজার করুন তীক্ত অনুভূতি সব। অশ্রু জলে ভাসিয়ে দিন সমস্ত বিষাদ।”
সাফওয়ান যেন না শুনেও বুঝে ফেলল কথাগুলো। প্রেয়সীর এটুকু আহ্বানে সাড়া না দিয়ে পারল না সে। এই মুহূর্তে ঠিক এটুকু ভরসার প্রয়োজন ছিল তার। তাই তো, সায়েরীর ভরসা টুকু পেয়ে দুই হাতে ঝাপটে ধরে মুখ গুঁজল ছোট্ট কাঁধটাতে। পুরুষালী অহং গুড়িয়ে রক্তিম আঁখিদুটি সিক্ত হলো। ভিজল চোখ, গাল, সায়েরীর জামা,কাঁধ। উষ্ণ তরল অনুভব করতে পেরে সায়েরীর দেহ কাঁপল একটুখানি। পরপরই সাফওয়ান ফুঁপিয়ে উঠেছে দেখে দম বন্ধ হয়ে আসতে চাইল তার। এই করুন কান্না, পুরুষালী দেহটি কান্নার ধাপে ধাপে কেঁপে উঠার এই দৃশ্য তার সহ্য ক্ষমতার বাহিরে। সাফওয়ানকে এই রূপে দেখার সাহস তার ছিল না কখনো। সারাজীবন কঠোর ব্যক্তিত্ত্ব বহন করা যুবকটার এহেন ভেঙ্গে পড়া রূপ সে সহ্য করতে পারছে না বিন্দুমাত্র। ঠোঁট কামড়ে সে নিজেও কেঁদে ফেলল নিঃশব্দে। সাফওয়ান দুই হাতে শক্ত করে ধরে রেখেছে তাকে। কাঁধ ভিজেছে উঠেছে অশ্রুজলে। দীর্ঘক্ষণ অশ্রু বিসর্জন দেওয়ার পর সাফওয়ানের ভাঙ্গা স্বরে শুনা গেল কেবল অল্প কিছু বাক্য।
‘ অ..আমি, আমি ওকে কখনো ক্ষমা করব না সুবহা! ও কী করে পারল এত বড় কথা আমার কাছ থেকে চেপে যেতে? এই ছিল ওর বন্ধুত্ব! এতগুলো বছরেও আমি ওর আপন হতে পারিনি? আমি..আমি ওকে বাঁচাতে পারিনি। ‘
কি নিদারুণ কষ্ট নিয়ে কথাগুলো নির্গত হচ্ছে। কথাগুলোর অর্থ ঠিক বুঝে উঠতে পারল না সায়েরী। কি লুকিয়েছে মিহাদ ভাই? কিসের জন্য সাফওয়ান ভাইয়েরস এত রাগ,অভিমান!
“আমি ওকে বাঁচাতে পারিনি” ভাঙ্গা স্বরে আরও কয়েক বার এই কথাটা আওড়াল সাফওয়ান। তার কন্ঠে প্রকাশ পাচ্ছে নিজের সবচেয়ে বড় ব্যার্থতা।
‘ ও জানত ওর হাতে বেশিদিন সময় নেই। আমি ওর গায়ে হাত তুলেছি শেষ দেখায়। তারপরও সে আসল না আমার কাছে৷ একটাবার জানাল না কিছু। আমি এই অনুতাপ নিয়ে কি করে বাঁচব! শেষ সময়ে এসে ও কেন অনুশোচনায় ডুবিয়ে দিয়ে গেল আমাকে? ‘
পূর্বের চেয়েও অধিক করুণ আর্তনাদ সাফওয়ানের । ডুকরে উঠেছে সে এসব বলতে গিয়ে। সায়েরী সেসব শুনে কেঁদেকেটে গাল ভিজাচ্ছে। এক পর্যায়ে সে অনুভব করল সাফওয়ানের হাতের বাঁধন আলগা হয়ে এসেছে। দেহের ভার ছেড়ে দিচ্ছে যেন। সায়েরী আৎকে উঠল। দ্রুত মুখ তুলল সাফওয়ানের। নিভু নিভু চোখে তাকিয়ে আছে ছেলেটা। ভেজা চোখ, মুখ সব নিজ হাত দ্বারা যথাসম্ভব মুছে নিল সায়েরী। অসম্ভব রকমের উত্তপ্ত দেহটা নিজের সঙ্গে জড়িয়ে ধরে, শব্দ করে কেঁদে উঠল সে। ক্রন্দনরত গলায় অভিযোগ তুলল,
‘ আপনি জানেন বৃষ্টির পানি আপনার সহ্য হয়না৷ তবুও কেনো ভিজেছেন? কত ঘন্টা বসে ছিলেন এখানে? ‘
অতিরিক্ত উত্তাপে সাফওয়ানের ত্বক অবধি লাল বর্ণ ধারণ করা শুরু করেছে। সায়েরীর মনে হচ্ছে সে যেন আগুন গায়ে জড়িয়ে আছে। কীভাবে সাফওয়ান কে এখান থেকে বাসার ভেতরে নিয়ে যাবে তা ভেবে ভেবে অস্থির অবস্থা তার৷ তার একার পক্ষে কখনো সম্ভব নয়। কিন্তু কেউ তো নেই আজ এখানে। খুব সম্ভবত সাফওয়ান নিজেই ধমক দিয়ে তাড়িয়ে দিয়েছে সবাইকে। বাহুতে সাফওয়ানের মাথাটা ঢলে পড়তেই সায়েরী’র হৃদস্পন্দন থমকায়। সাফওয়ান চেতনা হারিয়েছে! এত বেশি অসুস্থ তার শরীর! উত্তেজনা, অস্থিরতায় মস্তিষ্ক ফাঁকা, ফাঁকা ঠেকছে তার। একপর্যায়ে মনে পড়ল সাফওয়ানের বন্ধুদের কথা। খুব সাবধানে সে সাফওয়ানের মাথাটা রাখল নিজের কোলের উপর। ব্যাগ হাতড়ে মোবাইল বের করে ফোন করল নীতির নাম্বারে। দ্বিতীয় বার রিং হওয়া মাত্র কল রিসিভ করল নীতি। সঙ্গে সঙ্গে সায়েরী কেঁদে কেঁদে জানাল সাফওয়ানের অসুস্থতার কথা। নীতি উত্তেজিত হয়ে উঠল একথা শুনে। অশান্ত কন্ঠে আওড়াল,
‘ কোথাও ও? বেশি জ্বর এসেছে? কতক্ষণ ভিজেছে বৃষ্টিতে? ‘
সাফওয়ানের অচেতন মুখশ্রী’র দিকে তাকিয়ে সায়েরী ডুকরে উঠে,
‘ অ..আমি জানি না আপু। উনার শরীর খুব খারাপ। সেন্স হারিয়েছে৷ তোমরা প্লিজ একটু আসো না। এখানে বেশিক্ষণ থাকলে না জানি কি হয়। আমি পারব না একা একা কিছু করতে। ‘
‘ আচ্ছা, আচ্ছা। কান্না করো না। আমি..আমি পাঠাচ্ছি জিমন দের কে। আবরারও যাবে হয়তো৷ এই মুহূর্তে বেশি ঝামেলা করে লাভ নেই। আগে জিমন কে পাঠাচ্ছি। ও গেলে তুমি বাড়ি ফিরে যেও। পরে রায়ান আর আবরার গেলেই সামলে নিবে ওকে। আমি ইরা’র সাথে আছি তাই যেতে পারব না। কিন্তু ওরা দেখবে সব। তুমি চিন্তা করো না কেমন?
‘ হ..হুম। তাড়াতাড়ি আসতে বলো। ‘
‘ হ্যাঁ, বলছি। ‘
কল কেটে দিল নীতি। মোবাইল সরিয়ে রেখে সাফওয়ানের দিকে ঝুঁকল সায়েরী। কপালে কপাল ঠেকাল। তার চোখের অশ্রুকণা গড়িয়ে পড়ল সাফওয়ানের মুখের উপর। গালে গাল ছুঁইয়ে সায়েরী ভাবল, সাফওয়ানের এটুকু অসুস্থতা, এই চেতনাহীন দেহ দেখে তার দুনিয়া থমকে গেছে যেন। তাহলে ইরা কী করে সহ্য করেছে মিহাদের নিথর দেহটা দেখে! কেমন লেগেছে তার? কীভাবে বেঁচে থাকবে মেয়েটা এই শূন্যতা নিয়ে?
ইরা’কে জাদিদের বাসায় নিয়ে আসা হয়েছে শেষ বিকালের দিকে। ঘরে পা রাখতে না রাখতেই ইরা’কে মুখোমুখি হতে হয়েছে তার মা-বাবার। তার মা পূর্ব হতে সবকিছু নিয়ে অবগত ছিলেন বলে তিনি চুপচাপ রয়েছেন। কিন্তু ইরা’র বাবাকে দেখাল বেশ ক্ষিপ্ত। মেয়ের অপকর্মের জন্য আজ মেয়ের শ্বশুর, শাশুড়ীর কাছ থেকে কত কি অপমান সহ্য করতে হয়েছে তাদের। তাই তো, ক্ষোভে ফেটে পড়ে তিনি হাত তুললেন ইরা’কে মারার তাগিদে। কিন্তু সফল হতে পারলেন না। উনার ক্ষিপ্ত হাত ইরা’র গাল ছোঁয়ার আগেই রক্ষাকবচের ন্যায় তা আটকে ফেললো জাদিদ। সদা শান্ত, সভ্য থাকা পুরুষটার মুখশ্রী দেখাল অতী মাত্রায় গম্ভীর। ইরা’র বাবার হাত টা নামিয়ে দিয়ে সে সতর্ক বার্তা ছুড়ল রাশভারী কন্ঠে,
‘ ইরা এখন শুধুমাত্র আপনার মেয়ের পরিচয়ে নেই আঙ্কেল। সে আমার স্ত্রী। আর আমার বাড়িতে দাঁড়িয়ে, আমার স্ত্রীর গায়ে হাত তোলার অধিকার আমি কাউকে দেইনি। আপনাকেও না৷ ‘
তার এহেন প্রতিক্রিয়ায় ইরা-সহ সকলেই আশ্চর্য হলো। পরিবারের সকলে অবাক হচ্ছে জাদিদের এমন নির্লিপ্ততা দেখে৷ ইরা নামক রমনীকে এতগুলো মাস যাবত জাদিদ ভালোবেসে আসছে তা সকলে জানে। কিন্তু ভালোবাসায় অন্ধ হয়ে সে যে অন্য এক পুরুষের অবৈধ সন্তান পেটে ধারণ করা মেয়েকে বউ হিসেবে মেনে নিবে, তা সকলের ধারণার বাহিরে ছিল। জাদিদের মা আক্রোশে ফেটে পড়েছেন। সমাজে কত নাম-ডাক, কত সম্মান রয়েছে উনাদের। এসব ব্যাপার বাহিরে জানাজানি হলে মানসম্মান আদো থাকবে?
অপমান সহ্য করতে না পেরে ইরা’র বাবা মুখ ফিরিয়ে নিলেন ইরা’র কাছ থেকে। স্পষ্ট কন্ঠে জানালেন, এমন কুলাঙ্গার সন্তান উনাদের দরকার নেই। আজ থেকে উনার কেবল একটাই মেয়ে। তা হলো ইরিনা। ইরা’কে প্রয়োজন নেই তাদের। একথা গুলো জড়বস্তুর মতো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুনল ইরা। মনে হয়তো কিঞ্চিৎ প্রভাব পড়েছে ঠিক। কিন্তু মিহাদকে হারানোর দুঃখের কাছে এসব ফিকে পড়ে গেল। জাদিদ ইরাকে বলল নিজেদের কামরায় যাওয়ার জন্য। ইরা চলে গেল চুপচাপ। সে যেতেই জাদিদ শান্ত ভঙ্গিমায় গিয়ে দাঁড়ালো নিজের বাবা, মায়ের সম্মুখে৷ নির্লিপ্ত কণ্ঠে শুধালো,
‘ কি যেন বলতে চাচ্ছিলেন? বলে ফেলুন? ‘
তার এমন দায়সারা ভাব দেখে সকলে আশ্চর্যের চরম পর্যায়ে। তার মা চেঁচিয়ে উঠলো,
‘ কি বলতে চাচ্ছি তুমি জানো না? এমন এক নষ্টা মেয়ে ঘরে তোলার জন্য এত জেদ করছিলে তুমি? এত সাহস তোমাকে কে দিয়েছে? ‘
জাদিদ গোপনে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। পরিস্থিতি সামলানোর জন্য বলে উঠলো,
‘ আপনারা এত বেশি রিয়েক্ট করছেন কেনো? সাত মাস যাবত পরিচয় ইরা’র সাথে আমার। বাচ্চাটা আমারও তো হতে পারে না-কি? ‘
কথাটা বলে সে প্রতিক্রিয়া দেখতে চাইল সকলের। কিন্তু কেউ কিছু ভাববে এর পূর্বেই জাদিদের বাবা গর্জে উঠলো,
‘ পাগল পেয়েছো আমাদের? তুমি যা বলবে তা মেনে নিব আমরা? ভুলে যেওনা ইরা’র সাইকিয়াট্রিস্ট আমি ছিলাম। আমার পেশেন্ট ছিল বলেই তোমার সাথে পরিচয় হয়েছিল ওর। আর ওর মেন্টাল হেলথ্ নিয়ে অনেকটাই অবগত ছিলাম আমি। যদিও ওর বাবা জোর করে আমার কাছে ওকে নিয়ে আসতো। ও বলতে চাইত না কিছু। কিন্তু ওর রিলেশনশিপ ইস্যু ছিল এটা আমি জানি। ওর বাবা নিজে বলেছিল। এসব জানা স্বত্তেও তোমার জেদের কাছে হার মেনে বিয়ের জন্য রাজি হয়েছিলাম আমি। ভেবেছি অতীত কার না থাকে। মেয়েটা হয়তো তোমার সঙ্গ পেয়ে সুধরে যাবে। কিন্তু এ তো দেখছি নষ্টামির সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছে। বিচ্ছেদের পরেও… ছি!! ‘
জাদিদের মা এসকল কথা শুনে আরও বেশি আক্রোশ জমালেন বোধহয়। তেতে উঠলেন জাদিদের বাবার উপর।
‘ তুমি এসব কথা আমার কাছ থেকে লুকিয়েছ কেনো? আগে জানলে কখনোই এই বিয়ের জন্য রাজি হতাম না আমি। এমন দুশ্চরিত্র মেয়ে কখনোই আমার বউমা হতে পারে না। তুমি ওকে ডিভোর্স দিবে জাদিদ। এটা আমার আদেশ। ‘
‘ মা!! এটা অসম্ভব! ‘ জাদিদ অবাক কন্ঠে বলে উঠলো।
তার মা পূণরায় গর্জে উঠলো এহেন প্রতিউত্তর শুনে।
‘ অসম্ভব হলে নিজের দুশ্চরিত্র বউ নিয়ে বেরিয়ে যাও আমার বাড়ি থেকে। এমন মেয়ে আমি আমার বাড়িতে বরদাস্ত করবো না। ‘
জাদিদ আহত চোখে তাকাল। বড় ভাই, ভাবিও গম্ভীরমুখে দাঁড়িয়ে। কেউ-ই নত হতে রাজি নয়। জাদিদ নিজেও গম্ভীর হলো তা দেখে। স্পষ্ট কন্ঠে জবাব দিল,
‘ ঠিক আছে। আজ রাতটুকু সহ্য করে নিন। কাল ভোরেই আমি আমার বউ নিয়ে চলে যাব। চোখের সামনে আমার বউকে দেখে কেউ বিরক্ত হন, আর ওকে কথা শুনান সেটা আমিও চাই না। ‘
নিজ বক্তব্য পেশ করে সে বড় বড় কদম ফেলে স্থান ত্যাগ করলো। পেছনে হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো তা মা-বাবা। সর্বদা মায়ের সকল আদেশ মাতা পেতে নেওয়া ছেলেটার এহেন পরিবর্তন মেনে নিতে পারছে না কেউ।
যাদিদ নিজ রুমে প্রবেশ করতে গিয়ে লক্ষ্য করে বিছানার কিনার ঘেঁষে, হেড বোর্ডের সঙ্গে হেলান দিয়ে বসে আছে ইরা। জাদিদের দিকে দৃষ্টি পড়তেই সে ক্ষীণ স্বরে বলে উঠলো,
‘ বলেছিলাম, বিয়ে করে আমাকে নিজের জীবনের সাথে না জড়াতে। আবেগে ভেসে বিয়ে করে ফেললেন। আজ আমার কারণেই আপনার মা,বাবার কাছ থেকে এত কিছু শুনতে হলো। ঘর ছাড়াও হতে হচ্ছে। ‘
জাদিদ মলিন হাসে। মৃদু মৃদু প্রতিউত্তর করে,
‘ আবেগ দিয়ে বিবেচনা করা সিদ্ধান্ত কিন্তু সবসময়ই খারাপ হয়না। তাছাড়া, নিজের জীবনের সঙ্গে আপনাকে জড়িয়ে যখন ফেলেছি। এখন এই জীবনের শেষ নিঃশ্বাস অবধি আর ছাড়ছি না। ‘
ইরা ফ্যালফ্যাল নজরে তাকিয়ে থাকে। ভাগ্য আর কেমন কেমন পরিস্থিতির সম্মুখীন করবে তাকে!
হাঁটুতে মাথা রেখে চোখ বুজল সে। জাদিদ তখন কাছের এক বন্ধুকে ফোন করেছে। বন্ধুটার বাবার কয়েকটি বিল্ডিং রয়েছে এই শহরে। সবগুলোতেই ভাড়া দেওয়া। জাদিদ তাকে ফোন করে জেনে নিলো ভালো মানের কোনো ফ্ল্যাট খালি আছে কিনা। ভাগ্যবশত দুটো আলাদা বিল্ডিংয়ের দুটি ফ্ল্যাট খালি আছে জানাল। তন্মধ্যে যেটি সবচেয়ে ভালো মানের সেটিতে আগামীকাল সিফট করার পরিকল্পনা করল জাদিদ। ভাড়া পয়ত্রিশ হাজার। তা নিয়ে অবশ্য জাদিদের সমস্যা নেই। একজন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে তার বেতন যথেষ্ট মোটা অঙ্কের। তাছাড়া এতগুলো বছরের সেভিংস রয়েছে। সেসব দিয়েও নতুন ফার্নিচার হতে শুরু করে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সব দিব্যি কিনে ফেলা যাবে৷ সে একা হলে নাহয় আরও কম দামের ফ্ল্যাট দেখত। কিন্তু সাথে এখন বউ রয়েছে। স্বনামধন্য পরিবারের মেয়ে ইরা। যেনতেন যায়গায় কি আর রাখা যাবে তাকে?
ইরা’র দিকে তাকিয়ে দেখল সে হাঁটুতে মাথা রেখে বসে আছে। চোখের কার্নিশ ভেজা। জাদিদ দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। নম্র কন্ঠে বলে,
‘ ফ্রেশ হয়ে আসুন ইরা। সেই দুপুরের সময় জোর করে অল্প কিছু খেয়েছিলেন মাত্র। এত সময় না খেয়ে থাকলে আবারও শরীর খারাপ করবে৷ কাপড় বদলে নিন। আমি খাবার নিয়ে আসছি৷ খেয়ে রেস্ট করবেন। ‘
ইরা প্রথমে শুনেও নড়াচড়া করলো না। পরে আবার কি যেন ভেবে মেনে নিল জাদিদের কথা। ফ্রেশ হয়ে আসতেই দেখে জাদিদ ইতোমধ্যে খাবারের প্লেট হাতে নিয়ে বসে আছে। ইরা বসতেই সে প্লেট এগিয়ে দিল। না চাইতেও বাচ্চাটার কথা ভেবে অল্প খাবার মুখে তুললো ইরা। তারপর সে শুয়ে পড়তেই জাদিদ নিজের ক্রেডিট কার্ড, ওয়ালেট, মোবাইল সব নিয়ে রুমের দরজা লাগিয়ে বের হয়ে গেল বাসা থেকে। অনেক কাজ বাকি। প্রথমে গিয়ে আপার্টমেন্ট-টা দেখতে হবে। পরিষ্কার, পরিচ্ছন্নতার-ও একটা ব্যাপার আছে। কাল ইরা এসেই কি এসব পরিষ্কার করার কাজে লেগে পড়বে না-কি! একে তো সে অসুস্থ। তন্মধ্যে মানসিক অবস্থাও ঠিক নেই। তাছাড়া খাট,কাবার্ড সহ রান্নার কিছু প্রয়োজনীয় সামগ্রী আজকেই কিনে নিতে হবে। ইরাকে বাহিরের খাবার খাওয়ানো যাবে না। আজ রাতের মধ্যে যতটুকু পারে কাজ সেরে ফেলবে। প্রয়োজনে বন্ধুদের সাহায্য নিবে কিছু টা।
রাত তখন সাড়ে এগারোটা। গ্রীণ ভ্যালিতে অবস্থান করেছে আবরার,রায়ান এবং জিমন। তাহুরা খান এসেছিলেন সকালের দিকে। সাফওয়ানের অসুস্থতার কথা শুনে আর নিজ ঘরে মন ঠিকেনি উনার। মিহাদকেও দেখতে গিয়েছিলেন তিনি। সেখান থেকে ফিরার ঘন্টা খানিক পরই সাফওয়ানের খবর পেয়ে ছুটে এসেছেন গ্রীণ ভ্যালিতে। সঙ্গে ছিল সাফ্রিন। সাফওয়ানের বন্ধুরা পূর্বেই ডাক্তারকে খবর দিয়েছিল। টানা কয়েক ঘন্টা বৃষ্টিতে ভিজেছে বলে অতিরিক্ত জ্বর হয়েছে সাফওয়ানের৷ সেই সাথে যোগ হয়ে শ্বাস কষ্ট। নিউমোনিয়া হওয়ার সম্ভাবনা শতাংশ। চেকআপ করার পর বেশ সতর্কবার্তা দিয়ে গেছেন ডাক্তার৷ সেসব শুনেই তাহুরা খান’র দুশ্চিন্তা বেড়েছে দ্বিগুণ। তন্মধ্যে সাফওয়ান একরোখা জেদ চেপে বসেছে। নিজ বাড়ি ফিরতে রাজি নয় সে। অন্যদিকে নওশাদ খানের কিছু জরুরি কাজের উদ্দেশ্য আগামীকাল শহরের বাহিরে যেতে হবে। যার কারণে তাহুরা খানকে উপস্থিত থাকতে হবে বাড়িতে। ছেলের কাছে এসেও বিশেষ লাভ করতে পারলেন না তিনি।
ছেলেটা কাউকে পাশ ঘেঁষতে দিচ্ছে না। রুমে ঢুকলেই রাগারাগি করছে। তার এহেন আচরণের হেতু ধরতে না পেরে সকলে মেনে নিচ্ছে যা বলছে তা। এই মুহুর্তেও সাফওয়ান রয়েছে একাকী রুমে। জ্বর কতটুকু সেরেছে কেউ জানে না। বন্ধুরা সকলে অন্য এক রুমে অবস্থান করেছে। সারাদিনের দখলে বেশ তাড়াতাড়ি ক্লান্ত চোখে ঘুম নেমে এসেছে জিমন এবং রায়ানের। কিন্তু আবরার জেগে আছে। কিছুতেই মন টিকছে না তার। ভেতরটা পুড়ছে ভীষণ। বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল সে। এমন সময় রাতের নিস্তব্ধতা ভেদ করে শব্দ আসলো বাইকের। আবছা আলোয় নজরে আসলো গেইট পেরিয়ে বাহিরে বেরিয়ে যাচ্ছে সাফওয়ানের চকচকে কালো বাইকটা। আবরার চমকালো এসময় সাফওয়ানকে বের হতে দেখে। নাওয়া-খাওয়া নেই, ওষুধ খাওয়া হয়নি। জ্বর কমেনি।
এসময় কোথায় ছুটছে এই ছেলে? আবরার নিজেও নেমে আসে দ্রুত পায়ে৷ সাফওয়ানের গন্তব্য আন্দাজ করতে পেরে সে নিজেও বাইক বের করে বেরিয়ে গেল। পনেরো মিনিটের মাথায় গিয়ে থামল নিস্তব্ধ এক কবস্থানের কিছুটা দূরে। ওইতো খানিকটা দূরে সাফওয়ানের বাইকটা দাঁড়িয়ে। আবরার নেমে দাঁড়াল। নিঃশব্দে কয়েক কদম বাড়াতেই চোখে পড়ল সাফওয়ানকে। নতুন কবরটার সম্মুখে দুই হাঁটু ভেঙ্গে বসে রয়েছে সে। রাস্তার কিনারের টিমটিমে আলোয় তার অবয়ব অস্পষ্ট। না দেখেও আবরার যেন দেখে ফেলেছে দাম্ভিক পুরুষটার অশ্রুসিক্ত আঁখিদুটো। মিনিট খানিক পর সাফওয়ান লুটিয়ে পড়ল জমিনে।
কপাল ঠেকাল মাটিতে। দুই হাতে খামছে ধরেছে মাটি। শক্ত পোক্ত কাঁধ দুটো থেকে থেকে কাঁপছে তার। আবরার স্পষ্ট অবলোকন করতে পারল সেসব। নিজ গাল বেয়ে নামতে চাওয়া অশ্রুজল সে মুছে নিল আঙ্গুলের সহিত। এই নিশিত রাত্রিতে তিন বন্ধু এক স্থানে থেকেও, পরিণতি এমন হবে তা কখনো স্বপ্নেও কল্পনা করেনি তারা। কে বলেছে কেবল প্রেমিকযুগলের বিচ্ছেদের যন্ত্রণা হয়। কখনো কেউ জানতে চেয়েছে প্রিয়’র চেয়েও প্রিয় বন্ধু গুলো একে অপরকে ঠিক কতটা ভালোবাসে? যতটা ভালোবাসলে এক বন্ধুর মৃত্যুতে সাফওয়ানের মতো মানব নিজের স্বাভাবিক চিন্তা চেতনা হারিয়ে বসতে পারে। যতটা ভেঙ্গে পড়লে ভোর রাত হতে সারাদিনের দৌঁড়ঝাপের পড়েও আবরার নামক পুরুষটার দুই চোখ নিদ্রাহীনতায় ভোগে৷ বন্ধ চোখের পাতায় প্রিয় বন্ধুটার নিথর দেহ ভাসে। এই দুজনের প্রতিটা নিশ্বাস যেন তাদের আঙ্গুল তুলে বলছে, ” মিহাদের জন্য তোরা কিছু করতে পারলি না। সে জানাল না ঠিক৷ কিন্তু তোরাও কি করে খোঁজ পেলি না? কেনো বুঝতে পারলি না তার আসল সত্য? ”
ভোর সকালে মায়ের সঙ্গে সাফ্রিন ফিরে গিয়েছে বাড়িতে। তাহুরা খান বারবার করে আবরার দের বলে গিয়েছেন সাফওয়ানের খেয়াল রাখার কথা। বাড়ির কাজ মিটে গেলে তিনি পূণরায় আসবেন জানিয়েছেন। উনাকে আশ্বস্ত করে সকলে পাঠিয়ে দিল ঠিকই। কিন্তু কেউই পারল না সাফওয়ানকে রুম থেকে বের করতে। আবরার জোরজবরদস্তি করতে গিয়ে এক গাদা ঝাড়ি শুনে ফিরে এসেছে। তাছাড়াও সাফওয়ান কোনো এক ডাক্তারের সঙ্গে কি নিয়ে যেন আলাপ করছিল তখন। বেলা নয়টার দিকে আবরার এবং জিমন নিজ বাড়িতে গেল। নীতি এসেছে তখন। কাল ভোর বেলার পর সাফওয়ানের সাথে আর দেখা হয়নি তার। সে আসতেই জিমন এবং আবরার ফিরে গেল। প্রয়োজন সেরে পূণরায় আসবে জানিয়েছে তারা।
দশটার দিকে অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে উপস্থিত দেখা গেল সায়েরী -কে। নীতি অবশ্য স্বস্তি পেল যেন তাকে দেখে। সায়েরী কিছু জিজ্ঞেস করার আগে সে নিজেই হড়বড় করে বলে দিল সাফওয়ানের রাগারাগির ব্যাপারে। সেই সাথে জানাল রাতে মায়ের হাতে অল্প খাবার মুখে তোলার পর এখনো অবধি না খেয়ে আছে সে। একথা শুনে সায়েরীর-ও দুশ্চিন্তা হলো। নীতি তার হাতে গরম খাবারের ট্রে ধরিয়ে দিতেই সে ভয় পেয়ে গেল। গতকালও কতগুলো ধমক শুনতে হয়েছিল। আজ না জানি কি হয়! নীতির জোরাজোরি তে সে ধীর পায়ে সিড়ি বেয়ে উঠে গেল। রুমের দরজা ভিড়িয়ে রাখা। সায়েরী নক করার জন্য হাত তুলতে পারল না। ট্রে টা বেশ ভারী। দরজার ফাঁকে একটুখানি মাথা ঢুকিয়ে সে অবলোকন করলো সাফওয়ানের উপস্থিতি। জানলার পাশে থাকা ডিভানে বসে রয়েছে সে। কানে মোবাইল। বেশ মনযোগ দিয়ে কিছু শুনছে যেন। নত দৃষ্টি ফ্লোরে নিবদ্ধ। সায়েরী ফাঁকা ঢোক গিয়ে গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে গেল। খানিকটা শব্দ তুলে সাফওয়ানের সম্মুখের ছোট্ট টেবিলটার উপর রাখল ট্রে। সাফওয়ান কপালে ভাঁজ ফেলে তাকিয়ে রয়েছে তার দিকে। সায়েরী নিজের মনের ভয় সব মনেই চেপে রাখল। মিনমিন কন্ঠে বলে উঠলো,
‘ সকাল থেকে না খেয়ে আছেন। এসব নীতি আপু পাঠিয়েছে। খেয়ে নিন। আপনি অসুস্থ, মেডিসিন খেতে হবে। ‘
মোবাইলের অপর প্রান্তের ব্যাক্তির কথাগুলো এবারে মনযোগ দিয়ে শুনতে পারলো না বলে মেজাজ বিগড়ে গেল সাফওয়ানের। কান থেকে মোবাইল খানিকটা দূরে সরিয়ে সে ধমকের সুরে বলে উঠলো,
‘ তোমাকে মাতব্বরি করতে বলেছে কেউ? ক্লাস মিস দিয়ে এখানে কি করছো? বের হও। আউট! ‘
সায়েরী’র মন ক্ষুন্ন হয় কথাগুলো শুনে। তবুও সাফওয়ানের মন ভালো নেই ভেবে নিজের মন খারাপকে প্রাধান্য দিল না সে। সাফওয়ান উঠে গিয়ে জানালার দিকে মুখ করে দাঁড়িয়েছে। কথা বলছে ফোনে। সায়েরী রুমের চতুর্দিকে সাফওয়ানের মেডিসিন গুলো খোঁজতে লাগল। ভাগ্যবশত পেয়ে গেল বেড সাইড টেবিলে। সেখান থেকে রায়ানের বলা মেডিসিন দুটো বের করে সে খাবারের প্লেট গুলোর পাশে রাখে। নিজ কাজে মগ্ন সে লক্ষ্য করেনি মোবাইলে কথা শুনতে থাকা সাফওয়ানের হাত মুষ্টিবদ্ধ হচ্ছে। চোখদুটো রক্তাব আকার ধারণ করেছে। কপাল এবং ঘড়ের নীল রগ ফুলে উঠেছে। এমন সময় সায়েরী প্লেট হাতে তুলতে তুলতে বলে উঠে,
‘ কথা পরেও বলা যাবে৷ খেয়ে নিন আগে। অসুস্থ থাকলে কি করে…. ‘
তার অবুঝ মনের কথাটুকু শেষ করার পূর্বে নিজের পাশের টেবিলে সাজানো ফুলদানি টা সজোরে সায়েরীর পায়ের কাছটায় ছুড়ে মারলো সাফওয়ান। গর্জে উঠে ক্ষিপ্ত স্বরে,
‘ বলেছি না বের হয়ে যেতে? কথা কানে যায়না? বের হও! জাস্ট গেট লস্ট!!! ‘
আকস্মিক আক্রমণে সায়েরীর হাতের প্লেট ফসকে পায়ের উপর এসে পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে কাঁচের আঘাতে পা কেটে রক্তের স্রোত নামল ফ্লোর জুড়ে। ব্যাথায় দুই হাতে মুখ চেপে ধরে আর্তনাদ টুকু গিলে ফেলল সায়েরী। সাফওয়ানের সেসব দেখার সময় কই। সে তো গর্জন করামাত্রই বারান্দায় গিয়ে থাই গ্লাস লাগিয়ে দিয়েছে। কিচ্ছুটি নজরে আসল না তার। কাঁচ ভাঙ্গার শব্দটা শুনেও যেন শুনেনি। নিচ থেকে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসলো রায়ান এবং নীতি। ফুলদানি ভাঙ্গার শব্দ এবং সাফওয়ানের গর্জন শুনেই দৌঁড় লাগিয়েছে দুজনে। রুমে উপস্থিত হয়ে সায়েরীকে এই অবস্থায় দেখে দুজনেই স্তব্ধ! এ কি হয়ে গেল! ভালোর জন্য সায়েরীকে পাঠাল। আর সাফওয়ান কি না তার উপরেও এমন রাগ ঝাড়তে পারল!
রায়ান গম্ভীর মুখে বারান্দার দিকে যেতে নিলেই সায়েরী আটকে ফেলল তাকে। মৃদু কন্ঠে বলে উঠলো,
অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৫৩+৫৪
‘ ক..কিছু বলতে হবে না ভাইয়া। উনাকে একা ছেড়ে দিন। অ..আমি! আমি ঠিক আছি। ‘
নীতি অবাক চোখে দেখছে সায়েরীকে। ঠিক আছে বলছে কিন্তু সে স্পষ্ট দেখছে ভয়ে,যন্ত্রণায় থরথর কাঁপছে মেয়েটা। বাথ্যায় দাঁতে দাঁত চেপে রেখেছে। সামান্য কিছুতেও চেঁচিয়ে সবাইকে পাগল বানিয়ে দেওয়া মেয়েটা আজ কেমন শান্ত হয়ে আছে। কিন্তু চোখ থেকে অশ্রু গড়াচ্ছে ঠিকই। কে জানে! এই অশ্রু পায়ের ব্যাথার, না মনের ব্যাথার!
