ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ৩৩+৩৪
তানিশা ভট্টাচার্য্য
শরতের গোধূলি তখন ঝিলের শান্ত জলে এসে মিশেছে। পশ্চিম আকাশে সিঁদুরে মেঘের আভা ক্রমে ম্লান হয়ে আসছে। মেঘাদ্রির বুকটা তখন এক অজানা যন্ত্রণায় ভেঙে যাচ্ছিল; যাকে সে মনের মণিকোঠায় অতি সন্তর্পণে জায়গা দিয়েছিল, আজ তার মুখেই অন্য এক নারীর কথা শুনতে হচ্ছে! প্রতিটি পদক্ষেপ যেন তার কাছে পাহাড় সমান ভারি মনে হচ্ছিল, তবুও সে রিকির পিছু পিছু এগিয়ে চলল ঝিলের নির্জন পাড়ে।
চারপাশে কাশফুলের দোলা আর দূরে ঢাকের মৃদু আওয়াজ এক অদ্ভুত বিষণ্ণ সুর তৈরি করেছে। মেঘাদ্রি নিজেকে সামলে নিয়ে ধরা গলায় জিজ্ঞেস করল
-“কই, কোথায় তোর সেই স্বপ্নসুন্দরী? কোথায় তোর গার্লফ্রেন্ড?”
তার কণ্ঠে অভিমান আর চাপা কষ্ট মিলেমিশে একাকার। সে ভাবছিল, হয়তো এখনই কোনো এক সুন্দরী তরুণী এসে দাঁড়াবে তার সামনে, আর তাকে সহ্য করতে হবে সেই পরাজয়ের মুহূর্ত।
রিকি কোনো উত্তর না দিয়ে শুধু হাসল। সেই পরিচিত স্নিগ্ধ হাসি, যা মেঘাদ্রির হৃদয়কে বারবার দোলা দেয়। সে আলতো করে মেঘাদ্রির হাত ধরে ঝিলের একদম কিনারায় নিয়ে গেল। স্ফটিক স্বচ্ছ জলের ওপর বিকেলের পড়ন্ত আলোর শেষ ছটা ঠিকরে পড়ছে। রিকি জলের দিকে আঙুল বাড়িয়ে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে বলল
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
-“ওই দেখ! ঠিক সামনেই দাঁড়িয়ে আছে সে। দেখতে পাচ্ছিস না কত সুন্দর? আমার গার্লফ্রেন্ডকে একবার দেখ, ঠিক যেন এক মায়াবী পরী নেমে এসেছে মর্ত্যে!”
মেঘাদ্রি বিভ্রান্ত হয়ে এদিক-ওদিক তাকালো। ঝাউবনের ছায়া আর ঘাসের কার্পেট ছাড়া সেখানে তৃতীয় কোনো মানুষের চিহ্ন নেই। সে আবারও অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল
-“কোথায় ? তুই কি আমার সাথে মজা করছিস রিকি?”
রিকি তখন গভীর অনুরাগে মেঘাদ্রির চোখের দিকে তাকিয়ে বলল
-“জলের দিকে তাকা।”
মেঘাদ্রি মাথা নিচু করে ঝিলের শান্ত জলের দিকে তাকাতেই স্তব্ধ হয়ে গেল। কম্পিত জলের ওপর ফুটে উঠেছে তার নিজেরই প্রতিচ্ছবি। সেই কাজলা চোখ, ঘাম ভেজা কপাল আর বিষণ্ণতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা তার প্রিয় মুখখানিই জলে ভাসছে।
মুহূর্তে পৃথিবীর সমস্ত স্তব্ধতা যেন তাকে ঘিরে ধরল। রিকি ফিসফিস করে বলল
-“আমার এই পরিণীতাকেই আমি চেয়েছি রে। তোর ওই অভিমানী প্রতিচ্ছবিটাই আমার সারা জীবনের প্রেম।”
সপ্তমীর সন্ধ্যায় ঝিলের পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা মেঘাদ্রির চোখের কোণে তখন এক ফোঁটা আনন্দের জল মুক্তোর মতো চিকচিক করে উঠল।
ঝিলের জলের সেই কম্পিত প্রতিচ্ছবি তখন এক শাশ্বত সত্যে রূপ নিয়েছে। রিকি পকেট থেকে একটি লাল গোলাপ বের করে নতজানু হয়ে বসল। শরতের মৃদু বাতাসে তার চুলগুলো উড়ছে। গভীর চোখে মেঘাদ্রির চোখের দিকে তাকিয়ে সে বলল,
-“এই অগোছালো ছেলেটার জীবনের ধ্রুবতারা হয়ে থাকবি? আমার প্রতিটা পুজো, প্রতিটা শরৎ কি তোর হাতের ছোঁয়ায় রঙিন হতে পারে?”
মেঘাদ্রি তখন বাকরুদ্ধ, আনন্দের আতিশয্যে তার চোখের পলক পড়ছে না। মুহূর্তের জন্য সময় যেন থমকে গেল। সে সব দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে রিকি কে পরম আবেশে জড়িয়ে ধরল। কান্নার সুরে মিশে থাকা এক আকাশ প্রেম নিয়ে ফিসফিস করে বলল
-“ভালোবাসি রিকি, খুব ভালোবাসি তোকে!”
সপ্তমীর সেই সন্ধ্যা তখন এক পবিত্র মিলনের সাক্ষী হয়ে রইল। এরপর রিকি তার হাত শক্ত করে ধরে বলল,
-“অনেক তো হলো কান্না-অভিমান, এবার চল তিলোত্তমার উৎসবে মেতে উঠি। আজ সারা রাত তোকে নিয়ে ঠাকুর দেখব।”
মেঘাদ্রির ভিড়ের মাঝে হারিয়ে যাওয়ার ভয় আর নেই, কারণ এখন পৃথিবীর সবথেকে নিরাপদ আশ্রয়টি তার হাতের মুঠোয়। জনস্রোতের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে রিকি আপন মনে গুঞ্জন করে গেয়ে উঠল এক চিরচেনা সুর;
“আমার সপ্তমীর বিকেল,
আমার এক ভাঙা সাইকেল।
তোমার নতুন জুতো, মারুতি এস্টিম।
আমার পকেট গড়ের মাঠ,
তোমার নতুন ক্রেডিট কার্ড।
আমি তোমার কাছে নিতান্ত টিমটিম।…”
জনারণ্যে হারিয়ে যাওয়া এক জোড়া মানুষের হাত ধরা ছবি আর নেপথ্যে সেই সুর—সপ্তমীর রাতটি যেন এক মহাকাব্যের শেষ পাতায় এসে পৌঁছাল।
রাতের কলকাতা তখন আলোয় ঝলমল করছে, কিন্তু সেই বিলাসবহুল বাড়ির বেলকনিতে তখনো এক মায়াবী নিস্তব্ধতা। সপ্তমীর চাঁদ মধ্যগগনে, আর সেই শ্বেতপাথরের রেলিংয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সেই আভিজাত্যময়ী সপ্তদশী তরুণী। হঠাৎ তার ফোনে বেজে উঠল, পরিচিত রিংটোন। ওপার থেকে রিকির আনন্দিত কণ্ঠস্বর ভেসে এল,
-“আমি জানি তুই ঘুমোসনি। ধন্যবাদ রে! তোর এই মাস্টারপ্ল্যানটা না থাকলে আজকের এই রূপকথাটা সম্ভব হতো না। তোর জন্যই আমি ওকে সারা জীবনের জন্য নিজের করে পেলাম।”
তানভীর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। এই আড়ালে থাকা সুতোটি তো সেই টেনেছিল। সে জানত, মেঘাদ্রি রিকি কে মনে মনে কতটা ভালোবাসে, কিন্তু সে ছিল বড্ড লাজুক আর অভিমানী। তাই সে এই নাটকের চিত্রনাট্য সাজিয়েছিল। যেন এক নিপুণ সুতোয় দুই বিচ্ছিন্ন প্রাণকে বেঁধে দিল সে।
ফোনটা রেখে দিয়ে তানভী আকাশের দিকে তাকাল। তার দুচোখে এখন কোনো বিষণ্ণতা নেই, বরং এক নিঃস্বার্থ আনন্দের ঝিলিক। নিজের একাকীত্বকে সে আজ সার্থক মনে করল বন্ধুর খুশির আয়নায়। সে নিজেকে উৎসবের ভিড়ে সামিল করেনি ঠিকই, কিন্তু সপ্তমীর এই রাতে দুই হৃদয়ের মিলনের কারিগর হয়ে সে নিজেই হয়ে উঠল এক নিঃশব্দ উৎসব। তিলোত্তমার আকাশে তখন আতশবাজির রোশনাই, আর তার হৃদয়ে এক প্রশান্তির সুর।
অষ্টমীর সকাল মানেই তিলোত্তমার আকাশে এক পবিত্র শিউলি ফুলের সুবাস আর ঢাকের গম্ভীর আওয়াজ। সকালের সোনাঝরা রোদ্দুর যখন শ্বেতপাথরের মেঝের ওপর আল্পনার মতো ছড়িয়ে পড়েছে, তানভী তখন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে নতুন করে সাজিয়ে নিচ্ছে অষ্টমীর অঞ্জলী দিতে যাওয়ার জন্য।
পরনে তার আর্ভিকের দেওয়া সেই ধবধবে সাদা থ্রিপিস, চোখে হালকা করে দেওয়া কাজল, ঠোঁটে লিপস্টিক, কপালে ছোট্ট একটা কালো টিপ আর দুহাতে চুড়ি। তানভী শাড়ি পড়ে নি, আর্ভিকের কঠোর নিষেধ।
বিশাল চওড়া সিঁড়ি দিয়ে মন্থর গতিতে নামছে তানভী। সিঁড়ির শেষ ধাপে বসেই গিটারের তারে আঙুল বুলাচ্ছিল আর্ভিক। তার পায়ের কাছেই আয়েশ করে শুয়ে ছিল গোল্ডি, যে গিটারের মিড় আর সকালের শান্ত বাতাসে চোখ বুজে সুখনিদ্রা দিচ্ছে।
তানভীর পায়ের নূপুর যখন কাঠের সিঁড়িতে মৃদু রিনিঝিনি শব্দ তুলল, আর্ভিক মুখ তুলে তাকাল। এক মুহূর্তের জন্য তার সুর থমকে গেলেও পরক্ষণেই তার চোখের দৃষ্টি গভীর হলো। সে গিটারের তারে এক মায়াবী ঝংকার তুলে গেয়ে উঠল:
“জানিনা কেনো যে শুধু এ তোর কথা
ভাবতে ভালো লাগে
দুচোখে এতো যে সপ্ন লুকোচুরি
করেনি কেনো আগে
প্রিয়া রে জিয়া রে আর মানে না
হিয়া টারে কি বলে বুঝাই..
যে দেশে নয়ন বলে স্বপ্ন দেখে যাই
ইচ্ছে করে তরে নিয়ে যাই
যে দেশে চেনা জানা মানুষ কোনো নাই
ইচ্ছে করে তরে নিয়ে যাই
প্রিয়া রে জিয়া রে কথা শুনে না
হিয়া টারে কি বলে বুঝাই..”
গানের প্রতিটি শব্দ যেন ওই বিশাল হলের খিলানে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসছিল। তানভী মাঝপথে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল, তার ঠোঁটের কোণে লাজুক হাসি। গোল্ডি আলসেমি ভেঙে একবার লেজ নাড়িয়ে জানিয়ে দিল সেও এই সুরের সাক্ষী। ঝাড়লণ্ঠনের কাচ থেকে ঠিকরে পড়া আলো আর গিটারের সেই টুংটাং শব্দে অষ্টমীর সকালটা যেন এক সুরের সমুদ্রে পরিণত হলো। আভিজাত্য আর আধুনিকতার এক অদ্ভুত মেলবন্ধন ঘটে গেল ওই সিঁড়ির বাঁকে, যেখানে গান আর ভালোবাসা মিলেমিশে একাকার।
অষ্টমীর প্রখর রোদে বাইকের চাকায় গতি তুলে তারা পৌঁছে গেল এক সাবেকি মণ্ডপে। ভিড়ের মাঝে আর্ভিক তানভীর হাত শক্ত করে ধরে, মায়ের চরণে পুষ্পাঞ্জলি দিল। অঞ্জলি শেষে প্রসাদ নিয়ে মণ্ডপ থেকে বের হয়ে আসতেই এক বিড়ম্বনা দানা বাঁধল। তানভীর থ্রিপিসের প্যান্টের সুতো গুলো পায়ের নিচে চলে আসছিল, যার ফলে বারবার তার হাঁটা থমকে যাচ্ছিল। ভিড়ের মাঝে এই ছোট বিভ্রাটে সে বেশ অস্বস্তিতে পড়ে গেল।
আর্ভিক মুহূর্তেই ব্যাপারটা আঁচ করতে পারল। চারপাশের হাজারো মানুষের কোলাহলকে তুচ্ছ করে সে রাস্তা সংলগ্ন এক কোণায় তানভী কে দাঁড় করাল। কোনো দ্বিধা ছাড়াই সে হাঁটু গেড়ে নিচু হয়ে বসল। পরম যত্ন আর সাবলীলতায় সে সুতো গুলো ঠিক করে দিল, যেন সে কোনো মহৎ শিল্পকর্ম সারাই করছে। তানভী স্তম্ভিত হয়ে আর্ভিকের ঝুঁকে থাকা মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তার মনে হলো
“যে মানুষটা ভরা রাস্তার মাঝে হাঁটু গেড়ে বসে তার পায়ের সুতো গুলো ঠিক করে দিতে পারে, তার কাছেই পৃথিবীর সমস্ত নিরাপত্তা গচ্ছিত রাখা যায়।”
এই ছোট অথচ গভীর ভালোবাসার স্পর্শে তানভীর বুকের ভেতরটা এক অদ্ভুত সুখে ভরে উঠল। সেই অস্বস্তি কাটিয়ে তারা আবার বাইকে চড়ল। একের পর এক মণ্ডপে প্রতিমার রূপ আর আলোকসজ্জা দেখে যখন তারা বাড়ি ফিরল, তখন মনের মণিকোঠায় সারারাত ধরে জমানো খুশির জোয়ার। অষ্টমীর দুপুরটা কেবল ঠাকুর দেখার নয়, বরং এক পরম মমতার সাক্ষী হয়ে তানভীর মনে চিরস্থায়ী জায়গা করে নিল।
দশমীর সিঁদুরমাখা বিকেল, চারিদিকে বিদায়ের সুর বাজছে। তখনই তানভীর ফোনে রিকির কল এল। ওপার থেকে উৎসাহী স্বরে সে বলে উঠল
-“কিরে, তুই আসবি না? কত দেরি করছিস! তাড়াতাড়ি আর্ভিক দাদার সাথে বেরিয়ে পড়, আমরা সবাই তোর জন্য অপেক্ষা করছি।”
ফোনে কথা শেষ হতেই দরজায় কড়া নাড়ল আর্ভিক। তানভীর ঘরে ঢুকে সে দেখল, তানভী জানালার ধারে বিষণ্ণ মনে দাঁড়িয়ে বিসর্জনের বাজনা শুনছে। আর্ভিক আলতো হেসে কাছে গিয়ে বলল
-“দশমীর দিনে মন খারাপ নিয়ে বসে থাকলে চলে? ঝটপট রেডি হয়ে নে তো! প্রেমদের বাড়িতে যেতে হবে রিকি আর প্রেম অনেকক্ষণ থেকে ফোন করে আসার জন্য বলছে। ওদের বাড়িতে খুব বড় করে পুজো হয়, সেখানে প্রতিমা বরণের পর সবাই মিলে বিজয়ার আড্ডায় মাতব। তোকে ছাড়া সেই আড্ডাটা একদম জমবে না।”
ঘরের শান্ত পরিবেশে আর্ভিকের উপস্থিতিতে মুহূর্তেই এক চিলতে প্রাণের স্পন্দন ফিরে এল। তার আবদার মাখা কণ্ঠস্বর আর উৎসবের আমেজ তানভীর মন থেকে বিসর্জনের বিষাদ ধুয়ে মুছে দিল। তানভী একটা ম্লান হাসি দিয়ে আলমারি থেকে একটা শাড়িটা বের করে নিল। তারপর আর্ভিককে আহ্লাদী কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করল
-“আজ শাড়ি পড়ি ?”
আর্ভিক মুচকি হেসে সম্মতি জানালো। শরতের শেষ আলোয় ঘরের দেয়ালগুলো যেন এক নতুন উৎসবের অপেক্ষায় উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
কিছুক্ষণ পর তানভী যখন ধবধবে সাদা গরদের শাড়ি, তার চওড়া লাল পাড়, হালকা মেকআপ আর খোলা চুলে ধীর পায়ে আর্ভিকের সামনে এসে দাঁড়াল, মুহূর্তের জন্য সময় যেন থমকে গেল। শরতের শেষ বিকেলের সোনাঝরা আলো তার মুখে পড়ে এক স্বর্গীয় আভা তৈরি করেছে। আর্ভিক পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল; তার চোখের পলক পড়ছিল না। সে যেন কোনো রক্ত-মাংসের মানুষ নয়, বরং এক জীবন্ত ক্যানভাস দেখছে, যেখানে নিপুণ তুলিতে আঁকা হয়েছে শুদ্ধতম প্রেমের ছবি। হঠাৎই আর্ভিকের চোখের সামনে এক অতীতের স্মৃতি ভেসে ওঠে;
পাঁচ বছরের এক ছোট্ট পরী, সেদিন তার মায়ের কালো রঙের একটা শাড়ি জড়িয়ে গুটিগুটি পায়ে এসেছিল তার প্রিয় আর্ভিক ভাইয়ের সাথে রান্না-বাটি খেলবে বলে। কিন্তু আর্ভিক তখন বইয়ের পাতায় মগ্ন থাকায় তাকে একটু অপেক্ষা করতে বলেছিল— ব্যস, তাতেই মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি! অভিমানে গাল ফুলিয়ে, শাড়ির আঁচল টেনে সে যেন এক পুঁচকে কালো মেঘ হয়ে ঘরের কোণে বসে রইল। তাকে মানাতে আর্ভিক সেদিন সব কাজ ফেলে হাঁটু গেড়ে বসে কাব্যিক স্বরে বলেছিল:
“শোনো হে কালো শাড়ির রাজকন্যা, তোমার এই কাজল ধোয়া অভিমানী চোখে আকাশও হার মেনেছে। তুমি যদি হাড়ি-কুড়ি না ধরো, তবে এই রান্না-বাটির সংসার যে আজ উপোস করে থাকবে। ওই দেখো, চড়াই পাখিটাও তোমার হাসির অপেক্ষায় গান থামিয়ে দিয়েছে।”
সেই মিষ্টি তোষামোদে কাজ হলো। গাল ফোলানো ভাব কমে এক চিলতে মুক্তোঝরা হাসি ফুটে উঠল। কালো শাড়ির ভাঁজ থেকে বেরিয়ে আসা সেই খিলখিল হাসিতে যেন মুহূর্তেই বিকেলটা জ্যোৎস্নায় ভরে উঠেছিল।
তানভীর ডাকে আর্ভিক অতীতের স্মৃতি থেকে ফিরে আসে।এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেকে সংবরণ করল আর্ভিক। ঠোঁটের কোণে এক চিলতে তৃপ্তির হাসি ফুটিয়ে সে ধীর গলায় বলল,
-“চল, এবার যাওয়া যাক।”
আর্ভিক আর তানভী পাশাপাশি হাঁটছিল, তখন তানভীর শাড়ির খসখস শব্দ আর আর্ভিকের নিস্তব্ধ মুগ্ধতা মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছিল। চারপাশের বিসর্জনের বিষাদ তখন আর্ভিকের কাছে এক অন্য অর্থ বয়ে আনছিল। আর্ভিক জানত,
“আজ মূর্তির বিসর্জন হলেও তার মনের মণিকোঠায় যে প্রতিমা প্রতিষ্ঠা পেয়েছে, তার বিসর্জন কোনোদিন সম্ভব নয়।”
ঢাকের গুরুগুরু আওয়াজ আর শঙ্খধ্বনির মাঝে তারা এগিয়ে চলল সেই গন্তব্যে, যেখানে বিষাদ আর মিলন হাত ধরাধরি করে দাঁড়িয়ে আছে এক রঙিন সমাপ্তির অপেক্ষায়।
বিজয়া দশমীর সন্ধ্যায় রিকিদের পুরোনো বনেদি বাড়ির ঠাকুরদালান তখন এক মায়াবী কুয়াশায় ঢাকা। ধুনুচির ধোঁয়া আর চন্দনের সুবাসে বাতাস ভারি হয়ে উঠেছে। তানভী আর আর্ভিক পৌঁছাতেই রিকি ও মেঘাদ্রি প্রায় ছুটে এসে তানভীকে নিজেদের আড্ডার বৃত্তে টেনে নিল। কতদিন পর এমন অকৃত্রিম প্রাণখোলা হাসি! একদিকে তানভী রিকি আর মেঘাদ্রির খুনসুটি, আর অন্যদিকে আসন্ন বিদায়ের বিষাদ—সব মিলিয়ে এক মিশ্র অনুভূতির দোলাচল।
হঠাৎ ঢাকের বাদ্যি বদলে গেল এক রণনদীতে। সবাই অবাক হয়ে দেখল, ধুনুচি হাতে সেই আর্ভিক দালানের মাঝখানে এসে দাঁড়িয়েছে। তারপর ধুনুচি হাতে নাচতে নাচতে আর্ভিক গেয়ে উঠলো
“মায়ের রুপে মন ভরে যায়
প্রনাম জানা ঐ রাঙা পায়,
ওরে ধুনুচি দু’হাতে নাচরে এখন।
ঢাকের তালে কোমর দোলে
খুশিতে নাচে মন,
আজ বাজা কাঁসর জমা আসর
থাকবে মা আর কতক্ষন।
বলো দূর্গা মায় কি,
সবাই একসাথে আনন্দে বলে উঠে
“জয় ..”
আর্ভিকের প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল বিদ্যুতের মতো চপল। ধুনুচি থেকে ছিটকে আসা আগুনের ফুলকি আর ধোঁয়ার বলয়ের মাঝে আর্ভিক যখন ছন্দে ছন্দে নিজেকে বিলিয়ে দিল, তখন ঠাকুরদালানের প্রতিটি কোণ যেন জেগে উঠল।
তানভী স্তম্ভিত হয়ে ভিড়ের একপাশে দাঁড়িয়ে দেখছিল সেই অদ্ভুত সুন্দর দৃশ্য। যে যুবক তার প্রতি যত্নশীল,কোমল, সে-ই আবার ধুনুচি নাচের সময় কতটা তেজস্বী! আর্ভিকের চোখের মণি তখন আগুনের শিখার মতো জ্বলছে। নাচের প্রতিটি ঝংকার যেন তানভীর হৃদস্পন্দনের সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছিল। মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে আছে তানভী আর্ভিকের পানে।
নাচ শেষ হতে না হতেই দালান জুড়ে করতালির জোয়ার বয়ে গেল। ঠিক সেই মুহূর্তে শুরু হলো সিঁদুর খেলা। মর্ত্যের বরণ শেষে মা যখন কৈলাসের পথে পা বাড়াবেন, তখন তাঁর সেই বিদায়ী সিঁদুরে রঙিন হওয়ার উৎসব। লাল সিঁদুরের আবিরে চারিদিক তখন রক্তিম। আর্ভিক এক মুঠো সিঁদুর নিয়ে ভিড় ঠেলে সোজা এগিয়ে এল তানভীর দিকে। তার ঘাম ভেজা কপালে লেপ্টে থাকা চুলের ফাঁক দিয়ে সে অতি সন্তর্পণে তানভীর গালের ওপর সেই সিঁদুরের ছোঁয়া দিল। তানভীও আর পিছিয়ে থাকল না। পরম আবেশে সেও নিজের হাতের সিঁদুরে রাঙিয়ে দিল আর্ভিকের গাল।
ঢাকের বিদায়ী আওয়াজের মাঝেও তখন এক নতুন আশার সুর বেজে উঠল। সিঁদুরে রাঙানো মুখগুলোয় শরতের শেষ আলোটা যখন পড়ল, মনে হলো এই তিলোত্তমা যেন তার সবটুকু আশীর্বাদ এই দুই জোড়া হৃদয়ের ওপর উজাড় করে দিচ্ছে।
সিঁদুর খেলার সেই রক্তিম আভা যখন চারপাশকে মায়াবী করে তুলেছে, তখন দালানের এক কোণে তৈরি হলো কিছু অমলিন মিষ্টি মুহূর্ত। রিকি মেঘাদ্রির কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল
-“লাল রঙে তোকে একদম অন্যরকম লাগছে, ঠিক যেন আমার ঘরের লক্ষ্মীটি।”
মেঘাদ্রি লজ্জায় নুইয়ে পড়ল, তার সিঁদুরমাখা গালে তখন ভালোবাসার আর এক প্রস্থ লাল আভা ফুটে উঠল।
আড্ডার মাঝে এল বিজয়ার সেই চিরাচরিত মিষ্টি আর নারিকেল নাড়ুর থালা। রিকি একটি নাড়ু হাতে নিয়ে আলতো করে মেঘাদ্রির মুখে তুলে ধরল। মেঘাদ্রি প্রথমে একটু ইতস্তত করলেও পরে পরম আবেশে সেই নাড়ুর স্বাদ নিল। বিনিময়ে সেও রিকির মুখে এক টুকরো সন্দেশ তুলে দিল—যেন এক মিষ্টি অঙ্গীকারের শুরু।
দশমীর সেই মায়াবী আবহে যখন দুটি হৃদয়ের গোপন আলাপন চলছিল, ঠিক তখনই এক বজ্রনির্ঘোষের মতো উদয় হল নীলাদ্রী। গম্ভীর গলায় সে মেঘাদ্রিকে বলে উঠল
-“এই! তোরা এখানে কোণায় দাঁড়িয়ে কী করছিস?”
দাদাকে হঠাৎ দেখে যেন স্বর্গ থেকে মর্ত্যে আছড়ে পড়ল মেঘাদ্রি। রিকিও আমতা আমতা করতে লাগল। ওদিকে আর্ভিক পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে ঝড়ের বেগে এসে নীলাদ্রির হাত চেপে ধরল। সে নীলাদ্রিকে একরকম টেনে সরিয়ে নিতে নিতে রসিকতা করে বলল
-“আরে নীল, ‘কাবাবের হাড্ডি’ হয়ে লাভ নেই, চল আমার সাথে ওদিকে!”
নীলাদ্রি একটু দূরে সরতেই রিকি হাঁফ ছেড়ে বলল,
-“বাপ রে! তোর দাদা তো দেখি আস্ত এক হিটলার!”
রিকির মুখে দাদার নামে এমন উপাধি শুনে মেঘাদ্রির রোমান্টিক মেজাজ এক নিমেষে উধাও। সে অভিমানী চোখে বড় বড় করে তাকিয়ে যেন নীরব হুঙ্কার দিল—নিজের দাদার নামে এমন কথা সে বরদাস্ত করবে না। প্রেমের সুতোয় তখন এক চিলতে খুনসুটির টান লাগল।
অন্যদিকে, নীলাদ্রি তখন আর্ভিকের হাতে ছটফট করছে। সে উত্তেজিত হয়ে বলল
-“তুই তার মানে সব জানিস? ছাড় আমাকে, বোনুর কাছে যেতে দে!”
আর্ভিক আর প্রেম দুজনে হেসেই কুপোকাত। আর্ভিক নীলাদ্রির কাঁধে হাত রেখে দরাজ গলায় বলল
-“আরে ভাই, নিজের তো প্রেম করার সুযোগ হলো না, অন্তত বোনটাকে তো সেই বসন্তটুকু উপভোগ করতে দে! বড় হতে শেখ, ওদিকে চল এখন।”
দশমীর সেই সিঁদুরমাখা সন্ধ্যায় যেন প্রণয়ের মায়া চলল। এরপর শুরু হলো সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত—বিজয়া দশমীর কোলাকুলি আর প্রণাম। আর্ভিক যখন বাড়ির বড়দের আশীর্বাদ নিয়ে তানভীর সামনে এসে দাঁড়ালো, তানভী মাথা নিচু করে তাকে প্রণাম করতে গেল। কিন্তু আর্ভিক চট করে তার হাত ধরে ফেলল এবং হাসিমুখে বলল
-“বারণ করেছিলাম না পায়ে হাত দিতে?”
দশমীর রাত তখন গভীর হচ্ছে। বিসর্জনের ঢাকের আওয়াজ তখন ক্রমশ দূরে মিলিয়ে যাচ্ছে, আর শহরের আকাশে জেগে উঠেছে একাদশীর চাঁদ। আর্ভিক তানভীকে নিয়ে ফিরে এল তাদের বাড়ির সদর দরজায়। বাইকের শব্দ থামতেই চারপাশটা যেন এক অদ্ভুত শান্তিতে ভরে উঠল।
কেটে গেছে দুটো দিন, দশমীর রেশ কাটলেও তানভীর রুমে তখনো উৎসবের মেজাজ। পুজোর ছুটির প্রোজেক্টের পাহাড় সামলাতে আজ জড়ো হয়েছে রিকি আর মেঘাদ্রি। ঘরের ভেতর তখন অ্যাকাউন্টসের প্রজেক্টের চার্ট পেপার আর রঙের ছড়াছড়ি।
কাজের মাঝপথে তানভী হাত বাড়িয়ে বলল
-“রিকি, ছবিগুলো দে, এবার এখানে আটকাতে হবে।”
রিকি আমতা আমতা করে মাথা চুলকে বলল
-“আসলে… আমি তো ছবি গুলো প্রিন্টআউট করতেই ভুলে গেছি!”
রিকির কথা শুনেই মেঘাদ্রি মেজাজ হারিয়ে চেঁচিয়ে উঠল,
-“কেন করিসনি?”
রিকি বোকার মতো করে হেসে জবাব দিল
-“দোকানদারা সব Closed day পালন করছিল”
মেঘাদ্রি রাগান্বিত কন্ঠে বলল
-“তুই কি মজা করছিস আমাদের সাথে! কাল রাত পর্যন্ত তোকে মনে করিয়ে দিলাম! এখন কি আমরা হাতে এঁকে ছবি বানাব? এত কেয়ারলেস কেন তুই”
তানভীর কথায় ঘরে সাময়িক একটা স্তব্ধতা নেমে এল। মেঘাদ্রিকে শান্ত করতে সে নরম স্বরে বলল
-“থাক মেঘাদ্রি, আর রাগারাগি করে লাভ নেই। সময় নষ্ট করে কী হবে? ছবিগুলো বরং আমি নিজেই হাতে এঁকে নেব।”
মেঘাদ্রি আর কিছু বলল না আড়চোখে রিকির দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। সেই রাগান্বিত চাহনি দেখে রিকির অবস্থা নাজেহাল—সে অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে বসে রইল, যেন মেঘাদ্রির চোখের আগুন তাকে পুড়িয়ে দিচ্ছে।
প্রেমের হঠাৎ এমন টানে নীলাদ্রি প্রায় টালমাটাল হয়ে আর্ভিকদের ড্রয়িং রুমে এসে পৌঁছাল। আর্ভিকের মা তখন গুছিয়ে বসছিলেন, প্রেমদের এই ‘ঝড়ো’ এন্ট্রি দেখে তিনি বেশ অবাকই হলেন।
প্রেম একটু হাঁপাতে হাঁপাতে নিচু হয়ে রাখী রায়চৌধুরী কে প্রণাম করল। তারপর তড়িঘড়ি জিজ্ঞেস করল,
-“আন্টি, আর্ভিক কি বাড়িতে আছে?”
আর্ভিকের মা ওর ব্যস্ততা দেখে হেসেই ফেললেন। মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়ে স্নিগ্ধ স্বরে বললেন,
ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ৩১+৩২
-“হ্যাঁ বাবা, আর্ভিক ওর ঘরেই আছে। যা, ভেতরে যা।”
প্রেমের তর সইছে না। সে নীলাদ্রির হাতটা আরও শক্ত করে ধরে প্রায় দৌড়াতে দৌড়াতে আর্ভিকের রুমের দিকে এগোলো। ওদিকে নীলাদ্রি বিড়বিড় করে বলছে
-“আরে আস্তে চল, আমার পা দুটো এবার আলাদা হয়ে যাবে শরীর থেকে!”
