Home অপরাহ্নে উপসংহার অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৩৫

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৩৫

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৩৫
তোনিমা খান

শিক্ষার্থীদের ভীড় ঠেলে রূপকথা ছুটে এসে অদূরে
দাঁড়িয়ে থাকা তানশানের হাত আঁকড়ে ধরলো। জড়তা বিহীন চুলের ভাঁজে হাত গলিয়ে দিয়ে শুধায়,
–“শরীর খারাপ করেছিল? মাথা ব্যথা করছে? এখন কি একটুও ভালো লাগছে?”
একসাথে বহু প্রশ্নের জবাবে তানশান শুধু শান্ত দৃষ্টিতে তাকালো। ছোট্ট জবাবে বলল,
–“ঠিক আছি।”
রূপকথা মোটেই বিচলিত হয় না সেই নির্জীবতায়। বলে,
–“জুস খেয়েছিলে?”
–“জুস টক ছিল।”
–“তো কি হয়েছে? একদম আসল মাল্টার জুস একটু টক-ই হয়। বাজারের গুলো তো কেমিক্যাল মেশানো থাকে।”
তানশান নিরুত্তর শুনলো।
–“পুরোটা খেয়েছিলে?”
–“হুঁ।”
হাঁটতে হাঁটতে গাড়ির কাছে যায় দু’জনে। রূপকথা তখনো ছেলেটির হাত বগলদাবা করে হাঁটছে। তানশান ঘাড় ঘুরিয়ে কপাল কুঁচকে তাকায় সেদিকে। থমথমে মুখে বলে,

–“আমি বাচ্চা নই।”
রূপকথার সময় লাগল কথার মানে বুঝতে। বুঝতে পেরে বলল,
–“আমার থেকে বড় ও তো নও। চুপচাপ হাঁটো, শরীর তো একদম দূর্বল হয়ে আছে। কিছু খাবে?”
তানশান উষ্ণ নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
–“নাহ।”
–“বার্গার, পিৎজা খাবে?”
এই পর্যায়ে তানশান আড়চোখে তাকালো। রূপকথা তা দেখে হেসে ফেললো। কাঁটা কাঁটা চুলগুলো এলোমেলো করে দিয়ে বলল,
–“বাজে জিনিস খাওয়ার জন্য এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকো, তাই না? তোমার পাপা শুধু শুধু তোমায় বকে না। চলো কোনো রেস্তোরাঁয় যাই।”
–“কথায় কথায় চুলে হাত দেয়া আমার অপছন্দ।”, তানশানের সরব গম্ভীর গলায় রূপকথা পিটপিট করে চেয়ে বলল,
–“এমন খাঁড়া খাঁড়া হয়ে বসলে হাত দিতে ইচ্ছে হবে না? এগুলোকে মাথা নুইয়ে থাকতে বলো তবে আর হাত দেবো না।”
তানশান চোখমুখ কুঁচকে আওড়ায়,

–“কি অদ্ভুত! আপনি অনেক জেদি। কারোর কথা শোনেন না।”
রূপকথা স্মিত হাসলো তার কথায়। একটু জেদি না হলে যে এই গম্ভীর ছেলেটির সাথে পেরে ওঠা মুশকিল!
সে শুধায়,
–“কোথায় খেতে যাবে?”
–“রুবার্স ক্যাফেতে যাবেন?”, তানশান সতর্ক কণ্ঠে শুধালো।
–“যেখানে তোমার ইচ্ছা।”
–“কিন্তু ড্রাইভার দাদু পাপাকে জানিয়ে দেবে। আর পাপা আমায় বকবে।”
–“আমি বারণ করে দেবো তাকে, চলো।”
তানশানের দূর্বল শরীর মুহুর্তেই ঝরঝরা হয়ে গেল। চোখেমুখে চাপা আনন্দ। তারা গাড়ি পর্যন্ত যেতেই রূপকথা ছটফটিয়ে উঠল ফুচকাওয়ালাকে দেখে। ছেলের পানে চেয়ে বলল,
–“একটু ফুচকা খাই?”
তানশান সরব গম্ভীর মুখে বলল,
–“এগুলো আনহাইজেনিক।”
–“তুমি মনে হয় খুব হাইজিনিক খাবার খাও। চলো একটু খেলে কিছু হবে না।”
–“আমি ভালো মানের রেস্তোরাঁর খাবার খাই। এগুলো রাস্তার পাশের বাজে খাবার। এগুলো কে খায়?”
–“মাটির মানুষ আমরা, রাস্তা আর উঁচু দালান আছে? এগুলোর স্বাদ এই ফুটপাতের পাশেই বেশি বাড়ে। এসো, গোমড়া মুখো ছেলে। একদম বাবার কপি পেস্ট! তোমার পাপা একদিন খাইয়েছিল আর এই জীবদ্দশায় খাওয়ায়নি।”, রূপকথা ক্ষেপে গিয়ে বলল।
তানশান ও নিজ ভাবনায় অটল রইল।

–“আপনি এসব আইনহাইজিনিক খাবার খেলে পাপাকে জানিয়ে দেবো।”
রূপকথা কপাল কুঁচকে তাকায়। বলে,
–“তবে তুমি যে এই পিৎজা, বার্গার খাবে তাও আমি বলে দেবো।”
তানশান নীরব হয়ে গেল এবার। রূপকথা তার মিইয়ে যাওয়া দেখে চমৎকার হেসে বলল,
–“চলো সমঝোতায় যাই। আমি ফুচকা খাবো তুমি তোমার পাপাকে বলবে না। আর তুমি পিৎজা বার্গার খাবে তাও আমি তোমার পাপাকে বলবো না। রাজি?”
তানশান নিরুত্তর। রূপকথা তাড়া দিলো,
–“কি হলো রাজি?”
তানশান গম্ভীর মুখে বলল,
–“তাড়াতাড়ি খেয়ে আসুন।”
–“এইতো পথে এসেছো। আমি একা কেন যাবো তুমিও আসো।”
রূপকথা টানতে টানতে তানশানকেও নিয়ে গেল। এবং নিজে তো খেলো, ছেলেটাকেও চেপে ধরে দু’টো খাওয়ালো।
–“খাও খাও জ্বর মুখে ভালো লাগবে।”

সত্যিই তানশানের জ্বরগ্রস্থ তেতো মুখে টক ঝাল ফুচকা খেতে ভীষণ ভালো লাগল। এরপর আর নাকচ করে না বরং রূপকথা সাধলে চুপচাপ খেয়ে নেয়।
তারা মা-ছেলে ড্রাইভারকে বুঝিয়ে শুনিয়ে নিলো।
–“বুঝেছেন দাদু, মিমির অনেক ক্ষুদা পেয়েছে। তাই মিমি একটু জুস খেতে চাইছে। আপনি রুবার্স ক্যাফেতে চলুন ওখানে ভালো জুস পাওয়া যায়।”
রূপকথাও ছেলের কথায় সায় জানিয়ে ঘন ঘন মাথা নেড়ে বলল,
–“হ্যাঁ হ্যাঁ চাচা চলুন। খুব খিদে পেয়েছে।”
বয়স্ক লোকটি অসহায় দৃষ্টিতে তাকায় তাদের দিকে। বলে,
–“মাত্রই না ফুচকা খেলেন।”
–“জি, কিন্তু তাতে পেট ভরেনি। আপনি চলুন আর ফুচকা খাওয়ার কথা কাউকে বলবেন না ঠিক আছে?”
লোকটি মাথা নেড়ে সায় জানায়। গাড়ি চললো রুবার্স ক্যাফের দিকে। তানশান ছুটে গিয়ে রেস্তোরাঁয় ঢুকলো। ঢুকেই নিজের ইচ্ছামতো যা পারলো তা অর্ডার করলো। কিয়ৎকাল বাদ টেবিল ভরতি খাবার দেখে রূপকথা থমথমে মুখে বলল,

–“এতগুলো খাবার খাওয়ার কথা তো ছিল না, তানশান।”
তানশান বোকাসোকা হেসে বলল,
–“বারবার তো আসি না। খাওয়া শুরু করুন এখানকার খাবার টেস্টি। পটেটো ওয়েজেসটা আগে ট্রাই করুন।”
রূপকথা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ছেলেকে সঙ্গ দিলো। অতঃপর মা ছেলে মিলে পুরো টেবিল খালি করতে লাগল। দু’জনে যখন খেতে ব্যস্ত ঠিক তখনি রূপকথার ফোনটা ভাইব্রেট করে উঠল। রূপকথা আর তানশান চমকালো। রূপকথা দ্রুত ফোন বের করে।
কথায় আছে, যেখানেই বাঘের ভয়, সেখানেই সন্ধ্যা হয়। তপোবনের ফোন দেখে রূপকথা আর তানশান বার্গার মুখে দিয়ে একে অপরের দিকে ভয়ার্ত দৃষ্টি ফেললো।
–“এখন কি হবে?”, তানশানের আতঙ্কমিশ্রিত কণ্ঠে রূপকথা কৃত্রিম হেসে বলল,
–“আমি দেখে নিচ্ছি।”
ফোন রিসিভ করে স্পিকারে দিতেই ভেসে আসে অত্যাধিক গুরুগম্ভীর কণ্ঠ।
–“তোমরা কোথায় রূপকথা?”
রূপকথা আর তানশান বুঝেগেল ড্রাইভার চাচার পেটে কথা রাখা মুশকিল।
রূপকথা সতর্ক কণ্ঠে বলল।
–“খুব খিদে পেয়েছিল তাই খেতে এসেছি এক জায়গায়।”
অপরপ্রান্ত থেকে ভেসে আসলো ভীষণ অভিজ্ঞ কণ্ঠ।
–“বাহ্ আমার ছেলেটা দেখি তোমায় ও নিজের অপকর্মের সাথী বানিয়ে নিয়েছে।”
–“সত্যিই খিদে পেয়েছিল। আর তানশানের ও তো জ্বর! জ্বর মুখে তো ভাত খেতে ভালো লাগে না। এসব খেতে ভালো লাগে।”

–“তোমাদের এইসব অদ্ভুত কথা কে শিখিয়েছে? ভাত খেতে ইচ্ছে না হলে ঘরে অন্য কিছু বানিয়ে খাবে, ফল খেতো!”
–“বারবার তো খায় না, আজকে একদিনই। আর এখানকার খাবার সত্যিই অনেক সুস্বাদু!”
তপোবন ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলল। বলল,
–“তানশানকে ফোন দাও।”
তানশান পান্তুর মুখে তাকিয়ে আছে। রূপকথা মৃদু হেসে বলল,
–“কিছু বলবে না, কথা বলো।”
তানশান কানের ফোন ঠেকায়। এবং বরাবরের মতো বাবার স্নেহ ভরা কণ্ঠে তার ভয় উবে গেল।
–“শরীর ভালো লাগছে, আব্বু?”
–“ভালো লাগছে পাপা। আমি এখন সুস্থ হয়ে গিয়েছি।”, তানশানের হাস্যোজ্জ্বল কণ্ঠে তপোবনের মুখেও হাসি ফুটে উঠল। বলল,
–“সুস্থ তো হবেন-ই! অস্বাস্থ্যকর খাবার খাচ্ছেন যে!”
পরপরই বলে,
–“খেয়ে সাবধানে বাড়ি ফিরবে। আর ওষুধ খাবে। পাপা‌ শিঘ্রই আসছি।”
–“থ্যাংকিউ পাপা!”
তপোবন মৃদু হেসে বলল,
–“তোমার মিমিকে ফোনটা দাও।”
রূপকথা একহাতে ফোন কানে ঠেকিয়ে আরেকহাতে খেতে লাগল। ব্যস্ত কণ্ঠে বলল,

–“বলুন।”
–“আপনিও মনে হচ্ছে মজা করে খাচ্ছেন?”
–“জি, অনেক মজা।”
–“বাহ! আমি তবে আর্কিটেক্টের পেশা ছেড়ে একটা রেস্তোরাঁ খুলে বসি বউ বাচ্চার জন্য।”
–“ভালো হবে তানশানের পাপা।”, রূপকথা খিলখিলিয়ে হেসে উঠল। তপোবন মৃদু হেসে বলল,
–“এই শেষ, দু’জন আর এক মাসেও এসবের ধারেকাছে যেতে পারবে না।”
–“আপনি কি ভেবেছেন, এভাবে করে আমাদের আঁটকে রাখতে পারবেন? আমি এখন ইউটিউব চালানো শিখেছি। সেখানে অনেক রেসিপি পাওয়া যায়। আমি শিখে নেবো।”
তপোবন হতাশার নিঃশ্বাস ফেললো তার কথায়।
–“পড়াশুনা ব্যতীত তোমার সবকিছুতে ফুল এনার্জি থাকে।”
রূপকথা ম্লান হাসলো। কথাটি কদাপি মিথ্যা নয়। ইদানিং সংসার, স্বামী সন্তান তাকে বেশি আকৃষ্ট করে তার‌ লক্ষ্যের থেকে। বলল,

–“আমি পড়াশুনায় খামতি রাখব না।”
তপোবন উদাসীন কণ্ঠে বলল,
–“জীবনে সবচেয়ে বড় একটা দিক থেকে পিছিয়ে আছো অন্তত এই লক্ষ্যটা ভুলে যেওনা। যেভাবেই হোক নিজেকে দাঁড় করাও।”
রূপকথার খাওয়া থেমে গেল সেই কথায়। বলল,
–“আমি কোনোদিন থেকে পিছিয়ে নেই। বরং সবদিক থেকে এগিয়ে থাকব ইন শাহ্ আল্লাহ!”
তপোবন মৃদু হেসে নিজেও আওড়ায়,
–“ইন শাহ্ আল্লাহ।”
তপোবন ফোন রাখলে মা ছেলে চিত্ত ঠান্ডা করে মজাদার খাবার খেয়ে বের হলো। আর তানশানের অর্ধেক শরীর খারাপ তাতেই ভালো হয়ে গিয়েছে। রূপকথাও বেজায় খুশি হয়ে গেল ছেলেকে আগের মতো চঞ্চল প্রাণবন্ত দেখে।

সময় কাটে। এরোজের চিরসঙ্গী নিঃসঙ্গতা এবং নিষিদ্ধ নেশা দ্রব্য পুনশ্চঃ তার সঙ্গী হয়ে উঠল। ধরণীর রক্তে মাংসে গড়া বিবেকবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষগুলো তার সঙ্গ ছেড়ে দিলেও এগুলো কখনো তার সঙ্গ ছাড়ে না। এরোজ ভীষণ কৃতজ্ঞ এই দু’টো জিনিসের কাছে।
সকাল সাতটা। তানশান সতর্ক দৃষ্টি ফেলে চাচার ঘরে উঁকি দিলো। তন্মধ্যেই অনুভব করে টিকটিকির মতো কেউ তার কাঁধে চড়ে বসেছে। তানশান ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় বোনের দিকে। মিহি স্বরে বলে,
–“কোত্থেকে আসলে দুষ্টু বুড়ি?”
নামেল গাল ভরে হেসে বলল,
–“হলিক্স খেয়ে এসেছি।”
তানশান মৃদু হেসে তাকে কাঁধে করেই এরোজের ঘরে ঢোকে। অন্ধকারাচ্ছন্ন ঘর দেখে দুই ভাই-বোন ঠোঁটের উপর আঙুল চাপলো। একে অপরকে ইশারায় বলে,

–“ধীরে, ধীরে। কথা বলবে না।”
তারা ধীরে ধীরে পা টিপে টিপে যায় চাচার কাছে। গিয়েই এক বিকট চিৎকার করে ঝাঁপিয়ে পড়ে এরোজের গায়ের উপর। মাঝরাতে ঘুমিয়েছে, উপরন্তু দেহের উপর এমন ভারী আঘাতে এরোজ বিরক্তিতে “চ” বর্গীয় শব্দ করে। কম্ফোর্টার মুরি দেওয়া অবস্থাতেই রাগান্বিত স্বরে বলে,
–“দু’টো বাঁদর! তোমাদের কাজ নেই? সকাল সকাল এখানে হাজির হয়েছো কেন? তাও আবার এভাবে?”
দুই ভাই-বোন শোনেনা। দু’জনে দুদিক থেকে টিকটিকির মতো চার হাত পায়ে জড়িয়ে ধরে এরোজকে। বক্ষমাঝারে ছোট্ট একটা রাজকুমারী আর পৃষ্ঠদেশে তার রাজকুমারের আধিপত্যে। না চাইতেও এরোজ বিরক্তি ভুলে স্মিত হাসল। জ্বলন্ত বুকটায় প্রশান্তি আঁছড়ে পড়ে। বদ্ধ নেত্রেই জড়ানো কণ্ঠে শুধায়,
–“কি চাই?”
চাচাকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে কাঁধে থুতনি রেখে তানশান আহ্লাদি কণ্ঠে বলে,

–“ছোট পাপা তুমি তো বলেছিলে আমায় আমার পছন্দের গিফট দেবে। কিন্তু দিলে না তো!”
–“ট্যাব কে দিয়েছে? ওটা তুমি চেয়েছিলে না?”
এরোজের জলদগম্ভীর কণ্ঠে তানশান উৎকণ্ঠা নিয়ে বলল,
–“ওটা আমি চেয়েছিলাম ঠিক আছে কিন্তু ওটা পছন্দের নয়।”
ছেলেটির জড়তা ভরা কণ্ঠেই এরোজ বুঝে যায় কোনো অনৈতিক কিছু চাইবে। তাই সে কোনোরূপ বাকবিতন্ডা না করে শুধায়,
–“কি চাও?”
চাচার প্রশ্নে তানশান হড়বড়িয়ে বলল,
–“নেটফ্লিক্সের পাসওয়ার্ডটা দাও না, ছোট পাপা।”
ভীষণ অনৈতিক চাওয়ায় এরোজ চোখ খুলে তাকায় তানশানের দিকে। কম্ফোর্টারের আড়ালে শুধু ধূসর চোখদুটোই দৃশ্যমান। শানিত কণ্ঠে বলে,
–“মোক্ষম সময় মোক্ষম চাল, তাই না? তোমার পাপা শুনলে সব দোষ আমার ঘাড়ে পড়বে। নো নেটফ্লিক্স!”
তপোবন হলিউড মুভি দেখা পছন্দ করে না। নিজের ক্ষেত্রে নয়, ছেলের ক্ষেত্রে। বেশিরভাগ হলিউড মুভি এডাল্ট হয় তাই! কিন্তু দূর্ভাগ্যবশত তানশান হলিউড মুভি, এনিমেশনের প্রতি প্রচুর আকর্ষিত। স্পাইডার ম্যান, আয়রন ম্যান, মেলাফেশেন্ট, রাটাটোলি এগুলো তার পছন্দের তালিকায় শীর্ষে। এনিমেশন এলাউ করলেও মুভি এলাউ করে না তপোবন।

কেননা হুটহাট আঁছড়ে পড়া এডাল্ট সিন বিব্রত করে তপোবনকে।
আগে প্রায়শই বাবা ছেলে রাতে নেটফ্লিক্স দেখতো একসাথে। বলাবাহুল্য তপোবন ও এগুলোর প্রতি অবসেসড। এমনি করে একদিন ছেলের সামনে বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে তপোবন। সেই থেকে নিজেও নেটফ্লিক্স দেখা বন্ধ করেছে, ছেলের দেখাও বন্ধ করেছে। সে এখন আর নেটফ্লিক্স কিনে না কিন্তু এরোজ কিনে। আর তার জন্যই তানশানের এমন হঠকারিতা।
সে একপ্রকার ইমোশনাল ব্লাকমেইল করে পাসওয়ার্ড নিতে সক্ষম হয়। ভাইজানের গিফট নেওয়া শেষ হতেই চাচার বুকে লেগে থাকা, ছোট্ট খরগোশের ছানার ন্যায় নায়েল পিটপিট করে তাকায় এরোজের মুখপানে। বিগলিত হেসে শুধায়,

–“আমায় উপহাল দেবে না, ছোট পাপা?”
এরোজ মাথা নুইয়ে দৃষ্টি রাখ ফর্সা পাতলা লম্বাটে মুখপানে। ছুঁয়ে দেয়ার ইচ্ছা প্রবল হতেই আলতো চুম্বন করে আদুরে জোড়া ভ্রুযুগলের মাঝখানে। ক্ষীণ স্বরে বলে,
–“আজ কি আপনার জন্মদিন নাকি কোনো বিশেষ দিন? তবে কেন আপনাকে উপহার দিতে হবে?”
নায়েল থমথমে মুখে বলে,
–“উপহাল দিতে জমদিন লাগে না। মাম্মা বলে, ভালোবাসলে উপহাল দিতে হয়। তালমানে তুমি আমায় ভালোবাসো না। তুমি বলেছিলে আমায় পিনসেস ড্রেস এনে দেবে কিন্তু দাও নি। তুমি নটি বয়!”
এরোজের অলস বদনে হেসে উঠল। ত্যাড়া কণ্ঠে বলল,
–“হ্যাঁ, আমি নটি বয়। এখন‌ যাও কি করবে করো!”,
সহসা নায়েল ক্ষুব্ধ নয়নে তাকায়। রাগান্বিত স্বরে বলে,
–“তালমানে তুমি আমায় উপহাল দেবে না? পিনসেস ড্রেস দেবে না?”
–“তুমি না মাত্রই আমায় বাজে কথা বললে? তবে কেন দেবো তোমায় উপহার!”
এরোজের থমথমে কণ্ঠে নায়েল দ্বিগুণ রাগান্বিত স্বরে বলল,

–“কোথায় আমি তোমায় বাজে কথা বলেছি? তুমি তো দেখছি মিথা কথাও বলো!”
–“আমি মিথ্যা কথা বলি? নটি বয় কে বলল একটু আগে?”
সহসা চুপসে গেলো নায়েল। আলাভোলা হেসে সহসা পাল্টি খেয়ে বলে,
–“মজা কলেছি। তোমায় ক্ষেপিয়েছি। তুমি তো নটি বয় না— গুড বয়। আমায় একটা গিফট দাও।”
এরোজ দেখলো অতি দস্যি মেয়েটাকে। অতঃপর গম্ভীর গলায় বলে,
–“আদর করে দাও, তবে দেবো।”
এরোজের গম্ভীর কণ্ঠে নায়েল ফের তেতে উঠল,
–“ছবছময় এমনি কলো। আদল নিয়ে আল উপহাল দাও না।”
–“ঠিক আছে যাও। দেই না যখন, দেবোও না আর কখনো।”, এরোজ ফের কম্ফোর্টার টানলো। নিরুপায় নায়েল কি করবে ভেবে পায় না। রাগে গজগজ করতে করতে এরোজের মুখের উপর থেকে কম্ফোর্টার সরিয়ে পুরো মুখ জুড়ে আদর করে দিতে লাগল।
এরোজ মিটিমিটি হাসছে আর দেখছে রাগান্বিত মুখে আদর করতে থাকা মেয়েটিকে। মানসপটে ভেসে ওঠে এমনি হুটহাট রেগে যাওয়া এক চঞ্চল রমনীর কুঁচকানো মুখ। মস্তিষ্ক ফের নিজের স্বকীয়তা ভুলে বসল। মত্ত হয় ব্যথাগুলোর মাঝে।
মানুষটা এতটা সুখময় যে তারা দেয়া ব্যথাগুলোও ভাবতে সুখ অনুভব হয়।
পুরো মুখ জুড়ে ছোট ছোট স্পর্শ দেয়া শেষ হতেই নায়েল হাঁফ ছাড়লো। বলে,

–“এখন দেবে তিন্তু।”
রাগান্বিত স্বরে এরোজ ম্লান হেসে তানশান’কে বলল,
–“আব্বু! বাম পাশের কাবার্ডের ভেতর একটা শপিং ব্যাগ আছে নিয়ে আসো।”
চাচার কথামতো তানশান গিয়ে ব্যাগটা নিয়ে আসে। উৎসুক নায়েল চোখ বড় বড় করে তাকায় এরোজের দিকে। আশ্চর্য হয়ে শুধায়,
–“এখানে কি উপহাল আছে আমাল জন্য?”
এরোজ ব্যাগটি নায়েলের কোলের মাঝে রেখে বলে,
–“হুঁ।”
নায়েল উচ্ছ্বাসিত বদনে চিৎকার করে উঠল।
–“ওয়াও ছোট পাপা! তুমি গুড বয়!”
নায়েল তড়িঘড়ি ব্যাগটা খুলতেই, প্যাস্টেল কালারের একটি অনেক ঘের ওয়ালা ফুলকো একটা প্রিন্সেস ড্রেস বেরিয়ে আসে। নায়েলের আনন্দ উচ্ছ্বাসের শেষ নেই। সে এরোজের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ঝপাং ঝপাং আরো কয়েকটা আদর করে দেয়। জামাটা নিয়ে লাফাতে লাফাতে পুরো বাড়িজুড়ে সকলকে দেখায় আর বলে সে একটা প্রিন্সেস। তাই তার ছোট পাপা তাকে প্রিন্সেস ড্রেস এনে দিয়েছে। সে এটা পড়বে এখন!

তপোবনের শঙ্কা ঠিক লাগাতার ঐ দূর্ঘটনাগুলো কাকতালীয় ছিল না। বরাবরই তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তার কারণে তপোবন প্রশংসিত হয়ে আসছে। আজও সেই তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তার জোরেই সে প্রাণঘাতী আক্রমণ থেকে বেঁচে গেল।
মনের খচখচানি দূর করতে না পেরেই তপোবন কিছুটা কৌশল অবলম্বন করল। পরদিন বাড়ি ফেরার পথে সে নিজের গাড়িতে নয় ভাড়া করা গাড়িতে ফিরলো। আর নিজের গাড়ি ড্রাইভারকে দিয়ে পাঠালো তবে অগোচরে যশোর পুলিশ ছিল।
এবং তপোবনের শঙ্কা সত্যি করে দিয়ে পথিমধ্যে তার গাড়ির উপর একটা ট্রাক আক্রমণ করার চেষ্টা করে। যা বিফল হয়ে গেল তপোবনের কারণে।
পুলিশ ফোর্স ট্রাক ড্রাইভারকে আটক করতে পারে। কারোর কুটনৈতিক কৌশল সেখানেই ব্যর্থ হয়।
বাগের হাটের পথ ধরে সাঁই সাঁই করে চলন্ত গাড়িতে বসা তপোবন হেসে ফেলল। এত অদক্ষতা নিয়ে কেউ প্রাণঘাতী হামলা করতে নামে?
সন্ধ্যা সাতটা। গাড়িটি কিছুক্ষণের মধ্যেই তার গন্তব্যে পৌঁছায়। তপোবন গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ায় বিশালাকৃতির এক দালানের সামনে। সাথে রয়েছে বাগেরহাটের থানার ওসি। সে যশোর থেকে সোজা বাগেরহাটে এসেছে। মনে হয়েছে কারোর ভুল ধারণা আর অদক্ষতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখানোটা বেশি প্রয়োজন!
বিশালাকৃতির লিভিং রুমের মাঝ বরাবর সোফায় আয়েশ করে বসা বয়স্ক লোকটি সহিসালামত তপোবনকে দেখেই ক্রোধে থম মেরে বসলেন। চোখেমুখে চাপা ক্ররতা!
তপোবন সোজা গিয়ে বিনা অনুমতিতে তার সামনের সোফায় বসে। মৃদু হেসে বলে,
–“আসসালামুয়ালাইকুম, মোজাফফর চাচা। শরীর ভালো আছে?”
মোজাফফর খাঁ ক্রোর দৃষ্টি সরিয়ে আঁটকে আসা কণ্ঠনালী খুললো। সালামের জবাব দিয়ে ক্ষীণ স্বরে বললেন,

–“শরীর ভালো আছে, তপোবন।”
তপোবন জলদগম্ভীর কণ্ঠে বলে ওঠে,
–“কিন্তু আমি ভালো নেই, চাচা। আপনি থাকতে দিচ্ছেন না। ক্ষমতার লড়াই বড্ডো হিংস্র লড়াই চাচা। কিন্তু আমি বরাবরই আব্বুকে এই লড়াই থেকে দূরে রেখেছি। তার বয়স হয়েছে, রাজনীতি তার জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর এক বছর সে ক্ষমতায় আছে, এরপর চাইলেও আমি তাকে ক্ষমতায় দাঁড়াতে দেবো না। তখন আপনি নিশ্চিন্তে নিজের ক্ষমতা নিজের বলে অর্জন করে নিতে পারবেন। কিন্তু আমায় মেরে কিংবা আব্বুকে কোনো ক্ষতি করে আপনি কোনোভাবেই লাভবান হবেন না, চাচা।”
মোজাফফর খাঁ তীক্ষ্ম চোখে তাকালেন। শুধায়,
–“কি বলতে চাইছো তুমি?”
তপোবন মৃদু হেসে বলল,

–“আপনি আমায় মারার জন্য যাদের পাঠিয়েছিলেন তারা ভীষণ বোকা আর অদক্ষ! তারা আমার জিম্মায় রয়েছে চাচা। তাই বলছি, শান্ত হন আর নিজেকে গুটিয়ে নিন। আর মাত্র এক বছর এরপর বাগেরহাটের তিন নং আসনের প্রার্থী হিসেবে তকদির সিকদার আর থাকবে না। আপনার জন্য ইলেকশন জেতা সহজ হয়ে যাবে।”
–“আর তুমি ভাবছো আমি তোমার কথায় কুকুরের মতো লেজ গুটিয়ে বসে থাকব? তোমার বাবা সবসময় আমার বাড়া ভাতে ছাই ঢেলে দিয়েছে।”
–“আপনি কি করবেন সেটা নিতান্তই আপনার ব্যপার, চাচা। তবে আমি কথা দিতে পারি, এরপর আর তকদির সিকদারকে রাজনীতিতে দেখবেন না আপনি। আব্বুর বয়স হয়েছে বলেই আমি তাকে সাহায্য করছি। অন্তত যতক্ষণ রাজনীতিতে আছে যেন সাধারণ মানুষের কল্যাণের জন্য যথাযথভাবে কাজ করতে পারে। এটা ব্যতীত আমার কোনো সংযোগ নেই রাজনীতির সাথে। কিন্তু তবুও যদি আপনি না মানতে চান আর এই ঘৃণ্য পরিকল্পনা বহাল রাখেন—তবে আমাকেও শক্ত ভাবে মাঠে নামতে হবে। কারণ আমার একটা সন্তান আছে। জানেন তো মা ছাড়া ছেলে আমার। আমিই তার সব! আমায় বাঁচতে হবে তাকে নিজের পায়ে দাঁড় করানো পর্যন্ত। তাই সিদ্ধান্ত আপনার! আপনি কোনটা চান? ঝঞ্ঝাট বিহীন সমাধান না-কি রক্তারক্তি?”

থুতনিতে হাত ঠেকিয়ে মোজাফফর খাঁ চুপ করে বসে রইলেন সোজাসাপ্টা কথায়। একটু হলেও বুঝে যায়, কি করে পরপর তিনবার তকদির সিকদার একই আসনের এমপি হিসেবে ছিলেন। তকদির সিকদার এর পেছনের শক্তি যে বড্ডো ধীরস্থির চৌকস বুদ্ধির!
আটটা নাগাদ তপোবন সন্তোষজনক সিদ্ধান্ত নিয়েই বের হয় মোজাফফর খাঁ এর বাড়ি থেকে। চোখমুখ থেকে দৃঢ়তা মিলয়ে নিশ্চিন্তের এক নিঃশ্বাস বেরিয়ে আসলো।
ইদানিং তার জীবনের পাতায় বাঁচার জন্য অজস্র কারণ যুক্ত হচ্ছে। ছেলে ব্যতীত ও কেউ তার পথ চেয়ে থাকে, কেউ অনেক অনেক স্বপ্ন বোনে তাকে নিয়ে।
জীবনের দেয়া দুঃখগুলো ভুলে সে বহুবার সামনে এগিয়ে গেলেও কখনো পিছু ফিরে তাকানোর তাগিদ অনুভব হয়নি। তবে এবার মনে হচ্ছে হাজার মাইল সামনে এগিয়ে গেলেও, তাকে বারংবার পিছু ফিরে তাকাতে হবে দুই গজ মাটির নিচে রেখে আসা চঞ্চল রমনীটির পানে।
দরজা খুলতেই শুকতারার এঁটো মুখটি ভেসে উঠলে তপোবন স্মিত হাসলো। স্নেহের কণ্ঠে শুধায়,

–“ভালো আছেন ভাইজান?”
চেটেপুটে হরলিক্স খেতে থাকা শুকতারা ব্যক্কল হয়ে তাকিয়ে রইল তপোবনের দিকে।
–“দুলাভাই, আপনি?”
তপোবন হেসে তার মাথায় হাত বুলালো। নিলীমা ঘরের ভেতর থেকে চেঁচিয়ে বলল,
–“তারা তোকে কতবার বলেছি হুটহাট দরজা খুলবি না।”
–“আম্মা, দুলাভাই আসছে।” শুকতারা চেঁচিয়ে বলল।
তপোবন ড্রাইভারকে ইশারা করে বলল,
–“ব্যাগগুলো ভেতরে রেখে আসুন।”
ড্রাইভার সাথে করে আনা খাবার আর বাজার ভেতরে ঢুকিয়ে রাখলো। নিলীমা হতচকিত মাথায় কাপড় টেনে বেরিয়ে আসে। তপোবন মৃদু হেসে তাকে সালাম জানায়।
–“ভালো আছেন, আম্মা?”
নিলীমা অবাক কণ্ঠে সালামের জবাব দিয়ে বলল,

–“আলহামদুলিল্লাহ, আপনি? একা এসেছেন? দাদুভাই, কথা আসেনি?”
–“নাহ, আমি একটু কাজে এসেছিলাম ভাবলাম শুকতারার সাথে দেখা করে যাই।”
–“আসুন আসুন, ভেতরে আসুন।”
তপোবন ঢুকে দশ মিনিট বসলো। নিলীমা ব্যস্ত হয়ে পড়ে জামাই আদরে তবে সেই সময় তপোবন দিলো না। বলল,
–“তানশান অসুস্থ আমায় তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরতে হবে। আমি শুকতারার জন্যই এসেছি। কিছু করবেন না দয়াকরে।”
তন্মধ্যেই একটা লোক বিশালাকৃতির এক টিভি নিয়ে ঘরে ঢুকলো। শুকতারা চেঁচিয়ে উঠল,
–“কত বড় টিভি!”
নিলীমা শুধায়,
–“এগুলো কি?”
তপোবন শুকতারার মাথায় হাত রেখে বলল,
–“ওর জন্য, ঘরে একা একা থাকে মন খারাপ হয় না! একটা টিভি থাকলে অন্তত সময় কেটে যাবে। আশাকরি আপনি আমাদের ভাই বোনের মাঝে আসবেন না।”
প্রতিবার এই এক কথা দিয়েই তপোবন সম্মুখের আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন মানুষটিকে আঁটকে দেয়। নিলীমা কিছু বলল না। তপোবন টিভি সেট করিয়ে পাঁচ মিনিট বসে বেরিয়ে আসে। নিলীমা তাকে এগিয়ে দিয়ে বলল,
–“দাদুভাই, কথা নায়েল, মৌনতা রোজ ওদের নিয়ে একবার আসবেন।”
তপোবন ফিরে তাকায় তার দিকে। বিয়ের পর আজ দেড় মাস রূপকথা বাবার‌ বাড়িতে আসেনি। উভয়ের যে মন পোড়ে তা সে বোঝে। সে আশ্বস্ত করে বলল,
–“আমরা শিঘ্রই আসব।”
তপোবন বিদায় নিয়ে খুলনার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ে।

তানশান শান্তশিষ্ট, গুরুগম্ভীর, স্বল্পভাষী বলেই হয়তো রূপকথা তার উপর এতটা আধিপত্য বিস্তার করতে সক্ষম হয়‌। রূপকথা যত উশৃঙ্খলতা কিংবা জোরজবরদস্তি করুক না কেন চুপচাপ মুখ বুজে সহ্য করে নেয়।
তবে প্রায়শই সে এই ধৈর্য্যের ফলে বাজেভাবে ফেঁসে যায়। আজও তার ব্যতিক্রম না। সন্ধ্যা নাগাদ নায়েলকে কোলে নিয়ে এক প্লেট অপকর্ম নিয়ে হাজির হয় রূপকথা।
অপকর্ম ই বলা হলো। কেননা রূপকথা ইউটিউব থেকে হরেক রকমের আশ্চর্যজনক রান্না শিখেছে। কোনোটা হয় ভীষণ রকমের সুস্বাদু, তো কোনোটা হয় বিদঘুটে স্বাদের।
আজকের রেসিপিটাও বিদঘুটে স্বাদের কাতারেই পরে। আর এগুলো সব এক্সপেরিমেন্ট করে নায়েল আর তার উপর।
নায়েল তো খেয়েদেয়ে মন ভরে প্রশংসা করেছে বড় মায়ের। বলেছে,

–“খুব স্বাদ! খুব স্বাদ!”
আর তানশানের খাবারটা মুখে নিয়ে মনে হলো এর থেকে জঘন্য স্বাদ আর হতেই পারে না। সে ফেলতেও পারছে না, গিলতেও পারছে না। তাই মুখে নিয়ে চুপ করে বসে আছে।
রূপকথা চঞ্চল কণ্ঠে শুধায়,
–“কেমন হয়েছে? এটা একটা বিদেশী রেসিপি। নাম হলো সুশী! আজ নতুন শিখেছি।”
নায়েল ও সায় জানিয়ে বলল,
–“খুব মজা ভাইজান, খাও খাও।”
তানশান খাবার মুখে নিয়েই বহু কষ্টে মুখ খুললো। শুধায়,
–“কাঁচা চিংড়ি মাছ দিয়ে বানিয়েছেন?”
রূপকথা প্রসন্নতার সাথে গাল ভরে হেসে বলল,
–“হ্যাঁ, রেসিপিতে তো যেভাবে বলেছে একদম সেভাবেই বানিয়েছি। যেমন দেখতে, তেমন খেতেও হয়েছে, তাই না?”
তানশান আর খাবারটা মুখে রাখতে পারে না। সে তড়িঘড়ি করে চেয়ার ছেড়ে উঠে বলল

–“একটু বাইরে যান।”
–“কেন?”
রূপকথার অবাক কণ্ঠ উপেক্ষা করে তানশান ঠেলে তাকে সহ নায়েলকে ঘর থেকে বের করে দেয়। দরজা আঁটকে কোনমতে এক ছুটে বাথরুমে গিয়ে খাবারগুলো ফেলে দিলো। হন্তদন্ত হয়ে ব্রাশ করে, মাউথ ওয়াশ করে, এক গ্লাস পানি খেয়ে তারপর গিয়ে নিজের মুখের বিদঘুটে ভাব কমায়।
অতঃপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে দরজা খুলে দিলো। রূপকথা হন্তদন্ত হয়ে ঢুকে শুধায়,
–“কি হলো শরীর খারাপ লাগছে নাকি আবার?”
তানশান শ্রান্ত দৃষ্টিতে তাকায় চঞ্চল রমনীর পানে। বলে,
–“আপনি একটা খান।”
–“হ্যাঁ, খাবো তো। কিন্তু পরে। তুমি বলো তুমি অমন করলে কেন?”
তানশান জবাব দিলো না। একটা সুশী নিয়ে রূপকথার মুখে ঢুকিয়ে দিলো। রূপকথা একবার দু’বার নির্বিকার চিবুলেও তৃতীয়বার আর পারলো না বরং তানশানকে অবাক করে দিয়ে সে গল গল করে বমি করে দিলো মেঝেতে।
তানশান অবাক হতে গিয়েও হো হো করে হেসে ফেললো। ছুটে গিয়ে পানি এনে রূপকথার সামনে ধরে। ধাতস্থ রূপকথা করুণ চোখে তাকায় ছেলের পানে।
অভিযোগ করে বলে,

–“তুমি এমনটা কি করে করলে আমার সাথে? এটা কি বাজে ওয়াক!”
তানশান হাসতে হাসতে বলল,
–“তাহলে বুঝুন আপনি আমাকে কি অত্যাচার গুলো করেন।”
রূপকথা বিমর্ষ মুখে বলল,
–“আর এমন করব না, তোমার কষ্ট হয়েছে তাই না? দুঃখিত!”
তানশান মৃদু হেসে বলল,
–“ইটস ওকে। এরপর যাই বানান না কেন বিদেশীদের মতো রান্নাকরা ছাড়া রেসিপি ট্রাই করবেন না। যা ওয়েল কুকড তাই করবেন।”

–“না না, বাবা! আমি আর এই সাদা বিড়ালদের রেসিপিই ফলো করব না। ছিঃ ইয়াক!”
–“সুশী খেতে অনেক মজা কিন্তু আমরা তো কাঁচা মাছ খেতে অভ্যস্ত না। এটা অন্য ভাবেও বানানো যায়।”
তানশান ফের বলল। সে সুশী আগেও খেয়েছে কিন্তু সেটা ডিমের আর ওয়েল কুকড স্যালমনের।
রাত তখন এগারোটা। সদর দরজা থেকে তপোবন লম্বা লম্বা পা ফেলে ঢুকলো। তপোবনের এমন অনাকাঙ্ক্ষিত আগমনে রূপকথা আর তানশানের আঁখিদ্বয় চকচক করে উঠল।
ঘরের পুত্রবধূ সহ তখন সকলে খাবার টেবিলে। রূপকথা যেতে পারলো না। তপোবন নিজেই এগিয়ে এসে সকলের সাথে কুশল বিনিময় করে।
অদূরে দাদার পাশে বসা তানশানের হাসিমাখা মুখ দেখে এগিয়ে যায়। ছেলেকে একহাতে পেটের সাথে আগলে নিয়ে বলে,

–“শরীর ভালো লাগছে, আব্বু? খাওয়া দাওয়া করতে পারছো?”
তানশান প্রগাঢ় হেসে বাবাকে জড়িয়ে ধরে বলল,
–“পারছি পাপা। তুমি হঠাৎ এসেছো আমি সারপ্রাইজ হয়ে গিয়েছি।”
–“সারপ্রাইজ দিতেই তো চলে এসেছি।”
নির্জনা বেগম ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন,
–“যাও ঘরে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে খেতে আসো।”
–“জি আম্মা।”, তপোবন উপরে চলে যায়। নির্জনা বেগম রূপকথাকে বলল,
–“যাও গিয়ে দেখো তপোবনের কি লাগে!”
নির্জনি বেগম বলতেই রূপকথা গুটি গুটি পায়ে উপরে চলে গেল। ঘরে কেউ ঢুকতেই তপোবন ফিরে তাকায়। আনত মুখে নারীটি তার প্রয়োজনীয় সবকিছু এনে বিছানায় রাখলো। সে বাঁকা চোখে চেয়ে বলল,
–“রাগ কি কমেনি? নাকি তোমার বিগড়ে যাওয়া বিবাহিত বন্ধুরা বলে দিয়েছে যতক্ষণ চুমু না দেবে ততক্ষণ রাগ কমানো যাবে না?”
রূপকথা কোমড়ে হাত দিয়ে কপাল কুঁচকে তাকায়। তপোবন মিটিমিটি হাসছে। সে বিরোধ করে বলল,

–“আমার বান্ধবীরা মোটেই এমন বাজে বুদ্ধি দেয় না।”
–“কিন্তু আমার তো এমনি মনে হলো। যাও রাগ করো না। একটা চুমুই তো, কি এমন বড় ব্যপার! দিয়ে দিচ্ছি।”
বলেই তপোবন এগিয়ে এসে মেয়েটির দুগাল আঁকড়ে ধরে ললাট বরাবর শব্দ করে একটা চুমু দিলো। সেই অপ্রত্যাশিত স্পর্শ গলাধঃকরণ করা কষ্টসাধ্য হলেও লাজে মরি মরি রূপকথা বেজায় নির্লিপ্ত ভাবেই গ্রহণ করে।
রোবোটের ন্যায় শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটিকে দেখে তপোবন মিটিমিটি হেসে বিছানা থেকে পাঞ্জাবি নিয়ে চলে যায়।
ওয়াশরুম পর্যন্ত যেতেই ভেসে আসলো চতুর কণ্ঠ।
–“এত ছল কৌশলের কোনো প্রয়োজন ছিল না।”
তপোবন ফিরে তাকায়। চোখে হেসে শুধায়,
–“কী?”
রূপকথা আড়চোখে চেয়ে বলল,
–“আমি বুঝি সব!”
তপোবন হেসে বলল,
–“হ্যাঁ, তার জন্য ই তো আপনি মুরুব্বি।”
বলেই সে হাসতে হাসতে ওয়াশ রুমে চলে যায়। লোকটা যেতেই রূপকথা সরব দুগালে হাত দেয়। গাল দুটো যে অস্বাভাবিক গরম হয়ে উঠেছে। কি সাংঘাতিক!
তপোবন ফ্রেশ হয়ে এসে শুধায়,

–“তানশানের কি খুব বেশি জ্বর উঠেছিল? তুমি সামলাতে পেরেছিলে? বছরে একবার তার জ্বর ওঠে নিয়মকরে। আর তখন আমার নাজেহাল অবস্থা করে ছাড়ে। তোমারও সেই দশাই হয়েছে নিশ্চয়ই?”
–“নাজেহাল করলে হয়তো খুশি হতাম। কিন্তু আপনার ছেলে আপনার মতোই! অবচেতনেও সে দূরত্ব ঠিকই বজায় রেখেছে। আপনি বসুন নাহয়, আমি এখানেই খাবার নিয়ে আসছি।”
রূপকথার কণ্ঠে ব্যর্থতার ক্লেশ ছিল। তপোবন বুঝতে পারে সম্পর্কের এই জটিলতায় রূপকথা নামক ছোট্ট মেয়েটিও হতাশ হয়, কষ্ট পায়। কিন্তু সে তো ছেলের উপর জোরজবরদস্তি করতে পারে না। কিছু সম্পর্ক তার নিজস্ব স্বকীয়তা বজায় রেখে আগনোই উত্তম!
সে বিছানায় পা টান টান করে শুয়ে বলল,,

–“পরে খাবো। ক্লান্ত, একটু বিশ্রাম নেই।”
রূপকথা কথা বাড়ায় না। চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। তপোবন বদ্ধ নেত্রে কপাল ঘষছে! তার শ্রান্ত শরীর শীতল হয়ে পড়ে ললাটে চিকন হাতের নরম স্পর্শ অনুভব হতেই। তপোবন চোখ খুলে তাকায়। কৃত্রিম আলোয় স্পষ্ট উজ্জ্বল ফর্সা মুখটি। রূপকথা নীরবে মাথা টিপতে লাগলো। তপোবন কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করল না বরং এগিয়ে গিয়ে নিজের মাথাটাই রূপকথার কোলের মাঝে রাখে। যেন মেয়েটির এই কাজ মোটেই অবাক করার নয়। বরং এটাই আশা করেছিল।
ভারী মাথাটা নিজের কোলে সহ দু’টো বলিষ্ঠ হাত কোমড় জড়িয়ে নিতেই মেয়েটির অন্তঃস্থল হাঁসফাঁস করে উঠল। তবুও সেই অনুভূতি একটুও প্রকাশ পেল না। রূপকথা শুকনো ঢোক গিলে চুলে হাত গলিয়ে দেয়। তপোবন বদ্ধ নেত্রে বলল,

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৩৪ (২)

–“দশ মিনিট দিলেই হবে।”
রূপকথা নিরুত্তর টিপতে থাকে। তবে দশ মিনিট আর বিশ মিনিট নয় অগণিত সময়।
বহুবছর পর কারোর যত্নমাখা স্পর্শে তপোবন তখন গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন।

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৩৫ (২)