অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৪২
তোনিমা খান
মৌনতার হৃদয়ে স্তিমিত হয়ে আসা আকাঙ্ক্ষাগুলো আজ ফের অঙ্কুরিত হতে শুরু করেছে। এই যাত্রায় হয়তো তার তাসের ঘর সদৃশ সংসারটা বেঁচে যাবে। সন্ধ্যা থেকেই তার চোখেমুখে এক অবর্ণনীয় দীপ্তি; শরীরের অসহ্য যাতনাও আজ তার প্রবল আনন্দের কাছে হার মেনেছে।
এসেই ইমরোজের পছন্দের খাবার রান্না করেছে। যদিও তাতে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ দেখাযাবে না ইমরোজের মাঝে। কেননা মৌনতার প্রতিটি কাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে তার জন্য এক অন্ধ অনুরাগ মিশে আছে। আর ঠিক এই নিশ্চিত বিশ্বাসের কারণেই হয়তো এত উপেক্ষা আর অবহেলা।
যে যাকে অকাতরে বিলিয়ে দেয়, প্রতিদানে সে ততটাই রিক্ত হয়। পৃথিবীর নিয়মটা এমন না হলেও তো পারতো!
কেমন হতো যদি আমার দেয়া মূল্যের প্রতিদানে সামনের ব্যাক্তিটা তার থেকে দ্বিগুন মূল্য ফিরিয়ে দিত?
রাত তখন প্রায় এক’টা। মৌনতার উচ্ছ্বাস এবার শারীরিক অসুস্থতার কাছে নতি স্বীকার করল। ডান পায়ের তীব্র যন্ত্রণায় তার কপাল কুঁচকে উঠল। অবসন্ন শরীরটা নিয়ে বিছানায় একটু গা এলিয়ে দিতেই কলিং বেলের কর্কশ শব্দ। এটা নিশ্চিত ইমরোজ। মৌনতা এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বিছানা ছেড়ে ওঠার মতো শক্তি অবশিষ্ট নেই।
ওদিকে নায়েল এখনো ছোটাছুটি করছে। মেয়েটা দূরন্ত হয়েছে, ঘুমাতে ঘুমাতে প্রতিদিন একটা বাজিয়ে দেয়।
মৌনতার যৎসামান্য আরামকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে মিনিট খানেক বাদেই ইমরোজের হাকডাক শোনা গেল। ঘর্মাক্ত বদনে মৌনতা পা টেনে টেনে নিচে নামলো।
কিন্তু নিচে পা রাখতেই একরাশ বিতৃষ্ণা তাকে ঘিরে ধরল। বিক্ষিপ্ত মেজাজে ইমরোজ শূন্য লিভিং রুমে পায়চারি করছে, আঙুলের ফাঁকে জ্বলন্ত সিগারেট। মৌনতা নাকে আঁচল চেপে ধরে অনুযোগের সুরে বলল,
–“ঘরে বসেও এখন সিগারেট খাওয়া শুরু করেছেন? পরিবারের মানুষগুলোর সুস্বাস্থের কথা একটু ভাবুন।”
ইমরোজ কথাগুলো কানেই তুলল না। বরং রুক্ষ স্বরে আদেশ ছুড়ল,
—“ভাত বাড়ো।”
মৌনতা আজ আর তর্কে গেল না। তার ওষ্ঠকোণে কেবল এক চিলতে তাচ্ছিল্যের হাসি। এতকিছুর পরেও সৃজার মতো একটা মেয়ের বিরহে ইমরোজ মানসিকভাবে এতটা বিধ্বস্ত? আর সে বিগত ছয়টি বছর এই সংসারের পেছনে হাড়ভাঙা শ্রম দিয়েও স্বামীর সামান্যতম করুণা পেল না!
মৌনতা নিঃশব্দে খাবার বেড়ে দিল। নিজের পছন্দের আহার পেয়ে ইমরোজ তৃপ্তিসহকারে খেল বটে, কিন্তু তার মুখ থেকে দুটি মাধুর্যপূর্ণ শব্দ বের হলো না। বরং নিজের সকল দুশ্চিন্তা মেটানোর খোড়াক পেয়ে যাওয়ার প্রশান্তি তার চোখেমুখে।
সে খেয়ে উপরে উঠতে উঠতে আদেশের সুরে বলল,
–“তাড়াতাড়ি উপরে আসবে।”
মৌনতা মাথা নেড়ে সায় জানায়।
উপরে উঠতেই এরোজের ঘরেটা দেখে পুনশ্চ ইমরোজের মাথার রগ দপদপ করতে লাগল। নিজের চোখের সামনে ওকে সুপুরুষ আর নিজেকে কাপুরুষ হতে ও দেখতে পারবে না।
ইমরোজ গটগট করে ঘরে ঢুকতেই বাবার পাছে পাছে নিঃশব্দে ঢোকা নায়েল বাবাকে চমকে দেয়ার জন্য হৈ হৈ করে চেঁচিয়ে উঠল,
–“হ্যালোওওও পাপাআআআ!”
বিক্ষিপ্ত মেজাজের ইমরোজ সরব ভড়কে গেল। মুহুর্তেই মেজাজ আরো বিগড়ে গেল রাত একটার সময় নায়েলকে জেগে জেগে দুষ্টুমি করতে দেখে। মুহূর্তেই তার জমানো রাগ আছড়ে পড়ল অবুঝ শিশুটির ওপর।
সে ধমকে উঠে বলল,
–“হচ্ছে কি নায়েল? এত রাত অবধি তুমি জেগে আছো কেন? আর এত জোরে চিৎকার চেঁচামেচি করছ কেন? বাসার সবাই ঘুমাচ্ছে না?”
বাবার ধমকে চঞ্চল নায়েল ভয়ে মিইয়ে গেল। শূন্য ঘরে আশ্রয়ের খোঁজে এদিক ওদিক চেয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল ‘মাম্মা’ বলে। মেয়ের কান্নায় মৌনতা ছুটে আসল। মাকে দেখতেই নায়েল ঝাঁপিয়ে পড়ে তার বুকে।
মৌনতা মেয়ের পিঠে অভয় দিয়ে হাত বুলাতে বুলাতে ইমরোজের তপ্ত মুখের দিকে চাইল। শান্ত কণ্ঠে শুধাল,
—“কী হয়েছে? ওকে ধমকালেন কেন?”
ইমরোজ কঠিন চোখে তাকায়। শুধায়,
–“ও এখনো জেগে আছে কেন?”
–“ও প্রতিদিন-ই এমন রাত করে ঘুমায়। কখনো খেয়াল করেননি?”
–“আমার কি খেয়াল করার কথা? ওকে ঘুম পাড়ায় কে? তুমি আর রোজ না? তবে ওর এই উচ্ছৃঙ্খল স্বভাব হলো কী করে?”
মৌনতা অনিমেষ চেয়ে বলল,
–“আপনার খেয়াল করার কোনো কথা নয়? ওর বাবা আপনি, ইমরোজ। দুনিয়াবি মোহে কি এই ছোট্ট প্রাণটার কথাও ভুলে বসেছেন?”
–“অতটুকু একটা মেয়ে রাত একটা পর্যন্ত জাগে এই নিয়ম কে করেছে, মৌনতা? নিজেও ঠিকমতো চলাফেরা করো না, মেয়েটাকেও বানাচ্ছো তেমন। আবার আমি কিছু বললে আমার উপর আঙুল তুলে দিচ্ছো। আমি কি ঘরে বাইরে সবটা দেখব? তবে তুমি আছো কি করতে?”
–“সন্তানকে ভালোবাসতে বলাতেও এত অযুহাত, ইমরোজ?”, মৌনতা ক্ষীণ স্বরে বলে উঠল। ইমরোজের থেকে দৃষ্টি সরিয়ে মেয়ের পানে তাকায়। মেয়ের গালে চুমু দিয়ে আশ্বস্ত করে বলল,
–“মা আছি তো, ভয় নেই।”
ইয়রোজ ফোনটা ছুঁড়ে মারে বিছানায়। পোশাক খুলতে খুলতে বলল,
–“ওকে দ্রুত ঘুম পাড়িয়ে এসো।”
–“এখানেই ঘুমাবে ও।”
ইমরোজ রক্তচক্ষু নিয়ে তাকায় এবার। চাপা স্বরে হিসহিসিয়ে বলে,
–“তোমার কি মাথায় বুদ্ধিসুদ্ধি একটু কম? রোজ রোজ এক বিষয় নিয়ে তর্ক করে কি আনন্দ পাও? আমার প্রচন্ড মেজাজ খারাপ মৌনতা আর একটাও কথা বাড়াবে না।”
–“রোজ রোজ আপনিও বা এক বিষয় নিয়ে কেন পড়ে থাকেন? আমার শরীর ভালো আছে কি-না কিংবা মেয়েটার কথা একদিন ও ভাবেন না।”
–“তোমার শরীর বারোমাস খারাপ থাকে। এখন কি বারোমাস তোমায় সেবা করে যাব? আমার ও তো জীবন তাই না?”
মৌনতা বলহীন দেহে অনুভূতি শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল স্বামী নামক মানুষটির দিকে। স্ত্রী হিসেবে বিন্দুমাত্র করুণা তো দূর, মানুষ হিসেবে সামান্যতম মানবিকতাটুকু ও নেই ঐ চোখেমুখে। একদিন শাশুড়ি বলেছিল, তাকে নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে এই স্বামী, সংসারটাকে আগলে রাখতে হবে। এখন প্রশ্ন উঠছে, সর্বোচ্চটা কখন হবে? বুকের মাঝে ধুক ধুক করা প্রাণটা শেষ করে?
ইমরোজ পোশাক বদলে হাঁক ছেড়ে রোজকে ডাকে। দরজা খুলেই হাঁক ছেড়ে রোজকে ডাকলো। রোজ হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসে মেজো ভাইয়ের ঘরের সামনে। হড়বড়িয়ে বলে,
–“ও ভাইজান, কাজে আঁটকে গিয়েছিলাম। তাই দেরি হয়ে গিয়েছে। দাও নায়েলকে।”
ইমরোজ পথ ছেড়ে দেয়। রোজ ভেতরে ঢুকে মৌনতার থেকে নায়েলকে নিতে যায়। কিন্তু সবসময়ের মতোই নায়েল আসতে চায় না। রোজ আহ্লাদি স্বরে বলল,
–“এই বুড়ি আয়, ফুপির কাছে। আজ দু’জনে মিলে টম এন্ড জেরি দেখব আর চকলেট ও খাবো।”
নায়েল পিটপিট করে আগ্রহী দৃষ্টি ফেলল। শুধায়,
–“ছোট পাপাল সেই চকলেট? আল কার্টুন ও দেখাবে?”
রোজ মাথা নেড়ে সায় জানায়। নায়েল এক লাফে ফুপির কোলে চলে যায়। মৌনতা’র বুঝতে বাকি থাকে না শারীরিক অসুস্থতায় বারংবার ভেঙে পড়তে চাওয়া শরীরটাকে পুরোপুরি ভাঙবে ইমরোজ। যদিও আজ-কাল বলে কোনো কথা নেই তার জীবনে। সে তো বিবাহিতই হয়েছে প্রতি রাতে স্বামীর অদম্য চাহিদা, ক্রোধ আর জেদ মেটানোর ইন্ধন হতে।
সে ম্লান কণ্ঠে বলল,
–“রাতে উঠলে একটু দুধ গরম করে খাইয়ে দিও।”
রোজ ও ম্লান হাসে মৌনতার শুকনো, বিবর্ন মুখটি দেখে। মাথা নেড়ে বলে,
–“চিন্তা করোনা। আসছি।”
রোজ চলে যেতেই ইমরোজ সজোরে দরজা আঁটকে দেয়। গনগনে স্বরে বলে,
–“বিছানায় যাও।”
মৌনতা নিজের দেহের ভার ছেড়ে দিয়ে অশ্রুসিক্ত নয়নে তাকিয়ে রইল। বৈবাহিক সম্পর্কের এই তিক্ত অভিজ্ঞতা আর শারীরিক অবসাদে তার দম আটকে আসছে। এত যন্ত্রণা কেন হচ্ছে? সে তো মনের জোরটুকু হারায়নি এখনো।
কিন্তু মৌনতা হয়তো উপলব্ধি করতে পারেনি, তার ইচ্ছা প্রবল হলেও বিধ্বস্ত শরীরটা ক্রমশ বিশ্বাসঘাতকতা করছে। ইমরোজের যাবতীয় দুশ্চিন্তা কর্পূরের মতো উড়ে গেল তার ভাষায় এক ‘শকুনের মতো’ দেখতে অসুস্থ রমণীর শরীর ভোগ করে। আর নির্বোধ মেয়েটি তখনো হাড়ভাঙা সেই দৈহিক গ্লানি সহ্য করে যায় এক অলীক আশায়। এই তো হয়তো তার সংসারটা গুছিয়ে উঠবে। ফিরে আসবে সেই স্বাভাবিক দাম্পত্য, যেখানে থাকবে না কোনো পরনারীর ছায়া, থাকবে না কোনো অসহ্য মানসিক দহন।
এরোজের কাছে আরো একটা বিরক্তিকর কাজ হলো ঘুমের মধ্যে বিঘ্ন ঘটানো। আর তার ঘরের মানুষগুলো এটাই বেশি করে। মধ্যরাতে ধুপধাপ লাত্থির আওয়াজে তার ঘুম ভাঙে।
সে বিরক্ত হয়ে একটা গা/লি দিতে গিয়েও দিল না। দরজার ওপারের মানুষটা কাঙ্খিত মানুষ নয় জেনেও খারাপ কথা বলল না।
সে উঠে বসে। মাথাটা একটু হালকা লাগছে। লেবুর শরবত পান করে ঘুমিয়েছিল যে! তখনি আবার ও ধুপধাপ শব্দ হলো দরজায়। ভেসে আসে বাচ্চা বাচ্চা কণ্ঠ,
–”ছোট পাপা! ছোট পাপা? ঘুমিয়ে পলেছো? আমায় ছেড়ে ঘুমিয়ে পলেছো? তুমি তো পঁচা ছেলে! তুমি না বলেছিলে আমায় সাতে নিয়ে ঘুমাবে?”
এরোজ দ্রুত দরজার কাছে যায়। নিজের উৎকণ্ঠা লুকিয়ে গম্ভীর মুখ দরজা খুললো। খুলতেই ভেসে ওঠে রোজের কোলে থাকা ফুল কভারেজ রমপার আর টুপি পড়া নায়েলের ঘুম জড়ানো কান্নারত ফোলা ফোলা মুখটি। কান্নারত মুখটি দেখতেই এরোজের উৎকণ্ঠা ঠিকরে বেরিয়ে আসতে নেয়। কিন্তু তা প্রশ্রয় পায় না এরোজের কাছে।
এগুলোকে প্রশ্রয় দেয়ার কোনো কারণ নেই যে তার কাছে। সে গম্ভীর গলায় শুধায়,
–”কি হলো! এই রাতে এখানে কি করছিস?”
রোজের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করলেও জবাব দেয় নায়েল। সে ছোট ছোট হাতে চোখ মুছে নিজের দুই হাত বাড়িয়ে দেয় এরোজের দিকে। অভিমানী গলায় বলে,
–”তোমাল বোন পঁচা। সবাই পঁচা! আমায় বলেছে চকলেট দেবে, কাটুন দেখাবে কিন্তু দেখায়নি। আমি ফুপিল কাছে ঘুমাবো না, তোমার কাছে ঘুমাবো। কোলে নাও।”
রোজ ফোড়ন কাটল। বলে,
–”দেখেছো ভাইজান! তুমি বলো আমি চকলেট পাবো কোথায়? ওগুলো তো তোমার কাছে থাকে।”
এরোজ বাড়িয়ে দেওয়া হাতটির দিকে তাকিয়ে ম্লান কণ্ঠে বলে,
–“তোমায় না সকালে এক বক্স চকলেট দিয়েছিলাম?”
–“ছবাই খেয়ে ফেলেছি।”, নায়েল হাত ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বলল।
–”চকলেট শেষ নায়েল। আবার আনলে দেবো। এখন ফুপির কাছে ঘুমাও।”
–”না আমি তোমাল কাছে ঘুমাবো।”, নায়েল জেদি কণ্ঠে বলল।
–”আমার ঘরে গন্ধ। তুমি ঘুমাতে পারবে না।”
–”ছমছা নেই। তুমি এয়াল ফেশ দিয়ে দেবে। তাহলে আল গন্দ আসবে না।”, নায়েল কিছুটা তোতলানো কণ্ঠে বলে। তার প্রায়শই অনেক কথা অস্ফুট।
–”আমার মুখেও গন্ধ। বাজে গন্ধ।”
–”ছমছা নেই তো! তুমি বাশ কলবে আল মাউত ওয়াশ কলবে।”
এরোজ উষ্ণ নিঃশ্বাস ফেলে গম্ভীর গলায় বলে,
–”জেদ করোনা নায়েল। আমায় বিরক্ত করছো তুমি। ফুপির কাছে ঘুমাও।”
–”তুমি আমায় বকছো? পঁচা ছেলে তুমি! আমি কান্না কলে দেবো তিন্তু।”, নায়েল ছলছল নয়নে তাকিয়ে বলে। এরোজের ঠোঁটের কোনা বেঁকে যায়। ত্যাড়া কণ্ঠে বলে,
–”করো, তাতে আমার কি?”
–”তুমি কষতো পাবে না?”
–”না।”
নায়েল এবার চিৎকার করে কেঁদে উঠলো। কান্নারত গলায় বলে,
–”আমি তোমাল কাছে ঘুমাবো।”
এরোজ এবার গা দুলিয়ে হেসে উঠল। বিষাদের হাসি! সে মায়া বাড়াতে চায় না। চোখের কোনা টলমল করে উঠল।
এই আবদার গুলো তাকে খুব টানে। তার মনে আশা বাঁধে, এই আবদার গুলো সবসময় শোনার জন্য। ছোট্ট দেহটি যখন তার বুকে লেপ্টে থাকে তখন মনে হয় রাতটা না শেষ হোক। তাহলেই তো দূরে সরে যাবে আর তার বুকটা খালি হয়ে যাবে। সে থমথমে মুখে নায়েলকে কোলে তুলে নেয়। সহসা নায়েল এরোজের গলা জড়িয়ে ধরে লেপ্টে যায় বুকে্ কাঁধে মাথা এলিয়ে দিতেই এরোজের মনে হলো পৃথিবীর সব সুখ আল্লাহ তায়ালা ইমরোজকে দিয়েছে। কিন্তু তার কাছে নেই কিছু! কিছু নেই!
বিষাদের যন্ত্রনা তীব্রতর হয়, যখন মনে পড়ে ইমরোজ অন্য নারীতে আসক্ত নয় বরং দু’টো ফুলকে দুমড়েমুচড়ে মারছে। সে কখনো হতে দেবে না এটা। একবার সৃজাকে নিজের আয়ত্তে আনতে পারলে ওটার কলিজা কেটে দুভাগ করে দেবে। তার পরিবারের দিকে চোখ দেয়ার শাস্তি সে ভয়ঙ্কর ভাবে দেবে।
এরোজ নায়েলকে বিছানায় বসাতে চাইলে, নায়েল আরো জোরে তাকে জড়িয়ে ধরে বলে,
–”না না আমি নামবো না। তুমি দিয়ে আসবে আমায়।”
এরোজের ক্ষমতা নেই মেয়েটিকে উপেক্ষা করার। সে তাকে কোলে করেই পুরো ঘর পরিষ্কার করে, এয়ার ফ্রেশনার স্প্রে করে। নিজেও ব্রাশ করে মাউথ ওয়াশ করে বডি স্প্রে করে। পুরো ঘরময় সুগন্ধে ভরে যেতেই নায়েল স্বস্তি ভরা নিঃশ্বাস নিতে শুরু করে।
সে গুনগুন করতে করতে এরোজের ঘরময় হাঁটে। এরোজ সব কাজ শেষ করে নায়েলের দিকে হাত বাড়িয়ে দিতেই নায়েল ঝাঁপিয়ে পড়ে তার বুকে। এরোজ ছোট্ট দেহটিকে বুকে জড়িয়ে কম্ফোর্টারের ভেতরে ঢুকে যায়। আরো একটি স্বর্গীয় রাত এরোজকে উপহার দেওয়ার জন্য এরোজ ছলছল নয়নে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে সৃষ্টিকর্তার কাছে। কতো সুখ! কতো শান্তি! ছোট্ট এই প্রানটার মাঝে অথচ তার ভাই কি-না!!
সকাল সকাল আজ বৈঠক বসেছে সিকদার বাড়িতে। যার কারণে ঘরের নারী আর বাচ্চারা আজ অন্যত্র নাস্তা করছে।
খাবার টেবিলে গাম্ভীর্যতার ছড়াছড়ি। টেবিলে শুধুই ঘরের পুরুষদের দেখা যাচ্ছে, এমনকি এরোজকেও।
কক্ষের সেই গাম্ভীর্যতা ভেঙে ইমরোজের ক্ষিপ্ত কণ্ঠ বলল,
–”আব্বু, এরোজকে বোঝাও ও যা ইচ্ছা তাই করতে পারে না। সব জায়গাতে ওর উশৃঙ্খলতা, উগ্রতা মানবো না আমি। ও ছোট বোনকে দেখতে গিয়ে বড় বোনকে ভালোবাসার প্রস্তাব দেয় কি করে? সবকিছুর একটা সীমা থাকা দরকার।”
ইমরোজ রাগে ফোঁস ফোঁস করছে। এরোজের ভ্রু উঁচিয়ে গেল ভাইয়ের কথায়। সে বাঁকা হেসে প্লেট উল্টায়। হাত বাড়িয়ে পরোটা আর গরুর মাংস প্লেটে তুলে নিতে নিতে। শান্ত কণ্ঠে বলে,
–”আমার যাকে ইচ্ছা আমি তাকে বিয়ে করবো। পাত্রীর বড় বোন হোক কিংবা তাদের মা হোক তাতে তোর কি?”
তকদির সিকদার এতক্ষণ ছেলের দিকেই তাকিয়ে ছিল। ছেলের এমন নির্লিপ্ততায় তার মেজাজ চটে যায়। সে ক্ষিপ্ত কণ্ঠে বলে,
–”ফাজলামো হচ্ছে এখানে? সব জায়গায় আমার নাক না কাটালে তোমার হয় না? সৃজার ছোট বোন কত কষ্ট পাচ্ছে জানো? ইমরোজের কাছে জিজ্ঞেস করো, মেয়েটা তাকে ফোন দিয়ে কান্নাকাটি করেছে। মাতলামি করে বেড়াও সেটা আলাদা কথা, কিন্তু এখন তো মানুষকে কষ্ট দিতেও তুমি দু’বার ভাবো না। পছন্দ না হলে না হতো সেটা আলাদা কথা। কিন্তু ওর বড় বোনকেই তোমার বিয়ে করতে হবে কেন?”
–”কারণ আমি তাকে ভালোবাসি।”, এরোজ কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল।
ইমরোজ গর্জে উঠলো,
–”এই চুপ! একদম চুপ কর। কোন ভালোবাসা নেই। তুই শুধু ফাজলামো করছিস আমি বেশ ভালো করেই জানি। তুই এই বিয়ে ভেঙে দিবি। তোর বিয়ে করার হলে অন্য কাউকে বিয়ে কর। আমি অন্য কোন ভালো পাত্রী খুঁজে দেবো। কিন্তু ঐ বাড়ি থেকে কাউকে বিয়ে করার দরকার নেই তোর।”
এরোজ খাওয়া থামায়। অশান্ত, ক্রুব্ধ ইমরোজের পানে তাকিয়ে বরাবরের ন্যায় শান্ত স্বরে বলে,
–”তুই এমন ভাবে রিয়্যাক্ট করছিস যেন আমি সৃজাকে না তোর বউকে বিয়ে করছি।”
–”স্টপ ইট, এরোজ!”
এতক্ষণ বাদ তপোবনের ভারী কণ্ঠ শোনা গেল।
এরোজের কথায় সহসা ইমরোজ চুপসে গেল। চোখ মুখ উপচে পড়া ক্রোধ সামলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে সে। আরেকটু হলে সে রাগের বশে বলেই ফেলত সত্যটা। সে থতমত খাওয়া দৃষ্টিতে তাকায়, কৃত্রিম হেসে বলে,
–”না মানে আমি বলতে চাইছি যে, যেই বাড়ির একজন মেয়েকে রিজেক্ট করা হয়েছে, সেই বাড়ির আরেক মেয়েকে বউ আনা এটা দৃষ্টিকটু না? এটা বিশ্রী একটা ব্যপার। আব্বু তুমি কিছু করো!”
ইমরোজের শেষের কথায় আপ্রান চেষ্টার বহিঃপ্রকাশ। কোনোভাবে বিয়েটা ভেঙ্গে যাক। নয়তো সৃজার কাছে সে কাপুরুষ হয়েই থেকে যাবে। আর ইমরোজ সিকদার কখনো এই কাপুরুষের তকমা গায়ে লাগতে দেবে না।
সকলের মতামত শুনে তপোবন বলল,
–“আমি তো বুঝতে পারছি না এই বিষয়টা নিয়ে এত আলোচন সমালোচনার কি আছে? আর ইমরোজ, তোর এত ক্ষিপ্ত হওয়ার মতো কোনো কারন ও আমি দেখছি না। এরোজ তো আর সৃজার মতের বিরুদ্ধে গিয়ে ওকে বিয়ে করতে চায়নি। পাত্র-পাত্রী যখন রাজি তবে আমরা মাঝখান থেকে এসব সেন্টিমেন্টাল ব্যাপার কেন টানছি? আব্বু, সৃজার মা ও রাজি হয়েছে। আর কথা হলো সুপ্তির! সে সময় গড়ালে এসব কিছু ভুলে যাবে। এটা কোনো বিশ্রী ব্যপার নয়, বরং বড় বোনকে রেখে ছোট বোনকে বিয়ে করলে সেটা আরও দৃষ্টি কটু।”
এতটুকু বলে তপোবন থামে। পুনরায় মায়ের উদ্দেশ্যে বলে,
–”আম্মার যদি মেয়ে সবদিক থেকে পছন্দ হয়। তবে আব্বু, এই বিষয় নিয়ে আর বাড়াবাড়ি করো না। সকলে মিলে একটা দিন ধার্য করো। আর আকদ করে আসো। আমার মনে হয় না এই বিষয়টা ঝিমিয়ে রাখা উচিৎ।”
–”এক বাড়ি থেকে এক বোনকে কষ্ট দিয়ে, আরেক বোনকে বউ করে আনা, বিষয়টা কেমন তপোবন?”, তকদির সিকদার শান্ত স্বরে বলে।
–”বিষয়টা একটু জটিল তবে অসম্ভব তো নয় আব্বু। তুমি নিজেও কিছুটা এমন পরিস্থিতি পাড় করে এসেছো।”, তপোবন মৃদু হেসে বলল।
তকদির সিকদার শান্ত দৃষ্টিতে তাকায় ছেলের দিকে। নত মস্তকে খেতে থাকা নির্জনা বেগমের ও হাত থামলো। উষ্ণ এক নিঃশ্বাস ফেলে সে আবার খেতে শুরু করে।
ইমরোজ চাপা আক্রোশ, অকৃতকার্যতায় মিইয়ে গেল। সে খাওয়া বন্ধ করে চুপ করে বসে রইল। কিয়ৎকাল বাদ আবারো অন্য পন্থায় চেষ্টা চালিয়ে বলে,
–”ভাইজান তোমার এই সব বিষয়ে এরোজকে সাপোর্ট করা, আর ওর উচ্ছন্নতাকে প্রশ্রয় দেয়ার ফল কোনো একদিন বাজেভাবে তোমায় আশাহত করবে। তাকে জিজ্ঞাসা করো তো সে যে এতো টাকা উড়িয়ে বেড়ায় এই টাকা গুলো কাদের কষ্টের টাকা? কানাডাতে গিয়েই যে—সে বাড়ি কিনেছে তার পুরো টাকাটা আমাদের ইনকামের। অথচ সে যে ভরা সমাজে বলে এসেছে তার স্ত্রীকে সে সোনা নয় ডায়মন্ড দিয়ে ঘরে তুলবে।
তার পুরো ভিত্তি ই তো আমাদের ইনকামে গড়া। আমাদের কষ্টের ইনকামের মূল্য রয়েছে। আমাদের খরচের জন্য ও একটা টাকা দেয়?”
এরোজ শানিত দৃষ্টিতে তাকায় ভাইয়ের দিকে। রাগে হিসহিসিয়ে বলে,
–”কারণ এই যে গোটা সম্পত্তি—এই সম্পত্তিতে আমারো সমান ভাগ রয়েছে যেটা তোর আছে। আর তা দিয়ে আমি ওখানে বাড়ি কিনি না গাড়ি কিনি তাতে তোর কি?”
ইমরোজ দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
–”আমরা ইনকাম করে সেই সম্পদ টাকে ফলপ্রসূ করে তুলি। এমনি এমনি তো সম্পদ থেকে টাকা আসে না। তোর ভাগ তোকে আলাদা করে দেই, তারপর তুই দেখ তোর সম্পদ দিয়ে কোনো টাকা আসে কি-না!”, ইমরোজ পাল্টা রাগান্বিত স্বরে বলল।
এরোজ ও ক্ষিপ্ত কণ্ঠে বলে,
“হ্যাঁ হোক ভাগাভাগি! আমিও দেখবো আমি কিভাবে না খেয়ে মরি!”
তপোবনের হাতে মৃদু কম্পন অনুভব হলো, আজ এত বছর পর প্রথমবার এই সংসার, সম্পদের ভাগ বাটোয়ারা’র কথা শুনে। শুকনো একটা ঢোক গিললো সে। ভাইয়েরা বড় হয়ে গিয়েছে। এখন তারা নিজের ভাগ আলাদা করে নিতে চায়।
এই সংসারটিকে একত্রে পরিপূর্ণ হাসিখুশি দেখতে চাওয়ার ইচ্ছারা দূর্বল হয়ে পড়তে লাগল।
তকদির সিকদারের মাঝেও ঠিক একই বেদনার প্রলেপ পড়ল। সে নম্র স্বরে ইমরোজকে বলে,
–”থামো ইমরোজ! অনেক হয়েছে। সে যাকে ইচ্ছা তাকে বিয়ে করতেই পারে আমাদের এর মধ্যে নাক গলানো উচিৎ নয়। আমরা ভালো-মন্দ দু একটা উপদেশ দিতে পারি। কিন্তু জোর করতে পারি না। আর এরপর থেকে যেন সম্পদ নিয়ে আর কোনো কথা আমি না শুনি। সঠিক সময় আসলে আমি নিজেই সবার মাঝে ভাগ বাটোয়ারা করে দেবো। নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব করবে না। সম্পদ নিয়ে আমি কবরে চলে যাবো না।”
–”কিন্তু আব্বু!…” , ইমরোজের কণ্ঠে তকদির সিকদার ব্যগ্র কণ্ঠে তাকে থামিয়ে বলে,
–”আর কোন কথা নয়, ইমরোজ। তপোবন, নির্জনা তোমরা দু’জন সৃজার পরিবারের সাথে মিলে শিঘ্রই একটা দিনতারিখ ঠিক করো। আকদ করে আসবো।”
–”আমি আমার স্ত্রীকে ধুমধাম করে উঠিয়ে আনবো।”, এরোজ, ইমরোজের পানে শানিত দৃষ্টি রেখে বলে।
পরনারীর দিকে চোখ দেয়ার শাস্তিও সে দেবে ইমরোজকে। এবং তা খুব বাজেভাবে দেবে। চরিত্রহীন তো চরিত্রহীন! তার সামনে ভাই বোন বলে কোনো সম্পর্ক নেই। একটা চরিত্রহীন মানুষ দুনিয়ার সবচেয়ে নিকৃষ্ট এবং শক্তিশালী মানুষ হয়। তার মধ্যে থাকে কাউকে ধ্বংস করার ক্ষমতা, গোটা পরিবারটা ধ্বংস করার মতো ক্ষমতা থাকে।
তকদির সিকদার অতিষ্ট হয়ে বলে,
–”হ্যাঁ হ্যাঁ যা ইচ্ছা তাই করো। তোমায় আঁটকানোর সাধ্য কার আছে!”
ইমরোজ রাগে গজগজ করতে করতে চেয়ার ছেড়ে উঠে চলে যায়। এরোজ বাঁকা হেসে খেতে লাগল।
–”এরোজ! মাই কিং! কি করছো?”
সৃজার আবেদনময়ী কণ্ঠে এরোজ সিগারেটে সুখটান দিতে দিতে বাঁকা হেসে বলে,
–”বাসর রাতের প্লানিং করছি, মাই কুইন!”
সৃজার আবেদনময়ী কণ্ঠ রোধ হয়ে আসল এরোজের জড়ানো কণ্ঠে। এরোজ কতদূর ভেবে নিয়েছে তাকে নিয়ে। তার মধ্যে হঠাৎ করেই কিছু অনুভব হতে লাগল এরোজের জন্য। সে এখনো নিশ্চিত নয় এরোজকে নিয়ে।
তার শুধু একটাই লক্ষ্য সেটা হলো সিকদার বাড়ির বউ হওয়া, আর বিশাল এই সম্পদের অধিকারী হওয়া। নিজেকে সমাজে উচ্চবিত্ত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা। সে অফিসের ডকুমেন্ট তৈরি করতে করতে মিহি স্বরে শুধায়,
–”এখনি এসব নিয়ে ভাবছো? তুমি তো দেখছি খুব ফার্স্ট!”
–”আমার তো তর সইছে না। পারলে এখনি তুলে নিয়ে আসি তোমায়।”
–”নিয়ে কি করবে?”, সৃজা লাজুক হেসে শুধায়।
–”কে/টে কু/টে চার পিস করে রূপসা নদীতে ভাসিয়ে দেবো। আর কলিজাটা দিয়ে ভুনা খিচুড়ি করব! মেজো ভাইজান খুব পছন্দ করে কলিজা দিয়ে ভুনা খিচুড়ি!”,
এরোজের নিখাদ কণ্ঠে সৃজা ভিমড়ি খেয়ে গেল। টাইপিং থামিয়ে আশ্চর্য হয়ে শুধায়,
–”কি বললে?”
–”কি বললাম?”, এরোজের নিরুদ্বেগ কণ্ঠ।
–“এই যে মাত্র বললে কেটে…”, সৃজার কথা অসম্পূর্ণ থেকে গেলো এরোজের ব্যগ্র কণ্ঠে। সে বিগলিত কণ্ঠে বলে,
–”ওহ্ সৃজা, হাউ সুইট অফ ইউ! তুমি তো দেখছি আমার ইয়ার্কিটাকেও সিরিয়াসলি নিয়ে বিশ্বাস করছো। হাউ সুইট! এমন একজন লয়াল জীবনসঙ্গীর অভাবেই তো আমি আজ বত্রিশ বছর যাবৎ অবিবাহিত! ফাইনালি আই গট মাই লাইফ পার্টনার! আমার মনের রাজ্যের রানীকে দ্রুত তার সিংহাসনে বসাবো। আই কান্ট ওয়েট এনিমোর!”
সৃজা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। একগাল হেসে বলল,
–”তুমি প্রচুর দুষ্টু এরোজ। ”
–”কেন? তুমি কি ভাবছিলে আমি সত্যিই এমন কিছু করব? আমি তো ভাবছি বাসর রাতে তোমায় কিভাবে ভালোবাসবো। এত সুন্দরী, সুইট মেয়েটিকে যেভাবে ভালোবাসবো সেটাই কম পড়বে। “, এরোজ প্রগাঢ় হেসে বলল। এরোজের আশেপাশের তার ছোট ভাইয় সহ সৈকত হা করে তাকিয়ে আছে। তাদের ভাই যে তোষামোদে এত পটু তা তারা আজ-ই জানলো। বর্তমানে তারা নিউমার্কেটের ভেতরে রয়েছে।
–“ফোন কেন দিয়েছিলে মাই কুইন?”, এরোজ আদুরে গলায় জিজ্ঞাসা করে।
–“কেন আমি কি আমার কিং কে ফোন দিতে পারি না?”
–“মাই সুইটহার্ট, অবশ্যই পারো। যেকোনো সময় পারো। আমি এখনি ফোন দিতে চাচ্ছিলাম। আমার বুকটা তৃষ্ণার্ত হয়ে আছে তোমার কোকিলা কণ্ঠ আর লাজুক মুখটি দেখার জন্য। ছোঁয়ার জন্য তো হাত নিশপিশ করছে। বলতে চাচ্ছিলাম যে, তুমি আংটি তো চুজ করলে কিন্তু গলার হার চুজ করা হয়নি তো! আমি চাই না তোমার এই অমূল্য দেহে তুচ্ছ সোনা শোভা পাক! আমার অমূল্য মানুষটিকে আমি অমূল্য কিছু দিয়ে মুড়িয়ে দিতে পারলে খুশি হবো। তুমি কাজ শেষ করে আমায় মেসেজ করো। আমি নিতে আসব তোমায়।”
সৃজা আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়ে। সে আপ্লুত হয়ে বলে,
–“তোমার নামে এত দিন শুধু খারাপ কথাই শুনেছি। অথচ তোমার সাথে যত সময় কাটাচ্ছি মনে হচ্ছে আমি কোন সুপুরুষের সাথে কথা বলছি। একটা মানুষ এতো সুইট কি করে হয়! আম রিয়েলি ভেরি লাকি এরোজ।”
–“ইয়েস মাই লাভ। তোমার থেকে লাকি এই দুনিয়াতে আর দুটো নেই। নয়তো আমি থাকি তোমার কপালে?”, এরোজ বিগলিত কণ্ঠে বলে। চোখেমুখে তার হিংস্রতা। ইচ্ছে তো করছে এটাকে গলা টিপে মেরে তারপর জেলে গিয়ে আরামসে ঘুমাতে। সৃজা আনন্দিত হয়ে গেল এরোজের প্রস্তাবে। সে দ্রুত নিজের কাজ শেষ করতে লাগল।
সন্ধ্যা সাতটা। তপোবনের আদেশ মোতাবেক সৃজা অন্য সেক্টরে কাজ করে। আর সেই কাজ শিখতে এবং করতে সৃজা দম ফেলার সুযোগ পাচ্ছে না। সে রাগে গজগজ করছে আর কাজ করছে। আর তো মাত্র কটা দিন। তারপর সিকদার বাড়ির বউ হয়ে সব কটাকে দেখে নেবে। তখন রানীর বেশে বসে বসে শুধু টাকা গুনবে।
উজ্জ্বল স্বপ্ন বুনতে বুনতেই আবির্ভাব ঘটলো ইমরোজের। হাওয়ার বেগে ইমরোজ আসল আর সৃজাকে তার ডেস্ক থেকে টানতে টানতে নিয়ে যায় অফিসের শুনশান জায়গায়। সৃজা ক্রুব্ধ গলায় বলে,
–”ছাড়ো ইমরোজ। হুটহাট তুমি এসে আমার উপর এমন অধিকার দেখাতে পারো না।”
দেয়ালে সজোরে চেপে ধরে ইমরোজ হিসহিসিয়ে বলল,
–“তো কে পারে? এরোজ? সামান্য একটা ডায়মন্ডের রিং আর মিষ্টি মিষ্টি কথায় তুই বিক্রি হয়ে গিয়েছিস? আমাকে এখন আর ভালোবাসিস না?”
–“খবরদার ইমরোজ তুই তোকারি করবে না। তুমিও কোন দুধের ধোঁয়া তুলসী পাতা না। নয়তো বউ বাচ্চা রেখে পরোকিয়া করে বেড়াতে না। আমি তোমাকে ভালোবেসেছিলাম কিন্তু তুমি সেই সম্মান রাখতে পারোনি। কিন্তু এরোজ সেটা রেখেছে! সে আমায় স্বসম্মানে আমায় নিজের বউ করতে চায়। কিন্তু তোমার মধ্যে এমন কোন আগ্রহ দেখা যায়নি। তার থেকে ভালো তুমি থাকো। আমি এরোজকে বিয়ে করে নেই।”, সৃজা দাঁতে দাঁত চেপে বলল।
ইমরোজ গর্জে উঠলো,
–“তুই কাউকে বিয়ে করতে পারবি না আমায় ছাড়া। এতোদিন তোর পেছনে আমি টাকা উড়িয়েছি এই দিন দেখার জন্য? তুই এরোজের মুখের ওপর এই বিয়ের জন্য না করবি।”
–“করবো না। আমি ওকে বিয়ে করব। বিয়ে পর্যন্ত তোমায় একটা সুযোগ দিচ্ছি ইমরোজ। এই কদিনে যদি পারো তবে আমায় স্বসম্মানে নিজের বউ করে বাড়ি তোলো, নয়তো নিজের এই কাপুরুষের মতো মুখ আর আমায় দেখাবে না।”
বলেই সৃজা গটগট করে চলে যায়। ইমরোজ ও তার পিছু পিছু যায়।
–“সৃজা শোনো, আমার কথা আছো তোমার সাথে। আমরা এক জায়গায় শান্ত হয়ে বসে কথা বলি। তুমি তো জানো আমার পরিস্থিতি। আমি যদি এখন কোনো পদক্ষেপ নেই তবে বাবা আর ভাইজান আমায় ছেড়ে কথা বলবে না।”
ইমরোজ পেছন পেছন হাঁটতে হাঁটতে বলে। সৃজাকে ধরতে যাবে তার আগেই কেউ সজোরে সৃজাকে টেনে নিয়ে গেল। ইমরোজ চমকে উঠলো এরোজকে দেখে। তার থেকেও বেশি চমকায় এরোজের বাহুডোরে সৃজাকে দেখে। তার চোয়াল শক্ত হয়ে আসে। ধূসর বর্ণের দৃষ্টিদ্বয় সরু হয়ে আছে। এরোজ ভ্রু নাচিয়ে শুধায়
–“কি হলো ইমরোজ ভাইজান, ছোট ভাইয়ের বউয়ের পেছনে ঘুরছেন কেন?”
–“তোদের এখনো বিয়ে হয়নি এরোজ। আর হবে কি-না সেটাও সন্দেহ। সৃজা আমার ইমপ্লয়ি, ওর সাথে আমার কাজ আছে।”
এরোজ ফিচলে হেসে বলল,
–“এবার এই বস ইম্প্লয়ি’র সম্পর্ক ভুলে যান ভাইজান। আমার বউকে কারোর আন্ডারে কাজ করতে দেবো, আপনি এটা ভাবলেন কি করে? আমার বউ তো হবে এই কোম্পানির আরেকজন মালিক। আসছি হ্যাঁ, আমরা সেকেন্ড টাইম ডেটে যাবো। লেইট নাইট ডেট। সি ইউ!”
এরোজের কথায় সৃজার চোখ মুখ চকচক করে উঠলো। সে নাচতে নাচতে বেরিয়ে যায় এরোজের সাথে। আর ইমরোজ রাগে দুঃখে নিজের মাথার চুল টানতে লাগল।
পকেটে থাকা ফোনটা লাগাতার বেজে যাচ্ছে। ইমরোজ কিছুটা ত্যক্ত বিরক্ত হয়ে ফোনটা কানে তুলল। ওপাশ থেকে ভেসে এল চিকিৎসকের গম্ভীর ও মাপা কণ্ঠস্বর। তাকে জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালে তলব করা হচ্ছে। ললাটে বিরক্তির ভাঁজ গভীর করে ইমরোজ শুধাল,
–“এতদিন কেন লাগল রিপোর্ট আসতে? আর এখনি আসা লাগবে? আমি ব্যস্ত আছি।”
–“ইমার্জেন্সি, ইমরোজ! তোমাকে এখনই আসতে হবে। এসো, সামনাসামনি কথা হবে।”
চিকিৎসকের নিরুত্তাপ কথায় ইমরোজের বিরক্তি এবার উদ্বেগে রূপ নিল। সে সংক্ষিপ্ত উত্তরে বলল,
—“আসছি।”
চেম্বারে পা রাখতেই ডাক্তার থমথমে মুখে বললেন,
—“বোসো, ইমরোজ।”
ইমরোজ চেয়ার টেনে বসে শুধায়,
–“এত দেরি হলো কেন রিপোর্ট আসতে? হাসপাতালের রেকর্ড তো খারাপ হয়ে যাচ্ছে দিন দিন।”
ডাক্তার দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
–“হাসপাতালের কোনো ত্রুটি নেই। এই সপ্তাহে খুলনাতে কোনো দক্ষ হেমাটোলজিস্ট কিংবা অনকোলজিস্ট সহজলভ্য ছিলেন না। তাই মৌনতার স্যাম্পল ঢাকায় পাঠাতে হয়েছে। সেখানে দুইজন বিজ্ঞ হেমাটোলজিস্ট দিয়ে রিপোর্ট করিয়েছি।”
ইমরোজ কপাল কুঁচকে নেয়। অবুঝ কণ্ঠে শুধায়,
–“হেমাটোলজিস্ট, অনকোলজিস্ট তো..”
ডাক্তারটি রিপোর্ট বের করতে করতে ব্যগ্র কণ্ঠে বলে,
–“রক্ত এবং ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ”
ইমরোজ তখনো অবুঝপানে তাকিয়ে আছে ডাক্তরের দিকে। চোখমুখ তার অস্বাভাবিক রকমের ফ্যাকাসে দেখালো।
সে ক্ষীণ, কম্পিত কণ্ঠে শুধাল,
—“গুরুতর কিছু কি ডাক্তার? মৌনতার আসলে কী হয়েছে?”
ডাক্তার মলিন মুখে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন,
—“সাহস হারিও না, ইমরোজ। চিকিৎসাবিজ্ঞান এখন অনেক উন্নত। দেশ-বিদেশে সব কিছুরই সুচিকিৎসা সম্ভব।”
ইমরোজ মাথা ঝেড়ে বলল,
–“না ডক্টর, আমি মোটেও ভয় পাচ্ছি না। আপনি বলুন কোনো সমস্যা নেই। কি হয়েছে মৌনতার?”
সিটি মেডিকেল এর গ্রাউন্ড ফ্লোরে জনমানবে আড়ম্বরপূর্ণ। এই একটা জায়গাতেই কেউ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সুখের বার্তা পায়, আবার কেউ প্রিয়জনকে চিরতরে হারানোর অমোঘ সত্য মেনে নিয়ে রিক্ত হাতে ফিরে যায়।
তেমনি কিছুটা বিভ্রান্ত, দিক দিশাহারা পথিকের ন্যায় গ্রাউন্ড ফ্লোরের কাউচে বসে আছে ইমরোজ। হাতে তার মেডিকেল রিপোর্ট। মস্তিষ্ক থম মেরে আছে। ইমরোজের জীবনের সকল অশান্তি, অপ্রাপ্তি, হতাশা, টেনশন সব দূর হয় দিনশেষে মৌনতার সান্নিধ্যে। আর মৌনতা এমনি একটা মেয়ে, যে কি-না বিয়ের দিন থেকে আজ পর্যন্ত সবকিছুর আগে স্বামীর চাওয়াকে রেখেছে। ইমরোজের চিন্তা, হতাশা দূর করার জন্য মৌনতাই যথেষ্ট! সে ইমরোজকে এমনভাবে ট্রিট করে যেন সে কোনো রাজা আর মৌনতা তার বিশ্বস্ত, একনিষ্ঠ সেবিকা। ইমরোজ হ্যাঁ বললে হ্যাঁ, না বললে না।
ঠিক এই জায়গা থেকেই ইমরোজ দূর্বল মৌনতার প্রতি।
প্রতিটা পুরুষ-ই চায় সে কোনো নারীর থেকে রাজার মতো ট্রিট পাবে। এর জন্যই সে চাইলেও জোরগলায় বলতে পারে না, সে মৌনতাকে ছেড়ে দেবে। কেননা মৌনতার তো কোনো খুঁত’ই নেই। যা খুঁত বের করে তা তার চরিত্রহীন, দ্বিচারিতায় লিপ্ত মন। তার তো মৌনতার প্রতি টান এই কারণেই। কিন্তু যখন একটা মানুষের সেবা করার বা নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার নূন্যতম ক্ষমতাটুকুও আর অবশিষ্ট থাকবে না, তখন সেই মানুষের প্রয়োজনীয়তা কী? এমন জরাজীর্ণ মানুষের জন্য অপরাধবোধে দগ্ধ হওয়ারই বা কী আছে?
দীর্ঘসময়ের স্থবিরতা ভেঙে ইমরোজ হাতের রিপোর্টটির দিকে তাকায়। হঠাৎ করেই তার ওষ্ঠকোনা বেঁকে যায়। এক পৈশাচিক হাসিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল তার মুখ। একটু আগের সেই বিভ্রান্তি আর দিশেহারা ভাব অচিরেই কর্পূরের মতো উবে গেছে।
ইমরোজের চোখেমুখে এখন যে প্রফুল্লতা, তা অস্বাভাবিক এবং তীব্র। যেন কোনো গোলকধাঁধায় আটকে পড়া পথিক আচমকা প্রস্থানের গোপন পথটি খুঁজে পেয়েছে। এই হাসির ঝলক নিজের ললাট থেকে ‘কাপুরুষ’ আর ‘অক্ষম’ হওয়ার তকমা ঝেড়ে ফেলতে পারার এক পরম পৈশাচিক তৃপ্তি।
মস্তিষ্ক থেকে সবচেয়ে বড় বোঝা, ঝামেলা নেমে যেতেই মাথাটা হালকা হয়ে গেল। সে প্রফুল্ল চিত্তে উঠে দাঁড়ায়। ঘড়িতে তখন নয়টার বেশি বাজে। সে সোজা নিউমার্কেটে যায়। একটি ডায়মন্ডের দোকানে যায়। দেখে দেখে পছন্দ করে একটা ডায়মন্ডের সেট কিনলো। সেটা নিয়ে সোজা রওনা দিলো কাঙ্ক্ষিত মানুষটির কাছে।
সৃজা মেজাজ খারাপ করে ঘুমিয়ে ছিল নিজের বিছানায়। এরোজ কতকিছু বলে তাকে বাহিরে নিয়ে গিয়েছিল, কিন্তু তেমন কিছুই করেনি সে। বাইকে করে পুরো খুলনা একপাক ঘুরিয়ে, নিউমার্কেট থেকে বিশ টাকার ঝালমুড়ি খাইয়ে বাড়িতে দিয়ে গিয়েছে। সেই থেকেই তার মেজাজ খারাপ।
ভেবেছিল ডায়মন্ডের শপ থেকে গহনা চুজ করবে তারপর রেস্টুরেন্টে খেতে যাবে।
এর থেকে ইমরোজই তো ভালো ছিল; অন্তত সে তার প্রতিটি ইশারা পালন করত। নিজের জীবনের সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে কি সে ভুল করছে?
চিন্তায় পড়ল সৃজা!
গেটের ভেতর গাড়ি ঢোকার শব্দে সে জানালা থেকে উঁকি দেয়। ইমরোজকে দেখতেই চাপা আনন্দ দেখা গেল তার মাঝে। তবুও সে গাম্ভীর্যতা ধরে রাখে। ইমরোজ সোজা তার ঘরে আসে। এর আগেও এই ঘরে বহুবার এসেছে সে, একসাথে রাতে থেকেছে ও। ইমরোজের মাঝে অন্যরকম এক কনফিডেন্স দেখে সৃজার ভ্রু কুঁচকে গেল। সে গম্ভীর গলায় শুধায়,
–”তুমি এখানে কেন? তোমায় বলেছিলাম না আজ থেকে আমাদের পথ ভিন্ন!”
ইমরোজ উত্তরের বদলে প্যাকেটটি বিছানায় রেখে সৃজাকে এক হেঁচকা টানে নিজের বাহুবন্দি করল। সৃজা একটুও হকচকালো না। বরং বিরক্ত হয়। ইমরোজ স্মিত হেসে দেখে সেই বিরক্তি ভরা মুখ। গালে আলতো হাতে আঙুল ছোঁয়ায়। ধিমি কণ্ঠে বলে,
–”উঁহু, ভিন্ন নয়। আজ থেকে আমাদের পথ এক। এটাই সুনিশ্চিত করার জন্য এসেছি। এই মুখ থেকে এখন থেকে কাপুরুষ নয়, সুপুরুষের তকমা পাবো।”
সৃজা বিভ্রান্ত হয়ে শুধাল, —“কী বলছ এসব?”
ইমরোজ মৃদু হাসল। দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
—“বিয়ে করব এখনই। চলো।”
সৃজা স্তব্ধ হয়ে গেল। অবিশ্বাস্য নয়নে তাকিয়ে বলল,
—“পাগল হয়েছ? নাকি মজা করছ আমার সাথে?”
ইমরোজ পকেট থেকে সেই মেডিকেল রিপোর্টটি বের করে সৃজার সামনে ধরল। অবজ্ঞার সুরে বলল,
—“একজন মৃতপ্রায় মানুষের জন্য আমি আমার উজ্জ্বল জীবন কেন উৎসর্গ করব? আর রইলো বাড়ির লোক! তারাই আর কয়দিন পর উঠেপড়ে লাগবে আমার জন্য বউ আর নায়েলের দেখাশোনার জন্য মা আনতে। এবং তোমার থেকে বেস্ট অপশন আর কিছু হতেই পারে না। সো চিল! আমায় কালারিং ও হতে হলো না, কারোর মন ও ভাঙতে হলো না। সৃষ্টিকর্তা স্ব-উদ্যোগে আমাদের পথের কাঁটা উপড়ে ফেলছে।”
সৃজা রিপোর্টটির ওপর চোখ বোলাতেই স্থির হয়ে গেল। কয়েক মুহূর্তের নীরবতার পর সে এক মেকি ধিক্কার জানিয়ে বলল,
—“তুমি জালেম ইমরোজ! মৌনতার জীবনের সবচেয়ে বড় পাপ—সে তোমার স্ত্রী। তোমার সংসার, সন্তান লালন পালন করার প্রতিদান হিসেবে, ভোলাভালা মেয়েটাকে তুমি এটা দিলে।”
বলেই সৃজা খিলখিলিয়ে হেসে উঠল। ইমরোজ ও বাঁকা হাসে। পুনরায় এগিয়ে আসে সৃজার কাছে। কোমড়ে মৃদু চাপ প্রয়োগে মেয়েটিকে নিজের সাথে মিশিয়ে নেয়। থমথমে মুখে মেয়েটির হাস্যোজ্জ্বল চোয়াল চেপে ধরে হিসহিসিয়ে বলল,
–”যত ইচ্ছা হেসে নাও মেয়ে। তোমার কঠিন শাস্তি পাওনা আছে। আমাকে ছেড়ে অন্য কাউকে বিয়ে করার চিন্তা তুমি কোন সাহসে করো!”
–”কেন করব না? তুমি আমায় অবহেলা করো, আমায় আমার প্রাপ্য সম্মান দাও না, তবে কেন করবো না? আজ যদি আমি এরোজকে বিয়ে করার কথা না বলতাম, তবে কি তুমি এত তাড়াতাড়ি আমায় বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিতে?”, সৃজা দৃঢ় কণ্ঠে বলে।
ইমরোজ একটু নরম হয়। আলতো চুম্বনে সৃজার ওষ্ঠাধর ছুঁয়ে দিল। আদুরে গলায় বলল
–”আর কোনো সমস্যা আসতে দেবো না। অনেক হয়েছে। এবার এই লুকোচুরি খেলার সমাপ্তি ঘটাতেই হবে। আর কিছুদিন, তাহলেই সাপ ও মরবে লাঠিও ভাঙবে না।”
–”কি করতে চাইছো তুমি?”, সৃজা অবুঝ কণ্ঠে শুধায়।
ইমরোজের স্বরে আদিম হিংস্রতা, —“মৌনতা জানতেই পারবে না সে কী কারণে মারা যাচ্ছে।”
বলেই সে অবলীলায় রিপোর্টটি ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলল।
সৃজা অবিশ্বাস্য নয়নে তাকায়। আর ইমরোজ ক্ষণিকের মোহে ভুলে বসলো দিনশেষে সে এই মৌনতা নামক মেয়েটার কাছেই স্বস্তি খুঁজতো, তার সন্তানের মা। মেয়েটার কাছে সৃষ্টিকর্তার পর তার স্বামীর স্থান। পরনারীর মোহ এত কেনোশক্তিশালী?
একটাবার পিছু ঘুরে দেখলো না ফুলের মতো স্নিগ্ধ মেয়েটার এমন পৈশাচিকতা তো প্রাপ্য নয়।
কিছুটা ঘোরের মাঝে কাটালো সৃজার সময়টা। স্তব্ধতার আভাস চোখেমুখে।
কিন্তু ডায়মন্ডের সেটটি হাতে পেয়ে এক লহমায় সব গ্লানি ভুলে গেল। তবে হঠাৎ এরোজের কথা মনে পড়তেই তার চোখে ভয়ের আভাস ফুটল, —“কিন্তু এরোজ? ওকে কী বলব?”
সৃজার প্রশ্নে ইমরোজ চোয়াল শক্ত করে বলে,
–”মুখের ওপর না করে দেবে। বলবে ওর মতো মাতালের সাথে তোমার যায় না। যতসব বড় বড় কথা মুখে। বউকে ধুমধাম করে ঘরে তুলবে, ডায়মন্ড দিয়ে। ওর কানাডার বাড়ি আব্বুর টাকায় কেনা। এক দিন কাজ করে, সেই টাকা দিয়ে এক সপ্তাহ নেশা করে পড়ে থাকে। ওর সেই সামার্থ্য আছে? সে আবর বিয়ে করতে চায় তোমায়। ও তোমার যোগ্য?”
সৃজা মনে মনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। সত্যি তো, হুজুগের বশে এরোজকে বিয়ে করলে সে কত বড় লোকসানই না করত!
মনে মনে ইমরোজকে ধন্যবাদ জানায়। সেখানেই কিছুটা মুহূর্ত উষ্ণ করে তুললো ইমরোজের মেজাজ খারাপ দূর করার প্রয়াসে।
এবং একটা দীর্ঘ অবৈধ সম্পর্কের সমাপ্তি ঘটে তার এক দেড় ঘন্টার মাঝেই। ইমরোজ বিয়ের সকল ব্যবস্থা করেই এসেছিল। এক দেড় ঘন্টার ব্যবধানেই খুব লুকোচুরি করে তাদের বিবাহকার্য সম্পন্ন হয়। রাতটি ইমরোজের কাছে অন্যরকম হয়ে ওঠে।
বিবাহে উপস্থিত দু’জন কাছের, বিশ্বস্ত বন্ধু এবং সৃজার পরিবার নিয়ে রেস্টুরেন্টে খাওয়া-দাওয়া করে তারা। ইমরোজ যখন আমোদে মগ্ন তখন ফোন আসে মৌনতার। সরব ইমরোজের হাসিমুখে ভাটা পড়লো। গাম্ভীর্যের সাথে সে ফোনটা রিসিভ করে। রিসিভ হতেই মৌনতা জিজ্ঞাসা করে,
–”শুনছেন, ডাক্তারের সাথে কথা হয়েছিল? কোনোকিছু বলেছে? কোনো ঔষধ দিয়েছে?
–”কেন কি হয়েছে?”, ইমরোজ সন্দিগ্ধ কণ্ঠে শুধায়।
ইমরোজের প্রশ্নে মৌনতা মলিন কণ্ঠে বলে,
“শরীরটা একটুও ভালো যাচ্ছে না।”
প্রতি রাতেই মৌনতার, চোখে বাঁধার মতো ব্লিডিং এর কারণ এতদিন না বুঝলেও আজ স্পষ্ট ইমরোজের কাছে। তবে সেটি সন্তপর্ণে এড়িয়ে যায় ইমরোজ। নির্বিকার কণ্ঠে বলে,
–”অতিরিক্ত চিন্তা করার কিছু নেই। ডাক্তারের সাথে কথা হয়নি আমার। দেখি আগামীকাল কথা বলে ঔষধ নিয়ে আসব আমি।”
–”আগামীকাল? আপনি আজ বাসায় আসবেন না?”,মৌনতা উৎকঠা নিয়ে বলে।
–”নাহ।”, ইমরোজ একপলক সৃজার হাস্যোজ্জ্বল আবেদনময়ী বেশভূষার দিকে দৃষ্টিপাত করে জবাব দেয়।
অপরপাশে মৌনতার বক্ষস্থল খামচে ধরল। কোনোভাবে কি ইমরোজ সৃজার সাথে থাকবে? কিন্তু কিভাবে? তাদের মধ্যে কি এখনো কিছু আছে? সৃজা তো ছোট ভাইজানকে বিয়ে করছে। ছটফট করে উঠল। গাল গলা ঘেমে উঠল। জোর খাটিয়ে বলে,
–”এই ঠান্ডায় বাইরে কোথায় থাকবেন? এটা কেমন দেখায়! একটু দেরি হলেও, জরুরী কাজ থাকলে সেটা শেষ করে বাড়িতে চলে আসুন না!”
—“জরুরি কাজ আছে। আজ ফেরা সম্ভব নয়। বাড়িতে সবাইকে জানিয়ে দিও।” বলেই ইমরোজ ফোনটা কেটে দিল।
মৌনতা উদাসীন দৃষ্টিতে ফোনের দিকে তাকিয়ে রয়। এখন আর দেহ মন কোনটাই চলে না। বড্ড ক্লান্ত লাগে! অন্তঃস্থল অর্তনাদ করে বলে ওঠে, পৃথিবীর কোনো জায়গা বা কেউ কি একটু শান্তি দিতে পারে না তাকে? কত রাত আরামে ঘুমানো হয় না, কতদিন হলো চোখের পানি ছাড়া কাটায়নি। সব যন্ত্রণা তার জন্যই লিখে রেখেছে কি?
অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৪১
কিন্তু ভঙ্গুর নারীটি তখনো বুঝতে পারেনি, তার তিলে তিলে গড়া সবকিছু শেষ। তার অগোচরেই সৃষ্টিকর্তা তাকে চিরশান্তি দেওয়ার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে ফেলেছেন। শান্তির ঘুম আসছে মৌন! এই তো আর একটু, তারপরেই এই পিশাচে ভরপুর পৃথিবীটা থেকে রেহাই পাবে চিরতরে। একটা শান্তির ঘুম দিতে পারবে। কেউ আর কষ্ট দিতে পারবে না।
স্বামীর সংসার আগলে রাখতে চাওয়া সেই একনিষ্ঠ, ধৈর্যশীল বোকা নারীটির শেষ যাত্রাটি অবশ্যই প্রশান্তির হবে।
