অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৫৩+৫৪
সাজিয়া জাহান সুবহা
সময়ের বিবর্তনে সেদিনের পর কেটে গেছে আরও তিন দিন। ইরা’র মা পুরোদস্তুর তৈরি ছিলেন পরদিনই ইরা’র অ্যাবোর্শন করাবেন বলে। কিন্তু সৌভাগ্য কিংবা দুর্ভাগ্য বশত সেদিন হাসপাতাল থেকে ফিরার কিছু মুহুর্ত পরই খবর পেলেন ইরা’র নানা হার্ট অ্যাটাক করেছে। এই খবর পেয়ে তিনি দিকবিদিকশুন্য হয়ে তৎক্ষনাৎ রওনা দিলেন বাবার বাড়ি নারায়ণগঞ্জ এর উদ্দেশ্যে। অসময়ে অপ্রত্যাশিত এই খবরটা পাওয়া ভাগ্যের কোনো লীলাখেলা বলেই মনে হলো ইরা’র। নিজের বাবার অসুস্থতায় বাকি দিন দুনিয়া ভুলে বসেছে ইরা’র মা। ইরা নিজেও আগ বাড়িয়ে ঘাটাল না তাকে। বিগত ছয় মাসের তুলনায় এবার আরও বেশি চুপচাপ হয়ে গেল সে। জাদিদ সেদিনের পর আর ফোন করেনি ঠিক। কিন্তু হয়তো নিজের পরিবারের কাছেও জানায় নি ইরা’র ব্যাপারে। তাই তো আগের মতো স্বাভাবিক ভাবে বিয়ের আয়োজন চলছে। ইরা অবশ্য ভেবেছিল নিজ থেকে ফোন করে তার মতামত জেনে নিবে। কিন্তু বেঁচে থাকা স্বল্প আত্মসম্মান টুকু খোয়াতে চাইলো না সে। বিয়ে তো আজ হোক বা কাল হোক, ভেঙ্গেই যাবে। শুধু শুধু যেচে পরে জাদিদের কাছে নিজেকে ছোট করার কি দরকার!
এতকিছুর মাঝে একটা কিছুর পরিবর্তন ঘটেছে মাত্র। তা হলো, পূর্বের মতো অভুক্ত থেকে, অনিয়ম করে নিজেকে এখন কষ্ট দেয়না ইরা। ছোট্ট প্রাণটার প্রতি এখনো বিন্দুমাত্র অনুভূতি জন্মায়নি তার। কিন্তু কোথাও আবার তাকে কষ্ট দিতেও বিবেক বাধা দেয়। বিবেক! না মাতৃত্ব! জানা নেই তার। সে জানতেও চায়না। জীবনের মর্মান্তিক এই মুহূর্তে এই বাচ্চাটার আগমনী বার্তা আরও বেশি পোড়াচ্ছে তাকে। এ যেন অন্য আরেক আপদ তার জীবনের। তার জন্য আবার মিহাদকেও দোষ দেয়া যায়না। সব দোষ তো তারই। নিজের ভালোবাসাকে আটকে রাখার জন্য বিবেক কে ধিক্কার জানিয়ে নিজের সর্বত্র বিলিয়ে দিয়েছিলো সে। কিন্তু বিনিময়ে কি পেলো! সেই পূর্বের ন্যায় অবজ্ঞা, অবহেলা। তাই তো, বাচ্চাটার আগমনী বার্তাও মিহাদকে জানানোর প্রয়োজন বোধ করছে না ইরা। যেখানে মিহাদ অন্য কারো সাথে নতুন সম্পর্কে লিপ্ত, সেখানে ইরা এবং তার ভুলের অংশ হিসেবে এই বাচ্চাটাকে কি মেনে নিবে সে? নিশ্চয়ই না। তাহলে কি দরকার জানিয়ে? কি দরকার আরও একবার যেচে গিয়ে লাঞ্চিত হয়ে ফিরে আসার?
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
হাজারো ভাবনার ভিড়ে তলিয়ে আছে ইরা। এর মাঝে সবচেয়ে উর্ধ্বে আছে মিহাদের প্রতি অকাশ সম অভিমান। যে অভিমানের শাস্তি সরূপ মিহাদকে সে জানাতে চায়না বাচ্চাটার সম্পর্কে। অনেক লড়েছে নিজের সাথে, মিহাদের সাথে, পরিবারের সাথে। কিন্তু কিছুই পরিবর্তন করতে পারেনি। শত লড়াই করেও আজ মিহাদ তার কাছে নেই। আছে কেবল মিহাদের অংশ। যা সে চায়নি। কিন্তু ভাগ্য যখন এতদূর অবধি নিয়েই এসেছে, তাই সামনের পথটুকুও ভাগ্যের উপরই ছেড়ে দিয়েছে সে। এবার যা হবে, তা সে মাথা পেতে নিবে। এবার আর কোনো লড়াই নয়, কোনো প্রতিবাদ নয়। সবটা ভাগ্যের উপর।
ইলেকশনের পর আজ গোটা ছয়টা দিন কেটে গেল। অথচ সাফওয়ানের দেখা নেই। কথা ছিলো পরদিন থেকেই পুরনো রুটিন মাফিক সব চলবে। কিন্তু আজ ছয় দিন পার হতে চললো, কিন্তু সে লাপাত্তা। প্রথম দুদিন ব্যাপারটা স্বাভাবিক ভাবে নিলেও বিগত চারদিন যাবত অস্থির অবস্থা সায়েরীর। তন্মধ্যে সাফ্রিনও পুরোপুরি নেটওয়ার্কের বাইরে। যা সায়েরীর দুশ্চিন্তা বাড়িয়ে দিয়েছে দ্বিগুণ। মনে হচ্ছে কোথাও কিছু একটা ঠিক নেই। আজেবাজে খেয়াল আসছে মন,মস্তিষ্কে। বারবার মনে হচ্ছে হয়তোবা খারাপ কিছু হয়েছে সাফওয়ানের সাথে৷ নয়তো, ফাঁকিবাজ সায়েরী কে আশকারা দিয়ে এমন লাপাত্তা থাকার ছেলে তো নয় সে। তাও প্রায় এক সপ্তাহ! যদি সব ঠিক থেকেই থাকে, তবে এমন গায়েব হয়ে আছে কেনো সে! কেনো ধরা দিচ্ছে না নিজের ছোট্ট প্রেয়সীর কাছে!
‘ সায়ু! সায়ু!!!!!! ‘
নাজরাতের ধাক্কাধাক্কি-তে ভাবনার সুতো কাটলো সায়েরীর। প্রশ্নবিদ্ধ চোখে সে চাইলো নাজরাতের দিকে। তার উদাসীন চেহারা কয়েক দিন ধরেই ভাবাচ্ছে বন্ধুদের। জিজ্ঞেস করলেও উত্তর মিলেনি কোনো। তোহা আজও সায়েরী ঘাড়ে মাথা রেখে আহ্লাদী কন্ঠে জানতে চাইলো,
‘ এমন অফ হয়ে আছিস কেনো? বলনা কি হয়েছে? তোকে এমন দেখলে আমাদের ভালো লাগেনা, জানিস না? ‘
সায়েরী জোর পূর্বক হেসে ধীর কন্ঠে জবাব দিলো,
‘ কিছু হয়নি। ঠিক আছি আমি। ‘
সেকথা শুনে সম্মুখের চেয়ারে বসা নুহাশ মুখ বসা নুহাশ ভ্রুঁ কুঁচকে বলে উঠলো,
‘ কতটা ঠিক আছিস তা দেখতেই পারতেছি। এই যে তোর সামনে বসে দুইটা চিপস সাবাড় করে ফেললাম, সেদিকে নজর-ই নাই তোর। ঠিক থাকলে এতক্ষণে আমার কলিজা টেনে বের করে ফেলতি। করিসনি মানে ডালের বাটিতে কালা জিরা পরেছে। কিন্তু কেনো পরেছে সেটাই জানতে চাই আমরা। ‘
প্রশ্নের তোপ হতে বাঁচার জন্য সায়েরী ব্যাগ নিয়ে উঠে দাঁড়ালো। তাড়া দেখিয়ে বললো,
‘ ফালতু মাথা ঘামাচ্ছিস তোরা। ঘুম হয়নি তাই এমন লাগছে। উঠ, বেল বাজবে এক্ষুনি। চল ক্লাসে যায়। ‘
সায়েরী কিছু জানাবে না তা বুঝতে পেরে হতাশ শ্বাস ফেলে সকলের উঠে দাঁড়ালো। ক্যানটিন থেকে বেরুনোর পথে রওনা হতেই সায়েরীর কানে আসলো ভরা মজলিস হতে কয়েক জন ছেলের কথোপকথন।
‘ আরে সবাই জানতো তৌসিফ চৌধুরী কেমন বাটপার। নওশাদ খান’র ইমেজ ভালো। ক্ষমতা না থাকা অবস্থায়ও সমাজ সেবা করতো। এজন্যই তো সহজে জিতে গিয়েছে। কিন্তু তৌসিফ চৌধুরী আর তার গুন্ডা, মাস্তান ছেলের ইগো হার্ট হয়েছে বলেই অ্যাটেক করেছে। এসব যদিও প্রতি ইলেকশনেই হয়। কিন্তু এবার যা হলো! বাপরে! ভাবতেই আমার গা শিউরে উঠছে। সন্ধ্যা বেলায় আচমকা আক্রমণের জন্য কেউই প্রস্তুত ছিল না। এজন্যই এত বেশি……. ‘
পরবর্তী কথাগুলো শুনার আগেই সায়েরীর হাত টেনে নিয়ে গেল আয়ান। কিন্তু অর্ধেক কথা শুনেই সায়েরী চমকালো, থমকালো। অজানা আশংকায় কেঁপে উঠলো বুক। আয়ানের দিকে লক্ষ্য হতেই সে হাত ঝাড়া দিয়ে ছাড়িয়ে নিলো। বাকিরা ততক্ষণে অনেকখানি এগিয়ে গিয়েছে। আয়ান সায়েরীর দিকে তাকাতেই দেখল সে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলতেই সায়েরী নির্জীব কন্ঠে বলে,
‘ তুই কি আমার কাছ থেকে কিছু লুকাচ্ছিস, আয়ান? ‘
একথায় খানিকটা অপ্রস্তুত হলো আয়ান। কিন্তু সায়েরীর কাছে তা প্রকাশ করল না সে। দৃঢ় কন্ঠে জবাব দিলো,
‘ আমি কি লুকাব? কোন ব্যাপারে কথা বলছিস তুই? ‘
‘ তুই ভালো করেই জানিস আমি কোন ব্যাপারে কথা বলছি। এর আগেও বহুবার জানতে চেয়েছি। আজকে ফের বলছি, আমাকে বল সাফওয়ান ভাই কোথায়? ‘
কন্ঠস্বর নড়ে বড়ে হয়ে উঠেছে সায়েরীর। দৃষ্টি টলমল। আয়ান ফাঁকা ঢোক গিললো তা দেখে। নিজেকে স্বাভাবিক রেখে জবাব দিলো,
‘ তুই না জানলে আমি কি করে জানব বল? আমি জানি না সাফওয়ান ভাই কোথায়। ‘
সায়েরী নিরব চোখে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইলো তার দিকে। এরপর বিনা বাক্যে পা বাড়ালো মাঠের দিকে। ক্লাস করার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই তার। মন, মস্তিষ্ক ভীষণ বিক্ষিপ্ত হয়ে আছে। দুশ্চিন্তায়, দুশ্চিন্তায় শেষ হয়ে যাচ্ছে ভেতরটা। সে কখনো ভাবেনি এভাবে কোনো একদিন সাফওয়ানের জন্য তার মন পুড়বে। এতটা হাহাকার জমবে বুকে। মাত্র ছয় দিনের দুরত্ব দহনে নেতিয়ে পড়েছে সে। মনে হচ্ছে আর একটা দিনের দুরত্বও মেনে নিতে পারবে না তার কোমল মন। এমন হলে সে মরে যাবে, একদম মরে যাবে।
মাঠ অতিক্রম করতে গিয়ে অনার্স ভবনের দিকে একপলক তাকিয়ে চমকে উঠলো সায়েরী। চকচক করে উঠলো দুই চোখ। বারান্দায় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে নীতি এবং রায়ানের অবয়ব। আশার আলোয় দেহের রক্তকণিকা টগবগিয়ে উঠলো তার। বিনা বাক্যে সে একপ্রকার ছুট লাগালো অনার্স ভবনের দিকে। পেছনে থাকা আয়ান বুঝে উঠতে পারলো না কিছু। অগত্য সে নিজেও ছুট লাগালো পিছু পিছু।
নীতি এবং রায়ান বারান্দার রেলিংয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হাতে সাদা রাঙা কয়েকটি পেপার্স। সম্ভবত গুরুত্বপূর্ণ কোনো কিছুর পেপার্স সেসব। দুজনের মুখেও গম্ভীরতার ছাপ। সিরিয়াস কোনো আলাপ চলছিল এমন সময় আচানক তাদের সামনে এসে হাজির হলো সায়েরী। দৌড়ে আসার কারণে হাঁপিয়ে উঠেছে সে। পরপরই উপস্থিত হয়েছে আয়ান। সায়েরীকে এইসময় একদমই আশা করেনি কেউ। তাই আচানক দেখে চমকে উঠেছে। বারান্দার রেলিং ঘেঁষে একটি বেঞ্চের উপর বসে ছিলো জিমন এবং রায়ান। তাদের হাতেও কিছু পেপার্স। সায়েরীকে দেখে তারা মুখ চাওয়া চাওয়ি করে উঠে দাঁড়ালো। চার জনের বিষ্ময় ভাবকে পাত্তা না দিয়ে সায়েরী অস্থির কন্ঠে নীতি’কে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলো,
‘ তুমি আমার ফোন ধরছিলে না কেনো আপু? কত টেক্সট দিয়েছি। তাও দেখলে না। ‘
নীতি আড়চোখে চাইলো বন্ধুদের দিকে। হাতের পেপার্স গুলো রায়ানের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে সায়েরী কাছে এগিয়ে আমতাআমতা করে বললো,
‘ আসলে.. আমি..আমি ব্যস্ত ছিলাম তাই সময় পাইনি দেখার। সরি! ‘
সায়েরী সেকথার বিপরীতে কিছু বললো না। একপলক তাকালো রায়ান,জিমন এবং মিহাদের দিকে। জড়তা কাজ করছে পরবর্তী প্রশ্নটা করতে। কিন্তু আজ সেসবের তোয়াক্কা না করলো না সে। কম্পিত কন্ঠে বললো,
‘ স..সাফওয়ান ভাই! সে কোথায়? ‘
প্রশ্নটা করেই চাতক পাখির ন্যায় তাকিয়ে রইলো সে উত্তরের আশায়৷ অন্যদিকে চার বন্ধু একে অপরের দিকে তাকায় অসহায় চোখে। জবাব না পেয়ে সায়েরীর শ্বাস আটকে আসার জোগাড়। সে কম্পিত কন্ঠে ফের বলে,
‘ ক..কিছু বলছ না কেনো আপু? কোথায় উনি? ঠিক আছে তো? ‘
পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য মিহাদ জোরপূর্বক হেসে জবাব দিলো,
‘ ঠিক থাকবে না কেনো! আলবাত ঠিক আছে। আসলে ইনকোর্সের আগে আমাদের কিছু ইম্পর্ট্যান্ট সি টি (CT) আছে। এসব নিয়েই হয়তো ব্যস্ত সে৷ নাহলে ঠিকই কলেজে আসত। দেখনা, আমরাও কতদিন পর এসেছি। ‘
সায়েরী বিন্দু পরিমাণ বিশ্বাস করলো না সে কথা। যতই ব্যস্ত থাকুক না কেনো। নিজের পড়াশোনার জন্য সায়েরী’র পড়াশোনায় ছাড় দিবে না সাফওয়ান। বিগত দিনগুলোতে এটা বেশ ভালো করে বুঝেছে সায়েরী। তাহলে মিথ্যে বলছে কেনো সকলে তাকে! কি হয়েছে? আদৌ সাফওয়ান ঠিক আছে তো? একথা ভাবতেই দৃষ্টি টলমল করে উঠলো তার। কান্না চেপে রাখার চেষ্টায় কাঁপছে থুতনি। ধরা গলায় সে বলে উঠলো,
‘ তোমরা কেনো মিথ্যে বলছ আমাকে। বলে দাও না, সে কোথায়? ‘
সায়েরীর এহেন প্রতিক্রিয়ায় বন্ধুরা বিষ্ময়ে কিংকর্তব্যবিমুঢ়। সাফওয়ান এবং সায়েরী’র সম্পর্কের ব্যাপারে অবগত নয় তারা। তারা জানত সায়েরীও সাফওয়ানকে পছন্দ করে। কিন্তু পছন্দের উর্ধ্বে গিয়েও যে দুজনের মাঝে কোনো সম্পর্ক রয়েছে সেটা তারা জানত -ই না। তাইতো, সায়েরী কে কাঁদতে দেখে চরম মাত্রায় অবাক হলো তারা। নীতি দ্রুত কাছে এসে গালে হাত রাখল সায়েরী’র। জোর পূর্বক হেসে বলে উঠলো,
‘ বোকা মেয়ে! কাঁদছ কেনো? কিচ্ছু হয়নি সাফওয়ানের। একদম ঠিক আছে সে। ‘
সায়েরী’র অশ্রু বাঁধা মানল না। নিরবে দুই গাল ভিজিয়ে তুলল তার। নীতির কথার বিপরীতে সে ক্রন্দনরত কন্ঠে বলে উঠলো,
‘ মিথ্যা বলছ তোমরা। আমি জানি সে ঠিক নেই। থাকলে এতদিন এভাবে গায়েব হয়ে থাকত না। বলো না, কোথায় সে? ‘
প্রতিউত্তর করার ভাষা পেলো না নীতি। ফ্যালফ্যাল নজরে তাকিয়ে রইলো সায়েরীর দিকে। সকলের এমন নিরবতা, হতাশা দৃষ্টি এড়ালো না সায়েরীর। এসবে তার ভেতরটা আরও বেশি ছটফটিয়ে উঠল অজানা আশংকায়। তার এমন বিধ্বস্ত অবস্থা দেখে জিমন এগিয়ে আসলো। স্নেহের সহিত মাথায় হাত রেখে বললো,
‘ শুধু শুধু চিন্তা করছো তুমি। আমরা বলছি তো সাফওয়ান ঠিক আছে, সুস্থ আছে। কিছুই হয়নি ওর। ‘
বুঝদারের ন্যায় মাথা নাড়ল সায়েরী। কিন্তু অবুঝ কন্ঠে ফের বলে উঠলো,
‘ ঠিক থাকলে একটা কল করুন তাকে। আমি শুধু একবার তার কন্ঠ-টা শুনব। আর কিছু বলব না, সত্যি। একটাবার কন্ঠ-টা শুনব শুধু। প্লিজ ভ..ভাইয়া! ‘
করুণ কন্ঠের হৃদয় বিদারক এই আকুতি শুনে উপস্থিত সকলে থমকে। তারা কেবল সাফওয়ানের একপাক্ষিক অনুভূতি’র সাক্ষী ছিল। সকল উন্মাদনা, অস্থিরতা তারা দেখেছে। কিন্তু কখনো ভাবেনি সাফওয়ানের এই প্রেয়সী তার মতো করেই তার জন্য উন্মাদ হবে, অস্থির হবে, ব্যাকুল হবে। নীতি নিজের বিষ্ময় ভাব ঢেকে বড় অবলীলায় জড়িয়ে ধরলো সায়েরীকে। চুলে হাত বুলিয়ে আশ্বস্ত গলায় বললো,
‘ এত বেশি ভাবতে হবে না সায়েরী ৷ আমরা যখন বলছি সাফওয়ান ঠিক আছে, মানে সে ঠিক আছে। এভাবে কান্নাকাটি করে নিজের বেহাল অবস্থা করো না। সাফওয়ান এসে দেখলে তখন আমাদেরই হাওয়া টাইট করে ছাড়বে।
এটুকু বলে সায়েরীর দুই গাল মুছে দিল সে৷ মৃদু হেসে কন্ঠে খাদ নামিয়ে বললো,
‘ খান সাহেবের অবর্তমানে তার এই ছোট্ট, মিষ্টি প্রেয়সীকে দেখে রাখার দ্বায়িত্ব কিন্তু আমাদের। এবার সে এসে যদি প্রেয়সীকে এই হালে দেখে,তাহলে আমাদের হাল বেহাল করে ছাড়বে। অন্তত আমাদের উপর দয়া,মায়া করে হলেও নিজের যত্ন নাও, প্লিজ। ‘
নীতি’র রসিক কন্ঠের এই বাক্যে না চাইতেও গাল গরম হয়ে উঠলো সায়েরীর। লজ্জায় সে মাথা নুইয়ে ফেললো। তা দেখে নীতি স্বস্তির শ্বাস ফেলে হাসলো। সায়েরী বিদায় নিয়ে বারান্দা পেরিয়ে নেমে গেল সিড়ি বেয়ে। দুজন প্রস্থান করতেই চার বন্ধু বান্ধব মুখ চাওয়া চাওয়ি করে। মিহাদ বুকে হাত চেপে আশ্চর্য কন্ঠে বলে,
‘ ওরে!!! কেউ ধর আমাকে। নির্ঘাত হার্ট ফেইল করব আমি এখন। আমাদের রাগের ভান্ডার টা এই অবুঝ বালিকা কে কেমনে পটিয়ে ফেলল রে! আমি তো ভাবতাম ওর মধ্যে কোনো ইমোশন-ই নাই। কিন্তু তলে তলে যে এই বাচ্চা কাচ্চা মেয়েটাকে পুরোপুরি হাত করে নিবে এটা কে জানত! ওহ মাই গড! এটা কি করে সম্ভব ভাই? কি করে? ‘
ভর সন্ধ্যা। আবছা অন্ধকার রুমের বারান্দার ঝুলন্ত, গোলাকার দোলনা-টাতে দুই পা গুটিয়ে বসে আছে সায়েরী। দৃষ্টি তার দূর আকাশে। আচমকা রুমের বাতি জ্বলে উঠলো। শুনা গেলো নাজরাতের কন্ঠস্বর। আজই সে কলেজ হতে সরাসরি সায়েরীদের বাসায় চলে এসেছে। উদ্দেশ্য একটাই। সায়েরী’র পেট হতে মন খারাপের কারণ বের করা। যা না জানা অবধি তার নিজেরই পেটের ভাত হজম হবে না। নাজরাতের সাথে সাথে পিউ’র কন্ঠও শুনা গেল। দুজন সায়েরীকে ডাকছে। তাদের ডাকাডাকি তে বাধ্য হয়ে রুমে ঢুকলো সায়েরী। দেখল ট্রে-তে করে তিনটে নুডলসের বাটি নিয়ে হাজির হয়েছে নাজরাত। পিউ শুরুতেই হাতিয়ে নিয়েছে একটা। নাজরাত সায়েরী’র দিকে একটা বাটি বাড়িয়ে দিয়ে নিজেও আরাম করে বসলো খাওয়ার জন্য। ফাঁকে একপলক তাকালো সায়েরী’র নির্লিপ্ত মুখটার দিকে। নুডলসের দিকে বিন্দুমাত্র আগ্রহ না দেখে নাজরাত থমথমে গলায় বললো,
‘ হয়েছে কি বলবি তুই? এমনিতে তো রোজ সন্ধ্যায় নিজেই কিচেনে যুদ্ধ চালিয়ে নিজের জন্য নুডলস রান্না করিস৷ শুনলাম ক’দিন যাবত অভ্যাসের অনিয়ম হচ্ছে। আজ আমি এত কষ্ট করে বানিয়ে আনলাম সেটাও খাচ্ছিস না৷ কে তোর পাকা ধানে মই দিয়েছে৷ যার কারণে এমন মুখ লটকিয়ে রেখেছিস শুনি? ‘
সায়েরী নড়েচড়ে বসলো। জবাব দিলো না কোনো। কিন্তু তার পাশ থেকে পিহু খেতে খেতে আশ্চর্য হয়ে নাজরাতের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো,
‘ সে কি কথা! তুই জানিস না কিছু? ‘
নাজরাত ভ্রুঁ কুঁচকে বললো,
‘ তুমি জানো ও কেনো আপসেট হয়ে আছে? ‘
‘ তা তো অবশ্যই জানি। ‘
একথা শুনে নাজরাত অভিমানী কন্ঠে বলে উঠলো,
‘ বাহ! ভালো তো। আমি কে আর জানার। বিয়ে হয়ে গিয়েছে। ক’দিন পর পারমানেন্টলি বিদায় নিব। এখন আর আমাকে ইম্পর্ট্যান্স দিতে হচ্ছে কেনো! ‘
পিউ হাসে ওর কান্ড দেখে। সায়েরী হতাশ শ্বাস ফেলে বলে,
‘ বাজে বকবি না নাজরাত! এমনিতেই ভালো লাগছে না কিছু। ‘
নাজরাত পুণরায় কিছু বলতে নিবে এমন সময় আচমকা ফোন বেজে উঠলো তার। স্ক্রিনে সাদিফের নাম ভেসে উঠতেই সে দ্রুত নুডলসের বাটি রেখে বলে উঠলো,
‘ আমার বর দুই দিন পর ফোন করছে দেখে ঝগড়া টা তুলে রাখলাম। বাকিটা এসে কন্টিনিউ করছি। ‘
বলেই সে উঠে দাঁড়ালো। বারান্দার দিকে পা বাড়িয়েছে এমন সময় হঠাৎ তার সামনে এসে পথ রুখে দাঁড়ায় সায়েরী। ধীর কন্ঠে বলে,
‘ সাদিফ ভাই ফোন দিয়েছে? ‘
‘ সে নয়তো কে! আমার কি আর দশটা, পাঁচটা বর আছে? ‘
একথার বিপরীতে সায়েরী হুট করে বলে উঠলো,
‘ আমাকে দে। আমি কথা বলব। ‘
নাজরাত অবাক হলো ভীষণ। ফ্যালফ্যাল নজরে তাকিয়ে বললো,
‘ আমাদের সাথে কথা বলতে বোম ফাটাতে হচ্ছে মুখে। সেখানে তুই সাদিফের সথে কিসের কথা বলবি? ‘
‘ ত..তেমন কিছু না। ওই..সাফা আর স..সাফওয়ান ভাইয়ের খোঁজ নিব শুধু। ‘
একথা শুনে নাজরাতেরও মন খারাপ হয়। সায়েরীর গাল টেনে বলে,
‘ সাফা’র জন্য টেনশন হচ্ছে? ‘
‘ ভুল বললি। ওর তো সাফওয়ান ভাইয়ের জন্য টেনশন হচ্ছে। ‘
পিউ’র কথায় নাজরাত আনমনে জবাব দিলো, ওহ! পরমুহূর্তেই কি বলেছে তা খেয়াল হতেই সে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে জানতে চাইলো,
‘ কে? কার জন্য টেনশন হচ্ছে? ‘
পিউ কপাল চাপড়ে বলে,
‘ তুই কি এই ব্যাপারেও জানিস না? ‘
নাজরাত আশ্চর্য কন্ঠে বলে,
‘ কোন ব্যাপারে? আরও কি জানার আছে? আর সায়েরী কেনো সাফওয়ান ভাইকে নিয়ে টেনশন করতে যাবে? পাগল হলে নাকি? ‘
পিউ আরাম করে বসে নির্লিপ্ত কণ্ঠে জবাব দিলো,
‘ কেনো টেনশন করছে সেটা তোর বোন ভালো জানে৷ ওকে জিগা। ‘
নাজরাত প্রশ্নবিদ্ধ চোখে সায়েরী’র দিকে তাকায়। না চাইতেও সায়েরী’র এই উদাসীনতা মনে প্রশ্ন জাগিয়ে তুলছে তার। তাকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে সায়েরী মিনমিন কন্ঠে বলে,
‘ স..সাদিফ ভাই কল করছে। ‘
‘ করুক। আগে তুই বল, পিউ দি কি বলছে এসব? তুই কি সত্যিই সাফওয়ান ভাইয়ের জন্য… মানে..আমি বুঝতে পারছি না কিছু। হচ্ছে টা কি এখানে! তুই এমন আপসেট হয়ে আছিস কেনো সেটাই বল আগে। ‘
এই ফাঁকে পিউ দ্রুত দরজার ছিটকিনি লাগিয়ে দিলো। পুণরায় এসে বসলো নিজের যায়গায়। নাজরাতের প্রশ্নে বিরক্ত হয়ে সে বলে উঠলো,
‘ আজব কথাবার্তা। তুই কি জানিস না সায়ু আর সাফওয়ান ভাই রিলেশনশিপে আছে? প্রেমিক লাপাত্তা বলে টেনশন করবে এটা তো স্বাভাবিক ব্যাপার। এমন রিয়েক্ট করছিস কেনো? ‘
অনাকাঙ্ক্ষিত এই বাক্যে নাজরাত জ্ঞান হারাবার জোগাড়। চোখজোড়া ডিম্বাকৃতির ন্যায় বড় বড় হয়ে আছে তার। হাত ফসকে মোবাইলটা পড়ে যেতে নিলে সায়েরী দ্রুত সামলে নিলো সেটা। তার দিকে তাকিয়ে নাজরাত বিষ্ময় কন্ঠে সুধাল,
‘ এ…এসব সত্যি! ‘
সায়েরী জবাব না দিয়ে মাথা নুইয়ে ফেললো। যাতে স্পষ্ট সম্মতি দেখা দিল। তা দেখে নাজরাত ধপ করে বসে পড়লো বিছানায়৷ তার কোনোভাবেই বিশ্বাস হচ্ছে না। পিউ পাশ হতে পানির গ্লাস এগিয়ে দিলো তাকে। পিঠ মালিশ করে দিয়ে বললো,
‘ নে বইন পানি খা। আমিও মিনিট খানিক সেন্সলেস ছিলাম। ব্যাপার না সয়ে যাবে তোরও। ‘
নাজরাত বিনা বাক্যে সবটুকু পানি গিলে ফেললো এক নিঃশ্বাসে। সায়েরীর দিকে তাকিয়ে বিষ্ময় কন্ঠে বলে উঠলো,
‘ এটা কি করে সম্ভব! তোরা দুজনেই দুজনকে অপছন্দ করতি না। দুজনের তাল নেই মিল নেই। স্বভাব, বিহেভিয়ার, মেন্টালিটি কোথাও কোনো কিছুর বিন্দুমাত্র মিল নেই। তাহলে এটা কি করে সম্ভব হলো? ‘
সায়েরীর দৃষ্টি টলমল করে এরূপ কথাগুলো শুনে। ধরা গলায় সে বলে উঠলো,
‘ এ..এভাবে বলছিস কেনো? ‘
‘ তাহলে আর কীভাবে বলবো সায়ু! সাফওয়ান ভাই কেমন তুই জানিস না? এমন রগচটা, গম্ভীর একটা মানুষ উনি। তোর ক্রাশ ছিল জানি। কত মেয়ের ক্রাশ সে। কিন্তু তাই বলে… আমার মাথা কাজ করছে না। তুই..তুই উনার সাথে কমিটেড থাকতে পারবি না। এমন এরোগেন্ট একজনের সাথে তোর মত চঞ্চল মেয়ে কখনো ভালো থাকতেই পারে না। আগেও সব সময় ধমকা ধমকি করতো। বান্ধবীর ভাই বলে মেনে নিয়েছিলাম। কিন্তু তোর সাথে এমন একজন কে আমি কেনো, আবরার ভাই বা পরিবারের অন্য কেউ কখনো মেনে নিবে না দেখিস। ‘
সায়েরীর বুক কেঁপে উঠলো শেষের কথাগুলো শুনে। তাকে কাঁদতে দেখে নাজরাত নরম হলো। হাত বাড়িয়ে গাল মুছে বললো,
‘ কাঁদছিস কেনো! দেখ, আমি তোকে অনেক ভালোবাসি সায়ু। তোর সাথে খারাপ কিছু হোক, তা আমি চাইনা। এজন্যই বলছি, সাফওয়ানের ভাইয়ের চেয়েও বেটার কাউকে ডিজার্ভ করিস তুই। ‘
সায়েরীর মন সায় দিলনা সে কথায়। চোখ বেয়ে অশ্রু গড়াল অবিরাম। এক পর্যায়ে ফুঁপিয়ে উঠলো সে। নাজরাতের বুকে মুখ গুঁজে স্বগোতক্তি করলো,
‘ কিন্তু আমি তাকে ভালোবাসি নাজ! অনেক বেশি ভালোবাসি। বেটার কাউকে লাগবে না আমার। শুধু তাকেই লাগবে। ‘
নাজরাত থমকে গেল একথা শুনে। আশ্চর্য হয়ে ভাবলো, সাফওয়ানকে সবচেয়ে বেশি অপছন্দ করা এই মেয়েটা কবে এতটা ভালোবেসে ফেললো তাকে! সাফওয়ান কবে করলো এই ভালোবাসার বীজ বপণ!
বর্তমান ~
আজ সপ্তাহিক ছুটির দিন। সময়টা এখন বিকেল সাড়ে পাঁচটা। আবরারের সাথে বের হয়েছে সায়েরী। উদ্দেশ্য শপিংমল। প্রায় দেড় ঘন্টা সময় ব্যয় করার পর গিয়ে শেষ হলো তাদের কেনাকাটা। পছন্দ করা কাপড় সব হাতে নিয়ে সবে মাত্র কাউন্টারে যাচ্ছিল, এমন সময় প্রবেশ পথের কাঁচের দরজা ঠেলে ঢুকল পরিচিত একজন। আবরার এবং সায়েরী বহুমাস পর তাকে দেখে অবাক হলো। অন্য পাশের মানুষটারও একই অবস্থা। আবরার অবাক চোখে তাকিয়ে মৃদু কন্ঠে ডাকে, ‘ ইরা! ‘
লাল পাড়ের কালো শাড়ি ইরা’র গায়ে। সুন্দর করে খোঁপায় বাধা চুল। কানে ছোট ছোট দুল, গলায় লকেট যুক্ত চেইন। নাকেও জ্বলজ্বল করছে সাদা স্টোনের নোস পিন। বাম হাতে দুটো মোটা চুড়ি এবং ডান হাতে শোভা পাচ্ছে দামী ব্রান্ডের সিলভার চেইনের লেডিস ওয়াচ। ফর্সা মুখটা চিকচিক করছে লাবণ্যে। স্বাস্থ্য খানিকটা বেড়েছে পূর্বের চেয়ে। কিন্তু তাতেই অত্যাধিক সুন্দর দেখাচ্ছে তাকে। অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে আবরার এবং সায়েরী কে দেখে নিজের বিষ্ময় ভাব কাটিয়ে মুচকি হাসলো ইরা। পরপরই আবরার এগিয়ে আসলো তার দিকে। একপাশ থেকে জড়িয়ে ধরলো আলতো হাতে। উচ্ছ্বসিত কন্ঠে জানতে চাইলো,
‘ কতদিন পর দেখছি তোকে। কেমন আছিস? ‘
‘ দেখতে নিষেধ করেছে কেউ? তোদের তো ইচ্ছেই করে না আমাকে দেখার। ‘
‘ ব্যস্ততা বেড়েছে বুঝিস তো। কেমন আছিস সেটা বল। ‘
ইরা মুচকি হেসে ঝটপট জবাব দিলো,
‘ আলহামদুলিল্লাহ। খুব ভালো আছি।
সায়েরীও এগিয়ে এসে কথা বললো টুকটাক। আবরার একে একে খোঁজ নিচ্ছে ইরা’র। মেয়েটাও হাস্যজ্বল মুখে জবাব দিচ্ছে। একপর্যায়ে আবরারের হাতের গোলাপি রঙের সিল্কের শাড়িটার দিকে চোখ গেলে সে বলে উঠে,
‘ শাড়িটা তো বেশ সুন্দর। কার জন্য এটা? ‘
চোখে মুখে দুষ্টুমি ধরা দিয়েছে তার। আবরার এবং সায়েরী হেসে ফেললো তা দেখে। আবরার মাথা চুলকে জবাব দিলো,
‘ যেন তুই জানিস না কার? ‘
ইরা আবারো হাসলো। সে এই ফ্লোরে পূর্বেই এসে নিজের পছন্দসই শাড়ি, পাঞ্জাবী সিলেক্ট করেছিল। সেসব প্যাক করতে বলে গিয়েছিল অন্য ফ্লোরে। এবার বিল দেওয়ার পালা। একজন সেলসম্যান এসে দুটো প্যাকেট বাড়িয়ে দিলো তার দিকে৷ সে বিল পে করার পরপরই আবরার গেল নিজেদের বিল পে করার জন্য৷ সায়েরী এবং ইরা তখন অন্য পাশে দাঁড়িয়ে। সায়েরী আগ বাড়িয়ে জানতে চাইলো,
‘ একাই এসেছ আপু? ভাইয়া আসেনি? ‘
‘ নাহ। তার এত সময় কোথায়? আজ তাও ছুটির দিন বলে তাকে বাসায় রেখে আমি বের হয়েছি৷ মাত্র দুই ঘন্টা হচ্ছে তাতেই কল দিয়ে দিয়ে অস্থির। আমি একা বের হতেই পারি না….এই দেখ দেখ, আবারো ফোন দিচ্ছে৷ এই ছেলে আমাকে শান্তি দিল না একেবারে। ‘
সায়েরী নিঃশব্দে হাসে। ইরা বিরক্ত মুখে কল রিসিভ করে কানে চাপলো মোবাইল। ওপাশের ব্যাক্তির কথাগুলো শুনে চাপা স্বরে ঝাঁঝালো গলায় বলে উঠলো,
‘ এটুকু ব্যাপারে ফোন দিতে হয়? বলেছি না আসছি? আজ একটা দিন মেইড নেই বলে তুমি সামলাতে পারবে না? ‘
…………
‘ বেশ হয়েছে। আমি পারলে আরও দুই ঘন্টা ঘুরেফিরে আসবো। ‘
…………
‘ না কেনো? এখন না না করছ কেনো? যেভাবে পারো সেভাবে সামলাও। আমি কি করে রোজ সামলায় বুঝো এবার। ‘
‘ হ্যাঁ বাবা আসছি আসছি। আবরারের সাথে দেখা হয়েছিল বলে একটু কথা বলছি। কেনাকাটা শেষ আমার। এক্ষুনি ফিরব আমি। রাখো ফোন। ‘
কল কেটে বড় করে দম নিলো ইরা। সায়েরী বুঝল এবার সে ফিরে যাবে। মোবাইল পার্সে ঢুকিয়ে প্যাকেট সব গুছিয়ে নিলো ইরা। এরপর পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালো সায়েরীর দিকে। নীতি এবং সায়েরীর যেমন বন্ডিং তেমন ইরা’র সাথে নয়। তবুও মেয়েটা পূর্বের চেয়ে অনেক বেশি গুটিয়ে থাকে। আরও কত কত কিছু বদলেছে। ব্যাপার গুলো চোখে লাগার মতো খুব। কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে হুট করে ইরা বলে উঠলো,
‘ তুমি ভালো আছো তো সায়েরী? ‘
আচমকা এমন ঘটা করে এই প্রশ্ন করায় সায়েরী চমকে গেল কিছুটা। কিছুক্ষণ আগেই না একবার হালচাল জানাল! তাহলে আবার কেনো? ইরা’র দিকে তাকিয়ে সে দেখল মেয়েটা কেমন ভাবুক নজরে তাকিয়ে আছে তার দিকে। সায়েরী বুঝল সব। খানিক্ষন পূর্বের মতো মিথ্যে হাসি হেসে ‘ ভালো আছি ‘ বলে দিতে পারল না সে। কোথাও যেন আটকে গেল কন্ঠস্বর৷ আজ বহু মাস পর নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করলো, আসলেই সে ভালো আছে কি?
ভাবনার সুতো কাটলো গালে ইরা’র স্পর্শ পেয়ে। সায়েরীর গালে হাত রেখে সে উদাসীন গলায় বলে উঠলো,
‘ নিয়তি বড্ড নিষ্ঠুর হয় জানো? শেষ সময়ে এসে কেমন সুখ কপালে আছে তা শুরু থেকে জানি না আমরা। শুরু থেকে জানতে পারলে হয়তো তখন এতো কষ্ট পেতাম না। আমরা যাকে সর্বস্ব উজাড় করে ভালোবাসি, মাঝ পথে সে-ই মিলিয়ে যায় কোথাও। বিচ্ছেদের যন্ত্রণা কেমন তা বোধহয় আমার চেয়ে ভালো কেউ জানে না। আমি জানি কেমন এক বিভীষিকা ময় জীবন কাটিয়েছিলাম আমি। প্রতিটা মুহুর্ত মৃত্যু কামণা করেছি। নিজ হাতে প্রাণ নেওয়ার সাধ্য যে ছিলনা। কিন্তু এখন দেখো, অনেক অনেক সুখে আছি আলহামদুলিল্লাহ। সবার জীবনেই একটা না একটা অপ্রাপ্তি থাকে। আমারও আছে। আজীবন থাকবে। কিন্তু সেটা মেনে নিয়েও আমি সুখে আছি, খুশি আছি। তোমার গল্পের শেষটাও সুখকর হবে দেখো। এই যে নির্জীব হয়ে জীবন কাটাচ্ছ, এটার সমাপ্তি হবে খুব তাড়াতাড়ি। আমি দোয়া করি, অনেক অনেক সুখী হবে তুমি। ‘
কথাগুলো বলেই সে আগ বাড়িয়ে জড়িয়ে ধরলো সায়েরী কে। সায়েরী’র একপ্রকার ঘোরের মাঝেই আলতো করে হাত রাখলো ইরা’র পিঠে। আবরার ফিরতেই দুজনের কাছ থেকে বিদায় নিলো সে। আবরার খানিকটা জোর করলো কোথাও বসায় জন্য। কিন্তু ইরা’র তাড়া আছে দেখে আর সম্ভব হলো না। ইরা’র গমন পথের দিকে তাকিয়ে সায়েরী’র অবচেতন মনে প্রশ্ন জাগে,
‘ সত্যিই তার শেষ টা সুখকর হবে তো? ‘
অতীত ~
সায়েরীর স্বীকারোক্তি শুনার পর কিছু মুহুর্তের জন্য থমকে ছিলো নাজরাত। পরবর্তীতে সায়েরীর কান্না থামতেই সে জানতে চাইলো সাফওয়ান এবং সায়েরী’র ব্যাপারে। এবার আর কিচ্ছুটি লুকাল না সায়েরী। অনুভূতি আদান-প্রদান হতে শুরু করে সবটা প্রকাশ করলো সে। চেপে গেল কেবল রোজ সকালে গ্রীণ ভ্যালি যাওয়ার কথাটা। কথাগুলো শুনে নাজরাতের আক্কেলগুড়ুম অবস্থা। বিন্দু পরিমাণ বিশ্বাস হলো না চিরচেনা গম্ভীর পুরুষ টার এমন যত্নশীল দিক। অবাক বিষ্ময়ে সে হা করে কেবল শুনেই গেল। পিউ আগে থেকে জানত কিছু কিছু। কিন্তু আজ গালে হাত দিয়ে পুরোটা শুনতে শুনতে সে কিছু মুহূর্ত পরপরই বলে উঠছে,
‘ হাউ রোমান্টিক! হাউ কিউট! ‘
কথার মাঝে পিউ’র এমন সুর শুনে সায়েরী লজ্জায় লাল হয়৷ পুরনো স্মৃতি চারণ করতে করতে মুহুর্ত গুলোতে ডুবে গেল সে। দীর্ঘক্ষণ কথা শেষ করার পর বাস্তবে ফিরতেই পুণরায় মন খারাপেরা এসে ভীড় করলো মনে। নাজরাত আর কথা বাড়ালো না। যা শুনেছে তাতেই জ্ঞান হারাবে, হারাবে ভাব তার। নাজরাত নিজেকে ধাতস্থ করে কিছু মুহুর্ত পর মোবাইল হাতে নিয়ে চলে গেল বারান্দায়। সাদিফকে কল দিয়ে কথা বললো কিছুক্ষণ। নিজেদের আলাপ শেষে সাফ্রিন এবং সাফওয়ানের কথা উঠতেই সাদিফের পরবর্তী কথাগুলো শুনে নাজরাতের শ্বাস আটকে গেল যেন। চরম উৎকন্ঠায় গলা শুকিয়ে গেল। এই নিয়ে কথা চললো দীর্ঘক্ষণ। কল কেটে রুমে প্রবেশ করতেই মুখোমুখি হলো পিউ’র। নাজরাতের চোখ মুখে যেন সে বুঝে ফেললো সব। নাজরাত লম্বা শ্বাস ফেলে বলে উঠলো,
‘ তুমি জানতে সাফওয়ান ভাই’য়ের ব্যাপারে? ‘
পিউ মাথা দুলিয়ে সায় দেয়,
‘ হুম। জিমন বলেছিল। সায়েরীকে বলিস না কিছু। দেখিসনি কেমন অবস্থা হয়েছে না জেনেই। জানলে কি হবে আল্লাহ মালুম। ‘
‘ এত কিছু হয়ে গেল অথচ আমরা জানলাম না! সাফাও বললো না কিছু। মেয়েটা নিজেই গায়েব। ‘
‘ সেইফটিরও একটা ব্যাপার আছে না। এজন্যই হয়তো চুপ করে আছে সবাই। শুনলাম হসপিটালে কড়া সিকিউরিটি দিয়ে রেখেছে। বলা তো যায় না, কবে কোন দিক থেকে… ‘
পিউ কথা থামল। না বলা কথাটুকু ভেবেই নাজরাত চিন্তায় পড়ে। সাফওয়ানের সাথে বিন্দুমাত্র সখ্যতা নেই তার। বিগত পাঁচ বছরে মাত্র হাতে গুনা কয়েক বার কথা হয়েছে হয়তো। কিন্তু মানুষটা তাদের কাছে সম্মানের। কিছু মুহুর্ত পূর্বে সায়েরী’র জন্য সাফওয়ানকে কে অযোগ্য বলেছে, কারণ কথাটা ভুল নয়। দুই মেরুর দুজনকে তার কাছে একে অপরের অযোগ্য বলেই মনে হয়েছে। কিন্তু তাই বলে এমন নয় যে সাফওয়ানের খারাপ চাইবে সে। বরং সায়েরী’র মুখ হতে তাদের মধ্যকার কথাগুলো শুনে সে সায়েরী এবং সাফওয়ান দুজনের জন্যই চিন্তিত। না জানে এই কথা জানলে সায়েরীর কেমন অবস্থা হবে!
রাত ১২টা বেজে ৪৫ মিনিট। শরীরে ঘাম দিয়ে আচমকা ঘুম ছুটে গেল সায়েরী’র। ভয়াবহ এক দুঃস্বপ্ন দেখে ঘাবড়ে গেল সে। শোয়া থেকে উঠে বসলো দ্রুত। পাশেই নাজরাত গভীর ঘুমে। সায়েরী ঘনঘন শ্বাস ফেলে নিজেকে ধাতস্থ করে। বেড সাইড টেবিল হতে মামপট তুলে নিয়ে ঢকঢক করে পানি গিলে। ড্রিম লাইট জ্বলছে। আবছা অন্ধকারে সে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে কিছু মুহুর্ত। অস্থির ভাব কাটছে না কিছুতেই। দুইহাতে মুখ ঢেকে থম মেরে বসে থাকে সে। বুকের ভিতর টা হু হু করছে। জ্বালা করছে চোখ। গলায় কাছে হরতাল চালাচ্ছে কিছু বেদনাদায়ক অনুভূতি। ফাঁকা ঢোক গিলে সে ধীর কন্ঠে বলে উঠলো,
‘ কোথায় আপনি সাফওয়ান ভাই? কেনো এত কষ্ট দিচ্ছেন? ‘
কথাগুলো’র উত্তর দেওয়ার জন্য মানুষ টা নেই আশেপাশে। কোথায় আছে তাও জানে না সায়েরী। লম্বা শ্বাস টেনে নিজেকে সামলে নিলো সে। অভিমানী মন বলে উঠলো আর কাঁদবে না। কেনো কাঁদবে হৃদয়হীন ওই পুরুষের জন্য? সে যদি সায়েরীকে দূরে রেখেও ভালো থাকতে পারে, তবে সায়েরীও পারবে। খুব পারবে।
ঘুম আসছে না দেখে সে ধীর পায়ে নামলো বেড থেকে। মোবাইলের আলো জ্বালিয়ে নগ্ন পায়ে, নিঃশব্দে বারান্দার দরজা খুলে ঝুলন্ত দোলনায় গিয়ে বসলো সে। দুই হাঁটু বুকে চেপে তাতে মাথা রাখল৷ দৃষ্টি দূর আকাশে৷ ধূসর বর্ণের আকাশে আজ গোলাকার চাঁদের দেখা মিলছে। ভরা জ্যোৎস্না। কেমন এক রোমাঞ্চকর পরিবেশ। অথচ সায়েরীর মনে হচ্ছে এক সমুদ্র বিষাদ ছাড়া তার জীবনে আর কিছু নেই। বিষাদের সমুদ্রে তলিয়ে যাচ্ছে যেন সে।
ভাইব্রেশনে থাকা মোবাইলটা আচমকা কেঁপে উঠলো। ভাবনায় বিভোর সায়েরী চমকে উঠলো কিছুটা। পা নামিয়ে বসে মোবাইল হাতে নিতেই দেখল আননোন একটা নাম্বার হতে কল আসছে। সায়েরী অবাক হলো। এত রাতে অপরিচিত একজন কেনো কল করছে তাকে! চতুর্থ বারের মতো রিং বাজতেই সে রয়েসয়ে রিসিভ করলো। ফোন কানে চেপে নম্র কন্ঠে সালাম দিল। কিন্তু প্রতিউত্তর পেলো না কোনো। পিনপতন নীরবতা অন্য পাশে। বার কয়েক হ্যালো! হ্যালো! বলেও সাড়া পেলো না কোনো। সায়েরী ভেবে পেলো না এসবের মানে কি? বিরক্ত হয়ে কান হতে মোবাইল সরাতে গেলে আচমকা নিরবতা ভঙ্গ করে শোনা গেল সমুদ্রের মতো গভীর কন্ঠের চিরপরিচিত ডাক,
‘ বোকাপাখি! ‘
বজ্রপাতের মতো ঝংকার দিয়ে উঠলো সায়েরীর সর্বাঙ্গ। থরথর করে কাঁপল দেহ। সে চমকাল। থমকাল। বক্ষস্পন্দনের অস্বাভাবিক গতির কাছে হার মানতে চাইল তার শ্বাস – প্রশ্বাস। নিজ কানকে বিশ্বাস করতে পারলো না যেন। শক্ত করে মোবাইলটা কানে চেপে সে মন্ত্রমুগ্ধের মতো ডাকল, ‘ স..সাফওয়ান ভাই! ‘
ভাবল উত্তর পাবে না। কিন্তু তাকে পুণরায় চমকে দিয়ে সাফওয়ান ছোট্ট করে সাড়া দিল, ‘ হুম? ‘
এটুকু সাড়াতে মেয়েটা নেতিয়ে পড়লো। বহুদিন পর আজ মুক্ত পাখিক ন্যায় মুখ দিয়ে শ্বাস টানলো বড় করে। কিন্তু বলতে পারলো না কিছু। অভিমানী বাক্যগুলো কান্নারূপে গলায় আটকে আছে। ঠেলেঠুলে বেরিয়ে আসতে চাইছে তারা। সায়েরী বাঁধা দিলো না। ক্ষণিক পূর্বের ‘ আর কাঁদবে না’ প্রতিশ্রুতি টা ভেঙ্গে সে ডুকরে কেঁদে উঠলো। হু হু করে কাঁদছে। তার কান্নার আওয়াজ উপাশের ব্যাক্তির উপর কেমন প্রভাব ফেলছে তা সে জানে না। জানতে চায় না। সে ব্যস্ত নিজের ভেতরের রাগ, অভিমান, দুঃখ সব কান্না রূপে ঝরিয়ে ফেলতে। সাফওয়ানও আটকাল না তাকে। নিঃশব্দে শুনে গেল কেবল। বেশ অনেক্ষন পর গিয়ে কান্নার গতি খানিকটা কমে আসতেই শুনা গেলো সাফওয়ানের গভীর স্বর,
‘ কাঁদছ কেনো? আমার জন্য? ‘
সায়েরী রাগে কিড়মিড়িয়ে উঠল এই প্রশ্ন শুনে। এতগুলো দিন তাকে দুঃখের সাগরে ভাসিয়ে এখন জানতে চাইছে কেনো কাঁদছে? আদো কি তার কান্না কোনো প্রভাব ফেলেছে এই ছেলের উপর? তীব্র অভিমানে কান্না বাড়লো তার। ক্রন্দনরত অবস্থায় ক্ষুব্ধ কন্ঠে বলে উঠলো,
‘ একদম না। আপনার জন্য কেনো কাঁদতে যাব আমি? আপনি কেন হন আমার? আপনাকে আমি একটুও ভালোবাসি না, সাফওয়ান ভাই। একটু..ও..ন…. ‘
কান্নার তাগিদে কথাটুকু সমাপ্ত করতে পারলো না সে। কিন্তু আচমকা ক্ষণিকের জন্য কান্না ভুলে গেল ফোনের ওপাশ হতে অনাকাঙ্ক্ষিত শব্দ শুনে। হাসির শব্দ। সাফওয়ান হাসছে! সায়েরী’র কান্না শুনেও কিনা হাসছে সে! সায়েরী রাগে, দুঃখে ফের কাঁদে। পরপরই শুনা যায় সাফওয়ানের কৌতুকপূর্ণ কন্ঠ,
‘ আমি তো জানতে চাইনি ভালোবাসার কথা। নিজ থেকেই স্বীকারোক্তি দিচ্ছ? ‘
সায়েরী লজ্জা পেল খানিকটা। কিন্তু দমে গেল না। কান্না অব্যাহত রেখেই রেগেমেগে বলে উঠলো,
‘ কোনো স্বীকারোক্তি দিচ্ছি না। আপনার সাথে কথাও বলতে চাইনা। আমার সামনেও আসতে হবে না আপনাকে । থাকুন যেখানে আছেন সেখানে। আপনাকে কোনো প্রয়োজন নেই আমার। একদম কাছে চাই না আপনাকে। ‘
এটুকু রাগ দেখাতে গিয়েই হাঁপিয়ে উঠেছে সে। শ্বাস ফেলছে বড় বড়। কিন্তু সাফওয়ানের সাড়া নেই কোনো। কেবল এক দীর্ঘ শ্বাসের শব্দ কানে আসলো সায়েরী। এর কিছু সেকেন্ড পর শুনা গেল মানুষটার বিষন্ন কন্ঠ,
‘ কথাও বলতে চাওনা! ফোন রাখি তাহলে? ‘
অভিমানী প্রেয়সীর অভিমান বাড়ে আরও এক ধাপ। মানুষ টা কেনো বুঝতে পারছে না তার অভিমান? এটুকু কথাতেই কি না হার মেনে নিল! এই তার অনুভূতি?
‘ কল কাটব? ‘
‘ জানি না। ‘ কাটকাট কন্ঠের জবাব সায়েরীর।
সাফওয়ান বোধহয় পুণরায় হাসলো। অনেকটা হাসিমাখা কন্ঠেই গভীর স্বরে বললো,
‘ আর তিনটা দিনের দুরত্ব সহ্য হবে ম্যাডাম? অনলি থ্রি ডেইস। এরপর আপনার সব অভিমান, অভিযোগ আমি মাথা পেতে নিব, প্রমিস। ‘
টুকরো টুকরো অভিমান গুলো কোথাও যেন ধূলিসাৎ হয়ে গেল এই কন্ঠে,এই কথাগুলোই। প্রেমময়ী হৃদয়ে পুণরায় বাসা বাঁধল প্রণয় কুমারের চিন্তা। কান্না চেপে ধীর কন্ঠে সে জানতে চাইলো,
‘ কোথায় আপনি? ‘
সেকথা পুরোপুরি এড়িয়ে গিয়ে সাফওয়ান বলে উঠলো,
‘ ঘুমাওনি কেনো এখনো? ক’টা বাজে? ‘
‘ ঘুম ভেঙ্গে গেছে। ‘
‘ ঘুম ভেঙ্গে গিয়েছে! তাও তোমার? ‘ কন্ঠে কৌতুক ধরা দিলো তার।
সায়েরী থমথমে কন্ঠে জবাব দিলো,
‘ খারাপ স্বপ্ন দেখেছিলাম। ‘
‘ এখন ঘুমাও তাহলে। ফোন রাখছি আমি। ‘
‘ ন..নাহ!! আর একটু…ম মানে… ‘
উৎকন্ঠায় কথা জড়িয়ে আসলো তার। বিপরীতে শুনা গেলো সাফওয়ানের দীর্ঘঃশ্বাসের শব্দ। গভীর কন্ঠে সে ডাকল,
‘ সুবহা! ‘
সায়েরী শক্ত করে কানে চাপে মোবাইলটা। এই ডাক যেন সোজা বুকে গিয়ে বিধেছে। মন্ত্রমুগ্ধের মতো চোখ বুজে সে প্রতিউত্তর করলো, ‘ হুম? ‘
‘ আমি ফিরব তো। তিনটা দিন মাত্র। আর কোনো কান্নাকাটি নয়৷ ঘুমাও এবার। ‘
মিনিট খানিক নিরবতার পর সায়েরী নিম্ন কন্ঠে বলে,
‘ আমি অপেক্ষা করব। ‘
সাফওয়ান গভীর স্বরে জবাব দেয়, ‘ জানি তো। ‘
এরপর আবারো নিরবতা। দুজনের মধ্যে কারো মাঝেই হেলদোল দেখা দিল না কল কাটার। ফোন কানে নিয়েই সায়েরী নিঃশব্দে পুণরায় বেডে এসে শুয়েছে। এককাত হয়ে কুশন জড়িয়ে ধরলো সে। কানের নিচে বালিশের উপর চাপা পড়ে আছে মোবাইলটা৷ চোখ বুজে সে সাফওয়ানের উপস্থিতি অনুভব করার প্রচেষ্টায়। কিন্তু মনে পড়ছে, তার কান্নারত মুহুর্তে মানুষটার হাসা,উস্কানিমূলক কথাবার্তা। যা মনে পড়তেই ঘুমের ঘোরে গাল ফোলাল সে। সাফওয়ান কে শুনিয়ে স্পষ্ট কন্ঠে বলে উঠলো,
‘ আপনি একটা খারাপ মানুষ। পাষাণ, নির্দয় লোক। ‘
শেষের কথাটুকু জড়িয়ে আসলো তার। ঘুম পাচ্ছে ভীষণ। গোটা একটা সপ্তাহ পর আজ চোখ ভরে ঘুম আসছে৷ নিশ্চিন্তের, প্রশান্তির ঘুম। সেকেন্ডের মধ্যেই গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল সে। ফোনের অপর প্রান্তে সাফওয়ান স্পষ্ট শুনতে পেলো তার গভীর শ্বাস-প্রশ্বাস। বুঝল, সায়েরী ঘুমিয়ে। কিন্তু কল কাটল না সে। মিনিট খানিক পূর্বে বলা কথাটার রেশ টেনে সে নিম্ন কন্ঠে জবাব দিলো,
‘ এই খারাপ মানুষটার প্রতিটা ভালো লাগা জুড়ে তুমি বোকাপাখি। আমার পাষাণ হৃদয়ের একমাত্র নমনীয়তা। নির্দয় মনের কোমল,প্রেমময়ী সব অনুভূতি কেবল তোমায় ঘিরে। ‘
সকাল নয়টা বেজে বিশ মিনিট। মুখের উপর নরম কিছুর অগণিত স্পর্শে সায়েরী’র ঘুম ছুটে গেল আচমকা। পিটপিট করে চোখ মেলতেই দেখা মিলল নিজ মুখের অতি সন্নিকটে মিনহার আদুরে মুখখানা। মেয়েটা মিটিমিটি হেসে সায়েরী’র লম্বা চুল দিয়ে তার-ই মুখে সুড়সুড়ি দিচ্ছে। সায়েরী চোখ ভর্তি ঘুম নিয়ে পাশ ফিরে। মিনহা এবারে কানে সুড়সুড়ি দিতেই সে মুচড়ে উঠে বিরক্ত কন্ঠে বললো,
‘ মেহু!!! কি সমস্যা? স্কুল না গিয়ে আমাকে বিরক্ত করছিস কেনো? ‘
‘ পেট ব্যাথা তাই আম্মু যেতে দেয়নি। উঠো তুমি। এই দেখো, নাজরাত আপি কিন্তু খুব বকবে লেট করলে। ‘
এ কথায় না চাইতেও চাদর নামিয়ে উঁকি দিয়ে রুমে চোখ বুলালো সায়েরী। ড্রেসিং টেবিলের সামনে কলেজ ইউনিফর্ম পরিহিতা নাজরাত দাঁড়িয়ে। চুলগুলো ভেজা। সাত সকালে গোসল করার অভ্যাস এই মেয়ের। যা ইহজীবনে প্রয়োজন ব্যাতিত করে না সায়েরী। চোখ ফিরিয়ে সে মিনহার দিকে চাইলো। নয় বছরের এই বাচ্চা মেয়েটার পেটে ব্যাথা উঠে হুটহাট। উল্টো পালটা খেতে পারেনা একেবারে। এটুকু শরীরে মেডিসিনে ভর্তি। সায়েরী আচমকা হাত বাড়িয়ে নাদুসনুদুস মেয়েটাকে ঝাপ্টে ধরে নিজের পাশে শুইয়ে দিলো। মিনহা চিৎকার করে উঠে। পেটের দুইপাশে সুড়সুড়ি অনুভব হতেই খিলখিল করে হাসে। সায়েরী নিজ কাজ অব্যাহত রেখেই বলে,
‘ আমার ব্যাগ থেকে চুরি করে চিপস খেলে এমনি হবে৷ কতবার মানা করেছি? তোর জন্য আনি না আমি? হুহ? তবুও আমার টা খাবি কেনো? ‘
মিনহা গড়াগড়ি খেয়ে ছাড়াতে চাইলো নিজেকে। হাসতে হাসতে অধৈর্য কন্ঠে বলে উঠলো, ‘ আপু!! ছাড়ো!! ‘ একপর্যায়ে ছাড় পেয়ে দ্রুত উঠে বসলো সে। বেড থেকে নামতে নামতে সায়েরীর মতোই ভেংচি কেটে বললো,
‘ বেশ করেছি খেয়েছি। আবার রেখো, আরও খাবো। ‘
সায়েরী উঠে বসতে দৌড়ে পালালো সে। নাজরাত দুই বোনের খুনশুটি দেখছিল এতক্ষণ। সায়েরীকে হাসতে দেখে সে জহুরি চোখে তাকিয়ে বলে উঠলো,
‘ রাতে তো কান্নাকাটি করে সাগর বানিয়ে ফেলেছিলি। কিন্তু সকাল সকাল এত খুশি! ব্যাপার কি? ‘
সায়েরীর যেন টনক নড়ল। রাতে তো সে কল না কেটেই ঘুমিয়ে পড়েছিল। সাফওয়ান আর কিছু বলেছিল কি? কথাটা মাথায় আসতেই সে দ্রুত মোবাইল হাতে নিলো। আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করলো রাত একটায় করা কলটা কেটেছে ভোর সাড়ে ছয়টায়। কি আজব! এত ঘন্টা করেছে কি সাফওয়ান?
‘ থম মেরে বসে না থেকে উঠে ফ্রেশ হ। নয়তো আজকেও লেট হয়ে যাব। তোর সাথে যাওয়া মানেই লেট হওয়া। উঠ তাড়াতাড়ি। ‘
সায়েরী ভাবনা চিন্তা ফেলে হাই তুলে বেড ছাড়ে। নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলে,
‘ সাত সকালে এত ঘ্যানঘ্যান করছিস কেনো? রিলেক্স থাক। বাহিরে ঘুরে ফিরে প্রকৃতি উপভোগ কর। দেখ, জীবন টা কত সুন্দর! আহা!! ‘
নাজরাতের চোখ কপালে। এই মেয়ে বলে কি? গোটা একটা সপ্তাহ সবাইকে টেনশনে রেখে, সন্ধ্যা হতে রাত অবধি কেঁদে ভাসিয়ে এখন তাকেই লেকচার দিচ্ছে যে জীবন সুন্দর! মাথার অবশিষ্ট ঘিলু টুকুও কি হারিয়ে বসেছে নাকি?
‘ হয়েছে কি তোর সায়ু? এমন অদ্ভুত আচরণ করছিস কেনো? ‘
সায়েরী দাঁত কেলিয়ে হাসে। জবাব না দিয়ে ঢুকে যায় ওয়াশরুমে। নাজরাত মাথা ঘামাল না বেশি। এই আধ পাগল মেয়েকে নিয়ে মাথা ঘামানোর মানেই হয়না। এখন হয়তো প্রেমে পড়ে পুরোপুরি পাগল হয়ে গেছে। সে ভেবে পায়না, সাফওয়ানের মতো একজন কি করে এই মেয়েকে মন দিয়ে বসলো!
রিংটোন এর শব্দে ঘোর কাটলো তার। আয়ান ফোন করছে। কিন্তু এই অসময়ে কেনো? কিসের এত জরুরি তলব?
রিকশা চলছে কলেজের উদ্দেশ্যে। সায়েরী এবং নাজরাত পাশাপাশি বসে আছে। কলেজের পেছন দিকের রোডে নিয়ে যাওয়া নির্দেশ দিল নাজরাত। সায়েরী অবাক হলো। আজ হঠাৎ পেছন গেইট দিয়ে কেনো ঢুকবে? ওদিকটা সচরাচর খুব কমই ব্যাবহৃত হয়। স্টুডেন্টস দের আনাগোনা থাকে না বললেই চলে। আজ হঠাৎ সেদিকে কেনো যাবে তা ভেবে পেলো না সায়েরী। প্রশ্ন করলেও উত্তর মিললো না নাজরাতের পক্ষ হতে। মেয়েটা চিন্তিত মুখে চুপচাপ বসে আছে। একটা কথাও বলছে না। গন্তব্যে পৌঁছে আগে আগেই নেমে দাঁড়ালো সায়েরী। দেখল, গেইটের কাছে আয়ান,নুহাশ তোহা এবং সাফ্রিন দাঁড়িয়ে। তোহা জড়িয়ে ধরে আছে সাফ্রিন কে। বাকিরা কি কি যেন বলছে। সায়েরী অবাক, বিষ্ময়, উত্তেজনায় ছুটে গেল সেদিকে। সাফ্রিন ফিরে তাকানো মাত্র সায়েরী কাছে গিয়ে জড়িয়ে ধরলো তাকে। অস্থির কন্ঠে বলে বললো,
‘ কোথায় ছিলি তুই? এমনভাবে কেউ উধাও হয়ে যায় নাকি? কত চিন্তায় ছিলাম জানিস? ‘
সাফ্রিন হাসল। ছাড় পেতেই বলে উঠলো,
‘ আয়ানকে তো প্রথম দিনই জানিয়ে ছিলাম সব। বলেনি তোদের? আর নাজরাতের সাথে তো কাল রাতেই কথা
হলো৷ ‘
সায়েরী অবাক চোখে তাকিয়ে। কি কথা হয়েছে! সে কেন জানে না কিছু! আয়ান এবং নাজরাত নজর লুকাল। সায়েরী’র মন ক্ষুন্ন হলো তা দেখে। সে কতটা দুঃশ্চিন্তায় ছিল তা কি জানে না ওরা? এখনো কি দুশ্চিন্তা কমেছে? বরং সাফওয়ানের ক্লান্ত কন্ঠস্বর শুনার পর থেকে আরও বেড়েছে চিন্তা। সদা গম্ভীর, রাশভারি স্বরে কথা বলা মানুষটার কন্ঠ অমন ক্লান্ত, ভারাক্রান্ত শুনাল কেনো এটা ভেবেই ভেতরটা অস্থির হয়ে আছে তার। উপর দিয়ে হাসিখুশি আছে কেবল একটুখানি দুঃশ্চিন্তা মুক্ত হয়েছে বলে। নয়তো সকলে আরও চিন্তায় থাকত তাকে নিয়ে। তপ্ত শ্বাস ফেলে সে ক্ষীণ গলায় বলে উঠলো,
‘ তুই ফোন বন্ধ রেখেছিলি কেনো? বাসায় সবাই ঠিক আছে তো? ‘
ঢিপঢিপ বুকে প্রশ্নটা করেই সে উৎসুক নজরে তাকালো। মনে প্রাণে চাইলো খারাপ কিছু যেন না শুনে। সাফ্রিন কপাল কুঁচকে তাকিয়ে। পূর্বে কখনো তার পরিবার নিয়ে সায়েরীকে এত উতলা হতে দেখেনি সে। আজ কি হলো তবে!
বেল বেজেছে শুনে সাফ্রিন কথা না বাড়িয়ে বলে উঠলো,
‘ যেতে যেতে বলছি, আয়। ‘
বলেই সামনের দিকে অগ্রসর হলো সে। সাথে তোহা এবং নুহাশ। অস্থির হৃদয় নিয়ে সায়েরীও পা বাড়াতে গেলে বেখেয়ালি নজর এক পলকের জন্য থামে গেইট হতে বিশ – পাঁচিশ হাত দুরত্বে দাঁড়ানো চকচকে কালো টয়েটো গাড়িটার দিকে। সবে মাত্র ব্যাক সিট হতে মোবাইল কানে চেপে বেরিয়ে আসা মানুষটাকে দেখে সায়েরী জমে গেল নিজ স্থানে। ফিরিয়ে নেওয়া নজর দ্রুত গতিতে ফের ঘুরাল। বিষ্ময় দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে ভাবল, এ কি তার ভ্রম! না সত্যি সত্যিই মানুষটা তার সম্মুখে দাঁড়িয়ে আছে! অস্থিরতা, উত্তেজনায় হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিকভাবে লাফাচ্ছে তার। বুকের ভিতর হরতাল চলছে যেন। আচমকা মাথায় স্পর্শ পেলো কারো। সায়েরী তাকাল না সেদিকে। কিন্তু কানে আসলো আয়ানের ফিচেল কন্ঠ,
‘ এতদিন তো কেঁদে ভাসিয়ে দিচ্ছিলি। এখন দাঁড়িয়ে আছিস কেনো? যা!! ‘
সায়েরী’র হৃদস্পন্দন বোধহয় থমকাল এই কথায়। এটা তবে তার ভ্রম নয়। সব সত্যি! সত্যিই সাফওয়ান এসেছে! উত্তেজনায় থরথর কাঁপছে তার তনু। সুখ,দুঃখ, দুঃশ্চিন্তা, অভিমান সকল অনুভূতির সংমিশ্রণে সায়েরীর দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসলো। পেছন হতে তোহা ডাকছে তাদের। আজ সায়েরী বিন্দুমাত্র পরোয়া করলো না কিছুর। স্থান, কাল, বন্ধুবান্ধব সবাইকে উপেক্ষা করে আচমকা ছুটে গেলো সামনের দিকে। গাড়ির পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল সাফওয়ান। ফোনালাপ চলছিল বলে আশেপাশে খেয়াল ছিল না তার। এমন সময় ঝড়ের গতিতে বুকের উপর কেউ ঝাপিয়ে পড়তেই চমকে উঠলো সে। অপ্রস্তুত থাকায় পিছিয়ে গেল কয়েক কদম। সেকেন্ড দুয়েক মস্তিষ্ক ফাঁকা ফাঁকা ঠেকল তার। পরপরই চেনা পরিচিত স্পর্শ, পরিচিত সুভাসে থমকাল সে। চোখ বুজে হেসে ফেললো নিঃশব্দে। অবচেতনে হাত উঠে আসলো মেয়েলি দেহের পৃষ্ঠদেশে। মেয়েটা দুইহাতে তার গলা জড়িয়ে ধরে কাঁধে মুখ গুজেছে। মাটি হতে কয়েক ইঞ্চি উপরে ভাসছে তার পা জুড়া। সাফওয়ান অনাসয়ে মুখ ডুবাল মেয়েলি, ছোট্ট কাঁধে। গভীর কন্ঠে ডাকল, সুবহা!!
সঙ্গে সঙ্গে ফুঁপিয়ে উঠলো সায়েরী। প্রসস্থ কাঁধ টাতে শক্ত করে মুখ গুঁজে শব্দ করে কেঁদে উঠলো সে। সাফওয়ান পুণরায় হাসে। দুই হাতে শক্ত করে জড়িয়ে রাখে সায়েরীর দেহ। মেয়েটার দেহের সবটুকু ভার তার উপর৷ সাফওয়ান চোখ কুঁচকে শ্বাস টানল। কেমন এক ক্লান্ত স্বরে বলে উঠলো,
‘ বোকাপাখি! ব্যাথা লাগছে তো। ‘
সহসা কান্না থামে সায়েরী’র। চট করে মাথা তুলে তাকালো সে। মুখের অতি সন্নিকটে সাফওয়ানের মুখ। সফেদ ব্যান্ডেজ দ্বারা গোল করে মোড়ানো তার কপাল। ডানপাশে কপাল ফুলে আছে রক্তাক্ত তূলা,ব্যান্ডেজে।এহেন দৃশ্যে সায়েরী’র বুকের ভিতরটা ধ্বক করে উঠলো। নড়েচড়ে উঠতেই সাফওয়ান তার কোমর হতে হাত সরিয়ে নামিয়ে দিলো তাকে। সায়েরী তখনো তার গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে। প্রশ্নবিদ্ধ চোখে ফ্যালফ্যাল নজরে তাকিয়ে আছে সে। সপ্তাহ খানিকের অবহেলায় সাফওয়ানের ফর্সা গালে অল্প সংখ্যক অগোছালো দাড়ি গজিয়েছে। সর্বদা ক্লিন সেভ থাকা মুখটাতে ক্ষত চিহ্নের কালসিটে দাগ দেখা যাচ্ছে। অবাক, বিষ্ময়ে সায়েরী একবুক অস্থিরতা নিয়ে বলে উঠলো,
‘ ক..কপালে ব্যান্ডেজ কেনো আপনার? কি হয়েছে? কোথায় ব্যাথা পেয়েছেন? ‘
সাফওয়ান জবাব দিল না। আশেপাশে তাকালো তীক্ষ্ণ নজরে। গেইটের কাছে নজর যেতেই দ্রুত দৃষ্টি ফিরিয়ে হাত ধরলো সায়েরীর। গাড়ির ব্যাক সিটের দরজা খুলে তাকে ঠেলে বসিয়ে দিলো ভেতরে। মেয়েটা অস্থির চিত্তে একের পর এক প্রশ্ন করে যাচ্ছে। সাফওয়ান নিজেও উঠে বসলো পাশে। সামনে ড্রাইভার বসা। দুজন বসা মাত্র গাড়ি ছুটল অজানা গন্তব্যে।
গেইটের কাছটাতে থমকে দাঁড়িয়ে আছে পাঁচ মানব মানবী। ক্ষণিক পূর্বে দেখা দৃশ্যটা সকলের জন্য অপ্রত্যাশিত ছিল। ভীষণ রকমের অপ্রত্যাশিত। নাজরাত এবং আয়ান পূর্ব হতে অবগত থাকলেও সাফওয়ান এবং সায়েরী’র এহেন ঘনিষ্ঠতা দেখে দুজনেই বাকহারা। বিপরীত স্বভাবের দুজন কি করে একে অপরের সাথে মানিয়ে নিচ্ছে এমন প্রশ্ন কিলবিল করছিল তাদের মস্তিষ্কে। কিন্তু আজকের এই দৃশ্য, সায়েরীর অস্থিরতা, সাফওয়ানের সামলে নেওয়া সবটা দেখে ভারী অবাক তারা।
সম্পর্কের এই গভীরতার একমাত্র কাটি যে সাফওয়ানের বিচক্ষণতা, ধৈর্যশীলতা তা বুঝতে বাকি নেয় আর। সায়েরীর মতো ছটফটে, বোকা মেয়েটার জন্য সাফওয়ানের চেয়ে ভালো সঙ্গী বোধহয় আর হতেই পারে না। আজ গিয়ে ব্যাপারটা বেশ ভালো ভাবে উপলব্ধি করতে পারছে তারা৷ বুক ভরে শ্বাস ফেলে দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেললো। পরপরই নজর গেলো নুহাশ,তোহা এবং সাফ্রিন এর দিকে। আহাম্মকের মতো হা মুখ করে শূন্য রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছে তারা। আয়ান এবং নাজরাত পুণরায় তাকালো একে অপরের দিকে৷ এবার ঠোঁট চেপে হাসল তারা। অনাকাঙ্ক্ষিত এই দৃশ্য দেখে তারা যতদূর চমকেছে, আসল কাহিনী জানিয়ে আরও চমকে দেওয়ার পালা এবার। এরাও হয়তো প্রশ্নের ঝুলি নিয়ে বসবে..
‘ এ কি হলো? কবে হলো? কীভাবে হলো? দুনিয়াতে এত কেউ থাকতে শেষ কিনা সাফওয়ান ভাই আর সায়েরী? এটা কি করে সম্ভব? ‘
সাফওয়ান গাড়িতে বসার পর থেকেই সায়েরী নির্বাক চোখে তাকিয়ে রয়েছে তার দিকে। নিরবে কেবল গাল ভিজছে তার। সাফওয়ানের হাতেও ক্ষত চিহ্নের কালসিটে দাগ। ডান হাতের তালু হতে কব্জি অবধি ইয়া মোটা ব্যান্ডেজ। আর কোথায় কোথায় লেগেছে কে জানে। গাড়িতে উঠেছে অবধি এসবই দেখে যাচ্ছে সায়েরী। আচমকা মাঝপথে গাড়ি থেমে গেলো। ড্রাইভার নেমে গেল নিঃশব্দে। সায়েরী বুঝে উঠতে পারলো না কারণ কি। এমন নিরিবিলি স্থানে গাড়ি থামিয়েছে কেনো? মাত্রই না উঠলো!
ভাবনার মাঝে কোমরে উষ্ণ হাতের ছোঁয়া পেতেই ঘাড় ফিরিয়ে তাকালো সে৷ ততক্ষণে সাফওয়ানের পোক্ত হাতের টানে সে বাহুবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে। অভিমানী, ঝাপসা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সাফওয়ানের দিকে। যা দেখে মাথা ঝুঁকাল সাফওয়ান। খসখসে ডান হাত দ্বারা অশ্রুসিক্ত গালজোড়া মুছে ধীর কন্ঠে সুধাল,
‘ তিন দিনের অপেক্ষা না করিয়ে আজকেই চলে এসেছি। তবে এখনো এই কান্নাকাটি কীসের? হুহ? ‘
সায়েরীর অশ্রু যেন দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেলো। আটকে রাখার চেষ্টায় কাঁপল ওষ্ঠযুগল৷ নাকের পাটা ফুলে ফুলে উঠছে। সাফওয়ান ফের কিছু বলার আগে পুণরায় দুইহাতে তার গলা জড়িয়ে ধরলো সায়েরী। পূর্বের ন্যায় শব্দ করে কাঁদছে মেয়েটা। কন্ঠে উপচে পড়ছে সমুদ্রের ন্যায় অভিমান,
‘ আপনি জানেন আমি কতটা ভয় পেয়েছিলাম? কত খারাপ চিন্তা এসেছিল মাথায়! সবার কাছে জানতে চেয়েছি আপনার ব্যাপারে। কিন্তু কেউ বলেনি৷ সবাই শুধু মিথ্যে বলেছিল, যে আপনি ঠিক আছেন। ‘
স্বভাবগত ভাবে আজও সায়েরীর পাঞ্চ ক্লিপটা খুলে এলোকেশ সব পিঠময় ছড়িয়ে দিল সাফওয়ান। তাতে হাত ডুবিয়ে ছোট্ট করে জবাব দিলো,
‘ ঠিক-ই তো আছি। ‘
সায়েরী ফুঁসে ওঠে এহেন জবাবে। মুখ তুলে চোখে চোখ রাখে৷ ক্রন্দনরত কন্ঠে জবাব দেয়,
‘ খুব ভালো করে দেখতে পাচ্ছি কেমন ঠিক আছেন। এত ব্যান্ডেজ! র..রক্ত! এসব কীভাবে হয়েছে, বলুন? ‘
সাফওয়ান তাকিয়ে থাকে অনিমেষ। কাঁদলে মেয়েটাকে অদ্ভুত সুন্দর লাগে। উঁহু! সবসময় না। তখন, যখন কান্নার কারণটা একমাত্র সাফওয়ান হয়, ঠিক তখন। লম্বা লম্বা ভেজা পাপড়িযুক্ত আঁখিদুটি তার অন্যতম আকর্ষণ। এদের সম্মোহনী দৃষ্টিতে জান কোরবান করার ক্ষমতা আছে যেন। নাক,গাল বেয়ে দৃষ্টি নামে কম্পিত অধর যুগলে। যা দেখে শুষ্ক ঢোক গিলে গলা ভেজাল সাফওয়ান। ফের দৃষ্টি মিলাল সায়েরীর সাথে। তার এমন নিরবতায় সায়েরী ছটফট করতে করতে বলে উঠলো,
‘ বলছেন না কেনো? কীভাবে এত আঘাত পেয়েছেন? ‘
সাফওয়ান জোর করে ধরে রাখে তাকে। ব্যান্ডেজ যুক্ত হাতে শক্তি প্রয়োগ করছে দেখে সায়েরী দ্রুত গলায় বলে উঠলো,
‘ এমন করছেন কেনো? ব্যথা পাবেন তো! ‘
‘ সরে যাচ্ছ কেনো তাহলে? ‘
অধৈর্য কন্ঠ সাফওয়ানের। সে সত্যিই ব্যাথা পেয়েছে। অগত্যা সায়েরী লেপ্টে রইল তার বুকের সঙ্গে। ঝাপসা নয়নে সে সাফওয়ানের মুখের ক্ষত চিহ্নগুলোতে চোখ বুলাচ্ছে। একপর্যায়ে হাত উঠিয়ে আলতো করে স্পর্শ করে তাতে। সাফওয়ান চোখ বুজতেই হতদন্ত করে হাত সরিয়ে ব্যথিত কন্ঠে সুধাল, ‘ ব্যথা লেগেছে? ‘
সাফওয়ান চোখে মেলে তাকালো। প্রেয়সীর চোখ দুটোতে উপচে পড়া দুঃশ্চিন্তা দেখে একটুখানি হাসলো সে৷ সায়েরীর কোমর হতে এক হাত উঠিয়ে ধীর গতিতে তা ডুবিয়ে দিলো ঘাড়ের পেছনে। অতঃপর আদুরে মুখশ্রী টা আরও কাছে টেনে নিলো। মাখনের মতো নরম গালটাতে ঘষল নিজের শক্তপোক্ত গাল। পরপর আবার কানের লতিতে ঠোঁট ছুঁইয়ে গভীর কন্ঠে জবাব দিলো,
‘ আমার সকল ব্যাথায় প্রতিকার যে, তার ছোঁয়ায় ব্যথা নয়, প্রাণ ফিরে পাই। ‘
অনাকাঙ্ক্ষিত এই স্পর্শে, এই বাক্যে সায়েরী’র দেহ কাঁপছে দৃশ্যমান রূপে। নিশ্বাসের গতি অস্বাভাবিক তার। কম্পিত হাতে খামচে ধরল সাফওয়ানের বাহু। সাফওয়ান একপলক তাকালো সায়েরী’র বন্ধ চোখের পানে। পুণরায় গালে গাল ঘঁষল সে। নিম্ন কন্ঠে সুধাল,
‘ মিস করছিলে? ‘
সায়েরী একপ্রকার ঘোরের মাঝেই জবাব দিলো, ‘ হুম। ‘
সাফওয়ানের একহাত তখনও সায়েরীর গলা,ঘাড় সংলগ্ন স্থানে। খুব ধীরে তা চুলের ভাঁজে সঞ্চালন করার তাগিদে নড়েচড়ে উঠতেই সাফওয়ানের মনযোগে কাড়ে অন্যকিছু। দৃষ্টি নামাতেই চোখের সামনে জ্বলজ্বল করে তার অন্যতম দুর্বলতা। সায়েরীর বাম ঘাড়ের লাল,কালো তিল দুটো। দেখেই বারকয়েক ঢোক গিললো সাফওয়ান। বুকজুড়ে অস্থিরতা বিরাজ করছে তার। নিশপিশ করছে পুরুষ সত্তা। আজ তাকে একটুখানি আশকারা দিল সে। সরু আঙ্গুলের সাহায্যে ছুঁয়ে দিলো তিল দুটো। তাতেই মেয়েটা ছটফটিয়ে উঠল অদ্ভুত ভঙ্গিমায়। সাফওয়ান দ্রুত হাত সরাল। সায়েরীকে ছেড়ে নিজের অস্থিরতা সামলানোর চেষ্টায় বেখেয়ালিতে বুকে চাপ পড়তেই অস্পষ্ট আওয়াজ করলো সে। সায়েরী চমকে উঠলো। সাফওয়ান বুকের বাম পাশে হাত চেপে চোখ কুঁচকে রেখেছে দেখে চিত্ত চনমনে হলো তার। অস্থির কন্ঠে বারকয়েক সুধাল,
‘ কি হয়েছে? কোথায় ব্যথা পেয়েছেন? ‘
সাফওয়ানের জবাব না পেয়ে সায়েরী জোর করে হাত সরাল তার। নির্বিকারে শার্টের বোতাম উন্মুক্ত করলো পরপর তিনটা। শুরুতেই নজর কাড়ল পুরনো ক্ষত চিহ্নের দাগটা। এরপর বাম পাশ হতে শার্ট সরাতেই আৎকে উঠলো সে। ইয়া মোটা ব্যান্ডেজ দ্বারা আবৃত বুকের বাম পাশ। তুলো পুরোটা ভিজে আছে শুকনো রক্তে। সায়েরীর শরীর যেন সেখানেই জমে গেল। এত এত আঘাত কি করে পেলো সাফওয়ান ভাই? কেন সে খোলাসা করছে না কিছু?
পুণরায় তার চোখে অশ্রু জমতেই সাফওয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বোতাম লাগাল শার্টের। হাত বাড়িয়ে মেয়েটাকে কাছে টানতে চাইতেই ঝটকা মেরে তা সরিয়ে দিলো সায়েরী। ছলছল চোখে তাকিয়ে, তেজস্বী কন্ঠে বলে উঠলো,
‘ ছোঁবেন না আমাকে। আগে বলুন এসব কীভাবে হয়েছে? ‘
‘ সুবহা! আমার কথা শু… ‘
‘ আমি যা জানতে চেয়েছি, সেটাই বলুন আগে। এত এত আঘাত কি করে পেয়েছেন? ‘
‘ সিরিয়াস কিছু না। ছোট্ট এক্সি… ‘
‘ বলতে হবে না। কিচ্ছু শুনতে চাইনা আমি। ‘
একথা বলার সঙ্গে সঙ্গে গাড়ির দরজা খুলে ফেললো সায়েরী। বের হতে নিলেই পেছন থেকে আঘাতপ্রাপ্ত হাত দিয়েই তাকে ঝাপটে ধরলো সাফওয়ান। অন্যহাতে দরজা বন্ধ করে দিল পুণরায়। মেয়েটা ছটফট করছে, পাখির কিচিরমিচির এর ন্যায় ঝগড়া করছে। উপায়ন্তর না পেয়ে সাফওয়ান একহাতে পেট জড়িয়ে ধরে কাছে টেনে বলে দিল সত্যটা,
‘ আমার গাড়ির ব্রেক ফেইল করিয়েছিল কেউ। তাতেই এক্সিডেন্ট করেছি। ‘
সহসা চমকে উঠে থমকে গেল সায়েরী। ব্রেক ফেইল! এটা কি সাধারণ কিছু! হতবাক তাকে পুণরায় বুকে টেনে নিলো সাফওয়ান। তপ্ত শ্বাস ফেলে একে একে বলতে আরম্ভ করল সব। মূলত ইলেকশনের দিন ঘটেছিল এই দুর্ঘটনা। প্রথমে সন্ধ্যা বেলায় অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে দলের ছেলেদের উপর বিপক্ষ দলের আক্রমণ। সেদিক সামলাতে গিয়ে অল্প সল্প ব্যথা পেয়েছিল। কিন্তু এই ফাঁকে তার গাড়ির ব্রেক ফেইল করে রাখবে সে কথা কে জানত! যতক্ষণে টের পেয়েছিল,তখন হাইওয়ে তে দ্রুত গতিতে ছুটছে গাড়ি। উপায়ান্তর না পেয়ে মাঝ রাস্তাতেই ঝাঁপিয়ে পড়েছিল সাফওয়ান। পাথরের সাথে আঘাত লেগে কপাল ফাটল। সেই সঙ্গে বুকে বিধল সরু কিছু একটা। দেহের অন্যান্য যায়গায়ও ব্যথা পেয়েছে।
কিন্তু হাতে,কপালে এবং বুকের আঘাত গুরুতর। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে ঘটনা স্থলেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল সে। টানা দুই দিন পর জ্ঞান ফিরেছিল তাও অল্প সময়ের জন্য। চার দিনের মাথায় গিয়ে পুরোপুরি চোখ মেলে তাকিয়েছে, কথা বলেছে। সব কথা শুনে সায়েরী পুরোপুরি বিবশ হয়ে রইলো। নিরবে কাঁদল দীর্ঘক্ষণ। যদি সাফওয়ান ভাই গাড়ি হতে ঝাপিয়ে না পড়তো, তাহলে কি হতো? কিংবা মাথার আঘাত যদি আরও গুরুতর হতো, তাহলে! ভাবতেও বুক ধরফর করছে তার৷ সাফওয়ান বেশ কসরতে প্রেয়সীর কান্না থামাল। থেমে গিয়েও বেশ কয়েক সেকেন্ড নিরব রইলো সায়েরী। গুটিয়ে রইলো সাফওয়ানের প্রসস্থ বুকটাতে। এরপর আশ্চর্য হয়ে বলে উঠলো,
‘ এখন তো মাত্র সাতদিন হয়েছে। মানে আপনাকে রিলিজ দেয়নি এখনও? ‘
সাফওয়ান মাথা নাড়ে। তা দেখেই সায়েরী ফুঁসে উঠল,
‘ তাহলে আপনি এখানে কি করছেন? কেনো এসেছেন অসুস্থ শরীর নিয়ে? ‘
‘ অবশ্যই তোমার জন্য। ‘
‘ ডায়লগ বাজি করবেন না একদম। আমি কখন বলেছি আসার জন্য? ‘
সাফওয়ান ভ্রুঁ কুঁচকে তাকায়। আসার পর থেকেই তার উপর অতী মাত্রায় রাগ ঝাড়ছে এই মেয়ে। বিন্দুমাত্র ভয় পাচ্ছে না। ফুঁস করে শ্বাস ফেললো সে। মেয়েটার এই বিধ্বস্ত মুখ দেখে ধমক দিতেও মন চাচ্ছে না তার। আজ কেবল আদর পাচ্ছে। ভাবতে ভাবতেই পূর্বের ন্যায় কোমর টেনে কাছে নিয়ে আসলো সায়েরীকে৷ মেয়েটার ছটফট ভাবকে পাত্তা না দিয়ে মুখোমুখি হয়ে হাত রাখল ঘাড়ের নিচে। ফিসফিস কন্ঠে বললো,
‘ শুনলাম আমার বন্ধুদের সামনে কেঁদেকেটে আমার সাথে কথা বলতে চেয়েছ। কি যেন বলেছিলে….সে ইট এগেইন। ‘
সায়েরী ব্যাপক লজ্জা পেল। চোখ বুজল শক্ত করে৷ অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে জবাব দিলো,
‘ ম..মিথ্যে কথা। আমি মোটেও এমন কিছু করিনি৷ ‘
সাফওয়ান হাসে। সায়েরীর থুতনি উঁচু করে নাকে নাক ঘষল সে। গভীর কন্ঠে বললো,
‘ মিহাদ জানতে চেয়েছে এমন কোন স্পেশাল ডোজ দিয়ে এই বাচ্চা মেয়েটাকে বশ করে ফেললাম। কিন্তু আমি তো কোনো ডোজ দেইনি। ভাবছি, অপবাদ যখন পেয়েই গিয়েছি, এবার তাহলে দিয়েই দিই, কেমন? ‘
সায়েরী’র বুক কাঁপে এহেন বাক্যে। কিসের ডোজ! কেমন ডোজ! উৎকন্ঠায় গলা শুকিয়ে আসল তার। তোলপাড় চলছে বুকে। মুখের উপর সাফওয়ানের উষ্ণ নিশ্বাস পড়ছে ঘনঘন। আজকে এমন আচরণ করছে কেনো এই ছেলে? নিশ্চয়ই মেডিসিনের প্রভাব কাটেনি এখনো। নয়তো সুস্থ, স্বাভাবিক সাফওয়ান কি আর এমন উন্মাদ প্রেমিক হয়ে ধরা দেয় কখনো! কল্পনায় বিভোর তার রক্ত ছলকে উঠল নিজ অধরের সন্নিকটে সাফওয়ানের অধরের উপস্থিতি ঠের পেয়ে। কেবল ইঞ্চি দুয়েক দুরত্ব দুটোতে। নড়াচড়ার ক্ষমতা হারিয়ে শক্ত করে চোখ বুজে ফেললো সায়েরী। শ্বাস আটকে পড়ে রইলো সাফওয়ানের বাহুবন্ধনে।
সেকেন্ড দুয়েকের তফাৎ-এ অনুভব করলো তার থুতনিতে উষ্ণ, কোমল এক স্পর্শ। যা তার সর্বাঙ্গে কাঁপন ধরিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। এটুকুতেই সমাপ্তি নয়, বরং আটকে রাখা শ্বাসটুকু পুরোপুরি থমকে দিয়ে তার নরম গালেও ঠোঁট ডোবাল সাফওয়ান। সেটা ছিলো শব্দ সহ, শক্ত এক চুমু। তাতেই মেয়েটা ঢলে পড়েছে। দেহের ভার ছেড়ে দিয়েছে পুরোপুরি। সাফওয়ানের ছোঁয়া গুলো এত বেশি উষ্ণ যে সায়েরীর বুঝতে বাকি রইলো না, তার দেহে জ্বর বিদ্যমান এখনো। কিন্তু এই জ্বরের উত্তাপ যে সায়েরীকে ঝলসে দিবে তা কে জানত! মেয়েটা থম মেরে রইলো সাফওয়ানের বুকে। এই অল্প স্বল্প ছোঁয়াতে মেয়েটার নাজেহাল অবস্থা দেখে সাফওয়ান হেসে ফেললো। নাকে নাক ঘষে বলে উঠলো,
‘ এটুকুতেই কপোকাত! সারাজীবন তো পরেই আছে। ‘
দুপুর ১টা বেজে ২৭ মিনিট। কলেজের নিকটবর্তী একটি রেস্টুরেন্টের গোলাকার এক টেবিল দখল করে বসে আছে ৬ বন্ধুবান্ধব। তন্মধ্যে তোহা,নুহাশ এবং সাফ্রিনের মুখশ্রী অত্যন্ত গম্ভীর। নুহাশের সাদা ইউনিফর্মের তিনটে বোতাম এলোমেলো ভাবে খোলা। ঝাকড়া চুলগুলো এলোমেলো হয়ে তার মধ্যে চেপে বসেছে একটি আইস ব্যাগ। ছেলেটার বিষ্ময়কর, বিমূঢ় দৃষ্টি আধ ঘন্টা যাবত স্থির হয়ে আছে সায়েরীর দিকে। শুধু সে নয়। তোহা এবং সাফ্রিনও অদ্ভুত চোখে তাকিয়ে। তাদের এহেন চাহনীতে সায়েরী লজ্জা, অস্বস্তিতে পারছে না মাটি ফাঁক করে নিজেকে গেড়ে ফেলতে। ম্যানু কার্ড দিয়ে নিজের মুখ আড়াল করে থেমে থেমে উঁকিঝুঁকি মারছে বেচারি। অন্যদিকে নাজরাত এবং আয়ান মজা লুটছে নিঃশব্দে। এরই মধ্যে এগিয়ে আসলো অল্প বয়স্ক এক ছেলে৷ ওয়েটারের ইউনিফর্ম লেপ্টে তার দেহে। কাছে এসেই সে বিনীত কন্ঠে জানতে চাইল অর্ডারের ব্যাপারে। কি লাগবে জিজ্ঞেস করা মাত্র নুহাশ থমথমে মুখে বলে উঠলো,
‘ হারপিকের কোনো রেসিপি আছে? অথবা বিষের কোনো ড্রিংকস? যেটা খেলে একেবারে পরপারে গিয়ে লগ ইন হব। আছে? থাকলে নিয়ে আসেন, যান। ‘
এই উদ্ভট কথায় থতমত খেয়ে তাকিয়ে আছে ছেলেটা। অন্যরাও ভ্রুঁ কুঁচকে তাকিয়ে। আয়ান ঠোঁট ঠোঁট চাপে। কিন্তু নাজরাত ফিক করে হেসে দিল। ওয়েটার কিছু বুঝে উঠতে না পেরে ফের বলে উঠলো,
‘ এনি প্রবলেম স্যার? ‘
নুহাশ যেন আশকারা পেল একথায়। আইস ব্যাগ নামিয়ে সায়েরীর দিকে আঙুল তাক করে কিড়মিড়িয়ে বলে উঠলো,
‘আলবাত প্রবলেম। এই দেখেন প্রবলেম দেখতে কেমন। দেখে বলুন ত এই প্রবলেমের বয়স কত হতে পারে? বলুন, বলুন। ‘
ছেলেটা ফের অপ্রস্তুত হয়। তবুও সায়েরীর দিকে তাকিয়ে দেখে সেকেন্ড দুয়েক। কলেজ ইউনিফর্ম পরিহিতা মেয়েটাকে দেখে বড়জোর ষোলো কি সতেরো বছরের নাবালিকা বলে মনে হলো তার। সেই মোতাবেক বলে উঠলো,
‘ ষোলো – সতেরো বছর হবে হয়তো। ‘
‘ বিসমিল্লাহ তে গলত। আপনারও একে মাসুম বাচ্চা বলে মনে হচ্ছে না? আমিও এটাই ভাবতাম। এইটুকুন দুধের বাচ্চা। মনে হত এখনো নাক টিপলে ম্যা ম্যা চিল্লাবে। কিন্তু এই দুধের শিশু নাকি প্রেম করছে। বিশ্বাস হচ্ছে আপনার? হচ্ছে না তাইনা? আমারও হচ্ছে না রে ভাই। কিন্তু হাতে নাতে প্রমাণ পেয়েছি। এই দুধের বাচ্চা আস্ত এক রোবট মানব কে হাত করে ফেলেছে। ইয়া আল্লাহ! কি দেখলাম রে! সাফওয়ান ভাই এই মাইয়ার সামনে গলে গেছিল! সাফওয়ান ভাই! ‘
অনাকাঙ্ক্ষিত সেই দৃশ্যে নুহাশের মস্তিষ্ক নড়ে বড়ে হয়ে আছে। আবুল তাবুল বকছে। তার কথার তেজে ওয়েটার ছেলেটা ভ্যাবলার মত তাকিয়ে। আর সায়েরী লজ্জায় ম্যানিউ কার্ড টা ঠেসে ধরেছে মুখের সঙ্গে। এত লজ্জা কোথায় রাখবে সে! আল্লাহ!
অবস্থা বুঝতে পেরে আয়ান হাসি চেপে নিজেই অর্ডার করল সবার জন্য। অর্ডার পেয়ে ওয়েটার প্রস্থান করতেই নুহাশ ফের সায়েরীর দিকে তাকিয়ে আইস ব্যাগটা চেপে ধরল মাথায়। বিড়বিড় কন্ঠে বললো,
‘ পিচ্ছি রে! তুই ও প্রেম করছ? ‘ তাও আবার সাফওয়ান ভাইয়ের সাথে? ‘
তোহা এত সময় চুপ থাকার পর এবার গিয়ে মুখ খুলল। রুষ্ট কন্ঠে বলে উঠলো,
‘ সায়ু! এইটা কিন্তু আশা করিনি তোর কাছ থেকে। একটাবারও জানালি না! নাজরাত-ই বোন হয় শুধু। আমরা কেউ না? ‘
একথা শুনে নাজরাত ঘোর বিরোধিতা করে বলে উঠলো,
‘ আমি জেনেছি কবে সেটা জিজ্ঞেস কর! কাল রাতে জেনেছি। তাও আবার এই ম্যাডাম নিজে বলেনি কিছু। পিউ দি না বললে তো জানতামই না। সোজা বিয়ের কার্ড ধরিয়ে দিয়ে হার্ট অ্যাটাক করানোর জন্য বলত, নে বোন আমার আর সাফওয়ান ভাইয়ের বিয়ের কার্ড। হার্ট অ্যাটাকে মরে টরে না গেলে বিয়েতে আসিস। ‘
সায়েরী এবার সোজা হয়ে বসে। গলা খাঁকারি দিয়ে মৃদু কন্ঠে বলে,
‘ আমি কিন্তু বলতে চেয়েছিলাম বিশ্বাস কর। কিন্তু.. আসলে.. মানে.. আমার না লজ্জা লাগছিল। তাই আরকি…… ‘
‘ ওরে তোর লজ্জা রে! এত লজ্জাবতী লতিকা হলে শারুখ খানের নায়িকা সেজে জড়িয়ে ধরেছিলি কীভাবে আমার সামনে? তখন তোর লজ্জা গুলো রাস্তার ড্রেনে ফেলে এসেছিলি? ‘
নুহাশের ক্ষিপ্ত স্বর। তোহা না চাইতেও হেসে ফেলে। সায়েরী অসহায় নজরে তাকার। মিনমিন কন্ঠে বলে,
‘ তুই এমন হাইপার হয়ে আছিস কেনো সেটাই তো বুঝলাম না! ‘
নুহাশ অভিমানী রমনীর মতো করে মুখ ফিরিয়ে নিল। রুষ্ট কন্ঠে বললো,
‘ সর তুই। প্রেমিক কে নিয়ে সুখে সংসার কর। আমার সামনে খবরদার এসব বলতে আসবি না। একদম মনে করিয়ে দিবি না যে আমি এখনো সিঙ্গেল। ‘
অবশেষে গিয়ে সত্য উদঘাটন করতে পেরে সাফ্রিন ব্যাতিত বাকিরা উচ্চ স্বরে হেসে উঠলো। এমন প্রতিক্রিয়ায় নুহাশ রাগত্ব স্বরে বলে উঠলো,
‘ হাসতেছস ক্যান বা*ল? মিথ্যা কি বললাম। দেখ এই মাইয়াকে। একে আমি আসলেই কত পিচ্ছি ভাবতাম। কিন্তু আমার মত মুরুব্বি কে সিঙ্গেল রেখে সে আরেক মুরুব্বি জুটিয়ে ফেলেছে নিজের জন্য। এখন এর সামনে গেলেই আমার সিঙ্গেলত্ব জেগে উঠবে। ভেতর থেকে বলবে, শেম অন ইউ নুহাশ সিকদার! এই তিন ফুট দুই ইঞ্চিও প্রেম করছে। কিন্তু তুই এখনো সিঙ্গেল। ‘
সায়েরী লজ্জা মুখেই হাত রাখে নুহাশের মাথায়। হাসি চেপে বলে,
‘ আচ্ছা থাক। কাঁদে না। আমি নিজে তোর জন্য মেয়ে খুঁজব। একদম চাঁদের মত ফুটফুটে প্রেমিকা হবে তোর দেখিস। ‘
নুহাশ তখনও মুখ ফিরিয়ে রেখেছিল। একথা শুনেও মুখ ঘুরাল না সে। কিন্তু সেই অবস্থাতেই বলে উঠলো,
‘ কথাটা মনে থাকে যেন। ‘
সায়েরী হেসে মাথা নাড়ে, ‘ অবশ্যই মনে থাকবে। ‘
খাবার নিয়ে এসেছে দুজন ওয়েটার মিলে। ভাগাভাগি করে যার যার প্লেটে খাবার নিতে গিয়ে সায়েরী লক্ষ্য করে সাফ্রিন কে। মেয়েটা এখনও কেমন এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। আয়ান নিজেও লক্ষ্য করল সেটা। গলা ঝেড়ে সে বলে উঠলো,
‘ সাফা! আসার পর থেকেই চুপচাপ হয়ে আছিস। কি হয়েছে? ‘
সাফ্রিন নজর সরাল। চামচের সাহায্যে খাবার নাড়াচাড়া করতে করতে বলে উঠলো,
‘ কি হয়েছে তো জানি না। কিন্তু আমার এখনও কিছু বিশ্বাস হচ্ছে না রে। আই মিন..আমার ভাই! সে রিলেশনশিপে তাও আবার সায়ু’র সাথে! এই দুটোর কত ঝগড়াঝাঁটি সামলেছি আমি গত পাঁচ বছর ধরে। এই মেয়ে কতবার কান্নাকাটি করে আমার কাছে নালিশ দিত। আমি ভাইকে বলতে গেলে উল্টো বকা শুনতাম। সায়ু ঝামেলা করত আর আমি ভাইয়াকে বলে কয়ে বকতে নিষেধ করতাম। সে-ই দুজন কি না এখন….! মানে.. কীভাবে সম্ভব এটা? ‘
গালভর্তি খাবার নিয়ে থম মেরে বসে আছে সায়েরী। যে কথা স্বয়ং তারও বিশ্বাস হয়না আজ অবধি। সেটা বাকিদের বিশ্বাস করতে সে সময় লাগবে তা জানে সে। তোহাও সাফ্রিনের মত এই মনোভাব নিয়ে বসে আছে। পরপরই আবার ছটফটে গলায় সে বলে উঠলো,
‘ ঠিক বলেছিস। কিন্তু যা দেখলাম তাতে তো আর প্রশ্ন করার মুখ নেই। তবে কথা হলো, রিলেশনশিপ চলছে কবে থেকে? এই সায়ু? বল দেখি। ‘
সায়েরী কেশে উঠল। কোনো রকমে মুখের খাবার টুকু গিলে ভাবতে লাগল কবে থেকে চলছে সাফওয়ান ভাইয়ের সাথে তার সম্পর্ক? রায়ানের জন্মদিনের পার্টির রাত থেকে কি? কিন্তু তার আগে যে পহেলা বৈশাখের দিন দুজন ফাঁকা রুমে কাছাকাছি, পাশাপাশি অনেক্ষন ছিল। দুই পাক্ষিক অনুভূতি তো তার আগেই সৃষ্টি হয়েছে। পহেলা বৈশাখ এর আগেই সায়েরী জানতে পেরেছে সাফওয়ান তাকে পছন্দ করে সেটা। আর সাফওয়ানও জানতে পারল সেদিন লাইব্রেরিতে, মুখ ফসকে বলে ফেলা কথা গুলো শুনে। সবই ঠিক আছে, কিন্তু সম্পর্ক কবে থেকে চলছে সেটা তো জানে না সে।
‘ কি হলো বলনা! ‘ তোহা তাড়া দিল।
‘ জানি না তো। ‘
‘ জানিস না মানে? সাফওয়ান ভাই তোকে প্রপোজ করেনি? ‘
তোহার একথা শুনে সায়েরী গাল ফোলাল। থমথমে গলায় বললো,
‘ আজ অবদি পছন্দ করে সেটাও সোজা মুখে বললো না। আবার প্রপোজ! ‘
তোহা বড় আগ্রহী চোখে বলে উঠে,
‘ তাহলে..কেমনে কি? ‘
সায়েরী কাঁধ নেড়ে সুধাল, ‘ এমনি এমনি। ‘
‘ বা*লের কথা কস! এমনি এমনি আবার কি? প্রপোজ ছাড়া এইটা আবার কোন কচুর রিলেশনশিপ? ‘
নুহাশের বিরক্ত ভরা কন্ঠ। এই যাত্রায় গিয়ে হেসে উঠলো সাফ্রিন। বড় সাচ্ছন্দ্যে খাবার মুখে তুলতে তুলতে বলে উঠলো,
‘ এবার গিয়ে বিশ্বাস হচ্ছে, সকালে দেখা মানুষটা হান্ড্রেড পার্সেন্ট আমার ভাই। দ্যা রসকষ হীন মানব, সাফওয়ান খান। বাই দ্যা ওয়ে…বেস্ট অফ লাক উডবি ভা..বি!! ‘
এমন সুর টেনে বলা ‘ভাবি’ ডাকটা শুনে বিষম খেল সায়েরী। আয়ান দ্রুত পানি এগিয়ে দিল তাকে। গ্লাসে চুমুক বসাতে বসাতে সায়েরী’র মনে পড়ে গেল সকালে গাড়িতে কাটানো মুহুর্ত গুলো। লজ্জায় গাল ফুলে উঠল তার। মনে মনে বললো,
‘ আহ রে বান্ধবী! তোরে যদি জানাতে পারলা তোর এই রসকষহীন, কাঠখোট্টা ভাইটার জ্বরের ঘোরের উন্মাদনা। ‘
টুকটাক কথায় খাওয়াতে মনযোগ দিল সকলে। সাফ্রিন এবং তোহা’র পেটে খচখচ করছে হাজার টা প্রশ্ন। কিন্তু দুই বন্ধুর উপস্থিতির জন্য চুপ হয়ে আছে তারা। যতই ক্লোজ ফ্রেন্ডশিপ হোক না কেন! ছেলে- মেয়ের মধ্যকার লিমিটেশন তাদের সকলের জানা আছে। তবে একটা বার শুধু সুযোগে সায়েরীকে চেপে ধরার অপেক্ষা। সব কথা উগলে ছাড়বে পেট থেকে। মনে মনে এসব ভাবতে ভাবতে তোহা অসন্তুষ্ট কন্ঠে ফের বলে উঠলো,
‘ যা-ই বল সায়ু! তোর কাছ থেকে কিন্তু এটা আশা করিনি। কীভাবে চেপে গেলি এত বড় কথাটা? আমরা কি তোর পর? হুহ? ‘
তোহার পাশেই আয়ান বসে ছিলো। মুখে খাবার তুলতে গিয়ে থেমে গেল সে তোহার কথা শুনে। খানিকটা ঝুঁকে সে নিম্ন কন্ঠে সুধাল,
‘ নাটক কম কর পিও। তুমিও যে এমন কিছু চেপে রেখেছ সেটা ভুলে গেলে কিন্তু চলবে না। ‘
তোহা রাগী চোখে তাকাল। সকলের অগোচরে আয়ানের পেটে খোচা মেরে দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠলো,
‘ রাবিশ কথা বলবি না। চুপ থাক। কালকের কথা ভুলে যায়নি আমি। একশ হাত দূরে থাকবি আমার কাছ থেকে। তোর সাথে আমার কোনো কথা নেই। ‘
আয়ান হতাশ হয়ে শ্বাস ফেলে পুণরায় মনযোগ দেয় খাওয়াতে।
খাওয়া – দাওয়া শেষে বিল দিতে গিয়েছে আয়ান। সাথে তোহাও গিয়েছে। রেষ্টুরেন্টের কর্ণারে ফটোসেশন এর জন্য খুব সুন্দর করে ডেকুরেশন করা। সেখানে ছবি তুলছে নাজরাত এবং তোহা। নুহাশ এবং সায়েরী ভরপেট খেয়ে নড়াচড়ার ক্ষমতা হারিয়েছে। সায়েরী অবশ্য পানি খেয়ে ঢোল হয়ে আছে। নুহাশ খেয়েছে অতিমাত্রায়। একেবারে গলা অবধি উঠেছে খাবার৷ অস্বস্তি লাগছে ভীষণ। তাই সে বড়সড় ঢেকুর তুলে সায়েরীকে উদ্দেশ্য করে বললো,
‘ এমনে চিৎ হয়ে থাকলে ফুটবল হয়ে যাবি। তুই ফুটবল হয়ে গেলে তখন বিরাট সমস্যা। দেখা গেল তোকে উল্টা পাল্টা খাইয়ে ফুটবল বানিয়ে ফেলেছি সেই দায়ে তোর বডি বিল্ডার বয়ফ্রেন্ড আমাদের এক এক লাত্থিতে উগান্ডা পাঠিয়ে দিয়েছে। অবশ্য উগান্ডা না পৌঁছালেও হাসপাতাল অবধি ঘুরে আসতে হবে পাক্কা। কিন্তু আমি এই সিঙ্গেলত্ব নিয়ে হাসপালের বেডে শুয়ে থাকতে চাই না। যেদিন বেডের পাশে কুইকুই করে কাঁদার মানুষ হবে সেদিন যাব। তাই চল, গিয়ে এক রাউন্ড হেঁটে আসি। ‘
সায়েরী বিরক্তিতে ভেংচি কেটে বলে,
‘ হাঁটবি সেটা শুরু তে বললেই হতো। সব কথাতে সাফওয়ান ভাইকে টেনে আনছিস কেনো? ‘
‘ ভুল হয়েছে মেরি মা। চল এবার। নিজেকে গর্ভবতী বলে মনে হচ্ছে আমার। দ্রুত উঠ। নাহলে এখানেই যা খেয়েছি সব উগলে দিব। ‘
না চাইতেও উঠতে হলো সায়েরীকে। দুজন ক্লান্ত দেহ টেনেটুনে এগিয়ে গেল রুফটপের দিকে। নাজরাত এবং সাফ্রিন কেও বললো আসার জন্য। সেখান থেকেই সোজা বেরিয়ে যাবে যার যার বাসার উদ্দেশ্যে।
রুফটপে পৌঁছাতে পৌঁছাতে হাঁপিয়ে ওঠেছে দুজন। মনে হচ্ছে যেন এভারেস্ট জয় করেছে। সবে মাত্র স্বস্তিতে শ্বাস ফেলতেই নিচ্ছিল তারা, কিন্তু সেই স্বস্তি ঠিকল না বেশিক্ষণ। পরিচিত দুটো কন্ঠের চিৎকার চেঁচামেচি তে ভড়কে গেল তারা। একে অপরের দিকে তাকাল অবুঝ নয়নে। পরপরই তড়াক করে লাফিয়ে উঠে কন্ঠ যেদিক থেকে শুনা যাচ্ছে সেদিকে গেল। লুকাল দেওয়ালের আড়ালে। নুহাশ সামনে থাকায় সায়েরী তার পিঠ ছাড়া কিছুই দেখতে পারছে না। বিরক্ত হয়ে ধুমধাম কিল বসাল সে নুহাশের পিঠে। নুহাশ চট জলদি পেছন ফিরল। সায়েরীর মাথা ঠেলে নিজের সামনে দাড় করিয়ে দিল তাকে। নিজে চোখ দিল সায়েরীর মাথার উপর দিয়ে। ছাদের কিনারে দাঁড়িয়ে আয়ান-তোহা। দূর থেকেই ভেসে আসছে আয়ানের রুষ্ট কন্ঠ,
‘ আশ্চর্য বিহেব করছিস তুই তোহা। তুই কি জানিস না আমি কেমন? অহেতুক ঘটনা নিয়ে এত ঝামেলা করার মানে কি? ‘
তোহাও চেঁচিয়ে উঠলো সমান তালে,
‘ খুব ভালো জানি তুমি কেমন। প্রভার সাথে দেখেছিলাম না? সব মনে আছে আমার। ব্রেকাপ হতে না হতে তো আরেক জনকে চিঠি পাঠিয়েছিলি। সেসব কি মনে নেই আমার? ‘
‘ তোকে হাজার বার বলে ওই চিঠি টা আমি না নুহাশ পাঠিয়েছিল। আর প্রভার ব্যাপারেও সবটা ক্লিয়ার করেছি না তোকে? বার বার তাহলে ওই কথাগুলো তুলে বিরক্ত করছিস কেনো? ‘
‘ বিরক্ত করছি! এই কয়েক দিনেই বিরক্তিতে হয়ে গেছি তবে? বাহ! ভালো তো। আমারই ভুল। তোর কাছে কনফেশন করাই ভুল হয়েছে আমার। ব্রেকাপ তোর সাথে। যা খুশি কর গিয়ে। ‘
দেওয়ালের আড়ালে লুকিয়ে থাকা দুই গোয়েন্দা ভীমড়ি খেল যেন। লম্বা চওড়া নুহাশ ধপ করে পড়ল সায়েরীর উপর। মাথায় নুহাশের শক্ত থুতনির আঘাতে সায়েরী চাপা স্বরে আর্তনাদ করে উঠলো। কনুই দ্বারা খোচা দেওয়া মাত্র নুহাশ তড়িঘড়ি করে ঠিক হয়ে দাঁড়াল। বুকে হাত চেপে বলে উঠলো,
‘ পিচ্ছি রে! আমি যা শুনেছি, তুইও কি সেসব শুনেছিস? ‘
সায়েরীও অবিশ্বাস্য গলায় বলে উঠলো,
‘ তাই-ই তো মনে হচ্ছে। ‘
নুহাশ এবার তাকাল সায়েরীর দিকে। আশ্চর্য কন্ঠে বলে উঠলো, ‘ আয়ান? ‘
সায়েরীর একই ভাবে সুর মেলাল, ‘ তোহা? ‘
পরপর আবার দুজন একই সুরে বলে উঠলো,
‘ কবে? কখন? কীভাবে? ‘
সাফ্রিন এবং নাজরাত সবে মাত্র রুফটপে পা রেখেছে। বাকিদের খোঁজ করছে এমন সময় দেখা মিলল সায়েরী এবং নুহাশের। সেদিকে পা বাড়ানো মাত্র নুহাশ আচমকা তেড়ে গেল অন্যদিকে। পরপরই ভেসে আসল আয়ানে আতংকিত আর্তনাদ। উপস্থিত চার রমনী ভড়কে গেল। বাহু দ্বারা আয়ানের গলা চেপে ধরেছে নুহাশ। পিঠের উপর ধুমধাম কিল বসাতে বসাতে চিল্লিয়ে বলছে,
‘ শালার মীরজাফর। এত বড় ধোকা! তোরে আমি কেটে কুচিকুচি করে গঙ্গায় ভাসাব আয়াইন্না। আমি সিঙ্গেলত্বে কাতর হয়ে, শুকিয়ে মরে যাচ্ছি তুই! তুই তলে তলে রঙ্গলীলা চালিয়ে যাচ্ছিলি? এই তোর বন্ধুত্ব? ‘
নুহাশের প্রহারে আর্তনাদ করছে আয়ান। বার বার আকুতি জানাচ্ছে ছেড়ে দেওয়ার জন্য। ইতোমধ্যে সায়েরী নিজ দায়িত্বে বাকি দুই বান্ধবীর কানে তুলে দিয়েছে ঘটনা। তারাও রীতিমতো হতভম্ব। আজ কি প্রেম ফাঁস হওয়ার দিন নাকি! আশ্চর্য!
আয়ানের অবস্থা দেখে তোহা ছটফটিয়ে উঠে। এগিয়ে গিয়ে নুহাশের কাছ থেকে ছাড়ানোর জন্য বলে উঠে,
‘ নুহাশ! কি করছিস টা কি? আস্তে..এমন করছিস কেনো? লাগছে তো ওর! ‘
নুহাশ থেমে গেল। পরপরই দাঁতে দাঁত চেপে তোহাকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলো,
‘ বেদ্দপ চার আনা চোখ কানা। তোরে কানা ভাবছিলাম। কিন্তু তোর নজর তো দেখি ঠিকঠাক যায়গায় পড়েছে। তলে তলে এতদূর! হুহ! ‘
আয়ান ব্যাথায় চোখ মুখ কুঁচকে সোজা হয়ে দাঁড়াল। পিঠের হাড় সব গুড়িয়ে গেছে বোধহয়। সকলে তাদের দুজনের দিকে রাগী চোখে তাকিয়ে। নুহাশ, সায়েরী,নাজরাত এবং সাফ্রিন একই সুরে বলে উঠলো,
‘ কীভাবে পারলি এত বড় কথা চেপে যেতে? ‘
বাকি দুজন ভড়কে গেলে। তোহা জোরপূর্বক হেসে বলে উঠলো,
‘ উত্তেজিত হবেন না প্লিজ! এটা তো সারপ্রাইজ রেখেছিলাম। হে হে। ‘
সাফ্রিন ধমকে উঠলো তাকে,
‘ রাখ তোর সারপ্রাইজ। নিজে বড় গলা করে সায়ুকে কথা শুনালি। আর নিজের বেলায় কি করছিস? ‘
বান্ধবীদের রাগের তোপে তোহা অসহায় কন্ঠে বলে উঠলো,
‘ জানাতে চেয়েছিলাম তো। কিন্তু.. আমারও সায়ুর মত লজ্জা লাগছিস আরকি, তাই….. ‘
নাজরাত কপাল কুঁচকে ফেলে। বিরক্ত কন্ঠে বলে,
‘ যত লজ্জা সব কি তোদের মাঝে ঢেলে দিয়েছে আল্লাহ! আমি এক সপ্তাহের পরিচয়ে সোজা বিয়ে করে ফেলতে পেরেছি। আর তোরা প্রেম করে জানালি অবধি না। যত্তসব! ‘
তোহা নিশ্চুপ। আয়ানের নজর পড়ল সায়েরীর উপর। মেয়েটা কোমরে হাত দিয়ে চোখ পাকিয়ে তাকিয়ে আছে। আয়ান তাকাতেই ক্ষিপ্ত স্বরে বলে উঠলো,
‘ এই তোর বন্ধুত্ব? আমার ব্যাপারে পইপই খবর রাখিস। আমি প্রেমে পড়েছি সেটাও আমার আগে তুই জেনে গেলি। আর তুই প্রেমের জোয়ারে ভেসে যাচ্ছিস, তাও আমাকে জানালি না? আই হেট ইউ আয়ান! ‘
আয়ান ঢোক গিলে। অসহায় অনুভব করে নিজেকে। কি বলবে বুঝে উঠতে না পেরে ফট করে বলে ফেলে,
‘ তোরা অযথা ভুল বুঝছিস আমাকে। আমার কোনো দোষ নেই। এই মহিলা উসকে দিয়েছে আমাকে। সত্যি। ‘
তোহা চোখ বড় বড় করে তাকাল। মুহুর্তেই রেগে বোম হয়ে তেড়ে গেল আয়ানের দিকে। আয়ান চট জলদি নিজেকে আড়াল করল নুহাশের পেছনে। তোহা ডানে ঘুরলে সে বামে ঘুরছে, বামে ঘুরলে সে ডানে ঘুরছে। আয়ানকে হাতের নাগালে না পেয়ে তোহা গর্জে উঠলো,
‘ এ্যাইঁ! কি বললি তুই? আমি উসকে দিয়েছি? তুই কি কচি খোকা? উসকে দিয়েছি সেটা বুঝে থাকলে এসেছিলি কেনো প্রেম করতে হ্যাঁ? আমি ডেকেছিলাম সেদিন? বড় গলায় ডায়লগ ঝেড়ে এখন আমার দোষ দিচ্ছিস! তোর সাথে প্রেম করাটায় ভুল হয়েছে। ব্রেকাপ! আজ থেকে তোর আর আমার মধ্যে কোনো সম্পর্ক নেই বুঝেছিস? ‘
‘ একমাস হলো না এখনো আর তুই দিনে চারবার ব্রেকাপ করিস৷ সত্যি করে বল তোহা, তুই কি আদো প্রেম করছিস না কি ব্রেকাপ ব্রেকাপ গেম খেলছিস আমার সাথে? ‘
তোহা আরও কিছু বলতে নিবে এমন সময় নুহাশ চিল্লিয়ে উঠল। দুজনের মাঝে মাইনকার চিপায় পড়েছে যেন সে। ঝাড় মেরে আয়ান কে সরাল সে। তোহাও সরে গেল থমথমে মুখ করে। আয়ানের দিকে তাকিয়ে নুহাশ কলার উঁচিয়ে বলে উঠলো,
‘ সিঙ্গেলত্ব অতটাও খারাপ না। নিজের মত চলা যায়, যে মেয়েকে ইচ্ছে চোখ ভরে দেখা যায়। তাই না বন্ধু? ওহ! আপনি তো প্রেম করেন। ‘
আয়ান তাচ্ছিল্য হেসে বলে উঠলো,
‘ নাগাল না পেলে আঙ্গুল ফল টক লাগেই। ‘
নুহাশ চুপসে গেল। এরই মাঝে সকলে উদঘাটন করল তোহার আকাশ সমান রাগ। ব্রেকাপ বলেছে মানে ব্রেকাপ। একথার নড়নচড়ন হচ্ছে না। নুহাশ এই পর্যায়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠলো,
‘ বেশি কথা বলবি না তোরা দুজন। আমাদের মুরুব্বি হাজির আছেন। তিনি সমাধান দিবেন। মুরুব্বি! সমাধান দিন। ‘
সকলে চুপচাপ। সবার সাথে নাজরাতও উৎসুক হয়ে আছে কিছু শুনার জন্য। কিন্তু হঠাৎ লক্ষ্য করল সকলে উৎসুক নজরে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। থতমত খেয়ে সে বলে উঠলো,
‘ আশ্চর্য! আমার দিকে তাকিয়ে আছিস কেন? ‘
‘ আমাদের দলের বিবাহিত ব্যাচেলর, মুরুব্বি হিসেবে তো তুই-ই আছিস। তাই তুই দিবি সমাধান। ‘
সাফ্রিনের কথায় ব্যাপার লজ্জা পেল নাজরাত। অপ্রস্তুত হয়ে বলে উঠলো,
‘ ওদের ঝামেলা, ওরা মিটমাট করে নিবে। আমি নেই এসবের মাঝে। তোরাও চল। ‘
সকলে সহমত পোষণ করল। কিন্তু নুহাশ দ্বিমত পোষণ করে বলে উঠলো,
‘ যতদিন না ট্রিট দিবি, ততদিন এই ব্রেকাপ ব্রেকাপ চলতে থাকবে। ইহা এই সিঙ্গেল প্রাণীর অভিশাপ। ‘
একথা শুনামাত্র নাজরাত ঠাশ করে এক চড় মারল নুহাশের মাথায়,
‘ সবসময় খালি খাই খাই। চুপচাপ নিচে আয়। ‘
নুহাশ মাথা ঢলতে ঢলতে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। সাথে সায়েরী,নাজরাত এবং সাফ্রিন। আয়ান এবং তোহা তখনও নিজের স্থানে ঠাই দাঁড়িয়ে। তোহা থমথমে মুখে রেলিং উপর হতে নিজের ব্যাগ তুলে নিলো। চলে যেতে নিলে আয়ান দ্রুত কাছে গিয়ে হাত টেনে ধরলো তার। তোহা হাত ছাড়াতে চাইলে আয়ান দুইহাতে নিজের সাথে ঝাপটে ধরে তাকে। দ্রুত গলায় বলে উঠে,
‘ স্যরি! সো স্যরি তোহা। আমি ইচ্ছে করে বলিনি কথাগুলো। মাফ করে দে প্লিজ! ‘
‘ আয়ান ছাড় আমাকে। ব্রেকাপ করেছি মানে ব্রেকাপ! আজ থেকে তুই মুক্ত। ‘
‘ ফালতু কথা বলবি না। আমি বলেছি ব্রেকাপ করতে? তোর ইনসিকিরিটির জন্য শুধু শুধু আমাদের সম্পর্ক টা নষ্ট হচ্ছে। তুই এখনও অনেক ইম্যাচিউর তোহা। তাই তুই রাগারাগি করলে আমি পালটা রাগারাগি না করে বুঝানোর চেষ্টা করি। কিন্তু আজ তুই কি বললি? পুরনো কথা টেনে ইনডিরেক্টলি আমার ক্যারেক্টর খারাপ বলেছিস। আদো কি তাই? তুই প্রমাণ দিতে পারবি এমন কিছু? ‘
তোহা নিশ্চুপ৷ আঁখি ছলছল করছে তার৷ ধরা গলায় সে বলে উঠলো,
‘ আমার সাথে থেকে তুই খুব বিরক্ত তাই না? আমি একদম তোর মত না। ‘
আয়ান হতাশ শ্বাস ফেলে। তোহার মাথাটা বুকে চেপে ধরে বলে উঠে,
‘ আজব কথাবার্তা! আমি তোকে কি বুঝাচ্ছি আর তুই কি বুঝছিস! আমি বলেছি কখনো যে তুর সাথে থেকে আমি বিরক্ত? এমন হলে কি থাকতাম? মনের অমিল হলে সেই কবেই পিছু হাঁটতাম। ‘
এটুকু বলে জোর করে তোহার মুখ তুলল সে৷ চশমার আড়ালে চোখদুটো ভেজা। সেই সাথে দুই গালও ভিজেছে। আয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলল৷ একহাতে তোহার গালদুটো মুছে বলে উঠলো,
‘ তুই তো এমন ছিঁদকাঁদুনি ছিলি না আগে। আমার কিন্তু এমন কথায় কথায় কান্না করে মেয়ে পছন্দ না। এই স্বভাব পালটা। নাহলে পরের বার আমিই ব্রেকাপ করব। ‘
তোহা ফুঁসে ওঠে। আয়ানের বাহুরে কিল মেরে বলে,
‘ মনের কথা চলে আসল তো মুখে। জানতাম আমি। তুই তো চাচ্ছিস আমার থেকে পিছু ছাড়াতে। ‘
আয়ান দুইহাতে ফের কাছে টেনে নিল তোহাকে। মুখটা কাছাকাছি নিয়ে আচমকা তোহার নাকের ডগায় ঠোঁট ছোঁয়াল,
‘ তুই পিছু ছেড়ে দিলে তখন নাহয় আমি পিছু নিব। এই সম্পর্ক তোর জন্য শুরু হলেও শেষ অবধি আমি আগলে রাখব, দেখিস। ‘
তোহা স্তব্ধ। মূলত অনাকাঙ্ক্ষিত এই চুমুতে চমকে গিয়েছে সে। এই প্রথমবার এতটা কাছাকাছি এসেছে আয়ান। তাই তো সে বেশ অবাক হয়েছে। তোহার এহেন চাহনিতে আয়ান বিব্রত হয়। দ্রুত ছেড়ে দিয়ে আবার হাত ধরে। এগিয়ে যায় ছাদের দরজার দিকে।
রাত প্রায় বারোটা। আশ্চর্যজনক ভাবে আজ এত রাতেও সায়েরীর চোখে ঘুমের লেশ মাত্র নেই। বারে বারে হাজার বার ফোন চেক করেছে সে। সাফওয়ানের কোনো আত্তা পাত্তা নেই। সকালে অমন আঘাত প্রাপ্ত অবস্থায় দেখার পর থেকে শান্তি লাগছে না একদম। সাফ্রিন জানিয়েছে হাসপাতাল থেকে রিলিজ না পেলেও বাড়ি ফিরে এসেছে সাফওয়ান। যদিও বেড রেস্টে আছে। তবও কেউ সন্তুষ্ট তার এহেন জেদি স্বীদ্ধান্তে। গত রাতে সাফওয়ান যে নাম্বার হতে ফোন করেছিল সেটাতে কল করতে চেয়েও নিজেকে দমিয়ে ফেলল সায়েরী। কে জানে কার নাম্বার সেটা। তাছাড়া এত রাত অবধি নিশ্চয়ই জেগে নেই সাফওয়ান ভাই! সকালে খোঁজ নেওয়া যাবে সাফ্রিনের কাছ থেকে৷ একথা ভেবে শক্ত করে চোখ বুজল সায়েরী। কিন্তু তাতেও দুশ্চিন্তা কমছে না। অস্থির লাগছে ভীষণ। কোলবালিশ জড়িয়ে ধরে সে ভাবতে লাগল কয়েক ঘন্টা আগের মুহুর্তগুলোর কথা…..
অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে নিজ থুতনিতে, গালে সাফওয়ানের অধরের গভীর স্পর্শ পেয়ে, টালমাটাল অনুভূতি তে সায়েরী যখন দেহের ভার ছেড়ে দিয়েছিল। সাফওয়ান তখন আঘাত প্রাপ্ত বুকেই স্ব-যত্নে আগলে রেখেছিল তাকে। গাড়ির ভেতর টা তে দুজনের নিঃশ্বাসের শব্দ ব্যাতিত অন্য কোনো শব্দ ছিল না। সাফওয়ানের বুকের মধ্যিখানে চোখ বুজে পড়ে ছিল সায়েরী। সাফওয়ানের একহাত তখন সায়েরীর চুলের ভাঁজে। মিষ্টি সুবাসে মাতোয়ারা হয়ে সরু আঙ্গুলের সঞ্চালনে চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল সে। এতটা আদুরে আচরণে ঘুম কাতুরে মেয়েটা সেই অবস্থাতেই পাড়ি জমাল ঘুমের রাজ্যে। বিগত এক সপ্তাহ দুঃশ্চিন্তায় নির্ঘুম রাত কাটানোর পর আজ গিয়ে প্রেমিক পুরুষের আলিঙ্গনে জম্পেশ একটা ঘুম দিল সে। বেলা দশটা থেকে সাড়ে বারোটা অবধি ঘুমিয়েই কাটিয়ে দিল সে। যখন ঘুম ভাঙ্গল তখন কয়েক সেকেন্ডের জন্য বুঝে উঠতে পারল না ব্যাপারটা। পরিচিত সুবাসে লেপ্টে ছিল সে। কোমরে জড়ানো শক্তপোক্ত দুটো হাত। সায়েরী একটুখানি মাথা তুলে চাইল৷ সিটের সঙ্গে ঘাড় এলিয়ে চোখ বুজে আছে সাফওয়ান। সায়েরী তড়াক করে লাফিয়ে উঠল। নিজের এহেন বোকামিতে নিজ গালেই দুটো থাপ্পড় লাগাতে মন চাইল তার। এতটা বেক্কল হয় কেউ?
সে লাফিয়ে উঠতেই সাফওয়ান চোখে মেলে তাকাল। চোখ জোড়া ভয়ংকর রকমের লাল হয়ে আছে তার। সায়েরীর খুব খুব মন খারাপ হলো তা দেখে। কোথায় এই অসুস্থ মানুষ টাকে সে সেবা করবে তা না। উল্টো সে সাফওয়ানের বুকে আরামসে ঘুমাচ্ছিল!
ঘুমু ঘুমু, মিনমিন কন্ঠে সে বলে উঠলো,
‘ স্যরি! আমি..আমি বুঝতেই পারিনি কখন ঘুমিয়ে গিয়েছি। আপনি ডাকেন নি কেনো? ‘
সাফওয়ান অদ্ভুত চোখে তাকিয়ে। সায়েরী লক্ষ্য করল, তার দিকে তাকিয়ে বার কয়েক ঢোক গিলছে সাফওয়ান। গলার অ্যাডমস অ্যাপল টা উঁচু নিচু হচ্ছে। কেমন এক গভীর স্বরে সে বলে উঠলো,
‘ ইচ্ছে করেনি ঘুম ভাঙ্গাতে। ‘
পরপরই আবার পূর্বের ন্যায় সিটে মাথা এলিয়ে দিল সে। ফের একবার ঢোক গিলে বললো,
‘ চুল বাঁধ। ‘
সায়েরী বুঝে উঠতে পারেনা এহেন আচরণের মানে। তবুও আদেশ টুকু পালন করে সে। দক্ষ হাতে সব গুলো চুল একত্রিত করে খোঁপা করেছে। ঘাড় হতে হাত নামানো মাত্র তার নজর গেল সাফওয়ানের দিকে। লালছে চোখজোড়া সায়েরীর দিকে স্থির। এই দৃষ্টিতে হাঁসফাঁস লাগল সায়েরীর। মিনমিন কন্ঠে সে সুধাল,
‘ এভাবে তাকাবেন না। ‘
সাফওয়ান ঝুঁকে আসল তার দিকে। ঠোঁটের কোণে দুষ্টুমি ভরা হাসি লেপ্টে সুধাল,
‘ কীভাবে তাকাচ্ছি? ‘
সায়েরী লেপ্টে গেল গাড়ির দরজার সাথে। দৃষ্টি নত রেখে আমতাআমতা করে বলে উঠলো,
‘ আপনার বিশ্রাম প্রয়োজন। হসপিটালে ফিরে যান। অনেক দেরি হয়ে গেছে। খাওয়া হয়নি,মেডিসিন নেওয়াও হয়নি।
সাফওয়ান নিঃশব্দে সরে আসে। মোবাইল বের করে ড্রাইভার কে কল করে। মিনিটের মধ্যেই ড্রাইভার এসে পুণরায় সায়েরীর কথামতো কলেজের সামনে এসে থামে। সায়েরী ব্যাগপত্র নিয়ে বের হতেই নিচ্ছিল এমন সময় হুট করে পেছন থেকে তার হাত টেনে ধরল সাফওয়ান। অত্যাধিক উষ্ণ সেই স্পর্শ। সায়েরী ফিরতেই চোখের পলকে সাফওয়ানের উত্তপ্ত ঠোঁট জোড়া ছুঁয়ে দিল তার ললাট। নিম্ন কন্ঠে নির্দেশ দিল,
‘ সাবধানে থাকবে। ‘
সায়েরী ইচ্ছে করল একই রকম ভাবে, একই বাণী সাফওয়ান কে বলতে। কিন্তু লজ্জায় আর বলা হলনা। বিনা বাক্যে সে নেমে গেল গাড়ি থেকে। গাড়ি পুণরায় ছুটে গেল নিজ গন্তব্যে। সায়েরী তখনও ঠাই দাঁড়িয়ে। চোখের দৃশ্যপটে ভাসছে প্রেমিক পুরুষটার ব্যান্ডেজ যুক্ত কপাল, কালসিটে দাগ হয়ে যাওয়া মুখ। জ্বরাক্রান্ত দেহের উত্তাপ আর ঘোর লাগানো চোখদুটোর গভীর চাহনি।
অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৫১+৫২
নিজের অবস্থা টালমাটাল। অথচ যেতে যেতে জ্বরের ঘোরেও প্রেয়সীকে সতর্কতা দিয়ে গেছে। সায়েরীর দেহ, মন জুড়ে শীতল হাওয়া বয়ে যায়। এত এত ভালোবাসা, যত্ন পাবে তা কি আদো কখনো ভেবেছিলো সে! না কি কেউ ভেবেছিল এই গুরুগম্ভীর পুরুষ টা নির্দিষ্ট এক মানবীর কাছে এতটা নমনীয় হবে! ভালোবাসার শক্তি তবে এতো প্রখর! যে শক্তি সাফওয়ান খান’র মতো দাম্ভিক পুরুষটাকেও গুড়িয়ে দিয়েছে এক অষ্টাদশী মানবীর সম্মুখে।
