Home অপরাহ্নে উপসংহার অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৩৫ (২)

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৩৫ (২)

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৩৫ (২)
তোনিমা খান

ভালোবাসা এলে শক্ত মানুষও ভেঙে যায়,
অবহেলিত ব্যথাগুলো তখন আদর খুঁজে পায়।
যে মন একদা অনাদরে অভ্যস্ত ছিল
আজ সে মন একটুখানি জ্বরেও সুখ খোঁজে।
বহুবছর পর অসুখের মাঝে সুখময় সঙ্গী পেয়ে তপোবনের অসুস্থতারা বেজায় আহ্লাদী হয়ে উঠল। আগে যেখানে মারাত্মক অসুস্থতা তাকে কাবু করতে পারত না, এখন সেখানে সামান্য অসুস্থতায় কারোর দিকে যত্নের আকাঙ্ক্ষায় বিধুর নয়নে চেয়ে থাকে।
তপোবনের ও রাতে জ্বর আসে। এবং বাবা ছেলের দু’জনের অসুখের সঙ্গী রূপকথা নামক ছোট্ট মেয়েটি সবটা দায়িত্ববান অভিভাবকের ন্যায় সামলে নিলো।
তবে সকাল হতেই বড় ছেলে, বড় ভাই, বাবার দায়িত্বগুলো দোরগোড়ায় এসে হাজির। অসুস্থতাদের আর প্রশ্রয় দেয়া হলো না।
বাধ্য হয়ে তপোবনকে তৈরি হয়ে বের হতে হয় অফিসের উদ্দেশ্যে যাওয়ার জন্য। তখন সকাল আটটা। এত সকালেই কেন অফিসে ডাক পড়ল জানে না।

–“এখনি বেরিয়ে যাচ্ছেন? খাবার খাবেন না?”
রূপকথার ব্যস্ত কণ্ঠে তপোবন পাঞ্জাবির আস্তিন গোটাতে গোটাতে ফিরে তাকায়। সারারাত না ঘুমাতে পারার কারণে মেয়েটির চোখেমুখে বিদীর্ণ বিষন্নতা। সে ক্ষীণ স্বরে বলল,
–“খিদে নেই, তুমি বিশ্রাম নাও। সারারাত ঘুম হয়নি।”
চোখেমুখে তম্রাভ আভা নিয়েই রূপকথা
ম্লান হেসে তার কথা এড়িয়ে গিয়ে বলল,
–“খিদে পায় নি বললে কেমন হবে? আপনার চোখেমুখে ক্লান্তি, ক্ষুধা স্পষ্ট। খেতে হবে, না খেলে এত এত দায়িত্ব কিভাবে পালন করবেন? বড় ছেলে, বাবা, ভাই আরও কত কত দায়িত্ব। সেগুলো পালন করতে হলেও তো শক্তির প্রয়োজন। আপনি একটু বসুন আমি খাবার এখানেই নিয়ে আসছি।”
–“এগুলো আমার দায়িত্ব নয় আমার ভালোবাসার এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ।”
–“সব ভালোবাসার অংশ নয়, কিছু কিছু জোরপূর্বক চাপিয়ে দেয়া দায়িত্ব ও হয়।”
মেয়েটি এমন নয়, তার কথাগুলোও এমন নয়। তপোবনের দৃষ্টি গভীর হয়। গভীর কণ্ঠেই বলে ওঠে,
–“আমার কাছে কোনোকিছু জোরপূর্বক চাপিয়ে দেয়া দায়িত্বের অংশ নয়, রূপকথা। তুমিও না।”
রূপকথার চলন্ত কদম থেমে যায়। উদাসীন হেসে বলে,
—”জীবনের পথটুকু মসৃণ করতে আমরা এমন মনভোলানো কথা অনেক বলি। কিন্তু সময় আর পরিস্থিতি মানুষকে ভীষণ বুঝদার করে তোলে। তখন বোঝা যায়—কোনটা ভালোবাসা, আর কোনটা শুধুই দায়িত্ব।”

—”বুঝদার হয়ে গেলে কি অনুভব করা বন্ধ হয়ে যায়?”
তপোবন ধীরে কদমে এগিয়ে গিয়ে ঠিক মেয়েটির সামনে এসে দাঁড়ায়। চোখে ক্লান্তি, অথচ তার চেয়েও বেশি মায়া। মাঝেমধ্যে মনে হয় মেয়েটির আবেগ আর অভিমান এর পাল্লা অনেক ভারী। কিন্তু পরমুহূর্তেই মনে হয় এই ভার যে নিছকই প্রেমময় অনুভূতির ভার। যা কেবল সেই বহন করতে পারবে।
সে ব্যস্ততা উপেক্ষা করে আলগোছে অভিমানী নারীটিকে আগলে নিলো বাহুডোরে। হকচকালো রূপকথা। তপোবন ম্লান হেসে বিমর্ষ মেয়েটির এলোমেলো চুলগুলো গুছিয়ে দিতে দিতে বলল,
—”যে দায়িত্ব ভালোবাসা ছাড়া পালন করা যায় না, তাকে আমি দায়িত্ব কি করে বলি বলোতো?ভালোবাসার অংশ বলেই তাকে আগলে রাখার দায়িত্ব জন্মায়, হারিয়ে ফেলার ভয় জন্মায়।”
রূপকথা শক্ত চাহনি চঞ্চল হয়। অবুঝ মন এসব কথা মানতে নারাজ। তাই সে বাহুডোর থেকে বের হতে হতে ব্যস্ত কণ্ঠে বলে,

–“ছাড়ুন, আমি খাবার আনছি।”
তপোবন ছাড়ে না। বরং মিহি স্বরে বলে,
–“আমি চাই না তুমি সংসার আর দায়িত্বের টানাপোড়েনে নিজেকে হারিয়ে ফেলো, রূপকথা।”
রূপকথা টলটলে নেত্রে চোখ তুলে তাকায় ধূসর রঙা আঁখিদ্বয়ের দিকে। ক্ষীণ স্বরে বলে,
–“জানেন, নারী মায়ার বাঁধনে বড্ডো অসহায়! আর বিয়ের পর এই মায়াই হয়ে দাঁড়ায় তাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা, যাকে আমরা ‘সংসার’ বলি। সংসারবিমুখ মানুষটাও একটাসময় জীবনের এই বাঁকে এসে নিজের অস্তিত্ব বিলীন করে দেয়। একটা নীড় তিল তিল করে সাজানো, তাকে পরম মমতায় আগলে রাখার মাঝেই আমরা জীবনের সার্থকতা খুঁজে পাই। আর সেই নীড়ে আশ্রয়ের জন্য একজন জীবনসঙ্গীকে চায়, যে হবে তার তপ্ত দুপুরের শীতল ছায়া। সংসার আর প্রিয়জনের ভালোবাসা পাথরের ন্যায় কঠিন হৃদয়কেও চূর্ণবিচূর্ণ করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। সেখানে আমি তো কেবল এক নগণ্য বালুকণা মাত্র!
শৈশব থেকে এক জোড়া স্নেহময় চোখের জন্য, বাবার ছায়ার জন্য চাতক পাখির মতো তৃষ্ণার্ত ছিলাম। আর আজ ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! বিয়ের পর আমি এমন একজনের আশ্রয়ের জন্য হাহাকার করছি, যে আমাকে ভালোবেসে নয়, বরং দায়বদ্ধতার শিকলে বেঁধে কেবল ‘মানিয়ে’ নিচ্ছে। আমার অস্তিত্ব সেখানে কেবল এক জোরপূর্বক উপস্থিতিমাত্র।”

অভাবের সাথে লড়াই করে বড় হওয়া মেয়েটির কাছে তপ্ত রোদে এক চিলতে শীতল ছায়া পাওয়া ছিল দুঃস্বপ্নের মতো অলীক। তবুও মনের গহীনে এক সুপ্ত তৃষ্ণা ছিল—কেউ তাকে আগলে রাখবে, আগলে রাখবে পৃথিবীর সবটুকু মালিন্য থেকে। বিয়ের পর স্বামী নামক মানুষটির মাঝে সেই পরম আশ্রয়ের সবটুকু রসদ সে খুঁজে পেয়েছিল ঠিকই, কিন্তু যা পেল না, তা হলো ভালোবাসা। পাবেই বা কী করে? সেই মানুষটি যে বছরের পর বছর অন্য কারো স্মৃতির অরণ্যে পথ হারিয়ে বিভোর হয়ে আছে!
​রূপকথা মাথায় কাপড় টেনে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। তপবোন উদাসীন চোখে চেয়ে থাকে। গুরূত্বপূর্ণ দায়িত্ব গুলোর ভিড়ে স্বামীর সহজ দায়টুকু কি তবে কোথাও কিঞ্চিৎ অবহেলিত থেকে যাচ্ছে? জীবনের সব পিছুটান ভুলে— যে মেয়েটি সাধ্যের বাইরে গিয়ে এই সংসার আর সন্তানের ভার হাসিমুখে নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে। তবে সে কেন অপরাধবোধে দগ্ধ হচ্ছে অসম এই সম্পর্কটিকে আগলে নিতে?

–“দ্বিতীয়বার বাবা হওয়ার জন্য শুভকামনা, ইমরোজ সিকদার।”
কারোর তীর্যক কণ্ঠে কর্মরত ইমরোজ চোখ তুলে তাকায়। সৃজার কঠোর চাহনি দেখে বিরক্তি মিশ্রিত নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
–“শাট আপ সৃজা! উল্টাপাল্টা কথা বলো না।”
–“উল্টাপাল্টা কথা হয়ে গেল বুঝি? সেদিন শুনলাম স্ত্রীকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলেন। কিসের জন্য?”
–“ডাক্তারের কাছে গেলেই কি এমন কিছু? দিস ইজ ঠু মাচ, সৃজা! মৌনতা অসুস্থ ছিল।”
সৃজার ভ্রু উঁচিয়ে গেল ইমরোজের বিরক্তি মাখা কণ্ঠে। ইমরোজের মাঝে আজ পর্যন্ত তার প্রতি কোনো বিরক্তি প্রকাশ পায়নি। তবে কি সে হেরে যাচ্ছে? সে কি পাবে না সিকদার বাড়ির মেজো বউ এর সম্মান আর আভিজাত্য? কিন্তু সে তো হার মানবে না। সে তাচ্ছিল্য হেসে বলল,
–“বাহ্! আজ ইমরোজ সাহেবের চোখেমুখে বিরক্তি আমার জন্য। অথচ গতকাল রাত পর্যন্ত সে আমার কাছে আকুতি মিনতি করে গিয়েছে, সে না-কি আমায় পুরো পৃথিবীর উর্ধ্বে গিয়ে ভালোবাসে।”

–“এখনো সেটাই বলছি।”
–“কিন্তু আপনার কথায় আর কাজে কোনো মিল নেই, ইমরোজ। আমি আর বিশ্বাস করতে পারছি না আপনাকে।”
ইমরোজ ত্যক্ত হয়ে বলল,
–“ক’দিন যাবৎ এমন করছো কেন সৃজা? সব তো ঠিকঠাক চলছিল।”
সৃজা রেগে গেল। উচ্চস্বরে বলল,
–“সব ঠিকঠাক চলছে তোমার জন্য, ইমরোজ। আমার কিছু ঠিক নেই। তুমি আমাকে আমার প্রাপ্য সম্মান দিচ্ছো না। তুমি যদি পৃথিবীর সকলের উর্ধ্বে গিয়ে আমায় ভালোবেসেই থাকো, তবে সকলের বিরুদ্ধে গিয়ে আমায় বিয়ে করছো না কেন?”
ইমরোজ পাল্টা আক্রোশে বলল,

–“মৌনতাকে ডিভোর্স দেয়ার মতো কোনো রিজন আমার কাছে নেই, সৃজা। মৌনতা ইজ পার্ফেক্ট ফর মাই ফ্যামিলি এন্ড ফ্যামিলি মেম্বারস—বাট নট ফর মি। ও নায়েলের মা! আম্মার, আব্বুর, ভাইজান সকলের চোখের মনি। কিন্তু আমি তোমায় ভালোবাসি, তোমাকে নিয়ে সংসার করতে চাই। এটা যদি ঘরের সবাইকে বলি —তবে তারা এক মুহুর্ত বিলম্ব না করে আমায় সবকিছু থেকে বহিস্কার করে দেবে। এরপর আমাদের কি হবে বলতে পারো?”
সৃজা টলটল নেত্রে তাকিয়ে রইল। শান্ত কণ্ঠে বলল,
–“ঠিক আছে, মৌনতাকে ডিভোর্স দিতে না পারলে তবে আমায় ভুলে যাও।”
–“অসম্ভব!”, ইমরোজের দৃঢ় কণ্ঠে সৃজাও একরোখা কণ্ঠে বলল,
–“তবে আমায় বিয়ে করো।”
কঠিন সেই মোড়ে ইমরোজের দৃঢ়তা মিলিয়ে যায়। নিজের অসহায়ত্বে নিজের ওপর রাগ হয়‌। সে মৌনতাকে নিজের অধিনস্ত ব্যতীত অন্য কোথাও সহ্য করতেই পারে না। মৌনতার কাছে সে পূজনীয় এই অনুভূতিটা অবর্ণনীয়! উপরন্তু সৃজার মতো কোয়ালিফাইড, স্মার্ট মেয়েকে সে তার স্ত্রী হিসেবে দেখার জন্য মরিয়া হয়ে আছে। কি করবে ভেবে পায় না সে।

দুপুর দুইটা। মধ্যাহ্নের তপ্ত রোদে খাবারের টেবিলে তখন পরিবারের পরিচিত কলরব। রূপকথা আর মৌনতা সকলকে খাবার পরিবেশন করে নিজেরাও বসে। ইমরোজের দৃষ্টি গিয়ে পড়ল নতমুখে খেতে থাকা এরোজের ওপর। চাহনিটা তীক্ষ্ণ, পরক্ষণেই সে ইশারায় তপোবনকে কিছু একটা বিঁধিয়ে দিল।
তপোবন নিঃশব্দে আশ্বস্ত করল—সে দেখে নেবে। কিন্তু ইমরোজের ধৈর্য আজ বাঁধ মানছে না। চাপা স্বরে ফেটে পড়ল,
–“আর কবে বলবে? অলরেডি দেড় মাস শেষ। তোমার ভাইয়ের যাওয়ার সময় হয়ে আসছে। এখন বলো, বাসার সকলে আছে। একটা বিয়ে তো মুখের কথা না যে একদিন দুদিনে হয়ে যাবে।”
তপোবন খাওয়া থামায়। গম্ভীর গলায় বলে,
–“বাসার সকলে আছে সেটাই তো সমস্যা। ঘরের বউ বাচ্চার সামনে তর্ক বিতর্ক করব?”
–“বউ বাচ্চারা আছে বলেই তো তোমার ওই অবাধ্য ভাই আজ উগ্রতা দেখানোর সাহস পাবে না।”
–“কি হলো তোমরা কি নিয়ে বাঁক বিতণ্ডা করছো?”
বাবার প্রশ্নে ইমরোজ কাউকে তোয়াক্কা না করেই বলল,
–“আব্বু, তোমার ছোট ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমি বড় ভাইজানকে এখনই ভাবতে বলছি। ওর চালচলন এখন যে পর্যায়ে ঠেকেছে, তাতে আরো দেরি হলে ভালো ঘরের কোনো মেয়ে ওর কপালে অন্তত জুটবে না।”
তকদির সিকদার মেজো ছেলের কথায় সায় জানালেন। ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বড় ছেলের উদ্দেশে বললেন,

–​”ইমরোজ তো মিথ্যা বলেনি, তপোবন। তুমি কেন এখনো দ্বিধা করছো? সব যদি ওর খেয়ালখুশির ওপর ছেড়ে দাও, তবে অদূর ভবিষ্যতে ভাইয়ের বদলে একটা নিথর লাশ ছাড়া আর কিছুই পাবে না।”
​স্বামীর এমন রূঢ় মন্তব্যে নির্জনা বেগম বিতৃষ্ণা ভরা চোখে তাকালেন। আজ কতদিন পর ছেলেটা পরিবারের সাথে খেতে বসেছে, এই আনন্দটুকু বিষাদ করে তোলার কি খুব প্রয়োজন ছিল? রূপকথা, মৌনতা আর রোজ—সবার চোখ তখন এরোজের ওপর। কিন্তু এরোজ আশ্চর্যজনকভাবে নির্বিকার। তার এই অস্বাভাবিক নিস্তব্ধতা আর পাথুরে শান্ত ভাব দেখে মনে হচ্ছে ফের কোনো কলহের পূর্বাভাস এটা।
তপোবন গাম্ভীর্যতার সাথে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
–“আমার কথা বলা, না বলায় কোনো সমস্যা নেই, আব্বু। তুমি, আম্মা সবাই মেয়ে দেখে আসো পছন্দ হলে শুভকাজ সেরে ফেলব।
ইমরোজ ভ্রু কুঁচকে নিলো। এরোজের দিকে আড়চোখে চেয়ে সতর্ক কণ্ঠে বলল,

–“আর তোমার ছোট ভাই? সে বিয়ের জন্য প্রস্তুত?”
তকদির সিকদার ব্যগ্র কণ্ঠে গর্জে উঠলেন,
–“প্রস্তুত আবার কি? অনেক হয়েছে এমন নোংরা জীবনযাপন এবার আমি যেটা করব তাকে সেটা মেনে নিতে হবে। তকদির সিকদারের এক ছেলে নেশাখোর, বখাটে এই বয়সে এসে এগুলো আমি শুনতে পারব না। আমাদের একটা মেয়ে পছন্দ হয়েছে নির্জনা। পড়াশুনা করা, আধুনিক যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে জানা মেয়ে—তোমার ছেলের সাথে মানাবে। সব ঠিক থাকলে এই মেয়েকেই তোমার ছোট ছেলের বউ করে আনবো।”
বিগত ছয়টি বছরে ‘বিয়ে’ শব্দটা শুনলে এরোজ কতটা বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ত তা রিবারের সবারই নখদর্পণে। তাই তকদির সিকদারের চূড়ান্ত ঘোষণার পর সবার উৎকণ্ঠিত দৃষ্টি গিয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল বিধ্বস্ত সেই যুবককে।
উপস্থিত সকলের আশঙ্কাকে কিঞ্চিৎ সঠিক প্রমাণ করে দিয়ে এরোজের ডান হাতটা হঠাৎ নিস্পন্দ হয়ে গেল। চরাচরে নেমে এল এক অসহ্য নীরবতা। তবে আজ বিক্ষিপ্ত মস্তিষ্ক আর বিদ্রোহ করে না, বরং মস্তিষ্কের প্রতিটি তপ্ত নিউরনকে এক অদ্ভুত শীতলতায় অবশ করে দিয়ে মানসপটে ভেসে উঠল অন্য এক ছবি। ক্রোধের বদলে হৃদয়ের গহীনে জেঁকে বসে ‘বিয়ে’ নামক শব্দটিকে ঘিরে বহু আগে দেখা কিছু ধূসর অথচ স্নিগ্ধ স্বপ্ন।
যেই স্বপ্নগুলো আজ ও তাকে বশীভূত করে, আজ ও তাকে আফসোসে জর্জরিত করে। কিন্তু বাস্তবতার কশাঘাত যে বড্ডো নিষ্ঠুর! আজ স্বপ্নগুলো ছেলেটিকে অশ্রুসিক্ত করে।
এরোজকে নীরব দেখে নির্জনা বেগম খানিক সাহস পেলেন। বললেন,

–“এর থেকে ভালো উপায় আর হতেই পারে না। ঘর সংসার হলে এমনিতেই আমার এরোজ দায়িত্ববান হয়ে উঠবে, তাই না এরোজ?”
পরপরই বলেন,
–“মেয়ে পেয়েছো বুঝি? কার মেয়ে? পরিচয় কি? বংশীয়?”
–“তোমার এই মাতাল ছেলেকে কোনো বংশীয় বাড়ির মেয়ে বিয়ে করবে আম্মা?”, ইমরোজ বিদ্রুপ করে হেসে উঠল।
–“বাজে কথা বলবে না ইমরোজ।” নির্জনা বেগমের কথায় ইমরোজ তৎক্ষণাৎ হাসি থামিয়ে বলল,
–“আমার কাছে ভালো একটা মেয়ে আছে আম্মা। আমাদের অফিসে কর্মরত সৃজা’র ছোট বোন সুপ্তি। বড় বোনের মতোই অসম্ভব ভালো একটা মেয়ে। সুন্দরী, উচ্চশিক্ষিত, বড়দের সম্মান করা সব ধরনের কোয়ালিটি রয়েছে। এরোজ যেমন পরিবেশে থাকে তার জন্য একদম বেস্ট। আর আমি ব্যাক্তিগত ভাবে ওকে চিনি। মেয়ে নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।”
মৌনতা এতক্ষণ নির্বিকার ইমরোজের কথা শুনলেও শেষের কথাগুলোয় তার গলার খাবার আঁটকে গেল। ঘেমে ওঠা আস্থির বদনে আর খাবার গিলতেই পারল না। সৃজা নামটি শুনতেই অন্তঃস্থলে কাঁপন ধরে। ব্যাক্তিগত? সৃজা এবং সৃজার পরিবার কি ইমরোজের ব্যাক্তিগত হয়ে গিয়েছে? তবে সে আর নায়েল কে?
মৌনতা অস্থির দৃষ্টি ফেলে ইমরোজের দিকে।
তার আঁকড়ে ধরা সংসারের খুঁটিটি বারংবার নড়ে উঠছে কেন? আর কতটুকু ধৈর্য ধরলে জীবন থেকে স্বামী হারানোর ভয়টুকু মিলিয়ে যাবে?

–“আমি বিয়ে করব না।”
বহুল আকাঙ্ক্ষিত ক্ষীণ কণ্ঠস্বরে পাথুরে দৃঢ়তা। সকলে উৎসুক বিতৃষ্ণা ভরা দৃষ্টি ফেললো নত শির খেতে থাকা এরোজের পানে।
ইমরোজ রেগে গেল। ক্ষিপ্ত কণ্ঠে বলল,
–“কেন? কার জন্য সন্ন্যাসী জীবন কাটাচ্ছেন আপনি?”
ইমরোজের তপ্ত বাক্যে এরোজ খাওয়া থামিয়ে ধীরস্থির চোখ তুলে তাকালো। কণ্ঠে হিমশীতল গাম্ভীর্যতা নিয়ে চোয়ালবদ্ধ কণ্ঠে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,
–“আমার জীবন নিয়ে তোকে কে ভাবতে বলেছে?”
ইমরোজ দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
–“বড় ভাই হই তোর। ছোট ভাইয়ের জীবনের ব্যাপারে আমি দেখবে না তো কে দেখবে? তুই বেয়াদব হতে পারিস কিন্তু আমি না। আমার একটু হলেও তোর চিন্তা হয়। ।”
এরোজের শীতলতা মিলিয়ে যায়। রাগে কাঁপতে থাকা বদনে বলে,

–“আমি বলেছি দেখতে? এই আমি বলেছি হ্যাঁ? তুই তোর জীবন নিয়ে ভাব, আমার জীবন নিয়ে ভাবতে হবে না।”
–“একশবার ভাববো! তোর কারণে আমাদের মানসম্মান নষ্ট হয়। এবার হয় বিয়ে করবি নয়তো রিহ্যাবে যাবি।”
ইমরোজের এই চরম শাসনে এরোজের হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়ল। ক্ষিপ্ত হাতে সামনের খাবারের প্লেটটা সজোরে ছুঁড়ে মারল মেঝেতে। কাঁচ ভাঙার তীব্র শব্দের রেশ না কাটতেই ডাইনিং টেবিলে সজোরে চাপড় মেরে গর্জে উঠল,
–“তোর ওই মেকি মান-সম্মান আর নীতিবাক্য নিজের কাছে রাখ! খবরদার, আমার বিষয়ে একটুও নাক গলালে কিন্তু আমি ভুলে যাব তুই আমার ভাই।”
–“এরোজ?”, তপোবন চোয়াল শক্ত করে হুঙ্কার ছাড়লো।
ঘরের নারীরা আতঙ্কে আড়ষ্ট হয়ে গেল। ছোট্ট তানশান ভয়ার্ত চোখে বাবার হাত খামচে ধরল। আর মায়ের বুকে মুখ লুকিয়ে থাকা ছোট্ট নায়েল পিটপিট করে দেখে চলেছে অতি প্রিয় রাগান্বিত মুখটিকে।
তবে আজ চোখেমুখে ভয় এর দেখা মিলছে না।
এরোজ নীরবে ফুঁসে যাচ্ছে। তপোবন থমথমে গলায় মৌনতাকে বলল,

–“মৌন, ওদের নিয়ে এখান থেকে যাও।”
মৌনতা মাথা নেড়ে দ্রুত তানশান, রূপকথা রোজকে নিয়ে ভেতরের ঘরে চলে যায়। রূপকথা অবুঝপানে সকলকে দেখলো। তারা যেতেই তপোবন হঙ্কারের সুরে বলল,
–“এরোজ বিহেভ ইয়োর সেল্ফ। এটা ঘর, ইমরোজ তোর বড় ভাই। তুই ওর সাথে এমন ধৃষ্টতা দেখানোর সাহস কোথায় পাচ্ছিস?”
–“আমার ওর সাথে কোন বোঝাপড়া নেই ভাইজান। ওকে বলুন ওর মতো থাকতে। আমার জীবনে যেন ও নাক না গলায়।”
তেজি কণ্ঠে বলেই এরোজ গটগট করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
ইমরোজ বাবার উদ্দেশ্যে ক্ষিপ্ত কন্ঠে বলল,
–“দেখেছো আব্বু? ও বড় ভাইয়ের সাথে কেমন আচরণ করছে? ও তো মানুষের মধ্যেই পড়ে না। এরপরেও এই মাতালটাকে তুমি রিহ্যাবে না পাঠিয়ে বিদেশে পাঠাবে? বিলসীতা করতে?”
তকদির সিকদার ও ধৈর্য হারা হয়ে ওঠেন। ক্রোধে ফেটে পড়ে বলে,
–“অনেক হয়েছ তপোবন। এই গুন্ডা, উশৃঙ্খল ছেলেকে তুমি এভাবে বিদেশে পাঠাতে চাও? আমি আর এই সাহস করছি না। ওকে আমি আগে রিহ্যাবে দেবো এরপর যা কিছু একটা করব।
কিন্তু এই ছেলেকে আর ঘরে রাখা যাবে না এভাবে। এতদিন তোমার কথায় আমি চুপ ছিলাম। কিন্তু আর নয়।”

–“এটাই ঠিক হবে আব্বু এই মাতালটাকে রিহাবে পাঠাও। ওটাই ওর জন্য সঠিক জায়গা।”
ইমরোজ তিরস্কারের সুরে বলল।
তপোবন বলহীন দেহে ধপ করে চেয়ারে বসে পড়ল। জীবনের এই এলোমেলো সমীকরণ আর ভ্রাতৃঘাতী দ্বন্দ্বের সামনে নিজেকে বড্ড অসহায় মনে হলো তার। বড় ভাই হিসেবে ছোট ভাইকে আগলে রাখতে না পারার গ্লানি তার অন্তরাত্মাকে কুরে কুরে খাচ্ছে।
কিয়ৎকাল পূর্বের সেই তপ্ত কোলাহল একরাশ নিস্তব্ধতার অতলে হারিয়ে গেল। তপোবন ক্ষীণ, ভাঙা স্বরে মিনতি করে বলল,
–“আমায় একটু সময় দাও, আব্বু। আমি ওকে সঠিক পথে আনবো যেভাবেই হোক!”

উগ্র গতিতে চলন্ত গাড়ির হালকা ওঠানামার তালে ডোর বিনে থাকা নিষিদ্ধ পানীয় বোতল দুটো একে অপরের ধাক্কায় লোভাতুর শব্দ সৃষ্টি করল।
গুরুগম্ভীর মুখশ্রীতে কপাল কুঁচকে ড্রাইভ করতে থাকা এরোজ ধ্যানচ্যূত হয় সেই শব্দে। প্রলুব্ধ নেত্রে তাকায় ছোট ছোট বোতল দুটোর দিকে। বাড়ি পৌঁছাতে এখনো বেশ কিছুক্ষণ। এতক্ষণ নিজেকে দমিয়ে রাখা দুঃসাধ্য হয়ে যাবে বুঝতে পেরেই সে একটা বোতল খুলে এক হাতে ঢকঢক করে খেয়ে নিলো। ক্ষণকালের মাঝেই দেহের অস্থিরতা কমে আসে, বিক্ষিপ্ত মেজাজ খানিক ঠান্ডা হয়।
হালকা ঝাঁপসা নেত্রেই এরোজ ড্রাইভ করতে লাগলো। তার সমস্যা হচ্ছে না, এগুলো অভ্যাস হয়ে গিয়েছে! কানাডায় থাকাকালীন সময়ে জ্যামহীন রাস্তায় এমন কত গাড়ি চালায়। না কখনো পুলিশ ধরতে পারে আর না কখনো এক্সিডেন্ট হয়েছে! এখন আর সহজে নেশা চড়ে না তার। তাচ্ছিল্য হাসল সে, জীবন কতটা বিদঘুটে যন্ত্রণাদময় হলে তীব্র মাদক ও কার্যকর হয় না? একটা মানুষের দেয়া স্মৃতিগুলো এতটা তীব্র কেন হতে হবে?
এরোজের দৃষ্টি ম্লান হয়। আজও হারিয়ে ফেলার আফসোস অন্তঃস্থল নিঙরে বের হয়। অন্তঃস্থলে প্রশ্ন জাগে শক্তিশালী মাদকও যদি ঐ ক্ষণকালের স্মৃতি, আফসোস ভোলাতে না পারে, তবে কি পারবে? বিষ? মৃত্যু ব্যতীত কি সে ঐ অতৃপ্ত অনুভূতি থেকে রেহাই পাবে না?
কারোর থেকে পালাতে চাওয়ার প্রচেষ্টায় নেশাগ্রস্ত এরোজ ফের ডুবে যায় ঐ ক্ষণকালের মোহে। চোখের কোনা টলটল করছে অথচ ঠোঁটের কোনে হাসি। আফসোসে জর্জরিত কণ্ঠে ফিসফিসিয়ে আওড়ায়,

–”অপেক্ষা করতে বলেছিলাম অথচ আপনি তো জানেন-ই না কেউ আপনার জন্য লাল টুকটুকে বেনারসি হাতে আজ ও নিঃস্ব পথিকের ন্যায় দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু শাড়ির মালিকের যে এই পথে আর আসা হবে না। আমার ও ফিরে যাওয়ার কোনো উপায় নেই শূন্য পথে হাঁটতে হাঁটতে একদিন ঠিক শেষ গন্তব্যে পৌঁছে যাবো। আমার জন্য একটু অপেক্ষা করতেন, রূপাঞ্জেল।”
আকুতি গুলো ইদানিং ক্লান্তিতে রূপ নিয়েছে। অথচ ক্লান্তি গুলো নিঃশেষের উপায় নেই।
মাদকের নেশা না চড়লেও কিছু অমলিন স্মৃতি আজও এরোজকে মোহগ্রস্ত করার ক্ষমতা রাখে। আর সেই মোহের ঘোরেই কখন যে সে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিল, তা টেরই পায়নি। হঠাৎ ঝাপসা দৃষ্টির সামনে ক্ষিপ্র বেগে ধেয়ে আসা একটি গাড়ি দেখে এরোজ সংবিৎ ফিরে পেল। কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থায় সে দ্রুত স্টিয়ারিং ঘোরাতে চাইল, কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। তীব্র বেগে ধেয়ে আসা গাড়ি দু’টো কোনাকুনি ধাক্কায় বিকট শব্দে সংঘর্ষ হলো।
এরোজের মাথা চক্কর দিয়ে উঠল। কিয়ৎকালের জন্য চোখের সামনে হঠাৎ সব ধূসর হয়ে উঠল।
মস্তিষ্ক যখন সচল হলো তখন নিজেকে পেল থানায়।
সাথে পেল অপরিচিত এক ক্ষিপ্ত নারীকে। পুলিশ আঁটকে রেখেছে তার গাড়ি।
পুলিশের সাথে একদফা তর্কবিতর্ক করে এরোজ থানার প্রাঙ্গণে এসে রুক্ষ স্বরে নারীটিকে বলল,

–“অভিযোগ তুলে নিন, দ্রুত।”
–“একে তো নেশা করে গাড়ি চালাচ্ছিলেন উপরন্তু হুমকি দিচ্ছেন?”
–“কোনো হুমকি দিচ্ছি নাহ শুধু ব্যাপারটাকে ঝামেলা ছাড়া মিটমাট করতে চাইছি।”
–“কিন্তু আমি তো আপনাকে জেলের ভাত না খাইয়ে ছাড়ব না।”
–“বুল শিট! আর ইউ সিরিয়াস, মিস? আপনার মনে হয় আপনি এটা করতে পারবেন? আমি আবারও বলছি, আপনার ও ক্ষতি হয়েছে আমার ও ক্ষতি হয়েছে। আমি ক্ষতিপূরণ দিচ্ছি আপনি অভিযোগ তুলে নিন।”
–“আমি মোটেও অভিযোগ তুলছি না।” নারীটির দৃঢ় কণ্ঠে এরোজ অস্থির চিত্তে কপাল ঘষতে লাগলো।
এরোজ নিজে ব্যতীত সবাই বোঝে সে নেশাগ্রস্ত। অথচ তার নেশাই চড়ে না। সে লালচে চোখ তুলে সম্পূর্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে নারীটির দিকে, পরপরই তাকায় গাড়িটির দিকে। দৃষ্টি সচকিত হয়! চোখদুটো সরু হয়ে আসলো। নারীটিকে আপাদমস্তক নিগুঢ় চোখে পর্যবেক্ষণ করে শ্লেষ্মাত্মক কণ্ঠে বলল,
–“টাকাটা নিলে আপনার লাভ হতো মিস। দেখযাবে বাড়তি ঝামেলা করলে যেটুকু গাড়ি আছে সেটুকুও থাকবে না।”
সম্মুখে ক্ষিপ্ত নারীরূপে সৃজা রাগে ফেটে পড়ল আগুন্তকের এহেন হুমকিতে। দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

–”আপনার কি আমাকে ফকিন্নি মনে হচ্ছে?”
–“দুঃখিত মিস, আমার আপনাকে একটুও ফকিন্নি মনে হচ্ছে না। কারণ আমি জানি আপনি একটা ফকিন্নি।”, এরোজের প্রহসনমূলক কণ্ঠে সৃজা তব্দা খেয়ে গেল।
–“হোয়াট ডু ইউ মিন? আমি ফকিন্নি? এমন একটা অডি কার নিয়ে যখন চলতে পারছি, তখন এটা ঠিক করাতে পারব‌ না?”
এরোজ ফিচলে হেসে বলল,
–”গাড়িটাই তো অন্যের, ঠিক করবেন ও নিশ্চয়ই অন্যের টাকায়?”
সৃজা চমকায়। থতমত খেয়ে শুধায়,
–”আপনি কি করে এটা বলতে পারেন? একে তো অপরাধ করছে আবার আমার সাথে বেহুদা তর্ক করছেন?”
এরোজ বাঁকা চোখে সৃজার আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করল। বিদ্রুপ করে বলল,
–”একে তো ফকিন্নি উপরন্তু ওভার কনফিডেন্স। পুরাই আনম্যাচড ফেইক পার্সোনালিটি।”
সৃজার কান গরম হয়ে উঠল জনসম্মুখে এহেন অপমানজনক কথায়। রেগে বলে,
–“আপনার সাহস কি করে হয় আমায় ফকিন্নি বলার? আপনি জানেন আমি কে?”
এরোজ সোজা হয়ে দাঁড়াৎ। ঝাঁপসা নেত্রে বিরক্তির আভাস। গমগমে স্বরে বলল,
–“আপনি কে তা জেনে আমার লাভ নেই। কিন্তু আমার মনে হয় আপনার জানা উচিৎ আমার পরিচয়। আমি এরোজ সিকদার, আপনি যেই গাড়িটা নিজের বলে দাবি করছেন, সেটা আমার ফ্যামিলি কার। এখন আমার প্রশ্ন, আমার বাড়ির গাড়ি আপনার কাছে কি করছে?”
সৃজা কপাল কুঁচকে নিলো।

–“আপনি আমার সাথে মাজা করছেন? এটা আমার ব…”
বলতে গিয়েও সৃজা থমকালো। ইমরোজ ক্ষিপ্র কদমে এগিয়ে আসে।
–“মিস সৃজা! আপনি আমার ভাইয়ের সাথে কথা বলছেন।”
সৃজা হতচকিত অবিশ্বাস্য নয়নে তাকায়। এরোজ ঘাড় ঘুরিয়ে সরু চোখে তাকায় হন্তদন্ত হয়ে ঢোকা ইমরোজের পানে।
সৃজা অস্ফুট স্বরে আওড়ায়,
–”এরোজ।”
ছেলেটির আপাদমস্তক গভীর চোখে দেখে সৃজা। এযাবৎকালে এরোজের একটামাত্র ছবি দেখেছিল ইমরোজের ফোনে। কিন্তু সেই ছবি আর বাস্তবতার মাঝে বিস্তর ফারাক! সম্মুখে এক সুঠামদেহী, সুদর্শন বিত্তশালী পুরুষের শ্রান্ত চেহারা যে চুম্বকের ন্যায় আকর্ষণীয়!
–“তুই এখানে কি করছিস?”
ইমরোজের কঠোর গলায় এরোজের সরু দৃষ্টি আরও সরু হলো। ইমরোজের প্রশ্নকে পুরোদস্তুর উপেক্ষা করে কাঠকাঠ কণ্ঠে শুধালো,
–“তোর গাড়ি এই মেয়ের কাছে কি করছে?”
ইমরোজ গলা খাঁকারি দিয়ে গম্ভীর মুখে বলল,

–“ও আমাদের অফিসের একজন কর্মকর্তা। আমার পি এ! কিছু প্রয়োজনে আমার গাড়িটা নিয়েছিল।”
ভাইয়ের এহেন সোজাসাপ্টা স্বীকারোক্তিতে এরোজের ভ্রু উঁচিয়ে গেল। নিজ মনে আওড়ালো,
–“পি. এ পার্সোনাল এসিস্ট্যান্ট? ইন্টারেস্টিং!”
–“তো রাত এগারোটার সময় ও পি এর প্রয়োজনে বসের গাড়ি তার কাছে থাকে?”
এরোজের সূচালো কণ্ঠে ইমরোজ খানিক কঠিন গলায় বলল,
–“এটা কোন ধরণের কথা? থাকতে পারে না?”
–“নাহ একদম থাকতে পারে না।”, এরোজের স্পষ্ট কণ্ঠে সৃজা তৎক্ষণাৎ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্যগ্র কণ্ঠে বলল,
–“আমি দুঃখিত! আসলে আমার মা অসুস্থ হয়ে পড়েছিল তাই স্যারের গাড়িটা একটু নিয়েছিলাম। আর কারোর জিনিস যতক্ষণ আমার কাছে থাকে সেটা তো আমার দায়িত্ব, তাই না? তাই আমি এটা নিজের মনে করেই টেক কেয়ার করছিলাম। স্যারের জিনিসটির আমি কোনো ক্ষতি হতে দিতে পারি না, যার কারণে আপনার সাথে রাগারাগী করেছি। আন্তরিকভাবে দুঃখিত, আমি এখনি অভিযোগ তুলে নিচ্ছি।”
বলেই সৃজা দ্রুত থানার ভেতরে ঢুকে গেল। ভাইয়ের দিকে এক পলক সতর্ক দৃষ্টি ফেলে ইমরোজ ও তার পিছু পিছু গেল। গাড়ির মালিক সে বলেই এখানে তার ও আসতে হয়েছে। পনেরো মিনিটের মধ্যে সব ঝামেলা চুকে গেল। ঝামেলা মিটতেই সৃজা কোনোমতে সেখান থেকে চলে গেল।
ইমরোজ নিজের গাড়ি দেখতে দেখতে বলল,

–“আমার গাড়ি সকালের মধ্যে ঠিক করে দিবি।”
এরোজ নিরুদ্বেগ শান্ত স্বরে বলল,
–“তোর পি.এ কে বল।”
–“ও কি আমার গাড়ির এই দশা করেছে নাকি তুই? মদ খেয়ে গাড়ি তুই চালিয়েছিস। আমি চাইলেই কিন্তু তোকে পুলিশের দুই ঘা খাওয়াতে পারতাম।”
ইমরোজের কথায় এরোজ সরব খিক খিক করে হেসে উঠল। ইমরোজ কপাল কুঁচকে বলল,
–“হাসছিস কেন?”
এরোজ মাথা দুলিয়ে বলল,
–“এমনিই হাসি পাচ্ছে। আমি আসছি হ্যাঁ! গলাটা শুকিয়ে গেছে, মাথাটা বেশি চলছে একটু কিছু খেতে হবে।”
বলেই সে হেলেদুলে চলে গেল। কিন্তু থানা থেকে যতটা হাসিমুখ নিয়ে বের হয়েছিল, এর পর মুহূর্তে মুখশ্রী ঠিক ততটাই আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। ছোটবেলা থেকে ভাইয়ের আদ্যোপান্ত জানা
এরোজ চোখেমুখে আস্থির বিমর্ষতা নিয়েই তৎক্ষণাৎ ফোন বের করে কাউকে ফোন লাগায়।

–“এই মান্নান ভাই, সৃজা কে?”
সিকদার কোম্পানির বহুবছরের পুরোনো একাউন্ট ম্যানেজার— মান্নান অবাক হলো এই অসময়ে এরোজের ফোনে। লোকটা টাকার সমস্যা ছাড়া কখনো ফোন দেয় না।
–“স্যার, সৃজা ম্যাডাম আমাদের কোম্পানিতে কর্মরত। কেন স্যার কোনো প্রয়োজন?”
–“এই মেয়ের সব ডিটেইলস আমায় পাঠাও তো!”
–“স্যার এখন?”
–“আপনার কাছে পনেরো মিনিট টাইম মান্নান ভাই।”, এরোজ গাড়ি স্টার্ট দিতে দিতে বলল। ইমরোজ আর কোনো নারী— এই দু’টো সত্তার মধ্যে ভালো সম্পর্ক মানেই এটা অনৈতিক কিছু। এই ভাবনা অন্তঃস্থলে দৃঢ় হওয়ায় সৃজা আর ইমরোজের সুসম্পর্ক স্বাভাবিক ভাবে নিতে পারলো না এরোজ।
বড় ভাইজান তার মেজো ভাইয়ের উপর অন্ধবিশ্বাস করতে পারে কিন্তু সে না! কুকুরের লেজ কখনো সোজা হয় না। ইমরোজ যে তার মায়ের-ই সন্তান! এই দু’জন নিজেদের ঘৃণ্য রূপ দেখাতে দু’বার ভাবে না।

অন্তদিনের শেষটা হলো আরামের নিদ্রা দ্বারা। কিন্তু সৃষ্টিকর্তা জগতের সকলের জন্য আরামের নিদ্রা লিখে রাখেননি। কেউ কেউ তো প্রতিটা রাত মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করে। চোখের সামনে নিজের সর্বোস্ব হারিয়ে ফেলার সেই মন্থর প্রক্রিয়ায় হারিয়ে যেতে থাকা বিধ্বস্ত নারীটি বলহীন দেহে আরশির সামনে দাঁড়ালো।
কর্নকুহরে বিঁধছে ‘শকুন’ নামক এক প্রাণীর চেহারা। কতটা বিদঘুটে চেহারা হলে কেউ এমন তুলনা করতে পারে? তাকে নিশ্চয়ই বিশ্রী দেখতে লাগছে! নিজের উপর ঘৃণায় আরশি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলো মৌনতা।
কিয়ৎকাল বাদ বারান্দায় গিয়ে পা গুটিয়ে বসলো। ঘুম আসে না ইদানিং! শরীরটা বড্ডো ক্লান্ত লাগে। ক্লান্তি দূর করতেই প্রিয় কাউকে ফোন লাগালো।
ভেসে আসলো মিষ্টিমধুর কণ্ঠ,
–”মৌন, বোনু এত রাতে জেগে আছিস কেন?”
বড় বোনের আদুরে কণ্ঠে মৌনতা ম্লান হাসলো। যন্ত্রণায় অস্থির এই জীবনে এই কণ্ঠগুলো নিদারুণ প্রশান্তি দেয়ার ক্ষমতা রাখে। সে ক্ষীণ স্বরে আবদার করে বলে,
–“আপা, একটু কথা বলবে? বড্ডো ক্লান্ত লাগছে। বুকের ভেতরটা ভীষণ ব্যথা করছে আপা।”
অপরপ্রান্তের মোমিতা চকিতে উঠে বসে। উদ্বিগ্ন কণ্ঠে শুধায়,
–“মৌন কি হয়েছে? কণ্ঠ এমন শোনাচ্ছে কেন? ইমরোজের সাথে কিছু হয়েছে নাকি?”
মৌনতা বলহীন দেহে শূন্য অম্বরে তাকিয়ে রইল। অক্ষীপটে ভাসছে স্বামী আর পরনারীর অন্তরঙ্গ কথোপকথন। দেহ মন যে আর সইতে পারে না পরনারীর এই ভার।
তিরতির করে কেঁপে ওঠা অধর কামড়ে ক্ষীণ স্বরে বলল,

–“বড্ডো ক্লান্ত লাগছে আপা। তোমাদের জন্য মন কেমন করছে।”
–“কিন্তু হয়েছেটা কি মৌন? তোর কণ্ঠ এমন শোনাচ্ছে কেন? আপার কাছে বল। ঝগড়া হয়েছে দু’জনের?”
–“ক..কিছু না…আ..”
টলটলে নেত্রে মৌনতা অস্থির দৃষ্টি ফেলে কথা ঘোরাতে চাইলেও পারলো না। বরং ফোনটা কেটে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। চোখেমুখে অস্থিরচিত্তে হাত ঘষতে ঘষতে আকুতি করে বলল,
–“আমার অনেক কষ্ট হচ্ছে আপা, বুকের ভেতরটা ব্যথায় দম বন্ধ হয়ে আসছে, আপা। আর কত ধৈর্য ধরলে আমার সংসারটা টিকে যাবে আপা? আমি যে আর ধৈর্য ধরতে পারছি না। চোখের সামনে আমার নায়েলের পাপাকে, আমার সুখের সংসারটাকে হারিয়ে যেতে দেখতে পারছি না আপা। আমার কি দোষ আপা? সৃষ্টিকর্তা আমায় এত যন্ত্রনাদ্বায়ক শাস্তি কেন দিচ্ছে বলোতো?”

মুখে আঁচল গুঁজে মেয়েটি গলাকাটা মুরগির মতো ছটফট করতে থাকে। ইচ্ছে করে সাহস করে কাউকে বলতে কিন্তু সে জানে সবটা গিয়ে তালাকের পর্যায়ে গিয়ে ঠেকবে। আর তার নায়েলের জীবনটা এলোমেলো হয়ে যাবে। লোকে বলে ‘সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে’। তাকে আরেকটু দাঁত কামড়ে থাকতে হবে। হয়তো দিনশেষে টিকে যাবে তার ঘরটা। কিন্তু কতক্ষণ পর্যন্ত? যতক্ষণ পর্যন্ত না শেষ নিঃশ্বাসটা বের হয়?
রাতটুকু দীর্ঘ আর যন্ত্রনাদ্বায়ক শুধু মৌনতা নামক দূর্বল সত্তার জন্য নয়। বরং ধরণীতে আরো অনেক অনেক মানুষ আছে, যারা নিজ জীবনের যন্ত্রণার সাথে লড়ছে।
চতুর্থ বারের মতো কারোর চাপা কান্না আর ফুপানোর স্বরে এরোজ খামচে ধরলো হাতের স্ট্রেস বলটি। বক্ষস্থল অস্থির হয়ে আছে তবুও চোখ খোলে না। বদ্ধ নেত্রে চোয়ালবদ্ধ করে‌ শোনে সেই কান্নার সুর। একটাসময় কান্না গুলো মিলিয়ে গেল। মিলিয়ে গেল বাতাবরণ থেকে ল্যাভেন্ডারের সুবাস ও।
এরোজ ঝট করে অস্থির নয়ন খুলে ফেলল। শূন্য অম্বর ব্যতীত দৃষ্টিতে কিছুই আটকায় না কিংবা আটকাতে চায় না।
সোফায় পা ছড়িয়ে বসে থাকা এরোজ থুতনিতে হাত ঠেকিয়ে শুকনো ঢোক গিললো। ক্ষীণ স্বরে বলে ওঠে,
–“ভালো আছেন তো?”

বলেই এরোজ ম্লান হাসল। অবেহলায় পড়ে থাকা ফোনটি হাতে তুলে নিয়ে নিনাদ নামক ছেলেটির একাউন্টে ঢুকলো। কিয়ৎকাল পূর্বের সেন্ড করা ছবি আর তথ্যগুলো গভীর চোখে দেখতে দেখতে বিড়বিড় করে আওড়ালো,
–“ভালো নেই। একটুও ভালো নেই।”

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৩৫ 

ক্ষীণ সময়ের ব্যবধানেই এরোজের চোখ লাল হয়ে উঠল। হীম করা পরিবেশেও সুগঠিত দেহটা দরদর ঘামছে। চোখের সামনে ভেসে উঠল মা বিহীন এরোজের কঠিন ছোটবেলা। সে কি দুঃসহ দিনগুলো!
চোখের সামনে ভেসে উঠল নায়েলের হাস্যোজ্জ্বল মুখটি। সহসা টপ করে এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো। মুহুর্তেই কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলো এরোজ। নায়েলের হাসিমুখ ধরে রাখার সিদ্ধান্ত!
ফোনটাকে অদূরে ছুঁড়ে মেরে ছেলেটি দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
–“ছোট পাপা আছি তো! আমার নায়েলের হাসিমুখ কখনো হারাবে না। আর না আমি কাউকে হারাতে দেবো।”

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৩৬